Last updated Oct 19th, 2026

করুণাময় চাকমার ঠিকানা এখন বাঘাইছড়ির রূপকারী। নিজের গ্রাম কোথায় ছিল, তা তিনি বোঝান রাঙামাটির একটি মোটেলের অবস্থান দিয়ে: রাঙামাটির যে পর্যটন মোটেলটি আছে তার ঠিক পূর্ব দক্ষিণ বরাবর কাপ্তাই লেকের যে পানি দেখা যায় ঠিক সেইখানে পানির তলে ডুবে আছে আমাদের আসল ঝগড়াবিল আদাম।
কথাটি আছে আমাদের আর্কাইভে, তাঁর নিজের বয়ানে।
কাপ্তাই বাঁধ রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী নদীর ওপর মাটির তৈরি একটি বাঁধ, যার জলাধারই আজকের কাপ্তাই হ্রদ। পাকিস্তান আমলে মার্কিন অর্থসাহায্যে বাঁধটি তৈরি হয়; জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হয় 1962 সালে। প্রায় সব উৎসের হিসাবে এতে 54,000 একর আবাদি জমি ডুবে যায় এবং 18,000 পরিবারের প্রায় 1 লাখ মানুষ উচ্ছেদ হন, যাঁদের একাংশ পাহাড়ের অন্য জায়গায় আর একাংশ ভারতে চলে যান।
কিন্তু নির্মাণের সাল, হ্রদের আয়তন, ক্ষতিপূরণের হার আর ভারতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা উৎসভেদে আলাদা। এই পাতায় প্রতিটি সংখ্যা তার উৎসের নামসহ পাশাপাশি রাখা হয়েছে; কোনটি ঠিক, সে বিচার এখানে নেই। ডুবে যাওয়া গ্রামের মানুষের স্মৃতিকথা আমাদের আর্কাইভে আলাদা আলাদা লেখায় আছে। সেগুলো এখানে নতুন করে বলা হয়নি; বক্তার নিজের বাক্য হুবহু উদ্ধৃত হয়েছে, সঙ্গে মূল লেখার লিংক। অঞ্চলটির অন্য বিষয়ের জন্য দেখুন জুমজার্নালের পার্বত্য চট্টগ্রাম আর্কাইভ।
এই পাতায় যা আছে
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী কাপ্তাইয়ের জায়গাটি বাছা হয় 1952 সালের শুরুতে, নির্মাণ শেষ হয় 1961 সালের শেষে এবং 1962 সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। উইকিপিডিয়া নির্মাণকাল দেখায় 1957 থেকে 1962। অন্য উৎসে শুরুর সাল 1952, 1958 বা 1959 এবং শেষের সাল 1960, 1961 বা 1963 পাওয়া যায়।
জলবিদ্যুতের ভাবনাটি অনেক পুরনো। বাংলা উইকিপিডিয়া ও ইংরেজি উইকিপিডিয়ার বিবরণে প্রথম সমীক্ষা 1906 সালে, দ্বিতীয়টি 1923 সালে। 1946 সালে ই.এ. মুরের প্রতিবেদনে বাঁধের জায়গা প্রস্তাব করা হয় বরকলে, এখনকার জায়গা থেকে প্রায় 65 কিলোমিটার উজানে। 1950 সালে মার্জ রেনডাল ভ্যাটেন নামের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব করে চিলারডাক, প্রায় 45 কিলোমিটার উজানে। 1951 সালে সরকারি প্রকৌশলীরা প্রস্তাব করেন চিৎমরম; সে বছরই সেচ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী খাজা আজিমুদ্দিনের তত্ত্বাবধানে কাপ্তাই চূড়ান্ত হয়।
উজানের ওই প্রস্তাবের কথা স্মৃতিকথাতেও আছে। শুভলংয়ের পঞ্চ চাকমা বলেছেন, তাঁদের বাড়ির কাছেই বাঁধ হওয়ার কথা ছিল এবং তা হয়নি ভারতের আপত্তিতে: চিলকগোদাতে বাধ হলে সে বাঁধের পানিতে ভারতের অনেক এলাকা তলিয়ে যেতো।
বুদ্ধধন চাকমার মনে আছে সালটিও: আসলে ১৯৫৩ খ্রি. কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ হবার কথা ছিল অন্য একটা জায়গায়
। জায়গা বদলের কারণ হিসেবে ভারতের আপত্তির কথা সুলভ চাকমার একটি লেখাতেও আছে; পড়া বিশ্বকোষ-ভুক্তিগুলোতে কারণটি নেই।
| উৎস | নির্মাণ শুরু | শেষ / চালু |
|---|---|---|
| বাংলাপিডিয়া (কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র) | শুরুর সাল দেয়নি; স্থান নির্বাচন 1952-র শুরুতে, প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান নিযুক্ত 1952, দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান যোগ দেয় 1957 | 1961-র শেষে নির্মাণ শেষ; স্পিলওয়ে বন্ধ ও উৎপাদন শুরু 1962 |
| ইংরেজি উইকিপিডিয়া | 1957 | 1962 |
| বাংলা উইকিপিডিয়া | অক্টোবর 1957 | 1962 |
| International Rivers (2021) | 1957 | প্রায় 6 বছর লাগে |
| ইংরেজি উইকিপিডিয়া (Chakma people) | 1959 | 1963 |
| দ্য ডেইলি স্টার (Hana Shams Ahmed) | — | 1963 |
| শরদিন্দু শেখর চাকমা (আর্কাইভ) | 1952 | 1958-র প্রথম দিকে; পরে আবার নির্মাণ, শেষ 1961 |
| মানিক লাল দেওয়ান (আর্কাইভ, স্মৃতিকথা) | “সম্ভবত” 1958 | 1962 |
| উম্মে হাবিবা ইয়াছমিন (আর্কাইভ, গবেষণা-প্রবন্ধ) | 1958 | 1960 |
শরদিন্দু শেখর চাকমার বিবরণটি বাকিদের থেকে আলাদা। তাঁর লেখায় আছে, 1958 সালে সব স্পিলওয়ে বন্ধ করলে বাঁধটি ভেঙে যায় এবং আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন সাহায্যে আবার নির্মাণ হয়। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কথা অন্য কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি, তাই কথাটি এখানে কেবল তাঁর বিবরণ হিসেবেই রইল।
যাঁরা তখন সেখানে ছিলেন, তাঁদের কালপঞ্জি মানুষের জীবনের মাপে। মহেন্দ্র চাকমা নিজে বাঁধে কাজ করেছেন: ১৯৫৭ এবং ১৯৫৮ সাল এই দুই বছর আমি কাপ্তাই বাধে কাজ করেছি।
খবরটি তাঁদের গ্রামে পৌঁছায় আরও আগে: ১৯৫৪ সালের দিকে আমরা প্রথম জানতে পারি কাপ্তাই বাঁধের কথা।
করুণাময় চাকমার অনুমান, কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ শুরু হয় সম্ভবত ১৯৫০ সালের পর থেকে।
বাঁধটি তৈরি করে পাকিস্তান সরকার। প্রকৌশল ও নির্মাণের কাজ করে দুটি প্রতিষ্ঠান, ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি ও ইউতাহ ইন্টারন্যাশনাল ইনকর্পোরেট। উইকিপিডিয়ার হিসাবে অর্থ আসে পূর্ব পাকিস্তান সরকার, যুক্তরাষ্ট্র ও Overseas Economic Cooperation Fund থেকে; International Rivers ও দ্য ডেইলি স্টার মার্কিন সংস্থা USAID-এর নাম করেছে।
বাংলাপিডিয়ার বিবরণে ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি নিযুক্ত হয় 1952 সালে, ইউতাহ ইন্টারন্যাশনাল যোগ দেয় 1957 সালে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া শিকাগো ডেইলি নিউজের 1962 সালের একটি প্রতিবেদন উদ্ধৃত করেছে, যেখানে প্রকল্পটিকে 10 কোটি ডলারের বহুমুখী বাঁধ এবং এ অঞ্চলে মার্কিন সাহায্যের প্রথম বড় সাফল্য বলা হয়।
খরচের হিসাব দুই রকম। ইংরেজি উইকিপিডিয়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রে লিখেছে, প্রথম দুই ইউনিট ও তৃতীয় ইউনিটের একাংশে খরচ হয় 50.3 কোটি রুপি আর সম্প্রসারণে 190 কোটি টাকা। বাংলা উইকিপিডিয়া বলছে, প্রাথমিক বাজেট ছিল প্রায় 25 কোটি 40 লাখ টাকা, পরে তা 48 কোটি ছাড়িয়ে যায়।
শ্রমিক কারা ছিলেন, সে কথা মহেন্দ্র চাকমার মুখে: কাপ্তাই বাঁধে শ্রমিক হিসাবে ছিল মূলত বাঙালিরা।
শরদিন্দু শেখর চাকমাও লিখেছেন, বাঁধ, জঙ্গল পরিষ্কার ও পুনর্বাসনের কাজে তখন হাজার হাজার শ্রমিক, ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে আসেন। প্রকল্পটির সরকারি নাম, তনয় দেওয়ানের লেখা অনুযায়ী, ছিল “কর্ণফুলী মাল্টি পারপাস হাইডেল প্রজেক্ট”।
বাংলাপিডিয়ার মাপে কাপ্তাই বাঁধ 670.6 মিটার লম্বা ও 45.7 মিটার উঁচু একটি মাটির বাঁধ, যার স্পিলওয়েতে 16টি গেট। কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ইউনিট পাঁচটি: 40 মেগাওয়াটের দুটি ও 50 মেগাওয়াটের তিনটি, মোট 230 মেগাওয়াট। উইকিপিডিয়া একে বাংলাদেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বলেছে।
| বিষয় | মাপ | উৎস ও অমিল |
|---|---|---|
| দৈর্ঘ্য | 670.6 মিটার | বাংলাপিডিয়া; International Rivers লিখেছে প্রায় 666 মিটার |
| উচ্চতা | 45.7 মিটার | বাংলাপিডিয়া; International Rivers লিখেছে প্রায় 43 মিটার |
| চূড়ার প্রস্থ | 7.6 মিটার | বাংলাপিডিয়া |
| ভিত্তির প্রস্থ | 45.7 মিটার | বাংলাপিডিয়া; বাংলা উইকিপিডিয়ার মূল পাঠে 457 মিটার, তথ্যছকে 45.7 মিটার |
| স্পিলওয়ে | 16টি গেট | ক্ষমতা 6,25,000 কিউসেক (বাংলাপিডিয়া); সেকেন্ডে 16,000 ঘনমিটার (উইকিপিডিয়া) |
| ইউনিট 1 ও 2 | 2 × 40 মেগাওয়াট | 1962 (বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া) |
| ইউনিট 3 | 50 মেগাওয়াট | জানুয়ারি 1982 (বাংলাপিডিয়া); আগস্ট 1982 (উইকিপিডিয়া) |
| ইউনিট 4 ও 5 | 2 × 50 মেগাওয়াট | 1988 (বাংলাপিডিয়া); অক্টোবর 1988 (উইকিপিডিয়া) |
| মোট ক্ষমতা | 230 মেগাওয়াট | বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া; International Rivers লিখেছে প্রায় 239 মেগাওয়াট |
1982 সালের আগে পর্যন্ত জেনারেটর ছিল দুটিই। তার একটি সাক্ষ্য জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণীতে আছে। 3 জুলাই 1973 তারিখে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জানতে চান, কর্ণফুলী প্রকল্পে কয়টি জেনারেটর চালু আছে আর বিদ্যুৎ বিক্রি করে বছরে কত টাকা আয় হয়। মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদের উত্তর ছিল (ক) দুইটি।
আয়ের প্রশ্নে তিনি জানান, বিদ্যুৎ গ্রিড লাইনে যায় বলে আলাদা হিসাব রাখা হয় না। একই দিনে লারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন গ্রাম আজ পর্যন্ত বৈদ্যুতিকরণ করা হয় নাই।
পুরো প্রশ্নোত্তর আছে সংসদ-বিতর্কের ওই পাতায়।
আবাদি জমির হিসাবে উৎসগুলো প্রায় একমত: 54,000 একর, বাংলাপিডিয়ার এককে 21,870 হেক্টর। এটিকে তখনকার পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট আবাদি জমির প্রায় 40 শতাংশ বলা হয়। হ্রদের মোট আয়তন নিয়ে মিল নেই; উৎসভেদে তা 254 বর্গমাইল থেকে 400 বর্গমাইল, অর্থাৎ প্রায় 655 থেকে 1,036 বর্গকিলোমিটার।
| উৎস | হ্রদ বা ডুবে যাওয়া এলাকা | আবাদি জমি |
|---|---|---|
| বাংলাপিডিয়া (কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র) | 33 মিটার জলস্তরে 777 বর্গকিমি; প্রকল্প-দলিলে প্রায় 665 বর্গকিমি | 21,870 হেক্টর |
| বাংলাপিডিয়া (কাপ্তাই হ্রদ) | 58,300 হেক্টর | — |
| বাংলাপিডিয়া (পার্বত্য চট্টগ্রাম) | শুষ্ক মৌসুমে প্রায় 767, বর্ষায় প্রায় 1,036 বর্গকিমি | — |
| ইংরেজি ও বাংলা উইকিপিডিয়া | মূল পাঠে 655 বর্গকিমি (253 বর্গমাইল); তথ্যছকে 777 বর্গকিমি | 220 বর্গকিমি, এলাকার আবাদি জমির 40% |
| International Rivers | এক জায়গায় 1,306 বর্গকিমি, অন্য জায়গায় 655 বর্গকিমি | উর্বর জমির 40% |
| শরদিন্দু শেখর চাকমা (আর্কাইভ) | বলা হয়েছিল 250 বর্গমাইল; ডোবে 350; বর্ষায় 400 বর্গমাইল | 54 হাজার একর, জেলার কৃষিজমির প্রায় 40% |
| মিশুক চাকমা (আর্কাইভ) | 254 বর্গমাইল; এর মধ্যে সংরক্ষিত বন 22.34 ও অশ্রেণীভুক্ত বন 234 বর্গমাইল | — |
| তনয় দেওয়ান (আর্কাইভ) | 256 বর্গমাইল (1,46,840 একর); সংরক্ষিত বন 20 ও অশ্রেণীভুক্ত বন 234 বর্গমাইল | 54,000 একর, মোট ধান্যজমির 40% |
| মঙ্গল কুমার চাকমা ও হিরণ মিত্র চাকমা (আর্কাইভ) | প্রায় 350 বর্গমাইল | এক জায়গায় “প্রথম শ্রেণীর 54% জমি”, অন্য জায়গায় 40% আবাদি জমি |
| এডিসন চাকমা (আর্কাইভ) | — | 54 হাজার একর, মোট চাষযোগ্য জমির 54.06% |
| জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা (আর্কাইভ, “সরকারী হিসাব মতে”) | — | 54 হাজার একর, মোট কৃষিজমির 40% |
| দ্য ডেইলি স্টার (13 নভেম্বর 2020-এর কলাম) | — | অন্তত 54,000 একর |
ছকটি পড়ার সময় দুটি কথা মনে রাখা দরকার। এক, 54,000 একর, 21,870 হেক্টর আর 220 বর্গকিলোমিটার প্রায় একই পরিমাণ, তিন এককে লেখা। দুই, 253 বর্গমাইল মানে 655 বর্গকিলোমিটার, আর 400 বর্গমাইল মানে প্রায় 1,036 বর্গকিলোমিটার; অর্থাৎ ছোট সংখ্যাগুলো প্রকল্প-দলিলের মাপের কাছাকাছি, বড়গুলো বর্ষার মাপের কাছাকাছি। হ্রদের জলস্তর যে ঋতুভেদে ওঠানামা করে, তা লারমার 1973 সালের সংসদ-প্রশ্নেও আছে: বর্ষায় 100 ফুটের ওপরে, পরে 85 থেকে 90 ফুট।
মৌজার হিসাবও আছে। শরদিন্দু শেখর চাকমা লিখেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের 369টি মৌজার মধ্যে 125টি পানির নিচে যায়; International Rivers-ও 125টি মৌজার কথা বলেছে। আগে থেকে যা বলা হয়েছিল, পানি উঠেছে তার চেয়ে বেশি, এ কথা শরদিন্দু শেখর চাকমার লেখায় যেমন আছে, তেমনি আছে বুদ্ধধন চাকমার স্মৃতিতে: কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গেল সরকারের হিসাবের চেয়েও বেশি জায়গা বাঁধের পানিতে তলিয়ে গেছে।
কাপ্তাই হ্রদের গভীরতা বাংলাপিডিয়ার হ্রদ-ভুক্তি অনুযায়ী গড়ে 9 মিটার, সর্বোচ্চ 32 মিটার।
ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে, বাঁধের পানিতে পুরনো রাঙ্গামাটি শহর ডুবে যায়; International Rivers লিখেছে চাকমা রাজপ্রাসাদের কথা। এর বাইরে কোন গ্রাম, কোন মৌজা ডুবেছে, তার বিবরণ বিশ্বকোষে নেই। সে তালিকা আছে আমাদের আর্কাইভের লেখকদের কাছে, যাঁদের অনেকে জায়গাগুলো নিজে দেখেছেন।
পুরনো রাঙ্গামাটি। মানিক লাল দেওয়ান তাঁর কিশোরকালের স্মৃতিতে আপার ও লোয়ার রাঙ্গামাটির বর্ণনা দিয়েছেন: লোয়ার রাঙ্গামাটিতে ছিল জেলা প্রশাসকের অফিস, ডাকঘর, থানা, হাসপাতাল, বাজার, কালী মন্দির ও মসজিদ। তারাচরন চাকমার দীর্ঘ লেখায় শহরটির পত্তনের সাল 1870। তাঁর বাক্য: পুরাতন রাঙ্গামাটি শহরও জলমগ্ন হয়।
শরদিন্দু শেখর চাকমা জানাচ্ছেন, আজকের রিজার্ভ বাজার বাঁধের আগে সংরক্ষিত বন ছিল; নামটি সেখান থেকেই।
চাকমা রাজবাড়ি। মানিক লাল দেওয়ান লিখেছেন, ১৯৬১ সালে কাপ্তাই হ্রদের জলে এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ি নিমজ্জিত হয়।
যাঁরা ভেতরে গিয়েছেন তাঁদের স্মৃতি আলাদা আলাদা টুকরো। পঞ্চ চাকমা: গেট দিয়ে ঢুকার পরই দুইটা বড় সিংহমূর্তি ছিল।
অরুণ কুমার দেওয়ান: রাজবাড়ি গেছি অনেকবার। বিশাল রাজঘর। দোতলা ছিল। নাটঘর ছিল, পাকা বাড়ি কিন্তু টিনের চালের।
গ্রাম ও মৌজা। তারাচরন চাকমা কাচালং, চেঙ্গী, কর্ণফুলী, বরকল ও সুবলং উপত্যকা ধরে ডুবে যাওয়া গ্রামের দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন; সেটি তাঁর লেখাতেই পড়া ভালো। ইলিরা দেওয়ানের লেখায় নাম আছে গোলাছড়ি, বড়াদম, মগবান, ঝগড়াবিল, বালুখালি ও মাওরুমের। স্মৃতিকথার বক্তারা নিজেদের গ্রামের নাম বলেছেন: ঝগড়াবিল, মাইচছড়ি, মুরঘোনা, কেরেঙাছড়ি, উগলছড়ি, বুড়িঘাট, বড়াদাম। কে কোন গ্রামের, তা নিচে স্মৃতিকথার ছকে আছে।
তঞ্চঙ্গ্যা মৌজা। ডুবে যাওয়া সব জায়গা চাকমা-অধ্যুষিত ছিল না। বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা তঞ্চঙ্গ্যা জাতি নিয়ে তাঁর লেখায় রাইংখ্যং নদীর অববাহিকার দশটি মৌজার নাম করেছেন যেগুলো জলমগ্ন হয়, তার মধ্যে কুতুবদিয়া, বিলাইছড়ি, বল্লালছড়া ও কেঙড়াছড়ি। করুণাময় চাকমার ঝগড়াবিলেও, তাঁর বয়ানে, চাকমাদের পাশাপাশি মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও একশর বেশি বাঙালি পরিবার থাকত।
বরকল জলপ্রপাত। সুলভ চাকমার বরকল নিয়ে লেখায় সুনীতি ভূষণ কানুনগোর বই থেকে উদ্ধৃতি আছে: জলপ্রপাতটি একসময় বাংলা প্রদেশের বৃহত্তম ছিল, এখন কাপ্তাই জলাধারে নিমজ্জিত।
বাংলাপিডিয়ার হিসাবে স্পিলওয়ে বন্ধ হয় 1962 সালে এবং সে বছরের বর্ষায় জলাধার নকশার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছায়। স্মৃতিকথাগুলোতে পানি আসে তার আগেই, কোথাও 1959 সালের কাছাকাছি, কোথাও 1960 বা 1961 সালে, আর এক বারে নয়, কয়েক বর্ষা ধরে। তারও আগে আসে করাত।
গাছ কাটার কথা প্রায় সব বক্তাই বলেছেন। কারণটি মহেন্দ্র চাকমার মুখে, যিনি নিজে এ কাজে ছিলেন: কেটে ফেলার কারণ ছিল পানি হয়ে যাবার পর যাতে নৌকা লঞ্চ চলাচলে বাধাগ্রস্ত না হয়।
তাঁর হিসাবে, গাছ কাটিং হয়েছিল ১৯৫৯ সালের দিকে।
অরুণ কুমার দেওয়ানের মনে আছে ব্যবধানটি: গাছ কাটিং হবার পরও পানি হতে বছর খানেক সময় লেগেছিল।
পঞ্চ চাকমার কাছে এটিই ছিল প্রথম প্রমাণ যে খবরটি সত্যি: গাছ কাটিংটা ছিল আমাদের জন্য একটা সিগনাল।
পানি ওঠার বর্ণনা এক এক জায়গায় এক এক রকম। পঞ্চ চাকমা সাল নিয়ে নিশ্চিত নন: তবে ১৯৬০ বা ৬১ দিকে হবে। তবে বাঁধের পানি একেবারে আসার আগে তার আগের দুই/তিন বছর বর্ষার সময় পানি ওঠেছিল।
আনন্দ মুখি চাকমা: আমার আজো মনে আছে প্রথমে একবার পানি এলো আবার পানি নেমে গেল।
প্রিয়বালা চাকমার বুড়িঘাটে পানি আসে এক রাতে: একদিন রাত শেষে সকালে উঠেই দেখলাম চারিদিকে পানি আর পানি।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বড় বোন জ্যোতিপ্রভা লারমা তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন: কাপ্তাই বাঁধের দরজা বন্ধ করার সাথে সাথে দেখতে দেখতে বাঁধের পানি গ্রামের পর গ্রাম গ্রাস করে নিচ্ছে।
অনেকে পানি আসার আগেই গ্রাম ছেড়েছিলেন। করুণাময় চাকমা, মহেন্দ্র চাকমা, বুদ্ধধন চাকমা, অরুণ কুমার দেওয়ান ও প্রতিমা দেওয়ান, প্রত্যেকে নিজের লেখায় সে কথা বলেছেন। আবার কেউ কেউ পাশের উঁচু টিলায় ঘর তুলে আরও কয়েক বছর থেকে গিয়েছেন, যেমন পঞ্চ চাকমার পরিবার। ঘটনাগুলোর বিস্তার তাঁদের নিজেদের লেখায়; এখানে কেবল সময়ের দাগগুলো তোলা হলো।
সবচেয়ে বেশি উৎসে যে সংখ্যা পাওয়া যায়: 18,000 পরিবার, প্রায় 1 লাখ মানুষ। বাংলাপিডিয়া 18,000 পরিবারের কথা বলেছে; উইকিপিডিয়া, International Rivers, দ্য ডেইলি স্টার এবং আমাদের আর্কাইভের শরদিন্দু শেখর চাকমা প্রায় 1 লাখ মানুষের কথা। 1972 সালের একটি স্মারকলিপিতে সংখ্যাটি 99,977।
| উৎস | উচ্ছেদ হওয়া মানুষ | বাড়তি তথ্য |
|---|---|---|
| বাংলাপিডিয়া | আনুমানিক 18,000 পরিবার | মানুষের সংখ্যা দেয়নি |
| ইংরেজি ও বাংলা উইকিপিডিয়া | 18,000 পরিবার, 1,00,000 মানুষ | 70% চাকমা (ইংরেজি পাতা) |
| International Rivers | 1,00,000-এর বেশি; 18,000 ঘর ডোবে | 70% চাকমা; অঞ্চলের জনসংখ্যার প্রায় 25% |
| শরদিন্দু শেখর চাকমা (আর্কাইভ) | 18 হাজার পরিবার, প্রায় 1 লাখ | তখনকার প্রায় 3 লাখ জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ; 10 হাজার পরিবার কৃষিজমির মালিক, বাকিরা জুমচাষি |
| জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা (আর্কাইভ) | 18 হাজার পরিবার, 1,00,000 | “সরকারী হিসাব মতে” |
| 1972 সালের স্মারকলিপি (আর্কাইভে পুনর্মুদ্রিত); এডিসন চাকমা | 99,977 জন | সাল দেওয়া 1960 |
| দ্য ডেইলি স্টার (Hana Shams Ahmed) | প্রায় 1,00,000 | বেশির ভাগ চাকমা |
অনুপাতের হিসাবে তাই দুই রকম কথা আছে: শরদিন্দু শেখর চাকমার লেখায় জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ, International Rivers-এ প্রায় 25 শতাংশ। 99,977 সংখ্যাটি পাওয়া যায় সংবিধান প্রণয়নের সময় দেওয়া স্মারকলিপির পাঠে, যা তিনটি ঐতিহাসিক দলিল নিয়ে লেখায় পুনর্মুদ্রিত।
চাকমা ছাড়া আর কারা? বাইরের উৎসগুলো কেবল বলে, উচ্ছেদ হওয়াদের 70 শতাংশ চাকমা। বাকিদের পরিচয় আর্কাইভের লেখা থেকে খানিকটা মেলে। সুষমা বালা চাকমাকে নিয়ে লেখায় বর্ণনাকারীর বাক্য: সঙ্গে কিছু হাজং, মার্মা আর কিছু পুরাতন বাঙালি অধিবাসীরাও তাদের সবকিছু হারিয়েছেন।
বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা লিখেছেন তঞ্চঙ্গ্যাদের কথা। মানিক লাল দেওয়ান তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, চাকমাদের পরে ক্ষতিগ্রস্ত হন সমতল জমিতে চাকমাদের পাশাপাশি চাষ করা আদি বাঙালি মুসলমানেরা। করুণাময় চাকমা নিজের গ্রামের কথা বলেছেন এভাবে: আমাদের গ্রামের মারমাদের একটা অংশ গেছে মাটিরাঙ্গায় আর একটা অংশ বান্দরবানে। আর আমার বাঙালি প্রতিবেশীরা ফিরে যায় তাদের পুরাতন গ্রামে ক্ষতিপূরণ নিয়ে।
জনগোষ্ঠী ধরে আলাদা কোনো গণনা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
এ প্রশ্নে উৎসগুলো দুই ভাগ। বাংলাপিডিয়া বলছে, ক্ষতিপূরণ বাবদ 4 কোটি 15 লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল, তবে সবাই প্রাপ্য নগদ পাননি। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার একটি বাক্যে আছে, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি; International Rivers লিখেছে, প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ কখনো দেওয়া হয়নি। স্মৃতিকথার বক্তাদের বেশির ভাগ বলেছেন, টাকা পেয়েছেন, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না।
বাংলাপিডিয়ার ব্যাখ্যায়, হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়াল অনুযায়ী এলাকার জমি ছিল রাষ্ট্রের সম্পত্তি, বাসিন্দারা আইনত মালিক ছিলেন না; তবু সরকার “মানবিক কারণে” ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দেয়। দ্য ডেইলি স্টারের একটি লেখায় বলা হয়েছে, জমির প্রতিশ্রুতি বাস্তব হয়নি, যাঁরা জমি পেয়েছেন তাঁরা পেয়েছেন আগের জমির ভগ্নাংশ। ভূমির এই আইনি কাঠামো আলাদা লেখায় আছে: পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি: 1900 সালের রেগুলেশন থেকে ভূমি কমিশন।
শরদিন্দু শেখর চাকমা 1964 সালে রাঙ্গামাটিতে বদলি হয়ে আসা সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর ভাষায় ক্ষতিগ্রস্তদের খুবই নাম মাত্র ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়
; জুমিয়ারা জুমের জন্য কিছু পাননি, আর 1964 সালেও অনেকে প্রাপ্য টাকা পাননি। তিনি 1970 সালের একটি সাময়িকীর প্রতিবেদনের বরাতে লিখেছেন, বরাদ্দ ছিল 5 কোটি 10 লাখ মার্কিন ডলার, খরচ হয় 26 লাখ ডলার। এই অঙ্ক বাংলাপিডিয়ার বরাদ্দের অঙ্কের সঙ্গে মেলে না; মূল প্রতিবেদনটি পাওয়া যায়নি, তাই অঙ্ক দুটি কেবল তাঁর লেখার বরাতেই রইল।
একরপ্রতি হার তিনটি লেখায় তিন রকম।
| কে বলেছেন | প্রথম শ্রেণির জমি (একর) | দ্বিতীয় শ্রেণি | তৃতীয় শ্রেণি | অন্যান্য |
|---|---|---|---|---|
| শরদিন্দু শেখর চাকমা (কর্মকর্তা, বইয়ে) | 600 টাকা | 400 টাকা | 200 টাকা | বসতবাড়ি পরিবারপিছু গড়ে 500 টাকা; ফলবান গাছ 10 টাকা; অফলবান গাছ 5 টাকা |
| করুণাময় চাকমা (ঝগড়াবিল) | 900 টাকা | 600 টাকা | 300 টাকা | পথখরচ 11 টাকা |
| অরুণ কুমার দেওয়ান (মুরঘোনা) | 300 টাকা | 200 টাকা | 100 টাকা | কলাগাছ 4 আনা |
বক্তাদের নিজের বাক্যে হারগুলো এ রকম। করুণাময় চাকমা: ১ম শ্রেণির জমির ক্ষতিপূরণের দাম হচ্ছে ৯০০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণির জমির দাম ৬০০ টাকা আর তৃতীয় শ্রেণির দাম ৩০০ টাকা।
অরুণ কুমার দেওয়ান, যিনি নিজেই বলেছেন যতদূর মনে পড়ে: ১ম শ্রেণির একরে ৩০০ টাকা, ২য় শ্রেণি একরে ২০০ টাকা এবং ৩য় শ্রেণি একরে ১০০ টাকা।
এবং একটা কলা গাছের দাম পেয়েছিলাম ৪ আনা।
টাকা হাতে পাওয়ার কথা বলেছেন কয়েকজন। পঞ্চ চাকমা: আমার মনে আছে তখনকার দিনে আমার বাবা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন ষাট (৬০) হাজার টাকা।
বুদ্ধধন চাকমা: যদ্দুর মনে আছে, তখনকার সময়ে আমার আজু এবং বাবা আমাদের জায়গাজমির ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা হাতে পেয়েছিলেন।
আনন্দ মুখি চাকমা: জমি জিরাতের জন্য টাকা পেয়েছি। কিন্তু টাকা দিয়ে কি সবকিছু পূরণ হয় বলো।
সবাই পেয়েছেন কি না, সে সন্দেহও তাঁদেরই। বুদ্ধধন চাকমা: আমি এখনো সন্দিহান বাঁধের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত সকল জায়গার মালিকরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিল কিনা।
মহেন্দ্র চাকমা: আমি যতটুকু জানি, ডুবে যাওয়া জায়গা জমির ক্ষতিপূরণ অনেকে পেয়েছে আবার অনেকে পায়নি। তবে লাভবান হয়েছে ধূর্ত বা চালাক ব্যক্তিরাই।
জুরাছড়ির প্রিয় কুমার চাকমা চিজির লেখায় নগদ ক্ষতিপূরণের কথা নেই, আছে ঋণের কথা: প্রতি পরিবারকে দেয়া হয় ৩০০-৫০০ টাকা কৃষিঋণ বাবদ।
পঞ্চ চাকমার প্রশ্নটি সব হিসাবের বাইরে: কিন্তু ক্ষতিপূরণ দিয়ে কি সব ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায়?
টাকার বাইরে একটি প্রতিশ্রুতির কথাও আছে। করুণাময় চাকমা জানিয়েছেন, তাঁদের বলা হয়েছিল এই বাঁধ থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে সে বিদ্যুতের আলো আমরা বিনা পয়সায় আজীবন ভোগ করতে পারবো।
তাঁর রায়: পাকিস্তান সরকার আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে।
বেশির ভাগ পরিবার পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতরেই সরে যায়: কাচালং বা কাসালং সংরক্ষিত বন খুলে দেওয়া এলাকায় (আজকের বাঘাইছড়ি ও মারিশ্যা), রাইংখ্যং ও সুবলংয়ের বনে, খাগড়াছড়ি, দীঘিনালা, রামগড়, রাজস্থলী ও বান্দরবানে। কত পরিবার কত জমি পেয়েছে, তার দুটি আলাদা হিসাব আর্কাইভে আছে।
| উৎস | পুনর্বাসনের হিসাব |
|---|---|
| শরদিন্দু শেখর চাকমা | কাসালং সংরক্ষিত বন অবমুক্ত করে প্রায় 10 হাজার একর, তাতে 3,734 পরিবার; রামগড় ও বান্দরবান মহকুমায় 11,322 একর “খাস” জমি; 8 হাজার জুমিয়া পরিবার ও আরও কয়েক হাজার চাষি পরিবারের পুনর্বাসন হয়নি |
| জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা | 7,398 পরিবারকে 20,231 একর কৃষিজমি; 7,676 জুমিয়া পরিবারকে হ্রদ এলাকায় 12,615 একর পাহাড়ি জমি; বাকি 2,926 পরিবারের কিছুকে 800 একর অসমতল জমি, বাকিদের মাছ ধরার সরঞ্জাম |
| তনয় দেওয়ান | প্রায় 3,000 পরিবার পুনর্বাসন পায়, 15 হাজার পরিবার বঞ্চিত |
শরদিন্দু শেখর চাকমার বক্তব্য, রামগড় ও বান্দরবানের ওই “খাস” জমি আসলে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের আবাদি কিন্তু বন্দোবস্তহীন জমি ছিল; ফলে যাঁদের ঘর ডোবেনি তাঁরাও জমি হারান। তাঁর আরেকটি বক্তব্য, কাসালংয়ের সর্বোৎকৃষ্ট জমি দেওয়া হয় ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি পরিবারগুলোকে। এ দুটি তাঁর দাবি; অন্য উৎসে মেলানো যায়নি। জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমার অঙ্কগুলো আছে চাষযোগ্য জমি ও জনসংখ্যা নিয়ে তাঁর লেখায়।
নিয়মটি কেমন ছিল, করুণাময় চাকমা মনে রেখেছেন। গ্রামে বিলি করা ফরমে গন্তব্য বাছতে হতো: ফরমে ১ম চয়েস হিসাবে কাজলং রিজাভ ফরেস্ট আর ২য় চয়েস খাগড়াছড়ি এলাকার নাম ছিল।
জমির মাপ: প্রতি ১ জনে ১ একর। তবে প্রত্যেক পরিবার মাত্র সর্বোচ্চ ১০ (দশ) একর করে জমি পাবে।
শরদিন্দু শেখর চাকমাও লিখেছেন, বেশি পরিবারকে জায়গা দিতে পরিবারপিছু বন্দোবস্তের সীমা 25 একর থেকে কমিয়ে 10 একর করা হয়। অরুণ কুমার দেওয়ানের হিসাব: ডুবে যাওয়া গ্রামে আমাদের ৭০০ একরের মতো জমি থাকলেও আমরা এখানে এসে জায়গা পেয়েছি মাত্র জনপ্রতি এক একর।
সুষমা বালা চাকমা: কিন্তু কী জানো, এতকিছুর পরও আমরা ভালো জায়গা পাইনি। খুব কম জায়গা পেয়েছি।
সরকারি নৌকার কথাও তাঁর মনে আছে: তখন পাকিস্তান সরকার কাপ্তাই বাঁধে ডুবে যাবে এমন এলাকার লোকদের নতুন জায়গায় যাবার জন্য বড় বড় নৌকা ভাড়া করে দিয়েছিল।
নতুন জায়গা ছিল জঙ্গল। সেখানে কী ঘটেছিল, করুণাময় চাকমার একটি বাক্যে: কলেরা, ম্যালেরিয়া আর পেটের অসুখ আরো কত রোগশোকে ভুগে কত জন যে মারা গেছে তখন সে হিসাব আমরা কেউ রাখিনি।
সাফ করা জমিরও একাংশ টেকেনি: আমরা যে নতুন জায়গাকে কেটেকুটে সাফ করে বসবাসের যোগ্য করেছি সেসব জমি কয়েক বছরের মধ্যে ডুবে যায় কাজলং নদীর পানিতে।
অন্য জনগোষ্ঠীর গন্তব্য আলাদা লেখায় আছে। মিশুক চাকমা: পরে এই সব উদ্বাস্তু জুম্মরা কাচালং, রেংখং, সুভলং সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে।
বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা: এই সব মৌজায় বসবাসরত তঞ্চঙ্গ্যাদের রাইংখং সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করে।
তিনি আরও লিখেছেন, অনেকে রাজস্থলী, বান্দরবান, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদমে বসতি করেন। তারাচরন চাকমা বিলাইছড়ি এলাকা নিয়ে: বাঁধে আক্রান্ত অধিকাংশ লোকজনকে রাজস্থলি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে স্থানান্থরিত করা হয়।
বিলাইছড়ির দুর্গম বড়থলি নিয়ে প্রতাঙ চাকমার ভ্রমণ-লেখায় আছে: তবে ত্রিপুরা এবং মারমারা ১৯৬০ সালের পর এখানে এসে বসতি করে।
খাগড়াছড়ির দিকে যাঁরা গিয়েছেন তাঁরা অনেকে নিজের টাকায় জমি কিনেছেন, যেমন অরুণ কুমার দেওয়ান ও পঞ্চ চাকমার পরিবার। মহালছড়ি এলাকার একটি গ্রাম নিয়ে এ.বি. চাকমা ছদ্মনামের এক লেখকের অনূদিত স্মৃতিকথায় আছে: কাপ্তাই বাঁধের কারণে উদ্বাস্তুদের সংখ্যাই সেখানে বেশি ছিল।
ওই লেখার পাদটীকায় বলা আছে, সব নাম ও তারিখ বদলে দেওয়া।
কেউ কেউ বার্মার দিকেও যান। International Rivers লিখেছে, প্রায় 20,000 মানুষ বার্মায় গিয়ে থাকতে পারেন। আর্কাইভে এর একটি পারিবারিক সাক্ষ্য আছে। কং চাই তাঁর লেখায় জানিয়েছেন, তাঁর নানাদের মারমা পরিবার তখন আরাকানে চলে গিয়েছিল: ঐসময় সম্পদ-ভিটে হারা মানুষজন শুধু ভারতে পালিয়ে যায়নি, বার্মাতেও গেছে।
বাঁধের পর ভারতে চলে যাওয়াকে চাকমারা বড়পরং বা বর-পরং বলেন। শব্দটির মানে একজন যাত্রীর মুখে: নেফায় আসাটা আমরা বর-পরং বলি, মানে অনেক দূরে বসতি করা।
কতজন গিয়েছিলেন, তা নিয়ে সংখ্যা 40,000 থেকে 80,000 পর্যন্ত; বেশির ভাগ বক্তা যাত্রার সাল বলেছেন 1964।
| উৎস | ভারতে যাওয়া মানুষ |
|---|---|
| শরদিন্দু শেখর চাকমা (আর্কাইভ) | 40 হাজারের বেশি; প্রায় সবাই অরুণাচলে, কিছু ত্রিপুরা ও আসামে |
| ইংরেজি ও বাংলা উইকিপিডিয়া (কাপ্তাই বাঁধ) | 40,000-এর বেশি চাকমা |
| দ্য ডেইলি স্টার | প্রায় 40,000 চাকমা অরুণাচলে |
| International Rivers | প্রায় 40,000 জন ত্রিপুরা, আসাম ও অরুণাচলে; আরও প্রায় 20,000 সম্ভবত বার্মায় |
| ইংরেজি উইকিপিডিয়া (Chakma people) | উচ্ছেদ হওয়াদের প্রায় 40%; বাকি প্রায় 60% দেশে পুনর্বাসিত |
| মানিক লাল দেওয়ান (আর্কাইভ) | প্রায় 50 হাজার চাকমা |
| সুষমা বালা চাকমাকে নিয়ে লেখার বর্ণনাকারী (আর্কাইভ) | অর্ধলক্ষাধিক চাকমা, হাজং ও কিছু ত্রিপুরা |
| স্নেহ কুমার চাকমা; তারাচরন চাকমা (আর্কাইভ) | 60 হাজার |
| এডিসন চাকমা (আর্কাইভ) | 80 হাজার, ভারত ও বার্মা মিলিয়ে |
সংখ্যাগুলোর পেছনের বাক্য এ রকম। স্নেহ কুমার চাকমা, যিনি নিজে একটি দলের নেতা ছিলেন: সব মিলিয়ে ৬০,০০০ (ষাট হাজার) চাকমা ভারতে শরণার্থী হয়েছিল।
তারাচরন চাকমা: এই বাঁধের ফলে উচ্ছেদ হওয়া দূর্ভাগ্যপীড়িত ৬০ হাজার আদিবাসী চাকমা জনগোষ্ঠী ছিন্নমূল অবস্থায় ভারতে দেশান্তরিত হয়। ইহা ছিল ১৯৬৩-৬৪ সালের ঘটনা।
মানিক লাল দেওয়ান: এক পর্যায়ে প্রায় ৫০ হাজার চাকমা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে চলে যায়।
শরদিন্দু শেখর চাকমা: ৪০ হাজারের অধিক জুম্ম আদিবাসী ভারতে চলে যায়
।
আর্কাইভের যে বক্তারা ভারতে গিয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগ গিয়েছেন পুনর্বাসনের জায়গা থেকে, সেখানে কয়েক বছর থাকার পর। আনন্দ মুখি চাকমা: এই রিজার্ভে তিন বছর তো থাকলাম কিন্তু কিছুই হলো না আমাদের।
করুণাময় চাকমা নিজে যাননি, তবে কারণটি বলেছেন: ৬১ থেকে ৬৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ বর-পরং-এ চলে যায়। চলে যাওয়ার তখন অন্যতম কারণ ছিল, প্রয়োজন অনুযায়ী জায়গা-জমি ভাগ না পাওয়া।
শরদিন্দু শেখর চাকমা আরেকটি কারণ যোগ করেছেন: 1964 সালের শুরুর দাঙ্গা, যা তাঁর বিবরণে নতুন বসতির এলাকা মারিশ্যাতেও পৌঁছায়। সে ব্যাখ্যা তাঁর লেখায় এবং নিঝুম তালুকদারের “কাপ্তাই বাঁধ ও বড়পরং” লেখায় বিস্তারিত আছে; এখানে তার পুনরাবৃত্তি নেই। প্রিয় কুমার চাকমা চিজি জুরাছড়ির স্মৃতিতে বড়পরং শব্দটি ব্যবহার করেছেন আরও আগের, গাছ কাটার সময়ের দেশত্যাগ বোঝাতেও।
পথের বর্ণনা যাত্রীদের লেখায় বিস্তারিত; এখানে কেবল যে নাম ও সংখ্যা তাঁরা নিজেরা দিয়েছেন। সীমান্তের ওপারে প্রথম শিবির ছিল আজকের মিজোরামের দেমাগ্রীতে, যাকে স্নেহ কুমার চাকমা লিখেছেন ডেমাগিরি। তাঁর যাত্রা শুরু মে মাস ১৯৬৪ সন।
শিবিরে পৌঁছে তিনি শোনেন: অফিস থেকে জানতে পারি এর মধ্যে ২৬ হাজার শরণার্থী জমা হয়েছে।
মহেন্দ্র চাকমা তার কিছু আগে পৌঁছান: লিডার জাতীয় একজন বললো ১৭/১৮ হাজার লোক এখন। সেটা ১৯৬৪ সালের প্রথম দিকের কথা।
শরণার্থীদের দলে ভাগ করা হয়। স্নেহ কুমার চাকমা: এক হাজার থেকে দেড় হাজার জনসংখ্যা সম্বলিত শরণার্থী নিয়ে এক একটি ব্যাচ গঠন করা হলো।
বুদ্ধধন চাকমা: আমার স্মরণশক্তি বলছে দেমাগ্রী শিবিরে ২২টা গ্রুপে আমাদেরকে ভাগ করা হয়েছিল।
তারপর হাঁটা। মহেন্দ্র চাকমা: দেমাগ্রী থেকে মিজোরামের রাজধানী আইজল পর্যন্ত পুরোটাই ছিল হাটা পথ।
বুদ্ধধন চাকমা: যতদূর মনে পড়ে দেমাগ্রী থেকে মোট ৩১ দিনের মতো আমাদের হাটতে হয়েছে।
আনন্দ মুখি চাকমা, পিঠে এক সন্তান নিয়ে: হেঁটেছি না, হাঁটতে বাধ্য হয়েছি।
পথে ও শিবিরে মৃত্যুর কোনো গণনা নেই। বুদ্ধধন চাকমা: কত মানুষ যে রাস্তায় অসুখে বিপদে পড়ে মারা গেছে সেসব হিসাব কেউ কোনোদিন আর পাবে না। আমরাই তখন কেউ এই হিসাব রাখতে পারিনি।
স্নেহ কুমার চাকমা লেডুর শেষ শিবিরটি নিয়ে: এমনই দিন গিয়েছিল দৈনিক ১০/১১ জন মারা গেছে। শিশুর সংখ্যাই বেশি ছিল।
ভারত সরকারের গন্তব্য ছিল নেফা (North-East Frontier Agency), আজকের অরুণাচল প্রদেশ। কিন্তু আসামের শিবির থেকে সবাই সেখানে যাননি। বুদ্ধধন চাকমা: এই আনিপুর ক্যাম্পে প্রথমে আমাদের ২ মাস থাকার কথা থাকলেও থাকতে থাকতে ৩ (তিন) বছর রয়ে গেলাম।
মহেন্দ্র চাকমা: তো একদিন ক্যাম্পের লিডার আমাদের ডেকে বলে দিলযে নেফা না গেলে রেশন বন্ধ।
বুদ্ধধন চাকমা: রেশন বন্ধ হবার ভয়ে অনেকের ইচ্ছে না থাকা সত্বেও নেফা যেতে বাধ্য হলো।
এই দুই বক্তা নিজেরা শিবির ছেড়ে ত্রিপুরায় চলে যান। স্নেহ কুমার চাকমাও লিখেছেন, শরণার্থীদের কিছু অংশ আসামের কাছার জেলার মনাছড়াতে নিয়ে যায়।
নেফায় কেন বসানো হলো, সে বিষয়ে প্রধীর তালুকদার তাঁর লেখায় এস পি তালুকদারের একটি মত তুলে ধরেছেন: ভারত সরকার চাকমাদের সেখানে বসিয়েছে বরং চীন সীমান্তবর্তী প্রদেশ হওয়ার কারনে কৌশলগত দূরদর্শী লক্ষ্য নিয়ে রিহাব্লিটেড করেছে।
এটি একজনের মত, অন্যের মুখে শোনা; কোনো দলিলে মেলানো যায়নি।
যাঁরা 1964 থেকে 1969 সালের মধ্যে অরুণাচল প্রদেশে বসতি করেন, তাঁদের নাগরিকত্ব ছয় দশকেও মীমাংসিত হয়নি। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট 2015 সালের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে যোগ্য চাকমা ও হাজংদের নাগরিকত্ব চূড়ান্ত করতে বলে, সম্ভব হলে তিন মাসের মধ্যে। International Rivers 2021 সালে লিখেছে, নির্দেশটি বাস্তবায়িত হয়নি।
LiveLaw-এর 18 সেপ্টেম্বর 2015 তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী রায়টি দেন বিচারপতি Anil R. Dave ও A.K. Goel; আবেদনকারী ছিল Committee for Citizenship Rights of the Chakmas of Arunachal Pradesh। আদালত আরও বলে, আনুষ্ঠানিক নাগরিকত্ব না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে কোনোভাবে বৈষম্য করা যাবে না। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার বিবরণে, 1971 সালের আগে আসা চাকমাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে 1972 সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল, কিন্তু অরুণাচল প্রদেশ আবেদনগুলো নিয়ে পদক্ষেপ নেয়নি।
International Rivers লিখেছে, অরুণাচলের হাজার হাজার চাকমা ভূমির অধিকার, রেশন কার্ড, প্রাথমিকের পরের শিক্ষা ও চাকরি ছাড়া আছেন, আর অন্য জনগোষ্ঠীর আপত্তির কারণে আদালতের নির্দেশ কার্যকর হয়নি। 2011 সালের ভারতীয় আদমশুমারিতে অরুণাচলে চাকমা গণনা হয়েছে 47,073 জন (উইকিপিডিয়ার তথ্যছক)।
আর্কাইভের বক্তারা একই কথা নিজেদের জীবন থেকে বলেছেন। অরুণাচলের মিউ থেকে আনন্দ মুখি চাকমা: যদিও নাগরিকত্ব আজো মেলেনি।
প্রিয়বালা চাকমা অরুণাচলে তাঁর ভাইবোনদের দেখে এসে: যদিও এখনও তাদের ভারতের নাগরিকের সনদ মিলেনি।
ত্রিপুরায় থেকে যাওয়া মহেন্দ্র চাকমার অভিজ্ঞতা উল্টো: কিছুই নেই কিন্তু নাগরিকত্ব পেয়েছি আর কঠিন পরিশ্রম করে ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া শিখিয়েছি।
নিঝুম তালুকদারের লেখায়: যারা অরুণাচল প্রদেশে পুনর্বাসিত হয়েছে তারা এখনও সকলে পুরোপুরিভাবে ভারতীয় নাগরিকত্ব পায় নি।
যাঁরা গিয়েছিলেন তাঁদের সময় ফুরিয়ে আসছে। প্রধীর তালুকদার প্রথম অরুণাচলে যান 2002 সালে; তাঁর অনুমান, গত ৫৫ বছরে শতকরা ৮০/৯০ জন মারা গেছেন।
দায়নের অমিয় চাকমা পরের প্রজন্ম নিয়ে বলেছেন: তারা দেশকে চেনে আমাদের গল্পের মধ্য দিয়ে।
বাংলাপিডিয়া বাঁধের দুটি সুফলের কথা বলে: 230 মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এবং চট্টগ্রাম শহরকে বড় বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা। একই বিশ্বকোষ লিখেছে, হ্রদটি 1990-এর দশকের শুরুর মধ্যে পলিতে আয়তনের প্রায় 25 শতাংশ হারিয়েছে, বড় মাছ প্রায় শেষ, আর প্রায় 689 বর্গকিলোমিটার বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জীবিকার বদলটি প্রিয় কুমার চাকমা চিজি এক বাক্যে ধরেছেন: কেউ পরিণত হল জেলে, কেউ কাঠুরিয়া, কেউ লেবার, কেউবা নৌকার মাঝি আর কেউবা ভবঘুরে।
ইংরেজি উইকিপিডিয়া একটি বাস্তুচ্যুতি-পর্যবেক্ষণ সংস্থার বরাতে লিখেছে, বাঁধের পর জমির যে সংকট তৈরি হয় তাকে এ অঞ্চলের চলমান সংঘাতের অন্যতম মূল কারণ মনে করা হয়। আর্কাইভে এ ব্যাখ্যার বিস্তার আছে শরদিন্দু শেখর চাকমার লেখায়, আর প্রেক্ষাপট আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস লেখায়। দ্য ডেইলি স্টারের লেখাটি সাবেক চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের The Departed Melody বই থেকে একটি মত উদ্ধৃত করেছে: বাঁধের একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল প্রভাবশালী চাকমা পরিবারগুলোকে ছত্রভঙ্গ করা। মতটি ডেইলি স্টারের উদ্ধৃতি থেকে; মূল বইয়ে মিলিয়ে দেখা যায়নি।
প্রতিবাদও হয়েছিল। শরদিন্দু শেখর চাকমা লিখেছেন, চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ক্ষতিগ্রস্তদের বঞ্চনা নিয়ে প্রচারপত্র বিলি করেন এবং 13 ফেব্রুয়ারি 1963 তারিখে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আটক হন। প্রচারপত্রে কী ছিল, তা মনোজের স্মৃতিচারণে লারমার নিজের মুখের কথা হিসেবে আছে: কাপ্তাই বাঁধের জল ৬০ ফুটের নিচে রাখা; উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আর পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে একটা লিফলেট জুম্ম জনগণের কাছে বিতরণ করি।
দশ বছর পর, 23 জুন 1973, তিনি সংসদে বলেন: কাপ্তাই বাঁধ আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়েছে।
তাঁর জীবন ও রাজনীতি নিয়ে পড়ুন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা: জীবন, সংগ্রাম ও অসমাপ্ত প্রশ্ন।
হ্রদটি এখন পর্যটনের জায়গা। যাঁদের গ্রাম তার নিচে, তাঁরা একে কী চোখে দেখেন, প্রিয়বালা চাকমার প্রশ্নে: চোখের জল কি কখনো বিনোদনের মাধ্যম হতে পারে?
জুমজার্নালে কাপ্তাই বাঁধের প্রত্যক্ষদর্শীদের দশটি বয়ান আছে সমারী চাকমার কাপ্তাই বাঁধ: বর-পরং – ডুবুরীদের আত্মকথন বই থেকে। দ্য ডেইলি স্টারের লেখা অনুযায়ী বইটির সম্পাদক আলোড়ন খীসা, প্রকাশক খাগড়াছড়ির কমরেড রূপক চাকমা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি 2018। এর বাইরে আরও কয়েকটি স্মৃতিচারণ আছে। নিচের ছকে গ্রাম ও ঠিকানা লেখাগুলোতে যেভাবে আছে সেভাবেই দেওয়া।
| বক্তা ও লেখা | পুরনো গ্রাম → লেখায় দেওয়া ঠিকানা | তাঁর একটি বাক্য |
|---|---|---|
| করুণাময় চাকমা — মৃত্যুর ফাঁদ, কাপ্তাই বাঁধ | ঝগড়াবিল আদাম, 104 নম্বর ঝগড়াবিল মৌজা → রূপকারী, মারিশ্যা | এভাবে কাপ্তাই বাঁধ আমাদের আলাদা করে দেয় গ্রাম থেকে, পরিবার থেকে, সমাজ থেকে আর শেষে দেশ থেকেও। |
| পঞ্চ চাকমা — চোখের পানি বাঁধের পানি যখন একাকার | মাইচছড়ি আদাম, শুভলং → খাগড়াছড়ি | আমাদের পুরোনোদের কাছে এই পানি কাপ্তাই বাঁধের পানি। কিন্তু এখন সবার কাছে শুনি এই পানির নাম কাপ্তাই লেক। |
| বুদ্ধধন চাকমা — পার্বত্য চট্টগ্রাম টু নেফা, ভারত : বড়পরং যাত্রা | 9 নম্বর মারিশ্যা চর মৌজা → মধ্য বাঘাইছড়ি → ত্রিপুরা | অথচ কি ছিল না আমাদের, আমাদের দেশে। সেসব এখন পানির তলে। |
| প্রিয়বালা চাকমা — ডুবুরীর আত্মকথন | উগলছড়ি (জন্মগ্রাম), বুড়িঘাট (শ্বশুরবাড়ি) → খাগড়াছড়ি | বাঁধের পানিতে ভেসে গিয়েছি আমরা, ডুব-সাঁতার দিয়ে একেকজন উঠেছি একেক দেশে। |
| সুষমা বালা চাকমা — ডুবুরী থেকে শহীদ জননী | বড়াদাম, পুরাতন রাঙামাটি শহরের কাছে → মারিশ্যা | আস্তে আস্তে পানি উপরে যাচ্ছে, আমরাও উজানে যাচ্ছি। |
| মহেন্দ্র চাকমা — গাছ কাটা ছিল বাঁধের প্রথম ধাপ | কাজলং পারের গ্রাম, পুরাতন মারিশ্যা → পেচারতল, ভারত | বাঁধের পানিতেই সব ডুবে গেল আর আমরা জায়গা ছাড়া হলাম। |
| অরুণ কুমার দেওয়ান — বাঁধ আমার তিন ভাইবোনকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে | মুরঘোনা, 115 নং মগবান মৌজা → খাগড়াছড়ি | কাপ্তাই বাঁধের কারণেই তো আমাদের পূর্ব পুরুষের শুশানভূমিও ডুবে গেল। |
| প্রতিমা দেওয়ান — কাপ্তাই বাঁধ আমার ছোট বোনকে কেড়ে নিয়ে গেছে | গ্রামের নাম লেখায় নেই → পজিম নারাঙহিয়া, খাগড়াছড়ি | আমাদের সোনার পরিবার এই বাঁধের পানিতেই ডুবে শেষ হয়ে গেল। |
| আনন্দ মুখি চাকমা — কাপ্তাই বাঁধ- সকল দুঃখের কারণ | কেরেঙাছড়ি → মিউ, অরুণাচল | আমাদের চোখের সামনেই কিন্তু আমাদের বাড়িটা ডুবে গেল। |
| অমিয় চাকমা — ১২ বছর বয়সে জন্মভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম | উগলছড়ি, বগাছদা মৌজা → দায়ন, অরুণাচল | বাবা না বললে আমি হয়তো আসতাম না। |
| স্নেহ কুমার চাকমা — বড় পরঙ: শরনার্থী জীবনের স্মৃতিচারণ (জীবনালেখ্য থেকে) | গ্রামের নাম লেখায় নেই; 1964 সালের মে মাসে যাত্রা | প্রায় দিন ছিল মৃত্যুর দিন। |
| প্রিয় কুমার চাকমা চিজি — বড়পরঙঃ মানবিক বিপর্যয়ের একটি বাস্তব চিত্র | জুরাছড়ি এলাকা → বনযোগীছড়া | তখন বিপদ, দুঃসময় কি জিনিস আমরা কি জানতাম, না বুঝতাম? |
| জ্যোতিপ্রভা লারমা — মঞ্জু’র কিছু স্মৃতি কিছু কথা | মহাপুরম (মাওরুম) | আমাদের সুন্দর প্রিয় গ্রামটিও ডুবে যাবে। |
| মানিক লাল দেওয়ান — আমার কিশোরকাল ও আমি ও আমার পৃথিবী | পুরনো রাঙ্গামাটি শহরের বর্ণনা | রাজবাড়ির ফটকের দুই পাশে ছিল পাথরের তৈরি দুটি বড় সিংহ মূর্তি। |
পরের প্রজন্মের লেখাও আছে: প্রধীর তালুকদারের বড় পরঙ নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রের আহ্বান, সুলভ চাকমার বাঁধ নিয়ে চাকমা গান ধরে লেখা, আর কে. ভি. দেবাশীষ চাকমার একটি গল্প। তথ্যের দিক থেকে ছোট দুটি লেখা আগে থেকেই আছে: কাপ্তাই বাঁধ ও বড়পরং এবং বড়পরং – বাঙালিদের প্রতি পাহাড়ীদের অবিশ্বাসের সূত্রপাত।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী কাপ্তাইয়ের জায়গাটি বাছা হয় 1952 সালের শুরুতে, নির্মাণ শেষ হয় 1961 সালের শেষে এবং 1962 সালে স্পিলওয়ে বন্ধ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। ইংরেজি ও বাংলা উইকিপিডিয়া নির্মাণকাল দেখায় 1957 থেকে 1962। দ্য ডেইলি স্টারের একটি লেখায় সমাপ্তির সাল 1963, আর শরদিন্দু শেখর চাকমার বইয়ে শুরু 1952 ও শেষ 1961।
কাপ্তাই বাঁধ তৈরি করে পাকিস্তান সরকার, মার্কিন অর্থসাহায্যে। বাংলাপিডিয়া ও উইকিপিডিয়া অনুযায়ী প্রকৌশল ও নির্মাণের কাজ করে ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (1952 সালে নিযুক্ত) এবং ইউতাহ ইন্টারন্যাশনাল ইনকর্পোরেট (1957 সালে যুক্ত)। জায়গাটি 1951 সালে চূড়ান্ত হয় সেচ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী খাজা আজিমুদ্দিনের তত্ত্বাবধানে।
প্রায় সব উৎসে আবাদি জমির হিসাব 54,000 একর; বাংলাপিডিয়া একই পরিমাণকে লিখেছে 21,870 হেক্টর। এটিকে তখনকার পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট আবাদি জমির প্রায় 40 শতাংশ বলা হয়। আর্কাইভের দুটি লেখায় অনুপাতটি 54 শতাংশ। শরদিন্দু শেখর চাকমার হিসাবে 369টি মৌজার মধ্যে 125টি মৌজা পানির নিচে যায়।
উৎসভেদে আলাদা। বাংলাপিডিয়ার জলবিদ্যুৎ-ভুক্তি বলছে 33 মিটার জলস্তরে 777 বর্গকিলোমিটার, প্রকল্প-দলিলে প্রায় 665 বর্গকিলোমিটার; হ্রদ-ভুক্তি বলছে 58,300 হেক্টর। উইকিপিডিয়ার মূল পাঠে 655 বর্গকিলোমিটার (253 বর্গমাইল)। শরদিন্দু শেখর চাকমা লিখেছেন 350 বর্গমাইল, বর্ষায় 400 বর্গমাইল। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী গড় গভীরতা 9 মিটার, সর্বোচ্চ 32 মিটার।
সবচেয়ে প্রচলিত হিসাব 18,000 পরিবার, প্রায় 1 লাখ মানুষ; বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, International Rivers ও শরদিন্দু শেখর চাকমার বইয়ে এই সংখ্যা পাওয়া যায়। 1972 সালের একটি স্মারকলিপিতে সংখ্যাটি 99,977। উইকিপিডিয়া ও International Rivers অনুযায়ী উচ্ছেদ হওয়াদের 70 শতাংশ চাকমা; আর্কাইভের লেখায় তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, হাজং ও পুরনো বাঙালি বাসিন্দাদের কথাও আছে।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বরাদ্দ ছিল 4 কোটি 15 লাখ টাকা, তবে সবাই প্রাপ্য নগদ পাননি। শরদিন্দু শেখর চাকমার বইয়ে হার ছিল প্রথম শ্রেণির জমি একরপ্রতি 600 টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণি 400 ও তৃতীয় শ্রেণি 200 টাকা। করুণাময় চাকমার স্মৃতিতে হার 900, 600 ও 300 টাকা; অরুণ কুমার দেওয়ানের স্মৃতিতে 300, 200 ও 100 টাকা।
কাপ্তাই বাঁধের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়াকে চাকমারা বড়পরং বা বর-পরং বলেন। অরুণাচলে বসতি করা অমিয় চাকমার ব্যাখ্যায় শব্দটির মানে অনেক দূরে গিয়ে বসতি করা। বেশির ভাগ যাত্রী 1964 সালে আজকের মিজোরামের দেমাগ্রী শিবির হয়ে আসামে, সেখান থেকে তখনকার নেফা অর্থাৎ আজকের অরুণাচল প্রদেশে যান; কিছু মানুষ ত্রিপুরায় থেকে যান।
উইকিপিডিয়া ও শরদিন্দু শেখর চাকমার বইয়ে সংখ্যাটি 40,000-এর বেশি। International Rivers বলছে প্রায় 40,000 জন ত্রিপুরা, আসাম ও অরুণাচলে এবং আরও প্রায় 20,000 জন সম্ভবত বার্মায় যান। স্নেহ কুমার চাকমা ও তারাচরন চাকমা লিখেছেন 60,000; মানিক লাল দেওয়ান প্রায় 50,000। স্নেহ কুমার চাকমার স্মৃতিতে এক সময়ে দেমাগ্রী শিবিরেই 26 হাজার শরণার্থী ছিলেন।
মূলত অরুণাচল প্রদেশে, যার তখনকার নাম ছিল নেফা; আর্কাইভের বক্তারা মিউ ও দায়ন নামের দুটি জায়গার কথা বলেছেন। কিছু পরিবার আসামের শিবির ছেড়ে ত্রিপুরায় বসতি করে। 2011 সালের ভারতীয় আদমশুমারিতে অরুণাচলে 47,073 জন চাকমা গণনা হয়। 2015 সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের নাগরিকত্ব চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেয়।
বাংলাপিডিয়া ও উইকিপিডিয়া অনুযায়ী 230 মেগাওয়াট। 1962 সালে 40 মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট চালু হয়, 1982 সালে 50 মেগাওয়াটের তৃতীয় ইউনিট এবং 1988 সালে 50 মেগাওয়াটের আরও দুটি। International Rivers লিখেছে প্রায় 239 মেগাওয়াট। 1973 সালে সংসদে মন্ত্রী জানান, তখন দুটি জেনারেটর চালু ছিল।
হ্যাঁ। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে, বাঁধের পানিতে মূল রাঙ্গামাটি শহর ডুবে যায়; International Rivers লিখেছে চাকমা রাজপ্রাসাদ হ্রদের নিচে। মানিক লাল দেওয়ানের স্মৃতিকথায় রাজবাড়ি ডোবার সাল 1961। শরদিন্দু শেখর চাকমার বই অনুযায়ী আজকের রিজার্ভ বাজার এলাকা বাঁধের আগে সংরক্ষিত বন ছিল, সেখান থেকেই নামটি এসেছে।
জুমজার্নালের আর্কাইভ (প্রাথমিক উৎস)
বাইরের উৎস
সর্বশেষ হালনাগাদ: 10 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:ইতিহাস ও রাজনীতি
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।