Last updated Oct 19th, 2026
0

চা বাগানের আদিবাসী জনগোষ্ঠী বলতে বোঝায় সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের চা-বাগানে বসবাসকারী সেই জাতিগুলোকে, যাঁদের পূর্বপুরুষদের উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ব্রিটিশ চা-করেরা ভারতের ছোটনাগপুর, যুক্তপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মাদ্রাজ, উড়িষ্যা ও বাংলার পশ্চিমাঞ্চল থেকে শ্রমিক হিসেবে এনেছিলেন। এঁরা একটি জাতি নন: উন্নয়ন সংস্থা সেডের 2016 সালের মানচিত্রায়নে 156টি বাগানে 80টি আলাদা জনগোষ্ঠী পাওয়া গেছে — মুন্ডা, সাঁওতাল, ওরাওঁ, ভূমিজ, খাড়িয়া, বাড়াইক, তাঁতি, কানু, রবিদাস, গোয়ালাসহ আরও অনেকে। কে কবে, কোথা থেকে এসেছেন, আর আজ কতজন — তার হিসাব নিচে, প্রতিটি সংখ্যা তার নথিসহ।
1921 সালের মার্চে আসামের শুমারি-কর্মীরা সিলেট জেলার চা-বাগানগুলোতে 1,63,222 জন মানুষ গুনেছিলেন — পুরুষ 81,755, নারী 81,467। শুমারি দপ্তর তাঁদের জাতি ধরে আলাদা একটি সারণিতে সাজিয়েছিল। সেই সারণিতে সবচেয়ে বড় ঘরটি ছিল “Chamar”-দের, তারপর “Bauri”, “Munda”, “Tanti”, “Pan”। একশো বছর পরের জনশুমারিতে এই নামগুলোর অনেকগুলো আর নেই; আছে 50টি সরকারি নামের একটি তালিকা, আর তার বাইরে “অন্যান্য” নামে একটি ঘর। চা-বাগানের মানুষ কারা — এই প্রশ্নের উত্তর তাই দুই নথির মাঝখানে খুঁজতে হয়।
এই লেখা সেই কাজটিই করে: শ্রম-নথি, 1905 সালের সিলেট গেজেটিয়ার, 1921 সালের আসাম শুমারি, জনশুমারি 2022-এর মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা প্রতিবেদন, চা বোর্ডের উদ্ধৃত হিসাব আর তিনটি মাঠ-গবেষণা পাশাপাশি রাখে। সমতলের প্রতিটি জাতির আলাদা পরিচয় আছে আমাদের সমতলের আদিবাসী জাতিগুলো নিয়ে নির্দেশিকায়, আর চা-বাগানের মুন্ডাদের বিস্তারিত আছে মুন্ডাদের বসতি, ভাষা ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে লেখায়; সেগুলো এখানে আর বলা হয়নি।
এই লেখায়

চা বাগানের আদিবাসী জনগোষ্ঠী একক কোনো জাতি নয়, বহু জাতির একটি সমষ্টি, যাঁদের একসূত্রে বেঁধেছে একটি পেশা আর বাগানের “লেবার লাইন”-এ বসবাস। আইএলওর জন্য করা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, শ্রমিকেরা দুই স্তরে নিজেদের পরিচয় দেন: প্রথমে চা-শ্রমিক সম্প্রদায়, তারপর পূর্বপুরুষের জাতি।
ওই গবেষণা (ফয়সাল আহম্মেদ ও মো. ইসমাইল হোসেন, 2016) সিলেট ও মৌলভীবাজারের 10টি বাগানে 297 জন শ্রমিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। গবেষকেরা লিখেছেন, ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে শ্রমিক এনেছিল, আর শ্রমিকেরা “still identify with those ethnic identities”। সময়ের সঙ্গে কিছু বাঙালিও বাগানের কাজে যুক্ত হয়েছেন; কয়েকটি বাগানে “বরিশাল লাইন” ও “কুমিল্লা লাইন” নামে আলাদা শ্রমিক-সারি পাওয়া গেছে।
এক নজরে মূল তথ্যগুলো:
| প্রশ্ন | উত্তর | উৎস |
|---|---|---|
| প্রথম চা-বাগান কবে | 1854, মালনীছড়া, সিলেট | বাংলাপিডিয়া |
| শ্রমিক আনা শুরু কবে | উনিশ শতকের মাঝামাঝি (বাংলাপিডিয়া); আর্কাইভের একটি লেখায় 1834–35 | বাংলাপিডিয়া; মোহন রবিদাস |
| সবচেয়ে বেশি আমদানি কোন দশকে (সিলেট) | 1891–1900: 1,41,650 জন | সিলেট গেজেটিয়ার, 1905 |
| কোথা থেকে | ছোটনাগপুর, যুক্তপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মাদ্রাজ, উড়িষ্যা, বাংলার পশ্চিমাঞ্চল | গেজেটিয়ার 1905; শুমারি 1921 |
| কয়টি জনগোষ্ঠী | 80 (156টি বাগানে); 38 (10টি বাগানে) | সেড 2016; আইএলও-শাবিপ্রবি 2016 |
| মৌলভীবাজার + হবিগঞ্জে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী (2022) | 73,303 + 41,573 = 1,14,876 | বিবিএস জেলা প্রতিবেদন |
| মোট চা জনগোষ্ঠী | 3,59,085 থেকে প্রায় 15 লাখ — উৎসভেদে | নিচে আলাদা অংশ |
চা-বাগানে কয়টি জাতি থাকে, তার একটিমাত্র সরকারি উত্তর নেই। তিনটি উৎস তিনটি সংখ্যা দেয়, কারণ তারা তিন রকম জিনিস গুনেছে: আমাদের আর্কাইভের একটি লেখা বলে “প্রায় ১১৬টি”, সেডের 2016 সালের মানচিত্রায়ন বলে 80টি, আর আইএলওর জন্য করা গবেষণা 10টি বাগানে পেয়েছে 38টি।
| উৎস | সাল | কী গোনা হয়েছে | সংখ্যা |
|---|---|---|---|
| মোহন রবিদাস, জুমজার্নাল আর্কাইভ | — | বিহার, মাদ্রাজ, উত্তর প্রদেশ, উড়িষ্যা থেকে আনা “আদিবাসী জনগোষ্ঠী” | প্রায় 116 |
| সেড, Slaves In These Times | 2016 | সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটির 156টি বাগানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী (বাঙালিসহ) | 80 |
| আইএলও-শাবিপ্রবি গবেষণা | 2016 | নমুনায় থাকা 10টি বাগানে পাওয়া জাতিগোষ্ঠী | 38 |
| ফিলিপ গাইন, ডেইলি স্টার বাংলায় | 2022 | শুমারিতে “যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি” এমন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী | 23 |
| ডেইলি স্টার বাংলা (মিন্টু দেশোয়ারা) | 2025 | চা-বাগানে বলা ভাষা | অন্তত 15 |
সংখ্যাগুলো পরস্পরবিরোধী নয়, ভিন্ন। আইএলওর 38 একটি নমুনার হিসাব — 10টি বাগানে যা পাওয়া গেছে। সেডের 80 প্রায় সব বাগান ঘুরে করা, আর তাতে বাঙালিও একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে গোনা। রবিদাসের লেখায় 116 সংখ্যাটির উৎস বলা নেই। তিনটি সংখ্যাতেই একটি কথা মেলে: চা-বাগানের মানুষকে একটি জাতি ধরে নেওয়া ভুল।
ভেতরের ভাগও সরল নয়। ডেইলি স্টারের 2019 সালের প্রতিবেদন সেডের গবেষণা উদ্ধৃত করে জানায়, “তাঁতি” নামে চার আলাদা দল পাওয়া গেছে, যারা যথাক্রমে তেলেগু, জংলি (বাংলার একটি রূপ), সাদরি ও ওড়িয়া ভাষায় কথা বলে, আর যাদের শিকড় অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও উড়িষ্যায়। একই নাম, চার উৎস — এই একটি উদাহরণই দেখায় কেন নাম দেখে কারও উৎস অনুমান করা যায় না।
চা-বাগানের জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে পূর্ণ নামতালিকা সেডের (Society for Environment and Human Development) 2016 সালের বই Slaves In These Times: Tea Communities of Bangladesh, সম্পাদক ফিলিপ গাইন। বইয়ের সূচিপত্রে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর আলাদা পরিচিতি আছে, ইংরেজি বানানে।
বইটির মুখবন্ধ বলছে, এই 80টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র নয়টির নাম 1991 সালের শুমারি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, 2010-এ ছিল: ত্রিপুরা, সাঁওতাল, ওরাওঁ, রাজবংশী, মারমা, মণিপুরী, মুন্ডা, মাহালী (Mahale) ও গারো। বাকি 71টি (বাঙালিসহ) ছিল সরকারি নথির বাইরে। মাঠ-গবেষণায় সম্প্রদায়ের সদস্যরাই যুক্ত ছিলেন — বইয়ের কৃতজ্ঞতা-তালিকায় মাঠ-গবেষক হিসেবে আছেন আশা ওরনাল, সঞ্জয় কৈরি, পরিমল সিং বাড়াইক, রামভজন কৈরি প্রমুখ।
সূচিপত্রে ছাপা নামগুলো, মূল ইংরেজি বানানে (বাংলা বানান সব নামের জন্য কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি, তাই অনুবাদ করা হয়নি):
Almik, Bakti, Bangalee, Baraik, Barma, Bashphor, Bauri, Been, Bhar, Bhokta, Bhuiya, Bhumij, Bihari, Bunerjee, Chasha, Chatri, Dusad, Garo, Ghatuar, Giri, Goala, Ganju, Gorait, Goswami, Gour, Goyashur (Ashur), Hajra, Jhora, Kahar, Kairi, Kalindi, Kalowar, Kanu, Karmokar, Keot, Kharia, Khodal, Kol, Kondo, Kora, Kumar, Kurmi, Lohar, Mandraji, Mahale, Majhi, Mal, Marma, Monipuri, Mridha, Munda, Mushohor, Naidu, Nayek, Nepali, Noonia, Oraon (Orang), Painka, Pashi, Patro, Phulmali, Pandit, Pradhan, Rajballobh, Rajbhar, Rajbongshi, Rajgor, Rajwar, Rautia, Reli, Robidas, Sadhu, Santal, Shabor, Sheel, Suklaboiddyo, Shobdokar, Tanti, Teli (Pal), Tongla, Tripura।
গুনলে সূচিপত্রে নাম 81টি, যদিও মুখবন্ধে সংখ্যা 80 — দুটি নাম একই জনগোষ্ঠীর কি না, বই থেকে স্পষ্ট নয়। তালিকায় গারো, মণিপুরী, মারমা ও ত্রিপুরার মতো নামও আছে, যাঁরা ব্রিটিশ আমলে আনা শ্রমিক বলে কোনো উৎসে বলা হয়নি; সেড তাঁদের রেখেছে কারণ তাঁরাও কোনো না কোনো বাগানে থাকেন। অর্থাৎ এটি “চা-বাগানে কারা থাকেন” তার তালিকা, “কাদের আনা হয়েছিল” তার নয়।
আইএলও-শাবিপ্রবি গবেষণার 38টি নামের তালিকা আলাদা, এবং বানানেও আলাদা: Koirey, Lohar, RobiDas, Bagdee, Bhumij, Bauri, Bahadur, Nayek, Rikiason, Shobdokar, Ashon, Naidu, Donia, Rai, Munda, Chotree, Patra, Kalindee, Kumir, Halder, Kondo, Bhumia, Orao, Santal, Mahali, Barai, Rajbhar, Shill, Pashi, Kharia, Goala, Bunargee, Nunia, Uria, Kaloar, Bhuian, Kurmi ও Khasis। গবেষকেরা লিখেছেন, এদের মধ্যে কৈরি (Koirey) দলটিতে শিক্ষিত মানুষ বেশি, আর পঞ্চায়েত ও চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বেও তাঁরা এগিয়ে। 2022 সালে ইউএনবিতে আফসান চৌধুরীর লেখায় যে নামতালিকা ছাপা হয়েছিল, তা এই আইএলও তালিকারই প্রায় হুবহু রূপ — তাই সেটিকে আলাদা উৎস হিসেবে গোনা যায় না।
শ্রমিক আনা একবারে ঘটেনি; প্রায় সত্তর-আশি বছর ধরে ঢেউয়ে ঢেউয়ে চলেছে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দেশের প্রথম চা-বাগান 1854 সালে সিলেটের মালনীছড়ায়, আর চা-করেরা উনিশ শতকের মাঝামাঝি ছোটনাগপুর, ঝাড়খণ্ড ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে শ্রমিক জোগাড় করেন। সিলেটে আমদানির চূড়া 1890-এর দশক।
সংখ্যাটা পাওয়া যায় বি. সি. অ্যালেনের Assam District Gazetteers, Vol. II: Sylhet (1905) থেকে। গেজেটিয়ার লিখছে, স্থানীয় শ্রমিক “generally unsatisfactory”, তাই বাগান চালাতে শ্রমিক আনতে হয় ভারতের অন্য অংশ থেকে। আমদানির হিসাব:
| সময় | সিলেটের বাগানে আনা শ্রমিক |
|---|---|
| 1881–1890 (দশ বছর) | 71,950 |
| 1891–1900 (দশ বছর) | 1,41,650 |
| সর্বোচ্চ এক বছর: 1895 | 26,450 |
| সর্বোচ্চ এক বছর: 1896 | 27,080 |
উৎস: B. C. Allen, Assam District Gazetteers Vol. II (Sylhet), 1905, অধ্যায় IV। 1896 সালটি স্ক্যান-করা পাঠে অস্পষ্ট; ক্রম অনুযায়ী এটি 1895-এর পরের বছর।
বিশ শতকেও স্রোত থামেনি। 1921 সালের আসাম শুমারির প্রতিবেদন (জি. টি. লয়েড) জানায়, 1918–19 সালে আসাম প্রদেশে বাগান-শ্রমিকের সংখ্যা দশ লাখ ছাড়িয়েছিল, তারপর 1920–21-এর মন্দায় কমে। আমাদের সমতলের লেখায় উদ্ধৃত বাংলাপিডিয়া ভুক্তি অনুযায়ী কুর্মিদের আনা হয় উনিশ শতকের শেষার্ধে, আর ভূমিজরা সিলেটের চা-বাগানে আসেন বিশ শতকের প্রথম দিকে — দুটি ভুক্তির বিস্তারিত আছে সমতলের আদিবাসী জাতিগুলো নিয়ে লেখায়।
শুরুর তারিখ নিয়ে উৎসে অমিল আছে। আমাদের আর্কাইভে চা-শ্রমিক সন্তান মোহন রবিদাসের লেখা চা-শ্রমিকদের মুল্লুকে চলো আন্দোলনঃ একটি অলিখিত আখ্যান শ্রমিকদের আগমনকাল বলেছে “১৮৩৪-৩৫ সালে”; বাংলাপিডিয়া প্রথম বাগানের সাল দিয়েছে 1854, আর শ্রমিক জোগাড়ের সময় উনিশ শতকের মাঝামাঝি। মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেটের শ্রমিকদের প্রসঙ্গে ডেইলি স্টার (2019) সেডের গবেষণা উদ্ধৃত করে বলেছে “প্রায় 150 বছর আগে”।
প্রতিটি জাতির নিজস্ব আগমন-সাল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নথিতে নেই। মুন্ডাদের নিয়ে লেখায় যেমন বলা হয়েছে, চা-বাগানে মুন্ডাদের ঠিক কবে আনা হয়েছিল, আলাদা করে এমন কোনো তারিখ কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
শ্রমিকেরা এসেছিলেন মূলত পাঁচ অঞ্চল থেকে: ছোটনাগপুর, যুক্তপ্রদেশ (আজকের উত্তর প্রদেশ), মধ্যপ্রদেশ (তখনকার Central Provinces), মাদ্রাজ ও উড়িষ্যা, সঙ্গে বাংলার পশ্চিমাঞ্চল। সিলেটের বৈশিষ্ট্য ছিল এই: আসামের অন্য বাগানের তুলনায় এখানে যুক্তপ্রদেশের মানুষ বেশি, ছোটনাগপুরের মানুষ কম।
অ্যালেনের গেজেটিয়ার 1901 সালের শুমারি থেকে এই হিসাব দেয়:
কেন এই ভাগ, তার ব্যাখ্যাও গেজেটিয়ারে আছে, আর সেটি ঔপনিবেশিক চোখের ব্যাখ্যা: সিলেটের আবহাওয়া যুক্তপ্রদেশের মানুষের জন্য “not unsuited”, তাই চা-করেরা তাঁদের দিয়ে কাজ চালাতে পারতেন; অন্যদিকে ছোটনাগপুর মালভূমির সাঁওতাল ও অন্যান্য “jungly tribes”-কে আনতে মাথাপিছু প্রায় একশো টাকা লাগত, তাই তাঁরা সিলেটে তুলনামূলক কম।
জেলার মোট জনসংখ্যার তুলনায় এই আগন্তুকেরা অবশ্য ছোট একটি অংশ ছিলেন। গেজেটিয়ার জানায়, 1901 সালের শুমারিতে প্রদেশের বাইরে জন্মানো মানুষ সিলেটের জনসংখ্যার মাত্র 7 শতাংশের কিছু বেশি, যেখানে কাছাড়, দরং, শিবসাগর ও লখিমপুরের মতো অন্য চা-জেলায় অনুপাতটি 24 থেকে 41 শতাংশ। মহকুমা ধরে পার্থক্য বড়: দক্ষিণ সিলেটে 16 শতাংশ, করিমগঞ্জে 10, সুনামগঞ্জে মাত্র 4। গেজেটিয়ার এ-ও সতর্ক করেছে, বাইরে-জন্মানো 1,64,895 জনের সবাই বাগান-শ্রমিক নন: 88 হাজারের বেশি এসেছিলেন পার্বত্য ত্রিপুরা ও বাংলার পাশের তিন জেলা থেকে, যাঁদের 30 হাজার থাকতেন সীমান্তবর্তী সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ মহকুমায়। গেজেটিয়ারের মতে এঁরা মূলত সীমান্তের ওপার থেকে কয়েক মাইল সরে আসা মানুষ, বাগান-শ্রমিকদের থেকে “a quite different category”।
দুই দশক পরে, 1921 সালের শুমারিতে, আসামের চা-জেলাগুলোর মধ্যে বাগান-জনসংখ্যায় সিলেট তৃতীয়: লখিমপুর (2,33,000) ও শিবসাগরের (2,29,000) পরেই সিলেট (1,69,000), তারপর কাছাড় (1,38,000)। প্রতিবেদন অনুযায়ী আসামের বাগানের দুই-তৃতীয়াংশ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায়, বাকি এক-তৃতীয়াংশ সুরমা উপত্যকায় — সিলেট আর কাছাড়ে।
1921 সালের মধ্যে ছবি বদলাতে শুরু করে। লয়েডের শুমারি-প্রতিবেদন বলছে, যুক্তপ্রদেশ থেকে আসা মানুষ সব চা-জেলাতেই কমেছেন, কারণ ম্যানেজারেরা ক্রমশ ছোটনাগপুর, মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা ও মাদ্রাজের শ্রমিক পছন্দ করছিলেন। প্রতিবেদনের ভাষায়, মুন্ডা, সাঁওতাল, গোন্দ প্রভৃতিকে “the best men for the climate and the work of tea gardens” মনে করা হতো। প্রতিবেদন এ-ও লেখে, যুক্তপ্রদেশের শ্রমিকেরা বেশি ছিলেন সুরমা উপত্যকায়, যেখানে 1920 সালের মন্দা সবচেয়ে কঠিন আঘাত করেছিল। বাংলার পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় 7,000 জন বাগান থেকে কমে যাওয়ার কথাও আছে, কারণ ম্যানেজারেরা “prefer new recruits from Bihar and Orissa”।
আমাদের আর্কাইভের লেখায় মোহন রবিদাস জেলার নাম দিয়েছেন: বিহারের রাঁচী, হাজারিবাগ, সাঁওতাল পরগণা, ডুমকা ও গয়া; উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্জ, গঞ্জাম, সম্বলপুর ও চাইবাসা; মধ্যপ্রদেশের রায়পুর, রামপুরহাট ও জব্বলপুর; সঙ্গে উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, এমনকি নেপাল। সেডের বইয়ের মুখবন্ধে রাজ্যের তালিকা: বিহার, মাদ্রাজ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর প্রদেশ।
1921 সালের শুমারিতে ধর্মের হিসাবেও এই স্রোতের ছাপ আছে। আসামের চা-বাগানের 9,22,000 মানুষের মধ্যে “Animist” ছিলেন প্রায় 1,10,000, মোটের 12 শতাংশ, যেখানে 1911 সালে অনুপাতটি ছিল 9 শতাংশের কিছু বেশি। প্রতিবেদন এটিকে ছোটনাগপুর ও মধ্যপ্রদেশ থেকে বাড়তি নিয়োগের চিহ্ন বলে ব্যাখ্যা করেছে।
শ্রমিক জোগাড় হতো দালালের মাধ্যমে — প্রথমে ঠিকাদার বা “আড়কাঠি”, পরে বাগানেরই পাঠানো “সর্দার”। আর একবার বাগানে পৌঁছালে শ্রমিককে বেঁধে রাখত চুক্তি-আইন: 1859 সালের ভারতীয় আইন XIII, যা অগ্রিম টাকা নিয়ে কাজ না করলে কারাদণ্ডের বিধান দিত।
আর্কাইভের লেখায় মোহন রবিদাস লিখেছেন, 1841 সালের দিকে “ফ্রি কনট্রাক্টরস” পদ্ধতিতে চা-করেরা স্থানীয় এজেন্টদের সঙ্গে চুক্তি করতেন; এই এজেন্টদেরই বলা হতো আড়কাঠি। গ্রামে গ্রামে তাঁরা বলতেন, চা-বাগানে “গাছ হিলায়ে গা তো পাইসা মিলেবে” — গাছ নাড়লে টাকা মিলবে। লেখাটি জাহাজে ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ মানুষ তোলা আর পথে কলেরায় মৃত্যুর বিবরণ দেয়, এবং গ্রিফিথসের (1967) সূত্রে বলে, 1863–1866 সালে এ অঞ্চলে আনা 84,915 শ্রমিকের মধ্যে 30,000 জন মারা যান।
অ্যালেনের গেজেটিয়ার (1905) আইনি দিকটি লেখে। আমদানির খরচ বেশি, তাই চা-কর এমন নিশ্চয়তা চাইতেন যে শ্রমিক কিছুকাল থাকবেন; সেই নিশ্চয়তা দিত Act XIII of 1859, যা ম্যাজিস্ট্রেটকে অগ্রিম নেওয়া শ্রমিককে চুক্তি পূরণের আদেশ দিতে এবং অস্বীকার করলে কারাদণ্ড দিতে ক্ষমতা দিত। গেজেটিয়ারের হিসাবে 1903 সালে এ আইনে সিলেটে কারাদণ্ড হয়েছিল 13 জন “deserter”-এর।
মৃত্যুর হিসাবও গেজেটিয়ারে আছে। প্রাপ্তবয়স্ক বাগান-শ্রমিকদের গড় মৃত্যুহার 1880–89 সালে ছিল হাজারে 33, পরের দশকে 27; সবচেয়ে খারাপ বছর 1897, হাজারে 51। গেজেটিয়ার নিজেই স্বীকার করেছে, প্রদেশে মৃত্যু-নিবন্ধনের ব্যবস্থা “extremely defective” ছিল, তাই নথিভুক্ত হার প্রকৃত মৃত্যুর চেয়ে কম।
1921 সালের মধ্যে পদ্ধতি বদলেছিল। লয়েডের প্রতিবেদন জানায়, ঠিকাদার দিয়ে নিয়োগ তখন বিলুপ্ত, চালু হয়েছে “সর্দারি” ব্যবস্থা: বাগান থেকে বাছাই করা সর্দারদের প্রতি মৌসুমে তাঁদের নিজ জেলায় পাঠানো হতো, তাঁরা আত্মীয়-বন্ধুদের নিয়ে আসতেন। Tea Districts Labour Supply Association প্রতি প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সাধারণত 15 টাকা, শিশুর জন্য 7–8 টাকা কমিশন পেত, সর্দারও মাথাপিছু টাকা পেতেন। ম্যানেজারেরা পরিবারসহ লোক আনতে পছন্দ করতেন, কারণ একা পুরুষ পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। প্রতিবেদন লিখেছে, 1859 সালের চুক্তি-আইন ন্যায্য কি না, তা নিয়ে তখন সরকারি কমিটির তদন্ত চলছিল।

সিলেটের চা-বাগানের মানুষকে জাতি ধরে গোনার সবচেয়ে বিস্তারিত সরকারি নথি 1921 সালের আসাম শুমারির প্রাদেশিক সারণি X, “Tea-Garden Population by Caste”। এতে সিলেট জেলার বাগানে মোট মানুষ 1,63,222। নাম ধরে সবচেয়ে বড় দল Chamar (18,198), তারপর Bauri (6,994), Munda (5,959), Tanti (5,692) ও Pan (5,638); আর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, 51,800 জন, লেখা হয়েছে “Others” ঘরে।
সারণিটি বাগান-জনসংখ্যার “important castes” আলাদা দেখায়, সব জাতি নয়, আর হিন্দু ও “Animist” — দুই ধর্মের ঘর আলাদা। নিচের সংখ্যা হিন্দু ও Animist মিলিয়ে, পুরুষ ও নারী যোগ করে। নামগুলো সারণির মূল ইংরেজি বানানে রাখা হয়েছে, কারণ 1921 সালের এই শ্রেণিগুলো আজকের কোন সম্প্রদায়ের সঙ্গে মেলে, সারণি তা বলে না।
| সারণির নাম | সিলেটের বাগানে (1921) | টীকা |
|---|---|---|
| Chamar | 18,198 | সবই হিন্দু ঘরে |
| Bauri | 6,994 | 41 জন Animist |
| Munda | 5,959 | 219 জন Animist |
| Tanti | 5,692 | |
| Pan (Panika) | 5,638 | 1 জন Animist |
| Bhuiya | 4,970 | 7 জন Animist |
| Bhar | 4,528 | |
| Bhumij | 4,197 | 30 জন Animist |
| Goala | 4,039 | |
| Santal | 3,875 | 2,207 জন Animist |
| Kamar | 3,437 | 96 জন Animist |
| Kurmi | 3,395 | |
| Ahir | 3,027 | |
| Musahar | 2,675 | |
| Koiri | 2,545 | |
| Ghasi | 2,170 | |
| Oraon | 2,034 | 31 জন Animist |
| Kayastha | 1,975 | |
| Teli | 1,696 | |
| Dhoba | 1,477 | |
| Kumhar | 1,470 | |
| Dosadh | 1,409 | |
| Malo | 1,298 | |
| Brahman | 1,291 | |
| Bagdi | 1,210 | |
| Lohar | 1,166 | |
| Nuniya | 1,156 | |
| Bhogta | 929 | |
| Sudra | 767 | |
| Gond | 729 | |
| Yogi | 715 | |
| Kharia | — | সিলেটের ঘরে কোনো সংখ্যা নেই |
| Others (অন্যান্য) | 51,800 | 271 জন Animist; সারণির সবচেয়ে বড় ঘর |
উৎস: Census of India 1921, Vol. III (Assam), Part II, Provincial Table X, পৃ. 366–371। সুরমা ভ্যালি বিভাগের সংখ্যা থেকে কাছাড়ের সংখ্যা বাদ দিয়ে সিলেটের সংখ্যা মিলিয়ে দেখা হয়েছে। এখানে সিলেটের ঘরে 700-এর বেশি সংখ্যার নামগুলো দেখানো হয়েছে; Dom-এর সংখ্যা স্ক্যানে অস্পষ্ট বলে বাদ। মুসলমানদের জন্য সারণির আলাদা একটি অংশ (Part B) আছে, তা এখানে ধরা হয়নি।
সারণি পড়ার সময় তিনটি জিনিস মনে রাখা দরকার। এক, সারণির নিজের টীকা বলছে, এর মোট সংখ্যা অন্য চা-বাগান সারণির সঙ্গে মেলে না; প্রতিবেদনের মূল অংশে সিলেটের বাগান-জনসংখ্যা লেখা আছে প্রায় 1,69,000। দুই, গোনার সময় “জাতি” লেখা হয়েছিল শুমারির নির্দেশিকায় দেওয়া তালিকা ধরে — প্রতিবেদন জানায়, চা-বাগানের অভিবাসীদের জন্য জাতির তালিকা শুমারি-কোডেই দেওয়া ছিল। তিন, বাগানে ম্যানেজার, কেরানি, দোকানিসহ সবাইকে গোনা হয়েছে, কেবল শ্রমিককে নয়।
“Others” ঘরটির আকারও একটি তথ্য: 1921 সালেই সিলেটের বাগানের প্রতি তিনজনে প্রায় একজন শুমারির “important castes”-এর কোনো নামে পড়েননি। আজকের জনশুমারির “অন্যান্য” ঘরের সমস্যাটি তাই নতুন নয়।
তবু সারণিটি এমন একটি জিনিস দেখায়, যা আজকের কোনো নথি দেখায় না: একশো বছর আগে সিলেটের চা-বাগানের সবচেয়ে বড় দলগুলো সরকারি “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী” তালিকার জাতি ছিল না। মুন্ডা, সাঁওতাল, ভূমিজ, ওরাওঁ আজ তালিকায় আছে; কিন্তু Chamar, Bauri, Tanti, Pan, Bhar, Goala, Ahir, Koiri — এই নামগুলো 2019 সালের 50টি নামের কোথাও নেই। 1921 সালের পরের শুমারিতে এ ধরনের সারণি আর তৈরি হয়নি: 1931 সালের আসাম শুমারি জানায়, “for reasons of economy” চা-বাগানের জাতিভিত্তিক সারণি পুনরাবৃত্তি করা হয়নি, শুধু লিঙ্গ ও ধর্ম ধরে মোট সংখ্যা ছাপা হয়েছে।
Kharia-র শূন্য ঘরটি আলাদা করে লক্ষ করার মতো। সমতলের লেখায় উদ্ধৃত বাংলাপিডিয়া ভুক্তি বলছে খাড়িয়ারা ব্রিটিশ আমলে চা-শ্রমিক হিসেবে সিলেটে আসেন, আর 2022 সালে মৌলভীবাজারেই খাড়িয়া 2,012 জন। অথচ 1921 সালের সারণিতে সিলেটের বাগানে Kharia নামে কাউকে গোনা হয়নি। তাঁরা তখন অন্য নামে লেখা হয়েছিলেন, নাকি পরে এসেছিলেন — সারণি তা বলে না।
জনশুমারি 2022 অনুযায়ী মৌলভীবাজার জেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ 73,303 জন, হবিগঞ্জে 41,573 জন, সিলেট জেলায় 16,508 জন। চা-বাগানের সঙ্গে যুক্ত জাতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় মুন্ডা — মৌলভীবাজারে 8,158, হবিগঞ্জে 13,152; তারপর সাঁওতাল, ওরাওঁ ও ভূমিজ।
শুমারি কারও বাসস্থান “চা-বাগান” কি না, তা রেকর্ড করে না; গোনে কেবল জাতি। তাই নিচের সংখ্যা ওই জাতির জেলার সব মানুষের, শুধু বাগানবাসীর নয়। ছকে কেবল সেই জাতিগুলো রাখা হয়েছে, যাদের চা-বাগানে থাকার কথা অন্তত একটি উৎসে আছে — সেডের তালিকা, আইএলও-শাবিপ্রবি তালিকা, অথবা ডেইলি স্টার বাংলায় (2025) সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিকসের (সিল) উদ্ধৃত চা-বাগানের বিপন্ন ভাষাগুলোর তালিকা। নামের বানান 2019 সালের সরকারি গেজেটের।
| জাতি (গেজেটের বানান) | মৌলভীবাজার | হবিগঞ্জ | সিলেট বিভাগ | সারা দেশ | দেশের কত % সিলেট বিভাগে |
|---|---|---|---|---|---|
| মুন্ডা | 8,158 | 13,152 | 22,125 | 60,201 | 36.8 |
| সাঁওতাল | 6,308 | 6,666 | 13,274 | 1,29,056 | 10.3 |
| ওরাওঁ | 4,468 | 2,551 | 7,666 | 85,858 | 8.9 |
| ভূমিজ | 3,318 | 3,184 | 6,962 | 9,664 | 72.0 |
| মাহাতো/কুর্মি মাহাতো/বেদিয়া মাহাতো | 2,632 | 242 | 3,520 | 19,271 | 18.3 |
| খারিয়া/খাড়িয়া | 2,012 | 843 | 2,859 | 3,100 | 92.2 |
| বড়াইক/বাড়াইক | 995 | 960 | 2,538 | 3,447 | 73.6 |
| মাহালী | 469 | 1,214 | 2,005 | 6,614 | 30.3 |
| শবর | 1,036 | 611 | 1,853 | 1,980 | 93.6 |
| কন্দ | 1,006 | 170 | 1,735 | 1,899 | 91.4 |
| গঞ্জু | 865 | 262 | 1,581 | 4,137 | 38.2 |
| লোহার | 716 | 160 | 1,528 | 3,420 | 44.7 |
| তেলী | 828 | 133 | 1,065 | 2,082 | 51.2 |
| গড়াইত | 498 | 265 | 827 | 2,730 | 30.3 |
| কোল | 436 | 306 | 774 | 3,822 | 20.3 |
| তুরি | 426 | 26 | 601 | 3,794 | 15.8 |
| মুসহর | 415 | 27 | 456 | 4,603 | 9.9 |
| বাগদী | 342 | 614 | 989 | 12,096 | 8.2 |
| কড়া | 30 | 52 | 150 | 816 | 18.4 |
| অন্যান্য | 3,483 | 6,215 | 13,707 | 68,588 | 20.0 |
| সব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী | 73,303 | 41,573 | 1,36,692 | 16,50,478 | 8.3 |
উৎস: বিবিএস, জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022 — জেলা প্রতিবেদন মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ, সারণি P17; জাতীয় প্রতিবেদন (খণ্ড I), সারণি P28 ও P29। “সিলেট বিভাগ” কলামে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা একসঙ্গে। শতাংশ নিজস্ব হিসাব।
শেষ কলামটিই সবচেয়ে বেশি বলে। শবর (93.6%), খারিয়া/খাড়িয়া (92.2%), কন্দ (91.4%), বড়াইক/বাড়াইক (73.6%) ও ভূমিজ (72.0%) — এই পাঁচটি জাতির প্রায় সবাই সিলেট বিভাগে। অর্থাৎ বাংলাদেশে এই জাতিগুলোর অস্তিত্বই প্রায় পুরোপুরি চা-অঞ্চলকেন্দ্রিক। উল্টো দিকে সাঁওতাল (10.3%), ওরাওঁ (8.9%) ও বাগদীদের (8.2%) বড় অংশ থাকেন উত্তরবঙ্গে; চা-বাগানে তাঁদের একটি শাখা মাত্র। মুন্ডা মাঝামাঝি: দেশের মুন্ডাদের প্রায় 37% সিলেট বিভাগে।
মৌলভীবাজারের মোট ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বড় অংশ অবশ্য চা-বাগানের মানুষ নন: মণিপুরী 18,031, খাসিয়া/খাসি 10,045, গারো 4,132। আইএলও-শাবিপ্রবি গবেষণা খাসি ভাষাভাষীদের বাগানে পেয়েছে, আর সেডের তালিকায় গারো ও মণিপুরীর নাম আছে — কিন্তু এঁদের ব্রিটিশ আমলে শ্রমিক হিসেবে আনা হয়েছিল, এমন কথা কোনো উৎসে নেই। শুমারির জেলা-সংখ্যাকে তাই “চা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা” পড়া ভুল হবে।

উপজেলা ধরে দেখলে ছবিটা আরও স্পষ্ট। হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ 28,439 জন, যার 10,304 জন মুন্ডা — দেশের যেকোনো উপজেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে মোট 28,383, তবে সেখানে সবচেয়ে বড় দল মণিপুরী (15,708); শ্রীমঙ্গলে সবচেয়ে বেশি সাঁওতাল (2,513)।
| উপজেলা | মোট ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী | সবচেয়ে বড় পাঁচটি দল (2022) |
|---|---|---|
| চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) | 28,439 | মুন্ডা 10,304 · অন্যান্য 3,583 · সাঁওতাল 3,006 · ভূমিজ 2,174 · ওরাওঁ 2,028 |
| কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) | 28,383 | মণিপুরী 15,708 · মুন্ডা 2,409 · ওরাওঁ 1,655 · অন্যান্য 1,301 · খাসিয়া/খাসি 1,029 |
| শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) | 15,434 | সাঁওতাল 2,513 · গারো 1,741 · খাসিয়া/খাসি 1,556 · মুন্ডা 1,417 · ভূমিজ 1,146 |
| কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) | 10,893 | খাসিয়া/খাসি 4,472 · ওরাওঁ 1,340 · গারো 1,333 · খারিয়া/খাড়িয়া 850 · অন্যান্য 465 |
| জুড়ী (মৌলভীবাজার) | 8,652 | মুন্ডা 2,586 · সাঁওতাল 1,689 · মণিপুরী 1,078 · ওরাওঁ 601 · মাহাতো 420 |
| মাধবপুর (হবিগঞ্জ) | 8,572 | মুন্ডা 2,341 · সাঁওতাল 2,109 · অন্যান্য 1,835 · ভূমিজ 980 · ওরাওঁ 407 |
| বড়লেখা (মৌলভীবাজার) | 6,228 | খাসিয়া/খাসি 2,382 · মুন্ডা 883 · সাঁওতাল 605 · অন্যান্য 594 · ভূমিজ 533 |
| বাহুবল (হবিগঞ্জ) | 3,858 | সাঁওতাল 1,516 · অন্যান্য 503 · খাসিয়া/খাসি 451 · মুন্ডা 361 · ত্রিপুরা 189 |
উৎস: বিবিএস, জনশুমারি 2022, জেলা প্রতিবেদন মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ, সারণি P17।
শ্রীমঙ্গলে খারিয়া/খাড়িয়া 842 জন — বাংলাপিডিয়ার খাড়িয়া ভুক্তি যে বলছে তাঁদের অধিকাংশ শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানে, শুমারি তার সঙ্গে মেলে, যদিও কুলাউড়ায়ও প্রায় সমান (850)। চুনারুঘাটে মাহালী 1,173 আর বড়াইক/বাড়াইক 932; শ্রীমঙ্গলে কন্দ 524; জুড়ীতে শবর 310। সংখ্যাগুলো ছোট, কিন্তু প্রতিটি একটি আলাদা জাতির — একটি “চা-শ্রমিক” পরিচয়ের নিচে ঢেকে থাকা আলাদা আলাদা মানুষ।
চুনারুঘাট আর মাধবপুরে “অন্যান্য” ঘরটিও বড় (যথাক্রমে 3,583 ও 1,835)। 50টি নামের কোনোটিতে না পড়া মানুষেরা এই ঘরে যান। এই দুটি উপজেলা চা-অঞ্চল, তাই এ ঘরের একটি অংশ তালিকার বাইরের চা-বাগান-জনগোষ্ঠী হওয়া সম্ভব — তবে শুমারি তা ভেঙে দেখায় না, তাই কারা, তা জানা যায় না।
জনশুমারি 2022 চা জনগোষ্ঠীর পুরো সংখ্যা দেয় না, তিনটি কারণে: শুমারি গোনে কেবল 50টি তালিকাভুক্ত নাম, বাকিরা হয় “অন্যান্য” ঘরে যান, নয়তো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবেই গোনা হন না; সম্প্রদায়ের নেতারা গণনায় বাদ পড়ার অভিযোগ করেছেন; আর শুমারিতে বাসস্থান হিসেবে চা-বাগান আলাদা করা হয় না।
ডেইলি স্টার বাংলার 9 আগস্ট 2022 সালের প্রতিবেদন (পিনাকী রায় ও মিন্টু দেশোয়ারা) কয়েকটি জাতির শুমারির সংখ্যার পাশে সম্প্রদায়ের নিজস্ব হিসাব রেখেছিল:
| জাতি | শুমারি 2022 (প্রাথমিক) | সম্প্রদায়ের হিসাব ও বক্তা |
|---|---|---|
| খড়িয়া (খাড়িয়া) | 3,099 | 2020 সালের শুরুতে সিলেট বিভাগের 41টি গ্রামে জরিপে 5,700 — পিউস নানাউর |
| কোরা (কড়া) | 816 | প্রায় 2,000; সিলেট বিভাগের আরও 26টি চা-বাগানে বসবাস — রিদেশ মুদি, মালনীছড়া চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক |
| বেদিয়া মাহাতো | 7,207 | নিজস্ব সমীক্ষায় 14–15 হাজার — বিভূতিভুষণ মাহাতো |
| গোর্খা | 100 | বান্দরবান ও সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জের চা-বাগানে 83টি পরিবার — পরিমল সিং বারাইক, চা জনগোষ্ঠী আদিবাসী ফ্রন্ট |
একই প্রতিবেদনে শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট ইউনিয়নের সুপারভাইজার রিপন বন্দোপাধ্যায় জানান, কিছু তথ্য সংগ্রাহক “ঝামেলা এড়াতে” ডিভাইসের “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী” অপশন ব্যবহার করেননি; কুলাউড়ার কর্মধা ইউনিয়নের মাঠকর্মী রাম পাপাং জানান, দুর্গম তিনটি গ্রামে শুরুতে জরিপই হয়নি। শুমারি প্রকল্পের কারিগরি প্রধান দীপংকর রায় বলেছেন, প্রতিবেদন তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি। দুই পক্ষের বক্তব্যই প্রতিবেদনে আছে।
খাড়িয়ার সংখ্যায় একটি ছোট পার্থক্যও আছে: আগস্ট 2022-এর প্রাথমিক হিসাবে 3,099, চূড়ান্ত জাতীয় প্রতিবেদনে 3,100। শুমারিতে জাতিগোষ্ঠী কীভাবে গোনা হয় আর তার সীমা কোথায়, তার বিস্তারিত আছে আমাদের জনশুমারিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গোনার পদ্ধতি নিয়ে লেখায়।
চা জনগোষ্ঠীর মোট মানুষের সংখ্যা উৎসভেদে 3,59,085 থেকে প্রায় 15 লাখ পর্যন্ত; বাগানের সংখ্যা 156 থেকে 172। কোনো সংখ্যাই জাতি ধরে ভাঙা নয়, আর কোনোটিই সরাসরি চা বোর্ডের প্রকাশনা থেকে পড়া নয় — সবই অন্য উৎসে উদ্ধৃত।
| উৎস | বাগান | শ্রমিক | মোট জনগোষ্ঠী |
|---|---|---|---|
| বাংলাপিডিয়া (আশফাক হোসেন) | 162 (2010): সিলেটে 135, চট্টগ্রামে 23, রংপুরে 4 | 1970-এর দশকে প্রায় 1,20,000 স্থায়ী; এখন প্রায় 1.5 লাখ সরাসরি নিযুক্ত | 1970-এর দশকে নির্ভরশীল 3,50,000 |
| আইএলও-শাবিপ্রবি (2016) | 164, সাত জেলায় | 89,812 নিবন্ধিত + 19,592 অস্থায়ী | 3,59,085 (বাগান এলাকায়) |
| সেড (2016) | চা বোর্ডের 2015 সালের তালিকায় 160, জনবসতি 156টিতে | — | — |
| মোহন রবিদাস, আর্কাইভ (চা বোর্ড 2015 উদ্ধৃত) | 241 (ফাঁড়িসহ) | স্থায়ী 1,19,000; ভবিষ্য তহবিল পান 93,500 | প্রায় 15 লাখ |
| ডেইলি স্টার বাংলা 2025 (সেড উদ্ধৃত) | 158 | 1,38,000 | প্রায় 5 লাখ |
| ঢাকা ট্রিবিউন, অক্টোবর 2022 (চা বোর্ড উদ্ধৃত) | 167 (1970 সালে 150) | আগস্ট 2022-এর ধর্মঘটে প্রায় 1,50,000 | — |
| বিডিনিউজ২৪, মে 2025 | 170 | — | — |
| টিবিএস বাংলা, জুন 2026 (চা বোর্ড উদ্ধৃত) | 172 | — | — |
বাগানের সংখ্যার পার্থক্যের একটি অংশ ব্যাখ্যা করা যায়: সময়ের সঙ্গে পঞ্চগড়ের মতো উত্তরবঙ্গের জেলায় নতুন বাগান হয়েছে, আর সেডের হিসাবে কয়েকটি তালিকাভুক্ত বাগান চালু নেই বা সেখানে কেউ থাকেন না। 241 সংখ্যাটি “ফাঁড়িসহ”, অর্থাৎ বড় বাগানের শাখা-বাগানও আলাদা গোনা। মোট জনসংখ্যার পার্থক্য — 3.6 লাখ থেকে 15 লাখ — ব্যাখ্যার মতো কোনো তথ্য উৎসগুলোতে নেই।
চা বোর্ডের সংখ্যাগুলো বাগান ও শ্রমিকের, জাতির নয়। চা বোর্ড বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থা বাগানের মানুষকে জাতি ধরে গুনেছে, এমন কোনো প্রকাশনা পাওয়া যায়নি। শেষবার এমন সরকারি গণনা হয়েছিল 1921 সালে।
চা-বাগানের অনেক জাতি এখন সরকারি তালিকায় আছে — মুন্ডা, সাঁওতাল, ওরাওঁ ছিল 2010 সালেই, আর 2019 সালের প্রজ্ঞাপনে যোগ হয় ভূমিজ, খারিয়া/খাড়িয়া, বড়াইক/বাড়াইক, গঞ্জু, গড়াইত, কন্দ, কড়া, লোহার, তেলী, তুরি, মুসহর, শবর, বাগদী, মাহাতো ও আরও কয়েকটি। কিন্তু তাঁতি, কানু, রবিদাস, বাউরি, কৈরির মতো বড় দলগুলো এখনো তালিকার বাইরে।
সেডের 2016 সালের হিসাবে চা-বাগানের 80টি জনগোষ্ঠীর মাত্র নয়টি তখন সরকারি নথিতে ছিল। 2019 সালের 23 মার্চের গেজেটে তালিকা 27 থেকে 50-এ বাড়ে, আর নতুন 26টি নামের অনেকগুলোই চা-অঞ্চলের — কোন নাম কবে যুক্ত হলো, তার পূর্ণ হিসাব আছে স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা 27 থেকে 50 হওয়া নিয়ে লেখায়।
বাইরে থেকে যাওয়াদের কথা উৎসে স্পষ্ট। ডেইলি স্টারের 2019 সালের প্রতিবেদন জানায়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তালিকায় তাঁতিরা নেই; বাংলাদেশ টি ওয়ার্কার্স উইমেন ফোরামের সভাপতি গীতা রানী কানু বলেন, সরকার 50টি সম্প্রদায়কে স্বীকৃতি দিলেও দেশোয়ালি ভাষাভাষী তাঁর কানু সম্প্রদায়ের নাম নেই। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাখনলাল কর্মকার, নিজে কর্মকার সম্প্রদায়ের, চা-বাগানের সব সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি আর একটি চা-শ্রমিক ভাষা ও সংস্কৃতি একাডেমি দাবি করেন। আমাদের আর্কাইভে মোহন রবিদাসের লেখাতেও প্রথম দাবি “চা বাগানে বসবাসরত সকল জনগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তালিকায় অন্তভূক্ত করা”।
আইএলও-শাবিপ্রবি গবেষণা আরেকটি দিক তুলে ধরে: বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামও এই সম্প্রদায়গুলোর বেশিরভাগকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। গবেষকেরা লিখেছেন, আইএলও কনভেনশন 107 ও 169-এর মানদণ্ডে এঁদের আদিবাসী গণ্য করা যেতে পারে, আর কনভেনশন 169 আত্মপরিচয়ের ওপর জোর দেয়। স্বীকৃতি পেলে আইনত কী বদলায়, তা আলাদা প্রশ্ন; সেটি এই লেখার বিষয় নয়।
চা-বাগানে অন্তত 10 থেকে 15টি ভাষার কথা উৎসে আছে, তবে বেশিরভাগ বাগানে মানুষ এখন একটি মিশ্র যোগাযোগ-ভাষা ব্যবহার করেন। আইএলও-শাবিপ্রবি গবেষণা এটিকে বলেছে “language of tea garden” — বাংলা, দেশোয়ালি, হিন্দি ও অসমিয়ার মিশ্রণ। আলাদা মাতৃভাষাগুলো দ্রুত হারাচ্ছে।
আইএলও-শাবিপ্রবি গবেষণা 10টি ভাষা পেয়েছে। উড়িষ্যা থেকে আসা শ্রমিকেরা সাধারণত দেশালি বলেন, যাকে গবেষকেরা বাংলা ও ওড়িয়ার মিশ্রণ বলেছেন; কেউ কেউ একে ভোজপুরি বলেন। আরেক দল বলেন পরিবর্তিত হিন্দি। অল্প কয়েকজন অসমিয়া, মুন্ডা, ওরাওঁ (Orang) ও তেলেগু বলেন; সাঁওতালরা সাঁওতালি, খাসিরা খাসি।
ডেইলি স্টার বাংলার 2025 সালের প্রতিবেদন (মিন্টু দেশোয়ারা) চা-বাগানে অন্তত 15টি ভাষার কথা বলে, আর সিলের তালিকায় বিপন্নপ্রায় হিসেবে নাম দেয়: কন্দ, গঞ্জু, বানাই, বাড়াইক, বাগদি, ভূমিজ, খাড়িয়া, মালো, মুসহর, তেলি, তুরি, রাজোয়ার, হুদি ও ভুঁইমালী। প্রতিবেদন অনুযায়ী মালো, বাড়াইক ও গঞ্জু সম্প্রদায় মৌখিকভাবে সাদরি ব্যবহার করে, যার কোনো লিপি নেই। প্রতিবেদনে বিপন্ন ভাষার সংখ্যা 15 লেখা, তবে নাম আছে 14টি।
ব্যক্তিগত সাক্ষ্যও আছে। ডেইলি স্টারের 2019 সালের প্রতিবেদনে শ্রীমঙ্গলের বর্মাছড়া চা-বাগানের অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক ভেরোনিকা কেরকেটা জানান, তাঁর মাতৃভাষা খাড়িয়া এখন সক্রিয়ভাবে বলেন মাত্র দুই-তিনজন; বাগানে সবচেয়ে প্রচলিত ভাষা সাদরি। একই এলাকার খাড়িয়া সম্প্রদায়ের পিউস নানুয়ার খাড়িয়া বোঝেন না, তবে বলেন, সরকার সাদরি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক বই ছেপেছে। চা-বাগানে মুন্ডারি ভাষার অবস্থা আলাদা করে আছে মুন্ডাদের নিয়ে লেখায়; সিলেটের চা-বাগানের সৌরা ও কন্দদের ভাষার কথা আছে সমতলের আদিবাসী জাতিগুলো নিয়ে লেখায়।
যেখান থেকে আনা হয়েছিল, সেখানে ফিরে যাওয়ার সবচেয়ে বড় চেষ্টা 1921 সালের “মুল্লুকে চলো” আন্দোলন। আমাদের আর্কাইভে মোহন রবিদাসের লেখা অনুযায়ী সিলেট ও কাছাড়ের প্রায় ত্রিশ হাজার চা-শ্রমিক বাগান ছেড়ে রেলপথ ধরে হেঁটে চাঁদপুরের দিকে রওনা দেন; 20 মে চাঁদপুরে তাঁদের ওপর হামলা হয়, যে দিনটি এখন “চা-শ্রমিক হত্যা দিবস”।
“মুল্লুক” মানে আবাসভূমি — যে গ্রাম, যে জেলা থেকে তাঁদের বা তাঁদের বাবা-মাকে আনা হয়েছিল। আন্দোলনের পুরো বিবরণ, নিহতদের হিসাব না থাকা আর চার দফা আপসের কথা আছে মুল্লুকে চলো আন্দোলন নিয়ে আর্কাইভের লেখায়। এই লেখার প্রসঙ্গে একটি তথ্যই যোগ করার মতো: আন্দোলনটি ঘটে 1921 সালের শুমারির (মার্চ) কয়েক সপ্তাহ পরে, তাই উপরের Table X আন্দোলনের ঠিক আগের মুহূর্তের সিলেটের বাগানের মানুষের ছবি।
ফিরে যাওয়া হয়নি বেশিরভাগেরই। সেডের বইয়ের মুখবন্ধের ভাষায়, যে সম্প্রদায়গুলো দেড়শো বছরের বেশি বাগান আর লেবার লাইনে বাঁধা, তারা এখন “bona fide citizens of Bangladesh”। মুক্তিযুদ্ধে চা-বাগানের শ্রমিকদের অংশগ্রহণের একটি সাক্ষ্য আছে আমাদের আর্কাইভের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা লেখায়, চুনারুঘাটের লালচাঁদ চা-বাগানের শ্রমিকদের কথায়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের আদিবাসী জাতিগুলো নিয়ে আমাদের সব লেখা একসঙ্গে পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আদিবাসী বিষয়ক মূল পাতায়।
সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের চা-বাগানে বসবাসকারী সেই জাতিগুলো, যাঁদের পূর্বপুরুষদের ব্রিটিশ চা-করেরা উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ভারতের নানা অঞ্চল থেকে শ্রমিক হিসেবে এনেছিলেন। এঁরা একটি জাতি নন; সেডের 2016 সালের মানচিত্রায়নে 156টি বাগানে 80টি জনগোষ্ঠী পাওয়া গেছে, যেমন মুন্ডা, সাঁওতাল, ওরাওঁ, ভূমিজ, খাড়িয়া, তাঁতি, কানু ও রবিদাস।
মূলত ছোটনাগপুর, যুক্তপ্রদেশ (উত্তর প্রদেশ), মধ্যপ্রদেশ, মাদ্রাজ ও উড়িষ্যা থেকে, সঙ্গে বাংলার পশ্চিমাঞ্চল। 1905 সালের সিলেট গেজেটিয়ার অনুযায়ী 1901 সালে সিলেটে ছোটনাগপুরের মানুষ 24,627, যুক্তপ্রদেশের 51,068 (বেশিরভাগ গাজিপুর ও আজমগড়ের), মধ্যপ্রদেশের 18 হাজারের বেশি (প্রধানত বিলাসপুর ও জবলপুরের), মাদ্রাজের 10 হাজারের বেশি। 1921 সালের মধ্যে ম্যানেজারেরা ছোটনাগপুর, মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা ও মাদ্রাজের শ্রমিক বেশি পছন্দ করতেন।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী প্রথম চা-বাগান 1854 সালে সিলেটের মালনীছড়ায়, আর শ্রমিক আনা শুরু উনিশ শতকের মাঝামাঝি। সিলেট গেজেটিয়ার (1905) বলছে, 1881–1890 সালে সিলেটের বাগানে আনা হয় 71,950 জন, 1891–1900 সালে 1,41,650 জন। আর্কাইভের একটি লেখা আগমনকাল 1834–35 বলেছে, যা অন্য উৎসের সঙ্গে মেলে না।
উৎসভেদে সংখ্যা আলাদা। সেডের 2016 সালের মানচিত্রায়ন 156টি বাগানে বাঙালিসহ 80টি জনগোষ্ঠী পেয়েছে। আইএলওর জন্য শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের 2016 সালের গবেষণা নমুনার 10টি বাগানে পেয়েছে 38টি জাতিগোষ্ঠী। জুমজার্নাল আর্কাইভে মোহন রবিদাসের লেখায় “প্রায় ১১৬টি” বলা হয়েছে, উৎস ছাড়া।
1921 সালের আসাম শুমারির প্রাদেশিক সারণি X অনুযায়ী সিলেটের বাগানে মোট 1,63,222 জনের মধ্যে সবচেয়ে বড় দল ছিল Chamar (18,198)। তারপর Bauri 6,994, Munda 5,959, Tanti 5,692 ও Pan 5,638। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (51,800) “Others” ঘরে। Santal ছিলেন 3,875, Oraon 2,034, আর Kharia নামে কাউকে গোনা হয়নি।
জনশুমারি 2022-এর জেলা প্রতিবেদন অনুযায়ী মৌলভীবাজারে মুন্ডা 8,158 জন, হবিগঞ্জে 13,152 জন। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় একাই 10,304 জন মুন্ডা, যা দেশের যেকোনো উপজেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। সারা দেশে মুন্ডা 60,201 জন, যার প্রায় 37% সিলেট বিভাগে। শুমারি বাগানবাসীদের আলাদা করে না, তাই এই সংখ্যা জেলার সব মুন্ডার।
জনশুমারি 2022 অনুযায়ী শবরদের 93.6%, খারিয়া/খাড়িয়াদের 92.2%, কন্দদের 91.4%, বড়াইক/বাড়াইকদের 73.6% আর ভূমিজদের 72.0% সিলেট বিভাগে থাকেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে এই পাঁচটি জাতির অস্তিত্ব প্রায় পুরোপুরি চা-অঞ্চলকেন্দ্রিক। সাঁওতাল ও ওরাওঁদের ক্ষেত্রে অনুপাতটি মাত্র 10.3% ও 8.9%, কারণ তাঁদের বড় অংশ থাকেন উত্তরবঙ্গে।
না। জনশুমারি 2022 কেবল সরকারি তালিকার 50টি নাম আলাদা দেখায়; তাঁতি, কানু, রবিদাস, বাউরির মতো জাতিরা আলাদা নামে গোনা হন না, “অন্যান্য” ঘরে যান অথবা একেবারেই বাদ পড়েন। শুমারি বাসস্থান হিসেবে চা-বাগানও আলাদা করে না। গবেষক ফিলিপ গাইন 2022 সালে বলেছেন, সিলেটের চা-বাগানের 23টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
উৎসভেদে আলাদা। বাংলাপিডিয়া 2010 সালের হিসাবে 162টি বাগান দেয়; চা বোর্ড উদ্ধৃত করে টিবিএস বাংলা 2026 সালে লিখেছে 172টি। আইএলও-শাবিপ্রবি গবেষণায় (2016) নিবন্ধিত শ্রমিক 89,812, অস্থায়ী 19,592, বাগান এলাকায় মোট মানুষ 3,59,085। সেড উদ্ধৃত করে ডেইলি স্টার বাংলা (2025) বলেছে শ্রমিক 1,38,000, মোট প্রায় 5 লাখ।
প্রথমে ঠিকাদার বা আড়কাঠির মাধ্যমে, পরে “সর্দারি” ব্যবস্থায়, যেখানে বাগানের বাছাই করা সর্দার নিজ জেলা থেকে লোক আনতেন। 1921 সালের আসাম শুমারি অনুযায়ী Tea Districts Labour Supply Association প্রতি প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সাধারণত 15 টাকা কমিশন পেত। 1859 সালের আইন XIII অগ্রিম নিয়ে কাজ ছাড়লে কারাদণ্ডের বিধান দিত।
2019 সালের 50টি নামের গেজেটে মুন্ডা, সাঁওতাল, ওরাওঁ, ভূমিজ, খাড়িয়া, বাড়াইক, গঞ্জু, কন্দ, শবর, তেলী, লোহারসহ অনেকে আছেন। কিন্তু তাঁতি, কানু, রবিদাস, বাউরি, কৈরি, কর্মকারসহ বহু চা-বাগান-জনগোষ্ঠী তালিকার বাইরে। ডেইলি স্টার (2019) জানায়, তাঁতি ও কানুরা নিজেদের অন্তর্ভুক্তির দাবি তুলেছেন।
আইএলও-শাবিপ্রবি গবেষণা 10টি ভাষা পেয়েছে, যার মধ্যে দেশালি, পরিবর্তিত হিন্দি, অসমিয়া, মুন্ডা, ওরাওঁ, তেলেগু, সাঁওতালি ও খাসি। বেশিরভাগ বাগানে চলে বাংলা, দেশোয়ালি, হিন্দি ও অসমিয়া মেশানো “বাগানের ভাষা”। ডেইলি স্টার বাংলা (2025) অন্তত 15টি ভাষার কথা বলে, আর সাদরিকে বলেছে বাড়াইক, গঞ্জু ও মালোদের মৌখিক ভাষা।
না। ডেইলি স্টারের 2019 সালের প্রতিবেদন সেডের গবেষণা উদ্ধৃত করে জানায়, চা-বাগানে “তাঁতি” নামে চারটি আলাদা দল আছে, যারা তেলেগু, জংলি (বাংলার একটি রূপ), সাদরি ও ওড়িয়া ভাষায় কথা বলে, আর যাদের শিকড় যথাক্রমে অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও উড়িষ্যায়। একই নাম মানেই একই উৎস নয়।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 19 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, চা বাগান, মুন্ডা, সিলেট
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।