Jumjournal Logo

জুম চাষ: পাহাড়ের কৃষিবিদ্যা, মাসে মাসে

Last updated Oct 6th, 2026

6

পাহাড়ের চূড়ায় বাঁশ ও ছনের তৈরি জুমঘর, চারপাশে কলাগাছ ও শুকনো ফসলের গোড়া, ঘরের পাশ দিয়ে সরু পায়ে-চলা পথ; পেছনের পাহাড়ে জুম পোড়ানোর ধোঁয়া ছড়িয়ে আছে

পৌষ মাসে কাজটা শুরু হয় হাঁটা দিয়ে। কোন পাহাড়ে এ বছর জুম হবে, সেটা ঠিক করতে জুমিয়া মাটি দেখেন, গাছ দেখেন, আশপাশে পানির উৎস আছে কি না দেখেন — আর দেখেন কাছের বনে ফসলখেকো পশুপাখি আছে কি না। সিদ্ধান্তটা ভুল হলে সারা বছরের শ্রম বৃথা।

জুম চাষ নিয়ে বাংলায় যা লেখা হয়, তার প্রায় সবই এক জায়গায় এসে থেমে যায় — “পাহাড়ের জঙ্গল কেটে পুড়িয়ে চাষ”। সংজ্ঞাটা ভুল নয়, কিন্তু ওতে কৃষিবিদ্যাটা নেই। কোন মাসে কী কাজ, কোন যন্ত্র দিয়ে, কী কী ফসল একসঙ্গে, জমির স্বত্ব কীভাবে ঠিক হয় — এসব প্রশ্নের উত্তর একসাথে কোথাও নেই।

এই লেখাটি সেই ফাঁকটা ভরাট করার চেষ্টা, আর সেই সঙ্গে সংখ্যাগুলোর দিকেও তাকানো — কারণ কতজন জুম করেন, কত জমিতে, আর জুম চক্র কত বছরের — এই তিনটির কোনোটিতেই উৎসগুলো একমত নয়।

জুম চাষ আসলে কী

জুমজার্নালের আর্কাইভে সংরক্ষিত “পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে আদিবাসী লোকজ্ঞান” লেখাটির সংজ্ঞা: “পাহাড়ের প্রাকৃতিক জঙ্গল কেটে রোদে শুকিয়ে তা আগুনে পুড়িয়ে কৃষিজ পণ্য উৎপাদনের পদ্ধতি”।

কিন্তু ঐ লেখাটির পরের বাক্যটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ: “এ চাষে কোন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হয় না… এসবকিছুই ঋতুর পালাবদলের সাথে সাথে সম্পন্ন করতে হয়। যদি সময়ের সাথে তাল মিলাতে না [পারে] তাহলে জুমের কোন ফসলই উত্তমরূপে ফলবে না।”

অর্থাৎ জুমের প্রযুক্তি যন্ত্রে নয়, সময়জ্ঞানে। ঠিক কোন সপ্তাহে আগুন দিতে হবে, কোন বৃষ্টির আগে বীজ পড়তে হবে — এই হিসাবটাই মূল দক্ষতা।

পদ্ধতিটি কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়। একই লেখায় অন্য দেশের নামগুলোর তালিকা আছে — আসামে জ্যাহোমা, সলোমন দ্বীপপুঞ্জে য়্যাম, জাপানে কারেন, জাভায় হুমা, সুমাত্রায় জুমা, মিয়ানমারে টঙ্গিয়া, তিব্বতে ঝোং, ব্রাজিলে রোকা। বাংলা উইকিপিডিয়ায় ভারতের আরও কয়েকটি নাম আছে — পোড়ু, বীরা, পোনম।

জুমঘর
জুমঘর। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ

কোন পাহাড়ে জুম হয়, কোনটায় হয় না

এটি সেই অংশ যা প্রায় কোনো লেখায় থাকে না। আর্কাইভের লেখাটি অনুযায়ী স্থান নির্বাচনের শর্তগুলো বেশ কড়া:

  • মাটি: শুধু পাথর হলে হবে না; শুধু এঁটেল মাটি হলেও নয়। দোআঁশ মাটি দরকার — কিন্তু দোআঁশ হলেই যথেষ্ট নয়।
  • আর্দ্রতা: “বৃক্ষ-গুল্ম ও মাটির উপযোগিতা সঠিক হলেও যদি মাটির আর্দ্রতা শুষ্ক থাকে সেক্ষেত্রেও সে স্থানে জুমচাষ করা যাবে না।”
  • গাছপালার ধরন: অতিরিক্ত ছনের খলা, আগাছা-লতা বা বাঁশঝাড় থাকলে ঐ জায়গা বাদ।
  • পানি: কাছাকাছি জলাশয় বা জলাধার থাকা “আবশ্যকীয়”।
  • বন্যপ্রাণী: আশপাশের বনে ফসলহানিকর পশুপাখি বা কীটপতঙ্গ থাকলে সে জায়গা ত্যাগ করতে হয় — অথবা সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে চাষ করতে হয়, যাতে পাহারা দেওয়া যায়।

শেষ পয়েন্টটি লক্ষণীয়: বন্যপ্রাণীর চাপ সরাসরি সামষ্টিক চাষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জুম কেবল ব্যক্তিগত পরিবারের কাজ নয়।

জুম চক্র: মাসে মাসে কী কাজ

আর্কাইভের লেখাটির সবচেয়ে মূল্যবান অংশ হলো বাংলা মাস ধরে সাজানো একটি পূর্ণ কর্মপঞ্জি। নিচে সেটিই সংক্ষেপে:

মাস কাজ
পৌষ–মাঘজুমের স্থান নির্ধারণ; মাটি পরীক্ষা; আশপাশে পশুপাখি ও পোকামাকড়ের জরিপ; জলাশয় আছে কি না দেখা
ফাল্গুন–চৈত্রনির্ধারিত জায়গার বৃক্ষ-গুল্ম ও জঙ্গল কাটা
চৈত্র–বৈশাখজুমে আগুন দেওয়া; ভস্ম ছড়ানো; অবশিষ্ট খড়কুটো পরিষ্কার
বৈশাখ–জ্যৈষ্ঠবীজ বপন — ধান, তুলা, তিল, তিশি, ভুট্টা, কইন ধান, কার্পাস তুলা, বরবটি, ঢেঁড়স, মিষ্টি কুমড়ো
আষাঢ়–শ্রাবণচারা রক্ষণাবেক্ষণ; আগাছা সাফ; লতাজাতীয় ঘাস কাটা; (কোথাও কোথাও) সার দেওয়া
শ্রাবণ–ভাদ্রএকই কাজ চলতে থাকে
ভাদ্র–আশ্বিনপশুপাখি তাড়ানো; পরিবার নিয়ে জুমঘর বা টংঘরে ওঠা — ফসল আসতে শুরু করায় পাহারা দিতে হয়
আশ্বিন–কার্তিকফসল তোলা শুরু; ধান কেটে থুরুং (ঝুড়ি) ভরে টংঘরে স্তূপ করা
কার্তিক–অগ্রহায়ণধান মাড়াই ও শুকানো — “যুবক-যুবতীরা দল বেঁধে পালাক্রমে জুমে জুমে গিয়ে পায়ে চেপে চেপে” মাড়াই করে
অগ্রহায়ণটংঘর থেকে গ্রামে ধান নেওয়া; তুলা, তিল, তিশি, কইন ধান, আলু তোলা

দুটি জিনিস এখানে চোখে পড়ার মতো।

প্রথমত, পুরো পরিবার মাঠে উঠে যায়। ভাদ্র-আশ্বিনে জুমঘরে ওঠা মানে কয়েক মাস পাহাড়েই থাকা — এটি কেবল কৃষিকাজ নয়, একটি মৌসুমি জীবনযাপন।

দ্বিতীয়ত, সার নিয়ে একটি সৎ স্বীকারোক্তি আছে। আর্কাইভের ছকে লেখা: “আগে জুমে সার দেওয়া হতো না। বর্তমানে জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে পাহাড়ী অঞ্চলে জায়গা সঙ্কুচিত হওয়ায় একই স্থানে বারবার জুমচাষ করার ফলে কোন কোন জুমে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয়।” জুম আর “সম্পূর্ণ প্রকৃতিনির্ভর” নেই — কারণ চক্রটাই ছোট হয়ে এসেছে।

জ্বালানি কাঠ সংগ্রহকারী জুম্ম নারীরা
জ্বালানি কাঠ সংগ্রহকারী জুম্ম নারীরা। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ

জুমে কী কী ফলে

জুমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এক ফসল নয়, মিশ্র ফসল। আর্কাইভের লেখার ভাষায়: “শুধু ধান্য ফসল নয়, এর পাশাপাশি নানা ধরনের শাক-সবজি, আলু, দানাজাতীয় শস্য সবকিছু পাওয়া যায়। তাই জুমচাষ করে আদিবাসীরা খাদ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভ করে।”

তিনটি উৎসের ফসল-তালিকা মিলিয়ে দেখা যাক:

উৎস ফসল
জুমজার্নাল আর্কাইভধান, তুলা, তিল, তিশি, ভুট্টা, কইন ধান, কার্পাস তুলা, বরবটি, ঢেঁড়স, মিষ্টি কুমড়ো, আলু
বাংলাপিডিয়াrice, maize, millet, sesame, cucumber, pumpkin, melon, stringbean, cotton, banana, ginger, turmeric
বণিক বার্তা (কৃষি গবেষণা কেন্দ্র)ধান, মিষ্টি কুমড়া, মারফা, চিনাল, অড়হর, শিম, আদা, হলুদ — “প্রায় ১৮ ধরনের ফসল”

তিন তালিকা মিলিয়ে যা দাঁড়ায়: একটি জুমক্ষেতে খাদ্যশস্য, ডাল, তেলবীজ, সবজি, মসলা ও তন্তু-ফসল একসঙ্গে চলে। কার্পাস তুলার উপস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ — পাহাড়ি বয়নশিল্পের কাঁচামাল একসময় জুম থেকেই আসত (দেখুন পিনন হাদি ও বেইন তাঁত নিয়ে আমাদের লেখা)। অর্থাৎ জুম কেবল খাদ্যের নয়, বস্ত্রেরও উৎস ছিল।

জুমের যন্ত্রপাতি

আর্কাইভের ছকে প্রতিটি ধাপের সঙ্গে ব্যবহৃত উপকরণের নামও আছে — এবং তালিকাটি ছোট, যা “আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হয় না” কথাটাকে সমর্থন করে:

  • দা — প্রায় প্রতিটি ধাপে
  • ছাবল, খন্টি — বীজ বোনার সময়
  • নিড়ানী — আগাছা সাফে
  • থুরুং / টুকরী / ঝুংড়ি — ঝুড়ি, বহনের জন্য
  • তলই (চাতাই) — শুকানো ও মাড়াইয়ে
  • লাউয়ের খোলস — পানি রাখার পাত্র
  • চকমকি পাথর — দা শাণ দেওয়ার জন্য
  • তুম প্লুং — এক প্রকার বাঁশি, পশুপাখি তাড়ানোর সময় ব্যবহৃত

শেষ জিনিসটা লক্ষ করার মতো: পাহারার সরঞ্জামের তালিকায় ফাঁদ ও বাঁশের ফালির পাশে একটি বাঁশি। শব্দ দিয়ে পশু তাড়ানো — এবং সম্ভবত দীর্ঘ পাহারার একঘেয়েমি কাটানোও।

জুমের জমি কার

জুম যেহেতু স্থানান্তরিত, স্বত্বের প্রশ্নটা জটিল। আর্কাইভের লেখাটি প্রথাগত নিয়মগুলো বেশ নির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করেছে:

  • “চিহ্ন” স্থাপনের পর জুম প্লটের উপর অস্থায়ীভাবে ব্যক্তি-অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • রান্যা (পতিত ফেলে রাখা) শর্তে মালিকানা নির্ধারিত হয় — জুমিয়া তাঁর জুমভূমি রান্যা হিসেবে ফেলে রাখলে পরে তা আবার চাষযোগ্য হলে সেখানে তাঁর মালিকানা স্বীকৃত।
  • একই স্থানে ১২ বছর জুমচাষ করলে মালিকানাস্বত্ব স্থায়ী হয়।
  • গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়ে ফিরে এলে আগের জুমভূমির অধিকার ফিরে পাওয়া যায় — তবে কেউ যদি “কোন দুষ্কর্ম বা অনুরূপ কোন কারণে” গ্রাম ছাড়েন, তিনি সেই দাবি হারান; ফিরলে তাঁকে নতুন প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।
  • প্রথম বছরে অন্যের জুম থেকে কিছু আহরণ করা “অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ”।
  • প্রতি বছর নির্ধারিত জুম এলাকায় প্লট ভাগ হয় পরিবারের সংখ্যার ভিত্তিতে।
  • কেউ জুমে ফলদ বা বনজ গাছ রোপণ করলে, তিনি যেখানেই থাকুন, সেই গাছের উপর তাঁর অধিকার বলবৎ থাকে।

উত্তরাধিকারের নিয়মটি অসম, এবং আর্কাইভের লেখাটি তা গোপন করেনি: “প্রথাগত আইন অনুযায়ী মেয়েদের উপর ঐ জমির অংশীদার হওয়া অধিকার বর্তাবে না। তবে পিতা-মাতা চাইলেই মেয়েকে সম্পত্তির অংশ দিতে পারে।” সাধারণত যে ছেলের সঙ্গে বাবা-মা থাকেন, তিনি বেশি অংশ পান।

কতজন জুম করেন, কত জমিতে

এখানে উৎসগুলো একমত নয় — এবং পার্থক্যগুলো ছোট নয়।

কী জুমজার্নাল আর্কাইভ বণিক বার্তা (2020) বাংলাপিডিয়া
বছরে চাষের আয়তন 20,000 হেক্টর — 20,000 হেক্টর
জুম-এলাকার বিস্তার 5,480 “কিলোমিটার” অশ্রেণীভুক্ত বনভূমি 5,480 বর্গকিলোমিটার —
জুমিয়া 34,000 পরিবার
(খাগড়াছড়ি 12,000 · রাঙামাটি ~10,000 · বান্দরবান ~13,000)
42,937 জন
(বান্দরবান 15,048)
—

তিনটি অসঙ্গতি আলাদা করে বলা দরকার।

এক — এককের গোলমাল। আর্কাইভের লেখায় আছে “৫ হাজার ৪৮০ কিলোমিটার অশ্রেণীভুক্ত বনভূমি”। কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একক, আয়তনের নয়। বণিক বার্তায় একই সংখ্যাটি আছে বর্গকিলোমিটার হিসেবে, যা অর্থবহ। আর্কাইভের বাক্যটিতে “বর্গ” শব্দটি বাদ পড়েছে বলেই মনে হয়। [যাচাই প্রয়োজন]

দুই — যোগফল মেলে না। আর্কাইভ বলছে মোট ৩৪ হাজার পরিবার, কিন্তু জেলাভিত্তিক সংখ্যাগুলো যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার। [যাচাই প্রয়োজন]

তিন — পরিবার না ব্যক্তি? আর্কাইভ গুনেছে “পরিবার”, বণিক বার্তা গুনেছে “জুমিয়া কৃষক” — অর্থাৎ ব্যক্তি। ৩৪ হাজার পরিবার আর ৪২,৯৩৭ জন কৃষক পরস্পরবিরোধী নয়, কিন্তু একই জিনিসও নয়। উৎস উদ্ধৃত করার সময় এই পার্থক্যটা ধরে রাখা দরকার।

নির্ভরতার মাত্রা নিয়ে একটি বড় সংখ্যা আছে: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) জরিপ অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ জুমচাষের উপর নির্ভরশীল। জরিপটি কোন সালের, তা আর্কাইভের লেখায় নেই। [যাচাই প্রয়োজন]

উৎপাদনশীলতা নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায় বণিক বার্তার লেখাটিতে (লেখক আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, হাটহাজারীর একজন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা): জাতীয় জাতের ধানের ফলন প্রতি হেক্টরে ২.০৩–২.৭৩ টন।

চক্র ছোট হয়ে আসা ও পরিবেশ-বিতর্ক

জুম নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে একটি সংখ্যা — ফেলে রাখার সময় বা fallow period। জঙ্গল কেটে পোড়ানোর পর জমি কত বছর বিশ্রাম পেলে আবার উর্বর হয়, সেটাই পুরো পদ্ধতির টেকসই হওয়া না-হওয়া ঠিক করে।

বাংলাপিডিয়ার জুম পাতাটি (লেখক Md Shahidul Islam) এখানে সবচেয়ে স্পষ্ট। সেখানে বলা হয়েছে, ফেলে রাখার সময় “ঐতিহ্যগত দশ বছর থেকে বিপজ্জনকভাবে কমে দুই থেকে তিন বছরে” নেমেছে; অন্যত্র একই পাতায় বলা হয়েছে “৭-৮ বছরের ন্যূনতম আবর্তন চক্র এখন কমে মাত্র ৩-৪ বছর”। বণিক বার্তার লেখায় সংখ্যাটি আরও কম — “বর্তমানে ১-৩ বছর”।

উৎসআগেএখন
বাংলাপিডিয়া (১)10 বছর2–3 বছর
বাংলাপিডিয়া (২)7–8 বছর3–4 বছর
বণিক বার্তা—1–3 বছর

একই পাতায় দুটি ভিন্ন জোড়া সংখ্যা থাকা অস্বাভাবিক; সম্ভবত দুটি ভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া। যেটি সব উৎসেই এক — চক্রটি অনেক ছোট হয়ে এসেছে। [যাচাই প্রয়োজন]

ক্ষতির হিসাব হিসেবে বাংলাপিডিয়ায় একটি সংখ্যা আছে যা প্রায়ই উদ্ধৃত হয়: প্রতি হেক্টরে ১০০ থেকে ২৫০ মেট্রিক টন মাটি ক্ষয়। ক্ষতিকর ফলাফল হিসেবে বলা হয়েছে — মাটির উর্বরতা হ্রাস, ভূমিক্ষয়, বন উজাড় এবং নদী-হ্রদে পলি জমা। বাংলাপিডিয়ার সিদ্ধান্ত: ৩-৪ বছরের চক্রও “এখনো টেকসই নয়”।

এখানে একটি জিনিস স্পষ্ট করে বলা দরকার, কারণ এই বিতর্কে তা প্রায়ই হারিয়ে যায়। আর্কাইভের লেখাটি নিজেই কারণটা দেখিয়ে দিয়েছে: চক্র ছোট হয়েছে “জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে পাহাড়ী অঞ্চলে জায়গা সঙ্কুচিত হওয়ায়”। অর্থাৎ জুমিয়া আগের মতোই চাষ করতে চাইলেও জমি কমে যাওয়ায় একই জায়গায় বারবার ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। মাটিক্ষয়ের সংখ্যাটি তাই পদ্ধতির বিরুদ্ধে যতটা, ভূমি-সংকোচনের বিরুদ্ধেও ততটাই সাক্ষ্য।

জুম আর রাষ্ট্রীয় ভূমিনীতির সম্পর্ক নিয়ে আলাদা একটি লেখা এই সিরিজে আসবে।

“জুমিয়া” শব্দটা কোথা থেকে এল

শব্দটি আজ পরিচয়সূচক, কিন্তু তার উৎপত্তি বাইরের। আর্কাইভে সংরক্ষিত “পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে জুমচাষ ও জুমিয়া” লেখাটি ল্যুইনের ১৮৬৯ সালের বিবরণ উদ্ধৃত করে জানাচ্ছে: “বাঙালিরা চট্টগ্রাম জেলার সীমান্তবর্তী এলাকার বন্ধুভাবাপন্ন উপজাতিগুলোকে ‘জুমিয়া’ বলে অভিহিত করত এবং অন্যদের, বিশেষ করে যারা বাংলা বলতে পারত না তাদের ‘কুকী’ হিসাবে আলাদাভাবে চিহ্নিত করত” (Lewin 1869:28)।

অর্থাৎ “জুমিয়া” ও “কুকী” — দুটোই ছিল সমতলের দেওয়া নাম, এবং ভাগটা হয়েছিল বন্ধুভাবাপন্ন কি না তার ভিত্তিতে। ঐ লেখাটি স্পষ্ট করে বলেছে, “কুকী” নামে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই।

একই লেখায় ল্যুইনের আরেকটি শ্রেণিবিন্যাসও আছে, যা মারমাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল — “খিয়ংথা” (নদীতীরবাসী) ও “টংথা” (পর্বতবাসী)। প্রথম দলে চাকমা ও মারমার মতো জনগোষ্ঠী, যাঁরা নদীর তীরে বা নিচু পাহাড়ের পাদদেশে থাকতেন এবং আগেই ব্রিটিশ প্রভাববলয়ে আসেন; দ্বিতীয় দলে ম্রো, বম, লুসাই — দুর্গম শিখরদেশের বাসিন্দা।

লেখাটির একটি সতর্কবাণীও উল্লেখযোগ্য: ব্রিটিশ শাসনের আগে সব পাহাড়ি জনগোষ্ঠী জুম করলেও তার মানে এই নয় যে তাঁরা “কোনো একক ও অভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে বাঁধা ছিল”। জুম একটি সাধারণ পদ্ধতি, একটি সাধারণ পরিচয় নয়।

যা এখনো জানা যায়নি

  • বীজের জাত — topics.md-এ “বীজের জাত” ও “বীজের তালিকা” চাওয়া হয়েছিল। কইন ধান ছাড়া জুমের স্থানীয় ধানের জাতগুলোর নাম কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি। এটি সবচেয়ে বড় ফাঁক — জুমের জীববৈচিত্র্যের মূল কথাটাই এখানে।
  • জুমিয়ার নিজের বক্তব্য — একজন জুমচাষির সরাসরি উদ্ধৃতি কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। বানিয়ে লেখার চেয়ে ফাঁকটা রেখে দেওয়াই ভালো।
  • আচার ও কৃষিপঞ্জিকার সম্পর্ক — বীজ বোনার আগে বা ফসল তোলার সময় কোন পূজা বা আচার হয়, কীভাবে হয় — ব্যবহারযোগ্য বিবরণ মেলেনি। এটি আলাদা একটি লেখার বিষয়।
  • ফলনের তুলনা — বণিক বার্তায় জাতীয় জাতের ধানের ফলন আছে, কিন্তু স্থানীয় জুম-ধানের ফলন কত, তা পাওয়া যায়নি।
  • এককের অসঙ্গতি — ৫,৪৮০ কিলোমিটার না বর্গকিলোমিটার, এবং সেই এলাকার কতটুকু আসলে জুমের অধীনে।
  • ADB জরিপের সাল — “৮০ শতাংশ নির্ভরশীল” সংখ্যাটি কোন বছরের, জানা যায়নি।
  • মাঠকর্ম — topics.md চেয়েছিল একটি পূর্ণ মৌসুম ধরে জুমক্ষেত পরিদর্শন ও সাক্ষাৎকার। এই লেখাটি সম্পূর্ণভাবে নথিভিত্তিক; মাঠের পর্যবেক্ষণ এতে নেই।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

জুম চাষ মানে কী?
পাহাড়ের প্রাকৃতিক জঙ্গল কেটে রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে সেই জমিতে চাষ করার পদ্ধতি। কয়েক বছর পর জায়গা বদলে নতুন পাহাড়ে যাওয়া হয়, আর পুরনো জমি ফেলে রাখা হয় উর্বরতা ফিরে পাওয়ার জন্য।

জুমে কি শুধু ধান হয়?
না। জুমের মূল বৈশিষ্ট্যই মিশ্র ফসল — একই ক্ষেতে ধানের সঙ্গে তুলা, তিল, তিশি, ভুট্টা, মিষ্টি কুমড়ো, বরবটি, ঢেঁড়স, আলু, আদা, হলুদ ইত্যাদি ফলে। কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের হিসাবে প্রায় ১৮ ধরনের ফসল।

জুম চক্র কত বছরের?
ঐতিহ্যগতভাবে জমি ৭–১০ বছর ফেলে রাখা হতো। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী তা এখন নেমেছে ২–৪ বছরে, বণিক বার্তার হিসাবে ১–৩ বছরে। সব উৎসই একমত যে চক্রটি বিপজ্জনকভাবে ছোট হয়ে এসেছে।

জুমের জমির মালিক কে?
প্রথাগত নিয়মে “চিহ্ন” স্থাপনের পর ঐ প্লটে অস্থায়ী ব্যক্তি-অধিকার জন্মায়; একই জায়গায় ১২ বছর চাষ করলে স্বত্ব স্থায়ী হয়। প্রতি বছর নির্ধারিত জুম এলাকায় প্লট ভাগ হয় পরিবারের সংখ্যার ভিত্তিতে।

জুম চাষ কি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর?
বাংলাপিডিয়া হেক্টরপ্রতি ১০০–২৫০ মেট্রিক টন মাটিক্ষয়ের কথা বলেছে এবং ৩–৪ বছরের চক্রকে “টেকসই নয়” বলেছে। তবে আর্কাইভের উৎসটি কারণ হিসেবে দেখিয়েছে জমি সংকুচিত হয়ে আসাকে — চক্র ছোট হওয়ায় জমি বিশ্রাম পাচ্ছে না।

তথ্যসূত্র

  1. প্রাথমিক উৎস — “পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে আদিবাসী লোকজ্ঞান”, জুমজার্নাল আর্কাইভ — মাসভিত্তিক জুম চক্র, যন্ত্রপাতি, স্থান নির্বাচন, প্রথাগত মালিকানা। লিংক
  2. প্রাথমিক উৎস — “পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে জুমচাষ ও জুমিয়া”, জুমজার্নাল আর্কাইভ — ল্যুইন ১৮৬৯, খিয়ংথা/টংথা, “জুমিয়া” ও “কুকী” নামের উৎপত্তি। লিংক
  3. প্রাথমিক উৎস — “চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জুমচাষ”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। লিংক
  4. প্রাথমিক উৎস — “চাকমা লোককথা: সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনী”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। লিংক
  5. Md Shahidul Islam, “Jhum”, Banglapedia, Asiatic Society of Bangladesh — আয়তন, মাটিক্ষয়, চক্রের দৈর্ঘ্য, ফসল, টেকসইতা। লিংক
  6. “পাহাড়ে জুম চাষের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উপায়”, বণিক বার্তা, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ — লেখক: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কৃষি অর্থনীতিবিদ, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, হাটহাজারী। লিংক
  7. “জুম চাষ”, বাংলা উইকিপিডিয়া — ভারতে প্রচলিত নাম (পোড়ু, বীরা, পোনম)। লিংক
  8. প্রাথমিক উৎস — “বন, পাহাড়, পরিবেশ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। লিংক

সর্বশেষ হালনাগাদ: 8 আগস্ট 2026

প্রসঙ্গ:জুম, জুম ও জুমিয়া, জুম চাষ, জুমচাষ

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা