Last updated Oct 17th, 2026
0

চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামে কবে থেকে আছেন — নথি দিয়ে এর উত্তর দুই ধাপে দেওয়া যায়। মধ্য-ষোড়শ শতকের তথ্য নিয়ে আঁকা একটি পর্তুগিজ মানচিত্রে, যা প্রথম ছাপা হয় 1615 সালে, কর্ণফুলীর উজানে ‘Chacomas’ নামে একটি জায়গা চিহ্নিত আছে[1]; আর চাকমা রাজার নাম ধরে সরকারি হিসাবের খাতায় নিয়মিত উল্লেখ শুরু হয় আনুমানিক 1715 সালে, মোগলদের তুলা-কর দিয়ে। এর আগের ইতিহাস — চাকমারা কোথা থেকে এসেছে, কবে এসেছে — পাওয়া যায় চাকমা পালা, রাজবংশের তালিকা আর আরাকানি বৃত্তান্তে, এবং সেগুলোর পাঠ নিয়ে লেখকেরা একমত নন।
প্রশ্নটি নিরীহ ইতিহাসের প্রশ্ন হয়ে থাকেনি। একদিকে কিছু লেখা চাকমাদের “বহিরাগত” প্রমাণ করতে ঔপনিবেশিক নথির কয়েকটি বাক্য উদ্ধৃত করে; অন্যদিকে কিছু লেখা একই মানচিত্রকে “স্বাধীন চাকমা রাজ্য”-এর দলিল হিসেবে পড়ে। এই লেখা কোনো পক্ষের রায় দেয় না। প্রতিটি নথি কবেকার, কে বানিয়েছিলেন, তাতে আসলে কী লেখা আছে, আর কে সেটিকে কীভাবে পড়েন — শুধু এটুকু পাশাপাশি রাখা হলো। চাকমা জাতির সামগ্রিক ইতিহাস, পালা ও রাজবংশের বিস্তারিত বিবরণ আমাদের আর্কাইভের অন্য লেখাগুলোতে আছে; এখানে সেগুলোর পুনরাবৃত্তি নেই, কেবল যেখানে তারা একে অন্যের সঙ্গে মেলে না, সেটুকু দেখানো হয়েছে।
সূচিপত্র
চাকমারা কোথা থেকে এসেছে, এই প্রশ্নে লিখিত নথি সরাসরি কোনো উত্তর দেয় না। নথি বলতে পারে কোন সালে কোন জায়গায় চাকমা নাম বা চাকমা রাজার উল্লেখ আছে। তার আগের যাত্রাপথ — চম্পকনগর, আরাকান, বার্মা বা আসাম — আসে মৌখিক ঐতিহ্য আর পরবর্তী লেখকদের পুনর্গঠন থেকে, এবং সেখানে মত অনেক।
ঔপনিবেশিক প্রশাসক টি. এইচ. লুইন 1869 সালে নিজেই এই সীমাটি লিখে গেছেন: চাকমাদের উৎপত্তি “can only be inferred from their traditions and physique, as they possess no written records of ancient times” — অর্থাৎ প্রাচীন কালের লিখিত নথি না থাকায় উৎপত্তি কেবল ঐতিহ্য আর শারীরিক গড়ন থেকে অনুমান করা যায় (লুইন, 1869, পৃ. 62)। প্রায় একশো বিশ বছর পর চাকমা ইতিহাস-লেখক অশোক কুমার দেওয়ান তাঁর চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার-এর প্রথম খণ্ড শেষ করেন এই উপসংহারে যে তাঁর পর্যালোচিত “দেড় হাজার বছরের ইতিহাস অধিকাংশই ফাঁকা” — উদ্ধৃতিটি আমাদের আর্কাইভে প্রশান্ত ত্রিপুরার লেখা অশোক কুমার দেওয়ানের চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার প্রসঙ্গে কিছু কথা-য় আছে।
অধ্যাপক আনন্দ বিকাশ চাকমা আমাদের আর্কাইভের পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাদের রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ লেখায় সীমারেখাটি এভাবে টেনেছেন: অষ্টাদশ শতকের আগের রাজা বিজয়গিরি, সমরগিরি, সিরিত্তমার কথা চাকমা সাহিত্যিক উপাদান ছাড়া “প্রত্নতাত্ত্বিক বা বৈদেশিক কোনো উৎসে উল্লেখ নেই”, তাঁদের নামে কোনো মুদ্রা বা শিলালিপিও পাওয়া যায় না; আর 1715 সাল থেকে চাকমা রাজাদের “প্রামাণ্য ইতিহাস” পাওয়া যায়। একই লেখায় তিনি মধ্য-ষোড়শ শতকের পর্তুগিজ মানচিত্রটিকে ষোড়শ শতকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা বসবাসের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এই লেখার বাকি অংশ সেই দুই প্রান্তের মাঝখানের নথিগুলো একে একে খুলে দেখে।
নিচের ছকে চাকমা নাম বা চাকমা রাজার উল্লেখ আছে বলে দাবি করা প্রধান নথিগুলো সময়ের ক্রমে সাজানো। “পাঠ” কলামে কে নথিটিকে কীভাবে পড়েন, তা উৎসের নামসহ দেওয়া; প্রতিটির বিস্তারিত নিচের অংশগুলোতে।
| নথি | তারিখ | উৎপত্তি | কী আছে | কে কীভাবে পড়েন |
|---|---|---|---|---|
| আরাকানি বৃত্তান্ত দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং | ঘটনার তারিখ 480 মগাব্দ (1118–19 খ্রি.), রচনাকাল জানা যায়নি | আরাকান | পেগুর রাজার বিরুদ্ধে “বাঙালি ও চাকমাগণ”-এর যুদ্ধ (পার্বত্যনিউজের উদ্ধৃতিতে) | আবদুস সাত্তার: চাকমাদের প্রথম উল্লেখ, তারা বার্মায় ছিল; নিঝুম তালুকদার: 1118 সালে চাকমারা নিম্ন আরাকান থেকে বিতাড়িত |
| আরাকানি ইতিহাসে “থেক বা সাক রাজা”-র আক্রমণ | ফেইরির পাশ-টীকায় 1544; উইকিপিডিয়ায় 1546 | আরাকান | উত্তর থেকে এক “থেক বা সাক রাজা” রামু পর্যন্ত ঢোকেন | ফেইরি (1883): এখানে ত্রিপুরার শাসককে বোঝানো হয়েছে বলে মনে হয়; উইকিপিডিয়া ও তারা চরণ চাকমা: চাকমা রাজা |
| পর্তুগিজ মানচিত্র Descripção do Reino de Bengalla | তথ্য মধ্য-ষোড়শ শতকের, প্রথম ছাপা 1615[1] | পর্তুগাল/স্পেন; জোয়াঁও দে বারোসের Décadas da Ásia-র চতুর্থ খণ্ড | চট্টগ্রামের উজানে, ত্রিপুরা ও আরাকানের মাঝে ‘Chacomas’ | প্রায় সব লেখক: চাকমাদের বসতি বা রাজ্য; আঁকিয়ে ও সাল নিয়ে মতভেদ |
| আরাকান রাজা মিন রাজাগ্রির চিঠি | 1607 | আরাকান | রাজা নিজেকে আরাকান, Chacomas ও বাংলার রাজা বলেন (দ্বিতীয় হাতের বিবরণে) | উইকিপিডিয়া: প্রাপক ফিলিপে দে ব্রিতো; সঞ্জীব চাকমা: চট্টগ্রামের এক পর্তুগিজ ফাদার |
| মোগল তুলা-কর | আনুমানিক 1715 | চট্টগ্রাম; লুইন ও হাচিনসনের তালিকায় | চাকমা প্রধান মোগল উজির ফররুখ শাহকে তুলা দেন | আনন্দ বিকাশ চাকমা: প্রামাণ্য ইতিহাসের শুরু; সঞ্জীব চাকমা: 1713 সালে 11 মণ তুলার উপঢৌকন |
| চাকমা রাজাদের মোহর | প্রাচীনতমটিতে “ফতে খাঁ ১১৩৩ হিং” | চাকমা রাজপরিবার; সতীশচন্দ্র ঘোষের বইয়ে ছাপা | ফারসি লেখা, পরে “জয় কালী সহায়” | ঘোষ: 1714–15 সালে ফতে খাঁর শাসনের প্রমাণ; সাত্তার: চাকমারা একসময় মুসলমান ছিল কি না তার ইঙ্গিত |
| জমিদারি সনদ ও বন্দোবস্ত | 1733 বা 1737 | মোগল প্রশাসন | রাঙ্গুনিয়া এলাকার জমিদারি বা সরকারের সঙ্গে বন্দোবস্ত | বাংলাপিডিয়া: 1733, শেরমুস্ত খাঁ; লুইন: 1737; হাচিনসন: 1737, শুকদেব রায় |
| কোম্পানির ঘোষণা (ভেরেলস্ট) | 6 শ্রাবণ 1170 মঘী (1763) | ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, চট্টগ্রাম | চাকমা রাজার এলাকা: ফেনী থেকে সাঙ্গু, নিজামপুর রোড থেকে কুকি রাজার পাহাড় | কানুনগো ও তালুকদারের বইয়ে উদ্ধৃত |
| চট্টগ্রামের প্রধানের চিঠি | 10 এপ্রিল 1777 | কোম্পানি | “রামু খাঁ” নামে এক পাহাড়ির বিদ্রোহ | লুইন: চাকমা বিদ্রোহ বলে ধরে নিতে “disposed” |
| আরাকানের রাজার চিঠি | প্রাপ্তি আনুমানিক 24 জুন 1787 | আরাকান থেকে চট্টগ্রামের প্রধানকে | “Domcan Chukma” প্রমুখ আরাকান থেকে পালিয়ে কোম্পানির সীমায় আশ্রয় নিয়েছে | সাত্তার: চাকমারা বার্মা থেকে এসেছে তার প্রমাণ; লুইন: পালানো লোকেরা চাকমা ও ম্রো গোত্রপ্রধান |
| ফ্রান্সিস বুকাননের ভ্রমণ-দিনলিপি | 1798 | কোম্পানির বোর্ড অব ট্রেড | রাঙ্গুনিয়া থেকে বরকল পর্যন্ত “চাকমা রাজা” তব্বক খাঁর এলাকা | কানুনগোর বইয়ে উদ্ধৃত |
ছকের প্রথম দুই সারির নথি চাকমা নামের সঙ্গে কতটা মেলে, তা-ই বিতর্কের কেন্দ্র; তৃতীয় সারি থেকে নামটি নিশ্চিতভাবে কাগজে আছে, কিন্তু তার তারিখ আর আঁকিয়ে নিয়ে মতভেদ; আর পঞ্চম সারি থেকে চাকমা রাজার নাম ধরে প্রশাসনিক নথির ধারাবাহিকতা শুরু।
চাকমা নামের সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত প্রাচীন প্রমাণ একটি পর্তুগিজ মানচিত্র, যার শিরোনাম Descripção do Reino de Bengalla (বাংলা রাজ্যের বিবরণ)। মানচিত্রটি ছাপা আছে জোয়াঁও দে বারোসের Décadas da Ásia গ্রন্থমালার চতুর্থ খণ্ডে, যা প্রকাশিত হয় 1615 সালে। কে এঁকেছিলেন আর কোন সালের — এই দুই প্রশ্নে উৎসগুলো চার রকম কথা বলে[1]।
উইকিপিডিয়ার জীবনী অনুযায়ী জোয়াঁও দে বারোসের জন্ম আনুমানিক 1496 সালে, মৃত্যু 20 অক্টোবর 1570। তাঁর Décadas da Ásia-র চতুর্থ খণ্ড বেরোয় মৃত্যুর পর, 1615 সালে মাদ্রিদ থেকে; বারোসের ছড়ানো পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা ও সংকলন করেন রাজকীয় কসমোগ্রাফার জোয়াঁও বাপতিস্তা লাভানিয়া (উইকিপিডিয়া, João de Barros)। একই নিবন্ধের রচনাতালিকায় সালটি 1613 লেখা — নিবন্ধটির ভেতরেই এই অমিল আছে।
| উৎস | আঁকিয়ে | সাল |
|---|---|---|
| উইকিমিডিয়া কমন্সের ফাইল-বিবরণ (হাউটন লাইব্রেরির কপি) | জোয়াঁও দে বারোস | উল্লেখ নেই |
| ড. আবদুল করিমের প্রবন্ধ “A Map of Joa de Barros dated about 1550 A.D” (আজাদ বুলবুলের লেখায় উদ্ধৃত) | বারোস | আনুমানিক 1550 |
| বাংলাপিডিয়া, “চাকমা” (ভেলাম ভ্যান শেন্ডেল) | পর্তুগিজ মানচিত্র প্রণেতা লাভানহা | আনুমানিক 1550 |
| ইংরেজি উইকিপিডিয়া, “Chakma people”; অল আরুণাচল প্রদেশ চাকমা স্টুডেন্টস ইউনিয়নের বিবৃতি | দিয়েগো দে আস্তোর | প্রকাশ 1615; বিবৃতিতে প্রস্তুতকাল 1525–1550 |
| mappingbengal.com | নাম নেই | প্রথম ছাপা 1615; তথ্য “আনুমানিক 1525 থেকে 1550”, অন্য জায়গায় “1525–1535” |
তৃতীয় নামটি — লাভানিয়া — সেই কসমোগ্রাফারেরই, যিনি 1615 সালের খণ্ডটি সম্পাদনা করেছিলেন। চতুর্থ নাম দিয়েগো দে আস্তোর সম্পর্কে উইকিপিডিয়ার আলাদা নিবন্ধ বলে, তিনি সপ্তদশ শতকের টলেডোর এক স্প্যানিশ খোদাইশিল্পী, এল গ্রেকোর ছাত্র, সেগোভিয়ার টাকশালের খোদাইকার; সেই নিবন্ধে এই মানচিত্রের কোনো উল্লেখ নেই (উইকিপিডিয়া, Diego de Astor)। mappingbengal.com-এর পাতায় আরও একটি তথ্য আছে, যা বাকিদের কোথাও নেই: তাদের দেখানো কপির পরিচয়-লাইনে লেখা “Da Asia de Joao de Barros/ Decada Quarta, Diogo do Couto, Lisbon, 1777” — অর্থাৎ 1777 সালের লিসবন সংস্করণ (mappingbengal.com)।
এই কারণেই এই লেখায় মানচিত্রটিকে “মধ্য-ষোড়শ শতকের” বলা হয়েছে, কোনো একটি সাল দিয়ে নয়। উৎসগুলো যে সালটি দেয় তা সবখানে “আনুমানিক” — আর সেটি মানচিত্রে ধরা তথ্যের সময়, ছাপার সময় নয়।
মানচিত্রটি পূর্ব দিক উপরে রেখে আঁকা। নিচের দিকে চট্টগ্রাম বন্দর (Chatigam) আর সন্দ্বীপ (Sundiua); উপরে পাহাড়ের সারির ভেতরে, বাঁয়ে ত্রিপুরা রাজ্য (Reino de Tipora) আর ডানে আরাকান রাজ্যের (Reino de Arracam) মাঝামাঝি, ‘Chacomas’ লেখা। mappingbengal.com নামটির পাশে বন্ধনীতে লিখেছে “Chakma Kingdom”; উইকিমিডিয়া কমন্সের ফাইল-বিবরণ বলে জায়গাটি কর্ণফুলীর পূর্ব তীরে।
মানচিত্রে নামটি একটি স্থাননাম হিসেবে লেখা — তার পাশে কোনো বর্ণনা, জনসংখ্যা বা সীমানা নেই। কিন্তু একই মানচিত্র পড়ে লেখকেরা জায়গাটির অবস্থান আর তাৎপর্য আলাদা আলাদা ভাবে বর্ণনা করেছেন:
শেষ বিবরণটির সীমারেখা মানচিত্রের ছবিতে আঁকা কোনো রেখা থেকে নেওয়া কি না, মুখবন্ধের উদ্ধৃতিতে বলা নেই। হাউটন লাইব্রেরির কপির যে অংশ উপরে দেওয়া, তাতে ‘Chacomas’ একটি একক স্থাননাম হিসেবে আছে; কোনো রাজ্যসীমা আঁকা দেখা যায় না।
এই মানচিত্র থেকে দুই ধরনের সিদ্ধান্ত টানা হয়। আনন্দ বিকাশ চাকমা ও পুলক খীসা (চাকমা জাতির আদিনিবাস সন্ধানে) এটিকে ষোড়শ শতকে চট্টগ্রাম ও তার আশপাশে চাকমা বসতির প্রমাণ হিসেবে পড়েন; পুলক খীসা শর্ত রেখে লেখেন, “মানচিত্রের তথ্য যদি সত্য হয়”। কজমিলিক্ক্য চাঙমা উদ্ধৃত মুখবন্ধ একে চাকমা রাজ্যের সীমানার “সুষ্পষ্ট প্রমাণ” বলে। আর আমাদের আর্কাইভের সাম্প্রতিক লেখা চাদিগাং ছাড়া পালা: নায়ক কে, শতক কোনটি মনে করিয়ে দেয়, “মানচিত্রের একটি নাম আর একটি পালার কাহিনি এক জিনিস নয়”।
“বহিরাগত” যুক্তি দেওয়া যে দুটি লেখা নিচে আলোচিত, তার কোনোটিতেই এই মানচিত্রের উল্লেখ নেই।
মানচিত্রের আগের সময়ের জন্য উৎস হিসেবে আসে আরাকানি রাজবৃত্তান্ত, যেখানে “সাক”, “থেক” বা “থেক্” নামে এক জনগোষ্ঠী বা রাজার উল্লেখ আছে। এই নামগুলো চাকমাদেরই বোঝায় কি না, সেখানেই মতভেদ শুরু।
লুইন 1869 সালে লেখেন, চাকমা নামটি কখনো “Tsakma” বা “Tsak” বানানে লেখা হয়, আর বর্মি ভাষায় একে বলে “Thek”; দৈংনাক নামে একটি ছোট শাখাও একই জাতির অংশ (লুইন, 1869, পৃ. 62)। ব্রিটিশ বর্মা-ইতিহাসবিদ আর্থার ফেইরি তাঁর History of Burma-য় (1883) বর্মার আদি তিন জনগোষ্ঠীর নামের একটি হিসেবে “Sak or Thek”-এর কথা লেখেন এবং মনে করেন নামটি সম্ভবত “শাক্য” শব্দের সংক্ষেপ (ফেইরি, 1883, পৃ. 5)।
পার্বত্যনিউজে আবদুস সাত্তারের লেখা আরাকানি বৃত্তান্ত দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং-এর (পৃ. 17–19) একটি বিবরণ উদ্ধৃত করে: 480 মগাব্দে (খ্রিস্টীয় 1118–19) পেগুর রাজা আলং চিছুর বিরুদ্ধে “পশ্চিমের বাঙালিদিগের সহিত মিলিত হয়ে চাকমাগণ” যুদ্ধ করে। সাত্তার একে “চাকমাদের সর্বপ্রথম উল্লেখ” বলেন এবং এ থেকে সিদ্ধান্ত টানেন যে চাকমারা “এককালে ব্রক্ষ্মদেশে ছিল”। আমাদের আর্কাইভে নিঝুম তালুকদারের লেখায় একই 1118 সালটি আসে ভিন্ন গল্পে — আরাকান রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে “১১১৮ সালে নিম্ন আরাকান হতে চাকমারা বিতারিত হয়”। দুই লেখার কোনোটিতেই বৃত্তান্তটির রচনাকাল দেওয়া নেই।
ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Chakma history” নিবন্ধ ফেইরির বই (পৃ. 79) উদ্ধৃত করে লেখে, 1546 সালে আরাকান রাজা মিন বিন যখন বর্মিদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত, তখন “সাক রাজা” উত্তর আরাকান আক্রমণ করেন; তারা চরণ চাকমার লেখা চাকমা জাতির অতীত কথা ও স্মৃতি-ও লেখে, 1546 সালে “চাকমা” রাজা রামু দখল করেন। কিন্তু ফেইরির মূল পাঠে ঘটনাটির পাশ-টীকায় সাল 1544, আর শনাক্তকরণ অন্যরকম: আরাকানি ইতিহাসে যাঁকে “Thek or Sak king” বলা হয়েছে, “by which term the … of Tippera appears to be meant” — অর্থাৎ ফেইরির মতে এই নামে ত্রিপুরার (Tippera) শাসককেই বোঝানো হয়েছে বলে মনে হয় (ফেইরি, 1883, পৃ. 79–80)।
ইংরেজি উইকিপিডিয়া আরাকানি বৃত্তান্ত Dhagnawadi Areḥdopũ-র বরাতে আরও লেখে, পঞ্চদশ শতকের শুরুতে সাকরা চট্টগ্রামে ঢোকে এবং 1418 সালে আলীকদমে পৌঁছায়; এই অংশের সূত্র দেবনাথের 2025 সালের একটি গ্রন্থ, যার পূর্ণ বিবরণ নিবন্ধে ভাঙা অবস্থায় আছে। নিবন্ধটির মাথায় সতর্কবার্তাও আছে যে এর কিছু সূত্র নির্ভরযোগ্য না-ও হতে পারে।
দুটি নথি প্রায়ই উদ্ধৃত হয়, কিন্তু তাদের মূল পাঠ কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
1607 সালের চিঠি। তারা চরণ চাকমার লেখা অনুযায়ী পর্তুগিজ বণিক ফিলিপ দে ব্রিতো নিকোতে 1607 সালের এক চিঠিতে লেখেন, আরাকান রাজা মেং রাজাগ্রী নিজেকে “আরাকান, চাকোমাস এবং বেংগল”-এর সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা বলে পরিচয় দেন। ইংরেজি উইকিপিডিয়া বলে চিঠিটি লেখা হয়েছিল দে ব্রিতোকে; সঞ্জীব চাকমা লেখেন, আরাকান রাজা চিঠিটি লেখেন “চট্টগ্রামস্থ পর্তুগিজ ফাদারকে”। অর্থাৎ চিঠির লেখক ও প্রাপক নিয়েই উৎসগুলো এক নয়, আর তিনটির কোনোটিতে চিঠির মূল পাঠ বা প্রকাশের সূত্র নেই [যাচাই প্রয়োজন]।
1561 সালের ‘Chadma’। সঞ্জীব চাকমার লেখায় আছে, 1561 সালে “Gastaidi” নামে এক ইউরোপীয়র আঁকা ‘BENGALA’ মানচিত্রে চট্টগ্রামের দক্ষিণে ও আরাকানের উত্তরে ‘Chadma’ নামে একটি জায়গা আছে। ইতালীয় মানচিত্রকার জাকোমো গাস্তালদির পূর্ব এশিয়ার মানচিত্রের 1561 সালের অংশ নিয়ে পঠিত বিবরণগুলোতে এই নামের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি; দাবিটির একমাত্র উৎস ওই লেখা [যাচাই প্রয়োজন]।
ত্রিপুরার রাজবৃত্তান্ত রাজমালার একটি সংস্করণে ছাপা মানচিত্রে চট্টগ্রামের ঠিক পাশে ‘চাখমা’ লেখা আছে। পুলক খীসা চাকমা জাতির আদিনিবাস সন্ধানে লেখায় এটিকে “ষোড়শ শতাব্দীতে বিরচিত” রাজমালার দ্বিতীয় লহরের মানচিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, এবং পর্তুগিজ মানচিত্রের পাশাপাশি এটিকেও ষোড়শ শতকে চাকমা বসতির ইঙ্গিত ধরেছেন।
ছবির ভেতরের উদ্ধৃতিটিই মানচিত্রটির পরিচয় দেয়: এটি রাজমালার দ্বিতীয় লহরের সমসাময়িক ত্রিপুরা রাজ্য দেখানোর জন্য “আধুনিক মানচিত্রের সাহায্যে অঙ্কিত” একটি মানচিত্র। অর্থাৎ মানচিত্রটি আধুনিক কালে আঁকা একটি পুনর্গঠন, ষোড়শ শতকে আঁকা মানচিত্র নয়। কোন সংস্করণ, কোন সম্পাদক, কোন সাল — তা ছবিতে বা লেখায় বলা নেই [যাচাই প্রয়োজন]। আবদুস সাত্তারের লেখাও রাজমালার উল্লেখ করে, তবে ভিন্ন প্রসঙ্গে: তাঁর মতে রাজমালার রাজনামের সঙ্গে আরাকানি দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং-এর বর্ণনার “যথেষ্ট সাদৃশ্য” আছে, আর রাজমালায় চম্পকনগরের “সরাসরি কোন উল্লেখ নাই”।
চাকমা রাজার নাম ধরে প্রশাসনিক উল্লেখ যেখানে নিয়মিত হয়, সেখানে প্রায় সব উৎস একটি সালে একমত: আনুমানিক 1715। লুইনের 1869 সালের রাজতালিকায় প্রথম নাম “Jumaul Khan”, পাশে লেখা “About 1715 A.D. first paid tribute of cotton to Mogul Wuzeer Furruck Shah” — অর্থাৎ আনুমানিক 1715 সালে তিনি প্রথম মোগল উজির ফররুখ শাহকে তুলা-কর দেন (লুইন, 1869, পৃ. 64)। আর. এইচ. স্নেইড হাচিনসনের 1906 সালের বইয়ের তালিকায় তৃতীয় নাম “Jallal Khan, about 1715 A.D. He paid tribute to Furruck Shah, Mogul Wazir of Chittagong” (হাচিনসন, 1906, পৃ. 93)।
এই প্রথম সম্পর্কটি কীভাবে শুরু হলো, তার বিবরণে উৎসগুলো আলাদা:
এরপর 1724 সালের ঘটনা। সুনীতিভূষণ কানুনগোর বইয়ের উদ্ধৃতি অনুযায়ী (কজমিলিক্ক্য চাঙমার লেখায়), মোগলদের আক্রমণে রাজা জল্লাল খাঁ দলবলসহ রোসাঙ্গ বা আরাকান রাজ্যে আশ্রয় নেন, পরে ফিরে আসেন, আর আরাকান রাজ তাঁকে “রাজা” উপাধি দেন। চাদিগাং ছাড়া পালা লেখায় উদ্ধৃত থিসিসও 1724 সালে কর দিতে অস্বীকারের পর জালাল খাঁর আরাকানে পালানোর কথা বলে।
পরের ধাপ জমিদারি সনদ, আর সেখানেও দুটি সাল: বাংলাপিডিয়ার “চাকমা” নিবন্ধ অনুযায়ী “১৭৩৩ সালে চাকমা প্রধান শেরমাস্ত খান চাকলা রাঙ্গুনিয়া এলাকার জন্য জমিদারি সনদ লাভ করেন”; লুইনের তালিকায় আছে “A.D. 1737 made settlement with Government” — তালিকার স্ক্যান করা পাঠে টীকাটি শেরমুস্তা খাঁ না শুকদেব রায়ের পাশে, তা স্পষ্ট নয়। হাচিনসনের তালিকায় 1737 সালের বন্দোবস্তটি স্পষ্টভাবে শুকদেব রায়ের নামে, আর সেখানে লেখা “with the British Government”; অথচ আমাদের আর্কাইভের বৃটিশ শাসনে চাকমা জনগোষ্ঠী লেখা অনুযায়ী কোম্পানির প্রতিনিধি হ্যারি ভেরেলস্ট চট্টগ্রামের শাসনভার নেন 5 জানুয়ারি 1761।
সতীশচন্দ্র ঘোষ তাঁর 1909 সালের চাকমা জাতি বইয়ে এই পর্বের একটি উদ্ধৃতি দেন যে চাকমা প্রধানেরা “১০৭৭ মঘী—১৭১৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত মোগল গভর্নমেন্টকে রাজস্ব বা খাজনা দেন নাই” (ঘোষ, পুনর্মুদ্রণ, পৃ. 51)। “বহিরাগত” যুক্তি দেওয়া এ. এইচ. এম. ফারুকের লেখাও মোগল পর্বের কথা বলে, তবে অন্যভাবে — সে আলোচনা নিচে।
সতীশচন্দ্র ঘোষের চাকমা জাতি (1909) চাকমা রাজাদের কয়েকটি মোহরের ছাপ ছেপেছে, আর এগুলোই এই প্রশ্নে একমাত্র “নিজস্ব” লিখিত উপাদান যা চাকমা রাজপরিবার থেকে এসেছে। ঘোষ লেখেন, “যে কয়েকটি মোহর আছে, তন্মধ্যে দুইটি কেবল রাজকীয় চিহ্নসূচক” — একটিতে সম্ভবত “সিংহধ্বজা”; বাকি “আটটি মুদ্রা পারসিতে উৎকীর্ণ”, যার দুটির পাঠোদ্ধার করা যায়নি, একটিতে খোদিত “আল্লা হু রাব্বী”, আর প্রাচীনতমটিতে “ফতে খাঁ ১১৩৩ হিং” (ঘোষ, পুনর্মুদ্রণ, পৃ. 54)। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্ত টানেন, “খৃষ্টাব্দের ১৭১৪-১৫ সনে ‘ফতে খাঁ’ নামক জনৈক চাকমা রাজার শাসন বাধ্য হইয়া স্বীকার করিতে হইতেছে।”
একই বইয়ে আরও দুটি ছাপ: রাজা জব্বর খাঁর মোহরে “শ্রীশ্রীজয়কালী জয় নারায়ণ জব্বর খাঁ ১১৬৩”, যা থেকে ঘোষ তাঁর সিংহাসনারোহণ 1163 মঘী বা 1801–02 খ্রিস্টাব্দ ধরেছেন (পৃ. 63); আর রাজা ধরমবক্স খাঁ “পিতার অনুকরণে মোহরেও খোদাইয়াছিলেন” — “জয় কালী সহায় ধরমবক্স খাঁ” (পৃ. 65)।
শব্দ নিয়ে একটি সতর্কতা দরকার। ঘোষ এই বস্তুগুলোকে কোথাও “মোহর”, কোথাও “মুদ্রা” বলেছেন, আর বাংলায় দুটি শব্দই সিলমোহর ও ধাতব টাকা — দুই অর্থে চলে। “মোহরেও খোদাইয়াছিলেন” বাক্যটি সিলমোহরের দিকে ইঙ্গিত করে; কিন্তু ছাপা প্রতিকৃতি থেকে এগুলো সিলের ছাপ না প্রচলিত মুদ্রা, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না [যাচাই প্রয়োজন]। পার্বত্যনিউজে আবদুস সাত্তার ঘোষকেই উদ্ধৃত করে এগুলোকে “চাকমা রাজাদের মুদ্রা” বলেছেন এবং একটি আলাদা ছাপের উল্লেখ করেছেন — “শুকদের রায় ১২১০ হিজরী”, যা ঘোষের পুনর্মুদ্রিত সংস্করণের পঠিত পাতাগুলোতে পাওয়া যায়নি।
এই মোহরগুলো দুই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। ঘোষ এগুলো দিয়ে অষ্টাদশ শতকের শুরুতে চাকমা রাজার শাসনের তারিখ নির্ধারণ করেছেন। সাত্তার এগুলো ব্যবহার করেছেন অন্য যুক্তিতে — ফারসি লেখা, “খাঁ” উপাধি আর “আল্লাহ রাব্বী” দেখিয়ে তিনি অনুমান করেন চাকমারা “হয়ত বা মুসলমান ছিল”; একই লেখায় তিনি জানান চাকমারা নিজেরা এই যুক্তিকে “সর্বৈব মিথ্যা” বলেন, আর তাঁদের ব্যাখ্যা হলো কোনো এক চাকমা রাজা এক মুসলমান নবাব-কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। চাদিগাং ছাড়া পালা লেখায় উদ্ধৃত থিসিসের ব্যাখ্যা আবার আলাদা: মোগল সাম্রাজ্যকে প্রভাবিত করতে রাজারা মুসলিম নাম নিয়েছিলেন, কিন্তু ইসলাম অনুসরণ করতেন না।
উল্টো দিকে, তারা চরণ চাকমার লেখা বলে, তখন চাকমা সমাজে “মুদ্রার প্রচলন ছিল না”, রাজস্ব দেওয়া হতো দ্রব্যে; আর আনন্দ বিকাশ চাকমা লেখেন, অষ্টাদশ শতকের আগের রাজাদের নামে কোনো মুদ্রা পাওয়া যায় না। ঘোষের মোহরগুলো সবই অষ্টাদশ শতক বা তার পরের — তাই এই দুই বক্তব্যের সঙ্গে সেগুলো সাংঘর্ষিক নয়, যদি মোহরগুলো সিলমোহর হয়।
1760–61 সালে চট্টগ্রাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে আসার পর থেকে চাকমা রাজার উল্লেখ কোম্পানির নিজের কাগজে পাওয়া যায়। আমাদের আর্কাইভের পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা-বিদ্রোহ (১৭৭৬-৮৭) লেখায় সুপ্রকাশ রায় সেই বিদ্রোহের ঘটনাক্রম বিস্তারিত দিয়েছেন; এখানে শুধু নথিগুলো।
কোম্পানির একটি ঘোষণা, তারিখ “6th Shraavana 1170 M.S.” (1763), চাকমা রাজার এলাকা নির্ধারণ করে: “All the hills from the Feni River to the Sangoo and from Nizampur Road in Chittagong to the hills of Kooki Raja” — ফেনী নদী থেকে সাঙ্গু পর্যন্ত, আর চট্টগ্রামের নিজামপুর রোড থেকে কুকি রাজার পাহাড় পর্যন্ত সব পাহাড় (উইকিপিডিয়া, Chakma history, তালুকদারের 1988 সালের বইয়ের বরাতে)। সুনীতিভূষণ কানুনগো একই বর্ণনা দেন চট্টগ্রামের প্রথম চিফ হেনরি ভেরেলস্টের নামে, প্রায় একই ইংরেজি বাক্য উদ্ধৃত করে (কজমিলিক্ক্য চাঙমার লেখায়, কানুনগোর বইয়ের পৃ. 23)।
লুইন চট্টগ্রামের তৎকালীন প্রধানের 10 এপ্রিল 1777 তারিখের একটি চিঠি উদ্ধৃত করেন, যেখানে “a mountaineer, named Ramoo Cawn, who pays the Company a small revenue on their cotton farm” — কোম্পানিকে তুলার খামারে সামান্য রাজস্ব দেওয়া রামু খাঁ নামে এক পাহাড়ির — বিদ্রোহের কথা আছে। চিঠিতে চাকমা শব্দটি নেই। লুইন নিজে লেখেন, তিনি এই গোলযোগকে চাকমাদের বলে ধরে নিতে “the more disposed”, কারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কেবল চাকমারাই তখন “quasi Mohommedan” নাম ব্যবহার করতেন (লুইন, 1869, পৃ. 21)।
এর পরের নথিগুলো — 1776–77 সালের বিদ্রোহ থেকে 1787 পর্যন্ত — নিয়ে বিবরণে বিরাট অমিল নেই, অমিল খুঁটিনাটিতে। সেটি পরের অংশে।
1787 সালের নাম দুটি আলাদা নথির সঙ্গে জড়িয়ে আছে, আর দুটিই “চাকমারা কোথা থেকে এসেছে” প্রশ্নে উদ্ধৃত হয়।
লুইন দুটি চিঠি উদ্ধৃত করেন, একটি বর্মার রাজার আর একটি আরাকানের রাজার, দুটিই চট্টগ্রামের প্রধানকে লেখা এবং “received about the 24th June 1787”। আরাকানের রাজার চিঠিতে আছে: “Domcan Chukma, and Kiecopa Lies, Marring and other inhabitants of Arracan, have now absconded and taken refuge near the mountains within your border” — অর্থাৎ ডোমকান চাকমা, কিয়েকোপা লিস, মারিং প্রমুখ আরাকানের বাসিন্দা পালিয়ে কোম্পানির সীমার ভেতরের পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে, আর রাজা তাদের ধরতে সেনা নিয়ে সীমান্তে এসেছেন। লুইনের মন্তব্য: পলাতকেরা “evidently men of the Chuckma and Mroong hill tribes, who to this day preserve the recollection of their ancestor’s flight from Arracan”, এবং সম্ভবত তাঁরা গোত্রপ্রধান ছিলেন (লুইন, 1869, পৃ. 28–29)।
আবদুস সাত্তার একই চিঠির বাংলা অনুবাদ উদ্ধৃত করেছেন, তবে তিনি একে “১৭৮৭ খ্রীস্টাব্দের ২জুন তারিখে চট্রগ্রামের তদানীন্তন শাসনকর্তাকে লিখিত ব্রক্ষ্মরাজের একটি চিঠি” বলেছেন — লুইনের পাঠে চিঠিটি আরাকানের রাজার, আর তারিখটি প্রাপ্তির, আনুমানিক 24 জুন। সাত্তারের সিদ্ধান্ত: “এ থেকে চাকমারা কি করে ব্রক্ষ্মদেশ থেকে চট্রগ্রামে আগমন করেছিল তার হদিস পাওয়া যায়।” চিঠিটি নিজে কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির পালানোর কথা বলে; এটি কোনো জনগোষ্ঠীর প্রথম আগমনের কথা বলে কি না, সেটিই দুই পাঠের পার্থক্য।
1787 সালে চাকমা রাজা জান বক্স খাঁ কোম্পানির সঙ্গে একটি নিষ্পত্তিতে আসেন — এ পর্যন্ত বেশির ভাগ উৎস একমত। কিন্তু খুঁটিনাটিতে অমিল:
| উৎস | সাল | তুলা-কর | ঘটনাটিকে কী বলা হয়েছে |
|---|---|---|---|
| লুইন (1869) | 1787 সালে বশ্যতা; 1789 থেকে নগদে কর | 1782 সালে 500 মণে নামানো | “made submission” |
| হাচিনসন (1906) | দ্বিতীয় শের দৌলতের বশ্যতা 1787; 1789 থেকে নগদে | 500 মণ তুলা থেকে 2,224 টাকা | “made his submission” |
| বাংলাপিডিয়া (ভ্যান শেন্ডেল) | ফেব্রুয়ারি 1789, কলকাতায় | উল্লেখ নেই | “চুক্তি”; কোম্পানি তাঁকে পাহাড়ের প্রকৃত প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দেয় |
| উইকিপিডিয়া (জেলা গেজেটিয়ার, মিনাহান, কানুনগোর বরাতে) | 1787, কলকাতা | রাজস্ব 1,852 টাকা (1789 পর্যন্ত) | “peace treaty”; সমতল থেকে অভিবাসন সীমিত রাখার শর্ত |
| তারা চরণ চাকমা | 1787 | বার্ষিক 300 মণ | “শান্তিচুক্তি”, ইংরেজদের “পরাজয় স্বীকার” |
| নিঝুম তালুকদার | 1787 | বছরে 500 মণ | জান বক্স খাঁ বড়লাটের কাছে “ক্ষমা চান” ও সন্ধি করেন |
| তনয় দেওয়ান | 1789 | বার্ষিক 501 মণ | গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে বশ্যতা স্বীকার |
| সুপ্রকাশ রায় | 1787 বশ্যতা; 1789 দ্বিতীয় শের দৌলতের বশ্যতা | রামু খাঁর সময় থেকে 501 মণ; 1789 সালে 2,224 টাকা | “বশ্যতা স্বীকার” |
| চাদিগাং ছাড়া পালা লেখায় উদ্ধৃত থিসিস | 1787 | 1791 থেকে নগদে | জান বক্স খাঁ ও লর্ড কর্নওয়ালিস “শান্তির জন্য একটি পিটিশনে সই করেন” |
অর্থাৎ একই ঘটনাকে কোনো উৎস “শান্তিচুক্তি” বলে, কোনোটি “বশ্যতা” বা “ক্ষমা প্রার্থনা”; বড়লাটের নাম কোথাও হেস্টিংস, কোথাও কর্নওয়ালিস; তুলার পরিমাণ 300, 500 বা 501 মণ। এই সমঝোতার মূল দলিলের পাঠ কোনো পঠিত উৎসে পুরোটা উদ্ধৃত নেই।
কোম্পানির বোর্ড অব ট্রেডের আদেশে ফ্রান্সিস বুকানন 1798 সালে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘোরেন; তাঁর দিনলিপি 1992 সালে উইলেম ভ্যান শেন্ডেলের সম্পাদনায় ঢাকার ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে ছাপা হয়। কানুনগোর বইয়ের উদ্ধৃতি অনুযায়ী (কজমিলিক্ক্য চাঙমার লেখায়), বুকানন রাজা তব্বক খাঁর সময় পশ্চিমে রাঙ্গুনিয়া থেকে পূর্বে বরকল পর্যন্ত এলাকাকে “The Property of Taubboka (Tabbak Khan) The Chakma Raja” বলেছেন, আর চেঙ্গী ও কাচালং উপত্যকাও চাকমা রাজার এলাকায় ধরেছেন। একই উদ্ধৃতিতে বুকাননের বর্ণনায় রনু খান “a powerful man among the chakmas”। বুকাননের মূল দিনলিপির পাঠ পাওয়া যায়নি; এই তথ্যগুলো কানুনগোর উদ্ধৃতির ওপর নির্ভরশীল।
“চাকমারা বহিরাগত” — এই যুক্তির পক্ষে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত ঔপনিবেশিক বাক্যটি লুইনের 1869 সালের বইয়ের: “A greater portion of the hill tribes, at present living in the Chittagong Hills, undoubtedly came about two generations ago from Arracan. This is asserted both by their own traditions and by records in the Chittagong Collectorate.” অর্থাৎ বর্তমানে চট্টগ্রামের পাহাড়ে বাস করা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর “বড় অংশ” নিঃসন্দেহে প্রায় দুই প্রজন্ম আগে আরাকান থেকে এসেছে, যা তাদের নিজেদের ঐতিহ্য আর চট্টগ্রাম কালেক্টরেটের নথি — দুটোই বলে (লুইন, 1869, পৃ. 28)।
বাক্যটির ঠিক পরে লুইন লেখেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর আরাকান থেকে এই প্রস্থান কিছুটা হলেও 1824 সালের বর্মা যুদ্ধের কারণ ছিল; আর প্রমাণ হিসেবে তিনি উপরে আলোচিত 1787 সালের চিঠিগুলো উদ্ধৃত করেন। বাক্যটিতে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নাম নেই — আছে “a greater portion of the hill tribes”।
এই বাক্যের পাশে লুইনের নিজের বইয়েরই আরও তিনটি তথ্য রাখা যায়, যা একই লেখক অন্য অধ্যায়ে লিখেছেন:
“বহিরাগত” যুক্তির লেখাগুলো প্রথম বাক্যটি উদ্ধৃত করে, বাকি তিনটি নয়। অন্যদিকে এই লেখায় পঠিত বিপরীত পক্ষের লেখাগুলোতে — যেমন কজমিলিক্ক্য চাঙমা ও আনন্দ বিকাশ চাকমার লেখায় — বাক্যটির উল্লেখই নেই। দুই দিকের লেখাই নথির একটি অংশ ব্যবহার করে।
হাচিনসন (1906) লেখেন, চাকমারা নিজেদের বিহার থেকে আসা অভিবাসীদের বংশধর মনে করেন, যাঁরা “in the days of the Arracanese Kings” এখানে বসতি করেন; চাকমা প্রধান ও দেওয়ানদের দেওয়া নোট থেকে “piecing together the semblance of a history” করতে গিয়ে তিনি লেখেন, বিজয়গিরি প্রথমে নাফ নদীর কাছে, পরে মাতামুহুরী উপত্যকায় বসতি করেন, আর তাঁর বংশের শেষ প্রধান “পাগলা” শের দৌলতের হত্যার পর লোকেরা উত্তরে কর্ণফুলীর ধারে রাঙ্গুনিয়ার কাছে সরে আসে (হাচিনসন, 1906, পৃ. 89–91)।
সুপ্রকাশ রায়ের লেখায় (আমাদের আর্কাইভে প্রকাশিত) আরেকটি দাবি আছে, যা অন্য কোনো পঠিত উৎসে নেই: পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রথমে কুকিদের বাসস্থান ছিল; চাকমারা কুকিদের উত্তর-পূর্বে সরিয়ে আরাকান অধিকার করে; কিন্তু “ব্রহ্মযুদ্ধের সময় (১৮২৪-৫২)” মগেরা তাদের দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে তাড়ালে চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে স্থায়ী বসতি গড়ে। একই লেখায় 1776–89 সালের চাকমা বিদ্রোহের বিবরণ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতরেই ঘটে — অর্থাৎ লেখাটির নিজের দুই অংশের সময়রেখা মেলে না। লেখাটিতে এই দাবির সূত্র দেওয়া নেই [যাচাই প্রয়োজন]।
চাকমা রাজবংশের তালিকা একটি স্বতন্ত্র ধরনের নথি — রাজপরিবার ও চাকমা লেখকদের সংরক্ষিত বংশানুক্রম। এর সবচেয়ে বড় অমিল প্রথম রাজার সময় নিয়ে।
অর্থাৎ বিজয়গিরি নামটি একদিকে ষষ্ঠ শতকে, অন্যদিকে সপ্তদশ শতকে বসানো। হাচিনসন নিজেই লিখেছেন তাঁর বিবরণ চাকমা প্রধান ও দেওয়ানদের নোট থেকে জোড়া লাগানো; চাকমা লেখকদের তালিকা চাদিগাং ছাড়া পালা ও রাজনামার মতো উৎস থেকে। পালাটির কাহিনি কোন শতকের, সে প্রশ্নে উৎসগুলোর তিন রকম উত্তর আমাদের চাদিগাং ছাড়া পালা লেখায় আলাদা করে আলোচিত।
পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের আগমনের সাল নিয়েও আমাদের আর্কাইভের লেখাগুলোতে অন্তত পাঁচটি আলাদা সাল আছে: সঞ্জীব চাকমা “চাকমা ঐতিহাসিকদের মতে” 1333 খ্রিস্টাব্দ; নিঝুম তালুকদার ও তনয় দেওয়ান 1418 সালে রাজা মানিকগিরি বা মারিক্যার বসতি; তনয় দেওয়ান জেলা গেজেটিয়ারের বরাতে 1448 সালে “MWUN TSNI” নামে এক চাকমা রাজার আলীকদমে আশ্রয়; আর তনয় দেওয়ানই লেখেন, 1459 সাল থেকে চাকমারা দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে উত্তরে পাহাড়ে সরে আসতে শুরু করে। 1418 সালের ঘটনায় বাংলার শাসকের নামও দুই রকম — নিঝুম তালুকদারের লেখায় সুলতান জালালুদ্দীন মোহাম্মদ শাহ, উইকিপিডিয়ায় (সুগত চাকমার বইয়ের বরাতে) চট্টগ্রামের শাসক জামালউদ্দিন।
চাকমারা কোথা থেকে এসেছে — এই প্রশ্নে চাকমা লেখকেরা নিজেরাও এক মতে নেই, আর এই মতভেদ “বহিরাগত” বিতর্কের আগেরও।
চম্পকনগর ধারা। চাকমা রাজা ভুবন মোহন রায়, বিরাজ মোহন দেওয়ান, মাধবচন্দ্র চাকমা কর্মী প্রমুখের লেখায় পূর্বপুরুষদের আদি বাসভূমি চম্পকনগর, এবং চাকমারা শাক্যবংশের — আনন্দ বিকাশ চাকমার লেখায় এভাবে সংক্ষেপিত। চম্পকনগর কোথায়, তা নিয়ে আবার আলাদা মত: লুইন লেখেন চাকমাদের কেউ বলেন মালাক্কার কাছে, কেউ উত্তর-পশ্চিম ভারতে; হাচিনসন বিহারের চম্পানগর; তনয় দেওয়ান হিমাচলের চাম্বা থেকে ভিয়েতনামের চম্পা পর্যন্ত নানা “চাম্পা”র তালিকা দিয়ে লেখেন, কোনটি থেকে নামটি এসেছে “তা কেউ সঠিকভাবে বলতে পারেননি”; আর পুলক খীসা চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রাচীন হরিকেল জনপদের রাজধানীর সঙ্গে চম্পকনগরের যোগ খোঁজেন।
আরাকান-মধ্য বার্মা ধারা। বাংলাপিডিয়ার “চাকমা” নিবন্ধ (ভেলাম ভ্যান শেন্ডেল) বলে, “সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তাত্ত্বিক অভিমত অনুযায়ী, চাকমারা মূলত ছিল মধ্য মায়ানমার ও আরাকান এলাকার অধিবাসী”, আর চম্পকনগর থেকে আসার অভিমতের পক্ষে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। একই নিবন্ধ আবার বলে, ব্রিটিশ শাসনের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম “কোনো রাষ্ট্রের অংশ ছিল না”।
উত্তর-পূর্ব ভারত ধারা। অশোক কুমার দেওয়ান (1926–1991) ভাষা ও সংস্কৃতির তুলনা করে মনে করতেন, চাকমা জাতির “প্রথম বীজটি” দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনো বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা হয়ে অঙ্কুরিত হয়, আর তারা শ্রীহট্ট ও পার্বত্য ত্রিপুরা হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে (আনন্দ বিকাশ চাকমার লেখায় সংক্ষেপিত)। আজাদ বুলবুলের লেখা অনুযায়ী অশোক দেওয়ানের ধারণা, চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামে আসার আগে বেশ কিছুকাল ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা বা কামরূপ অঞ্চলে ছিল। প্রশান্ত ত্রিপুরা উদ্ধৃত করেছেন, প্রিসিলা রাজের (2016) বইয়ে লেখা আছে যে চাকমা বন্ধুদের কাছে শোনা কথা অনুযায়ী অশোকবাবু এই মতের জন্য “চাকমা সমাজের বিরাগভাজন হয়েছিলেন”, কারণ সমালোচকদের মতে এতে পাহাড়িদের ভূমি দখলকারীদের হাতে “আরো একটি হাতিয়ার” তুলে দেওয়া হয়েছিল।
প্রশান্ত ত্রিপুরা নিজে এই বিতর্কে আরেকটি দিক তোলেন: অশোক দেওয়ানের অনুসন্ধানে “একটা প্রচ্ছন্ন অনুমান” কাজ করেছে যে চাকমা জাতি একক উৎস থেকে আসা একটি গোষ্ঠী, অথচ বাস্তবে প্রায় সব জাতির উৎপত্তিই নানা সাংস্কৃতিক ও “রক্তধারা”র মিশ্রণে গড়া একটি জটিল প্রক্রিয়া। তিনি আরও লেখেন, আদিবাসী ধারণার আলোচনার সঙ্গে অশোক দেওয়ানের বইয়ের মূল বিষয়ের “কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই”।
“চাকমারা কোথা থেকে এসেছে” লিখে খুঁজলে সার্চের প্রথম দিকে যে লেখাটি আসে, সেটি পার্বত্যনিউজে 3 আগস্ট 2015 তারিখে প্রকাশিত “চাকমা: আদিবাসী নয় বহিরাগত”। লেখক আবদুস সাত্তার, যাঁর পরিচয় লেখার শেষে দেওয়া “কবি, গবেষক ও আরণ্য জনপদের লেখক”। লেখাটি একটি স্পষ্ট অবস্থান নেয়: শিরোনামেই সিদ্ধান্ত, আর সমাপ্তির আগে লেখা — “পার্বত্য চট্রগ্রামের এসব উপজাতি যে এখানকার ভূমিজ সন্তান নয় তা আমাদের উপরোক্ত আলোচনা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়।”
লেখাটির যুক্তি, তার নিজের ক্রমে:
লেখাটি নিজের ভেতরেই কিছু বিপরীত তথ্য রাখে: চাকমারা মুসলমান ছিল — এই যুক্তিকে চাকমারা “সর্বৈব মিথ্যা” বলেন, এবং রাজা ভুবন মোহন রায় চাকমাদের শাক্যবংশের বলে দেখাতে চেয়েছেন; আর চাকমাদের একটি গানে “নুরনগর”-এর উল্লেখ থেকে লেখক নিজেই লেখেন, চাকমাদের সঙ্গে পার্বত্য ত্রিপুরার “যোগসূত্র প্রাচীনকাল থেকেই”। লেখাটিতে মধ্য-ষোড়শ শতকের পর্তুগিজ মানচিত্র, 1715 সালের তুলা-কর বা 1763 সালের সীমানা-ঘোষণার উল্লেখ নেই।
পার্বত্যনিউজে 6 মার্চ 2015 তারিখে প্রকাশিত এ. এইচ. এম. ফারুকের “পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃ-গোষ্ঠীগুলো আদিবাসী না অভিবাসী: ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ” একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়: “চাকমাদের আদি বাসস্থান ছিল আরাকান … সেই অর্থে তারা কেউই বাংলাদেশের আদিবাসী নয় বরং অভিবাসী।” লেখাটির যুক্তিগুলো:
“বহিরাগত” বা “অভিবাসী” অবস্থানের লেখাগুলো যুক্তি দাঁড় করায় “আদিবাসী” শব্দের একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞার ওপর — স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস। সেই সংজ্ঞাটি কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে আমাদের আলাদা একটি লেখা প্রস্তুত হচ্ছে: “আদিবাসী মানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী” — সংজ্ঞাটি কোথা থেকে এসেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি ও বাঙালি জনসংখ্যার শুমারিভিত্তিক হিসাবও আলাদা লেখায় আসছে: পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি ও বাঙালি জনসংখ্যার অনুপাত, 1941–2022।
উল্টো দিকের অবস্থানও প্রকাশ্যে উচ্চারিত। 17 জানুয়ারি 2025 চট্টগ্রামে এক সমাবেশে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিনিময় চাকমা বলেন, “আদিবাসীদের বহিরাগত কিংবা মিয়ানমার, থাইল্যান্ড থেকে এসেছে বলে মিথ্যাচার করবেন না” (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)। আর কজমিলিক্ক্য চাঙমার লেখা, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের প্রকাশনা আর কানুনগোর বইয়ের উদ্ধৃতি একসঙ্গে রেখে সিদ্ধান্ত টানে, “আজকের যে পার্বত্য চট্টগ্রাম সেটা একসময়কার স্বাধীন চাকমা রাজ্য” — সঙ্গে যোগ করে, এর অর্থ এই নয় যে সেখানে কেবল চাকমারা বাস করতেন।
এই লেখায় পঠিত দুই অবস্থানের লেখাগুলোর মধ্যে একটি মিল লক্ষ করার মতো: কোনোটিই উপরের নথিগুলোর সবকটি একসঙ্গে উল্লেখ করে না। প্রথম পক্ষ 1787 সালের চিঠি আর লুইনের “দুই প্রজন্ম” বাক্য রাখে, পর্তুগিজ মানচিত্র ও 1715 সালের তুলা-কর বাদ দেয়; দ্বিতীয় পক্ষ মানচিত্র ও সীমানা-ঘোষণা রাখে, লুইনের বাক্যটি বাদ দেয়।
জুমজার্নালের আর্কাইভে চাকমা ইতিহাস নিয়ে অন্তত দশটি লেখা আছে, বিভিন্ন লেখকের, 2020 থেকে 2026 সালের মধ্যে প্রকাশিত। এগুলো একে অন্যের সঙ্গে অনেক জায়গায় মেলে না, আর কয়েকটি লেখা নিজের ভেতরেও মেলে না। পাঠকের সুবিধার জন্য সেই অমিলগুলো এক ছকে রাখা হলো; কোনটি ঠিক, তার বিচার এখানে নেই।
| প্রশ্ন | আর্কাইভের লেখাগুলো যা বলে |
|---|---|
| পর্তুগিজ মানচিত্রের আঁকিয়ে ও সাল | তনয় দেওয়ান, নিঝুম তালুকদার, কজমিলিক্ক্য চাঙমা, আনন্দ বিকাশ চাকমা: বারোস, 1550। তারা চরণ চাকমা: “ডিয়েগো ডি এস্টোর” এঁকেছেন, বারোস 1615 সালে প্রকাশ করেছেন। সঞ্জীব চাকমা: বারোস, ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ। |
| ‘Chacomas’-এর অবস্থান | তনয় দেওয়ান: কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীর। নিঝুম তালুকদার ও তারা চরণ চাকমা: পূর্ব তীর। আজাদ বুলবুল (করিমের বরাতে): উজানে। কজমিলিক্ক্য চাঙমা (আঞ্চলিক পরিষদের বরাতে): ফেনী থেকে নাফ। |
| মোগলদের সঙ্গে প্রথম সম্পর্ক | তারা চরণ চাকমা: 1713, রাজা সুখদেব রায়। সঞ্জীব চাকমা: 1713, রাজা “জল্পীল খান”, 11 মণ তুলা। নিঝুম তালুকদার: 1714 যুদ্ধ, 1715 ফতে খাঁর সঙ্গে শান্তি। তনয় দেওয়ান: 1715 সালে ফতে খাঁ রাজা। আনন্দ বিকাশ চাকমা: 1715, সম্রাট ফররুখশিয়ারের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি। |
| শায়েস্তা খাঁর চট্টগ্রাম দখল | তারা চরণ চাকমার লেখায় একই পাতায় দুটি সাল: শুরুতে 1666, পরে “১৬১৬ সালে মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খান”। তনয় দেওয়ান ও পুলক খীসা: 1666। |
| 1787 সালের নিষ্পত্তি | তারা চরণ চাকমা: শান্তিচুক্তি, 300 মণ, ইংরেজদের পরাজয় স্বীকার। নিঝুম তালুকদার: ক্ষমা প্রার্থনা, 500 মণ। তনয় দেওয়ান: 1789, হেস্টিংসের কাছে বশ্যতা, 501 মণ। সুপ্রকাশ রায়: বশ্যতা, 501 মণ। চাদিগাং ছাড়া পালা (থিসিস): কর্নওয়ালিসের সঙ্গে পিটিশন। |
| পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন | সঞ্জীব চাকমা: 1333। নিঝুম তালুকদার ও তনয় দেওয়ান: 1418। তনয় দেওয়ান (গেজেটিয়ারের বরাতে): 1448। তনয় দেওয়ান: 1459 থেকে উত্তরে সরে আসা। সুপ্রকাশ রায়: 1824–52 সালের বর্মা যুদ্ধের সময়। |
| আদি নিবাস | নিঝুম তালুকদার: চম্পকনগর, আরাকান হয়ে। পুলক খীসা: হরিকেল জনপদ। আজাদ বুলবুল ও আনন্দ বিকাশ চাকমা (অশোক দেওয়ানের বরাতে): উত্তর-পূর্ব ভারত বা কামরূপ। |
| রাজা নলিনাক্ষ রায়ের মৃত্যু | নিঝুম তালুকদারের লেখার একই পাতায়: “১৯৫১ সালের ৭ অক্টোবর”, পরে “১৯৫৪ সালে রাজা নলিনাক্ষ রায়ের মৃত্যুর পর”। |
| দেবাশীষ রায় কততম রাজা | নিঝুম তালুকদারের লেখায় “৫১তম রাজা”, অথচ একই লেখার তালিকায় তিনি 68তম। |
এই লেখাগুলোর বেশির ভাগই নিজের সূত্র দিয়েছে — কামিনী মোহন দেওয়ান, বিরাজ মোহন দেওয়ান, সুগত চাকমা, সতীশচন্দ্র ঘোষ, লুইন, হাচিনসন, কানুনগো। অমিলের বড় অংশ তাই সেই মূল বইগুলোর অমিলেরই প্রতিফলন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য জনগোষ্ঠী ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটের জন্য দেখতে পারেন আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব।
লিখিত নথি এর সরাসরি উত্তর দেয় না। চাকমা রাজবংশের ঐতিহ্য বলে পূর্বপুরুষেরা চম্পকনগর থেকে আরাকান হয়ে এসেছেন; বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধ মধ্য মায়ানমার ও আরাকানকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত বলে; অশোক কুমার দেওয়ান উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে শ্রীহট্ট ও পার্বত্য ত্রিপুরা হয়ে আসার কথা ভেবেছিলেন। লুইন 1869 সালে লিখেছিলেন, প্রাচীন লিখিত নথি না থাকায় উৎপত্তি কেবল ঐতিহ্য থেকে অনুমান করা যায়।
নিশ্চিতভাবে চাকমা নাম লেখা সবচেয়ে পুরোনো নথি হলো মধ্য-ষোড়শ শতকের তথ্য নিয়ে আঁকা একটি পর্তুগিজ মানচিত্র, যা 1615 সালে জোয়াঁও দে বারোসের Décadas da Ásia-র চতুর্থ খণ্ডে ছাপা হয়; তাতে চট্টগ্রামের উজানে ‘Chacomas’ লেখা। আরাকানি বৃত্তান্তে 1118 সালের “চাকমা” এবং ষোড়শ শতকের “সাক রাজা”-র উল্লেখ আছে, তবে সেগুলো চাকমাদেরই বোঝায় কি না, তা নিয়ে মতভেদ আছে।
উৎসগুলো চারটি উত্তর দেয়। উইকিমিডিয়া কমন্স ও আবদুল করিম বলেন জোয়াঁও দে বারোস; বাংলাপিডিয়া বলে লাভানহা, যিনি 1615 সালের খণ্ডটির সম্পাদক; ইংরেজি উইকিপিডিয়া বলে দিয়েগো দে আস্তোর, যিনি উইকিপিডিয়ার আরেক নিবন্ধে সপ্তদশ শতকের স্প্যানিশ খোদাইশিল্পী; আর mappingbengal.com কোনো নাম দেয় না। মানচিত্রের তথ্য মধ্য-ষোড়শ শতকের, প্রথম ছাপা 1615 সালে।
অনেক বাংলা লেখায় 1550 সাল লেখা থাকলেও প্রতিটি উৎসে সালটি “আনুমানিক”। mappingbengal.com বলে মানচিত্রের তথ্য আনুমানিক 1525 থেকে 1550 সালের, অন্য জায়গায় 1525–1535; প্রথম ছাপা 1615 সালে, বারোসের মৃত্যুর (1570) পর। তাই এটিকে মধ্য-ষোড়শ শতকের তথ্যভিত্তিক মানচিত্র বলাই উৎসগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
লুইনের 1869 সালের তালিকা ও হাচিনসনের 1906 সালের তালিকা — দুটিতেই প্রথম নথিভুক্ত চাকমা প্রধান আনুমানিক 1715 সালে চট্টগ্রামের মোগল উজির ফররুখ শাহকে তুলা-কর দেন; লুইনের তালিকায় নাম জুমাল খাঁ, হাচিনসনের তালিকায় জালাল খাঁ। চাদিগাং ছাড়া পালা লেখায় উদ্ধৃত একটি থিসিস মোগল নথির বরাতে 1711 সালে চন্দন খাঁর কথা বলে।
লুইন 1869 সালে লেখেন, চট্টগ্রামের পাহাড়ে বাস করা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর “a greater portion” প্রায় দুই প্রজন্ম আগে আরাকান থেকে এসেছে। বাক্যটিতে চাকমাদের আলাদা নাম নেই। একই বইয়ের চাকমা অধ্যায়ে তাঁর তালিকা অনুযায়ী চাকমা প্রধান আনুমানিক 1715 সালে মোগলদের তুলা-কর দেন, আর 1737 সালে সরকারের সঙ্গে বন্দোবস্ত হয়।
লেখাটি আবদুস সাত্তারের, পার্বত্যনিউজে 3 আগস্ট 2015 প্রকাশিত। এটি আরাকানি বৃত্তান্তে 1118 সালের উল্লেখ, 1787 সালের একটি চিঠি, রাজাদের “খাঁ” উপাধি ও ফারসি মোহরের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত টানে যে চাকমারা ব্রহ্মদেশ থেকে এসেছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের “ভূমিজ সন্তান নয়”। লেখাটিতে পর্তুগিজ মানচিত্র বা 1715 সালের মোগল তুলা-করের উল্লেখ নেই।
রাজা জান বক্স খাঁ 1787 সালে কোম্পানির সঙ্গে নিষ্পত্তিতে আসেন বলে বেশির ভাগ উৎস লেখে, কিন্তু খুঁটিনাটি মেলে না। লুইন ও হাচিনসন একে “submission” বলেন; উইকিপিডিয়া “peace treaty”; বাংলাপিডিয়া চুক্তির সাল দেয় ফেব্রুয়ারি 1789। তুলা-করের পরিমাণ উৎসভেদে 300, 500 বা 501 মণ, আর বড়লাটের নাম কোথাও হেস্টিংস, কোথাও কর্নওয়ালিস।
সতীশচন্দ্র ঘোষ (1909) চাকমা রাজাদের দশটি মোহরের কথা লেখেন — দুটি প্রতীকচিহ্ন, আটটিতে ফারসি লেখা; প্রাচীনতমটিতে “ফতে খাঁ ১১৩৩ হিং”। ঘোষ এগুলোকে কখনো মোহর, কখনো মুদ্রা বলেছেন, আর ছাপা ছবি থেকে এগুলো সিলমোহর না প্রচলিত টাকা, তা নিশ্চিত নয়। পুরোনো রাজা বিজয়গিরি প্রমুখের নামে কোনো মুদ্রা পাওয়া যায় না।
সাল উৎসভেদে আলাদা: চাকমা লেখকদের তালিকায় বিজয়গিরির অভিযান আনুমানিক 590 খ্রিস্টাব্দে; সঞ্জীব চাকমা 1333; নিঝুম তালুকদার 1418; তনয় দেওয়ান গেজেটিয়ারের বরাতে 1448; হাচিনসন বিজয়গিরিকে আনুমানিক 1630 সালে রাখেন; এ. এইচ. এম. ফারুক 1660 ও মোগল আমলের শেষ; সুপ্রকাশ রায়ের লেখায় 1824–52 সালের বর্মা যুদ্ধের সময়।
পুলক খীসার লেখায় সংযুক্ত মানচিত্রটি রাজমালার একটি সংস্করণে ছাপা। ছবির ভেতরের উদ্ধৃতিতেই লেখা, এটি রাজমালার দ্বিতীয় লহরের সমসাময়িক ত্রিপুরা রাজ্য দেখাতে “আধুনিক মানচিত্রের সাহায্যে অঙ্কিত”। অর্থাৎ এটি আধুনিক কালে আঁকা পুনর্গঠন, ষোড়শ শতকে আঁকা মানচিত্র নয়; সংস্করণ ও সম্পাদকের নাম জানা যায়নি।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি ঘোষণা, তারিখ 6 শ্রাবণ 1170 মঘী (1763), চাকমা রাজার এলাকা নির্ধারণ করে: ফেনী নদী থেকে সাঙ্গু, আর চট্টগ্রামের নিজামপুর রোড থেকে কুকি রাজার পাহাড় পর্যন্ত সব পাহাড়। উইকিপিডিয়া এটি তালুকদারের 1988 সালের বই থেকে, আর কানুনগো চট্টগ্রামের প্রথম চিফ হেনরি ভেরেলস্টের বিবরণ থেকে উদ্ধৃত করেন।
জুমজার্নালের আর্কাইভ
ঔপনিবেশিক ও প্রাথমিক নথি
বিশ্বকোষ ও অনলাইন উৎস
“বহিরাগত” বিতর্কের লেখা ও প্রতিক্রিয়া
সর্বশেষ হালনাগাদ: 17 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:চাকমা, চাকমা জাতির আদিনিবাস, চাকমা জাতির ইতিহাস, চাকমা রাজা, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।