Last updated Oct 19th, 2026
0

2019 সালের 8 মার্চ সকালে বান্দরবান শহরের রাজার মাঠে বোমাং রাজা উ চ প্রু চৌধুরী শোভাযাত্রা করে মঞ্চে আসেন, আর হেডম্যান-কার্বারিরা জুমচাষিদের কাছ থেকে তোলা খাজনা তাঁর হাতে তুলে দেন। আগের দিন জেলা প্রশাসন মেলার দোকান খুলতে দেয়নি; উপজেলা নির্বাচনের কারণে। সংবাদমাধ্যমে বান্দরবানের রাজপুণ্যাহর শেষ যে আয়োজনের খবর পাওয়া যায়, সেটি এটিই।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: রাজপুণ্যাহ হলো সার্কেল চিফ বা রাজার কাছে হেডম্যান-কার্বারিদের বার্ষিক খাজনা জমা দেওয়ার রাজকীয় অনুষ্ঠান, যাকে ঘিরে মেলা বসে। রাজপুণ্যাহ বোমাং সার্কেলে 1875 সাল থেকে প্রায় প্রতিবছর হয়ে এসেছে, কিন্তু ডিসেম্বর 2024-এ পাহাড়বার্তা জানায়, 2018 সাল থেকে বান্দরবানে আর আয়োজন হয়নি। চাকমা সার্কেলে অনুষ্ঠানটি এখন পাঁচ-ছয় বছরে একবার হয় বলে চাকমা রাজা নিজেই বলেছেন; মং সার্কেলে সর্বশেষ খবর ডিসেম্বর 2021-এর।
এই লেখা একটি প্রশ্নের পেছনে হাঁটে: কোন সার্কেলে কবে রাজপুণ্যাহ হয়েছে, কবে থেমেছে, আর উৎসগুলো এর কী কারণ বলে। সার্কেল চিফের আইনি ক্ষমতা, তিন সার্কেলের গঠন ও খাজনার বিধি নিয়ে আমাদের আলাদা লেখা আছে — সার্কেল চিফের ক্ষমতা ও তিন সার্কেল এবং চাকমা সার্কেল, হেডম্যান ও কার্বারি। সেগুলোর কথা এখানে আবার বলা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য বিষয়গুলোর সূচি পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
এই লেখায়
রাজপুণ্যাহ সার্কেল চিফের বার্ষিক খাজনা আদায়ের অনুষ্ঠান: মৌজার হেডম্যান ও পাড়ার কার্বারিরা প্রজাদের কাছ থেকে তোলা জুম কর আনুষ্ঠানিকভাবে রাজার হাতে দেন, সঙ্গে উপঢৌকন। বোমাং সার্কেলে মারমা ভাষায় একে ‘পইজ্রা’ বলা হয়; ডেইলি স্টার লিখেছে ‘Poyengjara’। অনুষ্ঠানকে ঘিরে সাধারণত তিন দিনের মেলা বসে।
শব্দটির দ্বিতীয় অংশ ‘পুণ্যাহ’-র অর্থ আমাদের আর্কাইভের চাকমা জাতি লেখায় দেওয়া আছে ‘শুভদিন’; সেখানে অনুষ্ঠানটির আরেক নাম ‘দরবার’। একই লেখা বলছে, রাজার সবচেয়ে দৃশ্যমান কাজগুলোর একটি এই বার্ষিক পুণ্যাহ, যখন হেডম্যানরা রাজাকে কর দেন, আর এটি একটি বড় সামাজিক সমাবেশও।
দৈনিক ইনকিলাবে 2024 সালে প্রকাশিত “বোমাং রাজাদের ইতিহাস” লেখাটি অনুষ্ঠানের সংজ্ঞা দেয় এভাবে: রাজপুণ্যাহ হচ্ছে সার্কেল চিফের ট্যাক্স আদায়ের বাৎসরিক অনুষ্ঠান, যেখানে বিভিন্ন মৌজার হেডম্যান-কারবারিরা ট্যাক্স রাজার হাতে তুলে দেন। লেখাটি আরও বলে, অনুষ্ঠানটি শুধু ট্যাক্সে সীমাবদ্ধ নয়; প্রজাদের সঙ্গে রাজার দেখা-সাক্ষাতের সুযোগও এটি।
বাংলা উইকিপিডিয়ার “রাজপুণ্যাহ” ভুক্তি অনুষ্ঠানটিকে ‘চাকমা জনগোষ্ঠীর’ উৎসব হিসেবে বর্ণনা করে এবং আয়োজনের স্থান বলে রাঙামাটি। কিন্তু ভুক্তিটির প্রধান তথ্যসূত্র বিডিনিউজের একটি প্রতিবেদন, যার বিষয় বান্দরবানের 137তম রাজপুণ্যাহ। একই নামের অনুষ্ঠান দুই সার্কেলে আলাদাভাবে হয়েছে, আর উইকিপিডিয়ার ভুক্তিতে দুটি মিশে গেছে — এটুকু মনে রেখে ভুক্তিটি পড়া ভালো। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Rajpunyah” ভুক্তি দুই সার্কেলকে আলাদা করে লেখে: চাকমা সার্কেল রাঙামাটিতে, বোমাং সার্কেল বান্দরবানে।
রাজপুণ্যাহ কেবল প্রথা নয়, আইনেও এর একটি জায়গা আছে। 1900 সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির 42(6) বিধি অনুযায়ী হেডম্যান তাঁর মৌজার জুম করের অন্তত অর্ধেক ‘পুণ্যাহ দিবসে’ সার্কেল চিফকে দেন, বাকিটা পরে। অর্থাৎ আইনের চোখে পুণ্যাহ দিবস একটি রাজস্ব-সময়সীমা।
বাকি অংশ কবে দিতে হয়, তা নিয়ে আমাদের আর্কাইভের দুটি লেখায় দুই রকম তারিখ: “পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার সৃষ্টি, শাসন ও বিচার ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ” লেখাটি বলছে পরবর্তী বছরের 1 জানুয়ারির মধ্যে, আর মৌজা হেডম্যান ও কার্বারির দায়িত্ব নিয়ে লেখাটি বিধি পড়ে বলছে 15 জানুয়ারির আগে। চিফের পুরো রাজস্ব-বর্ষপঞ্জি, তৌজি জমার তারিখ আর খেলাপির নিয়ম ওই দুই লেখায় ছক ধরে দেওয়া আছে।
খাজনার এই ব্যবস্থার শিকড় ঔপনিবেশিক নথিতে দেখা যায়। আর. এইচ. স্নেইড হাচিনসনের 1906 সালের “An Account of the Chittagong Hill Tracts” বইয়ে লেখা আছে, চিফদের রাজস্ব আদায় হতো মাথাপিছু কর (capitation tax) হিসেবে, যার একটি অংশ সরকারকে ‘tribute’ হিসেবে দিতে হতো। হাচিনসন এর একটি পরিণামও লিখেছেন: এ কারণে চিফের স্বার্থ ছিল জনসংখ্যা কম দেখানো, তাই 1871 সালের শুমারির সংখ্যা তাঁর মতে বিশ্বাসযোগ্য নয়।
বান্দরবান জেলা প্রশাসনের সদর উপজেলা পোর্টালের “ইতিহাস ঐতিহ্য” পাতাও একই কথা বলে অন্য ভাষায়: ব্রিটিশ শাসকরা সার্কেল প্রধানের মাধ্যমে পরিবারপিছু বাৎসরিক খাজনা আদায়ের ‘রাজপুন্যাহ’ অনুষ্ঠান চালু করেন। বাংলা ও ইংরেজি উইকিপিডিয়াও অনুষ্ঠানটি ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত বলে লেখে।
খাজনার টাকা রাজা, হেডম্যান আর সরকারের মধ্যে কীভাবে ভাগ হয়, সেই প্রশ্ন এই লেখার বিষয় নয়। শুধু এটুকু: আর্কাইভের মারমা-পরিচিতি, উইকিপিডিয়া, বিডিনিউজ ও জেলা পোর্টাল — চারটি উৎস চার রকম হিসাব দেয়।
প্রায় সব উৎস একমত যে বোমাং সার্কেলে আনুষ্ঠানিক খাজনা আদায়ের রাজপুণ্যাহ শুরু 1875 সালে, বোমাং রাজা সাক হ্ন ঞোর আমলে। মতভেদ তাঁর ক্রমিক নম্বরে: ডেইলি স্টার (2010, 2011), দৈনিক ইনকিলাব (2024) ও প্রথম আলো (2024) তাঁকে নবম বোমাং রাজা বলে, আর সিভয়েস24 (2019) বোমাং রাজার সংবাদ সম্মেলনের খবরে লেখে ‘৫ম তম বোমাং রাজা’।
ইনকিলাবের লেখাটি 16তম বোমাং রাজার শেষকৃত্য উপলক্ষে প্রকাশিত একটি স্মারকগ্রন্থ থেকে রাজাদের পূর্ণ তালিকা দিয়েছে। সেই তালিকায় নবম নামটি “সাক হ্ন ঞো বোমাংগ্রী (1875–1901)” — অর্থাৎ রাজপুণ্যাহ শুরুর বছর আর তাঁর রাজত্বের প্রথম বছর একই। প্রথম আলো একই রাজার নাম লিখেছে ‘সাক হ্না ঞো চৌধুরী’ এবং বলেছে, বান্দরবানের রাজগুরু বৌদ্ধবিহারের নির্মাণ তিনিই শুরু করেছিলেন। ডেইলি স্টারের 2011 সালের প্রতিবেদনে নামটি ‘Sanangor’।
বোমাং সার্কেলের কার্যক্রম কবে শুরু, সে বিষয়ে উৎসগুলো আরও বেশি ছড়ানো। 2009 সালে বিডিনিউজকে তৎকালীন বোমাং রাজা অংশৈপ্রু চৌধুরী বলেন, 1822 সাল থেকে বোমাং সার্কেলের কার্যক্রম শুরু হয়। পাহাড়বার্তার 2024 সালের প্রতিবেদনে বোমাং রাজপরিবার সূত্র বলছে, 1867 সালে কর্ণফুলীর দক্ষিণের মারমা-অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে বোমাং সার্কেল গঠিত হয়। ইনকিলাবের লেখা বলছে, 1789 সালে ইংরেজরা প্রথম বোমাং কং হ্লা প্রুর সঙ্গে কর আদায়ের ব্যাপারে সরাসরি যোগাযোগ করে, আর 1900 সালে সার্কেলগুলো গঠিত হলে বোমাং সার্কেল দাঁড়ায়।
এই সালগুলো আসলে আলাদা আলাদা ঘটনার: ব্রিটিশদের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ, একটি এলাকাকে আলাদা করা, আর 1900 সালের শাসনবিধিতে আইনি রূপ। রাজপুণ্যাহর 1875 সালটি এই ধারার মাঝখানে পড়ে — সার্কেলের আইনি কাঠামো তৈরির পঁচিশ বছর আগে।
1875 থেকে টানা চলার দাবির মধ্যেও অন্তত একটি বিরতির খবর আছে। বিডিনিউজের 2009 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী 14তম রাজা মংশৈপ্রু চৌধুরী 1996 সালে মারা যান, আর নতুন রাজা অংশৈপ্রু চৌধুরীর রাজপুণ্যাহ শুরু হয় 1997 সাল থেকে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া বলছে, 14তম রাজার মৃত্যুর পর দুই বছর রাজপুণ্যাহ হয়নি; ইনকিলাবের তালিকায় 15তম রাজার দায়িত্বকাল শুরু 1998 থেকে।
বোমাং রাজপুণ্যাহর সবচেয়ে বিস্তারিত লিখিত বর্ণনা আমাদের আর্কাইভের মারমা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায়, যা আহসান (1993)-এর সূত্রে লেখা। নিচের বিবরণ কেবল বোমাং সার্কেলের, এবং কেবল ওই উৎস ও সংবাদপত্র যা বলে ততটুকুই। চাকমা বা মং সার্কেলের অনুষ্ঠান একই রকম কি না, এই উৎস তা বলে না।
আর্কাইভের বর্ণনা অনুযায়ী অনুষ্ঠান হয় জুমের ফসল তোলার পর, ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে, সাধারণত রাজবাড়ির দরবার হলের সামনে। দিনক্ষণ ঠিক হলে প্রতিটি মৌজার হেডম্যান, গ্রামের কার্বারি ও গণ্যমান্যদের নোটিশ দেওয়া হয়। বোমাং রাজার দপ্তর থেকে মারমা ভাষায় লেখা একটি বিশেষ চিঠি যায় হেডম্যানদের কাছে, যাতে ‘অইং’ বা উপহারসহ এসে জুমের খাজনা পরিশোধের আহ্বান থাকে। তার আগে প্রত্যেক হেডম্যানকে তৌজি, অর্থাৎ জুমচাষি পরিবারের তালিকা, তৈরি রাখতে বলা হয়।
খবর পৌঁছানোর আরেকটি পদ্ধতির কথা আছে সিভয়েস24-এর 2019 সালের প্রতিবেদনে: রাজপরিবারের পক্ষ থেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে দুর্গম এলাকাতেও পুণ্যাহ মেলার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
আর্কাইভের বর্ণনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে রাজা পঞ্চশীল গ্রহণ করেন। দুপুরে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে তিনি বয়োজ্যেষ্ঠদের শুভেচ্ছা নেন, তারপর শোভাযাত্রা করে দরবারের দিকে যান। সঙ্গে রাজার যন্ত্রীদল বাজায় খরা (এক রকম শিঙা), মঙঃ (পিতলের দুন্দুভি), প্যাহ্ (ঢোল), হ্নেঃ (বাঁশি) ও চে (কাঠ ও চামড়ার দুন্দুভি)। রাজার নিজস্ব সৈনিকেরা, যাদের বলা হয় ‘দ্গই’, অভিবাদন জানায়; একজন রাজার মাথার ওপর সোনালি ছাতা ধরে রাখেন। যন্ত্রগুলোর আলাদা আলোচনা আছে পাহাড়ি গান ও আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র লেখায়।
রাজা আসনে বসার পর হেডম্যান, কার্বারি ও সমবেত গ্রামবাসী অভিবাদন জানিয়ে বসেন। তারপর তালিকা ধরে একজন ঘোষক নাম ডাকেন, আর হেডম্যানরা একে একে খাজনা জমা দেন। রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পরদিন অতিথিদের সম্মানে ভোজ — যার খরচে হেডম্যান-কার্বারিরাও সাধ্যমতো অংশ নেন — আর রাজার সভাপতিত্বে একটি আলোচনা সভা, যেখানে বিভিন্ন সমস্যা ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে কথা হয়।
জুম কর থেকে কারা অব্যাহতি পান, সেটিও আর্কাইভের বর্ণনায় আছে: অবিবাহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু, বিধবা, বিপত্নীক, শিকারি ও বৈদ্য।
সংবাদপত্রের প্রতিবেদনগুলো আর্কাইভের বর্ণনার কয়েকটি অংশ মিলিয়ে দেয়, কয়েকটি নতুন দিক যোগ করে। ডেইলি স্টারের জানুয়ারি 2010-এর প্রতিবেদনে 15তম রাজা অংশৈপ্রু চৌধুরী রাজবাড়ি থেকে দরবারে আসার সময় ‘troops’ তাঁকে গার্ড অব অনার দেয়। ডিসেম্বর 2015-এর প্রতিবেদনে 17তম রাজা উ চ প্রু চৌধুরী হলুদ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে প্রহরীসহ পুরাতন রাজার মাঠে অস্থায়ী সিংহাসনে ওঠেন, আর আদিবাসী ছেলেমেয়েরা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাঁকে বরণ করে।
ডেইলি স্টার 2015 অনুযায়ী প্রতিটি হেডম্যান ও কার্বারি রাজার জন্য উপহার আনেন — মদের বোতল, মোরগ, ছাগল ও শূকর। জানুয়ারি 2011-এর প্রতিবেদনে উপহারের তালিকায় মদ, মুরগি ও শূকর। বাংলাদেশ প্রতিদিনের ডিসেম্বর 2016-এর প্রতিবেদনে রাজা রাজকীয় পোশাকে তরবারি হাতে উজির-নাজির ও সৈন্য-সামন্ত নিয়ে সিংহখচিত সিংহাসনে বসেন।
প্রতিবেদনগুলোতে খাজনা দেওয়া মৌজা ও কার্বারির সংখ্যাও আছে। সব প্রতিবেদনে মৌজা 109টি — বিডিনিউজ 2009-এর হিসাবে বান্দরবানের 95টি আর রাঙামাটির কাপ্তাই ও রাজস্থলীর 14টি। কার্বারির সংখ্যা ডেইলি স্টার 2015 ও 2016-এ প্রায় 1,000, আর 2017-এ প্রায় 1,261।
রাজপুণ্যাহর সঙ্গে বসা মেলাই বাইরের মানুষের কাছে অনুষ্ঠানটির সবচেয়ে চেনা রূপ। বিডিনিউজ 2009 মেলায় লোকজ, কৃষিজ ও শিল্প পণ্যের পসরা, গান-বাজনা, যাত্রাপালা, সার্কাস ও পুতুলনাচের কথা লেখে। বাংলাদেশ প্রতিদিন 2016 যোগ করে মৃত্যুকূপ, হাউজি ও পপসংগীত; সিভয়েস24 2019 যোগ করে নাগরদোলা ও সারারাত যাত্রা। ডেইলি স্টার 2011 লিখেছিল, খাজনা আদায়ের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ‘জনগণের উৎসবে’ পরিণত হয়েছে।
বোমাং সার্কেলের রাজপুণ্যাহ কেবল মারমাদের অনুষ্ঠান নয়। ডেইলি স্টার 2011 ও 2015-এর প্রতিবেদনে তিন পার্বত্য জেলা থেকে আসা মারমা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো, খুমি, পাংখুয়া, লুসাই, খিয়াং, বম ও চাক জনগোষ্ঠীর নাম আছে। কিন্তু প্রত্যেক জনগোষ্ঠী অনুষ্ঠানটিকে কীভাবে দেখে, সে তথ্য আলাদা আলাদা উৎসে, এবং সব জনগোষ্ঠীর জন্য নেই।
তঞ্চঙ্গ্যাদের বেলায় চিত্রটি আলাদা, এবং সেটি চাকমা সার্কেলের সঙ্গে যুক্ত। আর্কাইভের তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত বলছে, তঞ্চঙ্গ্যাদের মধ্য থেকে কোনো সার্কেল চিফ না থাকায় তাদের গোষ্ঠীগত রাজপুণ্যাহর অবকাশ নেই; তবে তাঁরা চাকমা রাজার পুণ্যাহকে নিজেদের মনে করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন।
2019 সালের মার্চের পর বান্দরবানে রাজপুণ্যাহ হওয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। পাহাড়বার্তা 23 ডিসেম্বর 2024 জানায়, “২০১৮ সালে থেকে এ বছরও” রাজপুণ্যাহর আয়োজন হবে না; বোমাং রাজার সহকারী অং ঝাই খ্যায়াং কারণ বলেন দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। 2025-26 মৌসুমে আয়োজন হয়েছে কি না, জানা যায়নি।
পাহাড়বার্তার “২০১৮ সালে থেকে” আর ঢাকাটাইমসের মার্চ 2019-এর খবর আপাতদৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক। ঢাকাটাইমস লিখেছে, সাধারণত ডিসেম্বরের শেষ বা জানুয়ারির শুরুতে হলেও সে বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে অনুষ্ঠানটি পিছিয়ে মার্চে হয়। অর্থাৎ মার্চ 2019-এর আয়োজনটি আসলে 2018-19 মৌসুমের, যার স্বাভাবিক সময় ছিল ডিসেম্বর 2018। পাহাড়বার্তার হিসাব সম্ভবত সেই মৌসুম থেকে ধরা; তবে প্রতিবেদনটি নিজে তা ব্যাখ্যা করেনি।
বিরতির শুরুটা এল অস্বস্তি নিয়ে। ডেইলি স্টারের 8 মার্চ 2019-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী আগের দিন স্থানীয় প্রশাসন দেশের নানা জায়গা থেকে আসা প্রায় 250 জন ব্যবসায়ীকে দোকান না খুলে চলে যেতে বলে। বান্দরবান সদর থানার ওসি বলেন, আসন্ন উপজেলা নির্বাচনের কারণে মেলা বন্ধের নির্দেশ এসেছে। রাজা উ চ প্রু বলেন, “Our communal harmony has been damaged through this cruel decision of the administration.”
নিচের ছকটি এই লেখার জন্য সংবাদপত্রের প্রতিবেদন পাশাপাশি রেখে সাজানো। এটি পূর্ণ তালিকা নয় — যে বছরগুলোর প্রতিবেদন পড়া গেছে, কেবল সেগুলো।
| সময় | কী হয়েছিল | উৎস যে নম্বর দেয় | উৎস |
|---|---|---|---|
| 1996–97/98 | 14তম রাজার মৃত্যুর পর বিরতি; 15তম রাজার রাজপুণ্যাহ শুরু 1997 থেকে | — | বিডিনিউজ 2009; ইংরেজি উইকিপিডিয়া (দুই বছরের বিরতি) |
| 5–7 ফেব্রুয়ারি 2009 | রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে তিন দিনের আয়োজন ঘোষিত | বর্তমান রাজার “11th instalment” | ডেইলি স্টার, 22 জানুয়ারি 2009 |
| জানুয়ারি 2010 | 14 জানুয়ারি শুরু ঘোষিত; 13 জানুয়ারি শুরুর খবর | 134তম; 15তম রাজার 12তম | বিডিনিউজ, 31 ডিসেম্বর 2009; ডেইলি স্টার, 14 জানুয়ারি 2010 |
| 20 জানুয়ারি 2011 থেকে | সপ্তাহব্যাপী আয়োজন; 96 বছর বয়সী রাজা অংশৈপ্রু চৌধুরী | 135তম | ডেইলি স্টার, 31 জানুয়ারি 2011 |
| জানুয়ারি 2013 | বৃহস্পতিবার শুরু | 137তম | বাংলানিউজ24, 2 জানুয়ারি 2013 (ইংরেজি উইকিপিডিয়ার সূত্রতালিকা থেকে) |
| 18 ডিসেম্বর 2015 | 17তম রাজা উ চ প্রু চৌধুরী পুরাতন রাজার মাঠে উদ্বোধন করেন | — | ডেইলি স্টার, 10 ও 18 ডিসেম্বর 2015 |
| 21 ডিসেম্বর 2016 | স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধান অতিথি | 139তম | বাংলাদেশ প্রতিদিন, 21 ডিসেম্বর 2016 |
| 21 ডিসেম্বর 2017 | শুরুর তারিখ ঘোষিত | — | ডেইলি স্টার, 22 নভেম্বর 2017 |
| 8 মার্চ 2019 | সংসদ নির্বাচনের কারণে পিছিয়ে আয়োজন; উপজেলা নির্বাচনের কারণে মেলা বন্ধ | 141তম | সিভয়েস24, 19 ফেব্রুয়ারি 2019; ঢাকাটাইমস ও ডেইলি স্টার, 8 মার্চ 2019 |
| ডিসেম্বর 2024 | “এবারও” আয়োজন হবে না; কারণ অস্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি | 147তম (যেটি হচ্ছে না) | পাহাড়বার্তা, 23 ডিসেম্বর 2024 |
ছকের একটি ধরন লক্ষ করার মতো। 2015 থেকে 2017 পর্যন্ত অনুষ্ঠান সরে এসেছিল ডিসেম্বরে, যা পাহাড়বার্তার “ডিসেম্বরের শেষে বা জানুয়ারির প্রথম দিকে” বর্ণনার সঙ্গে মেলে। আর 2011 সালে আয়োজনটি ছিল সপ্তাহব্যাপী, অন্য বছরগুলোতে তিন দিনের।
রাজপরিবারের দেওয়া ক্রমিক নম্বর পাশাপাশি রাখলে দুটি আলাদা গোনার পদ্ধতি দেখা যায়। 2010-এ 134তম থেকে 2019-এ 141তম পর্যন্ত নম্বর মোটামুটি প্রতি আয়োজনে একটি করে বেড়েছে। কিন্তু 2024-এ যে আয়োজন হচ্ছে না, পাহাড়বার্তা তাকে বলছে 147তম — যেন না-হওয়া বছরগুলোও গোনা হয়েছে।
হিসাবটা সরল: 1875 সালকে প্রথম ধরলে 2010-এর আয়োজন 136তম বছরের, অথচ নম্বর দেওয়া হয়েছিল 134। অর্থাৎ 2010 পর্যন্ত দুটি বছর বাদ পড়েছিল — যা নব্বইয়ের দশকের দুই বছরের বিরতির সঙ্গে মেলে। আবার 2019 সালে 141তম হলে, পরের পাঁচ মৌসুম না হওয়া সত্ত্বেও 2024-এর নম্বর 147 দাঁড়ায় কেবল তখনই, যখন প্রতিটি বছর গোনা হয়। এই ব্যাখ্যা প্রতিবেদনগুলোর সংখ্যা মিলিয়ে করা; কোনো উৎসে এভাবে বলা নেই।
2009 সালের ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে আরেকটি নম্বর আছে: “113-year old tradition”। 1875 থেকে হিসাব করলে 2009-এ বয়স 134 বছর, তাই এই সংখ্যাটি অন্য সব হিসাবের সঙ্গে মেলে না।
চাকমা সার্কেলে রাজপুণ্যাহ একসময় প্রতিবছর অগ্রহায়ণ মাসে হতো; এখন হয় অনেক বছর পরপর। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় 2017 সালে দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, রাজপুণ্যাহ আগে প্রতিবছর হলেও এখন পাঁচ-ছয় বছরে একবার হয়, কারণ আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানটির জন্য বিপুল অর্থ, বিস্তারিত পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা লাগে। শেষ যে আয়োজনের খবর পাওয়া যায়, সেটি ডিসেম্বর 2009-এর।
আমাদের আর্কাইভের চাকমা-পরিচিতি অনুযায়ী রাজপুণ্যাহ মূলত একটি রাজকীয় অনুষ্ঠান, আর চাকমা রাজ কর্তৃপক্ষই এর আয়োজক। আগের দিনে এটি সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে হতো; রাজভাণ্ডার থেকে সমাগত মানুষের খাওয়ার ব্যবস্থা থাকত, বাজার বসত, বিনোদন ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানও থাকত। রাজা বিরাট চন্দ্রাতপের নিচে কারুকাজ করা মণ্ডপে রাজকীয় পোশাকে পাত্রমিত্র ও দেওয়ান-তালুকদারদের নিয়ে বসতেন।
একই লেখায় একটি উদ্ধৃতি আছে: রাজদরবার জনসমাবেশে ভরে গেলে “তোপধ্বনি সহকারে খাজনা উসুল করার কাজ শুরু হত। তখন খাটি রৌপ্য মুদ্রাই প্রচলন ছিল।” উৎসব চলত দুই-তিন দিন।
রাজপুণ্যাহর সঙ্গে জড়ানো একটি পুরোনো প্রথার নামও আর্কাইভে পাওয়া যায়। চাংমাটারা — চাকমা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লেখাটি বলছে, ‘মাংসী’ নামের এক মদ্যপ দেওয়ানের সূত্র ধরে একসময় রাজপুণ্যাহতে দেওয়ান, পরে হেডম্যানদের রাজার মদ বাবদ বাড়তি খরচ দিতে হতো, যার নাম ‘মাংসী খরচ’। প্রথাটি এখনো আছে কি না, লেখাটি বলে না।
চাকমা সার্কেলের সাম্প্রতিক রাজপুণ্যাহগুলোর সাল নিয়ে উৎসগুলো এক নয়। আর্কাইভের চাকমা-পরিচিতি বলছে, যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে এখন আর রাজপুণ্যাহ হয় না; সর্বশেষ হয়েছে 1978 সালে রাজা দেবাশীষ রায়ের অভিষেকের সময় এবং 2006 সালে রাজকুমার ত্রিভুবন আর্যদেব রায়কে যুবরাজ ঘোষণার সময়।
অন্য উৎসগুলো অন্য সাল দেয়। দ্য ইনডিপেনডেন্ট (2017) লিখেছে, ত্রিভুবন আর্যদেব রায়কে যুবরাজ করা হয় 2003 সালে, আর দেবাশীষ রায়ের অভিষেক হয় 25 নভেম্বর 1977। আর্কাইভের আরেকটি লেখা, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরার জাতিতত্ত্ব বিচার ও অভিবাসন, তথ্যসূত্র হিসেবে “চাকমা রাজপূণ্যাহ স্মারকগ্রন্থ ২০০৩” উল্লেখ করে — অর্থাৎ 2003 সালে একটি রাজপুণ্যাহ হয়েছিল এবং তার স্মারকগ্রন্থ বেরিয়েছিল।
এরপরের আয়োজনটি সংবাদপত্রে আছে। ডেইলি স্টারের 27 ডিসেম্বর 2009-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী আগের দিন রাঙামাটির চাকমা রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে তিন দিনের রাজপুণ্যাহ শুরু হয়। রাজা দেবাশীষ রায় ও যুবরাজ ত্রিভুবন আর্যদেব রায় দরবার হলে অস্থায়ী সিংহাসনে বসেন; প্রথা অনুযায়ী হেডম্যানরা রাজকীয় তরবারি হস্তান্তর করে রাজার প্রতি সম্মান জানান। এরপর রাজা তাঁর সার্কেলের 175টি মৌজার 175 জন হেডম্যানের কাছ থেকে বার্ষিক জুম কর নেন; প্রজারা মুরগি, শূকর ও মদ উপহার দেন।
সেদিনের বক্তৃতায় রাজা পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ও উন্নয়নের সব কাজে নারীদের যুক্ত করার কথা বলেন। ডেইলি স্টার জানায়, চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, পাংখুয়া, লুসাই, খিয়াং, বম ও চাক জনগোষ্ঠীর হাজারো মানুষ তিন জেলা থেকে রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে ভিড় করেন।
2003 থেকে 2009 — ছয় বছরের এই ব্যবধান চাকমা রাজার 2017 সালের “পাঁচ-ছয় বছরে একবার” কথার সঙ্গে মেলে। কিন্তু সেই হিসাবে 2015 বা তার কাছাকাছি সময়ে আরেকটি আয়োজন হওয়ার কথা; 2009-এর পর চাকমা সার্কেলে কোনো রাজপুণ্যাহর খবর পাওয়া যায়নি।
অনুষ্ঠান অনিয়মিত হলেও খাজনা আদায় থেমে নেই। দ্য ইনডিপেনডেন্টের 2017 সালের প্রতিবেদনে চাকমা রাজা বলেন, তাঁরা দুই ধরনের রাজস্ব তোলেন — জুমের জন্য পরিবারপিছু, আর জমি বন্দোবস্তির জন্য একরপিছু; গ্রামে একরপিছু 1 টাকা। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী তখন চাকমা সার্কেলে 186 জন হেডম্যান ও 1,834 জন কার্বারি ছিলেন, আর রাজা 282 জন নারীকে কার্বারি ও 8 জন নারীকে হেডম্যান নিয়োগ দিয়েছিলেন।
অর্থাৎ চাকমা সার্কেলে যা অনিয়মিত হয়েছে, তা হলো জনসমাগমের রাজকীয় অনুষ্ঠানটি — রাজস্বের প্রশাসনিক কাজ নয়। 1900 সালের শাসনবিধির 42(6) বিধি যে ‘পুণ্যাহ দিবসের’ কথা বলে, বড় অনুষ্ঠান না হলে সেই দিনটি কীভাবে পালিত হয়, তা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
মং সার্কেলে রাজপুণ্যাহ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল বলে 2009 ও 2011 সালের প্রতিবেদন জানায়; তারপর ডিসেম্বর 2021-এ খাগড়াছড়িতে সীমিত পরিসরে তিন দিনের রাজপুণ্যাহ হয়। বিডিনিউজ সেটিকে বলেছে মং সার্কেলের ‘seventh Rajpunyah’। এর পরের কোনো আয়োজনের খবর পাওয়া যায়নি।
ডেইলি স্টারের 22 জানুয়ারি 2009-এর প্রতিবেদন লেখে, চাকমা সার্কেল ও মং সার্কেলের মানুষও রাজপুণ্যাহর ঐতিহ্য পালন করেন, “However, the chiefs of those circles have not held the festival in recent years.” দুই বছর পর, জানুয়ারি 2011-এ, একই পত্রিকা লেখে, অতীতে তিন সার্কেলই একইভাবে রাজকীয় উৎসব পালন করত, কিন্তু চাকমা ও মং সার্কেল অর্থের সংকটে ঐতিহ্যটি ধরে রাখতে পারেনি।
2009 সালেই মং সার্কেলে রাজপদে বদল আসে। ডেইলি স্টারের 17 জানুয়ারি 2009-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী আগের বছরের 22 অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় রাজা পাইহ্লাপ্রু চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সাচিংপ্রু চৌধুরী 16 জানুয়ারি 2009 মং রাজা হন (বাংলা উইকিপিডিয়ায় তারিখটি 17 জানুয়ারি); চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার তাঁর হাতে মং রাজার তরবারি তুলে দেন। ডেইলি স্টার তাঁকে অষ্টম মং রাজা বলেছে; প্রথম আলোর 2019 সালের একটি লেখায় তিনি নবম মং রাজা।
দৈনিক গিরিদর্পণ ও পাহাড়বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী 10 ডিসেম্বর 2021 সকালে খাগড়াছড়ি শহরের জিরোমাইলে মহালছড়ায় মং রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাজপুণ্যাহ শুরু হয়। বিডিনিউজের ছবির ক্যাপশনে স্থানটির নাম ‘Thakuchhra’ এলাকার রাজবাড়ি। প্রথম দিন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দিয়ে উদ্বোধন, আর মং রাজা সাচিংপ্রু চৌধুরীর হাতে রাজস্ব ও উপহার তুলে দেওয়া হয়। বিডিনিউজের ছবিতে রাজাকে তরবারি উপহার দেওয়ার দৃশ্যও আছে।
গিরিদর্পণ লিখেছে, এদিন মৌজাপ্রধান ও হেডম্যানরা প্রজাদের কাছ থেকে তোলা ভূমি ও জুমের কর রাজার হাতে দেন, আর প্রজারা উপঢৌকন হিসেবে দেন জুমের নানা ফসল, চাল ও ফলমূল। দ্বিতীয় দিন, 11 ডিসেম্বর, বার্ষিক রাজস্ব আদায় অনুষ্ঠানে রাজা দিনভর 88টি মৌজার হেডম্যান ও 701 জন কার্বারির কাছ থেকে খাজনা ও উপঢৌকন নেওয়ার কথা; রাজবাড়িতে হেডম্যান-কার্বারিদের মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা ছিল।
তৃতীয় দিনের আয়োজনটি অন্য দুই সার্কেলের কোনো প্রতিবেদনে দেখা যায় না: 12 ডিসেম্বর নারী হেডম্যান ও নারী কার্বারিদের মতবিনিময় সভা, যেখানে সভাপতিত্ব করার কথা মং রানী উখ্যেংচিং চৌধুরীর। এবার কোনো মেলা বা বড় উৎসব না রাখার কথা জানায় রাজপুণ্যাহ উদযাপন কমিটি।
রাজা সাচিংপ্রু চৌধুরী বলেন, মহামারির কারণে আগের বছর উৎসব করা যায়নি। এবারের রাজপুণ্যাহ উপলক্ষে তিনি সরকারের কাছে কয়েকটি প্রত্যাশা তুলে ধরেন: প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনা সমুন্নত রাখা, 1900 সালের শাসনবিধি আরও কার্যকর করা, হেডম্যান-কার্বারিদের সম্মানী বাড়ানো, এবং হেডম্যানদের কার্যালয় নির্মাণ।
দুটি সংখ্যায় উৎসগুলো মেলে না। উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক হিরনজয় ত্রিপুরা গিরিদর্পণকে বলেন, এটি “প্রতিবছর” হওয়া ঐতিহ্যবাহী আয়োজন — অথচ ডেইলি স্টার 2009 ও 2011-এ লিখেছিল, মং সার্কেলে অনুষ্ঠানটি হচ্ছে না। আর কার্বারির সংখ্যা 2021-এর প্রতিবেদনে 701, মং সার্কেলের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও ডেইলি স্টার 2009-এ 950।
“চাকমা ও মং সার্কেলে রাজপুণ্যাহ হারিয়ে গেছে” — এই কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। দুই সার্কেলেই অনুষ্ঠান অনিয়মিত হয়েছে, কিন্তু চাকমা সার্কেলে 2003 ও 2009-এ এবং মং সার্কেলে 2021-এ আয়োজনের খবর আছে। আবার বোমাং সার্কেলে, যেখানে অনুষ্ঠানটি নিয়মিত ছিল, 2019-এর পর আয়োজনের খবর নেই।
| বিষয় | বোমাং সার্কেল | চাকমা সার্কেল | মং সার্কেল |
|---|---|---|---|
| আয়োজনের স্থান | বান্দরবান শহরের রাজার মাঠ ও রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ (ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ) | রাঙামাটির চাকমা রাজবাড়ি (ডেইলি স্টার 2009) | খাগড়াছড়ির মহালছড়া / ঠাকুরছড়া মং রাজবাড়ি (গিরিদর্পণ; বিডিনিউজ 2021) |
| স্থানীয় নাম | পইজ্রা / পইংজ্রা (আর্কাইভ; সিভয়েস24) | পুণ্যাহ বা দরবার (আর্কাইভ) | কোনো উৎসে আলাদা নাম পাওয়া যায়নি |
| শুরুর সাল | 1875 | জানা যায়নি | জানা যায়নি |
| আগের নিয়ম | প্রতিবছর, ডিসেম্বর-জানুয়ারি | প্রতিবছর, অগ্রহায়ণে | জানা যায়নি |
| যে আয়োজনগুলোর খবর আছে | 2009–2019 প্রায় প্রতি মৌসুমে | 1978, 2003, 2006 (আর্কাইভ), 2009 | 2021 (‘সপ্তম’) |
| সর্বশেষ খবর পাওয়া আয়োজন | মার্চ 2019 | ডিসেম্বর 2009 | ডিসেম্বর 2021 |
| খাজনা দেওয়া মৌজা (প্রতিবেদনের সময়ে) | 109 | 175 (2009) | 88 (2021) |
| উৎস যে বিশেষ রীতির কথা বলে | মারমা ভাষায় চিঠি, পঞ্চশীল, যন্ত্রীদল, দ্গই সৈনিক, সোনালি ছাতা (আর্কাইভ) | হেডম্যানদের তরবারি হস্তান্তর (ডেইলি স্টার 2009); আগে তোপধ্বনি (আর্কাইভ) | রাজাকে তরবারি উপহার (বিডিনিউজ 2021); নারী হেডম্যান-কার্বারির সভা |
ছকটি আমাদের সংকলন — কোনো একক উৎসে তিন সার্কেলকে এভাবে পাশাপাশি পাওয়া যায় না। কোনো ঘরে “জানা যায়নি” মানে সেই তথ্য পড়া কোনো উৎসে নেই, অনুষ্ঠানটি হয়নি এমন নয়।
তরবারির প্রসঙ্গে একটি সতর্কতা। প্রথম আলোর 2019 সালের একটি ভ্রমণ-লেখা বলছে, প্রতিটি সার্কেলের হেডম্যান পুণ্যাহর সময় তরবারি সমর্পণের মাধ্যমে খাজনা দেন। চাকমা ও মং সার্কেলের প্রতিবেদনে তরবারির কথা আছে, কিন্তু বোমাং সার্কেলের পড়া প্রতিবেদনগুলোতে হেডম্যানদের তরবারি দেওয়ার উল্লেখ নেই; সেখানে তরবারি রাজার হাতে (বাংলাদেশ প্রতিদিন 2016)। তাই রীতিটিকে তিন সার্কেলের সাধারণ নিয়ম বলা যায় না।
রাজপুণ্যাহ না হওয়ার যে কারণগুলো উৎসে পাওয়া যায়, সেগুলো সার্কেলভেদে আলাদা: চাকমা ও মং সার্কেলে অর্থসংকট ও খরচ, বান্দরবানে নির্বাচন ও আইনশৃঙ্খলা, আর 2020-এ মহামারি। কোনো উৎসই একটি একক কারণ দেয় না।
পাহাড়বার্তার ওই প্রতিবেদনে বান্দরবান শহরের বাসিন্দা শামসুল ইসলাম বলেন, বছরের পর বছর আয়োজন না হওয়ায় জেলার মানুষ এই ঐতিহ্য ভুলতে বসেছে। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী আগে মেলাকে ঘিরে জেলার 11টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো, আর পর্যটকসহ লক্ষাধিক মানুষ বান্দরবানে ভিড় করতেন।
রাজপুণ্যাহ পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্কেল চিফ বা রাজার বার্ষিক খাজনা আদায়ের রাজকীয় অনুষ্ঠান। মৌজার হেডম্যান ও পাড়ার কার্বারিরা জুমচাষিদের কাছ থেকে তোলা কর উপঢৌকনসহ রাজার হাতে তুলে দেন, আর অনুষ্ঠান ঘিরে সাধারণত তিন দিনের মেলা বসে। 1900 সালের শাসনবিধির 42(6) বিধিতে ‘পুণ্যাহ দিবসে’ হেডম্যানকে জুম করের অন্তত অর্ধেক চিফকে দিতে হয়।
বোমাং রাজপরিবার ও সংবাদপত্রগুলোর হিসাবে বোমাং সার্কেলে রাজপুণ্যাহ শুরু 1875 সালে, রাজা সাক হ্ন ঞোর আমলে। ডেইলি স্টার, দৈনিক ইনকিলাব ও প্রথম আলো তাঁকে নবম বোমাং রাজা বলে; সিভয়েস24-এর 2019 সালের প্রতিবেদনে তিনি পঞ্চম। ইনকিলাবের তালিকায় তাঁর রাজত্বকাল 1875 থেকে 1901।
সংবাদপত্রে বান্দরবানের শেষ রাজপুণ্যাহর খবর 8 মার্চ 2019-এর, যাকে সিভয়েস24 বলেছে 141তম। সংসদ নির্বাচনের কারণে অনুষ্ঠানটি ডিসেম্বর থেকে পিছিয়ে মার্চে হয়, আর উপজেলা নির্বাচনের কারণে প্রশাসন মেলা বন্ধ করে। পাহাড়বার্তা ডিসেম্বর 2024-এ জানায়, 2018 সাল থেকে আর আয়োজন হয়নি।
পাহাড়বার্তার 23 ডিসেম্বর 2024-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বোমাং রাজা উ চ প্রু চৌধুরী অস্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর সহকারী অং ঝাই খ্যায়াং এ কথা জানান। 2020-21 মৌসুম ও অন্য বছরগুলোতে কেন হয়নি, তার আলাদা ব্যাখ্যা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
বোমাং সার্কেলের রাজপুণ্যাহকে মারমা ভাষায় ‘পইজ্রা’ বলা হয় বলে জুমজার্নালের মারমা-পরিচিতি লেখায় আছে; সিভয়েস24 লিখেছে ‘পইংজ্রা’, ডেইলি স্টার ‘Poyengjara’। বোমাং রাজপুণ্যাহ উপলক্ষে “পইংজ্রা” নামে স্মরণিকাও প্রকাশিত হয়েছে, যার 1984 ও 1994 সালের সংখ্যা আর্কাইভের লেখাগুলোর তথ্যসূত্রে উল্লেখ আছে।
নিয়মিত নয়। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় 2017 সালে দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, আগে প্রতিবছর হলেও এখন রাজপুণ্যাহ পাঁচ-ছয় বছরে একবার হয়, কারণ এতে বিপুল অর্থ, পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা লাগে। সর্বশেষ যে আয়োজনের খবর পাওয়া যায়, সেটি ডিসেম্বর 2009-এ রাঙামাটির চাকমা রাজবাড়িতে, যেখানে 175 জন হেডম্যান খাজনা দেন।
জুমজার্নালের চাকমা-পরিচিতি অনুযায়ী আগে রাজপুণ্যাহ সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে রাজার আয়োজনে হতো। রাজভাণ্ডার থেকে সমাগত মানুষের খাওয়ার ব্যবস্থা থাকত, বাজার বসত। দরবার ভরে গেলে তোপধ্বনি দিয়ে খাজনা আদায় শুরু হতো, তখন খাঁটি রুপার মুদ্রা চলত, আর উৎসব চলত দুই-তিন দিন।
পাওয়া খবরের মধ্যে শেষটি 10 থেকে 12 ডিসেম্বর 2021-এর, খাগড়াছড়ির মং রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে, মহামারির কারণে মেলা ছাড়া সীমিত পরিসরে। বিডিনিউজ একে মং সার্কেলের সপ্তম রাজপুণ্যাহ বলেছে। রাজা সাচিংপ্রু চৌধুরী 88টি মৌজার হেডম্যান ও 701 জন কার্বারির কাছ থেকে খাজনা নেন; তৃতীয় দিন নারী হেডম্যান-কার্বারিদের সভা হয়।
ডেইলি স্টারের 2011 ও 2015 সালের প্রতিবেদনে বান্দরবানের রাজপুণ্যাহে মারমা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো, খুমি, পাংখুয়া, লুসাই, খিয়াং, বম ও চাক জনগোষ্ঠীর মানুষের কথা আছে। জুমজার্নালের আর্কাইভ অনুযায়ী খুমি কার্বারিরা মদ বা রাইস বিয়ার ও মোরগ দিয়ে বোমাং চিফকে খাজনা দেন, আর তঞ্চঙ্গ্যারা চাকমা রাজার পুণ্যাহে যোগ দেন।
আহসান (1993)-এর সূত্রে জুমজার্নালের মারমা-পরিচিতি বলছে, রাজার শোভাযাত্রায় ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রীদল বাজায় খরা (এক রকম শিঙা), মঙঃ (পিতলের দুন্দুভি), প্যাহ্ (ঢোল), হ্নেঃ (বাঁশি) ও চে (কাঠ ও চামড়ার দুন্দুভি)। একই সময় রাজার নিজস্ব সৈনিক ‘দ্গই’ অভিবাদন জানায় এবং একজন রাজার মাথায় সোনালি ছাতা ধরেন।
বোমাং সার্কেলের ক্ষেত্রে, আহসান (1993)-এর সূত্রে জুমজার্নালের মারমা-পরিচিতি লেখায় বলা আছে, অবিবাহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু, বিধবা, বিপত্নীক, শিকারি ও বৈদ্য জুমের খাজনা থেকে অব্যাহতি পান। আইনের দিক থেকে কোন শ্রেণি অব্যাহতি পাবে তা চিফ ঘোষণা করেন, তবে 1900 সালের শাসনবিধির 42(2) অনুযায়ী তালিকাটিতে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন লাগে।
বোমাং রাজপুণ্যাহর নম্বর 2010-এ 134তম, 2011-এ 135তম, 2016-এ 139তম ও 2019-এ 141তম — প্রতি আয়োজনে প্রায় একটি করে বেড়েছে। কিন্তু পাহাড়বার্তা ডিসেম্বর 2024-এ যে আয়োজন হচ্ছে না, তাকে 147তম বলেছে, যেন না-হওয়া বছরগুলোও গোনা হয়েছে। দুই পদ্ধতির ব্যাখ্যা কোনো উৎস দেয়নি।
জুমজার্নাল আর্কাইভ (প্রাথমিক উৎস)
সংবাদপত্র
অন্যান্য
সর্বশেষ হালনাগাদ: 17 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:চাকমা সার্কেল, বান্দরবান, বোমাং সার্কেল, মং সার্কেল, সার্কেল চীফ
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।