Last updated Oct 6th, 2026
3

খাগড়াছড়ির পানখাইয়াপাড়া সড়কের পাশে সোম আর বৃহস্পতিবার সকালে একটা বাজার বসে। পাহাড়ি নারীরা হাতে করে পিনন-হাদি নিয়ে আসেন, রাস্তার ধারে বসে পড়েন। প্রতি হাটে অর্ধশতাধিক নারী। কেউ বিক্রি করেন কুড়ি জোড়া, কেউ তিন-চার জোড়া।
এক সেট পিনন হাদির দাম সেখানে পাঁচ হাজার থেকে পনেরো হাজার টাকা।
সংখ্যাটা শুনে মনে হয় ভালোই। কিন্তু দিঘীনালার মোনালিসা চাকমা, যিনি এই ব্যবসায় নতুন, খাগড়াছড়ির তৃতীয় মাত্রা-র প্রতিবেদক বিপ্লব তালুকদারকে বলেছেন, তিনি ওই হাটে ১২ সেট বিক্রি করেছেন — আর প্রতি সেটে লাভ হয়েছে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা।
পনেরো হাজার টাকার কাপড়, তিনশো টাকার লাভ। বাকি টাকাটা কোথায় যায় — এই লেখাটা সেই প্রশ্ন নিয়ে। কাপড়টা কীভাবে বোনা হয়, বেইন তাঁতের অংশ কী কী, নকশার ব্যাকরণ কেমন — সেসব আছে পিনন হাদি ও বেইন: পাহাড়ি কোমর-তাঁতের পূর্ণ পাঠ-এ। এটি তার অর্থনৈতিক শাখা।
রাঙামাটির রাঙাপানি গ্রামে ৭৫টি কোমর-তাঁতি পরিবারের উপর একটি মাঠজরিপ হয়েছিল ২০২২ সালে — অতসী চাকমা, মো. মনিরুজ্জামান মুজিব ও শামীমা আক্তারের গবেষণা, ছাপা হয়েছে International Journal of Humanities and Social Science Invention-এ। তাঁদের হিসাব:
“A complete pinon set needs 3 to 4 weeks of undivided attention and unrelenting effort.”
তিন থেকে চার সপ্তাহ — একটানা মনোযোগ আর অক্লান্ত পরিশ্রম। এর আগে আছে রং করার ধাপ, যাতে লাগে আরও এক থেকে দেড় সপ্তাহ। অর্থাৎ একটি সেট বাজারে পৌঁছাতে এক মাসের বেশি সময় চলে যায়।
শরীরের হিসাবটাও ওই জরিপে আছে। সারাদিন বসে গিঁট বুনতে হয় বলে জরিপে অংশ নেওয়া সবার মধ্যেই কোনো না কোনো সমস্যা পাওয়া গেছে — পিঠে ব্যথা, মাথাব্যথা, পেশির ব্যথা, চোখের সমস্যা। গবেষকদের ভাষায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে অনেক তাঁতির নানা রোগ হয়।
এই এক মাসের শ্রমের বিনিময়ে পরিবারগুলো কেমন থাকে? জরিপের ছক অনুযায়ী ৭৫টি পরিবারের ২০ শতাংশের আয় সবচেয়ে নিচের ধাপে, ৪৯.৩ শতাংশ মাঝের ধাপে, আর ১৬ শতাংশ সবচেয়ে উপরের ধাপে। (পেপারটির নিজের ভেতরেই এখানে একটা গরমিল আছে — সারসংক্ষেপে লেখা “৪০,০০০ টাকার বেশি মাসিক আয়”, অথচ ছকের ঘরে লেখা “Below 40000”, আবার মূল অংশে একই সংখ্যাগুলোকে ডলারে ও বার্ষিক হিসেবে লেখা হয়েছে। তাই শতাংশগুলোই দিলাম, টাকার অঙ্ক নয়।)
আরও দুটো সংখ্যা: তাঁতিদের ৬৬.৭ শতাংশের শিক্ষা প্রাথমিক পর্যন্ত, আর ৪৯.৩৫ শতাংশ থাকেন টিনের ঘরে — যে ঘরের টাকার বড় অংশ এসেছে সমবায় সমিতি বা এনজিওর ঋণ থেকে, কিস্তিতে শোধ করতে হয়।

একই জরিপ বলছে, রাঙাপানির ৬৯.৩ শতাংশ তাঁতি এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন, গড় সুদের হার ৮ শতাংশ। বাকি ৩০.৭ শতাংশ সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছ থেকেই কোনো সহায়তা পাননি। রাঙামাটিতে সরকার-নিবন্ধিত এনজিওর সংখ্যা ৪২।
সরকারের দিক থেকে কী আছে? গবেষকদের উত্তর সরাসরি — বয়নশিল্প ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এটি রক্ষা করতে সরকার কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেয়নি; একে রক্ষা, সম্প্রসারণ বা উন্নয়নের কোনো সরকারি উদ্যোগ নেই।
ছোট ছোট ব্যতিক্রম অবশ্য আছে। জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, মনোঘর সম্প্রতি ঝরে পড়া পাঁচজন মেয়েকে ঐতিহ্যবাহী বয়ন ও পানি-সরবরাহ মেরামতের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, খরচ হয়েছে ৪৮,০০০ টাকা। পাঁচজন।
এই লেখার সবচেয়ে জরুরি বাক্যটা ওই গবেষণাপত্রের উপসংহারে:
“Local brands are buying their wares and reselling them at a premium… Because the loom weavers lack a comprehensive understanding of business or the ability to sell on international platforms, they wholesale at low costs, whereas local brands sell at high prices in those showrooms.”
অর্থাৎ তাঁতি পাইকারি দামে ছেড়ে দেন, ব্র্যান্ড শোরুমে চড়া দামে বেচে। গবেষকদের পরের বাক্যটা আরও সরাসরি: টাকার অভাবে তাঁতিরা মাঝেমধ্যে শহরের হাটের দিনে গিয়ে আরও কম দামে জিনিস বেচে দেন। তাঁদের উপসংহারের ভাষায়, একদিকে প্রচুর টাকা তৈরি হচ্ছে, অথচ তাঁতিরা এখনো জীবিকার জন্য লড়ে যাচ্ছেন।
জুমজার্নালের আর্কাইভে এর সঙ্গে মেলে একটা পর্যবেক্ষণ। বেইন টেক্সটাইলের মঞ্জুলিকা চাকমা একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নতুন করে তাঁত কারখানা আর গড়ে উঠছে না — “যারা কাপড়-চোপড় ব্যবসা করছেন তারা তাঁতের কাপড় দিয়ে নয়। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে কাপড় কিনে এনে বুটিক ও ব্লক করে বিভিন্ন রকম ডিজাইন করে বিক্রি করছেন।”
দোকানের সাইনবোর্ডে “আদিবাসী বস্ত্র” লেখা থাকলেও ভেতরের কাপড়টা তাঁতে বোনা না-ও হতে পারে — কথাটা বলছেন এই শিল্পেরই সবচেয়ে বড় উদ্যোক্তা।
আর চাকমা সার্কেল চিফ রাজা দেবাশীষ রায় আর্কাইভের একটি লেখায় কথাটা এক বাক্যে সেরেছেন: “হ্যাঁ, কেবল ধনীরা ঐতিহ্যবাহী বাড়ীতে বোনা কাপড়-চোপড় কিনতে পারে।”
এই বাণিজ্যের একটা শুরু আছে, আর তার একটা নাম আছে।
মঞ্জুলিকা চাকমার জন্ম ১৯৪৪ সালে রাঙামাটিতে, বাবা কালীরতন খীসা, মা পঞ্চলতা খীসা। পঞ্চাশের দশকে তাঁর মা বাড়ির কোমর তাঁতে টেবিল ও পর্দার কাপড়, শাল ইত্যাদি বুনে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে বিক্রি করতেন। সেই কাপড় তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুল করিমের নজরে পড়ে, তিনি উৎসাহ দেন। আর্কাইভের বর্ণনায় ওখান থেকেই আদিবাসী বস্ত্রশিল্পের নতুন যাত্রা।
মঞ্জুলিকা চাকমা ম্যাট্রিক পাস করে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন, ১৯৬৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের পুরস্কারও পান। ১৯৬৫ সালে দুটি তাঁত জোগাড় করে তিনি কোমর-তাঁতের বুনন পদ্ধতি হস্তচালিত তাঁতে প্রয়োগ করেন — এটাই কারিগরি মোড়। ১৯৭৬ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোপুরি বস্ত্রশিল্পে নামেন, প্রতিষ্ঠা করেন বেইন টেক্সটাইল। শুরুর পুঁজি ছিল পাঁচশো টাকা আর দুটি কোমর তাঁত।
আর্কাইভের লেখাটি যখন প্রকাশিত হয়, তখন বেইন টেক্সটাইলের উৎপাদন বিভাগে দুই শতাধিক নারী-পুরুষ কর্মী, আর বিভিন্ন এলাকায় ১৫ থেকে ১৬টি বিক্রয়কেন্দ্র। ওই লেখা অনুযায়ী পার্বত্য এলাকার অনেক পরিচিত বস্ত্র প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনার ও মালিকদের হাতেখড়ি হয়েছিল বেইন টেক্সটাইলেই। আশির দশকের গোড়ায় এই সাফল্য দেখেই বিসিক তিন পার্বত্য জেলায় আদিবাসী বস্ত্র বিক্রয় ও প্রদর্শনী বিভাগ খোলে।
একটা ছোট অমিল টুকে রাখি: ওই লেখাতেই পুরস্কারের তালিকায় ডেইলি স্টার ও ডিএইচএল-এর বিজনেস অ্যাওয়ার্ডের সাল লেখা ২০০৫, অথচ ভেতরের একটি ছবির ক্যাপশনে লেখা “Bangladesh Business Award 2003”।
একসময় আসত জুমক্ষেত থেকে। ওই একই আর্কাইভ লেখায় আছে, আগে আদিবাসী নারীরা জুমে ফলানো তুলা থেকে সুতা বের করে ঘরে বসেই পোশাক বানাতেন। রাঙাপানির জরিপেও লেখা আছে, দশক কয়েক আগেও তাঁরা কাপড়ের কাঁচামাল জুমচাষেই ফলাতেন। জুমের তুলা থেকে সুতা আর বনের গাছ থেকে রং — এই পুরো চক্রটার একটি বিবরণ আছে ম্রো ও বম বস্ত্র নিয়ে লেখাটিতে।
এখন আর তা নয়। জরিপ অনুযায়ী রাঙাপানির ১৮.৩ শতাংশ তাঁতি কাঁচামাল নিজে বানাতে পারেন না, তাঁদের সব কাঁচামাল বাজার থেকে কেনা। The Daily Star-এর “Weaving: An indigenous heritage in Chittagong Hill Tracts” প্রতিবেদন অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলার বয়নকারীরা প্রায় ১৫০টি স্থানীয় বাজার থেকে তুলা কেনেন — ১ কেজি ২২০ টাকায়, তা থেকে অন্তত দুটি পিস, বাজারে যার দাম ৬০০ টাকার বেশি।
বাজারনির্ভরতার পাশে একটা বন্ধ কারখানা দাঁড়িয়ে আছে। মঞ্জুলিকা চাকমা সেই সাক্ষাৎকারেই বলেছিলেন, রাঙামাটি শহর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে ঘাগড়ায় একটি টেক্সটাইল মিল থাকলেও সেটি বন্ধ, আর কাঁচামালের মধ্যে সুতা ও রঙেরই সবচেয়ে বেশি অভাব।
বাংলা ট্রিবিউনের ২৫ এপ্রিল ২০২৫-এর প্রতিবেদনে (জিয়াউল হক) কারখানাটির হিসাব মেলে: কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নে রাঙামাটি টেক্সটাইল মিলস, স্থাপিত ১৯৮৩, অব্যাহত লোকসানে বন্ধ হয়ে যায় ২০০৯ সালে। জায়গা প্রায় ৩১ একর, বন্ধের সময় জনবল ছিল প্রায় এক হাজার। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন এখন সেটি চালুর কথা ভাবছে — বিটিএমসি চেয়ারম্যানের ভাষায়, “কীভাবে চালু করা যায়, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে চালু করা যায় কিনা সেটিও ভাবছি আমরা।”
শিল্পটি কত বড়, তা নিয়ে দুই উৎস দুই রকম বলে। আর্কাইভের লেখায় তিন পার্বত্য জেলায় পাঁচ হাজারের বেশি কারখানার কথা আছে; The Daily Star বলছে তিন জেলায় কোমর-তাঁতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অন্তত ৫০,০০০, আর যন্ত্রচালিত তাঁতের প্রতিষ্ঠান মোটে ২০টি — সবগুলোই রাঙামাটিতে। আর্কাইভের একই লেখা অনুযায়ী শুধু রাঙামাটি শহর ও আশপাশে এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত সাত হাজারের বেশি মানুষ, যাঁদের ৯০ শতাংশই নারী।
ঐতিহ্যবাহী পণ্যের দাম ও পরিচয় রক্ষার একটা আইনি হাতিয়ার আছে — ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই সনদ। পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের নিবন্ধিত জিআই পণ্যের সরকারি তালিকায় (হালনাগাদ ১৬ জুন ২০২৬) এখন ৬৪টি পণ্য।
তালিকায় বস্ত্রের ভাগটা ছোট নয় — ঢাকাই মসলিন, রাজশাহী সিল্ক, জামদানি শাড়ি, টাঙ্গাইল শাড়ি, সিলেটের মণিপুরি শাড়ি, মিরপুরের কাতান, সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি ও গামছা, জামালপুরের নকশিকাঁথা, রংপুরের শতরঞ্জি, কুমারখালীর বেডশিট, কালীগঞ্জের তোয়ালে, এবং কুমিল্লার খাদি।
৬৪টির একটিও পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়। পিনন নেই, পাহাড়ের খাদি নেই, বেইন নেই, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবানের কোনো পণ্যই নেই।
“খাদি” নামটা তালিকায় আছে বটে, কিন্তু সেটি কুমিল্লার খাদি — হাতে-কাটা সুতার আলাদা একটি বস্ত্র-ঐতিহ্য। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা পোশাকের ঊর্ধ্বাঙ্গের কাপড় ‘খাদি’ তার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, কোনো উৎসে পড়িনি; নামটা মিলে যায়, এটুকুই বলা যায়।
জিআই সনদ থাকলে দাম বা তাঁতির আয় কতটা বদলাত — সে প্রশ্নের উত্তর কোনো উৎসে পাইনি। কিন্তু আবেদনই যেখানে হয়নি, সেখানে প্রশ্নটা অন্তত তোলা যায়।
বাণিজ্যিকীকরণের আরেকটা দিক আছে, যেটা এই লেখায় ছুঁতে পারলাম না — পিনন-হাদির নকশার অনুকরণে বোনা যে শাড়ি বাজারে চলে, তার হিসাব। জিনিসটা আছে; কিন্তু এ নিয়ে যে একটিমাত্র প্রতিবেদন খুঁজে পেয়েছি, তার আসল পাতা বারবার চেষ্টা করেও খোলা যায়নি। না পড়ে লিখব না, তাই দিকটা ফাঁকা রইল।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৪ আগস্ট ২০২৬
প্রসঙ্গ:আদিবাসী নারী, চাকমা, রাঙামাটি
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।