Last updated Oct 23rd, 2026
0

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ছাপা উৎসগুলো জোড়া দিলে পঞ্চাশটির বেশি নামের একটি তালিকা দাঁড়ায়: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খুমী, বম, পাংখোয়া ও চাক জনগোষ্ঠীর বাঁশি, তারযন্ত্র, ঢোল, গং আর শিং। বেশিরভাগই বাঁশে গড়া; বাকিগুলো লাউয়ের খোল, কাঠ, পশুর চামড়া, কাঁসা, পিতল বা অষ্টধাতু দিয়ে। লুসাই ও খিয়াং জনগোষ্ঠীর কোনো যন্ত্রের নাম কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
এই তালিকা আগে কোথাও এক জায়গায় ছিল না। নামগুলো ছড়িয়ে আছে বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধের একটি অংশে, বাংলাপিডিয়ার আলাদা আলাদা জনগোষ্ঠী-নিবন্ধে, আর জুমজার্নাল আর্কাইভের জনগোষ্ঠী-পরিচিতিগুলোতে, কোথাও এক লাইনে, কোথাও উৎসবের বর্ণনার ভেতরে। নিচের ছকে প্রতিটি যন্ত্রের পাশে লেখা আছে কোন জনগোষ্ঠীর, কী দিয়ে তৈরি, কখন বাজে, আর তথ্যটি কোন উৎস থেকে নেওয়া। যেখানে উৎস চুপ, সেখানে ঘরটি খালি না রেখে স্পষ্ট লেখা আছে “উৎসে নেই”।
গানের ধারা, শিল্পী আর সত্তরের দশকের সাংগঠনিক ইতিহাস নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি গান ও আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র: নাম ধরে ধরে একটি পাঠ-এ। এই লেখা তার পরিপূরক: সেখানে যন্ত্রগুলো শ্রেণি ধরে সাজানো, এখানে প্রতিটি যন্ত্র আলাদা সারিতে, উপাদান ও উপলক্ষসহ।
সূচিপত্র
ছকে 50টির বেশি সারি আছে, প্রতিটি একটি যন্ত্রের নাম। একই যন্ত্রের অন্য ভাষার নাম পাশের ঘরে, আলাদা সারিতে নয়। “উৎস” ঘরে বাংলাপিডিয়া মানে মোমেন চৌধুরীর লেখা “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধের উপজাতীয় বাদ্যযন্ত্র অংশ, যদি না অন্য নিবন্ধের নাম দেওয়া থাকে; “আর্কাইভ” মানে জুমজার্নালের নির্দিষ্ট লেখা।
দুটি সতর্কতা ছক পড়ার আগে। এক, উৎসে যেভাবে নাম ও বানান আছে হুবহু সেভাবেই রাখা হয়েছে; একই যন্ত্র মনে হলেও উৎস না বললে দুটি নাম জোড়া দেওয়া হয়নি। দুই, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কয়েকটি যন্ত্রের নাম এসেছে আর্কাইভের “ককবরক সঙ্গীত অতীত ও ভবিষ্যৎ” লেখা থেকে, যা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের প্রেক্ষাপটে লেখা; সেই সারিগুলোতে তা আলাদা করে বলা আছে।
| যন্ত্র | অন্য নাম বা বানান | জনগোষ্ঠী | কী দিয়ে গড়া | কখন বাজে | উৎস |
|---|---|---|---|---|---|
| বাঁশি ও ফুঁ দিয়ে বাজানো যন্ত্র | |||||
| প্লুং | তিনতেং প্লুং বা তুলেরুম প্লুং, প্লুংকে, প্লুংমা, রিনাপ্লুং (নলের সংখ্যা অনুযায়ী চার রকম) | ম্রো, খুমী | পাহাড়ি তিতা লাউয়ের খোল, সরু বাঁশের নল | সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পূজাপার্বণ ও মানত; গো-হত্যা উৎসব; মহামারী থেকে রক্ষার অনুষ্ঠানে কেবল রিনাপ্লুং | বাংলাপিডিয়া; বাংলাপিডিয়া (ম্রো); আর্কাইভ (ম্রো) |
| তুম প্লুং | — | উৎসে জনগোষ্ঠীর নাম নেই | উৎসে নেই (“এক প্রকার বাঁশি”) | ভাদ্র-আশ্বিনে জুম পাহারা | আর্কাইভ (জুমচাষে লোকজ্ঞান) |
| বাজি | বাঝি, বাঁশি | চাকমা | বিভিন্ন মাপের পাহাড়ি বাঁশ; গায়ে কারুকাজ | আলাদা করে বলা নেই; ঘরের বেড়ায় বাঁশের খাপে রাখা হতো; চাকমা গানে বহুল উল্লিখিত | বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ (গেংখুলি) |
| শিমুর | — | ত্রিপুরা | উপাদান আলাদা করে বলা নেই; সাধারণ বাঁশের বাঁশির চেয়ে লম্বা ও বেশি ছিদ্রযুক্ত | পরাইয়া নৃত্য, পূজাপার্বণ | বাংলাপিডিয়া |
| সুমুই | — | ত্রিপুরা (ককবরক লেখা, ভারতের ত্রিপুরা প্রেক্ষাপট) | উৎসে নেই (“বাঁশি”) | স্বর চয়নের যন্ত্র | আর্কাইভ (ককবরক) |
| শিঙ্গা | শিঙা | চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা | চার-পাঁচ হাত লম্বা বাঁশ | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ (চাকমা জাতি) |
| তু | — | উৎসে নেই | উৎসে নেই | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া (কেবল নাম) |
| ক্লাওনেট | — | উৎসে নেই | উৎসে নেই | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া (কেবল নাম) |
| হ্নেঃ | — | মারমা | উৎসে নেই (“এক প্রকার বাঁশি”) | বোমাং রাজপুণ্যাহর শোভাযাত্রা | আর্কাইভ (মারমা) |
| পিলিঈ | — | মারমা | উৎসে নেই (“বাঁশি”) | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া (মারমা) |
| হ্নে | — | চাক | উৎসে নেই (“এক ধরনের বাঁশি”) | ওয়াগ্যোই-তে ফানুস ওড়ানো; সাংগ্রাইং-এর দ্বিতীয় দিন | আর্কাইভ (চাক) |
| বাঁশি-পুলী | — | চাক | উৎসে নেই | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া (চাক) |
| মিমীম | — | বম | ধানের নাড়া | বিরহ ও বিচ্ছেদের সুর | আর্কাইভ (বম লোকসংগীত) |
| জলপাল | — | বম | উৎসে নেই (“এক প্রকার বাঁশি”) | বিরহ ও বিচ্ছেদের সুর | আর্কাইভ (বম লোকসংগীত) |
| বাঁশি | — | তঞ্চঙ্গ্যা | বাঁশ | উভাগীতের সুরে, পুরুষেরা বাজান | আর্কাইভ (তঞ্চঙ্গ্যা) |
| বাঁশি | — | খুমী | উৎসে নেই | গো-হত্যা অনুষ্ঠানে তাং ন’ নাচ | আর্কাইভ (খুমী) |
| খরা | — | মারমা | উৎসে নেই (“এক প্রকার শিঙা”) | বোমাং রাজপুণ্যাহর শোভাযাত্রা | আর্কাইভ (মারমা) |
| বেহালা ও তারযন্ত্র | |||||
| ধুধুক | তুত্রুমাও (চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা), টুটু-আ (ত্রিপুরা); বানানভেদে ধুদুক, ধুধক, ধুরূক | চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা | দুই প্রান্ত বন্ধ দুই হাত লম্বা বাঁশ; মাঝে গোল ছিদ্র; বাঁশের পিঠ থেকে তোলা দুটি সরু বাখারি | আলাদা করে বলা নেই; চাকমা গানে সবচেয়ে বেশি উল্লিখিত চার যন্ত্রের একটি | বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ (চাকমা জাতি, গেংখুলি) |
| খেংগ্রং | খেং খরং, হেঙগরঙ, হেংগরং (চাকমা); খ্রে খ্রং (মারমা); সাংমুঙ্ (ত্রিপুরা); খেংখং | চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ত্রিপুরা | বাঁশের কঞ্চি (বাংলাপিডিয়া); বাঁশের ফালি (তঞ্চঙ্গ্যা আর্কাইভ) | আনন্দ-উৎসব; তঞ্চঙ্গ্যা নারীরা উভাগীতের সুরে বাজান | বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ (চাকমা জাতি, তঞ্চঙ্গ্যা) |
| বে-আনা | বেলা (চাকমা), বেয়াঁজ (মারমা), ত্র (ম্রো) | চাকমা, মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা | বাঁশ ও কাঠ | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া |
| ক্রি-চয় | — | মারমা | কাঠ ও কাঁসা; কাঠের গোল চাকতিতে 15–20টি তার; দুটি কাঠিতে বাজে | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া |
| দুংমং | — | মারমা | উৎসে নেই | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া (কেবল নাম) |
| এঃ | — | মারমা | উৎসে নেই (“বেহালা জাতীয়”) | আফোওয়েহ্ গানের সঙ্গে; অতীতে রাজাদের আসরে | আর্কাইভ (মারমা) |
| ফকির দাঙ্গাইস | — | ত্রিপুরা, উসুই | খোদাই করা কাঠ; মাঝখানে লম্বালম্বি একটি তার | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া |
| সেঁদা | — | উসুই | দুই-তিন হাত লম্বা, দেড় হাত চওড়া খোদাই করা কাঠ; ফাঁপা অংশে চামড়া; তিনটি তার | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া |
| চং প্রেই | — | উসুই | প্রায় আড়াই হাত লম্বা খোদাই করা কাঠ; তিনটি তার; প্রথম তারের নিচে মোমে আটকানো পাঁচটি ছোট কাঠি | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া |
| একতারা | — | ম্রো, খুমী | লাউ বা নারকেলের খোল | বিভিন্ন অনুষ্ঠান | বাংলাপিডিয়া |
| রিরৎ | — | বম | উৎসে নেই (“এক প্রকার একতারা”) | বিরহ ও বিচ্ছেদের সুর | আর্কাইভ (বম লোকসংগীত) |
| সারিন্দ্যা | — | চাকমা | উৎসে নেই | উৎসে নেই | আর্কাইভ (চাকমা জাতি) |
| বেহালা | — | তঞ্চঙ্গ্যা | উৎসে নেই | গেঙ্গুলীদের উভাগীত ও পালাগান | আর্কাইভ (তঞ্চঙ্গ্যা); বাংলাপিডিয়া (তঞ্চঙ্গ্যা) |
| সারিন্দা | — | ত্রিপুরা (ককবরক লেখা) | উৎসে নেই | রাগিনি অনুসরণ করে বাজে; পশুপাখি ও মোরগের ডাক হুবহু তোলা যায় | আর্কাইভ (ককবরক) |
| চংপ্রেং | — | ত্রিপুরা (ককবরক লেখা) | উৎসে নেই | শিকারলব্ধ বস্তুর বণ্টন, পাহাড়ে চড়া, চরকা কাটা, ঘুম পাড়ানোর সুর | আর্কাইভ (ককবরক) |
| দাংদু | — | ত্রিপুরা (ককবরক লেখা) | উৎসে নেই | অতীতে যুবতীরা বাজাতেন; সুর ও তাল দুই কাজেই | আর্কাইভ (ককবরক) |
| রুয়া টিংটাং | — | পাংখোয়া | বাঁশ (“বাঁশের গিটার”) | উৎসে নেই | আর্কাইভ (পাংখোয়া) |
| ঢোল ও চামড়ার যন্ত্র | |||||
| খাইং | — | উসুই | বাঘ বা ছাগলের চামড়া; হালকা গামারি জাতীয় কাঠের ফ্রেম; দুই থেকে আড়াই হাত লম্বা | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া |
| খা-অম | — | ত্রিপুরা | আলাদা করে বলা নেই (“খাইং-এর মতোই”) | গরাইয়া পূজা ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অপরিহার্য | বাংলাপিডিয়া |
| বুঙ্গ | — | মারমা | কাঠ ও বন্য পশুর চামড়া; দশ ইঞ্চি লম্বা, সাত ইঞ্চি চওড়া | বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অন্য যন্ত্রের সঙ্গে | বাংলাপিডিয়া |
| পেহ্ | — | উৎসে জনগোষ্ঠীর নাম নেই | কাঠ ও চামড়া; দুই ফুট লম্বা, এক ফুট চওড়া; কাঠি দিয়ে বাজে | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া |
| প্যাহ্ | — | মারমা | উৎসে নেই (“এক প্রকার ঢোল”) | বোমাং রাজপুণ্যাহর শোভাযাত্রা | আর্কাইভ (মারমা) |
| চে | — | মারমা | কাঠ ও চামড়া (“দুন্দুভি”) | বোমাং রাজপুণ্যাহর শোভাযাত্রা | আর্কাইভ (মারমা) |
| সেইং ওয়েইং | — | মারমা | কাঠ; বৃত্তাকার বড় ঢোল | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া (মারমা) |
| কিয়ে ওয়েইং | — | মারমা | কাঠ; ছোট ঢোল | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া (মারমা) |
| ঢুল | ঢোল | চাকমা | উৎসে নেই | মৃত্যুর পর বিশেষ তালে বাজিয়ে পাড়াকে সংবাদ দেওয়া | আর্কাইভ (চাকমা জাতি, তঞ্চঙ্গ্যা) |
| বাইক | — | চাক | উৎসে নেই (“ঢোল”) | সাংগ্রাইং-এর দ্বিতীয় দিন | আর্কাইভ (চাক) |
| পাইয়া | — | চাক | উৎসে নেই (“বড়ঢোল”) | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া (চাক) |
| খোয়াং | — | পাংখোয়া | গাছ বা কাঠ (“গাছের তৈরি ঢোল”) | উৎসে নেই | আর্কাইভ (পাংখোয়া) |
| রুয়া খোয়াং | — | পাংখোয়া | বাঁশ (“বাঁশের ঢোল”) | উৎসে নেই | আর্কাইভ (পাংখোয়া) |
| ঢোল, ঢাকঢোল | — | খুমী | উৎসে নেই | তাং ন’ নাচ; মরদেহ ঘরে রাখার চার-পাঁচ দিন | আর্কাইভ (খুমী); বাংলাপিডিয়া (খুমি) |
| গং, ঘণ্টা ও করতাল | |||||
| গঙ্গ বা মঙ্গ | দারখোয়াং (পাংখোয়া ভাষায়), দার খোয়াং | ম্রো, খুমী, পাংখোয়া, চাকমা, মারমা, চাক | অষ্টধাতু; চাকতির মতো গোল, মাঝখান উঁচু; কাঠের দণ্ডে আঘাত | ম্রো-খুমীর গো-হত্যা; পাংখোয়াদের শিকার ও যুদ্ধনৃত্য; চাকমা, মারমা ও চাকদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান | বাংলাপিডিয়া; বাংলাপিডিয়া (চাক) |
| ডার পুই | মং | পাংখোয়া | উৎসে নেই (“বড় ঘণ্টা”) | কুমারী মেয়ের বিয়ের পণের একটি বিকল্প | আর্কাইভ (পাংখোয়া) |
| ডার সন | — | পাংখোয়া | পিতল (“ছোট্ট পিতলের ঘণ্টা”) | উৎসে নেই | আর্কাইভ (পাংখোয়া) |
| মঙঃ | — | মারমা | পিতল (“দুন্দুভি”) | বোমাং রাজপুণ্যাহর শোভাযাত্রা | আর্কাইভ (মারমা) |
| ছাইনজ | ছাইনজু | চাক | কাঁসা (“কাঁসার ঘণ্টা”) | কঠিন চীবর দানের শোভাযাত্রা; সাংগ্রাইং | আর্কাইভ (চাক) |
| লাংহোয়াক | — | চাক | উৎসে নেই (“ঝাঁজ”) | ওয়াগ্যোই-তে ফানুস ওড়ানো; সাংগ্রাইং-এর দ্বিতীয় দিন | আর্কাইভ (চাক) |
| লাংখোয়া সো | — | চাক | উৎসে নেই (“করতাল”) | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া (চাক) |
| শিং, বাঁশ ও অন্যান্য | |||||
| সিয়াল রাকি | — | পাংখোয়া | গয়ালের শিং | উৎসে নেই | আর্কাইভ (পাংখোয়া) |
| থেই খাং | — | পাংখোয়া | বাঁশ (“এক কৌটা বাঁশ”) | উৎসে নেই | আর্কাইভ (পাংখোয়া) |
| শিং জোড়া | — | বম | প্রাণীর শিং | সিয়া কী দেং: যশস্বী মৃতের স্মরণোৎসব; কেবল পুরুষ; গান হয় না | আর্কাইভ (বম লোকসংগীত) |
| জোড়া বাঁশ | — | বম | লম্বা বাঁশ | রোখা বা বাঁশনৃত্য: অপঘাতে বা অস্বাভাবিক মৃত্যুতে | আর্কাইভ (বম লোকসংগীত); বাংলাপিডিয়া (বম) |
| ঢেঁকির চড়ুন | — | মারমা | ঢেঁকির চড়ুন, 4 থেকে 6টি | ক্যমুইঙ আকাহ্ বা চড়ুন নৃত্য | আর্কাইভ (মারমা) |
| যন্ত্রের ধরন উৎসে স্পষ্ট নয় | |||||
| মুরি | — | ত্রিপুরা (ককবরক লেখা) | উৎসে নেই | যন্ত্রটি হারিয়ে গেছে বলে লেখা আছে | আর্কাইভ (ককবরক) |
| ডগর, তাক | — | চাকমা | উৎসে নেই | উৎসে নেই | আর্কাইভ (চাকমা জাতি; কেবল নাম) |
| বাইক-পুন | — | চাক | উৎসে নেই | ওয়াগ্যোই-তে ফানুস ওড়ানো | আর্কাইভ (চাক) |
| মং ঢোল | — | চাক | উৎসে নেই (মং ও ঢোল দুটি যন্ত্র, নাকি একটি, স্পষ্ট নয়) | মৃতদেহ ঘরে রাখার দিনগুলোতে | আর্কাইভ (চাক) |
| পুং, হন-সানাহ, পালাক | — | চাক | উৎসে নেই (পুং “ছোট বাদ্যযন্ত্র”) | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া (চাক; কেবল নাম) |
| খাম, ওয়াখপ | — | ত্রিপুরা (ককবরক লেখা) | উৎসে নেই | ধীর বা দ্রুত তাল মেলানোর যন্ত্র | আর্কাইভ (ককবরক) |
| ঝিনে | — | মারমা | উৎসে নেই | উৎসে নেই | বাংলাপিডিয়া (মারমা; কেবল নাম) |
| আলং, আতং | — | খুমী | উৎসে নেই | নাচের সময় উল্লাস প্রকাশে | বাংলাপিডিয়া (খুমি) |
ছক থেকে তিনটি বিষয় সহজে চোখে পড়ে। প্রথমত, উপাদানের ঘরে বাঁশ সবচেয়ে বেশিবার এসেছে: বাঁশি, শিঙা, ধুধুক, খেংগ্রং, বে-আনা, প্লুং-এর নল, পাংখোয়াদের বাঁশের ঢোল ও বাঁশের গিটার। দ্বিতীয়ত, কাঁসা, পিতল বা অষ্টধাতুর যন্ত্রগুলো প্রায় সবই আনুষ্ঠানিক: রাজপুণ্যাহর শোভাযাত্রা, কঠিন চীবর দান, গো-হত্যা অনুষ্ঠান। তৃতীয়ত, অনেক ঘরে উপাদান বা উপলক্ষ “উৎসে নেই”, কারণ উৎসগুলো বহু যন্ত্রের কেবল নামটুকু দিয়েছে।
উৎসে উপাদান লেখা আছে এমন যন্ত্রগুলোকে উপাদান ধরে সাজালে ছয়টি দল দাঁড়ায়: বাঁশ, লাউ বা নারকেলের খোল, কাঠ, পশুর চামড়া, ধাতু আর শিং। বেশিরভাগ যন্ত্রে একাধিক উপাদান থাকে, যেমন প্লুং-এ লাউয়ের খোল ও বাঁশের নল, ঢোলে কাঠের কাঠামো ও চামড়া।
| উপাদান | কোন যন্ত্রে (জনগোষ্ঠী) |
|---|---|
| বাঁশ | বাজি (চাকমা), শিঙ্গা (চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা), প্লুং-এর নল (ম্রো, খুমী), ধুধুক (চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা), খেংগ্রং (চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ত্রিপুরা), বে-আনা (চাকমা, মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা), বাঁশি (তঞ্চঙ্গ্যা), রুয়া টিংটাং, রুয়া খোয়াং, থেই খাং (পাংখোয়া), রোখার জোড়া বাঁশ (বম) |
| ধানের নাড়া | মিমীম (বম) |
| লাউ বা নারকেলের খোল | প্লুং-এর বাতাসের খোল (ম্রো, খুমী), একতারা (ম্রো, খুমী) |
| কাঠ | বে-আনা, ক্রি-চয় (মারমা), ফকির দাঙ্গাইস (ত্রিপুরা, উসুই), সেঁদা ও চং প্রেই (উসুই), খাইং-এর গামারি জাতীয় কাঠের ফ্রেম (উসুই), বুঙ্গ, চে, সেইং ওয়েইং, কিয়ে ওয়েইং (মারমা), পেহ্, খোয়াং (পাংখোয়া), ঢেঁকির চড়ুন (মারমা) |
| পশুর চামড়া | খাইং: বাঘ বা ছাগলের (উসুই); বুঙ্গ: বন্য পশুর (মারমা); চে (মারমা); পেহ্; সেঁদার আচ্ছাদন (উসুই) |
| কাঁসা, পিতল, অষ্টধাতু | গঙ্গ বা দারখোয়াং: অষ্টধাতু (ম্রো, খুমী, পাংখোয়া, চাক প্রমুখ); ক্রি-চয়: কাঁসা (মারমা); মঙঃ: পিতল (মারমা); ডার সন: পিতল (পাংখোয়া); ছাইনজ: কাঁসা (চাক) |
| শিং | সিয়াল রাকি: গয়ালের শিং (পাংখোয়া); সিয়া কী দেং নাচের শিং জোড়া (বম) |
| মোম | চং প্রেই-এর কাঠি আটকাতে (উসুই) |
বাংলাপিডিয়ার একই নিবন্ধ বাংলার লোকবাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে সাধারণভাবে লিখেছে, এগুলোর উপকরণ “নিতান্তই সাধারণ”: লাউয়ের খোল, নারকেলের মালা, বাঁশ, কাঠ, নল, পাতা, মাটি, লোহা, পিতল, সুতা, তার, শিং। পাহাড়ের তালিকায় এর মধ্যে বাঁশ, লাউ ও নারকেলের খোল, কাঠ, পিতল ও শিং আছে; মাটির তৈরি কোনো যন্ত্রের উল্লেখ পার্বত্য চট্টগ্রামের উৎসগুলোতে পাওয়া যায়নি। আরেকটি পার্থক্য চামড়ায়। বাংলার ঢোলে গরু, ছাগল বা সাপের চামড়ার কথা আছে; পাহাড়ের ঢোলের বিবরণে আছে বাঘ বা ছাগলের চামড়া (উসুইদের খাইং) এবং “বন্য পশুর চামড়া” (মারমাদের বুঙ্গ)।
কাঠের নাম কেবল একটি যন্ত্রের বেলায় পাওয়া যায়: খাইং-এর কাঠামো “হালকা গামারি জাতীয় কাঠের”। বাঁশের কোন প্রজাতি কোন যন্ত্রে লাগে, সে তথ্য কোনো উৎসে নেই; বাংলাপিডিয়া কেবল বলেছে চাকমাদের বাজি “বিভিন্ন মাপের পাহাড়ি বাঁশ দিয়ে” তৈরি, আর খেংগ্রং তৈরি হয় “বাঁশের কঞ্চি দিয়ে”।
বাঁশি-জাতীয় যন্ত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি জনগোষ্ঠীর তালিকায় আছে। বাংলাপিডিয়া এই দলে ছয়টি নাম দিয়েছে: প্লুং, তু, বাজি, শিমুর, শিঙ্গা ও ক্লাওনেট। আর্কাইভ থেকে যোগ হয় মারমাদের হ্নেঃ, চাকদের হ্নে, বমদের মিমীম ও জলপাল, আর ককবরক লেখার সুমুই।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী প্লুং ম্রো ও খুমী জনগোষ্ঠী ঐতিহ্যগতভাবে বাজায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পূজাপার্বণে; ম্রো ভাষায় প্লুং শব্দের অর্থ বাঁশি। তৈরি হয় পাহাড়ে জন্মানো এক প্রকার তিতা লাউয়ের খোল আর সরু বাঁশের নল দিয়ে। নলের সংখ্যা অনুযায়ী ম্রো সমাজে এর চারটি নাম আছে, আর কলেরা, মহামারী বা দৈব-দুর্বিপাক থেকে রক্ষার অনুষ্ঠানে কেবল রিনাপ্লুং বাজানো হয়। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার ম্রো নিবন্ধ যোগ করে, প্রতিটি নলের ভেতরে একটি করে রিড থাকে আর নলের গায়ের ছোট ছিদ্র বন্ধ করলে তবেই সেটি বাজে। প্লুং কীভাবে বানানো হয় আর চার রকমের পার্থক্য কোথায়, তা এই তালিকার বিষয় নয়; এখানে প্লুং একটি সারি মাত্র।
প্লুং কখন বাজে, তার দুটি বিবরণ আছে। আর্কাইভের ম্রো নামকরণ নিয়ে লেখাটি বলছে, ম্রোদের প্রধান উৎসব গো-হত্যা অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষ সবাই “নিজস্ব বাশি (প্লুং)” বাজিয়ে নাচ-গান করেন, সাধারণত শীতকালে। বাংলাপিডিয়ার “ম্রো” নিবন্ধ (আব্দুল মাবুদ খান) বলছে, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির এই উৎসবে ম্রো যুবক-যুবতীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে প্লুং বাঁশির তালে গরুকে ঘিরে নাচেন। আর্কাইভের জুমচাষের লোকজ্ঞান লেখায় ভাদ্র-আশ্বিনে জুম পাহারার সরঞ্জামের তালিকায় আছে “তুম প্লুং (এক প্রকার বাঁশি)”, যদিও সেখানে জনগোষ্ঠীর নাম আলাদা করে বলা নেই।

চাকমারা বাঁশিকে বলেন বাজি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বিভিন্ন মাপের পাহাড়ি বাঁশে এটি তৈরি, গায়ে কিছু কারুকাজও থাকে। আর্কাইভের গেংখুলি লেখায় একটি পর্যবেক্ষণ আছে: জুমিয়াদের ঘরে তরুণ-তরুণী থাকলে ঘরের বেড়ায় বাঁশের খাপে হেংগরং, বাঝি বা বাঁশি আর ধুধক লটকানো দেখা যেত। অর্থাৎ যন্ত্রগুলো ছিল ঘরের জিনিস, মঞ্চের নয়।
ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী বাঁশির নাম শিমুর, সাধারণ বাঁশের বাঁশির চেয়ে কিছুটা লম্বা ও বেশি ছিদ্রযুক্ত; বাংলাপিডিয়া বলছে এটি বাজে “পরাইয়া নৃত্য” ও পূজাপার্বণে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের প্রেক্ষাপটে লেখা ককবরক সঙ্গীত অতীত ও ভবিষ্যৎ-এ বিকাশ রায় দেববর্মা বাঁশির নাম দিয়েছেন সুমুই। শিমুর আর সুমুই একই যন্ত্র কি না, কোনো উৎস বলেনি।
মারমাদের বাঁশির দুটি নাম দুই উৎসে। আর্কাইভের মারমা জাতির আদ্যোপান্ত বোমাং রাজার শোভাযাত্রার যন্ত্রদলে রেখেছে হ্নেঃ (“এক প্রকার বাঁশি”); বাংলাপিডিয়ার “মারমা” নিবন্ধ (সাদাত উল্লাহ খান) বাঁশির নাম দিয়েছে পিলিঈ। চাকদের বাঁশির নামও হ্নে; আর্কাইভের চাক জাতির আদ্যোপান্ত অনুযায়ী ওয়াগ্যোই উৎসবে ফানুস ওড়ানোর সময় এবং সাংগ্রাইং-এর দ্বিতীয় দিনে এটি বাজে। বাংলাপিডিয়ার “চাক” নিবন্ধ (রাখী রায়) চাকদের বাঁশির নাম লিখেছে “বাঁশি-পুলী”।
সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত উপাদানটি বমদের মিমীম-এ: আর্কাইভে জির কুং সাহুর বম আদিবাসীদের লোকসংগীত ও লোকনৃত্য অনুযায়ী এটি “ধানের নাড়া দিয়ে তৈরি বাঁশি”। সঙ্গে আছে জলপাল (“এক প্রকার বাঁশি”) আর রিরৎ (একতারা-জাতীয়)। লেখক বলছেন এদের সুরে বিরহ ও বিচ্ছেদের ব্যথা ফুটে ওঠে, “কথা নেই আছে শুধু সুর।”
বাংলার লোকবাদ্যে শিঙ্গা মানে মহিষের শিং বা ধাতুর বাঁকা ভেঁপু। পাহাড়ের শিঙ্গা আলাদা: বাংলাপিডিয়া বলছে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা “চার-পাঁচ হাত লম্বা বাঁশ দিয়ে” শিঙ্গা তৈরি করেন। আর্কাইভের চাকমা জাতি লেখার আট যন্ত্রের তালিকাতেও শিঙা আছে। 1974 সালে গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষার আধুনিক গানের প্রথম সংকলনের নাম রেখেছিল ‘শিঙগা’, যা আর্কাইভের একাধিক লেখায় উল্লেখ আছে।
বাংলাপিডিয়া আটটি যন্ত্রকে “বেহালা জাতীয়” দলে রেখেছে: খেং খরং, বে-আনা, ধুধুক, ক্রি-চয়, ফকির দাঙ্গাইস, সেঁদা, চং প্রেই ও একতারা। এর মধ্যে তিনটি (ধুধুক, খেং খরং, বে-আনা) বাঁশে গড়া এবং একাধিক জনগোষ্ঠীতে প্রচলিত, তাই প্রত্যেকটির একাধিক নাম আছে। আর্কাইভ থেকে যোগ হয় মারমাদের এঃ, চাকমাদের সারিন্দ্যা, বমদের রিরৎ ও পাংখোয়াদের রুয়া টিংটাং।
ধুধুক চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত। বাংলাপিডিয়া এর গঠনের সবচেয়ে বিশদ বিবরণ দিয়েছে: দুই প্রান্ত বন্ধ, দুই হাত লম্বা এক খণ্ড বাঁশের ঠিক মাঝখানে একটি গোল ছিদ্র করা হয়; তারপর বাঁশের পিঠ থেকে বেত তোলার মতো করে সরু দুটি বাখারি তুলে বেহালার মতো করা হয়। অর্থাৎ তার আলাদা কিছু নয়, বাঁশেরই ছাল। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা একে তুত্রুমাও, ত্রিপুরারা টুটু-আ বলেন বলে বাংলাপিডিয়া লিখেছে।
বানান উৎসভেদে বদলায়: চাকমা জাতি লেখায় ধুদুক, গেংখুলি লেখার উদ্ধৃতিতে ধুধক ও ধুদক, আর বাংলাপিডিয়ার “তঞ্চঙ্গ্যা” নিবন্ধে (দীননাথ তঞ্চঙ্গ্যা) ধুরূক। সরকারের ঐতিহ্য তথ্যভান্ডার heritagehub.gov.bd-তে রাঙামাটির চাকমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য হিসেবে “Dudhuk” তালিকাভুক্ত আছে (ইউনিক আইডি BGD-20.84.2023.00068), তবে সেখানে একে “percussion instrument” বলা হয়েছে, আর বিবরণের ঘরে আছে আর্মেনিয়ার ডুডুক নামের সম্পূর্ণ আলাদা একটি বায়ুযন্ত্রের বর্ণনা।
বাংলাপিডিয়ার খেং খরং চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী “বাঁশের কঞ্চি দিয়ে” তৈরি করে আনন্দ-উৎসবে বাজায়; মারমারা বলেন খ্রে খ্রং, ত্রিপুরারা সাংমুঙ্, আর এর ব্যবহার চাকমাদের মধ্যে বেশি। আর্কাইভের চাকমা লেখায় নাম হেঙগরঙ, তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত-এ খেংগ্রং, বাংলাপিডিয়ার তঞ্চঙ্গ্যা নিবন্ধে খেংখং।
যন্ত্রটি কোন শ্রেণির, তা নিয়ে দুই উৎস আলাদা কথা বলে। বাংলাপিডিয়া একে বেহালা-জাতীয় দলে রেখেছে। তঞ্চঙ্গ্যা আর্কাইভ লেখা বলছে খেংগ্রং “বাঁশের ফালি দিয়ে তৈরি যন্ত্র (মাউথ অর্গান)”, আর উভাগীতের সুরে এটি বাজান নারীরা, পুরুষেরা বাজান বাঁশের বাঁশি। দুটোই উৎসসহ এখানে রাখা হলো।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বে-আনা বেহালার মতোই বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি; চাকমা ভাষায় বেলা, মারমা ভাষায় বেয়াঁজ, ম্রো ভাষায় ত্র। নিবন্ধটি আলাদা করে লিখেছে, ত্রিপুরাদের বাঁশে তৈরি এই জাতীয় বেহালার “বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শিল্পকর্ম” আছে। তঞ্চঙ্গ্যা গেঙ্গুলীরা বেহালা বাজিয়ে উভাগীত ও পালাগান গেয়ে থাকেন বলে তঞ্চঙ্গ্যা আর্কাইভ লেখা জানায়; সেই বেহালা দেশজ না কারখানার, তা বলা নেই।
বাংলাপিডিয়ার ক্রি-চয় মারমাদের যন্ত্র, কাঠ ও কাঁসা দিয়ে গড়া, কাঠের গোল চাকতির ওপর পনেরো থেকে বিশটি তার, দুটি কাঠি দিয়ে সুর তোলা হয়। একই নিবন্ধে মারমাদের আরেকটি যন্ত্রের নাম আছে, দুংমং, কিন্তু কোনো বিবরণ নেই। আর্কাইভের মারমা লেখায় আফোওয়েহ্ গানের সঙ্গে বাজে ‘এঃ’ নামের “বেহালা জাতীয়” যন্ত্র; অতীতে রাজারা আফোওয়েহ্ শিল্পীদের ডেকে আসর বসাতেন। ক্রি-চয় আর এঃ একই যন্ত্র কি না, কোনো উৎস বলেনি।
বাংলাপিডিয়া উসুইদের নাম আলাদা জনগোষ্ঠী হিসেবে লিখেছে; আর্কাইভের ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত উসুইকে ত্রিপুরাদের দফা বা গোত্রের তালিকায় রেখেছে। এদের তিনটি তারযন্ত্রের বিবরণ বাংলাপিডিয়ায় আছে। ফকির দাঙ্গাইস ত্রিপুরা ও উসুইদের একতারা-জাতীয় যন্ত্র: কাঠ খোদাই করে মাঝখানে লম্বালম্বি একটি তার, কাঠি বা হাতে বাজানো হয়। সেঁদা দেখতে ঘুঘু পাখির বাসার মতো: দুই-তিন হাত লম্বা ও দেড় হাত চওড়া কাঠ খোদাই করে বানানো, ফাঁপা অংশ চামড়ায় ঢাকা, তিনটি তার। চং প্রেই প্রায় আড়াই হাত লম্বা খোদাই করা কাঠে তিনটি তার; প্রথম তারেই বেশি সুর তোলা হয়, তাই তার নিচে পাঁচটি ছোট কাঠি মোম দিয়ে আটকানো থাকে।
ম্রো ও খুমীদের একতারা লাউয়ের বা নারকেলের খোলে তৈরি, বাংলাপিডিয়া বলছে। বমদের রিরৎ “এক প্রকার একতারা”, উপাদান উৎসে নেই। চাকমাদের সারিন্দ্যা আর্কাইভের আট যন্ত্রের তালিকায় আছে, বিবরণ নেই। পাংখোয়াদের রুয়া টিংটাং আর্কাইভের পাংখোয়া জাতির আদ্যাপান্ত-এ “বাঁশের গিটার”। আর্কাইভের গেংখুলি লেখা অনুযায়ী গোজেন লামা পালা সারা রাত চলে একটিমাত্র যন্ত্র সঙ্গে নিয়ে, আর সংরক্ষিত দুটি রেকর্ডিংয়ে গায়ক নিজেই একটি তারযন্ত্র বাজিয়েছেন; বিস্তারিত আছে গেংখুলি: চাকমা চারণ কবি ও তাঁদের পরিবেশনা-য়।
ঢোলের বিবরণে মাপ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। বাংলাপিডিয়া ঢোল-জাতীয় দলে পাঁচটি নাম দিয়েছে: খাইং, খা-অম, বুঙ্গ, পেহ্ এবং গঙ্গ বা দারখোয়াং (শেষটি আসলে ধাতুর গং, পরের অংশে আছে)। আর্কাইভ ও বাংলাপিডিয়ার জনগোষ্ঠী-নিবন্ধ থেকে যোগ হয় মারমাদের প্যাহ্, চে, সেইং ওয়েইং, কিয়ে ওয়েইং; চাকদের বাইক ও পাইয়া; চাকমাদের ঢুল; পাংখোয়াদের খোয়াং ও রুয়া খোয়াং।
| ঢোল | জনগোষ্ঠী | মাপ | উপাদান | উৎস |
|---|---|---|---|---|
| খাইং | উসুই | দুই থেকে আড়াই হাত লম্বা, এক হাতের বেশি চওড়া | বাঘ বা ছাগলের চামড়া, হালকা গামারি জাতীয় কাঠের ফ্রেম | বাংলাপিডিয়া |
| খা-অম | ত্রিপুরা | উৎসে নেই | “খাইং-এর মতোই” | বাংলাপিডিয়া |
| বুঙ্গ | মারমা | দশ ইঞ্চি লম্বা, সাত ইঞ্চি চওড়া | কাঠ ও বন্য পশুর চামড়া | বাংলাপিডিয়া |
| পেহ্ | উৎসে নেই | দুই ফুট লম্বা, এক ফুট চওড়া | কাঠ ও চামড়া | বাংলাপিডিয়া |
| সেইং ওয়েইং | মারমা | “বৃত্তাকার বড় আকৃতির” | কাঠ | বাংলাপিডিয়া (মারমা) |
| কিয়ে ওয়েইং | মারমা | “ছোট আকৃতির” | কাঠ | বাংলাপিডিয়া (মারমা) |
| চে | মারমা | উৎসে নেই | কাঠ ও চামড়া | আর্কাইভ (মারমা) |
| খোয়াং | পাংখোয়া | উৎসে নেই | গাছ বা কাঠ | আর্কাইভ (পাংখোয়া) |
| রুয়া খোয়াং | পাংখোয়া | উৎসে নেই | বাঁশ | আর্কাইভ (পাংখোয়া) |
খা-অম-এর উপলক্ষটি নির্দিষ্ট: বাংলাপিডিয়া বলছে গরাইয়া পূজা ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এটি বাজানো “অপরিহার্য”। আর্কাইভের ত্রিপুরা লেখা গরয়া নৃত্যের বর্ণনায় বলছে, বৈসুর প্রথম দিন থেকে টানা পাঁচ থেকে সাত দিন গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঢোল-বাঁশি বাজিয়ে নৃত্য পরিবেশিত হয়; সেই ঢোলের নাম লেখায় নেই। একই লেখায় সিমতৗং পূজায় চোন্তাই যখন পিতৃপুরুষদের নাম ধরে সংকল্প বাক্য উচ্চারণ করেন, তখন “ঢোলের গ্রীংচাং গ্রীংচাং বোলে” প্রদীপ জ্বালানো হয়।

মারমাদের ঢোলের নাম তিন উৎসে তিন রকম। বাংলাপিডিয়ার বাদ্যযন্ত্র নিবন্ধে বুঙ্গ (দশ ইঞ্চি লম্বা, সাত ইঞ্চি চওড়া, কাঠ ও বন্য পশুর চামড়া)। বাংলাপিডিয়ার মারমা নিবন্ধে সেইং ওয়েইং (বৃত্তাকার বড় কাঠের ঢোল) ও কিয়ে ওয়েইং (ছোট কাঠের ঢোল), আর নিবন্ধটি যোগ করেছে, এই যন্ত্রগুলোর সঙ্গে বার্মায় ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রের মিল আছে। আর্কাইভের মারমা লেখায় বোমাং রাজার যন্ত্রদলে প্যাহ্ (“এক প্রকার ঢোল”) ও চে (“কাঠ ও চামড়ার তৈরি এক প্রকার দুন্দুভি”); রাজপুণ্যাহ নিয়ে বিস্তারিত আছে রাজপুণ্যাহ: বোমাং সার্কেলে 1875 থেকে চলা খাজনার উৎসব লেখায়। বাংলাপিডিয়ার পেহ্ (দুই ফুট লম্বা, এক ফুট চওড়া, কাঠ ও চামড়ার, কাঠি দিয়ে বাজে) নামের দিক থেকে প্যাহ্-এর কাছাকাছি, কিন্তু নিবন্ধটি পেহ্-এর জনগোষ্ঠীর নাম বলেনি; তাই দুটিকে এক সারিতে রাখা হয়নি।
মারমা গীতিনাট্যেও ঢোল-বাঁশির ভাগ আছে। আর্কাইভের মারমা লেখা অনুযায়ী পাংঃখুঙ-এ “বঙ্গীয় বাদ্যযন্ত্র” এবং জাইত্-এ “বর্মী বাদ্যযন্ত্র” ব্যবহৃত হয়; কোন কোন যন্ত্র, তা নাম ধরে বলা নেই।
ধাতুর যন্ত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত একটি গং। বাংলাপিডিয়া একে বলছে গঙ্গ বা মঙ্গ, পাংখোয়া ভাষায় দারখোয়াং: অষ্টধাতুর চাকতির মতো গোলাকার যন্ত্র, মাঝখানটা উঁচু, সেখানে কাঠের দণ্ড দিয়ে আঘাত করলে ঘণ্টার মতো শব্দ হয়। নিবন্ধ অনুযায়ী এটি বাজে ম্রো ও খুমীদের গো-হত্যা অনুষ্ঠানে, পাংখোয়াদের শিকার ও যুদ্ধনৃত্যে, এবং চাকমা, মারমা ও চাকদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে।
বাকি উৎসগুলো একই ধরনের যন্ত্রকে ভিন্ন নামে ধরেছে। আর্কাইভের পাংখোয়া লেখায় ডার পুই (“মং বা বড় ঘণ্টা”) ও ডার সন (“ছোট্ট পিতলের ঘণ্টা”); একই লেখায় কুমারী মেয়ের বিয়ের পণের তালিকায় আছে “১টি বড় ঘণ্টা (মং) বা ১টি গাভী বা গয়াল”। অর্থাৎ পাংখোয়া সমাজে মং কেবল বাদ্যযন্ত্র নয়; পণের তালিকায় এর বিকল্প হিসেবে লেখা আছে একটি গাভী বা গয়াল। বাংলাপিডিয়ার চাক নিবন্ধেও “গঙ্গ বা মঙ্গ বা দার খোয়াং” অষ্টধাতুর তৈরি গোলাকার “ঘণ্টা জাতীয় ভারি যন্ত্র” হিসেবে আছে। আর্কাইভের চাক লেখায় মৃতদেহ ঘরে রাখার দিনগুলোতে “মং ঢোল” বাজিয়ে পরিবেশ মুখর রাখা হয়; এখানে মং ও ঢোল দুটি আলাদা যন্ত্র কি না, লেখা থেকে স্পষ্ট নয়।
মারমাদের মঙঃ আর্কাইভে “পিতলের তৈরি দুন্দুভি”, বোমাং রাজার শোভাযাত্রায় বাজে। চাকদের কঠিন চীবর দানের শোভাযাত্রার অগ্রভাগে একজন বয়স্ক পুরুষ কলাপরু গাছ বহন করেন, আরেকজন বাজান ‘ছাইনজ’ বা কাঁসার ঘণ্টা; চাক লেখায় একই যন্ত্র আরেক জায়গায় ‘ছাইনজু’ বানানে আছে।
করতাল বা ঝাঁজের দুটি নাম পাওয়া যায়, দুটিই চাকদের। আর্কাইভে লাংহোয়াক (ঝাঁজ), যা ওয়াগ্যোই-তে ফানুস ওড়ানোর সময় আর সাংগ্রাইং-এর দ্বিতীয় দিনে বাইক ও হ্নের সঙ্গে বাজে। বাংলাপিডিয়ার চাক নিবন্ধে লাংখোয়া সো (করতাল)। নাম দুটি কাছাকাছি, কিন্তু কোনো উৎস দুটিকে এক বলেনি।
কিছু ক্ষেত্রে বাদ্যযন্ত্র আলাদা করে বানানো হয় না; প্রাণীর শিং, জোড়া বাঁশ বা ঢেঁকির অংশই তাল তোলে। পাংখোয়াদের সিয়াল রাকি গয়ালের শিং, থেই খাং “এক কৌটা বাঁশ”। মারমাদের খরা আর্কাইভে “এক প্রকার শিঙা”, তবে তা শিং না বাঁশ না ধাতুর, তা বলা নেই।
বমদের দুটি নাচে বস্তুই যন্ত্র। জির কুং সাহুর লেখা অনুযায়ী রোখা বা বাঁশনৃত্যে জোড়া জোড়া লম্বা বাঁশের দুই প্রান্তে আড়াআড়ি ঠোকাঠুকিতে ছন্দতাল তৈরি হয়, আর এই নাচ হয় অপঘাতে, প্রসবজনিত বা অস্বাভাবিক মৃত্যুতে। বাংলাপিডিয়ার “বম” নিবন্ধও বলছে বমদের বাঁশনৃত্য ও গান আনন্দের নয়, পরিবেশিত হয় দুঃখ ও শোকের দিনে। সিয়া কী দেং বা শিং নৃত্যে কেবল পুরুষেরা শিং জোড়া হাতে নিয়ে বিশেষ ভঙ্গিতে ঠুকঠাক বাজান; এটি যশস্বী মৃতের স্মরণোৎসব, এবং লেখক জানাচ্ছেন এই নাচে গান হয় না।

মারমাদের ক্যমুইঙ আকাহ্ বা চড়ুন নৃত্যের তাল তৈরি হয় ঢেঁকির চড়ুন দিয়ে। আর্কাইভের মারমা লেখা অনুযায়ী আদিকালে “উন্নত বাদ্যযন্ত্রের আবিষ্কার” হওয়ার আগে এই চড়ুনের সাহায্যে নৃত্যের তাল সৃষ্টি হয়েছিল; নাচে চার থেকে ছয়টি চড়ুন ব্যবহার হয়, আর একে প্রাচীনতম মারমা নৃত্য বলে ধারণা করা হয়।
চাকমাদের একটি তালিকা এখানে সাবধানে পড়তে হয়। আর্কাইভের চাংমাটারা: চাকমা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস “বাঁশ ও গাছের তৈরী বাদ্যযন্ত্র ও খেলার উপকরণ” হিসেবে এগারোটি নাম দিয়েছে: ধুদুক, হেঙগরঙ, শিঙা, ঘিলে, নাধেং, বাজি, শামুক, মমা বিচি, বাঁশের কাঠি, সানেইগুলো, ঢোল। তালিকাটি যন্ত্র ও খেলা মিলিয়ে, আর কোনটি কোন দলে তা আলাদা করা নেই; তাই ঘিলে, নাধেং, শামুক, মমা বিচি ও সানেইগুলোকে এই লেখার মূল ছকে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ধরা হয়নি।
জনগোষ্ঠী ধরে সাজালে দেখা যায়, যন্ত্রের নাম সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় মারমা, চাক, ত্রিপুরা ও চাকমাদের বেলায়, আর লুসাই ও খিয়াংদের বেলায় একটিও নয়। এই পার্থক্য সংগীতের নয়, লেখার: যাদের নিয়ে বিস্তারিত লেখা আছে, তাদের যন্ত্রের নামও বেশি পাওয়া যায়।
| জনগোষ্ঠী | যন্ত্রের নাম (উৎসে যেমন) | মূল উৎস |
|---|---|---|
| চাকমা | ধুদুক বা ধুধুক, হেঙগরঙ বা খেংগ্রং, শিঙা, বাজি বা বাঁশি, ঢুল, ডগর, সারিন্দ্যা, তাক, বেলা; দারখোয়াং (ধর্মীয় অনুষ্ঠানে) | আর্কাইভ (চাকমা জাতি); বাংলাপিডিয়া |
| মারমা | খরা, মঙঃ, প্যাহ্, হ্নেঃ, চে, এঃ; বুঙ্গ, ক্রি-চয়, দুংমং, খ্রে খ্রং, বেয়াঁজ; সেইং ওয়েইং, কিয়ে ওয়েইং, পিলিঈ, ঝিনে; ঢেঁকির চড়ুন; দারখোয়াং | আর্কাইভ (মারমা); বাংলাপিডিয়া; বাংলাপিডিয়া (মারমা) |
| ত্রিপুরা | শিমুর, খা-অম, টুটু-আ, সাংমুঙ্, বে-আনা, ফকির দাঙ্গাইস; ককবরক লেখায় সারিন্দা, সুমুই, চংপ্রেং, খাম, ওয়াখপ, দাংদু, মুরি (হারানো) | বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ (ককবরক, ত্রিপুরা) |
| উসুই | খাইং, ফকির দাঙ্গাইস, সেঁদা, চং প্রেই | বাংলাপিডিয়া (আর্কাইভে উসুই ত্রিপুরাদের একটি দফা) |
| তঞ্চঙ্গ্যা | খেংগ্রং বা খেংখং, বাঁশি, বেহালা, ধুধুক বা ধুরূক (তুত্রুমাও), শিঙ্গা | আর্কাইভ (তঞ্চঙ্গ্যা); বাংলাপিডিয়া (তঞ্চঙ্গ্যা) |
| ম্রো | প্লুং (চার রকম), ত্র, একতারা, দারখোয়াং | বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ (ম্রো) |
| খুমী | প্লুং, একতারা, বাঁশি, ঢোল, আলং, আতং, দারখোয়াং | বাংলাপিডিয়া; বাংলাপিডিয়া (খুমি); আর্কাইভ (খুমী) |
| বম | রিরৎ, মিমীম, জলপাল; রোখার জোড়া বাঁশ; সিয়া কী দেং-এর শিং | আর্কাইভ (বম লোকসংগীত, বম জাতি) |
| পাংখোয়া | সিয়াল রাকি, ডার সন, ডার পুই, খোয়াং, থেই খাং, রুয়া খোয়াং, রুয়া টিংটাং; দারখোয়াং | আর্কাইভ (পাংখোয়া); বাংলাপিডিয়া |
| চাক | বাইক, বাইক-পুন, হ্নে, লাংহোয়াক, ছাইনজ, মং ঢোল; লাংখোয়া সো, পাইয়া, পুং, বাঁশি-পুলী, হন-সানাহ, পালাক, গঙ্গ বা দার খোয়াং | আর্কাইভ (চাক); বাংলাপিডিয়া (চাক) |
| লুসাই | কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি | বাংলাপিডিয়া (লুসাই) ও আর্কাইভে উল্লেখ নেই |
| খিয়াং | কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি | বাংলাপিডিয়া (খিয়াং) ও আর্কাইভে উল্লেখ নেই |
লুসাই ও খিয়াং সারি দুটি খালি থাকার কারণ উৎসের অভাব। বাংলাপিডিয়ার “লুসাই” ও “খিয়াং” নিবন্ধ (দুটিই খন্দকার ফাতেমা জোহরার লেখা) কোনো বাদ্যযন্ত্রের নাম দেয়নি, আর বাংলাপিডিয়ার বাদ্যযন্ত্র নিবন্ধ লুসাইদের নাম জনগোষ্ঠীর তালিকায় রাখলেও তাদের কোনো যন্ত্র আলাদা করে বলেনি। আর্কাইভেও এ দুই জনগোষ্ঠীর সংগীত নিয়ে কোনো লেখা নেই। ভারতের মিজোরামের লুসাই-মিজো যন্ত্র নিয়ে লেখা আছে, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের লুসাইদের বেলায় তা কতটা খাটে, কোনো উৎস বলেনি, তাই এখানে বসানো হয়নি।
উৎসগুলোতে উপলক্ষের বর্ণনা যন্ত্রের বর্ণনার চেয়ে বেশি। পাঁচ ধরনের অনুষ্ঠান বারবার আসে: মৃত্যু ও অন্ত্যেষ্টি, গো-হত্যা বা ভোজ-উৎসব, বৌদ্ধ ধর্মীয় উৎসব, রাজার অনুষ্ঠান, আর জুম ও নবান্ন। এর মধ্যে মৃত্যুর অনুষ্ঠানে ঢোল আর বিনোদনের আসরে তারযন্ত্র ও বাঁশি, এই ভাগটি প্রায় সব জনগোষ্ঠীতে দেখা যায়, যদিও ব্যতিক্রমও আছে।
| উপলক্ষ | জনগোষ্ঠী | যন্ত্র | উৎস |
|---|---|---|---|
| মৃত্যু ও অন্ত্যেষ্টি | |||
| মৃত্যুর সংবাদ | চাকমা | বিশেষ তালের ঢোল বা ঢোলক | আর্কাইভ (চাকমা জাতি, তঞ্চঙ্গ্যা) |
| অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া | ত্রিপুরা | খা-অম (অপরিহার্য) | বাংলাপিডিয়া |
| মরদেহ ঘরে রাখার দিনগুলো | চাক | মং ঢোল | আর্কাইভ (চাক) |
| মরদেহ ঘরে রাখার চার-পাঁচ দিন | খুমী | ঢাকঢোল | বাংলাপিডিয়া (খুমি) |
| অপঘাতে বা অস্বাভাবিক মৃত্যু | বম | রোখার জোড়া বাঁশ | আর্কাইভ (বম লোকসংগীত) |
| যশস্বী মৃতের স্মরণোৎসব | বম | সিয়া কী দেং-এর শিং জোড়া | আর্কাইভ (বম লোকসংগীত) |
| দাহের আগে মৃতের পাহারা | মারমা | কোনো যন্ত্র নয় (ন্বাইলাঃ গান) | আর্কাইভ (মারমা) |
| ভোজ, গো-হত্যা ও শিকার | |||
| গো-হত্যা উৎসব | ম্রো | প্লুং; দারখোয়াং | আর্কাইভ (ম্রো); বাংলাপিডিয়া |
| গো-হত্যা অনুষ্ঠান | খুমী | বাঁশি ও ঢোল (তাং ন’ নাচ); দারখোয়াং | আর্কাইভ (খুমী); বাংলাপিডিয়া |
| শিকার ও যুদ্ধনৃত্য | পাংখোয়া | দারখোয়াং | বাংলাপিডিয়া |
| ধর্মীয় উৎসব ও পূজা | |||
| মানত ও পূজাপার্বণ | ম্রো, খুমী | প্লুং; মহামারী-দুর্বিপাকে কেবল রিনাপ্লুং | বাংলাপিডিয়া |
| গরাইয়া পূজা | ত্রিপুরা | খা-অম | বাংলাপিডিয়া |
| বৈসু ও গরয়া নৃত্য | ত্রিপুরা | ঢোল ও বাঁশি | আর্কাইভ (ত্রিপুরা) |
| পরাইয়া নৃত্য | ত্রিপুরা | শিমুর | বাংলাপিডিয়া |
| সিমতৗং পূজা | ত্রিপুরা | ঢোল (“গ্রীংচাং গ্রীংচাং” বোল) | আর্কাইভ (ত্রিপুরা) |
| ওয়াগ্যোই বা প্রবারণা: ফানুস ওড়ানো | চাক | বাইক-পুন, হ্নে, লাংহোয়াক | আর্কাইভ (চাক) |
| কঠিন চীবর দানের শোভাযাত্রা | চাক | ছাইনজ | আর্কাইভ (চাক) |
| সাংগ্রাইং-এর দ্বিতীয় দিন | চাক | বাইক, লাংহোয়াক, হ্নে | আর্কাইভ (চাক) |
| ধর্মীয় অনুষ্ঠান | চাকমা, মারমা, চাক | দারখোয়াং | বাংলাপিডিয়া |
| রাজা, বিয়ে ও আসর | |||
| বোমাং রাজপুণ্যাহর শোভাযাত্রা | মারমা | খরা, মঙঃ, প্যাহ্, হ্নেঃ, চে | আর্কাইভ (মারমা) |
| আফোওয়েহ্ গানের আসর | মারমা | এঃ | আর্কাইভ (মারমা) |
| বিয়ের কাথারক পূজা ও নৃত্য | ত্রিপুরা | ঢোল | আর্কাইভ (ত্রিপুরা) |
| বিয়ের পণ | পাংখোয়া | মং বা বড় ঘণ্টা (গাভী বা গয়ালের বিকল্প) | আর্কাইভ (পাংখোয়া) |
| উভাগীত ও পালাগান | তঞ্চঙ্গ্যা | খেংগ্রং (নারী), বাঁশি (পুরুষ), বেহালা (গেঙ্গুলী) | আর্কাইভ (তঞ্চঙ্গ্যা) |
| গোজেন লামা পালা | চাকমা | একটিমাত্র যন্ত্র, সারা রাত | আর্কাইভ (গেংখুলি) |
| জুম | |||
| ভাদ্র-আশ্বিনে জুম পাহারা | উৎসে জনগোষ্ঠীর নাম নেই | তুম প্লুং | আর্কাইভ (জুমচাষে লোকজ্ঞান) |
মৃত্যুর অনুষ্ঠানে ঢোলের কাজটি কেবল সুর নয়, সংবাদ। আর্কাইভের চাকমা লেখা বলছে, কারও মৃত্যু হলে বিশেষ তালে ঢোল বাজানো হয়, আর সেই তাল শুনে পাড়ার লোকেরা বোঝেন কোনো বাড়িতে কেউ মারা গেছেন। তঞ্চঙ্গ্যা লেখা একই কথা চাকমাদের বেলায় বলেছে, আর জানিয়েছে তঞ্চঙ্গ্যারা এই খবর দেন বন্দুকের আওয়াজে। খুমীদের বেলায় বাংলাপিডিয়ার “খুমি” নিবন্ধ (মোহাম্মদ আব্দুল বাতেন) বলছে, মরদেহ চার-পাঁচ দিন ঘরে রাখা হয়, এ সময় ঢাকঢোল বাজে, কারণ তাদের ধারণা এতে মৃতের কষ্ট লাঘব হয়।
ব্যতিক্রমটি মারমাদের। মৃতের বাড়িতে দাহ না হওয়া পর্যন্ত পাহারার গান ন্বাইলাঃ “কোনো রকম বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই” পরিবেশিত হয়, বলছে আর্কাইভের মারমা লেখা; এর পুঁথি বৌদ্ধ মন্দিরে সংরক্ষিত থাকে।
খুশির অনুষ্ঠানের যন্ত্রও জনগোষ্ঠীভেদে আলাদা। খুমীদের বেলায় বাংলাপিডিয়া লিখেছে, নাচের সময় তারা “বাদ্যযন্ত্র আলং ও আতং বাজিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন”; একই নিবন্ধে লামনাহ নামের নাচের কথা আছে, যাতে নারী-পুরুষ দুজনেই অংশ নেন, আর বিজয়ের নাচ চারানাহ যুবকরা নাচেন বাদ্যের তালে। আলং ও আতং দেখতে কেমন বা কী দিয়ে তৈরি, তা নিবন্ধে নেই। আর্কাইভের খুমী জাতির আদ্যোপান্ত বলছে, গো-হত্যা অনুষ্ঠানে তাং ন’ নাচ হয় হাত ধরে সারিবদ্ধভাবে, বাঁশির সুরে তাল মিলিয়ে।
বাংলাপিডিয়ার বাদ্যযন্ত্র নিবন্ধ একটি সাধারণ বাক্যে বলেছে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যন্ত্রগুলোর মধ্যে “কতিপয় যন্ত্র বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া বাজানো নিষেধ”। কোন কোন যন্ত্র, তা নিবন্ধ পুরো তালিকা দেয়নি, তবে একটি উদাহরণ নির্দিষ্ট: ম্রো ও খুমী সমাজে কলেরা, মহামারী বা দৈব-দুর্বিপাক থেকে রক্ষার বিশেষ অনুষ্ঠানে “কেবল রিনাপ্লুং” বাজানো হয়।
বিপরীত দিক থেকে একটি অনুষ্ঠানে যন্ত্রই নিষিদ্ধ: মারমাদের ন্বাইলাঃ, যা আগের অংশে বলা হয়েছে। বমদের সিয়া কী দেং-এ শিং বাজে কিন্তু গান হয় না, আর রোখায় বাঁশের তাল আর গান দুটোই থাকে। এর বাইরে কোন যন্ত্র কোন ঋতুতে বা কার হাতে নিষিদ্ধ, এমন কোনো নিয়ম কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
কে বাজান, সে তথ্যও অল্প। তঞ্চঙ্গ্যাদের খেংগ্রং নারীরা আর বাঁশি পুরুষেরা বাজান; ককবরক লেখা বলছে দাংদু অতীতে যুবতীরা বাজাতেন; বমদের শিং নৃত্যে কেবল পুরুষ; ম্রোদের গো-হত্যা উৎসবে নারী-পুরুষের “কোন ভেদাভেদ নেই”। বাকি যন্ত্রগুলোর বাদক নারী না পুরুষ, তা উৎসে লেখা নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বাদ্যযন্ত্রের তালিকা জটিল দেখায় মূলত এ কারণে যে একই যন্ত্র চার-পাঁচটি ভাষায় চার-পাঁচ নামে চলে, আর বাংলা হরফে লেখার সময় বানানও বদলায়। নিচের ছকে কেবল সেই জোড়াগুলো আছে যেগুলোকে কোনো উৎস নিজেই এক যন্ত্র বলেছে।
| যন্ত্র | যে নামগুলো একই যন্ত্রের বলে উৎসে লেখা | উৎস |
|---|---|---|
| ধুধুক | তুত্রুমাও (চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা), টুটু-আ (ত্রিপুরা) | বাংলাপিডিয়া |
| খেং খরং | খ্রে খ্রং (মারমা), সাংমুঙ্ (ত্রিপুরা); চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা নাম খেংগ্রং বা হেঙগরঙ | বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ |
| বে-আনা | বেলা (চাকমা), বেয়াঁজ (মারমা), ত্র (ম্রো) | বাংলাপিডিয়া |
| গঙ্গ | মঙ্গ; দারখোয়াং (পাংখোয়া ভাষায়) | বাংলাপিডিয়া; বাংলাপিডিয়া (চাক) |
| ডার পুই | মং বা বড় ঘণ্টা | আর্কাইভ (পাংখোয়া) |
| তিনতেং প্লুং | তুলেরুম প্লুং | বাংলাপিডিয়া |
| বাজি | বাঁশি (চাকমা ভাষায় বাজি) | বাংলাপিডিয়া |
| ছাইনজ | ছাইনজু (একই লেখায় দুই বানান) | আর্কাইভ (চাক) |
নামের এই মিল একটি দরকারি সূত্র দেয়। ধুধুক, খেংগ্রং আর বে-আনা তিনটিই চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা ও ত্রিপুরাদের মধ্যে ভাগ করা; দারখোয়াং ভাগ করা ম্রো, খুমী, পাংখোয়া, চাক, চাকমা ও মারমার মধ্যে। কিন্তু প্লুং কেবল ম্রো ও খুমীর, শিমুর কেবল ত্রিপুরার, মিমীম কেবল বমের। কোনো যন্ত্রকে “পাহাড়ি” বলে সব জনগোষ্ঠীর গায়ে লাগানো তাই ভুল।
এই তালিকা তৈরির সময় দশটি জায়গায় উৎসগুলো পরস্পর থেকে আলাদা কথা বলেছে। কোনটি ঠিক, তা এখানে বিচার করা হয়নি; দুই পক্ষই নামসহ রাখা হলো।
একটি যন্ত্রের হারিয়ে যাওয়ার কথা নির্দিষ্ট করে লেখা আছে, বাকিগুলোর বেলায় আছে সাধারণ উদ্বেগ। ককবরক লেখার লেখক জানিয়েছেন, মুরি নামের একটি যন্ত্র ককবরকভাষীরা “অনেক আগেই” হারিয়ে ফেলেছেন; যন্ত্রটি কেমন ছিল, কোথাও লেখা নেই। একই লেখা বলছে, চংপ্রেং ও সারিন্দার যে কয়েকজন শিল্পী এখনো আছেন, তাঁদের কাছ থেকে শিখতে নবীনরা এগিয়ে আসছেন না; লেখাটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের প্রেক্ষাপটে।
বাইরের একটি পর্যবেক্ষণ আছে রল্ফ কিলিয়াসের, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফিনিক্সের Musical Instrument Museum-এর জন্য বাংলাদেশের বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন, যার একটি অংশ ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, ম্রো ও বম জনগোষ্ঠীর যন্ত্র। তাঁর ওয়েবসাইটে তিনি লিখেছেন, আদিবাসী ও জুম্ম জনগোষ্ঠীর সংগীত, নৃত্য ও যন্ত্র নির্মাণকে বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে দেখা হয় না, এর হারিয়ে যাওয়াকেও “বিপন্ন” ধরা হয় না; আর পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনি বলেছেন ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও নৃত্যের পৃথিবীর অল্প কয়েকটি অবশিষ্ট ভান্ডারের একটি।
উইকিমিডিয়া কমন্সে ম্রো বাদ্যযন্ত্রের যে আলোকচিত্র এই লেখায় ব্যবহৃত হয়েছে, তার বিবরণে আলোকচিত্রী লিখেছেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে অনেক প্রাচীন যন্ত্র বিলুপ্তির পথে। আর্কাইভের খুমী লেখা বলছে খুমী লোকগীতি “আজকাল খুব কম সংখ্যক লোকজন চর্চা করছে”। এগুলো পর্যবেক্ষণ; কোন যন্ত্রের কতজন বাদক বা নির্মাতা এখন আছেন, তার কোনো গণনা কোনো উৎসে নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য সাংস্কৃতিক বিষয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয় আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য লেখায়, আর অঞ্চলটির সব লেখা একসঙ্গে পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধ, বাংলাপিডিয়ার জনগোষ্ঠী-নিবন্ধ আর জুমজার্নাল আর্কাইভের লেখাগুলো জোড়া দিলে পঞ্চাশটির বেশি নাম পাওয়া যায়। এর অনেকগুলো একই যন্ত্রের ভিন্ন ভাষার নাম, যেমন ধুধুক চাকমা-তঞ্চঙ্গ্যায় তুত্রুমাও, ত্রিপুরায় টুটু-আ। অন্তত পনেরোটি যন্ত্রের কেবল নাম পাওয়া যায়, গঠন বা উপাদান নয়।
সবচেয়ে বেশি বাঁশ: বাজি, শিঙ্গা, ধুধুক, খেংগ্রং, বে-আনা আর প্লুং-এর নল বাঁশের। এর পরে কাঠ ও পশুর চামড়া (ঢোল), লাউ বা নারকেলের খোল (প্লুং, ম্রো-খুমীর একতারা), কাঁসা, পিতল ও অষ্টধাতু (দারখোয়াং, ক্রি-চয়, মঙঃ, ছাইনজ), আর গয়ালের শিং। বমদের মিমীম বাঁশি ধানের নাড়ায় তৈরি বলে আর্কাইভে লেখা আছে।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী প্লুং ম্রো ও খুমী জনগোষ্ঠীর যন্ত্র; ম্রো ভাষায় প্লুং মানে বাঁশি। পাহাড়ি তিতা লাউয়ের খোল আর সরু বাঁশের নল দিয়ে তৈরি, নলের সংখ্যা অনুযায়ী চার রকম নাম। ম্রোদের গো-হত্যা উৎসবে নারী-পুরুষ প্লুং বাজিয়ে নাচেন, আর মহামারী থেকে রক্ষার অনুষ্ঠানে কেবল রিনাপ্লুং বাজে।
ধুধুক বাঁশের বেহালা-জাতীয় যন্ত্র, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দুই প্রান্ত বন্ধ দুই হাত লম্বা বাঁশের মাঝখানে গোল ছিদ্র করে, বাঁশের পিঠ থেকে সরু দুটি বাখারি তুলে এটি বানানো হয়। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা একে তুত্রুমাও, ত্রিপুরারা টুটু-আ বলেন।
বাংলাপিডিয়া বলছে খেং খরং চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানিয়ে আনন্দ-উৎসবে বাজায়, তবে চাকমাদের মধ্যে ব্যবহার বেশি। মারমারা বলেন খ্রে খ্রং, ত্রিপুরারা সাংমুঙ্। জুমজার্নালের তঞ্চঙ্গ্যা লেখা একে বাঁশের ফালির মাউথ অর্গান বলেছে, যা উভাগীতের সুরে নারীরা বাজান।
আর্কাইভ অনুযায়ী বোমাং রাজপুণ্যাহর যন্ত্রদলে বাজে খরা (শিঙা), মঙঃ (পিতলের দুন্দুভি), প্যাহ্ (ঢোল), হ্নেঃ (বাঁশি) ও চে (কাঠ-চামড়ার দুন্দুভি); আফোওয়েহ্ গানে বাজে এঃ। বাংলাপিডিয়া যোগ করে বুঙ্গ, ক্রি-চয়, দুংমং, খ্রে খ্রং, বেয়াঁজ, আর মারমা নিবন্ধে সেইং ওয়েইং, কিয়ে ওয়েইং, পিলিঈ ও ঝিনে।
বাংলাপিডিয়া ত্রিপুরাদের ঢোলের নাম দিয়েছে খা-অম, এবং বলেছে গরাইয়া পূজা ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এটি বাজানো অপরিহার্য। এর উপাদান আলাদা করে বলা নেই, কেবল “খাইং-এর মতোই”। আর্কাইভের ত্রিপুরা লেখায় গরয়া নৃত্যে বৈসুর প্রথম দিন থেকে পাঁচ-সাত দিন ঢোল-বাঁশি বাজে, সিমতৗং পূজায় ঢোলে “গ্রীংচাং” বোল ওঠে।
দারখোয়াং পাংখোয়া ভাষায় গঙ্গ বা মঙ্গ নামের গংয়ের নাম। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এটি অষ্টধাতুর চাকতির মতো গোল যন্ত্র, মাঝখান উঁচু, কাঠের দণ্ডে আঘাত করলে ঘণ্টার মতো শব্দ হয়। ম্রো-খুমীর গো-হত্যা, পাংখোয়াদের শিকার ও যুদ্ধনৃত্য এবং চাকমা, মারমা ও চাকদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এটি বাজে।
জনগোষ্ঠীভেদে আলাদা। চাকমারা বিশেষ তালে ঢোল বাজিয়ে মৃত্যুর সংবাদ দেন; ত্রিপুরাদের অন্ত্যেষ্টিতে খা-অম অপরিহার্য; চাকেরা মরদেহ রাখার দিনগুলোতে মং ঢোল বাজান; খুমীরা চার-পাঁচ দিন ঢাকঢোল বাজান। বমদের রোখা নাচে জোড়া বাঁশের ঠোকাঠুকি। ব্যতিক্রম মারমা: মৃতের পাহারার ন্বাইলাঃ গান কোনো যন্ত্র ছাড়াই গাওয়া হয়।
জির কুং সাহুর লেখা অনুযায়ী বমদের তিনটি যন্ত্র রিরৎ (একতারা-জাতীয়), মিমীম (ধানের নাড়ার বাঁশি) ও জলপাল (বাঁশি), যাদের সুরে বিরহের ব্যথা ফোটে। এর বাইরে দুটি নাচে বস্তুই যন্ত্র: রোখা বা বাঁশনৃত্যে জোড়া লম্বা বাঁশের ঠোকাঠুকি, আর সিয়া কী দেং-এ পুরুষদের হাতের শিং জোড়া।
কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। বাংলাপিডিয়ার “লুসাই” ও “খিয়াং” নিবন্ধে কোনো যন্ত্রের নাম নেই, বাংলাপিডিয়ার বাদ্যযন্ত্র নিবন্ধ লুসাইদের নাম জনগোষ্ঠীর তালিকায় রাখলেও আলাদা কোনো যন্ত্র বলেনি, আর জুমজার্নাল আর্কাইভেও এ দুই জনগোষ্ঠীর সংগীত নিয়ে লেখা নেই। ভারতের মিজোরামের যন্ত্রগুলো এখানে প্রযোজ্য কি না, কোনো উৎস বলেনি।
নাম ধরে একটির কথাই লেখা আছে: মুরি। জুমজার্নাল আর্কাইভের “ককবরক সঙ্গীত অতীত ও ভবিষ্যৎ” লেখায় বিকাশ রায় দেববর্মা লিখেছেন, ককবরকভাষীরা মুরিকে অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছেন; লেখাটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের প্রেক্ষাপটে। মুরি কেমন দেখতে ছিল বা কী দিয়ে তৈরি, তা কোনো উৎসে নেই।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী সংস্কৃতি, ত্রিপুরা, বাদ্যযন্ত্র, মারমা, ম্রো, লোকসংগীত
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।