Last updated Oct 23rd, 2026
3

মারমা নারীর নিম্নাংশের কাপড়টির নাম থামি, আর উপরের জামাটি আঙ্গি। মারমা পোশাক থামি ও আঙ্গি দুটোই ঐতিহ্যগতভাবে ঘরে বোনা হয়, আর বাড়ির মাচাংয়ের নিচে রাখা তাঁতে। উৎসগুলোতে দুই রকম তাঁতের কথা আসে: কোমরে বেল্ট বেঁধে টান রাখা কোমর তাঁত, আর পায়ের পাদানিতে চালানো ফ্রেমের তাঁত।
পোশাকের প্রতিটি অংশের নাম, বানানের জট আর অলংকারের তালিকা আমাদের আগের লেখা মারমা থামি ও আংগি: পোশাকের অংশগুলো নাম ধরে-তে আছে। এই লেখার কাজ আলাদা: কাপড়টা কোথায়, কোন যন্ত্রে, কার হাতে ওঠে; দেড়শো বছর আগের বিবরণে থামি দেখতে কেমন ছিল; আর আজকের বাজারে “থামি” শব্দটা কতদূর ছড়িয়ে গেছে।
সূচিপত্র
থামি একখণ্ড বোনা কাপড়, যা কোমরে জড়িয়ে পরা হয়। বাংলাপিডিয়ার “পোশাক” নিবন্ধ একে বলেছে লুঙ্গির মতো, তবে এক প্রান্ত সেলাই করা নয়, আর রঙিন ঐতিহ্যবাহী নকশায় ভরা। দেড়শো বছর আগের এক বিবরণ আরও খুঁটিনাটি দেয়: থামিতে কোনো ফিতা বা বাঁধন থাকে না, প্রান্ত গুঁজে দিয়ে কোমরে আটকানো হয়।
বাংলাপিডিয়ার বাংলা নিবন্ধে মারমা নারীর নিম্নাংশের পোশাকের নাম দেওয়া আছে “থ্বিং বা থামি”। ইংরেজি “Dress” নিবন্ধের ভাষায়, থামি “like a lungi with an unstitched end” — আর পোশাকটি রঙিন ঐতিহ্যবাহী নকশায় ভরা। আমাদের আর্কাইভের মারমা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায় একই কাপড়ের নাম থবিইং, যা “বিভিন্ন প্রকার নকশা বিশিষ্ট”।
পরার ধরনের সবচেয়ে পুরোনো বিবরণটি পাওয়া যায় টমাস হার্বার্ট লেউইনের 1869 সালের বই The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein-এ। লেউইন মারমাদের লিখেছেন “খ্যয়ংথা” (Khyoungtha, নদীর সন্তান) নামে, আর স্যার আর্থার ফেয়ারের বরাতে জানিয়েছেন তাঁদের জাতীয় নাম Myamma, যা এই পাহাড়ে উচ্চারিত হয় “Murma”; কর্ণফুলীর দক্ষিণের গ্রামগুলো তখন বান্দরবানের বোমাং প্রধানের অধীন। তাঁর বর্ণনায় নারীরা পরেন “tabween” — বর্মি ভাষায় যাকে বলে “tamuin” — সুতি বা রেশমের। লেউইনের লেখা অনুযায়ী এতে “no tie or fastening” নেই; কোমরে ঘুরিয়ে প্রান্তগুলো ভেতরে পাকিয়ে গুঁজে দেওয়া হয়, আর কাপড়টি সামনের দিকে খোলা, একপরতা।
সাঁইত্রিশ বছর পরে, 1906 সালে, আর. এইচ. স্নেইড হাচিনসন তাঁর An Account of the Chittagong Hill Tracts-এ মারমা (তাঁর ভাষায় “Magh”) নারীর পোশাক প্রায় একই ভাষায় লিখেছেন: সুতি বা রেশমের নিম্নাংশের কাপড়, বাঁধন ছাড়া, প্রান্ত ভালো করে পাকিয়ে গুঁজে কোমরে আটকানো। তাঁর হিসাবে এই কাপড় আর বুকের বন্ধনী — এই দুটিই প্রতিদিনের পোশাক।

দৈর্ঘ্য নিয়ে দুই উৎস দুই কথা বলে। লেউইন (1869) লিখেছেন হাঁটার সময় থামির খোলা দিক দিয়ে ডান পা ও ঊরুর খানিকটা দেখা যায়; “The Marma Nation” নামের মারমা ইতিহাস-ও-সংস্কৃতি বিষয়ক ওয়েবসাইট লিখেছে থামি নিম্নাংশে “till bottom of the ankle”, অর্থাৎ গোড়ালি পর্যন্ত। দুটি বিবরণের মাঝে দেড়শো বছরের ফারাক।
আঙ্গি মানে উপরের জামা, আর উৎস অনুযায়ী এটি নারী-পুরুষ দুজনেরই পোশাক। বাংলাপিডিয়ার বাংলা নিবন্ধে মেয়েরা পরেন “বেদাই আঙগি” নামের ব্লাউজ। ইংরেজি নিবন্ধ বলছে মারমা নারী-পুরুষ দুজনেই সাধারণত থামি ও আঙ্গি পরেন, তবে পুরুষের আঙ্গি ব্লাউজের চেয়ে বেশি ওয়েস্টকোটের মতো।
পুরুষের আঙ্গি নিয়ে উৎসগুলোর নাম একটু একটু আলাদা। আমাদের আর্কাইভে আছে “ব্যারিষ্টা আঙ্গি” (একপ্রকার জ্যাকেট, জামার উপর দিয়ে পরা); বাংলাপিডিয়ায় “বারিস্টা অাঁঙ্গি”; “The Marma Nation” ওয়েবসাইটে উৎসবের দিনে বয়োজ্যেষ্ঠদের গলায় বোতাম-আঁটা কোট “Prakha Angyi”। লেউইন (1869) পুরুষের জামাটির নাম লিখেছেন “ranjee” — হাতাওয়ালা ছোট জ্যাকেট, গলার কাছে বাঁধা বা বোতাম-আঁটা। হাচিনসন (1906) লিখেছেন সাদা বা কালো ছোট জ্যাকেট, লম্বা ঢিলা হাতা।

নারীর উপরের অংশে আঙ্গির নিচে, বা আঙ্গির আগে, ছিল একটি বুকের বন্ধনী। বাংলাপিডিয়া এর নাম লিখেছে “রাংকাই”, আমাদের আর্কাইভ “রাংগাইত্”। এর মাপের দুটি পুরোনো হিসাব আছে: লেউইন (1869) লিখেছেন প্রায় এক বিঘত চওড়া কাপড়, আর হাচিনসন (1906) লিখেছেন প্রায় দশ ইঞ্চি চওড়া, “well worked and ornamented homespun cloth” — অর্থাৎ ঘরে কাটা সুতায় বোনা, কারুকাজ করা কাপড়। দুটি হিসাব কাছাকাছি।
দুই উৎসের একটি অমিল এখানে লিখে রাখা দরকার। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি “Dress” নিবন্ধ লিখেছে মারমা পুরুষেরা হাফ বা ফুল-হাতা ব্লাউজ বা আঙ্গি পরেন, আর বাংলা “পোশাক” নিবন্ধ লিখেছে “মেয়েরা থামির আঙ্গি পরে” — দুই ভাষার একই নিবন্ধে আঙ্গি একবার পুরুষের, একবার নারীর।
মারমা ঘরে তাঁতের জায়গা মাচাংয়ের নিচে। বাংলাপিডিয়া লিখেছে মারমা বাড়ি বাঁশের উঁচু মাচাংয়ের উপর তৈরি, আর মাচাংয়ের নিচের জায়গাটি গবাদিপশু রাখা, জ্বালানি কাঠ রাখা “অথবা তাঁত স্থাপনের” কাজে লাগে। আমাদের আর্কাইভের বিবরণও একই: মাচাংয়ের নিচের জায়গা ব্যবহৃত হয় জ্বালানি কাঠ, শূকর আর “কাপড় বোনার তাঁত রাখার কাজে”।
যন্ত্রের উপাদান নিয়েও উৎসগুলো একমত। লেউইন (1869) পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জীবনে বাঁশের ব্যবহারের তালিকায় লিখেছেন, নারীরা যে যন্ত্রে তুলা বোনেন তা বাঁশের তৈরি। The Daily Star-এর 2008 সালের প্রতিবেদন লিখেছে তিন পার্বত্য জেলার তাঁতিদের সরঞ্জাম বেশিরভাগ স্থানীয় বাঁশ ও কাঠে গড়া।
বাংলাপিডিয়ার “পোশাক” নিবন্ধ এর চেয়েও বড় একটি কথা বলে: বাংলাদেশের আদিবাসীদের “প্রায় প্রতি পরিবারের রয়েছে নিজস্ব তাঁত”, আর পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা “চরকা ও তাঁতের সাহায্যে” কাপড় তৈরি করেন। কথাটি সব জনগোষ্ঠী মিলিয়ে বলা; মারমা পরিবারের আলাদা কোনো গণনা এতে নেই।
কোমর তাঁতে টানা-সুতার এক প্রান্ত উঁচু খুঁটিতে বাঁধা থাকে, অন্য প্রান্ত দড়ি বা বেল্ট দিয়ে তাঁতির কোমরে। তাঁতি শরীর পেছনে হেলিয়ে সুতা টানটান রাখেন। ঢাকা পোস্টের 2021 সালের প্রতিবেদন এই যন্ত্র যাঁরা আজও ব্যবহার করেন তাঁদের মধ্যে চাকমা ও মণিপুরির সঙ্গে মারমাদের নাম আলাদা করে লিখেছে।
প্রতিবেদনটির ভাষায়, “সুতার বিম একটু উঁচু খুঁটির সঙ্গে বেঁধে কাপড়ের বিমের সঙ্গে দড়ি বা বেল্ট বেঁধে সেই দড়ি বা বেল্ট কোমরে পেঁচিয়ে টানটান করে কাপড় বোনা হয়”। একই প্রতিবেদন আরও দুটি বৈশিষ্ট্য লিখেছে: তাঁতটি দরকার হলে খুলে নিয়ে অন্য জায়গায় যাওয়া যায়, আর এতে মোটা কাপড় তৈরি হয়।
কোমর তাঁতের অংশগুলোর নাম, কাঠামো আর একটি পিনন বুনতে কত সময় লাগে — এসব চাকমা উৎস ধরে বিস্তারিত আছে পিনন হাদি ও বেইন: পাহাড়ি কোমর-তাঁতের পূর্ণ পাঠ লেখায়। সেখানে যন্ত্রটির নাম বেইন, যা চাকমা শব্দ। মারমা ভাষায় কোমর তাঁতের নাম কী, কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে কোমর তাঁত কতটি, তার দুটি হিসাব একই পত্রিকায় দুই রকম। The Daily Star 22 জুলাই 2008 লিখেছে তিন পার্বত্য জেলায় অন্তত 50,000 কোমর-তাঁতভিত্তিক বস্ত্র-উদ্যোগ আছে; একই পত্রিকা 27 আগস্ট 2009 বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) বরাতে লিখেছে আদিবাসীদের ঘরে আরও 5,000 কোমর তাঁত আছে। কোনো হিসাবেই জনগোষ্ঠীভিত্তিক ভাগ নেই।
কোমর তাঁতের বাইরে আরেক রকম তাঁতের কথাও উৎসে আছে: গর্ত-তাঁত বা ফ্রেমের তাঁত, যার একটি পাদানিযুক্ত রূপের বর্ণনা দিয়েছেন হাচিনসন। মিরাজ মুনাব্বিরের 2017 সালের একটি হস্ততাঁত-বিষয়ক সংকলন লিখেছে, মারমা ও ত্রিপুরারা নিজেদের কাপড় বুনতে “both the backstrap loom and the Bangla pit loom” ব্যবহার করেন। এটি একটিমাত্র অনলাইন সংকলন, যার মূল উৎস সেখানে দেওয়া নেই।
সংকলনটির ভাষায় হস্তচালিত বয়ন হয় “pit looms or frame looms generally located in weavers’ homes” — অর্থাৎ তাঁতির ঘরে বসানো গর্ত-তাঁত বা ফ্রেম-তাঁতে। একই সংকলন কক্সবাজারের রাখাইনদের সম্পর্কে লিখেছে যে তাঁরা প্রধানত ফ্রেম ও পিট লুমে গামছা, ব্যাগ ও থামি বোনেন, পর্যটকদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে। রাখাইন ও মারমা আলাদা জনগোষ্ঠী; এই তথ্য মারমাদের বেলায় প্রযোজ্য কি না, উৎসে বলা নেই। দুই জাতির পার্থক্য নিয়ে আছে রাখাইন ও মারমা কেন আলাদা জাতি, আর ‘মগ’ নামটি কোথা থেকে এল লেখায়।
পাদানিতে চালানো তাঁতের একটি ধাপে ধাপে বর্ণনা পাওয়া যায় হাচিনসনের 1906 সালের বইয়ে। সেটি কোনো একটি জনগোষ্ঠীর নয়, পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের বয়ন নিয়ে লেখা। তাঁর বিবরণ ধাপে ধাপে:
হাচিনসনের এই বিবরণে খুঁটিতে বাঁধা টানা আর পায়ের পাদানি — দুটোই একসঙ্গে আছে। মারমা ঘরে কোন তাঁতে কোন কাপড় ওঠে — থামি কোমর তাঁতে না পাদানির তাঁতে, আঙ্গির কাপড় কোথায় — এমন আলাদা হিসাব কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
কোমর তাঁতের বুনন হস্তচালিত তাঁতে তুলে আনার একটি নথিভুক্ত ঘটনা আছে, তবে তা চাকমা বয়নের: মঞ্জুলিকা চাকমা 1965 সালে দুটি তাঁত জোগাড় করে কোমর-তাঁতের বুনন-পদ্ধতি হস্তচালিত তাঁতে প্রয়োগ করেন। সেই ইতিহাস ও তার অর্থনীতি আছে পিনন হাদির দাম কত, আর তাঁতির ঘরে কত যায় লেখায়। The Daily Star (2008) লিখেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের 20টি হস্তচালিত তাঁতভিত্তিক বস্ত্র-প্রতিষ্ঠানের সবগুলো রাঙামাটি জেলায়; একই পত্রিকা 2009 সালে বিসিকের বরাতে সংখ্যাটি লিখেছে প্রায় 60।
পুরোনো উৎসে থামির সুতা আসত নিজের জুমের তুলা থেকে, রং আসত গাছের পাতা ও শিকড় থেকে। বাংলাপিডিয়ার “পোশাক” নিবন্ধ লিখেছে, আদিবাসীরা ঐতিহ্যগতভাবে পাহাড়ের ঢালে নিজেদের ফলানো তুলা থেকে নিজেরাই সুতা কেটে প্রাকৃতিক রঙে রাঙাতেন, কিন্তু এখন তাঁরা ব্যাপকভাবে বাজার থেকে সুতা ও রং কেনেন।
তুলার গুরুত্বের একটি প্রশাসনিক চিহ্নও লেউইন রেখে গেছেন। 1869 সালের বিবরণে মারমা গ্রামগুলো বছরে পরিবারপিছু 4 থেকে 8 টাকা কর দিত প্রধানকে, আর টাকার বাইরে প্রত্যেকের ক্ষেতের ধান ও তুলার প্রথম ফসলের একটি অংশ প্রধানকে নিবেদন করা হতো। লেউইন আরও লিখেছেন পাহাড়ের মানুষ গাছের শিকড় ও পাতা থেকে দুই-তিন রকম রং বানান।
হাচিনসন (1906) পার্বত্য চট্টগ্রামে সুতা তৈরির ধাপগুলো লিখেছেন: জুম থেকে আনা তুলা পরিষ্কার করে দুই-তিন দিন রোদে শুকানো, দুটি কাঠের রোলারের যন্ত্রে বীজ ছাড়ানো, বাঁশের ধনুকে ধুনে আঁশ আলগা করা, তারপর চরকায় কাটা। নীল বা কালো রঙের জন্য তিনি লিখেছেন কালমা বা নীলের পাতা মাটির পাত্রে রাখার কথা।
আজকের ছবি ভিন্ন। ঢাকা পোস্ট (2021) লিখেছে, পাহাড়ি নারীরা বাজার থেকে সুতা কিনে নিজের পছন্দমতো থামি বানান। The Daily Star (2008) লিখেছে তিন পার্বত্য জেলার প্রায় 150টি স্থানীয় হাট থেকে তাঁতিরা কাঁচামাল সংগ্রহ করেন। জুমের তুলা থেকে কাপড় পর্যন্ত পুরো পথের বিবরণ ম্রো উৎস ধরে আছে ওয়ানক্লাই ও কোমরতাঁত: ম্রো ও বম বস্ত্রের যতটুকু নথিভুক্ত লেখায়।
মারমা সমাজে কাপড় বোনা নারীর কাজ, আর মেয়েরা শুরু করেন এগারো-বারো বছর বয়সে। বাংলাপিডিয়া লিখেছে বয়ন মারমা নারীদের একটি খুব সাধারণ কাজ। আমাদের আর্কাইভের বিবরণে মারমা সমাজের শ্রমবিভাগ স্পষ্ট: “কাপড় বোনা ও মদ তৈরি নারীদের কাজ। ঝুড়ি তৈরির কাজটি পুরুষেরা করে থাকে।”
শেখার বয়সটিও আর্কাইভে আছে, আহসানের 1993 সালের গবেষণার বরাতে: নয়-দশ বছর বয়সে শিশুরা গবাদিপশু চরাতে শুরু করে, আর “এগারো বারো বছর বয়সে মেয়েরা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও কাপড় বুনতে শুরু করে”। একই লেখায় মারমাদের আটটি অর্থনৈতিক কাজের তালিকায় কাপড় বুনন পঞ্চম। আর্কাইভ এটাও লিখেছে যে শহরে বেড়ে ওঠা শিশুদের এই বয়সে স্কুলই প্রধান।
হাচিনসন (1906) মারমা নারীর দিনের হিসাব দিয়েছেন: গৃহস্থালি, সন্তান লালন আর জুমে বীজ বোনা, নিড়ানি ও ফসল তোলার পর যেটুকু সময় বাঁচে, তা যায় “weaving cloths for home use” — ঘরের ব্যবহারের কাপড় বোনায়। লেউইন (1869) খ্যয়ংথা অংশের এক পাদটীকায় লিখেছেন, কেবল খ্যয়ংথাদের মধ্যেই কাজের ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের সমান অবস্থানে।
বিক্রির দিকটি বাংলাপিডিয়ায় আলাদা করে আছে: মারমারা অতীতে বাজারমুখী ছিলেন না, আর তাঁদের উৎপাদিত পণ্য এখন বেশিরভাগ বিক্রি হয় মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে। নিবন্ধটি এটাও লিখেছে যে মারমারা ঐতিহ্যবাহী বয়ন-প্রযুক্তিতে নিজেদের পোশাক বানালেও অনেকে এখন বাজার থেকে সাধারণ বাঙালি পোশাক কেনেন।
মারমা বিয়ের আশীর্বাদ-পর্বে কনেকে একটি নতুন থামি আর একটি আংটি দেওয়ার রীতি দেড়শো বছরের বেশি সময় ধরে নথিভুক্ত। লেউইন 1869 সালে এটি লিখেছেন; আমাদের আর্কাইভে প্রায় একই বর্ণনা আছে; আর একটি মারমা সংস্কৃতি-বিষয়ক ওয়েবসাইটেও একই কথা। তিনটি উৎস, তিন ভিন্ন সময়, একই উপহার।
| উৎস | কখন দেওয়া হয় | কী দেওয়া হয় |
|---|---|---|
| লেউইন, 1869 | শুভ লক্ষণ মিললে হবু কনে বরের বাবা-মায়ের পায়ে নত হয়ে আশীর্বাদ নেন | একটি নতুন নিম্নাংশের কাপড় (petticoat) ও একটি রুপার আংটি |
| জুমজার্নাল আর্কাইভ, “মারমা জনগোষ্ঠীর বিবাহ” | গণক সব শুভ বললে পাত্রী পাত্রপক্ষের গুরুজনদের প্রণাম করেন | একটি থকিং (থামী) ও রুপা বা স্বর্ণের একটি আংটি |
| “The Marma Nation” ওয়েবসাইট | সব শুভ হলে বর-কনে গুরুজনদের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেন | একটি থামি, রুপা বা সোনার আংটি |
লেউইনের বর্ণনায় ধাপগুলোর ক্রমও আর্কাইভের সঙ্গে মেলে: আশীর্বাদ ও উপহারের পরে জ্যোতিষী ডেকে শুভ দিন ও সময় ঠিক করা হয়। আর্কাইভের মারমা জনগোষ্ঠীর বিবাহ লেখায় বউ আনার দিনে বরপক্ষ পুরো পোশাক-সেট নিয়ে যায়: থবিং, বেদাই আংগি, রাংগাই আংগি, এক জোড়া কাখ্যাং আর একটি গবং।
হাচিনসন (1906) বিয়ের পোশাক নিয়ে আরেকটি তথ্য যোগ করেছেন: বিয়ের দুই দিন আগের সন্ধ্যায় বর-কনেকে নতুন কাপড় দেওয়া হয়, আর সেই কাপড়ের রং বাছা হয় জ্যোতিষের সাহায্যে, যাতে রঙের অর্থ বর-কনের জন্মবারের সঙ্গে মেলে। পরানোর সময় বরের সঙ্গে থাকেন একজন পুরোহিত।
বাংলা সংবাদমাধ্যমে “থামি” শব্দটি এখন কেবল মারমা পোশাক বোঝায় না; পাহাড়ি নারীর কোমরে জড়ানো তাঁতে বোনা কাপড় বোঝাতেও লেখা হয়। খাগড়াছড়ির বাজার নিয়ে দুটি প্রতিবেদনে থামি বিক্রেতা ও তাঁতিরা চাকমা ও ত্রিপুরা। তাই এসব প্রতিবেদনের দাম ও সময়ের হিসাব মারমা থামির হিসাব হিসেবে পড়া যায় না।
| উৎস ও তারিখ | জায়গা ও কারা | দাম | একটি থামি বুনতে সময় |
|---|---|---|---|
| ঢাকা পোস্ট, 3 এপ্রিল 2021 | খাগড়াছড়ির বাজার; বিক্রেতা ও ক্রেতা চাকমা, উদ্যোক্তা ত্রিপুরা | 3,000 থেকে 9,000 টাকা (“থামি শাড়ি”) | 10 থেকে 15 দিন |
| জাগোনিউজ২৪, 13 নভেম্বর 2022 | খাগড়াছড়ির চেলাছড়া, গাছবান ও খাগড়াপুর; তাঁতি ত্রিপুরা নারীরা | থামি-ওড়না সেটের পাইকারি দাম 3,000 থেকে 4,000 টাকা | 4 থেকে 7 দিন |
| The Daily Star, 8 মার্চ 2022 | খাগড়াছড়ির সিন্দুকছড়ি; একজন ত্রিপুরা তাঁতি বেইনে “traditional Thami” বুনছেন | দেওয়া নেই | দেওয়া নেই |
দুই প্রতিবেদনের সময়ের হিসাবে অমিল আছে: ঢাকা পোস্ট লিখেছে একটি থামি হাতে বুনতে 10 থেকে 15 দিন লাগে, জাগোনিউজ২৪ লিখেছে 4 থেকে 7 দিন। জাগোনিউজ২৪-এর প্রতিবেদনে তাঁতিরা সুতা কিনতেন দাদনে, আর লাভের বড় অংশ চলে যেত দাদন কারবারিদের কাছে। ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনে এক বিক্রেতা জানিয়েছেন থামি রাঙামাটিতে বেশি তৈরি হয়, খাগড়াছড়ির খুচরা বিক্রেতারা সেখান থেকে পাইকারি কিনে আনেন।
The Daily Star-এর 2009 সালের প্রতিবেদনে বিসিকের কর্মকর্তারা খাগড়াছড়ি জেলায় 500 গ্রামের প্রায় এক লাখ আদিবাসী মানুষের বোনা পণ্যের তালিকায় পিননের পাশে থামিও রেখেছেন, আর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান এই ব্যবসায় যুক্ত অন্তত 13টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে মারমার নাম বলেছেন। একই পত্রিকা 2022 সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের বরাতে লিখেছে, খাগড়াছড়ি জেলায় নব্বইয়ের দশকে প্রায় 40,000 তাঁত ছিল, যা কমে 28,000-এ নেমেছে।
“থামি” শব্দের এই প্রসারের একটি সরাসরি সাক্ষ্য আছে বান্দরবান থেকে। bdnews24.com-এর 8 মার্চ 2024 সালের প্রতিবেদনে (প্রতিবেদক উ শে থোয়াই মারমা) বান্দরবান সদর থেকে 15 কিলোমিটার দূরের গুংগুরু খেয়াং পাড়ার একজন খেয়াং সংগঠক বলেছেন, আগে খেয়াংদের নিজস্ব ফ্যাশন ছিল না, “everyone wore the thami made by the Marma”; পরে নিজেরা কাপড় বুনতে শুরু করলে নিজেদের ফ্যাশন গড়ে ওঠে। ওই পাড়ার নারী উন্নয়ন সংগঠন আজ নিজেরাই থামি বোনে, আর বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও ঢাকার মেলায় বিক্রি করে।
থামির সঙ্গে বর্মি নারীর পোশাকের মিল উৎসে বারবার আসে। লেউইন (1869) মারমা “tabween”-এর পাশে লিখেছেন বর্মি নাম “tamuin”; আর একই বইয়ে স্যার আর্থার ফেয়ারের বরাতে লিখেছেন, মারমা ও আরাকানি একই জাতির মানুষ। আমাদের আর্কাইভে উচনুর 2008 সালের লেখার বরাতে আছে, মারমাদের পোশাক ও নকশায় বর্মিদের সঙ্গে “বেশ মিল”।
লেউইন থামির গড়ন নিয়ে মারমাদের নিজেদের একটি কাহিনিও লিখে রেখেছেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, প্রথাটির শুরু আরাকানের সান্ডোওয়ের মানুষের মধ্যে: এক রানির অনুরোধে রাজা আদেশ জারি করেছিলেন যে সব নারী একটি নির্দিষ্ট গড়নের নিম্নাংশের কাপড় পরবেন। লেউইন নিজে মন্তব্য করেছেন, প্রথাটি সম্ভবত আরও পুরোনো। কাহিনিটি লোকশ্রুতি হিসেবেই লেখা; এর সত্যতা যাচাইয়ের কোনো উৎস নেই।
হাতে বোনা থামি আজ কতটা পরা হয়, তার কোনো জরিপ পাওয়া যায়নি। যা আছে তা হলো বাংলাপিডিয়ার একটি বাক্য — অনেকে এখন বাজার থেকে সাধারণ বাঙালি পোশাক কেনেন — আর ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদন, যেখানে খাগড়াছড়ির বাজারে বৈসাবির আগে হাতে বোনা থামির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। মারমাদের বর্ষবরণ সাংগ্রাই এই বৈসাবিরই অংশ; উৎসবগুলোর পার্থক্য নিয়ে আছে বৈসাবি: বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসু লেখায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এগারোটি জনগোষ্ঠীর পোশাক পাশাপাশি দেখতে পড়তে পারেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, আর পুরো অঞ্চলের পরিচিতি আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
মারমা নারীর নিম্নাংশের কাপড়ের নাম থামি, বাংলাপিডিয়ায় “থ্বিং বা থামি”, আমাদের আর্কাইভে থবিইং। উপরের ব্লাউজের নাম বেদাই আঙ্গি। এর সঙ্গে ছিল বুকের বন্ধনী, বাংলাপিডিয়ায় যার নাম রাংকাই। 1906 সালে হাচিনসন লিখেছেন বন্ধনীটি প্রায় দশ ইঞ্চি চওড়া, কারুকাজ করা, ঘরে কাটা সুতায় বোনা কাপড়।
বাংলাপিডিয়ার “Dress” নিবন্ধ অনুযায়ী থামি লুঙ্গির মতো, তবে এক প্রান্ত সেলাই করা নয়, আর রঙিন নকশায় ভরা। লেউইন 1869 সালে লিখেছেন এতে কোনো ফিতা বা বাঁধন নেই; কোমরে ঘুরিয়ে প্রান্ত পাকিয়ে গুঁজে দেওয়া হয়, আর সামনের দিক খোলা থাকে। হাচিনসন 1906 সালে প্রায় একই বিবরণ দিয়েছেন।
না। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি “Marma” নিবন্ধ অনুযায়ী মারমা নারী-পুরুষ দুজনেই আঙ্গি পরেন, তবে পুরুষের আঙ্গি ব্লাউজের চেয়ে বেশি ওয়েস্টকোটের মতো। নারীর আঙ্গির নাম বেদাই আঙ্গি; পুরুষের জ্যাকেটের নাম আমাদের আর্কাইভে ব্যারিষ্টা আঙ্গি, বাংলাপিডিয়ায় বারিস্টা আঙ্গি।
ঢাকা পোস্টের 2021 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী মারমারা কোমর তাঁত ব্যবহার করেন, যেখানে সুতার এক প্রান্ত খুঁটিতে আর অন্য প্রান্ত বেল্ট দিয়ে তাঁতির কোমরে বাঁধা থাকে। মিরাজ মুনাব্বিরের 2017 সালের একটি অনলাইন সংকলন লিখেছে, মারমা ও ত্রিপুরারা কোমর তাঁতের পাশাপাশি “Bangla pit loom” বা গর্ত-তাঁতও ব্যবহার করেন।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী মারমা বাড়ি বাঁশের উঁচু মাচাংয়ের উপর তৈরি, আর মাচাংয়ের নিচের জায়গায় গবাদিপশু, জ্বালানি কাঠ রাখা হয় অথবা তাঁত বসানো হয়। আমাদের আর্কাইভের “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখাও একই কথা বলে: মাচাংয়ের নিচে জ্বালানি কাঠ, শূকর আর কাপড় বোনার তাঁত রাখা হয়।
আমাদের আর্কাইভের “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখায় আহসানের 1993 সালের গবেষণার বরাতে আছে, এগারো-বারো বছর বয়সে মেয়েরা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও কাপড় বুনতে শুরু করে। একই লেখা জানায় কাপড় বোনা ও মদ তৈরি নারীর কাজ, আর ঝুড়ি তৈরি পুরুষের কাজ। শহরে বেড়ে ওঠা শিশুদের এই বয়সে স্কুলই প্রধান।
আশীর্বাদ-পর্বে কনেকে একটি নতুন থামি আর একটি আংটি দেওয়া হয়। লেউইন 1869 সালে লিখেছেন নতুন নিম্নাংশের কাপড় ও রুপার আংটি; জুমজার্নালের আর্কাইভে আছে থকিং (থামী) ও রুপা বা স্বর্ণের আংটি। বউ আনার দিনে বরপক্ষ থবিং, বেদাই আংগি, রাংগাই আংগি, কাখ্যাং ও গবং নিয়ে যায়।
মারমা থামির আলাদা দামের কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। খাগড়াছড়ির বাজার নিয়ে ঢাকা পোস্ট 2021 সালে লিখেছে হাতে বোনা “থামি শাড়ি” 3,000 থেকে 9,000 টাকায় বিক্রি হয়; জাগোনিউজ২৪ 2022 সালে লিখেছে থামি-ওড়না সেটের পাইকারি দাম 3,000 থেকে 4,000 টাকা। দুটি প্রতিবেদনেই তাঁতি ও বিক্রেতারা চাকমা ও ত্রিপুরা।
দুটি প্রতিবেদনে দুই রকম হিসাব। ঢাকা পোস্ট (3 এপ্রিল 2021) লিখেছে একটি থামি হাতে বুনতে 10 থেকে 15 দিন লাগে, মান অনুযায়ী আরও বেশি। জাগোনিউজ২৪ (13 নভেম্বর 2022) লিখেছে 4 থেকে 7 দিন। দুটি প্রতিবেদনই খাগড়াছড়ির, আর তাঁতিরা চাকমা ও ত্রিপুরা; মারমা তাঁতির আলাদা হিসাব পাওয়া যায়নি।
লেউইন 1869 সালে মারমা নারীর নিম্নাংশের কাপড়ের নাম লিখেছেন “tabween”, আর পাশে লিখেছেন বর্মি ভাষায় একে বলে “tamuin”। বাংলাপিডিয়া লিখেছে “থ্বিং বা থামি”। আমাদের আর্কাইভে উচনুর 2008 সালের লেখার বরাতে আছে, মারমা পোশাক ও নকশায় বর্মিদের সঙ্গে বেশ মিল। শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে আলাদা গবেষণা পাওয়া যায়নি।
bdnews24.com-এর 8 মার্চ 2024 সালের প্রতিবেদনে বান্দরবানের গুংগুরু খেয়াং পাড়ার একজন খেয়াং সংগঠক বলেছেন, আগে খেয়াংদের নিজস্ব ফ্যাশন ছিল না, সবাই মারমাদের বোনা থামি পরতেন। পরে নিজেরা কাপড় বুনতে শুরু করলে তাঁদের নিজস্ব ফ্যাশন গড়ে ওঠে, আর পাড়ার নারী সংগঠন এখন নিজেরাই থামি বোনে।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:মারমা, মারমা নারী, মারমা বিবাহ
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।