Last updated Oct 24th, 2026
0

লুসাই জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনে নাম থাকা এগারোটি আদিবাসী জাতির মধ্যে সবচেয়ে ছোট: 2022 সালের জনশুমারিতে সারা বাংলাদেশে লুসাই গোনা হয়েছে মাত্র 380 জন, যার 111 জন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায়, অর্থাৎ সাজেক যে উপজেলায়। তাঁদের ভাষা কুকি-চিন দলের, প্রায় সবাই খ্রিস্টান, আর তাঁদের ভাষা, প্রথাগত আইন ও আত্মীয়তার বড় অংশ সীমান্তের ওপারে ভারতের মিজোরামের সঙ্গে জড়ানো, যেখানে একই জনগোষ্ঠী আজ “মিজো” নামে পরিচিত।
এই পাতা বাংলাদেশের লুসাইদের একটি পূর্ণ পরিচিতি: কতজন, কোন উপজেলায়, কোন ভাষায় কথা বলেন, সমাজ ও প্রথাগত আইন কেমন, আর আজ তাঁদের অবস্থা কী। মিজোরামের তথ্য যেখানে এসেছে, সেখানে আলাদা করে “মিজোরাম” লেখা আছে, কারণ উৎসগুলো প্রায়ই দুই দেশের লুসাইকে একসঙ্গে মিশিয়ে লেখে। সাজেকের পাড়াগুলোর ইতিহাস আছে আমাদের সাজেকের রুইলুই, কংলাক ও হামারি পাড়ার ইতিহাস লেখায়, আর লুসাইদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম আসার কথা আছে বম, পাংখোয়া, লুসাই ও খুমি সমাজে খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস লেখায়; এখানে সেগুলো আবার বলা হয়নি, কেবল সারকথা ও লিংক। পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জনগোষ্ঠী ও বিষয়ের সূচি আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব পাতায়।
সূচিপত্র
বাংলাদেশের আইনে ও শুমারিতে নামটি “লুসাই” (ইংরেজিতে Lusai বা Lushai)। একই মানুষকে সুগত চাকমা লিখেছেন “লুসেই”, ব্রিটিশ নথিতে “Lushai”, আর ক্যাপ্টেন লুইন 1869 সালে লিখেছিলেন “Lhoosai”। মিজোরামে আজ এই জনগোষ্ঠী নিজেদের বলেন মিজো; ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী “লুশাই” নামটি মিজোদের একটি গোত্র লুসেই থেকে এসেছে।
নামের অর্থ নিয়ে তিনটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তিনটিই ঔপনিবেশিক আমলের। আর. এইচ. স্নেইড হাচিনসন তাঁর 1906 সালের An Account of the Chittagong Hill Tracts বইয়ে লিখেছেন, লুইন শব্দটিকে ভেঙেছিলেন “লু” (মাথা) আর কাটা অর্থের একটি ক্রিয়ামূল ধরে; লুসাই পাহাড়ের সুপারিনটেনডেন্ট মেজর শেক্সপিয়ার ধরেছিলেন “লু” (মাথা) আর “শেই” (লম্বা), কারণ লুসাই গোত্রের মানুষ মাথার পেছনে চুলের খোঁপা বাঁধতেন। হাচিনসন নিজে দুটির কোনোটিই মানেননি; তাঁর মতে নামটি “সাইলো” গোত্রনামের অক্ষর উল্টে তৈরি। আজকের পত্রিকা 2026 সালে শেক্সপিয়ারের ব্যাখ্যাটিই লিখেছে: “লু” মানে মাথা, “সাই” মানে লম্বা।
“মিজো” নামটি নিয়ে ইংরেজি উইকিপিডিয়া জানায়, মিজো ইউনিয়ন দলের উত্থানের সময় “লুসেই” বা “লুশাই”-এর বদলে সচেতনভাবে “মিজো” শব্দটি চালু হয়, যাতে জেলার সব গোত্রকে এক নামে ধরা যায়; 1954 সালে লুসাই হিলস জেলার নামও বদলে মিজো জেলা হয়। এটি মিজোরামের ইতিহাস। বাংলাদেশে নামটি বদলায়নি: পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন এবং 2022 সালের শুমারি, সব জায়গায় “লুসাই”।
এই লেখায় বাংলাদেশের মানুষদের জন্য “লুসাই”, আর মিজোরামের প্রসঙ্গে “মিজো” লেখা হয়েছে, উৎস যেভাবে লিখেছে তা মেনে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022-এর চূড়ান্ত জাতীয় প্রতিবেদন (Table P29) অনুযায়ী সারা দেশে লুসাই 380 জন: পুরুষ 189, নারী 191। তিন পার্বত্য জেলায় আছেন 216 জন (রাঙামাটি 147, বান্দরবান 58, খাগড়াছড়ি 11), বাকি 164 জন অন্য জেলায়, যার 86 জন ঢাকা বিভাগে।
উপজেলা ধরে সংখ্যা আছে তিন জেলা-প্রতিবেদনের Table P17-এ। নিচের ছকটি সেই তিনটি ছক থেকে জোড়া লাগানো; যে উপজেলায় একজনও লুসাই গোনা হয়নি, সেটি ছকে রাখা হয়নি।
| উপজেলা | জেলা | মোট | পুরুষ | নারী |
|---|---|---|---|---|
| বাঘাইছড়ি | রাঙামাটি | 111 | 60 | 51 |
| রুমা | বান্দরবান | 28 | 17 | 11 |
| বান্দরবান সদর | বান্দরবান | 27 | 13 | 14 |
| রাঙামাটি সদর | রাঙামাটি | 20 | 5 | 15 |
| খাগড়াছড়ি সদর | খাগড়াছড়ি | 10 | 7 | 3 |
| কাপ্তাই | রাঙামাটি | 8 | 3 | 5 |
| বরকল | রাঙামাটি | 6 | 3 | 3 |
| নাইক্ষ্যংছড়ি | বান্দরবান | 2 | 2 | 0 |
| জুরাছড়ি | রাঙামাটি | 1 | 1 | 0 |
| কাউখালী | রাঙামাটি | 1 | 0 | 1 |
| আলীকদম | বান্দরবান | 1 | 0 | 1 |
| রামগড় | খাগড়াছড়ি | 1 | 1 | 0 |
| তিন পার্বত্য জেলা মোট | — | 216 | 112 | 104 |
ছকের জেলা-যোগফল জেলা-প্রতিবেদনের মোট সংখ্যার সঙ্গে মেলে: রাঙামাটি 111 + 20 + 8 + 6 + 1 + 1 = 147, বান্দরবান 28 + 27 + 2 + 1 = 58, খাগড়াছড়ি 10 + 1 = 11।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরের হিসাব আছে জাতীয় প্রতিবেদনের বিভাগভিত্তিক সারিতে: চট্টগ্রাম বিভাগে মোট 237 (তার মধ্যে তিন পার্বত্য জেলার বাইরে 21), ঢাকা 86, রাজশাহী 27, সিলেট 12, রংপুর 7, খুলনা 6, বরিশাল 4, ময়মনসিংহ 1। অর্থাৎ বাংলাদেশের লুসাইদের প্রায় 43 শতাংশ তিন পার্বত্য জেলার বাইরে গোনা হয়েছেন। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনসংখ্যার হিসাব লেখায় দেখানো হয়েছে, আইনে নাম থাকা এগারোটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই অনুপাত লুসাইদের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে কম (56.84 শতাংশ)। ঢাকা বা রাজশাহীতে গোনা লুসাইরা কারা, পড়াশোনা না চাকরির সূত্রে সেখানে, তা শুমারি বলে না।
শুমারি কীভাবে জাতিগত পরিচয় গোনে, কেন সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সেই আলোচনা আছে জনশুমারিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গোনার পদ্ধতি নিয়ে লেখায়; ৫০টি জাতিগোষ্ঠীর পুরো তালিকা জনশুমারি ২০২২-এর জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক হিসাবে।
লুসাইদের সংখ্যা নিয়ে অন্তত ছয়টি আলাদা হিসাব ছাপা আছে, 1,098 থেকে 380 পর্যন্ত। প্রবণতা নিচের দিকে, কিন্তু প্রতিটি হিসাব আলাদা পদ্ধতির, আর কয়েকটির উৎসই স্পষ্ট নয়। নিচের ছকে প্রতিটি সংখ্যা তার উৎসের নামসহ।
| সাল | সংখ্যা | কী গোনা হয়েছে | উৎস |
|---|---|---|---|
| 1901 | আলাদা সারি নেই | পার্বত্য চট্টগ্রামে “Kukis” 1,615 জন (পুরুষ 841, নারী 774); লুসাই নামে আলাদা গণনা নেই | হাচিনসন, 1906 |
| 1981 | 1,098 | প্রাথমিক আদমশুমারি রিপোর্ট | সুগত চাকমা, বাংলাদেশের উপজাতি |
| 1991 | 662 | আদমশুমারি | বাংলাপিডিয়া, “লুসাই” |
| সাল উল্লেখ নেই | আনুমানিক 1,000 | পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী | জুমজার্নাল আর্কাইভ (প্রথাগত আইনের সংকলন থেকে, 2019) |
| 2014 (ছবির তারিখ) | 293 | শুধু বান্দরবান | বান্দরবানে সাঙ্গু সেতুর পাশের পরিচিতি ফলক |
| 2022 | 380 (বান্দরবানে 58) | জনশুমারি, সারা দেশ | BBS, Table P29 ও P17 |
1901 সালের শুমারি “লুসাই” নামে কাউকে আলাদা করে গোনেনি। হাচিনসন লিখেছেন, “কুকি” নামটি সমতলের মানুষের দেওয়া একটি সাধারণ নাম, আর সরকারি নথিতে সীমান্তের ওপারের পাহাড়ি গোত্রগুলোকে “Lushais and Chins” বলা হয়; লুসাই, হাওলং, ফানাই, রালতে, পাইতে, সাইলো, লাখের প্রভৃতি সবাই সেই বড় “কুকি” দলে। তাই 1,615 সংখ্যাটি লুসাইদের নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে গোনা সব “কুকি”-র।
বান্দরবানের ফলকটির সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। মার্চ 2014-এ তোলা ছবিতে ফলকটির বাংলা অংশে লেখা “বান্দরবানে এদের সংখ্যা ২৯৩ জন”; আট বছর পরের শুমারিতে বান্দরবানে লুসাই 58 জন। ফলকটি কে বসিয়েছিল আর সংখ্যাটি কোন জরিপের, ফলকে তা লেখা নেই।
আরেকটি সংখ্যা সাবধানে পড়ার মতো। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Mizo language নিবন্ধ বাংলাদেশে মিজো ভাষাভাষী 70,000 জন লিখেছে। সূত্র হিসেবে দেওয়া আছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের 28 নভেম্বর 2022-এর একটি প্রতিবেদন; সেই প্রতিবেদনের বাক্যটি আসলে বলে, পার্বত্য চট্টগ্রামের 18 লাখ মানুষের মধ্যে “কুকি-চিন” জনগোষ্ঠীগুলো মিলিয়ে 60–70 হাজার। অর্থাৎ সংখ্যাটি সব কুকি-চিন জনগোষ্ঠী মিলিয়ে একটি আনুমানিক যোগফল, লুসাই বা মিজোভাষীর গণনা নয়।
কেন 1981 থেকে 2022-এর মধ্যে সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশে নেমেছে, তার একটি ব্যাখ্যা সাজেকের উৎসগুলো দেয়: মিজোরামে চলে যাওয়া (নিচে বর্তমান অবস্থা অংশে)। গণনার পদ্ধতি বা পুরোনো সংখ্যার ভুল কতটা ভূমিকা রেখেছে, কোনো উৎস তা যাচাই করেনি।
জুমজার্নালের আর্কাইভে সংরক্ষিত প্রথাগত আইনের লেখা অনুযায়ী লুসাইরা মূলত রাঙামাটি জেলা সদর ও বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক উপত্যকায়, আর বান্দরবান জেলা সদর ও রুমায় অল্প সংখ্যায় থাকেন। 2022 শুমারির ছকের প্রথম চারটি উপজেলাও ঠিক এগুলোই: বাঘাইছড়ি 111, রুমা 28, বান্দরবান সদর 27, রাঙামাটি সদর 20।
সুগত চাকমা 1985 সালে লিখেছিলেন, স্বল্পসংখ্যক লুসেই পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর-পূর্বাংশে রাঙামাটি জেলার সাজেক এলাকায় থাকেন; বান্দরবানের কথা তাঁর বইয়ে নেই। প্রথাগত আইনের সংকলন বলছে লুসাইরা মূলত বোমাং ও চাকমা সার্কেলে বাস করেন, আর তাঁদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন চাকমা, বোমাং ও মং তিন সার্কেলেই প্রযোজ্য।
সাজেকের পাড়া। নাম ধরে যে লুসাই পাড়াগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায়, সবই সাজেক ইউনিয়নে। প্রথম আলো (ডিসেম্বর 2025) রুইলুই পাড়া ও কংলাক পাড়াকে লুসাইদের “প্রাচীন বাসস্থান” বলেছে। Asian Review of Social Sciences-এ 2023 সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা বলছে কংলাক পাহাড়ের শেষ বসতিটি প্রধানত লুসাই-অধ্যুষিত, আর রুইলুই ও কংলাক দুই পাড়ার হেডম্যানই লুসাই। কোন পাড়ায় কোন জনগোষ্ঠীর কত পরিবার, তা নিয়ে উৎসগুলোর অমিল আটটি উৎস পাশাপাশি রেখে দেখানো হয়েছে সাজেকের পাড়াগুলোর ইতিহাস লেখায়; সেখানে আছে মৌজার নম্বর, 2015 সালের ইউনিয়ন পরিষদের গ্রামতালিকা আর রুইলুই পাড়া প্রতিষ্ঠার 1880 না 1885 প্রশ্নটিও।
বান্দরবান। রুমা ও বান্দরবান সদরে লুসাইদের কোনো পাড়ার নাম কোনো প্রকাশিত উৎসে পাওয়া যায়নি। রুমায় 28 জন ও সদরে 27 জনের হিসাব আছে, কিন্তু তাঁরা আলাদা পাড়ায় থাকেন না বম বা অন্য পাড়ার ভেতরে, শুমারি তা দেখায় না, কারণ BBS জাতিভিত্তিক সংখ্যা উপজেলার নিচে প্রকাশ করেনি।
রাঙামাটি জেলা-প্রতিবেদনের বয়ান। BBS-এর রাঙামাটি জেলা-প্রতিবেদনের পরিচিতি-অংশে বলা আছে, জেলায় বাঙালিসহ 14টি জনগোষ্ঠী, দশটি ভাষায়, “দীর্ঘদিন ধরে” বাস করে; তালিকায় লুসাইয়ের নাম আছে।
উৎসগুলো একমত যে লুসাইরা পূর্ব দিক থেকে, আজকের মিজোরাম ও মিয়ানমারের চিন অঞ্চলের দিক থেকে এসেছেন; সাল নিয়ে একমত নয়। আজকের পত্রিকা (2026) লিখেছে দেড় থেকে দুইশ বছর আগে; সুগত চাকমা লিখেছেন উনিশ শতকের প্রথমার্ধে; বাংলাপিডিয়া কোনো সাল না দিয়ে একটি কিংবদন্তির কথা বলে।
বাংলাপিডিয়ার কিংবদন্তি। খন্দকার ফাতেমা জোহরার লেখা বাংলাপিডিয়ার “লুসাই” ভুক্তি অনুযায়ী লুসাইরা বার্মা থেকে এসেছেন বলে ধারণা করা হয়। কিংবদন্তিতে চীনের রাজা চিনলুং বাবার সঙ্গে মতবিরোধে অনুসারীদের নিয়ে বার্মায় চলে আসেন; তাঁর বংশধররা চিন পাহাড়, মণিপুর, কাছাড়, মিজোরাম আর “সাতিকাং (চিটাগাং)” অঞ্চলে প্রায় দুশো বছর রাজত্ব করেন, আর উত্তরসূরি “যাম্হুয়াকা”-র আমলে তাঁরা রাঙামাটি ও বান্দরবানে ছড়িয়ে পড়েন। মিজোরামের দিক থেকেও ইংরেজি উইকিপিডিয়া একই আদিভূমির নাম দেয়: মিজো মৌখিক ইতিহাসে আদি বাসভূমি “ছিনলুং”। ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় মিজো সর্দার-বংশগুলোর আদিপুরুষ হিসেবে যে নাম আছে, সেটি “জাহমুয়াকা” (Zahmuaka); বাংলাপিডিয়ার “যাম্হুয়াকা” একই ব্যক্তি কি না, কোনো উৎস মিলিয়ে দেখায়নি।
সুগত চাকমার বিবরণ। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বাংলাদেশের উপজাতি (প্রথম প্রকাশ 1985, পুনর্মুদ্রণ 2000) বইয়ের “লুসেই ও পাংখুয়া” অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন, আঠারো শতকের শুরুতে বা তার আগে থাংউরা নামের এক সর্দার লুসেইদের ঐক্যবদ্ধ করেন, আর তাঁর কাছ থেকে ছয়জন সর্দারের বংশ: রোকুম, জাদেং, থাংলুয়া, পালিয়ান, রিভুং ও সাইলো। এঁদের মধ্যে থাংলুয়া ও রিভুং লোকজন নিয়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাংশে, চেঙ্গী থেকে কাসালং নদীর মাঝের অঞ্চলে ঢোকেন। বইয়ের এই অংশের বাকিটা, যেমন 1780-র দিকে সাইলো পরিবারের নেতৃত্বে মিজোরামে আধিপত্য বিস্তার, মিজোরামের ইতিহাস; সুগত চাকমা সেখানে ড. বি. বি. গোস্বামীর The Mizo Unrest (1979) উদ্ধৃত করেছেন।
লক্ষ করার মতো, আর্কাইভের প্রথাগত আইনের সংকলনে লুসাইদের যে 27টি দলের তালিকা আছে, তার মধ্যে সাইলু, যাদেং (জাদেং), খাংলুয়াহ, রিভুং ও রুখুম নামগুলো আছে, যা সুগত চাকমার ছয় সর্দার-বংশের নামের সঙ্গে প্রায় মেলে।
লুইনের 1869 সালের শ্রেণিবিভাগ। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ব্রিটিশ সুপারিনটেনডেন্টদের একজন টমাস হার্বার্ট লুইন 1869 সালে The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein বইয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেন: যারা কর দেয় ও পুরো নিয়ন্ত্রণে, যারা কর দেয় না কিন্তু প্রভাবের মধ্যে, আর যারা “সম্পূর্ণ স্বাধীন”। “Lhoosai, or Kookies” তিনি রেখেছিলেন তৃতীয় দলে। অর্থাৎ 1869 সালে লুসাইরা, অন্তত ব্রিটিশ চোখে, পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশাসনের বাইরের মানুষ ছিলেন।
ক্যাপ্টেন লুইন ও লুসাই সর্দারদের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের আর্কাইভে আছে ক্যাপ্টেন লুইন ও ঔপনিবেশিক জাদু বাস্তবতা লেখাটি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে লুসাইরা আজ এত কম কেন, তার সবচেয়ে পুরোনো ব্যাখ্যাটি যুদ্ধের। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী 1871 সালের অক্টোবরে এবং 1892 সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর “সর্ববৃহৎ লুসাই অভিযানের” পর পার্বত্য চট্টগ্রামে যাযাবর জীবনযাপনকারী লুসাইদের অনেকে লুসাই হিলস ডিস্ট্রিক্টে, অর্থাৎ আজকের মিজোরামে, স্থায়ী বসতি গড়েন।
ঔপনিবেশিক নথি ঘটনাগুলোর সাল দেয় একটু ভিন্নভাবে। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Lushai Expedition নিবন্ধ অনুযায়ী অভিযানের আগে প্রথম হামলাটি হয় পার্বত্য চট্টগ্রামেই, 31 ডিসেম্বর 1870-এ, প্রায় 200 জনের একটি দলের। অভিযান চলে 15 ডিসেম্বর 1871 থেকে 20 ফেব্রুয়ারি 1872: কাছাড় থেকে জেনারেল বুশিয়ারের অধীনে একটি দল, চট্টগ্রাম থেকে জেনারেল ব্রাউনলোর অধীনে আরেকটি, যার রাজনৈতিক কর্মকর্তা ছিলেন লুইন। হাচিনসন (1906) জানান, এর পর 1888 সালে আবার সংঘাত বাধে, 1890 সালে দণ্ডমূলক অভিযান লুসাই দেশে ঢোকে আর তখন থেকে এলাকাটি সেনা দখলে থাকে; লুসাই পাহাড়ের উত্তর অংশ যায় আসামের প্রশাসনে, দক্ষিণ অংশ বাংলার, আর 1898 সালে দুটি জেলা আসামের অধীনে এক হয়।
দ্বিতীয় অভিযানের সাল তাই দুই রকম: আর্কাইভে 1892, হাচিনসনে 1889–90 ও 1890।
সুগত চাকমা এই ইতিহাসের সঙ্গে একটি প্রশাসনিক তথ্য যোগ করেছেন: তাঁর ভাষায় “মূলত ১৮৬০ সালে লুসেইদের প্রচণ্ড চাপের ফলেই” Chittagong Hill Tracts District গঠিত হয়। তিনি আরও লেখেন, অভিযানের পর লুসেইরা ইংরেজদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য হন, এবং তারপর বহুকাল “শান্তভাবে” ব্রিটিশ আমলে জীবনযাপন করেন। প্রথম আলোর 2025 সালের প্রতিবেদন উল্টো দিকটি বলে: দীর্ঘ অভিযানের পর লুসাইরা সন্ধি করতে বাধ্য হলেও “পুরোপুরি বাগে আনা যায়নি”।
উনিশ শতকের যুদ্ধ ছাড়াও দেশান্তরের আরেকটি পর্ব আছে, অনেক সাম্প্রতিক। সেটি বর্তমান অবস্থা অংশে।
লুসাইদের ভাষা তিব্বতি-বর্মী শাখার কুকি-চিন দলের (জুমজার্নাল আর্কাইভ)। ভাষাতাত্ত্বিক তথ্যভান্ডার Glottolog ভাষাটিকে “Mizo” নামে রাখে, শ্রেণিবিন্যাস: সিনো-টিবেটান › কুকি-চিন-নাগা › কুকি-চিন › কেন্দ্রীয় কুকি-চিন › মিজোইক; ISO 639-3 কোড lus। ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী ভাষাটি Duhlián ṭawng নামেও পরিচিত, আর মিজোরামের প্রভাবশালী সাইলো বংশের লুসেই উপভাষা থেকেই আধুনিক মিজো ভাষা দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে। বাংলাদেশের লুসাইদের মুখের ভাষা নিয়ে কোনো আলাদা জরিপ, অভিধান বা ভাষাতাত্ত্বিক সমীক্ষা পাওয়া যায়নি। যে তথ্য আছে, তা অন্য জনগোষ্ঠীর লেখায় পরোক্ষে: ইংরেজি উইকিপিডিয়ার পাংখোয়া নিবন্ধের বরাতে আমাদের ক্ষুদ্রতম পাঁচ জনগোষ্ঠী লেখা জানায়, পাংখোয়ারা লুসাই ভাষা বোঝেন কিন্তু লুসাইরা পাংখো ভাষা বোঝেন না; সুগত চাকমাও লিখেছেন পাংখুয়ারা লুসেইদের ভাষা “কিছু কিছু” বুঝতে পারেন। আর্কাইভে বম লেখকের বয়ান অনুযায়ী মিজো ভাষা বাংলাদেশের বম, পাংখোয়া ও লুসাই সবাই কম-বেশি বোঝেন, আর সেটিই এখন তাঁদের “LINGUA FRANCA”; বিস্তারিত নাগা ও মিজো: সীমান্তের ওপারে একই ভাষাপরিবার লেখায়।
বর্ণমালা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উনিশ শতকের শেষার্ধে দুজন আর্থিংটন ব্যাপটিস্ট মিশনারি, রেভা. এফ. ডব্লিউ. সেভিজ ও রেভা. জে. এইচ. লরেইন, রোমান অক্ষরের অনুকরণে লুসাই বর্ণমালা তৈরি করেন। আমাদের খ্রিস্টধর্ম-বিষয়ক লেখায় উইকিপিডিয়ার মিশনারি-জীবনী ধরে সময়টি আরও নির্দিষ্ট: 1894 সালের মার্চ-এপ্রিলে আইজলে (মিজোরাম)। এই বর্ণমালাই পরে লুসাই প্রচারকদের হাতে বম ও পাংখোয়াদের লিখিত ভাষার ভিত্তি হয়।
মিজোরামে (তুলনার জন্য)। ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী মিজো মিজোরাম রাজ্যের সরকারি ভাষা ও সংযোগ-ভাষা; একই নিবন্ধের হিসাবে ভারতে মিজোভাষী 8,30,846 জন (সূত্র হিসেবে ভারতের 2011 সালের ভাষা-শুমারি দেওয়া)। বাংলাদেশে ভাষাটির কোনো সরকারি মর্যাদা বা সরকারি মাতৃভাষা-পাঠ্যবই কর্মসূচিতে লুসাই ভাষা থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি; আমাদের পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা লেখাতেও লুসাই ভাষার কর্মসূচির কোনো উল্লেখ নেই।
বাংলাদেশের লুসাইরা কার্যত সবাই খ্রিস্টান। বাংলাপিডিয়া লিখেছে “বর্তমানে শতভাগ লুসাই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী”; আর্কাইভে বম লেখক জির কুং সাহু বম, পাংখোয়া ও লুসাইদের “একশত ভাগই খ্রিস্টিয়ান” বলেছেন। জনশুমারি ধর্মের হিসাব জনগোষ্ঠী ধরে প্রকাশ করে না, তাই সরকারি সংখ্যায় এটি যাচাই করা যায় না।
আগের বিশ্বাস নিয়ে আর্কাইভের লেখা বলছে, লুসাইরা আদিতে সৃষ্টিকর্তা “পাথিয়েন”-এ বিশ্বাস করতেন, পশুবলি দিয়ে শিব পূজা ও নদী পূজা করতেন, আর সর্বপ্রাণবাদী ছিলেন। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, অতীতে লুসাইরা “যার যার গ্রামে একেক নিয়মে” দেবদেবীর পূজা করতেন। লুইন 1869 সালে লুসাইসহ যে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোকে “টংথা” দলে রেখেছিলেন, সাধারণভাবে তাদের ধর্মকে প্রকৃতির উপাসনা বলেছিলেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের লুসাইরা কবে, কার মাধ্যমে খ্রিস্টান হলেন, তার আলাদা কোনো সাল বা মিশনের নাম কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া যায়, তা মিজোরামের মিশন-ইতিহাস, অথবা বম ও পাংখোয়াদের সঙ্গে মিলিয়ে লেখা; সেই পুরো আলোচনা, Lorrain ও Savidge-এর কাজ আর NEIGM-এর দুই লুসাই পালকের কথাসহ, আছে পাহাড়ে খ্রিস্টধর্ম কীভাবে এল লেখায়। একটি তথ্য উল্টো দিকের: আর্কাইভের বম লেখকের বয়ান অনুযায়ী বমদের কাছে খ্রিস্টধর্ম পৌঁছে দিয়েছিলেন মণিপুর ও মিজোরামের “একই ভাষাভাষী স্বগোত্রীয় লুসাইরা”, অর্থাৎ ভারতের লুসাই প্রচারকেরা।
ধর্মান্তরের পর প্রথা বদলেছে, তবে পুরোপুরি মুছে যায়নি। আর্কাইভের লেখার ভাষায় পুরোনো রীতি “খ্রিস্টীয় ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে অনেক ক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক”, তবু সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষায় “প্রয়োজনের তাগিদে” সেগুলো মানা হয়, আগের তুলনায় অনেক কম।
লুসাই সমাজের প্রধান বা সর্দারকে বলা হয় “লাল”। আর্কাইভের প্রথাগত আইনের লেখা অনুযায়ী ব্রিটিশ শাসনের আগে বিচার ও শাসন চলত লালের কর্তৃত্বে; তাঁকে সাহায্য করতেন উপা (পরামর্শক), পুইথিয়াম (পুরোহিত), জালেন, রামহুয়ালতু (ভূমি বিশেষজ্ঞ), টলাংআউ (ঘোষক) আর থিরদেং (কামার)। 1900 সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির পর হেডম্যান, কার্বারি ও সার্কেল চিফের তিন স্তরের ব্যবস্থা আসে, আর লুসাই এলাকায় হেডম্যান-কার্বারির পাশাপাশি লালও বিচারে বসেন।
লাল কীভাবে হতেন: দুই বয়ান। সুগত চাকমা লিখেছেন, অতীতে গ্রামগুলো “গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে” চলত, গ্রামবাসীরা মিলে উপযুক্ত ব্যক্তিকে লাল নির্বাচিত করতেন, আর পরে মিজোরামে সাইলো বংশের নেতৃত্বের পর সমাজে কিছু অভিজাত শ্রেণি তৈরি হয়। আর্কাইভের উত্তরাধিকার-বিষয়ক লেখা বলছে, লুসাই সমাজপতি বা পাড়াপ্রধান পদ বংশানুক্রমিক, পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র অগ্রাধিকার পান, যদিও পদটি 1900 সালের শাসনবিধিতে স্বীকৃত নয়।
গোত্র। আর্কাইভের বিবাহ-বিষয়ক লেখা লুসাইদের 27টি দলের নাম দেয়, যার কয়েকটি: সাইলু, যাদেং, চেনাকোয়াল, খাংলুয়াহ, রিভুং, রুখুম, পাচুআও, ছাংতে, রালতে, পয়তে, হ্রাংতে, ভাইতে। তালিকায় “পাংখোয়া” ও “বমজুই” নামও আছে, যা বাংলাদেশে আলাদা জনগোষ্ঠীর নামের সঙ্গে মেলে; আর “জাহাও” দুবার এসেছে। একই গোত্রের মধ্যে বিয়ে চলে, তবে রক্তসম্পর্কের তিন পুরুষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ।
মিজোরামের আইন অনুসরণ। লুসাই প্রথাগত আইনের সবচেয়ে অস্বাভাবিক দিক এটি: আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ মেটাতে ভারতের মিজোরামে প্রচলিত “মিজৌ হ্লাম দান” 1956 (সংস্কার 1960) অনুসরণ করা হয়, পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন স্তরের সামাজিক আদালতও কাজ করে। মিজোরামের দিকের তথ্য (তুলনার জন্য): Law School Policy Review-এ 2021 সালে প্রকাশিত একটি লেখা জানায়, মিজো প্রথাগত আইন বা “হ্নাম দান” মিজোরামে আইনত বাধ্যতামূলক স্থানীয় প্রথা হিসেবে গণ্য, আর 2014 সালে মিজোরাম বিধানসভা Mizo Marriage, Divorce and Inheritance of Property Act পাস করে প্রথাটি আইনে লেখে। আর্কাইভে লেখা 1956 সালের পক্ষে দ্বিতীয় কোনো উৎস পাওয়া যায়নি।
প্রথাগত আইন কোন আইনের জোরে চলে, তা আর্কাইভের লেখা পাঁচটি সূত্র ধরে দেখায়: 1900 সালের শাসনবিধির 40 নম্বর বিধি, 2003 সালের সংশোধনীর 4(4) ধারা, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের 66 ধারা, আঞ্চলিক পরিষদ আইনের 22(ঙ) ধারা, আর ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের 6 ধারা। মৌজা ও হেডম্যান ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে আছে সার্কেল চিফ: তিনটি সার্কেল, আর রাজার ক্ষমতা আসলে কতটুকু।
কে লুসাই। একই লেখা অনুযায়ী লুসাই পরিচয় আসে পিতার দিক থেকে: পিতা লুসাই হলেই সন্তান লুসাই, মাতাকে লুসাই হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই; দত্তক সন্তানও লুসাই পরিচয় পান। কেউ ঘোষণা দিয়ে বা আচরণে লুসাই রীতিনীতি ত্যাগ করলে তাঁর ওপর লুসাই ব্যক্তিগত আইন আর প্রযোজ্য থাকে না।
লুসাই বিয়ের সামাজিক স্বীকৃতির পূর্বশর্ত “ইননেইহ্য়না” অনুষ্ঠান; সম্পত্তিতে প্রধান উত্তরাধিকারী কনিষ্ঠ পুত্র, কন্যা ও বিধবা স্ত্রী সাধারণত উত্তরাধিকারী নন। এই নিয়মগুলো জুমজার্নাল আর্কাইভের চারটি লেখায় বিস্তারিত আছে, যেগুলোর উৎস এডভোকেট জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, এডভোকেট প্রতিম রায় ও সুগত চাকমা সম্পাদিত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন। এখানে কেবল মূল নিয়ম আর উৎসগুলোর অমিল।
পাত্রপক্ষ “পালাহ” বা ঘটকের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠান; কনেপক্ষের সম্মতিতে কনেপণ (“মান ইন হ্লান”) হিসেবে গবাদি পশু বা সমমূল্যের টাকা দিতে হয়, আর দিতে না পারলে পুত্র বা নাতি পর্যন্ত সেই দায় থাকে। বাল্যবিয়ের প্রচলন নেই; সাবালকত্বের মাপকাঠি পাত্রের বেলায় থুরুং (বেতের বড় ঝুড়ি) বানানো, জুমচাষ, ঘর তৈরি আর ভারবহন, পাত্রীর বেলায় কাপড় বোনা ও রান্না। বহুবিবাহ নিষিদ্ধ, বিধবা বিবাহ চলে। এখন বিয়ে হয় গির্জায় “বান” প্রকাশের মাধ্যমে, আর বিয়ের প্রমাণ হিসেবে চার্চ বা চার্চ-এল্ডারের সনদ গণ্য (আর্কাইভ, লুসাই জনগোষ্ঠীর বিবাহ)। বাংলাপিডিয়াও পালাই, কনেপণ আর গির্জায় বিয়ের কথা লেখে, সঙ্গে একটি আচার: বিয়ের এক-দুই দিন আগে কনে পরিবারসহ পালাইয়ের বাড়িতে এসে ওঠেন, আর বিয়ের দিন বরপক্ষ সেখান থেকে কনেকে নিয়ে যায়।
কাকে বিয়ে করা যায়: উৎসে অমিল। বাংলাপিডিয়া বলছে জেঠাতো বা কাকাতো ভাইবোনের বিয়ে হয় না, “তবে মামাতো ও খালাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে হয়”। আর্কাইভের বিবাহ-বিষয়ক লেখা বলছে কাকা-জ্যেঠা ও মামাতো ভাইবোনের সঙ্গে বিয়ে অবৈধ, আর সেই সন্তানেরা “শন-ফা” হিসেবে পরিচিত হয়।
আর্কাইভের বিবাহবিচ্ছেদ-বিষয়ক লেখায় বিচ্ছেদের নাম “ইনমাক”; একই আর্কাইভের লুসাই নারীর অবস্থান লেখায় “ইনঠেন”। পুরুষত্বহীনতা, ব্যভিচার, স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে, দীর্ঘ নিরুদ্দেশ, মানসিক রোগ, দীর্ঘ কারাদণ্ড, নিষ্ঠুরতা বা মাদকাসক্তি, আর ভরণপোষণ না দেওয়া বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে স্বীকৃত। স্বামী স্বেচ্ছায় বিচ্ছেদ ঘটালে কনেপণের সমপরিমাণ জরিমানা দিতে হয়; স্ত্রী স্বেচ্ছায় ঘটালে কিছু পান না। স্বামী অন্যত্র বিয়ে করলে পূর্বের সংসারের সব ছেড়ে খালি হাতে চলে যাওয়ার বিচ্ছেদকে বলে “সাজুমেইদ”।
আর্কাইভের উত্তরাধিকার-বিষয়ক লেখা অনুযায়ী চাকমা ও বোমাং সার্কেলের লুসাই সমাজে মৃতের কনিষ্ঠ পুত্রই পিতার সম্পত্তির “অপ্রতিরোধ্য” উত্তরাধিকারী, কারণ বাবা-মা শেষ জীবনে তাঁর কাছেই থাকেন; অন্য পুত্ররাও ভাগ পান, তবে কম। কন্যা ও স্ত্রী উত্তরাধিকারী নন, যদিও দান বা উইলে পেতে পারেন; বিধবা সন্তানদের সঙ্গে থাকলে জীবনস্বত্বে ভরণপোষণ পান। পুত্র না থাকলে ভাই, ভাইপো বা গোত্রের রক্তসম্পর্কের পুরুষ।
এই নিয়মটি তিন সময়ের তিন উৎসে প্রায় একই রকম, যা পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়:
| উৎস | কোথাকার কথা | কনিষ্ঠ পুত্র | কন্যা ও নারী |
|---|---|---|---|
| লুইন, 1869 | “Lhoosai”, তখন ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে | সম্পত্তি পুত্রদের মধ্যে ভাগ, কনিষ্ঠ পায় সবচেয়ে বড় অংশ | নারীরা উত্তরাধিকারী হতে পারেন না; বিধবা আবার বিয়ে করতে পারেন |
| জুমজার্নাল আর্কাইভ (প্রথাগত আইনের সংকলন) | বাংলাদেশ, চাকমা ও বোমাং সার্কেল | “অপ্রতিরোধ্য” উত্তরাধিকারী, বেশি অংশ পান | কন্যা ও স্ত্রী উত্তরাধিকারী নন, দান বা উইলে পেতে পারেন |
| Law School Policy Review, 2021 | মিজোরাম, ভারত | “ফাথু” (Fathu) নামে প্রকৃত উত্তরাধিকারী; 2014 সালের আইনে একটি বাড়তি অংশে সীমিত | লেখাটি 2014 সালের আইনে বিধবার জন্য একটি শর্ত যোগ হওয়ার কথা বলে |
লুসাই নারীর অধিকার নিয়ে আলাদা বিশ্লেষণ আছে আর্কাইভের প্রথাগত আইনে আদিবাসী লুসাই নারীর অবস্থান লেখায়, যেখানে বলা হয়েছে লুসাই সমাজে নারীর ওপর সহিংসতার মাত্রা কম, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরুষের প্রাধান্য আছে।
লুসাই সমাজে আগস্ট মাসে বিয়ে বা আনন্দ-উৎসব হয় না, কারণ লোকবিশ্বাসে আগস্টই মৃতের আত্মার পৃথিবী ছেড়ে “মিথিখুয়া” নামের মৃতপুরীতে যাওয়ার মাস (“থি টিন থলা”)। আর্কাইভের প্রথা-বিষয়ক লেখা এই কথা বলে, আর বাংলাপিডিয়াও লিখেছে আগস্টে বিয়ে হয় না। আর্কাইভ অনুযায়ী মিথিখুয়ায় কর্মফলের বিচারের পর আত্মা স্বর্গে, “পিয়াল রাল”-এ যেতে পারে।
জন্ম। আর্কাইভ অনুযায়ী পুত্রসন্তানের জন্মের পাঁচ দিন পর আর কন্যাসন্তানের তিন দিন পর আত্মীয়দের খাওয়ানো হতো; বাড়ির সামনে একটি পরিপক্ব গাছের সার অংশ পোঁতা হতো, গয়াল বা শূকর বধ করে ভোজ হতো। প্রথম সন্তানের নাম রাখেন পিতৃকুলের দাদা-দাদি, পরের সন্তানদের নাম বাবা বা মা। খ্রিস্টান লুসাইরা এখন এর বদলে গির্জার রীতি মানেন।
মৃত্যু। মৃতদেহ কবর দেওয়া হয়; স্বাভাবিক মৃত্যুতে গ্রামের নির্দিষ্ট জায়গায়, সংক্রামক রোগ বা দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে গ্রামের বাইরে। আর্কাইভ জানায়, আগে কফিনে মৃতদেহ এক মাস রাখার পর করোটি ও কয়েকটি অস্থি পরিষ্কার করে বংশচিহ্ন হিসেবে রাখার রীতি ছিল, যার দায়িত্ব থাকত কনিষ্ঠ পুত্রের। সুগত চাকমা লিখেছেন, অতীতে লালের মৃত্যু হলে মৃতের সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রও কবরে দেওয়া হতো; লুইনের 1869 সালের বই উদ্ধৃত করে তিনি জানান, পরিবারপ্রধানের মৃতদেহকে সেরা পোশাক পরিয়ে ঘরের মাঝখানে বসিয়ে রেখে ভোজের আয়োজন হতো, তারপর কবর। বাংলাপিডিয়া বর্তমানের কথা বলে: প্রার্থনার পর কবর, আর কবরের ওপর মৃতের নাম, মৃত্যুর তারিখ ও গ্রামের নাম লেখা একটি পাথর পোঁতা হয়।
সুগত চাকমার বইয়ে আরেকটি পুরোনো প্রথার কথা আছে: অতীতে লুসেই ভূমিতে নরমুণ্ড শিকারের রীতি ছিল, যা খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রচেষ্টায় লোপ পেয়েছে। বইটি এখানে বাংলাদেশ ও মিজোরামের লুসাইকে আলাদা করেনি; প্রথাটি কোন অঞ্চলের, তা স্পষ্ট নয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী লুসাই নারীরা কোমরতাঁতে “পুয়ানফেল” (থামি) ও “করচুং” (ব্লাউজ) বোনেন, পুরুষেরা পরেন “করচুর” (শার্ট) ও “পুয়ানবি” (লুঙ্গি); আগে পুরুষ ও পরে নারীরাও তুলার সুতার “হ্নখাল” চাদর ব্যবহার করতেন। থামির কয়েকটি নাম: পুয়ান রৌপুই, পুয়ান চেই, পুয়ানদুম, ঙৌতে খের। প্রথম আলো (ডিসেম্বর 2025) একই চারটি পোশাকের নাম দিয়েছে, সঙ্গে সাদা, কালো ও লাল রঙের নকশা আর পাথর ও ধাতুর ভারী গয়নার কথা।
খাবার। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী প্রধান খাদ্য ভাত ও শাকসবজি; প্রিয় পদের একটি “সা-উম-বাই”, শূকরের তেল, শাকসবজি ও কাঁচামরিচের তরকারি। মাছ-মাংস দীর্ঘদিন রাখতে মাচার ওপর আগুনের তাপে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
উৎসব। বাংলাপিডিয়া তিনটি প্রধান উৎসবের নাম দেয়: চাপচারকূত (বসন্ত উৎসব), মীমকূত (মৃত আত্মাদের স্মরণে) ও পলকূত (শস্য কাটার উৎসব)। আজকের পত্রিকা (জুন 2026) চাপচারকূতকে প্রধান উৎসব বলে, সাধারণত মার্চে। বাংলাদেশে কোন বছর কোথায় চাপচারকূত পালিত হয়েছে, এমন কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি।
নাচ। বাংলাপিডিয়া লুসাইদের ঐতিহ্যবাহী “চের-লাম” নাচের কথা বলে, আজকের পত্রিকা লেখে “চেরাও নাচ বা বাঁশ নাচ”, আর সুগত চাকমা 1985 সালে লিখেছেন লুসেই মেয়েদের “বাঁশনৃত্য” দেশে-বিদেশে খ্যাতি পাচ্ছে, সঙ্গে তাঁদের “পুষ্পনৃত্য”-র কথা। লুসাইদের বাদ্যযন্ত্রের নাম কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি; আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাদ্যযন্ত্রের তালিকা লেখাতেও লুসাইয়ের ঘরটি খালি।
জলবুক। সুগত চাকমা লিখেছেন, অতীতে লুসেইরা শত্রুর ভয়ে খুব উঁচু পাহাড়ে গ্রাম বানিয়ে চারপাশে শক্ত খুঁটির বেষ্টনী দিতেন, পথে বিষাক্ত বেতের কাঁটা ছড়িয়ে রাখতেন, আর গ্রামের যুবকেরা রাতে সশস্ত্র অবস্থায় “জলবুক” নামের বড় মাচাঘরে ঘুমাতেন। প্রথম আলো (2025) জলবুককে যুদ্ধঘর বলেছে, যেখানে অস্ত্র সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক ছিল; সাজেকের লুসাই সাংস্কৃতিক পার্কে এর একটি প্রতিকৃতি আছে।
প্রথাগত আইনের সংকলন অনুযায়ী লুসাই সমাজে জুমচাষই প্রধান পেশা ছিল, আর জমির স্থায়ী মালিকানার প্রয়োজন কম ছিল; সম্প্রতি নতুন জুমভূমির অভাবে উদ্যানকৃষির দিকে মনোযোগ বেড়েছে। সাজেকে গত এক দশকে বড় পরিবর্তন এসেছে পর্যটন থেকে: 2023 সালের গবেষণা জানায়, সেখানে বসবাসকারী প্রায় সব লুসাই এখন ব্যবসায়ী, যেখানে পাঁচ-ছয় বছর আগে তাঁরা কেবল জুমচাষ করতেন।
অন্য উৎসগুলো ছবিটি আরও জটিল করে। ঢাকা কুরিয়ারের একটি প্রতিবেদন লিখেছে, সাজেক এলাকায় মূলত লুসাইরা থাকেন এবং দোকান, রেস্তোরাঁ, চা ও কফির দোকান চালান, আর সেখানে মিজোরাম থেকে অনানুষ্ঠানিক পথে আসা নানা পণ্য পাওয়া যায়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি 2025-এর আগুনের পর bdnews24-এর প্রতিবেদন (দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে পুনঃপ্রকাশিত) জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মূলত দিনমজুর, জুমচাষ ও হলুদ চাষের ওপর নির্ভরশীল; একজন লুসাই বাসিন্দা আদা ও হলুদের ফসল পুড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। অর্থাৎ সাজেকের সব লুসাই পরিবার রিসোর্ট-অর্থনীতিতে ঢোকেনি।
শিক্ষা নিয়ে দুটি উৎস একই দিকে ইঙ্গিত করে। বাংলাপিডিয়া লিখেছে “বর্তমানে প্রায় ৯৬% লুসাই শিক্ষিত” এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত; সংখ্যাটি বাংলাদেশের না মিজোরামের লুসাইদের, ভুক্তিতে বলা নেই। 2023 সালের গবেষণা বলছে, ব্রিটিশ আমলে ইংরেজদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণে লুসাইরা অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে এগিয়ে ছিলেন। বাংলাদেশের লুসাইদের সাক্ষরতার কোনো সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি।
ঢাকার ক্রীড়াঙ্গনে লুসাই পদবির কয়েকজনের নাম পরিচিত। প্রথম আলোর 18 জানুয়ারি 2015-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী সাবেক জাতীয় হকি খেলোয়াড় জুম্মন লুসাই 1982 ও 1986 সালের এশিয়ান গেমসে খেলেছেন, তাঁর বড় ভাই রামা লুসাই মোহামেডান ও জাতীয় ফুটবল দলে খেলেছেন; প্রতিবেদন তাঁদের পরিবারকে “ক্রীড়া পরিবার” বলেছে। শুমারিতে ঢাকা বিভাগে 86 জন লুসাইয়ের হিসাবের সঙ্গে এটি মেলে কি না, কোনো উৎস যোগসূত্র দেখায়নি।
সংখ্যায় সবচেয়ে ছোট হলেও আইনে লুসাইদের তিনটি প্রতিষ্ঠানে জায়গা আছে। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989-এর 4(3) ধারায় 20টি উপজাতীয় আসনের একটি লুসাইদের নিজস্ব। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে একটি আসন বম, লুসাই ও পাংখোয়া তিন জনগোষ্ঠীর যৌথ। আর পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদে লুসাই, বম, পাংখো, খুমী, চাক ও খিয়াং ছয় জনগোষ্ঠী মিলে একটি আসন।
আইনের পাঠ ও আসন-বণ্টনের বিস্তারিত আছে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ আইনের উপজাতীয় সংজ্ঞা, পার্বত্য জেলা পরিষদে আসন ভাগ ও আঞ্চলিক পরিষদের গঠন ও আসন-বণ্টন লেখায়। আমাদের আর্কাইভে সংরক্ষিত বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের পাঠের 2(খ) দফায় “উপজাতীয়” সংজ্ঞায় লুসাইয়ের নাম আছে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের সংজ্ঞায় আছে কেবল চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা; রাঙ্গামাটি-আইন বিষয়ক লেখাটি দেখায়, আক্ষরিক পাঠে খাগড়াছড়িতে স্থায়ীভাবে থাকা 11 জন লুসাই সেখানকার আইনের “উপজাতীয়” শ্রেণিতে পড়েন না। 1989 সালের পর জেলা পরিষদে নির্বাচন হয়নি, তাই এই আসনগুলোতে কখনো নির্বাচিত লুসাই প্রতিনিধি বসেছেন কি না, তা আলাদা প্রশ্ন।
নিযুক্ত পদে একজন লুসাই পদবির ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। bdnews24-এর 26 ডিসেম্বর 2024-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী 7 নভেম্বর 2024-এর প্রজ্ঞাপনে অন্তর্বর্তীকালীন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করা হয় অধ্যাপক থানজামা লুসাইকে, যিনি 2008 সালেও এই পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। একই প্রতিবেদন জানায়, চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
আজকের লুসাইদের প্রায় সব খবর সাজেককেন্দ্রিক, আর সেখানে চারটি বিষয় বারবার আসে: মিজোরামে দেশান্তর, পর্যটন, 2025 সালের আগুন, আর পাশের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক। বান্দরবানের লুসাইদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলাদা কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
দেশান্তর। Asian Review of Social Sciences-এর 2023 সালের গবেষণা (সাইফুদ্দিন আহমেদ, এ. টি. এম. শামসুজ্জোহা ও মো. জারিফ রহমান) অনুযায়ী সাজেকে একসময় 200-র বেশি লুসাই পরিবার ছিল; গবেষণার সময় ছিল 30–35টি, বাকিরা মূলত সুযোগ-সুবিধার অভাবে ভারতে চলে গেছেন। প্রথম আলো (2025) লিখেছে সাজেক “একসময় লুসাই–অধ্যুষিত ছিল”, এখন বহু পরিবার মিজোরামে অভিবাসন করেছে; আজকের পত্রিকা (2026) কারণ হিসেবে বলেছে উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক সুবিধার টান। কোন বছরে কতটি পরিবার গেছে, তার কোনো তালিকা নেই।
সীমান্ত। আজিজুল রাসেলের “Experiencing the Border: The Lushai People and Transnational Space” (Borders and Mobility in South Asia and Beyond, Amsterdam University Press, 2018) অধ্যায়ের সারাংশ অনুযায়ী বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী লুসাইরা দৈনন্দিন জীবনে নতুন সীমান্তের কড়াকড়িকে পাশ কাটিয়ে মিজোরামের লুসাইদের সঙ্গে একটি অভিন্ন পরিচয় টিকিয়ে রেখেছেন। অধ্যায়ের পূর্ণ পাঠ উন্মুক্ত নয়।
পর্যটন ও সাংস্কৃতিক পার্ক। রুইলুই পর্যটনকেন্দ্রের প্রবেশমুখে “লুসাই ভাংখুয়া পার্ক” বা লুসাই সাংস্কৃতিক পার্ক গড়ে উঠেছে রুইলুই মৌজার হেডম্যান লালথাঙ্গা লুসাই ও তাঁর পরিবারের উদ্যোগে (প্রথম আলো, 7 ডিসেম্বর 2025)। প্রবেশ টিকিট 30 টাকা, লুসাই পোশাক পরে ছবি তোলার ভাড়া 100 টাকা; পার্কের ব্যবস্থাপকের হিসাবে ছুটির দিন ছাড়া দৈনিক আয় 15–20 হাজার টাকা। পরিবারের একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেছেন, পার্বত্য অঞ্চলে লুসাই জনগোষ্ঠী এখন খুবই কম, ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে, তাই এই পার্ক। ফলে সাজেকে আজ লুসাই পোশাকে যাঁদের ছবি দেখা যায়, তাঁদের অনেকে পর্যটক।
2025 সালের আগুন। 24 ফেব্রুয়ারি 2025-এ সাজেকের আগুনে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন ও রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির হিসাবে লুসাইদের 16টি এবং ত্রিপুরাদের 19টি বসতঘর পুড়ে যায়, সঙ্গে রিসোর্ট, কটেজ ও দোকান; 200-র বেশি মানুষ গৃহহীন হন (bdnews24, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে 25 ফেব্রুয়ারি 2025)। রুইলুই পাড়ার হেডম্যান একে সাজেকের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ আগুন বলেছেন। পোড়া স্থাপনার মোট সংখ্যা নিয়ে উৎসভেদের তুলনা আছে আমাদের পর্যটনে কার জমি, কার আয়, কার সম্মতি লেখায়।
পাশের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক। একই 2023 সালের গবেষণা বলছে, সাজেক ইউনিয়নের আটটি মৌজার আটজন হেডম্যানের ছয়জন লুসাই, দুজন ত্রিপুরা, অথচ পর্যটন এলাকার বাসিন্দারা প্রধানত ত্রিপুরা। প্রকাশ্য সংঘাত নেই, কিন্তু আস্থার অভাব আছে: ত্রিপুরারা মনে করেন লুসাই ও তাঁদের হেডম্যানদের কারণে তাঁরা অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত, আর লুসাইরা মনে করেন চাকমাদের মতো প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীর তুলনায় তাঁরাই বেশি বঞ্চিত। হেডম্যানদের জাতিগত পরিচয় নিয়ে আমাদের আর্কাইভের পাংখোয়া-বিষয়ক লেখার সঙ্গে এই গবেষণার অমিলটি সাজেক-লেখায় বিস্তারিত।
কেএনএফ প্রসঙ্গ। 2022 সালে আত্মপ্রকাশ করা সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, ম্রো ও খুমিদের প্রতিনিধিত্বের দাবি করে। 28 ডিসেম্বর 2022-এ বান্দরবানে সংবাদ সম্মেলনে পাংখোয়া, লুসাই, ম্রো, খুমী ও খিয়াং নেতারা বলেন, তাঁদের জনগোষ্ঠী কেএনএফের সশস্ত্র কার্যকলাপের সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত নয়। পুরো নথিভুক্ত ঘটনাক্রম আছে কেএনএফ আর বম জনগোষ্ঠী এক নয় লেখায়।
ভাষা, ধর্ম ও প্রথাগত আইনে বাংলাদেশের লুসাই আর মিজোরামের মিজোরা এক উৎসের; কিন্তু সংখ্যা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা আর ভাষার সরকারি অবস্থানে দুই দিকের ফারাক বিশাল। নিচের ছকে প্রতিটি ঘরের উৎস আলাদা করে লেখা।
| বিষয় | বাংলাদেশ (লুসাই) | মিজোরাম, ভারত (মিজো) |
|---|---|---|
| জনসংখ্যা | 380 (BBS, 2022) | মিজোরামে 9,14,026; ভারতে মোট 10,22,616 (ইংরেজি উইকিপিডিয়া, 2011–2019-এর হিসাব); 1961 সালে মিজোরামে লুসেই 2,11,807 (সুগত চাকমা) |
| নাম | আইনে ও শুমারিতে “লুসাই” | “মিজো”; 1954-এ লুসাই হিলস জেলা মিজো জেলা হয় (ইংরেজি উইকিপিডিয়া) |
| ভাষার মর্যাদা | সরকারি মর্যাদা বা পাঠ্যবই কর্মসূচির তথ্য পাওয়া যায়নি | রাজ্যের সরকারি ভাষা; উচ্চশিক্ষায় মিজো ভাষায় পড়ানো হয় (আর্কাইভে বম লেখকের বয়ান) |
| ধর্ম | “শতভাগ” খ্রিস্টান (বাংলাপিডিয়া) | সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিস্টান; সংখ্যালঘু ইহুদি ধর্ম ও মিজো সাখুয়া (ইংরেজি উইকিপিডিয়া) |
| প্রথাগত আইন | 1900 সালের শাসনবিধির তিন স্তরের সামাজিক আদালত, সঙ্গে মিজোরামের “মিজৌ হ্লাম দান” অনুসরণ (আর্কাইভ) | হ্নাম দান; 2014 সালে বিয়ে, বিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকারের আইন (Law School Policy Review) |
| রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব | রাঙামাটি জেলা পরিষদে একটি নিজস্ব আসন, বান্দরবানে যৌথ আসন, আঞ্চলিক পরিষদে ছয় জাতির একটি আসন | নিজস্ব রাজ্য (মিজোরাম) |
সীমান্তের এই সম্পর্ক একমুখী নয়। 2022 সালের নভেম্বরে বান্দরবানে কেএনএফের সশস্ত্র শাখা ও র্যাবের সংঘর্ষের পর বম জনগোষ্ঠীর শরণার্থীরা মিজোরামে আশ্রয় নিলে মিজোরামের ক্ষমতাসীন দল তাঁদের একই “কুকি-চিন-মিজো” জাতিসত্তার মানুষ বলে আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয় (দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, 28 নভেম্বর 2022)। সেই প্রতিবেদনে লুসাইদের আলাদা কোনো উল্লেখ নেই। সীমান্তের দুই দিকে মিজো ও নাগাদের ভাষা ও আইনি কাঠামোর তুলনা আছে নাগা ও মিজো লেখায়।
পাঁচটি ক্ষুদ্রতম জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে তুলনা করা হয়েছে খিয়াং, খুমি, চাক, পাংখোয়া ও লুসাই নিয়ে আমাদের মূল লেখায়; একই ধাঁচের পূর্ণ পরিচিতি আছে খুমি জনগোষ্ঠী ও চাক জনগোষ্ঠী নিয়ে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি 2022 অনুযায়ী সারা দেশে লুসাই 380 জন: পুরুষ 189, নারী 191। তিন পার্বত্য জেলায় 216 জন (রাঙামাটি 147, বান্দরবান 58, খাগড়াছড়ি 11), ঢাকা বিভাগে 86। আগের হিসাবগুলো বেশি: 1981 সালে 1,098 (সুগত চাকমা), 1991 সালে 662 (বাংলাপিডিয়া)।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায়, যেখানে সাজেক উপত্যকা: 2022 শুমারিতে 111 জন, অর্থাৎ দেশের সব লুসাইয়ের প্রায় 29 শতাংশ। এরপর বান্দরবানের রুমা 28, বান্দরবান সদর 27, রাঙামাটি সদর 20 ও খাগড়াছড়ি সদর 10 জন। সংখ্যাগুলো BBS জেলা-প্রতিবেদনের Table P17 থেকে; রাঙামাটি জেলার 147 জনের তিন-চতুর্থাংশই বাঘাইছড়িতে।
একই উৎসের। ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী মিজোদের ঔপনিবেশিক আমলে “লুশাই” বলা হতো, নামটি এসেছে লুসেই গোত্র থেকে; মিজোরামে এখন “মিজো” নামটি চলে। বাংলাদেশের আইন ও শুমারিতে নামটি এখনো “লুসাই”। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী বাংলাদেশের লুসাইরা প্রথাগত বিরোধে মিজোরামের “মিজৌ হ্লাম দান”-ও অনুসরণ করেন।
তিনটি ব্যাখ্যা আছে। লুইন ধরেছিলেন “লু” (মাথা) আর কাটা অর্থের একটি ক্রিয়ামূল; মেজর শেক্সপিয়ার ধরেছিলেন “লু” (মাথা) আর “শেই” (লম্বা), যা আজকের পত্রিকাও লিখেছে। হাচিনসন (1906) দুটির কোনোটিই মানেননি; তাঁর মতে নামটি “সাইলো” গোত্রনামের অক্ষর উল্টে তৈরি। লুইন নিজে 1869 সালে নামটি লিখেছিলেন “Lhoosai”।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বর্তমানে শতভাগ লুসাই খ্রিস্টান, আর আর্কাইভে বম লেখক জির কুং সাহু বম, পাংখোয়া ও লুসাইদের “একশত ভাগই খ্রিস্টিয়ান” বলেছেন। আদিতে তাঁরা সৃষ্টিকর্তা “পাথিয়েন”-এ বিশ্বাস করতেন ও পশুবলি দিতেন। শুমারি ধর্মের হিসাব জনগোষ্ঠী ধরে প্রকাশ করে না, আর পার্বত্য চট্টগ্রামের লুসাইরা কবে খ্রিস্টান হন, তার আলাদা সাল কোনো উৎসে নেই।
লুসাইদের ভাষা তিব্বতি-বর্মী শাখার কুকি-চিন দলের। Glottolog ভাষাটিকে “Mizo” নামে কেন্দ্রীয় কুকি-চিন দলের মিজোইক শাখায় রাখে, ISO কোড lus। রোমান হরফে এর বর্ণমালা তৈরি করেন মিশনারি লরেইন ও সেভিজ, আমাদের খ্রিস্টধর্ম-বিষয়ক লেখার হিসাবে 1894 সালে আইজলে। মিজোরামে এটি রাজ্যের সরকারি ভাষা; বাংলাদেশে এর কোনো সরকারি মর্যাদার তথ্য পাওয়া যায়নি।
হ্যাঁ। প্রথম আলো (2025) রুইলুই ও কংলাক পাড়াকে লুসাইদের প্রাচীন বাসস্থান বলেছে, আর রুইলুই মৌজার হেডম্যান একজন লুসাই। 2023 সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী সেখানে লুসাই পরিবার কমে 30–35টিতে নেমেছে, যেখানে একসময় 200-র বেশি ছিল। পর্যটন এলাকায় ত্রিপুরারা সংখ্যায় বেশি। 2022 শুমারিতে সাজেক যে উপজেলায়, সেই বাঘাইছড়িতে লুসাই 111 জন।
উৎসগুলো দুই রকম কারণ দেয়। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী 1871 ও 1892 সালের ব্রিটিশ লুসাই অভিযানের পর অনেক লুসাই আজকের মিজোরামে স্থায়ী হন। সাম্প্রতিক উৎস, যেমন 2023 সালের গবেষণা ও আজকের পত্রিকা (2026), বলছে শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক সুবিধার টানে পরিবারগুলো মিজোরামে চলে গেছে।
আর্কাইভে সংরক্ষিত প্রথাগত আইনের সংকলন অনুযায়ী কনিষ্ঠ পুত্রই প্রধান উত্তরাধিকারী ও বেশি অংশ পান, কারণ বাবা-মা শেষ জীবনে তাঁর কাছে থাকেন। কন্যা ও স্ত্রী উত্তরাধিকারী নন, তবে দান বা উইলে পেতে পারেন। লুইন 1869 সালেই কনিষ্ঠ পুত্রের বড় অংশ পাওয়ার কথা লিখেছিলেন।
বাংলাপিডিয়া তিনটি উৎসবের নাম দেয়: চাপচারকূত (বসন্ত উৎসব), মীমকূত (মৃত আত্মাদের স্মরণে) ও পলকূত (শস্য কাটার উৎসব)। আজকের পত্রিকা (2026) চাপচারকূতকে প্রধান উৎসব বলেছে, সাধারণত মার্চে। এর বাইরে খ্রিস্টান লুসাইরা ধর্মীয় উৎসব পালন করেন। বাংলাদেশে কোথায়, কোন বছর চাপচারকূত পালিত হয়েছে, এমন সংবাদ পাওয়া যায়নি।
আর্কাইভের প্রথা-বিষয়ক লেখা অনুযায়ী লুসাই লোকবিশ্বাসে আগস্টই মৃতের আত্মার পৃথিবী ছেড়ে “মিথিখুয়া” নামের মৃতপুরীতে যাওয়ার মাস, তাই এই মাসে বিয়ে বা আনন্দ-উৎসব হয় না। বাংলাপিডিয়াও লিখেছে আগস্টে বিবাহ অনুষ্ঠান করা হয় না; আর্কাইভের ভাষায় এই রীতি এখনো মানা হয়। আর্কাইভ অনুযায়ী মিথিখুয়ায় কর্মফলের বিচারের পর আত্মা স্বর্গে, “পিয়াল রাল”-এ যেতে পারে।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989-এর 4(3) ধারায় লুসাইদের একটি নিজস্ব আসন আছে। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে একটি আসন বম, লুসাই ও পাংখোয়ার যৌথ। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদে লুসাই, বম, পাংখো, খুমী, চাক ও খিয়াং মিলে একটি আসন। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ আইনের সংজ্ঞায় লুসাইয়ের নাম নেই।
জুমজার্নালের নিজস্ব আর্কাইভ
সরকারি নথি
ঔপনিবেশিক নথি
বিশ্বকোষ ও তথ্যভান্ডার
গবেষণা
সংবাদ ও ফিচার
ছবি
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:বান্দরবান, মিজোরাম, রাঙ্গামাটি, লুসাই, লুসাই জনগোষ্ঠী, সাজেক
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।