Jumjournal Logo

কুড়ুখ: ওরাওঁদের ভাষা বরেন্দ্র অঞ্চলে কীভাবে টিকে আছে

Last updated Oct 19th, 2026

0

নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে কুয়াশাঢাকা সবুজ ধানখেত, আলপথ ধরে মাথায় বোঝা নিয়ে হাঁটছেন কয়েকজন নারী, পাশে ছাগল চরছে

বাংলাদেশে ওরাওঁ কুড়ুখ ভাষা এখনো টিকে আছে মূলত গ্রামের ঘরে, পাড়ার বন্ধুদের আড্ডায় আর বয়স্কদের মুখে — স্কুলে, বাজারে বা লেখায় প্রায় নয়। জনশুমারি 2022 অনুযায়ী দেশে ওরাওঁ 85,858 জন, যাঁদের 72.4% রাজশাহী বিভাগে; অথচ কুড়ুখভাষী গ্রাম নিয়ে একমাত্র বিস্তারিত মাঠ-সমীক্ষাটি (SIL, 2005) ভাষাটিকে বেশি পেয়েছে উত্তরে, ঠাকুরগাঁও আর রংপুরের মিঠাপুকুর-বদরগঞ্জে, আর জানিয়েছে দক্ষিণের ওরাওঁদের বড় অংশের ঘরের ভাষা সাদরি। সেই সমীক্ষার পূর্বাভাস ছিল, খাঁটি কুড়ুখ এক প্রজন্মের মধ্যে ব্যবহার থেকে উঠে যেতে পারে।

এই লেখা চারটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজে: ওরাওঁ কারা, বাংলাদেশে কোথায় থাকেন, শুমারিতে সংখ্যা ও ধর্ম কী, আর তাঁদের ভাষা কুড়ুখ কোথায় কতটা বেঁচে আছে। প্রতিটি সংখ্যার পাশে উৎস আছে, আর যেখানে উৎসগুলো একমত নয়, সেখানে দুটোই আছে। যতটা সম্ভব বাংলাদেশের ওরাওঁদের কথাই রাখা হয়েছে; ভারতের ঝাড়খণ্ড-ছত্তিশগড়ের ওরাওঁদের তথ্য কেবল তখনই এসেছে, যখন ভাষার পরিবার বা লিপি বোঝাতে তা দরকার।

সমতলের সব আদিবাসী জাতির সংক্ষিপ্ত পরিচয়, ওরাওঁদের পাঞ্চেস-পাঁড়হা বিচারব্যবস্থাসহ, আছে আমাদের আলাদা লেখায় — সমতলের আদিবাসী জাতিগুলো: কে কোথায় থাকেন, কী নিয়ে বেঁচে আছেন। সেখানে যা বলা হয়েছে, এখানে তা আর দোহরানো হয়নি। এই লেখা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরের আদিবাসীদের নিয়ে; পাহাড়ের জাতিগুলোর পূর্ণ সূচি আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব-পাতায়।

এই লেখায়

  1. ওরাওঁ কারা: নাম, গোত্র ও আগমনের তিন বয়ান
  2. ওরাও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোথায় বসবাস করে
  3. জনশুমারি 2022-এ ওরাওঁ কত জন, আর অন্য সংখ্যাগুলো কোথা থেকে
  4. ওরাওঁদের ধর্ম কী: শুমারি যা বলে না, মাঠ-গবেষণা যা বলে
  5. ওরাওঁ কুড়ুখ ভাষা কোন পরিবারের: দ্রাবিড়, বাংলার আত্মীয় নয়
  6. বরেন্দ্রের সব ওরাওঁ কি কুড়ুখ বলেন? কুড়ুখ আর সাদরির ভাগ
  7. বাংলাদেশের কুড়ুখ আর ভারতের কুড়ুখ কতটা এক
  8. কুড়ুখ কোথায় বলা হয়: ঘর, উপাসনালয়, বাজার
  9. ওরাওঁ শিশুরা কোন ভাষা আগে শেখে
  10. কুড়ুখ কতটা বিপন্ন: কে কী বলছে
  11. কুড়ুখ লেখা হয় কোন হরফে
  12. স্কুলে কুড়ুখ নেই কেন: মাতৃভাষায় শিক্ষায় সাদরি
  13. জমি, কাজ আর ভাষা: জীবিকার চাপ কীভাবে বাংলার দিকে ঠেলে
  14. কুড়ুখ নিয়ে কী কাজ হচ্ছে: গবেষণা ও ডিজিটাল সংরক্ষণ
  15. আমাদের আর্কাইভে ওরাওঁদের কথা
  16. প্রশ্নোত্তর
  17. যা এখনো জানা যায়নি
  18. তথ্যসূত্র

ওরাওঁ কারা: নাম, গোত্র ও আগমনের তিন বয়ান

ওরাওঁ বাংলাদেশের একটি আদিবাসী জাতি, যাঁদের প্রধান বসতি উত্তর-পশ্চিমের বরেন্দ্র অঞ্চলে। বাংলাপিডিয়া (লেখক মাযহারুল ইসলাম তরু) লিখেছে, নৃবিজ্ঞানীদের মতে তাঁরা নৃতাত্ত্বিকভাবে অস্ট্রিক আর ভাষার দিক থেকে দ্রাবিড়; তাই বেশির ভাগ গবেষক তাঁদের দ্রাবিড়ভাষী কুড়ুখ জাতির উত্তরপুরুষ মনে করেন। তাঁদের নিজেদের ভাষার নাম কুড়ুখ।

“ওরাওঁ” নামটি কাদের দেওয়া

নামের উৎস নিয়ে উৎসগুলো এক কথা বলে না। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Kurukh language নিবন্ধ ঔপনিবেশিক নৃতাত্ত্বিক Edward Tuite Dalton-কে উদ্ধৃত করে লিখেছে, “ওরাওঁ” নামটি প্রতিবেশী মুন্ডাদের দেওয়া, অর্থ “ঘুরে বেড়ানো”; জাতিটি নিজেদের বলে কুড়ুখ। একই নিবন্ধ ভাষাবিদ Sten Konow-এর মত দিয়েছে, যাঁর ব্যাখ্যায় কুড়ুখ ভাষায় urapai, urapo, urang শব্দের অর্থ “মানুষ”। দ্য ডেইলি স্টারে মানবাধিকারকর্মী ও গবেষক Babul Chandra Sutradhar (“Kurukh Voices: The Oraons of Bangladesh”, 4 জুলাই 2025) লিখেছেন, Oraon, Uraon বা Urang নামের আক্ষরিক অর্থ “মানুষ”, আর কুড়ুখ মানে “বক্তা”।

বাংলায় বানানও কয়েক রকম। সরকারি তালিকাতেই বদল ঘটেছে: ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনের 2010 সালের তফসিলে নামটি ছিল “ওরাও”, 2019 সালের সংশোধিত তালিকায় হয়েছে “ওরাওঁ” — এই বদলের বিস্তারিত আছে আমাদের স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা 27 থেকে 50 হলো কীভাবে লেখায়। ভাষার নামের বানান আরও বেশি:

বানান কোথায় পাওয়া যায়
কুড়ুখ অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের ভাষা-তালিকা, ডেইলি স্টার বাংলা (2025)
কুরুখ বাংলা উইকিপিডিয়া; ডেইলি স্টার বাংলা (2021, 2023)
কুরুক বাংলাপিডিয়া, “ওরাওঁ” ভুক্তি
কুঁডুখ একই আসাদুজ্জামান-প্রবন্ধের ভেতরের অনুচ্ছেদ (2025)
কুড়ুক সরকারের মাতৃভাষায় শিক্ষা কর্মসূচির পর্যায়-তালিকা, আমাদের আর্কাইভে উদ্ধৃত
কুড়ক আমাদের আর্কাইভের “আদিবাসী ওরাওঁ মুক্তিযোদ্ধা” লেখা
Kurux / Kurukh SIL সমীক্ষা (Kurux); উইকিপিডিয়া ও আন্তর্জাতিক গবেষণা (Kurukh)

এই লেখায় ভাষার নাম “কুড়ুখ” আর জাতির নাম “ওরাওঁ” রাখা হয়েছে; উদ্ধৃতির ভেতরে উৎসের নিজের বানান অপরিবর্তিত।

গোত্রের নাম যেগুলো বাংলাদেশে চেনা

বাংলাপিডিয়া ওরাওঁদের যে গোত্রগুলোর নাম দিয়েছে: লাকড়া, তিগগ্যা, তিরকী, বিন্ডো, বাড়ো বা বাড়োয়া, খাঁ খাঁ, করকেটা, টপ্য, এক্কা, খালকো, লিন্ডা, মিনজী, বাকলা, বাড়া, ক্ষেস, গান্না, বেক ও কিসপট্টা। একই গোত্রের মানুষ নিজেদের ভাই-বোন মনে করেন, তাই গোত্রের ভেতরে বিয়ে নিষিদ্ধ। ডেইলি স্টারের 2025 সালের লেখাটিও Lakda, Tirki, Ekka, Kujur গোত্রের নাম দিয়ে একই নিষেধের কথা বলেছে। আমাদের আর্কাইভের ব্যক্তিনামেও এগুলো চোখে পড়ে — বুদু লাকড়া, মহাদেব মিনজি, পৌল চারোয়া তিগ্যা। বংশ পিতা থেকে না মাতা থেকে গোনা হয়, সে প্রশ্নে উৎসগুলোর সীমা নিয়ে আলোচনা আছে বাংলাদেশের কোন জাতিগুলো মাতৃসূত্রীয়, কোনগুলো নয় লেখায়।

কবে বাংলাদেশে এলেন: উৎসভেদে তিন রকম সময়

ওরাওঁরা ঠিক কবে বরেন্দ্রে এসেছিলেন, তার কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই — বাংলাপিডিয়া নিজেই তা বলেছে। তবু উৎসগুলো তিন রকম সময় দেয়। বাংলাপিডিয়া বলছে মুগল আমলে প্রবেশ ও স্থায়ী বসতি; SIL-এর সমীক্ষা বলছে ঝাড়খণ্ডের ছোটনাগপুর থেকে মোটামুটি 100–200 বছর আগে আসা শুরু; নৃবিজ্ঞানী Md Rafiul Islam (Social Science Review, 2022) লিখেছেন, ব্রিটিশ শাসনামলে (1765–1947) তাঁরা বরেন্দ্রে এসে বসতি গড়েন, আর তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের সারাংশ বলছে ব্রিটিশ ভারত সরকারই তাঁদের ছোটনাগপুর থেকে এনে বসিয়েছিল; ডেইলি স্টারের 2025 সালের লেখা আবার মুগল আমলের কথা বলেছে, আদি উৎস হিসেবে “Kankan” অঞ্চলের নামসহ।

বাংলাপিডিয়া আরেকটি পুরোনো তথ্য দিয়েছে: 1881 সালের আদমশুমারিতে ওরাওঁদের বরেন্দ্রের বাইরে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলাতেও পাওয়া গিয়েছিল।

ওরাও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোথায় বসবাস করে

ওরাওঁদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ রাজশাহী বিভাগে থাকেন — জনশুমারি 2022-এ 85,858 জনের 62,178 জন। জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি নওগাঁয় (33,198), তারপর রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুর। রংপুর বিভাগে আছেন 13,982 জন, আর সিলেট বিভাগে 7,666 জন।

বিভাগ ধরে

বিভাগ ওরাওঁ জনসংখ্যা মোট ওরাওঁর %
রাজশাহী 62,178 72.4
রংপুর 13,982 16.3
সিলেট 7,666 8.9
ঢাকা 856 1.0
চট্টগ্রাম 789 0.9
ময়মনসিংহ 270 0.3
বরিশাল 65 0.1
খুলনা 52 0.1
সারা দেশ 85,858 100

উৎস: BBS, Population and Housing Census 2022, National Report (Volume I), Table P29, পৃ. 365। শতাংশ নিজস্ব হিসাব।

যে জেলা ও উপজেলায় ওরাওঁ বেশি

BBS প্রতিটি জেলার আলাদা প্রতিবেদনে (Table P17) উপজেলা ধরে জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা দিয়েছে। নিচে ছয়টি জেলার হিসাব; এই ছয় জেলাতেই থাকেন 57,952 জন, অর্থাৎ দেশের ওরাওঁদের 67.5%।

জেলা ওরাওঁ যে উপজেলায় সবচেয়ে বেশি
নওগাঁ 33,198 পত্নীতলা 8,017 · নিয়ামতপুর 6,955 · পোরশা 5,471 · মহাদেবপুর 4,540 · বদলগাছী 2,649 · সাপাহার 2,058
রাজশাহী 8,048 গোদাগাড়ী 6,447 · পুঠিয়া 910 · রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন 175
চাঁপাইনবাবগঞ্জ 6,510 গোমস্তাপুর 5,772
জয়পুরহাট 5,074 পাঁচবিবি 3,452 · জয়পুরহাট সদর 1,509
দিনাজপুর 4,184 হাকিমপুর 1,161 · নবাবগঞ্জ 875 · দিনাজপুর সদর 556 · বিরামপুর 451
ঠাকুরগাঁও 938 ঠাকুরগাঁও সদর 910

উৎস: BBS District Report (Table P17) — নওগাঁ পৃ. 328–334; রাজশাহী পৃ. 348–353; চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৃ. 183; জয়পুরহাট পৃ. 253–255; দিনাজপুর পৃ. 363–368; ঠাকুরগাঁও পৃ. 256–258। পৃষ্ঠা-নম্বর PDF-এর ক্রম অনুযায়ী।

নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে কুয়াশাঢাকা সবুজ ধানখেত, আলপথ ধরে মাথায় বোঝা নিয়ে হাঁটছেন কয়েকজন নারী, পাশে ছাগল চরছে
নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলের ধানখেত। দেশের ওরাওঁদের প্রায় 39% এই জেলায় থাকেন (জনশুমারি 2022)। ছবির মানুষদের জাতিপরিচয় উৎসে উল্লেখ নেই। ছবি: S.H. Tanim · CC BY-SA 4.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

দুটি ফাঁক আছে। রাজশাহী বিভাগের বাকি 9,348 জন ওরাওঁ নাটোর, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের কোথায় কতজন, আর রংপুর বিভাগের বাকি 8,860 জন রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী প্রভৃতি জেলায় কীভাবে ভাগ হয়েছেন — সেই জেলা-প্রতিবেদনগুলোর সংখ্যা এই লেখায় তোলা যায়নি। বাংলাপিডিয়ার জেলা-তালিকায় অবশ্য রংপুর অঞ্চলের কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও রংপুর, এবং সিলেট অঞ্চলের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার, সঙ্গে গাজীপুরও আছে।

সিলেটের ওরাওঁদের কথা উৎসগুলোতে আসে মূলত চা-বাগান প্রসঙ্গে। Snehangshu Shekhar Chanda ও Ayesha Khatun-এর 2020 সালের একটি গবেষণা বৃহত্তর সিলেটের চা-বাগানে “Urang” সম্প্রদায়ের 64 জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে লিখেছে, তাঁরা সাধারণত সাদরি ও কুড়ুখ দুই ভাষাতেই কথা বলেন। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের একটি ভাষা-প্রকল্পের 2026 সালের প্রতিবেদনও সিলেটের চা-বাগানে কুড়ুখভাষী থাকার কথা বলেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকশো ওরাওঁ কারা, কোন কাজে সেখানে আছেন, শুমারি তা জানায় না। চা-বাগানের জাতিগুলো কবে, কোথা থেকে এসেছিলেন, তা নিয়ে আমাদের আলাদা লেখা “চা বাগানের আদিবাসী জনগোষ্ঠী: চা-শ্রমিকেরা কারা, কোন কোন জাতি, কোথা থেকে আনা হয়েছিল” প্রস্তুত হচ্ছে।

জনশুমারি 2022-এ ওরাওঁ কত জন, আর অন্য সংখ্যাগুলো কোথা থেকে

BBS-এর চূড়ান্ত জাতীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ওরাওঁ 85,858 জন — পুরুষ 42,502, নারী 43,356। দেশের মোট 16,50,478 জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে এটি 5.20%, আর সংখ্যায় ওরাওঁরা পঞ্চম, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও সাঁওতালদের পরে। সমতলের জাতিগুলোর মধ্যে কেবল সাঁওতালরা (129,056) সংখ্যায় বেশি।

2022 সালের আগস্টে প্রকাশিত প্রাথমিক প্রতিবেদনে (Table A-1.4) সংখ্যাটি ছিল 85,846 — চূড়ান্ত হিসাবে 12 জন বেড়েছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Kurukh people পাতায় এখনো সেই প্রাথমিক সংখ্যাটিই আছে।

অন্য উৎসের সংখ্যা

শুমারির বাইরে ওরাওঁদের জনসংখ্যা নিয়ে যে সংখ্যাগুলো ঘোরে, সেগুলো এরকম:

উৎস সংখ্যা টীকা
বাংলাপিডিয়া (1991 শুমারির উদ্ধৃতি) 11,296 বাংলা ও ইংরেজি দুই ভুক্তিতেই
বাংলাপিডিয়া, ইংরেজি ভুক্তি 102,000 “বর্তমানে” — সাল ও উৎস নেই
অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, ডেইলি স্টার বাংলা (2025) 75,000 উত্তরবঙ্গে সংখ্যায় দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী বলে
Babul Chandra Sutradhar, দ্য ডেইলি স্টার (2025) প্রায় 1,20,000 উৎস উল্লেখ নেই
বাংলা উইকিপিডিয়া, “ওরাওঁ” প্রায় 2,45,000 “২০২০ সালের আদমশুমারি” বলে, পাশে “তথ্যসূত্র প্রয়োজন” চিহ্ন
BBS জনশুমারি 2022 (চূড়ান্ত) 85,858 National Report, Table P29

বাংলা উইকিপিডিয়ার সংখ্যাটি নিয়ে দুটি তথ্য পাশাপাশি রাখা যায়: 2020 সালে বাংলাদেশে কোনো জনশুমারি হয়নি — আগের দুটি শুমারি 2011 ও 2022 সালের, আর BBS-এর হিসাবে রাজশাহী বিভাগের সব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মিলিয়ে জনসংখ্যা 2,44,627। শুমারি কোন প্রশ্নে কীভাবে জাতিগোষ্ঠী গোনে, আর কেন আদিবাসী সংগঠনগুলোর হিসাব শুমারির চেয়ে বেশি হয়, তা আছে জনশুমারিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গোনা হয় কীভাবে লেখায়; 50টি জাতির জেলাওয়ারি পূর্ণ ছক জনশুমারি ২০২২: ৫০ জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা লেখায়।

ওরাওঁদের ধর্ম কী: শুমারি যা বলে না, মাঠ-গবেষণা যা বলে

জনশুমারি 2022 ওরাওঁদের ধর্মের আলাদা হিসাব দেয়নি — জাতিগোষ্ঠী আর ধর্ম মিলিয়ে কোনো ছক জাতীয় প্রতিবেদনে নেই। মাঠ-গবেষণাগুলো দেখায়, বাংলাদেশের ওরাওঁদের মধ্যে খ্রিস্টান, হিন্দু, প্রথাগত সারনা বা “সনাতন” বিশ্বাসী এবং অল্পসংখ্যক বৌদ্ধ আছেন, আর অনুপাত গ্রাম ভেদে খুব আলাদা।

শুমারির ধর্মের ঘর

শুমারির ধর্মের প্রশ্নে পাঁচটি ঘর: মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও “অন্যান্য”। প্রথাগত প্রকৃতিপূজার জন্য আলাদা কোনো নাম নেই। জাতীয় প্রতিবেদনের Table 3.2.15 অনুযায়ী “অন্যান্য” ধর্মের মানুষ সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বিভাগে — 36,700 জন, বিভাগের জনসংখ্যার 0.18%; চট্টগ্রামে 27,097, রংপুরে 21,527। এই 36,700 জনের মধ্যে কোন কোন জাতির মানুষ আছেন, শুমারি তা ভেঙে দেখায় না; তাই এটিকে ওরাওঁদের সংখ্যা হিসেবে পড়া যাবে না।

বাংলাপিডিয়া ও সংবাদমাধ্যম যা বলে

বাংলাপিডিয়া লিখেছে, ওরাওঁরা জড়োপাসক; তাঁদের সৃষ্টিকর্তার নাম ধরমী, ধার্মেশ বা ধরমেশ, যিনি সূর্যে থাকেন — তাই সূর্যও দেবতা। তাঁরা পূর্বপুরুষের আত্মা ও “নাদ” বা প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করেন, অনেকে হিন্দু প্রভাবে লক্ষ্মী ও সরস্বতীর পূজাও করেন। একই ভুক্তির শেষ বাক্য: ওরাওঁদের মধ্যে খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, আর মিশনারিদের প্রভাবে খ্রিস্টান ওরাওঁদের মধ্যে শিক্ষার হারও বাড়ছে। ডেইলি স্টারের 2025 সালের লেখা ওরাওঁদের প্রকৃতিভিত্তিক বিশ্বাসকে “Sanatan Dharma”-র বৃহত্তর ছাতার নিচে রেখেছে এবং লিখেছে, কেউ কেউ খ্রিস্টান হলেও অনেকে খ্রিস্টান ও প্রথাগত দুই ধরনের উৎসবই পালন করেন; প্রধান উৎসব কারাম পূজা, ভাদ্রের পূর্ণিমায় তিন দিন।

মাঠ-গবেষণার হিসাব

গবেষণা কোথায়, কাদের মধ্যে ধর্মের ভাগ
Md Rafiul Islam (মাঠকাজ 2011–2013) দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ ও রংপুরের মিঠাপুকুরের পাঁচ গ্রামের 260টি ওরাওঁ খানা “ওরাওঁ ক্ষত্রিয়” (হিন্দু) 36.15% · খ্রিস্টান 35.39% · সারনা 25.77% · বৌদ্ধ 2.69%
SIL সমীক্ষা (জুলাই 2005) ঠাকুরগাঁও ও রংপুরের পাঁচটি কুড়ুখভাষী গ্রামের 57 জন খ্রিস্টান 34 · “সনাতন” প্রথাগত ধর্ম 20 · হিন্দু 3

Rafiul Islam কোনো মুসলিম ওরাওঁ খানা পাননি বলে লিখেছেন, তবে অংশগ্রহণকারীদের কথায় “ইসলামীকরণের” একটি প্রক্রিয়ার কথা উঠে এসেছে। তাঁর ব্যাখ্যায় ধর্মান্তরের পেছনে মূল চাপ অর্থনৈতিক — মিশনারি, বৌদ্ধ বিহার বা বেসরকারি সংস্থার কাছে আর্থিক, আইনি ও শিক্ষার সাহায্য চাওয়া। তাঁর প্রবন্ধে উদ্ধৃত রংপুরের বিনোদপুর গ্রামের 55 বছর বয়সী একজন অংশগ্রহণকারী বলেছেন, অর্থনৈতিক সমস্যার কারণেই তাঁরা খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম হয়েছেন, আর খুব কম ওরাওঁই আদি বিশ্বাসে আছেন।

SIL-এর গ্রাম-বিবরণ দেখায় অনুপাত গ্রামে গ্রামে কত আলাদা: ঠাকুরগাঁওয়ের ক্যাথলিক মিশনের আশপাশের গ্রামটিতে 75% খ্রিস্টান ও 25% সনাতন; একই উপজেলার আরেকটি ছোট গ্রামে সবাই সনাতন; রংপুরের বদরগঞ্জের গ্রামটি খ্রিস্টান; মিঠাপুকুরের দক্ষিণের গ্রামটি প্রধানত সনাতন। আমাদের আর্কাইভের একটি লেখা মিঠাপুকুরের বলদিপুকুর এলাকার ওরাওঁদের “আদিধর্ম সাওসার” বলে উল্লেখ করেছে।

ধর্ম আর ভাষার মধ্যে একটি সম্পর্ক SIL-এর তথ্যে ধরা পড়ে, পরের অংশগুলোতে তা আছে: উপাসনালয়ে কুড়ুখ বলেন খ্রিস্টানদের 62%, আর সনাতন ও হিন্দুদের 83%।

ওরাওঁ কুড়ুখ ভাষা কোন পরিবারের: দ্রাবিড়, বাংলার আত্মীয় নয়

কুড়ুখ দ্রাবিড় ভাষা-পরিবারের উত্তর শাখার ভাষা — তামিল, তেলুগু, মালয়ালমের দূর আত্মীয়, বাংলার নয়। বাংলা ইন্দো-আর্য। কুড়ুখের সবচেয়ে কাছের ভাষা মালতো (সাউরিয়া পাহাড়িয়া ও কুমারভাগ পাহাড়িয়া), আর পাকিস্তানের ব্রাহুই। বাংলাদেশে দ্রাবিড়ভাষী জনগোষ্ঠী দুটি: ওরাওঁ ও পাহাড়িয়া।

SIL-এর সমীক্ষা কুড়ুখের সবচেয়ে কাছের ভাষা হিসেবে ব্রাহুই ও পাহাড়িয়ার নাম দিয়েছে; উইকিপিডিয়া কুড়ুখকে উত্তর দ্রাবিড় শাখায় রেখে বলেছে এর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সাউরিয়া পাহাড়িয়া ও কুমারভাগ পাহাড়িয়া, যাদের একসঙ্গে মালতো বলা হয়। গঠনের দিক থেকে কুড়ুখ যোগাত্মক ভাষা: শব্দের শেষে প্রত্যয় জুড়ে অর্থ বদলায়, উপসর্গ বা মধ্যপ্রত্যয় নেই; বাক্যের ক্রম কর্তা-কর্ম-ক্রিয়া। আমাদের সমতলের জাতিগুলোর লেখায় উদ্ধৃত মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার শ্রেণিবিন্যাসেও বাংলাদেশের দ্রাবিড় ভাষা দুটি — কুড়ুখ ও সাউরিয়া পাহাড়িয়া।

উল্টো একটি মতও উৎসে আছে। ইংরেজি বাংলাপিডিয়ার “Tribal Languages” ভুক্তি (লেখক Ali Nawaz) লিখেছে, কুড়ুখ শব্দভান্ডার ও বাক্যগঠনে মুন্ডা ভাষার মতো, এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে মুন্ডা ও কুড়ুখ আসলে একই ভাষা। অথচ মুন্ডা অস্ট্রো-এশিয়াটিক পরিবারের, আর আধুনিক শ্রেণিবিন্যাসগুলো কুড়ুখকে দ্রাবিড় বলে। মুন্ডাদের ভাষা নিয়ে আলাদা লেখা আছে — রাঁচি থেকে সুন্দরবন: মুন্ডাদের বসতি, ভাষা ও বর্তমান অবস্থা।

বাংলার সঙ্গে যে শব্দগুলো মেলে

ভিন্ন পরিবারের হলেও শত বছরের পাশাপাশি বসবাসে কুড়ুখে বাংলার শব্দ ঢুকেছে। একই বাংলাপিডিয়া ভুক্তি কিছু উদাহরণ দিয়েছে (রোমান বানান ভুক্তির নিজের):

ধরন কুড়ুখ (বাংলাপিডিয়ার রোমান বানান) বাংলা
গৃহস্থালি taoya (মাটির পাত্র) স্থানীয় উপভাষায়ও একই শব্দ
গয়না tikli, bala, payra, bali, kanpasha টিকলি, বালা, বালি ইত্যাদি
আত্মীয় ma, baba, mama, bhagina মা, বাবা, মামা, ভাগিনা
গাছ ও খাদ্য amba, katha, sim, sak, dali আম, কাঁঠাল, শিমুল, শাক, ডাল
ধর্ম bhagoyan, bhagati, bhut ভগবান, ভক্তি, ভূত

SIL-এর সমীক্ষা এই মিশ্রণ মেপেছে। 307টি শব্দের তালিকায় বাংলাদেশের কুড়ুখ আর প্রমিত বাংলার মধ্যে মিল পাওয়া গেছে 20–23% — সম্পূর্ণ আলাদা পরিবারের দুটি ভাষার জন্য এটি বেশি, আর সমীক্ষকেরা এর কারণ হিসেবে ধার করা শব্দকেই দেখিয়েছেন। গ্রামের মানুষও তাঁদের বলেছেন, দিন দিন আরও বেশি মানুষ আরও বেশি বাংলা শব্দ ব্যবহার করছেন।

বরেন্দ্রের সব ওরাওঁ কি কুড়ুখ বলেন? কুড়ুখ আর সাদরির ভাগ

না। বাংলাদেশের ওরাওঁরা ভাষার দিক থেকে দুই ভাগে বিভক্ত: একদল কুড়ুখ বলেন, আরেক দল সাদরি — একটি ইন্দো-আর্য মিশ্র ভাষা, যা উত্তরবঙ্গের অনেক জাতির যোগাযোগের ভাষা। SIL-এর সমীক্ষা অনুযায়ী কুড়ুখভাষী ওরাওঁরা প্রায় সবাই তখনকার রাজশাহী বিভাগের উত্তর অর্ধেকে, আর সাদরিভাষীরা মূলত দক্ষিণ অর্ধেকে।

বরেন্দ্র বলতে কোন এলাকা

বাংলাপিডিয়ার “Barind Tract” ভুক্তি অনুযায়ী বরেন্দ্রভূমি বঙ্গ অববাহিকার সবচেয়ে বড় প্লাইস্টোসিন ভূমিরূপ, প্রায় 7,770 বর্গকিলোমিটার — পূর্বে করতোয়া, পশ্চিমে মহানন্দা আর দক্ষিণে গঙ্গার উত্তর পাড় দিয়ে ঘেরা। ইংরেজি ভুক্তি এর মধ্যে বৃহত্তর দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া, জয়পুরহাট ও নওগাঁর বেশির ভাগ অংশ ধরেছে। অর্থাৎ “বরেন্দ্র” শব্দটি নওগাঁ-রাজশাহীর লাল মাটির উঁচু এলাকা বোঝাতে যেমন ব্যবহৃত হয়, বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর পর্যন্ত বিস্তৃত অর্থেও হয়। Rafiul Islam-এর গবেষণা মিঠাপুকুর-গোবিন্দগঞ্জ-ঘোড়াঘাটের গ্রামগুলোকেও “Barind” বলেছে।

SIL-এর মানচিত্র: উত্তরে কুড়ুখ, দক্ষিণে সাদরি

SIL Bangladesh-এর গবেষক Sayed Ahmad, Amy Kim, Seung Kim ও Mridul Sangma 2005 সালের জুলাইয়ে কুড়ুখভাষী ওরাওঁদের নিয়ে সমীক্ষা চালান; প্রতিবেদন “The Kurux of Bangladesh: A Sociolinguistic Survey” প্রকাশিত হয় 2011 সালে। তাঁদের ভাষায়, যেন আগে থেকে কোনো চুক্তি করা ছিল — কুড়ুখভাষী উরাওরা প্রায় সবাই রাজশাহী বিভাগের উত্তর অর্ধেকে, আর সাদরিভাষী উরাওরা মূলত দক্ষিণ অর্ধেকে। সমীক্ষার জন্য বাছা কুড়ুখভাষী এলাকাগুলো ছিল ঠাকুরগাঁও সদর, আর রংপুর শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমের বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর। সাদরিভাষী ওরাওঁদের জন্য আলাদা সমীক্ষার পরিকল্পনার কথা প্রতিবেদনের মুখবন্ধে আছে; সেটি হয়েছিল কি না, পাওয়া যায়নি।

অন্য উৎসগুলোও এই দুই ভাগের কথা বলে। বাংলাপিডিয়া: “কুরুক ভাষার দিক দিয়ে … এরা দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। একটি কুরুক অপরটি শাদরী।” বাংলাপিডিয়ার “Tribal Languages” ভুক্তি: রংপুর ও সিলেটে এক লাখের বেশি মানুষ ওরাওঁ ভাষায় কথা বলেন, সবচেয়ে বেশি রংপুরে, সবচেয়ে কম সিলেটে; আর মালো, মাহাতো, গঞ্জু, Kolkamar ও কিছু ওরাওঁ মিলিয়ে প্রায় 50,000 মানুষ সাদরি বলেন। Rafiul Islam লিখেছেন ওরাওঁরা “kurukh and sadri” ভাষায় কথা বলেন। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের ভাষা-প্রকল্প তাদের সংগ্রহে “Sadri (Oraon)”-কে রাজশাহী বিভাগের আলাদা একটি রূপ হিসেবে রেখেছে, আর কুড়ুখকে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ভাষা হিসেবে।

শুমারির মানচিত্রের সঙ্গে মেলালে

দুটি মানচিত্র পাশাপাশি রাখলে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ওঠে। শুমারিতে ওরাওঁ সবচেয়ে বেশি নওগাঁ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জয়পুরহাটে — চার জেলায় 52,830 জন। SIL-এর কুড়ুখ-মানচিত্রের কেন্দ্র ঠাকুরগাঁও ও রংপুর, যেখানে ঠাকুরগাঁও জেলায় ওরাওঁ মাত্র 938 জন। নওগাঁর 33,198 জন ওরাওঁর কতজন কুড়ুখ বলেন আর কতজন সাদরি, সেই হিসাব কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। শুমারি জাতিগোষ্ঠী গোনে, মাতৃভাষা নয়।

ঠাকুরগাঁওয়ের সংখ্যাটি নিয়ে একটি অমিলও আছে। SIL 2005 সালে ঠাকুরগাঁও শহরের পশ্চিমের ক্যাথলিক মিশন-এলাকার একটি কুড়ুখভাষী গ্রামেরই জনসংখ্যা লিখেছিল “প্রায় 1,000” (167 পরিবার); জনশুমারি 2022-এ পুরো ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় ওরাওঁ 910 জন।

সাদরি জানলেই কি সাদরি বই চলবে

SIL প্রশ্নটি সরাসরি পরীক্ষা করেছিল, কারণ দুই দলই নিজেদের একই জাতি বলেন এবং তাঁদের মধ্যে বিয়েও হয়, যদিও কম। কুড়ুখভাষী 57 জনের 63% বলেছেন তাঁরা সাদরি বলতে পারেন, কিন্তু শিখেছেন গড়ে 12 বছর বয়সে। সাদরিতে যা বলতে চান সবসময় বলতে পারেন — এমন দাবি করা মানুষ, সাদরিকে সেরা বা দ্বিতীয় সেরা ভাষা বলা মানুষসহ, মোট মাত্র 40%। সাদরিভাষীদের সঙ্গে কুড়ুখ বলেন মাত্র 12%; 42% বাংলায়, 47% সাদরিতে কথা বলেন। সমীক্ষকদের উপসংহার: সাদরি সাহিত্য কুড়ুখভাষীদের কাজে লাগবে না।

বাংলাদেশের কুড়ুখ আর ভারতের কুড়ুখ কতটা এক

বাংলাদেশের ভেতরে কুড়ুখ মোটামুটি একই রকম: SIL-এর চারটি গ্রামের শব্দতালিকায় পারস্পরিক মিল 84–93%। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রামের তালিকার সঙ্গে মিল নেমেছে 39–41%-এ — যদিও সমীক্ষকেরা নিজেরাই এই সংখ্যাটিকে সতর্কতার সঙ্গে নিতে বলেছেন।

তুলনা শব্দে মিল (%)
বাংলাদেশের চার কুড়ুখ গ্রাম, নিজেদের মধ্যে 84–93
বাংলাদেশের গ্রামগুলো বনাম পশ্চিমবঙ্গের Dima গ্রাম 39–41
বাংলাদেশের কুড়ুখ বনাম প্রমিত বাংলা 20–23
পশ্চিমবঙ্গের কুড়ুখ বনাম প্রমিত বাংলা 12

উৎস: Ahmad, Kim, Kim ও Sangma, SIL Electronic Survey Report 2011-040, Table 2।

39–41% কেন এত কম, তার জন্য সমীক্ষকেরা কয়েকটি কারণ দেখিয়েছেন: দুই তালিকা দুই দলের হাতে নেওয়া, প্রতিলিপির ধরন আলাদা, আর ভারতের তালিকায় শব্দ ছিল 210টি, বাংলাদেশেরটিতে 307টি। তাই “বাংলাদেশের কুড়ুখ আলাদা ভাষা” — এমন সিদ্ধান্ত তাঁরা টানেননি। বাংলাদেশের ভেতরে সবচেয়ে কম মিল (84%) পাওয়া গেছে দূরতম দুটি গ্রামে: একটি মূলত ক্যাথলিক, অন্যটির বাসিন্দারা হিন্দু, ফলে তাঁদের যোগাযোগও কম বলে সমীক্ষকদের অনুমান। 57 জনের মধ্যে মাত্র 5 জন মনে করেছেন কুড়ুখের আঞ্চলিক রূপে কোনো পার্থক্য আছে, আর তাঁরাও সবটা বুঝতে পারেন বলেছেন।

নেপালের “ধাঙড়” বা “Nepali Kurux”-কে Ethnologue ভারত-বাংলাদেশের কুড়ুখ থেকে আলাদা ভাষা হিসেবে গণ্য করে, ইংরেজি উইকিপিডিয়া জানায়। SIL পরামর্শ দিয়েছিল, বাংলাদেশে কুড়ুখের লিখিত রূপ গড়লে বৃহত্তর রংপুরের রূপটিকে ভিত্তি করতে, তবে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষকেও যুক্ত রাখতে।

কুড়ুখ কোথায় বলা হয়: ঘর, উপাসনালয়, বাজার

2005 সালের সমীক্ষায় কুড়ুখভাষী গ্রামে ঘরে কুড়ুখ বলেন 96%, বন্ধুদের সঙ্গে 100%। উপাসনালয়ে এই হার নামে 70%-এ, আর বাজারে শূন্য — দোকানির সঙ্গে সবাই কেবল বাংলা বলেন। সপ্তাহের হিসাবে 68% মানুষ বেশির ভাগ সময় কুড়ুখ বলেন, 30% বাংলা।

বেশির ভাগ সময় কোন ভাষা কুড়ুখ বাংলা সাদরি
ঘরে 96% 9% 2%
কুড়ুখভাষী বন্ধুর সঙ্গে 100% 5% 2%
গির্জা বা মন্দিরে 70% 35% 2%
সাদরিভাষীর সঙ্গে 12% 42% 47%
বাজারে দোকানির সঙ্গে — 100% —
সাধারণ এক সপ্তাহে 68% 30% 4%

উৎস: SIL 2011, Table 3। কেউ কেউ একাধিক ভাষা বলায় কিছু সারির যোগফল 100%-এর বেশি।

দুটি খুঁটিনাটি ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি কথা বলে। ঘরে কুড়ুখ নয়, শুধু বাংলা বলেন — এমন দুজনই ছিলেন অল্পবয়সী নারী, যাঁরা অষ্টম শ্রেণি পাস করেননি; সমীক্ষকেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, শিশুর প্রথম ভাষায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেন অল্পবয়সী মায়েরাই। আর বয়স ও শিক্ষা ভেদে সপ্তাহের ভাষা বদলায়: 35 বছরের কম বয়সীদের 34% আর শিক্ষিতদের (অষ্টম শ্রেণি বা তার বেশি) 40% বেশির ভাগ সময় বাংলা বলেন; বয়স্কদের মধ্যে এই হার 25%, অষ্টম শ্রেণি পাস না করাদের মধ্যে 22%।

উপাসনালয়ের ব্যবধানও শিক্ষণীয়। গির্জায় বেশির ভাগ সময় কুড়ুখ বলেন খ্রিস্টানদের 62%, অথচ মন্দিরে সনাতন ও হিন্দুদের 83%। সমীক্ষকদের ব্যাখ্যা: গির্জায় লিখিত উপকরণ বেশি, আর সেগুলো বেশির ভাগ বাংলায়; তাঁদের আরও জানানো হয়েছিল, কুড়ুখ এলাকায় অনেক সময় বাঙালি ক্যাথলিক যাজকেরা বাংলায় প্রার্থনা পরিচালনা করেন। মজার বিষয়, খ্রিস্টানদের 79% বলেছেন গির্জায় কুড়ুখ হওয়া উচিত — যা তাঁরা আসলে বলেন তার চেয়ে বেশি।

ওরাওঁ শিশুরা কোন ভাষা আগে শেখে

2005 সালের সমীক্ষায় 58% উত্তরদাতা বলেছেন তাঁদের গ্রামের শিশুরা আগে কুড়ুখ শেখে, 46% বলেছেন বাংলা — অর্থাৎ অনেক শিশু প্রায় একসঙ্গে দুটোই শেখে। কিন্তু দশ বছরের শিশুরা কোন ভাষা সবচেয়ে ভালো বলে, এই প্রশ্নে 65% বলেছেন বাংলা। এর ভিত্তিতেই সমীক্ষার পূর্বাভাস: খাঁটি কুড়ুখ সম্ভবত এক প্রজন্মের মধ্যে ব্যবহার থেকে উঠে যাবে।

প্রশ্ন কুড়ুখ বাংলা
গ্রামের শিশুরা প্রথমে কোন ভাষা বলে (সবাই) 58% 46%
— কম দূরবর্তী গ্রামের উত্তরদাতা 49% 57%
— বেশি দূরবর্তী গ্রামের উত্তরদাতা 73% 27%
দশ বছরের শিশুরা কোন ভাষা সবচেয়ে ভালো বলে 42% 65%
দশ বছরের শিশুরা নিজেদের মধ্যে কোন ভাষা বলে 77% 60%
30 বছর পর এই শিশুদের সন্তানেরা কোন ভাষা বলবে 60% 56%

উৎস: SIL 2011, Table 8 ও 10। একাধিক উত্তরের কারণে যোগফল 100% ছাড়াতে পারে।

আরও তিনটি সংকেত সমীক্ষায় আছে। 58% উত্তরদাতা এমন ওরাওঁকে চেনেন যিনি কুড়ুখ ভালো বলতে পারেন না — শহরে বা সাদরি এলাকায় থাকা মানুষ, বাংলা বলায় গর্ব বোধ করা মানুষ, আর অনেক শিশু। 46% বলেছেন তাঁদের গ্রামের দশ বছরের ছেলেমেয়েরা কুড়ুখ “যেমন বলা উচিত তেমন” বলে না। আর একটি তুলনামূলক দূরের এলাকার নেতা জানিয়েছেন, তাঁর গ্রামের শিশুরা নিজেদের মধ্যে বাংলা বলে, এবং তাঁর ধারণা 30–40 বছর পর সেখানে শুধু বাংলাই থাকবে। প্রবীণেরা যে কুড়ুখ বলেন তা তরুণদের চেয়ে “খাঁটি” — এক গ্রাম-নেতার এই মন্তব্যও প্রতিবেদনে আছে।

2005-এর পরের ছবি

2005 সালের পরে এমন বিস্তারিত সংখ্যাভিত্তিক সমীক্ষা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি; পরের তথ্য মূলত সংবাদপত্রের। দ্য ডেইলি স্টারের কংকন কর্মকারের 21 ফেব্রুয়ারি 2023-এর প্রতিবেদন (ইংরেজি, বাংলা) জানিয়েছে, বেসরকারি সংস্থা পুমডো জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার বাগজানা ও আতাপুর ইউনিয়নে ওরাওঁ, পাহান, মালো ও মাহাতো শিশুদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখেছে, বেশির ভাগই নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ভাষা বলতে পারে না, অনেকে সেই ভাষার কথা শোনেওনি। একই প্রতিবেদনে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেছেন, তরুণদের এই ভাষাগুলো চর্চার জায়গা — ঘরও না, স্কুলও না — নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান ডেইলি স্টার বাংলায় (1 মার্চ 2025) লিখেছেন, বাংলাদেশে 75 হাজার ওরাওঁ থাকলেও কুড়ুখে কথা বলতে পারেন মাত্র 25–30 হাজার।

কুড়ুখ কতটা বিপন্ন: কে কী বলছে

প্রায় সব উৎস কুড়ুখকে বাংলাদেশে বিপন্ন বা ঝুঁকিতে থাকা ভাষা বলে; পার্থক্য মাত্রায় আর বক্তার সংখ্যায়। সংখ্যার পরিসর 14,000 থেকে এক লাখের বেশি পর্যন্ত, আর সরকারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের 14টি বিপন্ন ভাষার তালিকায় কুড়ুখের নামই নেই।

উৎস বক্তার সংখ্যা মূল্যায়ন
বাংলাপিডিয়া, “Tribal Languages” রংপুর ও সিলেটে 1,00,000-এর বেশি কথ্য ভাষা, লিখিত রূপ নেই
SIL সমীক্ষা (মাঠকাজ 2005, প্রকাশ 2011) “একটি হিসাবে” সর্বোচ্চ 65,000 কুড়ুখ কৃষিজীবী খাঁটি কুড়ুখ এক প্রজন্মের মধ্যে ব্যবহার থেকে উঠে যেতে পারে
বাংলা উইকিপিডিয়ার বিপন্ন ভাষার তালিকা (ঢাকা ট্রিবিউন 2014 উদ্ধৃত) প্রায় 14,000 স্পষ্টত বিপন্ন
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভাষা-সমীক্ষা (2018), ডেইলি স্টার বাংলা 2021-এ উদ্ধৃত — 14টি বিপন্ন ভাষার তালিকায় কুড়ুখ নেই
অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, ডেইলি স্টার বাংলা (2025) 75 হাজার ওরাওঁর মধ্যে 25–30 হাজার ককবরক ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীর সঙ্গে “বিপন্ন”
ইউনেস্কোর বিপন্ন ভাষার অ্যাটলাস (ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় উদ্ধৃত) — (সব দেশ মিলিয়ে) Vulnerable
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের ভাষা-প্রকল্প (2026) — বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বাংলার দিকে ভাষা-বদলের বড় চাপ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের তালিকাটি ডেইলি স্টারের পিনাকী রায়ের 21 ফেব্রুয়ারি 2021-এর প্রতিবেদনে আছে: কন্দ, খাড়িয়া, কোডা, সৌরা, মুণ্ডারি, কোল, মালতো, খুমি, পাংখোয়া, রেংমিত্চা, চাক, খিয়াং, লুসাই ও লালেং (পাত্র)। একই প্রতিবেদন বিশেষজ্ঞদের বরাতে লিখেছে, কোনো ভাষায় পাঁচ হাজারের কম মানুষ কথা বললে তাকে বিপন্ন ধরা হয়; তালিকাটি এই মাপকাঠিতে তৈরি কি না, প্রতিবেদনে বলা নেই। এখানে “বিপন্ন” শব্দটি তাই দুই অর্থে চলে: বক্তার সংখ্যা কম, নাকি নতুন প্রজন্ম ভাষাটি নিচ্ছে না। SIL ও আসাদুজ্জামান দ্বিতীয় অর্থের দিকেই ইঙ্গিত করেন।

কুড়ুখ লেখা হয় কোন হরফে

বাংলাদেশে কুড়ুখের নিজস্ব কোনো প্রচলিত লিপি নেই; যাঁরা লেখেন, তাঁরা মূলত বাংলা হরফে লেখেন, কেউ কেউ রোমানে। ভারতে কুড়ুখ লেখা হয় দেবনাগরীতে, আর সেখানে দুটি নতুন লিপিও তৈরি হয়েছে — কুড়ুখ বান্না ও তোলং সিকি — কিন্তু বাংলাদেশে সেগুলোর ব্যবহারের কোনো তথ্য উৎসগুলোতে নেই।

বাংলাপিডিয়া লিখেছে, এ ভাষার কোনো বর্ণমালা নেই, সাহিত্য মৌখিক। ইংরেজি বাংলাপিডিয়ার “Tribal Languages” ভুক্তি যোগ করেছে, শিক্ষিত ওরাওঁরা বাংলা বা রোমান হরফে নিজেদের ভাষা লেখেন, আর কুড়ুখের মৌখিক সাহিত্য সমৃদ্ধ — উপকথা, রূপকথা, গাথা, ছড়া, ধাঁধা, প্রবাদ। ডেইলি স্টারের 2025 সালের লেখাও বলেছে কুড়ুখের লিখিত লিপি নেই, তাই গল্প, গান, ধাঁধা ও প্রবাদ মুখে মুখে চলে।

কুড়ুখভাষীরা নিজেরা কোন হরফ চান

SIL-এর 57 জন উত্তরদাতার 35 জন (61%) কোনো না কোনো ভাষায় চিঠি বা নোটিশ পড়তে-লিখতে পারেন; তাঁরা সবাই বাংলায় সাক্ষর। কুড়ুখে পড়তে-লিখতে পারেন 10 জন (পুরো নমুনার 18%), আর এই 10 জনই কুড়ুখ লেখেন বাংলা হরফে। নমুনায় শিক্ষিতদের ইচ্ছা করে বেশি নেওয়া হয়েছিল, তাই সমীক্ষকেরা সতর্ক করেছেন, পুরো জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতা এর চেয়ে কম।

কুড়ুখ লেখা উচিত কি না — 88% বলেছেন হ্যাঁ, 9% না। কোন হরফে, এ প্রশ্নে উত্তর দেওয়া 40 জনের 33 জন (82%) বলেছেন বাংলা, 6 জন রোমান, একজন দেবনাগরী। সমীক্ষকেরা যে নেতাদের জিজ্ঞেস করেছেন, তাঁরা সবাই বাংলা হরফের পক্ষে, কারণ মানুষ সেটি আগে থেকেই জানেন। একজন নেতা ভিন্নমত রেখেছিলেন: মানুষের জন্য বাংলা হরফ সহজ, কিন্তু ভাষা রক্ষার জন্য দেবনাগরী ভালো, কারণ বাংলা হরফে লিখলে কুড়ুখ একসময় বাংলায় মিলিয়ে যাবে — যদিও তিনিও মেনেছেন, সবাইকে নতুন হরফ শেখানো কঠিন।

ভারতের দুটি লিপি

ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী 1991 সালে ওড়িশার Basudev Ram Khalkho “কুড়ুখ বান্না” লিপি প্রকাশ করেন, যা ওড়িশা, ছত্তিশগড়, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও আসামের ওরাওঁরা ব্যবহার করেন। 1999 সালে চিকিৎসক নারায়ন ওঁরাও কুড়ুখের জন্য “তোলং সিকি” লিপি উদ্ভাবন করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া); ঝাড়খণ্ড রাজ্য 2007 সালে এটিকে স্বীকৃতি দেয়। SIL-এর মত ছিল, লিপি ও উপভাষার পার্থক্যের কারণে ভারতের কুড়ুখ বই হুবহু বাংলাদেশে চলবে না, তবে বাংলাদেশে লিখিত কুড়ুখ গড়তে সেগুলো ভালো উপকরণ হতে পারে।

স্কুলে কুড়ুখ নেই কেন: মাতৃভাষায় শিক্ষায় সাদরি

সরকারের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচিতে ওরাওঁ শিশুদের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল সাদরি, কুড়ুখ নয়। কুড়ুখ রাখা হয়েছিল তৃতীয় পর্যায়ে, আর সেই পর্যায় বাস্তবায়নের কোনো তথ্য উৎসগুলোতে পাওয়া যায়নি। ফলে কুড়ুখভাষী শিশু স্কুলে নিজের ভাষার বই পায় না।

পর্যায়-তালিকায় কুড়ুখের জায়গা

আমাদের আর্কাইভের আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা : অপেক্ষার শেষ কোথায়? লেখা অনুযায়ী প্রথম ধাপে ছয়টি ভাষায় বই তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছিল — চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, “সাদরি (ওঁরাও ও অন্যান্য)” ও গারো। দ্বিতীয় পর্যায়ে ম্রো, দুই মণিপুরী, তঞ্চঙ্গ্যা, খাসি ও বম; আর তৃতীয় পর্যায়ে কোচ, “কুড়ুক (ওঁরাও)”, হাজং, রাখাইন, খুমি ও খ্যাং। অর্থাৎ ওরাওঁদের নাম দুবার এসেছে — একবার সাদরির পাশে, একবার কুড়ুখের পাশে।

সাদরি বই কোন হরফে: দুই রকম তথ্য

আমাদের আর্কাইভের পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা: লিপি, কর্মসূচি ও বাস্তবতা লেখায় উদ্ধৃত 2012 সালের সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওঁরাওদের (সাদরি) বই হবে বাংলা বর্ণমালায়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ওয়েবসাইটে 2019 শিক্ষাবর্ষের সাদরি প্রাক-প্রাথমিক বইয়ের তালিকায় বইগুলোর নামও বাংলা হরফে — “আমার বই”, “কারাম”, “কাঁহা হামার মায়”, “বানদরা আর কুমহির” ইত্যাদি 14টি। অন্যদিকে ডেইলি স্টার বাংলার 2021 সালের প্রতিবেদন লিখেছে, চাকমা ও মারমা ছাড়া বাকি তিন ভাষার (ককবরক, গারো ও সাদরি) বই রোমান হরফে হয়েছে।

বই শিশুদের হাতে কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। 2023 সালের ডেইলি স্টার প্রতিবেদনে রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেছেন, সরকার 2017 সালে সাদরি ভাষায় পাঠ্যবই প্রকাশের উদ্যোগ নিলেও ছয় বছরে কোনো স্কুলে সে বই সরবরাহ হয়নি। অন্য দিকে আমাদের পাহাড়ি ভাষার লেখা প্রথম আলোর 2024 সালের তথ্য উদ্ধৃত করে বলেছে, প্রাক-প্রাথমিকের বই আসে 2017 সালে আর তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত 2020 সালের মধ্যে। এই দুই তথ্য একই এলাকার কথা বলছে কি না, স্পষ্ট নয়।

কুড়ুখভাষীরা নিজেরা কী চান

SIL-এর সমীক্ষার উত্তর এখানে দ্বিধাগ্রস্ত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ানোর ভাষা বাংলা হওয়া উচিত বলেছেন 81%, কুড়ুখ বলেছেন 21%। অপ্রত্যাশিতভাবে কম শিক্ষিতরাই বাংলা বেশি চেয়েছেন (91%), শিক্ষিতদের 40% চেয়েছেন কুড়ুখ। সমীক্ষকদের অনুমান, যাঁরা নিজেরা প্রমিত বাংলা ভালো বলতে পারেন না, তাঁরা সন্তানদের সেই সুযোগ দিতে চান।

কিন্তু প্রশ্ন বদলালে উত্তরও বদলায়। আগে কুড়ুখে, তারপর বাংলায় পড়তে-লিখতে শেখানোর একটি ক্লাসে সন্তান পাঠাবেন কি না — 96% বলেছেন পাঠাবেন। বেশির ভাগের কারণ, সন্তান কুড়ুখ আরও ভালো শিখবে। এমন ক্লাসের শিক্ষককে মাসে কিছু দেবেন বলেছেন 84%, কেউ কেউ 10 থেকে 50 টাকার কথা বলেছেন, কেউ চাল দেওয়ার কথা।

পাহাড়ের ভাষাগুলোর মাতৃভাষায় শিক্ষা-কর্মসূচির পূর্ণ বিবরণ ওই লেখাতেই আছে; এখানে কেবল ওরাওঁদের অংশটুকু।

জমি, কাজ আর ভাষা: জীবিকার চাপ কীভাবে বাংলার দিকে ঠেলে

বাংলাদেশের ওরাওঁদের বড় অংশ ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক, আর তাঁদের কাজের জগৎ — বাজার, মালিকের খেত, অফিস — পুরোটাই বাংলায় চলে। SIL লিখেছে, বেশির ভাগ কুড়ুখভাষী দিনমজুর, কারও কারও নিজের জমি আছে; শিক্ষিত হলেও সরকারি চাকরি পাওয়া কঠিন বলে তাঁরা আক্ষেপ করেছেন।

Rafiul Islam-এর মাঠ-গবেষণা আরও কঠিন ছবি দেয়: তাঁর অভিসন্দর্ভের সারাংশ বলছে, বরেন্দ্রের ওরাওঁরা প্রভাবশালী স্থানীয় কৃষক ও মহাজনের কাছে জমি হারিয়েছেন, আর এখন প্রায় সবাই ভূমিহীন কৃষি-দিনমজুর। দ্য ডেইলি স্টারের 2025 সালের লেখা রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার একটি সাম্প্রতিক গবেষণা উদ্ধৃত করেছে, যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর (শুধু ওরাওঁ নয়) 70% দিনমজুর, এসএসসির পরে পড়েছেন মাত্র 2.6%, আর 67.3%-এর কোনো কৃষিজমি নেই। গবেষণাটির নাম ও প্রকাশক লেখায় নেই।

ভাষার সঙ্গে এর যোগসূত্র SIL-এর সমীক্ষাতেই ধরা পড়ে। দোকানির সঙ্গে কথা বলেন 100% মানুষ বাংলায়, কারণ অন্য কেউ কুড়ুখ বোঝেন না; প্রমিত বাংলায় দক্ষতা নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা শিক্ষার। সমীক্ষার বাক্য-পুনরাবৃত্তি পরীক্ষায় অষ্টম শ্রেণি পাস না করা অ-খ্রিস্টান তরুণদের গড় স্কোর ছিল 14, একই শিক্ষাস্তরের খ্রিস্টান তরুণদের 20; গবেষকেরা পার্থক্যের কারণ হিসেবে গির্জার বাংলা উপকরণ আর স্কুলে গড়ে প্রায় দুই বছর বেশি পড়ার কথা বলেছেন। অর্থাৎ যে পথে শিক্ষা ও চাকরি আসে, সেই পথেই কুড়ুখ সরে যায়।

সমতলের আদিবাসীদের জমির আইনি সুরক্ষার বিধান নিয়ে আলাদা লেখা আছে — প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা: সমতলে আদিবাসীর জমি হস্তান্তরে যে বিধান। ওই ধারার 1951 সালের তালিকাতেই “Oraons” নামটি আছে।

কুড়ুখ নিয়ে কী কাজ হচ্ছে: গবেষণা ও ডিজিটাল সংরক্ষণ

বাংলাদেশে কুড়ুখ নিয়ে সংগঠিত কাজ এখনো মূলত গবেষণা আর নথিভুক্তির স্তরে। পাঠ্যবই, অভিধান বা সাক্ষরতা-কর্মসূচির মতো সম্প্রদায়-চালিত কোনো উদ্যোগের তথ্য উৎসগুলোতে পাওয়া যায়নি।

SIL-এর পরামর্শ, 2011

SIL শুধু সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ভাষা-উন্নয়ন কর্মসূচির সুপারিশ করেনি, কারণ বেশির ভাগ কুড়ুখভাষী বাংলা উপকরণ ভালোই ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু মাতৃভাষার প্রতি মানুষের গর্ব ও সাক্ষর হওয়ার আগ্রহ দেখে তারা ভাষা রক্ষার জন্য সাক্ষরতা ও সাহিত্য-উন্নয়ন কর্মসূচির সুপারিশ করেছে, শর্তসহ: সম্প্রদায়কে নেতাদের নিয়ে একটি কমিটি গড়তে হবে, খরচ-লাভ ভাবতে হবে, ভারতের কুড়ুখভাষীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। শেষ বাক্যটি সতর্কবার্তা: কুড়ুখ নিয়ে কাজ করতে হলে এখনই সময়, দেরি হলে ভাষার প্রাণশক্তি ও মানুষের উৎসাহ দুটোই এত কমে যেতে পারে যে কর্মসূচি টেকানো কঠিন হবে।

সাম্প্রতিক গবেষণা

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক Asifa Sultana গত তিন বছরে বাংলাদেশের কুড়ুখ নিয়ে তিনটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। 2024 সালের “What About the Indigenous Languages of the Plains?: The Case of Kurukh in Bangladesh” (Journal of Language, Identity & Education) প্রাপ্তবয়স্কদের পাঁচটি দল ও চারজন স্কুলপড়ুয়া শিশুর মধ্যে সমীক্ষা এবং চারজন বিশিষ্ট সম্প্রদায়-সদস্যের সাক্ষাৎকার নিয়ে ভাষা-বদল ও প্রাণশক্তির কারণগুলো খুঁজেছে। 2025 সালে Dripta Piplai ও Indrani Roy-এর সঙ্গে লেখা “Shaping the status of indigenous languages through policy: Kurukh in Bengal” (Current Issues in Language Planning) রংপুর আর পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের ছয়টি কুড়ুখভাষী দলের তথ্য তুলনা করেছে, “লাভ” ও “গর্ব” — কুড়ুখের সঙ্গে জড়ানো এই দুই ধারণা ধরে। 2026 সালে একই দলের তৃতীয় প্রবন্ধ সীমান্তের দুই পাশের কুড়ুখভাষী শিশুদের মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা নিয়ে, Language Policy সাময়িকীতে। তিনটির পূর্ণপাঠ উন্মুক্ত নয়; প্রথম দুটির তথ্য প্রকাশিত সারাংশ থেকে, তৃতীয়টির কেবল শিরোনাম পাওয়া গেছে।

ডিজিটাল সংগ্রহ

বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের EBLICT প্রকল্প জুলাই 2025-এ multiling.cloud নামে একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে, যেখানে 41টি ভাষা-রূপের অডিও, আইপিএ প্রতিলিপি ও বাংলা-ইংরেজি অনুবাদ আছে। প্রকল্পের 2026 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই সংগ্রহে কুড়ুখ (ওরাওঁ) ও “Sadri (Oraon)” দুটোই আলাদাভাবে আছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের 2018 সালের ভাষা-সমীক্ষাও প্রতিটি ভাষার 300টি করে শব্দ সংগ্রহ করেছিল বলে ডেইলি স্টারের 2021 সালের প্রতিবেদন জানায়।

আমাদের আর্কাইভে ওরাওঁদের কথা

জুমজার্নালের আর্কাইভে ওরাওঁদের নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত লেখা মুক্তিযুদ্ধের — আদিবাসী ওরাওঁ মুক্তিযোদ্ধা। এতে রাজশাহীর গোদাগাড়ী, জয়পুরহাট, দিনাজপুর ও রংপুরের কয়েকজন ওরাওঁ মুক্তিযোদ্ধার জীবনী আছে। ভাষার প্রশ্নে লেখাটির একটি বাক্য মূল্যবান: রংপুরের মিঠাপুকুর থানার বলদিপুকুর “মূলত ওরাওঁ এলাকা, তারা কুড়ক ভাষায় কথা বলেন”; বলদিপুকুর, তাজনগর ও মোমিনপুরকে সেখানে ওরাওঁ জনপদ বলা হয়েছে।

এটি SIL-এর মাঠ-সমীক্ষার সঙ্গে স্বাধীনভাবে মেলে। SIL যে পাঁচটি গ্রামে প্রশ্নপত্র নিয়েছিল, তার একটি ছিল মিঠাপুকুরের Boldipukur/Tajnagar এলাকা, একটি ক্যাথলিক মিশনের কাছে আর রংপুর শহরের কাছাকাছি। দুই ভিন্ন ধরনের উৎস — একটি মুক্তিযুদ্ধের জীবনী, একটি ভাষাতাত্ত্বিক সমীক্ষা — একই গ্রামকে কুড়ুখভাষী বলছে।

একই লেখায় 1971 সালের 28 মার্চ রংপুর ক্যান্টনমেন্ট অভিমুখে তীর-ধনুক হাতে ওরাওঁদের অভিযানের বিবরণ আছে, আর আছে ব্যক্তিজীবনের খুঁটিনাটি — যেমন গোদাগাড়ীর একজন মুক্তিযোদ্ধা নিজের জমি না থাকায় দৈনিক 80 টাকায় “পাইট” খাটেন। মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী লেখাটি জানায়, দিনাজপুরের ওরাওঁ ও সাঁওতাল মিলে প্রায় 1,000 জনের একটি মুক্তিবাহিনী সেই এলাকায় লড়েছিল।

প্রশ্নোত্তর

ওরাওঁ কারা?

ওরাওঁ বাংলাদেশের একটি আদিবাসী জাতি, যাঁদের প্রধান বসতি উত্তর-পশ্চিমের বরেন্দ্র অঞ্চলে। জনশুমারি 2022 অনুযায়ী তাঁরা 85,858 জন, দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংখ্যায় পঞ্চম। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী তাঁদের ভাষা দ্রাবিড় পরিবারের, আর তাঁরা নিজেদের ভাষাকে কুড়ুখ বলেন। গোত্রের নাম লাকড়া, তিগগ্যা, তিরকী, এক্কা, মিনজী প্রভৃতি।

ওরাও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোথায় বসবাস করে?

জনশুমারি 2022 অনুযায়ী ওরাওঁদের 72.4% (62,178 জন) রাজশাহী বিভাগে, 16.3% রংপুর বিভাগে ও 8.9% সিলেট বিভাগে। জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি নওগাঁয় (33,198), তারপর রাজশাহী (8,048), চাঁপাইনবাবগঞ্জ (6,510), জয়পুরহাট (5,074) ও দিনাজপুর (4,184)। উপজেলায় সবচেয়ে বেশি নওগাঁর পত্নীতলায় (8,017)।

বাংলাদেশে ওরাওঁ জনসংখ্যা কত?

BBS-এর জনশুমারি 2022-এর চূড়ান্ত জাতীয় প্রতিবেদন (Table P29) অনুযায়ী 85,858 জন — পুরুষ 42,502, নারী 43,356। এটি দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনসংখ্যার 5.20%। প্রাথমিক প্রতিবেদনে সংখ্যাটি ছিল 85,846। অন্য উৎসে 75,000 থেকে প্রায় 2,45,000 পর্যন্ত সংখ্যা পাওয়া যায়, যেগুলোর বেশির ভাগের উৎস দেওয়া নেই।

ওরাওঁদের ধর্ম কী?

জনশুমারি ওরাওঁদের ধর্মের আলাদা হিসাব দেয় না। মাঠ-গবেষণায় খ্রিস্টান, হিন্দু, প্রথাগত সারনা বা “সনাতন” বিশ্বাসী এবং কিছু বৌদ্ধ ওরাওঁ পাওয়া গেছে। দিনাজপুর-গাইবান্ধা-রংপুরের 260টি খানায় Rafiul Islam পেয়েছেন হিন্দু (“ওরাওঁ ক্ষত্রিয়”) 36.15%, খ্রিস্টান 35.39%, সারনা 25.77% ও বৌদ্ধ 2.69%। বাংলাপিডিয়া প্রথাগত সৃষ্টিকর্তার নাম দিয়েছে ধরমেশ।

ওরাওঁদের ভাষার নাম কী?

ওরাওঁদের নিজস্ব ভাষার নাম কুড়ুখ; বাংলায় কুরুখ, কুরুক বা কুড়ুক বানানেও লেখা হয়, ইংরেজিতে Kurukh বা Kurux। তবে বাংলাদেশের সব ওরাওঁ কুড়ুখ বলেন না। বাংলাপিডিয়া ও SIL-এর সমীক্ষা অনুযায়ী একটি বড় অংশের মাতৃভাষা সাদরি, যা উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জাতির যোগাযোগের ভাষা।

কুড়ুখ কি বাংলার মতো ইন্দো-আর্য ভাষা?

না। কুড়ুখ দ্রাবিড় ভাষা-পরিবারের উত্তর শাখার ভাষা; সবচেয়ে কাছের আত্মীয় মালতো (সাউরিয়া পাহাড়িয়া) ও পাকিস্তানের ব্রাহুই। তবু দীর্ঘ সহাবস্থানে প্রচুর বাংলা শব্দ ঢুকেছে: SIL 2005 সালে 307টি শব্দের তালিকায় বাংলাদেশের কুড়ুখ ও প্রমিত বাংলার মধ্যে 20–23% মিল পেয়েছে, যা ধার করা শব্দের ফল।

বাংলাদেশে কতজন কুড়ুখ ভাষায় কথা বলেন?

নির্ভরযোগ্য কোনো গণনা নেই; শুমারি মাতৃভাষা গোনে না। অনুমানগুলো একে অপরের থেকে অনেক দূরে: ঢাকা ট্রিবিউন (2014) প্রায় 14,000; অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান (2025) 25–30 হাজার; SIL-এর উদ্ধৃত একটি হিসাব সর্বোচ্চ 65,000; বাংলাপিডিয়ার “Tribal Languages” ভুক্তি এক লাখের বেশি।

কুড়ুখ কি বিপন্ন ভাষা?

বেশির ভাগ উৎস তা-ই বলে। SIL-এর 2011 সালের প্রতিবেদন বলেছে খাঁটি কুড়ুখ এক প্রজন্মের মধ্যে ব্যবহার থেকে উঠে যেতে পারে, কারণ 65% উত্তরদাতার মতে শিশুরা বাংলাই সবচেয়ে ভালো বলে। আসাদুজ্জামান (2025) কুড়ুখকে “বিপন্ন” ভাষার তালিকায় রেখেছেন। তবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের 2018 সালের 14টি বিপন্ন ভাষার তালিকায় কুড়ুখ নেই।

কুড়ুখের নিজস্ব বর্ণমালা আছে কি?

বাংলাদেশে নেই। বাংলাপিডিয়ার ভুক্তিগুলো লিখেছে, এ ভাষার বর্ণমালা নেই, সাহিত্য মৌখিক, আর শিক্ষিতরা বাংলা বা রোমান হরফে লেখেন। SIL-এর সমীক্ষায় কুড়ুখে সাক্ষর 10 জনের সবাই বাংলা হরফ ব্যবহার করেন, আর 82% উত্তরদাতা বাংলা হরফ চেয়েছেন। ভারতে দেবনাগরীর পাশাপাশি কুড়ুখ বান্না (1991) ও তোলং সিকি (1999) লিপি আছে।

ওরাওঁ শিশুরা কি মাতৃভাষায় পাঠ্যবই পায়?

কুড়ুখে নয়। সরকারের মাতৃভাষায় শিক্ষা কর্মসূচির প্রথম ধাপে ওরাওঁদের জন্য সাদরি রাখা হয়, আর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড 2019 শিক্ষাবর্ষে সাদরিতে 14টি প্রাক-প্রাথমিক বই তালিকাভুক্ত করেছে। কুড়ুখ ছিল তৃতীয় পর্যায়ে, যার বাস্তবায়নের তথ্য পাওয়া যায়নি। 2023 সালে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি বলেছেন, সাদরি বইও স্কুলে পৌঁছায়নি।

বাংলাদেশের কুড়ুখ আর ভারতের কুড়ুখ কি একই?

একই ভাষার রূপ, তবে পার্থক্য উল্লেখযোগ্য হতে পারে। SIL-এর শব্দতালিকায় বাংলাদেশের চার গ্রামের কুড়ুখে মিল 84–93%, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রামের সঙ্গে মাত্র 39–41%। সমীক্ষকেরা নিজেরাই এই কম সংখ্যাটিকে সতর্কতার সঙ্গে নিতে বলেছেন, কারণ তালিকা দুটি ভিন্ন দলের নেওয়া এবং আকারেও আলাদা।

ওরাওঁরা কবে বাংলাদেশে এসেছেন?

নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই, আর উৎসগুলো আলাদা সময় বলে। বাংলাপিডিয়া মুগল আমলে বরেন্দ্রে প্রবেশের কথা বলে; SIL ঝাড়খণ্ডের ছোটনাগপুর থেকে 100–200 বছর আগে আসা শুরুর কথা বলে; Rafiul Islam ব্রিটিশ শাসনামলে (1765–1947) বসতি গড়ার কথা বলেন। 1881 সালের আদমশুমারিতে ওরাওঁদের ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীতেও পাওয়া গিয়েছিল।

যা এখনো জানা যায়নি

  • কতজন ওরাওঁর মাতৃভাষা কুড়ুখ, কতজনের সাদরি। শুমারি মাতৃভাষা গোনে না, আর সাদরিভাষী ওরাওঁদের নিয়ে SIL-এর পরিকল্পিত আলাদা সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে কি না, পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে নওগাঁর 33,198 জন ওরাওঁর ভাষা-বিভাজন অজানা।
  • 2005-এর পরের সংখ্যাভিত্তিক তথ্য। শিশুদের প্রথম ভাষা, ঘরের ভাষা — এসব প্রশ্নে SIL-এর পরে তুলনীয় কোনো প্রকাশিত জরিপ পাওয়া যায়নি। Asifa Sultana-র 2024–2026 সালের তিনটি প্রবন্ধের পূর্ণপাঠ উন্মুক্ত নয়।
  • রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, নাটোর ও বগুড়ায় ওরাওঁ কত। এই জেলাগুলোর BBS জেলা-প্রতিবেদনের Table P17 এই লেখায় যাচাই করা যায়নি; রংপুর বিভাগের 8,860 জন ও রাজশাহী বিভাগের 9,348 জন ওরাওঁর জেলাভিত্তিক ভাগ তাই অজানা।
  • ওরাওঁদের ধর্মের জাতীয় হিসাব। শুমারি জাতি ও ধর্ম মিলিয়ে কোনো ছক প্রকাশ করেনি; মাঠ-গবেষণাগুলো কয়েকটি গ্রামের।
  • মাতৃভাষায় শিক্ষার তৃতীয় পর্যায়। “কুড়ুক (ওঁরাও)” ভাষায় বই তৈরির কাজ শুরু হয়েছে কি না, কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
  • সাদরি বইয়ের হরফ ও বিতরণ। আমাদের আর্কাইভ ও শিক্ষাবোর্ডের তালিকা বাংলা হরফের কথা বলে, ডেইলি স্টার বাংলা (2021) রোমানের কথা বলে; বই কতগুলো স্কুলে পৌঁছেছে, তা নিয়েও দুই রকম তথ্য।
  • বক্তার সংখ্যা। 14,000 থেকে এক লাখের বেশি — অনুমানগুলোর কোনোটিই প্রকাশিত গণনার ওপর দাঁড়ানো নয়।
  • আগমনের সময়। মুগল আমল, ব্রিটিশ আমল, নাকি 100–200 বছর আগে — উৎসগুলো মেলে না, আর কোনোটিই দলিল উদ্ধৃত করেনি।

তথ্যসূত্র

প্রাথমিক উৎস: জুমজার্নালের আর্কাইভ

  1. “আদিবাসী ওরাওঁ মুক্তিযোদ্ধা” — জুমজার্নাল
  2. “মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীঃ মহাকাব্যের অগ্রন্থিত কবিতা” — জুমজার্নাল
  3. “আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা : অপেক্ষার শেষ কোথায়?” — জুমজার্নাল
  4. “বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষা : এ যেন আলো আঁধারি পথ রেখায় অন্তহীন পদযাত্রা” — জুমজার্নাল
  5. “পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা: লিপি, কর্মসূচি ও বাস্তবতা” — জুমজার্নাল
  6. “সমতলের আদিবাসী জাতিগুলো: কে কোথায় থাকেন, কী নিয়ে বেঁচে আছেন” — জুমজার্নাল
  7. “জনশুমারি ২০২২: ৫০ জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা, জেলা ধরে ধরে” — জুমজার্নাল
  8. “স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা 27 থেকে 50 হলো কীভাবে” — জুমজার্নাল

শুমারি ও সরকারি নথি

  1. Bangladesh Bureau of Statistics, Population and Housing Census 2022: National Report (Volume I), নভেম্বর 2023 — Table P29 (পৃ. 365), Table 3.2.15 — Internet Archive কপি
  2. BBS, Population and Housing Census 2022: Preliminary Report, আগস্ট 2022 — Table A-1.4 — Internet Archive কপি
  3. BBS District Reports 2022, Table P17: নওগাঁ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও
  4. জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, “২০১৯ শিক্ষাবর্ষের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির (সাদরি ভাষার) প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তক” — nctb.gov.bd

গবেষণা ও বিশ্বকোষ

  1. Sayed Ahmad, Amy Kim, Seung Kim ও Mridul Sangma, The Kurux of Bangladesh: A Sociolinguistic Survey, SIL Electronic Survey Report 2011-040 (মাঠকাজ জুলাই 2005) — SIL International
  2. মাযহারুল ইসলাম তরু, “ওরাওঁ”, বাংলাপিডিয়া — বাংলা, ইংরেজি
  3. Ali Nawaz, “Tribal Languages”, Banglapedia — en.banglapedia.org
  4. “Barind Tract” / “বরেন্দ্রভূমি”, Banglapedia — en.banglapedia.org
  5. Md Rafiul Islam, “Economy and Identity: The Oraons’ Perspective In Northwest Bangladesh”, Social Science Review 39(2), 2022, পৃ. 39–57 — BanglaJOL
  6. Md Rafiul Islam, Culture, Economy and Identity: A Study of the Oraon Ethnic Community in the Barind Region of Bangladesh, পিএইচডি অভিসন্দর্ভ, James Cook University (সারাংশ) — doi.org/10.25903/ptbs-6s20
  7. Asifa Sultana, “What About the Indigenous Languages of the Plains?: The Case of Kurukh in Bangladesh”, Journal of Language, Identity & Education 25(4), 2024 (সারাংশ) — doi
  8. Asifa Sultana, Dripta Piplai ও Indrani Roy, “Shaping the status of indigenous languages through policy: Kurukh in Bengal”, Current Issues in Language Planning, 2025 (সারাংশ) — doi
  9. Asifa Sultana, Dripta Piplai Mondal ও Indrani Roy, “Language policies and practices across border: perspectives on mother tongue-based education for Kurukh-speaking children of Bengal”, Language Policy, 2026 — doi
  10. Snehangshu Shekhar Chanda ও Ayesha Khatun, “The Culture of the Urang Community of Bangladesh”, International Journal of Business Arts and Scientific Study, 2020 — doi
  11. Mohammad Mamun Or Rashid ও অন্যরা, “Oral to Web: Digitizing ‘Zero Resource’ Languages of Bangladesh”, EBLICT প্রকল্প, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, 2026 — arXiv:2603.05272
  12. “Kurukh language” ও “Kurukh people”, ইংরেজি উইকিপিডিয়া — ভাষা, জাতি
  13. “কুরুখ ভাষা”, “ওরাওঁ” ও “বাংলাদেশের বিপন্ন ভাষাসমূহের তালিকা”, বাংলা উইকিপিডিয়া — কুরুখ ভাষা, ওরাওঁ, বিপন্ন ভাষার তালিকা

সংবাদমাধ্যম

  1. Babul Chandra Sutradhar, “Kurukh Voices: The Oraons of Bangladesh”, দ্য ডেইলি স্টার, 4 জুলাই 2025 — thedailystar.net
  2. কংকন কর্মকার, “Indigenous languages in the North: Left to die out” / “বিলুপ্তির পথে উত্তরাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভাষা”, দ্য ডেইলি স্টার, 21 ফেব্রুয়ারি 2023 — ইংরেজি, বাংলা
  3. ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, “দেশে হারিয়ে যাচ্ছে যে কয়েকটি ভাষা”, ডেইলি স্টার বাংলা, 1 মার্চ 2025 — bangla.thedailystar.net
  4. পিনাকী রায়, “নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে”, ডেইলি স্টার বাংলা, 21 ফেব্রুয়ারি 2021 — bangla.thedailystar.net

ছবি

সর্বশেষ হালনাগাদ: 19 অক্টোবর 2026

 

প্রসঙ্গ:আদিবাসী ভাষা, আদিবাসীদের ভাষা বিলুপ্তি, ওরাওঁ সম্প্রদায়, মাতৃভাষায় শিক্ষা

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা