Last updated Oct 24th, 2026
0

খিয়াং জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামের ছোট আদিবাসী জাতিগুলোর একটি — 2022 সালের জনশুমারিতে সারা দেশে খিয়াং গোনা হয়েছে 4,826 জন, যাঁদের সবচেয়ে বড় দুটি বসতি রাঙামাটির রাজস্থলী (1,420 জন) ও বান্দরবান সদর উপজেলায় (1,310 জন)। তাঁদের ভাষা কুকি-চিন দলের, সমাজ দুই শাখায় ভাগ — পাহাড়ের কোংতু ও সমতলের লাইতু — আর ধর্মে একই জাতির মধ্যে বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও প্রকৃতিপূজার ধারা পাশাপাশি আছে।
খিয়াংদের আচার, গোত্র, গান ও শব্দভান্ডারের একটি বিস্তারিত বিবরণ আমাদের আর্কাইভে আগে থেকেই আছে — খিয়াং লেখক বাছা খিয়াংয়ের “খিয়াং জাতির আদ্যোপান্ত”। এই পাতা সেটি আবার বলবে না। এখানে আছে যা ওই লেখায় নেই: 2022 শুমারির উপজেলা ধরে হিসাব (চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশসহ), দেড়শো বছরের জনসংখ্যার অমিল এক ছকে, ভাষা নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানীদের গবেষণা, 2017 ও 2023 সালের নতুন ‘হোয়ো’ বর্ণমালা, আর 2014–2023 সালের গবেষণা ও সংবাদে খিয়াংদের বর্তমান অবস্থা। যেখানে উৎসগুলো একমত নয়, সেখানে দুটোই পাশাপাশি রাখা হয়েছে।
পাঁচটি ক্ষুদ্রতম জনগোষ্ঠীর তুলনামূলক পরিচিতি আছে খিয়াং, খুমি, চাক, পাংখোয়া ও লুসাই নিয়ে আমাদের মূল লেখায়; একই ধাঁচের পূর্ণ প্রোফাইল আছে খুমি জনগোষ্ঠী ও চাক জনগোষ্ঠী নিয়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জনগোষ্ঠী ও বিষয়ের সূচি আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব পাতায়।
সূচিপত্র
খিয়াং পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের একটি কুকি-চিন ভাষাভাষী জাতি। বাংলায় নামটি দুই বানানে চলে — খিয়াং ও খেয়াং — আর ইংরেজিতে Khyang, Khiang ও Kheyang। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লেখে, তাঁদের নিজেদের নাম ‘হিয়ো’ (Hyow), আর খিয়াং নামটি বাইরের দেওয়া।
নামের উৎস নিয়ে উৎসগুলো আলাদা কথা বলে। সুগত চাকমা বাংলা একাডেমি থেকে 1985 সালে প্রকাশিত “বাংলাদেশের উপজাতি” বইয়ে লিখেছেন, বার্মায় খিয়াংরা নিজেদের ‘শো’ (Sho) বা ‘শু’ (Shu) বলেন, আর আরাকানি ও বর্মিরা তাঁদের ডাকে ‘খ্যাং চিন্’ বা ‘টেমচিন’। তাঁর 1993 সালের বই “পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি ও সংস্কৃতি” আরও যোগ করে: বর্মি উচ্চারণে ‘খ্যাং’ অনেক সময় ‘ছ্যাং’-এর মতো শোনায়, আর সে কারণে ইংরেজরা তাঁদের নাম Chin লিখতেন। ইংরেজি উইকিপিডিয়া অন্য ব্যাখ্যা দেয় — ভাষাবিদ Kenneth VanBik-এর কাজ উদ্ধৃত করে লেখে, খিয়াং শব্দ এসেছে khlɔng থেকে, যার অর্থ ‘মানুষ’; আর ‘হিয়ো’ শব্দের অর্থ ‘চিন’।
বাংলা বানানের ফারাকটি সরকারি দলিলেও আছে। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের সংজ্ঞা ও আসন-তালিকায় ‘খেয়াং’, অথচ একই আইনে 2014 সালে যোগ হওয়া একটি দফায় ‘খিয়াং’; বান্দরবানের জেলা পরিষদ আইন, আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও 2022 সালের শুমারিতে ‘খিয়াং’ — এই হিসাব আছে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ আইনের উপজাতীয় সংজ্ঞা নিয়ে আমাদের লেখায়। সংবাদমাধ্যম ও জনগোষ্ঠীর নিজেদের সংগঠন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশি লেখে ‘খেয়াং’; আমাদের আর্কাইভের লোককাহিনির পাঠেও দুই বানানই আছে। এই লেখায় শুমারির বানান ‘খিয়াং’ রাখা হয়েছে, উদ্ধৃতির ভেতরে উৎসের বানান।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022 অনুযায়ী দেশে খিয়াং 4,826 জন — পুরুষ 2,459, নারী 2,367। এর 4,709 জন চট্টগ্রাম বিভাগে; বাকি 117 জন ছড়িয়ে আছেন দেশের অন্য সাতটি বিভাগে, যার মধ্যে ঢাকা বিভাগে 61 জন। শুমারির 50টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকায় সংখ্যার হিসাবে খিয়াংদের অবস্থান 24তম।
সংখ্যাগুলো এসেছে জাতীয় প্রতিবেদনের (National Report, Volume I) Table P29 থেকে, যেখানে প্রতিটি জাতিগোষ্ঠী বিভাগ ধরে আলাদা করে দেওয়া আছে। পুরো 50টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা আছে জনশুমারি 2022-এর জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক জনসংখ্যা নিয়ে আমাদের লেখায়, আর শুমারিতে জাতিগত পরিচয় কীভাবে গোনা হয় তা আছে গণনার পদ্ধতি নিয়ে আলাদা লেখায়।
| বিভাগ | খিয়াং (মোট) | পুরুষ | নারী | দেশের খিয়াংদের কত অংশ |
|---|---|---|---|---|
| চট্টগ্রাম | 4,709 | 2,386 | 2,323 | 97.6% |
| ঢাকা | 61 | 42 | 19 | 1.3% |
| রাজশাহী | 31 | 15 | 16 | 0.6% |
| খুলনা | 11 | 9 | 2 | 0.2% |
| ময়মনসিংহ | 7 | 4 | 3 | 0.1% |
| সিলেট | 5 | 3 | 2 | 0.1% |
| বরিশাল | 1 | 0 | 1 | — |
| রংপুর | 1 | 0 | 1 | — |
| সারা দেশ | 4,826 | 2,459 | 2,367 | 100% |
চট্টগ্রাম বিভাগের 4,709 জনকে জেলা ধরে ভাগ করলে দেখা যায়, খিয়াংরা কেবল তিন পার্বত্য জেলার জনগোষ্ঠী নন। জেলা-প্রতিবেদনগুলোর Table P17 অনুযায়ী বান্দরবানে 2,502, রাঙামাটিতে 1,670, খাগড়াছড়িতে 4 — আর পার্বত্য জেলার বাইরে চট্টগ্রাম জেলায় 472 জন। চার জেলা মিলিয়ে 4,648; বিভাগের বাকি 61 জন অন্য জেলাগুলোতে (নিজস্ব হিসাব)।
এই হিসাবটি একটি পুরনো প্রশ্নেরও উত্তর দেয়। পাঁচ ক্ষুদ্রতম জনগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের লেখায় প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, জাতীয় মোট 4,826 আর রাঙামাটি-বান্দরবানের যোগফলের মধ্যে কয়েকশো মানুষের ব্যবধান কোথা থেকে এল। চট্টগ্রাম জেলার প্রতিবেদন দেখায়, ব্যবধানের বড় অংশ — 472 জন — চট্টগ্রাম জেলারই খিয়াং, যাঁদের 382 জন চন্দনাইশ উপজেলায়।
2022 শুমারির জেলা-প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের খিয়াংদের অর্ধেকের বেশি থাকেন মাত্র দুটি উপজেলায় — রাঙামাটির রাজস্থলীতে 1,420 জন ও বান্দরবান সদরে 1,310 জন। এরপর রোয়াংছড়ি (652), চট্টগ্রামের চন্দনাইশ (382), থানচি (359), কাপ্তাই (177) ও রুমা (158)। বাকি উপজেলাগুলোতে সংখ্যা 50-এর নিচে।
রাজস্থলীতে খিয়াংরা উপজেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে সাত শতাংশ; চন্দনাইশে অনুপাতটি আরও বেশি — উপজেলার 1,187 জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সদস্যের 382 জনই খিয়াং, অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (নিজস্ব হিসাব)। নিচের ছকে প্রতিটি সংখ্যা জেলা-প্রতিবেদনের Table P17 থেকে নেওয়া।
| উপজেলা (জেলা) | খিয়াং | পুরুষ / নারী | উপজেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনসংখ্যার কত অংশ | দেশের খিয়াংদের কত অংশ |
|---|---|---|---|---|
| রাজস্থলী (রাঙামাটি) | 1,420 | 737 / 683 | 7.5% | 29.4% |
| বান্দরবান সদর (বান্দরবান) | 1,310 | 635 / 675 | 2.7% | 27.1% |
| রোয়াংছড়ি (বান্দরবান) | 652 | 317 / 335 | 2.6% | 13.5% |
| চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) | 382 | 216 / 166 | 32.2% | 7.9% |
| থানচি (বান্দরবান) | 359 | 167 / 192 | 1.4% | 7.4% |
| কাপ্তাই (রাঙামাটি) | 177 | 86 / 91 | 0.7% | 3.7% |
| রুমা (বান্দরবান) | 158 | 81 / 77 | 0.6% | 3.3% |
| বিলাইছড়ি (রাঙামাটি) | 48 | 21 / 27 | 0.2% | 1.0% |
| চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন | 40 | 24 / 16 | 0.2% | 0.8% |
| রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) | 39 | 18 / 21 | 0.8% | 0.8% |
| লামা (বান্দরবান) | 21 | 16 / 5 | 0.06% | 0.4% |
| রাঙামাটি সদর | 20 | 13 / 7 | 0.03% | 0.4% |
| রাউজান (চট্টগ্রাম) | 5 | 2 / 3 | 0.5% | 0.1% |
| কাউখালী (রাঙামাটি) | 4 | 3 / 1 | 0.01% | 0.1% |
| হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) | 4 | 2 / 2 | 0.15% | 0.1% |
| নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান) | 2 | 2 / 0 | 0.02% | — |
| লংগদু (রাঙামাটি) | 1 | 0 / 1 | — | — |
| পটিয়া (চট্টগ্রাম) | 1 | 1 / 0 | — | — |
| সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) | 1 | 1 / 0 | — | — |
জেলা ধরে লিঙ্গ-অনুপাতও আলাদা। রাঙামাটিতে খিয়াং পুরুষ 860, নারী 810; বান্দরবানে উল্টো — পুরুষ 1,218, নারী 1,284; চট্টগ্রাম জেলায় পুরুষ 264, নারী 208। এই পার্থক্যের কারণ কোনো প্রকাশিত উৎসে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
মানচিত্রে একটি জিনিস চোখে পড়ে: খিয়াং বসতির চারটি বড় এলাকা — রাজস্থলী, বান্দরবান সদর, চন্দনাইশ ও কাপ্তাই — একে অপরের লাগোয়া। রাজস্থলীর উত্তরে কাপ্তাই, পশ্চিমে রাঙ্গুনিয়া, দক্ষিণে বান্দরবান সদর; বান্দরবান সদরের উত্তর-পশ্চিমের কুহালং ইউনিয়নের সীমানা চন্দনাইশের সঙ্গে। অর্থাৎ শুমারির সংখ্যাগুলো কর্ণফুলী থেকে সাঙ্গুর উত্তর পর্যন্ত একটি টানা পাহাড়ি অঞ্চলের ছবি দেয়, যার ওপর দিয়ে জেলা ও বিভাগের সীমানা গেছে।
খিয়াংদের জনসংখ্যা নিয়ে প্রায় প্রতিটি উৎস আলাদা সংখ্যা দেয়, আর কয়েকটি সরাসরি পরস্পরবিরোধী। সবচেয়ে বড় অমিল 1981 সালের শুমারি নিয়ে: বাছা খিয়াংয়ের লেখায় সংখ্যাটি 5,453, আর সুগত চাকমার দুটি বইয়ে 1,501। 1991 সালে সংখ্যাটি 1,950, আর 2022 সালে 4,826।
সুগত চাকমা 1993 সালের বইয়ে হিসাবটি কীভাবে এল তাও লিখেছেন: 1981 সালের প্রাথমিক শুমারি-প্রতিবেদনে খিয়াং পরিবার ছিল 261টি, আর তখন প্রতি পরিবারে গড়ে 5.75 জন ধরায় সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় 1,501; তিনি নিজেই যোগ করেছেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হবে বলে মনে হয়। বাছা খিয়াং অন্যদিকে 5,453 থেকে 1,950-এ নেমে আসাকে প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছেন যে শুমারিতে খিয়াংদের ঠিকমতো গোনা হয় না, আর লিখেছেন, খিয়াংদের নিজস্ব জরিপে সংখ্যা আনুমানিক 3,600, পরিবার 700-র বেশি।
| সাল | সংখ্যা | কোথাকার, কোন উৎসে |
|---|---|---|
| 1853 | 13,709 | আরাকানের ব্রিটিশ-শাসিত অংশে খিয়াং — B. H. Hodgson-এর হিসাব, সুগত চাকমার উদ্ধৃতিতে |
| 1921 | 95,599 | খিয়াংদের “সর্বমোট” জনসংখ্যা — গ্রীয়ার্সনের Linguistic Survey of India-র হিসাব, সুগত চাকমার উদ্ধৃতিতে |
| 1981 | 1,501 | বাংলাদেশ — শুমারির 261টি পরিবার × 5.75 (সুগত চাকমা) |
| 1981 | 5,453 | বাংলাদেশ — শুমারি, বাছা খিয়াংয়ের উদ্ধৃতিতে |
| 1991 | 1,950 | বাংলাদেশ — শুমারি, বাছা খিয়াংয়ের উদ্ধৃতিতে |
| সাল উল্লেখ নেই | প্রায় 3,600 (700+ পরিবার) | খিয়াংদের নিজস্ব জরিপ — বাছা খিয়াং ও প্রথাগত আইনের লেখা |
| 2004 | 1,900 | Adnan (2004)-এর হিসাব, তারেক হাসানের 2014 সালের গবেষণায় উদ্ধৃত |
| 2010 | 2,000–3,000 | বাংলাপিডিয়ার অনুমান |
| 2018 | প্রায় 4,000 ভাষাভাষী | ভাষাবিদ মুহাম্মদ জাকারিয়ার গবেষণা-অভিসন্দর্ভ |
| 2022 | 4,826 | BBS জনশুমারি, Table P29 |
ছকের দুটি সংখ্যা একই সাল নিয়ে, অথচ একটি অন্যটির সাড়ে তিন গুণেরও বেশি — কোনটি ঠিক, তা এখানে মীমাংসা করা হচ্ছে না। লক্ষ করার বিষয় শুধু এটুকু: 1991 থেকে 2010 পর্যন্ত সংখ্যা ও অনুমানগুলো 1,900 থেকে প্রায় 3,600-এর মধ্যে, আর 2022 সালের শুমারির 4,826 তার সবগুলোর চেয়ে বেশি।
খিয়াংদের আগমন নিয়ে কোনো লিখিত দলিল নেই — বাছা খিয়াং নিজেই লিখেছেন, উৎপত্তির “সুনির্দিষ্ট কোনো লেখ্য দালিলিক প্রমাণ” আজও পাওয়া যায়নি। যা আছে তা দুই ধরনের: খিয়াংদের নিজেদের জনশ্রুতি, আর ঔপনিবেশিক ও আধুনিক লেখকদের অনুমান। সময় নিয়ে অনুমান ষোড়শ শতক থেকে অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত ছড়ানো।
সবচেয়ে প্রচলিত জনশ্রুতিটি এক রাজা ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা ছোট রানির — যুদ্ধের পর রাজা দেশে ফিরে যান, রানিকে কিছু অনুচরসহ এখানে রেখে যান, আর আজকের খিয়াংরা তাঁদেরই বংশধর। গল্পটির পূর্ণ রূপ আছে আর্কাইভের খিয়াং লেখায়, সেতু কেটে দেওয়ার আরেকটি জনশ্রুতিসহ। এখানে শুধু দেখার বিষয়, একই গল্প কত পুরনো উৎসে পাওয়া যায়।
| উৎস | কী বলে |
|---|---|
| Sir Arthur P. Phayre (সুগত চাকমার বানানে ‘ফেয়ারী’), Journal of the Asiatic Society of Bengal, 1841 — সুগত চাকমার উদ্ধৃতিতে | খিয়াংরা নিজেদের বর্মি শরণার্থীদের বংশধর মনে করেন, যাঁরা পশ্চিমে অভিযানের সময় পার্বত্য এলাকায় হারিয়ে গিয়েছিলেন। Phayre লিখেছেন, ব্রিটিশ আরাকানের ভেতরে Lemyo নদীর তীরের অল্প কিছু খিয়াং ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে, তার পূর্বে ইয়োমা পর্বতমালা পর্যন্ত “শক্তিশালী” খিয়াং গোষ্ঠীরা স্বাধীন |
| প্রদীপ চৌধুরী, “খিয়াং উপজাতি”, গিরিনির্ঝর 3য় সংখ্যা, 1983 — সুগত চাকমার উদ্ধৃতিতে | যুদ্ধে পালিয়ে আসা খিয়াং রাজা ফেরার সময় অন্তঃসত্ত্বা ছোট রানিকে রেখে যান; বাংলাদেশের খিয়াংরা সেই রানির বংশধর বলে ধারণা |
| সুগত চাকমা (1985) | উনিশ শতকের প্রথমার্ধে খিয়াংরা আরাকান-যু-মা-টং পার্বত্য এলাকায় থাকতেন; ইংরেজরা 1824 সালে আরাকান দখল করার সময়ও কিছু খিয়াং লেম্রো নদীর তীরে। তাঁর মতে এই খিয়াংরাই খুমিদের একটি অংশকে আরাকান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন |
| বাছা খিয়াং (আর্কাইভ) | আদি নিবাস নিয়ে তিনটি মত: আরাকানের ইয়োমা পর্বত; বার্মার চিন হিলস; বার্মা-আরাকান যুদ্ধের পর নেতা থোউয়ের নেতৃত্বে আগমন। কেউ কেউ 1600–1700 শতককে আগমনের সময় মনে করেন |
| বাংলাপিডিয়া | ষোলো ও সতেরো শতকে আগমন অনুমিত; প্রথম বসতি বান্দরবানের মুরারনজা পর্বতমালায়, তারপর জুমের জমি বদলের সঙ্গে বসতি সরেছে |
| ইংরেজি উইকিপিডিয়া | বর্মি ইতিহাসের সূত্রে (Phayre 1883; Brauns ও Löffler 1990) খিয়াংরা আঠারো শতকের শেষ দিকে দক্ষিণ মিয়ানমার থেকে মারমাদের সঙ্গে এসেছিলেন |
নদীর নাম নিয়ে সুগত চাকমার একটি পর্যবেক্ষণও এখানে প্রাসঙ্গিক। খিয়াং ভাষায় নদীকে বলে ‘লং’; তিনি লিখেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কাসালং, মাসালং, আসালং, কাসলং ও কুহলং, মিজোরামের টলং আর আরাকানের হুসলং ও ওয়াখালং — এসব নদীর নামের শেষাংশ ‘লং’ থেকে মনে হয়, অঞ্চলটি অতীতে খিয়াংদের পরিচিত ছিল। এটি তাঁর অনুমান; অন্য কোনো উৎসে এর সমর্থন বা খণ্ডন পাওয়া যায়নি।
খিয়াং গ্রামের কোনো পূর্ণ তালিকা প্রকাশিত হয়নি। বিভিন্ন উৎসে যে জায়গাগুলোর নাম এসেছে, সেগুলো মূলত রাজস্থলী-কাপ্তাই-চন্দ্রঘোনা, বান্দরবান সদরের কুহালং অঞ্চল, রোয়াংছড়ি এবং চট্টগ্রামের চন্দনাইশে। সুগত চাকমা 1985 সালে লিখেছিলেন, কাপ্তাইয়ের কাছে চন্দ্রঘোনার আশেপাশে ও রাজস্থলীতে খিয়াংদের “৭/৮টি ছোট ছোট গ্রাম” আছে।
| জায়গা | উপজেলা / জেলা | কী জানা যায় | উৎস |
|---|---|---|---|
| চন্দ্রঘোনার আশেপাশে | কাপ্তাই, রাঙামাটি | খিয়াং গ্রাম; এখানকার খিয়াংরা মূলত খ্রিস্টান | সুগত চাকমা 1985; বাছা খিয়াং |
| “মিশন পাড়া” | রাঙামাটি জেলা (কর্ণফুলী পেপার মিলগামী সড়কের সংযোগস্থলের কাছে) | 54টি খিয়াং পরিবার, 297 জন; ব্যাপ্টিস্ট চার্চের অনুসারী; নিজেদের কোংতু বলেন; 1900 সালের দিকে এখানে বসতি; এখন কেউ কৃষিকাজে নেই | M. T. Hasan, 2014 |
| কুক্যাছড়ি | রাজস্থলী, রাঙামাটি | খিয়াং-অধ্যুষিত গ্রাম; সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট মিশনের সহায়তায় খিয়াং শিশুদের জন্য আশ্রম-বিদ্যালয় | বাছা খিয়াং |
| ধনুছড়ি মৌজা | রাজস্থলী, রাঙামাটি | 1976 সালে 3,959 একরের মধ্যে 3,889 একর পাল্পউড বাগানের জন্য অধিগ্রহণ; 200 পরিবারের জন্য বাকি 70 একর | বাছা খিয়াং |
| গুংগুরুমুখ খেয়াং পাড়া / কমিউনিটি সেন্টার | কুহালং ইউনিয়ন, বান্দরবান সদর | 2017 সালের ‘হোয়ো’ বর্ণমালার উদ্ভাবক দল এই পাড়ার; 2023 সালে কী-বোর্ড উদ্বোধন | ডেইলি স্টার বাংলা, ঢাকা ট্রিবিউন, রাইজিংবিডি (2023) |
| দলবনিয়া | বান্দরবান | শহর থেকে প্রায় 15 কিমি; 65টি খিয়াং পরিবার, 360 জন; বৌদ্ধ, লাঙলচাষি — অর্থাৎ লাইতু | M. T. Hasan, 2014 |
| মৌজা নম্বর 324 | বান্দরবান সদর | এখানকার খিয়াংরা বৌদ্ধ, কিছু পরিবার খ্রিস্টান | বাছা খিয়াং |
| খামতাং পাড়া | রোয়াংছড়ি, বান্দরবান | খিয়াং পূজা-পার্বণ নিয়ে লেখা আর্কাইভ-প্রবন্ধের লেখক এই পাড়ার কার্বারি ছিলেন | জুমজার্নাল আর্কাইভ |
| মুরারনজা পর্বতমালা | বান্দরবান | খিয়াংদের প্রথম বসতি | বাংলাপিডিয়া |
| 10 নং ধোয়াছড়ি ইউনিয়ন | চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম | সরকারি অধিগ্রহণে উচ্ছেদের মুখে খিয়াং বসতি | বাছা খিয়াং |
এর বাইরে বাছা খিয়াং রুমা ও থানচিকেও খিয়াং বসতির উপজেলা হিসেবে লিখেছেন, আর 2022 শুমারি এই দুই উপজেলায় যথাক্রমে 158 ও 359 জন খিয়াং গুনেছে; তবে সেখানকার পাড়ার নাম কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
খিয়াং ভাষা চীনা-তিব্বতি পরিবারের কুকি-চিন দলের, আরও নির্দিষ্টভাবে দক্ষিণ চিন ভাষাগুলোর কাছাকাছি। ভাষাবিদ মুহাম্মদ জাকারিয়ার (Muhammad Zakaria) 2018 সালের গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় চার হাজার মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের 2018 সালে শেষ হওয়া ভাষা-জরিপ খিয়াংকে দেশের 14টি বিপন্ন ভাষার একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
ভাষাটির শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে দুটি অবস্থান আছে। ভাষার আন্তর্জাতিক ক্যাটালগ Glottolog আশো চিন (Asho Chin, ISO কোড csh) ভাষাকে কুকি-চিনের দক্ষিণ পেরিফেরাল শাখায় রাখে, আর ইংরেজি উইকিপিডিয়া বাংলাদেশের খিয়াং ভাষাকে সেই আশো বা শো (Shö) ভাষারই অংশ বলে — যার মিয়ানমারসহ মোট ভাষাভাষী প্রায় 1,80,000। অন্যদিকে জাকারিয়া 2013 সালে Journal of the Southeast Asian Linguistics Society-তে প্রকাশিত প্রবন্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তি দেন, হিয়ো (খিয়াং) ভাষাকে আশোর অধীনে না রেখে খুমি ও চো-আশোর সঙ্গে এক দলে রাখা উচিত।
জাকারিয়ার 2018 সালের অভিসন্দর্ভ “A Grammar of Hyow” (নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি) ভাষাটির প্রথম পূর্ণ ব্যাকরণ। এতে বারোটি অধ্যায়, একটি হিয়ো-ইংরেজি অভিধান ও নমুনা-পাঠ আছে; ভাষাটির যে বৈশিষ্ট্যগুলো তিনি আলাদা করে দেখিয়েছেন তার মধ্যে আছে সুর-সন্ধি (tone sandhi), ক্রিয়ামূলের বিকল্প রূপ, ক্রিয়ায় ব্যক্তি-ক্রম (person hierarchy) আর মধ্য বাচ্য (middle voice)। তাঁর মতে দক্ষিণ চিন ভাষাগুলোর মধ্যে শুধু হিয়ো ও আশোতে ক্রিয়ায় এই ব্যক্তি-ক্রম দেখা যায়।
সুরের ব্যবহার সাধারণ পাঠকের কাছেও চোখে পড়ে। বাংলাপিডিয়া ও বাছা খিয়াং দুজনেই একই উদাহরণ দেন: ‘চী’ মানে বড় বোন, আর ‘চি’ মানে লবণ বা ছাঁকা — একটি শব্দ, উচ্চারণভেদে ভিন্ন অর্থ। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, খিয়াংরা ঘরকে বলেন ‘ইম’, গ্রামকে ‘নাম’; সুগত চাকমা লেখেন, নদীকে বলেন ‘লং’। আত্মীয়তার শব্দ ও দৈনন্দিন বাক্যের একটি তালিকা আছে আর্কাইভের খিয়াং লেখায়, আর লোককাহিনির পাঠে বন্ধনীসহ দেওয়া খিয়াং শব্দকোষ আছে খেয়াং, চাক, খুমী, বম ও হালাম রূপকথার সূচিতে — সেখানে দেখা যায়, খিয়াং গল্পের শিরোনামের শেষ শব্দ ‘খুই’, যার অর্থ গল্প।
বিপন্নতার কারণ নিয়ে নৃবিজ্ঞানী মোহাম্মদ তারেক হাসানের (Mohammad Tareq Hasan) 2014 সালের গবেষণা খিয়াংদের নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে: আদালত, অফিস, রেডিও-টেলিভিশন, সাইনবোর্ড সবই বাংলায়, আর বাংলায় যত বেশি কথা বলতে হয়, নিজের ভাষা তত ক্ষয়ে যায়। হাসানের এক উত্তরদাতা জানান, বাংলা বুঝতে না পারায় অনেক খিয়াং চড়া সুদের দলিলে টিপসই দিয়ে জমি হারিয়েছেন। ডেইলি স্টারের 2021 সালের প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক Sourav Sikder বলেন, এই 14টি বিপন্ন ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার কোনো সরকারি উদ্যোগ তখন ছিল না। মাতৃভাষায় শিক্ষা নিয়ে সরকারি কর্মসূচির বিস্তারিত আছে পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা নিয়ে আমাদের লেখায়।
পুরনো উৎসগুলো — বাংলাপিডিয়া, বাছা খিয়াংয়ের লেখা, 2021 সালে IMLI-র জরিপ — সবই বলে খিয়াংদের নিজস্ব বর্ণমালা নেই। কিন্তু 2023 সালের সংবাদ অনুযায়ী খিয়াংরা এখন ‘হোয়ো’ (Hyow) নামে নিজস্ব বর্ণমালা তৈরি করেছেন, যাতে স্বরবর্ণ 11টি ও ব্যঞ্জনবর্ণ 21টি, আর 23 সেপ্টেম্বর 2023 থেকে সেটি কম্পিউটারে লেখা যায়।
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন লিপিটির একটি দীর্ঘ ইতিহাস দেয়। প্রথম খিয়াং বর্ণমালার কাজ শুরু করেন Kasamong Khiyang (প্রতিবেদনের ইংরেজি বানান) 1999 সালে, যা 2004 সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ হয়; 2006 সালে UNDP-র মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত এক ব্রিটিশ ভাষা-বিশেষজ্ঞ সেটির উন্নয়ন তত্ত্বাবধান করেন। পরে 2017 সালে বান্দরবানের গুংগুরু খেয়াং পাড়ার পাঁচ বাসিন্দা আগের লিপি সংশোধন করে নতুন বর্ণমালা তৈরি করেন, আর 22 অক্টোবর 2017 খেয়াং ভাষা ও বর্ণমালা বইয়ের প্রকাশনা উৎসব হয়।
ডেইলি স্টার বাংলা একই ঘটনার আরেকটি দিক জানায়। উদ্ভাবক দলের সদস্য ঞো জাই উ খেয়াং বলেন, তিন বছর আগে রাজস্থলীর কয়েকজন খিয়াং রোমান হরফে ভাষাটি লেখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রোমান হরফ খিয়াং ধ্বনির সঙ্গে মেলে না; তারপর গ্রামে পাঁচ সদস্যের কমিটি করে প্রায় পাঁচ বছরের চেষ্টায় বর্ণমালাটি তৈরি হয়। প্রতিবেদনে উদ্ভাবকদের নাম: ঞো জাই উ খেয়াং, চিং হ্লা উ খেয়াং, ক্য উ প্রু খেয়াং, মং হ্লা প্রু খেয়াং ও চিং সা থুই খেয়াং।
কী-বোর্ডটি তৈরি করেছে ফ্রেন্ডস অব এন্ডেঞ্জার্ড এথনিক ল্যাংগুয়েজেস (ফিল) নামের সংগঠন, প্রায় দুই মাসের কাজে। ঢাকা ট্রিবিউন ও রাইজিংবিডি লিখেছে, এটি বিশ্বের 294তম ডিজিটাল লিখিত ভাষার কী-বোর্ড। উদ্বোধন হয় কুহালং ইউনিয়নের গুংগুরুমুখ খেয়াং কমিউনিটি সেন্টারে; প্রধান অতিথি ছিলেন বর্ণমালা উদ্ভাবনী কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ম্রাসা খেয়াং। ঞো জাই উ খেয়াং আরও জানান, এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিছুদিন খেয়াং ভাষা শেখানো হয়েছিল; রাইজিংবিডির বিবরণে সেটি বন্ধ হয় আর্থিক সংকটে, ডেইলি স্টার বাংলার বিবরণে পূর্ণাঙ্গ বর্ণমালা না থাকায়।
এখানে লক্ষ করার মতো একটি বিষয়: হোয়ো লিপি তৈরি হয়েছে বান্দরবানের একটি পাড়ায়, আর রাজস্থলীর খিয়াংরা প্রথমে রোমান হরফ বেছে নিয়েছিলেন। দুই অঞ্চলের খিয়াংরা এখন একই লিপি ব্যবহার করছেন কি না, তা কোনো প্রকাশিত উৎসে পাওয়া যায়নি।
খিয়াং জনগোষ্ঠী দুটি শাখায় বিভক্ত — কোংতু ও লাইতু। প্রথাগত আইনের সংকলন অনুযায়ী যাঁরা পাহাড়ে থাকেন তাঁরা কোংতু, যাঁরা সমতলে থাকেন তাঁরা লাইতু, আর দুই শাখার ভাষায় কিছুটা পার্থক্য আছে। জুমচাষনির্ভর কোংতুরা নতুন জমির খোঁজে বসতি বদলাতেন।
তারেক হাসানের 2014 সালের মাঠ-গবেষণা আরেকটি পার্থক্য দেখায়: কোংতুরা বেশিরভাগ বৌদ্ধধর্ম থেকে খ্রিস্টধর্মে (সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট) গেছেন, আর লাইতুরা মূলত বৌদ্ধ ও লাঙলচাষি। তাঁর দুটি মাঠ-এলাকা এই দুই ধারার উদাহরণ — বান্দরবানের দলবনিয়ার বৌদ্ধ লাইতু পাড়া, আর রাঙামাটির মিশন পাড়ার ব্যাপ্টিস্ট কোংতু খিয়াং।
নাম দুটির একটি মিল মিয়ানমারেও আছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া VanBik-এর তালিকা উদ্ধৃত করে আশো ভাষার যেসব উপভাষা দেয়, তার মধ্যে আছে রাখাইন রাজ্যের Minbya ও Myebon অঞ্চলের ‘Laitu’ আর Magway অঞ্চলের ‘Kowntu’। বাংলাদেশের কোংতু-লাইতুর সঙ্গে মিয়ানমারের এই নামগুলোর সরাসরি সম্পর্ক নিয়ে কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি।
খিয়াং সমাজ পিতৃসূত্রীয় ও গোত্রভিত্তিক, কিন্তু গোত্রের সংখ্যা ও নামের ব্যাখ্যায় উৎসগুলো এক নয়। প্রথাগত আইনের সংকলন বলে দুই শাখা মিলিয়ে গোত্র 12টি, নামকরণ পেশা ও সামাজিক অবস্থান ধরে; বাছা খিয়াং দশটি গোত্রের নাম দিয়ে লেখেন, নাম এসেছে প্রাকৃতিক বস্তু থেকে; আর সুগত চাকমা গোত্রনামে টোটেম-বৈশিষ্ট্য দেখেন।
| উৎস | গোত্রের সংখ্যা | উদাহরণ ও ব্যাখ্যা |
|---|---|---|
| সুগত চাকমা | সংখ্যা দেননি | মিনচ সং (বিড়াল গোত্র), য়ুংচ সং (বানর গোত্র), ইউ সং (ইঁদুর গোত্র) — পার্বত্য চট্টগ্রামে একমাত্র খিয়াংদের গোত্রনামেই টোটেম-বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট |
| বাছা খিয়াং | দশটির নাম, তালিকা অসম্পূর্ণ | হোক্চ, খাংচ্, ছোচ্, পেচ্, ছেচ্, মংচ্, মংলম স, ক্ষেপ চ্, চুমচে সং, ম্রচ; নামের পেছনে রাজসেবার কাহিনি — যেমন মংলম স রাজার পথ পরিষ্কার করতেন, সে চ্ বর্শাধারী |
| প্রথাগত আইনের সংকলন | 12 | কোংতু ও লাইতু মিলিয়ে; নাম পেশা বা জীবিকা ও সামাজিক অবস্থান ধরে |
বাছা খিয়াং আরও লেখেন, গোত্রের ভেতরে বংশের বয়োজ্যেষ্ঠ প্রধানের নামে ‘গোষ্ঠী’র নাম হয়, আর অনেক গোত্রের নামের ইতিহাস মুখে মুখে চলত বলে ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। গোত্রের বিস্তারিত কাহিনি পড়া যাবে আর্কাইভের মূল লেখায়।
খিয়াং সমাজে বিয়ে দুই রকম — সামাজিক বিয়ে ও পালিয়ে বিয়ে (‘এচেনেইস’), আর দুটোই সমাজসিদ্ধ হয় ‘লাকশোং’ অনুষ্ঠানে। গোত্রের ভেতরে তিন পুরুষ পার না হলে বিয়ে নিষিদ্ধ। সম্পত্তিতে মেয়ের অংশ নিয়ে উৎসগুলো একমত নয়।
প্রথাগত আইনের সংকলন বিয়ের ক্ষেত্রে বৈধ সম্পর্ককে বলে ‘আসাংশ’, নিষিদ্ধ সম্পর্ককে ‘সাংআশ’, আর নিষিদ্ধ সম্পর্কের দীর্ঘ তালিকা দেয়। বাংলাপিডিয়া একটি জিনিস যোগ করে যা আর্কাইভের লেখায় নেই: অতীতে বরপক্ষকে কনের মা-বাবাকে পণ দিতে হতো, যার নাম ‘দাফা’; পালিয়ে বিয়েতে দাফা বাড়ত, আর ঘরজামাই হলে দাফা লাগত না। বিচ্ছেদের একটি রীতি আইনের সংকলনে আছে — কার্বারি বা সমাজপতির সামনে স্বামী-স্ত্রী ঘরের সিঁড়িতে পরস্পরকে কাঁঠাল গাছের পাতা ফেরত দেন।
উত্তরাধিকারে বাছা খিয়াং লাইতু শাখার রীতি লেখেন: বাবার সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পান ছেলেরা, এক-তৃতীয়াংশ মেয়েরা, আর ছেলে না থাকলে মেয়েরা পুরোটা। অন্যদিকে তারেক হাসান বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির 2007 সালের সংকলন “আদিবাসী জনগোষ্ঠী”-তে Thoisafrue Khyang-এর লেখা উদ্ধৃত করে লেখেন, ছেলেরা বাবার জমির অংশ পান, মেয়েরা পান না — তবে মা-বাবা চাইলে মেয়েকে অংশ দিতে পারেন। বিষয়টির পূর্ণ আলোচনা আছে প্রথাগত আইনে খিয়াং নারীর অবস্থান লেখায়।
সমাজের প্রধান কার্বারি; বাংলাপিডিয়া ও বাছা খিয়াং দুজনেই লেখেন, গ্রামের বিবাদ ও অপরাধের বিচার কার্বারি প্রথা অনুযায়ী করেন। বাছা খিয়াং যোগ করেন, খিয়াংদের মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে কার্বারি হওয়া খুব কম — সাধারণত প্রথাগত আইন জানা একজন বয়োজ্যেষ্ঠকে পাড়াবাসী মনোনীত করেন। বান্দরবানের খিয়াংরা বোমাং সার্কেলের অধীন; সার্কেল প্রধানের ভূমিকা নিয়ে আছে তিন সার্কেলের সার্কেল চিফ নিয়ে আমাদের লেখা, আর বোমাং সার্কেলের খাজনা উৎসবে খিয়াংদের অংশগ্রহণের কথা আছে রাজপুণ্যাহ নিয়ে লেখায়।
খিয়াংরা একসময় প্রকৃতিপূজারি ছিলেন, পরে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন, আর ব্রিটিশ আমল থেকে বড় একটি অংশ খ্রিস্টান হয়েছেন। বাছা খিয়াংয়ের হিসাবে এখন খিয়াংদের প্রায় অর্ধেক খ্রিস্টান; ইংরেজি উইকিপিডিয়া জশুয়া প্রজেক্টের সূত্রে লেখে থেরবাদ বৌদ্ধ 61.71% ও খ্রিস্টান 38.29%। ধর্ম ধরে খিয়াংদের কোনো সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি।
বাংলাপিডিয়া জানায়, খিয়াং ভাষায় সৃষ্টিকর্তার নাম ‘হ্নাদাগা’, আর বৌদ্ধ হওয়ার পরও তাঁরা আদি দেব-দেবীর পূজা চালিয়ে গেছেন। অঞ্চলভেদে ধর্মের ছবি আলাদা — বাছা খিয়াংয়ের বিবরণে বান্দরবান সদরের খিয়াংরা প্রধানত বৌদ্ধ, আর রোয়াংছড়ি, থানচি, রাজস্থলী ও কাপ্তাই-চন্দ্রঘোনার খিয়াংরা মূলত খ্রিস্টান; খ্রিস্টানদের মধ্যে ব্যাপ্টিস্ট ও সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট, অল্প কিছু রোমান ক্যাথলিক। তারেক হাসানের মাঠ-তথ্যও একই ভাগ দেখায়: রাঙামাটির মিশন পাড়া ব্যাপ্টিস্ট, বান্দরবানের দলবনিয়া বৌদ্ধ।
ধর্মান্তরের সময়কাল নিয়ে উৎসে সামান্য পার্থক্য আছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লেখে ব্রিটিশ আমলে অনেকে খ্রিস্টান হন; হাসানের এক উত্তরদাতা জানান, 1907 সালের দিকে রাঙামাটিতে খ্রিস্টান হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময় তাঁর বাবা মিশনারিদের সঙ্গে কাজ করতেন; অথচ সুগত চাকমা 1985 সালে লেখেন, খিয়াংদের “অধিকাংশই” বৌদ্ধ ছিলেন এবং “সাম্প্রতিককালে” অনেকে খ্রিস্টান হয়েছেন। বাছা খিয়াং ধর্মান্তরের কারণ হিসেবে লেখেন শিক্ষা, আর্থিক সহায়তা আর মিশনের স্কুল-অনাথ আশ্রম। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা ও জনগোষ্ঠী ধরে ধর্মের হিসাব আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ধর্ম নিয়ে আমাদের লেখায়।
বৌদ্ধ খিয়াংদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ‘সাংলান’, যা বাংলাপিডিয়ার মতে গৌতম বুদ্ধের পূজা দিয়ে শুরু হয়; বাছা খিয়াং সাংলানকে বৈশাখী পূর্ণিমা বলেন, সঙ্গে ওয়াছ (আষাঢ়ী পূর্ণিমা) ও ওয়াগ্যত (মাঘী পূর্ণিমা)। খ্রিস্টান খিয়াংদের প্রধান উৎসব বড়দিন। সামাজিক উৎসবের মধ্যে হেনেই, সৈত্যবীল ও বুগেলে জুমচাষের সঙ্গে বাঁধা।
বাছা খিয়াংয়ের বিবরণে হেনেই একাধিক পরিবার মিলে বছরে অন্তত তিনবার করে, জুমে ধান রোপণ ও কাটার সময়; বুগেলে হয় ধানের চারা ওঠার পর জুমে, যাতে ফসল রক্ষা পায়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনচক্রের অনুষ্ঠানগুলো — নবজাতকের ‘ওপেল’, মেয়েশিশুর কান ফোঁড়ানোর ‘হৃ উহ্ পেই’, কিশোরের ‘উ-খ পেই’, কিশোরীর ‘লাংকানহ্ পেই’ — ও শবদাহের রীতির বিবরণ আছে আর্কাইভের মূল লেখায়। জন্মের পর অনুষ্ঠানের দিন নিয়েও উৎসভেদ আছে: একই লেখার একটি অংশে ছেলের জন্য পাঁচ দিন ও মেয়ের জন্য সাত দিন, আরেক অংশে উল্টো।
প্রকৃতিপূজার দিকটি সবচেয়ে বিস্তারিত লিখে গেছেন রোয়াংছড়ির খামতাং পাড়ার প্রয়াত কার্বারি রুইহ্লাঅং খিয়াং, “খিয়াং আদিবাসীদের পূজা-পার্বন” লেখায়। তিনি 13টি পূজার নাম দেন — মীনা, খোয়োংহ্নারাং, রিজা খোয়োং হ্নারাং, চুং, চুংমাংলে, সৈত্যবীল, চিনি, ক্রাক হ্না, লুং নাত, মোটক্যা, লুক তেই ফুক, খোয়োং খাট ও বুগেলে — আর জানান, পূজা দেন ‘নাত সারা’ নামের অভিজ্ঞ ব্যক্তি, যার অর্থ ‘ভূতের শিক্ষক’। তাঁর লেখার একটি পর্যবেক্ষণ আন্তঃজনগোষ্ঠীগত: কোনো গ্রামে দক্ষ পূজারি না থাকলে অন্য জনগোষ্ঠীর পূজারি আনা হতো, আর অন্যরাও খিয়াং পূজারি ডাকতেন।
খিয়াংদের প্রধান জীবিকা ঐতিহ্যগতভাবে জুমচাষ, কিন্তু সংরক্ষিত বন, কাপ্তাই বাঁধ ও সরকারি অধিগ্রহণে জুমের জমি কমে যাওয়ায় অনেকে লাঙলচাষ, ফলবাগান, তামাক চাষ ও মজুরিতে গেছেন। সবচেয়ে নির্দিষ্ট নথিভুক্ত ঘটনা রাজস্থলীর ধনুছড়ি মৌজার: 1976 সালে 3,959 একরের মধ্যে 3,889 একর অধিগ্রহণ, 200 পরিবারের জন্য বাকি থাকে 70 একর।
ঘটনাটি লিখেছেন বাছা খিয়াং: বন বিভাগের কাপ্তাই পাল্পউড বাগান প্রকল্পের বনায়নের জন্য অধিগ্রহণটি হয়, আর এতে জুমচাষ ও পশুপালন দুটোই বাধাগ্রস্ত হয়। একই লেখায় তিনি চট্টগ্রামের চন্দনাইশের ধোয়াছড়ি ইউনিয়নের খিয়াং বসতিকে সরকারি অধিগ্রহণে উচ্ছেদের মুখে বলে উল্লেখ করেন, আর লেখেন মহাজনের সুদের ফাঁদে পড়ে অনেক খিয়াং ভূমিহীন হয়েছেন; অভাবের দিনে মজুরির অর্ধেক অগ্রিম নিয়ে শ্রম আগাম বিক্রি করতে হয়।
তারেক হাসানের গবেষণা একই প্রক্রিয়ার পরের ধাপ দেখায়। তাঁর উদ্ধৃত আরেক গবেষণা (Chapola 2009) অনুযায়ী সরকারি সংরক্ষিত বন ও বাগানের বিস্তারে খিয়াংদের মতো ক্ষতিগ্রস্ত আর কোনো জনগোষ্ঠী হয়নি, আর কোথাও কোথাও পুরো খিয়াং গ্রাম হারিয়ে গেছে। বান্দরবানে প্রায় সব খিয়াং পরিবার শীতকালে তামাক চাষ করে, স্থানীয় ও বিদেশি তামাক কোম্পানির এজেন্টদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে; আর আদা বা সবজির বাজার নিয়ন্ত্রণ মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে থাকায় লোকসান হলে জমি বন্ধক বা বিক্রি করতে হয়।
রাঙামাটির মিশন পাড়া এই পরিবর্তনের শেষ প্রান্ত: হাসানের হিসাবে সেখানকার কোনো খিয়াং আর কৃষিকাজে নেই — পেশার তালিকায় চিকিৎসক, হিসাবরক্ষক, নার্স, পোশাক শ্রমিক, বিউটিশিয়ান, নিরাপত্তাকর্মী, দোকানি, এনজিও কর্মী। হাসান এই অবস্থাকে বলেছেন খিয়াংদের “ethnic amphibians” হয়ে ওঠা — অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বাঙালি সমাজের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া, অথচ জাতিগত পরিচয়ে আলাদা থাকা।
খিয়াংদের শিক্ষার হারের কোনো সরকারি তথ্য প্রকাশিত হয়নি। বাছা খিয়াংয়ের বিবরণে খিয়াং বসতির এলাকায় তখন কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না, কারণ ছড়ানো ছোট পাড়ায় সরকারি অনুমোদনের শর্ত — অন্তত 40 জন ছাত্র বা বন্দোবস্তকৃত জমি — পূরণ হয় না। আর তারেক হাসান 2014 সালে লেখেন, কোটার সুবিধা মূলত বড় জনগোষ্ঠীগুলো পায়, খিয়াংরা “minority among the minorities”।
বাছা খিয়াং রাজস্থলীর কুক্যাছড়ি গ্রামের একটি উদাহরণ দেন: সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট মিশনের সহায়তায় খিয়াং শিশুদের জন্য একটি আশ্রম-বিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল, যেখানে নিম্ন মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ার সুযোগ হয়; 2007 সালে প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর বিদ্যালয়টির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। হাসান এক খিয়াং মেয়ের কথা লেখেন, যিনি মাধ্যমিক পাসের পর সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির চেষ্টা করেও সুযোগ পাননি; রাঙামাটির এক উত্তরদাতার ভাষায়, সেই প্রথম কোনো খিয়াং মেয়ে মেডিকেলে পড়ার অবস্থানে পৌঁছেছিলেন, কিন্তু “সংখ্যালঘুর মধ্যে সংখ্যালঘু” হওয়ায় পারেননি।
আইনে খিয়াংদের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু তা ভাগাভাগির। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ‘খেয়াং’দের জন্য একটি আলাদা আসন; বান্দরবান জেলা পরিষদে মারমা ও খিয়াং মিলে 10টি আসন; আর পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদে লুসাই, বম, পাংখো, খুমী, চাক ও খিয়াং — ছয় জনগোষ্ঠী মিলে একটি আসন। হিসাবগুলোর উৎস ও আইনের ধারা আছে জেলা পরিষদের আসন ভাগ ও আঞ্চলিক পরিষদের গঠন নিয়ে আমাদের দুটি লেখায়।
বাস্তবে এই আসনগুলোর প্রভাব সীমিত। বাছা খিয়াংয়ের লেখা (প্রথম প্রকাশ 2010) অনুযায়ী তখন পর্যন্ত আঞ্চলিক পরিষদে কোনো খিয়াং প্রতিনিধি ছিলেন না, আর জেলা পরিষদগুলো নির্বাচিত না হওয়ায় সেখানেও খিয়াং সদস্য ছিলেন না; ইউনিয়ন বা উপজেলা পরিষদেও খিয়াং প্রতিনিধি নির্বাচিত হননি। তারেক হাসান অবশ্য 2014 সালে তাঁর রাঙামাটির মাঠ-এলাকার ইউনিয়ন পরিষদে একজন নির্বাচিত খিয়াং সদস্যের কথা লেখেন। জেলা পরিষদে কেন 1989 সালের পর আর ভোট হয়নি, তা আছে জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে আমাদের লেখায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খিয়াংদের নিয়ে প্রকাশিত খবর কম, আর যা আছে তা মূলত তিন বিষয়ে: ভাষা ও বর্ণমালা, ভূমি ও অর্থনৈতিক প্রান্তিকতা, আর কেএনএফ নামের সশস্ত্র সংগঠনের দাবি অস্বীকার। নিচে সময় ধরে সাজানো হলো।
| সাল | ঘটনা | উৎস |
|---|---|---|
| 2014 | বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে খিয়াংদের ওপর মাঠ-গবেষণা: জুম থেকে বাজার-অর্থনীতিতে যাওয়া, ঋণ ও জমি হারানো, কোটায় বঞ্চনা, পরিচয়ের বৈচিত্র্য | M. T. Hasan |
| 2017 | গুংগুরু খেয়াং পাড়ায় নতুন বর্ণমালা; 22 অক্টোবর খেয়াং ভাষা ও বর্ণমালা বইয়ের প্রকাশনা উৎসব | ঢাকা ট্রিবিউন, 2023 |
| 2018 | খিয়াং (হিয়ো) ভাষার প্রথম পূর্ণ ব্যাকরণ; IMLI-র জরিপ শেষ, খিয়াং 14টি বিপন্ন ভাষার একটি | LINGUIST List; ডেইলি স্টার, 2021 |
| ডিসেম্বর 2022 | কেএনএফ বম, পাংখোয়া, লুসাই, ম্রো, খুমী ও খিয়াং জাতির সমন্বয়ে গঠিত বলে দাবি করলে বান্দরবানে পাঁচ জনগোষ্ঠীর নেতারা সংবাদ সম্মেলনে দাবিটি অসত্য বলে প্রত্যাখ্যান করেন; খিয়াংদের পক্ষে বক্তব্য দেন ম্রা সা খিয়াং | ডেইলি স্টার বাংলা, 28 ডিসেম্বর 2022 |
| 23 সেপ্টেম্বর 2023 | ‘হোয়ো’ বর্ণমালার কম্পিউটার কী-বোর্ড উদ্বোধন, কুহালং ইউনিয়ন, বান্দরবান সদর | ডেইলি স্টার বাংলা; ঢাকা ট্রিবিউন; রাইজিংবিডি |
2022 সালের সংবাদ সম্মেলনে নেতারা বলেন, কেএনএফ এসব জনগোষ্ঠীর নাম ব্যবহার করে কখনো কুকিচিন রাজ্য, কখনো খ্রিস্টান রাজ্যের কথা বলছে, আর দুর্গম পাড়ার মানুষ ও জুমচাষিরা একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, অন্যদিকে কেএনএফের চাপে কাজ করতে পারছেন না। কেএনএফ ও বম সমাজের সম্পর্ক নিয়ে নথিভুক্ত তথ্য ও অভিযোগের পার্থক্য আছে আমাদের আলাদা লেখায়। 2024–2026 সালের পরিস্থিতির কোনো খিয়াং-নির্দিষ্ট প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের খিয়াংদের ভাষা ও জাতিগত আত্মীয়রা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ও মধ্য মিয়ানমারে থাকেন, যাঁদের সাধারণত আশো বা আশো চিন বলা হয়। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার হিসাবে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ মিলিয়ে এই ভাষার ভাষাভাষী প্রায় 1,80,000; বাংলাদেশে মাত্র কয়েক হাজার।
উৎসগুলো মিয়ানমারের খিয়াংদের কয়েকটি এলাকা চিহ্নিত করে। বাছা খিয়াং আকিয়াব, ক্যক্পু ও সানডোওয়ে জেলার পশ্চিমে এবং মিনবু, দেয়েতমোয়া, প্রোম ও হেনজাদার পূর্বে খিয়াং বসতির কথা লেখেন; ইংরেজি উইকিপিডিয়া আশো ভাষার উপভাষাগুলো দেখায় Sittwe থেকে Thandwe, Minbya, Myebon, Kyaukphyu, Minbu, Minhla ও Bago-Mandalay-Magway অঞ্চলে। সেই সূত্রে মিয়ানমারে ভাষাটি বর্মি ও রোমান হরফে লেখা হয়, আর প্রথম লিখিত রূপ তৈরি করেন Rev. Lyman Stilson, 1842 সালে। বাংলাদেশের খিয়াংরা সেই লিপি নয়, 2017 সালে নিজেদের নতুন বর্ণমালা তৈরি করেছেন।
দুই দেশের খিয়াংদের মধ্যে বর্তমান যোগাযোগ, আত্মীয়তা বা যাতায়াত নিয়ে কোনো প্রকাশিত উৎস পাওয়া যায়নি। Phayre-এর 1841 সালের বিবরণ, যা সুগত চাকমা উদ্ধৃত করেছেন, অন্তত এটুকু দেখায় যে উনিশ শতকের শুরুতেই খিয়াংরা আরাকানের ব্রিটিশ ও বর্মি দুই এলাকায় ভাগ হয়ে ছিলেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি 2022 অনুযায়ী দেশে খিয়াং 4,826 জন — পুরুষ 2,459, নারী 2,367। এর 2,502 জন বান্দরবানে, 1,670 জন রাঙামাটিতে আর 472 জন চট্টগ্রাম জেলায়। আগের হিসাবগুলো অনেক কম: বাংলাপিডিয়া 2010 সালে দুই থেকে তিন হাজার অনুমান করেছিল, আর খিয়াংদের নিজস্ব জরিপে সংখ্যা ছিল প্রায় 3,600।
2022 শুমারিতে সবচেয়ে বেশি খিয়াং রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলায় (1,420 জন) ও বান্দরবান সদরে (1,310 জন) — দুই উপজেলায় দেশের অর্ধেকের বেশি খিয়াং। এরপর রোয়াংছড়ি 652, চট্টগ্রামের চন্দনাইশ 382, থানচি 359, কাপ্তাই 177 ও রুমা 158। উৎসে নাম আসা জায়গার মধ্যে আছে চন্দ্রঘোনা, রাজস্থলীর কুক্যাছড়ি ও কুহালংয়ের গুংগুরুমুখ।
হ্যাঁ, একই জাতির দুটি বাংলা বানান। জনশুমারি 2022, বান্দরবান জেলা পরিষদ আইন ও আঞ্চলিক পরিষদ আইনে ‘খিয়াং’; রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ আইনের মূল দফায় আর সাম্প্রতিক সংবাদে বেশি ‘খেয়াং’। ইংরেজিতে Khyang, Khiang ও Kheyang তিনটিই চলে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী তাঁদের নিজেদের নাম ‘হিয়ো’ (Hyow)।
খিয়াং চীনা-তিব্বতি পরিবারের কুকি-চিন দলের ভাষা, দক্ষিণ চিন ভাষাগুলোর কাছাকাছি। Glottolog আশো চিন (ISO কোড csh) ভাষাকে কুকি-চিনের দক্ষিণ পেরিফেরাল শাখায় রাখে, আর ইংরেজি উইকিপিডিয়া খিয়াংকে আশো ভাষার অংশ বলে। ভাষাবিদ মুহাম্মদ জাকারিয়া 2013 সালে যুক্তি দেন, হিয়োকে খুমি ও চো-আশোর সঙ্গে এক দলে রাখা উচিত।
হ্যাঁ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের 2018 সালে শেষ হওয়া ভাষা-জরিপ খিয়াংকে দেশের 14টি বিপন্ন ভাষার একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে, ডেইলি স্টারের 2021 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী। ভাষাবিদ মুহাম্মদ জাকারিয়ার 2018 সালের হিসাবে ভাষাটির বাংলাদেশি ভাষাভাষী প্রায় চার হাজার। মাঠ-গবেষণায় খিয়াংরা জানান, প্রতিদিন বাংলায় কথা বলতে হওয়ায় নিজের ভাষা ক্ষয়ে যাচ্ছে।
এখন আছে। পুরনো উৎস, যেমন বাংলাপিডিয়া, বলে খিয়াংদের বর্ণমালা নেই। কিন্তু 2017 সালে বান্দরবানের গুংগুরু খেয়াং পাড়ার পাঁচজনের একটি দল ‘হোয়ো’ নামের বর্ণমালা তৈরি করেন, যাতে স্বরবর্ণ 11টি ও ব্যঞ্জনবর্ণ 21টি। 23 সেপ্টেম্বর 2023 কুহালং ইউনিয়নে এর কম্পিউটার কী-বোর্ড উদ্বোধন হয়, ফ্রেন্ডস অব এন্ডেঞ্জার্ড এথনিক ল্যাংগুয়েজেসের সহায়তায়।
খিয়াংরা একসময় প্রকৃতিপূজারি ছিলেন, পরে বৌদ্ধ হন, আর ব্রিটিশ আমল থেকে বড় একটি অংশ খ্রিস্টান। খিয়াং লেখক বাছা খিয়াংয়ের হিসাবে প্রায় অর্ধেক খ্রিস্টান; ইংরেজি উইকিপিডিয়া জশুয়া প্রজেক্টের সূত্রে লেখে বৌদ্ধ 61.71% ও খ্রিস্টান 38.29%। বান্দরবান সদরের খিয়াংরা প্রধানত বৌদ্ধ, আর রাজস্থলী, কাপ্তাই, রোয়াংছড়ি ও থানচির খিয়াংরা মূলত খ্রিস্টান।
খিয়াং জনগোষ্ঠীর দুটি শাখা। প্রথাগত আইনের সংকলন অনুযায়ী পাহাড়ে বাস করা খিয়াংরা কোংতু, সমতলে বাস করা খিয়াংরা লাইতু, আর দুই শাখার ভাষায় কিছু পার্থক্য আছে। নৃবিজ্ঞানী তারেক হাসানের 2014 সালের মাঠ-গবেষণায় কোংতুরা মূলত খ্রিস্টান ও আগে জুমচাষি, আর লাইতুরা মূলত বৌদ্ধ ও লাঙলচাষি।
উৎসভেদে সংখ্যা আলাদা। প্রথাগত আইনের সংকলন বলে কোংতু ও লাইতু মিলিয়ে 12টি গোত্র, নাম পেশা ও সামাজিক অবস্থান ধরে। বাছা খিয়াং দশটি গোত্রের নাম দেন, যেমন হোক্চ, খাংচ্ ও মংচ্। সুগত চাকমা 1985 সালে লেখেন, খিয়াং গোত্রনামে টোটেম-বৈশিষ্ট্য আছে — মিনচ সং (বিড়াল), য়ুংচ সং (বানর), ইউ সং (ইঁদুর)।
লিখিত দলিল নেই, অনুমানগুলো আলাদা। বাংলাপিডিয়া ষোলো ও সতেরো শতকের কথা বলে, বাছা খিয়াং 1600–1700 শতকের মতের কথা লেখেন, আর ইংরেজি উইকিপিডিয়া বর্মি ইতিহাসের সূত্রে বলে আঠারো শতকের শেষে মারমাদের সঙ্গে আগমন। খিয়াংদের নিজস্ব জনশ্রুতিতে এক রাজার রেখে যাওয়া অন্তঃসত্ত্বা ছোট রানির বংশধর তাঁরা।
আছে, তবে ভাগাভাগির। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ‘খেয়াং’দের জন্য একটি আলাদা আসন; বান্দরবান জেলা পরিষদে মারমা ও খিয়াং মিলে 10টি আসন; আর পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদে লুসাই, বম, পাংখো, খুমী, চাক ও খিয়াং — ছয় জনগোষ্ঠী মিলে একটি আসন। 2010 সালের এক লেখা অনুযায়ী তখন পর্যন্ত আঞ্চলিক পরিষদে কোনো খিয়াং প্রতিনিধি ছিলেন না।
উৎসগুলোতে তিনটি সমস্যা বারবার এসেছে: জমি হারানো, ভাষা ক্ষয় ও প্রতিনিধিত্বের অভাব। 1976 সালে রাজস্থলীর ধনুছড়ি মৌজার 3,959 একরের 3,889 একর পাল্পউড বাগানের জন্য অধিগ্রহণ হয়, 200 পরিবারের জন্য থাকে 70 একর। 2014 সালের গবেষণা দেখায় ঋণ ও মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে জমি হারানো, আর বড় জনগোষ্ঠীর তুলনায় কোটার সুবিধা না পাওয়া।
প্রসঙ্গ:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।