Last updated Oct 6th, 2026
3

২০১২ সালের ৩ ডিসেম্বর একটি সরকারি কমিটির সভায় একটি সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যা শুনতে কারিগরি কিন্তু আসলে গভীর: কোন ভাষার বই কোন বর্ণমালায় ছাপা হবে।
সিদ্ধান্তটি ছিল — চাকমা ও মারমার বই হবে তাদের নিজস্ব বর্ণমালায়, গারো ও ত্রিপুরার বই রোমান বর্ণমালায়, আর ওঁরাওদের বই বাংলা বর্ণমালায়।
একটি ভাষা কোন হরফে লেখা হবে — এই প্রশ্নের উত্তরে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, ধর্মপ্রচারের পথ, রাষ্ট্রীয় সুবিধা আর আত্মপরিচয়। মাতৃভাষায় শিক্ষা নিয়ে আলোচনা সাধারণত “বই দেওয়া হয়েছে কি হয়নি” পর্যন্ত গিয়ে থামে; কিন্তু আসল গল্পটা শুরু হয় এর অনেক আগে।
এই লেখাটি সেই গল্পটা সাজানোর চেষ্টা — পাহাড়ে কয়টি ভাষা, কার লিপি আছে কার নেই, সরকারি কর্মসূচি কোথা থেকে কোথায় এল, আর আজ সেটি কোথায় আটকে আছে।
জুমজার্নালের আর্কাইভে সংরক্ষিত “বম ভাষা: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ” লেখাটির হিসাব: পার্বত্য চট্টগ্রামে ১০ ভাষাভাষী ১১টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী — বম, চাকমা, খুমি, খেয়াং, চাক, লুসাই, ম্রো, মারমা, পাংখোয়া, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরা।
এগারোটি জনগোষ্ঠী, দশটি ভাষা — অর্থাৎ অন্তত দুটি জনগোষ্ঠী একটি ভাষা ভাগ করে নেয়। ঐ লেখাটির একটি পর্যবেক্ষণ লক্ষণীয়: “এক পাহাড়ে কয়েক বর্গ কিলোমিটার জায়গায় এত ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষী জনমানুষের পাশাপাশি বসবাস পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত দেশের আর অন্য কোথাও দেখা যায় না।”
সারা দেশের হিসাবে সংখ্যাটা বড়: আর্কাইভের দুটি লেখাতেই বলা হয়েছে বাংলাদেশে ৪৫টির বেশি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী, ভাষার সংখ্যা প্রায় ৩০, মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ।

২০১২ সালের কমিটির সিদ্ধান্তটিই এই প্রশ্নের সবচেয়ে স্পষ্ট সরকারি উত্তর। আর্কাইভে সংরক্ষিত “আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা” লেখাটি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়:
| ভাষা | যে বর্ণমালায় বই হবে |
|---|---|
| চাকমা | নিজস্ব বর্ণমালা |
| মারমা | নিজস্ব বর্ণমালা |
| গারো | রোমান বর্ণমালা |
| ত্রিপুরা (ককবরক) | রোমান বর্ণমালা |
| ওঁরাও (সাদরি) | বাংলা বর্ণমালা |
একই সভায় আরও দুটি সিদ্ধান্ত হয় — প্রাক-প্রাথমিকের পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক-নির্দেশিকা সম্পূর্ণ নিজ নিজ মাতৃভাষায় প্রণয়ন, এবং শিশুর ভর্তিযোগ্য বয়স ৫ বছর নির্ধারণ।
চাকমা লিপির নিজস্ব অবস্থা নিয়ে অবশ্য একটি সতর্কতা আছে। বাংলাপিডিয়ার ভাষায় — চাকমা ভাষার নিজস্ব লিপি থাকলেও “আজ তা সাধারণত ব্যবহৃত হয় না, চাকমা এখন সাধারণত বাংলা অক্ষরে লেখা হয়”। অর্থাৎ যে লিপিতে সরকারি বই ছাপা হচ্ছে, দৈনন্দিন জীবনে তার ব্যবহার সীমিত। বর্ণমালা ও ব্যাকরণ নিয়ে বিস্তারিত আছে আর্কাইভের “চাকমা ভাষার বর্ণমালা ও ব্যাকরণ” লেখাটিতে।
ম্রোদের ক্ষেত্রে গল্পটা আলাদা — সেখানে লিপিটি তৈরি হয়েছে আশির দশকে, একজন মানুষের হাতে। সে গল্প আছে ম্রো জাতি নিয়ে আমাদের লেখায়।
কর্মসূচির শিকড় আরও পুরনো। আর্কাইভের লেখাটি অনুযায়ী দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে “ট্রাইবেল শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ, কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা” নামে যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়, সেটিই ছিল প্রথম সরকারি পরিকল্পনা যেখানে মাতৃভাষায় শিক্ষাদান, আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, পাঠ্যসূচিতে আদিবাসী সংস্কৃতি যুক্ত করা, এমনকি “স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই স্কুল পঞ্জিকা” চালুর কথা বলা হয়।
এরপর ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে আদিবাসী শিশুদের নিজ ভাষায় শেখার ব্যবস্থা, আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ ও পাঠ্যপুস্তকের কথা এল — এবং উল্লেখযোগ্যভাবে, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার কথাও।
বাস্তব বাস্তবায়ন শুরু ২০১২ সালে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও এনসিটিবির উদ্যোগে। প্রথম সভা ৩১ অক্টোবর ২০১২, তৎকালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব এম এম নিয়াজউদ্দিনের সভাপতিত্বে।
এরপরের ধাপগুলো প্রথম আলোয় প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুরের একটি লেখায় (৬ মার্চ ২০২৪) তারিখসহ দেওয়া আছে:
| সাল | যা হয়েছে |
|---|---|
| ২০১৭ | প্রাক-প্রাথমিকের বই |
| ২০১৮ | প্রথম শ্রেণির বই |
| ২০১৯ | দ্বিতীয় শ্রেণির বই |
| ২০২০ | তৃতীয় শ্রেণির বই |
অর্থাৎ সিদ্ধান্ত থেকে প্রথম বই পর্যন্ত সময় লেগেছে পাঁচ বছর, আর তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছাতে আট বছর।

এখানে একটি অসঙ্গতি আছে যা সহজে চোখে পড়ে না।
আর্কাইভের লেখাটি অনুযায়ী ৩১ অক্টোবর ২০১২-এর সভায় “জনসংখ্যার পরিমাণ বিবেচনায়” যে জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য কর্মসূচি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, সেগুলো ছয়টি: চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতাল, ত্রিপুরা ও সাদরি।
কিন্তু ২০২৪ সালের প্রথম আলোর লেখায় তালিকাটি পাঁচটি: “চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা (ককবরক), সাদরি (ওঁরাও) ও গারো (মান্দি)”। সাঁওতাল নেই।
লক্ষণীয়, আর্কাইভে উদ্ধৃত ২০১২ সালের বর্ণমালা-সিদ্ধান্তেও সাঁওতালদের নাম নেই — চাকমা, মারমা, গারো, ত্রিপুরা ও ওঁরাও, এই পাঁচটিরই লিপি ঠিক করা হয়েছিল। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের প্রথম ধাপেই সাঁওতালি কোন হরফে লেখা হবে তা নির্ধারিত হয়নি।
সাঁওতালি লিপি নিয়ে দীর্ঘদিনের মতভেদ আছে বলে জানা যায়, এবং সেটিই কারণ হতে পারে। কিন্তু কোনো পঠিত উৎসে এই বাদ পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করা নেই — তাই এখানে কেবল অসঙ্গতিটুকুই তুলে ধরা হলো, ব্যাখ্যা নয়। [যাচাই প্রয়োজন]
কর্মসূচির সবচেয়ে বড় সমস্যাটি সব উৎসেই এক জায়গায় গিয়ে ঠেকে।
অধ্যাপক তারিক মনজুরের ভাষায়: “এসব ভাষা পড়ানোর জন্য স্কুলগুলোয় উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়া যায় না।”
বই ছাপা একটি এককালীন কাজ; শিক্ষক তৈরি একটি চলমান ব্যবস্থা। প্রথমটি হয়েছে, দ্বিতীয়টি হয়নি — এবং তাতে প্রথমটির ফলও পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রেক্ষাপটটা বোঝা দরকার সংখ্যায়। আর্কাইভের লেখাটি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের সাক্ষরতার হার ৪৩.৯ শতাংশ — জাতীয় হারের (৫১.৮%) চেয়ে ৭.৯ শতাংশ কম, আর চট্টগ্রাম বিভাগের হারের (৫২.৭%) চেয়ে ৮.৮ শতাংশ কম। ঐ লেখাটি ঝরে পড়ার কারণ হিসেবে সরাসরি ভাষাগত সমস্যাকেই চিহ্নিত করেছে: “পার্বত্য চট্টগ্রামের যে সমস্ত শিশুর মাতৃভাষা বাংলা নয়, তাদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ না থাকা বা ভাষাগত সমস্যা… উঠে এসেছে।”
একটি বিষয় অবশ্য প্রায়ই অনুল্লেখিত থেকে যায়: সরকারি কর্মসূচির আগে ও পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ চলছিল। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর থেকেই বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠন নিজেদের ব্যবস্থায় মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল — পাঠক্রম তৈরি, উপকরণ, শিক্ষক-সহায়িকা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও স্কুল স্থাপন পর্যন্ত।
ঐ লেখার শুরুতেই দুটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা আছে — একটি চাঙমা ভাষায়, অন্যটি ককবরকে পরিচালিত। ত্রিপুরা শিশুদের গাওয়া “উই শ্যাল ওভারকাম” গানের ককবরক সংস্করণের উল্লেখটি এই কর্মসূচির সবচেয়ে জীবন্ত নথি।
সরকারি তালিকার পাঁচটি ভাষার বাইরে যে ভাষাগুলো পড়ে থাকে, তাদের অবস্থা বোঝাতে বম একটি ভালো উদাহরণ।
আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী বমরা কুকি-চিন বা সিনো-টিবেটান ভাষাগোষ্ঠীর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম জো জাতির একটি অংশ — যাঁদের বাকি অংশ ছড়িয়ে আছে মিয়ানমারের চিন স্টেট ও আরাকান এবং ভারতের মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও আসামে। বাংলাদেশে তাঁরা থাকেন বান্দরবানের রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও সদর এবং রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ৭০টি গ্রামে।
জনসংখ্যা নিয়ে এখানেও সেই পরিচিত দ্বন্দ্ব: ১৯৯১ সালের আদমশুমারিতে ৬,৯৭৮, কিন্তু ২০০৩ সালে বম সোশ্যাল কাউন্সিল বাংলাদেশের নিজস্ব জরিপে ৯,৫০০। আর্কাইভের বাক্য: “বমরা সরকারি পরিসংখ্যান যথাযথ নয় বলে মনে করেন।” একই সমস্যা আমরা দেখেছি ক্ষুদ্রতম পাঁচ জনগোষ্ঠী নিয়ে লেখাটিতেও।
নামের ইতিহাসটিও লক্ষণীয়: বমরা নিজেদের বলতেন বমজৌ, আর বিভিন্ন লেখক সেটিকে “উচ্চারণগত বিকৃতিতে বনযোগী, বনজো, বমজৌস” ইত্যাদি নানাভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। পুরনো নথিতে “বম” নামে কোনো জনগোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় “বনযোগী”।
পার্বত্য চট্টগ্রামে কয়টি ভাষা আছে?
জুমজার্নালের আর্কাইভের হিসাবে ১১টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১০টি ভাষা প্রচলিত। সারা দেশে ৪৫টির বেশি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩০টি ভাষা।
কোন কোন ভাষায় সরকারি পাঠ্যবই আছে?
পাঁচটি — চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা (ককবরক), সাদরি (ওঁরাও) ও গারো (মান্দি)। প্রাক-প্রাথমিকের বই আসে ২০১৭ সালে, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ২০২০ সালের মধ্যে।
এসব বই কোন বর্ণমালায় ছাপা হয়?
২০১২ সালের সরকারি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চাকমা ও মারমার বই নিজস্ব বর্ণমালায়, গারো ও ত্রিপুরার বই রোমান বর্ণমালায়, আর ওঁরাওদের বই বাংলা বর্ণমালায়।
বই থাকা সত্ত্বেও পাঠদান হচ্ছে না কেন?
প্রধান কারণ শিক্ষক। ঐ ভাষাগুলো পড়ানোর মতো উপযুক্ত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক স্কুলগুলোতে পাওয়া যায় না।
মাতৃভাষায় পড়া কেন জরুরি?
আর্কাইভের লেখাটি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে যে শিশুদের মাতৃভাষা বাংলা নয়, তাদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ ভাষাগত সমস্যা। অঞ্চলটির সাক্ষরতার হার ৪৩.৯%, জাতীয় হারের চেয়ে প্রায় ৮ শতাংশ কম।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 8 আগস্ট 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী ভাষা, চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।