Last updated Oct 6th, 2026
8

পাহাড়ে একটি জমির মালিকানা দুই জায়গায় লেখা থাকে। একটি খাতা থাকে মৌজার হেডম্যানের কাছে — জমাবন্দি, যেখানে কোন পরিবার কোন পাহাড়ে চাষ করে তা বছর বছর তোলা হয়। আরেকটি খাতা থাকে জেলা প্রশাসনের ভূমি অফিসে। ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায় লিখেছেন, বিংশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ পাহাড়ের বেশিরভাগ হালচাষের জমি দুবার রেকর্ড হয়েছিল — একবার প্রথাগত প্রশাসনে, একবার রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে।
সমস্যাটা শুরু হয় যখন দুই খাতা মেলে না।
জুমজার্নালের আর্কাইভে খাগড়াছড়ির ২৫৭ নম্বর নুনছড়ি মৌজার হেডম্যানের একটি বক্তব্য আছে। ১৯৮২ সালে সরকার ওই এলাকায় ৭৪টি বাঙালি পরিবারকে পুনর্বাসন করে। হেডম্যান বলছেন, “১৯০০ সালের চিটাগাং হিলট্রাক্টস রেগুলেশন অ্যাক্টকে পাশ কাটিয়ে হেডম্যান প্রতিবেদন ছাড়া সরকার প্রতি পরিবারের একজনের নামে ৫ একর করে ৫৩টি পরিবারকে বন্দোবস্তীর কবুলিয়ত দেয়। তবে এসব জায়গার সঠিক কোনো চৌহদ্দি নেই।”
এক লাইনে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি-সমস্যার গঠনটা ধরা পড়ে: একটি আইন আছে, আইনটি একটি প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করেছে, প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করা হয়নি, এবং যে কাগজ তৈরি হয়েছে তার সীমানাও অস্পষ্ট। এই লেখায় আমরা আইনি কাঠামোটাই ধরে ধরে দেখব — কী লেখা আছে, কবে কী বদলেছে, আর কোন জায়গায় কাগজ আর বাস্তবের মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়েছে।
সূচিপত্র
জুমজার্নালের আর্কাইভে শক্তিপদ ত্রিপুরার লেখা পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রবন্ধে সোজাসাপ্টা লেখা: “বৃটিশের অধীনে চলে যাবার আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্ত ভূমিই ছিল সমষ্টিগত মালিকানাধীন।” ব্যক্তিগত মালিকানার ধারণা এ অঞ্চলে এসেছে ব্রিটিশদের সঙ্গে।
সমষ্টিগত মানে বিশৃঙ্খল নয়। জুমভূমির প্রথাটি ছিল নির্দিষ্ট: যে ব্যক্তি প্রথমবার কোনো পাহাড়ে জুম কাটল, সেই পাহাড় তার জুমভূমি হিসেবে স্বীকৃতি পেত। অন্য কেউ সেখানে চাষ করতে চাইলে তার অনুমতি নিতে হতো। দেবাশীষ রায়ের বিবরণে এই পুরনো জুমকে বলা হয় রানিয়া — চাষির অধিকার তাতে বজায় থাকে, আর বিরোধ হলে সিদ্ধান্ত দেন তালুকদার বা মৌজা হেডম্যান। কোনো কাগজ লাগত না।
একই সঙ্গে জমিটি পতিত থাকা অবস্থায় গ্রামের সবার অধিকার ছিল সেখান থেকে লাকড়ি, বাঁশ, কলাপাতা, গাছ ও বনজ শাকসবজি সংগ্রহের। অর্থাৎ একই ভূখণ্ডে দু-ধরনের অধিকার পাশাপাশি চলত — চাষের একক অধিকার, আর সংগ্রহের সমষ্টিগত অধিকার।
আর্কাইভের ওই লেখা অনুসারে সমষ্টিগত মালিকানার আওতায় পড়ত পাঁচ ধরনের জমি:
| জমির ধরন | ব্যবহার |
|---|---|
| জুমভূমি | জুম চাষ |
| মৌজা রিজার্ভ (কালিত্র) | বন সংরক্ষণ, গাছ ও বাঁশ |
| গোচারণভূমি | গরু-মহিষ চরানো |
| গ্রামভূমি | ঘর তোলা ও বসবাস |
| শ্মশান / কবরস্থান | মৃতদেহ সৎকার |
জুম চাষের চক্র, ফসল ও যন্ত্রপাতি নিয়ে আলাদা করে লেখা আছে জুম চাষ: পাহাড়ের কৃষিবিদ্যা পোস্টে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা পাতায় রাখা রেগুলেশনের মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশনার তারিখগুলো লেখা আছে: গভর্নর-জেনারেলের সম্মতি 6 January 1900, Gazette of India-তে প্রকাশ 13 January, Calcutta Gazette-এ 17 January। কার্যকর হয় ওই বছরেরই মে মাসে।
এটি হঠাৎ আসা আইন নয়। তার আগে ধাপে ধাপে এসেছে ১৮৬০ সালের জেলা-ঘোষণা (Act XXII of 1860), ১৮৭০-এর ‘Rules for Administration of Backward Tracts’, ১৮৭৩-এর ‘Inner Line Regulation’ (অনুমতি ছাড়া বহিরাগতদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা), ১৮৭৪-এর ‘Scheduled District Act’, ১৮৮৪-র আঞ্চলিক সার্কেল বিধি, আর ১৮৯২-এর ১৭ বিধিসম্বলিত শাসনবিধি। সার্কেল, রাজা, হেডম্যান ও মৌজার কাঠামোটি কীভাবে দাঁড়াল, তার বিস্তারিত আছে চাকমা সার্কেল, হেডম্যান ও কার্বারি লেখায়।
১৯০০ সালের রেগুলেশনের সবচেয়ে বড় ফল আইনি কাঠামোয় নয়, সম্পর্কের সংজ্ঞায়। দেবাশীষ রায়ের ভাষ্য: রাষ্ট্র ধরে নিল পাহাড়ের সমস্ত জমি রাষ্ট্রের, নিজেকে বসাল জমিদারের আসনে, আর আদিবাসী কৃষককে বানাল প্রজা। “Thus, the indigenous farmers became leaseholders in their own territory.” — নিজের ভূখণ্ডেই তারা হয়ে গেলেন ইজারাদার।
মূল ৩৪ নম্বর বিধির ভাষাটি ছিল এরকম:
“All lands held for plough cultivation on lease from Government, under whatever rules they have been or may be granted, are subject to the condition that they cannot be sub-let or transferred, except on hereditary succession or with the consent of the Commissioner.”
অর্থাৎ হালচাষের জমি সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেওয়া, এবং উত্তরাধিকার ছাড়া বা কমিশনারের সম্মতি ছাড়া তা হস্তান্তর করা যাবে না। রক্ষাকবচ আর নিয়ন্ত্রণ — দুটোই একই বাক্যে।
মৌজা তৈরি হয়েছিল এই ইজারা-ব্যবস্থা সামলানোর জন্যই। ১৮৯১ সাল নাগাদ তিন সার্কেলে হালচাষের বন্দোবস্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১,২৫০। এক ব্রিটিশ প্রশাসকের ভাষায়, “আমাদের বড় বিভাগগুলো আছে, হেডম্যানের ব্যবস্থাও আছে; যা দরকার তা হলো ছোট স্থানীয় একক — মৌজা।”
আজ পাহাড়ে কতগুলো মৌজা, তা নিয়ে উৎসে মিল নেই। দেবাশীষ রায়ের IWGIA প্রতিবেদনে সরকারি তথ্যের বরাতে বলা হয়েছে 356টি মৌজা — রাঙামাটি 136, খাগড়াছড়ি 127, বান্দরবান 93; সঙ্গে 25টি থানা ও 110টি ইউনিয়ন। আর্কাইভের লেখায় সংখ্যাটি 390। দুটোই কয়েক দশক আগের হিসাব।
একটি ছোট টীকা: হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়েলের বিভিন্ন মুদ্রণে বিধির সংখ্যায়ন এক নয়। দেবাশীষ রায়ের বই ও আর্কাইভের লেখা — দুই জায়গাতেই জমি বন্দোবস্তের বিধিটি ৩৪ নম্বর; মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে রাখা সংস্করণের সূচিতে ঠিক একই উপ-বিধিগুলো (হস্তান্তর, উপ-ইজারা, অ-বাসিন্দার উত্তরাধিকার) আছে ৩৩ নম্বরে। এই লেখায় ৩৪ ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রথাগত প্রশাসন তিন স্তরের — গ্রামে কার্বারি, মৌজায় হেডম্যান, সার্কেলে রাজা বা সার্কেল চীফ। ভূমির প্রশ্নে সবচেয়ে ভারী কাজটা করেন মাঝের স্তর, অর্থাৎ মৌজা হেডম্যান।
হেডম্যানের হাতে যা আছে — আর্কাইভের বিবরণ অনুযায়ী: ভূমি রাজস্ব ও জুম খাজনা আদায়; ভূমির রেকর্ড সংরক্ষণ; স্থায়ী বাসিন্দার সনদ প্রদান; জুম তৌজি তৈরি ও জুম চাষ নিয়ন্ত্রণ; ঘাস-শনখোলা, গর্জন খোলা ও গোচারণের খাজনা আদায়; মৌজার বনজ সম্পদ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা জারি। পৌর এলাকার বাইরে তিনি কোনো আদিবাসী বাসিন্দাকে বসতবাড়ির জন্য সর্বোচ্চ 0.30 একর জমি ভোগদখলে রাখার অনুমতি দিতে পারেন, তবে তার রেজিস্টার রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাটি নেতিবাচক: মৌজা প্রধানের সুপারিশ ও মতামত ছাড়া মৌজার কোনো জমি বন্দোবস্ত হতে পারে না। এই বাধ্যবাধকতাটিই বারবার লঙ্ঘিত হওয়ার অভিযোগ ওঠে — লেখার শুরুর নুনছড়ির উদাহরণটি তারই একটি।
জুম তৌজি ব্যবস্থাটি বিশেষভাবে দেখার মতো, কারণ এটি এখনো রেগুলেশনের অংশ। হেডম্যান প্রতি বছর একটি রেজিস্টার তৈরি করেন যাতে থাকে পরিবারপ্রধানের নাম, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, ওই বছর তারা জুম করছে কি না, এবং জুমের বিবরণ। তালিকাটি প্রতি বছর রাজার কাছে পাঠাতে হয়; রাজা যাচাই করে ডেপুটি কমিশনারের কাছে অনুলিপি পাঠান, সঙ্গে জানান কারা খাজনা থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত — কার্বারি, অবিবাহিত, বিধবা ও বিপত্নীক। কেউ জুম না করলে তার ওপর খাজনা ধার্য হয় না।
এর ভেতরে পরকুল্যা নামের একটি সূক্ষ্ম নিয়মও আছে: যে জুমিয়া এক মৌজায় থাকেন কিন্তু চাষ করেন পাশের মৌজায়, তিনি নিজের মৌজার হেডম্যানকে পুরো খাজনা দেন আর যে মৌজায় চাষ করেন সেখানে অর্ধেক। আর যদি এক রাজার এলাকায় বাস করে অন্য রাজার এলাকায় চাষ করেন, তবে দুই রাজাকেই পুরো খাজনা দিতে হয়।
একটি অসঙ্গতিও নথিভুক্ত আছে। রেগুলেশনের বিধিটি ডেপুটি কমিশনারকে জুম “নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা” করার ক্ষমতা দেয় — সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার নয়। দেবাশীষ রায় লিখেছেন, ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামের জিওসি-র পরামর্শে পার্বত্য জেলাগুলোর ডেপুটি কমিশনাররা জুম চাষের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, যা বিধির ভাষার বাইরে।
হেডম্যান ও কার্বারিদের সাংস্কৃতিক ভূমিকা নিয়ে আর্কাইভে আলাদা লেখা আছে — ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে হেডম্যান ও কার্বারিগণের ভূমিকা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি-বিতর্কে সবচেয়ে কম আলোচিত অথচ সবচেয়ে নির্ধারক বিষয়টি সম্ভবত এই: রেগুলেশন বাতিল করা হয়নি, বদলে দেওয়া হয়েছে তার একটিমাত্র বিধি — ধাপে ধাপে, আট দশক ধরে। দেবাশীষ রায়ের IWGIA প্রতিবেদনে সংশোধনীগুলোর একটি কালানুক্রম আছে:
| সাল | কী হলো |
|---|---|
| 1900 | রেগুলেশন জারি। বাইরের লোকের বসতির ওপর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই — কারণ ধরেই নেওয়া হয়েছিল এ অঞ্চলের বাসিন্দারা সবাই এখানকারই। |
| 1920 | ৩৪ নম্বর বিধি সংশোধন: “ইজারা কেবল পাহাড়িদেরই দেওয়া যাবে” — তবে গ্রামে প্রকৃত বসবাসকারী অ-পাহাড়ি কৃষককে সর্বোচ্চ 25 একর পর্যন্ত দেওয়া যেতে পারে। বাইরের লোকের কাছে হস্তান্তর ও উপ-ইজারা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। |
| 1930 | এলাকায় প্রবেশে ডেপুটি কমিশনারের অনুমতি আর লাগবে না। জমির মালিকানায় বাইরের লোকের নিষেধাজ্ঞা বহাল। |
| 1956 | পাকিস্তানের সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পূর্ণ ‘Excluded Area’ হিসেবে স্বীকৃত। |
| 1964 | সাংবিধানিক সংশোধনী (Act No. 1 of 1964): আদিবাসী অঞ্চল হিসেবে বিশেষ মর্যাদা তুলে নেওয়া হলো। শর্তপূরণ সাপেক্ষে অ-আদিবাসীরাও জমির মালিক হতে পারবেন। |
| 1971 | ৩৪ নম্বর বিধি সংশোধন: একটি পরিবারের হালচাষের সমতল জমির সিলিং 5 একর; বাগান-জমিরও ৫ একর, ডেপুটি কমিশনার সন্তুষ্ট হলে ১০। রাজস্ব বোর্ডের পূর্বানুমোদন নিয়ে বহিরাগতদের জমি বন্দোবস্ত দেওয়া যাবে। |
| 1979 | “বসবাসের জমি ডেপুটি কমিশনার যোগ্য ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি ইজারায় বন্দোবস্ত দিতে পারবেন।” অ-আদিবাসীদের বসবাস ও মালিকানায় আর কোনো বিধিনিষেধ রইল না। |
রায়ের সিদ্ধান্ত সংক্ষিপ্ত: “By 1979, the legislative framework was in place to allow the entry and settlement of non-indigenous people in the Chittagong Hill Tracts.” — ১৯৭৯ সালের মধ্যেই আইনি কাঠামোটি প্রস্তুত ছিল।
এর সমান্তরালে আরেকটি পরিবর্তন ঘটেছিল। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘শাসনবহির্ভূত অঞ্চল’ মর্যাদা পাকিস্তান সরকার বাতিল করে দেয়। ওই মর্যাদা থাকা অবস্থায় বাইরের কারও পাহাড়ে জমির মালিকানা স্বত্ব পাওয়ার অধিকার ছিল না। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ সংবিধানে ‘প্রচলিত আইন’ হিসেবে ১৯০০ সালের শাসনবিধি বহাল রাখা হয়, কিন্তু ‘শাসনবহির্ভূত অঞ্চল’ মর্যাদা ফেরেনি।
আইন বদলানোর আগেই একটি প্রকল্প পাহাড়ের ভূমি-অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল।
বাংলাপিডিয়ার হিসাব: স্থান নির্বাচন ১৯৫২ সালের গোড়ায়, নির্মাণকাজ শেষ ১৯৬১-র শেষে, গেট বন্ধ করে চালু ১৯৬২-র শুরুতে। জলাধারের আয়তন 1,722 বর্গ কিমি, সঙ্গে আরও 777 বর্গ কিমি এলাকা প্লাবিত। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আনুমানিক 18,000; নিমজ্জিত কৃষিজমি 54,000 একর; ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমি প্রায় 690 বর্গ কিমি। ক্ষতিপূরণ বাবদ বরাদ্দ ছিল 4 কোটি 15 লক্ষ টাকা, কিন্তু “সবাইকে নগদ ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব হয়নি”।
দেবাশীষ রায়ের প্রতিবেদনে সরকারি নথি থেকে উদ্ধৃত হিসাবটি আরও নির্দিষ্ট: পুনর্বাসন কর্মকর্তার জরিপ অনুযায়ী জলাধারের তলায় জমি থাকা প্রায় 10,000 হালচাষি পরিবার এবং 8,000 ভূমিহীন জুমিয়া পরিবার — মোট এক লক্ষেরও বেশি মানুষ — উচ্ছেদ হন। পানির নিচে যায় 125টি মৌজা। ওই ৫৪ হাজার একর ছিল “জেলার মোট বন্দোবস্তকৃত আবাদযোগ্য জমির 40 শতাংশ” — কর্ণফুলী, চেঙ্গী, কাসালং ও মাইনী উপত্যকার উর্বরতম অংশ।
রায় আরও লিখেছেন, জমি হারিয়ে প্রায় 40,000 চাকমা ভারতের অরুণাচল প্রদেশে চলে যান এবং আজও রাষ্ট্রহীন অবস্থায় আছেন।
দুটি সংখ্যা আলাদা করে জেনে রাখা ভালো। জুমজার্নালের আর্কাইভের লেখায় ৫৪ হাজার একরকে বলা হয়েছে “পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট ভূমির ৪৮%”; সরকারি নথি উদ্ধৃত করে রায়ের প্রতিবেদনে তা বন্দোবস্তকৃত আবাদযোগ্য জমির ৪০%। বাঁধের নির্মাণকালও দু-রকম — বাংলাপিডিয়ায় ১৯৬১ শেষে নির্মাণ শেষ ও ১৯৬২-তে চালু, রায়ের প্রতিবেদনে ১৯৫৯–৬৩।
পাহাড়ে জমি কম — এটি অনুমান নয়, জরিপের ফল। ১৯৬৪-৬৬ সালে কানাডার Forestal Forestry and Engineering International Ltd-এর ভূমি জরিপ প্রতিবেদন আর্কাইভে উদ্ধৃত আছে:
| শ্রেণি | ভূমির ধরন | একর | শতাংশ |
|---|---|---|---|
| A | কৃষিজমি | 76,466 | 3.1% |
| B | ঢালু জমি | 67,871 | 2.7% |
| C | উদ্যানচাষ উপযোগী | 366,622 | 14.7% |
| D | শুধুমাত্র বনায়নে উপযোগী | 1,816,993 | 72.9% |
অর্থাৎ ধান্য জমি মোট ভূমির মাত্র 3.1 শতাংশ। এই সংকীর্ণ ভিত্তির ওপরেই ১৯৭৯ সালের পর একটি বড় জনস্থানান্তর কর্মসূচি চাপানো হয়।
দেবাশীষ রায়ের বিবরণে, ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উপ-প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, চট্টগ্রামের কমিশনার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনারকে নিয়ে একটি বৈঠক করেন, উদ্দেশ্য ছিল সমতল থেকে পরিবার স্থানান্তরের কর্মসূচি প্রণয়ন; বরাদ্দ হয় ৬ কোটি টাকা।
আর্কাইভের লেখায় সার্কুলারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর তালিকা আছে — পরিবারপ্রতি 2.5 একর সমতল কৃষিজমি, অথবা 4 একর মিশ্র জমি, অথবা 5 একর পাহাড়ি জমি; সঙ্গে এককালীন 500 টাকা, মাসিক 200 টাকা ও 12 সের খাদ্যশস্য। ওই লেখার হিসাবে প্রথমে 30,000 পরিবার পুনর্বাসনের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সংখ্যাটি দাঁড়ায় 80,000, আর ১৯৭৯–৮৬ সময়ে চার লক্ষাধিক মানুষ পাহাড়ে পুনর্বাসিত হন। এগুলো আর্কাইভের লেখকের হিসাব; স্বাধীন সরকারি নথি দিয়ে আমরা সংখ্যাগুলো মেলাতে পারিনি। [যাচাই প্রয়োজন]
দ্বিতীয় চাপটি এসেছে বন বিভাগ থেকে। ১৯৯২ সালে জুমভূমিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখানেও সংখ্যা দু-রকম: IWGIA প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২১ মে ১৯৯২-এর গেজেটে 175,000 একরের বেশি জমি সংরক্ষিত বন করার বিজ্ঞপ্তি জারি হয়; আর্কাইভের লেখায় সংখ্যাটি 2 লক্ষ 18 হাজার একর।
এর বাইরে আর্কাইভে সেনা স্থাপনার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ, বাণিজ্যিক বাগান ও রাবার প্লান্টেশনের ইজারা, এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের নামে জমি দখলের বিস্তারিত অভিযোগ ও উদাহরণ লিপিবদ্ধ আছে, নাম-ঠিকানাসহ। সেগুলো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান থেকে লেখা এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলে এখানে বিস্তারিত পুনরাবৃত্তি করা হলো না; আগ্রহী পাঠক মূল লেখাটি পড়তে পারেন — পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যার চিত্র।
২ ডিসেম্বর ১৯৯৭-এ স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির চার খণ্ডের মধ্যে ভূমি-সংক্রান্ত মূল বিধানগুলো আছে (ঘ) খণ্ডে। মূল পাঠ থেকে সংক্ষেপে:
এর সঙ্গে (খ) খণ্ডের ২৬ নম্বর ধারা মিলিয়ে পড়া দরকার। সেখানে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৬৪ ধারা নতুন করে লেখা হয়েছে: পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া জেলার কোনো জায়গা-জমি — বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ — ইজারা, বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় বা হস্তান্তর করা যাবে না (ব্যতিক্রম: রক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত ভূমি)। পরিষদের সম্মতি ছাড়া সরকার ওই জমি অধিগ্রহণ বা হস্তান্তর করতে পারবে না। পরিষদ হেডম্যান, চেইনম্যান, আমিন, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) কাজ তত্ত্বাবধান করতে পারবে। কাপ্তাই হ্রদের জলেভাসা জমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মূল মালিকদের বন্দোবস্ত দেওয়া হবে।
কাগজে ক্ষমতাটি প্রায় সম্পূর্ণ। বাস্তবে ভূমি প্রশাসন হস্তান্তরিত হয়নি। প্রথম আলোর ২ ডিসেম্বর ২০২৩-এর প্রতিবেদনে চুক্তির যে তিনটি মূল বিষয়ে অগ্রগতি নেই বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার প্রথমটিই — জেলা পরিষদের হাতে ভূমি-বিষয়ক কর্তৃত্ব হস্তান্তর।
চুক্তির ধারাটি আইনে রূপ নেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১-এ (২০০১ সনের ৫৩ নং আইন, ১৭ জুলাই ২০০১)। আইনটির কিছু বৈশিষ্ট্য মনে রাখার মতো:
২০০৯: জরিপ-বিতর্ক। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী, তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী এককভাবে ভূমি জরিপের ঘোষণা দেন এবং ছয় মাসে তা শেষ করার কথা বলেন। জনসংহতি সমিতি, আঞ্চলিক পরিষদ, সার্কেল চীফ, সংসদ সদস্য ও হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশন প্রতিবাদ জানায়। লেখকের যুক্তি ছিল দুটি: কমিশনের আইনে ভূমি জরিপের কথা কোথাও নেই, আর চুক্তি অনুযায়ী জরিপের আগে আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা বাধ্যতামূলক। বিতর্কটি ছিল রাজনৈতিক; এখানে লেখকের অবস্থানটুকু তাঁরই বলে উল্লেখ করা হলো।
২০১৬: সংশোধনী। ২০০১ সালের আইনের বিরুদ্ধে যে আপত্তিগুলো তোলা হচ্ছিল, তার কয়েকটি ২০১৬ সনের ৪৫ নং আইনে সরাসরি মেটানো হয়। আইনের পাঠে টীকা আকারে সংশোধনীগুলো দেখা যায়:
| আগে যা ছিল | ২০১৬-তে যা হলো |
|---|---|
| সর্বসম্মতি না হলে “চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত” | “চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গৃহীত সিদ্ধান্ত” |
| কোরাম: চেয়ারম্যান + দুইজন সদস্য | চেয়ারম্যান + তিনজন সদস্য |
| কেবল শরণার্থীদের বিরোধের কথা | “অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া ভূমি” যুক্ত; নতুন দফা (গ)-তে জলেভাসা জমিসহ প্রচলিত আইন-রীতির বাইরে দেওয়া বন্দোবস্ত বাতিল ও দখল পুনর্বহালের ক্ষমতা |
| সার্কেল চীফ পদাধিকারবলে | সার্কেল চীফ বা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধি |
| — | কমিশনের সচিব ও কর্মচারী পদে পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতীয়দের অগ্রাধিকারসহ স্থায়ী অধিবাসী নিয়োগ |
অর্থাৎ ২০০৯ সালের আপত্তির অনেকটাই ২০১৬ সালে আইনি ভাষায় স্বীকৃত হয়েছিল। কিন্তু তারপর?
প্রথম আলোর ২ ডিসেম্বর ২০২৩-এর প্রতিবেদনে (পার্থ শঙ্কর সাহা) কমিশনের সচিব মো. নেজাম উদ্দিনের বরাতে বলা হয়েছে, কমিশনে এ পর্যন্ত ২২ হাজারেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে এবং একটিরও সুরাহা হয়নি। কারণ হিসেবে যেটি বারবার আসে তা হলো বিধিমালা: ২০১৬ সালে আইন সংশোধনের পর যে বিধিমালা হওয়ার কথা ছিল, তা আজও চূড়ান্ত হয়নি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ অধিশাখার অতিরিক্ত সচিব এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন ওই প্রতিবেদনে বলেছেন, খসড়া বিধিমালা পর্যালোচনায় আছে। এই লেখা তৈরির সময় মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা-তালিকায় ভূমি কমিশনের কোনো বিধিমালা আমরা দেখতে পাইনি।
একটি কমিশন যার সিদ্ধান্ত দেওয়ানি ডিক্রির সমান এবং যার বিরুদ্ধে আপিল চলে না — তার কার্যপদ্ধতি নির্ধারণের বিধিমালা না থাকা মানে বাস্তবে কাজ শুরুই না হওয়া।
চেয়ারম্যানের ইতিহাসটিও ধারাবাহিকতার অভাব দেখায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী:
| নিয়োগ | চেয়ারম্যান |
|---|---|
| 1999 | বিচারপতি আনোয়ারুল হক — দায়িত্ব নেওয়ার আগেই মৃত্যু |
| 05/04/2000 | বিচারপতি আবদুল করিম — স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ |
| — | দেড় বছরের শূন্যতা |
| 04/11/2001 | বিচারপতি মাহমুদুর রহমান — নভেম্বর ২০০৭-এ মৃত্যু |
| 2009 | বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী |
| 07/09/2014 | বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার-উল হক |
তালিকাটি এখানেই শেষ। ২০১৪-র পরে আর কে কে দায়িত্ব পেয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নথিতে তা নেই। [যাচাই প্রয়োজন] — প্রথম নামের নিয়োগের সালটিও ওই নথিতে অসম্পূর্ণভাবে ছাপা।
বাংলাদেশের সমতলে জমির মালিকানার ভিত্তি খতিয়ান ও দাগ নম্বর। পাহাড়ে সেই ভিত্তিটাই বেশিরভাগ জায়গায় নেই। দেবাশীষ রায় সরাসরি লিখেছেন: “The greater part of the lands of the CHT has never been surveyed in detail.”
আইনি ব্যবস্থা অবশ্য একবার তৈরি হয়েছিল। ভূমি-খতিয়ান (পার্বত্য চট্টগ্রাম) অধ্যাদেশ জারি হয় ১৬ জানুয়ারি ১৯৮৫-তে (সংক্ষিপ্ত শিরোনামে ১৯৮৪ সনের অধ্যাদেশ)। এর কাঠামোটি পরিচিত: রাজস্ব অফিসার প্রতিটি মৌজাকে জরিপের একক ধরে বড় আকারের ম্যাপ প্রস্তুত করবেন; খসড়া খতিয়ান অন্তত ত্রিশ দিন জনসাধারণের পরিদর্শনে থাকবে; আপত্তি শোনা হবে; আপত্তির আদেশে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ত্রিশ দিনের মধ্যে সেটেলমেন্ট অফিসারের কাছে আপিল করতে পারবেন; তারপর চূড়ান্ত প্রকাশনা। প্রকাশিত খতিয়ানের প্রতিটি তথ্য অশুদ্ধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত শুদ্ধ বলে গণ্য হবে।
এই অধ্যাদেশের ১৬ ধারাটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়: খতিয়ান প্রস্তুত বা সংশোধন সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে কোনো আদালতে মামলা দায়ের বা দরখাস্ত পেশ করা চলবে না। আপত্তি ও আপিলের পথ প্রশাসনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ।
জরিপ নিয়ে ভয়টা কোথায়? রায়ের ব্যাখ্যা: ১৯৯২ সালে জরিপ শুরুর প্রস্তাব আদিবাসীরা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করেন, কারণ তাঁদের আশঙ্কা ছিল বর্তমান দখলদারদের নামে জমি রেকর্ড হয়ে যাবে — যাঁদের অনেকেই ১৯৭৮-৮৪-র জনস্থানান্তর কর্মসূচিতে আনা মানুষ — এবং প্রথাভিত্তিক অধিকার দুর্বল হয়ে পড়বে। সঙ্গে বাস্তব একটি সমস্যা: বহু আদিবাসীর হাতে জমির কাগজ নেই, আর খাগড়াছড়ির ভূমি রেকর্ড অফিস পুড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
চুক্তির ক্রমটি ঠিক এ কারণেই — আগে বাস্তবায়ন ও পুনর্বাসন, তারপর জরিপ। ক্রমটি উল্টে গেলে জরিপ বিরোধ মেটানোর বদলে বিরোধের ফলাফলকে স্থায়ী করে ফেলতে পারে।
পুরো কাঠামোটির নিচের ভিতটি নিয়েই দুই দশক ধরে আদালতে লড়াই চলছে — এবং মামলাটির উৎপত্তি ভূমি নয়, শুল্ক।
রাঙামাটি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড ২০০০ সালের ১২ অক্টোবর কাস্টমস কমিশনারের একটি সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে রিট করে; সিদ্ধান্তটি ছিল অগ্রিম আয়কর ও ভ্যাট বাবদ আদায় করা ১,৭৭,২৯৬ টাকা ফেরত না দেওয়ার। কোম্পানির যুক্তি ছিল, ১৯০০ সালের রেগুলেশনের আওতায় এ অঞ্চলের শিল্প এসব চার্জ থেকে অব্যাহতি পায়। ১৩ মে ২০০৩ হাইকোর্ট বিভাগ রিটটি খারিজ করে এবং রায় দেয় যে রেগুলেশন ১৯০০ একটি “dead law” — মৃত আইন — এবং বাংলাদেশে প্রযোজ্য সব আইন পার্বত্য জেলাগুলোতেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ওয়াগাছড়া টি এস্টেট লিমিটেডের মামলাতেও অনুরূপ সিদ্ধান্ত আসে।
রাষ্ট্রপক্ষের আপিলে ২২ নভেম্বর ২০১৬ প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ ওই রায় বাতিল করে রেগুলেশনকে বৈধ ও কার্যকর ঘোষণা করে। নিউ এজ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী আপিল বিভাগ বলেছিল, হাইকোর্ট “সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে” যে দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তিতে সরকার আজও এ অঞ্চলের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রথাকে স্বীকৃতি দেয়। রায়টি প্রকাশিত হয় 69 DLR (AD) (2017) হিসেবে।
কিন্তু বিষয়টি সেখানে থামেনি। ২০১৮ সালে খাগড়াছড়ির দুই বাঙালি বাসিন্দা ওই দুটি রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন (সিভিল পিটিশন ৫৪/২০১৮ ও ১৯২/২০১৮)। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয় সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ রিভিউ আবেদনদুটি শোনার সময় বলেন, রেগুলেশন ১৯০০ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না তা আদালত আরও পরীক্ষা করবে; অ্যাটর্নি জেনারেল সময় চাইলে শুনানি মুলতবি হয়। রিভিউ আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এফ হাসান আরিফ ও মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরী।
পাহাড়ি পক্ষের ভাষ্য কী? হিল ভয়েসের ১৩ মে ২০২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯ মে ২০২৪-এ প্রধান বিচারপতিসহ আট বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে রিভিউ শুনানি হয় এবং অ্যাটর্নি জেনারেল ‘রাজা’ ও ‘আদিবাসী’ শব্দসহ অন্তত ১০টি বিধান বাদ দেওয়ার পক্ষে বক্তব্য দেন; আঞ্চলিক পরিষদের পক্ষে পক্ষভুক্তির আবেদন করা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রবীর নিয়োগীর বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্রপক্ষ রায়ের ৬৫টি অনুচ্ছেদের মধ্যে ৩৭টি বাদ দিতে বলেছে। হিল ভয়েস একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের সংবাদমাধ্যম; শুনানিকক্ষের এই বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। [যাচাই প্রয়োজন]
উদ্বেগটি কেবল একটি পক্ষের নয়। আন্তর্জাতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের কো-চেয়ারগণ — সুলতানা কামাল, এলসা স্তামাতোপুলু ও মিরনা কানিংহাম কেইন — স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রেগুলেশন অবৈধ ঘোষিত বা দুর্বল হলে তা ভূমি কমিশনের কাজ ও চুক্তি বাস্তবায়ন — দুটোকেই বিপন্ন করবে। ২৬ জুলাই ২০২৩-এ চাকমা সার্কেল চীফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ানসহ ৩২ জন নাগরিক প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি দেন।
রিভিউ আবেদনদুটির চূড়ান্ত পরিণতি কী হয়েছে, আমরা যেসব উৎস পড়তে পেরেছি তাতে তার নিষ্পত্তির খবর নেই — সর্বশেষ পঠিত তথ্য মে ২০২৪ পর্যন্ত। [যাচাই প্রয়োজন]
পার্বত্য চট্টগ্রামে বাইরের কেউ কি জমি কিনতে পারেন?
আইনি ইতিহাসটি স্তরে স্তরে সাজানো। ১৯২০ সালের সংশোধনী অনুযায়ী ইজারা কেবল পাহাড়িদের, ব্যতিক্রম শুধু গ্রামে প্রকৃত বসবাসকারী অ-পাহাড়ি কৃষক। ১৯৭১-এ রাজস্ব বোর্ডের অনুমোদনসাপেক্ষে বহিরাগতদের বন্দোবস্ত দেওয়ার পথ খোলে, আর ১৯৭৯-এ অ-আদিবাসীদের মালিকানা ও বসবাসের বিধিনিষেধ কার্যত উঠে যায়। তবে ১৯৯৭-এর চুক্তি ও পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো হস্তান্তর বৈধ নয়।
হেডম্যানের সুপারিশ ছাড়া দেওয়া বন্দোবস্ত কি বৈধ?
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী মৌজা প্রধানের সুপারিশ ও মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক — এটি ছাড়া মৌজাধীন কোনো জমি বন্দোবস্ত হতে পারে না। আর্কাইভে এমন একাধিক ঘটনা নথিভুক্ত আছে যেখানে হেডম্যান নিজেই জানিয়েছেন যে সংশ্লিষ্ট বন্দোবস্তে তাঁর কোনো সুপারিশ ছিল না।
ভূমি কমিশনে আবেদন করলে কী হয়?
আবেদন সাদা কাগজে বাংলায় লিখে কমিশনের কাছে জমা দিতে হয়; প্রতিপক্ষ হিসেবে জেলা প্রশাসক, অবৈধ বন্দোবস্ত গ্রহীতা ও বর্তমান দখলকারের নাম দিতে হয়। বাস্তবে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলোকে কমিশনের সচিব জানিয়েছিলেন, ২২ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়লেও একটিরও নিষ্পত্তি হয়নি — মূল কারণ, বিধিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
পাহাড়ে ভূমি জরিপ হয় না কেন?
১৯৮৪-র ভূমি-খতিয়ান অধ্যাদেশে জরিপ ও খতিয়ান প্রস্তুতের পূর্ণ কাঠামো আছে, কিন্তু পাহাড়ের বেশিরভাগ জমি আজও বিস্তারিতভাবে জরিপ হয়নি। ১৯৯৭-এর চুক্তি জরিপকে রেখেছে ক্রমের শেষে — আগে চুক্তি বাস্তবায়ন ও উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, তারপর আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করে জরিপ। ক্রম উল্টে গেলে জরিপ বর্তমান দখলকেই রেকর্ডে পরিণত করবে — এই আশঙ্কাই প্রতিরোধের মূল কারণ।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ আগস্ট ২০২৬
প্রসঙ্গ:পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি সমস্যা, পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১৯০০, ভূমি অধিকার, ভূমি কমিশন আইন, ভূমি বিরোধ
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।