Last updated Nov 3rd, 2026
3

পিনন কীভাবে তৈরি হয়, তার উত্তর তাঁতে নয়, জুমক্ষেতে শুরু হয়। পুরনো পদ্ধতিতে জুমে ধানের সঙ্গে কার্পাস বোনা হতো, অক্টোবর-নভেম্বরে তুলা তুলে রোদে শুকিয়ে, কাঠের রোলারে বীজ ছাড়িয়ে, বাঁশের ধনুকে ধুনে, চরকায় সুতা কাটা হতো। তারপর সেই সুতা রাঙানো হতো নীলপাতা বা কালমা, গাছের ছাল, শিকড় আর হলুদে, আর রং পাকা করা হতো ছাই, কষালো পাতা বা নদীর কাদায়।
পিনন বোনার যন্ত্র, অর্থাৎ কোমর তাঁত বা বেইন কীভাবে কাজ করে, তা আমাদের লেখা কোমর তাঁত পিনন বুনন: বেইন কীভাবে কাজ করে, একটি পিনন বুনতে কত দিন লাগে-তে আছে; নকশার খাতা আলাম নিয়ে আছে চাকমা আলাম নকশা। এই লেখা তার আগের অংশ নিয়ে: তুলা কোন জাতের, কবে ফলে, কোন যন্ত্রে সুতা হয়, কোন গাছ থেকে কোন রং আসে, আর সেই তথ্য কোন জনগোষ্ঠী সম্পর্কে কোন উৎসে লেখা। শেষের প্রশ্নটিই সবচেয়ে জরুরি, কারণ “পাহাড়িরা গাছের রঙে সুতা রাঙাতেন” বাক্যটি প্রায় সব জায়গায় আছে, কিন্তু কোন জাতি কোন গাছ ব্যবহার করতেন, সেটি খুব কম উৎসে আলাদা করে লেখা।
সূচিপত্র
পুরনো পদ্ধতিতে পিননের মতো কাপড় তৈরির পাঁচটি ধাপ উৎসগুলোতে বারবার আসে: জুমে কার্পাস ফলানো, তুলা শুকিয়ে বীজ ছাড়ানো, ধনুকে ধুনে চরকায় সুতা কাটা, সুতা গাছের রঙে রাঙানো ও রং পাকা করা, তারপর তানা সাজিয়ে কোমর তাঁতে বোনা। এই লেখা প্রথম চারটি ধাপ নিয়ে।
ধাপগুলোর সবচেয়ে পুরনো পূর্ণ বিবরণ আর. এইচ. স্নেইড হাচিনসনের। 1906 সালের An Account of the Chittagong Hill Tracts বইয়ে আর 1909 সালের জেলা গেজেটিয়ারে তিনি তুলা পরিষ্কার থেকে শুরু করে নীল, কালো, লাল, হলুদ ও সবুজ রং তৈরির ধাপ লিখেছেন। তবে তাঁর বিবরণ কোনো একটি জাতির নয়; তিনি লিখেছেন “the tribes”, অর্থাৎ পাহাড়ের জনগোষ্ঠীগুলো সাধারণভাবে (Hutchinson 1909, পৃ. 81–83)।
| ধাপ | কী করা হয় | উৎস |
|---|---|---|
| ১. বোনা ও তোলা | এপ্রিলে ধানের সঙ্গে কার্পাস বোনা; অক্টোবর থেকে নভেম্বর, কখনো ডিসেম্বর পর্যন্ত তোলা | Lewin 1869 |
| ২. শুকানো | খোসা থেকে তুলা ছাড়িয়ে পরিষ্কার করে মাদুরে দুই-তিন দিন রোদে | Hutchinson 1906, 1909 |
| ৩. বীজ ছাড়ানো | খাড়া কাঠামোয় আড়াআড়ি বসানো দুটি কাঠের রোলার | Hutchinson 1906, 1909 |
| ৪. ধোনা | তিন ফুট বাঁশের ধনুক, লতার আঁশের ছিলা | Hutchinson 1906, 1909; Dewan 2002 |
| ৫. সুতা কাটা | হাতে বাঁশের কাঠিতে তুলা গড়ানো, পেচ দণ্ডে মিহি করা, চরকায় কাটা | Dewan 2002; Mahbub ও অন্যান্য 2021 |
| ৬. রাঙানো | নীল/কালো, লাল, হলুদ, সবুজ — আলাদা আলাদা গাছ ও প্রক্রিয়া | Lewin 1869; Hutchinson 1906, 1909; আর্কাইভ |
| ৭. রং পাকা করা | ছাইয়ের পানি, কষালো পাতার দ্রবণ, তেল, নদীর কাদা | Hutchinson 1909; Mahbub 2021; Cultural Survival 2025 |
বাংলাপিডিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি তুলাকে Gossypium arboreum বলে, যার প্রচলিত নাম “কুমিল্লা তুলা”। এই তুলা জুমে ধানের সঙ্গে মিশিয়ে বোনা হয়। টমাস লেউইনের 1869 সালের বিবরণে বোনা হয় এপ্রিলে, আর তোলা হয় অক্টোবর থেকে নভেম্বরে, খারাপ মৌসুমে ডিসেম্বর পর্যন্ত।
বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি “Cotton” ভুক্তি লেখে, নামটি ব্রিটিশ আমলে এসেছে, কারণ এই তুলা তখন পাশের কুমিল্লা জেলার নদীবন্দর দিয়ে বাজারে যেত। এখন রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে আদিবাসীরা সীমিত পরিমাণে এটি চাষ করেন; সুতা ভালো হয় না বলে ব্যবহার মূলত হস্তশিল্পে, আর ফলন হেক্টরপ্রতি মাত্র প্রায় 10 কেজি (Banglapedia, “Cotton”)। বাংলা ভুক্তিটি যোগ করে, পাহাড়িরা তুলার জন্য মুঘল সরকারকে রাজস্ব দিতেন, আর পাহাড়ি নারীরা তুলা থেকে সুতা করে নানা রকম কাপড় বুনতেন; নিজের কাপড় নিজে বোনার প্রথা এখনো দেখা যায় (বাংলাপিডিয়া, “তুলা”)।
লেউইন তাঁর বইয়ের পরিশিষ্টে পাহাড়ি তুলার আলাদা বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর হিসাবে পাহাড়ের জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তুলার একটিই জাত ছিল; কিছু তুলা মাঝে মাঝে লালচে রঙের হতো, কিন্তু সেটি ভিন্ন প্রজাতি নয়। সাধারণত পাহাড়ি তুলা খাঁটি সাদা, তবে আঁশ খাটো ও খসখসে। ধান, ভুট্টা ও অন্য সবজির সঙ্গে বোনা হতো, আর বৃষ্টি বেশি হলে বা মৌসুমজুড়ে সমানভাবে না হলে ফলন অনেক কমে যেত (Lewin 1869, পৃ. 143)।
লেউইনের আরেক বইয়ে, আরাকানের পাহাড়ে ভ্রমণের বিবরণে, স্থানীয় তুলার প্রশংসা আছে: সেখানে কর্তৃপক্ষ বিদেশি উন্নত জাত চালু করতে চাইলেও গ্রামবাসীরা বলেছিলেন বিদেশি গাছ যথেষ্ট শক্ত নয় আর বেশি যত্ন চায়; লেউইনের চোখে দেশি তুলার আঁশ ছিল খুব মিহি আর রঙে প্রায় অতুলনীয় (Lewin 1870, Wild Races of South-Eastern India)। এই বিবরণ পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়, সীমান্তের ওপারের; দুই বইয়ে আঁশের মান নিয়ে লেউইনের দুই রকম মন্তব্য তাই দুই জায়গার তুলা নিয়ে।
তুলা তোলার সময় নিয়ে উৎসগুলো মোটামুটি একই দিকে, তবে মাসের নাম আলাদা ক্যালেন্ডারে:
জুমের মাসভিত্তিক পুরো চক্র আর ফসল তোলার আচার আমাদের লেখা জুম চাষ: পাহাড়ের কৃষিবিদ্যা, মাসে মাসে ও জুম চাষের আচার ও উৎসব-এ আছে। শেষেরটিতে ত্রিপুরাদের গরিয়া নৃত্যের দৃশ্যক্রমও আছে, যেখানে জুম কাটা থেকে ধান পরিষ্কারের পরে আসে সুতা কাটা আর কাপড় বোনা।
জুমের তুলা একসময় শুধু ঘরের কাপড়ের কাঁচামাল ছিল না, ছিল খাজনা আর রপ্তানির পণ্য। লেউইনের হিসাবে 1860-এর দশকের শেষে পাহাড় থেকে বছরে প্রায় 55,854 মণ তুলা সমতলে রপ্তানি হতো, ঘরের প্রয়োজনে রাখা তুলার বাইরে। পুরো অঞ্চলের পুরনো নামই ছিল কার্পাস মহল।
লেউইন লেখেন, পাহাড়িরা বিক্রির জন্য নিচে আনতেন তুলা ও কাঠ, আর তাঁর মতে পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া তুলার জন্য বিশেষ উপযোগী; 1867-68 সালের উৎপাদনকে তিনি গড় ফলনের নমুনা বলেছেন (Lewin 1869, পৃ. 7–8)। এমিল রিবেক 1882 সালের ভ্রমণে কর্ণফুলীতে দেখেছেন পাহাড়ি মানুষ বাঁশের ভেলা ও ছোট নৌকায় কাঁচা তুলা চট্টগ্রামে পাঠাচ্ছেন, বিনিময়ে নিচ্ছেন শুঁটকি, লবণ, মসলা ও হার্ডওয়্যার (Riebeck 1885)।
মারমা প্রধানদের প্রাপ্য নিয়ে লেউইনের আরেকটি বাক্য তুলার গুরুত্ব দেখায়: পরিবারপিছু বছরে 4 থেকে 8 টাকা করের বাইরে প্রত্যেকের ক্ষেতের ধান ও তুলার প্রথম ফসলের একটি অংশ প্রধানকে নিবেদন করা হতো (Lewin 1869)।
খাজনার অঙ্ক ও বদলের সাল নিয়ে উৎসগুলো এক নয়। লেউইনের চাকমা প্রধানদের তালিকায় 1782 সালে তুলার খাজনা কমিয়ে 500 মণ করা হয়, আর 1789 সালে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় খাজনা তুলার বদলে টাকায় দিতে হবে। আর্কাইভের “চাংমাটারা” লেখায় রাজা জানবক্স খাঁ ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে বার্ষিক 501 মণ কার্পাস দেওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হন, আর “চাকমা জাতি” লেখায় 1791 সাল থেকে কার্পাসের বদলে টাকায় রাজস্ব নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা আছে। একই লেখা 1713 সালে রাজা জল্পীল খানের মুঘল কর্তৃপক্ষকে 11 মণ তুলা উপঢৌকন পাঠানোর কথাও লেখে। এই সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের লেখা চাকমা বিদ্রোহ: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াই-এ আছে।
জুম থেকে তুলা খোসাসহ ঘরে এনে ভালো করে পরিষ্কার করা হতো, তারপর মাদুরে বিছিয়ে দুই-তিন দিন রোদে পুরোপুরি শুকানো হতো। শুকনো তুলার বীজ ছাড়ানো হতো দুটি কাঠের রোলারের যন্ত্রে, তারপর বাঁশের ধনুকের ছিলায় টংকার দিয়ে আঁশ আলগা করা হতো।
হাচিনসন যন্ত্রটির গড়ন লিখেছেন: খাড়া একটি কাঠামোর ওপর আড়াআড়ি বসানো দুটি কাঠের রোলার, একটি আরেকটির সামান্য ওপরে। তাঁর মতে এটি সমতলের যন্ত্রের মতোই, আর সারা পাহাড়ে একই নকশার। ধনুকটি তিন ফুট লম্বা বাঁশের টুকরো, ছিলা এক লতার মিহি আঁশে তৈরি; লতাটির নাম তিনি লিখেছেন 1906 সালে “dhouoo goos” আর 1909 সালে “dhauu gus”। ধোনা হতো মাদুরে, সাধারণত ঘরের ভেতর যেখানে ধান পরিষ্কার করা হয়; ছিলা বারবার টেনে ছেড়ে দিলে ঝনঝন শব্দে তুলার আঁশ আলগা হয় (Hutchinson 1906, পৃ. 64–65; Hutchinson 1909, পৃ. 81–82)।
চাকমা তাঁতশিল্প নিয়ে আর্শি দেওয়ানের 2002 সালের থিসিসে একই ধাপের বিবরণ আছে, সঙ্গে ধনুকের একটি স্থানীয় নাম: তুলা নরম করা হয় “dhanuni” নামের যন্ত্রে (Dewan 2002, পৃ. 14)। তানজেনা মাহবুব ও সহগবেষকদের 2021 সালের প্রবন্ধে চাকমাদের ক্ষেত্রে লেখা, শুকনো তুলা বীজ ছাড়িয়ে নরম করা হতো (Mahbub ও অন্যান্য 2021, পৃ. 3)।
এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য খেয়াল রাখার মতো। কার্পাস চাষ ও কাপড় বোনা পাহাড়ের প্রায় সব জাতির মধ্যে নথিভুক্ত, কিন্তু বীজ ছাড়ানোর রোলার বা ধোনার ধনুকের নিজস্ব নাম চাকমা ছাড়া অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষায় কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। হাচিনসনের “সারা পাহাড়ে একই নকশা” বাক্যটি যন্ত্রের গড়ন নিয়ে, নাম নিয়ে নয়।
ধোনা তুলা সমান তক্তায় রেখে হাতে ছোট বাঁশের কাঠিতে গড়িয়ে লম্বা পাঁজ বানানো হতো, তারপর চরকায় সুতা কাটা হতো: বাঁ হাতে তুলার পাঁজ, ডান হাতে চাকা ঘোরানো, আর টাকু ভরে গেলে সুতার গোলা খুলে নেওয়া। চাকমা উৎসে মাঝখানে আরেকটি ধাপ আছে — “পেচ” নামের দণ্ডে পাঁজ আরও মিহি করা।
হাচিনসনের বিবরণে পাঁজের এক মাথা টাকুর ডগায় লাগিয়ে বাঁ হাতে ধরা পাঁজ থেকে সুতা টেনে নেওয়া হয়, ডান হাত চাকা ঘোরায়, আর হাতের সামান্য নড়াচড়ায় সুতা টাকুতে সমানভাবে জড়ায় (Hutchinson 1909, পৃ. 82)। দেওয়ান লেখেন, পাঁজ “pech” নামের দণ্ডে আরও গোল করে তারপর “Charka”-য় সুতা কাটা হয়; মাহবুব ও সহগবেষকেরাও একই কথা লেখেন — পেচ দণ্ডে মিহি করা, তারপর চরকা (Dewan 2002, পৃ. 14; Mahbub ও অন্যান্য 2021)।
দেওয়ান হক (2002)-এর বরাতে চরকার কয়েকটি অংশের নামও দিয়েছেন: “pering” হলো একটি বাঁশের ভিত্তি, তাতে আরও চারটি বাঁশের ফালি, যা মাকড়সার জালের মতো চাকা গড়ে, আর চারপাশে দড়ি; “laidai” কাঠের তৈরি, গোল ও আয়তাকার অংশ আর মাথায় কাঁটা; আর “ranga” দিয়ে সুতাগুলো একটি সোজা বাঁশের রেখায় আলাদা করা হয় (Dewan 2002, পৃ. 14)।
আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখায় চাকমা বুননের সরঞ্জামের সমষ্টিগত নাম “সজপদর”, আর তালিকায় আছে তাগলক, বিয়োঙ, তারাম, ব-কাদি, সুচ্ছেক বাঁশ, সিয়েং, তাম্মে বাশ, তাচ্ছিচাম, কুদুক কাদাক, ঠুটচুমো বা থুচ্চুমো, চরগা, চোরগি, রিবেঙ, নাদেই, বেইনো ভেরা, রিঝি, রদং, লেভলেভি ও মুম (আর্কাইভ)। তালিকার “চরগা” ও “চোরগি” নামে চরকার সঙ্গে মিল আছে, কিন্তু আর্কাইভ কোনো সরঞ্জামের কাজ লেখেনি; তাই কোনটি সুতা কাটার আর কোনটি তাঁতের অংশ, এই তালিকা থেকে বলা যায় না।
“নাদেই” নামটি নিয়ে উৎসে সরাসরি অমিল। মাহবুব ও সহগবেষকদের প্রবন্ধে natai বা nadai হলো বাঁশের ফ্রেম, যাতে মাড় দেওয়া শুকনো সুতা পেঁচিয়ে গুটি বানানো হয়; কালচারাল সারভাইভালের 2025 সালের লেখায় nadei হলো চরকা (Mahbub ও অন্যান্য 2021; Cultural Survival 2025)।
চরকার একমাত্র পুরনো ছবি, যেটিতে জনগোষ্ঠীর নাম লেখা, রিবেকের বইয়ে। জার্মান ভ্রমণকারী এমিল রিবেক 1882 সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘুরে যে জিনিসপত্র সংগ্রহ করেছিলেন, তার প্লেট 12-এ আছে লুসাইদের চরকা — বাঁশের ফালিতে তৈরি, একটি বাঁশের দণ্ডে বসানো, যে দণ্ডটি ভারী পিরামিড আকৃতির কাঠের পায়ায় গাঁথা; বাঁশের ফালির তৈরি লুসাই সুতা-ধারক; সাদা তুলাসহ ম্রোদের টাকু; আর গাঢ় লাল তুলাসহ মারমাদের টাকু (Riebeck 1885, প্লেট 12)। ম্রো টাকুর তুলা সাদা আর মারমা টাকুর তুলা রাঙানো — এই একটি ছবিতেই দুই জাতির দুই অবস্থার সুতা পাশাপাশি।
হাচিনসনের হিসাবে সোয়া এক গজ চওড়া আর সাড়ে চার গজ লম্বা যে কাপড় নিম্নাংশে পরা হয়, তা বুনতে গড়ে সাড়ে চার পাউন্ড সুতা লাগে; সুতার হিসাব রাখা হয় “একশো জোড়া” ধরে। পাংখোয়াদের বিয়ের বড় কাপড় পোয়ানসিলপুই বুনতে আর্কাইভের হিসাবে অন্তত 3 মণ জুমের তুলা লাগে।
হাচিনসনের বিবরণে তানা দেওয়ার জন্য পাঁচটি বাঁশের খুঁটি মাটিতে পোঁতা হয়, তাতে একবারে দুটি করে সুতা পেঁচানো হয়, আর প্রান্তের খুঁটিগুলোতে পালা করে মোচড় দেওয়া হয় (Hutchinson 1906, পৃ. 65)। দেওয়ানের থিসিসে এই অংশটি প্রায় হুবহু আছে (Dewan 2002, পৃ. 15)। তানা দেওয়া ও বোনার বাকি ধাপ কোমর তাঁত পিনন বুনন লেখায় আছে।
পোয়ানসিলপুই নিয়ে আর্কাইভের “পাংখোয়া জাতির আদ্যাপান্ত” লেখায় বিস্তারিত আছে: Puansil Pui মানে বড় কাপড়, জুমের তুলায় বোনা, আগের দিনে এটি ছাড়া বিয়ে সম্পূর্ণ হতো না, কারণ পাংখোয়ারা একে খুব পবিত্র মনে করেন; কনে এটি স্বামীর ঘরে নিয়ে যান, আর প্রথম ব্যবহার হয় বাসর রাতে। কনের সঙ্গে যাওয়া জিনিসের তালিকাতেও আছে বিয়ের আগে তাঁর নিজের হাতে বোনা 40–50টি পরনের কাপড় আর জুমের তুলায় তৈরি একটি বড় কাপড় (আর্কাইভ)। আমাদের পাংখোয়া জনগোষ্ঠী লেখা জানায়, এখন এর জায়গায় কম্বল যায়।
শ্রমের হিসাবও লেউইন রেখেছেন। একজন পুরুষ ও তাঁর স্ত্রী বছরে 9 কানি জুম করতে পারেন; সেখানে বীজ লাগে 6 আড়ি ধান আর 3 আড়ি তুলা। তুলা তোলায় লাগে তিন দফায় — প্রথমবার 18 দিন, দ্বিতীয়বার 27 দিন, তৃতীয়বার 3 দিন। বছর শেষে ফলন 12 মণ তুলা, মণপ্রতি 3 টাকা দরে 36 টাকা, যা ওই হিসাবে 180 আড়ি ধানের দামের সমান (Lewin 1869, পৃ. 143–144)। লেউইন অন্য জায়গায় লিখেছেন, তিন আড়ি বীজে মোটামুটি 10 থেকে 12 মণ তুলা হয়, আর বিক্রি হয় মণপ্রতি 3 থেকে সাড়ে 3 টাকায়।
রং করার সময় আজকের হিসাবেও কম নয়। রাঙাপানির 75টি তাঁতি পরিবারের জরিপে রং করাতেই 1 থেকে দেড় সপ্তাহ লাগে বলে লেখা আছে; সেই হিসাব আর তাঁতির আয়ের দিক পিনন হাদির দাম কত, আর তাঁতির ঘরে কত যায় লেখায় আছে।
নীল রঙের জন্য কালমা বা নীলের পাতা মাটির পাত্রে পানিতে দুই দিন ভিজিয়ে, পানি ছেঁকে চুন মিশিয়ে ফেনা তুলে, তলানি শুকিয়ে ছোট পিঠা বানানো হতো। পরে ছাইয়ের পানির সঙ্গে মিশিয়ে সুতা চার-পাঁচবার চোবানো হতো। কালো পেতে নীল সুতা আবার কালা গাবের ছাল সেদ্ধ পানিতে ভেজানো হতো।
হাচিনসনের পূর্ণ ধাপগুলো এরকম (Hutchinson 1909, পৃ. 82–83; Hutchinson 1906, পৃ. 66–67):
লেউইনের 1869 সালের গাছের তালিকায় একই নামের গাছ আছে, কিন্তু রং আলাদা: “Kalagap” গাছের ছাল পাহাড়িরা সুতি সুতা গাঢ় নীল রাঙাতে ব্যবহার করেন; ছাল গুঁড়ো বা ছোট টুকরো করে পানিতে সেদ্ধ করা হয়; আর “Fool” নামের গাছ পুড়িয়ে তার ছাই এর সঙ্গে রং করায় ব্যবহার হয় (Lewin 1869, পৃ. 122)। লেউইনের তালিকায় কালাগাবের ছালেই গাঢ় নীল, হাচিনসনের বিবরণে কালা গাবের ছাল নীল সুতাকে কালো করে।
কালমা আসলে কোন উদ্ভিদ, তার বৈজ্ঞানিক নাম কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। হাচিনসন “kalma or indigo leaves” লিখে দুটিকে বিকল্প হিসেবে রেখেছেন; আর্কাইভের ত্রিপুরা লেখায় কালমা একটি গাছ, যার পাতা অন্য গাছের পাতা ও বাকলের সঙ্গে রং তৈরিতে লাগে। “কালা গাব” নিয়েও একই অবস্থা। হাচিনসনের 1909 সালের বনজ গাছের তালিকায় “Gab” হলো Diospyros embryopteris, যার আঠালো ফলের শাঁস নৌকার জোড়, মাছ ধরার জাল, রং করা ও চামড়া পাকানোর কাজে লাগে (Hutchinson 1909, পৃ. 73–74)। কিন্তু সেখানে কাজে লাগে ফল, আর রঙের বিবরণে লাগে “কালা গাব”-এর ছাল; দুটি একই গাছ কি না, উৎসে বলা নেই। কালচারাল সারভাইভালের লেখায় কালা গাবের ছালের পাশে বন্ধনীতে “from the banana tree” লেখা আছে, যা অন্য কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি (Cultural Survival 2025)।
লাল রং আসত পাহাড়িদের ভাষায় “রংগাছ” নামের একটি গাছের শিকড় থেকে। শিকড় ছোট টুকরো করে থেঁতলে মণ্ড বানিয়ে তেঁতুল বা “পোল” গাছের ছাই মেশানো পানিতে মেশানো হতো, সুতা সারা রাত ভিজিয়ে ছায়ায় ধীরে শুকানো হতো, আর শেষবার চোবানোর আগে সুতায় উদ্ভিজ্জ তেল মাখানো হতো।
হাচিনসন 1906 সালে নামটির অর্থও দিয়েছেন — “Rang Gach” মানে “colour tree”। তাঁর বিবরণে পানি খুব সাবধানে ছাঁকতে হয়, যাতে ছাইয়ের একটি কণাও না থাকে; উজ্জ্বল লাল পেতে দুই-তিনবার ভেজাতে হয়, আর পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো তাড়াহুড়ো চলে না। শেষ চোবানোর আগে উদ্ভিজ্জ তেল মাখালে রং “একেবারে পাকা” হয় (Hutchinson 1906, পৃ. 67; Hutchinson 1909, পৃ. 83)। লেউইনের তালিকায় “Runggach” গাছ থেকে লাল রং পাওয়া যায়, আর কাঠ হিসেবে গাছটির কোনো দাম নেই (Lewin 1869, পৃ. 122)।
রংগাছের বৈজ্ঞানিক নাম কোনো পার্বত্য চট্টগ্রামের উৎসে নেই। হাচিনসনের 1909 সালের বনজ গাছের তালিকায় লাল রঙের আরেকটি উৎস আছে, কিন্তু সেখানে কাপড়ের কথা নেই: চিকরাশি (Chickrassia tabularis) গাছের ফুল থেকে লাল রং পাওয়া যায় আর ছাল কষালো; কাঁঠাল (Artocarpus integrifolia) থেকে হলুদ রং (Hutchinson 1909, পৃ. 73–74)। এই গাছগুলো কোন জনগোষ্ঠী কোন কাপড়ে ব্যবহার করতেন, তালিকায় লেখা নেই।
লাল রঙের ব্যবহার পুরনো বিবরণগুলোতে চোখে পড়ার মতো। রিবেকের প্লেটে মারমা টাকুতে গাঢ় লাল তুলা, আর মারমা তাঁতে বোনা হচ্ছে গাঢ় নীল ও “madder red” রঙের কাপড়, মাঝে সাদা ডোরা (Riebeck 1885, প্লেট 12)। রিবেক যে “madder red” লিখেছেন, তা রঙের বর্ণনা; মারমারা কোন গাছ থেকে সেই লাল পেতেন, তিনি লেখেননি।
হাচিনসনের বিবরণে হলুদ রং বানানো হতো হলুদ আর আম গাছের ছাল মিশিয়ে; সবুজ হতো নীল আর হলুদ একসঙ্গে মিশিয়ে, আর দুই ক্ষেত্রেই প্রস্তুতির ধাপ নীল রঙের মতোই। আর্কাইভের একটি লেখায় ম্রো প্রসঙ্গের ঠিক পরে হলুদের পাশাপাশি আছে দোপাটি ফুলের পাতা আর শিমের পাতার রস।
হাচিনসনের ভাষায় নীল ও হলুদের মিশেল “চমৎকার সবুজ” দেয় (Hutchinson 1909, পৃ. 83)। দেওয়ানের থিসিসে একই কথা, “vibrant green”, আর সূত্র হিসেবে দেওয়া হয়েছে বেসাইনের 1958 সালের বই (Dewan 2002, পৃ. 14–15)।
এই উৎসটি আলাদা ধারার। আর্কাইভের “পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে আদিবাসী লোকজ্ঞান” লেখায় ম্রোদের ‘স্রাম’-এর কথার ঠিক পরের বাক্য: “অনেকে” জুমে ফলানো দোপাটি ফুলের পাতার রস, শিমের পাতার রস আর হলুদ দিয়ে সুতা রাঙান। এই “অনেকে” কেবল ম্রো, না পাহাড়ের অন্য জনগোষ্ঠীও, লেখাটি স্পষ্ট করে না (আর্কাইভ)। এখানে রঙের উৎস বনের গাছ নয়, জুমেরই ফসল — শিম আর হলুদ দুটোই জুমের তালিকায় থাকে। কোন রস থেকে কোন রং আসে, লেখাটিতে আলাদা করে বলা নেই।
রং পাকা করার চারটি উপায় উৎসে আছে: নির্দিষ্ট গাছ পুড়িয়ে তার ছাইয়ের পানি, কষালো পাতার দ্রবণ, লাল রঙে শেষ ধাপে উদ্ভিজ্জ তেল, আর রাঙানো সুতা নদীর পাড়ের নরম কাদায় পুঁতে রাখা। প্রথম তিনটি ঔপনিবেশিক বিবরণে, চতুর্থটি কেবল একুশ শতকের লেখায়।
হাচিনসন 1909 সালে স্পষ্ট লেখেন, রং বসাতে মর্ড্যান্ট হিসেবে কষালো পাতার দ্রবণ ব্যবহার হয়; বাছাই করা রঙের মিশেলে সুতা ভিজিয়ে রোদে টাঙানো হয়, কয়েক দফা চোবালে কাঙ্ক্ষিত রং আসে, আর রং এত পাকা যে কোনো ব্যবহার বা ধোয়ায় তাতে এতটুকু প্রভাব পড়ে না (Hutchinson 1909, পৃ. 83)। কোন গাছের পাতা, তা লেখা নেই।
ছাইয়ের উৎস হিসেবে বিভিন্ন উৎসে বিভিন্ন গাছের নাম:
| গাছ (উৎসের বানানে) | কোন রঙে বা কী কাজে | উৎস |
|---|---|---|
| পোড়া বাঁশ, ডুমুর গাছ | নীল রঙের পিঠার সঙ্গে ছাইয়ের পানি | Hutchinson 1906, 1909 |
| তেঁতুল বা “Pole” গাছ | লাল রঙের শিকড়-মণ্ডের পানিতে | Hutchinson 1906, 1909 |
| “Fool” | কালাগাবের ছালের সঙ্গে রং করায় | Lewin 1869 |
| “Emelick” ও “Koosoom” | কাপড় রং করায় ছাই | Lewin 1869 |
| কুসুম (Schleichera trijuga) | পোড়া কাঠের ছাই রং করার কাজে | Hutchinson 1906, 1909 |
লেউইনের “Fool” আর হাচিনসনের “Pole” একই গাছ কি না, বানানের মিল থাকলেও কোনো উৎসে বলা নেই। লেউইনের “Koosoom” আর হাচিনসনের কুসুম (Schleichera trijuga) নামে মেলে, আর দুই উৎসেই এর ছাই রং করায় লাগে; হাচিনসন যোগ করেন, এর টক ফল পাহাড়িরা লম্বা পথ হাঁটার সময় খান (Hutchinson 1909, পৃ. 73)।
নদীর কাদার কথা প্রথম পাওয়া যায় মাহবুব ও সহগবেষকদের 2021 সালের প্রবন্ধে, চাকমাদের প্রসঙ্গে: রং পাকা করতে সুতা নদীর পাড়ের নরম কাদায় পুঁতে রাখা হয় (Mahbub ও অন্যান্য 2021)। কালচারাল সারভাইভালের 2025 সালের লেখাও বলে, বোনার আগে রং টেকসই করতে সুতা নরম নদী-কাদায় পোঁতা হয় (Cultural Survival 2025)। হাচিনসন, লেউইন, রিবেক বা দেওয়ানের লেখায় কাদার উল্লেখ নেই। কাদায় কতক্ষণ রাখা হয়, কোন রঙের জন্য, সেটিও কোথাও লেখা নেই।
জুমের তুলায় নিজের কাপড় বোনার কথা অন্তত আটটি জনগোষ্ঠী সম্পর্কে কোনো না কোনো উৎসে আছে। কিন্তু নির্দিষ্ট রঙের গাছের নাম জাতি ধরে পাওয়া যায় মাত্র দুটির ক্ষেত্রে — ত্রিপুরাদের কালমা আর ম্রোদের ‘স্রাম’। চাকমাদের নামে যে গাছের তালিকা চলে, তার উৎস একটি সাধারণ বিবরণ।
| জনগোষ্ঠী | জুমের তুলা / নিজে সুতা কাটা | রঙের গাছের নাম | পুরনো বিবরণে কাপড়ের রং |
|---|---|---|---|
| চাকমা | আছে (দেওয়ান 2002; মাহবুব 2021; আর্কাইভ) | রংগাছ, কালা গাব, নীলপাতা, হলুদ, আমছাল — হাচিনসনের সাধারণ তালিকা থেকে | মোটা নীল ও লাল ঘরে-বোনা (লেউইন 1869) |
| মারমা | আছে (লেউইন; আর্কাইভ, আহসান 1993) | পাওয়া যায়নি | গাঢ় নীল, লাল পাড়; গাঢ় লাল সুতা (লেউইন; রিবেক) |
| ত্রিপুরা | আছে (আর্কাইভ) | কালমা গাছের পাতা, অন্য গাছের পাতা ও বাকল (আর্কাইভ) | লাল-নীল ডোরা (লেউইন 1869) |
| তঞ্চঙ্গ্যা | জুমে কার্পাস (আর্কাইভ) | পাওয়া যায়নি | — |
| ম্রো | আছে (লেউইন 1869; আর্কাইভ) | ‘স্রাম’ (কালো) (আর্কাইভ); পরের বাক্যে দোপাটি পাতা, শিম পাতা, হলুদ — শুধু ম্রোদের কি না অস্পষ্ট | সাদা তুলার টাকু (রিবেক) |
| খুমি | দেশি তুলা, প্রাকৃতিক রং (রিবেক) | পাওয়া যায়নি | — |
| লুসাই | চাষ, সুতা কাটা, রং, বোনা নিজেরাই (রিবেক); নারীরা সুতা কাটেন (লেউইন 1870) | পাওয়া যায়নি | নীল, তাতে লাল ও হলুদ ডোরা (লেউইন 1869) |
| পাংখোয়া | আছে (আর্কাইভ) | পাওয়া যায়নি | — |
| বম | কার্পাস তুলা উৎপাদন (আর্কাইভ) | পাওয়া যায়নি | — |
চাকমাদের সম্পর্কে তুলা থেকে কাপড় পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লেখা আছে, আর সবচেয়ে বেশি ধার করা বিবরণও। লেউইন 1869 সালে লিখেছেন, চাকমাদের পোশাক মারমাদের মতো, শুধু নারীদের নিম্নাংশের কাপড় মোটা নীল ও লাল ঘরে-বোনা কাপড়ের, আর একটু খাটো করে পরা (Lewin 1869, পৃ. 74)। আর্কাইভের “চাংমাটারা” লেখায় আছে, জুম থেকে পাওয়া তুলার সুতায় শার্টও বোনা হতো।
তুলা চাকমা জীবনে শুধু কাঁচামাল নয়। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখায় বিয়ের আশীর্বাদে একটি থালায় চাল ও তুলা আনা হয়, আর আশীর্বাদকারীরা এক টুকরো তুলায় সামান্য চাল নিয়ে কনের মাথা ছোঁয়ান (আর্কাইভ)। দেওয়ানের থিসিসে চাকমা বর-কনেকে প্রবীণেরা আশীর্বাদ করেন ধান (খাবারের প্রতীক), তুলা (কাপড়ের প্রতীক) আর দূর্বা ঘাস দিয়ে; দেওয়ান লেখেন, বিয়েতে তুলা তাই খুব প্রতীকী (Dewan 2002, পৃ. 20)। কঠিন চীবর দানে 24 ঘণ্টার মধ্যে তুলা থেকে চীবর তৈরির রীতি কোমর তাঁত পিনন বুনন লেখায় আছে।
মারমাদের ক্ষেত্রে জুমে তুলা বোনা ও তোলার মাসের হিসাব আর্কাইভে আছে, পুরনো কাপড়ের রঙের বর্ণনা আছে, কিন্তু রঙের গাছের নাম কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। লেউইন একটি মেলার বর্ণনায় পাহাড় থেকে নামা গ্রামের দলগুলোর কথা লিখেছেন, যেখানে মেয়েদের পরনে লাল পাড়ের গাঢ় নীল ঘরে-বোনা কাপড়, বুকে চকলেট রঙের ডোরাকাটা সাদা কাপড়; অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়েরা গাঢ় নীল ঘরে-বোনার বদলে বেগুনি রেশমের কাপড় পরতেন (Lewin 1869, পৃ. 42)। লেউইন এখানে যাঁদের কথা বলছেন, তিনি তাঁদের “Khyoungtha” বলেছেন, যা তাঁর বইয়ে মারমা ও সংশ্লিষ্ট নদীতীরের জনগোষ্ঠীর নাম।
রিবেকের প্লেটে মারমা টাকুতে গাঢ় লাল তুলা আর মারমা তাঁতে নীল-লাল কাপড়ের কথা আগেই এসেছে। রিবেক সেখানে সুতাকে “woollen” লিখেছেন, অর্থাৎ পশমি; একই বইয়ের অন্য প্লেটে মারমা শিশুর কাপড় “native cotton”, অর্থাৎ দেশি তুলার, সাধারণ রঙে রাঙানো (Riebeck 1885, প্লেট 1 ও 12)। মারমা তাঁত ও থামির বাকি কথা থামি আর আঙ্গি: মারমা নারীরা কোন তাঁতে কী বোনেন লেখায়।
ত্রিপুরাদের ক্ষেত্রে আর্কাইভই একমাত্র উৎস, যেখানে একটি জাতির রঙের গাছের নাম সরাসরি লেখা। “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত” অনুযায়ী জুমে কার্পাস জন্মায়, সেই কার্পাস থেকে ত্রিপুরা নারীরা সুতা তৈরি করেন, আর তুলা থেকে সুতা তৈরি ও সুতায় রং করার প্রযুক্তি তাঁরা “প্রাচীনকাল থেকে” ব্যবহার করে আসছেন; রং তৈরি হয় কালমা নামের গাছের পাতা, অন্য গাছের পাতা ও গাছের বাকল দিয়ে (আর্কাইভ)। একই লেখায় ত্রিপুরাদের সব গোত্রের পোশাকে লাল, কালো, নীল, হলুদ ও সাদা রং দেখা যায়, আর বর্তমানে ত্রিপুরা নারীরা রং করা সুতা কিনে কাপড় বোনেন।
লেউইন 1869 সালে ত্রিপুরা নারীদের হাঁটুর একটু নিচ পর্যন্ত নিম্নাংশের কাপড়কে বলেছেন নিজেদের তৈরি খুব মোটা সুতি কাপড়, লাল ও নীল ডোরাকাটা; অবিবাহিত মেয়েরা বুকে রঙিন, ঝালরওয়ালা কাপড় পরতেন (Lewin 1869, পৃ. 82–83)। রিনাই-রিসার রং ও নকশা নিয়ে বাকি কথা রিনাই, রিসা ও কুবাই লেখায়।
তঞ্চঙ্গ্যাদের পিনুইন কোন রঙের, তা বিস্তারে লেখা আছে, কিন্তু সেই রং কোন গাছ থেকে আসত, কোনো উৎসে নেই। আর্কাইভের “তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখায় পিনুইনের দুই প্রান্ত অনুভূমিকভাবে কালো, ভেতরের দিকে লাল, মাঝখানে লাল ও হলুদে একই মাপের দুই পাড়, আর কয়েক নাল সবুজ, বেগুনি ও আকাশি রঙের প্রশস্ত অংশ। বাংলাপিডিয়া পিনুইনকে বলে সাত রঙের হাতে বোনা কাপড়, আর লেখে, তঞ্চঙ্গ্যারা বোনায় সাদা সুতা যত কম সম্ভব ব্যবহার করেন (Banglapedia, “Tanchangya, The”)। সবুজ, বেগুনি ও আকাশি — এই তিন রঙের কোনোটির প্রাকৃতিক উৎস কোনো পার্বত্য চট্টগ্রামের বিবরণে নেই। পোশাকের বাকিটা তঞ্চঙ্গ্যা পোশাক লেখায়।
ম্রোদের ক্ষেত্রে রঙের একমাত্র জাতিভিত্তিক বিবরণ আর্কাইভে, আর সেটিই এই বিষয়ে সবচেয়ে নির্দিষ্ট লেখা। “পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে আদিবাসী লোকজ্ঞান” লেখা জানায়, ম্রোরা জুমে ‘স্রাম’ নামের এক উদ্ভিদ জন্মান; এটি গরম পানিতে সেদ্ধ করে সুতা কালো রং করা হয়, আর সেই সুতায় মেয়েদের পরনের কাপড় ‘ওয়ানক্লাই’ তৈরি হয়। এর ঠিক আগের বাক্যগুলো সব আদিবাসী সম্পর্কে সাধারণভাবে লেখা: জুমের কার্পাস থেকে “বিশেষ উপায়ে” সুতা তৈরি হয়, বনের নানা গাছ ও লতাপাতার রস মিশিয়ে সুতা রাঙানো হয়, আর সেই সুতায় বিছানার কম্বল, গায়ের কম্বল, ওড়না, পরনের কাপড় ও জামা বোনা হয় (আর্কাইভ)।
লেউইন 1869 সালে ম্রোদের সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁরা জুমে ফলানো তুলা থেকে নিজেদের কাপড় বোনেন (Lewin 1869, পৃ. 94)। রিবেকের প্লেটে ম্রো টাকুতে সাদা তুলা, আর মারমা ও ম্রো নারীদের তাঁতের পিঠ-বন্ধনী একসঙ্গে দেখানো। বান্দরবানের সুয়ালকভিত্তিক রুটস অ্যান্ড রাইটস কালেক্টিভের একটি লেখা জানায়, ম্রো সমাজে তুলা থেকে বীজ ছাড়ানো, সুতা কাটা, রাঙানো ও বোনা সবই নারীদের কাজ, মেয়েরা মায়ের পাশে বসে শেখে, আর ওয়ানক্লাই, ওয়ানচা, খাবাং, ডং — সব ম্রো পোশাক কোমর তাঁতে বোনা; লেখাটিতে লেখকের নাম, তারিখ বা সূত্র নেই (Roots and Rights Collective)। ‘স্রাম’ আসলে কোন উদ্ভিদ, কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। ম্রো পোশাকের মাপ ও বানান নিয়ে ওয়ানক্লাই ও কোমরতাঁত লেখায় আছে।
খুমিদের কাপড় নিয়ে সবচেয়ে পুরনো নির্দিষ্ট বিবরণ রিবেকের সংগ্রহে। তাঁর প্লেট 1 ও 2-এ একটি খুমি নারীর শিশু বহনের কাপড়, খুমি নারীদের বুকের কাপড়, পুরুষদের নেংটি ও থলে আছে, আর রিবেক লেখেন, এগুলো দেশি তুলার, প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো; ঝালর তৈরি হয় কাপড়ের সুতার প্রান্ত পেঁচিয়ে (Riebeck 1885, প্লেট 1–2)। কোন রং, কোন গাছ, লেখা নেই। আমাদের খুমি জনগোষ্ঠী লেখায় খুমিদের জুম-ফসলের তালিকায় তুলা আছে।
লুসাইদের ক্ষেত্রে রিবেক সরাসরি লিখেছেন, তাঁদের সব কাপড় তুলার, যা তাঁরা নিজেরাই চাষ করেন, সুতা কাটেন, রাঙান ও বোনেন (Riebeck 1885, পৃ. 5)। লেউইনের 1870 সালের বইয়ে লুসাই নারীদের কাজের তালিকায় পানি আনা, কাঠ কাটা, চাষ, ফসল কাটায় সাহায্য, রান্না ও মদ তৈরির পাশে আছে সুতা কাটা; আর হাওলং গোত্রে মৃতদেহ সাত দিন ঘরের কড়িকাঠে ঝোলানো থাকার সময় বিধবা স্ত্রীকে নিচে বসে সুতা কাটতে হয় বলে তিনি লিখেছেন (Lewin 1870)। লেউইন 1869 সালে লুসাই পুরুষদের লম্বা চাদর সম্পর্কে লেখেন, সবচেয়ে ভালোগুলো নীল রঙে রাঙানো, তাতে লাল ও হলুদ ডোরা বোনা (Lewin 1869, পৃ. 103)। এই বর্ণনাগুলো তখনকার লুসাই পাহাড়ের, শুধু বাংলাদেশের লুসাইদের নয়। বাংলাদেশের লুসাইদের পোশাকের নাম লুসাই জনগোষ্ঠী লেখায় আছে।
পাংখোয়াদের ক্ষেত্রে আর্কাইভ পুরুষের পোশাকের তালিকায় স্পষ্ট লেখে কোনটি জুমের তুলার: ‘পোয়ান পুই’ কোমর তাঁতের কাপড়, নানা রং আর জুমের তুলায় নিজস্ব তৈরি; ‘কর ড’ ফুলহাতা জামা, জুমের তুলায় তৈরি; ‘ঙৌ লেপ পোয়ান’ নিছক সাদা কাপড়, বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য (আর্কাইভ)। রং কোথা থেকে আসে, লেখা নেই।
বমদের ক্ষেত্রে আর্কাইভের “বম জাতির আদ্যোপান্ত” লেখায় কার্পাস তুলা ও তিল অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রচুর উৎপন্ন হওয়ার কথা আছে, আর তুলা উৎপাদনের জন্য অঞ্চলটিকে তখন ‘কার্পাস মহল’ বলা হতো। কিন্তু বমরা সেই তুলা থেকে কীভাবে সুতা কাটতেন বা কী দিয়ে রাঙাতেন, কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
আজ চাকমা বস্ত্র নিয়ে যেসব লেখায় “রংগাছের শিকড়ে লাল, কালা গাবের ছালে কালো, নীলপাতায় নীল, হলুদ আর আমছালে হলুদ” পাওয়া যায়, প্রায় একই তালিকা আছে হাচিনসনের 1906 সালের বইয়ে, যেখানে বিবরণটি কোনো একক জাতির নয়। প্রকাশের ক্রমে উৎসগুলো এমন:
এর মানে এই নয় যে চাকমারা এই গাছ ব্যবহার করতেন না। দেওয়ান রাঙাপানির তাঁতিদের সঙ্গে কাজ করেছেন, আর মাহবুবের প্রবন্ধে নদীর কাদার ধাপটি পুরনো তালিকায় নেই, অর্থাৎ অন্তত সেটি অন্য কোনো উৎস থেকে এসেছে। তবে গাছের নামগুলোর বেলায় পরের লেখাগুলোর বিবরণ হাচিনসনের সাধারণ বিবরণের সঙ্গে প্রায় হুবহু মেলে, আর কোনো চাকমা তাঁতির নিজের মুখে রঙের গাছের তালিকা প্রকাশিত কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
উল্টো দিকে, যে দুটি তথ্য সরাসরি একটি জাতির নামে আর আমাদের আর্কাইভে আছে — ত্রিপুরাদের কালমা আর ম্রোদের স্রাম — সেগুলো কোনো ইংরেজি উৎসে পুনরাবৃত্ত হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে রঙের গাছ নিয়ে কোনো উদ্ভিদতাত্ত্বিক জরিপ পাওয়া যায়নি, কিন্তু ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আছে। ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা 2013–14 সালে রাজ্যের দক্ষিণ ও পশ্চিম জেলায় জনগোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে 39টি রঙের উদ্ভিদ নথিভুক্ত করেছেন, অনেকগুলোর ককবরক নামসহ।
এই তালিকা বাংলাদেশের ত্রিপুরাদের পদ্ধতি নয়; এটি অন্য রাষ্ট্রে, অন্য সময়ের জরিপ, আর গবেষকেরা জানিয়েছেন অনেক উদ্ভিদ সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাধারণ। তবু পার্বত্য চট্টগ্রামের উৎসে যে রংগুলোর গাছ অজানা, তার তুলনার জন্য তালিকাটি কাজে লাগে (Sutradhar ও অন্যান্য 2015):
| উদ্ভিদ | স্থানীয় নাম (জরিপে) | অংশ | রং |
|---|---|---|---|
| Morinda tinctoria | Haldiruk (ককবরক) | শিকড় | লাল, সুতি কাপড়ে |
| Musa acuminata | Thailic (ককবরক) | কাণ্ডের রস | কালো, ঐতিহ্যবাহী পোশাকে |
| Diospyros peregrina | Makur (ককবরক) | ফল | কালো, জাল ও সুতিতে |
| Strobilanthes cusia | অজানা | পাতা, কচি কুঁড়ি | কালো ও নীল |
| Indigofera tinctoria | Nil | সবুজ গাছ | নীল |
| Curcuma domestica | Haldi | কন্দ | হলুদ |
| Mallotus philippensis | Khurchub (ককবরক) | বীজ | লাল |
| Terminalia chebula | Bakhla (ককবরক) | ফল | কালো, সুতিতে |
দুটি সারি পার্বত্য চট্টগ্রামের উৎসের পাশে রাখার মতো। লাল রঙের শিকড় — হাচিনসনের “রংগাছ”ও শিকড় থেকে লাল দেয়। আর কলাগাছের কাণ্ডের রসে কালো — কালচারাল সারভাইভাল কালা গাবের পাশে “কলাগাছ” লিখেছে। তবে রংগাছ Morinda কি না, বা কালা গাব কলাগাছের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, কোনো উৎস তা বলে না; এখানে তুলনা কেবল প্রশ্ন তোলে, উত্তর দেয় না। জরিপটি আরও জানায়, রং তৈরির জ্ঞান এখন মূলত বয়স্কদের মধ্যেই চর্চিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
উৎসগুলো তিনটি কারণ দেয়: কারখানার সস্তা কাপড় ও সুতা, জুম চাষ কমে যাওয়া, আর বাজারে রং করা সুতার সহজলভ্যতা। ক্ষয়ের কথা নতুন নয় — হাচিনসন 1906 সালেই লিখেছিলেন, পশ্চিমের নিম্নমানের আমদানি জায়গা নিচ্ছে, আর ঘরে বোনার দিন শেষ হয়ে আসছে।
হাচিনসনের ভাষায় বোনা একসময় মেয়েদের শিক্ষার অপরিহার্য অংশ ছিল, রান্না শেখার মতোই জরুরি (Hutchinson 1906, পৃ. 64)। দেওয়ান রাজা দেবাশীষ রায়ের লেখা উদ্ধৃত করেছেন: কয়েক দশক আগেও বাজার এত কম আর দূরে দূরে ছিল যে প্রায় সব গ্রামীণ আদিবাসী সম্প্রদায় পাহাড়ি তুলা থেকে নিজেরাই সুতা কেটে কাপড় বুনত; দূরের বসতিতে তখনো সেটা চালু, কিন্তু শহরে বাইরের সস্তা কাপড় কেনা সহজ; আর জুম চাষ কমে যাওয়া ও বাজারব্যবস্থার বিস্তার ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ব্যবহার কমার বড় কারণ (Dewan 2002, পৃ. 5, Roy 2000-এর বরাতে)। দেওয়ান আরও লেখেন, জমির নিবিড় ব্যবহারে জুমক্ষেতের তুলার মতো কাঁচামালে প্রবেশাধিকার সীমিত হয়েছে (পৃ. 23, Roy 1995-এর বরাতে)।
কালচারাল সারভাইভালের লেখা ক্ষয়ের আরেকটি দিক দেখায়: তুলা চাষে নির্দিষ্ট আবহাওয়া আর যত্ন লাগত, রঙের জন্য বন থেকে উপকরণ জোগাড় করতে হতো; প্রথমে পুরুষেরা রং করার মতো ধাপ থেকে সরে যান, আর কারখানার কাপড়ের সঙ্গে জুমে যৌথ তুলা চাষ ও প্রাকৃতিক রঙের জ্ঞানও ম্লান হয় (Cultural Survival 2025)। মাহবুব ও সহগবেষকেরা লেখেন, এখন বেশির ভাগ সুতা বাজার থেকে কেনা, তবে কঠিন চীবর দানের সময় এখনো ঐতিহ্যগতভাবে তুলা তুলে সুতা কাটা হয়।
আজকের সমস্যাটা উল্টো দিকেরও। আর্কাইভে প্রকাশিত রাঙামাটির বস্ত্রশিল্প নিয়ে একটি প্রতিবেদন জানায়, তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি কারখানায় আদিবাসী নকশার পোশাক তৈরি হচ্ছে, কিন্তু কাঁচামালের মধ্যে “সূতা ও রঙের প্রচুর অভাব” (আর্কাইভ)। যে অঞ্চলের নামই ছিল কার্পাস মহল, সেখানে তাঁতের সবচেয়ে বড় ঘাটতি সুতা আর রং। আর বাংলাপিডিয়ার হিসাবে পাহাড়ি তুলার ফলন হেক্টরে মাত্র প্রায় 10 কেজি, সুতাও উৎকৃষ্ট নয় — অর্থাৎ শুধু ঐতিহ্যের কারণে জুমের তুলায় ফেরাও সহজ নয়।
পুরো বেইন-ঐতিহ্যের সামগ্রিক পাঠ আছে আমাদের মূল লেখা পিনন হাদি ও বেইন: পাহাড়ি কোমর-তাঁতের পূর্ণ পাঠ-এ।
পুরনো পদ্ধতিতে পিননের সুতা আসত জুমের কার্পাস থেকে। তুলা রোদে শুকিয়ে কাঠের রোলারে বীজ ছাড়িয়ে, বাঁশের ধনুকে ধুনে, পেচ দণ্ডে মিহি করে চরকায় সুতা কাটা হতো; তারপর গাছের রঙে রাঙিয়ে কোমর তাঁত বা বেইনে বোনা হতো। এখন বেশির ভাগ সুতা বাজার থেকে কেনা হয় (Dewan 2002; Mahbub ও অন্যান্য 2021)।
বাংলাপিডিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি তুলাকে Gossypium arboreum বলে, প্রচলিত নাম “কুমিল্লা তুলা”, কারণ ব্রিটিশ আমলে এটি কুমিল্লার নদীবন্দর দিয়ে বাজারে যেত। আঁশ খাটো, সুতা উৎকৃষ্ট নয়, ফলন হেক্টরে প্রায় 10 কেজি। লেউইন 1869 সালে লিখেছেন, পাহাড়ে তুলার একটিই জাত, সাধারণত খাঁটি সাদা, কখনো লালচে।
লেউইনের 1869 সালের বিবরণে এপ্রিলে বোনা তুলা জুমের সব ফসলের শেষে, অক্টোবর থেকে নভেম্বরে তোলা হয়, খারাপ মৌসুমে ডিসেম্বর পর্যন্ত। আর্কাইভ অনুযায়ী ত্রিপুরারা কার্তিক-অগ্রহায়ণে তুলা তোলেন, আর মারমারা ‘নাইত’ (নভেম্বর-ডিসেম্বর) মাসে তুলা, আদা ও হলুদ তোলেন (আহসান 1993-এর বরাতে)।
হাচিনসনের 1906 ও 1909 সালের বিবরণে খাড়া কাঠামোয় আড়াআড়ি বসানো দুটি কাঠের রোলারের যন্ত্রে বীজ ছাড়ানো হয়, যা তাঁর মতে সারা পাহাড়ে একই নকশার। তারপর তিন ফুট লম্বা বাঁশের ধনুকে, লতার আঁশের ছিলায় টংকার দিয়ে তুলা ধোনা হয়। চাকমা উৎসে ধনুকের নাম “dhanuni” (Dewan 2002)।
হাচিনসনের বিবরণে কালমা বা নীলের পাতা মাটির পাত্রে দুই দিন ভিজিয়ে, পানি ছেঁকে চুন মিশিয়ে ফেনা তুলে তলানি শুকিয়ে পিঠা বানানো হতো। পরে বাঁশ বা ডুমুরের ছাইয়ের পানির সঙ্গে মিশিয়ে 10–15 দিন রোদে রেখে, সুতা আধা ঘণ্টা করে চার-পাঁচবার চোবানো হতো। বিবরণটি কোনো একক জাতির নয়।
পাহাড়িদের ভাষায় “রংগাছ” বা “colour tree”-এর শিকড় থেকে, হাচিনসনের 1906 ও লেউইনের 1869 সালের বিবরণে। শিকড় থেঁতলে তেঁতুল বা “পোল” গাছের ছাই মেশানো পানিতে সুতা সারা রাত ভিজিয়ে ছায়ায় শুকানো হতো, দুই-তিনবার; শেষবারের আগে উদ্ভিজ্জ তেল মাখানো হতো। রংগাছের বৈজ্ঞানিক নাম কোনো উৎসে নেই।
হাচিনসনের বিবরণে নীল সুতা “কালা গাব” গাছের ছাল সেদ্ধ পানিতে দুই ঘণ্টা ভিজিয়ে কালো করা হতো। লেউইনের 1869 সালের তালিকায় একই “Kalagap” ছাল সরাসরি গাঢ় নীল দেয়। ম্রোদের ক্ষেত্রে আর্কাইভ লেখে, জুমে জন্মানো ‘স্রাম’ নামের উদ্ভিদ গরম পানিতে সেদ্ধ করে সুতা কালো করা হয়, যা দিয়ে ওয়ানক্লাই বোনা হয়।
কালমার বৈজ্ঞানিক নাম কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। আর্কাইভের ত্রিপুরা লেখায় কালমা একটি গাছ, যার পাতা অন্য গাছের পাতা ও বাকলের সঙ্গে মিশিয়ে ত্রিপুরা নারীরা সুতার রং তৈরি করেন। হাচিনসন 1906 ও 1909 সালে নীল বা কালো রঙের জন্য “kalma or indigo leaves” লিখেছেন, অর্থাৎ নীলপাতার বিকল্প হিসেবে।
উৎসে চারটি উপায় আছে: বাঁশ, ডুমুর, তেঁতুল, কুসুম প্রভৃতি গাছের ছাইয়ের পানি; কষালো পাতার দ্রবণ, যাকে হাচিনসন 1909 সালে মর্ড্যান্ট বলেছেন; লাল রঙে শেষ চোবানোর আগে উদ্ভিজ্জ তেল; আর নদীর পাড়ের নরম কাদায় সুতা পুঁতে রাখা। কাদার কথা কেবল 2021 ও 2025 সালের লেখায় আছে।
পিননের আলাদা হিসাব পাওয়া যায়নি। হাচিনসনের 1906 সালের হিসাবে সোয়া এক গজ চওড়া ও সাড়ে চার গজ লম্বা নিম্নাংশের কাপড়ে গড়ে সাড়ে চার পাউন্ড সুতা লাগে, আর সুতা গোনা হয় “একশো জোড়া” ধরে। পাংখোয়াদের বিয়ের বড় কাপড় পোয়ানসিলপুই বুনতে আর্কাইভের হিসাবে অন্তত 3 মণ জুমের তুলা লাগে।
নিয়মিত চর্চার কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। মাহবুব ও সহগবেষকেরা (2021) লেখেন, চাকমারা এখন বেশির ভাগ সুতা বাজার থেকে কেনেন, তবে কঠিন চীবর দানে এখনো তুলা তুলে সুতা কাটা হয়। আর্কাইভ অনুযায়ী ত্রিপুরা নারীরা এখন রং করা সুতা কেনেন, আর পাংখোয়াদের বিয়ের পোয়ানসিলপুইয়ের জায়গায় এখন কম্বল যায়।
আধুনিক লেখায় চাকমাদের নামে রংগাছের শিকড় (লাল), কালা গাবের ছাল (কালো), নীলপাতা (নীল), হলুদ ও আমছাল (হলুদ) পাওয়া যায় (Dewan 2002; Mahbub 2021)। তবে তালিকাটি হাচিনসনের 1906 সালের বিবরণের সঙ্গে প্রায় হুবহু মেলে, যেখানে এটি পাহাড়ের সব জনগোষ্ঠীর সাধারণ বর্ণনা। চাকমা তাঁতির নিজের বিবরণে আলাদা তালিকা পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 2 নভেম্বর 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী নারী, চাকমা, জুম, ত্রিপুরা, ম্রো
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।