Last updated Oct 23rd, 2026
0

বান্দরবানের চিম্বুক-থানচি সড়কে, জেলা শহর থেকে 18 কিলোমিটার দূরের ক্রামাদি পাড়ায় একটি বটগাছের নিচে কয়েকটি ছোট ঘর আছে। প্রথমটি ক্রামা বর্ণমালা ঘর; তার পাশে পাথরে খোদাই করা ম্রো বর্ণমালা, আর ঘরের ভেতরে খোদাই করা টেবিলের ওপর একটি কাঠের বই, যার পাতায় কয়েকটি হরফ খোদাই করা। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার ডিসেম্বর 2024-এর প্রতিবেদন জানায়, সে মাসে ম্রোরা নিজেদের উদ্যোগ ও অর্থায়নে নতুন একটি বর্ণমালা ঘর উদ্বোধন করেছেন। নাম রেখেছেন থারকিম, কারণ তাঁদের বর্ণমালাটি “পৃথিবীর নবীনতম”।
ম্রো লিপি ম্রো ভাষা লেখার নিজস্ব বর্ণমালা, যা 1980-এর দশকে বান্দরবানের এক কিশোর, মেনলে ম্রো (ক্রামাদি মেনলে নামেও পরিচিত), তৈরি করেন। এতে 31টি অক্ষর, নিজস্ব 10টি অঙ্ক আর দুটি দাঁড়িচিহ্ন আছে; লিপিটি 2014 সাল থেকে ইউনিকোডে আছে। তবে বাংলাদেশের সরকারি মাতৃভাষা-পাঠ্যবই কর্মসূচিতে ম্রো ভাষা নেই — লিপিটি শেখানো হয় মূলত সমাজের নিজস্ব কমিটি, কোর্স আর ব্যক্তিগত উদ্যোগে।
এই লেখায় লিপিটির অক্ষর, গঠন, ইউনিকোডে ঢোকার নথি, ফন্ট ও কিবোর্ড, বই, স্কুল আর কতজন লিপিটি পড়তে পারেন — এসব এক জায়গায় রাখা হলো। লিপির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ধর্মটির উৎপত্তি, পুরাণ ও আচারের বিস্তারিত আছে ক্রামা ধর্ম নিয়ে আমাদের লেখায়; ম্রো সমাজের সামগ্রিক পরিচয় আছে ম্রো জাতি: ক্রামা, বর্ণমালা ও চিম্বুকের পাহাড় লেখায়। এখানে সেগুলো আবার বলা হয়নি। একই ধাঁচের আরেকটি লিপির ইতিহাস পড়তে পারেন চাকমা লিপি (অঝাপাত): উৎপত্তি, বর্ণমালা, ইউনিকোড ও পুনরুজ্জীবন লেখায়।
সূচিপত্র
ম্রো লিপি হলো বাংলাদেশের বান্দরবানের ম্রো জনগোষ্ঠীর ভাষা লেখার জন্য তৈরি একটি বর্ণমালা। ইউনিকোড মানদণ্ড এর নাম দেয় “Mro”, আন্তর্জাতিক লিপি-কোড ISO 15924-এ এর কোড Mroo, সংখ্যা 264। লিপিটি ক্রামা ধর্মের সঙ্গে একসঙ্গে জন্ম নিয়েছিল বলে একে “ক্রামা বর্ণমালা”ও বলা হয়।
নামের এই দ্বৈততা উৎসগুলোতেই আছে। ক্রামা ধর্মের প্রধান পুরোহিত মাংইয়া ম্রো ডেইলি স্টার বাংলাকে (26 ডিসেম্বর 2024) বলেছেন, মেনলে ধর্মের বিধি-বিধান সংরক্ষণের জন্য “ক্রামা বর্ণমালা” উদ্ভাবন করেছিলেন, “যা এখন ম্রো বর্ণমালা হয়েছে”। বাংলা উইকিপিডিয়ার “ক্রামা” পাতাতেও লিপিটির নাম “ক্রামা বর্ণমালা”। এন্ডেঞ্জার্ড অ্যালফাবেটস প্রকল্পের Tim Brookes 2021 সালে লিখেছেন, লিপিটি সাধারণত Mro নামে পরিচিত, “also called Crama or Krama”। ইংরেজি উইকিপিডিয়া একে “Mru script” বলে।
ভাষার নাম নিয়েও একই রকম বৈচিত্র্য — ম্রো, মুরুং, মুরং, Mru। কোন নামটি জনগোষ্ঠী নিজেরা ব্যবহার করেন, সে আলোচনা আছে আমাদের আর্কাইভের মুরুং নাকি ম্রো লেখায়। এই লেখায় লিপির নাম হিসেবে “ম্রো লিপি” ও “ম্রো বর্ণমালা” দুটোই ব্যবহার হয়েছে, কারণ বাংলা সংবাদমাধ্যমে দুটোই চলে।
একটা বিভ্রান্তি এখানেই দূর করা দরকার। ইউনিকোড মানদণ্ডের মূল গ্রন্থ (অধ্যায় 13.8) স্পষ্ট করে লিখেছে, এই ম্রো ভাষা তিব্বতি-বর্মি পরিবারের “Mruic” শাখার, আর মিয়ানমারের “Mro-Khimi” নামের আরেকটি ভাষা থেকে আলাদা — সেটি কুকি শাখার। নাম এক হলেও দুটি আলাদা ভাষা।
সব উৎস একমত যে ম্রো লিপি তৈরি করেন মেনলে ম্রো, 1980-এর দশকে। কিন্তু নির্দিষ্ট সাল নিয়ে উৎসগুলো আলাদা: কেউ বলছে 1982, কেউ 1984, কেউ 1985, কেউ 1986। অনেক সময় একটি সাল উদ্ভাবনের, অন্যটি জনসমক্ষে প্রকাশের — নিচের ছকে প্রতিটি উৎস নিজে যা বলেছে তা-ই রাখা হলো।
| উৎস | লিপি তৈরি বা প্রকাশ নিয়ে যা বলে |
|---|---|
| মার্টিন হোস্কেন ও মাইকেল এভারসনের ইউনিকোড প্রস্তাব (2009) | লিপিটি “invented in the 1980s”; নির্দিষ্ট সাল নেই। |
| প্রথম আলো, 17 ফেব্রুয়ারি 2022 | “ক্রামাদি মেনলে ১৯৮২ সালে ম্রো ভাষার বর্ণমালা উদ্ভাবন করেন।” |
| গ্লোবাল ভয়েসেস, 5 মার্চ 2022 | 1982 সালে 17 বছর বয়সী কিশোর ক্রামাদি মেনলে বর্ণমালাটি তৈরি করেন। |
| বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, 21 ফেব্রুয়ারি 2026 | 1982 সালে, 17 বছর বয়সে, সুয়ালক ইউনিয়নের ম্রো আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বর্ণমালা প্রবর্তন। |
| দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 26 ডিসেম্বর 2024 | “১৯৮২ সালের ডিসেম্বরের ভরা পূর্ণিমার দিনে ক্রামাদি পাড়ায় বর্ণমালা প্রকাশ করেছিলেন মেনলে ম্রো।” |
| Tim Brookes, এন্ডেঞ্জার্ড অ্যালফাবেটস, 20 জুলাই 2021 (মেনলের ভাগনে Fungpre Mro-র বর্ণনায়) | 1980 সালে 15 বছর বয়সে আবাসিক স্কুলে ভর্তি; 1981 সালে লিপির কাজ শুরু, প্রায় এক বছরে শেষ; 1982 সালে স্কুলে জানাজানি; 1984 সালে ম্রোদের জন্য প্রকাশ। |
| Mong Sing Neo, নিউ এজ, 21 ফেব্রুয়ারি 2026 | 1985 সালে ধর্মপ্রচার শুরুর সময়েই 31 অক্ষরের লিপি তৈরি; 25 আগস্ট 1985 পোড়ায় প্রায় 5,000 মানুষের সামনে লিপিটি পড়ে শোনানো। |
| বাংলা উইকিপিডিয়া, “ক্রামা” | 5 এপ্রিল 1986, নিজ গ্রামে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে “ক্রামা বর্ণমালা” প্রকাশ। |
মেনলের নিজের জীবনের তারিখ নিয়েও একই অবস্থা। জন্মসাল নিউ এজ লিখেছে 1962; ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস (2022), বিডিনিউজ (ডিসেম্বর 2024), ডেইলি স্টার বাংলা (2024) ও এন্ডেঞ্জার্ড অ্যালফাবেটস (2021) লিখেছে 1965। জন্মস্থান নিউ এজ ও বাংলা উইকিপিডিয়ায় চিম্বুকের পাদদেশের পোড়া পাড়া; বিডিনিউজ বলছে সুয়ালক ইউনিয়নের একটি ম্রো গ্রাম, যার নাম এখন ক্রামাদি পাড়া; এন্ডেঞ্জার্ড অ্যালফাবেটস গ্রামের নাম লিখেছে Kretkung।
তিনি নিরুদ্দেশ হন কবে, সে প্রশ্নেও উত্তর একাধিক। ডেইলি স্টার বাংলা (20 অক্টোবর 2022) ও এন্ডেঞ্জার্ড অ্যালফাবেটস বলছে জুলাই 1984; বিডিনিউজ বলছে 1984, 19 বছর বয়সে; প্রথম আলো (2022) লিখেছে 1985; নিউ এজ লিখেছে ক্রামা প্রবর্তনের দেড় বছর পর। বিডিনিউজের বর্ণনায় যাওয়ার আগে তিনি পাঁচজন শিষ্য তৈরি করে যান, যাঁরা পরে নিজেদের মতো করে বর্ণমালা শেখানোর ব্যবস্থা করেন।
বেশিরভাগ উৎসের বর্ণনায় লিপিটির শুরু মেনলের স্কুলজীবনে। সুয়ালক ম্রো আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক চিত্তরঞ্জন জলদাস বিডিনিউজকে (16 ডিসেম্বর 2024) মনে করে বলেছেন, মেনলে নামের এক ছাত্র একদিন ক্লাসে দাঁড়িয়ে বলেছিল, সে ম্রোদের জন্য বর্ণমালা তৈরি করবে।
ম্রো লিপি আর ক্রামা ধর্ম একসঙ্গে এসেছিল, আর দুটোর পেছনেই একটি পুরাণ: সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি জাতিকে ধর্মগ্রন্থ ও বর্ণমালা পাঠিয়েছিলেন, ম্রোদেরটা বাহক গরু পথে খেয়ে ফেলে। এই পুরাণের একাধিক পাঠ আছে; আর মেনলের কাজকে ম্রোরা সেই হারানো জিনিস ফিরিয়ে আনা হিসেবে দেখেন।
পুরাণের পাঠগুলোর তুলনা আর ধর্মটির বিশ্বাস ও আচার নিয়ে আলোচনা আছে ক্রামা ধর্ম: গরু যে বইটা খেয়েছিল, আর মেনলে ম্রোর নতুন লিপি লেখায়। এখানে কেবল লিপির দিক থেকে যা প্রাসঙ্গিক, তা রাখা হলো।
লিপিটি কেন তৈরি হয়েছিল, সে প্রশ্নে দুটি ভাষ্য পাওয়া যায়, আর দুটির মধ্যে বিরোধ নেই। কবি ও গবেষক হাফিজ রশীদ খানের লেখা মেনলে ম্রো: পার্বত্য পুরাণের স্বপ্নবীজ (আমাদের আর্কাইভে সংরক্ষিত) অনুযায়ী ক্রামার প্রচার ও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেই মেনলে বর্ণমালাটি উদ্ভাবন করেন, আর তা দিয়ে লিপিবদ্ধ হয় ক্রামার সূক্তগুলো; পাশাপাশি চলে ম্রো পল্লিতে স্কুল প্রতিষ্ঠার লড়াই। প্রধান পুরোহিত মাংইয়া ম্রোর কথাও একই: ধর্মের বিধি-বিধান সংরক্ষণের জন্যই বর্ণমালা।
পুরাণটি নিয়ে ম্রোদের নিজেদের বর্ণনাও প্রকাশিত হয়েছে। ডেইলি স্টার বাংলার 2024 সালের প্রতিবেদনে খেদডিং ম্রো যে পাঠটি বলেছেন, তাতে গাভীটি ম্রো বর্ণমালা লেখা কলাপাতা মুখে নিয়ে আসছিল; ক্লান্ত হয়ে একটি ডুমুর গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ে, আর ঘুমের ঘোরে পাতাগুলো খেয়ে ফেলে। “এরপর থেকে ম্রো বর্ণমালাও পাওয়া যায়নি।” জুন 2026-এ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, এই কাহিনি নিয়ে Khandaker Mahfuz Salekin ও Tasnuva Himi-র লেখা ও সম্পাদনায়, শিল্পী Mong Shonie Rakhaine-এর আঁকায় একটি গ্রাফিক আখ্যান তৈরি হয়েছে — বাংলা অনুবাদের পাশাপাশি পুরোটাই ম্রো লিপিতে একটি সমান্তরাল সংস্করণসহ।
লিপি ও ধর্মের যোগ ক্যালেন্ডারেও আছে। ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে, ম্রো বর্ণমালা উদ্ভাবিত হয়েছিল বৃহস্পতিবার, আর মেনলের জন্ম, ধ্যান, ধর্ম প্রবর্তন ও গৃহত্যাগ রোববারে — তাই এই দুই দিন ক্রামা অনুসারীদের সাপ্তাহিক উপাসনার দিন। বর্ণমালা প্রকাশ হয়েছিল ডিসেম্বরে, তাই বার্ষিক ক্রামা সম্মেলনও ডিসেম্বরে: প্রথমটি 1986 সালে টংকাবতি ইউনিয়নের বাইট্যাপাড়ায়, 40তমটি 14–15 ডিসেম্বর 2024, শুরু হয় থারকিম ঘর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী ক্রামার বিধানে প্রতিটি গ্রামে পাঁচজন “ধর্ম ও বর্ণমালা প্রচারকারী” থাকার কথা, যাঁদের একজনের দায়িত্ব ভাষা শিক্ষক হিসেবে।
তবে লিপিটি এখন আর কেবল ক্রামা অনুসারীদের নয়। নিউ এজ, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস ও বিডিনিউজের প্রতিবেদনে লিপিটিকে ম্রো ভাষার সাধারণ বর্ণমালা হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে; মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী থেকে গণিতের বই পর্যন্ত — ধর্মের বাইরের বই এখন এই লিপিতেই ছাপা হচ্ছে (নিচে “ম্রো লিপিতে কী কী বই ছাপা হয়েছে” দেখুন)।
ম্রো বর্ণমালায় 31টি বর্ণ। এই সংখ্যায় উৎসগুলো একমত: ইউনিকোডের অক্ষর-তালিকায় বর্ণ 31টি, নিউ এজ ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসও 31 বলে, আর ডেইলি স্টার বাংলায় কিরওয়ান ম্রোও বলেছেন “৩১টি হরফ”। এর সঙ্গে আছে 0 থেকে 9 পর্যন্ত নিজস্ব 10টি অঙ্ক এবং দুটি দাঁড়িচিহ্ন। ইউনিকোডে সব মিলিয়ে 43টি অক্ষর।

ইউনিকোডে বর্ণগুলোর যে ক্রম, ইউনিকোড প্রস্তাব বলছে সেটিই ম্রো বর্ণমালার প্রচলিত ক্রম (“Collation order is as in the code chart”)। তাই প্রথম বর্ণ TA, শেষ বর্ণ TEK। প্রস্তাবের সঙ্গে জমা দেওয়া বর্ণমালা-ছকের শিরোনাম ছিল ম্রো ভাষায় “śaŋ loŋ”। বর্ণের নামগুলো, প্রস্তাবের ভাষায়, “traditional” — প্রতিটি নাম তার উচ্চারণের ধ্বনিগত প্রতিবর্ণীকরণ থেকে নেওয়া। নিচের ছকে ইউনিকোড কোড পয়েন্ট, ইংরেজি নাম, আর ইউনিকোডের দলিলে কোনো বাড়তি টীকা থাকলে তা দেওয়া হলো।
| ক্রম | কোড পয়েন্ট | ইউনিকোড নাম | ইউনিকোড দলিলের টীকা |
|---|---|---|---|
| 1 | U+16A40 | MRO LETTER TA | |
| 2 | U+16A41 | MRO LETTER NGI | |
| 3 | U+16A42 | MRO LETTER YO | |
| 4 | U+16A43 | MRO LETTER MIM | কিছু শব্দে [m] — যেমন min “বিড়াল”, cmi “ভাত” |
| 5 | U+16A44 | MRO LETTER BA | |
| 6 | U+16A45 | MRO LETTER DA | |
| 7 | U+16A46 | MRO LETTER A | |
| 8 | U+16A47 | MRO LETTER PHI | |
| 9 | U+16A48 | MRO LETTER KHAI | |
| 10 | U+16A49 | MRO LETTER HAO | 2009 সালের প্রস্তাবের বৈশিষ্ট্য-তালিকায় নাম ছিল HAE; চূড়ান্ত মানদণ্ডে HAO |
| 11 | U+16A4A | MRO LETTER DAI | কোড চার্টে বিকল্প নাম “i” |
| 12 | U+16A4B | MRO LETTER CHU | |
| 13 | U+16A4C | MRO LETTER KEAAE | [k]-এর সাধারণ বর্ণ — যেমন kow “গ্রাম” |
| 14 | U+16A4D | MRO LETTER OL | [l]-এর সাধারণ বর্ণ — যেমন lɔŋ “নৌকা” |
| 15 | U+16A4E | MRO LETTER MAEM | [m]-এর সাধারণ বর্ণ — যেমন maŋ “যাওয়া” |
| 16 | U+16A4F | MRO LETTER NIN | |
| 17 | U+16A50 | MRO LETTER PA | |
| 18 | U+16A51 | MRO LETTER OO | |
| 19 | U+16A52 | MRO LETTER O | |
| 20 | U+16A53 | MRO LETTER RO | |
| 21 | U+16A54 | MRO LETTER SHI | |
| 22 | U+16A55 | MRO LETTER THEA | |
| 23 | U+16A56 | MRO LETTER EA | |
| 24 | U+16A57 | MRO LETTER WA | |
| 25 | U+16A58 | MRO LETTER E | |
| 26 | U+16A59 | MRO LETTER KO | কিছু শব্দে [k] — যেমন ko “সোনা” |
| 27 | U+16A5A | MRO LETTER LAN | কিছু শব্দে [l]; প্রস্তাবে উদাহরণ নেই |
| 28 | U+16A5B | MRO LETTER LA | কিছু শব্দে [l] — যেমন lamɘ “চাঁদ”; কোড চার্টে “মাস”-এর প্রতীক হিসেবেও |
| 29 | U+16A5C | MRO LETTER HAI | কয়েকটি বর্ণগুচ্ছের সংক্ষেপ |
| 30 | U+16A5D | MRO LETTER RI | কোড চার্টে বিকল্প নাম “o” |
| 31 | U+16A5E | MRO LETTER TEK | tek “উদ্ধৃতি” শব্দের সংক্ষেপ |
| — | U+16A60–U+16A69 | MRO DIGIT ZERO … NINE | নিজস্ব 10টি অঙ্ক |
| — | U+16A6E | MRO DANDA | দাঁড়ি |
| — | U+16A6F | MRO DOUBLE DANDA | দুই দাঁড়ি |
ছকের উচ্চারণ-উদাহরণগুলো হোস্কেন-এভারসনের প্রস্তাব থেকে নেওয়া, রোমান ধ্বনিলিপিতে যেভাবে সেখানে দেওয়া আছে। বর্ণের নাম রোমান হরফে রাখা হয়েছে, কারণ এগুলো ইউনিকোডের আনুষ্ঠানিক নাম; প্রতিটি নামের প্রচলিত ম্রো উচ্চারণের কোনো বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
ম্রো লিপি বাঁ থেকে ডানে লেখা একটি সরল বর্ণমালা। এতে যুক্তবর্ণ, কার-চিহ্ন বা বিশেষ কাজের কোনো চিহ্ন নেই — প্রতিটি বর্ণ আলাদা দাঁড়ায়, শব্দের মাঝে ফাঁক থাকে। ম্রো ভাষা সুরভিত্তিক হলেও লিপিতে সুরচিহ্ন নেই। ইউনিকোড প্রস্তাবের ভাষায়, “The Mro script has no technical complexity”।
বাংলা বা চাকমা লিপির সঙ্গে এখানেই বড় পার্থক্য। ওই লিপিগুলোতে ব্যঞ্জনের সঙ্গে স্বরচিহ্ন জুড়ে বা দুটি ব্যঞ্জন মিলিয়ে নতুন আকার তৈরি হয়; ম্রো লিপিতে তা হয় না। ইউনিকোডের মূল গ্রন্থ তাই একে “alphabet” বলে — ইংরেজি বা রোমান হরফের মতো, যেখানে স্বর ও ব্যঞ্জন দুটোই পূর্ণ বর্ণ।
ম্রো ভাষা যে সুরভিত্তিক, তার সাক্ষ্য আছে আমাদের প্লুং বাঁশি নিয়ে লেখায় উদ্ধৃত ব্রাউন্স ও ল্যোফলারের বইয়ে, যেখানে ম্রো ভাষাকে তিন স্বরস্তরের “tonal language” বলা হয়েছে। লিখিত রূপে এই সুর ধরা হয় না; পাঠককে প্রসঙ্গ থেকে বুঝে নিতে হয়।
ম্রো লিপির একটি বৈশিষ্ট্য হলো, কয়েকটি ধ্বনির জন্য একাধিক বর্ণ আছে, আর কোন শব্দে কোনটি বসবে তা শব্দ ধরে ঠিক করা। হোস্কেন-এভারসনের প্রস্তাব তিনটি উদাহরণ দেয়:
এ ছাড়া দুটি স্বরবর্ণ পাশাপাশি বসিয়ে [ø] ধ্বনিটি লেখা হয় — অর্থাৎ যুক্তবর্ণ না থাকলেও যুগ্মবর্ণ (digraph) আছে।
দুটি বর্ণ সংক্ষেপচিহ্ন হিসেবেও বসে। TEK বর্ণটি একাই tek, অর্থাৎ “উদ্ধৃতি” শব্দটির জায়গা নিতে পারে। HAI বর্ণটি hai বা ɘi-এর মতো কয়েকটি বর্ণগুচ্ছের বদলে বসে — প্রস্তাবে উদাহরণ আছে hai-kan “তরকারি নাড়া”, hai-lɔŋ “নৌকা বাওয়া”, wɘi “আছে”, kɘi “ভাঙা”। ইউনিকোডের কোড চার্ট আরও জানায়, LA বর্ণটি “মাস”-এর প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
ম্রো লিপির দুটি যতিচিহ্ন — দাঁড়ি ও দুই দাঁড়ি — ইউনিকোডে ঢোকার আগে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। 17 মার্চ 2011 তারিখের একটি নথিতে (L2/11-122) মার্টিন হোস্কেন জানান, পর্যালোচনায় দুটি আপত্তি উঠেছিল: একক দাঁড়ির ব্যবহারের কোনো নমুনা জমা দেওয়া হয়নি, আর নমুনা লেখায় ইংরেজির পূর্ণবিরামও (.) দেখা গেছে — তাহলে দাঁড়ির বিন্দুটিকে কি আলাদা অক্ষর ধরা উচিত?
হোস্কেনের জবাবে একটি ছাপা নমুনা ছিল, যেখানে একটি অনুচ্ছেদের শেষে একক দাঁড়ি আছে। তিনি লেখেন, ম্রো লেখকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আছে — পশ্চিমা পূর্ণবিরাম ও কমা, নাকি নিজস্ব দাঁড়ি, নাকি দুটো মিশিয়ে। কিন্তু দাঁড়ির বিন্দুটি দাঁড়িরই অংশ, আলাদা পূর্ণবিরাম নয়; প্রধান নমুনা-ফন্টে দাঁড়ির বিন্দু গোল, আর পূর্ণবিরাম চৌকো। ইউনিকোড টেকনিক্যাল কমিটির দক্ষিণ এশীয় লিপি পর্যালোচনা দল (L2/11-139) এরপর দুটি চিহ্নই গ্রহণের সুপারিশ করে।
ম্রো বর্ণমালার 31টি বর্ণের কয়টি স্বরবর্ণ, তা নিয়ে উৎসগুলো এক কথা বলে না। ইউনিকোডের দলিল বর্ণগুলোকে স্বর-ব্যঞ্জনে ভাগ করে না; সংবাদমাধ্যম ও উইকিপিডিয়ায় তিনটি আলাদা হিসাব পাওয়া যায়।
ডেইলি স্টার বাংলায় (ডিসেম্বর 2024) কিরওয়ান ম্রো বলেছেন, “ম্রো বর্ণমালার ৩১টি হরফের মধ্যে ছয়টি স্বরবর্ণ।” ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Mru script” পাতা লিখেছে 23টি ব্যঞ্জন ও 8টি স্বর, তবে সেই বাক্যের সঙ্গে কোনো তথ্যসূত্র জোড়া নেই। বিডিনিউজের ফেব্রুয়ারি 2026-এর প্রতিবেদনে লেখক-গবেষক ইয়াংঙান ম্রোর উদ্ধৃতি হিসেবে ছাপা হয়েছে, “ম্রো বর্ণমালা মোট ৩১টি স্বরবর্ণ রয়েছে” — বাক্যটি মোট বর্ণসংখ্যাকেই স্বরবর্ণের সংখ্যা হিসেবে বলছে।
ইউনিকোডের নামগুলো থেকে এটুকু বোঝা যায় যে A, OO, O, EA, E — এই নামের বর্ণগুলো স্বরধ্বনি বোঝায়; প্রস্তাবের উদাহরণেও OO ও EA স্বর হিসেবে ব্যবহৃত। কিন্তু ছয়টি না আটটি, তা প্রস্তাব বা কোড চার্টে লেখা নেই।
একই প্রতিবেদনে কিরওয়ান ম্রো একটি তথ্য দিয়েছেন, যা ইউনিকোডের কোনো দলিলে নেই। তাঁর কথায়, রোমান হরফের বড় ও ছোট হাতের মতো ম্রো বর্ণমালাতেও তিন ধারার হরফ আছে: সাংলু, ইউকলুং ও মুক্লুং। সাংলু দিয়ে সাধারণ লেখা, গান, কবিতা, ইতিহাস ও সাহিত্য; ইউকলুং দিয়ে ধর্মগ্রন্থ; আর মুক্লুং দিয়ে ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক চিঠিপত্র লেখা হয়।
ইউনিকোডে ম্রো লিপির একটিই অক্ষর-সেট, কোনো বড়-ছোট হাতের ভাগ নেই। 2009 সালের প্রস্তাবের বর্ণমালা-ছকের শিরোনাম “śaŋ loŋ” আর কিরওয়ান ম্রোর “সাংলু” নামের মিল চোখে পড়ে, তবে দুটি একই জিনিস কি না, কোনো উৎসে বলা নেই। ইউকলুং ও মুক্লুং ধারার কোনো নমুনা বা বর্ণনা অন্য কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি।
ইউনিকোডের দলিল অনুযায়ী ম্রো লিপি অন্য কোনো লিপি থেকে আসেনি। 2009 সালের প্রস্তাব একে “messianic” শ্রেণির লিপি বলেছে, যার কোনো বিদ্যমান লিপির সঙ্গে “genetic relationship” নেই; কিছু বর্ণের সঙ্গে অন্য বর্ণমালার চেহারার মিল “purely coincidental”।
ইউনিকোড মানদণ্ডের মূল গ্রন্থের 13.8 অধ্যায়ও একই কথা বলে: লিপিটি “unrelated to any other script”। অর্থাৎ চাকমা লিপির মতো এটি ব্রাহ্মী-পরিবারের সদস্য নয়; এটি একজন মানুষের হাতে নতুন করে বানানো একটি বর্ণমালা।
তবে ভিন্নমতও আছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে, কিছু পাঠ্যবই দাবি করে মেনলে রোমান, বর্মি ও চীনা হরফের ভিত্তিতে লিপিটি গড়েছিলেন, আর অন্যরা বলে যেকোনো মিল কাকতালীয়। উইকিপিডিয়া কোন পাঠ্যবইয়ের কথা বলছে, তার নাম দেয়নি।
মেনলের নিজের শিক্ষা এই প্রশ্নে প্রাসঙ্গিক। Tim Brookes লিখেছেন, ম্রো লিপির আগে বেশিরভাগ গ্রামের স্কুলে বর্মি লিপির আত্মীয় মারমা বর্ণমালা পড়ানো হতো। ক্রামা ধর্ম নিয়ে আমাদের লেখায় উদ্ধৃত নিউ এজের একটি আগের লেখা অনুযায়ী মেনলে কাটং ম্রোর কাছে মারমা ভাষায় পড়তে-লিখতে শিখেছিলেন। পরে তিনি সুয়ালকের ম্রো আবাসিক স্কুলে পড়েন। অর্থাৎ অন্তত দুটি লিপির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল — কিন্তু সেগুলোর কোনোটি থেকে তিনি বর্ণ নিয়েছিলেন, এমন কথা ইউনিকোডের দলিল বা অন্য কোনো পঠিত উৎস বলে না।
ম্রো লিপি ইউনিকোডে যুক্ত হয় 16 জুন 2014 প্রকাশিত ইউনিকোড 7.0 সংস্করণে। ব্লকটির নাম “Mro”, পরিসর U+16A40 থেকে U+16A6F — ইউনিকোডের সম্পূরক বহুভাষিক তলে (SMP)। ভিত্তি ছিল মার্টিন হোস্কেন ও মাইকেল এভারসনের 2009 সালের প্রস্তাব, যাতে 43টি অক্ষর ছিল; চূড়ান্ত ব্লকেও সেই 43টিই আছে।
ইউনিকোড যুক্ত হওয়ার মানে, কোনো বিশেষ ফন্ট-কৌশল ছাড়াই ম্রো লেখা কম্পিউটার, ফোন বা ওয়েবপাতায় সঠিক অক্ষর হিসেবে সংরক্ষণ, খোঁজা ও পাঠানো যায় — শর্ত শুধু একটি ইউনিকোড-সমর্থিত ফন্ট থাকা। নিচে নথিগুলোর ক্রম:
| তারিখ | নথি | কী হলো |
|---|---|---|
| 24 মার্চ 2009 | L2/09-097 (WG2 N3589) | হোস্কেন ও এভারসনের প্রথম প্রস্তাব: “Proposal for encoding the Mro script in the SMP of the UCS”, 43টি অক্ষর। |
| 27 অক্টোবর 2009 | L2/09-097R (N3589R) | সংশোধিত প্রস্তাব; অক্ষর একই, ব্যবহারকারী সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ হিসেবে John Clifton-এর নাম; কাজে পায়াপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের (চিয়াং মাই, থাইল্যান্ড) আংশিক সহায়তা। |
| 17 মার্চ 2011 | L2/11-122 (N4010) | হোস্কেনের “Discussion of Mro Dandas” — দাঁড়ি ও দুই দাঁড়ির পক্ষে নমুনা ও যুক্তি। নথি জানায়, লিপিটি ISO 10646-এর একটি ভবিষ্যৎ সংশোধনীতে যুক্ত হওয়ার জন্য ইতিমধ্যে গৃহীত। |
| 2011 | L2/11-139 | দক্ষিণ এশীয় লিপি পর্যালোচনা দলের সুপারিশ: দুটি দাঁড়িচিহ্নই গ্রহণ করা হোক। |
| 16 জুন 2014 | ইউনিকোড 7.0.0 | প্রকাশ; এই সংস্করণে মোট 2,834টি অক্ষর ও 23টি নতুন লিপি যুক্ত হয়, তার একটি ম্রো। |
প্রস্তাবের আবেদনপত্রে কয়েকটি তথ্য আছে, যা লিপিটির অবস্থা বোঝায়। লিপিটিকে রাখা হয়েছে “Category A” বা সমসাময়িক, প্রচলিত লিপির শ্রেণিতে; ব্যবহারের প্রশ্নে উত্তর “In Bangladesh”; আর ব্যবহারের উদ্দেশ্য “To write the Mro language”। প্রস্তাবের সঙ্গে চারটি নমুনা জমা দেওয়া হয়েছিল: বর্ণমালার ছক, 1 থেকে 100 পর্যন্ত সংখ্যার ছক, ম্রো লিপিতে একটি নমুনা লেখা, আর দেয়ালে টাঙানোর একটি বর্ণমালা-চার্ট।
প্রস্তাব আর চূড়ান্ত মানদণ্ডের মধ্যে একটি ছোট পরিবর্তন ধরা পড়ে। প্রস্তাবের অক্ষর-বৈশিষ্ট্য তালিকায় U+16A49-এর নাম ছিল MRO LETTER HAE, যদিও একই নথির কোড চার্টে লেখা HAO। আজকের ইউনিকোড ক্যারেক্টার ডেটাবেসে নামটি HAO।
আন্তর্জাতিক লিপি-কোড তালিকা ISO 15924-এ ম্রো লিপির চার অক্ষরের কোড Mroo ও সংখ্যা 264। একই তালিকার ভুক্তিতে লিপিটির দুটি ইংরেজি নাম — “Mro, Mru” — আর ইউনিকোডে যুক্ত হওয়ার সংস্করণ হিসেবে 7.0 লেখা আছে।

ম্রো লিপি কম্পিউটারে আসে 1994 সালে, Menrum Mro-র তৈরি প্রথম সফটওয়্যারে, পরে যার নাম হয় “Rien”। এখন ইউনিকোড-ভিত্তিক ফন্ট (Noto Sans Mro), একটি উন্মুক্ত কিবোর্ড আর সরকারি উদ্যোগে তৈরি মোবাইল অ্যাপ আছে। ধাপগুলো নিচে।
সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি কত দ্রুত বদলেছে, দুটি প্রতিবেদন পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়। গ্লোবাল ভয়েসেস 5 মার্চ 2022 লিখেছিল, ম্রোর ইউনিকোড ব্লক থাকলেও ভাষাটি “still cannot be written online”। চার বছর পর বিডিনিউজ লিখছে, অ্যাপ ব্যবহার করে ম্রোরা নিজের ভাষায় বার্তা পাঠাচ্ছেন, মোবাইল নম্বর সেভ করছেন, ম্রো অঙ্কে হিসাব করছেন, ফেসবুকে লিখছেন। ইয়াংঙান ম্রোর পর্যবেক্ষণ: যাঁরা বাংলা জানেন না, অ্যাপ আসার পর তাঁরাই সবচেয়ে সহজে নিজের ভাষায় লিখতে পারছেন।
অনলাইনে ম্রো লেখার একটি নিয়মিত জায়গাও তৈরি হয়েছে। যোহন ম্রো কোভিড মহামারির পর “দ্য ম্রোচা ডট ব্লগ স্পট” নামে ম্রো ভাষায় একটি ব্লগ খোলেন, যেখানে ম্রো সমাজ, জীবনাচার ও শিক্ষা-সংস্কৃতি নিয়ে লেখা ছাপা হয়। বান্দরবান শহরের উজানি পাড়ায় তাঁর কম্পিউটারের দোকানে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসেন ম্রো ভাষায় লেখা ছাপাতে।
প্রকাশনার দিক থেকেও ফন্ট একসময় বাধা ছিল। সিয়াটল স্টারে (মার্চ 2019) Pantha Rahman Reza লিখেছেন, ম্রো ভাষায় গল্পের বই ছাপার সময় ফন্ট নিয়ে কাজ করাই ছিল দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ এমন ফন্ট দেশের সবচেয়ে বড় বইবাজার বাংলাবাজারে আগে কখনো ব্যবহার হয়নি।
ম্রো লিপি শেখানো হয় মূলত ম্রো সমাজের নিজস্ব উদ্যোগে — পাড়াভিত্তিক ভাষা কমিটি, ক্রামা ধর্মের প্রচারক, স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক আর বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের (কেএসআই) কোর্সে। সরকারের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যবই কর্মসূচিতে ম্রো ভাষা নেই।
শিক্ষক ও গবেষক তারিক মনজুর প্রথম আলোয় (6 মার্চ 2024) লিখেছেন, প্রথম দফায় পাঠ্যবই তৈরি হয় পাঁচটি ভাষায় — চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা (ককবরক), সাদরি (ওঁরাও) ও গারো (মান্দি); 2017 সালে প্রাক-প্রাথমিক, তারপর 2018, 2019 ও 2020 সালে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বই। এই তালিকায় ম্রো নেই। কোন কোন ভাষা কর্মসূচিতে আছে আর কেন কিছু ভাষা বাদ পড়েছে, তার বিস্তারিত আছে আমাদের পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা লেখায়।
এই অভাবের কথা ম্রো সমাজের নেতারা প্রকাশ্যেই বলছেন। ডেইলি স্টার বাংলার 2024 সালের প্রতিবেদনে ক্রামা ধর্মের নেতারা বলেছেন, সরকার মারমা ও চাকমা ভাষার পাশাপাশি ম্রো ভাষায়ও শিক্ষার উদ্যোগ নিলে বাংলার পাশাপাশি প্রতিটি ম্রো মানুষ নিজের ভাষা শিখতে পারবে।
তবে একটি উৎস ভিন্ন ছবি দেয়। ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসে (13 অক্টোবর 2022) Syeda Fabiha Tasnim লিখেছেন, লিপিটি এখন “a part of the textbooks of grades one to three of the local schools”। কোন স্কুল, কারা বই প্রকাশ করেছে, সরকারি না বেসরকারি — প্রতিবেদনে তা বলা নেই। সরকারি তালিকায় ম্রো না থাকায় এই বাক্যটি স্থানীয় বা বেসরকারি উদ্যোগের কথা বলছে কি না, তা যাচাই করা যায়নি।
নিউ এজের লেখা অনুযায়ী 1986-87 সালে ভাষা প্রসারের জন্য “Mro Chah Cha Sangra” নামে একটি স্কুল হয়; শিক্ষার্থীরা তিন বছর পড়ে নিজ নিজ গ্রামে ফিরে অন্যদের শেখাতেন। বিডিনিউজ জানায়, মেনলে নিজেও চিম্বুক এলাকা ও অন্যান্য ম্রো পাড়ায় স্কুল খুলে বর্ণমালা শেখাতেন, আর তখন পাড়ায় পাড়ায় “ম্রো ভাষা শিক্ষা কমিটি” থাকত; এখন সেগুলো “কোথাও সক্রিয়, কোথাও অনিয়মিত”।
এন্ডেঞ্জার্ড অ্যালফাবেটসের 2021 সালের লেখায় মেনলের ভাগনের বর্ণনা আছে, গ্রামের প্রবীণ Langpung প্রথমে একমাত্র মানুষ ছিলেন যিনি মেনলের কথা বিশ্বাস করেন, আর পরে তিনিই গ্রামে বর্ণমালার ক্লাসের ব্যবস্থা করেন, যেখানে শিক্ষক কোনো টাকা নিতেন না। 2004 সালে ম্রো বর্ণমালা সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আর্থিক সহায়তা পায়, আর তাতে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই ছাপা সম্ভব হয় (নিউ এজ)।
এই ধারাটি এখনো চলছে। বাগানচাষি ও ম্রো ভাষার প্রশিক্ষক ঙানসিং ম্রো বিডিনিউজকে বলেছেন, তিনি 1985-86 সালে বর্ণমালা শিখেছেন আর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে শিশুদের শেখান। 2019 সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে দ্য ডেইলি স্টারে Sanjoy Kumar Barua লিখেছেন, 48 বছর বয়সী কৃষক Menpoy Mro ক্রামাদি পাড়ায় নিজের বাড়িতে প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিনা পয়সায় ম্রো শিশুদের মাতৃভাষায় পড়াচ্ছেন; প্রতিবেদকের সফরের দিন সেখানে 35 জন শিশু নিজেদের ভাষায় বর্ণ, ছড়া আর জাতীয় সংগীত আবৃত্তি করছিল।
বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক নুক্রাচিং মারমা বিডিনিউজকে (2026) বলেছেন, কেএসআই ম্রো ভাষার দুই মাসের একটি কোর্স চালায়, প্রতি ব্যাচে 30 জন। মেলকম ম্রো জানিয়েছেন, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় কেএসআই থেকে একজন ম্রো ভাষার শিক্ষক তাঁর স্কুলে এসে দুপুরের পর এক-দুই ঘণ্টা বর্ণমালা শেখাতেন; পরে তিনি কেএসআইয়ের দুটি কোর্সও করেছেন। বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফেকরু ম্রো 2018 সালে থানচিতে তিন মাসের কোর্স আর 2024 সালে কেএসআইয়ের কোর্স করেছেন।
দ্য ডেইলি স্টারে Tamanna Khan-এর 8 জুলাই 2015-এর প্রতিবেদন জানায়, সরকার ও ইউনিসেফের যৌথ অর্থায়নে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে বান্দরবানের প্রায় 1,000 পাড়াকেন্দ্রের 208টিতে সে বছর মারমা, ত্রিপুরা ও ম্রো — তিন ভাষায় বহুভাষিক শিক্ষার পাইলট শুরু হয়। ম্রো-অধ্যুষিত Empu Para-র কেন্দ্রে শিশুরা ম্রো ভাষায় ছড়া আর জিনিসের নাম শিখছিল। তবে সেখানে কোন লিপি ব্যবহার হয়েছে — ম্রো লিপি না বাংলা হরফ — প্রতিবেদনে বলা নেই।
এর বাইরে স্কুলের দেয়ালেও লিপিটি জায়গা পেয়েছে। Tim Brookes 2014 সালে লিখেছেন, “আওয়ার গোল্ডেন আওয়ার” সংস্থার তিনটি স্কুলের (265 শিশু) জন্য তিনি শ্রেণিকক্ষের দরজায় চার লিপিতে — বাংলা, মারমা, চাকমা ও ম্রো — ঘরের নম্বর লিখে দেন, কারণ এই আদিবাসী লিপিগুলো সরকারি সাইনবোর্ডে প্রায় কখনো দেখা যায় না।
ম্রো লিপিতে প্রথম ছাপা বইয়ের নথিভুক্ত উল্লেখ 1994 সালের, Rien সফটওয়্যারে ছাপা একটি ধর্মীয় শিক্ষার বই। এরপর 2004 সালে প্রাথমিকের পাঠ্যবই, আর গত এক দশকে গল্প, ব্যাকরণ, জীবনী, অভিধান ও গণিতের বই। সবচেয়ে বেশি বই একজন লেখকের — ইয়াংঙান ম্রোর।
| সাল | বই বা প্রকাশনা | উৎস |
|---|---|---|
| 1994 | Menrum Mro-র Rien সফটওয়্যারে ছাপা ধর্মীয় শিক্ষার বই | নিউ এজ, 2026 |
| 2004 | প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই (ম্রো বর্ণমালা সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অর্থায়নে) | নিউ এজ, 2026 |
| 2019 | ইয়াংঙান ম্রোর রূপকথার বই (“Mro Fairy Tales”), বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন; ম্রো ভাষার ফন্টে প্রকাশিত প্রথম কথাসাহিত্য বলে উল্লিখিত | সিয়াটল স্টার (গ্লোবাল ভয়েসেস থেকে), মার্চ 2019 |
| 17 ফেব্রুয়ারি 2022 | “ততোং” — ইয়াংঙান ম্রোর লেখা ম্রো ভাষার প্রথম ব্যাকরণ, বাংলা ব্যাকরণ ও ইংরেজি গ্রামারের অনুকরণে | প্রথম আলো; গ্লোবাল ভয়েসেস, 2022 |
| ডিসেম্বর 2024 | “নমমো তসেন কিয়াক মি” — সাত বীরশ্রেষ্ঠের জীবনী, 24 পৃষ্ঠা, ম্রো লিপিতে; লিখতে সময় লেগেছে প্রায় সাত বছর | বিডিনিউজ, 16 ডিসেম্বর 2024; দ্য বর্ডারলেন্স |
| ডিসেম্বর 2024-এর আগে | “মিটচ্য তখক” — বিপন্ন রেংমিটচ্য ভাষার শব্দভাণ্ডার, 2013 থেকে দশ বছরের সংগ্রহ; রেংমিটচ্যের নিজস্ব বর্ণমালা না থাকায় উচ্চারণ ম্রো শব্দের পাশাপাশি বাংলা শব্দের মাধ্যমে লেখা | বিডিনিউজ, 16 ডিসেম্বর 2024 |
| 2026 | ঙানসিং ম্রোর গণিতের বই, 40 পৃষ্ঠা, প্রথম দফায় 400 কপি, প্রতি কপির ছাপা খরচ 135 টাকা; গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আগের বই সংশোধন করে | বিডিনিউজ, 21 ফেব্রুয়ারি 2026 |
| 2026 | হারানো লিপির লোককাহিনি নিয়ে গ্রাফিক আখ্যান, পুরোটাই ম্রো লিপিতে একটি সমান্তরাল সংস্করণসহ | দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, 30 জুন 2026 |
ইয়াংঙান ম্রো চিম্বুক পাহাড়ের বাইট্যা পাড়ার বাসিন্দা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। তাঁর বইয়ের মোট সংখ্যা প্রতিটি প্রতিবেদনে বেড়েছে, যা কাজটি চলমান থাকারই চিহ্ন: গ্লোবাল ভয়েসেস (মার্চ 2022) লিখেছে 28টি (ম্রো ভাষায় 18, বাংলায় 10); ডেইলি স্টার বাংলা (আগস্ট 2022) 29টি (19 ও 10); বিডিনিউজ (ডিসেম্বর 2024) 33টি (ম্রো ভাষায় 21, বাংলায় 11, আর রেংমিটচ্য শব্দভাণ্ডার নিয়ে ম্রো ও বাংলায় 1); আর বিডিনিউজ (ফেব্রুয়ারি 2026) ম্রো ভাষায় 21টি, রেংমিটচ্য ভাষায় 2টি ও বাংলায় 12টি।
বইগুলো পাঠকের কাছে পৌঁছানোর একটি জায়গাও তিনি তৈরি করেছেন। ডেইলি স্টার বাংলার আগস্ট 2022-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী চিম্বুকের পাদদেশে রামরি পাড়ায় প্রায় 1,300 ফুট উচ্চতার একটি জুমঘরকে তিনি পাঠাগার বানিয়েছেন, যেখানে ম্রো ভাষায় রূপকথা, লোককাহিনি, ক্রামা ধর্ম ও ব্যাকরণের বই রাখা।
প্রথম আলোর 2022 সালের প্রতিবেদন মনে করিয়ে দেয়, বর্ণমালা থাকলেও লেখার নিয়ম স্থির হতে সময় লাগে: “এতদিন ম্রো ভাষার ব্যাকরণ না থাকায় বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে বানান, শব্দ প্রয়োগ ও ক্রিয়াপদের ব্যবহার করে আসছিলেন”, ফলে একজনের লেখা আরেকজনের বুঝতে কষ্ট হতো। ইয়াংঙান ম্রো নিজেই মেনে নিয়েছেন, প্রারম্ভিক উদ্যোগ হিসেবে “ততোং”-এ ভুলত্রুটি থাকতে পারে। বীরশ্রেষ্ঠ বইটি লিখতে গিয়েও তাঁকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে — “বীরশ্রেষ্ঠ”-এর সরাসরি কোনো ম্রো শব্দ নেই, তাই বইয়ের নাম “নমমো তসেন কিয়াক মি”, যার অর্থ যুদ্ধে শ্রেষ্ঠ।
বই ছাড়াও দৈনন্দিন লেখায় লিপিটি চলে। বিডিনিউজ জানায়, বর্ণমালা তৈরির পর থেকে আমন্ত্রণপত্র, চিঠি, সামাজিক নির্দেশনা আর পাড়ার নাম ম্রো ভাষায় লেখা হতো, ছোট ছোট পুস্তিকাও ছাপা হতো।
কতজন ম্রো এই লিপি পড়তে-লিখতে পারেন, তার কোনো জরিপভিত্তিক হিসাব নেই। যে হিসাবগুলো আছে, তা একে অন্যের সঙ্গে মেলে না — “80 শতাংশের বেশি” থেকে “হয়তো 50 জন” পর্যন্ত। নিচের ছকে প্রতিটি দাবি তার উৎসসহ।
| উৎস | দাবি |
|---|---|
| হোস্কেন ও এভারসন, ইউনিকোড প্রস্তাব, 2009 | গত 10 বছরে সব ম্রো এই লিপি গ্রহণ করেছেন; 1,00,000 ম্রোর মধ্যে সাক্ষরতা “exceed 80%”। |
| ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, 2022 | বাংলাদেশের ম্রো জনসংখ্যার আনুমানিক 60 শতাংশ “related to the Mro script”। |
| পাকো ম্রো, ডেইলি স্টার বাংলা, ডিসেম্বর 2024 | “প্রায় ৮০ শতাংশ ম্রো এই বর্ণমালা লিখতে-পড়তে পারেন।” |
| এন্ডেঞ্জার্ড অ্যালফাবেটস অ্যাটলাস (তারিখ নেই) | “perhaps as few as 50 Mro can still read and write their own script”। |
| নিউ এজ, 2026 | কোনো সংখ্যা নেই: “many individuals can read and write in the Mro script”। |
প্রথম তিনটি দাবি একই দিকে, আর চতুর্থটি একদম উল্টো। এন্ডেঞ্জার্ড অ্যালফাবেটসের অ্যাটলাস পাতায় ম্রো জনসংখ্যাও লেখা “about 20,000”, যেখানে বিডিনিউজ ও ডেইলি স্টার বাংলা জনশুমারির হিসাবে 51,448 লিখেছে (দুই প্রতিবেদনেই সাল লেখা 2021); পাতাটির তথ্য কোন সময়ের, তা স্পষ্ট নয়।
সংখ্যার বাইরে প্রতিবেদনগুলোতে কিছু গুণগত পর্যবেক্ষণ আছে, যেগুলো পাশাপাশি পড়লে ছবিটা কিছুটা স্পষ্ট হয়। ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে, বয়োবৃদ্ধ ম্রোদের অনেকে বর্ণমালা পড়তে-লিখতে না পারলেও নতুন প্রজন্মের অনেকেই পারদর্শী। মেলকম ম্রো বিডিনিউজকে বলেছেন, যাঁরা ম্রো লিখতে পারেন তাঁদের সঙ্গে চ্যাট হয়, “তবে বেশিক্ষণ করা যায় না। অনেকেই এখনও ভাল করে ম্রো ভাষা লিখতে পারে না।” আর ইয়াংঙান ম্রো বলেছেন, বেশিরভাগ ম্রো নিজের ভাষায় পড়তে-লিখতে পারেন কিন্তু বাংলা পড়তে পারেন না।
শেষ কথাটির শিক্ষাগত তাৎপর্য বড়। 2019 সালের ডেইলি স্টার প্রতিবেদনে ম্রো লেখক Sing Young Mro বলেছেন, ম্রোসহ বহু আদিবাসী শিশু প্রাথমিক স্তরেই ঝরে পড়ে, প্রধানত ভাষার বাধায়; ক্রামাদি পাড়ার এক দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র বলেছে, স্কুলে কেবল বাংলা চলে, যা সে ভালো বোঝে না।
এই প্রশ্নে উৎসগুলো পরস্পরবিরোধী। বাংলাদেশের ম্রো লেখকেরা বলছেন, মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের ম্রোরাও মেনলের লিপি ব্যবহার করেন। এন্ডেঞ্জার্ড অ্যালফাবেটস বলছে, মিয়ানমারের “Mro” নামের গোষ্ঠী আলাদা ভাষায় কথা বলে এবং এই লিপি ব্যবহার করে না।
বিডিনিউজের (ফেব্রুয়ারি 2026) প্রতিবেদন অনুযায়ী মিয়ানমারের রাখাইন ও “শাইন” রাজ্যের ম্রোরা মেনলের প্রবর্তিত বর্ণমালায় চর্চা করেন। ইয়াংঙান ম্রো সেখানে বলেছেন, মিয়ানমারের ম্রোরা বাংলাদেশে বেড়াতে এলে গান, গল্প, সামাজিক ও ক্রামা রীতিনীতির বই কিনে নিয়ে যান। ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসও লিখেছে, ক্রামা মিয়ানমারে ছড়িয়েছে।
অন্যদিকে, মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদ সংস্থা বিএনআই (নারিনজারার প্রতিবেদন, 27 এপ্রিল 2017) রাখাইনের Mrauk-U-তে ম্রো ভাষার লেখা-পদ্ধতি নিয়ে একটি প্রশিক্ষণের খবর দিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, ম্রো ভাষার লেখা-পদ্ধতিটি “based on the English alphabet” — 1996 সালে সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিকসের Kenneth Edison এটি তৈরি করেন। ওই প্রতিবেদনে মেনলে, ক্রামা বা বাংলাদেশের কোনো উল্লেখ নেই।
এই বিরোধের একটি সম্ভাব্য সূত্র ইউনিকোডের মূল গ্রন্থেই আছে: ম্রো ভাষা দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সংলগ্ন এলাকায় বলা হয়, কিন্তু মিয়ানমারের “Mro-Khimi” আলাদা ভাষা। বিএনআইয়ের প্রতিবেদন কোন ভাষার কথা বলছে, প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Mru language” পাতা বলছে, ভাষাটি ম্রো ও লাতিন — দুই লিপিতেই লেখা হয়।
দুটিই পার্বত্য চট্টগ্রামের নিজস্ব লিপি, দুটিই ইউনিকোডে আছে। কিন্তু চাকমা লিপি ব্রাহ্মী-পরিবারের পুরোনো লিপি, অন্তত 1903 সাল থেকে ছাপা নথিতে আছে, আর ম্রো লিপি 1980-এর দশকে একজন মানুষের তৈরি, কোনো পরিবারের নয়। স্কুলের প্রশ্নেও তফাত বড়: চাকমার সরকারি পাঠ্যবই আছে, ম্রোর নেই।
| বিষয় | চাকমা লিপি | ম্রো লিপি |
|---|---|---|
| উৎপত্তি | ব্রাহ্মী-পরিবারের; মাঝের ধাপ নিয়ে মতভেদ | কোনো লিপি-পরিবারের নয় (ইউনিকোড) |
| কে, কবে | উৎপত্তির সময় নিয়ে সমসাময়িক নথি নেই; 1903 সালে গ্রিয়ারসনের ছাপা ছক প্রথম দিকের নথিগুলোর একটি | মেনলে ম্রো, 1980-এর দশক |
| গঠন | ব্যঞ্জনে অন্তর্নিহিত স্বর “আ”; স্বরচিহ্ন ও যুক্তবর্ণ আছে | সরল বর্ণমালা; যুক্তবর্ণ, কার-চিহ্ন বা সুরচিহ্ন নেই |
| ইউনিকোড | 6.1 সংস্করণ, 2012; U+11100–U+1114F; এখন 71টি অক্ষর | 7.0 সংস্করণ, 2014; U+16A40–U+16A6F; 43টি অক্ষর |
| ISO 15924 কোড | Cakm (349) | Mroo (264) |
| নিজস্ব অঙ্ক | আছে | আছে, 10টি |
| সরকারি পাঠ্যবই (বাংলাদেশ) | 2017 থেকে প্রাক-প্রাথমিক, পরে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত | নেই; সমাজের নিজস্ব বই ও কোর্স |
| ধর্মের সঙ্গে যোগ | বৈদ্যদের পুঁথি ও বৌদ্ধ গ্রন্থে ব্যবহার | ক্রামা ধর্মের সঙ্গে একসঙ্গে জন্ম |
চাকমা লিপির সব তথ্য আমাদের চাকমা লিপি লেখা থেকে, যেখানে প্রতিটির উৎস দেওয়া আছে। পাহাড়ের অন্যান্য ভাষা ও জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক পরিচয় পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
ম্রো লিপি তৈরি করেন মেনলে ম্রো, যিনি ক্রামাদি মেনলে নামেও পরিচিত এবং ক্রামা ধর্মের প্রবর্তক। বেশিরভাগ উৎসের বর্ণনায় তিনি তখন বান্দরবানের সুয়ালকের ম্রো আবাসিক স্কুলের ছাত্র। জন্মসাল নিয়ে দুই হিসাব আছে: নিউ এজ লিখেছে 1962, আর ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বিডিনিউজ ও ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে 1965। নিরুদ্দেশের সাল ডেইলি স্টার বাংলা ও বিডিনিউজের হিসাবে 1984, প্রথম আলোর হিসাবে 1985; নিউ এজ লিখেছে ক্রামা প্রবর্তনের দেড় বছর পর।
উৎসভেদে আলাদা। প্রথম আলো, বিডিনিউজ ও ডেইলি স্টার বাংলা বলছে 1982 — ডেইলি স্টারের হিসাবে সে বছরের ডিসেম্বরের পূর্ণিমায় ক্রামাদি পাড়ায় প্রকাশ। Tim Brookes লিখেছেন কাজ শুরু 1981, প্রকাশ 1984। নিউ এজ জনসমক্ষে উন্মোচনের তারিখ দিয়েছে 25 আগস্ট 1985, আর বাংলা উইকিপিডিয়া দিয়েছে 5 এপ্রিল 1986।
ম্রো বর্ণমালায় 31টি বর্ণ। এর সঙ্গে আছে 0 থেকে 9 পর্যন্ত নিজস্ব 10টি অঙ্ক আর দুটি যতিচিহ্ন — দাঁড়ি (U+16A6E) ও দুই দাঁড়ি (U+16A6F)। ইউনিকোডের ম্রো ব্লকে সব মিলিয়ে 43টি অক্ষর। ইউনিকোডের অক্ষর-তালিকা, নিউ এজ, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস ও ডেইলি স্টার বাংলা — সবখানেই বর্ণের সংখ্যা 31।
এ নিয়ে একমত হিসাব নেই। ডেইলি স্টার বাংলায় (ডিসেম্বর 2024) কিরওয়ান ম্রো বলেছেন, 31টির মধ্যে 6টি স্বরবর্ণ। ইংরেজি উইকিপিডিয়া 23টি ব্যঞ্জন ও 8টি স্বর লিখেছে, তবে কোনো তথ্যসূত্র ছাড়া। ইউনিকোডের দলিল বর্ণগুলোকে স্বর-ব্যঞ্জনে ভাগ করে না; তবে A, OO, O, EA, E নামের বর্ণগুলো স্বরধ্বনি বোঝায়।
হ্যাঁ। ম্রো লিপি 16 জুন 2014 প্রকাশিত ইউনিকোড 7.0 সংস্করণে যুক্ত হয়। ব্লকের নাম “Mro”, পরিসর U+16A40 থেকে U+16A6F, অক্ষর 43টি। ভিত্তি ছিল মার্টিন হোস্কেন ও মাইকেল এভারসনের 2009 সালের প্রস্তাব (L2/09-097R)। আন্তর্জাতিক লিপি-কোড ISO 15924-এ এর কোড Mroo, সংখ্যা 264।
ইউনিকোডের দলিল অনুযায়ী না। 2009 সালের প্রস্তাব একে “messianic” শ্রেণির লিপি বলেছে, যার কোনো বিদ্যমান লিপির সঙ্গে বংশগত সম্পর্ক নেই; কিছু বর্ণের চেহারার মিল কাকতালীয়। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে, কিছু পাঠ্যবই রোমান, বর্মি ও চীনা হরফের প্রভাবের দাবি করে, তবে সেগুলোর নাম দেয়নি।
দুটি একই মানুষের হাতে, একই সময়ে এসেছে। হাফিজ রশীদ খানের লেখা অনুযায়ী ক্রামার প্রচার ও সূক্তগুলো লিপিবদ্ধ করতেই মেনলে বর্ণমালাটি উদ্ভাবন করেন। ক্রামার প্রধান পুরোহিত মাংইয়া ম্রো ডেইলি স্টার বাংলাকে বলেছেন, বর্ণমালাটি প্রথমে “ক্রামা বর্ণমালা” ছিল, “যা এখন ম্রো বর্ণমালা হয়েছে”। বার্ষিক ক্রামা সম্মেলন ডিসেম্বরে হয়, বর্ণমালা প্রকাশের মাস মনে রেখে।
সরকারি পাঠ্যবই কর্মসূচিতে নয়। প্রথম আলোয় তারিক মনজুরের (2024) হিসাবে সরকারি মাতৃভাষা-পাঠ্যবই পাঁচটি ভাষায় — চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাদরি ও গারো; ম্রো নেই। লিপিটি শেখানো হয় পাড়াভিত্তিক ভাষা কমিটি, ক্রামা প্রচারক, স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক আর বান্দরবানের কেএসআইয়ের দুই মাসের কোর্সে (প্রতি ব্যাচে 30 জন)। ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস (2022) স্থানীয় স্কুলে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বইয়ে লিপিটি থাকার কথা লিখেছে, কোন স্কুল তা বলেনি।
জরিপভিত্তিক কোনো সংখ্যা নেই, আর দাবিগুলো বিপরীতমুখী। 2009 সালের ইউনিকোড প্রস্তাব বলেছে সাক্ষরতা 80 শতাংশের বেশি; ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস (2022) লিখেছে প্রায় 60 শতাংশ ম্রো লিপিটির সঙ্গে যুক্ত; পাকো ম্রো ডেইলি স্টার বাংলাকে (2024) বলেছেন প্রায় 80 শতাংশ পড়তে-লিখতে পারেন। অন্যদিকে এন্ডেঞ্জার্ড অ্যালফাবেটস অ্যাটলাস লিখেছে, হয়তো মাত্র 50 জন পারেন।
ইউনিকোড-সমর্থিত ফন্ট ও কিবোর্ড লাগে। Noto প্রকল্পের Noto Sans Mro ফন্ট SIL Open Font License-এ মুক্ত। Keyman প্ল্যাটফর্মে “Mro Phonetic” কিবোর্ড উইন্ডোজ, ম্যাক, লিনাক্স, অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএসে চলে। বিডিনিউজ জানায়, সরকারের আইসিটি বিভাগের উদ্যোগে “ইউবোর্ড” অ্যাপ 16 জানুয়ারি 2026 প্লে স্টোরে আসে; তার আগে অনেকে “কেইমেন” অ্যাপ ব্যবহার করতেন।
ম্রো ভাষার প্রথম ব্যাকরণ বই “ততোং”, লিখেছেন ইয়াংঙান ম্রো। প্রথম আলো জানায়, 17 ফেব্রুয়ারি 2022 বান্দরবান শহরের উজানি পাড়ায় লেখকের বাড়িতে অনানুষ্ঠানিকভাবে বইটির মোড়ক উন্মোচন হয়। বইটি বাংলা ব্যাকরণ ও ইংরেজি গ্রামারের অনুকরণে লেখা। প্রতিবেদন অনুযায়ী এর আগে বানান ও ক্রিয়াপদের ব্যবহারে লেখকভেদে অমিল ছিল।
উৎসগুলো একমত নয়। বিডিনিউজে (2026) ইয়াংঙান ম্রো বলেছেন, রাখাইনের ম্রোরা বাংলাদেশের ম্রোদের হরফই ব্যবহার করেন এবং বাংলাদেশ থেকে বই কিনে নেন। এন্ডেঞ্জার্ড অ্যালফাবেটস বলছে, মিয়ানমারের “Mro” গোষ্ঠী আলাদা ভাষায় কথা বলে এবং এই লিপি ব্যবহার করে না। বিএনআই (2017) রাখাইনে 1996 সালে তৈরি একটি ইংরেজি-বর্ণমালাভিত্তিক ম্রো লেখা-পদ্ধতির খবর দিয়েছে।
প্রাথমিক উৎস — জুমজার্নাল আর্কাইভ
ইউনিকোড ও মানদণ্ডের নথি
সংবাদ ও অন্যান্য উৎস
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী ভাষা, মাতৃভাষায় শিক্ষা, মেনলে ম্রো, ম্রো, ম্রো বর্ণমালা
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।