Last updated Oct 19th, 2026
1

“বাঙালিরাই কি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা?” প্রশ্নটির পক্ষে-বিপক্ষে যে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঔপনিবেশিক নথি উদ্ধৃত হয়, তার কোনোটিই সরাসরি বলে না কোন ভাষার মানুষ সবার আগে এই পাহাড়ে বসতি গড়েছিলেন। পাহাড়ে ও পাহাড়ের কিনারে পাওয়া পাথরের হাতিয়ারগুলোর সঙ্গে কোনো কঙ্কাল বা বসতির স্তর পাওয়া যায়নি। আর 1869 থেকে 1909 সালের ব্রিটিশ নথি বাঙালিদের দেখায় মূলত ব্যবসায়ী, দোকানি ও রাঙামাটির একটি ছোট হালচাষি বসতি হিসেবে; কোন পাহাড়ি জনগোষ্ঠী “aboriginal”, তা নিয়ে ব্রিটিশ লেখকেরা নিজেরাও একমত ছিলেন না।
এই লেখা দুই পক্ষের কোনোটির রায় দেয় না। প্রতিটি প্রমাণের তারিখ, কে খুঁজে পেয়েছিলেন বা লিখেছিলেন, আর আজ কে সেটিকে কোন যুক্তিতে টানেন, শুধু সেটুকু এক জায়গায় রাখা হয়েছে। চাকমাদের প্রাচীনতম লিখিত ও মানচিত্র-প্রমাণ (1550-এর পর্তুগিজ মানচিত্র, মোগল আমলের তুলা-কর, 1777-এর চিঠি) আমাদের আলাদা লেখা চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামে কবে থেকে আছে: প্রাচীনতম লিখিত ও মানচিত্র-প্রমাণ-এ বিস্তারিত আছে, আর 1941 থেকে 2022 পর্যন্ত শুমারির অনুপাত আছে পাহাড়ি ও বাঙালি জনসংখ্যার অনুপাত, 1941–2022 লেখায়। সেগুলো এখানে আবার বলা হয়নি। এখানে আছে তার আগের স্তর: প্রত্নতত্ত্ব, আর 1941-এর আগের ব্রিটিশ আমলের নথি।
সূচিপত্র
“বাঙালিরাই আদি বাসিন্দা” অবস্থানের সবচেয়ে উদ্ধৃত সরকারি রূপটি তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির, 26 জুলাই 2011 ঢাকায় কূটনীতিকদের কাছে দেওয়া ব্রিফিং। তিনি প্রমাণ হিসেবে দুটি জিনিস টেনেছিলেন: উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতত্ত্ব, আর “ঔপনিবেশিক নথি”। বিপরীত অবস্থানের লেখকেরাও ঔপনিবেশিক নথি ও ব্রিটিশ আমলের আইনই টানেন।
The Daily Star (26 জুলাই 2011) ও bdnews24.com (একই দিন)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী দীপু মনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী 16 শতকের আগে সেখানে বাস করত না, তারা 16 থেকে 19 শতকের মধ্যে মূলত আশ্রয়প্রার্থী ও অর্থনৈতিক অভিবাসী হিসেবে এসেছে, আর বাঙালিরা এ ভূখণ্ডে আছেন “4,000 বছর বা তারও বেশি”। bdnews24-এর প্রতিবেদনে এই 4,000 বছরের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে “‘Wari Bateshwar’ excavations”-এর কথা আছে, আর বলা আছে যে উপমহাদেশের ও ঔপনিবেশিক “সব ঐতিহাসিক দলিলে” এই জনগোষ্ঠীকে “tribal” বলা হয়েছে। একই Daily Star প্রতিবেদনে চাকমা সার্কেল চিফ রাজা দেবাশীষ রায়ের জবাবও ছাপা হয়: সংবিধান বলেনি যে দেশে আদিবাসী নেই; সংবিধান “indigenous” শব্দ ব্যবহার করেনি, আবার কাউকে চিহ্নিত করতে “minority” শব্দও ব্যবহার করেনি।
পরের দশকে একই প্রশ্নে আরও দুটি লেখা বেশি ছড়িয়েছে। বণিক বার্তায় 27 সেপ্টেম্বর 2024 জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মিজানুর রহমান লেখেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটিসহ দেশের নানা জায়গায় নবপলীয় হাতকুঠার ও বাটালি পাওয়া গেছে, এ অঞ্চলে “প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার বছরের প্রাচীন মানববসতির ধারাবাহিকতা” আছে, আর “সপ্তদশ শতক ও তৎপরবর্তী সময়ে কিছু জনজাতি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি গড়ে তুলেছিল”; সমতলে ও পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের সম্পর্কে তাঁর বাক্য, “এরা এই ভূমিরই সন্তান”। পার্বত্য সময়-এ 7 মে 2026 এ এইচ এম ফারুক লুইনের 1869 সালের বই ও হাচিনসনের বর্ণনা টেনে লেখেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলো আরাকান ও ত্রিপুরা থেকে যুদ্ধ ও অস্থিরতায় পালিয়ে এসেছিল, তাই “তারা এই ভূমির আদি বাসিন্দা নয়”।
অন্য দিকে কোপেনহেগেনের IWGIA থেকে 2000 সালে প্রকাশিত রাজকুমারী চন্দ্রা কালিন্দী রায়ের Land Rights of the Indigenous Peoples of the Chittagong Hill Tracts (আমাদের ই-বুক লাইব্রেরিতে বইটি আছে) বলে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলে “since time immemorial” আছে এবং পরপর প্রশাসনগুলো তা নথিভুক্ত করেছে; প্রমাণ হিসেবে বইটি 1900 সালের শাসনবিধির “indigenous hillman” শব্দ আর ব্রিটিশ শুমারির হিসাব দেখায়। বণিক বার্তার লেখাটি আরেকটি দাবির কথাও জানায়: 21 সেপ্টেম্বর 2024 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে “বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র জনতা”-র সংবাদ সম্মেলনে মোগল আমল থেকে এ অঞ্চলে উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল; লেখক সেটিকে প্রমাণহীন বলেছেন।
“আদিবাসী” শব্দের মানে কি সত্যিই “সবার আগে আসা মানুষ”, সেই সংজ্ঞাগত প্রশ্নটি এ লেখার বিষয় নয়। সেটি আছে আমাদের “স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী” সংজ্ঞাটি কোথা থেকে এসেছে লেখায়, আর স্বীকৃতির আইনি ফল নিয়ে আছে আদিবাসী স্বীকৃতি দিলে আইনত কী বদলায়, কী বদলায় না লেখায়। এখানে শুধু প্রমাণের দিকটি: দুই পক্ষ যে নথিগুলো টানে, সেগুলোতে আসলে কী লেখা।
| কে, কবে | দাবি | প্রমাণ হিসেবে যা টানা হয় |
|---|---|---|
| দীপু মনি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, 26 জুলাই 2011 | পাহাড়ি জনগোষ্ঠী 16–19 শতকে এসেছে; বাঙালিরা 4,000 বছরের বেশি | উয়ারী-বটেশ্বরের খনন; ঔপনিবেশিক দলিলে “tribal” শব্দ |
| রাজা দেবাশীষ রায়, একই দিন (Daily Star) | সংবিধান আদিবাসীর অস্তিত্ব অস্বীকার করেনি | সংবিধানের শব্দ; 2010 সালের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন |
| রাজকুমারী চন্দ্রা কালিন্দী রায়, IWGIA, 2000 | পাহাড়িরা “since time immemorial” আছেন | শাসনবিধি 1900-এর “indigenous hillman”; 1872–1991 শুমারি |
| মিজানুর রহমান, বণিক বার্তা, 27 সেপ্টেম্বর 2024 | আড়াই থেকে তিন হাজার বছরের ধারাবাহিক বসতি; কিছু জনজাতি 17 শতক ও পরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি গড়ে | রাঙ্গামাটিসহ নানা স্থানের নবপলীয় হাতিয়ার; লুইনের 1869 সালের বর্ণনা |
| এ এইচ এম ফারুক, পার্বত্য সময়, 7 মে 2026 | পাহাড়িরা আরাকান ও ত্রিপুরা থেকে পালিয়ে আসা | লুইন 1869; হাচিনসন; রিজলির শ্রেণিবিভাগ |
| অশোক কুমার দেওয়ান, চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার, 1991 | আদিকালে এ অঞ্চলে কেউ স্থায়ীভাবে বাস করত বলে মনে হয় না | (আমাদের আর্কাইভের একটি লেখায় উদ্ধৃত; প্রমাণের বিবরণ সেখানে নেই) |
শেষ সারিটি আলাদা করে লক্ষ করার মতো। আমাদের আর্কাইভে আজাদ বুলবুলের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম স্টাডিজ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব লেখায় (মূল প্রকাশ: তাক্রুপ্ সংকলন, 2013) চাকমা ইতিহাসবিদ অশোক কুমার দেওয়ানের উদ্ধৃতি আছে: “আদিকালে এ অঞ্চলে স্থায়ীভাবে কেউ বসবাস করতো বলে মনে হয় না। শিকারজীবী কিছু আদিম যাযাবর জনগোষ্ঠী মাঝে মাঝে পূর্বদিক থেকে এসে হানা দিয়ে কিছুদিন পর ফিরে যেতো।” একই লেখায় আছে, 19 এপ্রিল 2012 চট্টগ্রামে এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে পণ্ডিতেরা বলেছিলেন প্রাগৈতিহাসিক প্রত্ননিদর্শন ধরে ইতিহাস লেখা হলে চট্টগ্রামই “বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর বীজ কেন্দ্র” হিসেবে চিহ্নিত হবে। অর্থাৎ একই প্রশ্নে দুই দিকেই প্রত্নতত্ত্ব ও আদি ইতিহাসকে ডাকা হয়, আর দুই দিকেই এমন বাক্য আছে যা ঢালাও অবস্থানের সঙ্গে খাপ খায় না।
নিচের ছকে বারোটি প্রমাণ আছে, পুরোনো থেকে নতুন ক্রমে। প্রতিটির জন্য: কবেকার, কে পেয়েছিলেন বা লিখেছিলেন, আর বিতর্কে কে সেটিকে কীভাবে ব্যবহার করেন। “কীভাবে পড়েন” ঘরে কেবল সেই পাঠগুলোই আছে যা কোনো প্রকাশিত লেখায় পাওয়া গেছে।
| প্রমাণ | তারিখ ও উৎপত্তি | কে কীভাবে পড়েন |
|---|---|---|
| সীতাকুণ্ড পাহাড়ের জীবাশ্ম-কাঠের কাঁধওয়ালা হাতিয়ার | উল্লেখ 1886; রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সূত্রে (বাংলাপিডিয়া)। স্থান চট্টগ্রাম জেলা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নয় | বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশে প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ারের প্রথম দিকের নথিভুক্ত প্রাপ্তি; বিতর্কে কোনো পক্ষ একে কোনো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করেনি |
| সীতাকুণ্ডের দ্বিতীয় হাতিয়ার | 1917-এর আগে; J Coggin Brown-এর ভারতীয় জাদুঘরের তালিকা, 1917 | বাংলাপিডিয়া: সীতাকুণ্ডের দ্বিতীয় নমুনা, একই জীবাশ্ম-কাঠের |
| রাঙামাটির পাথরের হাতিয়ার | 1958; Dyson নামের এক মার্কিন নাগরিক ভূপৃষ্ঠে পান | মিজানুর রহমান (2024) পার্বত্য চট্টগ্রামে নবপলীয় নিদর্শনের উদাহরণ হিসেবে রাঙামাটির নাম নেন |
| ছাগলনাইয়ার হাতকুঠার | 1963; জাতীয় জাদুঘর সংগ্রহ করে, রামগড় সীমান্তের কাছে আমজাদহাট ইউনিয়ন থেকে | মিজানুর রহমানের তালিকায় ছাগলনাইয়া আছে |
| উয়ারী-বটেশ্বর | নরসিংদী জেলা; জনপদ যুগের রৌপ্যমুদ্রা আনুমানিক 600–400 খ্রিস্টপূর্বাব্দ (বাংলাপিডিয়া) | দীপু মনি (2011): বাঙালির 4,000 বছরের উপস্থিতির প্রমাণ |
| মাইনী নদীর ধারে দিঘি, ফলের গাছ ও ইটের ধ্বংসাবশেষ | লুইন 1869; হান্টার 1876; হাচিনসন 1906 নিজে ঘুরে দেখেন | লুইন: “men of the plains”-এর বসতি, জনশ্রুতিতে ত্রিপুরার রাজার; হাচিনসন: ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী, ত্রিপুরাদের বড় বসতি |
| রাঙামাটিতে বাঙালি হালচাষি বসতি | হান্টার 1876 (ডেপুটি কমিশনারের প্রতিবেদন): রাজা ধরম বক্স খাঁ আনেন, নোয়াবাদ বন্দোবস্ত 1818; লুইন 1869: প্রায় 120 পরিবার, “some six years ago” | এ লেখায় আলোচিত বিতর্কের লেখাগুলোর কোনোটিতে নথিটি নেই |
| 1872 সালের শুমারি | মোট 63,054 (হান্টার); 381 মুসলমান, 142 হিন্দু | IWGIA (2000): অ-আদিবাসী 1,097, 1.74% |
| লুইনের শ্রেণিবিভাগ: খ্যংথা ও টংথা | লুইন 1869 | পার্বত্য সময় (2026): পাহাড়িরা যাযাবর ছিল, নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মালিক নয় |
| “originally occupied by … the Kuki group” | হাচিনসন 1906 ও 1909 | পার্বত্য সময় (2026): চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা আরাকান ও ত্রিপুরা থেকে আসা |
| 1901 সালের শুমারি | মোট 124,762; বৌদ্ধ 83,000, হিন্দু 36,000, মুসলমান 5,000 (ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার 1908) | IWGIA (2000): অ-আদিবাসী 8,762, 7.37% |
| শাসনবিধির বিধি 52 (1934 সালের সংশোধন) | “Chakma, Mogh or a member of any hill tribe indigenous to the Chittagong Hill Tracts…” ছাড়া প্রবেশে পারমিট | IWGIA ও জনসংহতি সমিতি: রাষ্ট্রীয় নথিতে আদিবাসিত্বের স্বীকৃতি |
প্রসঙ্গ:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।