Last updated Oct 23rd, 2026
0

ত্রিপুরা পোশাক রিনাই রিসা আর কুবাই — এই তিন নামে ত্রিপুরা নারীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক ভাগ করা যায়। জুমজার্নালের আর্কাইভের বিবরণে রিনাই কোমর থেকে নিচের অংশ ঢাকে; রিসা আর কুবাই ঢাকে কোমরের উপরের অংশ। রিসা দিয়ে বুক বাঁধা হয়, পাগড়ির মতো মাথায় জড়ানো হয়, আর অনেক সময় রিনাই শক্ত করতে কোমরেও বাঁধা হয় (ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত)।
নামগুলো সহজ, কিন্তু প্রতিটি কাপড়ের পেছনে আছে আলাদা ইতিহাস: কোন দফার নারী কোন নকশা পরেন, বিয়েতে বরপক্ষ কী নিয়ে যায়, বৈসুর সকালে নদীতে কেন হাতে বোনা কাপড় ভাসানো হয়, আর সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে একই কাপড় কীভাবে সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে। পাহাড়ি কোমর তাঁত আর অন্য জনগোষ্ঠীর পোশাক নিয়ে আমাদের মূল লেখা পিনন হাদি ও বেইন: পাহাড়ি কোমর-তাঁতের পূর্ণ পাঠ; এখানে কেবল ত্রিপুরা নারীর পোশাক। বাংলাদেশের উৎস আগে রাখা হয়েছে; ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎস যেখানে এসেছে, সেখানে আলাদা করে বলা আছে।
সূচিপত্র
বাংলাদেশের উৎসে ত্রিপুরা নারীর প্রধান পরিধেয় তিনটি: রিনাই, রিসা ও কুবাই। রিনাই কোমর থেকে নিচে পরা হয়। রিসা ও কুবাই কোমরের উপরের অংশ ঢাকে। রিসার কাজ একাধিক: বক্ষবন্ধনী, মাথার পাগড়ি, আর রিনাই শক্ত করে ধরে রাখার কোমরবন্ধ। এই বিবরণ জুমজার্নালের আর্কাইভের “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখার।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎস একই পোশাককে আরেকভাবে ভাগ করে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (2022 ও 2024) লিখেছে, ত্রিপুরি নারীর পোশাকের তিন অংশ রিসা, রিগনাই ও রিকুতু: রিসা উপরের পোশাক, রিগনাই নিচের, আর রিকুতু ওড়না বা শাড়ির আঁচলের মতো জড়ানোর কাপড় (Indian Express, 2024)। অর্থাৎ নিচের আর বুকের কাপড়ের নাম দুই দেশের উৎসে মেলে; তৃতীয় অংশের নাম মেলে না — বাংলাদেশের আর্কাইভে কুবাই, ভারতের উৎসে রিকুতু।
| অংশ | বাংলাদেশের উৎস (জুমজার্নাল আর্কাইভ) | ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎস |
|---|---|---|
| নিচের কাপড় | রিনাই — কোমর থেকে নিচের অংশ ঢাকার জন্য | রিগনাই — কোমরে জড়িয়ে পরা; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ভাষায় শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘পরা’ |
| বুকের কাপড় | রিসা — বক্ষবন্ধনী; মাথায় পাগড়ির মতো; রিনাই শক্ত করতে কোমরে বাঁধা | রিসা — উপরের পোশাক হিসেবে ধড়ে দুবার পেঁচানো; মাথার কাপড়, স্টোল, সম্মানের উপহার |
| তৃতীয় অংশ | কুবাই — কোমরের উপরের অংশ ঢাকে; পুরুষের ক্ষেত্রে ‘কুবাই (শার্ট)’ | রিকুতু — ওড়না বা আঁচলের মতো জড়ানো; নববিবাহিত নারীর মাথা ঢাকতেও ব্যবহৃত |
ছকের ভারতের ঘরগুলো দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (2022, 2024) ও ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Tripuri dress” পাতা থেকে। উইকিপিডিয়ার পাতাটি নিজেই সতর্ক করে দিয়েছে যে তাতে যথেষ্ট তথ্যসূত্র নেই, তাই সেখানকার যে দাবি অন্য কোনো উৎসে মেলেনি, তা এই লেখায় উৎসের নাম ধরে বলা হয়েছে।
রিনাই ত্রিপুরা নারীর নিচের কাপড়, কোমর থেকে নিচে পরা হয়। একটিমাত্র রিনাই নেই: আর্কাইভের তালিকায় অন্তত ছয় রকম রিনাইয়ের নাম আছে — রিনাই চাঙগ্রং, রিনাই খাইচৈংতৈ, রিনাই নাগি, রিনাই কলফ, রিনাই বেখ: আর য়ংসা রিনাই। তালিকাটি “ইত্যাদি” দিয়ে শেষ, অর্থাৎ পূর্ণ নয়।
এই নামগুলোর প্রতিটি দেখতে কেমন, কোনটি কোন উপলক্ষে পরা হয়, আর্কাইভের লেখায় বলা নেই। খাগড়াছড়ির একটি ছবির ক্যাপশনে প্রথম আলো (2019) কেবল জানিয়েছে, ত্রিপুরা নারীরা “জরি ও সুতা দিয়ে” পরনের কাপড় রিনাই তৈরি করছেন — খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার বাঙ্গালকাটিমুখ ত্রিপুরাপাড়ায় (প্রথম আলো, 2019)।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎসে রিনাইয়ের নামতালিকা অনেক লম্বা। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Tripuri dress” পাতায় 39টি নকশার নাম আছে — আনজি, চামথ্বিবার, খামজাং, কুয়াইচু, মালিবার, তাখুমতৈ, সাদা, সালু প্রভৃতি — তবে পুরো তালিকাটিই “citation needed” চিহ্নিত। একই পাতার দাবি, “রিগনাই চামাথ্বিবার” সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রিগনাই, অন্য সব রিগনাই এখান থেকেই এসেছে। “Rignai” পাতাটি একে বর্ণনা করেছে মেরুন বা অন্য রঙের পাড়ওয়ালা সাদা কাপড় হিসেবে, যা বিয়ে, গরিয়া পূজা ও হাংরাইয়ের মতো উপলক্ষে পরা হয়।

দুই তালিকা পাশাপাশি রাখলে একটি জিনিস চোখে পড়ে: বাংলাদেশের আর্কাইভের ছয়টি নামের একটিও উইকিপিডিয়ার 39 নামের তালিকায় হুবহু নেই, আর চামাথ্বিবার নামটি বাংলাদেশের কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি। এটা ভিন্ন দফার ভিন্ন নকশা, একই নকশার ভিন্ন নাম, নাকি কেবল তালিকার অসম্পূর্ণতা — কোনো উৎসে বলা নেই।
রিনাইয়ের নকশার উৎপত্তি নিয়ে ভারতের উৎসে একটি কাহিনি প্রচলিত। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, ত্রিলোচন বা সুব্রাই রাজা তাঁর 250 জন স্ত্রীর জন্য প্রায় 250 রকম রিগনাই নকশা উদ্ভাবন করেছিলেন বলে কথিত — এবং সঙ্গে সঙ্গে জানিয়েছে, “এই ইতিহাস বিতর্কিত”। উইকিপিডিয়ার পাতায় কাহিনিটি উল্টো দিক থেকে বলা: যে নারী নতুন নকশা উদ্ভাবন করতেন, রাজা তাঁকে বিয়ে করতেন। দুটির কোনোটির পক্ষে সমসাময়িক কোনো দলিল উদ্ধৃত হয়নি।
রিসা একটি লম্বা, সরু বোনা কাপড়, যার প্রধান কাজ বুক বাঁধা। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের উৎস মিলিয়ে দেখা যায়, একই কাপড় মাথার পাগড়ি, কোমরবন্ধ, পুরুষের নাচের সাজ আর অতিথিকে দেওয়া সম্মানের উপহার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। রিসা তাই পোশাকের একটি অংশের চেয়ে বেশি — বহু কাজের একটি কাপড়।
আর্কাইভের বিবরণে রিসার তিনটি ব্যবহার: বক্ষবন্ধন, মাথায় পাগড়ির মতো করে পরা, আর রিনাই আরও শক্ত করতে কোমরে বাঁধা। রিসারও ধরন আছে — খাজা রিসা, বখরুক রিসা ও চাঙ রিসা; এই তালিকাও “ইত্যাদি” দিয়ে শেষ।

ভারতের উৎসে রিসার ব্যবহারের তালিকা আরও দীর্ঘ। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের (2024) বিবরণে রিসা গরিয়া পূজার মতো ধর্মীয় উৎসবে ব্যবহৃত হয়; বিয়ে ও উৎসবে পুরুষেরা একে পাগড়ি করেন; ধুতির উপর কোমরবন্ধ হিসেবে বাঁধেন; কিশোর-কিশোরীরা মাথার স্কার্ফ করে; শীতে মাফলার হয়; আর মায়ের পিঠে শিশুকে বেঁধে রাখার কাপড় হিসেবেও কাজ করে। বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মান জানাতে রিসা উপহার দেওয়া হয়।
ভারতের হ্যান্ডলুম এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিলের (HEPC) পাতায় রিসার মাপও দেওয়া আছে: সাধারণত প্রায় পাঁচ ফুট লম্বা, উপরের শরীরে জড়ানো হয়। সেখানে কয়েকটি নকশার নাম — ক্বচাক পালি, কসম পালি, তাখুমত্বি, খামজাং — আর বলা হয়েছে, প্রতিটি অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথিকে স্বাগত ও সম্মান জানাতে রিসা উপহার দেওয়া হয় (HEPC)।
বাংলাদেশের উৎসে রিসার মাপ পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পুরুষের রিসা ব্যবহারের প্রত্যক্ষ বিবরণ আছে, যা নিচে গরয়া নাচের অংশে।
কুবাই ত্রিপুরা পোশাকের সেই অংশ, যার সম্পর্কে উৎস সবচেয়ে কম বলে। জুমজার্নালের আর্কাইভ অনুযায়ী কুবাই ও রিসা পরা হয় কোমরের উপরের অংশ ঢাকতে। একই লেখা জানায়, অতীতে ত্রিপুরা পুরুষেরাও ঘরে তৈরি গামছা ও “কুবাই (শার্ট)” পরতেন। অর্থাৎ নামটি নারী ও পুরুষ দুজনের উপরের পোশাকের ক্ষেত্রেই এসেছে।
এর বাইরে কুবাইয়ের কাট, হাতা, রং বা বোনার পদ্ধতি — কোনো পঠিত উৎসে নেই। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ইংরেজি উৎসগুলোতে কুবাই নামটিই পাওয়া যায়নি। সেখানে তৃতীয় অংশের নাম রিকুতু (জড়ানোর কাপড়), আর ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Tripuri dress” পাতায় পুরুষের উপরের পোশাকের নাম “কামচ্বলুই বরক”। উইকিমিডিয়া কমন্সে “Tripuri Kamchwlwi” নামের ছবিটির বিবরণে একে বলা হয়েছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ত্রিপুরিদের ঐতিহ্যবাহী শার্ট।
তাই কুবাই নিয়ে সবচেয়ে সতর্ক কথা এটুকু: বাংলাদেশের আর্কাইভে কুবাই উপরের পোশাক ও পুরুষের শার্ট; ভারতের ইংরেজি উৎসে এই নাম নেই, পুরুষের শার্টের নাম সেখানে কামচ্বলুই। দুই নাম একই জামার, নাকি আলাদা জামার — কোনো উৎস মিলিয়ে বলেনি।
ত্রিপুরা সমাজ দফা বা গোত্রে বিভক্ত, আর বাংলাদেশের দুটি উৎস বলে প্রতিটি দফার পোশাক আলাদা। আর্কাইভের ভাষায়: “ত্রিপুরা রমণীর পোশাক রিনাই-রিসার নকশার বিন্যাস দেখে কে কোন দফার রমণী তা অনায়াসেই চিহ্নিত করা যায়।” কোনো কোনো গোত্রের রিনাই-রিসা কয়েক ধরনেরও হয়।
দফার সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশের উৎসগুলো একমত। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও সংস্কৃতি (উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙামাটি, 1994) বইয়ে আছে, ত্রিপুরারা মোট 36টি দলে বা দফায় বিভক্ত, প্রত্যেক দফার আলাদা কথ্যরীতি, পোশাক-পরিচ্ছদ ও অলংকার আছে, আর এর মধ্যে 16টি উপদল বাংলাদেশে বসবাস করে; বাকিরা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে (পৃ. 96; বইটি জুমজার্নালের ই-বুক সংগ্রহে আছে)। বাংলাপিডিয়ার “Tripuris, The” নিবন্ধেও (লেখক প্রভাংশু ত্রিপুরা) 36 দফার কথা আছে, নামতালিকাসহ — গুরপাই, রিয়াং, খালি, জমাতিয়া, নাইতং, কেওয়া, উসুই, হালাম, মুরাসিং প্রভৃতি (Banglapedia)।
ভারতের উৎসেও একই দাবি। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে, ত্রিপুরিদের প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব রিগনাই নকশা আছে, আর নকশা এত স্বতন্ত্র যে দেখে নারীর গোত্র চেনা যায় — তবে একই বাক্যে যোগ করেছে, এখন গোত্রগুলো একে অপরের রিগনাই অবাধে পরছে আর নতুন নকশা বোনা হচ্ছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলেছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের প্রায় সব 19টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীতে রিসা প্রচলিত, তবে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব নকশা আছে। HEPC-র পাতায় রিসার মোটিফকে বলা হয়েছে জনগোষ্ঠী আলাদা করে চেনার উপায়।
কোন দফার কোন নকশা — এই মিলটি কোনো উৎসে লেখা নেই। আর্কাইভ বলে নকশা দেখে দফা চেনা যায়, কিন্তু কোন নকশা কোন দফার, সেই তালিকা দেয় না।
ত্রিপুরা পোশাকের সুতা একসময় আসত জুম থেকে। আর্কাইভের বিবরণে ত্রিপুরারা জুম চাষ করেন, জুমে কার্পাস জন্মায়, আর সেই কার্পাস থেকে নারীরা সুতা তৈরি করেন। তুলা থেকে সুতা কাটা ও সুতায় রং করার প্রযুক্তি তাঁরা “প্রাচীনকাল থেকে” ব্যবহার করে আসছেন।
রঙের উৎস হিসেবে আর্কাইভ একটি গাছের নাম দিয়েছে: কালমা গাছের পাতা, সঙ্গে অন্যান্য গাছের পাতা ও বাকল। কালমা কোন উদ্ভিদ, তার বৈজ্ঞানিক নাম বা কোন রং আসে কোন গাছ থেকে — লেখা নেই।
রঙের ব্যবহারও আর্কাইভে আছে: ত্রিপুরাদের সব গোত্রের পোশাকে লাল, কালো, নীল, হলুদ ও সাদা রং দেখা যায়, তবে ত্রিপুরা নারীরা লাল ও কালো রংই বেশি ব্যবহার করেন।
এখন সেই প্রক্রিয়া বদলে গেছে। একই লেখা জানায়, বর্তমানে ত্রিপুরা নারীরা বাজার থেকে রং করা বিভিন্ন রঙের সুতা কিনে কাপড় বোনেন, আর অনেকে টেক্সটাইলে তৈরি রিনাই-রিসাও ব্যবহার করেন। প্রথম আলোর 2019 সালের ছবিতে রিনাই বোনা হচ্ছে জরি ও সুতা দিয়ে।
ভারতের দিকেও একই রকম পরিবর্তনের কথা আছে। সেলভেজ ম্যাগাজিনের 2021 সালের একটি লেখায় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের একটি নথিভুক্তি প্রকল্পের উল্লেখ আছে, যেখানে পুরোনো রিসায় সুতার ধরন রেশম ও তুলা থেকে অ্যাক্রিলিকে বদলে যাওয়ার হিসাব রাখা হয়েছে (Selvedge, 2021)। গ্লোবাল ইনসিএইচ-এর বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রিয়াং জনগোষ্ঠী কালো, নীল ও বাদামি রং গাছ থেকে নেয়, আর কেবল সাদা সুতা মিলের (Global InCH)। রিয়াং বাংলাদেশের দফাতালিকাতেও আছে, কিন্তু বাংলাদেশের রিয়াংদের রং নিয়ে আলাদা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
রিনাই-রিসা বোনেন ত্রিপুরা নারীরা, কোমর তাঁতে। প্রথম আলো (2019) জানিয়েছে, জুম চাষ শেষ হওয়ার পর অক্টোবর-নভেম্বরে পাহাড়ের বেশির ভাগ নারীর হাতে কাজ থাকে না, তখন বাড়তি আয়ের আশায় তাঁরা কোমর তাঁতের পোশাক বোনা শুরু করেন। খাগড়াছড়িতে এক জোড়া রিনাই-রিচা বিক্রি হয়েছিল 2,800 থেকে 3,000 টাকায়।

ওই প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা বড়নাল বড় ত্রিপুরাপাড়ার যুবনিকা ত্রিপুরার হিসাব আছে। তিনি 17 বছর ধরে কোমর তাঁতে কাজ করছেন। সাতজনের সংসার জুম চাষে চলছিল না বলে তিনি সারা বছর রিনাই-রিচা বোনেন; মাসে দু-তিন জোড়া, প্রতি জোড়া 2,800 থেকে 3,000 টাকা, মাস শেষে আয় 4-5 হাজার টাকা। প্রতিবেদনের শুরুর বাক্যটিও লক্ষ করার মতো: কোমর তাঁত কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ নয়, “যুগ যুগ ধরে পাহাড়ের নারীরা কোমরতাঁতে তৈরি করে আসছেন নিজেদের পরিধেয় পোশাক।”
দ্য ডেইলি স্টারে 2010 সালে প্রকাশিত একটি বই-সমালোচনায় বলা হয়েছে, বইটি বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বৌদ্ধ চাকমা, খিয়াং, খুমি, চাক, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ম্রো, হিন্দু ত্রিপুরা, খ্রিস্টান পাংখোয়া, বম ও লুসাইদের বয়নশিল্প নিয়ে; আর আগে নিজের ও পরিবারের জন্য বোনা হলেও “এখন বোনা হয় বাজারের জন্য” (Farida Shaikh, The Daily Star, 2010)।
চাকমা পিনন-হাদির দাম ও তাঁতির আয়ের তুলনামূলক হিসাব আছে পিনন হাদির দাম কত, আর তাঁতির ঘরে কত যায় লেখায়। ত্রিপুরা রিনাই-রিসার জন্য 2019-এর পরের কোনো দামের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ত্রিপুরা বিয়েতে রিনাই-রিসা কনের সাজের প্রধান উপকরণ, আর সেটি আসে বরপক্ষ থেকে। মুকুল কান্তি ত্রিপুরা লিখেছেন, বরযাত্রী কনের বাড়িতে পৌঁছালে কনের মা বরকে কুলায় ধূপ জ্বালিয়ে বরণ করে ঘরে বসান, তারপর বরপক্ষের আনা গহনা, রিনাই, রিসা ও সাজগোজের জিনিস নিয়ে কনেকে সাজাতে যান (ত্রিপুরা সমাজের বিবাহ সংস্কৃতি)।
এই উপহার আগে থেকেই ঠিক হয়। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার 1994 সালের বইয়ে আছে, বিয়ের প্রস্তাবে কনের পিতার সম্মতি থাকলে সেদিনই কনের জন্য কোন পোশাক-পরিচ্ছদ ও কোন কোন অলংকার লাগবে, তার দাবি বরপক্ষের কাছে তোলা হয় (পৃ. 101)। মুকুল কান্তি ত্রিপুরার লেখাতেও প্রস্তাবের আলোচনায় কনেপক্ষ গয়না ও কাপড়-চোপড়ের চাহিদা জানায়।
উসুই দফার নিয়ম আরও নির্দিষ্ট। আর্কাইভের “প্রথাগত আইনে আদিবাসী ত্রিপুরা নারীর অবস্থান” লেখায় (সুস্মিতা চাকমার গ্রন্থের বরাতে) আছে, উসুই ত্রিপুরাদের বরযাত্রীকে বাঁশের দাঁত মাজার ব্রাশ, সিঁদল, শুঁটকি, “লাল রিনাই” ও 12 থেকে 14 বোতল মদসহ কিছু সামগ্রী নিয়ে যেতে হয়; বরকে সাজানো হয় 5 হাত সাদা পাগড়ি ও 7 হাত গায়ের চাদরে। একই লেখা জানায়, এখন খ্রিস্টধর্মাবলম্বী উসুইরা এসব রীতি তেমন পালন করেন না (প্রথাগত আইনে আদিবাসী ত্রিপুরা নারীর অবস্থান)।
বিয়ের মূল আচারেও কাপড় আছে, তবে সেটি রিনাই-রিসা নয়। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার বইয়ে বর ও কনের কোমরে আলতোভাবে জড়িয়ে একটি সাদা চাদর বেঁধে দেওয়ার কথা আছে, তারপর অচাই বীজযুক্ত তুলা ও চাল নিয়ে মন্ত্র পড়েন। আর্কাইভের লেখাতেও বর-কনেকে নতুন চাদরে জড়িয়ে দুই প্রান্ত বেঁধে দেওয়ার (জোড়াবন্ধন) বিবরণ আছে।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎসে বিয়েতে রিসার আরেকটি ব্যবহার: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, বিয়ে ও উৎসবে পুরুষেরা রিসা পাগড়ি করে পরেন, আর রিকুতু দিয়ে নববিবাহিত নারীর মাথা ঢাকা হয়।
বৈসু ত্রিপুরাদের বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসব, আর এর প্রথম দিন হারি বৈসুতে ফুলের সঙ্গে নদীতে হাতে বোনা নতুন কাপড়ের টুকরা ভাসানো হয়। কেন ভাসানো হয়, তার উত্তর খাগড়াপুরের আয়োজকের মুখে: নতুন বছরে রিনাই-রিসা বুননে যাতে দক্ষতা ও নিপুণতা বাড়ে।
এপ্রিল 2026-এ খাগড়াছড়ির খাগড়াপুরে হারি বৈসুর মূল আয়োজক চামেলী ত্রিপুরা দুটি সংবাদমাধ্যমকে প্রায় একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে: নতুন বছরে তাঁদের নিজস্ব পোশাক রিনাই ও রিসা বুননে দক্ষতা ও নিপুণতা বাড়াতেই ফুলের সঙ্গে হাতে বোনা ছোট কাপড় ভাসানো হয় (বিডিনিউজ২৪, 13 এপ্রিল 2026)। প্রথম আলোতে: নতুন বছরে বুননে দক্ষতা ও নিপুণতা যাতে বাড়ে, সে উদ্দেশ্যেই হাতে বোনা নতুন কাপড়ের টুকরা ভাসানো হয় (প্রথম আলো, 13 এপ্রিল 2026)।
সেদিন খাগড়াপুরে ত্রিপুরা নারীদের রিনাই ও রিসা পরে ছড়ায় ফুল নিবেদন করতে দেখা গেছে, দুই প্রতিবেদনেই এ কথা আছে। চার দিন আগে, 9 এপ্রিল, খাগড়াছড়ি শহরের বৈসু শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া দুই তরুণী বিডিনিউজকে বলেছেন, তাঁরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক রিনাই-রিসা ও গহনা পরে এসেছেন (বিডিনিউজ২৪, 9 এপ্রিল 2026)।
বৈসুর তিন দিনের নাম ও আচার-ক্রম, এবং চাকমা বিজু ও মারমা সাংগ্রাইয়ের সঙ্গে এর পার্থক্য নিয়ে আলাদা লেখা আছে: বৈসাবি: বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসুর আলাদা আচার-ক্রম।
রিসা কেবল নারীর কাপড় নয় — বাংলাদেশে গরয়া নাচের পুরুষ দলের সাজেও রিসা থাকে। প্রথম আলো (10 এপ্রিল 2026) খাগড়াছড়ির গরাইয়া নাচের দলের বর্ণনায় লিখেছে, পুরুষেরা পরেন সাদা ধুতি, সঙ্গে সাদা, নীল বা হলুদ জামা, আর তাঁদের কোমর, মাথা ও হাতে জড়ানো থাকে ‘রিসা’ নামে লম্বা ঝুলের কাপড়। নারীরা পরেন তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক (প্রথম আলো, 10 এপ্রিল 2026)।

ওই প্রতিবেদনে নাচের নিয়মও আছে: অংশগ্রহণকারীদের বলা হয় ‘খেয়েবাই’, একজন আচাই বা ওঝা ও একজন দেওয়াই (দলনেতা) নাচ পরিচালনা করেন, আর নাচে 22টি তাল ও মুদ্রা আছে। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার 1994 সালের বইও গরয়া নাচের 22টি মুদ্রার কথা বলে, আর জানায়, শিল্পীদের একজনের কাঁধের শূলে একটি ‘খাদি’ বাঁধা থাকে।
এখানে একটি নামের সতর্কতা দরকার। ওই বইয়ের মুদ্রাতালিকায় “রিসুনাই” নামে একটি মুদ্রা আছে; নামটি রিসার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, বইয়ে ব্যাখ্যা নেই, তাই এখানে কোনো সম্পর্ক ধরা হয়নি।
রিনাই-রিসা এখন উৎসবের পরিচয়-চিহ্নও। অক্টোবর 2026-এ খাগড়াছড়ি জেলা সদরের খাগড়াপুর সার্বজনীন দুর্গামণ্ডপে দেবী দুর্গাকে সাজানো হয়েছে ত্রিপুরা নারীর পোশাক ও অলংকারে: পরনে রিনাই-রিসা, গলায় রুপার চন্দ্রাহার ও পয়সা দিয়ে তৈরি ‘পুইসা মালা’, খোঁপায় সুরাম ও কালসি, কানে ‘য়াংকুং’, হাতে ‘বাংগ্রী’, পায়ে ‘বেংকি’ (বিডিনিউজ২৪, 17 অক্টোবর 2026)।
লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকেও ত্রিপুরা পোশাকে সাজানো হয়েছে। পূজা উদ্যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক চামেলী ত্রিপুরা জানিয়েছেন, নিজেদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে গত 11 বছর ধরে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর কথায়: “আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।”
ত্রিপুরা নারীর সাজ অলংকার ছাড়া সম্পূর্ণ নয়, আর বাংলাদেশের তিনটি উৎস অলংকারের নাম দিয়েছে। আর্কাইভের তালিকায় আছে সাংগে, আঁচিলি, বাংগ্রি (বালা, কুঁচি), তয়া, চন্দ্রহার, সিকল, রামতাঙ, বেঙকি, ওয়াখুমু, নাফু, লক, কালচি, য়েইতাঁ, সউরাঙ ও বলবলি, সঙ্গে কোনটি কোথায় পরা হয় তার বিবরণ। বাংলাপিডিয়ার তালিকা আরও লম্বা, আর বিডিনিউজের দুর্গামণ্ডপের প্রতিবেদনে আছে আরও দুটি নাম।
| শরীরের অংশ | জুমজার্নাল আর্কাইভ | বিডিনিউজ২৪, 2026 (দুর্গামণ্ডপ) | বাংলাপিডিয়ার তালিকায় একই নাম |
|---|---|---|---|
| খোঁপা | সাংগে | সুরাম, কালসি | sange, suram |
| গলা | আঁচিলি, লক, চন্দ্রহার, রামতাঙ | রুপার চন্দ্রাহার, পুইসা মালা | anchli |
| কান | তয়া, ওয়াখুমু | য়াংকুং | toya, wakhum |
| নাক | নাফু, বলবলি | — | — |
| হাত ও আঙুল | বাংগ্রি (বালা, কুঁচি) — তালিকায়; য়েইতাঁ — আঙুলে | বাংগ্রী (হাতে) | — |
| পা | বেঙকি | বেংকি | bengki |
ছকের শেষ কলামে কেবল সেই নামগুলো রাখা হয়েছে, যেগুলো বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি তালিকায় হুবহু বা প্রায় হুবহু আছে; বাংলাপিডিয়া কোন অলংকার কোথায় পরা হয় তা বলেনি, তাই শরীরের অংশ আর্কাইভ ও বিডিনিউজ থেকে। আর্কাইভের ‘কালচি’ আর বিডিনিউজের ‘কালসি’ বানানে কাছাকাছি, তবে আর্কাইভে কালচি কোথায় পরা হয় লেখা নেই, তাই দুটিকে এক ধরা হয়নি। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, অতীতে ত্রিপুরা পুরুষেরাও অলংকার পরতেন।
উৎসগুলো একটি বিষয়ে একমত: রিনাই-রিসা আর আগের মতো প্রতিদিনের পোশাক নেই, বিশেষ করে শহরে। প্রশান্ত ত্রিপুরা লিখেছেন, ঐতিহ্যগতভাবে ত্রিপুরা নারীদের পোশাক ‘রিনাই রিসা’ হলেও শহরাঞ্চলে বসবাসরত অনেকের কাছেই এগুলো এখন দৈনন্দিন পরিধেয়র তালিকায় নেই (আদিবাসী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিষয়ক কিছু ভাবনা)।
তাঁর যুক্তি অবশ্য উল্টো দিক থেকে: যেহেতু পোশাক বদলেছে, তাই ত্রিপুরা নারীর ছবি আঁকতে গেলে তাঁকে সবসময় রিনাই-রিসা পরিয়ে দেখাতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। সংস্কৃতির চলমান রূপ দেখানোই প্রত্যাশিত।
বিয়েতেও বদল এসেছে। মুকুল কান্তি ত্রিপুরা লিখেছেন, অনেককে রিনাইয়ের পরিবর্তে শাড়ি, আর ধুতির পরিবর্তে প্যান্ট-শার্ট পরতে দেখা যায়। পুরুষের পোশাকের বদল আরও আগে: আর্কাইভ অনুযায়ী অতীতে পুরুষেরা ঘরে তৈরি গামছা ও কুবাই পরতেন, কিন্তু এখন বাজার থেকে কেনা আধুনিক পোশাক পরেন। আর বুননের উপকরণ বদলেছে জুমের কার্পাস থেকে বাজারের রং করা সুতায়, কোথাও টেক্সটাইলের তৈরি রিনাই-রিসায়।
ভারতের উৎসেও একই ছবি। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Tripuri dress” পাতা বলে, এখন রিসার বদলে বেশির ভাগ নারী সুবিধার জন্য ব্লাউজ পরেন, আর কিশোরীরা রিগনাইয়ের সঙ্গে টপ পরেন — তবে এই অংশও “citation needed” চিহ্নিত। সেলভেজের লেখায় আছে, এই পোশাক পরার ঐতিহ্য কমেছে, বিশেষ উপলক্ষে পরা হয়, আর অনুষ্ঠানে অতিথিকে রিসা উপহার দেওয়া হয়।
এই পরিবর্তনের বিপরীতে উৎসব একটি জায়গা ধরে রেখেছে। বৈসুর শোভাযাত্রা, হারি বৈসুর ছড়ার ঘাট, গরয়া নাচ আর দুর্গামণ্ডপ — চারটি প্রতিবেদনেই রিনাই বা রিসা এসেছে উৎসবের প্রসঙ্গে। পূজা কমিটির কথায় উদ্দেশ্যও স্পষ্ট: হারিয়ে যেতে থাকা সংস্কৃতি ধরে রাখা।
এই অংশের সব তথ্য ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের, বাংলাদেশের নয়। ভারতে রিসা ও রিগনাই দুটিই ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি পেয়েছে, দুটিই 2024 সালের মার্চে। বাংলাদেশে রিনাই-রিসার এমন কোনো স্বীকৃতির খবর পাওয়া যায়নি।
রিসার জিআই ঘোষণা হয় মার্চ 2024-এর শুরুতে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (3 মার্চ 2024) জানিয়েছে, ত্রিপুরা রুরাল লাইভলিহুড মিশনের সহায়তাপুষ্ট গোমতী জেলার কিল্লা মহিলা ক্লাস্টার এই স্বীকৃতি পায়। মে 2022-এ তখনকার মুখ্যমন্ত্রী রিসার জিআই প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন (Indian Express, 2022; EastMojo, 2022)।
রিগনাইয়ের জিআই এসেছে কয়েক সপ্তাহ পরে। ইস্টমোজো (31 মার্চ 2024) লিখেছে, 30 মার্চ 2024-এ ঘোষিত এই সনদ মার্চ 2033 পর্যন্ত বৈধ; আবেদনকারী ছিল দেওয়ানবাড়ি মহিলা ক্লাস্টার বহুমুখী সমবায় সমিতি। প্রতিবেদনটি আরও বলেছে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে এই পোশাকের আলাদা নাম আছে, তবে “রিগনাই” সবচেয়ে প্রচলিত; গ্রামাঞ্চলে নারীরা নিজেদের রিগনাই নিজেরাই বোনেন (EastMojo, 2024)।
ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর (PIB) অক্টোবর 2025-এর একটি নথিতে জিআই-প্রাপ্ত পণ্য দুটির নাম “Tripura Risa Textile” ও “Tripura Pachra–Rignai Textile”। নথিটির বিবরণে রিগনাই একটি স্কার্ট আর পাছড়া একটি জড়ানো কাপড় বা ওভারস্কার্ট; দুটিই কোমর বা পিঠ-বন্ধনী তাঁতে বোনা, প্রতিদিন ও অনুষ্ঠানে পরা হয়। নথি অনুযায়ী ত্রিপুরা রাজ্যে 1.3 লাখের বেশি পরিবার তাঁতের কাজে যুক্ত (PIB, 23 অক্টোবর 2025)।
ভারতের উৎসে রিসার একটি জীবনচক্রের আচারও আছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, 12 থেকে 14 বছর বয়সে ত্রিপুরি কিশোরীকে প্রথম রিসা পরানো হয় “রিসা সরমানি” নামের একটি অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশের কোনো পঠিত উৎসে রিসা সরমানি বা প্রথম রিসা পরার এমন আচারের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
ভারতে রিসা রাজনৈতিক প্রতীকও হয়ে উঠেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিবরণে 2018 থেকে রাজ্য সরকার রিসাকে রাজ্যের “সিগনেচার” পরিচয় হিসেবে প্রচার করছে, অতিথি নেতাদের রিসা দিয়ে বরণ করা হচ্ছে, আর রিসা “ইন্ডিয়া হ্যান্ডলুম” ব্র্যান্ডের অধীনে বাজারে আসছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নারী-পোশাকে একটি নিচের কাপড় আর একটি বুকের কাপড় আছে, কিন্তু নাম, গঠন ও নকশা আলাদা। একটিকে আরেকটির রূপভেদ বলা ঠিক নয় — এই সতর্কতা আমাদের কোমর তাঁত বিষয়ক মূল লেখাতেই আছে।
| জনগোষ্ঠী | নিচের কাপড় | উপরের অংশ | বিস্তারিত |
|---|---|---|---|
| ত্রিপুরা | রিনাই | রিসা (বক্ষবন্ধনী), কুবাই | এই লেখা |
| চাকমা | পিনোন | খাদি (বক্ষবন্ধনী) | পিনন হাদি ও বেইন |
| মারমা | থবিং বা থামি | আংগি | মারমা থামি ও আংগি |
| তঞ্চঙ্গ্যা | পিনুইন | খাদি; কোবোই সালুম | তঞ্চঙ্গ্যা পোশাকের স্বাতন্ত্র্য |
দুটি মিল চোখে পড়ার মতো। তঞ্চঙ্গ্যা পোশাকের ক্ষেত্রে আমাদের লেখায় দেখা গেছে, গসা বা গোত্র বদলালে অনুষঙ্গ বদলায় — ত্রিপুরাদের দফাভেদে নকশা বদলানোর সঙ্গে এর তুলনা চলে, যদিও কোনো উৎস দুটিকে পাশাপাশি রেখে আলোচনা করেনি। আর গরয়া নাচের শূলে বাঁধা কাপড়টির নাম সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার বইয়ে ‘খাদি’ — চাকমা বুকের কাপড়ের নামও খাদি; এটি একই শব্দ নাকি কেবল কাকতালীয় মিল, উৎসে বলা নেই। ম্রো ও বম বস্ত্রের জন্য দেখুন ওয়ানক্লাই ও কোমরতাঁত। সব জনগোষ্ঠীর উৎসব, পোশাক ও খাবারের নামের এক জায়গার সূচি আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য পাতায়, আর পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সব লেখার সূচি পার্বত্য চট্টগ্রাম আর্কাইভে।
বাংলা উইকিপিডিয়ার “পিনন হাদি” পাতায় পিনন-হাদির ধরন ত্রিপুরাদের রিনাই-রিসা থেকে এসেছে বলে একটি দাবি আছে। আমাদের মূল লেখায় দেখানো হয়েছে, দাবিটির সমর্থনে যে সূত্র দেওয়া, তা পোশাকের উৎস নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো গবেষণা নয়। এই লেখায় তাই দাবিটি গ্রহণ বা খণ্ডন করা হয়নি।
একই পোশাকের নাম উৎসভেদে কয়েক রকম বানানে লেখা হয়, আর বাংলা ও ইংরেজির মধ্যে পার্থক্য সবচেয়ে বড়। বাংলাদেশের বাংলা উৎসে প্রধান রূপ “রিনাই” ও “রিসা”; ভারতের ইংরেজি উৎসে “rignai” ও “risa”। কোনটি শুদ্ধ, সে বিচার এই লেখার কাজ নয় — নিচে কোন উৎস কোন বানান লিখেছে, কেবল তা রাখা হলো।
| উৎস | নিচের কাপড় | বুকের কাপড় |
|---|---|---|
| জুমজার্নাল আর্কাইভ; বিডিনিউজ২৪ (2026) | রিনাই | রিসা |
| প্রথম আলো (2019) | রিনাই | রিচা |
| প্রথম আলো ও বিডিনিউজ২৪ (এপ্রিল 2026, একটি করে প্রতিবেদন) | রিনা | রিসাই / রিসায় |
| দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস; ইস্টমোজো (2024); PIB | rignai | risa |
| ইংরেজি উইকিপিডিয়া; উইকিমিডিয়া কমন্স | rignai, rignwai, rigwnai | risa |
| ইস্টমোজো (2022); সেলভেজ (2021) | rignai | risha |
| HEPC; গ্লোবাল ইনসিএইচ | rinai; pachra-rignai | risa; riha |
এপ্রিল 2026-এর দুটি প্রতিবেদনে বানান আরও আলাদা: প্রথম আলোর বাক্য “রিনা-রিসাই পরে” আর বিডিনিউজের “রিনা-রিসায় এবং গহনা পরে” — দুটি রূপই ছকে রাখা হয়েছে। আসামের মেখেলা-চাদরের সঙ্গে পরা কাপড়ের নাম “রিহা”; ইংরেজি উইকিপিডিয়া রিহা ও ত্রিপুরি রিসাকে একই পাতায় রেখেছে, তবে দুটি একই কাপড় কি না, আলাদা করে প্রমাণ দেয়নি।
ত্রিপুরা নারীর ঐতিহ্যবাহী পোশাকের তিন অংশ। জুমজার্নালের আর্কাইভের “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখা অনুযায়ী রিনাই কোমর থেকে নিচের অংশ ঢাকে, আর রিসা ও কুবাই ঢাকে কোমরের উপরের অংশ। রিসা দিয়ে বুক বাঁধা হয়, মাথায় পাগড়ির মতো পরা হয়, আর রিনাই শক্ত করতে কোমরেও বাঁধা হয়।
রিনাই কোমর থেকে নিচে পরা হয়; এটি ত্রিপুরা নারীর নিচের কাপড়। জুমজার্নালের আর্কাইভে অন্তত ছয় রকম রিনাইয়ের নাম আছে: চাঙগ্রং, খাইচৈংতৈ, নাগি, কলফ, বেখ: ও য়ংসা রিনাই। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে একই পোশাককে রিগনাই বলা হয়; সেখানকার উৎসে এটি কোমরে জড়িয়ে পরা কাপড়।
রিসা লম্বা, সরু বোনা কাপড়। বাংলাদেশের আর্কাইভে এটি বক্ষবন্ধনী, মাথার পাগড়ি ও রিনাই শক্ত করার কোমরবন্ধ। প্রথম আলো (এপ্রিল 2026) জানিয়েছে, খাগড়াছড়িতে গরয়া নাচের পুরুষদের কোমর, মাথা ও হাতে রিসা জড়ানো থাকে। ভারতের উৎসে রিসা অতিথিকে সম্মান জানানোর উপহারও।
জুমজার্নালের আর্কাইভ অনুযায়ী কুবাই ও রিসা কোমরের উপরের অংশ ঢাকতে পরা হয়, আর অতীতে ত্রিপুরা পুরুষেরা ঘরে তৈরি গামছা ও “কুবাই (শার্ট)” পরতেন। কুবাইয়ের কাট, হাতা বা রং নিয়ে কোনো উৎসে বিবরণ পাওয়া যায়নি। ভারতের ইংরেজি উৎসে নামটি নেই; সেখানে তৃতীয় অংশের নাম রিকুতু।
হ্যাঁ, বাংলাদেশ ও ভারতের উৎস দুটিই তা বলে। জুমজার্নালের আর্কাইভ লিখেছে, রিনাই-রিসার নকশার বিন্যাস দেখে কে কোন দফার নারী তা অনায়াসেই চেনা যায়। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার 1994 সালের বই অনুযায়ী ত্রিপুরারা 36 দফায় বিভক্ত, প্রত্যেকের পোশাক আলাদা। কোন দফার কোন নকশা, তার তালিকা কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি।
সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার “পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও সংস্কৃতি” (1994) ও বাংলাপিডিয়ার “Tripuris, The” নিবন্ধ — দুটিই বলে 36টি দফা। ওই বই অনুযায়ী এর মধ্যে 16টি উপদল বাংলাদেশে থাকে, বাকিরা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। বইটি জানায়, প্রত্যেক দফার কথ্যরীতি, পোশাক ও অলংকার আলাদা।
জুমজার্নালের আর্কাইভ অনুযায়ী জুমের কার্পাস থেকে নারীরা সুতা কাটতেন, আর কালমা গাছের পাতা ও অন্যান্য গাছের পাতা-বাকল থেকে রং তৈরি হতো। সব গোত্রের পোশাকে লাল, কালো, নীল, হলুদ ও সাদা দেখা যায়, তবে লাল ও কালো বেশি। এখন অনেকে বাজার থেকে রং করা সুতা কিনে বোনেন।
প্রথম আলোর 1 ডিসেম্বর 2019-এর প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা বড়নাল বড় ত্রিপুরাপাড়ার তাঁতি যুবনিকা ত্রিপুরা বলেছেন, প্রতি জোড়া রিনাই-রিচা 2,800 থেকে 3,000 টাকায় বিক্রি হয়। তিনি মাসে দু-তিন জোড়া বোনেন, মাস শেষে আয় 4-5 হাজার টাকা। 2019-এর পরের কোনো বাজারদর পাওয়া যায়নি।
বরপক্ষ। মুকুল কান্তি ত্রিপুরার লেখায়, কনের মা বরপক্ষের আনা গহনা, রিনাই, রিসা ও সাজগোজের জিনিস নিয়ে কনেকে সাজান। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার 1994 সালের বই অনুযায়ী বিয়ের প্রস্তাবের দিনই কনের পোশাক ও অলংকারের দাবি তোলা হয়। উসুই দফায় বরযাত্রীকে “লাল রিনাই” নিয়ে যেতে হয়।
হারি বৈসুর দিন ফুলের সঙ্গে হাতে বোনা নতুন কাপড়ের টুকরা নদী বা ছড়ায় ভাসানো হয়। খাগড়াছড়ির খাগড়াপুরের আয়োজক চামেলী ত্রিপুরা এপ্রিল 2026-এ প্রথম আলো ও বিডিনিউজ২৪-কে বলেছেন, নতুন বছরে রিনাই-রিসা বুননে দক্ষতা ও নিপুণতা যাতে বাড়ে, সে জন্যই এই কাপড় ভাসানো হয়।
ভারতে পেয়েছে, বাংলাদেশে এমন খবর পাওয়া যায়নি। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (3 মার্চ 2024) জানিয়েছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের গোমতী জেলার কিল্লা মহিলা ক্লাস্টার রিসার জিআই পায়। ইস্টমোজো (31 মার্চ 2024) অনুযায়ী রিগনাইয়ের জিআই ঘোষণা হয় 30 মার্চ 2024, বৈধ মার্চ 2033 পর্যন্ত।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের একটি অনুষ্ঠান। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, 12 থেকে 14 বছর বয়সে ত্রিপুরি কিশোরীকে প্রথম রিসা পরানো হয় “রিসা সরমানি” নামের অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশের ত্রিপুরা সমাজে এমন আচারের উল্লেখ কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি।
উৎসের বিবরণে দুটিই ত্রিপুরা নারীর কোমর থেকে নিচের কাপড়: বাংলাদেশের বাংলা উৎসে রিনাই, ভারতের ইংরেজি উৎসে rignai বা rignwai। ইস্টমোজো (2024) লিখেছে, ভারতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে এর আলাদা নাম থাকলেও রিগনাই সবচেয়ে প্রচলিত। তবে বাংলাদেশের আর্কাইভের ছয়টি রিনাই-নামের একটিও ইংরেজি উইকিপিডিয়ার 39টি রিগনাই-নামের তালিকায় হুবহু নেই।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী নারী, খাগড়াছড়ি, ত্রিপুরা
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।