Last updated Oct 17th, 2026
0

পরীক্ষার প্রশ্ন আসে এভাবে: বাংলাদেশের মাতৃতান্ত্রিক নৃগোষ্ঠী কোনটি? উৎস ধরে সোজা উত্তর হলো — বাংলাদেশে যাদের বংশপরিচয় ও সম্পত্তি মায়ের ধারায় চলে, সেই দুটি জাতি গারো (মান্দি) ও খাসি। কিন্তু তারা মাতৃসূত্রীয়, মাতৃতান্ত্রিক নয়: সম্পত্তি মেয়ের নামে থাকে, অথচ পরিবার ও সমাজের সিদ্ধান্ত বেশির ভাগই নেন পুরুষেরা।
আর একটি ভুল প্রায় সব নোট-গাইডে ঘুরে বেড়ায় — সাঁওতালদেরও এই তালিকায় রাখা। শিক্ষক বাতায়নের একটি ব্লগে মনে রাখার কৌশল হিসেবে লেখা আছে “গা খাসাঁ” — গারো, খাসিয়া, সাঁওতাল। অথচ সাঁওতাল সমাজ নিয়ে যে গবেষণা পাওয়া যায়, তা বলছে উল্টো কথা। এই লেখায় একে একে প্রতিটি জাতির কথা বলা হয়েছে — প্রত্যেকটি তার নিজের উৎস থেকে। এক জাতির নিয়ম অন্য জাতির ঘাড়ে চাপানো হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগুলোর বিস্তারিত পরিচয়ের জন্য দেখতে পারেন আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব।
এই লেখায় যা আছে
মাতৃতান্ত্রিক (matriarchal) মানে এমন সমাজ, যেখানে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রধানত নারীর হাতে। মাতৃসূত্রীয় (matrilineal) মানে বংশ গোনা হয় মায়ের দিক থেকে — সন্তান মায়ের গোত্রের সদস্য, অনেক ক্ষেত্রে সম্পত্তিও যায় মায়ের ধারায়। প্রথমটি ক্ষমতার প্রশ্ন, দ্বিতীয়টি বংশ ও উত্তরাধিকারের।
ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Matrilineality নিবন্ধ মাতৃসূত্রকে বলছে নারীর ধারা ধরে আত্মীয়তা গোনার রীতি, যার সঙ্গে সম্পত্তি ও পদবির উত্তরাধিকারও যুক্ত থাকতে পারে। Matriarchy নিবন্ধ আলাদা করে সতর্ক করছে: মাতৃতন্ত্রকে প্রায়ই মাতৃসূত্রীয়, মাতৃবাস (বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর ঘরে থাকেন) আর মাতৃকেন্দ্রিক সমাজের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, অথচ কঠোর সংজ্ঞায় বেশির ভাগ গবেষক এগুলোকে মাতৃতন্ত্রের বাইরে রাখেন।
একই নিবন্ধ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার (2007) মত উদ্ধৃত করেছে — আধুনিক নৃবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের ঐকমত্য হলো, কঠোর অর্থে মাতৃতান্ত্রিক কোনো সমাজ কখনো ছিল না। বিপরীত মতও আছে: Heide Göttner-Abendroth-এর মতো গবেষকেরা মাতৃতন্ত্রের সংজ্ঞাই নতুন করে লিখতে চান — নারীর শাসন হিসেবে নয়, সমতাভিত্তিক মাতৃসূত্রীয় সমাজ হিসেবে। এই লেখায় শব্দ দুটি প্রচলিত অর্থেই ব্যবহার করা হয়েছে।
কোনো সমাজকে বুঝতে তাই চারটি আলাদা প্রশ্ন করতে হয়, আর প্রতিটির উত্তর আলাদা হতে পারে:
প্রথম তিনটিতে মায়ের দিক এগিয়ে থাকলে সমাজটি মাতৃসূত্রীয়। চতুর্থটিতেও নারী এগিয়ে থাকলে তবেই মাতৃতান্ত্রিক বলার প্রশ্ন ওঠে। নিচের প্রতিটি জাতির ক্ষেত্রে এই চার প্রশ্নের যতটুকু উত্তর উৎসে আছে, ততটুকুই লেখা হয়েছে।
উৎস অনুযায়ী বাংলাদেশে পূর্ণ অর্থে মাতৃসূত্রীয় জাতি দুটি: গারো ও খাসি। দুই সমাজেই সন্তান মায়ের পদবি পায়, সম্পত্তি যায় মেয়ের কাছে, স্বামী থাকেন স্ত্রীর বাড়িতে বা কাছে। কিন্তু কোনো উৎসেই পাওয়া যায় না যে এই দুই সমাজে শাসন ও সিদ্ধান্ত নারীর হাতে — তাই “মাতৃতান্ত্রিক” শব্দটি তাদের বেলায়ও খাটে না।
2020 সালে PLOS ONE সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা (Karim ও সহকর্মী) বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এক বাক্যে বলে দিয়েছে: চাকমা, মারমা, মণিপুরী, সাঁওতালসহ বেশির ভাগ জাতি পিতৃতান্ত্রিক; গারো ও খাসির মতো কয়েকটি “নারীকেন্দ্রিক” মাতৃসূত্রীয় সমাজও আছে। গারো প্রসঙ্গে একই গবেষণা লিখেছে, গারো সমাজে মাতৃতন্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকলেও কেবল নারীর শাসনে চলার মতো সামাজিক কাঠামো সেখানে নেই।
এর মাঝখানে আরও তিনটি জাতি আছে, যাদের কথা পরীক্ষার তালিকায় কখনো আসে না: কোচ, ডালু ও হাজং। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী কোচ ও ডালু সন্তানেরা মায়ের গোত্রনাম নেন, কিন্তু সম্পত্তি পান ছেলেরা। আর পার্বত্য চট্টগ্রামে ত্রিপুরাদের কয়েকটি গোত্রে মেয়েরা মায়ের বংশপরিচয় ও মায়ের সম্পত্তি পান। এরা কেউই মাতৃসূত্রীয় সমাজ নন — কিন্তু পুরোপুরি পিতৃসূত্রীয়ও নন।
বাংলায় এই বিভ্রান্তির বড় একটি উৎস অনুবাদ। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি ও বাংলা সংস্করণে একই জাতির বর্ণনায় দুটি আলাদা শব্দ বসেছে — ইংরেজিতে যা matrilineal, বাংলায় তা মাতৃতান্ত্রিক। পাঠক বাংলা পাতা পড়েন, আর সেখান থেকে শব্দটি চলে যায় গাইড বই ও প্রশ্নব্যাংকে।
উদাহরণ তিনটি, সবই বাংলাপিডিয়া থেকে:
সংবাদমাধ্যমেও একই লেখার ভেতরে দুই শব্দ পাশাপাশি আসে। দৈনিক জনকণ্ঠে 2016 সালে প্রকাশিত মেজবাহ উদ্দিন তুহিনের “গারোদের সামাজিক বন্ধন” লেখায় একবার “গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক”, পরের অনুচ্ছেদে “গারো সমাজেও এ অবস্থা থেকে মাতৃসূত্রীয় ধারা অব্যাহত থাকে”।
আমাদের আর্কাইভও এর বাইরে নয়। জুমজার্নালে 2020 সালে প্রকাশিত গারো ইতিহাস ও সংস্কৃতি লেখায় আছে “এদের পারিবারিক ব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক। গারো সমাজে পুরুষের কর্তৃত্ব নেই।” মুক্তিযুদ্ধে গারোদের অবদান নিয়ে আর্কাইভের আরেকটি লেখায় একজন মুক্তিযোদ্ধার বিয়ের পর স্ত্রীর বাড়িতে চলে আসাকে বলা হয়েছে “মাতৃতান্ত্রিক গারো নিয়মানুযায়ী”। শব্দটি এত গভীরে গেঁথে আছে যে গারো সমাজ নিয়ে লেখা পুরোনো বইয়েও এটিই চলেছে — বাংলা একাডেমি থেকে 1980 সালে প্রকাশিত আবদুস্ সাত্তারের গারোদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বইয়ে মাহারি-ব্যবস্থাকে বলা হয়েছে “মাতৃতান্ত্রিক সমাজেরই পরিচয়”।
গারো সন্তান মায়ের পদবি পায়, সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন একজন নির্বাচিত কন্যা, আর বিয়ের পর ছেলে যান স্ত্রীর বাড়িতে। এই তিনটি বিষয়ে সব উৎস একমত। কিন্তু গৃহকর্তা বা নকমা একজন পুরুষ, আর বিচার-সালিশে বসেন পুরুষেরাই — গারো লেখকেরা নিজেরাই এই কথাটি জোর দিয়ে বলেছেন।
গারো সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে আলাদা একটি বিস্তারিত লেখা পরে আসবে; এখানে কেবল এই প্রশ্নের জন্য দরকারি অংশটুকু।
গারো সমাজে বংশের একক মাহারি (উৎসভেদে মাহারী)। 1977 সালে তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত গারো সংস্কৃতি সংকলনে গারো লেখিকা বিভা সাংমা লিখেছেন, সন্তানের পরিচয় হয় “মাছং” অর্থাৎ মাতৃগোত্র দিয়ে, তারা মায়ের পদবি ব্যবহার করে; বিয়ের পর মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি যান না, স্বামী এসে স্ত্রীর ঘরে থাকেন, আর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন মেয়েরা।
বাংলাপিডিয়া গারো সমাজের পাঁচটি গোত্রের নাম দিয়েছে — সাংমা, মারাক, মোমিন, শিরা ও আরেং। আমাদের আর্কাইভের 2020 সালের লেখায় বলা হয়েছে গারো সমাজে দশটি গোত্র। দুই উৎসের সংখ্যা মেলে না।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী মেয়েরা, তবে শুধু নির্বাচিত মেয়েই মালিকানা পান; তাঁকে গারো ভাষায় বলে “নক্না”, আর সাধারণত কনিষ্ঠ কন্যাকেই বেছে নেওয়া হয়। আবদুস্ সাত্তার বানান লিখেছেন “নকনা”, আমাদের আর্কাইভের লেখায় “নোকনা”; নকনার স্বামীকে বলা হয় নক্রম। সাত্তার আরও লিখেছেন, ছোট মেয়ে অনুপযুক্ত বিবেচিত হলে অন্য মেয়েদের মধ্য থেকে নকনা ঠিক করা হয়, আর সেই বৈঠকে মায়ের মতামতই চূড়ান্ত।
ছেলেদের অধিকার কতটুকু, তা নিয়ে উৎসে সূক্ষ্ম তফাত আছে। সাত্তার লিখেছেন, নকনা কেবল পুত্রসন্তান রেখে মারা গেলে ছেলেরা পিতার নিজের উপার্জিত অস্থাবর সম্পত্তি — কাপড়, গয়না, বাসন — ভাগ করে নিতে পারেন, কিন্তু স্থাবর সম্পত্তিতে তাঁদের কোনো অধিকার নেই। গারো লেখক বাবুল ডি নকরেক 2020 সালে তাঁর ব্লগ-লেখায় লিখেছেন, কন্যার একচেটিয়া উত্তরাধিকার “মাহারী সম্পত্তি”-র বেলায়; স্বোপার্জিত সম্পত্তিতে ছেলেদেরও উত্তরাধিকার আছে।
সাত্তারের বইয়ে “গৃহকর্তা অর্থাৎ নকমা” — এবং তাঁর মৃত্যুর পর “তার স্ত্রী অর্থাৎ গৃহকর্ত্রী”। অর্থাৎ পরিবারের নকমা একজন পুরুষ, সম্পত্তির মালিক নকনার স্বামী। আমাদের আর্কাইভের গারো লেখায় “আখিং নকমা” শব্দটি এসেছে আরেক অর্থে — যিনি নতুন জুমের জমি বণ্টন করেন, বন্ধনীতে লেখা “রাজা”। নকমা শব্দের দুই স্তরের ব্যবহার, এবং দুই ক্ষেত্রেই পদটি পুরুষের।
বাবুল ডি নকরেক আরও স্পষ্ট: তাঁর ভাষায় গারো সমাজ “মাতৃতান্ত্রিক সমাজ” নয়, মাতৃসূত্রীয়; বাবাই পরিবার-প্রধান। তিনি লিখেছেন, বিচার-সালিশ, বাজার, আদালত — সর্বত্র পুরুষেরা যান, নারীরা সং নকমা বা ওয়ানগালার নকমা পদে নেই, আর জমির মালিকানা তাঁদের “নাম মাত্র”। এটি একজন গারো লেখকের মত, গবেষণা-সমীক্ষা নয়; কিন্তু PLOS ONE-এর গবেষণাও একই দিকে ইঙ্গিত করে। গারো সমাজের আরও পরিচয়ের জন্য পড়তে পারেন আর্কাইভের গারো ইতিহাস ও সংস্কৃতি।
খাসি সমাজে সন্তান মায়ের নামে পরিচিত, মাতৃগৃহ ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কনিষ্ঠ কন্যা, আর বিয়ের পর দম্পতি থাকেন কনের মায়ের বাড়ির পাশে। এগুলো বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা। তবে মেঘালয়ের খাসি সমাজ নিয়ে লেখা উৎসগুলো বলছে, গ্রামের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান Dorbar Shnong-এ নারীরা পদ পান না।
খাসিদের উত্তরাধিকার নিয়ে আলাদা একটি বিস্তারিত লেখা পরে আসবে। এখানে মূল কথাগুলো।
বাংলাপিডিয়ার খাসিয়া নিবন্ধ অনুযায়ী বিয়ের পর কন্যার মাতৃগৃহের পাশে নবদম্পতির জন্য নতুন ঘর তোলা হয়, কোনো কোনো পুঞ্জিতে তা বাধ্যতামূলক; কনিষ্ঠ কন্যার জন্য আলাদা ঘর হয় না, কারণ তিনিই মাতৃগৃহ ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী। অন্য বোনেরাও সম্পত্তির ভাগ পান, তবে তা বিক্রি করার অধিকার তাঁদের নেই। পারিবারিক পূজা-অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ছোট বোনের। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পরও খাসিরা মাতৃনাম ছাড়েন না।
একই নিবন্ধে পুঞ্জির নেতৃত্বের কথাও আছে: পুঞ্জিপ্রধানকে বলা হয় সিয়েম, আর বাংলাদেশে পুঞ্জিপ্রধানেরা — যাঁদের “মন্ত্রী” বলা হয় — নিজেদের বিচার-আচার করেন। এই পদগুলো নারী না পুরুষের, বাংলাপিডিয়া তা বলেনি।
মেঘালয়ের ছবিটি স্পষ্টতর। আল জাজিরায় 2013 সালে Subir Bhaumik-এর প্রতিবেদন লিখেছে, খাসি ও জয়ন্তিয়াদের তৃণমূল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান Dorbar Shnong নারীদের পদে বসতে দেয় না; নারীরা সভায় যেতে পারেন, কিন্তু নির্বাহী সদস্য হতে পারেন না। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার মেঘালয়ের মাতৃসূত্রীয় সমাজ নিবন্ধ সরাসরি লিখেছে: সমাজটি মাতৃসূত্রীয়, মাতৃতান্ত্রিক নয়; অতীতের রাজবংশে রাজার কনিষ্ঠ বোনের ছেলে সিংহাসন পেতেন। খাসি ইতিহাসবিদ Amena Nora Passah মেঘালয়কে বলেছেন পিতৃতান্ত্রিক সূক্ষ্মতাসহ মাতৃসূত্রীয় সমাজ (সাউথ ফার্স্ট, 2026)।
এই পর্যবেক্ষণগুলো মেঘালয়ের। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের পুঞ্জিগুলোতে নারীরা মন্ত্রী পদে বসেন কি না, সে বিষয়ে কোনো উৎস পাওয়া যায়নি; তাই মেঘালয়ের নিয়ম এখানে হুবহু প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া হয়নি।
না। দুই সমাজই মাতৃসূত্রীয়, কিন্তু উত্তরাধিকারী বাছাই, বোনেদের ভাগ আর বিয়ের পর বসবাসের নিয়ম আলাদা। গারো সমাজে নকনা “নির্বাচিত” হন, খাসি সমাজে কনিষ্ঠ কন্যা নিয়মমতোই উত্তরাধিকারী আর অন্য বোনেরাও ভাগ পান। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি খাসিয়া নিবন্ধের মতে খাসি সামাজিক প্রথা গারোদের মতো কঠোর নয়।
| প্রশ্ন | গারো | খাসি |
|---|---|---|
| উত্তরাধিকারী কে | নির্বাচিত একজন কন্যা (নকনা), সাধারণত কনিষ্ঠ; অনুপযুক্ত হলে অন্য মেয়ে (বাংলাপিডিয়া; সাত্তার) | কনিষ্ঠ কন্যা (বাংলাপিডিয়া) |
| অন্য বোনেরা | শুধু নির্বাচিত মেয়েই মালিকানা পান (বাংলাপিডিয়া) | ভাগ পান, কিন্তু বিক্রির অধিকার নেই (বাংলাপিডিয়া) |
| বিয়ের পর বসবাস | স্বামী স্ত্রীর বাড়িতে আসেন (বিভা সাংমা, 1977) | কনের মাতৃগৃহের পাশে নতুন ঘর (বাংলাপিডিয়া) |
| সন্তানের পরিচয় | মায়ের মাছং বা পদবি | মাতৃনাম |
| পরিবার বা গ্রামের প্রধান | গৃহকর্তা নকমা পুরুষ (সাত্তার) | মেঘালয়ে Dorbar Shnong-এ নারীরা পদ পান না (আল জাজিরা); বাংলাদেশের তথ্য পাওয়া যায়নি |
অর্থনীতিবিদ Bina Agarwal-এর 1994 সালের তুলনা (উইকিপিডিয়ার মেঘালয় নিবন্ধে উদ্ধৃত) আরেকটি তফাত দেখায়: গারোরা মামাতো-পিসতুতো ভাইবোনের বিয়ে পছন্দ করেন, খাসিরা এ ধরনের বিয়ে এড়িয়ে চলেন। আমাদের আর্কাইভের গারো লেখাও বলছে, অভিভাবক-আয়োজিত দোবিকদোকা বিয়ে সাধারণত মামাতো-পিসতুতো ভাইবোনের মধ্যে হয়।
না। সাঁওতাল সমাজকে মাতৃতান্ত্রিক বা মাতৃসূত্রীয় বলে এমন কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি। PLOS ONE-এর 2020 সালের গবেষণা সাঁওতালদের বলেছে পিতৃবাস ও পিতৃসূত্রীয়; জমির বেশির ভাগ পান ছেলেরা। অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের সমীক্ষা সাঁওতাল নারীদের উত্তরাধিকারে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দলগুলোর মধ্যে রেখেছে।
ভুলটির একটি নথিভুক্ত উৎস আছে। সরকারি শিক্ষক বাতায়নে 24 সেপ্টেম্বর 2024 তারিখে একজন সহকারী শিক্ষকের ব্লগ — শিরোনামে “চতুর্থ শ্রেণিতে উল্লেখিত” — লিখেছে: মাতৃতান্ত্রিক পরিবার গারো, খাসিয়া, সাঁওতাল, মনে রাখার কৌশল “গা খাসাঁ”; আর চাকমা, মারমা, মণিপুরী, ওঁরাও, হাজং, ম্রো ও ত্রিপুরা পিতৃতান্ত্রিক। দ্বিতীয় তালিকাটির সঙ্গে নিচের উৎসগুলো মোটামুটি মেলে; সমস্যা প্রথম তালিকার শেষ নামটিতে।
বিপরীত উৎসগুলো:
“গা খাসাঁ” কৌশলটি তাই মনে রাখার সুবিধার জন্য বানানো হলেও ভুল জিনিস মনে রাখায়। চতুর্থ শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে নিজেই সাঁওতালদের মাতৃতান্ত্রিক বলা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা যায়নি — নিচের “যা এখনো জানা যায়নি” অংশ দেখুন।
এই তিনটি জাতি মাঝামাঝি অবস্থানে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী কোচ ও ডালু সন্তানেরা মায়ের গোত্রনাম নেন, কিন্তু সমাজ পিতৃপ্রধান আর সম্পত্তি পান ছেলেরা। হাজংদের গোত্র বা নিকনী একসময় মাতৃসূত্রীয় ছিল বলে একটি উৎস জানায়, কিন্তু আজকের হাজং সমাজকে বাংলাপিডিয়া পিতৃতান্ত্রিক বলছে।
বাংলাপিডিয়ার কোচ নিবন্ধ তিনটি বাক্যে পুরো চিত্রটি দেয়: কোচ সমাজ পিতৃপ্রধান; তবে পরিবারের সন্তানেরা মায়ের গোত্রনাম গ্রহণ করে; পুত্রসন্তানেরাই পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। কোচরা গোত্রকে বলেন নিকিনি, নিজ নিকিনিতে বিয়ে নিষিদ্ধ। শেরপুরের ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবর্দী উপজেলায় তাঁদের বাস।
ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Koch people নিবন্ধ, ভাষাবিজ্ঞানী Kondakov-এর গবেষণা উদ্ধৃত করে, কোচদের নিকিনিকে মাতৃসূত্রীয় ও কঠোরভাবে বহির্বিবাহী বলেছে এবং যোগ করেছে যে কোচদের মাতৃসূত্রীয় নিয়ম গারো ও খাসিদের মতো কঠোর নয়। ওই গবেষণার বড় অংশ মেঘালয় ও আসামের কোচদের নিয়ে।
ময়মনসিংহের সীমান্ত এলাকার ছোট জাতি ডালু। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, ডালুদের প্রধান তিনটি গোত্র বা দপ্ফা — চিকাং, পিড়া ও মাশী; মাতৃসূত্রীয় সমাজ না হলেও ডালুরা মায়ের দপ্ফা বা গোত্রনাম গ্রহণ করেন। একই নিবন্ধ জানায়, সম্প্রতি তাঁরা ঐতিহ্যবাহী দপ্ফা নামের বদলে বর্ণহিন্দুদের অনুকরণে গোত্রনাম ব্যবহারে উৎসাহী হচ্ছেন। ডালুদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার কোন ধারায় চলে, বাংলাপিডিয়া তা বলেনি।
বাংলাপিডিয়ার হাজং নিবন্ধ অনুযায়ী হাজং সমাজ পিতৃতান্ত্রিক — পিতাই পরিবারের মূল নিয়ন্ত্রক, মায়ের অবস্থান দ্বিতীয়, পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী ছেলেরা; বিয়ে হয় বরের পিতৃগৃহে এবং দম্পতি সেখানেই থাকেন। বিধবা পুনর্বিবাহ না করলে স্বামীর সম্পত্তির অধিকারী হন। ইংরেজি সংস্করণ একটি ব্যতিক্রম যোগ করেছে: কনের কোনো ভাই না থাকলে এবং তিনি সম্পত্তি পেলে দম্পতি কখনো কনের বাবার বাড়িতে থাকেন।
হাজং সমাজ একসময় 17টি নিকনী বা গোত্রে বিভক্ত ছিল, যা এখন বিলুপ্তপ্রায়; তার বদলে এসেছে কাশ্যপ, ভরদ্বাজ, শান্ডিল্য প্রভৃতি গোত্রনাম (বাংলাপিডিয়া)। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Hajong people নিবন্ধ, Hamlet Bareh-এর Encyclopaedia of North-East India: Meghalaya (2001) উদ্ধৃত করে, বলছে এই নিকনীগুলো ছিল মাতৃসূত্রীয় বহির্বিবাহী গোত্র, পাশাপাশি daidi নামে পিতার ধারার আত্মীয়তার হিসাবও চলত। অর্থাৎ হাজংদের মধ্যে মায়ের দিকের একটি চিহ্ন ছিল, যা এখন আর চোখে পড়ে না।
না। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা — তিন সমাজকেই উৎস পিতৃতান্ত্রিক বা পিতৃসূত্রীয় বলছে। তবে তিনটির ভেতরে মায়ের দিকের আলাদা আলাদা ব্যতিক্রম আছে: মারমা মেয়ে মায়ের বংশপরিচয় পান, ত্রিপুরাদের কয়েকটি গোত্রে মেয়েরা মায়ের বংশ ও সম্পত্তি পান, আর চাকমা মেয়েরা কেবল ভাই না থাকলে পিতৃসম্পত্তি পান।
আর্কাইভের চাকমা জাতি লেখা অনুযায়ী চাকমা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক, বংশপরিচয় পিতৃসূত্রীয় — পিতার সূত্র ধরেই সন্তানের গঝা ও গুখি ঠিক হয়, বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর পরিবারের লোক বলে গণ্য হন। একই লেখা বলছে, পিতা পরিবারের প্রধান কর্তা হলেও পরে বয়োজ্যেষ্ঠতা অনুসারে নারী-পুরুষ সবার মতামতের গুরুত্ব আছে। চাকমা উত্তরাধিকার লেখা জানায়, মেয়েরা সাধারণত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন না, তবে মালিকের কোনো পুত্র না থাকলে মেয়েরা পিতৃসম্পত্তি পান।
মারমা সমাজ মজার একটি দ্বিমুখী নিয়ম মানে। আর্কাইভের মারমা জাতির আদ্যোপান্ত লিখেছে “মারমা সমাজ পিতৃসূত্রীয়, কিন্তু নারীর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”; পরিবার-প্রধানের মৃত্যুর পর স্ত্রীকেই প্রধানের ভূমিকা নিতে হয়। বাংলাপিডিয়া যোগ করছে: বংশের ক্ষেত্রে মেয়ে মায়ের বংশ আর ছেলে সবসময় বাবার বংশপরিচয় পান; সম্পত্তিতে প্রাচীন বার্মার থামোহাডা নীতি অনুসরণ করা হয়, যাতে পুত্র ও কন্যা দুজনেই পৈতৃক সম্পত্তি পান।
কন্যার ভাগ কতটা, তা নিয়ে উৎসের মধ্যে তফাত আছে। আর্কাইভের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও পাহাড়ি নারী লেখায় রাঙামাটির আইনজীবী প্রতীম রায় পাম্পুর মত উদ্ধৃত: বোমাং সার্কেলের মারমা কন্যারা পৈতৃক সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ পান, অথচ চাকমা ও মং সার্কেলের মারমা কন্যারা কোনো উত্তরাধিকার পান না। একই লেখা আরেক জায়গায় বলছে, মারমা সমাজে মায়ের সম্পত্তি মেয়ের পাওয়ার বিধান আছে, তবে তা আদায় করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। অর্থাৎ মারমা নিয়মও সার্কেলভেদে আলাদা — এক মারমা এলাকার কথা আরেক এলাকায় খাটে না।
আর্কাইভের ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত অনুযায়ী ত্রিপুরা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক; পিতাই পরিবারের প্রধান, সাধারণত পিতার পরিচয়েই সন্তানের বংশ ঠিক হয়, আর প্রথাগতভাবে ছেলেরাই স্থাবর সম্পত্তির আইনি অধিকারী। ব্যতিক্রম কয়েকটি গোত্র: দেনদাউ, গাবিং এবং ফাদু (একই লেখায় বানান কোথাও “ফাদভ”, কোথাও “ফাদুঙ”) গোত্রে মেয়েরা মায়ের বংশপরিচয়ে পরিচিত হন এবং উত্তরাধিকারী হিসেবে মায়ের সম্পত্তি ভোগ করেন।
লেখাটি আরও জানায়, এখন অনেক পরিবারে বাবা-মা মেয়েদেরও সম্পত্তির ভাগ দেন, তবে সে ভাগ ছেলেদের সমান নয় এবং পুরোপুরি বাবা-মায়ের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। ত্রিপুরাদের এই কয়েকটি গোত্রই পার্বত্য চট্টগ্রামে মাতৃসূত্রের একমাত্র নথিভুক্ত চিহ্ন — তঞ্চঙ্গ্যা নারীর অবস্থান লেখার দশ-জনগোষ্ঠীর ছকও তাকে “এই অঞ্চলে ব্যতিক্রম” বলেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বাকি যেসব জাতির বিবরণ পাওয়া যায় — তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খুমী, খিয়াং, চাক, পাংখোয়া, লুসাই — প্রত্যেকটিকেই উৎস পিতৃতান্ত্রিক বা পিতৃসূত্রীয় বলছে। কন্যার সম্পত্তির অধিকারে অবশ্য তফাত আছে: খিয়াংদের এক শাখায় নির্দিষ্ট ভাগ, কোথাও ভাই না থাকলে ভাগ, কোথাও একেবারেই নয়।
জাতি ধরে, উৎস ধরে:
কন্যার সম্পত্তির অধিকার নিয়ে দশটি জনগোষ্ঠীর তুলনামূলক ছক আগেই আমাদের তঞ্চঙ্গ্যা নারীর অবস্থান লেখায় দেওয়া আছে; এখানে তা আর পুনরাবৃত্তি করা হলো না।
সমতলের যেসব জাতির বংশ বা উত্তরাধিকার নিয়ে কোনো উৎসে তথ্য আছে, তাদের সবাই পিতৃসূত্রীয়। পাত্র, রাজবংশী ও ভূমিজ সমাজে ছেলেরাই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী (বাংলাপিডিয়া); ওরাওঁ ও মুন্ডাদের গোত্রনাম বাবা থেকে ছেলেতে যায় (ভারতের প্রেক্ষাপটে উইকিপিডিয়া)। রাখাইন ও মৈতৈ মণিপুরীদের বংশরীতি নিয়ে কোনো উৎস পাওয়া যায়নি।
ওরাওঁ ও মুন্ডার ক্ষেত্রে উৎসগুলো মূলত ভারতের সমাজ নিয়ে; বাংলাদেশের ওরাওঁ ও মুন্ডা সমাজে নিয়ম একই কি না, আলাদা কোনো উৎসে তা নিশ্চিত করা যায়নি। মৈতৈ (হিন্দু) মণিপুরী, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ও রাখাইনদের বংশ ও উত্তরাধিকারের নিয়ম বাংলাপিডিয়ায় বা আমাদের আর্কাইভে পাওয়া যায়নি।
নিচের ছকে প্রতিটি সারি তার নিজের উৎস থেকে নেওয়া। “পাওয়া যায়নি” মানে উৎসে প্রশ্নটির উত্তর নেই — উত্তর “না” নয়। কেবল গারো ও খাসির ক্ষেত্রে বংশ, সম্পত্তি ও বসবাস — তিনটিই মায়ের দিকে।
| জাতি | বংশপরিচয় | স্থাবর সম্পত্তি | বিয়ের পর বসবাস | উৎস |
|---|---|---|---|---|
| গারো | মায়ের মাহারি/পদবি | নির্বাচিত কন্যা (নকনা) | স্ত্রীর বাড়িতে | বাংলাপিডিয়া; সাত্তার 1980; বিভা সাংমা 1977 |
| খাসি | মাতৃনাম | কনিষ্ঠ কন্যা; অন্য বোনেরাও ভাগ পান | কনের মায়ের বাড়ির পাশে | বাংলাপিডিয়া |
| কোচ | মায়ের গোত্রনাম | ছেলেরা | পাওয়া যায়নি | বাংলাপিডিয়া |
| ডালু | মায়ের দপ্ফা | পাওয়া যায়নি | পাওয়া যায়নি | বাংলাপিডিয়া |
| হাজং | নিকনী এখন বিলুপ্তপ্রায় | ছেলেরা | বরের পিতৃগৃহে | বাংলাপিডিয়া |
| সাঁওতাল | পিতৃসূত্রীয় | বেশির ভাগ ছেলেরা | পিতৃবাস | PLOS ONE 2020 |
| চাকমা | পিতৃসূত্রীয় (গঝা-গুখি) | ছেলেরা; পুত্র না থাকলে মেয়েরা | স্বামীর পরিবারে | আর্কাইভ |
| মারমা | মেয়ে মায়ের, ছেলে বাবার বংশ | পুত্র-কন্যা দুজনেই (থামোহাডা); সার্কেলভেদে তফাত | পাওয়া যায়নি | বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ |
| ত্রিপুরা | পিতৃসূত্রীয়; কয়েকটি গোত্রে মেয়ে মায়ের বংশ | ছেলেরা; ওই গোত্রগুলোয় মেয়েরা মায়ের সম্পত্তি | পাওয়া যায়নি | আর্কাইভ |
| তঞ্চঙ্গ্যা | পিতৃসূত্রীয় | ছেলেরা; পুত্র না থাকলে কন্যা | স্বামীর ঘরে | বাংলাপিডিয়া; আর্কাইভ |
| ম্রো | পিতৃতান্ত্রিক | পুত্র; সিংহভাগ কনিষ্ঠ পুত্র | পাওয়া যায়নি | বাংলাপিডিয়া |
| বম | পিতার সূত্রে | পাওয়া যায়নি | পাওয়া যায়নি | বাংলাপিডিয়া |
| খুমী, খিয়াং, চাক, পাংখোয়া | পিতৃসূত্রীয়/পিতৃতান্ত্রিক | মূলত ছেলেরা | পাওয়া যায়নি | আর্কাইভ; বাংলাপিডিয়া |
| পাত্র, রাজবংশী, ভূমিজ | পিতৃতান্ত্রিক | ছেলেরা | পাওয়া যায়নি | বাংলাপিডিয়া |
| মণিপুরী মুসলিম | পিতা থেকে পুত্রে | পিতা থেকে পুত্রে | পাওয়া যায়নি | আর্কাইভ |
| রাখাইন, মৈতৈ মণিপুরী | পাওয়া যায়নি | পাওয়া যায়নি | পাওয়া যায়নি | — |
গারো ও খাসি — দুই সমাজেই সম্পত্তি নারীর নামে, কিন্তু পরিবার পরিচালনা, বিচার আর রাজনৈতিক পদে পুরুষের প্রাধান্যের কথা উৎসগুলো বারবার বলছে। মাতৃতন্ত্রের মূল শর্ত ক্ষমতা; সেটি এখানে নারীর হাতে নেই। তাই এই দুই সমাজকে মাতৃতান্ত্রিক বললে তাঁদের সমাজের আসল কাঠামোটাই আড়াল হয়।
গারো সমাজে মায়ের দিকের পুরুষেরা — ভাই ও মামা — বড় ভূমিকা নেন। সাত্তারের বই অনুযায়ী নকনা বাছাইয়ের সময় কখনো মায়ের “চ্রা” অর্থাৎ মামা ও ভাইয়ের মতামত নেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে; মেয়েরা নাবালিকা থাকতে মা মারা গেলে মায়ের ভাই বা মাহারির কেউ অভিভাবক হন। একই বইয়ে আছে, নক্রম তাঁর নকনা ও কন্যাদের অনুমতি ছাড়া জমি বিক্রি বা বন্ধক দিতে পারেন না — অর্থাৎ জমির দেখাশোনা পুরুষের হাতে, কিন্তু চূড়ান্ত মালিকানা নারীর।
বাবুল ডি নকরেকের লেখা এই ভারসাম্যকে একটি উপমায় ধরেছে: গারো পরিবারে নারী রাষ্ট্রপতির মতো সম্মানের আসনে, পুরুষ প্রধানমন্ত্রীর মতো ক্ষমতায়। জনকণ্ঠের 2016 সালের লেখাও বলছে, গারো সমাজে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও চার্চের সিদ্ধান্ত পুরুষেরাই নিচ্ছেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা কমছে।
খাসি সমাজে মেঘালয়ের পুরুষদের একটি অংশ উল্টো অভিযোগ করেন — তাঁরা মনে করেন পুরুষেরা পিছিয়ে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী 1990 সালে Keith Pariat-এর উদ্যোগে Syngkhong Rympei Thymmai (SRT) নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে, যার দাবি পুরুষদের অধিকার। অথচ একই প্রতিবেদন দেখিয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান Dorbar Shnong-এ নারী পদ পান না। সম্পত্তির অধিকার আর রাজনৈতিক ক্ষমতা যে দুটি আলাদা জিনিস, খাসি সমাজের এই টানাপোড়েনই তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।
এর অর্থ এই নয় যে মাতৃসূত্রের কোনো প্রভাব নেই। PLOS ONE-এর গবেষণায় স্ত্রীর ওপর নির্যাতনকে মেনে নেওয়ার প্রবণতা মাপা হয়েছিল তিন সম্প্রদায়ে — গারো, সাঁওতাল ও বাঙালি। তিনটির মধ্যে গারোদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে কম পাওয়া গেছে; গবেষকেরা এর কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন সম্পদে নারীর বেশি প্রবেশাধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা আর পারিবারিক সিদ্ধান্তে নারীর বেশি ক্ষমতা। আবুল বারকাতের সমীক্ষাও গারো নারীদের “তুলনামূলক নিরাপদ” বলেছে। মাতৃসূত্র নারীর অবস্থান বদলায় — কিন্তু তাতে সমাজটি নারীশাসিত হয়ে যায় না।
মাতৃসূত্রীয় নিয়মগুলো স্থির নয়। বাংলাপিডিয়া জানাচ্ছে, গারো মা-বাবা এখন জীবিত অবস্থাতেই ছেলের নামে জমি লিখে দিচ্ছেন। 1977 সালেই বিভা সাংমা লিখেছিলেন, শিক্ষিত ছেলেরা সন্তানদের ওপর নিজেদের পদবি চাপাচ্ছেন। হাজং ও ডালুদের পুরোনো মাতৃধারার গোত্রনামও বদলে যাচ্ছে হিন্দু গোত্রনামে।
বিভা সাংমার লেখাটি বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো, কারণ এটি একজন গারো নারীর নিজের সমাজ নিয়ে সমালোচনা। তিনি লিখেছেন, প্রতিবেশী সমাজের দেখাদেখি শিক্ষিত ছেলেরা চান সন্তানেরা মায়ের নয়, বাবার পদবি নিক; এতে মেয়েরা অন্য মাছং-এর পদবি নিয়ে বসছেন, আর বিয়ের নিয়মে জটিলতা তৈরি হচ্ছে, কারণ গারো সমাজে সাংমা-সাংমা বা মারাক-মারাক বিয়ে চলে না। একই লেখায় তিনি “ছাপ্পা” প্রথার — স্ত্রী বা স্বামীর মৃত্যুর পর মাহারি থেকে নতুন সঙ্গী এনে দেওয়ার রীতি, যাতে প্রায়ই বয়সের বড় অসমতা থাকে — বিলোপও চেয়েছেন। সাত্তার একই প্রথার বানান লিখেছেন “সাপ্পা”।
উল্টো দিকের পরিবর্তনও আছে। ডালুরা ঐতিহ্যবাহী দপ্ফা নামের বদলে বর্ণহিন্দুদের অনুকরণে গোত্রনাম নিতে আগ্রহী হচ্ছেন, আর হাজংদের 17টি নিকনী প্রায় বিলুপ্ত — দুটিই বাংলাপিডিয়ার তথ্য। মারমাদের ক্ষেত্রে আর্কাইভের লেখায় দেখা যায় সার্কেলভেদে কন্যার ভাগ আলাদা। ত্রিপুরাদের ক্ষেত্রে আর্কাইভ জানায়, অনেক পরিবারে বাবা-মা এখন মেয়েদেরও ভাগ দেন — যদিও সমান নয়।
পরিবর্তনের দিক তাই একমুখী নয়: কোথাও মাতৃধারা ক্ষয় হচ্ছে, কোথাও পিতৃসূত্রীয় সমাজে মেয়েরা অল্প অল্প ভাগ পাচ্ছেন। কোন দিকে কত দ্রুত বদলাচ্ছে, তা মাপার মতো কোনো সাম্প্রতিক জরিপ পাওয়া যায়নি।
বহুনির্বাচনি প্রশ্নে “মাতৃতান্ত্রিক” লেখা থাকলে প্রশ্নকর্তা আসলে মাতৃসূত্রীয় জাতি খুঁজছেন — উত্তর গারো ও খাসি। সাঁওতাল এই তালিকায় পড়েন না। লিখিত উত্তরে সুযোগ থাকলে “মাতৃসূত্রীয়” শব্দটি লেখাই সঠিক, সঙ্গে এক লাইনে কারণ: বংশ ও সম্পত্তি মায়ের ধারায়, ক্ষমতা নারীর হাতে নয়।
প্রশ্নব্যাংকে যে প্রশ্নগুলো ঘুরে আসে, তার উত্তর এক নজরে:
পরীক্ষায় যে উত্তর চাওয়া হয় তা গারো ও খাসি। তবে সঠিক শব্দ মাতৃসূত্রীয়: দুই সমাজে সন্তান মায়ের পদবি পায়, সম্পত্তি পান কন্যা, স্বামী থাকেন স্ত্রীর বাড়িতে বা কাছে। কিন্তু গারো গৃহকর্তা নকমা পুরুষ, আর মেঘালয়ের খাসি Dorbar Shnong-এ নারীরা পদ পান না। তাই এ দুটি সমাজও মাতৃতান্ত্রিক নয়।
মাতৃতান্ত্রিক (matriarchal) মানে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রধানত নারীর হাতে। মাতৃসূত্রীয় (matrilineal) মানে বংশ মায়ের দিক থেকে গোনা হয় এবং প্রায়ই সম্পত্তিও মায়ের ধারায় যায়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (2007) অনুযায়ী আধুনিক নৃবিজ্ঞানীদের ঐকমত্য হলো, কঠোর অর্থে মাতৃতান্ত্রিক কোনো সমাজ কখনো ছিল না; মাতৃসূত্রীয় সমাজ অবশ্য অনেক আছে।
না। 2020 সালে PLOS ONE-এ প্রকাশিত Karim ও সহকর্মীদের গবেষণা সাঁওতালদের পিতৃবাস ও পিতৃসূত্রীয় বলেছে; ছেলেরা পৈতৃক জমির বেশির ভাগ পান, মেয়েরা যৌতুক হিসেবে ছোট অংশ পেতে পারেন। আবুল বারকাতের 2015 সালের সমীক্ষা সাঁওতাল নারীদের উত্তরাধিকারে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের মধ্যে রেখেছে। “গা খাসাঁ” কৌশলটি তাই ভুল।
না। জুমজার্নাল আর্কাইভের চাকমা জাতি লেখা অনুযায়ী চাকমা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক এবং বংশপরিচয় পিতৃসূত্রীয়; পিতার সূত্র ধরেই সন্তানের গঝা ও গুখি ঠিক হয়, বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর পরিবারের সদস্য হন। মেয়েরা সাধারণত পিতৃসম্পত্তি পান না; কেবল মালিকের কোনো পুত্র না থাকলে কন্যারা উত্তরাধিকারী হন।
না, মারমা সমাজ পিতৃসূত্রীয়। তবে বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বংশের ক্ষেত্রে মেয়ে মায়ের বংশ আর ছেলে বাবার বংশপরিচয় পান, আর থামোহাডা নীতিতে পুত্র-কন্যা দুজনেই পৈতৃক সম্পত্তি পান। আইনজীবী প্রতীম রায় পাম্পুর মতে বোমাং সার্কেলের মারমা কন্যারা এক-চতুর্থাংশ পান, মং সার্কেলে কিছু পান না।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী পরিবারের একজন নির্বাচিত কন্যা, যাঁকে গারো ভাষায় নক্না বা নকনা বলে; সাধারণত কনিষ্ঠ কন্যাকেই বেছে নেওয়া হয়। আবদুস্ সাত্তারের 1980 সালের বই বলছে, ছোট মেয়ে অনুপযুক্ত হলে অন্য মেয়েদের মধ্য থেকে নকনা ঠিক হয় এবং মায়ের মতামতই চূড়ান্ত। নকনার স্বামীকে বলা হয় নক্রম।
না। আবদুস্ সাত্তারের “গারোদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” (বাংলা একাডেমি, 1980) বইয়ে লেখা “গৃহকর্তা অর্থাৎ নকমা”, আর তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী “গৃহকর্ত্রী”। গারো লেখক বাবুল ডি নকরেক (2020) লিখেছেন, নারীরা সং নকমা বা ওয়ানগালার নকমা পদেও নেই। সম্পত্তির মালিক নারী, কিন্তু নকমা পদটি পুরুষের।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী মাতৃগৃহ ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কনিষ্ঠ কন্যা, তাই তাঁর জন্য আলাদা ঘর তোলা হয় না। অন্য বোনেরাও সম্পত্তির ভাগ পান, তবে বিক্রির অধিকার নেই। সন্তানেরা মাতৃনামে পরিচিত, আর খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পরও খাসিরা মাতৃনাম ছাড়েন না। পারিবারিক পূজা-অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ছোট বোনের।
আংশিকভাবে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী কোচ সমাজ পিতৃপ্রধান এবং পুত্রসন্তানেরাই পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, কিন্তু সন্তানেরা মায়ের গোত্রনাম নেন। কোচরা গোত্রকে বলেন নিকিনি। অর্থাৎ বংশপরিচয়ে মায়ের দিক, সম্পত্তিতে বাবার দিক। ডালুদের ক্ষেত্রেও বাংলাপিডিয়া বলছে, মাতৃসূত্রীয় সমাজ না হলেও তাঁরা মায়ের দপ্ফা বা গোত্রনাম নেন।
না। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী হাজং সমাজ পিতৃতান্ত্রিক; পিতাই পরিবারের মূল নিয়ন্ত্রক, সম্পত্তির উত্তরাধিকারী ছেলেরা, বিয়ের পর দম্পতি বরের পিতৃগৃহে থাকেন। হাজংদের 17টি পুরোনো নিকনী বা গোত্র এখন বিলুপ্তপ্রায়। Hamlet Bareh-এর মেঘালয় বিশ্বকোষ (2001) অনুযায়ী এই নিকনীগুলো একসময় মাতৃসূত্রীয় গোত্র ছিল।
পুরো জাতি হিসেবে নেই। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খুমী, খিয়াং, চাক, পাংখোয়া — সবাইকে উৎস পিতৃতান্ত্রিক বা পিতৃসূত্রীয় বলছে। ব্যতিক্রম ত্রিপুরাদের কয়েকটি গোত্র: দেনদাউ, গাবিং ও ফাদু গোত্রে মেয়েরা মায়ের বংশপরিচয় এবং মায়ের সম্পত্তি পান (জুমজার্নাল আর্কাইভ, ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত)।
বাংলাপিডিয়ার বাংলা সংস্করণে গারো সমাজকে “মাতৃতান্ত্রিক” লেখা হয়েছে, অথচ ইংরেজি সংস্করণে একই জায়গায় “matrilineal” — অর্থাৎ মাতৃসূত্রীয়। ডালু নিবন্ধে উল্টোটা ঘটেছে: ইংরেজির “not a matriarchal society” বাংলায় হয়েছে “মাতৃসূত্রীয় সমাজ না হলেও”। দুই শব্দকে সমার্থক ধরে অনুবাদ করাতেই বিভ্রান্তিটি বাংলায় ছড়িয়েছে।
জুমজার্নালের নিজস্ব সংগ্রহ
অন্যান্য উৎস
সর্বশেষ হালনাগাদ: 16 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:উত্তরাধিকার, খাসি, গারো, সাঁওতাল
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।