Jumjournal Logo

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা: জীবন, সংগ্রাম ও অসমাপ্ত প্রশ্ন

Last updated Oct 6th, 2026

1

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার আলোকচিত্র — জুমজার্নাল আর্কাইভ

কাপ্তাই জলাধারের পানির নিচে একটি গ্রাম আছে। নাম মাওরুম, কেউ বলে মহাপুরম — রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট মৌজায়। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে কর্ণফুলীতে বাঁধ হওয়ার পর গ্রামটি ডুবে যায়, আর সেই পরিবারটি ভিটে ছেড়ে চলে যায় খাগড়াছড়ির পানছড়িতে।

ওই গ্রামেই ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জন্মেছিলেন এম এন লারমা — মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। তেইশ বছর পর, ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর, তিনি খুন হন সেই পানছড়িতেই — যেখানে উচ্ছেদ হয়ে তাঁর পরিবার গিয়ে উঠেছিল। কাপ্তাই বাঁধ থেকে মৃত্যুস্থান পর্যন্ত একটা সরলরেখা টানা যায়। তাঁর রাজনীতি বুঝতে হলে ওই রেখাটাই ধরতে হয়।

এই লেখায় তাঁর জীবন সাজানো হয়েছে যাচাই-করা তথ্য দিয়ে, আর যেখানে উৎসে বিরোধ আছে সেখানে বিরোধটাই লেখা হয়েছে — একটা পক্ষ বেছে নিয়ে নয়।

সূচিপত্র

  1. এম এন লারমা কে ছিলেন, আর কীভাবে তৈরি হলেন
  2. কাপ্তাই বাঁধ কীভাবে তাঁকে রাজনীতিতে আনল
  3. নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সংসদে কী করলেন
  4. চার দফা দাবিতে লারমা ঠিক কী চেয়েছিলেন
  5. জনসংহতি সমিতি কীভাবে ও কেন গঠিত হলো
  6. শান্তিবাহিনী কেন তৈরি হলো, আর তাঁর ভূমিকা কী ছিল
  7. বাকশাল, আন্ডারগ্রাউন্ড ও ১৯৭৫-এর মোড়
  8. ১০ নভেম্বর ১৯৮৩-এ কী ঘটেছিল
  9. লারমার উত্তরাধিকার আজ কোথায় দেখা যায়
  10. যা এখনো জানা যায়নি
  11. সচরাচর জিজ্ঞাসা

এম এন লারমা কে ছিলেন, আর কীভাবে তৈরি হলেন?

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ – ১০ নভেম্বর ১৯৮৩) ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন চাকমা রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও শিক্ষক। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (PCJSS) প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, পরে সভাপতি, এবং ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। বাংলাদেশের সংবিধানে সবাইকে “জাতি হিসেবে বাঙালি” বলা হওয়ার বিরুদ্ধে গণপরিষদে প্রকাশ্যে আপত্তি তোলা প্রথম নেতা তিনি।

জন্ম ও পরিবার

তাঁর জন্ম রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট মৌজার মাওরুম (মহাপুরম) গ্রামে, ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। পিতা চিত্ত কিশোর চাকমা, মাতা শুভাসিনী দেওয়ান। বাবা ছিলেন শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত এবং গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের একজন — নানা বিষয়ে গ্রামের মানুষ তাঁর পরামর্শ নিতে আসত।

শৈশব কেটেছে জুম, নদী আর পাহাড়ি পথের মধ্যে। জুমজার্নালের ধারাবাহিকে তাঁর শৈশবের বিস্তারিত বিবরণ আছে। কিন্তু ওই শৈশবের কেন্দ্রে একটা ঘটনা আছে যা তাঁর সারা জীবন নির্ধারণ করে দিয়েছে: কাপ্তাই বাঁধের পানিতে তাঁর নিজের গ্রামটি তলিয়ে যায়, আর পরিবার সরে যায় খাগড়াছড়ির পানছড়িতে।

তাঁর ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা — সন্তু লারমা — এম এন লারমার মৃত্যুর পর জনসংহতি সমিতির নেতৃত্ব নেন এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে সমিতির পক্ষে স্বাক্ষর করেন। ১৯৭১ সালে লারমা বিবাহ করেন।

শিক্ষা, শিক্ষকতা ও আইন পেশা

প্রাথমিক পড়াশোনা গ্রামের জুনিয়র হাই স্কুলে — বাঁশের বেড়া, টিনের ছাউনি। এরপর:

  • ১৯৫৮ — রাঙামাটি গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন
  • ১৯৬০ — চট্টগ্রাম গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট
  • ১৯৬৫ — একই কলেজ থেকে স্নাতক
  • ১৯৬৮ — কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে B.Ed
  • ১৯৬৯ — চট্টগ্রাম আইন কলেজ থেকে LLB, এবং চট্টগ্রাম বার অ্যাসোসিয়েশনে আইনজীবী হিসেবে যোগদান

পড়ার পাশাপাশি তিনি শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৬৬ সালে দিঘীনালা হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন, পরে চট্টগ্রাম রেলওয়ে কলোনি হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক হন। ১৯৬৯ সালে আইন পেশায় ঢোকার পর সামাজিক আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততা বাড়ে।

এই দুটো পেশা — শিক্ষকতা আর আইন — পরে খুব কাজে লেগেছে। চার দফা দাবি তিনি লিখেছেন আইনি ভাষায়: ১৯০০ সালের রেগুলেশন, প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি, সাংবিধানিক গ্যারান্টি। আর শিক্ষা নিয়ে তাঁর নিজস্ব ভাবনা ছিল স্পষ্ট — পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারে লারমার ভূমিকা নিয়ে আলাদা করে পড়া যায়।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ

কাপ্তাই বাঁধ কীভাবে তাঁকে রাজনীতিতে আনল?

১৯৬০-এর দশকের শুরুতে কর্ণফুলী নদীতে কাপ্তাই বাঁধ তৈরি হয়। রাষ্ট্রের ভাষ্য ছিল উন্নয়ন ও বিদ্যুতের। পাহাড়ে সেটা পৌঁছাল উচ্ছেদ হয়ে।

সংখ্যাগুলো এখনো নাড়া দেয়:

  • প্রায় ১৮,০০০ পরিবারের ১,০০,০০০-এর বেশি মানুষ ভিটেছাড়া হয়, যাঁদের বড় অংশ আদিবাসী
  • ৫৪,০০০ একর আবাদি জমি — অঞ্চলের সবচেয়ে উর্বর জমির প্রায় অর্ধেক — পানির নিচে চলে যায়
  • প্রায় ৪০,০০০ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের ত্রিপুরা, আসাম ও অরুণাচলে চলে যান; আরও প্রায় ২০,০০০ যান মিয়ানমারে
  • চাকমা রাজবাড়িও ডুবে যায়

এই উচ্ছেদকে পাহাড়ে বলা হয় বড়পরং — মহাযাত্রা। জুমজার্নালের আর্কাইভে এ নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের লেখা আছে: কাপ্তাই বাঁধ ও বড়পরং এবং কাপ্তাই বাঁধ আমার ছোট বোনকে কেড়ে নিয়ে গেছে। ধারাবাহিকে বাঁধ ও উচ্ছেদের পর্বটিও আছে।

লারমা তখন কুড়ির কোঠায়। তিনি দেখলেন আত্মীয়-প্রতিবেশীরা ভিটে ছেড়ে যাচ্ছে, কেউ কাঁদছে, কেউ কিছু বলতে পারছে না। নিজের গ্রামও গেল। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর রাজনীতির প্রথম প্রশ্নটা তৈরি হয় — উন্নয়নের নামে রাষ্ট্র যদি মানুষকে উচ্ছেদ করে, তবে পাহাড়ি মানুষের অস্তিত্বের নিশ্চয়তা কোথায়?

তিনি ১৯৫৬ সালে ছাত্র রাজনীতিতে ঢোকেন। ১৯৫৭ সালে পাহাড়ি ছাত্রদের প্রথম সম্মেলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন, ১৯৫৮ সালে যোগ দেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে। ১৯৬০-এর দশকের গোড়ায় পাহাড়ে ছাত্র সংগঠন গড়ে ওঠে — শিক্ষা, অধিকার আর ভূমি রক্ষার দাবিতে। সেই সময়ের ছাত্র সংগঠন নিয়ে আলাদা লেখা আর্কাইভে আছে।

১৯৬৩ সালে কাপ্তাই বাঁধবিরোধী আন্দোলনে তিনি গ্রেপ্তার হন — জীবনের প্রথম গ্রেপ্তার। রাঙামাটি বাজারে ছাত্রদের এক মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে, কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যায়। সেই প্রথম প্রতিবাদ ও গ্রেপ্তারের বিবরণ ধারাবাহিকে আছে। জেল থেকে বেরিয়ে তাঁর অবস্থান নরম হয়নি, শক্ত হয়েছে। ১৯৬৯ সালে তিনি গঠন করেন “CHT Election Organizing Committee” — নির্বাচনী পথে পাহাড়ের প্রতিনিধিত্ব আদায়ের প্রথম সংগঠিত চেষ্টা।

নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সংসদে কী করলেন?

১৯৭০ ও ১৯৭৩: দুই নির্বাচন

১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (MPA) নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম–১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন। সংসদে পাহাড়ের কণ্ঠস্বর পর্বে এই সময়ের বিবরণ আছে।

সংসদ তাঁর কাছে কেবল আইন প্রণয়নের জায়গা ছিল না। পাহাড়ের ১১টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর হয়ে কথা বলার একটাই মঞ্চ ছিল তখন, আর সেখানে তিনি ছিলেন সংখ্যায় প্রায় একা।

৩১ অক্টোবর ১৯৭২: অনুচ্ছেদ ৬ ও গণপরিষদ থেকে ওয়াকআউট

১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর গণপরিষদে পাস হয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬, যেখানে বলা হয় — জাতি হিসেবে জনগণ বাঙালি এবং নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি।

লারমা দাঁড়িয়ে আপত্তি জানান। তাঁর বক্তব্যের মর্মটা ছিল সরল: নাগরিকত্ব আর জাতিসত্তা এক জিনিস নয়। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক, কিন্তু তিনি চাকমা; তাঁর প্রতিবেশী মারমা, ত্রিপুরা। রাষ্ট্র যদি সবাইকে এক জাতি বলে সংজ্ঞায়িত করে, তবে যাঁরা সেই সংজ্ঞার বাইরে পড়েন তাঁদের সাংবিধানিক অস্তিত্ব থাকে না। প্রস্তাব ভোটে পাস হলে তিনি গণপরিষদ থেকে ওয়াকআউট করেন।

উদ্ধৃতি নিয়ে একটি স্পষ্ট কথা: ওই দিনের বক্তব্য নানা লেখায় নানা ভাষায় উদ্ধৃত হয় — একাধিক পরস্পরবিরোধী পাঠ চালু আছে। ১৯৭২ সালের গণপরিষদের কার্যবিবরণীর কোনো প্রতিলিপি আমরা মেলাতে পারিনি। তাই এই লেখায় তাঁর বক্তব্যের ভাব বলা হয়েছে, কোনো বাক্য উদ্ধৃতি-চিহ্নে বসানো হয়নি। মূল প্রতিলিপি পাওয়া গেলে এই অংশ হালনাগাদ করা হবে। 

তিনি কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, সে প্রশ্নে আর্কাইভে আলাদা একটি আলোচনা আছে। উল্লেখ্য, তাঁর রাজনীতি কেবল জাতিসত্তার প্রশ্নে সীমিত ছিল না — নারী মুক্তি নিয়েও তাঁর নিজস্ব অবস্থান ছিল।

চুক্তি-পরবর্তী অস্ত্র সমর্পণ
চুক্তি-পরবর্তী অস্ত্র সমর্পণ। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ

চার দফা দাবিতে লারমা ঠিক কী চেয়েছিলেন?

১৯৭২ সালের গোড়ার দিকে লারমা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে একটি চার দফা দাবিপত্র দেন। এটি পাহাড়ের রাজনীতির মূল দলিল, এবং এর ধারাগুলো আজও প্রাসঙ্গিক:

  1. স্বায়ত্তশাসন — পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিজস্ব পরিষদসহ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।
  2. আইনি সুরক্ষা — ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা CHT Regulation, 1900 বহাল রাখতে হবে। এই আইনেই পাহাড়ি ভূমি ও প্রথাগত অধিকারের সুরক্ষা নিহিত ছিল।
  3. রাজপ্রথার স্বীকৃতি — চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা প্রথাগত রাজপ্রথা বা সার্কেল-প্রধানদের পদকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
  4. সাংবিধানিক নিশ্চয়তা — উপরের সবকিছুর জন্য সংবিধানে গ্যারান্টি থাকতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার একতরফাভাবে তা বদলাতে না পারে। (এই দফার পাঠ নিয়ে উৎসে পার্থক্য আছে — নিচে দেখুন।)

লক্ষ করার বিষয় — চারটি দফার একটিতেও বিচ্ছিন্নতার দাবি নেই। সবগুলোই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবি। এই পার্থক্যটা পরের চার দশকের বিতর্কে বারবার হারিয়ে গেছে। চার দফা দাবি নিয়ে ধারাবাহিকের পর্বটি আলাদা করে পড়া যায়।

দাবিপত্রটি সরকার আমলে নেয়নি।

দুটি বিষয়ে উৎসে পার্থক্য:

১. তারিখ। জনসংহতি সমিতির নিজস্ব বিবরণে দাবিপত্র পেশ হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২, Wikipedia-র PCJSS নিবন্ধে ২৪ এপ্রিল ১৯৭২, আর জুমজার্নালের আর্কাইভে কেবল “ফেব্রুয়ারি মাসে”। তাই এখানে “১৯৭২ সালের গোড়ার দিকে” লেখা হলো।

২. চতুর্থ দফার পাঠ। Wikipedia-র পাঠে চতুর্থ দফায় ১৯০০ সালের রেগুলেশন সংশোধন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি বাঙালি পুনর্বাসন নিষিদ্ধ করার দাবিও স্পষ্টভাবে যুক্ত আছে। জুমজার্নালের আর্কাইভের পাঠে সেটি নেই — সেখানে কেবল সাধারণ সাংবিধানিক গ্যারান্টির কথা। এটি গৌণ পার্থক্য নয়, কারণ সেটেলার পুনর্বাসনের প্রশ্ন পরের দশকগুলোতে পাহাড়ের কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে। কোনো একটি পাঠ বেছে না নিয়ে দুটোই এখানে জানানো হলো। 

জনসংহতি সমিতি কীভাবে ও কেন গঠিত হলো?

দাবি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর লারমার উপলব্ধি ছিল স্পষ্ট — সংগঠন ছাড়া অধিকার আদায় হয় না। তিনি গোপনে পাহাড়ি গ্রামে গ্রামে ঘোরা শুরু করেন, তরুণদের একত্র করতে থাকেন।

১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটিতে আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (PCJSS)। লারমা হন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক; ১৯৭৩ সালে তিনি সভাপতির দায়িত্ব নেন। সমিতির ঘোষিত মূলনীতি ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার।

একটি তারিখ-বিতর্ক: জনসংহতি সমিতির নিজস্ব দলিল, তাদের ২০২৩ সালের সুবর্ণজয়ন্তী ও ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর হিসাব, প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন UPDF-এর বিবরণ এবং জুমজার্নালের আর্কাইভ — সবই ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ বলে। তবে বাংলাপিডিয়া ও Wikipedia-র PCJSS নিবন্ধ — দুটোই ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ লিখেছে। (উল্লেখ্য, Wikipedia-র লারমা-নিবন্ধ আবার ১৯৭২ বলে; অর্থাৎ Wikipedia নিজের ভেতরেই অসঙ্গত।) বহু লেখা বাংলাপিডিয়াকে অনুসরণ করে, তাই বিরোধটি এখানে উল্লেখ করা হলো। প্রমাণের ভার ১৯৭২-এর দিকেই বেশি।

সমিতি কেবল একটি রাজনৈতিক দল ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল একধরনের সমান্তরাল সামাজিক ব্যবস্থা:

  • প্রতিটি গ্রামে গ্রামপঞ্চায়েত
  • তরুণদের জন্য যুবসমিতি, নারীদের জন্য মহিলা সমিতি
  • গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো গণসমাবেশে

এই কাঠামোই পরের দুই দশকে পাহাড়ের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায় — এবং এখানেই লারমার তৃতীয় নীতিটি কাজ করছিল: সংগঠনই শক্তি।

শান্তিবাহিনী কেন তৈরি হলো, আর তাঁর ভূমিকা কী ছিল?

প্রথম দিকে সমিতি শান্তিপূর্ণ পথেই দাবি আদায়ের চেষ্টা করেছে — স্মারকলিপি, বৈঠক, সংসদে বক্তব্য। কিন্তু সাংবিধানিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এবং গ্রামে গ্রামে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় সমিতি একটি সশস্ত্র শাখা তৈরি করে, যার নাম রাখা হয় শান্তিবাহিনী। সমিতি ও শান্তিবাহিনী গঠনের পর্বটি ধারাবাহিকে বিস্তারিত আছে।

নামটি স্বতঃবিরোধী মনে হতে পারে, কিন্তু ওটাই সমিতির অবস্থান ছিল — যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেও লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক মীমাংসা।

গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য: লারমা ব্যক্তিগতভাবে সশস্ত্র সংগ্রামে অনিচ্ছুক ছিলেন। তিনি বিচ্ছিন্নতার রাজনীতি চাননি এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধানেই আস্থা রেখেছেন। জনগণের চাপ ও সময়ের বাস্তবতায় তিনি এই পথ মেনে নিতে বাধ্য হন।

গঠনের সাল ১৯৭৩ — বাংলাপিডিয়া তারিখ হিসেবে ৭ জানুয়ারি ১৯৭৩ উল্লেখ করেছে, তবে ভাষাটি সতর্ক (“declared to have been formed”)। প্রথম কয়েক বছর কোনো সামরিক কার্যক্রম হয়নি।

অমীমাংসিত: সশস্ত্র কার্যক্রম কবে শুরু হয়, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য উৎসেই বিরোধ আছে — বাংলাপিডিয়া বলে ১৯৭৬-এর শুরুতে, অন্য উৎসে ১৯৭৭। কোনো একটি বেছে নেওয়ার মতো প্রমাণ আমরা পাইনি। 

বাকশাল, আন্ডারগ্রাউন্ড ও ১৯৭৫-এর মোড়

১৯৭৪–৭৫ সময়টা বাংলাদেশের জন্য ছিল তীব্র অস্থিরতার — দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক সংকট। ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ), একদলীয় শাসনব্যবস্থা। সব রাজনৈতিক দলকে ভেঙে বাকশালে যোগ দিতে হবে — এই চাপ জনসংহতি সমিতির ওপরও আসে।

লারমা এক অস্বস্তিকর দ্বিধায় পড়েন। যোগ না দিলে তাঁকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে; যোগ দিলে নিজের মানুষ ভাববে তিনি আদর্শের সঙ্গে আপস করেছেন। শেষে তিনি কৌশলগত কারণে বাকশালে যোগ দেন — ভেবেছিলেন ভেতরে থাকলে পাহাড়ের দাবির কথা বলা সহজ হবে। বাকশাল ও আন্ডারগ্রাউন্ড পর্বে এই দ্বন্দ্বের বিবরণ আছে।

আর্কাইভের কিছু বিবরণে বাকশালে যোগদানের সাল ১৯৭৪ লেখা আছে; সেটি সঠিক নয় — বাকশাল ঘোষিত হয় ১৯৭৫ সালে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব নিহত হন। সামরিক শাসন জারি হয়, আর নতুন শাসকেরা পাহাড়ি আন্দোলনের দিকে আরও কঠোরভাবে তাকায়। লারমা বুঝলেন খোলাখুলি রাজনীতি আর সম্ভব নয় — তাঁকে আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে হবে।

এরপর তিনি বেশিরভাগ সময় গোপনে থাকতেন — কখনো দীঘিনালার ঘন জঙ্গলে, কখনো সীমান্তের কাছাকাছি ছোট ঘাঁটিতে। গ্রামের মানুষ রাতে গোপনে তাঁকে দেখতে আসত, খাবার দিত, খবর দিত।

এই মোড়টাই আসল মোড়। একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য থেকে আত্মগোপনে যাওয়া নেতা — সংসদীয় পথ বন্ধ হওয়ার পরেই পাহাড়ে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রশ্ন কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। ১৯৭৭ সালে সমিতির দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলনে এবং ১৯৮২ সালের সম্মেলনেও তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।

১০ নভেম্বর ১৯৮৩-এ কী ঘটেছিল?

১৯৮০-র দশকের শুরুতে জনসংহতি সমিতির ভেতরে মতভেদ বাড়তে থাকে। কেউ চাইত সশস্ত্র সংগ্রাম আরও তীব্র হোক, কেউ চাইত রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা থাকুক, আবার কেউ লারমার নেতৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলে — তাঁদের অভিযোগ ছিল, তিনি বেশি সমঝোতামুখী।

১৯৮২ সালের অক্টোবরে সরকার উপেন্দ্র লাল চাকমার মাধ্যমে সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু সমিতির অন্তর্দ্বন্দ্বের খবর ছড়িয়ে পড়লে সরকার যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। জুমজার্নালের আর্কাইভে জনসংহতি সমিতির গৃহযুদ্ধ ও তারপর লেখাটিতে এই পর্বের বিস্তারিত বিবরণ আছে; সেখানে সমিতির অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের সূচনা-তারিখ হিসেবে ১৪ জুন ১৯৮৩ উল্লেখ করা হয়েছে।

এই গৃহযুদ্ধের পরিণতিতেই ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর এম এন লারমা নিহত হন। স্থান — খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার খেদারাছড়ার উৎস। সশস্ত্র একটি দল সেখানে তাঁর ওপর হামলা চালায়। তাঁর সঙ্গে আরও আটজন সহযোদ্ধা নিহত হন। তাঁর বয়স তখন ৪৪। অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও হত্যাকাণ্ডের পর্বটি ধারাবাহিকে আছে।

মৃত্যুর খবর পাহাড়ে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। যে নেতা এক লক্ষ উচ্ছেদ হওয়া মানুষের ক্ষতকে নিজের ক্ষত বানিয়েছিলেন, তিনি প্রাণ হারালেন নিজের দলের ভেতর থেকে আসা গুলিতে। জুম্ম জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের শক্তি এখানেই ভেঙে পড়ে।

দায় নিয়ে যা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি: সব উৎস একমত যে হামলাটি সমিতির ভেতরের একটি বিভেদপন্থী গোষ্ঠীর। কিন্তু সেই গোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে দুই ধরনের বিবরণ চালু আছে। কিছু বিবরণে চারজন ব্যক্তির নাম নিয়ে গঠিত একটি চক্রকে দায়ী করা হয়; বাংলাপিডিয়ায় দায়ী বলা হয়েছে “প্রীতি গ্রুপ”-কে, যা প্রীতিকুমার চাকমার নেতৃত্বে সমিতি থেকে আলাদা হয়েছিল এবং ১৯৮৫ সালের ২৯ এপ্রিল রাঙামাটি স্টেডিয়ামে অস্ত্র সমর্পণ করে। এই দুটি বিবরণ একই ঘটনাকে বোঝাচ্ছে কি না, কোনো উৎস স্পষ্ট করেনি। বিভাজনের সময়কাল নিয়েও বিরোধ আছে — কোথাও ১৯৮২, কোথাও ১৪ জুন ১৯৮৩, আর বাংলাপিডিয়ার দুটি ভিন্ন নিবন্ধ পরস্পরের সঙ্গে অসঙ্গত। নথিভুক্ত রায় বা তদন্তপ্রতিবেদন ছাড়া এই লেখায় কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। এগুলো অভিযোগ, প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়। 

তাঁর মৃত্যুর পর ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা সমিতির নেতৃত্ব নেন।

লারমার উত্তরাধিকার আজ কোথায় দেখা যায়?

তাঁর তিনটি কেন্দ্রীয় নীতি

লারমার রাজনৈতিক চিন্তাকে তিনটি বাক্যে ধরা যায়, আর তিনটিই আজও পাহাড়ের আলোচনার কেন্দ্রে:

  1. জাতিসত্তা আর নাগরিকত্ব এক নয়। নাগরিক হিসেবে সবাই বাংলাদেশি হতে পারে, কিন্তু জাতিসত্তার ভিন্নতাকে সম্মান জানাতে হবে।
  2. স্বায়ত্তশাসন মানে বিচ্ছিন্নতা নয়। পাহাড়ি মানুষ বাংলাদেশকেই নিজের দেশ মনে করে; তারা নিজেদের সংস্কৃতি ও অধিকার রক্ষার স্বাধীনতা চায়।
  3. সংগঠনই শক্তি। ছাত্র, যুব, নারী — সব স্তরে সংগঠন গড়ে তোলাই ছিল তাঁর পদ্ধতি।

উত্তরাধিকার ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা পর্বে এই নীতিগুলো নিয়ে আলোচনা আছে।

সংবিধানের দ্বৈততা, আজও অমীমাংসিত

এখানে বৃত্তটা সম্পূর্ণ হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৩(ক) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। অথচ অনুচ্ছেদ ৬-এ বলা আছে, জাতি হিসেবে জনগণ বাঙালি — যে অনুচ্ছেদের বিরুদ্ধেই লারমা ১৯৭২ সালে ওয়াকআউট করেছিলেন।

এই দ্বৈত অবস্থান নিয়ে বিতর্ক এখনো চলছে। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পরিভাষা “উপজাতি” বা “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী”; আত্ম-পরিচয়ভিত্তিক অবস্থান “আদিবাসী”। পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পরও প্রশ্নটার নিষ্পত্তি হয়নি।

অনুচ্ছেদ ২৩(ক) সংবিধানে যুক্ত হয় ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে — অর্থাৎ এটি ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের অংশ ছিল না।

শান্তিচুক্তি ও অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন

দুই দশকের সংঘাতের পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকায় স্বাক্ষরিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি — সরকারের পক্ষে ও জনসংহতি সমিতির পক্ষে সন্তু লারমা। চুক্তির মূল ধারাগুলোর মধ্যে ছিল আঞ্চলিক পরিষদ গঠন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ভূমি কমিশন, সেনা শিবির কমানো, শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন, এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি রক্ষার নিশ্চয়তা। শান্তিচুক্তি নিয়ে ধারাবাহিকের পর্বটিও দেখা যায়।

চুক্তির অনেক ধারা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি — ভূমি কমিশন কাজ শুরু করলেও বাস্তব ফল সীমিত, সেনা শিবির কমেছে আংশিকভাবে, শরণার্থীদের বড় অংশ ফিরলেও অনেকের পুনর্বাসন অসম্পূর্ণ। এই ঘাটতিই পাহাড়ে হতাশা তৈরি করছে। শান্তিচুক্তির আগে-পরের হিসাব নিয়ে আর্কাইভে আলাদা লেখা আছে।

প্রতি বছর ১০ নভেম্বর

প্রতি বছর ১০ নভেম্বর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে মানুষ মোমবাতি জ্বালায়, স্মরণসভা করে। দিনটি জুম্ম জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়। যাঁরা তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন, তাঁদের স্মৃতিও আর্কাইভে আছে — আমার চোখে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা।

২০১৬ সালে, মৃত্যুর ৩৩ বছর পর, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ তাঁর মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করে।

যা এখনো জানা যায়নি

এই লেখার সব দাবি সমান নিশ্চিত নয়। তিনটি প্রশ্নের উত্তর আমরা মেলাতে পারিনি, এবং সেগুলো এখানে খোলাখুলি বলে রাখা দরকার:

  1. শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র কার্যক্রম কবে শুরু হয়? বাংলাপিডিয়া বলে ১৯৭৬-এর শুরুতে, অন্য নির্ভরযোগ্য উৎসে ১৯৭৭। দুটোই একই শ্রেণির উৎস; কোনটি ঠিক তা নির্ধারণ করা যায়নি।
  2. ১৯৮৩-এর হামলার দায় ঠিক কার? হামলাটি সমিতির ভেতরের বিভেদপন্থী গোষ্ঠীর — এ নিয়ে সব উৎস একমত। কিন্তু গোষ্ঠীটির পরিচয় নিয়ে দুই ধরনের বিবরণ আছে, দুটি একই কি না কেউ বলেনি, এবং বিভাজনের সময়কাল নিয়েও উৎসগুলো পরস্পরবিরোধী। কোনো তদন্তপ্রতিবেদন বা আদালতের রায় আমরা পাইনি।
  3. গণপরিষদে তাঁর বক্তব্যের মূল পাঠ কী ছিল? ১৯৭২ সালের কার্যবিবরণীর কোনো প্রতিলিপি মেলেনি। যে বাক্যগুলো আজ তাঁর নামে ঘুরে বেড়ায়, তার একাধিক পরস্পরবিরোধী রূপ চালু — কোনোটির উৎস দেখানো নেই। তাই এই লেখায় তাঁর কোনো বক্তব্য উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি।

এছাড়া কাপ্তাই জলাধারের মোট নিমজ্জিত এলাকার হিসাব নিয়েও উৎসে গরমিল আছে (১,০৩৬ বনাম ১,৩০৬ বর্গকিলোমিটার), তাই এই লেখায় কেবল আবাদি জমির পরিমাণ (৫৪,০০০ একর) ব্যবহার করা হয়েছে, যা একাধিক উৎসে মিলেছে।

নতুন নথি, সংসদীয় প্রতিলিপি বা প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য পাওয়া গেলে এই লেখা হালনাগাদ করা হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

এম এন লারমা কে ছিলেন?

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (১৯৩৯–১৯৮৩) ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা রাজনীতিবিদ, শিক্ষক ও আইনজীবী। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, পরে সভাপতি, এবং ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। সংবিধানে সবাইকে “জাতি হিসেবে বাঙালি” বলার বিরুদ্ধে গণপরিষদে আপত্তি তোলার জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয়।

লারমার চার দফা দাবি কী ছিল?

১৯৭২ সালের গোড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানকে দেওয়া দাবিপত্রে চারটি দফা ছিল: পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিজস্ব পরিষদসহ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ঘোষণা; ১৯০০ সালের CHT Regulation বহাল রাখা; চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা প্রথাগত রাজপ্রথার সাংবিধানিক স্বীকৃতি; এবং এসবের জন্য সংবিধানে গ্যারান্টি। কোনো দফাতেই বিচ্ছিন্নতার দাবি ছিল না।

এম এন লারমা কবে ও কোথায় নিহত হন?

১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর, খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার খেদারাছড়ার উৎসে সশস্ত্র হামলায় তিনি নিহত হন; তাঁর সঙ্গে আরও আটজন সহযোদ্ধা প্রাণ হারান। তাঁর বয়স ছিল ৪৪। সব উৎস একমত যে হামলাটি জনসংহতি সমিতির ভেতরের একটি বিভেদপন্থী গোষ্ঠীর, তবে সেই গোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে উৎসে বিরোধ রয়ে গেছে।

এম এন লারমা ও সন্তু লারমার সম্পর্ক কী?

জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা — সন্তু লারমা — এম এন লারমার ছোট ভাই। ১৯৭২ সালে জনসংহতি সমিতি গঠনের সময় তিনি বড় ভাইয়ের সঙ্গে ছিলেন। ১৯৮৩ সালে এম এন লারমার মৃত্যুর পর তিনি সমিতির নেতৃত্ব নেন এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে সমিতির পক্ষে স্বাক্ষর করেন।

কাপ্তাই বাঁধে কত মানুষ ভিটেছাড়া হয়েছিল?

একাধিক স্বাধীন উৎসের হিসাবে প্রায় ১৮,০০০ পরিবারের ১,০০,০০০-এর বেশি মানুষ উচ্ছেদ হন, এবং ৫৪,০০০ একর আবাদি জমি পানির নিচে চলে যায়। প্রায় ৪০,০০০ মানুষ ভারতে এবং প্রায় ২০,০০০ মিয়ানমারে আশ্রয় নেন। পাহাড়ে এই উচ্ছেদ পরিচিত “বড়পরং” নামে।

তথ্যসূত্র

নিচের উৎসগুলোর প্রতিটি পাতা পড়ে তথ্য নেওয়া হয়েছে।

  1. Parbatya Chattagram Jana Samhati Samiti, “Manabendra Narayan Larma”, pcjss.org — লিংক। জন্মতারিখ ও জন্মস্থান, বাবা-মায়ের নাম, শিক্ষার ধাপ, সমিতিতে পদ, মৃত্যুর স্থান।
  2. Parbatya Chattagram Jana Samhati Samiti, “About PCJSS”, pcjss.org — লিংক। সমিতির প্রতিষ্ঠার তারিখ ও মূলনীতি।
  3. Parbatya Chattagram Jana Samhati Samiti, “Golden Jubilee and 51st Founding Anniversary of PCJSS celebrated” (২০২৩) — লিংক। প্রতিষ্ঠাবর্ষ ১৯৭২ হওয়ার নিশ্চয়তা।
  4. Parbatya Chattagram Jana Samhati Samiti, “Kaptai Dam”, pcjss.org — লিংক। উচ্ছেদের সংখ্যা, আবাদি জমি, ভারত ও মিয়ানমারে অভিবাসন।
  5. Banglapedia, “Parbatya Chattagram Jana-Samhati Samiti” — লিংক। প্রতিষ্ঠার তারিখ প্রসঙ্গে ভিন্নমত (১৯৭৩); ১৯৮৩-এর হত্যায় প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর প্রসঙ্গ।
  6. Banglapedia, “Shanti Bahini” — লিংক। শান্তিবাহিনী গঠনের তারিখ (৭ জানুয়ারি ১৯৭৩) ও সামরিক কার্যক্রম শুরুর সাল (১৯৭৬)।
  7. Wikipedia, “Manabendra Narayan Larma” — লিংক। জন্মতারিখ; জন্মগ্রাম কাপ্তাই জলাধারে নিমজ্জিত; PCJSS ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২; সশস্ত্র কার্যক্রম শুরুর বিকল্প সাল (১৯৭৭)।
  8. Wikipedia, “Parbatya Chattagram Jana Samhati Samiti” — লিংক। প্রতিষ্ঠার তারিখ প্রসঙ্গে ভিন্নমত (১৯৭৩); চার দফা পেশের তারিখ ২৪ এপ্রিল ১৯৭২; চতুর্থ দফায় বাঙালি পুনর্বাসন নিষেধের পাঠ।
  9. সমকাল, “নিপীড়িত মানুষের শক্তি” (সম্পাদকীয় নিবন্ধ) — লিংক। জন্মতারিখ ও গ্রাম; সমিতিতে প্রথমে সাধারণ সম্পাদক পরে সভাপতি; আট সহযোদ্ধাসহ নিহত।
  10. UNPO, “Bangladeshi Government Expresses Condolence for Jumma Representative After 33 Years” — লিংক। মৃত্যুর স্থান ও বয়স ৪৪; ১৯৭৩ সালে সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ; সংসদের শোকপ্রস্তাব।
  11. Dhaka Tribune, “MN Larma remembered at 35th death anniversary” (১০ নভেম্বর ২০১৮) — লিংক। আট সহযোদ্ধাসহ নিহত হওয়ার স্বাধীন নিশ্চিতকরণ।
  12. Global Voices, “Indigenous artist depicts the hidden history behind the creation of Bangladesh’s Kaptai Lake” (২০২১) — লিংক। ১৮,০০০ পরিবার ও ৫৪,০০০ একরের হিসাব।
  13. International Rivers, “The Kaptai Dam: A Story of Disenfranchisement, Displacement, and Destruction” — লিংক। উচ্ছেদের সংখ্যা ও সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া মানুষের হিসাব।
  14. UPDF, “Brief History of the Chittagong Hill Tracts” — লিংক। প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের বিবরণেও সমিতির প্রতিষ্ঠাবর্ষ ১৯৭২ ও শান্তিবাহিনী তার পরের বছর।
  15. জুমজার্নাল আর্কাইভ, “জনসংহতি সমিতির গৃহযুদ্ধ ও তারপর” — লিংক। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ ও প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক; ১৪ জুন ১৯৮৩-এ গৃহযুদ্ধের সূচনা; ১৯৮৫ সালের ২৯ এপ্রিল অস্ত্র সমর্পণ; ১৯৮২ সালের অক্টোবরে সরকারি যোগাযোগ।
  16. জুমজার্নাল, “জীবন গাঁথায় এম এন লারমা” — ১০ পর্বের ধারাবাহিক (`mnlarma-blog`)। চার দফার বিষয়বস্তু; অনুচ্ছেদ ৬ ও ওয়াকআউট; বাকশাল ১৯৭৫; সমিতির সমান্তরাল কাঠামো; মৃত্যুস্থান; উত্তরাধিকারের তিনটি নীতি।

এই লেখাটি জুমজার্নালের একটি চলমান আর্কাইভ-এন্ট্রি। নতুন নথি বা উৎস পাওয়া গেলে হালনাগাদ করা হয়।

সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ আগস্ট ২০২৬

প্রসঙ্গ:এম এন লারমা, কাপ্তাই বাঁধ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, সন্তু লারমা

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা