Last updated Oct 23rd, 2026
1

পুরনো রাঙামাটি শহর কাপ্তাই হ্রদের নিচে। ডিসি বাংলোর পাহাড়ের গোড়া থেকে কর্ণফুলীর তিন দিক ঘেরা যে সমতল উপদ্বীপে জেলার অফিস-আদালত, থানা, বাজার, সিনেমা হল আর মাঠ ছিল, 1959 থেকে 1961 সালের মধ্যে বাঁধের পানিতে তার পুরোটা তলিয়ে যায়; নদীর ওপারের চাকমা রাজবাড়িও যায়। নতুন শহর গড়ে ওঠে পেছনের উঁচু টিলায়, আপার রাঙামাটিতে, আর সংরক্ষিত বন কেটে তৈরি হয় রিজার্ভ বাজার ও তবলছড়ি।
বাঁধটি কবে, কার টাকায়, কত জমি ডুবিয়ে তৈরি হয়েছিল, আর কত মানুষ ভারতে চলে গেলেন, সে হিসাব আমাদের আর্কাইভের কাপ্তাই বাঁধের পূর্ণাঙ্গ লেখায় আছে। এই লেখার বিষয় ছোট আর নির্দিষ্ট: একটি শহর। সেটি দেখতে কেমন ছিল, কবে ডুবল, কারা থেকে গেলেন, আর পুরনো বাজার, অফিস ও রাজবাড়ি কোথায় সরে গেল। প্রধান উৎস তিনটি: আমাদের ই-বুক লাইব্রেরিতে থাকা আজাদ বুলবুলের কাপ্তাই বাঁধে ডুবে যাওয়া রাঙ্গামাটি (মিজান পাবলিশার্স, 2014), যেটি 2004 থেকে 2006 সালের মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা মৌখিক ইতিহাস; ড. মানিক লাল দেওয়ানের কিশোরকালের স্মৃতিকথা; আর তারাচরন চাকমার দীর্ঘ লেখা। ঔপনিবেশিক আমলের দুটি সরকারি বিবরণ ও একজন জেলা প্রশাসকের আত্মজীবনী দিয়ে শহরের শুরুটা মেলানো হয়েছে।
এই লেখায়
পুরনো রাঙামাটি শহর ছিল আজকের ডিসি বাংলোর নিচে, কর্ণফুলীর একটি বাঁকে তৈরি সমতল উপদ্বীপে। এর তিন দিকে নদী। স্থানীয়রা এই নিচু অংশকে লোয়ার রাঙামাটি বলতেন, আর ডিসি বাংলো থেকে পেছনের উঁচু এলাকাকে আপার রাঙামাটি। বাঁধের পানিতে লোয়ার অংশ সম্পূর্ণ ডোবে, আপার অংশ টিকে যায়।
মানিক লাল দেওয়ান 1945 সালের জানুয়ারিতে, তাঁর নিজের ভাষায় সম্ভবত, রাঙামাটি সরকারি উচ্চ ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন এবং আপার রাঙামাটির একটি বাসায় থেকে পড়তেন। তাঁর স্মৃতিকথায় শহরটি দুই ভাগে বিভক্ত: আসামবস্তি-সংলগ্ন কৃষিখামার থেকে ডিসি বাংলো পর্যন্ত আপার রাঙামাটি, আর ডিসি বাংলোর গোড়া থেকে পূর্বদিকে প্রায় এক মাইল লম্বা ও পোয়া মাইল চওড়া, মোটামুটি সমতল একটি উপদ্বীপ, যার নাম লোয়ার বা নিচু রাঙামাটি। তিনি লিখেছেন, এটিই ছিল শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র।
শহরের মাপ নিয়ে তিনটি উৎস তিন রকম সংখ্যা দেয়। পাঠক একসঙ্গে দেখে নিতে পারেন:
| উৎস | দৈর্ঘ্য | প্রস্থ | দিক |
|---|---|---|---|
| মানিক লাল দেওয়ান, স্মৃতিকথা | প্রায় 1 মাইল | পোয়া মাইল | ডিসি বাংলোর গোড়া থেকে পূর্বদিকে |
| তারাচরন চাকমা | প্রায় দেড় মাইল | আনুমানিক 500 গজ | ডিসি বাংলোর প্রান্ত থেকে সোজা দক্ষিণে |
| আজাদ বুলবুল, পৃ. 32 | আড়াই কিলোমিটার | আধা কিলোমিটার | ডিসি বাংলোর প্রান্ত থেকে সোজা দক্ষিণে |
দিক নিয়েও দুই রকম বর্ণনা আছে: মানিক লাল দেওয়ান উপদ্বীপটিকে পূর্বমুখী বলেছেন, তারাচরন চাকমা ও আজাদ বুলবুল দক্ষিণমুখী। তবে তিনজনই একমত যে শহরের তিন দিক ঘিরে ছিল কর্ণফুলী। তারাচরন চাকমা ও আজাদ বুলবুলের বর্ণনায় নদী শহরের পূর্ব পাশ দিয়ে দক্ষিণে নেমে দক্ষিণ-পশ্চিমে বাঁক নিত, তারপর কোতোয়ালী থানার পাশ দিয়ে সোজা পশ্চিমে চলে যেত। আজাদ বুলবুল একে বলেছেন নদীর “ত্রিমুখী বেষ্টনী”।
ডিসি বাংলোর ঠিক পূর্ব পাশে কর্ণফুলীর একটি গভীর খাদ ছিল। তারাচরন চাকমা লিখেছেন, খাদটি বড় বড় পাথরে তৈরি, পানি এত গভীর ও নীলাভ যে অনেকে সেখানে স্নান করতে সাহস পেতেন না, আর চাকমারা খাদটিকে “রাঙামাত্য মোর” বলতেন। আজাদ বুলবুলের বইয়ে একই জায়গার নাম “রাঙামাইট্যা মোড়”, যেখানে বর্ষায় তীব্র ঘূর্ণিস্রোত তৈরি হতো।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আলাদা জেলা হয় 1860 সালে, আর প্রথম সদর দপ্তর ছিল চন্দ্রঘোনায়। সেখান থেকে রাঙামাটিতে সরে আসার সাল নিয়ে উৎসগুলো একমত নয়: হান্টার বলছেন 1868, হাচিনসন 1865, তারাচরন চাকমা শহরের পত্তন লিখেছেন 1870, আর ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী 1860 থেকেই সদর রাঙামাটি।
| উৎস | কী বলছে |
|---|---|
| W. W. Hunter, A Statistical Account of Bengal, খণ্ড 6 (1876) | জেলার প্রশাসনিক সদর দপ্তর চন্দ্রঘোনায় ছিল 1868 সালের নভেম্বর পর্যন্ত; তারপর রাঙামাটিতে স্থানান্তর। |
| R. H. Sneyd Hutchinson, An Account of the Chittagong Hill Tracts (1906) | 1860 সালে আলাদা জেলা, চন্দ্রঘোনা থেকে শাসন; 1865 সালে সদর রাঙামাটিতে সরে, চট্টগ্রাম থেকে নদীপথে 65 মাইল উজানে। |
| তারাচরন চাকমা, আমাদের আর্কাইভ | রাঙামাটি শহরের পত্তন 1870 সালে; তার আগে রাজধানী ছিল চন্দ্রঘোনা। |
| মানিক লাল দেওয়ান, আমাদের আর্কাইভ | 1860 সালে জেলা সৃষ্টি; প্রথমে সদর চন্দ্রঘোনা, পূর্ণাঙ্গ জেলা হলে সদর রাঙামাটিতে আসে (সাল উল্লেখ নেই)। |
| দৈনিক ইত্তেফাক, 7 সেপ্টেম্বর 2025 | 1860 সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গঠিত হয়, যার সদর দপ্তর ছিল রাঙামাটি। |
স্থানান্তরটি কেমন ছিল, তার একটি সমসাময়িক বিবরণ আছে টমাস হার্বার্ট লিউইনের আত্মজীবনী A Fly on the Wheel-এ (1912)। লিউইন তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসক। তিনি লিখেছেন, রাঙামাটিতে নতুন সদর প্রতিষ্ঠার কাজ তাঁকে শেষ করতে হয়েছিল: পুলিশ ব্যারাক, আদালত, ট্রেজারি আর বাজার চন্দ্রঘোনা থেকে নদীর চল্লিশ মাইল উজানে সরিয়ে আনা। অর্থাৎ পুরনো রাঙামাটির বাজার নিজেও একবার স্থানান্তরিত বাজার; প্রায় নব্বই বছর পর বাঁধের পানিতে দ্বিতীয়বার সেটিকে সরতে হয়।
হান্টারের বিবরণে শহরটির প্রথম দিকের কয়েকটি চিহ্ন পাওয়া যায়। রাঙামাটিতে একটি সরকারি স্কুল ছিল 1863 সাল থেকে, যার দুটি বিভাগ: বর্মি বিভাগে খ্যংথা ছেলেরা বর্মি ও ইংরেজি পড়ত, বাংলা বিভাগে চাকমা ও গুর্খা ছেলেরা। 1871 সালের নভেম্বরে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি টেলিগ্রাফ চালু হয়, কিন্তু ব্যবহার কম হওয়ায় 1 মে 1875 তারিখে রাঙামাটির অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। হান্টার আরও লিখেছেন, ফ্রন্টিয়ার বাহিনী থেকে শারীরিক অক্ষমতার কারণে অবসর পাওয়া গুর্খা সৈন্যদের নিয়ে রাঙামাটিতে একটি বসতি স্থাপন করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটির দিকে 21 মাইলের একটি পায়ে চলা পথ ছিল ডাক-সড়কের অংশ।
তিরিশ বছর পর হাচিনসন শহরটিকে দেখেছেন “কর্ণফুলী নদীর তৈরি একটি উপদ্বীপে” অবস্থিত সমৃদ্ধ বসতি হিসেবে, চট্টগ্রাম থেকে নদীপথে 65 মাইল, সড়কপথে 46 মাইল। প্রতি বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম থেকে একটি সরকারি স্টিমার ছেড়ে নয় ঘণ্টায় রাঙামাটি পৌঁছাত। এই “উপদ্বীপ” কথাটি প্রায় একশ বছর পরের স্মৃতিকথাগুলোর বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায়। জেলাটির আজকের প্রশাসনিক কাঠামো জানতে দেখুন রাঙামাটি জেলা পরিচিতি।
উপদ্বীপের মুখে, ডিসি বাংলোর নিচে, ছিল জেলার প্রশাসনিক অংশ: ডিসি অফিস, ট্রেজারি, কোতোয়ালী থানা, পোস্ট অফিস। তার পরে একটি বড় খেলার মাঠ, মাঠের দুই পাশে দুটি পাকা রাস্তা আর বড় বড় মেহগনি গাছ। রাস্তা ধরে সরকারি কর্মচারীদের কোয়ার্টার, হাসপাতাল, ক্লাব, তারপর বাজার, মন্দির, মসজিদ আর খেয়াঘাট।
তিনটি বিবরণ পাশাপাশি রাখলে মোটামুটি একটি নকশা দাঁড়ায়। তারাচরন চাকমার বর্ণনা: থানার লাগোয়া ওসির কোয়ার্টার, পুলিশ ক্লাব ও পানি সরবরাহের মেশিনঘর; পূর্বদিকে সামান্য উঁচু টিলার ওপর বাজার ফান্ড অফিস, ট্রেজারি অফিস ও ডিসি অফিস; নিচে সিএন্ডবি অফিস, তার উত্তরে পোস্ট অফিস। ডিসি অফিসের নিচে রাস্তার পাশে একটি বড় হোটেল-রেস্তোরাঁ, নাম “কোর্ট বিল্ডিং রেস্টুরেন্ট”। পোস্ট অফিসের পাশে নদীর ঘাটে পাকা সিঁড়ি, সেখানে খেয়ামাঝি সবসময় তৈরি থাকতেন; নদীর ওপারে ছিল পুরান বস্তি নামের পাড়া।
আজাদ বুলবুলের বইয়ের “রাঙ্গামাটি টাউন” অধ্যায়ে (পৃ. 32–33) প্রায় একই তালিকা, সঙ্গে আরও কিছু: সড়কের মাঝামাঝি ইন্দ্রপুরী সিনেমা হল, তার দক্ষিণে ফুটবল মাঠ; মাঠের পশ্চিমে নদীর কূল ঘেঁষে কয়েকটি দোকান, একটি কালী মন্দির, শাহ জুনিয়র বয়েজ স্কুল, স্টাফ কোয়ার্টার, হাসপাতাল, সিভিল সাপ্লাইয়ের প্রধান অফিস, কারমাইকেল হল, টেনিস কোর্ট, প্রাইমারি গার্লস স্কুল, সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার ও আবাসিক বাড়িঘর। একটু দূরে রাঙামাটি সমবায় সমিতি। এসব স্থাপনার মেঝে পাকা, বেড়া কাঠ ও বাঁশের, ছাউনি টিনের। আরও দক্ষিণে রাস্তার দুই পাশে একটি হিন্দু মন্দির, একটি মসজিদ, একটি ধর্মশালা আর একটি বিশাল বটগাছ, তারপর বাজারের খেয়াঘাট।
মানিক লাল দেওয়ানের বর্ণনায় উপদ্বীপের প্রথম অংশে ডিসি অফিস, সড়ক ও জনপথ অফিস, পোস্ট অফিস ও কোতোয়ালী থানা; এরপর বিস্তীর্ণ খেলার মাঠ; মাঠের দুই পাশের দুটি পাকা রাস্তা পরে মিলে উপদ্বীপের পূর্ব সীমানা পর্যন্ত গেছে। রাস্তার দুই পাশে সরকারি কর্মচারীদের সারিবদ্ধ বাসা আর আমবাগান। কর্মচারী কলোনির শেষ প্রান্তে ডান পাশে সরকারি হাসপাতাল, বাম পাশে ছোট একটি কারমাইকেল ক্লাব, তারপর চার সারির একটি বিশাল বাজার।
শহর থেকে বাইরে যাওয়ার পথও উৎসে আছে। তারাচরন চাকমা ও আজাদ বুলবুল দুজনেই লিখেছেন, কোতোয়ালী থানার পাশ দিয়ে কর্ণফুলী ঘেঁষে চট্টগ্রামের রাস্তা খচ্চর ঘাট হয়ে চলে গেছে। আজাদ বুলবুলের বইয়ে খচ্চর ঘাট ছিল আজকের পুলিশ লাইন প্রাইমারি স্কুলের দক্ষিণে, চাকমা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের আবাসিক এলাকা; একটি ছোট ছড়ার ওপর কাঠের সেতু ছিল, আর সেখান দিয়ে চট্টগ্রামমুখী বাস ও জিপ চলত। একসময় এখানে মালবাহী খচ্চর পালা হতো বলে নাম খচ্চর ঘাট। দূরের যাত্রীরা লঞ্চে আসতেন; বইয়ের তথ্যদাতাদের মনে আছে সারদা, কৃপা, লালা ও দোভাষীদের লঞ্চের নাম, যেগুলো ভিড়ত অভয়মিত্র ঘাটে।
বাঁধের আগে শহরের মূল আকর্ষণ ছিল রাঙামাটি বাজার। দোকানের বেশির ভাগ টিনের ঘর, বাঁশ-বেতের চাউনি; পাকা স্থাপনা প্রায় ছিল না। হাটবার নিয়ে দুই সময়ের দুই তথ্য আছে: হাচিনসন 1906 সালে লিখেছেন সোম ও বৃহস্পতিবার, আজাদ বুলবুলের তথ্যদাতারা 1947-এর আগের সময়ের কথা বলেছেন রবি ও বৃহস্পতিবার।
হাচিনসনের চোখে বাজারটি “ধীরে ধীরে বাড়ছে” এবং বাংলার বাজারগুলোর তুলনায় “পরিচ্ছন্নতার আদর্শ”; হাটের দিন আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ ভিড় করে নিজেদের ফসল বিক্রি আর সংসারের জিনিস কিনতে আসতেন। হান্টার 1875 সালের তথ্যে লিখেছেন, পাহাড়ের মানুষ কাঠ, তুলা, বাঁশ, বেত, ছনসহ বনজ পণ্য রাঙামাটি, কাসালং, চন্দ্রঘোনা ও বান্দরবানের বাজারে নামিয়ে আনতেন, আর বিনিময়ে কিনতেন চাল, লবণ, মসলা, শুঁটকি, শূকর, গবাদিপশু, কাপড় ও তামাক।
মানিক লাল দেওয়ানের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি বাজারের বিশাল বিশাল তুলার স্তূপ। তাঁর অনুমান, এই তুলা ইংল্যান্ডে চালান হতো; তিনি লিখেছেন 1947 সালের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে তুলার উৎপাদন ক্রমশ কমে যায়। বাজারের শেষ প্রান্তের বাম কোণে কালীমন্দির, ডান কোণে মসজিদ, মাঝখানের খালি মাঠে প্রতিবছর বলী খেলা হতো; কালীবাড়ির পাশের পুরনো বটগাছে হাজার হাজার বাদুড় ঝুলে থাকত।
আজাদ বুলবুলের বইয়ে (পৃ. 78–79) বাজারের দোকানিদের বেশির ভাগ ছিলেন হিন্দু। বড় দোকানে চিনি, মিছরি, চা-পাতা, সাবান, সুগন্ধি তেল পাওয়া যেত, যেগুলোর ক্রেতা শহরের বাবুরা; পাহাড়িরা কিনতেন লবণ, কেরোসিন, শুকনো মরিচ, শুঁটকি, নাপ্পি আর রাবগুড়। মাছবাজার আলাদা জায়গায় বসত। জলিল চৌধুরীর হোটেলে রাতে থাকার ব্যবস্থা ছিল, পাশেই লঞ্চঘাট। একমাত্র পাকা দোকানঘরটি ছিল দোভাষীদের। বাজারবারে কারমাইকেল হলে নাচগানের আসর বসত।
বইটিতে বাঁধের আগের বাজারদরের কয়েকটি তালিকা আছে। লেখক নিজেই জানিয়েছেন, তালিকাগুলো মৌখিক বয়ান থেকে সংগৃহীত এবং কোনো মুদ্রিত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যটি একটি লিখিত দলিল থেকে: কালিরতন খীসার 1944 সালের বাজারের হিসাবখাতা।
| জিনিস | পরিমাণ | দাম (1944) |
|---|---|---|
| সোনা | প্রতি ভরি | 62–63 টাকা |
| ইচা শুঁটকি | প্রতি সের | 5 আনা |
| সুপারি | এক পণ | 2 আনা 9 পয়সা |
| জাপানি মার্কিন কাপড় (আম মার্কা) | প্রতি গজ | 9 পয়সা |
| লবণ | প্রতি সের | 2 আনা |
| চিনি | প্রতি সের | 5 আনা |
| চুল কাটা | জনপ্রতি | 1 আনা |
উৎস: আজাদ বুলবুল, কাপ্তাই বাঁধে ডুবে যাওয়া রাঙ্গামাটি, পৃ. 82, কালিরতন খীসার 1944 সালের হিসাবখাতা থেকে। একই পাতায় আরেক তথ্যদাতার স্মৃতিতে 1943 সালে ধান প্রতি মণ 2 টাকা, চাল 16 সের 1 টাকা, হালের বলদ জোড়া 50–60 টাকা, আর নদী পারাপারে নৌকাভাড়া 1 পয়সা।
পুরনো রাঙামাটিতে ছিল পুরো জেলার একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি হাসপাতাল, একটি সিনেমা হল আর একটি ক্লাবঘর। আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ পড়তে, চিকিৎসা নিতে, বই কিনতে আর যাত্রাপালা দেখতে এই শহরে আসতেন। শহরের শিক্ষিত সমাজ গড়ে উঠেছিল মূলত সরকারি চাকরিজীবী পরিবারগুলোকে ঘিরে।
হাচিনসন 1906 সালে লিখেছেন, রাঙামাটি স্টেশনে একটি হাই ইংলিশ স্কুল আছে, যেখানে পঞ্চাশজন বিনা খরচের বোর্ডারের জায়গা, শর্ত হলো তাদের পাহাড়ি ছেলে হতে হবে। সঙ্গে ছিল সুসজ্জিত হাসপাতাল ও দাতব্য চিকিৎসালয়, জেলা পুলিশ রিজার্ভ লাইন, থানা, ট্রেজারি, ডাক ও টেলিগ্রাফ অফিস, সার্কিট হাউস আর একটি বড় বাজার। রাঙামাটি তখন লন্ডন ব্যাপটিস্ট মিশনেরও সদর দপ্তর।
মানিক লাল দেওয়ান 1945 সালে যখন ভর্তি হন, তখনও এটি, তাঁর ভাষায়, পার্বত্য অঞ্চলের একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়; ক্লাসে ছাত্র বিশজনের বেশি নয়, ছাত্রী একজন। আজাদ বুলবুলের বইয়ে (পৃ. 73–74) বলা হয়েছে, 1958 সালের আগে পুরো রাঙামাটি মহকুমায় একটিমাত্র সরকারি হাইস্কুল ছিল, আর গ্রামাঞ্চলে লেখাপড়া ছিল কঠিন। কিন্তু শহরের অবস্থা ছিল আলাদা: শিক্ষিত অভিভাবকেরা ছেলেমেয়ে উভয়কে স্কুলে পাঠাতেন, প্রাইভেট টিউটর ও লজিং মাস্টার রাখতেন। বইয়ের ভাষায়, 1947-এর আগে কিংবা 1960 সালে বাঁধ নির্মাণের আগে থেকে যেসব সরকারি কর্মচারী রাঙামাটিতে স্থায়ীভাবে থাকতেন, তাঁরা সন্তানদের পড়ানোর পূর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন, আর তাঁদের ঘিরে রাঙামাটিতে একটি শিক্ষিত সমাজ গড়ে ওঠে।
স্কুলের ছাত্রদের অনুপাত নিয়ে বইটিতে তথ্যদাতাদের দুটি হিসাব আছে: একটিতে 80 শতাংশ পাহাড়ি, 15 শতাংশ হিন্দু ও 5 শতাংশ মুসলিম; অন্যটিতে 1959 সালে, বাঁধের প্রস্তুতির সময়, 70 শতাংশ পাহাড়ি ও 30 শতাংশ বাঙালি, এবং 60 শতাংশ ছাত্র ও 40 শতাংশ ছাত্রী। দূরের শিক্ষার্থীরা স্কুল হোস্টেলে থাকত। নাটক মঞ্চস্থ হতো স্কুলের মিলনায়তনে।
শহরের বিনোদনের দুটি কেন্দ্রের নাম বারবার আসে। ইন্দ্রপুরী সিনেমা হল ছিল কামিনী মোহন দেওয়ানের; আজাদ বুলবুলের তথ্যদাতাদের মনে আছে, সেখানে হিন্দি, উর্দু ও ভারতীয় বাংলা ছবি চলত, টিকিটের দাম আট আনা থেকে পাঁচসিকা। কারমাইকেল হল সম্পর্কে বইটি বলছে, ব্রিটিশ আমলে গভর্নর কারমাইকেলের স্মৃতিতে চাকমা রাজার তত্ত্বাবধানে, হেডম্যান, কার্বারি, দেওয়ান ও তালুকদারদের আর্থিক সহযোগিতায় এটি তৈরি হয়েছিল; সেখানে তাস, ক্যারাম ও দাবা খেলা চলত। শহরে কামিনী মোহন দেওয়ানের “স্টুডেন্ট লাইব্রেরি” নামের বইয়ের দোকানও ছিল; বইটির এক বয়ানে বারো মাইল দূরের পুঁটিখালী থেকে স্কুলের ছাত্ররা সেখানে পাঠ্যবই কিনতে আসত।
পুরনো চাকমা রাজবাড়ি ছিল শহরের ঠিক উল্টো দিকে, কর্ণফুলীর পূর্ব পাড়ে। দ্য ইনডিপেনডেন্ট ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজা ভুবনমোহন রায় 12 বছর ধরে দোতলা রাজবাড়িটি তৈরি করেন, শেষ হয় 1914 সালে। কাপ্তাই হ্রদের পানিতে এটি ডুবে যায়; ডোবার সাল উৎসভেদে 1960, 1961 অথবা 1962।
মানিক লাল দেওয়ান লিখেছেন, রাজবাড়িটি ছিল বর্তমান ডিসি বাংলোর পূর্ব-দক্ষিণে প্রায় আধা মাইল দূরে, তৈরি করেছিলেন রাজা ভুবনমোহন রায়, আর এর ফটকের দুই পাশে ছিল পাথরের দুটি বড় সিংহমূর্তি। আজাদ বুলবুলের বইয়ে (পৃ. 33) আরও বিস্তারিত: বিশাল দ্বিতল অট্টালিকা, পাকা মেঝে মাটি থেকে সাত-আট ফুট উঁচু; সিংহদরজার দুই পাশে বসার ভঙ্গিতে দুটি সিংহমূর্তি, তাদের নিচে দুটি কামান আর সামনে “ফতে খাঁ” নামের বিশাল কামান; কাছেই রাজা ভুবনমোহন রায়ের শ্বেতপাথরের মূর্তি; ভেতরে কাছারিঘর, দরবার হল, নাটমন্দির ও বৌদ্ধ বিহার, বিহারে অষ্টধাতুর তৈরি চল্লিশ মণ ওজনের একটি শাক্যমুনি মূর্তি।
যাঁরা ভেতরে গিয়েছিলেন, তাঁদের স্মৃতি টুকরো টুকরো। পঞ্চ চাকমা লিখেছেন, ডোবার আগে তিনবার রাজবাড়ি দেখার সুযোগ হয়েছিল তাঁর: গেট দিয়ে ঢুকলেই দুটি সিংহমূর্তি, লম্বা বারান্দায় অনেক ছবি, লোহায় মোড়া দুটি বড় হাতির দাঁত, একটি বৌদ্ধমন্দির, একটি বিশাল নাটঘর যেখানে রাজপুণ্যাহের সময় যাত্রাপালা হতো, আর ওপরতলায় গ্রিলঘেরা একটি বড় ঝুলবারান্দা। তিনি নিজেই প্রশ্ন রেখেছেন, রাজা ভুবনমোহনের মূর্তিটি পানিতে ডুবেছিল, নাকি নতুন রাজবাড়িতে আনা হয়েছিল। এই প্রশ্নের উত্তর কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

রাজপরিবার কবে রাঙামাটিতে এসেছিল, সে নিয়েও উৎস আলাদা কথা বলে। আজাদ বুলবুলের বইয়ে (পৃ. 106) আছে, 1863 সালে রাজা হরিশচন্দ্র রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর থেকে চাকমা রাজবাড়ি রাঙামাটির বালুখালীতে সরিয়ে আনেন। প্রথম আলোর 2024 সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রানি কালিন্দী রায় 1874 সালে মারা যাওয়ার পর রাজা হওয়া হরিশচন্দ্র রায় তিন বছরের মাথায় রাঙামাটিতে চলে আসেন। হান্টার 1875 সালের তথ্যে হরিশচন্দ্রকে “বর্তমান রাজা” বলেছেন, আর হাচিনসন 1906 সালে লিখেছেন চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ভুবনমোহন রায়ের সদর দপ্তর রাঙামাটিতে। চাকমা সার্কেল ও রাজার প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন চাকমা সার্কেল, হেডম্যান ও কার্বারি লেখায়।
| উৎস | রাজবাড়ি ডোবার সাল |
|---|---|
| মানিক লাল দেওয়ান, স্মৃতিকথা | 1961 |
| দ্য ইনডিপেনডেন্ট, 13 সেপ্টেম্বর 2018 | 1962 |
| দ্য ডেইলি স্টার, 15 মে 2006 | 1960 সালে বাঁধ দেওয়ার পর; প্রতিবেদনের সময় “প্রায় ছেচল্লিশ বছর আগে” |
| প্রথম আলো, 7 নভেম্বর 2024 | 1960 সালে বাঁধ দেওয়ার পর (চাকমা সার্কেল কার্যালয়ের কর্মকর্তার উদ্ধৃতি) |
শহরের সঙ্গে ডুবেছিল তার চারপাশের পাড়াগুলোও। আজাদ বুলবুলের বই (পৃ. 29) অনুযায়ী কর্ণফুলীর তীরের 59 নং বন্দুকভাঙ্গা, রাজার খাস, নোয়াদম, জুমতো পাড়া, খারিখ্যাং, কুকিপাড়া, তঞ্চঙ্গ্যাপাড়া, মোবাছড়ি পাড়া ও ত্রিপুরাছড়া সবই পানির নিচে যায়। বন্দুকভাঙ্গার বেশির ভাগ মানুষ পরে খাগড়াছড়ির পানছড়ি, লোগাং, পুজগাং ও আচালং-এ বসতি গড়েন।
একই বইয়ের আরেকটি তালিকায় (পৃ. 31) কচুনালা, সিঙ্গিনালা, পাকুয্যানালা, রাঙামাইট্যা খাল, পুরানবস্তি, দেবানের চর, চেঙ্গীমুখ রিজার্ভ, তিবিরা পাড়া ও রাজবাড়ি এলাকার নাম আছে, যাদের প্রায় সবাই মাটির রাস্তায় পায়ে হেঁটে শহরে আসতেন। বইটি আরও বলছে, দূর থেকে আসা মানুষ জেলা সদরের লাগোয়া রাঙামাটি বাজারকেই “রাঙামাটি টাউন” ভাবতেন। পৃ. 28-এ রাঙামাটি তালুকের ঝগড়াবিল, জীবতলী ও কামিলাছড়ি, আর রাজভবন তালুকের বালুখালী ও মগবানের নাম আছে।
করুণাময় চাকমার বয়ানে তাঁর গ্রাম ছিল 104 নম্বর ঝগড়াবিল মৌজা, রাঙামাটি শহর থেকে মাত্র পাঁচ মাইল দক্ষিণে; তিনি লিখেছেন, আজকের তবলছড়ি বাজারও তখন এই ঝগড়াবিল মৌজার অন্তর্ভুক্ত ছিল, আর আসল ঝগড়াবিল আদাম ডুবে আছে আজকের পর্যটন মোটেলের পূর্ব-দক্ষিণের পানির নিচে। গ্রামে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত একটি এমই স্কুল ছিল; তার আগে প্রাথমিক শিক্ষার জন্যও রাঙামাটি শহরে যেতে হতো। পঞ্চ চাকমার গ্রাম মাইচছড়ি আদাম ছিল শুভলং এলাকায়, তাঁর আন্দাজে তখনকার শহর থেকে চার-পাঁচ মাইল; তখন হাঁটাপথে শহরে আসা যেত, এখন কেবল পানিপথ।
তারাচরন চাকমা শহরের পাশের গ্রামগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে মগবান, বালুখালী ও বরাদমের কথা লিখেছেন, যেগুলো তাঁর ভাষায় শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত ও উর্বর জনপদ ছিল। তাঁর হিসাবে রাঙামাটি শহর ও এর সংলগ্ন উজান-ভাটির উর্বর সমতল জমির একশ ভাগই জলমগ্ন হয়।
শহর একদিনে ডোবেনি। আজাদ বুলবুলের সংগৃহীত বয়ান অনুযায়ী 1959 সালে প্রথমবার পানি আটকানোর সময় উজানের কিছু গ্রাম ডোবে, আর 1961 সালে স্থায়ীভাবে বাঁধ বন্ধ হলে পানি ধাপে ধাপে উঠে লোয়ার রাঙামাটির মাঠ, বাজার, কোয়ার্টার ও অফিস ঢেকে দেয়। মাইকে, ঢোল পিটিয়ে আর স্পিডবোট থেকে টিনের চোঙা ফুঁকে মানুষকে উঁচু জায়গায় সরে যেতে বলা হয়।

প্রথম খবর এসেছিল জরিপকর্মীদের হাতে। বইয়ের (পৃ. 35) এক বয়ানে কর্ণফুলীর পশ্চিম তীরের কচুনালা গ্রামে সাদা পোশাকের কয়েকজন লোক নৌকায় এসে নারকেল গাছের মাথায় সাদা রং দিয়ে দাগ দিয়ে যান; তাঁদের মুখেই গ্রামের মানুষ প্রথম শোনেন যে কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি হবে। আরেক বয়ানে (পৃ. 38) মাইনীতে কাপ্তাই প্রকল্পের “রেঞ্জ মার্ক” বা সতর্কচিহ্নের কথা: 95 ফুট উচ্চতায় কয়েকজন চাষ করছেন, অথচ পানি উঠবে 120 ফুট পর্যন্ত, তাই ঘরবাড়ি, জমি, মাচাংঘর সব বানাতে হবে 120 ফুটের ওপরে।
শহর ডোবার দিনের সবচেয়ে স্পষ্ট বিবরণ আছে “পুঁজি হারিয়ে যায় লেকের তলায়” অংশে (পৃ. 36)। এক কাঠ ব্যবসায়ী পরিবার নিয়ে শহরে এক বন্ধুর বাসায় উঠেছিলেন; বাঁধের পানির তীব্র স্রোতে তাঁর জমানো কাঠ চোখের সামনে ভেসে যায়। মাইকে ঘোষণা হচ্ছিল, উত্তরে পানি বাড়ছে, শিশু ও মহিলাদের নিয়ে ডিসি অফিসের বারান্দায় চলে আসুন। মাইক থামার আগেই ডুবতে শুরু করে প্যারেড গ্রাউন্ড, বাজার আর কেরানিদের বাসাবাড়ি; ওপারের রাজবাড়িকেও তখন পানি গ্রাস করছিল। তিনি প্রথমে আপার রাঙামাটিতে এক পরিচিতের বাসায়, পরে রাঙাপানিতে সরে যান।
“মাছের পোনায় দুঃখ লীন” অংশে (পৃ. 40) মূল শহর ডোবার দিনের সকাল: রাতে বাঁধ বন্ধ হয়েছে, পানি হু হু করে বাড়ছে; সিঙ্গিনালায় বাড়িতে বুক সমান পানি; ছোট নৌকায় অতি প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া কিছুই নেওয়া যায়নি, পোষা কুকুর-বিড়াল ফেলে যেতে হয়েছে। নৌকা আপার রাঙামাটির দিকে যাচ্ছিল, আর ডিসি বাংলোর পাশের প্যারেড মাঠে তখন ছিপছিপে পানিতে লাখ লাখ মাছের পোনা ঘুরছিল।
“কান্নার স্রোতে ডুবে যায় জনপদ” অংশে (পৃ. 39) একজন তথ্যদাতা পানছড়ি থেকে ফিরে দেখেন রাঙামাটি প্রায় ডুবে গেছে: রাজবাড়ির চূড়া, ডিসি অফিসের টিনের চাল আর কয়েকটি বড় গাছের মাথা ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আরেক বয়ানে (পৃ. 39) তখন মাইক ছিল না; স্পিডবোটে ডুবন্ত পাহাড়ের কাছে গিয়ে চোঙা ফুঁকে বলা হতো, আরও উঁচু পাহাড়ে উঠে যাও। প্রশাসন বাজারে ঢোল পিটিয়েও সবাইকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল (পৃ. 41), আর শহর ডোবার সময় সরকার পাহাড়ের চূড়ায় একটি ট্রানজিট ক্যাম্প বানিয়েছিল, যেখানে অনেকে উঠতেই পারেননি (পৃ. 43)।
পানি একবারে স্থির হয়নি। আজাদ বুলবুলের বইয়ে (পৃ. 41) আছে, বাঁধের কাজ শেষ হয়ে পানি বাড়ার দু-তিন মাস পর পানি নেমে গেলে হাইল্যা চাষিরা ফিরে এসে আবার চারা রোপণ করেন; মাসখানেক পর আবার মাইকে “পানি আসছে” ঘোষণা, আর এবার সব ডুবে যায়। পাকা ধান কাটার আগের রাতেই পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কথাও আছে। করুণাময় চাকমা লিখেছেন, তাঁর পরিবার গ্রামে পানি আসার আগেই, 1959 বা তার কাছাকাছি সময়ে, পুরনো গ্রাম ছেড়ে চলে আসে; তিনি পরিবারকে রাঙামাটি শহরে রেখে দলবল নিয়ে কাজলং-এ জমির দখল বুঝে নিতে যান।
আজাদ বুলবুলের বই অনুযায়ী রাঙামাটি টাউনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ শহর ছেড়ে চলে যান। চাকরি, ব্যবসা বা অন্য উপার্জনের পেশায় যুক্ত হাজার পাঁচেক মানুষ থেকে যান। শহরের চাকরিজীবীদের পুনর্বাসন হয় আপার রাঙামাটিতে; বইয়ের ভাষায়, তখন কেবল সরকারি চাকরিজীবীরাই নতুন শহরে পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছিলেন।
এই তিনটি বাক্য বইয়ের দুটি আলাদা জায়গা থেকে (পৃ. 36 ও 44), আর এগুলোই পুরনো ও নতুন রাঙামাটির মধ্যের সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা বুঝিয়ে দেয়: পুরনো শহর ছিল আশপাশের কৃষিনির্ভর পাড়াগুলোর সঙ্গে জড়ানো একটি বাজার-শহর, নতুন শহর গড়ে উঠল অফিস আর চাকরিকে কেন্দ্র করে। মোবাছড়ি পাড়া থেকে উদ্বাস্তুরা চলে যান কেরেঙ্গানালার নতুন জনপদে; শহরের পুরানবস্তির বাঙালি মুসলমান পরিবারগুলোর একটি অংশ খাগড়াছড়ির বাঙালকাটিতে মং সার্কেলের 265 নং মৌজায় বসতি গড়ে (পৃ. 48)।
বাকিরা গেলেন দূরে। আজাদ বুলবুল লিখেছেন (পৃ. 53), রাঙামাটির লোকজনের অধিকাংশ স্থানান্তরিত হয় মারিশ্যা অঞ্চলে, যেখানে কাচালং রিজার্ভের 77 বর্গমাইল বনমুক্ত করে পুনর্বাসন জোন তৈরি করা হয়; অন্য খাস এলাকা খুঁজে বের করা হয় লক্ষ্মীছড়ি, পানছড়ি, আচালং, খাগড়াছড়ি, দীঘিনালা, মহালছড়ি, রামগড়, চন্দ্রঘোনা, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়িতে। মারিশ্যা তখন দীঘিনালা থানার অধীনে, বাঘাইছড়ি উপজেলা তখনো হয়নি; রাঙামাটি থেকে দূরত্ব সত্তর-আশি মাইল (পৃ. 52)। নতুন বসতিগুলোর নাম রাখা হয় ডুবে যাওয়া গ্রামের নামে: জীবতলী, তুলাবান, মগবান, গোলাছড়ি, ঝগড়াবিল, বালুখালী। কাচালং-এর বন কাটার মাপ নিয়ে বইটির ভেতরেই দুটি হিসাব আছে: এক জায়গায় দশ হাজার একর (পৃ. 46), আরেক জায়গায় 77 বর্গমাইল (পৃ. 53)।
1964 সালের দিকে মারিশ্যা, সিজক, খেদারমারা ও দূরছড়ি থেকে প্রতিদিন চার-ছয়টি পরিবার কর্ণফুলী-ঠেগা হয়ে ভারতের দিকে রওনা দিত বলে বইটি জানাচ্ছে (পৃ. 53)। এই যাত্রা, যাকে চাকমারা বড়পরং বলেন, আর অরুণাচলে তাঁদের আজকের নাগরিকত্বের প্রশ্ন আলাদা লেখার বিষয়: ভারতের চাকমা: কাপ্তাই বাঁধের উদ্বাস্তুরা কোথায় গেলেন।
কাপ্তাই বাঁধে ডোবা জমির জন্য একটিমাত্র সরকারি হারের তালিকা উৎসগুলোতে পাওয়া যায়নি। আজাদ বুলবুলের সংগৃহীত বয়ানে জমির শ্রেণিভেদে একরপ্রতি হার তিন রকম। তবে একটি বিষয়ে সব বয়ান একমত: কেবল বন্দোবস্তি ও মৌজা জমাবন্দিতে নথিভুক্ত জমির মালিকেরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন।
| বয়ান (আজাদ বুলবুলের বই) | 1 নং জমি (একরপ্রতি) | 2 নং জমি | 3 নং জমি / পাহাড় | অন্যান্য |
|---|---|---|---|---|
| শহরলাগোয়া সিঙ্গিনালার এক তথ্যদাতা (পৃ. 46) | 400 টাকা | 300 টাকা | 3 নং জমি 200 টাকা | ফলের গাছ এক আনা-দুই আনা; বসতবাড়ির ক্ষতিপূরণ “নিতান্তই কম” |
| কুতুবদিয়ার 52 একর জমির মালিকের পরিবার (পৃ. 46) | 300 টাকা | 200 টাকা | পাহাড় 100 টাকা | সবাই পাননি; শুধু বন্দোবস্তি ও রেজিস্ট্রিকৃত জমির মালিকেরা |
| 79 একর প্রজাবিলি ও 40 একর খাসজমির এক পরিবার (পৃ. 45) | 250 টাকা | 150 টাকা | — | টিন-কাঠের বাংলো বাড়ির জন্য মাত্র 7 টাকা; বড় গাছ প্রতিটি 2–3 টাকা |
| ছয় একর জমির এক পরিবার (পৃ. 45) | মোট 1,800 টাকা | — | — | ঘরবাড়ির জন্য 250 টাকা; কলাগাছ প্রতিটি 4 আনা |
বইটি বলছে (পৃ. 46), পুনর্বাসনকর্মীরা মৌজা জমাবন্দি ধরে মালিকানা ঠিক করেছিলেন; ফলে বহু মানুষ জমির মালিক হয়েও জমাবন্দিতে নাম না থাকায় ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হন, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন যাঁরা দরিদ্র ও লেখাপড়ায় পিছিয়ে ছিলেন। আরেক তথ্যদাতার পরিবারের আট একর ধানি জমি ও তেরো একর পাহাড়ের জন্য মিলেছিল দু-তিন হাজার টাকা (পৃ. 51); বন্দোবস্তির বাইরে দখলে থাকা জমির জন্য কিছুই দেওয়া হয়নি।
বড় অঙ্কের দুটি দাবিও বইটিতে আছে, দুটিই লেখকের দেওয়া তথ্য: কাপ্তাই বাঁধে চাকমা রাজপরিবার 14–15 লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিল, আর কামিনী মোহন দেওয়ান কেবল বসতবাড়ির জন্য 60 হাজার টাকা পান, যার স্বীকারোক্তি আছে তাঁর নিজের স্মৃতিকথা “পার্বত্য চট্টলের এক দীন সেবকের জীবন কাহিনী”-তে (পৃ. 55)। এই দুই অঙ্ক অন্য কোনো উৎসে মিলিয়ে দেখা যায়নি।
প্রতিশ্রুতিগুলোও লেখা আছে। আজাদ বুলবুলের বই অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান রাঙামাটিতে এসে সভা করেছিলেন ইন্দ্রপুরী সিনেমা হলে, যেটি তখন ডিসি বাংলোর নিচে; তথ্যদাতাদের মনে আছে বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও রেশন, আর ঘর, জমি, পুকুর, গোয়াল, বাগান সবকিছুর ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি (পৃ. 56)। আরেক তথ্যদাতা জানিয়েছেন (পৃ. 60), 1959 সালে প্রথম পানি আটকানোর পর বাঙালি চাষিরা ডিসি বাংলোয় গেলে তখনকার ডেপুটি কমিশনার আশ্বাস দিয়েছিলেন, একশ বছর পরেও লেকের নিচ থেকে জমি ভেসে উঠলে যার জমি তাকে ফেরত দেওয়া হবে। International Rivers-এর 2021 সালের নিবন্ধ বলছে, প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণের আশায় অনেকে রয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি কখনো রক্ষা করা হয়নি।
পুনর্বাসনের দুটি ফরমের কথাও বইয়ে আছে। বাঁধের পর ক্ষতিগ্রস্তদের বি-ফরমে লিখতে হতো তাঁরা কোথায় যেতে চান (পৃ. 45)। বইয়ের ভাষায়, বি-ফরমের লোকেরা গাড়িভাড়া, ট্রানজিট ক্যাম্পের খরচ, রেশন ও ঘর বানানোর টাকা পেয়েছিলেন, কিন্তু ই-ফরমের লোকেরা এসব কোনো সুযোগ-সুবিধা সরকারের কাছ থেকে পাননি (পৃ. 48)। যাঁরা বি-ফরম পূরণ করেননি, তাঁরা খাগড়াছড়িতে গিয়ে দেখেন খালি জায়গা আগেই অন্যদের নামে বরাদ্দ হয়ে গেছে।
নতুন রাঙামাটি শহর কোনো খালি জায়গায় নকশা করে বসানো হয়নি; পুরনো শহরের পেছনের উঁচু টিলা আর সংরক্ষিত বন কেটে ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছে। অফিস ও কর্মচারীরা গেলেন আপার রাঙামাটিতে, পুরনো বাজারের দোকানিরা গেলেন সংরক্ষিত বন কেটে বানানো রিজার্ভ বাজারে, আর বাজারের আরেক অংশ গেল তবলছড়িতে।
রিজার্ভ বাজারের জন্মকথা আজাদ বুলবুলের বইয়ের পৃ. 34-এ সবচেয়ে বিস্তারিত। বাঁধে শহর, দোকানপাট, অফিস, আদালত, রাঙামাটি বাজার ডুবল; সিদ্ধান্ত হলো পুরনো বাজারের লোকদের রিজার্ভ মুখ ও তবলছড়িতে পুনর্বাসন করা হবে। আজকের রিজার্ভ বাজারের জায়গায় তখন ছিল ছোট একটি প্রদর্শনী রিজার্ভ, যেখানে বনবিদ্যার ছাত্র-গবেষক ও বনকর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য দেখাতে আনা হতো; খ্রিস্টান গির্জা থেকে শুরু হতো রিজার্ভ মুখ। 1958 সালে এখানে গাছ কাটা শুরু হয়, আর 1960 সালে জায়গাটির নাম দেওয়া হয় নিউ রাঙামাটি।
সরকারের প্রথম পরিকল্পনা অবশ্য অন্যরকম ছিল। একই পাতায় বলা হয়েছে, রিজার্ভ মুখে প্রথমে একটি ফিশারিঘাট করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, আর পুরনো রাঙামাটির দোকানিদের জন্য বাজার বসার কথা ছিল রাঙাপানি মৌজার কাঁঠালতলীতে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা রিজার্ভ মুখ ছেড়ে যেতে রাজি না হওয়ায় নতুন বাজার এখানেই গড়ে ওঠে। ওদিকে তখনকার মহকুমা প্রশাসক মাঝের বস্তি এলাকায় পাহাড়ের নিচে নিজের নামে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন, যা কাসেম বাজার নামে পরিচিতি পায়; অল্পদিনের মধ্যে সেটি উঠে গিয়ে আজকের তবলছড়ি বাজারে সরে যায়।
বইয়ের পৃ. 53-এ ঘটনাটির আরেকটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ: রাঙামাটি বাজার ডুববে বলে বাজারের একাংশ পুনর্বাসিত হয় আপার রাঙামাটির তবলছড়িতে, সেখানে জায়গা না কুলানোয় আরেক অংশ যায় রিজার্ভ বাজারে। একই পাতায় আছে, ডিসি অফিস স্থানান্তরিত হয় “উন্নয়ন বোর্ড ভবনে”, যেটি 2005 সালে ভেঙে ফেলা হয়েছে। দুই বিবরণে তবলছড়ির জন্মের পথ আলাদা, তাই দুটিই এখানে রাখা হলো।
1961 সালে পুরনো বাজারের ডুবে যাওয়া দোকানের ব্যবসায়ীরা রিজার্ভ বাজারে আবার ব্যবসা শুরু করেন, কিন্তু বইয়ের ভাষায় “আগের জমজমাট অবস্থা ফিরে পেলো না” (পৃ. 34)। কিছু দোকান নাম বদলে টিকে গেল: পুরনো বাজারের এক চায়ের দোকান সরে গিয়ে হলো আরামবাগ হোটেল, আরেকটি হোটেল রিজার্ভ বাজারে এসে নতুন নাম পেল। আবার কিছু দোকান, যেমন একটি বন্দুকের দোকান, নতুন বাজারে আসেইনি; পুরনো শহর ডোবার সঙ্গে সেটিরও শেষ। আমাদের আর্কাইভের চাকমা রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি লেখায় পুরনো বাজারের একটি চাকমা মালিকানার হোটেল, “কদম্ব হোটেল”, বাঁধের পর রিজার্ভ বাজারে সরিয়ে নেওয়ার কথা আছে; সেই লেখায় এটাও বলা হয়েছে যে রিজার্ভ বাজার সৃষ্টি হয় রাঙামাটি রিজার্ভ কেটে রাঙামাটি বাজারকে স্থানান্তর করে।
নামটির উৎস নিয়ে আরও দুটি উৎস একমত। শরদিন্দু শেখর চাকমার বই উদ্ধৃত করে নিঝুম তালুকদার লিখেছেন, রাঙামাটি শহরের প্রধান বাজার রিজার্ভ বাজার বাঁধের আগে সংরক্ষিত বন ছিল, সেজন্য এই নাম। মানিক লাল দেওয়ানের আত্মজীবনীতে বাঁধের পরে রাঙামাটিতে ফিরে দেখা পরিবর্তনের তালিকায় আছে: পুরনো বা লোয়ার রাঙামাটি সম্পূর্ণ জলমগ্ন, রাজবাড়ি তলিয়ে গেছে, সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেটে রিজার্ভ বাজার ও তবলছড়ি বাজার সৃষ্টি করা হয়েছে, আর শহরটি পশ্চিম দিকে ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে।
আজকের শহরের কোন অংশগুলো বাঁধের আগে বন ছিল, তার একটি তালিকা দিয়েছেন মানিক লাল দেওয়ান: তবলছড়ি, রিজার্ভ বাজার, পুরনো বাস স্টেশন, কাঁঠালতলী, বনরূপা, চম্পক নগর, কালিন্দীপুর, ট্রাইবেল আদাম, দেবাশীষ নগর, কল্যাণপুর, কলেজ গেট ও ভেদভেদী। তাঁর ভাষায় এগুলো ছিল “গহীন জঙ্গলে ঢাকা”, আর এখন আপার রাঙামাটি বা রাঙামাটি শহরের অংশ।
পুরনো রাজবাড়ি ডোবার পর রাজা ত্রিদিব রায় নতুন রাজবাড়ি বানান। দ্য ইনডিপেনডেন্টের 2018 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী এটি তৈরি হয় 1962 সালে, রাঙামাটির রাজদ্বীপ গ্রামে। প্রথম আলো শুধু জানিয়েছে, পরে রাঙামাটি শহরের বর্তমান রাজ এলাকায় নতুন রাজবাড়ি গড়ে তোলা হয়।
প্রথম আলোর একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরনো রাজবাড়ি থেকে একটি কামান এনে বর্তমান চাকমা রাজ কার্যালয়ের পাশে রাখা হয়েছে। পুরনো রাজবাড়ির সামনের “ফতে খাঁ” কামানের কথা আজাদ বুলবুলের বইয়েও আছে, আর বাংলা উইকিপিডিয়ার একটি ছবির বর্ণনায় ফতে খাঁ কামান এখন রাঙামাটি রাজবাড়িতে সংরক্ষিত বলে লেখা। পুরনো রাজবাড়ির বাকি জিনিস, যেমন রাজা ভুবনমোহন রায়ের শ্বেতপাথরের মূর্তি বা বিহারের অষ্টধাতুর বুদ্ধমূর্তি, কী হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়; এ নিয়ে যতটুকু জানা যায়, তা পরের অংশে।
পুরনো রাঙামাটির সবচেয়ে পরিচিত চিহ্ন পুরনো রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, যা খরায় হ্রদের পানি অনেক নেমে গেলে 1986 ও 2006 সালে ভেসে উঠেছিল। এর বাইরে আজাদ বুলবুল লিখেছেন, শীতে লেকের পানি নামলে ডিসি বাংলোর সামনের পুরনো মেহগনি গাছগুলোর কঙ্কাল এখনো দেখা যায়।
দ্য ডেইলি স্টারের 15 মে 2006 তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী দীর্ঘ খরায় হ্রদের পানি কমে যাওয়ায় শতবর্ষী রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ দ্বিতীয়বারের মতো ভেসে ওঠে; প্রথমবার উঠেছিল 1986 সালে। মানুষ ভিড় করে ছবি তুলছিলেন, রাতে চুরির অভিযোগও ছিল। রাজপরিবারের সদস্য নন্দিত রায় প্রতিবেদককে বলেছিলেন, প্রাসাদটি ছিল একটি টিলার ওপর আর বিহারটি নিচু জমিতে, প্রায় 1,600 ফুট দূরে, এবং ধ্বংসাবশেষটি যে রাজবাড়িরই, তাতে তাঁর সন্দেহ নেই। প্রথম আলো 2024 সালে লিখেছে, পানি নামার সময় কিছু মানুষ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ইট নিয়ে গিয়েছিলেন; পুরনো রাজবাড়ির পাশের বিহারটি পানির নিচে, কিন্তু তার বড় বুদ্ধমূর্তিটি রয়ে গেছে।
মানুষের স্মৃতিও একরকম চিহ্ন। আজাদ বুলবুলের বইয়ের শেষ দিকের বয়ানগুলোতে (পৃ. 56–60) উদ্বাস্তুদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, বাঁধ খুলে দিলে তাঁরা পুরনো জায়গায় ফিরবেন কি না। একজন বলেছেন, অর্ধশতাব্দীতে কর্ণফুলীর তলায় পলি জমেছে, ধানের শহর হলেও সে শহর তাঁদের লাগবে না, তাঁর “স্মৃতির শহর” অনেকটাই বদলে গেছে। আরেকজন জানিয়েছেন, বাঁধের সময় কর্তারা বলেছিলেন আশি বছর বাঁচলে সবাই জমি ফিরে পাবে, কারণ ততদিনে হ্রদ ভরাট হয়ে যাবে। করুণাময় চাকমা লিখেছেন, আজো চোখ বন্ধ করলে তিনি পানিতে ডোবা ঝগড়াবিল আদামেই ফিরে যান।
উৎসগুলো মিলিয়ে পুরনো ও নতুন রাঙামাটির পার্থক্য এক ছকে নিচে দেওয়া হলো। প্রতিটি ঘরের তথ্য ওপরের অংশগুলোতে উৎসসহ আছে।
| বিষয় | পুরনো রাঙামাটি (বাঁধের আগে) | নতুন রাঙামাটি (বাঁধের পরে) |
|---|---|---|
| অবস্থান | ডিসি বাংলোর নিচে কর্ণফুলীঘেরা সমতল উপদ্বীপ (লোয়ার রাঙামাটি) | পেছনের উঁচু টিলা ও কেটে ফেলা সংরক্ষিত বন (আপার রাঙামাটি, রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি) |
| প্রশাসন | ডিসি অফিস, ট্রেজারি, কোতোয়ালী থানা উপদ্বীপের মুখে | ডিসি অফিস প্রথমে “উন্নয়ন বোর্ড ভবনে” (আজাদ বুলবুল); শহর পশ্চিমে সম্প্রসারিত |
| বাজার | চার সারির রাঙামাটি বাজার, লঞ্চঘাট ও খেয়াঘাটের পাশে | রিজার্ভ বাজার (1958 সালে গাছ কাটা শুরু, 1961 থেকে দোকান) ও তবলছড়ি বাজার |
| রাজবাড়ি | কর্ণফুলীর পূর্ব পাড়ে ভুবনমোহন রায়ের দোতলা রাজবাড়ি (1914) | রাজা ত্রিদিব রায়ের নতুন রাজবাড়ি (দ্য ইনডিপেনডেন্ট: 1962, রাজদ্বীপ) |
| বাসিন্দা | চাকরিজীবী, দোকানি, আশপাশের কৃষক পাড়ার মানুষ | আজাদ বুলবুলের হিসাবে দুই-তৃতীয়াংশ চলে যান; থাকেন চাকরি-ব্যবসায় যুক্ত প্রায় পাঁচ হাজার |
| যাতায়াত | খচ্চর ঘাট দিয়ে চট্টগ্রামের সড়ক, লঞ্চ, হাঁটাপথ | ডুবে যাওয়া হাঁটাপথের জায়গায় হ্রদের নৌপথ |
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য লেখাগুলো একসঙ্গে পাবেন জুমজার্নালের পার্বত্য চট্টগ্রাম আর্কাইভে।
পুরনো রাঙামাটি শহরের প্রাণকেন্দ্র ছিল আজকের ডিসি বাংলোর নিচ থেকে পূর্ব ও দক্ষিণে ছড়ানো একটি সমতল উপদ্বীপ, যার তিন দিক ঘিরে বইত কর্ণফুলী। স্থানীয়ভাবে এটিকে লোয়ার রাঙামাটি বলা হতো। উঁচু অংশটি, অর্থাৎ ডিসি বাংলো থেকে আজকের আসামবস্তির দিকের এলাকা, ছিল আপার রাঙামাটি। কাপ্তাই হ্রদের পানিতে লোয়ার অংশটি পুরো তলিয়ে যায়।
মানিক লাল দেওয়ানের আত্মজীবনী অনুযায়ী 1961 সালে লোয়ার রাঙামাটি সম্পূর্ণ জলমগ্ন হয়। আজাদ বুলবুলের মৌখিক ইতিহাসভিত্তিক বই বলছে, 1959 সালে প্রথমবার পানি আটকানোর সময় কিছু গ্রাম ডোবে, আর 1961 সালে স্থায়ীভাবে বাঁধ বন্ধ হলে শহর ডোবে; সে বছরই পুরনো বাজারের ব্যবসায়ীরা রিজার্ভ বাজারে নতুন করে দোকান খোলেন।
স্মৃতিকথা ও মৌখিক ইতিহাস মিলিয়ে: ডিসি অফিস, ট্রেজারি, কোতোয়ালী থানা, পোস্ট অফিস, সিএন্ডবি অফিস, সরকারি হাসপাতাল, কারমাইকেল হল, ইন্দ্রপুরী সিনেমা হল, ফুটবল মাঠ, সরকারি কর্মচারীদের কোয়ার্টার, চার সারির বাজার, কালী মন্দির, মসজিদ, লঞ্চঘাট। নদীর ওপারে ছিল চাকমা রাজবাড়ি। পুরো জেলার একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়টিও এই শহরে ছিল।
উৎসভেদে সাল আলাদা। হান্টারের 1876 সালের পরিসংখ্যান-বিবরণী বলছে, সদর দপ্তর চন্দ্রঘোনায় ছিল 1868 সালের নভেম্বর পর্যন্ত, তারপর রাঙামাটিতে সরে। হাচিনসনের 1906 সালের বিবরণে সালটি 1865। তারাচরন চাকমা শহরের পত্তনের সাল লিখেছেন 1870, আর ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদন বলছে 1860 সালেই সদর ছিল রাঙামাটি।
দ্য ইনডিপেনডেন্ট ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজা ভুবনমোহন রায় 12 বছর ধরে দোতলা রাজবাড়িটি তৈরি করেন, শেষ হয় 1914 সালে। কাপ্তাই হ্রদে এটি ডুবে যায়; ডোবার সাল উৎসভেদে 1960, 1961 বা 1962। খরায় হ্রদের পানি অনেক নেমে গেলে 1986 ও 2006 সালে এর ধ্বংসাবশেষ ভেসে উঠেছিল।
বাঁধের আগে জায়গাটি ছিল সংরক্ষিত বন বা রিজার্ভ ফরেস্ট। আজাদ বুলবুলের বই অনুযায়ী এটি ছিল বনবিদ্যার ছাত্র ও বনকর্মীদের দেখানোর জন্য রাখা ছোট একটি প্রদর্শনী রিজার্ভ। 1958 সালে সেখানে গাছ কাটা শুরু হয়, 1960 সালে জায়গাটির নাম দেওয়া হয় নিউ রাঙামাটি, আর পুরনো বাজার ডোবার পর ব্যবসায়ীরা এখানেই নতুন বাজার বসান।
আজাদ বুলবুলের বইয়ে দুটি বিবরণ আছে। একটিতে ডুবন্ত রাঙামাটি বাজারের একাংশকে আপার রাঙামাটির তবলছড়িতে পুনর্বাসন করা হয়, জায়গা না কুলানোয় বাকি অংশ যায় রিজার্ভ বাজারে। অন্যটিতে মহকুমা প্রশাসক মাঝের বস্তিতে নিজের নামে একটি বাজার বসান, যা কাসেম বাজার নামে পরিচিত হয় এবং অল্পদিনেই তবলছড়ি বাজারে সরে যায়।
আজাদ বুলবুলের বইয়ে বলা হয়েছে, রাঙামাটি টাউনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ শহর ছেড়ে চলে যান। চাকরি, ব্যবসা বা অন্য উপার্জনের পেশায় যুক্ত হাজার পাঁচেক মানুষ থেকে যান। শহরের চাকরিজীবীদের পুনর্বাসন হয় আপার রাঙামাটিতে, এবং বইয়ের ভাষায় তখন কেবল সরকারি চাকরিজীবীরাই নতুন শহরে পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছিলেন।
একটিমাত্র সরকারি হার নথিতে পাওয়া যায়নি; তথ্যদাতাভেদে হার আলাদা। আজাদ বুলবুলের সংগৃহীত বয়ানে এক নম্বর জমির জন্য একরপ্রতি 400, 300 বা 250 টাকা, দুই নম্বরের জন্য 300, 200 বা 150 টাকা। কেবল বন্দোবস্তি ও মৌজা জমাবন্দিতে নথিভুক্ত জমির মালিকেরা ক্ষতিপূরণ পান; দখলে থাকা অনথিভুক্ত জমির জন্য কিছু মেলেনি।
বাঁধের পর ক্ষতিগ্রস্তদের একটি ফরমে লিখতে হতো তাঁরা কোথায় যেতে চান; এটিকে বি-ফরম বলা হতো। আজাদ বুলবুলের বই অনুযায়ী বি-ফরমধারীরা গাড়িভাড়া, ট্রানজিট ক্যাম্পের খরচ, রেশন ও ঘর তোলার টাকা পেয়েছিলেন, কিন্তু ই-ফরমের লোকেরা এসব কোনো সুবিধা সরকারের কাছ থেকে পাননি। ফরম দুটির মূল সরকারি নথি পাওয়া যায়নি।
আজাদ বুলবুলের বই অনুযায়ী বেশির ভাগ গেছেন মারিশ্যা এলাকায়, যেখানে কাচালং রিজার্ভের বন কেটে পুনর্বাসন জোন করা হয়। অন্যরা গেছেন লোগাং, পুজগাং, পানছড়ি, আচালং, খাগড়াছড়ির বাঙালকাটি, দীঘিনালা, মহালছড়ি, বান্দরবানসহ নানা জায়গায়। 1964 সালের দিকে বহু পরিবার মিজোরাম হয়ে ভারতের অরুণাচলে চলে যায়।
আজাদ বুলবুল লিখেছেন, শীতে হ্রদের পানি নামলে ডিসি বাংলোর সামনের পুরনো মেহগনি গাছগুলোর কঙ্কাল এখনো দেখা যায়। প্রথম আলোর 2024 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী পুরনো রাজবাড়ির পাশের বিহারের বড় বুদ্ধমূর্তি পানির নিচে রয়ে গেছে, আর পুরনো রাজবাড়ির একটি কামান এনে বর্তমান চাকমা রাজ কার্যালয়ের পাশে রাখা হয়েছে।
বাঁধের সামগ্রিক ইতিহাস, জমি ও উচ্ছেদের সংখ্যা জানতে পড়ুন: কাপ্তাই বাঁধ: কবে, কারা বানাল, কত জমি ডুবল, কত মানুষ কোথায় গেলেন।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:কাপ্তাই বাঁধ, কাপ্তাই লেক, কাপ্তাই হ্রদের ইতিহাস, রাঙ্গামাটি
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।