Last updated Oct 17th, 2026
1

মুন্ডা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের সমতলের একটি অস্ট্রো-এশীয় শিকড়ের আদিবাসী জাতি, যাঁদের পূর্বপুরুষদের আদি বাসভূমি ভারতের ছোটনাগপুর মালভূমি, রাঁচি যার কেন্দ্র। জনশুমারি 2022 অনুযায়ী দেশে মুন্ডা 60,201 জন, এবং তাঁদের সিংহভাগ থাকেন সুন্দরবনে নয়, নওগাঁ-রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল ও হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজারের চা-বাগানে। সুন্দরবনঘেঁষা সাতক্ষীরা ও খুলনায় থাকেন তিন হাজারের সামান্য বেশি; অথচ মুন্ডাদের নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বেশিরভাগই এই ছোট দলটিকে নিয়ে।
2026 সালের সেপ্টেম্বরে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দাতিনাখালি মুন্ডাপাড়ায় পাঁচ দিনের কারাম উৎসব শেষ হয় একটি পিপুলগাছের ডাল পুঁতে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী উপকূলের লবণাক্ততা আর গরমে সেখানে কারামগাছ টেকে না; গাছ আনতে হয় জয়পুরহাট থেকে, আর এবার সেটিও সময়মতো পৌঁছায়নি। জয়পুরহাট থেকে শ্যামনগর — এই একটি গাছের যাত্রাই বাংলাদেশের মুন্ডাদের মানচিত্রটা দেখিয়ে দেয়: উত্তরের বরেন্দ্র আর দক্ষিণের সুন্দরবন, মাঝখানে কয়েকশ কিলোমিটার, আর দুই জায়গার মানুষ একই উৎসবের সুতোয় বাঁধা।
এই লেখা চারটি প্রশ্নের উত্তর দেয়: মুন্ডা কারা, বাংলাদেশে কোথায় ও কতজন, কোন ভাষায় কথা বলেন ও কোন ধর্ম মানেন, আর রাঁচি থেকে সুন্দরবনে আসার ইতিহাস ও আজকের অবস্থা কী। যেখানে উৎস ভারতের মুন্ডাদের কথা বলছে, সেখানে তা আলাদা করে বলা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের অন্যান্য জাতির লেখাগুলো পাওয়া যাবে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আদিবাসী বিষয়ক মূল পাতায়।
এই লেখায়
মুন্ডারা ভারতের ঝাড়খণ্ড-বিহারের ছোটনাগপুর অঞ্চলের আদি অধিবাসী একটি জাতি, যাঁদের ভাষা অস্ট্রো-এশীয় পরিবারের মুন্ডা শাখার। বাংলাদেশে তাঁরা এসেছেন মূলত ব্রিটিশ আমলে, শ্রমিক হিসেবে — দক্ষিণ-পশ্চিমে বন কেটে আবাদ করতে, উত্তরে কৃষি ও নীলকুঠির কাজে, আর সিলেটে চা-বাগানে। সরকারি তালিকায় তাঁরা স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী।
ইংরেজি বাংলাপিডিয়া (লেখক এনামুল হক) দক্ষিণ-পশ্চিমের মুন্ডাদের সম্পর্কে লিখেছে, তাঁরা প্রায় দুইশ বছর আগে বিহারের রাঁচি ও ছোটনাগপুর থেকে জমিদারদের জমি আবাদযোগ্য করার কাজে এসেছিলেন, আর স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিলেন “বুনো” বা জঙ্গল-সাফকারী নামে। একই ভুক্তি উত্তরের মুন্ডাদের সম্পর্কে বলে, তাঁরা ভারতের রাজমহল পাহাড় থেকে এসে রাজশাহী জেলার উত্তরাংশে বসতি গড়েন এবং কৃষি, নীলকুঠি ও চা-বাগানে কাজ করতেন। অর্থাৎ এক উৎসেই দুটি আলাদা আগমন-পথের কথা আছে।
নামটির বানান নিয়ে একটু বলা দরকার। বাংলা বাংলাপিডিয়া লেখে “মুন্ডা”; জুমজার্নালের ই-বুক সংগ্রহের দুটি বই — তপন কুমার দে সম্পাদিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা ও সালেক খোকনের আদিবাসী মিথ এবং অন্যান্য — লেখে “মুণ্ডা”। দুটিই চালু। সুন্দরবন অঞ্চলের মুন্ডারা নিজেদের “হোরোকো” বলেন, যার অর্থ “মানুষ” — দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (এপ্রিল 2026) এটি জানিয়েছে, আর একই প্রতিবেদন বলছে আশপাশের সমাজ তাঁদের “বুনো” বলে ডাকে, যে শব্দে অবজ্ঞা মেশানো। হাবিবুল্লাহ ও হোসেনের 2025 সালের গবেষণা যোগ করেছে আরও দুটি ডাকনাম — “কুলি” ও “সর্দার” — এবং লিখেছে, স্থানীয়রা এই নামগুলো হীন অর্থে ব্যবহার করেন।
ভারতের মুন্ডাদের ইতিহাসের সবচেয়ে পরিচিত অধ্যায়টি বাংলাদেশের মুন্ডাদের ইতিহাস নয়, তবে প্রেক্ষাপট হিসেবে জরুরি। বাংলাপিডিয়ার “Munda Rebellion” ভুক্তি অনুযায়ী বিরসা মুন্ডা 1899–1900 সালে রাঁচির দক্ষিণে “উলগুলান” বা “মহা-বিক্ষোভ” নামে পরিচিত আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ভুক্তিটি বিরসার জীবৎকাল দিয়েছে 1874–1900; ইংরেজি উইকিপিডিয়া দিয়েছে 15 নভেম্বর 1875 – 9 জুন 1900। এটি পুরোপুরি ভারতের ঘটনা; বাংলাদেশে আসা মুন্ডাদের কোনো দল এতে জড়িত ছিল, এমন তথ্য কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
আমাদের আর্কাইভের দুটি লেখায় মুন্ডাদের বৃহত্তর আত্মীয়তার কথা আছে। “সাঁওতাল, সান্তাল, সান্থাল, সাঁওতাড়, সান্তাড় নাকি সাতাড়?” লেখাটি একটি সাঁওতালি গ্রন্থ উদ্ধৃত করে জানায়, একসময় সাঁওতাল, মুন্ডা, কুড়মি, বিরহড়সহ বহু জাতি নিজেদের “খারওয়ার” নামে পরিচয় দিত; আর বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষা নিয়ে লেখাটি মুন্ডারিকে খাসি, কোদা, প্নার ও সান্তালির সঙ্গে অস্ট্রো-এশীয় পরিবারে রেখেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি 2022-এর চূড়ান্ত জাতীয় প্রতিবেদনে মুন্ডা 60,201 জন — পুরুষ 29,773, নারী 30,428। দেশের মোট ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনসংখ্যার এটি 3.65%। 2022 সালের আগস্টে প্রকাশিত প্রাথমিক প্রতিবেদনে সংখ্যাটি ছিল 60,191 (পুরুষ 29,764, নারী 30,427)।
চূড়ান্ত সংখ্যাটি জাতীয় প্রতিবেদনের (National Report Vol. I) সারণি P29 থেকে, প্রাথমিক সংখ্যাটি প্রাথমিক প্রতিবেদনের সারণি A-1.4 (পৃ. 33) থেকে। শুমারিতে জাতিগোষ্ঠী কীভাবে গোনা হয় এবং তার সীমা কোথায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আছে আমাদের “১৬ লাখ না ৩০ লাখ — জনশুমারিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গোনা হয় কীভাবে” লেখায়। পঞ্চাশটি জাতির পূর্ণ জেলাভিত্তিক হিসাব থাকছে “জনশুমারি ২০২২: ৫০ জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা, জেলা ধরে ধরে” লেখায়।
| বিভাগ | মুন্ডা জনসংখ্যা | দেশের মুন্ডাদের % |
|---|---|---|
| রাজশাহী | 32,595 | 54.1 |
| সিলেট | 22,125 | 36.8 |
| খুলনা | 3,179 | 5.3 |
| রংপুর | 1,576 | 2.6 |
| চট্টগ্রাম | 477 | 0.8 |
| ঢাকা | 233 | 0.4 |
| ময়মনসিংহ | 11 | 0.02 |
| বরিশাল | 5 | 0.01 |
| মোট | 60,201 | 100 |
ছকটি এক নজরে দেখায়, দেশের দশজন মুন্ডার নয়জনই রাজশাহী ও সিলেট বিভাগে। খুলনা বিভাগ, যার ভেতরে সুন্দরবন, সেখানে মুন্ডা মাত্র 3,179 জন — জাতীয় মোটের 5.3%। “রাঁচি থেকে সুন্দরবন” গল্পটি সত্য, কিন্তু বাংলাদেশের মুন্ডাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের গল্প এটি নয়।
বেসরকারি হিসাবগুলো শুমারির সঙ্গে মেলে না, এবং নিজেদের মধ্যেও মেলে না। দ্য ডেইলি স্টারে (21 ফেব্রুয়ারি 2021) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাশরুর ইমতিয়াজ বলেছেন, মুন্ডারি ভাষার জনগোষ্ঠী প্রায় 40,000, যদিও প্রকৃত বক্তা তার চেয়ে অনেক কম; ইউসিএ নিউজ (আগস্ট 2022) লিখেছে দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম মিলিয়ে প্রায় 40,000 মুন্ডা; ঢাকা ট্রিবিউনে (12 এপ্রিল 2023) এক এনজিও-প্রধানের উদ্ধৃতি: সারা দেশে 15,000–20,000। শুমারির 60,201 এই তিনটির চেয়েই বেশি। ইংরেজি বাংলাপিডিয়ার “কিছু বেসরকারি সংস্থার মতে দেশে 212টি মুন্ডা পরিবার” বাক্যটির সাল উল্লেখ নেই, এবং প্রসঙ্গ দেখে এটি কেবল দক্ষিণ-পশ্চিমের হিসাব বলে মনে হয় [যাচাই প্রয়োজন]।
জেলাভিত্তিক শুমারি-প্রতিবেদন দেখায়, দেশের মুন্ডাদের প্রায় 42% একটি জেলাতেই — নওগাঁয় (25,194 জন)। এরপর হবিগঞ্জ (13,152) ও মৌলভীবাজার (8,158), দুটিই চা-বাগানের জেলা। সুন্দরবনঘেঁষা সাতক্ষীরা (2,148) ও খুলনা (924) মিলিয়ে 3,072 জন। নিচের ছকের বারোটি জেলায় থাকেন দেশের 57,157 জন মুন্ডা, অর্থাৎ 95%।
| জেলা | বিভাগ | মুন্ডা | যে উপজেলাগুলোতে বেশি |
|---|---|---|---|
| নওগাঁ | রাজশাহী | 25,194 | নিয়ামতপুর 7,965; মহাদেবপুর 5,799; বদলগাছী 3,640; ধামইরহাট 2,392; পত্নীতলা 2,154; মান্দা 1,690; পোরশা 1,148 |
| হবিগঞ্জ | সিলেট | 13,152 | চুনারুঘাট 10,304; মাধবপুর 2,341; বাহুবল 361; নবীগঞ্জ 139 |
| মৌলভীবাজার | সিলেট | 8,158 | জুড়ী 2,586; কমলগঞ্জ 2,409; শ্রীমঙ্গল 1,417; বড়লেখা 883; কুলাউড়া 388; রাজনগর 377 |
| জয়পুরহাট | রাজশাহী | 3,489 | পাঁচবিবি 1,568; জয়পুরহাট সদর 1,417; আক্কেলপুর 500 |
| সাতক্ষীরা | খুলনা | 2,148 | শ্যামনগর 1,724; তালা 421 |
| রাজশাহী | রাজশাহী | 1,645 | গোদাগাড়ী 1,290; তানোর 334 |
| খুলনা | খুলনা | 924 | কয়রা 920 |
| দিনাজপুর | রংপুর | 888 | বিরামপুর 507; বীরগঞ্জ 228; বিরল 104 |
| সিলেট | সিলেট | 811 | গোয়াইনঘাট 444; সিলেট সদর 237; কোম্পানীগঞ্জ 83 |
| চাঁপাইনবাবগঞ্জ | রাজশাহী | 740 | নাচোল 622; গোমস্তাপুর 118 |
| সুনামগঞ্জ | সিলেট | 6 | — |
| যশোর | খুলনা | 2 | — |
বাকি 3,044 জন ছড়িয়ে আছেন এমন জেলাগুলোতে, যাদের প্রতিবেদন এই লেখার জন্য পড়া হয়নি — রাজশাহী বিভাগের বগুড়া, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জে (বিভাগের হিসাব থেকে 1,527 জন বাকি থাকে), রংপুর বিভাগের দিনাজপুর ছাড়া অন্য জেলাগুলোতে (688), খুলনা বিভাগের অন্য জেলাগুলোতে (105), চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগে (710) এবং ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগে (16)। একটি অসংগতিও আছে: সিলেট বিভাগের চার জেলার প্রতিবেদন যোগ করলে দাঁড়ায় 22,127, কিন্তু জাতীয় প্রতিবেদনের সারণি P29 বিভাগটির জন্য দেয় 22,125। দুই সংখ্যার পার্থক্য দুইজন।
জেলার ছবিটা উৎসগুলোর বর্ণনার সঙ্গে মেলে, তবে অনুপাত অনেক কিছু বদলে দেয়। বাংলা বাংলাপিডিয়া মুন্ডাদের বসতি বলেছে “উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল, সিলেট জেলার চা বাগান এবং বৃহত্তর যশোর এবং খুলনা জেলা”য়। তালিকার ক্রম ঠিক আছে; কিন্তু শুমারি অনুযায়ী বৃহত্তর যশোরে মুন্ডা প্রায় নেই, আর বৃহত্তর খুলনার মুন্ডারা প্রায় সবাই সাতক্ষীরার শ্যামনগর-তালা ও খুলনার কয়রায়।
আমাদের আর্কাইভের “জাতীয় অস্তিত্ব সংরক্ষণে মাতৃভাষার ভূমিকা” লেখায় মুন্ডাদের নাম এসেছে তিনটি অঞ্চলের তালিকায় — উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ ও সিলেট। শুমারির জেলা-চিত্র সেই তিন অঞ্চলকেই নিশ্চিত করে।
দক্ষিণ-পশ্চিমের মুন্ডাদের আগমন নিয়ে উৎসগুলো একমত যে তাঁদের আনা হয়েছিল সুন্দরবনের জঙ্গল কেটে বসতি ও আবাদযোগ্য জমি তৈরির কাজে, আর এনেছিলেন জমিদার বা ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ। কবে এলেন, সেখানে মতভেদ: বিভিন্ন উৎস বলছে 200, 220, 250 ও 300 বছর আগে। কোনো উৎসই নির্দিষ্ট সাল, জমিদারের নাম বা নথি দেয়নি।
| উৎস | কত বছর আগে | কে আনল, কেন |
|---|---|---|
| বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি) | প্রায় 200 | জমিদারদের জমি আবাদযোগ্য করতে; রাঁচি ও ছোটনাগপুর থেকে |
| দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, এপ্রিল 2026 | মোটামুটি 200 (“It is said”) | ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ, বাঘ-অধ্যুষিত জঙ্গল সাফ করতে |
| ক্লাইমেট হোম নিউজ, নভেম্বর 2020 | দুই শতাব্দী | জমিদারদের জন্য জমি উদ্ধার, দিঘি-পুকুর খনন; বিহার থেকে |
| আল মাহমুদ, JIKAP 2026 | প্রায় 220 | জমিদার বা রাজবাড়ির লাঠিয়াল; পরে নীলচাষ ও বন সাফের কাজে |
| প্রথম আলো, মে 2016 (সামসের তথ্য) | প্রায় 250 | সুন্দরবন কেটে আবাসভূমি গড়তে; ঝাড়খণ্ড থেকে |
| বাংলা ট্রিবিউন, ডিসেম্বর 2025 (সামসের তথ্য) | প্রায় 250 | একই |
| ঢাকা ট্রিবিউন, মে 2020 | প্রায় 300 | উল্লেখ নেই |
| দত্ত ও রহমান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় স্টাডিজ 2022 | 300-এর বেশি | ব্রিটিশ আমলে নীলকুঠির শ্রমিক, বন-সাফকারী ও জমিদারের লাঠিয়াল হিসেবে “জোর করে” আনা |
ছকের সবচেয়ে বিস্তারিত বিবরণটি আল মাহমুদের, যিনি শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জে 16টি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তাঁর লেখায় ধাপগুলো এরকম: ব্রিটিশ আমলে মুন্ডারা প্রথমে লাঠিয়াল বা রাজবাড়ির রক্ষী হিসেবে কাজ করতেন; নীলচাষ শুরু হলে নীলকরেরা তাঁদের মাঠের কাজে নেন; আঠারো শতকের শেষ ও উনিশ শতকের শুরুতে জমিদারি ব্যবস্থায় জমিদারেরা সুন্দরবনের বিশাল এলাকা ইজারা নেন, আর বন সাফের পর চাষ শুরু করতে মুন্ডাদের আনা হয়। দারিদ্র্যও একটি চালিকা শক্তি ছিল বলে তিনি ফাদার লুইজি পাজ্জির 2003 সালের লেখা উদ্ধৃত করেছেন।
মুখের ইতিহাসেও একই গল্প। বাংলা ট্রিবিউনকে (ডিসেম্বর 2025) শ্যামনগরের রমজাননগরের 79 বছর বয়সী রনজিত মুন্ডা বলেছেন, “আমাদের আসল বাড়ি রাঁচি। জমিদাররা এনে সুন্দরবন পরিষ্কার করিয়েছিল।” প্রথম আলোর 2022 সালের একটি কলামে সঞ্জীব দ্রং ভিন্ন সুরে লিখেছেন, ব্রিটিশ আসার “বহু বহু বছর আগে থেকে” মুন্ডারা সুন্দরবনে বসতি গড়েছিলেন — এটি একজন কলাম লেখকের মন্তব্য, কোনো সূত্র উল্লেখ নেই, আর অন্য সব উৎসের সঙ্গে মেলে না।
ছোটনাগপুর থেকে কেন মানুষ বেরিয়ে আসছিলেন, তার ভারতীয় প্রেক্ষাপট দিয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন: সেখানে মুন্ডারা “খুঁটকাট্টি” ব্যবস্থায় গোত্রভিত্তিক যৌথ মালিকানায় জমি ভোগ করতেন; ব্রিটিশরা জমিদারি ব্যবস্থা চাপায়, 1894 সালের মধ্যে বনে আদিবাসীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়, আর বহিরাগত “দিকু”রা জমি দখল করে মুন্ডাদের মজুরে পরিণত করে। আল মাহমুদ পাজ্জিকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, 1790 থেকে 1832 সালের মধ্যে মুন্ডারা জমিদারদের বিরুদ্ধে বহুবার বিদ্রোহ করেছিলেন। এই বিবরণগুলো ভারতের মুন্ডাদের; বাংলাদেশে আসা কোন দলটি কোন ধাক্কায় বেরিয়েছিল, তা আলাদা করে জানা যায়নি।
শুমারি অনুযায়ী দক্ষিণ-পশ্চিমের মুন্ডারা তিনটি উপজেলায় কেন্দ্রীভূত: সাতক্ষীরার শ্যামনগর (1,724), খুলনার কয়রা (920) ও সাতক্ষীরার তালা (421)। স্থানীয় সংগঠনের হিসাব সবসময়ই শুমারির চেয়ে বড় — শুধু শ্যামনগরেই সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থা (সামস) বিভিন্ন সময়ে 2,300 থেকে 3,000 জনের কথা বলেছে।
পুরনো তালিকাগুলোতে আরও কয়েকটি উপজেলার নাম আসে। ইংরেজি বাংলাপিডিয়া লিখেছে, স্থানীয় গণনায় খুলনার কয়রা ও ডুমুরিয়া এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর, দেবহাটা ও তালার বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোতে 1,163 জন মুন্ডা থাকেন; সালটি দেওয়া নেই। শুমারি 2022 ডুমুরিয়ায় পেয়েছে একজন মুন্ডা, আর দেবহাটা ও আশাশুনিতে একজনও নয়। বাংলাপিডিয়ার তালিকা সম্ভবত পুরনো সময়ের, কিংবা সেখানকার পরিবারগুলো নিজেদের অন্য পরিচয়ে নথিভুক্ত করেছেন — কোনটি ঠিক, কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
| উৎস ও সাল | এলাকা | পরিবার | মানুষ |
|---|---|---|---|
| জনশুমারি 2022 | শ্যামনগর | — | 1,724 |
| জনশুমারি 2022 | কয়রা | — | 920 |
| জনশুমারি 2022 | তালা | — | 421 |
| বাংলাপিডিয়া (সাল নেই) | কয়রা, ডুমুরিয়া, শ্যামনগর, দেবহাটা, তালা | — | 1,163 |
| প্রথম আলো 2016, সামস | শ্যামনগর | 450 | 2,300 |
| ঢাকা ট্রিবিউন 2020 | শ্যামনগরের 8টি ইউনিয়ন | 460 | 3,000-এর বেশি |
| ক্লাইমেট হোম নিউজ 2020 | খুলনা ও সাতক্ষীরা | — | প্রায় 5,000 |
| ইউসিএ নিউজ 2022 | সাতক্ষীরা জেলা | — | প্রায় 6,000 |
| দত্ত ও রহমান 2022 (HRCBM 2004 উদ্ধৃত) | শ্যামনগর, কয়রা, তালা | প্রায় 900 | — |
| হুদার 2022 জরিপ (টিবিএস 2023-এ উদ্ধৃত) | খুলনা-সাতক্ষীরার 4 উপজেলার 43 গ্রাম | 892 | 3,758 |
| ঢাকা ট্রিবিউন 2023 | কয়রা / শ্যামনগর | 490-এর বেশি / প্রায় 420 | — |
| বাংলা ট্রিবিউন 2025, সামস | শ্যামনগর ও তালা | 500–550 | — |
| টিবিএস 2026, সামস | শ্যামনগর | প্রায় 420 | প্রায় 2,740 |
| ডেইলি স্টার 2026 (বিআইজিডি গবেষক) | শ্যামনগরের 22টি গ্রাম | প্রায় 450 | — |
| প্রথম আলো 2026, সামস | শ্যামনগর ও আশপাশ | — | 2,500–3,000 |
ছকের সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি জিনিস স্পষ্ট হয়: শ্যামনগরে পরিবারের সংখ্যা ষোলো বছর ধরে মোটামুটি 420 থেকে 460-এর মধ্যে, অথচ জনসংখ্যার হিসাব 1,724 থেকে 3,000-এর বেশি পর্যন্ত। পরিবারপিছু সদস্য হিসাবে শুমারির সংখ্যা দাঁড়ায় চারজনের কাছাকাছি, সামসের সংখ্যা ছয়ের বেশি। কোন হিসাবটি সঠিক, তা নির্ধারণের মতো কোনো উৎস পাওয়া যায়নি; তবে ঢাকা ট্রিবিউনের 2023 সালের প্রতিবেদনের “কয়রায় 490-এর বেশি পরিবার” সংখ্যাটি শুমারির কয়রার 920 জনের সঙ্গে মেলানো কঠিন।
শ্যামনগরে: কালিঞ্চি (দত্ত ও রহমানের মাঠ-গবেষণায় প্রায় 50টি খানায় প্রায় 350 জন), ধুমঘাট অন্তাখালি মুন্ডাপাড়া (ঈশ্বরীপুর ইউনিয়ন), দাতিনাখালি, কাশিপুর, বুড়িগোয়ালিনী, বংশীপুর, উত্তর কদমতলা এবং মুন্সিগঞ্জ ও গাবুরা এলাকা। সঞ্জীব দ্রং লিখেছেন, ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নে মুন্ডাপাড়া সাতটি এবং ধুমঘাট এলাকায় মুন্ডা 1,764 জন, তার মধ্যে শিশু 232। সাতক্ষীরা সদরের একটি গ্রামে (টিবিএস লিখেছে Bakkali) 37টি মুন্ডা পরিবার (প্রায় 180 জন) একটি গভীর নলকূপ ভাগ করে চলে — টিবিএস (2026) জানিয়েছে। শুমারি অবশ্য সাতক্ষীরা সদরে মুন্ডা পেয়েছে মাত্র দুজন; এখানেও দুই হিসাবের ফারাক বড়। কয়রায়: নলপাড়া গ্রামের নাম এসেছে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে।
মুন্ডাদের দ্বিতীয় বড় কেন্দ্র সিলেট বিভাগের চা-অঞ্চল: হবিগঞ্জে 13,152 আর মৌলভীবাজারে 8,158 জন। একক উপজেলা হিসেবে দেশের সবচেয়ে বেশি মুন্ডা থাকেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে — 10,304 জন, যা পুরো খুলনা বিভাগের তিনগুণের বেশি। চা-শ্রমিক হিসেবে তাঁদের পূর্বপুরুষদের আনা হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে।
দ্য ডেইলি স্টার (9 আগস্ট 2019) সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) গবেষণা উদ্ধৃত করে লিখেছে, সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের অধিকাংশ চা-শ্রমিক প্রায় 150 বছর আগে ব্রিটিশ বাগান-মালিকদের ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনা মানুষের বংশধর। মুন্ডাদের ঠিক কবে চা-বাগানে আনা হয়েছিল, আলাদা করে এমন কোনো তারিখ কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। ইংরেজি বাংলাপিডিয়ার “1921 সালের শুমারিতে ডুয়ার্সের চা-বাগানে 34,601 মুন্ডা কাজ করছিলেন” তথ্যটি ভারতের জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সের, সিলেটের নয়।
চা-বাগানে মুন্ডারি ভাষা টিকে থাকার লড়াইটা আলাদা। ডেইলি স্টারে (20 ফেব্রুয়ারি 2018) কমলগঞ্জের একটি চা-বাগানের (ডেইলি স্টার লিখেছে Mirtinga) 45 বছর বয়সী শ্রমিক ব্রিটিশ মুন্ডা বলেছেন, তাঁদের সন্তানেরা মুন্ডারি শিখতে চায় না, কারণ তাঁরা বেশিরভাগ সময় বাংলা ব্যবহার করেন। ডেইলি স্টার বাংলায় (21 ফেব্রুয়ারি 2025) হবিগঞ্জের চন্ডিছড়া চা-বাগানের মনি মুন্ডা জানিয়েছেন, সেখানে তাঁদের সম্প্রদায়ের 40টি পরিবার থাকে, যাদের মাতৃভাষা মুন্ডারি, কিন্তু “এখনকার বেশিরভাগ শিশুই এই ভাষা পারে না”। একই প্রতিবেদন বলছে, চাঁন্দপুর, লুস্করপুর, লালচাঁদ, চাকলাপুঞ্জি ও সুরমার মতো বাগানে মুন্ডারি বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
চা-বাগানের মুন্ডাদের একটি ইতিহাস আমাদের আর্কাইভেই আছে। “বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা” লেখায় চুনারুঘাটের লালচান্দ চা-বাগানের শ্রমিক উপেন্দ্র ভৌমিকের সাক্ষ্য আছে: 1971 সালে বাগানের 11 জন শ্রমিককে রাজাকারদের দেওয়া তালিকা ধরে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে হত্যা করে, এরপর বাগানের 8 জন আদিবাসী শ্রমিক ত্রিপুরার লোহারবনে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে যান। সেই দলে ছিলেন হরিচন্দ্র মুন্ডা ও অনিল মুন্ডা; অনিল মুন্ডা ও উপেন্দ্র ভৌমিক দুজনেই ছিলেন বাগান-পঞ্চায়েতের সদস্য।
সিলেট জেলায় মুন্ডা 811 জন, তাঁদের বেশিরভাগ গোয়াইনঘাট (444) ও সিলেট সদরে (237)। সুনামগঞ্জে মাত্র 6 জন। অর্থাৎ সিলেট বিভাগের মুন্ডারা মূলত হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজারের বাগান-বলয়ে।
নওগাঁ জেলায় মুন্ডা 25,194 জন — দেশের যেকোনো জেলার চেয়ে বেশি এবং জাতীয় মোটের প্রায় 42%। তাঁরা ছড়িয়ে আছেন জেলার প্রায় সব উপজেলায়, সবচেয়ে বেশি নিয়ামতপুর (7,965) ও মহাদেবপুরে (5,799)। পাশের জয়পুরহাটে 3,489, রাজশাহীতে 1,645 (গোদাগাড়ীতে 1,290), দিনাজপুরে 888 ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে 740।
সংবাদমাধ্যমে উত্তরবঙ্গের মুন্ডারা প্রায় অদৃশ্য। এই লেখার জন্য পড়া উৎসগুলোর বেশিরভাগ সুন্দরবনের মুন্ডাদের নিয়ে; নওগাঁর 25 হাজার মানুষকে নিয়ে আলাদা কোনো মাঠ-গবেষণা বা দীর্ঘ প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া গেছে তা টুকরো টুকরো:
ইংরেজি বাংলাপিডিয়া বলছে, উত্তরের মুন্ডারা ভারতের রাজমহল পাহাড় থেকে এসে রাজশাহী জেলার উত্তরাংশে বসতি গড়েন, কাজ করতেন কৃষি, নীলকুঠি ও চা-বাগানে। ঢাকা ট্রিবিউনকে (2023) কয়রার 80 বছর বয়সী অতুল মুন্ডা বলেছেন, বাংলাদেশে মুন্ডারা আছেন সিলেট অঞ্চলে এবং বগুড়া, নওগাঁ, রাজশাহী ও দিনাজপুরে। প্রথম আলোর 2026 সালের প্রতিবেদন জানায়, শ্যামনগরের কারাম উৎসবের গাছ আসে জয়পুরহাট থেকে — 2024 সালেও তাই হয়েছিল। আর প্রথম আলোর 1 অক্টোবর 2023-এর প্রতিবেদনে নওগাঁর মহাদেবপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের কারাম উৎসব নিয়ে ওঁরাও নেতা বঙ্গপাল সরদার বলেছেন, কারাম ওঁরাওদের প্রধান উৎসব হলেও মুন্ডা, রাজোয়ারসহ আরও জাতি এটি পালন করে।
উত্তরবঙ্গের মুন্ডাদের নিয়ে সবচেয়ে কাছ থেকে লেখা বিবরণটি সালেক খোকনের। জুমজার্নালের ই-বুক সংগ্রহে থাকা তাঁর আদিবাসী মিথ এবং অন্যান্য (ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি 2011) বইয়ের “মহৎজাতি আদিবাসী মুণ্ডা পাহান” অধ্যায় (পৃ. 90–95; প্রথম ছাপা সাপ্তাহিক-এ, 8 অক্টোবর 2009) কালিয়াগঞ্জ বাজার পেরিয়ে শালবনঘেঁষা গোদাবাড়ি গ্রামের কথা বলে, যার সবাই “আদিবাসী মুণ্ডা পাহান”। প্রায় 15 বছর পর একই লেখক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে (13 জানুয়ারি 2024) আবার সেই গ্রামে ফেরেন, যেটিকে তিনি বলেছেন দিনাজপুরের সীমান্তঘেঁষা শালবনের ভেতরের উত্তর গোদাবাড়ি; সেখানে তখন প্রায় 30টি মুন্ডা পাহান পরিবার।
বইয়ের অধ্যায়ে গ্রামের মণ্ডল মাঠু পাহানের (তখন প্রায় 90 বছর) দাবি: তাঁরা ব্রিটিশ আমলেরও আগে থেকে এখানে আছেন, এসেছেন ভারতের “নাগপুর” থেকে, আর তখন বন কেটে যে জমি সাফ করা হতো, আদিবাসী নিয়মে তা তারই হয়ে যেত। স্বাধীনতার পর মাঠুর তিন ছেলের দুজন, চৈতন্য ও পরিমল, ভারতে চলে যান; সীমান্তের কাঁটাতার পরিবারটিকে ভাগ করে দিয়েছে। লেখক জানান, গ্রামের 22টি পরিবারকে বারবার ধর্মান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে — আর্থিক সচ্ছলতা, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার প্রলোভনসহ — কিন্তু তাঁরা রাজি হননি; খোকা পাহানের ভাষায়, “জাত ধ্বংস করমু না।”
বিডিনিউজের 2024 সালের লেখায় জানা যায়, মাঠু পাহান মারা গেছেন, তাঁর জায়গায় গ্রামপ্রধান হয়েছেন নিমাই পাহান, আর চার বছরে গ্রাম হারিয়েছে আরও চারজন বয়োজ্যেষ্ঠকে “যারা জানতেন মুন্ডা পাহানদের আদি রীতিনীতি ও আচার”। একই লেখা বলছে, গোদাবাড়ির আশপাশের অনেক আদিবাসী ধর্মান্তরিত হয়েছেন। গ্রামের সবচেয়ে শিক্ষিত কিশোর সুখদেব পাহান তখন কালিয়াগঞ্জের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে।
“পাহান” শব্দটি নিয়ে একটু সাবধানতা দরকার। সুন্দরবনের মুন্ডাদের বর্ণনায় হাবিবুল্লাহ ও হোসেন “পাহান”কে বলেছেন প্রধান ধর্মীয় কর্মকর্তা, আর প্রথম আলোর 2026 সালের প্রতিবেদনেও “পূজারি বা পাহান”। গোদাবাড়িতে আবার “মুন্ডা পাহান” একটি গোষ্ঠী-পরিচয়: বিডিনিউজের লেখায় আছে, মুন্ডাদের সঙ্গে “আচারগত কিছু পার্থক্য থাকলেও” পাহানরা নিজেদের “মুন্ডা পাহান” বলেই পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। শুমারির 50 জাতির তালিকায় “পাহান” নামে আলাদা কোনো সারি নেই।
বাংলাদেশের মুন্ডারা নিজেদের ভাষাকে নানা নামে ডাকেন — মুন্ডারি, সাদরি, নাগরি, খরটাই, বোনুয়া। উৎসগুলো দেখায়, সুন্দরবন ও দিনাজপুরের মুন্ডারা যে ভাষায় কথা বলেন তা মূলত সাদরি, যা ইন্দো-আর্য; অন্যদিকে চা-বাগানের কিছু পরিবার মাতৃভাষা হিসেবে মুন্ডারির কথা বলেন, যা অস্ট্রো-এশীয়। কোনোটিরই নিজস্ব লিপি এখানে চালু নেই।
| উৎস | এলাকা | ভাষার নাম যা বলা হয়েছে |
|---|---|---|
| বাংলাপিডিয়া (বাংলা) | সাধারণ | “মুন্ডারী ভাষা”, মৌখিক; কেউ বলেন “খরটাই”, কেউ “নাগরী” |
| হাবিবুল্লাহ ও হোসেন 2025 | সুন্দরবন | সাদরি বা মুন্ডারি; কেউ বলেন খাড়িয়া, নাগপুরি, সাদরি-কোল; 5 জন উত্তরদাতা বলেছেন “বোনুয়া” |
| প্রথম আলো 2016 | শ্যামনগর | “শাদ্রী” ভাষা |
| বাংলা ট্রিবিউন 2025 | শ্যামনগর ও তালা | “সাদরি” |
| টিবিএস 2026 | শ্যামনগর ও সাতক্ষীরা সদর | Sadri; নিজস্ব লিপি নেই, শিক্ষিতরা বাংলা হরফে লেখেন |
| বিডিনিউজ 2024 | দিনাজপুর সীমান্তের গোদাবাড়ি | “নাগরি ভাষা”; লিখিত বর্ণ নেই |
| ডেইলি স্টার 2018 | কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার | Mundari |
| ডেইলি স্টার বাংলা 2025 | চন্ডিছড়া, হবিগঞ্জ | মুন্ডারি |
পার্থক্যটি শুধু নামের নয়। হাবিবুল্লাহ ও হোসেন গ্রিয়ারসনের লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে কোনো আদিবাসী গোষ্ঠী নিজের ভাষা ছেড়ে একটি আর্য ভাষা গ্রহণ করলে তাকে “সাদরি” বলা হয়; আর সৌরভ সিকদারের (2020) মত উদ্ধৃত করেছেন যে সাদরি ইন্দো-আর্য পরিবারের বিহারি শাখার ভাষা, যা প্রথমে ছিল ব্যবসার যোগাযোগের ভাষা এবং পরে ওঁরাও, কোল, মুন্ডা, সাঁওতালসহ কয়েকটি জাতির মাতৃভাষা হয়ে ওঠে। বিডিনিউজের লেখায় গোদাবাড়ির উদাহরণগুলো — সূর্যকে “বেলা”, সকালকে “বিহান”, রাতকে “রাতি” — বাংলার কাছাকাছি শব্দ।
প্রতিদিনের ব্যবহার নিয়ে একটি সংখ্যা আছে: হাবিবুল্লাহ ও হোসেনের হিসাবে সুন্দরবনের একজন মুন্ডা গড়ে তাঁর কথাবার্তার অন্তত 60% মাতৃভাষায় বলেন। তবু প্রথম আলোর 2016 সালের প্রতিবেদনে সামসের নির্বাহী পরিচালক কৃষ্ণপদ মুন্ডা বলেছেন, বাঙালিদের সঙ্গে ওঠাবসা ও পড়াশোনার কারণে নতুন প্রজন্ম “শাদ্রী” ভুলতে বসেছে।
ডেইলি স্টারের (2021) প্রতিবেদন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের যে নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা 2018 সালে শেষ হয়, তাতে 14টি বিপন্ন ভাষার তালিকায় মুন্ডারি আছে; একই সমীক্ষার তালিকায় “মুন্ডা” ও “সাদরি” আলাদাভাবে এসেছে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় সমীক্ষাটি দুই বছরের বেশি অপ্রকাশিত ছিল। প্রকাশিত সমীক্ষাটি পাওয়া যায়নি।
সরকার প্রাক-প্রাথমিক স্তরে পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় পাঠ্যবই ছাপে — চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা, গারো ও সাদরি; মুন্ডারি এর মধ্যে নেই। সাদরি বই থাকলেও সুন্দরবনের মুন্ডা শিশুরা তা কার্যত পায় না। হাবিবুল্লাহ ও হোসেন লিখেছেন, শ্যামনগরে সাদরিভাষী শিক্ষার্থী মাত্র 220 জন, প্রায় 30টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছড়ানো, প্রতি বিদ্যালয়ে 10–12 জন, আর কোনো বিদ্যালয়ে মুন্ডা শিক্ষক নেই — ফলে বইগুলো দিয়ে পাঠদান সম্ভব হয় না।
ঘাটতি পূরণের একটি চেষ্টা হয়েছে সম্প্রদায়ের ভেতর থেকে। একই গবেষণা অনুযায়ী সামস “কমিউনিটি টিউশন সাপোর্ট প্রোগ্রাম” নামে 14টি বিদ্যালয় চালু করেছে, যেখানে মুন্ডা সম্প্রদায়ের শিক্ষকেরা শিশুদের বাংলা-মাধ্যমের পাঠক্রমের জন্য তৈরি করেন, এবং বাংলা হরফে সাদরি ভাষার প্রাথমিক পাঠ্যবইও বানিয়েছে। বাংলা ট্রিবিউনকে কালিঞ্চি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধনঞ্জয় কুমার বৈদ্য বলেছেন, মুন্ডা শিক্ষার্থীরা সাদরিতে কথা বললে অন্যরা বোঝে না, তাই তারা বাধ্য হয়ে বাংলা বলে, আর অনেক শিশু কিছুদিন পর ঝরে পড়ে।
বাংলাদেশের মুন্ডাদের ধর্ম কোনো একক খোপে পড়ে না। বাংলাপিডিয়া তাঁদের প্রকৃতি-পূজারী বলেছে, প্রধান দেবতা সিং বোঙ্গা (সূর্য) ও মারাংবুরু; একই সঙ্গে বলেছে, বাংলাদেশের মুন্ডারা নিজেদের হিন্দু দাবি করেন এবং শ্যামা ও কালীপূজা করেন। সুন্দরবনের মুন্ডারা এর সঙ্গে বনবিবির পূজাও করেন, যা উত্তরের মুন্ডারা করেন না।
বাংলা বাংলাপিডিয়া লিখেছে, গ্রাম পূজা মুন্ডাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব; ভাদ্র মাসে কারাম পূজা ও মনসা পূজা; এর বাইরে দুর্গা, সরস্বতী ও লক্ষ্মীপূজাও হয়; আর “আজকাল অনেকে বৈষ্ণব ধর্মের দীক্ষা নিয়ে থাকেন”। ইংরেজি ভুক্তি বাংলাদেশের মুন্ডা ও মাহাতোদের সম্পর্কে বলেছে, তাঁরা নিজেদের হিন্দু দাবি করেন, শ্যামা ও কালীপূজা করেন, জুলাইয়ে আষাঢ়ী পূজা ও সেপ্টেম্বরে ভাদু পূজা পালন করেন, পৌষ-পার্বণও মানেন, তবে জাতপাতের বাঁধনে নেই। একই ভুক্তির সারহুল, কাদলেটা বা মাঘ পরবের তালিকাটি ছোটনাগপুরের নৃতত্ত্ব থেকে নেওয়া বলে মনে হয়, বাংলাদেশের নয়।
সুন্দরবনের ছবিটা দিয়েছেন হাবিবুল্লাহ ও হোসেন। তাঁদের উত্তরদাতা আনন্দিতা মুন্ডা (30) বলেছেন, এই এলাকার অনেক মুন্ডা হিন্দু হলেও হিন্দুদের সব উৎসব তাঁরা করেন না; তাঁদের নিজস্ব পূজা সারহুল, কারাম, গোয়াল, কালী, টুসু, পাহাড়িয়া, বড় ও বনবিবি। মাঠকর্মে আরও এসেছে বুড়া-বুড়ি, বয়িল, দেলিয়া, শীতলা ও গঙ্গাদেবীর পূজা। সবচেয়ে বেশি উল্লেখিত উৎসব “মুরগি পূজা” — পূর্বপুরুষদের স্মরণে মুরগি উৎসর্গ, যা বছরের যেকোনো সময় হতে পারে। বনে শিকারে বা কাজে ঢোকার আগে বনবিবির পূজা সুন্দরবনের মুন্ডাদের নিজস্ব, উত্তরের জেলাগুলোর মুন্ডাদের নয়, এটিও তাঁরা আলাদা করে লিখেছেন।
নিজস্ব বিশ্বাসের দাবিও আছে। কালিঞ্চির গ্রাম-পুলিশ ও অনানুষ্ঠানিক নেতা গোপাল মুন্ডা টিবিএসকে বলেছেন, তাঁরা “মুন্ডা ধর্ম” মানেন, তাঁরা প্রকৃতি-পূজারী; সাতক্ষীরা সদরের এক গৃহিণী বলেছেন, স্কুলে মুন্ডা শিশুদের ইসলাম, হিন্দু, খ্রিষ্ট বা বৌদ্ধ — এই চারটি ধর্মবইয়ের একটি বেছে নিতে হয়, নিজেদের বিশ্বাসের জায়গা ক্লাসরুমে নেই। ইউসিএ নিউজে সামসের ভাইস-চেয়ারম্যান নীলিমা মুন্ডা মুন্ডাদের “বেশিরভাগ হিন্দু” বলেছেন। আর গোদাবাড়ির মুন্ডা পাহানদের সালেক খোকন বলেছেন “হিন্দু সনাতন ধর্ম” পালনকারী, যাঁরা কারমা ও দুর্গাপূজা করেন।
খ্রিষ্টধর্মের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সুনির্দিষ্ট তথ্য সুন্দরবনের। টিবিএস (জুন 2023) জানিয়েছে, ইতালির জেভেরিয়ান যাজক ফাদার লুইজি পাজ্জি 1975 সালে বাংলাদেশে আসেন এবং প্রায় 20 বছর ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমের মুন্ডাদের মধ্যে কাজ করছেন; বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছয় মুন্ডা মেয়েকে তিনি ইতালিতে নিয়ে গেছেন, যাঁরা ফিরে এসে সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করছেন। উত্তরবঙ্গে মিশনারি তৎপরতার কোনো নির্দিষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায়নি, যদিও বিডিনিউজের লেখা গোদাবাড়ির আশপাশে ধর্মান্তরের কথা বলে।
কারাম মুন্ডাদের অন্যতম প্রধান উৎসব, কারামগাছের ডাল পুঁতে তাকে ঘিরে পূজা, গল্প আর নাচ-গান। বাংলাপিডিয়া একে ভাদ্র মাসের পূজা বলেছে। সুন্দরবনে উৎসবটি হুমকিতে: 2009 সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর নোনা পানিতে কারামগাছ মরে গেছে, কয়রায় উৎসব বন্ধ, আর শ্যামনগরে গাছ আনতে হচ্ছে জয়পুরহাট থেকে।
প্রথম আলোর 2026 সালের প্রতিবেদন উৎসবটির বর্ণনা দিয়েছে: সামর্থ্য অনুযায়ী এটি তিন থেকে সাত দিন চলে; পূজার স্থানে শর্ষেসহ নানা বীজ দেওয়া হয়, তারপর কারামের ডাল স্থাপন করা হয়; পূজারি বা পাহান উৎসবের গল্প বলেন, এরপর নাচ-গান। গল্পটি দুই ভাইয়ের — ধর্মা কারামগাছের পূজা করতেন, কর্মা করতেন না; কর্মা গাছটি নদীতে ফেলে দিলে বিপদ নামে, পরে গাছ ফিরিয়ে এনে পূজা করলে বিপদ কাটে। শ্যামনগরের দাতিনাখালির দীপালি মুন্ডা বলেছেন, স্বামী-সন্তানের মঙ্গল কামনায় তিনি উৎসবে যান।
আইলার পরের ক্ষতির বিবরণও একই প্রতিবেদনে। কয়রার নলপাড়া গ্রামের নমিতা রানী মুন্ডা বলেছেন, “২০০৯ সালের আইলার আগেই শেষবার হইছিল। এরপর আর হয়নি।” কয়রার তরুণ সাধন কুমার মুন্ডা নিজের চোখে কখনো কারাম উৎসব দেখেননি। শ্যামনগরে জয়পুরহাট থেকে আনা একটি চারা লাগানো হয়েছিল; পাতা মেলার প্রায় দুই মাস পর গরমে সেটি মারা যায়। আইপিএস নিউজ (ডিসেম্বর 2025) জানিয়েছে, কয়রার একটি গ্রামে যে প্রবীণ পাঁচ বছর আগে শেষবার ছোট একটি উৎসব দেখেছিলেন, এক বছর আগে তাঁর মৃত্যুর পর সেখানে আর কেউ জানেন না উৎসব কীভাবে শুরু করতে হয়। প্রবীণ মুন্ডাদের অনেকে মনে করেন, শুধু আইলা নয়, 1988 সালের একটি বড় ঘূর্ণিঝড়ও কারামগাছ কমিয়েছে।
আমাদের আর্কাইভের “আদিবাসী জনগণের কার্বন-নিরপেক্ষ অর্থনীতি” লেখায় পাভেল পার্থ লিখেছেন, সুন্দরবন অঞ্চলের মুন্ডা ও মাহাতোরাও মৌয়াল-বাওয়ালিদের পাশাপাশি মধু, মোম, গোলপাতা ও গরান সংগ্রহ করেন। কারামগাছ হারানোর গল্প সেই বনের সঙ্গে সম্পর্ক বদলে যাওয়ারই আরেকটি দিক।
মুন্ডা সমাজ গোত্রে বিভক্ত, আর নিজ গোত্রে বিয়ে নিষিদ্ধ — এ কথা বাংলাপিডিয়া, হাবিবুল্লাহ-হোসেন ও বিডিনিউজ তিন উৎসেই আছে। গোত্রগুলোর নাম সাধারণত পশুপাখি বা বস্তুর নামে। গ্রাম চালায় মণ্ডল বা মন্ত্রীর নেতৃত্বে পরিষদ।
| উৎস | এলাকা | গোত্রের যে নামগুলো এসেছে |
|---|---|---|
| বাংলাপিডিয়া (বাংলা) | সাধারণ | টপ, কছুয়া, রাজফূত, উৎকুমার, নগড়ুয়া, বাঘ |
| বিডিনিউজ 2024 | গোদাবাড়ি (মুন্ডা পাহান) | তিংকী, দুরা, হেমব্রম, তোমগড়িয়া, কেরকাটা, বাঘোয়ার, সঘুয়ার, হরদুয়ার, সপুয়ার |
| তপন কুমার দে (সম্পা.) 2010 | রাজশাহীর গোদাগাড়ী | মুক্তিযোদ্ধাদের পদবি হিসেবে: হেরদুয়ার, মুরারী |
বাংলাপিডিয়া লিখেছে, মুন্ডাদের গোত্রগুলো সম-মর্যাদার, পোশাকের নাম “হাতকা”, বিধবারা “সাগাই” নামের প্রথায় আবার বিয়ে করতে পারেন, আর এখন তাঁরা প্রতীকীভাবে মুখাগ্নি করে মৃতদেহ কবর দেন। ভুক্তিটির “উনিশ শতকের শেষদিকের এক সমীক্ষায় কনেপণ ছিল 4 থেকে 20 টাকা” তথ্যটির উৎস বলা নেই; এটি ভারতের নৃতত্ত্ব থেকে নেওয়া হতে পারে [যাচাই প্রয়োজন]।
সুন্দরবনের বিয়ের একটি আচার হাবিবুল্লাহ ও হোসেন লিখেছেন: বিয়ের দিন বর-কনের কড়ে আঙুল থেকে সামান্য রক্ত নিয়ে আমপাতায় মেশানো হয়, যা চিরস্থায়ী বন্ধনের প্রতীক। গোদাবাড়ির মুন্ডা পাহানদের বিয়ের বিবরণ সালেক খোকনের বইয়ে: বরপক্ষ কনেকে পণ দেয় মাত্র 12 টাকা, সঙ্গে 5টি শাড়ি আর “সাজ দৌড়ী” — বাঁশের ডালায় সাজানো শর্ষের তেল, 5 কেজি চাল, হলুদ-মরিচ-মশলা ও ছাতু; বরপক্ষের সবার পা ধুইয়ে বাড়িতে তোলা হয় (“গড় হাত ধুয়া পর্ব”); কনের মা, খালা ও ফুফু বরকে বরণ করেন (“বরকে চুমাহান”); আর মারোয়ায় শিলপাটার ওপর দাঁড়িয়ে বর-কনে পরস্পরকে সিঁদুর পরান — এটিই বিয়ের মূল পর্ব।
গ্রামের নেতৃত্ব নিয়ে দুটি বিবরণ আছে। ইংরেজি বাংলাপিডিয়া বলছে, দক্ষিণ-পশ্চিমে সব গ্রামের জন্য একজন “মন্ত্রী” থাকেন, যিনি গ্রামের “মোড়ল”দের সাহায্যে বিরোধ মেটান। গোদাবাড়িতে বিডিনিউজ পেয়েছে তিনটি পদ: মণ্ডল, “বারঘা” (মণ্ডলের পরামর্শে হুকুম দেন) ও “পরানিক” (হুকুম সবাইকে জানান), সবার মতামতে নির্বাচিত। সুন্দরবনে এই প্রথা দুর্বল হচ্ছে: সাতক্ষীরা জেলা জলবায়ু পরিষদের সদস্যসচিব আশেক-ই এলাহী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, আগে মুন্ডারা নিজেদের মধ্যে দলনেতা ঠিক করতেন, এখন সেই প্রথা নেই।
মৃত্যুর পরের আচারও দুই উৎসে এসেছে। গোদাবাড়ির মুন্ডা পাহানরা মৃত্যুর 13 দিনের দিন “ঘাটকামান” পালন করেন, তারপর শ্রাদ্ধ; মাঠু পাহান সনাতন ধর্মাবলম্বী হলেও তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছে। শ্যামনগরে সঞ্জীব দ্রং দেখেছেন, নিহত নরেন্দ্রনাথ মুন্ডার পাঁচ ছেলে সাদা থান ধুতি পরে “দশাকামা” অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি — যা নাম দেখে দশম দিনের আচার বলে মনে হয়, তবে লেখায় তা ব্যাখ্যা করা হয়নি।
মুন্ডারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন — রাজশাহীর গোদাগাড়ী, জয়পুরহাট ও হবিগঞ্জের চা-বাগান থেকে। তপন কুমার দে সম্পাদিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা (অন্বেষা প্রকাশন, 2010) বইয়ে চারজন মুন্ডা মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষ্য আছে, আর আমাদের আর্কাইভে আছে চুনারুঘাটের দুজনের নাম।
বইটির “মুণ্ডা” অধ্যায়ে (পৃ. 235–239): গোদাগাড়ীর বটতলী গ্রামের বীরেন্দ্রনাথ হেরদুয়ার বৈশাখে ভারতে যান, গৌড়বাগান যুব ক্যাম্পে ও শিলিগুড়িতে প্রশিক্ষণ নিয়ে 17 জন আদিবাসীর একটি দলে দেশে ঢোকেন, কানসাট ও শিবগঞ্জে যুদ্ধ করেন। গোগ্রামের নারায়ণ চন্দ্র মুরারী, যিনি বই প্রকাশের সময় গোগ্রাম ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কমান্ডার, গোদাগাড়ী, তানোর, মোহনপুর, কাঁকনহাট ও আন্ধারকোঠা এলাকায় যুদ্ধ করেন। বটতলীর গজেন্দ্রনাথ মুরারী প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ঢোকার কয়েক দিনের মধ্যেই দেশ স্বাধীন হয়; তাঁর ভাষায়, “আজ পর্যন্ত আমার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ওঠেনি।” জয়পুরহাটের দোগাছির বুধু মুণ্ডা গোবরা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে পরে তুরা পাহাড় হয়ে সিলেট সেক্টরে যান; 16 ডিসেম্বর তিনি সিলেটে ছিলেন।
যুদ্ধের পরের অভিজ্ঞতাও বইটিতে আছে, এবং তা জমির প্রশ্নের সঙ্গে জড়ানো। বীরেন্দ্রনাথ হেরদুয়ার বাড়ি ফিরে দেখেন গ্রামের কোনো চিহ্ন নেই, পুরো গ্রামে সরিষা ফুটে আছে; বইয়ের ভাষায়, স্থানীয় পাকিস্তানপন্থীরা ভেবেছিল আদিবাসীরা আর ফিরবে না, তাই সব জমি দখল করে। নারায়ণ মুরারীও ফিরে দেখেন বাড়ি মাঠ হয়ে গেছে, কিছুই ফেরত পাননি, জমি উদ্ধারেও কষ্ট হয়েছে। এটি একটি সম্পাদিত সংকলনের মৌখিক সাক্ষ্য; জমি দখলের অভিযোগ যাচাইয়ের মতো আলাদা নথি পাওয়া যায়নি।
চা-বাগানের দুই মুন্ডা মুক্তিযোদ্ধা — হরিচন্দ্র মুন্ডা ও অনিল মুন্ডা — এবং লালচান্দ চা-বাগানের ঘটনা আছে আমাদের আর্কাইভের মুক্তিযোদ্ধা-সংকলনে। সঞ্জীব দ্রংও শ্যামনগরে গিয়ে শুনেছেন, সেখানকার মুন্ডাদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তবে তাঁদের নাম লেখায় নেই।
সুন্দরবনের মুন্ডাদের বেশিরভাগ আজ ভূমিহীন। প্রথম আলো (2016) ও ঢাকা ট্রিবিউন (2023) দুই উৎসেই সংখ্যাটি প্রায় 95%; দত্ত ও রহমানের কালিঞ্চি গ্রামে 99%। যে জমি পূর্বপুরুষেরা বন কেটে আবাদ করেছিলেন, তার দলিল তাঁরা কখনো পাননি — টিবিএস লিখেছে — আর যা ছিল, তা গেছে জাল দলিল, মামলা ও দখলে।
প্রথম আলোর 2016 সালের প্রতিবেদনে কাশিপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব অশ্বিনী কুমার মুন্ডা বলেছেন, তাঁদের 13 বিঘা জমির সবই প্রভাবশালীরা জাল দলিল করে নিয়ে গেছে, আর 11 সদস্যের পরিবার এখন থাকে 5 শতাংশ জমিতে। একই গ্রামের তারক মুন্ডা জানিয়েছেন, 1996 সালে কেনা 7 শতাংশ জমি নিয়ে আদালতে গেলে প্রতিপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে 16টি মামলা দেয়। প্রতিবেদনটি বলছে, ধুমঘাট, মুন্সিগঞ্জ ও গাবুরার প্রায় প্রতিটি মুন্ডা পরিবারের অভিজ্ঞতা একই।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি 19 আগস্ট 2022-এর। ডেইলি স্টার বাংলা ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সেদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী শ্যামনগরের ধুমঘাট অন্তাখালি মুন্ডাপাড়ায় প্রায় 200 জন লোক মুন্ডা পরিবারগুলোকে ঘরে অবরুদ্ধ করে বিরোধপূর্ণ আট বিঘা জমি চষে দেয়; বাধা দিলে তিন নারী ও নরেন্দ্রনাথ মুন্ডা আহত হন। স্থানীয়রা ডেইলি স্টারকে জানান, পাড়ায় প্রায় 100 বছর ধরে 32টি মুন্ডা পরিবার থাকে। অভিযুক্ত রাশিদুল ইসলাম সরদার ও এবাদুল ইসলাম সরদারের দাবি, জমিটি তাঁদের বাবার কেনা এবং 6–7 বছর আগে মুন্ডারা দখল করে নিয়েছিল। নরেন্দ্রনাথ মুন্ডা পরদিন, 20 আগস্ট, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।
নরেন্দ্রনাথের বয়স নিয়ে উৎসভেদ আছে: ডেইলি স্টার বলছে 65, বিডিনিউজ বলছে 70। পাড়ার পরিবারের সংখ্যাও ভিন্ন: ডেইলি স্টার বাংলা 32, ইউসিএ নিউজ 27। দ্য ডেইলি স্টারের পরের প্রতিবেদন জানায়, ঘটনার পর গ্রামের 19 জন মুন্ডা শিক্ষার্থী — 17 জন স্কুলের, দুজন কলেজের — ভয়ে ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। প্রথম আলোর কলামে সঞ্জীব দ্রং লিখেছেন, মামলার 22 আসামির মধ্যে তখন পর্যন্ত চারজন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন; ইউসিএ নিউজ লিখেছে, মামলায় 17 জনকে আসামি করা হয়। বিডিনিউজকে সামসের কৃষ্ণপদ মুন্ডা বলেছেন, মুন্ডাদের জমি হস্তান্তরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে, অথচ জালিয়াতি করে মালিকানা দাবি করায় বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন।
কৃষ্ণপদ মুন্ডা যে নিষেধাজ্ঞার কথা বলেছেন, তার আইনি ভিত্তি রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950-এর ধারা 97: সেখানে যে “aboriginal castes or tribes”-এর জমি অ-আদিবাসীর কাছে হস্তান্তরে বিধিনিষেধ, তার তালিকায় “Mundas” নামটি আছে। ধারাটির পূর্ণ পাঠ ও অনুমতির প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত থাকছে “প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা: সমতলে আদিবাসীর জমি হস্তান্তরে যে বিধান” লেখায়। হামলার ঘটনা আরও আছে: ডিসেম্বর 2022-এ শ্যামনগরে জমির বিরোধে অসিত কুমার মুন্ডা, তাঁর মা আনার মনি ও স্ত্রী আরতি রানী মুন্ডাকে মারধরের অভিযোগে একজন গ্রেপ্তার হন। এলাকাটির নাম ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে উত্তর কদমতলা, ইংরেজি ডেইলি স্টার South Kadamtali।
ভূমিহীন সুন্দরবনের মুন্ডাদের জীবিকা চিংড়িঘের, দিনমজুরি, ইটভাটা আর বনের ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনে বেড়ে চলা লবণাক্ততা সেই জীবনকে আরও কঠিন করেছে: খাবার পানির সংকট, প্রচলিত খাবার হারিয়ে যাওয়া, নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আর ঘূর্ণিঝড়ে বারবার ঘর হারানো।
দত্ত ও রহমানের কালিঞ্চি গবেষণায় 85% মানুষ চিংড়িঘেরে কাজ করে জীবিকা চালান, কেউ কেউ কৃষি, ইটভাটা ও দিনমজুরিতে। ঢাকা ট্রিবিউন (মে 2020) জানিয়েছে, কোভিড-লকডাউনে দাতিনাখালির কণিকা মুন্ডার কাঁকড়া-খামারের কাজ আর ধুমঘাটের ফনি মুন্ডার ইটভাটার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম আলোর 2016 সালের প্রতিবেদনে সামস জানিয়েছিল, সাড়ে চারশ পরিবারের মধ্যে তিনজন গ্রাম-পুলিশ আর 13 জন বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন, বাকিরা দিনমজুর। ক্লাইমেট হোম নিউজ (নভেম্বর 2020) লিখেছে, জামানত দেওয়ার মতো সম্পদ না থাকায় ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলো মুন্ডাদের ঋণ দিতে চায় না।
বাংলা ট্রিবিউনের (ডিসেম্বর 2025) প্রতিবেদন বলছে, আইলা, আম্পান, রেমাল, নার্গিস ও সিত্রাংসহ প্রতিটি ঘূর্ণিঝড় মুন্ডা গ্রামগুলোকে আরও দুর্বল করেছে। কালিঞ্চির দিপালী রানী মুন্ডার কথায়, “ঘর বানাইলে ঝড় এসে নিয়ে যায়। নোনাপানি ঢুকলে ফসল হয় না।” একই প্রতিবেদন অনুযায়ী মুন্ডাদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যতালিকায় ছিল ইঁদুর, কচ্ছপ, শামুক, জুংড়া, কুঁচিয়া, বুনো মাছ, ঘাসফড়িং ও বনশাক, যা এখন খুব কম পাওয়া যায়; সবিতা রানী মুন্ডা বলেছেন, বাধ্য হয়ে এখন বাঙালিদের মতো ডাল-ভাত খেতে হচ্ছে।
পানির সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা নারীদের। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষকেরা ডেইলি স্টারে (2026) লিখেছেন, শুকনো মৌসুমে মুন্ডা নারী ও কিশোরীরা খাবার পানির জন্য কখনো এক দিকে তিন-চার কিলোমিটার হাঁটেন। টিবিএসের (2026) প্রতিবেদনে কালিঞ্চির প্রিয়াঙ্কা মুন্ডা যে চাপকল থেকে পানি তোলেন, সেটি 60 জনে ভাগ করে নেন, আর পানি লোহা ও লবণে হলদেটে; সুলতা মুন্ডা বলেছেন, তাঁর মাসিক এখন নিয়মিত হয় না। ঢাকা ট্রিবিউনের 2023 সালের প্রতিবেদনের শিরোনামই ছিল খুলনার মুন্ডা নারীদের “শেষ না হওয়া দুর্ভোগ”।
শিক্ষায়ও পিছিয়ে থাকার কারণ শুধু দারিদ্র্য নয়। টিবিএসের (2023) প্রতিবেদনে ফাদার পাজ্জি বলেছেন, মুন্ডা মেয়েদের বেশিরভাগের বিয়ে হয় 13–14 বছরের আগে, আর অল্প বয়সে মাতৃত্বের জটিলতায় অনেকে মারা যান। একই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত মো. শাইফুল হুদার 2022 সালের জরিপ খুলনা-সাতক্ষীরার 43টি গ্রামে 892টি পরিবারে 3,758 জন মুন্ডা পেয়েছে — পুরুষ 2,004, নারী 1,754। পাজ্জির ব্যাখ্যায় নারী কম হওয়ার কারণ এই বাল্যবিবাহ ও মাতৃমৃত্যু। শুমারি 2022 অবশ্য সাতক্ষীরা ও খুলনার মুন্ডাদের মধ্যে নারী-পুরুষ প্রায় সমান পেয়েছে (সাতক্ষীরায় পুরুষ 1,089, নারী 1,059; খুলনায় 460 ও 464)।
দেশ ছাড়ার কথাও উৎসে আছে। হাবিবুল্লাহ ও হোসেন লিখেছেন, টিকতে না পেরে অনেকে দেশের অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন; সঞ্জীব দ্রং লিখেছেন, অনেকে “দেশান্তরে” গেছেন। কতজন, কোথায় গেছেন — এমন কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
মুন্ডারা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। হাবিবুল্লাহ ও হোসেন জানিয়েছেন, বাংলাদেশ গেজেটে স্বীকৃত 50টি জাতির তালিকায় মুন্ডা 19তম। আর 1950 সালের প্রজাস্বত্ব আইনের ধারা 97-এর জমি-সুরক্ষার তালিকায় “Mundas” আছে, যা মুন্ডাদের জমি অ-আদিবাসীর কাছে হস্তান্তরে বিধিনিষেধ দেয়।
সরকারি তালিকায় নাম থাকা আর সেই সুরক্ষা মাঠে পৌঁছানো এক জিনিস নয় — ধুমঘাটের ঘটনা তার উদাহরণ। ধারা 97-এর তালিকায় “Mundas”-এর ঠিক পরেই “Mundais” নামে আরেকটি নাম আছে; দুটির সম্পর্ক কী, আইনের পাঠে বলা নেই। তালিকা কীভাবে 27 থেকে 50-এ পৌঁছাল, তা নিয়ে আলাদা লেখা “স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা 27 থেকে 50 হলো কীভাবে”; আর সমতলের সব জাতির জেলা, ভাষা ও জীবিকার তুলনামূলক ছক থাকছে “সমতলের আদিবাসী জাতিগুলো: কে কোথায় থাকেন, কী নিয়ে বেঁচে আছেন” লেখায়।
মুন্ডাদের নিয়ে বাংলা ও ইংরেজি লেখায় ভারতের তথ্য প্রায়ই বাংলাদেশের নামে চলে আসে। সবচেয়ে বড় পার্থক্য ভাষায়: ঝাড়খণ্ডের মুন্ডারি অস্ট্রো-এশীয়, কিন্তু বাংলাদেশের অনেক মুন্ডার দৈনন্দিন ভাষা সাদরি। ধর্মেও বাংলাদেশের মুন্ডারা বেশিরভাগ নিজেদের হিন্দু বলেন, আর সুন্দরবনে বনবিবির পূজা করেন।
| বিষয় | উৎসে বাংলাদেশের মুন্ডাদের কথা | যা মূলত ভারতের মুন্ডাদের তথ্য |
|---|---|---|
| ভাষা | সাদরি / নাগরি / মুন্ডারি; লিপি নেই; বাংলা হরফে লেখা (সামস) | মুন্ডারি (অস্ট্রো-এশীয়); 1980-এর দশকে উদ্ভাবিত “মুন্ডারি বাণী” লিপি (উইকিপিডিয়া) |
| ধর্ম | বেশিরভাগ নিজেদের হিন্দু বলেন; সিং বোঙ্গা, কারাম, বনবিবি, মুরগি পূজা | সারনা ধর্ম, সারনা বা পবিত্র কুঞ্জে পূজা |
| গোত্র | টপ, কছুয়া, বাঘ…; গোদাবাড়িতে তিংকী, হেমব্রম, কেরকাটা… | “কিলি” নামের গোত্রব্যবস্থা (উইকিপিডিয়া, রায় 1912 উদ্ধৃত) |
| ইতিহাস | জমিদার-ঔপনিবেশিক আমলে শ্রমিক হিসেবে আগমন; 1971-এ মুক্তিযুদ্ধ | খুঁটকাট্টি ভূমিব্যবস্থা; বিরসা মুন্ডার উলগুলান (1899–1900) |
| চা-বাগান | হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজারে 21 হাজারের বেশি | 1921 সালে ডুয়ার্সে 34,601 (বাংলাপিডিয়া) |
আরেকটি সতর্কতা: বাংলা উইকিপিডিয়ার “মুন্ডা” নিবন্ধে বাংলাদেশের মুন্ডাদের সাতটি গোষ্ঠী ও প্রায় 27টি গোত্রের তালিকা আছে, কিন্তু সেগুলোর কোনো সূত্র দেওয়া নেই, আর নিবন্ধটি নিজেই “আমাদের গবেষণালব্ধ” তথ্যের কথা বলে। তাই এই লেখায় সেগুলো ব্যবহার করা হয়নি।
মুন্ডারা ভারতের ঝাড়খণ্ডের ছোটনাগপুর অঞ্চলের আদি অধিবাসী একটি জাতি, রাঁচি যার কেন্দ্র। বাংলাদেশে তাঁরা এসেছেন মূলত ব্রিটিশ আমলে শ্রমিক হিসেবে — সুন্দরবনে বন কেটে আবাদ করতে, উত্তরবঙ্গে কৃষি ও নীলকুঠিতে, সিলেটে চা-বাগানে। তাঁরা সরকারি তালিকাভুক্ত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী; জনশুমারি 2022-এ সংখ্যা 60,201।
বিবিএসের জনশুমারি 2022-এর চূড়ান্ত জাতীয় প্রতিবেদন (সারণি P29) অনুযায়ী 60,201 জন — পুরুষ 29,773, নারী 30,428। প্রাথমিক প্রতিবেদনে সংখ্যাটি ছিল 60,191। বেসরকারি হিসাব ভিন্ন: ডেইলি স্টারে (2021) প্রায় 40,000, ঢাকা ট্রিবিউনে (2023) এক এনজিও-প্রধানের মতে 15,000–20,000।
নওগাঁয় — 25,194 জন, দেশের মোট মুন্ডার প্রায় 42%; সবচেয়ে বেশি নিয়ামতপুর (7,965) ও মহাদেবপুরে (5,799)। এরপর হবিগঞ্জ 13,152 (চুনারুঘাটেই 10,304), মৌলভীবাজার 8,158, জয়পুরহাট 3,489 এবং সাতক্ষীরা 2,148। হিসাবগুলো জনশুমারি 2022-এর জেলা প্রতিবেদনের সারণি P17 থেকে।
জনশুমারি 2022 অনুযায়ী সাতক্ষীরার শ্যামনগরে 1,724, খুলনার কয়রায় 920 এবং সাতক্ষীরার তালায় 421 জন — দুই জেলা মিলিয়ে 3,072। স্থানীয় হিসাব বড়: সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থা (সামস) শুধু শ্যামনগরেই 2,300 (2016) থেকে 2,500–3,000 (2026) জনের কথা বলেছে।
উৎসভেদে 200 থেকে 300 বছর আগে। বাংলাপিডিয়া ও টিবিএস বলছে প্রায় 200 বছর, আল মাহমুদের 2026 সালের গবেষণা প্রায় 220, সামস (প্রথম আলো 2016, বাংলা ট্রিবিউন 2025) প্রায় 250, আর ঢাকা ট্রিবিউন (2020) ও দত্ত-রহমান (2022) প্রায় 300। কোনো উৎস নির্দিষ্ট সাল বা নথি দেয়নি।
সুন্দরবনের জঙ্গল কেটে বসতি ও চাষের জমি তৈরির জন্য। বাংলাপিডিয়া বলছে জমিদারদের জমি আবাদযোগ্য করতে; আল মাহমুদের গবেষণা বলছে, আগে জমিদার বা রাজবাড়ির লাঠিয়াল ও নীলকরদের শ্রমিক হিসেবে, পরে উনিশ শতকের শুরুতে জমিদারদের ইজারা নেওয়া বনভূমি সাফ করতে। এ কারণে স্থানীয়রা তাঁদের “বুনো” বলে ডাকত।
নিজেরা ভাষাটিকে মুন্ডারি, সাদরি, নাগরি বা খরটাই বলেন। সুন্দরবন ও দিনাজপুরের মুন্ডারা যা বলেন তা মূলত সাদরি, যা ইন্দো-আর্য ভাষা; চা-বাগানের কিছু পরিবার মাতৃভাষা হিসেবে মুন্ডারির কথা বলেন, যা অস্ট্রো-এশীয়। ভাষাটির কোনো নিজস্ব লিপি এখানে চালু নেই; শিক্ষিতরা বাংলা হরফে লেখেন।
হ্যাঁ। ডেইলি স্টারের (2021) প্রতিবেদন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের 2018 সালে শেষ হওয়া নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় 14টি বিপন্ন ভাষার তালিকায় মুন্ডারি আছে। চা-বাগানের মুন্ডা অভিভাবকেরাও বলছেন, নতুন প্রজন্ম ভাষাটি শিখছে না। সরকারের পাঁচ ভাষার পাঠ্যবই কর্মসূচিতে মুন্ডারি নেই, সাদরি আছে।
বাংলাপিডিয়া মুন্ডাদের প্রকৃতি-পূজারী বলেছে, প্রধান দেবতা সিং বোঙ্গা ও মারাংবুরু, আবার জানিয়েছে বাংলাদেশের মুন্ডারা নিজেদের হিন্দু দাবি করেন এবং শ্যামা-কালীপূজা করেন। সুন্দরবনের মুন্ডারা সারহুল, কারাম, টুসু, মুরগি পূজা ও বনবিবির পূজাও করেন; কেউ কেউ নিজেদের “মুন্ডা ধর্ম”-এর অনুসারী বলেন।
কারাম মুন্ডাদের প্রধান উৎসবগুলোর একটি — কারামগাছের ডাল পুঁতে তিন থেকে সাত দিন পূজা, গল্প ও নাচ-গান। 2009 সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর নোনা পানিতে উপকূলের কারামগাছ মরে গেছে। কয়রায় উৎসব বন্ধ, আর শ্যামনগরে গাছ আনতে হয় জয়পুরহাট থেকে; 2026 সালে তা না আসায় পিপুলের ডালে উৎসব হয়।
হ্যাঁ। তপন কুমার দে সম্পাদিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা (2010) বইয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বীরেন্দ্রনাথ হেরদুয়ার, নারায়ণ চন্দ্র মুরারী, গজেন্দ্রনাথ মুরারী ও জয়পুরহাটের বুধু মুণ্ডার সাক্ষ্য আছে। হবিগঞ্জের লালচান্দ চা-বাগানের হরিচন্দ্র মুন্ডা ও অনিল মুন্ডা ত্রিপুরার লোহারবনে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ করেন।
বন সাফ করে যে জমি পূর্বপুরুষেরা আবাদ করেছিলেন, তার দলিল তাঁরা পাননি, আর পরে জাল দলিল, মিথ্যা মামলা ও দখলে বাকি জমি হারিয়েছেন। প্রথম আলো (2016) ও ঢাকা ট্রিবিউন (2023) অনুযায়ী প্রায় 95% পরিবার ভূমিহীন। 2022 সালের আগস্টে শ্যামনগরের ধুমঘাটে জমি দখলের হামলায় নরেন্দ্রনাথ মুন্ডা নিহত হন।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950-এর ধারা 97-এর তালিকায় “Mundas” আছে, যাদের জমি অ-আদিবাসীর কাছে হস্তান্তরে বিধিনিষেধ রয়েছে। সামসের কৃষ্ণপদ মুন্ডা বিডিনিউজকে (2022) বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জালিয়াতি করে মুন্ডাদের জমির মালিকানা দাবি করা হচ্ছে।
দিনাজপুর সীমান্তের শালবনঘেঁষা গোদাবাড়ি গ্রামের একটি গোষ্ঠী, যাঁরা নিজেদের “মুন্ডা পাহান” বলে পরিচয় দেন। সালেক খোকনের বই (2011) ও বিডিনিউজের লেখা (2024) অনুযায়ী তাঁরা নাগরি ভাষায় কথা বলেন, সনাতন হিন্দু রীতি মানেন, আর গ্রামে প্রায় 30টি পরিবার। সুন্দরবনের মুন্ডাদের মধ্যে আবার “পাহান” মানে পূজারি।
জুমজার্নালের নিজস্ব সংগ্রহ
সরকারি নথি
বিশ্বকোষ ও গবেষণা
সংবাদ ও প্রতিবেদন
সর্বশেষ হালনাগাদ: 17 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ভাষা, চা বাগান, মুন্ডা
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।