Last updated Oct 6th, 2026
0

পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনজন রাজা আছেন — চাকমা, বোমাং ও মং সার্কেলের প্রধান। বাংলায় তাঁদের প্রায়ই “রাজা” বলা হয়, ইংরেজি নথিতে Chief। কিন্তু ১৯০০ সালের শাসনবিধির পাঠ খুললে দেখা যায়, পদটির ক্ষমতা যতটা মনে হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি বাঁধা।
এই লেখাটি বিধির মূল পাঠ ধরে দেখছে চিফের অবস্থান ঠিক কোথায় — রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী, আর নিচের স্তরের উপর তাঁর কর্তৃত্ব কতটুকু।
সংক্ষেপে। চিফের অভিষেক নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। হেডম্যান নিয়োগে তাঁর পরামর্শ লাগে, কিন্তু জেলা প্রশাসক তা মানতে বাধ্য নন। জুম করের বড় অংশ তাঁর কাছে যায়, তবে জেলা প্রশাসক চাইলে তাঁকে বাদ দিয়ে সরাসরি আদায়ের নির্দেশ দিতে পারেন। প্রথাগত বিচারে তিনি আপিলের একটি স্তর, শেষ স্তর নন। আর আধুনিক আইনে তাঁর সবচেয়ে বড় ক্ষমতা একটিই — জাতিসত্তার সার্টিফিকেট, যা ছাড়া কেউ জেলা পরিষদের উপজাতীয় আসনে প্রার্থীই হতে পারেন না।
একটি পরিভাষাগত বিষয় শুরুতেই স্পষ্ট করা দরকার, কারণ এক পদকে চারটি দলিল চার নামে ডাকে।
| দলিল | ব্যবহৃত শব্দ |
|---|---|
| শাসনবিধি ১৯০০ (ইংরেজি মূল) | Chief |
| জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ | “সার্কেল চীফ” |
| পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭ | “রাজা” — চাকমা রাজা, বোমাং রাজা, মং রাজা |
| ভূমি কমিশন আইন ২০০১ | “সার্কেল চীফ” — চাকমা চীফ বা বোমাং চীফ বা মং চীফ |
দৈনন্দিন বাংলায় ‘রাজা’ শব্দটিই বেশি চলে, আর ১৯৯৭ সালের চুক্তিও সেটিই ব্যবহার করেছে। এই লেখায় আইনি প্রসঙ্গে ‘চিফ’ ও চুক্তির প্রসঙ্গে ‘রাজা’ — দলিল যেখানে যা লিখেছে, সেটিই রাখা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশাসনিকভাবে তিনটি সার্কেলে ভাগ — চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল ও মং সার্কেল। প্রতিটির একজন করে চিফ। শাসনবিধির ৩৫ বিধিতে সার্কেল-বিভাজনের বিধান, আর ৩৭ বিধিতে মৌজা।
নামগুলো লক্ষ করার মতো। সার্কেলের নাম এসেছে চিফের পরিচয় থেকে — চাকমা, বোমাং, মং। কিন্তু সার্কেল কোনো নৃগোষ্ঠীভিত্তিক এলাকা নয়, ভৌগোলিক। বোমাং সার্কেলে কেবল মারমারা থাকেন না, চাকমা সার্কেলে কেবল চাকমারা নন।
এই পার্থক্যটি ব্যবহারিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সার্কেল চিফের ক্ষমতা প্রয়োগ হয় এলাকা ধরে, জনগোষ্ঠী ধরে নয়। রাঙামাটিতে বসবাসকারী একজন খেয়াং বা পাংখোয়া প্রার্থীকে জাতিসত্তার সার্টিফিকেট নিতে হয় চাকমা চীফের কাছ থেকে — কারণ তিনি ওই সার্কেলের চিফ, ওই জনগোষ্ঠীর নন।
একইভাবে ভূমি কমিশনে কোন চিফ বসবেন, তা ঠিক হয় বিরোধীয় জমি কোন সার্কেলে পড়েছে তা দিয়ে — আবেদনকারী কোন জনগোষ্ঠীর, তা দিয়ে নয়।
সার্কেল ভৌগোলিক হওয়ার আরও একটি ফল: ফলে একটি সার্কেলে একাধিক জনগোষ্ঠীর মানুষ থাকেন, আর একই জনগোষ্ঠীর মানুষ একাধিক সার্কেলে ছড়িয়ে থাকতে পারেন। মারমা সমাজের উত্তরাধিকার-প্রথায় এই ভাগ স্পষ্ট দেখা যায় — বোমাং, মং ও চাকমা সার্কেলে বসবাসরত মারমাদের নিয়ম আলাদা করে বলা হয়।
চিফের ক্ষমতা নিয়ে যত কথা হয়, তার চেয়ে কম হয় তাঁর দায়িত্ব নিয়ে। অথচ শাসনবিধির ৩৮ বিধিতে সেটি বিস্তারিত লেখা, এবং প্রথম বাক্যটিই পদটির সাংবিধানিক অবস্থান ঠিক করে দেয়:
“The Circle-Chiefs shall form an Advisory Council to the Deputy Commissioner…”
শাসনবিধি ১৯০০, বিধি ৩৮
বাংলায় — সার্কেল চিফরা জেলা প্রশাসকের একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করবেন।
এটি ছোট কথা নয়। তিন চিফ মিলে যে সংস্থাটি তৈরি হয়, বিধির ভাষায় তা স্বাধীন কোনো কর্তৃপক্ষ নয় — জেলা প্রশাসকের উপদেষ্টা পরিষদ।
ধারাটি এরপর চিফদের কাজ গুনে গুনে বলে দেয়:
শেষ বাক্যটি বাংলায়: তাঁরা কখনোই জোর করে ‘নজর’ আদায় করতে পারবেন না, এবং মানুষকে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দিতে বাধ্য করতে পারবেন না।
বিধিমালায় এমন সরাসরি নিষেধাজ্ঞা বিরল। এর সঙ্গে ৪২(১১) বিধির আবওয়াব-নজর নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে পড়লে বোঝা যায়, বিধিপ্রণেতারা এই দুটি ঝুঁকি — অতিরিক্ত আদায় এবং বেগার শ্রম — সম্পর্কে সচেতন ছিলেন।
৩৮ বিধির পরের অনুচ্ছেদে হেডম্যানের কর্তব্য, আর সেখানে একটি বাক্য চিফের অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে: হেডম্যানরা জেলা প্রশাসক, সাব-ডিভিশনাল অফিসার ও চিফদের আদেশ মানবেন।
তালিকায় চিফের নাম আছে, কিন্তু তৃতীয় — প্রশাসনের দুই স্তরের পরে।
হেডম্যানদের আরও দায়িত্ব: নিজ মৌজার রাজস্ব সময়মতো আদায় ও হিসাবভুক্ত করা, মৌজার ভেতরে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা, এবং গ্রামের অবস্থান, জনসংখ্যা বা চাষের বিস্তারে কোনো পরিবর্তন হলে জেলা প্রশাসককে জানানো।
সার্কেলের আকার নিয়ে একটি নির্দিষ্ট হিসাব বিধিতে আছে, যা সাধারণত আলোচনায় আসে না।
৩৫ বিধি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গঠিত সংরক্ষিত বনাঞ্চল, তিন চিফের সার্কেল ও মাইনি উপত্যকা নিয়ে। অর্থাৎ সার্কেল তিনটি মিলেও গোটা জেলা নয় — বনাঞ্চল ও মাইনি উপত্যকা এর বাইরে।
৩৬ বিধিতে ১৮৯১ সালের আদমশুমারির জন্য ১৮৯০ সালে গঠিত ৩৩টি ব্লককে স্থায়ী বিভাগ করা হয়, নাম দেওয়া হয় তালুক। তিন সার্কেলে তাদের ভাগ:
| সার্কেল | তালুক |
|---|---|
| বোমাং সার্কেল | ১৮ |
| চাকমা চিফের সার্কেল | ৯ |
| মং চিফের সার্কেল | ৬ |
ঊনবিংশ শতকের শেষে বোমাং সার্কেলই ছিল সবচেয়ে বড় — ৩৩টির অর্ধেকেরও বেশি। এটি বর্তমান জনসংখ্যার হিসাব নয়, ১৮৯০ সালের প্রশাসনিক ব্লকের হিসাব; আজকের জেলা-সীমার সঙ্গে সরাসরি মেলানো যাবে না।
৩৭ বিধি অনুযায়ী বনাঞ্চলের বাইরের পুরো এলাকা মৌজায় বিভক্ত, আর মৌজার সীমানা নির্ধারণ করেছেন জেলা প্রশাসক — চিফ নন।
মাইনি উপত্যকার ব্যবস্থা আলাদা: ৩৮ বিধির শেষে বলা আছে, মাইনি উপত্যকা পরিচালিত হবে গভর্নরের সময়ে সময়ে জারি করা বিশেষ আদেশে।
সার্কেল-মৌজার কাঠামোই একমাত্র নয়। ৩৮ক বিধি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা তিনটি মহকুমায় বিভক্ত, আর প্রতিটির দায়িত্বে একজন সাব-ডিভিশনাল অফিসার, যিনি নিজের মহকুমার প্রশাসনের জন্য সরাসরি জেলা প্রশাসকের কাছে দায়ী।
বিধিতে মহকুমা তিনটির নাম — রাঙামাটি (বা সদর), রামগড় ও বান্দরবান।
ফলে একই ভূখণ্ডে দুটি সমান্তরাল প্রশাসনিক মানচিত্র: একটি সার্কেল-মৌজার, অন্যটি মহকুমার। প্রথমটির শীর্ষে চিফ, দ্বিতীয়টির শীর্ষে সাব-ডিভিশনাল অফিসার — আর দুটিই মেশে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে।
৩৮ বিধিতে হেডম্যানদের যে আদেশ মানার তালিকা, সেখানে সাব-ডিভিশনাল অফিসারের নামও আছে — চিফের আগে।

এখানেই পদটির আসল চরিত্র বোঝা যায়। ৪৮ বিধির প্রথম বাক্যটি সরাসরি — চিফের অভিষেক নিয়ন্ত্রণ করে সরকার (মূল পাঠে বেঙ্গল গভর্নমেন্ট)।
অর্থাৎ উত্তরাধিকারসূত্রে কেউ চিফ হলেও পদে বসার আনুষ্ঠানিকতা রাষ্ট্রের হাতে। পদটি প্রথাগত, কিন্তু স্বীকৃতিটি রাষ্ট্রীয়।
একই বিধির পরের অংশে হেডম্যান নিয়োগের কথা, আর সেখানে চিফের ভূমিকা আরও সীমিত: হেডম্যান নিয়োগ করেন জেলা প্রশাসক, চিফের সঙ্গে পরামর্শ করে। বরখাস্তের ক্ষেত্রেও একই — অযোগ্যতা বা অসদাচরণে জেলা প্রশাসক বরখাস্ত করতে পারেন, চিফের কাছে বিষয়টি পাঠানোর পর।
আর তারপরের বাক্যটিই নির্ণায়ক: জেলা প্রশাসক কোনো ক্ষেত্রেই চিফের ইচ্ছা মানতে বাধ্য নন, যদিও সেই ইচ্ছাকে পূর্ণ বিবেচনায় নিতে হবে।
চিফের আয়ের কাঠামোটি বিধিতে নির্দিষ্ট, আর তা হেডম্যানের মাধ্যমে আসে।
জুম কর। জুমচাষি পরিবার কর দেয় মৌজা হেডম্যানকে (৪২ বিধি)। হেডম্যান সেই করের অন্তত অর্ধেক চিফকে পরিশোধ করেন, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে। কর বকেয়া হলে জেলা প্রশাসক পর্যন্ত বিষয়টি যায়, আর খেলাপি হেডম্যানের কথা তাঁকে জানাতে হয়।
খাজনা। ৪৩ বিধিতে হেডম্যান প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা তুলে জমা দেন সাব-ডিভিশনাল অফিসার বা জেলা প্রশাসকের কাছে। তবে বাগানজমির খাজনা করের আওতায় এলে চিফ ও হেডম্যান সেই অনুপাতেই অংশ পান, যে অনুপাতে তাঁরা ওই জমির জুম থেকে পেতেন (৪৩(২))। অর্থাৎ ভূমির ব্যবহার বদলালেও দুই পদের প্রাপ্য অনুপাত অপরিবর্তিত থাকে — এটি দুজনের পরস্পর-সমান ভাগ নয়।
খাজনা আদায়ের জন্য হেডম্যান কমিশন পান, তবে বাগানজমির ক্ষেত্রে সেই কমিশন প্রযোজ্য নয় (৪৩(১))। আর হাল ও বাগানজমির খাজনা মওকুফ করতে পারেন কেবল জেলা প্রশাসক, লিখিত কারণসহ (৪৩(৩))।
৪৭ বিধির শিরোনাম “Khas mauza of Chiefs”, আর ভেতরের বিধানটি এই পদের অর্থনীতি বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ।
কমিশনারের অনুমোদন নিয়ে একজন সার্কেল চিফ তাঁর সার্কেলের এক বা একাধিক মৌজা নিজের খাস মৌজা হিসেবে রাখতে পারেন। সেক্ষেত্রে চিফ হিসেবে প্রাপ্য পারিশ্রমিকের অতিরিক্ত তিনি হেডম্যানের জন্য নির্ধারিত সব পারিশ্রমিকও পান।
শর্ত একটাই — হেডম্যান ও মৌজা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের যথাযথ ব্যবস্থা তাঁকে করতে হবে।
এর একটি ফল আছে যা সাধারণত আলোচনায় আসে না। খাস মৌজায় চিফ ও হেডম্যান একই ব্যক্তি হয়ে যান, ফলে হেডম্যানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চিফের কাছে নালিশের পথটি সেখানে কার্যত থাকে না।
৪২ বিধির বারোটি উপবিধিতে চিফের ভূমিকা কয়েক জায়গায় নির্দিষ্ট, আর সেগুলো একসঙ্গে দেখলে ছবিটি সম্পূর্ণ হয়।
বকেয়া জেলা প্রশাসক আদায় করলে হিসাবটি বদলায়: আদায় খরচ ও হেডম্যানের অংশের এক-চতুর্থাংশ প্রাদেশিক রাজস্বে যায়, বাকিটা চিফের কাছে (৪২(৭))।
৪২(৮) বিধিতে একটি ক্ষমতা আছে, যা এই পুরো শৃঙ্খলটিকে স্থগিত করতে পারে।
লিখিতভাবে কারণ লিপিবদ্ধ করে এবং সংশ্লিষ্ট চিফকে জানিয়ে জেলা প্রশাসক নির্দেশ দিতে পারেন যে, হেডম্যান বা সরাসরি জুমিয়ারা জুম কর তাঁকেই দেবেন, চিফকে নয়।
এমন নির্দেশ হলে জেলা প্রশাসক হেডম্যানের অংশ বাদ দিয়ে পুরো টাকা চিফকে দেন, আর হেডম্যানের অংশ থেকে আগে সরকারের পাওনা, তারপর চিফের পাওনা মিটিয়ে অবশিষ্টটুকু তাঁকে দেন।
বিধানটি দেখায়, চিফের রাজস্ব-ভূমিকা অলঙ্ঘনীয় প্রথাগত অধিকার নয় — এটি একটি ব্যবস্থা, যা কারণ দেখিয়ে বদলে দেওয়া যায়।
৪২(১১) বিধিতে একটি স্পষ্ট নিষেধ: হেডম্যান ও চিফ জুমিয়া বা অন্য প্রজাদের কাছ থেকে কোনো আবওয়াব, নজর বা অন্য কোনো আদায় নিতে পারবেন না — ব্যতিক্রম কেবল যা প্রথাসিদ্ধ ও অসন্তোষের কারণ হয় না, অথবা প্রাদেশিক সরকার বিশেষভাবে অনুমোদন করেছে।
৪৯ বিধিতে চিফের হাতে একটি কঠিন ক্ষমতা দেওয়া আছে। এক সার্কেল থেকে অন্য সার্কেলে চাষি প্রজাদের স্থানান্তর নিরুৎসাহিত করতে হবে, আর কেউ পাওনা না মিটিয়ে যেতে চাইলে চিফ ও হেডম্যান জেলা প্রশাসকের আদেশ না আসা পর্যন্ত সেই ব্যক্তির দেহ ও সম্পত্তি উভয়ই আটকে রাখতে পারেন।
ইংরেজি পাঠে detain the persons and property — কেবল সম্পত্তি নয়। আর যিনি পালিয়ে যান, তিনি পাওনা না মেটানো পর্যন্ত ওই সার্কেলে আর বসতি করতে পারবেন না।
৪৮ বিধির শেষ বাক্যটি চিফের নয়, হেডম্যানের নিয়োগ নিয়ে — তবু এখানে উল্লেখযোগ্য, কারণ এটিই প্রথাগত পদের উত্তরাধিকার নিয়ে বিধির একমাত্র স্পষ্ট বক্তব্য:
“This appointment is not hereditary, but a son, when competent, may be appointed to succeed his father.”
শাসনবিধি ১৯০০, বিধি ৪৮
বাংলায় — এই নিয়োগ বংশানুক্রমিক নয়, তবে যোগ্য হলে পুত্র পিতার স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন।
চিফের ক্ষেত্রে বিধিটি এতটা স্পষ্ট নয় — সেখানে কেবল বলা আছে অভিষেক সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। চিফ পদের উত্তরাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হয়, তার কোনো নিয়ম ৪৮ বিধিতে লেখা নেই। [যাচাই প্রয়োজন]
১৯০০ সালের বিধি ছাড়াও পরবর্তী তিনটি আইনে সার্কেল চিফের নির্দিষ্ট ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। এগুলো একসঙ্গে না দেখলে পদটির বর্তমান অবস্থান বোঝা যায় না।
১৯৮৯ সালের তিনটি জেলা পরিষদ আইনের ২ ধারায় সংজ্ঞা দেওয়া আছে, আর সেখান থেকেই সার্কেল ও জেলার মিল স্পষ্ট হয়:
| জেলা | আইনে ‘সার্কেল চীফ’ অর্থ |
|---|---|
| রাঙামাটি | চাকমা চীফ |
| খাগড়াছড়ি | মং চীফ |
| বান্দরবান | বোমাং চীফ |
এটি সম্ভবত আধুনিক আইনে চিফকে দেওয়া সবচেয়ে বড় ক্ষমতা, এবং এটি নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তিনটি জেলা পরিষদ আইনেরই ৪(৫) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি উপজাতীয় কি না এবং হলে তিনি কোন উপজাতির সদস্য, তা স্থির করেন জেলার সার্কেল চীফ। আর তাঁর দেওয়া সার্টিফিকেট ছাড়া কেউ উপজাতীয় হিসেবে চেয়ারম্যান বা কোনো উপজাতীয় সদস্যপদের প্রার্থী হতে পারবেন না।
ফলে জেলা পরিষদের আসন-বণ্টন যতই আইনে লেখা থাকুক, ওই আসনে দাঁড়ানোর প্রথম দরজাটি খোলেন সার্কেল চিফ। রাঙামাটিতে মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখোয়া বা খেয়াং — সব প্রার্থীকেই সার্টিফিকেট নিতে হয় চাকমা চীফের কাছ থেকে, কারণ ওই জেলার সার্কেল চীফ তিনিই।
রাঙামাটির আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী চাকমা সার্কেলের চীফ এবং বোমাং সার্কেলের চীফ ইচ্ছা করলে বা আমন্ত্রিত হলে পরিষদের যেকোনো সভায় যোগ দিতে পারেন এবং যেকোনো আলোচ্য বিষয়ে মতামত দিতে পারেন।
ধারাটিতে ভোটাধিকারের কথা নেই — উপস্থিতি ও মতামতের অধিকার, সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়ার নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এর ৩(২)(ঘ) ধারা অনুযায়ী কমিশনের পাঁচ সদস্যের একজন সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ বা তাঁর মনোনীত একজন প্রতিনিধি।
ওই আইনের ২(ঠ) ধারায় ‘সার্কেল চীফ’-এর সংজ্ঞা — চাকমা চীফ বা বোমাং চীফ বা মং চীফ। আর ‘সংশ্লিষ্ট’ মানে বিরোধীয় ভূমি যে সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত, সেই সার্কেল।
এখানে চিফের ভূমিকা কেবল পরামর্শমূলক নয় — তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সদস্য, আর সেই সিদ্ধান্ত দেওয়ানি আদালতের ডিক্রির মর্যাদা পায় এবং তার বিরুদ্ধে আপিল চলে না।
প্রথাগত বিচারব্যবস্থায় চিফ সবচেয়ে উপরের স্তর। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ — বিবাহবিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, উত্তরাধিকার — এসব প্রথমে কার্বারি, তারপর হেডম্যান, আর শেষে চিফের আদালতে যায়।
আর্কাইভের প্রথাগত-আইন পোস্টগুলোতে এই ক্রমটি বারবার আসে। খিয়াং সমাজের উত্তরাধিকারের বিবরণে যেমন বলা আছে, হেডম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, কার্বারি বা পৌর চেয়ারম্যান সার্কেল চিফের কাছ থেকে মতামত ও সুপারিশ নিয়ে এগোন, আর সংশ্লিষ্ট জেলার দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে উত্তরাধিকার নির্ধারণের কাজ হয়।
অর্থাৎ চিফের সিদ্ধান্ত প্রথাগত ক্ষেত্রে ওজনদার, কিন্তু সেটিও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরেই কাজ করে।
এই ক্রমটি কেবল প্রথা নয় — ১৯৮৯ সালের জেলা পরিষদ আইনগুলোর ৬৬ ধারায় তা লিখিতভাবে দেওয়া। উপজাতীয়দের মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা উপজাতীয় বিষয়ে বিরোধ হলে প্রথমে যেতে হয় স্থানীয় কার্বারি বা হেডম্যানের কাছে, যিনি প্রচলিত রীতি-নীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করবেন।
তবে তিন জেলায় সিঁড়িটি হুবহু এক নয়।
| স্তর | রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি | বান্দরবান |
|---|---|---|
| ১ | কার্বারি বা হেডম্যান | কার্বারি |
| ২ | সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ | হেডম্যান |
| ৩ | চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার (চূড়ান্ত) | বোমাং চীফ |
| ৪ | — | চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার (চূড়ান্ত) |
রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির আইনে কার্বারি ও হেডম্যান একই স্তরে; বান্দরবানের আইনে কার্বারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল যায় হেডম্যানের কাছে, তারপর বোমাং চীফের কাছে। অর্থাৎ বান্দরবানে ধাপ একটি বেশি।
তিন জেলাতেই শেষ ধাপ একই — চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার, এবং তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে শর্ত আছে: আপিল নিষ্পত্তির আগে তাঁকে সংশ্লিষ্ট উপজাতি থেকে তাঁর মনোনীত অন্তত তিনজন উপজাতীয় বিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।
এই ব্যবস্থাটির অর্থ পরিষ্কার: প্রথাগত আইনের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা একজন সরকারি কর্মকর্তার হাতে — সার্কেল চিফের নয়। চিফ আপিলের একটি স্তর, শেষ স্তর নন।
আর ৬৬(৪) ধারা অনুযায়ী জেলা পরিষদ প্রবিধান দ্বারা এই বিরোধ নিষ্পত্তির বিচার পদ্ধতি এবং বিচারপ্রার্থী ও আপিলকারীর দেয় ফিস নির্ধারণ করতে পারে — অর্থাৎ চিফের আদালতের পদ্ধতি ও ফি ঠিক করার ক্ষমতাও একটি নির্বাচিত পরিষদের হাতে।
চুক্তির (ঘ)১৯ দফায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে, যার মন্ত্রী হবেন উপজাতীয়দের মধ্য থেকে। সেই মন্ত্রণালয়কে সহায়তার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটির তালিকাও দেওয়া আছে, আর সেই বারো সদস্যের তালিকায় তিন রাজাই আছেন:
| ক্রম | সদস্য |
|---|---|
| ১ | পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী |
| ২ | চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদ |
| ৩–৫ | চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি — রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ |
| ৬–৮ | সাংসদ — রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান |
| ৯ | চাকমা রাজা |
| ১০ | বোমাং রাজা |
| ১১ | মং রাজা |
| ১২ | সরকার-মনোনীত তিনজন অ-উপজাতীয় স্থায়ী অধিবাসী |
দুটি জিনিস লক্ষণীয়। প্রথমত, চুক্তির নিজের ভাষায় এখানে ‘রাজা’ শব্দটিই ব্যবহৃত — ‘চীফ’ নয়। ১৯০০ সালের বিধিতে ইংরেজি Chief, ১৯৮৯ সালের আইনে ‘সার্কেল চীফ’, আর ১৯৯৭ সালের চুক্তিতে ‘রাজা’।
দ্বিতীয়ত, তাঁরা এখানে পদাধিকারবলে — নির্বাচিত নন, মনোনীতও নন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের (পরিষদ চেয়ারম্যান, সাংসদ) পাশে তিনজন প্রথাগত পদাধিকারীকে সরাসরি জাতীয় নীতি-পরামর্শের টেবিলে বসানো হয়েছে।
এই উপদেষ্টা কমিটি বাস্তবে গঠিত হয়েছে কি না বা কতবার বসেছে, তার কোনো নথি এই কাজে ব্যবহার করা হয়নি। [যাচাই প্রয়োজন]
ক্ষমতার তালিকা যত লম্বাই হোক, অনুপস্থিতিগুলোও সমান তথ্যবহুল।
আঞ্চলিক পরিষদে আসন নেই। ১৯৯৮ সালের আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ৫ ধারায় ২৫টি পদের তালিকায় সার্কেল চিফের কোনো পদ নেই। জেলা পরিষদের তিন চেয়ারম্যান পদাধিকারবলে সদস্য ও ভোটাধিকারসহ; তিন চিফ নন।
তুলনাটি স্পষ্ট: জেলা পরিষদের সভায় চিফ বসতে পারেন কিন্তু ভোট নেই; আঞ্চলিক পরিষদে বসার বিধানও নেই।
হেডম্যান নিয়োগে চূড়ান্ত কথা নয়। ৪৮ বিধিতে পরামর্শের অধিকার আছে, সিদ্ধান্তের নয় — আর জেলা প্রশাসক চিফের ইচ্ছা মানতে বাধ্য নন।
প্রথাগত বিচারে শেষ কথা নয়। ৬৬(৩) ধারায় চিফের সিদ্ধান্তের উপরেও বিভাগীয় কমিশনারের আপিল-এখতিয়ার।
জুম করে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নয়। ৪২(৮) বিধিতে জেলা প্রশাসক চিফকে বাদ দিয়ে সরাসরি আদায়ের নির্দেশ দিতে পারেন।
তালিকাটি একটি ধরন দেখায়: প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে চিফের ভূমিকা আছে, কিন্তু প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই তা শেষ ভূমিকা নয়।
| পদ | কে বসান | আয় |
|---|---|---|
| সার্কেল চিফ | অভিষেক সরকার-নিয়ন্ত্রিত (৪৮) | জুম করের অন্তত অর্ধেক; বাগানজমির খাজনার অংশ; খাস মৌজা (৪৭) |
| মৌজা হেডম্যান | জেলা প্রশাসক, চিফের পরামর্শে (৪৮) | আদায়ের পারিশ্রমিক ও খাজনামুক্ত জমি (৪৬); বর্তমানে মাসিক ভাতা |
| কার্বারি | বিধিতে নেই | মাসিক ভাতা, হেডম্যানের চেয়ে কম |
ছকটি একটি জিনিস পরিষ্কার করে: প্রথাগত পদ তিনটির কোনোটিই রাষ্ট্রের বাইরে নয়। উপরের দুটির নিয়োগ বা স্বীকৃতি রাষ্ট্রের হাতে, আর নিচেরটির অস্তিত্ব বিধিতেই নেই — সেটি চলে প্রথা ও প্রশাসনিক অভ্যাসে।
তিনটি — চাকমা, বোমাং ও মং। প্রতিটির একজন করে চিফ, যাঁদের বাংলায় প্রায়ই রাজা বলা হয়।
৪৮ বিধি অনুযায়ী চিফের অভিষেক সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। পদটি প্রথাগত হলেও স্বীকৃতিটি রাষ্ট্রীয়।
না। হেডম্যান নিয়োগ ও বরখাস্ত করেন জেলা প্রশাসক, চিফের সঙ্গে পরামর্শ করে। বিধিতে স্পষ্ট, জেলা প্রশাসক চিফের ইচ্ছা মানতে বাধ্য নন।
জুমচাষি পরিবার কর দেয় মৌজা হেডম্যানকে, আর হেডম্যান সেই করের অন্তত অর্ধেক চিফকে পরিশোধ করেন (৪২ বিধি)।
৩৮ বিধি অনুযায়ী সার্কেল চিফরা জেলা প্রশাসকের একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। তাঁদের দায়িত্ব — সার্কেলের প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়ে জেলা প্রশাসককে তথ্য ও পরামর্শ দেওয়া, তাঁর সব আদেশ মৌজাগুলোতে দ্রুত কার্যকর করা, সার্কেল পরিদর্শন করে হেডম্যানদের কাজ তদারক করা, এবং শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রভাব ব্যবহার করা।
না। ৩৮ বিধির শেষ বাক্যে স্পষ্ট নিষেধ — চিফরা কখনোই জোর করে ‘নজর’ আদায় করতে পারবেন না, এবং মানুষকে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দিতে বাধ্য করতে পারবেন না। এর সঙ্গে ৪২(১১) বিধিও মেলে, যেখানে হেডম্যান ও চিফের আবওয়াব-নজর গ্রহণ নিষিদ্ধ।
না। ৩৬ বিধি অনুযায়ী ১৮৯০ সালে গঠিত ৩৩টি তালুকের ভাগ ছিল — বোমাং সার্কেল ১৮, চাকমা চিফের সার্কেল ৯, মং চিফের সার্কেল ৬। এটি ঊনবিংশ শতকের প্রশাসনিক ব্লকের হিসাব, বর্তমান জনসংখ্যা বা জেলা-সীমার হিসাব নয়। মৌজার সীমানা নির্ধারণ করেছেন জেলা প্রশাসক, চিফ নন (৩৭ বিধি)।
পারেন। ৪৭ বিধি অনুযায়ী কমিশনারের অনুমোদন নিয়ে একজন সার্কেল চিফ তাঁর সার্কেলের এক বা একাধিক মৌজা নিজের খাস মৌজা হিসেবে রাখতে পারেন, এবং সেক্ষেত্রে চিফ হিসেবে প্রাপ্য পারিশ্রমিকের অতিরিক্ত হেডম্যানের জন্য নির্ধারিত সব পারিশ্রমিকও পান। শর্ত হলো হেডম্যান ও মৌজা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের যথাযথ ব্যবস্থা তাঁকে করতে হবে।
১৯৮৯ সালের জেলা পরিষদ আইনগুলোর ২ ধারার সংজ্ঞা অনুযায়ী রাঙামাটির সার্কেল চীফ চাকমা চীফ, খাগড়াছড়ির মং চীফ এবং বান্দরবানের বোমাং চীফ। ভূমি কমিশন আইনের ২(ঠ) ধারাতেও একই তিনজন — চাকমা চীফ বা বোমাং চীফ বা মং চীফ।
সার্কেল চীফ। তিনটি জেলা পরিষদ আইনেরই ৪(৫) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি উপজাতীয় কি না এবং হলে কোন উপজাতির, তা স্থির করেন জেলার সার্কেল চীফ — এবং তাঁর সার্টিফিকেট ছাড়া কেউ উপজাতীয় হিসেবে চেয়ারম্যান বা উপজাতীয় সদস্যপদের প্রার্থী হতে পারেন না।
হ্যাঁ। ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এর ৩(২)(ঘ) ধারা অনুযায়ী কমিশনের পাঁচ সদস্যের একজন সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ বা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধি। এখানে তাঁর ভূমিকা পরামর্শমূলক নয় — তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সদস্য।
না। ১৯৮৯ সালের জেলা পরিষদ আইনগুলোর ৬৬(৩) ধারা অনুযায়ী সার্কেল চীফের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের কাছে আপিল করা যায়, এবং তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে সিদ্ধান্তের আগে তাঁকে সংশ্লিষ্ট উপজাতির অন্তত তিনজন মনোনীত বিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করতে হয়।
রাঙামাটির আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী চাকমা সার্কেলের চীফ ও বোমাং সার্কেলের চীফ ইচ্ছা করলে বা আমন্ত্রিত হলে পরিষদের যেকোনো সভায় যোগ দিতে পারেন এবং যেকোনো আলোচ্য বিষয়ে মতামত দিতে পারেন। ধারাটিতে ভোটাধিকারের কোনো উল্লেখ নেই।
পারেন। ৪২(৮) বিধি অনুযায়ী লিখিতভাবে কারণ লিপিবদ্ধ করে এবং সংশ্লিষ্ট চিফকে জানিয়ে জেলা প্রশাসক নির্দেশ দিতে পারেন যে হেডম্যান বা সরাসরি জুমিয়ারা জুম কর তাঁকেই দেবেন, চিফকে নয়। অর্থাৎ চিফের রাজস্ব-ভূমিকা একটি ব্যবস্থা, অলঙ্ঘনীয় অধিকার নয়।
৪৯ বিধি অনুযায়ী কোনো চাষি প্রজা পাওনা না মিটিয়ে অন্য সার্কেলে চলে যেতে চাইলে চিফ ও হেডম্যান জেলা প্রশাসকের আদেশ না আসা পর্যন্ত সেই ব্যক্তির দেহ ও সম্পত্তি আটকে রাখতে পারেন। ইংরেজি পাঠে শব্দগুলো detain the persons and property।
আইনি কাঠামোর বিবরণ পড়ে যা কাজে লাগে, তা হলো — কোন বিষয়ে কার কাছে যেতে হবে। ধারাগুলো মিলিয়ে ছকটি এরকম দাঁড়ায়।
| বিষয় | প্রথমে কোথায় | তারপর |
|---|---|---|
| সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা উপজাতীয় বিরোধ | কার্বারি বা হেডম্যান | সার্কেল চীফ → বিভাগীয় কমিশনার |
| জাতিসত্তার সার্টিফিকেট | সার্কেল চীফ | আইনে আপিলের বিধান নেই |
| জুম কর বা তার অব্যাহতি | মৌজা হেডম্যান | চিফ → জেলা প্রশাসক |
| ভূমি-বিরোধ (অবৈধ বন্দোবস্ত, বেদখল) | ভূমি কমিশন — যেখানে চিফ একজন সদস্য | আপিল নেই |
| জমি বেচাকেনা বা বন্দোবস্তের অনুমোদন | জেলা পরিষদ | — |
| বসতভিটার জন্য ০.৩০ একর পর্যন্ত জমি | মৌজা হেডম্যান | বেশি হলে জেলা প্রশাসক |
ছকটি দেখায়, চিফের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে মূলত দুটি কারণে — প্রথাগত বিরোধের আপিলে, আর জাতিসত্তার সার্টিফিকেটের জন্য। দৈনন্দিন ভূমি বা করের প্রশ্নে প্রথম দরজা হেডম্যানের, শেষ দরজা প্রশাসনের।
তিন স্তরের সম্পর্কটি একমুখী নয় — কয়েকটি জায়গায় চিফ উপরে, কয়েকটিতে পাশে, আর একটি জায়গায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
রাজস্বে। হেডম্যান জুম কর তুলে চিফকে দেন, আর চিফ সরকারকে। হেডম্যানের হিসাব ঠিক আছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়ও চিফের (৪২(৫))। খেলাপি হেডম্যানের নাম চিফই জেলা প্রশাসককে জানান।
বিচারে। হেডম্যানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল চিফের কাছে (৬৬(২))।
নিয়োগে। হেডম্যান নিয়োগ ও বরখাস্তে চিফ কেবল পরামর্শ দেন। সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসকের, আর তিনি চিফের ইচ্ছা মানতে বাধ্য নন (৪৮)।
খাজনায়। বাগানজমির খাজনায় চিফ ও হেডম্যান দুজনেই অংশ পান, সেই অনুপাতে যা তাঁরা ওই জমির জুম থেকে পেতেন (৪৩(২))।
কার্বারির নিয়োগে। শাসনবিধিতে কার্বারি পদের কোনো বিধান নেই — নিয়োগ, মেয়াদ, অপসারণ, পারিশ্রমিক কিছুই নয়। অথচ ১৯৮৯ সালের জেলা পরিষদ আইনের ৬৬ ধারায় কার্বারিকে প্রথম স্তরের বিচারক হিসেবে নাম ধরে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
ফলে যে স্তরে সবচেয়ে বেশি বিচার হয়, সেটির নিয়োগ-পদ্ধতি কোনো আইনেই লেখা নেই। বান্দরবানের আইনে কার্বারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হেডম্যানের কাছে আপিলের বিধান আছে, কিন্তু কার্বারি কে হবেন তা সেখানেও বলা নেই।
এই ফাঁকটি চিফের ক্ষমতার প্রশ্নেও প্রাসঙ্গিক। কার্বারি নিয়োগে চিফের কোনো আইনি ভূমিকা আছে কি না — শাসনবিধি বা তিনটি জেলা পরিষদ আইনের যে অংশগুলো এই কাজে পড়া হয়েছে, তাতে তার উত্তর নেই। [যাচাই প্রয়োজন]
শাসনবিধির ৪২ বিধিতে তারিখগুলো ছড়ানো, কিন্তু চিফের দিক থেকে সাজালে একটি পূর্ণ রাজস্ব-বর্ষপঞ্জি দাঁড়ায়।
| তারিখ | চিফের দিক থেকে কী ঘটে | বিধি |
|---|---|---|
| পুণ্যাহ দিবস | হেডম্যানরা জুম করের অন্তত অর্ধেক চিফকে দেন | ৪২(৬) |
| ১৫ জানুয়ারির আগে | বাকি টাকা, বকেয়া তালিকা ও রসিদের মুড়ি চিফের কাছে জমা | ৪২(৬) |
| ৩১ জানুয়ারির মধ্যে | চিফ খেলাপি হেডম্যানের নাম জেলা প্রশাসককে জানান | ৪২(৬) |
| ৩১ মার্চের মধ্যে | চিফ সরকারের পাওনা পরিশোধ করেন | ৪২(৯) |
| ১ জুনের আগে | হেডম্যানরা জুম তৌজি চিফের কাছে পাঠান | ৪২(৫) |
| ১ আগস্টের আগে | চিফ সব তৌজি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠান | ৪২(৫) |
| ১৫ অক্টোবরের আগে | চিফ অব্যাহতিপ্রাপ্তদের তালিকা জেলা প্রশাসকের অনুমোদনে পাঠান | ৪২(২) |
ছকটি একটি জিনিস স্পষ্ট করে। চিফের বছরের প্রতিটি নির্দিষ্ট তারিখেই কিছু না কিছু জেলা প্রশাসকের দিকে যায় — নাম, তালিকা, তৌজি বা টাকা। পদটি রাজস্ব-শৃঙ্খলের মাঝখানের একটি ধাপ, আর সেই শৃঙ্খলের শেষ প্রান্ত প্রশাসনে।
এর সঙ্গে যোগ করতে হয় দায়িত্বও: প্রতিটি হেডম্যান যেন সঠিক হিসাব রাখেন এবং মুড়িসহ ছাপা রসিদ দেন — তা নিশ্চিত করার দায় চিফের (৪২(৫))।
| বিষয় | চিফের ভূমিকা | কে চূড়ান্ত | উৎস |
|---|---|---|---|
| নিজের অভিষেক | — | সরকার | বিধি ৪৮ |
| হেডম্যান নিয়োগ ও বরখাস্ত | পরামর্শ | জেলা প্রশাসক (চিফের ইচ্ছা মানতে বাধ্য নন) | বিধি ৪৮ |
| জুম কর | অর্ধেকের বেশি গ্রহণ, তৌজি প্রেরণ | জেলা প্রশাসক (৪২(৮)-এ বাদ দিতে পারেন) | বিধি ৪২ |
| জুম কর অব্যাহতি | ঘোষণা করেন | জেলা প্রশাসকের অনুমোদন | বিধি ৪২(২) |
| খাস মৌজা | রাখতে পারেন, হেডম্যানের পারিশ্রমিকসহ | কমিশনারের অনুমোদন | বিধি ৪৭ |
| খেলাপি প্রজা আটক | দেহ ও সম্পত্তি আটকাতে পারেন | জেলা প্রশাসকের আদেশ | বিধি ৪৯ |
| জাতিসত্তার সার্টিফিকেট | একাই স্থির করেন | আপিলের বিধান আইনে নেই | জেলা পরিষদ আইন ৪(৫) |
| প্রথাগত বিচারে আপিল | একটি স্তর | বিভাগীয় কমিশনার | জেলা পরিষদ আইন ৬৬(৩) |
| জেলা পরিষদের সভা | যোগ দিতে ও মতামত দিতে পারেন | ভোটাধিকার নেই | জেলা পরিষদ আইন ২৬ |
| ভূমি কমিশন | সিদ্ধান্তদানকারী সদস্য | কমিশনের সিদ্ধান্ত, আপিল নেই | কমিশন আইন ৩(২)(ঘ) |
| আঞ্চলিক পরিষদ | কোনো পদ নেই | — | আঞ্চলিক পরিষদ আইন ৫ |
| মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটি | পদাধিকারবলে সদস্য | পরামর্শমূলক | চুক্তি (ঘ)১৯ |
এগারো সারির ছকে দুটি জায়গায় চিফের ভূমিকা নিরঙ্কুশের কাছাকাছি — জাতিসত্তার সার্টিফিকেট এবং ভূমি কমিশনের সদস্যপদ। বাকি সব জায়গায় তিনি পরামর্শদাতা, একটি স্তর, বা অনুপস্থিত।
আর ঐতিহাসিকভাবে যা বদলেছে তা হলো, ১৯০০ সালের বিধিতে চিফের ক্ষমতা ছিল মূলত রাজস্ব-কেন্দ্রিক; ১৯৮৯ ও ২০০১ সালের আইনে তা হয়েছে পরিচয় ও ভূমি-কেন্দ্রিক। জুম করের হিসাব যত অপ্রাসঙ্গিক হয়েছে, সার্টিফিকেট ও ভূমি-বিরোধের ভূমিকা তত বেড়েছে।
চারটি দলিল একসঙ্গে পড়লে পদটির একটি রূপান্তর চোখে পড়ে।
১৯০০ সালে চিফ ছিলেন মূলত একজন রাজস্ব-কর্মকর্তা ও তত্ত্বাবধায়ক — জুম কর সংগ্রহ করে সরকারকে দেওয়া, হেডম্যানদের কাজ তদারক করা, জেলা প্রশাসকের আদেশ মৌজায় কার্যকর করা, আর তাঁর উপদেষ্টা পরিষদে বসা। বিধির ভাষায় তাঁর প্রায় প্রতিটি কাজেরই অন্য প্রান্তে জেলা প্রশাসক।
১৯৮৯ সালে নির্বাচিত জেলা পরিষদ তৈরি হওয়ার পর উন্নয়ন ও স্থানীয় শাসনের ভার গেল সেই পরিষদের হাতে। চিফ সেখানে সভায় বসার অধিকার পেলেন, ভোট নয়। কিন্তু একই আইনে তাঁকে দেওয়া হলো একটি সম্পূর্ণ নতুন ক্ষমতা — জাতিসত্তার সার্টিফিকেট, যা ছাড়া কেউ উপজাতীয় আসনে প্রার্থী হতে পারেন না।
১৯৯৭ সালের চুক্তিতে তিন রাজা পেলেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটিতে পদাধিকারবলে আসন — নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পাশে।
২০০১ সালে ভূমি কমিশনে চিফ হলেন সিদ্ধান্তদানকারী সদস্য, আর সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল নেই।
অর্থাৎ পদটি দুর্বল হয়নি, বরং ভিন্ন ধরনের ক্ষমতায় সরে গেছে। জুম করের হিসাব যত কম গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে, ততই বেড়েছে দুটি জিনিসে চিফের ভূমিকা — কে কোন জনগোষ্ঠীর, সেই সিদ্ধান্ত, আর জমি কার, সেই সিদ্ধান্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুটি সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্নই এই দুটি।
এই ব্যাখ্যাটি চারটি দলিলের পাঠ মিলিয়ে করা — কোনো দলিলে এভাবে বলা নেই।
এটি আইন ও চুক্তি কী বলে তার বিবরণ, বাস্তবে কী ঘটে তার নয়। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম, দায়িত্বকাল বা সিদ্ধান্তের উল্লেখ এখানে নেই, কারণ যাচাইযোগ্য উৎস ব্যবহার করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত, রাজপুণ্যাহ — খাজনা আদায়ের যে বার্ষিক অনুষ্ঠান চিফের সবচেয়ে দৃশ্যমান ভূমিকা — সে বিষয়ে পূর্ণ বিবরণ দেওয়ার মতো উৎস এই কাজে পাওয়া যায়নি। ৪২(৬) বিধিতে ‘পুণ্যাহ দিবস’ একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা হিসেবে আছে, ততটুকুই এখানে ব্যবহার করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, চিফ পদের উত্তরাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হয় — কোন প্রথা, কোন নিয়ম — তার কোনো লিখিত বিধান শাসনবিধিতে পাওয়া যায়নি। ৪৮ বিধি কেবল বলে অভিষেক সরকার নিয়ন্ত্রণ করে।
পদ্ধতি সম্পর্কে। শাসনবিধি ১৯০০-এর উদ্ধৃতিগুলো সংশোধনীসহ সংকলিত পাঠ থেকে; ৪২ বিধি ১৯৩৮–১৯৪৪ সালের একাধিক প্রজ্ঞাপনে সংশোধিত হয়েছে। ১৯৮৯ ও ২০০১ সালের আইনের উদ্ধৃতি bdlaws.minlaw.gov.bd-এর সরকারি বাংলা পাঠ থেকে ধারা ধরে ধরে নেওয়া; আসন ও সংজ্ঞা-সংক্রান্ত ধারা তিনটি জেলা আইনেই আলাদা করে পড়া হয়েছে। চুক্তির উদ্ধৃতি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রকাশিত বাংলা পাঠ থেকে, ইউনিকোডে রূপান্তরের পর মূল পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। প্রতিটি দাবির পাশে ধারা বা বিধির নম্বর দেওয়া আছে যাতে পাঠক নিজে যাচাই করতে পারেন।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৫ আগস্ট ২০২৬
প্রসঙ্গ:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।