Jumjournal Logo

খুমি জনগোষ্ঠী: বান্দরবানের খুমিদের জনসংখ্যা, ভাষা, গ্রাম, ধর্ম ও বর্তমান অবস্থা

Last updated Oct 23rd, 2026

0

ঐতিহ্যবাহী নকশা-করা মাথার কাপড়, রুপার বড় কানের দুল ও মুদ্রার মালা পরা খুমি তরুণী, পেছনে লাল পোশাকে আরও কয়েকজন নৃত্যশিল্পী

খুমি জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে ছোট জাতিগুলোর একটি — 2022 সালের জনশুমারিতে সারা দেশে খুমি গোনা হয়েছে 3,780 জন, যার 3,287 জন বান্দরবান জেলায় এবং প্রায় অর্ধেক থানচি উপজেলায়। তাঁদের ভাষা কুকি-চিন দলের, সমাজ পিতৃসূত্রীয় ও গোত্রভিত্তিক, আর ধর্মবিশ্বাসে একই সমাজে প্রকৃতিপূজা, ক্রামা, খ্রিস্টধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম পাশাপাশি আছে।

খুমিদের নিয়ে লেখা বেশি নেই, আর যা আছে তার সংখ্যাগুলো প্রায়ই একটি আরেকটির সঙ্গে মেলে না। এই পাতা চারটি প্রধান উৎস — খুমি গবেষক লেলুং খুমীর “খুমী জাতির আদ্যোপান্ত”, জুম ঈস্থেটিকস কাউন্সিলের 2004 সালের খুমি-বিষয়ক সংকলন “লাঙ”, ভাষাবিদ ডেভিড এ পিটারসনের ভাষা-পরিচিতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত আইনের সংকলন — পাশাপাশি রেখে দেখায় কোন তথ্যে উৎসগুলো একমত, কোথায় আলাদা। সঙ্গে আছে 2022 শুমারির উপজেলা ধরে হিসাব এবং 2022–2026 সালের সংবাদপত্রে খুমিদের বর্তমান অবস্থার খবর।

পাঁচটি ক্ষুদ্রতম জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে তুলনা করা হয়েছে খিয়াং, খুমি, চাক, পাংখোয়া ও লুসাই নিয়ে আমাদের মূল লেখায়; এই লেখা শুধু খুমিদের নিয়ে, আরও বিস্তারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জনগোষ্ঠী ও বিষয়ের সূচি আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব পাতায়।

সূচিপত্র

  1. খুমি জনগোষ্ঠী কারা, আর ‘খুমি’ নামের মানে কী
  2. খুমি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা কত: 2022 শুমারির হিসাব
  3. আগের শুমারি ও খুমিদের নিজস্ব জরিপে সংখ্যা কেন মেলে না
  4. বাংলাদেশের বাইরে খুমি কোথায় থাকেন, কতজন
  5. খুমিরা কবে, কীভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে এলেন
  6. খুমিরা কোথায় থাকেন: উপজেলা, মৌজা ও গ্রাম
  7. খুমি ভাষা: কোন পরিবারের, কয়টি উপভাষা, কেন বিপন্ন
  8. খুমিদের কি নিজস্ব বর্ণমালা আছে?
  9. খুমি সমাজের গোত্র, পরিবার ও সামাজিক বিচার
  10. খুমি বিয়ে, কনেপণ ও বিবাহবিচ্ছেদ: তিন উৎসের হিসাব
  11. জন্ম, নামকরণ ও মৃত্যু: খুমিদের যে আচারগুলো নথিভুক্ত
  12. খুমিদের ধর্ম কী: প্রকৃতিপূজা, ক্রামা, খ্রিস্টধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম
  13. জুম ঘিরে খুমিদের উৎসব ও আচার
  14. খুমিদের পোশাক, গান ও লোককাহিনি
  15. খুমিদের জীবিকা, ভূমি ও আয়
  16. খুমিদের শিক্ষা: 2004-এ এসএসসি পাস 13 জন, 2024-এ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে 11 জন
  17. খুমিদের বর্তমান অবস্থা: স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও প্রতিনিধিত্ব
  18. সচরাচর জিজ্ঞাসা
  19. যা এখনো জানা যায়নি
  20. তথ্যসূত্র

খুমি জনগোষ্ঠী কারা, আর ‘খুমি’ নামের মানে কী

খুমিরা কুকি-চিন ভাষাভাষী একটি জনগোষ্ঠী, যাঁদের মূল অংশ মিয়ানমারের আরাকান ও চিন অঞ্চলে আর একটি ছোট অংশ বাংলাদেশের বান্দরবানে। ‘খুমি’ নামের মানে নিয়ে অন্তত পাঁচটি ভিন্ন ব্যাখ্যা ছাপা আছে; তার একটি — ‘কুকুর-মানুষ’ — খুমি লেখকেরা অপমানজনক ও ভুল বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

বাংলায় বানান দুরকম চলে — ‘খুমি’ ও ‘খুমী’। জনশুমারির ইংরেজি তালিকায় নামটি Khumi, বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি ভুক্তিতে Khumee। আরাকানের খুমিরা নিজেদের মধ্যে ‘কুমি’ নামে পরিচিত, আর সেখানে তাঁদের দুটি দল — আরাকানিরা একটিকে বলে আওয়া কুমি (Awa Kumi), অন্যটিকে আফ্যা কুমি (Aphya Kumi) — লিখেছেন সুগত চাকমা তাঁর “বাংলাদেশের উপজাতি” বইয়ে (বাংলা একাডেমি, 1985)। বাংলাপিডিয়াও দুই দলের নাম দেয়: Aowa ও Afia।

উৎস: লেলুং খুমী, “খুমী জাতির আদ্যোপান্ত”; “লাঙ” পৃ. 4; বাংলাপিডিয়া “Khumee”। ইংরেজি উইকিপিডিয়া আরও একটি ব্যাখ্যা দেয় (“Kha” = মানুষ, “Ma” = সেরা জাতি)।
উৎসনামের ব্যাখ্যা
টি এইচ লুইন (1869), লেলুং খুমীর উদ্ধৃতিতেআরাকানি “Khe” (কুকুর) + “Me” (জাতি) — “কুকুর-মানুষ”। লেলুং খুমী একে বিকৃত ও অপমানজনক বলেছেন
লেলুং খুমী (খুমি গবেষক)খুমি শব্দ: “খু” = গভীর জঙ্গল, “মী” = মানুষ — “গভীর জঙ্গলের মানুষ”
ডেভিড এ পিটারসন ও কেনেথ ভানবিক (লেলুং খুমীর নেওয়া সাক্ষাৎকার, 2005)Zomi → Hyomi → Khyomi → Khomi → Khumi — শব্দটি ধাপে ধাপে বদলে এসেছে
“লাঙ” সংকলন (জাক, 2004)“খু” = সীমান্তবর্তী পাহাড়, “মী” = মানুষ — “সীমান্তবর্তী পাহাড়ী”
বাংলাপিডিয়া (মুহম্মদ আবদুল বাতেন)“খা” = উত্তম, “মী” = মানুষ — “খামী” থেকে কালক্রমে “খুমী”

লক্ষ করার বিষয়, পাঁচটি ব্যাখ্যার চারটিতেই “মী” অংশের অর্থ “মানুষ” — অমিল কেবল প্রথম অংশে। লেলুং খুমী লিখেছেন, “খুমী” শব্দের আরাকানি উৎস দেখিয়ে যে ব্যাখ্যা লুইন দিয়েছিলেন, পরের অনেক লেখক সেটিই হুবহু নিজেদের বইয়ে তুলেছেন।

খুমি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা কত: 2022 শুমারির হিসাব

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022 অনুযায়ী দেশে খুমি 3,780 জন — পুরুষ 1,951, নারী 1,829। এর 3,360 জন চট্টগ্রাম বিভাগে, তার মধ্যে বান্দরবান জেলায় 3,287 এবং রাঙামাটিতে 44। জাতীয় সংখ্যাটি জাতীয় প্রতিবেদনের Table P29-এ, জেলা ও উপজেলার সংখ্যা জেলা-প্রতিবেদনের Table P17-এ।

উৎস: BBS, Population and Housing Census 2022, National Report Vol. I, Table P29। বিভাগের সংখ্যা যোগ করলে 3,780 মেলে।
এলাকাখুমি (2022)টীকা
বাংলাদেশ (মোট)3,780পুরুষ 1,951, নারী 1,829
চট্টগ্রাম বিভাগ3,360বান্দরবান ও রাঙামাটির বাইরে বিভাগের অন্য জেলায় 29 জন (বিয়োগফল)
ঢাকা বিভাগ189
সিলেট বিভাগ166
রাজশাহী বিভাগ27
ময়মনসিংহ বিভাগ13
খুলনা বিভাগ10
রংপুর বিভাগ8
বরিশাল বিভাগ7

বান্দরবানের ভেতরে খুমিরা মূলত তিনটি উপজেলায় — থানচি, রুমা ও রোয়াংছড়ি। শুমারি এই তিনটির বাইরেও কয়েকজনকে গুনেছে: বান্দরবান সদরে 81, লামায় 44, আলীকদমে 7। রাঙামাটির 44 জনের 25 জন বিলাইছড়িতে।

উৎস: District Report: Bandarban, Table P17 (পুরুষ 1,683, নারী 1,604); District Report: Rangamati, Table P17। “অংশ” কলাম নিজস্ব হিসাব, উপজেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যার অনুপাতে।
উপজেলাখুমি (2022)উপজেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মোটঅংশ
থানচি (বান্দরবান)1,82926,1037.0%
রুমা (বান্দরবান)89028,2983.1%
রোয়াংছড়ি (বান্দরবান)43624,8081.8%
বান্দরবান সদর8147,8040.2%
লামা4433,2210.1%
আলীকদম725,113—
বিলাইছড়ি (রাঙামাটি)25
রাঙামাটি সদর14
কাপ্তাই / রাজস্থলী / কাউখালী2 / 2 / 1

তিন উপজেলা মিলিয়ে শুমারির খুমি 3,155 জন — বান্দরবানের খুমিদের 96%। শুধু থানচিতেই দেশের প্রায় অর্ধেক (48%) খুমি। লেলুং খুমীর পুরোনো হিসাবেও “মোট জনসংখ্যার এক-দ্বিতীয়াংশ” থানচিতে — শুমারির অনুপাতের সঙ্গে এটি মেলে। শুমারির পুরো জাতিভিত্তিক তালিকা জেলা ধরে আছে জনশুমারি 2022-এর ৫০ জাতিগোষ্ঠীর হিসাব নিয়ে আমাদের লেখায়।

আগের শুমারি ও খুমিদের নিজস্ব জরিপে সংখ্যা কেন মেলে না

খুমিদের সংখ্যা নিয়ে অন্তত তিন ধরনের হিসাব আছে — সরকারি শুমারি, খুমিদের নিজেদের জরিপ, আর সংবাদপত্রে উদ্ধৃত সংখ্যা। 1951 থেকে 1991 পর্যন্ত সরকারি সংখ্যা কমেছে, অথচ খুমিদের নিজস্ব জরিপ বরাবর সরকারি সংখ্যার চেয়ে বেশি পেয়েছে।

উৎস: লেলুং খুমী; “লাঙ” (2004); সুগত চাকমা (1985); বাংলাপিডিয়া; ইংরেজি উইকিপিডিয়া; BBS 2022; bdnews24 — তথ্যসূত্র অংশে পূর্ণ লিংক।
সালসংখ্যাকে বলছে
18534,129 (আরাকানের খুমি)বি এইচ হজসন, এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নাল — সুগত চাকমার বইয়ে উদ্ধৃত
19311,549সরকারি আদমশুমারি — লেলুং খুমীর উদ্ধৃতি
19511,951সরকারি আদমশুমারি — লেলুং খুমীর উদ্ধৃতি
19811,094 / 1,258লেলুং খুমী 1,094 লেখেন; সুগত চাকমা (প্রাথমিক রিপোর্ট) ও ইংরেজি উইকিপিডিয়া 1,258
19911,241 / 1,214লেলুং খুমী ও “লাঙ” 1,241; ইংরেজি উইকিপিডিয়া 1,214। বাংলাপিডিয়া 1,241 সংখ্যাটি “1919 সালের শুমারি”র বলে লেখে
1999–20001,734 জন, 451 পরিবারনইলু খুমীর নেতৃত্বে খুমিদের নিজস্ব জরিপ — “লাঙ” পৃ. 5
20062,094সিঅং খুমির নেতৃত্বে জরিপ — লেলুং খুমী
20223,780BBS জনশুমারি, Table P29
2022 (সংবাদে)3,994bdnews24-এর আগস্ট 2023, অক্টোবর 2024 ও মার্চ 2026-এর প্রতিবেদন, “2022 সালের জনশুমারি অনুযায়ী” বলে
2022 (সংবাদে)তিন উপজেলায় 3,369bdnews24-এর নভেম্বর 2022-এর প্রতিবেদন, “2022 সালের জনশুমারি অনুযায়ী” বলে
2022 (সংবাদে)প্রায় সাড়ে চার হাজারখুমি সোস্যাল কাউন্সিলের হিসাব, bdnews24 (নভেম্বর 2022)

“লাঙ” সংকলন সরাসরি লিখেছে, খুমিদের মতে তাঁদের ব্যাপারে “সঠিকভাবে আদমশুমারী করা হয়নি”, সে কারণেই 1999–2000 সালে নিজেরা জরিপ করেছিলেন। লেলুং খুমী শুধু লক্ষ করেছেন, সরকারি হিসাবে 1951 থেকে 1991-এর মধ্যে খুমি কমেছে 710 জন। সংবাদপত্রের 3,994 সংখ্যাটি BBS-এর প্রকাশিত Table P29-এর 3,780-এর সঙ্গে মেলে না; আবার “তিন উপজেলায় 3,369” সংখ্যাটিও জেলা-প্রতিবেদনের তিন উপজেলার যোগফল (3,155) থেকে আলাদা। শুমারি কীভাবে জাতি গোনে, আর সম্প্রদায়ের দাবির সঙ্গে কেন প্রায়ই অমিল হয়, তার বিস্তারিত আছে জনশুমারিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গোনার পদ্ধতি নিয়ে আমাদের লেখায়।

বাংলাদেশের বাইরে খুমি কোথায় থাকেন, কতজন

সব উৎস একমত যে খুমিদের বড় অংশ মিয়ানমারে — আরাকান (রাখাইন) ও চিন রাজ্যের কালাদান নদী অঞ্চলে। কতজন, সেখানে উৎসগুলোর ফারাক প্রায় সাত গুণ: এক লক্ষের বেশি থেকে চোদ্দ হাজার পর্যন্ত। ভারতের মিজোরামেও কিছু খুমি আছেন।

লেলুং খুমী লেখেন, চিন প্রদেশের পালেটওয়া (Paletwa) অঞ্চলে “১ লক্ষের বেশি” খুমি থাকেন, আর মিজোরামে আনুমানিক 3,000। “লাঙ” সংকলন বাংলাদেশের খুমিদের ধারণা হিসেবে দেশের বাইরের সংখ্যা দেয় 70–80 হাজার। ডেভিড এ পিটারসন “লাঙ”-এ ছাপা ইংরেজি ভাষা-পরিচিতিতে লেখেন, বার্মার দিকে খুমি বলেন “many tens of thousands” মানুষ, আর বাংলাদেশের খুমিরা মোট খুমি জনসংখ্যার “just a small part”। ইংরেজি উইকিপিডিয়া পশ্চিম মিয়ানমারে সংখ্যা দেয় প্রায় 14,000। সুগত চাকমা 1985 সালে লিখেছিলেন, স্থানীয়দের ধারণা ছিল বান্দরবানের খুমিদের অনেকে বার্মার আরাকানের দিকে চলে যাচ্ছেন; ইংরেজি উইকিপিডিয়া লেখে, পূর্ব পাকিস্তান আমলে অনেক খুমি মিয়ানমারে চলে যান।

ভাষার হিসাবে মিয়ানমারের দিকে খুমি একাধিক উপভাষায় বিভক্ত। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Khumi language” Ethnologue-এর বরাতে খুমি-ভাষী এলাকা দেখায় চিন রাজ্যের পালেটওয়া টাউনশিপের কালাদান নদী অঞ্চল ও রাখাইন রাজ্যের কিয়াকতাও টাউনশিপের কয়েকটি গ্রাম। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Khumi people” নিবন্ধ জানায়, মিয়ানমারে আরাকান আর্মি খুমি-ভাষী শিশুদের স্কুলে রাখাইন ভাষা চাপিয়েছে।

খুমিরা কবে, কীভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে এলেন

খুমিরা আরাকান-চিন অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছেন — এ নিয়ে সব উৎস একমত। কবে এসেছেন, তা নিয়ে উৎসভেদে সময়টা প্রায় চারশো বছর ওঠানামা করে: পঞ্চদশ শতক থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

উৎস: “লাঙ”; বাংলাপিডিয়া “Khumee”; লেলুং খুমী, “খুমী জাতির আদ্যোপান্ত”।
উৎসকবে এসেছেন বলে দাবি
“লাঙ” সংকলন (2004), পৃ. 4আনুমানিক 1430 খ্রিস্টাব্দে বার্মায় “গোষ্ঠীর দাঙ্গার” ফলে একটি অংশ পালিয়ে রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচিতে বসতি করে। একই সংকলনের পৃ. 5 লেখে “চৌদ্দ শতকের গোড়া” থেকে
বাংলাপিডিয়া, ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের বরাতেসতেরো শতকের শেষ দিকে
লেলুং খুমী — “অনেকের মতে”সতেরো শতকের মাঝামাঝি
লেলুং খুমী — বোমাং রাজা অংশৈপ্রু চৌধুরীর মতপ্রথম বোমাং রাজা (1760) আসার পর
লেলুং খুমী — উ. গ. প. উসাইয়ের বরাতে (1995)চাকমা রানি কালিন্দীর আমলে (1832–73) আরাকান থেকে কার্পাস মহলে
লেলুং খুমী — সামথাং গোত্রের মৌখিক বংশতালিকাবাংলাদেশে আট পুরুষ ধরে বসবাস (কেচেং থেকে লেলুং পর্যন্ত আট নাম)

খুমিদের নিজস্ব জনশ্রুতিও একটি আছে। “লাঙ” সংকলনে লেখা এক কাহিনি অনুযায়ী এক অত্যাচারী কুকি রাজা খুমিদের ধানের গোলা থেকে খাজনা নিতেন; রাজার এক মন্ত্রী গোপনে খুমিদের পালাতে বলেন, আর খুমিরা পালিয়ে এসে বান্দরবানের “রেইছা” নামক স্থানে বসতি শুরু করেন। সংকলনটি একে “জনশ্রুতি” বলেই উল্লেখ করেছে।

ঔপনিবেশিক নথিতে খুমিদের প্রথম স্পষ্ট উল্লেখ সংঘাতের প্রসঙ্গে। লেলুং খুমী আরাকানের সহকারী কমিশনার এ পি ফেইরির 1841 সালের লেখা থেকে উদ্ধৃত করেন যে অক্টোবর 1838-এ কালাদানের এক প্রভাবশালী খুমি প্রধান Hleng Kreing-এর গ্রাম Lungkhe-রা রাতের অন্ধকারে আক্রমণ করে। সুগত চাকমা একই ঘটনা লেখেন অন্যভাবে: উনিশ শতকের শুরুতে খুমিরা একটি বম গ্রামে হামলা করে বম সর্দার লিয়ানকুং-এর এক পূর্বপুরুষের কবর লুণ্ঠন করেছিলেন — এই অজুহাতে অক্টোবর 1838-এ বম সর্দার খুমি সর্দার হ্লোংক্রেইং-এর গ্রাম আক্রমণ করে 30–40 জনকে হত্যা করেন, খুমি সর্দারের এক কন্যাসহ 38 জন নারী ও শিশুকে ধরে আনেন, পরে চট্টগ্রামের ইংরেজদের মধ্যস্থতায় 33 জনকে ফেরত দেন। দুই উৎসই খুমি-ম্রো সংঘাতের কথাও লেখে — খুমিরা জয়ী হয়ে ম্রোদের তাড়িয়ে দেন।

খুমিরা কোথায় থাকেন: উপজেলা, মৌজা ও গ্রাম

লেলুং খুমীর হিসাবে বান্দরবানের 11টি মৌজায় মোট 36টি খুমি গ্রাম — থানচিতে 21, রুমায় 11, রোয়াংছড়িতে 4। গ্রামগুলো শহর থেকে দূরে উঁচু পাহাড়ে, আর তিনি লিখেছেন খুমিদের মধ্যে তখনো শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়নি।

উৎস: লেলুং খুমী, “খুমী জাতির আদ্যোপান্ত”। লেখাটিতে গ্রাম গোনার সাল দেওয়া নেই।
উপজেলামৌজা (লেলুং খুমীর দেওয়া নম্বরসহ)গ্রাম
থানচি373 প্রকয়া, 359 সেকাদু, 369 সিংপা, 385 রাইখ্যং, 367 তিন্দু21
রুমা358 রুমা, 372 নাইতং, 353 কৌলাদি, 384 রোমক্রী11
রোয়াংছড়ি317 ক্যছালং, 316 বেতছড়া4
মোট11টি মৌজা36
বান্দরবানের থানচি উপজেলার মৌজা মানচিত্র: বলিপাড়া, থানচি, তিন্দু ও রেমাক্রি ইউনিয়ন আলাদা রঙে, পূর্ব ও দক্ষিণে মিয়ানমার সীমান্ত, মাঝ দিয়ে সাঙ্গু নদী
থানচি উপজেলার মৌজা মানচিত্র — দেশের খুমিদের প্রায় অর্ধেক এই উপজেলায়। মানচিত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, Small Area Atlas of Bangladesh – Bandarban Zila (2017) · সরকারি প্রকাশনা · উইকিমিডিয়া কমন্স

“লাঙ” সংকলন একটি ভিন্ন তালিকা দেয় — যেসব মৌজায় অতীতে খুমি হেডম্যান ছিলেন, আর 2004 সালে সেখানে কোন জাতির হেডম্যান। তালিকার সাতটি মৌজার মধ্যে কেবল একটিতে, 367 নম্বর তিন্দু মৌজায়, তখনো খুমি হেডম্যান ছিলেন — মাংলুং খুমী; সংকলন লিখেছে হেডম্যানদের মধ্যে তিনিই “একমাত্র জীবিত এবং হেডম্যান পদমর্যাদায় বর্তমানে রয়েছেন”।

উৎস: “লাঙ — খুমী বিষয়ক বিশেষ সংকলন”, জুম ঈস্থেটিকস কাউন্সিল, 2004, পৃ. 8। মৌজার নম্বর লেলুং খুমীর তালিকার সঙ্গে সবসময় মেলে না — যেমন রেমাক্রি “লাঙ”-এ 371, লেলুং খুমীর তালিকায় “রোমক্রী” 384।
মৌজা (“লাঙ”-এর বানান ও নম্বর)পূর্বের খুমি হেডম্যান (নামক্রমে)2004-এ হেডম্যান
368 মিবক্যালিইটং, হুবই, মাংখি, এংফাই, খুউংমারমা
370 মধুআনলিং, আমং, সিবংত্রিপুরা
371 রেমক্রীকুকাই, থাংকি, ক্রাবো, কেতিলংঅজানা
369 সিংগফালিতিং, ঙাফুই, হইলো, লাইফইমারমা
সেংফ্রা (আলীকদম, মাতামুহুরী এলাকা)অজানা—
372 নাইতংহাই তিল, লিইখিনমারমা
367 তিন্দু—মাংলুং খুমী

বসতির এলাকা নিয়েও উৎসভেদ আছে। সুগত চাকমা (1985) লেখেন খুমিরা রুমা ও থানচিতে থাকেন; বাংলাপিডিয়া লেখে থানচি, রোয়াংছড়ি ও লামায়; লেলুং খুমী লেখেন রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচির বাইরে বাংলাদেশের আর কোথাও খুমিরা থাকেন না। 2022 শুমারি তিন উপজেলাকেই প্রধান দেখায়, তবে লামায় 44 ও বান্দরবান সদরে 81 জনও গুনেছে। bdnews24-এর মার্চ 2026-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী খুমিদের মধ্যে তখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি পরিবার শহরে এসে বসবাস করছে।

খুমি ভাষা: কোন পরিবারের, কয়টি উপভাষা, কেন বিপন্ন

খুমি ভাষা তিব্বতি-বর্মী পরিবারের কুকি-চিন শাখার ভাষা। ভাষাবিদ ডেভিড এ পিটারসনের হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় 2,000 মানুষ খুমি বলেন, দুটি প্রধান উপভাষায় — রুমা-রোয়াংছড়ির খুমি ও থানচির খুমি — যা পরস্পরের বোধগম্য। ভাষা ইনস্টিটিউটের এক জরিপে খুমি দেশের 14টি বিপন্ন ভাষার একটি।

পিটারসন (তখন ডার্টমাউথ কলেজ, যুক্তরাষ্ট্র) “লাঙ” সংকলনে “A brief introduction to Khumi” নামে একটি ইংরেজি পরিচিতি লেখেন, পাঁচ বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে খুমিদের সঙ্গে গবেষণার ভিত্তিতে। তাঁর লেখার মূল কথাগুলো:

  1. পার্বত্য চট্টগ্রামে খুমির সবচেয়ে কাছের ভাষা বম, খিয়াং (Hyow), পাংখোয়া ও লুসাই (Mizo) — এই পাঁচটি কুকি-চিন শাখার।
  2. কুকি-চিন ভাষাগুলোর মধ্যে খুমি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শব্দের শুরুর অংশ (prefix) ধরে রেখেছে, যা এই শাখার বেশির ভাগ ভাষা হারিয়েছে। আবার মারমা ভাষার প্রভাবে খুমির কিছু মৌলিক কুকি-চিন বৈশিষ্ট্য হারিয়েও গেছে।
  3. খুমি সুরভিত্তিক (tonal) ভাষা — পাঁচটি মূল সুর, আর প্রসঙ্গভেদে প্রায় এক ডজন রূপভেদ। লেলুং খুমী লেখেন প্রধান সুর তিনটি, বিভক্তিভেদে 9–10টি।
  4. বাক্যে কর্তা আগে, ক্রিয়া শেষে — বাংলার মতোই। লেলুং খুমীর উদাহরণ: “কাই বিউ চা’” = আমি ভাত খাই।
  5. সর্বনামে একবচন ও বহুবচনের পাশাপাশি দ্বিবচন আছে, আর “আমরা” দুরকম — শ্রোতাকে ধরে আর শ্রোতাকে বাদ দিয়ে।
  6. খুমি গানের নিজস্ব একটি “গানের ভাষা” আছে, যা গায়ক ছাড়া অন্যদের কাছে প্রায় দুর্বোধ্য। লেলুং খুমীও লেখেন, খুমি লোকগীতি “কেবল শিল্পীরাই বুঝতে পারে”।

পিটারসন আশা নিয়েই শেষ করেছিলেন: মূলধারার সঙ্গে কম যোগাযোগের কারণে খুমিরা অন্য কিছু জনগোষ্ঠীর চেয়ে নিজেদের ভাষা ভালোভাবে ধরে রেখেছেন, তবে “Languages can be lost within a couple of generations”। লেলুং খুমী আরও শঙ্কিত — তিনি পিটারসন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষকদের বরাতে লেখেন, 50–60 বছরে খুমিসহ অনেক ছোট ভাষা বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক ভাষাতাত্ত্বিক ক্যাটালগ Glottolog ভাষাটিকে “Khumi Chin” নামে রাখে (কোড khum1248, ISO 639-3 কোড cnk), শ্রেণিবিন্যাস: Sino-Tibetan › Kuki-Chin-Naga › Kuki-Chin › Peripheral Kuki-Chin › Khomic। একই পাতায় Ethnologue-এর অবস্থান-মান দেওয়া আছে 5 (Developing)। এই মান মিয়ানমারসহ পুরো ভাষার জন্য; বাংলাদেশের খুমি-ভাষীদের জন্য আলাদা মান পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের (IMLI) ভাষা-জরিপ, যা 2018-এ শেষ হয়, 14টি বিপন্ন ভাষার তালিকায় খুমিকে রেখেছে — দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী জরিপের ফল তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। খুমিরা সাধারণত নিজের ভাষার বাইরে আরও দু-তিনটি ভাষা বলেন — মারমা, ম্রো, বম ও ত্রিপুরা — লিখেছেন লেলুং খুমী; পিটারসনও লেখেন প্রাপ্তবয়স্ক খুমি-ভাষীদের বেশির ভাগ অন্তত আরেকটি পাহাড়ি ভাষা জানেন, আর অল্পবয়সীদের মধ্যে সুবিধাপ্রাপ্তরা বাংলা শিখতে শুরু করেছেন। মাতৃভাষায় শিক্ষা নিয়ে সরকারি কর্মসূচির অবস্থা আছে পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা নিয়ে আমাদের লেখায়।

খুমি ভাষার একটি সাম্প্রতিক মাইলফলক: bdnews24-এর নভেম্বর 2022-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী রোয়াংছড়ির তারাছা ইউনিয়নের লংথাং খুমি পাড়ায় খুমি ভাষার প্রথম নাটক “মোমাহ্ তা-কোছি” মঞ্চস্থ হয়, বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটের আয়োজনে; সংলাপ লেখা ও অভিনয় করেছেন খুমি শিক্ষার্থীরা।

খুমিদের কি নিজস্ব বর্ণমালা আছে?

খুমি লেখার জন্য রোমান হরফের একটি বর্ণমালা আছে, যা মিয়ানমারের দিকে বেশি চলে; বাংলাদেশে এর চর্চা তুলনামূলক নতুন এবং মূলত খ্রিস্টান খুমিদের মধ্যে। উৎসগুলো এখানে স্পষ্টভাবে আলাদা কথা বলে — বাংলাপিডিয়া লেখে খুমি ভাষার “no alphabets”।

লেলুং খুমী 25 অক্ষরের তালিকা দিয়েছেন — A Y YH AW B CH D E F H I J K L M N NG O P R S T U V Z — এবং লিখেছেন আনুমানিক 25% খুমি নিজেদের বর্ণমালা ব্যবহার করেন। “লাঙ” সংকলনের ছক অন্যরকম: রোমান বর্ণমালা ব্যবহারকারী 80%, ক্রামা বর্ণমালা 40% (কেবল ক্রামা অনুসারীরা), আর বাংলা হরফে খুমি লেখার চল “নাই”। শতাংশ দুটি যোগ করলে 100 ছাড়ায়, সংকলন তার ব্যাখ্যা দেয়নি। পিটারসন আরও একটি সূক্ষ্ম কথা লেখেন: বার্মার দিকের প্রচলিত বানানরীতি বাংলাদেশের খুমিদের মধ্যে ব্যাপকভাবে জানা নয়, আর বাংলাদেশের খুমিতে এমন কিছু ধ্বনিভেদ আছে যা বর্মি খুমিতে নেই — তাই তিনি ও তাঁর খুমি সহকর্মীরা আলাদা একটি বানানরীতি তৈরি করেছিলেন।

এই বর্ণমালা কে, কবে তৈরি করেছিলেন, সে প্রশ্নেও উৎসভেদ আছে; মিশনারি ইতিহাসের সেই আলোচনা আছে বম, পাংখোয়া, লুসাই ও খুমিদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম নিয়ে আমাদের লেখায়।

খুমি সমাজের গোত্র, পরিবার ও সামাজিক বিচার

খুমি সমাজ পিতৃসূত্রীয় ও গোত্রভিত্তিক — সন্তান বাবার গোত্রের পরিচয় পায়, আর একই গোত্রে বিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গোত্রের মোট সংখ্যা নিয়ে তিনটি আর্কাইভ-উৎস তিন রকম বলে: 50-এর বেশি, 48, ও 32।

উৎস: লেলুং খুমী; “লাঙ” পৃ. 7–8; “খুমি জনগোষ্ঠীর বিবাহ (আইয়ুলানা)”, জুমজার্নাল আর্কাইভ।
উৎসগোত্রের সংখ্যাটীকা
লেলুং খুমী50-এর বেশি; বাংলাদেশে 14–15টিপ্রধান আটটি: সামথাং, ভউ, উমসিং, লামওচে, অমসাং, খইসেই, ক্রিমসাং, লিমলাই
“লাঙ” সংকলন (তথ্য সংগ্রহে লেলুং খুমী)48 (বাংলাদেশ ও বার্মা মিলিয়ে)48টি নামের পূর্ণ তালিকা, শুরু সামথাং, সিংক্‌বেউ, উমসিং দিয়ে
প্রথাগত আইনের সংকলন (আর্কাইভ পোস্ট “খুমি জনগোষ্ঠীর বিবাহ”)32সংখ্যাটি বাংলাদেশের না সব দেশের, বলা নেই

গোত্র শুধু খুমিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লেলুং খুমী লেখেন, খুমি, বম ও ম্রো সমাজে কিছু গোত্র একই, শুধু নাম বদলেছে — খুমিদের সামথাং গোত্রকে বম সমাজে বলা হয় থামবিং; আর গোত্রভেদে কিছু পশুপাখির মাংস না খাওয়ার রীতি তিন সমাজেই আছে। “লাঙ” জানায়, সামথাং গোত্রের কেউ দেশের বাইরে নিজের গোত্রের মানুষ পেলে বয়স অনুযায়ী তাঁকে নিকট আত্মীয়ের মতো সম্বোধন করেন।

পরিবারের ধরন নিয়ে লেলুং খুমী লেখেন, অতীতে বর্ধিত পরিবার ছিল, এখন একক ও যৌথ পরিবার বেশি। “লাঙ” যৌথ পরিবারের একটি বিশেষ রীতি নথিভুক্ত করেছে: যতজন বিবাহিত দম্পতি, প্রত্যেকের ঘরে আলাদা চুলা; তরকারি এক পদ হলে একজন রেঁধে সবাইকে ভাগ করে দেন, চাল সমান ভাগ করে যার যার চুলায় রান্না হয়, তারপর সবাই একসঙ্গে খান।

বিচার-ব্যবস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন স্তরের প্রথাগত কাঠামোর মধ্যে — কার্বারী, হেডম্যান ও সার্কেল চিফ। খুমিরা বোমাং সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত, আর লেলুং খুমী লেখেন বোমাং সার্কেল চিফই খুমিদের “সর্বোচ্চ সামাজিক ন্যায় নির্ধারক”; বেশির ভাগ বিরোধ মেটে পাড়ার কার্বারীর কাছে। “লাঙ” অনুযায়ী খুমি সামাজিক বিচারে সাধারণ দণ্ড 60–70 টাকা রুপার পয়সা আর একটি মাদি শূকর — জরিমানা যা-ই হোক, শূকর থাকতেই হবে; চুরির দণ্ড ছিল 60টি রুপার মুদ্রা, যা পরে শিথিল করে 60 টাকা করা হয়েছে।

খুমি সমাজের একটি স্বতন্ত্র রীতি “শপথের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন”। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও এক গোত্রের মানুষ অন্য গোত্রের বা অন্য জাতির কারও সঙ্গে শপথ নিয়ে আত্মীয়তা গড়েন; “লাঙ” লেখে, এই সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, আর এরপর দুই পক্ষে বিয়ে চলে না। লেলুং খুমী লেখেন, প্রকৃতিপূজারি খুমিরা মারমা, বম, ম্রো ও ত্রিপুরাদের সঙ্গেও পশু জবাই করে রক্ত ছুঁয়ে এমন শপথ নেন, আর শপথ-বন্ধুর মৃত্যুতে একজন আরেকজনের সম্পত্তির ভাগ দাবি করতে পারেন।

নারীর অবস্থান নিয়ে দুই উৎসের সুর আলাদা। “লাঙ” লেখে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রোদের পরেই খুমি নারীরা সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদা পান — স্বামীর মৃত্যুর পর ভাইয়েরা বোনের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। লেলুং খুমী লেখেন, উৎপাদনে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ থাকলেও পরিবারে ও সমাজে সিদ্ধান্তে পুরুষের মতই প্রাধান্য পায়। প্রথাগত আইনে নারীর সম্পত্তি ও অধিকারের বিস্তারিত আছে প্রথাগত আইনে খুমি নারীর অবস্থান ও খুমি উত্তরাধিকার (ঙাছাং) লেখায়।

খুমি বিয়ে, কনেপণ ও বিবাহবিচ্ছেদ: তিন উৎসের হিসাব

খুমি বিয়ের শুরু একটি মুরগি, এক বোতল মদ ও একটি বল্লম নিয়ে পাত্রপক্ষের রাতের প্রস্তাব দিয়ে; রাজি হলে বল্লমটি কনের বাবার কাছে থেকে যায়, না হলে ফেরত আসে। এ বিবরণে তিনটি উৎস একমত; কনেপণের পরিমাণে একমত নয়।

উৎস: লেলুং খুমী, “খুমী জাতির আদ্যোপান্ত”; “লাঙ” পৃ. 19; “খুমি জনগোষ্ঠীর বিবাহ (আইয়ুলানা)”।
উৎসকনেপণ
লেলুং খুমী (পুরোনো রীতি)120টি রুপার পয়সা, 19 বা 21টি মোরগ-মুরগি, 11 বা 13টি বল্লম
“লাঙ” সংকলন (2004)120টি রুপার টাকা ও নানা ধরনের 7–8টি বল্লম
প্রথাগত আইনের সংকলন (আর্কাইভ পোস্ট)100টি রৌপ্যমুদ্রা বা সমপরিমাণ অর্থ, 19টি মোরগ-মুরগি, 13টি বল্লম; এর মধ্যে মায়ের দুধের দাম, ভাইয়ের ভাগ ও দাদির ভাগ 10টি করে মুদ্রা
লেলুং খুমী — 2007 সালের সংস্কারকনেপণ 10,000 টাকা, মায়ের ভাগ 1,000, ভাইয়ের ভাগ 1,000, বল্লমের বদলে 500 টাকা, আর 17টি মোরগ-মুরগি

সংস্কারের প্রেক্ষাপট লেলুং খুমী ব্যাখ্যা করেছেন: রুপার মুদ্রা ও বল্লম অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় খুমিদের সামাজিক সংগঠন “খুমী কুহুং সমিতি” 2007 সালে আলোচনা সভা ডেকে টাকায় কনেপণ ঠিক করে, আর ফেব্রুয়ারি 2008-এ বোমাং রাজা অংশৈপ্রু চৌধুরীর সুপারিশে তা প্রথাগত আইন হিসেবে অনুমোদিত হয়।

বিয়ের আনুষ্ঠানিক নাম “আইয়ুলানা পই” — এটি ছাড়া খুমি সমাজে বিয়ে সমাজসিদ্ধ নয়, আর এর সঙ্গে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের সম্পর্ক নেই, জানায় আর্কাইভের খুমি বিবাহ-বিষয়ক লেখা। একই লেখায় পালিয়ে বিয়ে (“স্পতুলায়না”), মিশ্র বিয়ে ও কোর্ট ম্যারেজের প্রথাগত অবস্থান বিস্তারে আছে। বিয়ের আসরে মোরগের জিহ্বা পরীক্ষা করে নবদম্পতির শুভাশুভ দেখা হয় — এ কথা “লাঙ”, প্রথাগত আইনের সংকলন ও বাংলাপিডিয়া তিনটিতেই আছে।

বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে উৎসে স্পষ্ট বিরোধ: বাংলাপিডিয়া লেখে খুমি সমাজে বিবাহবিচ্ছেদের কোনো বিধান নেই (“There is no provision of divorce”); অথচ লেলুং খুমী লেখেন নির্দিষ্ট কিছু কারণে স্ত্রী সামাজিক আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন, আর আর্কাইভে খুমি বিবাহবিচ্ছেদ (আয়ু আখাইনা) নিয়েই আলাদা লেখা আছে। বহুবিবাহ ও বিধবা বিবাহ অনুমোদিত — এ বিষয়ে লেলুং খুমী ও প্রথাগত আইনের সংকলন একমত; সংকলনটি যোগ করে, বহুবিবাহ অনুমোদিত হলেও সমাজে “তেমন প্রবণতা নেই”।

জন্ম, নামকরণ ও মৃত্যু: খুমিদের যে আচারগুলো নথিভুক্ত

শিশুর জন্মের দু-তিন দিন পর “আথিক্লো” নামের অনুষ্ঠান হয়, নাভিরজ্জু শুকিয়ে পড়ার পর নামকরণ, আর মৃত্যুর পর মৃতদেহ কয়েক দিন ঘরে রেখে সৎকার — এই কাঠামোয় উৎসগুলো একমত। কত দিন, কোন বয়সে, কারা পালন করেন — এসব খুঁটিনাটিতে অমিল আছে।

জন্ম: লেলুং খুমী লেখেন, জন্মের 2–3 দিন পর একটি মুরগি জবাই করে “আথিক্লো” অনুষ্ঠান হয়, প্রসবের সময় উপস্থিত বয়স্ক নারীদের মদ দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়, আর প্রসূতি মা তিন মাস লবণ, মাছ ও মাংস খান না। “লাঙ” একই অনুষ্ঠানকে বলে “আথিক্লো পেই” এবং যোগ করে, উপস্থিত বয়স্ক নারীরা হাত ধুয়ে একে একে একটি কাঁচা ডিম স্পর্শ করেন। “লাঙ” আরও লেখে, জন্মের এক বছর পর শিশুর প্রথম চুল কাটার পারিবারিক উৎসব হয়।

নামকরণ: নাভিরজ্জু শুকিয়ে পড়ার পর — লেলুং খুমী, “লাঙ” ও বাংলাপিডিয়া তিনটিতেই এক কথা। “লাঙ” অনুযায়ী নাম দেওয়ার সময় মায়ের কবজিতে সাতবার সুতা প্যাঁচানো হয়, আর সাধারণত পূর্বপুরুষের নাম অনুসরণ করা হয় — বাংলাপিডিয়াও লেখে শিশুর নাম রাখা হয় পূর্বপুরুষের নামে।

বারো বছরের অনুষ্ঠান: লেলুং খুমী লেখেন, কেবল ক্রামা ধর্মে বিশ্বাসী খুমিরা সন্তানের 12 বছর পূর্ণ হলে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করে তাকে যৌবনপ্রাপ্ত ঘোষণা করেন; প্রকৃতিপূজারি ও খ্রিস্টান খুমিরা এটি পালন করেন না। “লাঙ” লেখে, ক্রামা “বা খ্রীষ্টান” ধর্মে প্রবেশের পর থেকে এ অনুষ্ঠান চালু হয়েছে।

মৃত্যু: মৃতদেহ কত দিন ঘরে রাখা হয়, তাতে অমিল — লেলুং খুমী লেখেন সাধারণত 2–3 দিন, “লাঙ” ও বাংলাপিডিয়া লেখে 4–5 দিন। দুই খুমি উৎসই ঘরের মাঝখানের খুঁটিতে বাঁশের একটি ঝুড়ি ঝোলানোর কথা লেখে, যাতে প্রতিবেলা এক মুঠো ভাত রাখা হয়; “লাঙ” এর কারণ লেখে — খুমিদের বিশ্বাস, সৎকারের পর আত্মা বাড়িতে ফিরে আসে। বছর শেষে মৃতের জন্য ভোজ হয়, যাতে মামার পক্ষের গোত্রকে অবশ্যই নিমন্ত্রণ করতে হয়। প্রকৃতিপূজারি খুমিদের মধ্যে মৃত্যুর খবর জানাতে আকাশে ফাঁকা গুলি ছোড়ার রীতির কথা লেখেন লেলুং খুমী।

খুমিদের ধর্ম কী: প্রকৃতিপূজা, ক্রামা, খ্রিস্টধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম

খুমিদের কোনো একটি ধর্ম নেই — একই সমাজে, এমনকি একই পরিবারে, ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ আছেন। লেলুং খুমীর অনুমান: খ্রিস্টান প্রায় 45%, প্রকৃতিপূজারি 45%, ক্রামা প্রায় 10%। শুমারি জাতি ধরে ধর্মের হিসাব প্রকাশ করে না, তাই এর সরকারি যাচাই নেই।

উৎস: তথ্যসূত্র অংশে।
উৎসখুমিদের ধর্ম সম্পর্কে যা বলে
সুগত চাকমা (1985)খুমি অধ্যায়ে ধর্মের কোনো উল্লেখ নেই
“লাঙ” (2004)বৌদ্ধ, ক্রামা, খ্রিস্টান ও প্রকৃতিপূজারি — চার ধরনের ধর্ম; “একই পরিবারে একাধিক ধর্ম বিশ্বাসী সদস্যও”
লেলুং খুমীবৌদ্ধ বলে পরিচয় দিলেও প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতিপূজারি; এখন তিনটি — প্রকৃতিপূজা, ক্রামা, খ্রিস্টধর্ম (45/45/10%)
বাংলাপিডিয়া“followers of Buddhist faith”, তবে আচারে প্রকৃতিপূজার প্রাধান্য; সৃষ্টিকর্তা Pathian
ইংরেজি উইকিপিডিয়া“primarily Christian”, সংখ্যালঘু বৌদ্ধ ও সর্বপ্রাণবাদী — মিয়ানমার ও বাংলাদেশ একসঙ্গে

অঞ্চলভেদও আছে। লেলুং খুমী লেখেন, রোয়াংছড়ির কিছু খুমি ক্রামা অনুসারী, কিন্তু রুমা ও থানচির খুমিদের মধ্যে ক্রামা অনুসারী নেই — সেখানে একাংশ প্রকৃতিপূজারি, একাংশ খ্রিস্টান। “লাঙ”-ও লেখে, ক্রামা ধর্মীয় উৎসবগুলো পালন করেন ক্রামা অনুসারী খুমিরা, আর “অন্যান্য এলাকায় ক্রামাধর্মানুসারী খুমী নেই বললেই চলে”।

প্রকৃতিপূজার দেবদেবীর নামেও উৎসভেদ। লেলুং খুমী লেখেন, পৃথিবী সৃষ্টির পেছনের সর্বশক্তিমান দেবতাকে খুমি ভাষায় বলা হয় “তামিউ” (Tameuh); তিনি গৃহপূজা, ছড়া-পূজা, বৃক্ষপূজা ও পাথরপূজার কথা লেখেন। “লাঙ” দেয় অন্য নাম — ভগবান “কিন্নি”, স্রষ্টা “তিমি”, ধানদেবতা “টিটো”, আর ক্রামা ধর্মের প্রবর্তক “মেনলে”। বাংলাপিডিয়া সৃষ্টিকর্তার নাম দেয় Pathian। খুমিদের বর্ণমালা ও ধর্মগ্রন্থ হারিয়ে যাওয়ার কাহিনির সঙ্গে ম্রোদের কাহিনির “যথেষ্ট মিল” আছে বলে লেখেন লেলুং খুমী।

ধর্মান্তরের ফল নিয়ে লেলুং খুমী উদ্বিগ্ন: ক্রামা ও খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পর অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী মদ নিষিদ্ধ হচ্ছে, শিকারের খুলি টাঙানো, বাঁশির তালে গো-হত্যা অনুষ্ঠান ও নবান্ন “দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে”, আর ভিন্ন ধর্মের কারণে বিয়ে ও বিচারে মতবিরোধ দেখা দিচ্ছে। খুমিদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম কীভাবে এল, মিয়ানমারের দিকে মিশনের ইতিহাস ও উৎসের অমিলসহ, তা আছে পাহাড়ে খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস নিয়ে আমাদের লেখায়।

জুম ঘিরে খুমিদের উৎসব ও আচার

খুমিদের প্রধান উৎসবগুলোর বেশির ভাগ জুমচাষ ও পাড়ার মঙ্গলকে ঘিরে — বীজ বোনার পর আগাছা পরিষ্কার, নতুন ধান তোলা, পাড়া-বন্ধ পূজা, আর গো-হত্যা উৎসব। একই উৎসবের নাম লেলুং খুমী ও “লাঙ” আলাদা বানানে লেখেন; নিচের ছকে দুটো পাশাপাশি রাখা হলো।

উৎস: “লাঙ” পৃ. 20–28; লেলুং খুমী, “খুমী জাতির আদ্যোপান্ত”। লেলুং খুমী লিখেছেন রাজকীয় গো-হত্যা অনুষ্ঠান বাংলাদেশের খুমিরা এখন প্রায় আর করেন না।
উৎসব / আচার“লাঙ”-এর নাম ও বিবরণলেলুং খুমীর নাম ও বিবরণ
জুমে আগাছা পরিষ্কার“ল’বনা” — ধানদেবতা “টিটো”-র উদ্দেশে মুরগি ও এক জোড়া ডিম; মুরগির জিভ সোজা থাকলে ভালো ফসল“ল ব” — জুমদেবতাকে খুশি করতে মুরগি ও ডিম; পরিবারভিত্তিক
নতুন ধান তোলা (নবান্ন)“চৌপলনা” — আগস্ট-সেপ্টেম্বর, পরিবারভিত্তিক; শেষে “আঁ-তাঁই পাঁ” প্রতিযোগিতা“চো প্ল” — ধান কাটার সময়ের পূজা; পরিবারভিত্তিক
পাড়া-বন্ধ পূজা“আ-ওয়া-আনা” — বছরে দুবার: জুন-জুলাই ও নভেম্বর-ডিসেম্বর; দুই দিন পাড়ায় কেউ ঢোকে না, বেরোয় না“নিশা জা” (শুষ্ক মৌসুম) ও “নিচো জা” (আষাঢ়) — পাড়াকেন্দ্রিক, 2–3 দিন
গো-হত্যা উৎসব“রেইনা” (মধ্যবিত্ত) ও “আরেচেইনা” (ধনী) — নভেম্বর থেকে জানুয়ারি“রেইংনাই পই” ও রাজকীয় “আরেং চেংনাই পই” (5–7টি গরু/মহিষ লাগে)
রাজ-উৎসব“আরাং চ্যাং” — সাত দিনের, সবচেয়ে ব্যয়বহুল; যে পরিবার করে তাদের বংশধর “রাজগোষ্ঠী”—
নববর্ষ“সাংক্রাই” — বৌদ্ধ খুমিরা এক দিন“সাংক্রাই” — তিন দিন; গিলা, বাঁশ ও পানি খেলা

“লাঙ” লেখে, খ্রিস্টান ও ক্রামা অনুসারী খুমিরা “আরেচেইনা” উৎসব করেন না; খ্রিস্টান খুমিরা বড়দিন ও ইস্টার, আর ক্রামা অনুসারীরা বছরে চারবার — আগস্ট, ডিসেম্বর, জুন ও মার্চে — নিজেদের উৎসব পালন করেন। লেলুং খুমী আরও লেখেন, খ্রিস্টান খুমিরা বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষে দূর থেকে এসে একটি গ্রামে জড়ো হন।

জুমের বাইরেও একটি সামাজিক বন্ধন খুমিদের বোমাং সার্কেলের সঙ্গে যুক্ত রাখে: লেলুং খুমী লেখেন, রাজপুণ্যাহর দিনে খুমি কার্বারীরা এক বোতল মদ বা রাইসবিয়ার ও একটি মোরগ দিয়ে বোমাং চিফকে খাজনা দেন। “লাঙ”-ও লেখে, প্রতিটি খুমি পরিবার গ্রামপ্রধানের মাধ্যমে বোমাং রাজাকে খাজনা দেয়। উৎসবটির ইতিহাস আছে বোমাং সার্কেলের রাজপুণ্যাহ নিয়ে আমাদের লেখায়।

খুমিদের পোশাক, গান ও লোককাহিনি

খুমি নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক নিজেদের হাতে বোনা খাটো স্কার্ট বা থামি, মাথায় সাদা পাগড়ি, আর রুপা-পিতল-পুঁতির অলংকার; পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক সাদা নেংটি ও মাথায় পাগড়ি। উৎসগুলো লেখে, দৈনন্দিন জীবনে এখন লুঙ্গি, ব্লাউজ, শার্ট-প্যান্ট বেশি চলে।

লাল ব্লাউজ, নকশা-করা মাথার কাপড়, চুলে লাল ফুল আর গলায় রুপার মুদ্রা ও পুঁতির মালা পরা খুমি তরুণী, পেছনে বসে আছেন আরও কয়েকজন
ঢাকায় আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে খুমি নৃত্যশিল্পীরা, 9 আগস্ট 2014। ছবি: Biplob Rahman (Biplobcht) · CC BY-SA 4.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

“লাঙ” লেখে, নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক নিজস্ব তৈরি ফুল-তোলা লালচে রঙের 7–8 ইঞ্চি প্রস্থের খাটো স্কার্ট, আর পুরুষদের 3–4 হাত মাপের সাদা কাপড় দুই মাথায় ফুল-তোলা নেংটির মতো। লেলুং খুমী নারীদের থামিকে বলেন “নেনা” — 15–16 ইঞ্চি লম্বা, নানা রঙে নকশা করা, চারপাশে পুঁতি দিয়ে সাজানো। দুই উৎসই লেখে নারী-পুরুষ উভয়েই আগে লম্বা চুল রাখতেন, পুরুষেরা এখন আর রাখেন না।

এই পোশাক বানানো সময়সাপেক্ষ — “লাঙ” এ কারণেই লিখেছিল যে মেয়েরা এখন বর্মি লুঙ্গি ও ব্লাউজ পরেন। bdnews24-এর মার্চ 2026-এর প্রতিবেদনে বান্দরবান শহরে কোমর তাঁতে খুমি পোশাক বোনেন এমন এক খুমি নারী জানান, বিয়ে বা উৎসবের পোশাক বানাতে তিন মাস পর্যন্ত লাগে, আর তা বিক্রি হয় সাধারণত নয় হাজার টাকায়; ঘরে পরার পোশাক 15 দিনে হয়, দাম তিন হাজার টাকা।

গান ও নাচ: লেলুং খুমী লেখেন, প্রধান নাচ “তাং ন’” — গো-হত্যা অনুষ্ঠানে যুবক-যুবতীরা হাত ধরে সারিবদ্ধভাবে বাঁশি ও ঢোলের তালে নাচেন। সুগত চাকমা (1985) লিখেছিলেন, খুমিরা গো-হত্যা অনুষ্ঠানে ম্রোদের মতো দলবদ্ধ হয়ে নাচেন না, একজন পুরুষ ও একজন নারী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নাচেন। বাংলাপিডিয়া দুটি নাচের নাম দেয় — নারী-পুরুষের “Lamnah” আর কেবল যুবকদের বিজয়-নৃত্য “Charanah”, আর বাদ্যযন্ত্র “Along” ও “Atong”; “লাঙ”-ও আলুং ও আতুং-কে উল্লেখযোগ্য বাদ্যযন্ত্র বলে।

লোককাহিনি: লেলুং খুমী ছয়টি লোককাহিনির নাম দেন — আংলো রেইংপা, সিখি আচি, পুইখং আচি, উইকিই আচি, লাকনা নু আচি ও য়াংপো চে আচি; “লাঙ” সংকলনে বগা লেকের উৎপত্তির খুমি কিংবদন্তিসহ কয়েকটি কাহিনি ছাপা আছে। জুমজার্নালের আর্কাইভে থাকা দুটি খুমি রূপকথার সূচি আছে খেয়াং, চাক, খুমী, বম ও হালাম রূপকথার সূচিতে।

খুমিদের জীবিকা, ভূমি ও আয়

খুমিদের প্রধান জীবিকা জুমচাষ, সঙ্গে শিকার, মাছ ধরা ও পশুপালন। খুমি উৎস দুটি একমত যে জুমের ফলন কমেছে আর বাগান-চাষের দিকে ঝোঁক বাড়ছে; “লাঙ” 2004 সালে খুমিদের গড় বার্ষিক আয় লিখেছিল 10,000 টাকা।

লেলুং খুমী জুমের ফসলের তালিকা দেন — ধান, তিল, তুলা, ভুট্টা, কুমড়া, মরিচ, শশা, কচু — আর জুমের পাশাপাশি আদা, আনারস, কলা, আম ও কমলা। ধান বিক্রি না করে নিজেদের জন্য রাখা হয়, অন্য ফসল বাজারে যায়। “লাঙ” লেখে, খুমিরা বাগান-চাষের দিকে ঝুঁকছেন, কিন্তু বসতি উঁচু পাহাড়ে হওয়ায় সম্প্রসারণের সুযোগ “খুবই সীমিত”। জুমের কাজে শ্রম বিনিময়ের রীতিকে “লাঙ” বলে “আসহরুনা” — যে পরিবার জুমের কাজ শেষ করতে পারছে না, প্রত্যেক গ্রামবাসী তাকে অন্তত এক দিন সাহায্য করেন।

ভূমি নিয়ে লেলুং খুমীর লেখা দ্ব্যর্থহীন: খুমিদের ভূমি-অধিকার মূলত প্রথাগত ও সমষ্টিগত, হেডম্যানের বণ্টন করা এলাকায় পাড়াবাসী মিলে জুম করেন; কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অধিগ্রহণ ও বেদখলে খুমিদের আবাদি জমি “ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে”, আর কিছু খুমি ভূমিহীন হয়ে পড়ছেন। তিনি অধিকাংশ খুমিকে দারিদ্র্যসীমার নিচে বলেছেন। বাংলাপিডিয়া খুমিদের দক্ষ কারিগর বলে উল্লেখ করে — বাঁশ ও বেত দিয়ে ঘরের প্রয়োজনীয় সব জিনিস নিজেরাই তৈরি করেন।

বাইরের লেখকেরা এই দারিদ্র্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভিন্নভাবে। সুগত চাকমা 1985 সালে খুমিদের অবস্থাকে “ভালো নয়” লিখে কারণ হিসেবে “যাযাবর মনোবৃত্তি” ও জনসংখ্যার স্বল্পতাকে দায়ী করেছিলেন; খুমি লেখক লেলুং খুমী কারণ হিসেবে দেখান জুমের ফলন কমা, ভূমি হারানো ও শিক্ষার অভাব।

খুমিদের শিক্ষা: 2004-এ এসএসসি পাস 13 জন, 2024-এ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে 11 জন

শিক্ষায় খুমিরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর একটি — “লাঙ”-এর 2004 সালের হিসাবে খুমিদের মধ্যে এসএসসি পাস ছিলেন 13 জন, এইচএসসি 2 জন, স্নাতক একজনও না। দুই দশক পরে, 2024 সালে, খুমি সোস্যাল কাউন্সিলের সভাপতির হিসাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলেন 11 জন খুমি শিক্ষার্থী।

উৎস: bdnews24, 18 আগস্ট 2023; bdnews24, 25 অক্টোবর 2024; “লাঙ”; লেলুং খুমী; ইংরেজি উইকিপিডিয়া।
সময়হিসাবউৎস
1995সে বছর মাত্র একজন খুমি এসএসসি পাস করেনইংরেজি উইকিপিডিয়া
2004এসএসসি 13 (নারী 3, পুরুষ 10), এইচএসসি 2 (পুরুষ), বিএ ও এমএ 0; আধুনিক শিক্ষার হার 10%“লাঙ” পৃ. 5–6
লেলুং খুমীর লেখা (সাল উল্লেখ নেই)এসএসসি 15 পুরুষ ও 3 নারী, এইচএসসি 1; বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী কেউ নেই; কোনো খুমি পাড়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই“খুমী জাতির আদ্যোপান্ত”
আগস্ট 2023পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট 7 জন; কলেজে স্নাতক পর্যায়ে প্রায় 8 জনবাংলাদেশ খুমী স্টুডেন্টস কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি, bdnews24
অক্টোবর 2024পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট 11 জন; প্রথম নারী শিক্ষার্থী শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েখুমি সোস্যাল কাউন্সিলের সভাপতি সিঅং খুমি, bdnews24

লেলুং খুমী নিজের সম্পর্কে লিখেছিলেন, তিনিই তখন পুরো খুমি সমাজ থেকে একমাত্র উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি। তিনি লেখেন, কিছু খুমি শিশু রুমা আবাসিক বিদ্যালয়, ম্রো আবাসিক বিদ্যালয়, লামার কোয়ান্টাম ও রাঙামাটির মোনঘর শিশু সদনে বিনা বা কম খরচে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে; কিছু পাড়ায় এনজিও-চালিত স্কুল ও মিশনারিদের সহায়তায় মাতৃভাষায় পাঠদান চালু হলেও শিক্ষকের অভাবে তা ফলপ্রসূ হয়নি। তাঁর প্রস্তাব ছিল খুমি-অধ্যুষিত কোনো উপজেলায় একটি আবাসিক স্কুল।

bdnews24-এর মার্চ 2026-এর প্রতিবেদনে খুমি সোশ্যাল কাউন্সিলের সভাপতি জানান, খুমি সম্প্রদায়ের সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি নিয়োগ পেয়েছিলেন 1998 সালে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে। 2024 সালের প্রতিবেদনে নিজ সম্প্রদায় থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা প্রথম ছাত্রী বলেন, বড় হতে থাকলে মেয়েরা স্কুল থেকে ঝরে পড়ে — “নারীরা তো আরও অনেক পিছিয়ে”।

খুমিদের বর্তমান অবস্থা: স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও প্রতিনিধিত্ব

সাম্প্রতিক সংবাদপত্রে খুমিদের খবর তিন ধরনের: দুর্গম পাড়ায় চিকিৎসা না পৌঁছানো, সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফের দাবির সঙ্গে খুমিদের নাম জড়ানো ও তার প্রতিবাদ, আর শিক্ষায় ধীর অগ্রগতি। খুমিদের আলাদা কোনো আর্থসামাজিক জরিপ সাম্প্রতিক কালে প্রকাশিত হয়েছে বলে পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য: প্রথম আলোর জুলাই 2026-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী রুমা ও থানচির দুর্গম এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়; রুমা সদর ইউনিয়নের লেটংপাড়ার এক খুমি পরিবারের দুই শিশু দুই দিনের ব্যবধানে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায়। পাড়াটি থেকে যানবাহনের সড়কে পৌঁছাতে প্রায় 9 কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হাঁটতে হয়। পাড়ার কার্বারি শৈলুং খুমি জানান, তাঁদের 26 পরিবারের পাড়ায় দুই দিনে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, এর আগে আরও তিনজনের। জনপ্রতিনিধিরা উপজেলায় অন্তত আট শিশুর মৃত্যুর কথা বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ তখন পর্যন্ত তিনজনের তথ্য নিশ্চিত করে; এরপর বিশেষ টিকাদান অভিযান শুরু হয়।

নিরাপত্তা: 2022 সালে সক্রিয় হওয়া সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) দাবি করে তারা বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, ম্রো ও খুমি — এই ছয় জাতির প্রতিনিধি। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী 28 ডিসেম্বর 2022-এ বান্দরবানে ম্রো, লুসাই, খুমী, খেয়াং ও পাংখোয়া জনগোষ্ঠীর নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, এই জাতিগুলো কেএনএফের সশস্ত্র কার্যকলাপের সঙ্গে “কোনোভাবেই জড়িত নয়”; খুমিদের পক্ষে বক্তব্য দেন সিং ইয়ং খুমী ও লেলুং খুমী। কেএনএফ নিয়ে নথিভুক্ত তথ্য ও অভিযোগ আলাদা করে আছে কেএনএফ ও বম জনগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের লেখায়।

প্রতিনিধিত্ব ও সংগঠন: লেলুং খুমী লেখেন, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে খুমিদের জন্য একটি সদস্যপদ সংরক্ষিত, আর তিনি লেখার সময় খুমিরা স্থানীয় বা জাতীয় রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না। bdnews24 (নভেম্বর 2022) খুমি সোস্যাল কাউন্সিলের সভাপতি সিঅং খুমিকে জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয়। উৎসগুলোতে খুমিদের অন্তত তিনটি সংগঠনের নাম আছে — খুমী কুহুং সমিতি (লেলুং খুমী), খুমি সোস্যাল/সোশ্যাল কাউন্সিল (bdnews24) ও বাংলাদেশ খুমী স্টুডেন্টস কাউন্সিল (bdnews24, 2023)। প্রথম দুটি একই সংগঠন কি না, কোনো উৎসে বলা নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য জনগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংখ্যার তুলনা দেখতে পারেন পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তালিকা ও জনসংখ্যা পাতায়।

সচরাচর জিজ্ঞাসা: খুমি জনগোষ্ঠী নিয়ে প্রশ্নোত্তর

খুমি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা কত?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি 2022 অনুযায়ী দেশে খুমি 3,780 জন — পুরুষ 1,951, নারী 1,829। এর 3,287 জন বান্দরবান জেলায় ও 44 জন রাঙামাটিতে। খুমিদের নিজস্ব হিসাব ভিন্ন: খুমি সোস্যাল কাউন্সিল 2022 সালে সংখ্যাটি প্রায় সাড়ে চার হাজার বলেছিল, আর 2006 সালের এক সম্প্রদায়-জরিপে পাওয়া যায় 2,094 জন।

খুমিরা কোথায় বাস করেন?

খুমিরা মূলত বান্দরবানের তিন উপজেলায় থাকেন। 2022 শুমারিতে থানচিতে 1,829, রুমায় 890 ও রোয়াংছড়িতে 436 জন — দেশের খুমিদের প্রায় অর্ধেক শুধু থানচিতে। খুমি গবেষক লেলুং খুমীর হিসাবে বান্দরবানের 11টি মৌজায় 36টি খুমি গ্রাম: থানচিতে 21, রুমায় 11, রোয়াংছড়িতে 4।

খুমি শব্দের অর্থ কী?

উৎসভেদে অর্থ আলাদা। খুমি গবেষক লেলুং খুমীর মতে “খু” মানে গভীর জঙ্গল, “মী” মানে মানুষ — “গভীর জঙ্গলের মানুষ”। জুম ঈস্থেটিকস কাউন্সিলের 2004 সালের সংকলন “লাঙ” লেখে “সীমান্তবর্তী পাহাড়ী”, আর বাংলাপিডিয়া লেখে “উত্তম মানুষ”। ঔপনিবেশিক লেখক টি এইচ লুইনের “কুকুর-মানুষ” ব্যাখ্যাকে লেলুং খুমী অপমানজনক ও ভুল বলেছেন।

খুমি ভাষা কোন ভাষা পরিবারের?

খুমি তিব্বতি-বর্মী পরিবারের কুকি-চিন শাখার ভাষা; Glottolog একে Khumi Chin (ISO কোড cnk) নামে Peripheral Kuki-Chin-এর Khomic দলে রাখে। ভাষাবিদ ডেভিড এ পিটারসনের হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় 2,000 মানুষ খুমি বলেন, দুটি পরস্পর-বোধগম্য উপভাষায় — রুমা-রোয়াংছড়ির ও থানচির। পাঁচটি মূল সুর আছে।

খুমি ভাষা কি বিপন্ন?

হ্যাঁ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভাষা-জরিপ, যা 2018 সালে শেষ হয়, বাংলাদেশের 14টি বিপন্ন ভাষার তালিকায় খুমিকে রেখেছে। খুমি গবেষক লেলুং খুমী লিখেছেন, 50–60 বছরে খুমিসহ অনেক ছোট ভাষা হারিয়ে যেতে পারে। পিটারসন 2004 সালে লিখেছিলেন, মূলধারার সঙ্গে কম যোগাযোগের কারণে খুমিরা ভাষা তুলনামূলক ভালোভাবে ধরে রেখেছেন।

খুমিদের কি নিজস্ব বর্ণমালা আছে?

রোমান হরফের একটি খুমি বর্ণমালা আছে, যা মিয়ানমারে বেশি চলে আর বাংলাদেশে মূলত খ্রিস্টান খুমিরা শিখছেন। লেলুং খুমী 25টি অক্ষরের তালিকা দেন এবং লেখেন প্রায় 25% খুমি এটি ব্যবহার করেন; 2004 সালের “লাঙ” সংকলন রোমান হরফ ব্যবহারকারী 80% বলে। বাংলাপিডিয়া লেখে খুমি ভাষার কোনো বর্ণমালা নেই।

খুমিদের ধর্ম কী?

খুমিদের মধ্যে একাধিক ধর্ম পাশাপাশি আছে। লেলুং খুমীর অনুমান: খ্রিস্টান প্রায় 45%, প্রকৃতিপূজারি 45%, ক্রামা প্রায় 10%। 2004 সালের “লাঙ” সংকলন চারটি ধর্মের কথা লেখে — বৌদ্ধ, ক্রামা, খ্রিস্টান ও প্রকৃতিপূজা — এমনকি একই পরিবারে একাধিক ধর্মের মানুষ। জনশুমারি জাতি ধরে ধর্মের হিসাব প্রকাশ করে না।

খুমি সমাজে কয়টি গোত্র আছে?

উৎসভেদে সংখ্যা আলাদা। লেলুং খুমী লেখেন 50-এর বেশি গোত্র, যার 14–15টি বাংলাদেশে; 2004 সালের “লাঙ” সংকলন বাংলাদেশ ও বার্মা মিলিয়ে 48টি গোত্রের নাম দেয়; প্রথাগত আইনের সংকলন লেখে 32টি। সবগুলো উৎস একমত যে একই গোত্রে বিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং সমাজ পিতৃসূত্রীয়।

খুমি বিয়েতে কনেপণ কত?

পুরোনো রীতিতে কনেপণ ছিল 100 থেকে 120টি রুপার মুদ্রা, সঙ্গে মোরগ-মুরগি ও বল্লম — সংখ্যা উৎসভেদে আলাদা। রুপার মুদ্রা ও বল্লম অবৈধ হওয়ায় খুমী কুহুং সমিতি 2007 সালে টাকায় কনেপণ ঠিক করে: 10,000 টাকা, মায়ের ভাগ 1,000, ভাইয়ের ভাগ 1,000, বল্লমের বদলে 500 টাকা ও 17টি মোরগ-মুরগি; ফেব্রুয়ারি 2008-এ তা প্রথাগত আইন হিসেবে অনুমোদিত হয়।

খুমিরা কবে বাংলাদেশে এসেছেন?

উৎসভেদে সময় আলাদা। জুম ঈস্থেটিকস কাউন্সিলের “লাঙ” সংকলন লেখে আনুমানিক 1430 সালে বার্মায় গোষ্ঠী-সংঘাতের ফলে একটি অংশ বান্দরবানে আসে; বাংলাপিডিয়া হান্টারের বরাতে সতেরো শতকের শেষ দিক বলে। লেলুং খুমী একাধিক মত উদ্ধৃত করেন — সতেরো শতকের মাঝামাঝি, প্রথম বোমাং রাজার (1760) পরে, কিংবা চাকমা রানি কালিন্দীর আমলে।

মিয়ানমারে কত খুমি আছেন?

সংখ্যাটি নিয়ে উৎসে বড় ফারাক। লেলুং খুমী লেখেন চিন প্রদেশের পালেটওয়া অঞ্চলে এক লক্ষের বেশি খুমি থাকেন; 2004 সালের “লাঙ” সংকলন বাংলাদেশের বাইরের খুমি 70–80 হাজার বলে; ইংরেজি উইকিপিডিয়া পশ্চিম মিয়ানমারে প্রায় 14,000 লেখে। ভারতের মিজোরামেও প্রায় 3,000 খুমি আছেন বলে লেলুং খুমীর অনুমান।

খুমিদের শিক্ষার অবস্থা কেমন?

শিক্ষায় খুমিরা অনেক পিছিয়ে, তবে বদলাচ্ছে। 2004 সালের হিসাবে এসএসসি পাস ছিলেন 13 জন ও এইচএসসি 2 জন, কোনো স্নাতক ছিলেন না। bdnews24-এর অক্টোবর 2024-এর প্রতিবেদনে খুমি সোস্যাল কাউন্সিলের সভাপতি জানান, তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলেন 11 জন খুমি শিক্ষার্থী, আর সে বছর প্রথম খুমি ছাত্রী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

যা এখনো জানা যায়নি

  • খুমিদের প্রকৃত সংখ্যা — শুমারির 3,780, সংবাদে উদ্ধৃত 3,994 ও খুমি সোস্যাল কাউন্সিলের প্রায় 4,500-এর মধ্যে ব্যবধানের কারণ কোনো প্রকাশিত উৎসে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
  • সংবাদপত্রে “2022 সালের জনশুমারি অনুযায়ী 3,994” সংখ্যাটি BBS-এর কোন প্রকাশনা থেকে নেওয়া, তা জানা যায়নি; জাতীয় প্রতিবেদনের Table P29-এ সংখ্যাটি 3,780।
  • বাংলাদেশে খুমি গ্রামের বর্তমান সংখ্যা — লেলুং খুমীর 36টি গ্রামের হিসাব কোন সালের, তা লেখায় নেই; নতুন কোনো গ্রামভিত্তিক তালিকা পাওয়া যায়নি।
  • খুমিদের মধ্যে খ্রিস্টান, ক্রামা, প্রকৃতিপূজারি ও বৌদ্ধের বর্তমান অনুপাত — একমাত্র শতাংশ-হিসাব একজন লেখকের অনুমান, কোনো জরিপ নয়।
  • মিয়ানমারে খুমিদের সংখ্যা — এক লক্ষ, 70–80 হাজার না 14 হাজার — উৎসগুলো মেলেনি, আর কোনোটিই জরিপের সূত্র দেয় না।
  • খুমি ভাষার বাংলাদেশি উপভাষা দুটির পার্থক্য কী, আর ভাষা ইনস্টিটিউটের 2018 সালের জরিপের খুমি অংশে কী আছে — জরিপটি প্রকাশিত হয়েছে কি না, জানা যায়নি।
  • খুমী কুহুং সমিতি ও খুমি সোস্যাল কাউন্সিল একই সংগঠন কি না, কবে প্রতিষ্ঠিত — জানা যায়নি।
  • 2023–2024 সালের কেএনএফ-বিরোধী অভিযানে খুমি পাড়াগুলো সরাসরি কীভাবে প্রভাবিত হয়েছে, তার খুমি-নির্দিষ্ট কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
  • খুমি বর্ণমালার উৎপত্তি — কে, কবে তৈরি করেছেন — নিয়ে উৎসগুলোর সাল মেলে না।

তথ্যসূত্র

  1. লেলুং খুমী, “খুমী জাতির আদ্যোপান্ত”, জুমজার্নাল আর্কাইভ, প্রকাশ 2021। লিংক
  2. শান্তিময় চাকমা (সম্পা.), লাঙ — খুমী বিষয়ক বিশেষ সংকলন, জুম ঈস্থেটিকস কাউন্সিল (জাক), রাঙামাটি, এপ্রিল 2004 — পৃ. 4–30, 48–52। জুমজার্নাল ই-বুক লাইব্রেরি। লিংক
  3. David A. Peterson, “A brief introduction to Khumi”, লাঙ (জাক, 2004), পৃ. 48–52। লিংক
  4. সুগত চাকমা, বাংলাদেশের উপজাতি, বাংলা একাডেমি, ঢাকা; প্রথম প্রকাশ 1985, পুনর্মুদ্রণ 2000 — খুমি অধ্যায় পৃ. 71–73। জুমজার্নাল ই-বুক লাইব্রেরি। লিংক
  5. “খুমি জনগোষ্ঠীর বিবাহ (আইয়ুলানা)”, জুমজার্নাল আর্কাইভ (উৎস: পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন)। লিংক
  6. “খুমি জনগোষ্ঠীর উত্তরাধিকার (ঙাছাং)”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। লিংক
  7. “খুমি জনগোষ্ঠীর বিবাহ বিচ্ছেদ (আয়ু আখাইনা)”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। লিংক
  8. “প্রথাগত আইনে আদিবাসী খুমী নারীর অবস্থান”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। লিংক
  9. Bangladesh Bureau of Statistics, Population and Housing Census 2022, National Report Vol. I, Table P29 “Ethnic Population by Category, Sex and Division, 2022” (Internet Archive কপি)। লিংক
  10. Bangladesh Bureau of Statistics, Population and Housing Census 2022, District Report: Bandarban, Table P17, পৃ. 202–204 (Internet Archive কপি)। লিংক
  11. Bangladesh Bureau of Statistics, Population and Housing Census 2022, District Report: Rangamati, Table P17 (Internet Archive কপি)। লিংক
  12. Muhammad Abdul Baten, “Khumee”, Banglapedia, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি (শেষ সম্পাদনা 18 জুন 2021)। লিংক
  13. “Khumi people”, English Wikipedia (দেখা হয়েছে অক্টোবর 2026)। লিংক
  14. “Khumi language”, English Wikipedia (দেখা হয়েছে অক্টোবর 2026)। লিংক
  15. Hammarström, Forkel, Haspelmath ও Bank, “Khumi Chin (khum1248)”, Glottolog। লিংক
  16. “Dying in silence”, The Daily Star। লিংক
  17. “খুমি ভাষার প্রথম নাটক মঞ্চে”, bdnews24.com, 11 নভেম্বর 2022। লিংক
  18. “বান্দরবানের খুমী সম্প্রদায়ের ২ শিক্ষার্থী সরকারি দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি”, bdnews24.com, 18 আগস্ট 2023। লিংক
  19. “খুমি সম্প্রদায় থেকে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী তংসই”, bdnews24.com, 25 অক্টোবর 2024। লিংক
  20. উসিথোয়াই মারমা, “এক খুমী মায়ের সংগ্রাম: উচ্চ শিক্ষায় চার সন্তান”, bdnews24.com, 8 মার্চ 2026। লিংক
  21. প্রথম আলো, 28 জুলাই 2026: রুমার খুমি পাড়ায় হামে শিশুমৃত্যু নিয়ে প্রতিবেদন। লিংক
  22. “‘কেএনএফ ও জঙ্গি কার্যকলাপের সঙ্গে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠী জড়িত নয়’”, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 28 ডিসেম্বর 2022। লিংক

সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026

প্রসঙ্গ:আদিবাসী ভাষা, খুমি, খুমি জনগোষ্ঠী, বান্দরবান

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা