Jumjournal Logo

সমতলের আদিবাসী জাতিগুলো: কে কোথায় থাকেন, কী নিয়ে বেঁচে আছেন

Last updated Oct 17th, 2026

0

Featured image

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ওরাওঁ, শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে কোচ, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে মণিপুরী, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় রাখাইন — পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরেও বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে আদিবাসী জাতির বসতি আছে। সমতলের আদিবাসী তালিকা খুঁজলে প্রথম উত্তরটি সরকারি: ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০-এর সংশোধিত তফসিলে 50টি নাম আছে, যার 11টি পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনে নাম ধরে থাকা জাতি; বাকি 39টির প্রায় সবার বসতি সমতলে। তবে এই তালিকার বাইরেও এমন জাতি আছে যারা নিজেদের আদিবাসী বলে পরিচয় দেন।

এই লেখাটি একটি নির্দেশিকা: অঞ্চল ধরে, জাতি ধরে — কে কোন জেলায় থাকেন, কোন ভাষায় কথা বলেন, কী কাজ করে সংসার চলে। প্রতিটি জাতির কথা আলাদা করে, তার নিজের উৎস থেকে। এক জাতির কথা অন্য জাতির ঘাড়ে চাপানো হয়নি। জনসংখ্যার সংখ্যা এখানে রাখা হয়নি; সেগুলোর জন্য BBS-এর জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022-এর জাতীয় প্রতিবেদন দেখা যেতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগুলোর জন্য আছে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব।

এই লেখায় যা আছে

  1. সরকারি তালিকায় কারা আছেন, কারা নেই
  2. এক নজরে: জাতি, এলাকা, ভাষা, জীবিকা
  3. উত্তরবঙ্গ ও বরেন্দ্র অঞ্চল
  4. বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও গাজীপুর
  5. সিলেট অঞ্চল
  6. চা-বাগানের জাতিগুলো
  7. উপকূলের রাখাইন
  8. দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
  9. সমতলের ত্রিপুরা
  10. সমতলের ভাষাগুলো
  11. জমি ও আলাদা ভূমি কমিশনের দাবি
  12. মুক্তিযুদ্ধে সমতলের জাতিগুলো
  13. প্রশ্নোত্তর
  14. যা এখনো জানা যায়নি
  15. তথ্যসূত্র

সমতলের আদিবাসী কারা, আর সরকারি তালিকায় কতটি নাম আছে?

সরকারি তালিকা বলতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০-এর তফসিল। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তফসিলটি সংশোধন করে আগের 27টির জায়গায় 50টি জাতির নাম বসায়। 25 জুন 2026 সংসদে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীও বলেছেন, এই আইনের “তফসিল (সংশোধিত-১৯) অনুযায়ী গেজেটভুক্ত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা ৫০টি”।

27 থেকে 50-এ যাওয়ার কথা এবং পুরো তালিকাটি আমাদের আর্কাইভের আমাদের আদিবাসী ভাষাগুলোর বর্তমান অবস্থা লেখায় আছে (মূল লেখা The Daily Star-এ, অনুবাদ সপ্তর্ষি দেওয়ান)। মন্ত্রীর বক্তব্য ছেপেছে বাংলা ট্রিবিউন; সেখানে কেবল মোট সংখ্যা আছে, নামগুলো নেই।

তালিকার 50টি নামের মধ্যে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখুয়া, খিয়াং, ম্রো, বম, খুমি ও চাক — এই 11টি পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনে নাম ধরে থাকা জাতি। বাকি 39টি নাম তালিকায় যে বানানে আছে সে বানানেই:

বর্মন, বাগদি, বনাই, বড়ইক, বেদিয়া, ভিল, ভূমিজ, ভূইমালী, ডালু, গারো, গোরাইত, গুর্খা, গঞ্জু, হোদি, হো, হাজং, কোচ, কোল, খাসি, কুর্মি মাহাতো, কোদা, কোড়া, খড়িয়া, খারোয়ার, লোহার, মনিপুরী, মালপাহারী / পাহাড়ী, মুন্ডা, মালো / ঘাসিমালো, মহালি, মুশোর, ওঁরাও, পাত্রো, রাজোয়ার, রাখাইন, সাঁওতাল, সাবার, তেলি ও তুরি।

এদের মধ্যে গুর্খা ও সাঁওতালদের একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামেও থাকেন, আর ত্রিপুরাদের একটি অংশ সমতলে। তাই “পাহাড়ের তালিকা” আর “সমতলের তালিকা” পুরোপুরি আলাদা করা যায় না।

কারা তালিকায় নেই?

রাজবংশী নামটি 50টির তালিকায় নেই, যদিও বাংলাপিডিয়া রাজবংশীদের “বাংলাদেশে বসবাসরত একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী” বলেছে। পাহান ও সিং নামও তালিকায় নেই, অথচ জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে এই দুই জাতির মানুষ নিজেদের আলাদা জাতি হিসেবেই পরিচয় দেন বলে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা-র 21 ফেব্রুয়ারি 2023-এর প্রতিবেদনে আছে।

24 আগস্ট 2022 ঠাকুরগাঁওয়ে “বাংলাদেশ কোচ-রাজবংশী-বর্মণ সংগঠন” মানববন্ধন করে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের কোচ ও বর্মণরা ২০১০ সালের আইনে স্বীকৃত। কিন্তু প্রায় 6–7 মাস ধরে উপজেলা প্রশাসন তাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সনদ দিচ্ছিল না। সংগঠনের দাবির মধ্যে ছিল সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য আলাদা ভূমি কমিশন।

পরিভাষা নিয়েও একমত নেই। রাষ্ট্রের আইনে নাম “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী”, আর এই জাতিগুলোর সংগঠনগুলো নিজেদের “আদিবাসী” বলে। জুমজার্নাল সাধারণ লেখায় “আদিবাসী” শব্দটি ব্যবহার করে।

এক নজরে: কোন জাতি কোথায় থাকেন, কোন ভাষায় কথা বলেন, কী করে সংসার চলে?

নিচের ছকে প্রতিটি সারি সেই জাতির নিজস্ব উৎস থেকে নেওয়া (উৎস শেষ কলামে)। কোনো ঘরে “উৎসে নেই” লেখার মানে, যে উৎসগুলো পড়া হয়েছে তার কোনোটিতে বিষয়টির কথা নেই।

জাতি প্রধান এলাকা ভাষা জীবিকা উৎস
সাঁওতাল রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া সাঁওতালি (অস্ট্রিক) প্রধানত কৃষি; দিনমজুরি, চা-বাগানে শ্রম বাংলাপিডিয়া
ওরাওঁ বরেন্দ্র অঞ্চলসহ উত্তরের 12 জেলা, গাজীপুর, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার কুড়ুখ (দ্রাবিড়), সাদরি কৃষি, কৃষিশ্রম, বর্গাচাষ বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ
মুন্ডা উত্তরবঙ্গ, সিলেটের চা-বাগান, বৃহত্তর যশোর-খুলনা মুন্ডারি (অস্ট্রিক) উৎসে নেই বাংলাপিডিয়া
মাহালি রাজশাহী, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট মাহালি (মুন্ডা শাখা) বাঁশের গৃহস্থালি জিনিস বানিয়ে হাটে বিক্রি উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)
পাহাড়িয়া / মালপাহাড়ি রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, পাবনা মালতো (দ্রাবিড়); কোথাও হারিয়ে গেছে আগে চাষ ও বনজ সংগ্রহ বাংলাপিডিয়া
রাজবংশী রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী; অল্প বগুড়া-ময়মনসিংহে আঞ্চলিক মিশ্র ভাষা, লিপি নেই কৃষি, মাছ ধরা ও বিক্রি বাংলাপিডিয়া
গারো (মান্দি) ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, টাঙ্গাইল, জামালপুর, গাজীপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট গারো (সিনো-টিবেটান), রোমান হরফ কৃষি; ঐতিহাসিকভাবে জমির দলিল নেই বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ
হাজং ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, সিলেট হাজং (ইন্দো-আর্য), অসমীয়া হরফে লেখা জমিচাষ বাংলাপিডিয়া
কোচ শেরপুরের ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী; গাজীপুর; ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় কোচ (সিনো-টিবেটান), লিপি নেই কৃষি; অধিকাংশ প্রান্তিক চাষি বাংলাপিডিয়া; ডেইলি স্টার
ডালু ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, শেরপুরের নালিতাবাড়ী বাংলা কৃষি; বাংলাপিডিয়ার হিসাবে শতকরা 90 ভাগ ভূমিহীন বাংলাপিডিয়া
বর্মন বৃহত্তর ময়মনসিংহ, গাজীপুর, ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় নিজস্ব ভাষা হারিয়েছে (আর্কাইভ) কৃষি (ব্যক্তিগত বিবরণে) আর্কাইভ; ডেইলি স্টার
খাসি সুনামগঞ্জ, সিলেটের গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া খাসি (অস্ট্রো-এশিয়াটিক) পান, কমলা, আনারস, তেজপাতা; সীমান্ত বাণিজ্য বাংলাপিডিয়া
মণিপুরী কেবল সিলেট বিভাগ; অর্ধেকের বেশি মৌলভীবাজারে মৈতৈ লোন; বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী উৎসে নেই আর্কাইভ; বাংলাপিডিয়া
পাত্র (লালেং) সিলেট সদর ও গোয়াইনঘাট লালেং উৎসে স্পষ্ট নয় বাংলাপিডিয়া; ডেইলি স্টার
খাড়িয়া মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান বাংলা; নিজেদের মধ্যে সাদরি চা-শ্রমিক বাংলাপিডিয়া
ভূমিজ শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান মুন্ডারি চা-শ্রমিক বাংলাপিডিয়া
কুর্মি সিলেট সদর, গোয়াইনঘাট, কুলাউড়া, শ্রীমঙ্গল, বাহুবল বাংলা-হিন্দি মিশ্র ভাষা মূলত চা-শ্রমিক; এখন ছোট ব্যবসা, চাকরিও বাংলাপিডিয়া
রাখাইন কক্সবাজার, পটুয়াখালী, বরগুনা রাখাইন, নিজস্ব লিপি কৃষি, মাছ ধরা, ব্যবসা, নৌকা তৈরি, তাঁত, কারুশিল্প বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ
বাগদি যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা উৎসে নেই মাছ ধরা, পালকি বহন, চুন তৈরি, চটের থলি, তাঁত, দিনমজুরি বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ
ত্রিপুরা (সমতল) চাঁদপুর, কুমিল্লা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম ককবরক; চাঁদপুরে নতুন প্রজন্ম বলতে পারে না উৎসে নেই আর্কাইভ

অঞ্চলের ভাগটি নেওয়া হয়েছে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার লেখা আমাদের আর্কাইভের বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষা : এ যেন আলো আঁধারি পথ রেখায় অন্তহীন পদযাত্রা থেকে। লেখাটি ভাষার অবস্থান ধরে দেশকে 11টি অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিটি অঞ্চলে কোন জাতি আছে তার ছক দিয়েছে। ছকের সূত্র বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম (2002), টেরি ডারনিয়ান (2007) ও বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ (2013)।

উত্তরবঙ্গ ও বরেন্দ্র অঞ্চলে কোন কোন আদিবাসী জাতি থাকেন?

মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ছক অনুযায়ী রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা, নওগাঁ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরে জাতির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুন্ডা, মালো, মাহালি, খন্ড, বেদিয়া, ভূমিজ, কোল, টুরি, বিল, কর্মকার, মাহাতো, মুরিয়ার, মুশহর, পাহান, পাহাড়িয়া, রাই ও সিং — মোট 19টি নাম আছে এই অঞ্চলের ঘরে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার 2023-এর প্রতিবেদনে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ মিলিয়ে 35–38টি জাতিগোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে।

দিনাজপুর সীমান্তের বহবলদিঘী গ্রাম একটি উদাহরণ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ সালেক খোকন (26 ডিসেম্বর 2023) লিখেছেন, ওই এক গ্রামেই সাঁওতাল, কড়া, ওরাওঁ, মুন্ডা, মাহালী আর ভুনজার জাতির মানুষ থাকেন, প্রত্যেকের ভাষা আলাদা। মায়ের প্রতিশব্দই তার প্রমাণ: মাহালিরা বলেন “মাই”, কড়ারা “মেয়া”, মুন্ডারা “মায়ে”, ওরাওঁরা “ইয়ো”।

সাঁওতাল

বাংলাপিডিয়া (লেখক আহমদ রফিক) অনুযায়ী সাঁওতালদের বাসস্থান মূলত রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়ায়। 1881 সালের আদমশুমারিতে পাবনা, যশোর, খুলনা, এমনকি চট্টগ্রামেও অল্প কিছু সাঁওতাল বসতি ছিল। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ছকে সাঁওতালের নাম আছে সিলেট অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঘরেও।

বাংলাপিডিয়া বলছে, সাঁওতাল সমাজ “প্রধানত কৃষিজীবী”। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে “অতি অল্প বিনিময়মূল্যে এরা চা বাগানে বা অন্যত্র শ্রম বিক্রয় করে”, মাটি কাটে, মোট বয়, দিনমজুরি করে। 1946 থেকে 1950 সালের তেভাগা আন্দোলনে সাঁওতালদের ব্যাপক অংশগ্রহণের কথাও সেখানে আছে। বহবলদিঘীর প্রতিবেদনে আছে শালবনে তীর-ধনুক নিয়ে মৌসুমি শিকারের কথা।

ভাষা সাঁওতালি, অস্ট্রিক পরিবারের। লিপি নিয়ে দুই রকম কথা আছে। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, সাঁওতালদের “ভাষা আছে কিন্তু লেখ্য বর্ণমালা নেই”। অন্যদিকে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন ডেইলি স্টার বাংলাকে বলেছেন, সাঁওতালি “যার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে”। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানিয়েছেন, সরকারের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম ধাপে সাঁওতালি ছিল। কিন্তু “সাঁওতালরা তাঁদের বর্ণমালার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানাতে না পারায়” তাদের ভাষায় পাঠ্য উপকরণ তৈরি স্থগিত হয়।

নামের বানান নিয়ে আমাদের আর্কাইভের লেখা সাঁওতাল, সান্তাল, সান্থাল, সাঁওতাড়, সান্তাড় নাকি সাতাড়?। ভাষা শেখার জন্য সাঁওতালি ভাষা শিক্ষা, আর 1855-এর বিদ্রোহের জন্য সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল ও প্রভাব।

ওরাওঁ

বাংলাপিডিয়া (লেখক মাযহারুল ইসলাম তরু) অনুযায়ী ওরাওঁরা মুগল আমলে বরেন্দ্র অঞ্চলে ঢুকে সেখানে স্থায়ী নিবাস গড়েন। এখন তাঁরা থাকেন কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, রংপুর, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, বগুড়া, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গাজীপুর, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে।

তাঁদের ভাষা কুড়ুখ (বাংলাপিডিয়ার বানানে “কুরুক”)। এটি দ্রাবিড় পরিবারের ভাষা। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, ভাষার দিক থেকে ওরাওঁরা দুই ভাগে বিভক্ত — কুরুক ও শাদরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান ডেইলি স্টার বাংলা-য় (1 মার্চ 2025) কুড়ুখকে বিপন্ন ভাষার তালিকায় রেখেছেন। জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে তরুণদের মধ্যে কুড়ুখ কদাচিৎ শোনা যায়, ডেইলি স্টার বাংলার 2023-এর প্রতিবেদনও তা-ই বলছে।

গ্রামের বিরোধ মেটায় “পাঞ্চেস” — গ্রামের বয়স্ক সাত-আটজনকে নিয়ে গড়া পরিষদ, যার মাথায় হেডম্যান “মহাতো”। পাঞ্চেসের রায়ে সন্তুষ্ট না হলে আপিল যায় উপরের সংগঠন “পাঁড়হা”-য়। জীবিকা নিয়ে বাংলাপিডিয়ায় আলাদা বিবরণ নেই। আমাদের আর্কাইভের আদিবাসী ওরাওঁ মুক্তিযোদ্ধা লেখায় রাজশাহীর গোদাগাড়ীর দুজন মুক্তিযোদ্ধার কথা আছে। হোসেন ওরাওঁর নিজের জমি নেই, “পাইট (কৃষি শ্রমিক)” খাটেন। শুকাদ ওরাওঁর 3 বিঘা জমি আছে, তার পাশাপাশি বর্গাচাষ করেন। এ দুটি ব্যক্তিজীবনের বিবরণ; পুরো জাতির ছবি নয়।

মুন্ডা

বাংলাপিডিয়া (লেখক এনামুল হক) অনুযায়ী মুন্ডারা থাকেন উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে, সিলেটের চা-বাগানে, আর বৃহত্তর যশোর ও খুলনায়। নিজেদের মধ্যে কথা বলেন মুন্ডারি ভাষায়, যা মৌখিক। কেউ এ ভাষাকে “খরটাই”, কেউ “নাগরী” বলেন। ভাষাবিজ্ঞানীরা একে অস্ট্রিক ভাষার কোলারিয়ান দলে রাখেন।

মুন্ডারা বহু গোত্রে বিভক্ত — টপ, কছুয়া, রাজফূত, উৎকুমার, নগড়ুয়া, বাঘ প্রভৃতি। স্বগোত্রে বিয়ে নিষিদ্ধ। প্রধান দেবতা শিং বোঙ্গা, অন্য প্রধান দেবতা মারাংবুরু। ভাদ্র মাসে হয় কারাম পূজা। জীবিকা নিয়ে বাংলাপিডিয়ায় কিছু নেই। ডেইলি স্টার বাংলার 2023-এর প্রতিবেদন বলছে, মুন্ডালি ভাষা সম্প্রদায়ের ভেতরেই, বিশেষত তরুণদের মধ্যে, খুব কম ব্যবহৃত হয়।

মাহালি

তালিকায় নামটি “মহালি”, বিডিনিউজে “মাহালী”, চলতি বানান “মাহালি”। মাহালিদের নিয়ে বাংলায় কোনো বিশ্বকোষীয় ভুক্তি পাওয়া যায়নি। ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশে মাহালিরা থাকেন রাজশাহী, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, রংপুর ও সিলেটে, আর তাঁদের পূর্বপুরুষ এক শতাব্দীরও আগে ঝাড়খণ্ড থেকে আসেন [যাচাই প্রয়োজন]। ভাষা মাহালি, মুন্ডা শাখার। অনেকে সাঁওতালিও বলেন।

একই উৎস বলছে, এই সম্প্রদায়ের প্রধান পেশা বাঁশ দিয়ে ডালি, কুলা, লবণ রাখার টুংকি, হাতপাখা বানিয়ে স্থানীয় হাটে বিক্রি করা। কুলাকে মাহালি ভাষায় বলে “হাতাক”, আর ধর্মীয় আচারেও কুলার জায়গা আছে। লিপি নিয়ে দুটি দাবি আছে। উইকিপিডিয়া বলছে, একজন মাহালি সংগঠক রোমান হরফে মাহালি বর্ণমালা তৈরি করেছেন, যা রাজশাহীর পবার তিনটি বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে চলছে। বিডিনিউজের প্রতিবেদন বলছে, কিছু প্রতিষ্ঠান 40 বর্ণের (5 স্বর, 35 ব্যঞ্জন) একটি মাহালি লিপি তৈরি করেছে, তবে তা কথ্য ভাষার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

পাহাড়িয়া (মালপাহাড়ি)

বাংলাপিডিয়া (লেখক সাদাত উল্লাহ খান) বলছে, বাংলাদেশের দুটি দ্রাবিড়ভাষী জনগোষ্ঠীর একটি পাহাড়িয়া, অন্যটি ওরাওঁ। পাহাড়িয়ারা প্রধানত দুই ভাগে — সাউরিয়া (মালার নামেও পরিচিত) ও মাল। তাঁদের বসবাস মূলত রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া ও পাবনায়। তাঁদের ধারণা, আদি উৎস দক্ষিণ বিহারের রাজমহল পর্বতমালা। আগে চাষাবাদ ও বন থেকে ফলমূল সংগ্রহ করে তাঁদের জীবিকা চলত।

কোনো কোনো অঞ্চলের পাহাড়িয়ারা নিজেদের ভাষা ভুলে গেছেন, বাংলাপিডিয়াই তা লিখেছে। অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মালপাহাড়িদের মালতো ভাষার এলাকা বলেছেন নাটোর, পাবনা ও রাজশাহী। তাঁর লেখার এক জায়গায় ভাষাটিকে বিলুপ্ত, আরেক জায়গায় বিপন্ন বলা হয়েছে। 6 সেপ্টেম্বর 2025 প্রথম আলো জানায়, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের 2 নম্বর ওয়ার্ডের মোল্লাপাড়ার পাহাড়িয়া মহল্লা থেকে 16টি পরিবারকে উচ্ছেদের চেষ্টার প্রতিবাদে মানববন্ধন হয়েছে। জমির মালিকানা দাবি করেছেন সাজ্জাদ আলী নামের একজন; সেটি তাঁর দাবি, আর পরিবারগুলোর বক্তব্য উল্টো। প্রতিবেদন প্রকাশের পর উচ্ছেদ বন্ধ হয়।

কুর্মি মাহাতো ও মাহাতো

সরকারি তালিকায় নামটি “কুর্মি মাহাতো”। আমাদের আর্কাইভের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা লেখায় মাহাতোদের বসবাস বলা হয়েছে “উত্তরবঙ্গের সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট ও রাজশাহীর বিভিন্ন অঞ্চলে”। ডেইলি স্টার বাংলার 2023-এর প্রতিবেদনে জয়পুরহাটের পাঁচবিবির দমদমা গ্রামের গৃহকর্মী সঞ্জিতা মাহাতো বলেছেন, তাঁর বাবা-মা বা শ্বশুরবাড়ির কেউ নিজস্ব ভাষায় কথা বলেন না।

অন্যদিকে বাংলাপিডিয়ার কুর্মি ভুক্তি সিলেটের চা-বাগানের কুর্মিদের কথা বলে, আর সেখানে গোয়াইনঘাটের রাধানগরের কুর্মিদের বলা হয়েছে “মাহাতো কুর্মি”। উত্তরবঙ্গের মাহাতো আর সিলেটের কুর্মি একই জাতি কি না, কোনো উৎসে স্পষ্ট করে বলা নেই।

পাহান, সিং ও অন্যরা

পাহানদের নিয়ে উৎস খুব কম। আর্কাইভের মুক্তিযোদ্ধা-লেখায় নওগাঁর মহাদেবপুর থানার উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের শিবরামপুর গ্রামের সুরেন চন্দ্র পাহানের কথা আছে। ডেইলি স্টার বাংলার 2023-এর প্রতিবেদন বলছে, পাঁচবিবির বাগজানা ও আটাপুর ইউনিয়নের পাহান, মালো ও মাহাতো শিশুদের বেশিরভাগ নিজেদের ভাষা বলতে পারে না। অনেকে জানেই না যে তাদের আলাদা ভাষা ছিল। একই উপজেলার দমদমা গ্রামে সিং জাতির শিক্ষার্থীদের কথাও আছে। কোল, কড়া, ভুনজার, মুশহর, তুরি, বেদিয়া ও ভিলদের জীবিকা বা জেলার বিবরণ কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি; পাওয়া গেছে কেবল নাম।

রাজবংশী

বাংলাপিডিয়া (লেখক আহমদ রফিক) অনুযায়ী রাজবংশীদের বসবাস প্রধানত রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহীতে, আর খুব অল্প সংখ্যায় বগুড়া ও ময়মনসিংহে। অনেকে তাঁদের “ক্ষত্রিয় নামক এক কোচ শাখার সঙ্গেও অভিন্ন” মনে করেন। 1941 ও পরের আদমশুমারিগুলোতে রাজবংশীদের হিন্দু জনগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে গোনা হয়েছে।

রাজবংশীরা মূলত কৃষিজীবী, তবে মাছ ধরা ও মাছ বিক্রিও তাঁদের অন্যতম পেশা, আর মেয়েরা কুটিরশিল্পে দক্ষ। নিজস্ব লিখিত ভাষা বা বর্ণমালা নেই। তাঁদের ভাষা “স্থানিক তথা আঞ্চলিক ভাষার এক মিশ্ররূপ”। খরা ও অনাবৃষ্টির সময়ের “হুদুমা” পূজা তাঁদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর একটি। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ছকে রাজবংশীর নাম আছে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঘরেও।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও গাজীপুরে কোন কোন আদিবাসী জাতি থাকেন?

মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ছকে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুরের ঘরে আছে গারো, হাজং, কোচ, বর্মন, ডালু, হদি, বানাই ও রাজবংশী। গাজীপুরের আলাদা ঘরে বর্মন, কোচ ও গারো। এই অঞ্চলের বেশিরভাগ বসতি মেঘালয় সীমান্তের গারো পাহাড়ের পাদদেশে — হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী।

গারো (মান্দি)

বাংলাপিডিয়া (লেখক সুভাষ জেংচাম) অনুযায়ী গারোরা থাকেন টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও গাজীপুরে। সবচেয়ে বেশি থাকেন হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও মধুপুর উপজেলায়। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, গারোরা নিজেদের “আচিক্ মান্দে (পাহাড়ের মানুষ)” বলতে পছন্দ করেন। “গারো” নামটি তাঁদের মতে অন্যের চাপিয়ে দেওয়া, তাই আপত্তিকর।

আমাদের আর্কাইভের গারো ইতিহাস ও সংস্কৃতি লেখায় অন্য একটি ভাগের কথা আছে: সমতলবাসীরা “লামদানি” আর পাহাড়িরা “আচ্ছিক” গারো নামে পরিচিত। দুই উৎসে শব্দটির প্রয়োগ আলাদা। বাংলাপিডিয়া “আচিক্ মান্দে”-কে সব গারোর আত্মপরিচয় বলেছে, আর আর্কাইভের লেখা “আচ্ছিক”-কে কেবল পাহাড়ের গারোর নাম বলেছে।

বংশ ও সম্পত্তি চলে মায়ের সূত্রে। বাংলাপিডিয়া একে “মাতৃতান্ত্রিক” বলেছে। সম্পত্তি পান একজন নির্বাচিত মেয়ে — “নক্না”, সাধারণত কনিষ্ঠ কন্যা। তবে একই ভুক্তি বলছে, এখন বাবা-মা জীবদ্দশাতেই ছেলের নামে জমি লিখে দিচ্ছেন। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে গারোদের “শতকরা নিরানববইজনই” খ্রিস্টান। ভাষা সিনো-টিবেটান পরিবারের, লেখা হয় রোমান হরফে (মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা)।

জমির প্রশ্নে আর্কাইভের লেখাটি স্পষ্ট: “গারোরা ঐতিহাসিকভাবে ভূমিহীন”, অনেকের দখলে জমি থাকলেও দলিল নেই। আগে জমি ছিল গোত্রভিত্তিক মালিকানায়, চাষ হতো সমবায়ে। 25 জানুয়ারি 2026 কাপেং ফাউন্ডেশনের সেমিনারে মধুপুর বনাঞ্চলের গারোদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার দাবি ওঠে (প্রথম আলো)। মুক্তিযুদ্ধে গারোদের ভূমিকা নিয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের অবদান।

হাজং

বাংলাপিডিয়া (লেখক সুভাষ জেংচাম) অনুযায়ী হাজংদের প্রধান বসবাস শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নালিতাবাড়ী, সুসং দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও বিরিশিরি এলাকায়; কিছু থাকেন শেরপুর, সিলেট ও নেত্রকোনায়। সপ্তদশ শতকে মুগলদের হাতে বিতাড়িত হয়ে তাঁরা গারো পাহাড়ে আশ্রয় নেন, পরে সমতলে বসতি গড়েন।

বাংলাপিডিয়া বলছে, হাজংরা জুমচাষে অভ্যস্ত ছিলেন না, “প্রাচীনকাল থেকেই জমিচাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত”। দেশভাগের আগে ময়মনসিংহে চাষ করে তাঁরা স্বনির্ভর ছিলেন। এখন আর্থিক অবস্থা ভালো নয়, শিক্ষিতের হার প্রায় 30%। নামের উৎস নিয়ে হাজংদের নিজেদের একটি কথা আছে: “গারো গিলা আমগা নাম থুছে হাজং” — গারোরা আমাদের নাম রেখেছে হাজং। গারো ভাষায় “হা” মানে মাটি, “জং” মানে পোকা।

বাইরের মানুষের সঙ্গে এবং বিদ্যালয়ে হাজংরা বাংলা বলেন, নিজেদের মধ্যে হাজং। হাজং ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা নেই, লেখা হয় অসমীয়া হরফে। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার লেখা অনুযায়ী হাজং এখন ইন্দো-আর্য পরিবারের ভাষা হিসেবে গণ্য, আগে টিবেটো-বর্মন পরিবারে ধরা হতো। সমাজ চলে পাড়া, গাঁও, চাক্লা ও পরগনার স্তরে, গ্রামপ্রধানকে বলা হয় “গাঁওবুড়া”। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রথম হাতিখেদা আন্দোলন করে হাজংরাই, আর টঙ্ক আন্দোলনেও তাঁদের বড় ভূমিকা ছিল।

কোচ

বাংলাপিডিয়া (লেখক সুভাষ জেংচাম) অনুযায়ী কোচরা মাতৃভূমি কোচবিহার ছেড়ে ময়মনসিংহে আবাস গড়েন। এখন তাঁরা থাকেন শেরপুরের ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদী উপজেলায়। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ছকে গাজীপুরেও কোচের নাম আছে, আর ডেইলি স্টার বাংলার 2022-এর প্রতিবেদনে আছে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের কোচদের কথা।

বাংলাপিডিয়া বলছে, “কৃষিকাজ কোচদের প্রধান জীবিকা”। ভূ-সম্পত্তি না থাকায় অধিকাংশ পরিবার প্রান্তিক চাষি, চাষের বাইরে অন্য পেশা নেই বললেই চলে। আর্কাইভের আদিবাসী কোচ মুক্তিযোদ্ধা লেখায় এর ব্যক্তিগত চেহারা আছে। ঝিনাইগাতীর রংটিয়ার মজেন্দ্র কোচ ও শালচড়ার সুধাংশু কোচের নিজের জমি নেই, অন্যের জমিতে দিনমজুরি করেন। গাজীপুরের রাধাকান্ত কোচ কাঠমিস্ত্রি।

ভাষা নিয়ে উৎসগুলো দুই রকম বলছে। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, “কোচদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে, তবে এ ভাষার বর্ণমালা নেই”, আর ছেলেমেয়েরা বাংলা মাধ্যমে পড়ে। আর্কাইভের আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতি লেখা বলছে, “সমতলের বর্মণ, কোচ ইত্যাদি জাতি তাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে”। কোচ সমাজ পিতৃপ্রধান, সম্পত্তি পায় ছেলেরা, তবে সন্তান মায়ের গোত্রনাম নেয়। কোচদের গোত্রকে বলে “নিকিনি”।

ডালু

বাংলাপিডিয়া (লেখক সুভাষ জেংচাম) অনুযায়ী ডালুরা বৃহত্তর ময়মনসিংহের উত্তর সীমান্তে থাকেন, বিক্ষিপ্তভাবে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট আর শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায়। তাঁদের কিংবদন্তি অনুযায়ী প্রথম বসতি ভোগাই নদীর তীরে বারেঙ্গাপাড়ায়। জায়গাটির নাম হয় “ডালুকিল্লা”, এখন “ডালুবাজার”।

বাংলাপিডিয়া বলছে, ডালুরা মূলত কৃষিজীবী, তবে এখন “শতকরা নববই ভাগই ভূমিহীন”, তাই সম্প্রদায়টি ভূমিহীন শ্রমজীবী সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে। ডালুদের মৌখিক ও লিখিত ভাষা বাংলা। একসময় তাঁরা মণিপুরী ভাষায় কথা বলতেন, বাংলাদেশের ডালুরা এখন আর তা বলেন না। ধর্মে তাঁরা সনাতন হিন্দু। পুরোনো দেবতাদের নাম — কেড়েং-কুড়ি, পথ-খাওরি, হয়দৈব — হারিয়ে যাচ্ছে।

বর্মন

বর্মনদের নিয়ে বাংলাপিডিয়ায় কোনো ভুক্তি পাওয়া যায়নি। আর্কাইভের আদিবাসী বর্মণ মুক্তিযোদ্ধা লেখায় গাজীপুরের সদর উপজেলার বার্ডপাড়া এবং কালিয়াকৈরের কেন্দুয়ার বাইদ গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের কথা আছে। সেখানে একজনকে “আদিবাসী বংশী বর্মণ সম্প্রদায়ের” বলা হয়েছে। এঁদের কেউ পৈতৃক কৃষিকাজ দেখতেন, কারও ভিটার 4–5 শতাংশ জমি ছাড়া কিছু নেই।

মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ছকে বর্মনের নাম বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও গাজীপুরের ঘরে। ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদনে আছে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের বর্মণদের কথা। এই দুই অঞ্চলের বর্মন একই জাতি কি না, উৎসে বলা নেই। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী সমতলের বর্মণরা ভাষা হারিয়েছেন।

হদি ও বানাই

দুটি নামই মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ছকে বৃহত্তর ময়মনসিংহের ঘরে আছে, আর সরকারি তালিকায় “হোদি” ও “বনাই” বানানে আছে। বাংলাপিডিয়ার ডালু ভুক্তিতে কেবল এটুকু আছে যে ডালুদের পোশাক “হাজং ও বানাইদের মত”। এর বাইরে এই দুই জাতির এলাকা, ভাষা বা জীবিকার বিবরণ পাওয়া যায়নি।

সিলেট অঞ্চলে কোন কোন আদিবাসী জাতি থাকেন?

মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ছকে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ঘরে আছে খাসি, গারো, হাজং, মণিপুরী, পাত্র, খাড়িয়া, সাঁওতাল, ওরাওঁ ও ত্রিপুরা। চা-বাগানের জাতিগুলোর কথা আলাদা অংশে আছে। এখানে থাকছে পান-জুমের খাসি, মণিপুরী আর পাত্রদের কথা।

খাসি (খাসিয়া)

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী খাসিয়ারা প্রায় পাঁচ শতাধিক বছর আগে আসাম থেকে বাংলাদেশে আসেন। আদি নিবাস সুনামগঞ্জে, খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের পাদদেশে। এখন সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, ছাতক ও সদর থানায় ছড়িয়ে আছেন; গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরেও অনেক বসতি। কুলাউড়ার চা-বাগানে বহু খাসিয়া চাকরি করেন।

জীবিকার ছবিটি বাংলাপিডিয়ায় এরকম: জমি আছে এমন অল্প কয়েকজনই জুমচাষ ও বাগান করেন, অনেকের জমিজমা নেই। কলা, আনারস, কমলা, তেজপাতা, গোলমরিচ, পান উৎপাদনে তাঁরা “স্মরণাতীত কাল থেকে” অভ্যস্ত। সীমান্তের এপার-ওপারে পান, কমলা, মাছ, চালের ব্যবসাও আছে, আর সেসব বাজারে বেচাকেনা করেন খাসিয়া নারীরা। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে 80–90% খাসিয়া খ্রিস্টান। বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর বাড়িতে থাকেন। ভাষা খাসি, অস্ট্রো-এশিয়াটিক পরিবারের (মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা)।

জমি নিয়ে বিরোধের খবর বারবার আসে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (23 নভেম্বর 2020) জানায়, কুলাউড়ার ইছাছড়া পুঞ্জির 52টি খাসি পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে সেখানে আছেন, আর একটি চক্র তাঁদের উচ্ছেদের চেষ্টা করছে বলে তাঁদের অভিযোগ। প্রশাসন জমি উদ্ধার করে পরিবারগুলোকে ফিরিয়ে দিলেও হামলার পর আতঙ্ক কাটেনি। খাসিয়া মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবির কথা আছে আর্কাইভের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা লেখায়।

মণিপুরী: মৈতৈ, বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ পাঙাল

আমাদের আর্কাইভের বাংলাদেশের মণিপুরী : এক সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র অনুযায়ী এখন বাংলাদেশে “শুধুমাত্র বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল তথা সিলেট বিভাগেই” মণিপুরীদের বসবাস। আগে ঢাকার তেজগাঁও, নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়ও মণিপুরী বসতি ছিল, সেগুলো বিলীন হয়ে গেছে।

লেখাটিতে গ্রাম ধরে তালিকা আছে। মোট মণিপুরী বসতির অর্ধেকের বেশি মৌলভীবাজারে, আর সবচেয়ে বেশি কমলগঞ্জে — গঙ্গানগর, শ্রীপুর, কাটাবিল, ভানুবিল, মাধবপুরসহ 14টি গ্রাম। এর বাইরে আছে শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলা; সিলেট শহরের লামাবাজার, শিবগঞ্জ, নয়াবাজারসহ 12টি পাড়া; হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বিশগাঁও; সুনামগঞ্জের ছাতকের রতনপুর। সব মিলিয়ে 46টি গ্রাম। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মণিপুরীরা, যাঁরা “মৈতৈ পাঙল” নামে পরিচিত, থাকেন মূলত কমলগঞ্জে, আর সিলেট সদরের খাদিমপাড়ায়। তাঁদের মোট গ্রাম 27টি। তাঁদের নিয়ে আর্কাইভে আছে বাংলাদেশের মণিপুরী মুসলিম।

বাংলাপিডিয়া বলছে, বড় আকারে অভিবাসন হয় 1819–1825-এর মণিপুর-বার্মা যুদ্ধের সময়। তখন মণিপুররাজ চৌরজিৎ সিংহ সিলেটে আশ্রয় নেন। তবে একটি গবেষণা এর শুরু আরও আগে, রাজা ভাগ্যচন্দ্রের (1764–1789) সময়ে বলে মনে করে। মৈতৈ ভাষা (“মৈতৈ লোন”) তিব্বতি-বর্মি উপ-পরিবারের। আর্কাইভের লেখাটি জানায়, বাংলাদেশে মণিপুরী ভাষা শেখার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। 2010 সালে কমলগঞ্জের তেতইগাঁওয়ে একটি “মীতৈ ময়েক” বর্ণমালা স্কুল চালু হলেও তা টেকেনি।

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী আলাদা ভাষা। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা একে ইন্দো-আর্য পরিবারে রেখেছেন, আর এটি লেখা হয় বাংলা হরফে। অধ্যাপক আসাদুজ্জামানের তালিকায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বিপন্ন। বিষ্ণুপ্রিয়াদের ভাষার স্বীকৃতির লড়াই নিয়ে আর্কাইভে আছে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা আন্দোলনের কথা। মণিপুরীদের জীবিকা নিয়ে পড়া উৎসগুলোর কোনোটিতে বিবরণ পাওয়া যায়নি। আর্কাইভের লেখাটিতে কেবল আছে যে সাক্ষরতার হার 80%-এর বেশি।

পাত্র (লালেং)

বাংলাপিডিয়া (লেখক সাদাত উল্লাহ খান) অনুযায়ী এই জাতির প্রকৃত নাম “লালেং”, যার অর্থ “পাথর”। কোথাও কোথাও তাঁরা “পাতর” বা “পাথর” নামে পরিচিত। সরকারি তালিকায় বানান “পাত্রো”। পাত্র সমাজ 12টি সমমর্যাদার গোত্রে বিভক্ত এবং সম্পূর্ণ পিতৃতান্ত্রিক; কন্যাসন্তান পিতার সম্পত্তি পান না।

গ্রামের সংখ্যায় দুই উৎসে অমিল আছে। বাংলাপিডিয়া বলছে, পাত্ররা সিলেটের 19টি গ্রামে থাকেন। অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বলছেন, সিলেট সদর ও গোয়াইনঘাট উপজেলার 23টি গ্রামে। 1971 সালে কেউ কেউ ভারতের আসাম, মেঘালয় ও কাছাড়ে চলে যান। ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী তাঁদের পূর্বপুরুষেরা পাথর সংগ্রহ ও কয়লার ব্যবসা করতেন, আর সেখান থেকেই “পাত্র/পাথর” নাম [যাচাই প্রয়োজন]। আর্কাইভের মুক্তিযোদ্ধা-লেখায় কমলগঞ্জের আলীনগরের চা-শ্রমিক কার্তিক পাত্রকে “চা জনগোষ্ঠীর আদিবাসী পাত্র সম্প্রদায়ের” বলা হয়েছে। তিনি সিলেটের লালেংদেরই অংশ কি না, সে লেখায় বলা নেই।

চা-বাগানের আদিবাসী জাতিগুলো কারা, কোথা থেকে এসেছেন?

মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেটের চা-বাগানে কয়েকটি জাতি আছে, যাঁদের পূর্বপুরুষদের ব্রিটিশ আমলে ভারতের বিহার, ছোটনাগপুর ও আশপাশ থেকে চা চাষের শ্রমিক হিসেবে আনা হয়েছিল। বাংলাপিডিয়ায় খাড়িয়া, ভূমিজ ও কুর্মিদের আলাদা ভুক্তি আছে। চা-শ্রমিকদের আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে আর্কাইভের লেখা চা-শ্রমিকদের মুল্লুকে চলো আন্দোলনঃ একটি অলিখিত আখ্যান।

খাড়িয়া

বাংলাপিডিয়া (লেখক সুভাষ জেংচাম) বলছে, খাড়িয়াদের আদি নিবাস ভারতের ছোটনাগপুর, রোহতাসগড় ও অযোধ্যার পাহাড়ি অঞ্চল। ব্রিটিশ আমলে তাঁরা চা-শ্রমিক হিসেবে সিলেটে আসেন। অধিকাংশই মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থানার বিভিন্ন চা-বাগানে চা-শ্রমিক। বাংলাপিডিয়া খাড়িয়া ও মুন্ডাকে “একই নৃগোষ্ঠী” বলেছে। খাড়িয়াদের প্রধান ভাষা বাংলা, তবে নিজেদের মধ্যে তাঁরা “মুন্ডাদের সাদরী ভাষায়” কথা বলেন। পঞ্চায়েত-প্রধানকে বলা হয় “পাহান” বা “ডেহুরী”।

ভূমিজ

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বিহার ছেড়ে ভূমির সন্ধানে পূর্বদিকে এসে কৃষিকে পেশা করায় তাঁদের নাম হয় “ভূমিজ”, অর্থাৎ ভূমির সন্তান। বিশ শতকের প্রথম দিকে তাঁরা সিলেটে এসে চা-বাগানে কাজ শুরু করেন, এখন থাকেন শ্রীমঙ্গলে। নিজেদের মধ্যে মুন্ডারি বলেন। ধর্মে সনাতনপন্থী হিন্দু, তবে বরম দেওতা, ধরম দেওতা ও সিংবোঙ্গার মতো আদি দেবতার পূজাও চলে; আদিধর্মের পূজায় পুরোহিত নিজেদের “লাভা”।

কুর্মি

বাংলাপিডিয়া (লেখক সুভাষ জেংচাম) বলছে, উনিশ শতকের শেষার্ধে ব্রিটিশ চা-কর ও ব্যবসায়ীরা কুর্মিদের বিহার, পুরুলিয়া ও হাজারিবাগ থেকে সিলেটে এনে চা চাষে লাগান। এখন তাঁরা থাকেন সিলেট সদরের গুলনি ও রাখালগুল, গোয়াইনঘাটের রাধানগর, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গল এবং হবিগঞ্জের বাহুবলে। কুর্মিরা মূলত চা-শ্রমিক, চা ফ্যাক্টরিতেও কাজ করেন; সম্প্রতি ছোট ব্যবসা ও চাকরিতেও যাচ্ছেন। ভাষা বাংলা ও হিন্দির মিশ্রণ। গ্রামের নেতাকে বলে মোড়ল বা চৌধুরী।

সৌরা ও কন্দ

সরকারি তালিকায় এ দুটি নাম নেই, তবে ভাষাবিদদের লেখায় আছে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (মিন্টু দেশোয়ারা, 21 ফেব্রুয়ারি 2026) জানিয়েছে, মৌলভীবাজার ও সিলেটের কিছু চা-বাগানে সৌরা (সাভারা) সম্প্রদায় আছে। তাঁদের ভাষা অস্ট্রো-এশিয়াটিক, নিজস্ব লিপি “সোরাং সোমপেং”। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ভাষাটিকে 14টি বিপন্ন ভাষার একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। প্রায় 90 বছর বয়সী সামরা সৌরা বলেছেন, “আমি মারা গেলে ভাষাটাও মারা যাবে।” অধ্যাপক আসাদুজ্জামানের লেখায় সৌরাদের এলাকা শ্রীমঙ্গল উপজেলা, পেশা চা-বাগানের শ্রম। একই লেখায় কন্দ জনগোষ্ঠীর কথা আছে, যাঁরা 12টি উপজেলার 30টি চা-বাগানে ছড়িয়ে আছেন।

উপকূলের রাখাইনরা কোথায় থাকেন, কী নিয়ে বাঁচেন?

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী রাখাইনরা আঠারো শতকের শেষে আরাকান থেকে এসে উপকূলীয় কক্সবাজার ও পটুয়াখালীতে বসতি গড়েন। আর্কাইভের বরিশাল অঞ্চলের রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর ভূমি এবং সম্পদে অধিকারঃ বর্তমান প্রেক্ষিত ও করণীয় লেখা বলছে, 1784 সালে তাঁরা বরিশালের সর্বদক্ষিণের উপকূলে আসেন। তখন জায়গাটি ছিল জনমানবহীন বন। ব্রিটিশ সরকারের আনুকূল্যে তাঁরা বন পরিষ্কার করে জমি আবাদযোগ্য করেন, আর যাঁর দখলে যতটুকু জমি আসে, সরকার তাতে দখলীস্বত্ব দেয়। এভাবে গলাচিপা, কলাপাড়া, আমতলী ও বরগুনায় রাখাইন বসতি ছড়ায়।

জীবিকার কথা বাংলাপিডিয়ায় বিস্তারিত আছে: কৃষি ও মাছ শিকারের বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্য, নৌকা নির্মাণ, বৃক্ষ কর্তন ও তাঁত বোনা। কারিগরি পেশার নিজস্ব নামও আছে — “পেং থিং” (স্বর্ণকার), “পেং ফে” (কামার), “পেং পু” (কাঠের নকশাকার), “পেং রে” (রাজমিস্ত্রি), “পেং সী” (চিত্রকর)। রাখাইন ভাষা লেখা হয় নিজস্ব লিপিতে, বাংলাপিডিয়ার মতে লিপিটি আদি ব্রাহ্মী থেকে এসেছে। জলকেলি উৎসবের নাম বাংলাপিডিয়ায় “সাংগ্রেং”।

আজকের সংকট জমি। প্রথম আলো (13 জুন 2026) জানিয়েছে, সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটসের প্রতিনিধিদল কুয়াকাটা ও কলাপাড়ার মিশ্রিপাড়া, নয়াপাড়া, গোড়া আমখোলা পাড়া, কেরানীপাড়া ও মেথাওপাড়া ঘুরে দেখেছে। প্রভাবশালী স্থানীয়দের বিরুদ্ধে রাখাইনদের জমি ও শ্মশান দখলের অভিযোগ উঠেছে। কুয়াকাটার শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের জমি 1943 সালে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া প্রায় 2 একর 44 শতাংশ থেকে কমে প্রায় 65 শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ 2021 সালে ছআনি পাড়া উচ্ছেদ করে; সেই 6টি পরিবার এখনো পুনর্বাসিত হয়নি। ল্যান্ড ইজ লাইফের সতেজ চাকমা বলেছেন, “রাখাইন আদিবাসীরা জমি হারাতে হারাতে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।” কলাপাড়ার ইউএনও বলেছেন, স্থানীয় প্রশাসন রাখাইনদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট।

রাখাইন ও মারমাকে অনেক লেখায় এক জাতি ধরা হয়, কিন্তু উৎসগুলো দুটিকে আলাদা জাতি হিসেবে দেখায়। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ছকেও মারমা আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘরে, রাখাইন উপকূলের ঘরে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা) কারা থাকেন?

মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ছকে যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনার ঘরে আছে বাগদি (বুনো), রাজবংশী ও সাঁওতাল। বাংলাপিডিয়া মুন্ডাদের বসতি বলেছে বৃহত্তর যশোর ও খুলনায়ও। বাংলাপিডিয়ার মুন্ডা ভুক্তিতে এই অঞ্চলের কোনো উপজেলার নাম নেই।

বাংলাপিডিয়া (লেখক এস.এম মাহফুজুর রহমান) বাগদিদের পরিচয় দিয়েছে “দ্রাবিড় বংশোদ্ভূত নিম্নশ্রেণির কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী সম্প্রদায়” হিসেবে, যাঁদের মধ্যে “আদিবাসীসুলভ নানা বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান”। অঞ্চল ও উপশ্রেণি ভেদে পেশা আলাদা: কেউ মৎস্যজীবী, কেউ পালকিবাহক, কেউ চুনাপাথর উৎপাদক, কেউ চটের থলি প্রস্তুতকারক, কেউ তাঁতি। পুরোনো কাল থেকে বড় একটি অংশ দিনমজুর। হিন্দু সমাজে তাঁদের অবস্থান ধর্মীয়ভাবে সর্বনিম্ন স্তরে নির্ধারিত ছিল। সর্পদেবী মনসা তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

পাহাড়ের বাইরে, চাঁদপুর-কুমিল্লায় কি ত্রিপুরারা থাকেন?

হ্যাঁ। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ছকে বৃহত্তর কুমিল্লা (চাঁদপুর ও কুমিল্লা), রাজবাড়ী ও ফরিদপুর — এই তিন অঞ্চলের ঘরে একটিই নাম: ত্রিপুরা। বৃহত্তর চট্টগ্রামের ঘরেও ত্রিপুরা আছে। এ অংশের সূত্র বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ (2013)।

আর্কাইভের আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতি লেখায় আছে: “চাঁদপুরের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বর্তমান প্রজন্মের লোকেরা নিজের ভাষায় আর কথা বলতে পারে না।” পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরাদের ভাষা ককবরক। সমতলের ত্রিপুরাদের জীবিকা বা গ্রামের নাম কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। ত্রিপুরা জাতির সাধারণ পরিচিতি আছে ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায়।

সমতলের আদিবাসীরা কোন কোন ভাষায় কথা বলেন?

সমতলের জাতিগুলোর ভাষা অন্তত চারটি ভাষা-পরিবারের। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী অস্ট্রো-এশিয়াটিক পরিবারে খাসি, কোদা, মুন্ডারি ও সান্তালি; সিনো-টিবেটান পরিবারে গারো, কোচ, মৈতৈ মণিপুরি ও রাখাইন; ইন্দো-আর্য পরিবারে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, হাজং ও সাদ্রি; আর দ্রাবিড় পরিবারে কুড়ুখ ও সাউরিয়া পাহাড়িয়া। বাংলাপিডিয়ার পাহাড়িয়া ভুক্তিও বলছে, বাংলাদেশে দ্রাবিড়ভাষী জনগোষ্ঠী দুটি — পাহাড়িয়া ও ওরাওঁ।

লিপির অবস্থা আলাদা আলাদা। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা লিখেছেন, রাখাইন নিজস্ব লিপিতে লেখা হয়, গারো রোমান হরফে, আর সাদ্রি ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি বাংলা হরফে। হাজং লেখা হয় অসমীয়া হরফে (বাংলাপিডিয়া)। সাঁওতালি লিপি নিয়ে উপরে উল্লেখ করা অমিলটি আছে।

সাদরি একটু আলাদা ভূমিকা পালন করে। ডেইলি স্টার বাংলার 2023-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী সমতলের জাতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভাষা সাদরি। আদিবাসী পরিষদের তথ্য সম্পাদক মানিক সরেন সেখানে বলেছেন, সাদরি “একটি মিশ্র ভাষা”, আর সমতলের 7–8টি ভাষা এর মধ্যেই হারিয়ে গেছে। খাড়িয়ারাও নিজেদের মধ্যে সাদরি বলেন (বাংলাপিডিয়া)।

অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বাংলা সহ বাংলাদেশে 41টি ভাষা গুনেছেন, যার 14টি বিপন্ন। তাঁর মতে, “বাংলাদেশের কোনো আদিবাসী ভাষাই সরকারি পর্যায়ে ব্যবহৃত হয় না।” সরকারের মাতৃভাষায় শিক্ষা কর্মসূচির পরিকল্পনায় সমতলের ভাষাগুলোর ক্রম ছিল এরকম: প্রথম ধাপে গারো, সাদ্রি ও সাঁওতাল (সাঁওতাল পরে স্থগিত); দ্বিতীয় ধাপে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, মৈতৈ মণিপুরী ও খাসি; তৃতীয় ধাপে কোচ, কুড়ুক (ওঁরাও), হাজং ও রাখাইন (মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা)। পাহাড়ের ভাষাগুলোর কর্মসূচি নিয়ে আছে আমাদের পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা লেখা।

সমতলের আদিবাসীরা জমি হারাচ্ছেন কেন, আর আলাদা ভূমি কমিশনের দাবি কী?

পার্বত্য চট্টগ্রামের জমির বিরোধ মেটানোর জন্য আইনে একটি ভূমি কমিশন আছে। সমতলের জন্য এমন কোনো কমিশন নেই। 25 জানুয়ারি 2026 কাপেং ফাউন্ডেশন ও ইন্ডিজেনাস পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেসের সেমিনারে মূল বক্তা উজ্জ্বল আজিম পাঁচ দফা দাবির একটি হিসেবে বলেছেন “সমতলের জাতিসত্তার মানুষের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন” (প্রথম আলো)। ঠাকুরগাঁওয়ে কোচ-রাজবংশী-বর্মণ সংগঠনও 2022 সালে একই দাবি তুলেছিল।

এই লেখায় পড়া উৎসগুলো জমির প্রশ্নকে দুই ধরনে দেখায়। একদিকে আছে বিবরণমূলক তথ্য: বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ডালুদের শতকরা 90 ভাগ ভূমিহীন; কোচদের অধিকাংশ ভূ-সম্পত্তি না থাকায় প্রান্তিক চাষি; আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী গারোদের অনেকের দখলে জমি থাকলেও দলিল নেই। অন্যদিকে আছে নির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে অভিযোগ, যা সংবাদমাধ্যমে এসেছে কিন্তু আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে উৎসে নেই: কুলাউড়ার ইছাছড়া পুঞ্জিতে খাসিদের উচ্ছেদচেষ্টা, কলাপাড়ায় রাখাইনদের জমি ও শ্মশান দখল, রাজশাহীর মোল্লাপাড়ায় পাহাড়িয়াদের উচ্ছেদচেষ্টা।

আর্কাইভের রাখাইন-বিষয়ক লেখাটি একটি ঐতিহাসিক কারণও দেখায়। রাখাইনরা যে জমি আবাদ করেছিলেন, তার মালিকানা এসেছিল ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া দখলীস্বত্ব থেকে। সেই প্রথাগত অধিকার পরে কাগজে কীভাবে টিকল বা টিকল না, সেখান থেকেই আজকের বিরোধ। গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালদের জমি বা মধুপুরের বন মামলার মতো আলাদা আলাদা ঘটনা এই লেখার বিষয় নয়; সেগুলোর প্রতিটি নিজের উৎস ধরে আলাদা লেখার দাবি রাখে।

মুক্তিযুদ্ধে সমতলের আদিবাসী জাতিগুলোর ভূমিকা কী ছিল?

আমাদের আর্কাইভের মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীঃ মহাকাব্যের অগ্রন্থিত কবিতা লেখা অনুযায়ী দিনাজপুরের ওরাওঁ ও সাঁওতাল মিলে প্রায় 1000 জনের একটি মুক্তিবাহিনী সেই এলাকায় লড়েছিল। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর ও নেত্রকোনার গারো, হাজং, কোচ, ডালু প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর প্রায় 1500 মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

জাতি ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনের বিবরণ আছে আলাদা লেখায়: ওরাওঁ, কোচ, গারো, বর্মণ, আর মাহাতো, মুন্ডা, পাহান, পাত্র ও খাসিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা লেখায়। এই লেখাগুলোর অনেকগুলোতেই যুদ্ধের পরের জীবনের কথা আছে — জমি নেই, দিনমজুরি, কৃষিশ্রম। সমতলের জীবিকা নিয়ে এগুলো কিছু ব্যক্তিগত সাক্ষ্য দেয়, যদিও প্রতিটিই একজন মানুষের গল্প।

প্রশ্নোত্তর

সমতলের আদিবাসী কতটি জাতি?

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০-এর সংশোধিত তফসিলে মোট 50টি জাতির নাম আছে। এর 11টি পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনে নাম ধরে থাকা জাতি; বাকি 39টির প্রায় সবার বসতি সমতলে। রাজবংশী, পাহান ও সিংয়ের মতো কিছু জাতি নিজেদের আলাদা জাতি হিসেবে পরিচয় দিলেও এই তালিকায় নেই।

সাঁওতালরা কোথায় থাকেন?

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী সাঁওতালদের বাসস্থান মূলত রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়ায়। 1881 সালের আদমশুমারিতে পাবনা, যশোর, খুলনা ও চট্টগ্রামে অল্প কিছু বসতি ছিল। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ভাষা-অঞ্চলের ছকে সিলেট অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং যশোর-সাতক্ষীরা-খুলনাতেও সাঁওতালদের নাম আছে।

গারোরা কোথায় বাস করে?

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী গারোরা থাকেন টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও গাজীপুরে। সবচেয়ে বেশি থাকেন হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও মধুপুরে। ভারতের মেঘালয়েও গারোরা থাকেন। তাঁরা নিজেদের “আচিক্ মান্দে” বলতে পছন্দ করেন।

খাসিয়ারা কোথায় বাস করে, কী চাষ করে?

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী খাসিয়ারা থাকেন সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, ছাতক ও সদরে, সিলেটের গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরে, আর মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়। পান, কলা, আনারস, কমলা, তেজপাতা ও গোলমরিচ উৎপাদনে তাঁরা বহুকাল ধরে অভ্যস্ত। সীমান্তের বাজারে বেচাকেনা করেন খাসিয়া নারীরা।

হাজংদের আদিবাস কোথায়, এখন কোথায় থাকেন?

বাংলাপিডিয়া বলছে, নৃবিজ্ঞানীদের মতে হাজংদের আদিনিবাস উত্তর বার্মায়। পরে তাঁরা আসামের কামরূপের হাজোতে বসতি গড়েন, সপ্তদশ শতকে মুগলদের হাতে বিতাড়িত হয়ে গারো পাহাড়ে আশ্রয় নেন। এখন প্রধান বসবাস শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নালিতাবাড়ী, সুসং দুর্গাপুর ও কলমাকান্দায়।

রাজবংশীরা কোথায় বাস করে, তারা কি সরকারি তালিকায় আছে?

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী রাজবংশীদের বসবাস প্রধানত রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহীতে, অল্প সংখ্যায় বগুড়া ও ময়মনসিংহে। তাঁরা মূলত কৃষিজীবী, মাছ ধরা ও মাছ বিক্রিও তাঁদের পেশা। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনের 50টি নামের তালিকায় “রাজবংশী” নাম নেই।

মণিপুরীরা বাংলাদেশের কোন জেলায় থাকেন?

জুমজার্নালের আর্কাইভের তথ্যচিত্র অনুযায়ী মণিপুরীরা এখন কেবল সিলেট বিভাগে থাকেন — মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে। মোট বসতির অর্ধেকের বেশি মৌলভীবাজারে, সবচেয়ে বেশি কমলগঞ্জে। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মৈতৈ পাঙালরা থাকেন মূলত কমলগঞ্জে এবং সিলেট সদরের খাদিমপাড়ায়।

রাখাইনরা কবে, কোথায় বসতি গড়েন?

বাংলাপিডিয়া বলছে, রাখাইনরা আঠারো শতকের শেষে আরাকান থেকে এসে কক্সবাজার ও পটুয়াখালীতে বসতি গড়েন। জুমজার্নালের আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী 1784 সালে তাঁরা বরিশালের দক্ষিণ উপকূলে আসেন, বন পরিষ্কার করে জমি আবাদ করেন, আর গলাচিপা, কলাপাড়া, আমতলী ও বরগুনায় বসতি ছড়ায়।

চা-বাগানে কোন কোন আদিবাসী জাতি কাজ করেন?

বাংলাপিডিয়ায় চা-বাগানের তিনটি জাতির ভুক্তি আছে: খাড়িয়া (শ্রীমঙ্গল, ব্রিটিশ আমলে আসেন), ভূমিজ (শ্রীমঙ্গল, বিশ শতকের শুরুতে আসেন) ও কুর্মি (সিলেট, কুলাউড়া, শ্রীমঙ্গল, বাহুবল; উনিশ শতকের শেষার্ধে আনা হয়)। মুন্ডা, সাঁওতাল, সৌরা ও কন্দদেরও চা-বাগানে থাকার কথা বিভিন্ন উৎসে আছে।

ওরাওঁদের ভাষা কী, এটি কি বাংলার আত্মীয়?

ওরাওঁদের ভাষা কুড়ুখ। এটি দ্রাবিড় পরিবারের ভাষা, বাংলার মতো ইন্দো-আর্য নয়। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, ভাষার দিক থেকে ওরাওঁরা কুরুক ও শাদরী — এই দুই ভাগে বিভক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান 2025 সালে কুড়ুখকে বিপন্ন ভাষার তালিকায় রেখেছেন।

সমতলের কোন জাতিগুলো নিজের ভাষা হারিয়েছে?

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ডালুরা এখন বাংলায় কথা বলেন, একসময় মণিপুরী বলতেন। জুমজার্নালের আর্কাইভ বলছে সমতলের বর্মণ ও কোচরা ভাষা হারিয়েছেন (কোচদের নিজস্ব ভাষা থাকার কথা বাংলাপিডিয়া বলেছে)। জয়পুরহাটের পাহান, মালো ও মাহাতো শিশুদের বেশিরভাগ নিজেদের ভাষা বলতে পারে না (ডেইলি স্টার বাংলা, 2023)।

সমতলের আদিবাসীদের জন্য আলাদা ভূমি কমিশনের দাবি কারা করছেন?

25 জানুয়ারি 2026 কাপেং ফাউন্ডেশন ও ইন্ডিজেনাস পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেসের সেমিনারে মূল বক্তা উজ্জ্বল আজিম সমতলের জাতিসত্তার জন্য পৃথক ভূমি কমিশনের দাবি তোলেন (প্রথম আলো)। এর আগে 24 আগস্ট 2022 ঠাকুরগাঁওয়ে বাংলাদেশ কোচ-রাজবংশী-বর্মণ সংগঠনের মানববন্ধনেও একই দাবি ছিল (ডেইলি স্টার বাংলা)।

যা এখনো জানা যায়নি

  • সরকারি তালিকার বড়ইক, বেদিয়া, ভিল, ভূইমালী, গোরাইত, গঞ্জু, হো, খারোয়ার, লোহার, মুশোর, রাজোয়ার, সাবার, তেলি ও তুরি — এই জাতিগুলোর জেলা, ভাষা বা জীবিকার কোনো বিবরণ পড়া উৎসগুলোতে পাওয়া যায়নি। অধ্যাপক আসাদুজ্জামানের লেখায় রাজোয়ার ভাষাকে বিলুপ্ত বলা হয়েছে, এটুকুই।
  • পাহান, সিং, ভুনজার ও কড়াদের সম্পর্কে কেবল কয়েকটি প্রতিবেদনে নাম ও গ্রামের উল্লেখ আছে; ভাষা ও সমাজের বিবরণ পাওয়া যায়নি।
  • মণিপুরী ও মুন্ডাদের জীবিকা নিয়ে কোনো উৎসে বিবরণ পাওয়া যায়নি।
  • উত্তরবঙ্গের মাহাতো আর সিলেটের কুর্মি একই জাতি কি না; ময়মনসিংহ-গাজীপুরের বর্মন আর ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়ের বর্মণ একই জাতি কি না; কমলগঞ্জের চা-বাগানের পাত্র আর সিলেটের লালেং একই কি না — কোনো উৎসে স্পষ্ট বলা নেই।
  • সাঁওতালি ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে কি না, তা নিয়ে উৎসগুলো একমত নয়; লিপি বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত না হওয়ায় মাতৃভাষায় শিক্ষার কর্মসূচিতে সাঁওতালির কাজ স্থগিত হয়েছিল।
  • পাত্রদের গ্রামের সংখ্যা: বাংলাপিডিয়া বলছে 19টি, অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বলছেন 23টি।
  • মাহালিদের জেলা, অভিবাসনের সময় ও বর্ণমালা নিয়ে তথ্য মূলত একটি ইংরেজি উইকিপিডিয়া নিবন্ধ ও একটি সংবাদ-ফিচার থেকে এসেছে; কোনো বাংলা বিশ্বকোষীয় উৎস পাওয়া যায়নি।
  • সমতলের ত্রিপুরাদের গ্রাম ও জীবিকার বিবরণ পাওয়া যায়নি।
  • বাংলাপিডিয়ার অনেক ভুক্তিতে তারিখ নেই, আর সেগুলোর তথ্য কোন সময়ের জরিপ থেকে নেওয়া তা জানা যায়নি।

তথ্যসূত্র

জুমজার্নালের আর্কাইভ

  1. মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষা : এ যেন আলো আঁধারি পথ রেখায় অন্তহীন পদযাত্রা, জুমজার্নাল।
  2. সপ্তর্ষি দেওয়ান (অনুবাদ), আমাদের আদিবাসী ভাষাগুলোর বর্তমান অবস্থা, জুমজার্নাল, 2020।
  3. আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতি, জুমজার্নাল, 2021।
  4. বাংলাদেশের মণিপুরী : এক সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র, জুমজার্নাল, 2020।
  5. বাংলাদেশের মণিপুরী মুসলিম, জুমজার্নাল।
  6. বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা আন্দোলনের কথা, জুমজার্নাল।
  7. গারো ইতিহাস ও সংস্কৃতি, জুমজার্নাল।
  8. বরিশাল অঞ্চলের রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর ভূমি এবং সম্পদে অধিকারঃ বর্তমান প্রেক্ষিত ও করণীয়, জুমজার্নাল।
  9. আদিবাসী ওরাওঁ মুক্তিযোদ্ধা; আদিবাসী কোচ মুক্তিযোদ্ধা; মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের অবদান; আদিবাসী বর্মণ মুক্তিযোদ্ধা; বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা, জুমজার্নাল।
  10. মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীঃ মহাকাব্যের অগ্রন্থিত কবিতা, জুমজার্নাল।
  11. সাঁওতাল, সান্তাল, সান্থাল, সাঁওতাড়, সান্তাড় নাকি সাতাড়?; সাঁওতালি ভাষা শিক্ষা; সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল ও প্রভাব; চা-শ্রমিকদের মুল্লুকে চলো আন্দোলনঃ একটি অলিখিত আখ্যান; ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত, জুমজার্নাল।

বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি)

  1. ভুক্তি: সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুন্ডা, পাহাড়িয়া, রাজবংশী, গারো, হাজং, কোচ, ডালু, খাসিয়া, মণিপুরী, পাত্র, খাড়িয়া, ভূমিজ, কুর্মি, রাখাইন, বাগদি।

সংবাদমাধ্যম, গবেষণা ও অন্যান্য

  1. কংকন কর্মকার, বিলুপ্তির পথে উত্তরাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভাষা, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 21 ফেব্রুয়ারি 2023।
  2. ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, দেশে হারিয়ে যাচ্ছে যে কয়েকটি ভাষা, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 1 মার্চ 2025।
  3. কোচ-রাজবংশী-বর্মণদের অধিকার নিশ্চিতের দাবি, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 25 আগস্ট 2022।
  4. মিন্টু দেশোয়ারা, কুলাউড়ার খাসিয়াদের ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধান চায় নাগরিক প্রতিনিধি দল, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 23 নভেম্বর 2020।
  5. মিন্টু দেশোয়ারা, প্রবীণ সামরার সঙ্গেই কি হারিয়ে যাবে মৌলভীবাজারের সৌরা ভাষা?, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 21 ফেব্রুয়ারি 2026।
  6. ক্ষুদ্র জাতিসত্তার উন্নয়নে জাতীয় নীতি তৈরির তাগিদ, প্রথম আলো, 26 জানুয়ারি 2026।
  7. কুয়াকাটা-কলাপাড়ায় রাখাইন জনগোষ্ঠীর সমস্যা সরেজমিনে দেখল নাগরিক প্রতিনিধিদল, প্রথম আলো, 13 জুন 2026।
  8. রাজশাহীতে পাহাড়িয়াদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদচেষ্টার প্রতিবাদে মানববন্ধন, প্রথম আলো, 6 সেপ্টেম্বর 2025।
  9. দেশে গেজেটভুক্ত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কতটি লোকসংখ্যা কত, জানালেন মন্ত্রী, বাংলা ট্রিবিউন, 25 জুন 2026।
  10. সালেক খোকন, আদিবাসী জীবনকথা: বর্ণহীন ভাষার ছন্দ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, 26 ডিসেম্বর 2023।
  11. Mahali people ও Laleng, ইংরেজি উইকিপিডিয়া (দেখা হয়েছে 16 অক্টোবর 2026)।
  12. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, Population and Housing Census 2022, National Report Vol. I, নভেম্বর 2023 (ইন্টারনেট আর্কাইভ কপি)।

সর্বশেষ হালনাগাদ: 16 অক্টোবর 2026

 

প্রসঙ্গ:ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, গারো, মণিপুরী, রাখাইন, সাঁওতাল

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা