Last updated Nov 3rd, 2026
0

জুমের জায়গা বাছাইয়ের আগের রাতে ত্রিপুরা জুমচাষি স্ত্রী-সন্তানের থেকে আলাদা বিছানায় ঘুমান, আর স্বপ্নে মাছ পেলে বা হাতির পিঠে চড়লে পরদিন পাহাড়ে গিয়ে “লওয়া” চিহ্ন পোঁতেন। মারমা গৃহকর্তা জুমের এক টুকরো মাটি বালিশের নিচে রেখে ঘুমান। পাংখোয়ারা জুম কাটার প্রথম দিনে অন্তত একটি মুরগি সঙ্গে নেন, কারণ যেখানে জুম হবে সেখানে রক্ত ঝরাতেই হয়। জুম চাষের আচার তাই কোনো একক “পাহাড়ি রীতি” নয় — প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব নাম, নিজস্ব দেবতা আর নিজস্ব দিনক্ষণ আছে, আর জুমের প্রতিটি ধাপ — জায়গা বাছাই, জঙ্গল কাটা, বীজ বোনা, নিড়ানি, ধান কাটা, গোলায় তোলা — কোনো না কোনো আচারে বাঁধা।
এই লেখা জুমের কাজের মাসভিত্তিক বিবরণ দেয় না; সেটি আছে আমাদের মূল লেখা জুম চাষ: পাহাড়ের কৃষিবিদ্যা, মাসে মাসে-য়, যেখানে আচার ও কৃষিপঞ্জিকার সম্পর্কটি “যা এখনো জানা যায়নি”-র তালিকায় ছিল। এখানে সেই ফাঁকটুকুই ভরানো হয়েছে — চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, পাংখোয়া, খুমি, খিয়াং, চাক ও লুসাই — এগারোটি জনগোষ্ঠীর জুম-আচার, প্রতিটি আলাদা উৎস ধরে। এক জাতির রীতি অন্য জাতির নামে লেখা হয়নি; যেখানে উৎস কোনো জাতির নাম দেয়নি, সেখানে সেটিও বলা আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমাদের সব লেখার সূচি পাবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
এই লেখায় যা আছে
কারণ একই ধাপে একেক জাতি একেক কাজ করে, আর নামগুলোও মেলে না। ধান কাটার পরের ভোজকে মারমারা যে নামে ডাকেন, ম্রো, বম বা চাকরা সে নামে ডাকেন না; চাকমারা আষাঢ়ে যে দিনটিতে মাটিতে কোদাল ছোঁয়ান না, তার সমান্তরাল দিন খুমিদের আছে, কিন্তু পূজার উদ্দেশ্য আলাদা। জাতি ধরে না পড়লে আচারগুলো গুলিয়ে যায়।
উৎসগুলোর একটা বৈশিষ্ট্যও মনে রাখা দরকার। জুমজার্নালের আর্কাইভে প্রায় প্রতিটি জাতির ওপর সেই জাতিরই কোনো লেখকের লেখা আছে — চাকমা আচার নিয়ে বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান (১৯৮৯) ও সুযশ চাকমা, ত্রিপুরা নিয়ে শক্তিপদ ত্রিপুরা ও সন্তোষ বিকাশ ত্রিপুরা, মারমা নিয়ে মংসিংঞা মারমা, বম নিয়ে জির কুং সাহু, পাংখোয়া নিয়ে লাল চুয়াক লিয়ামা পাংখো, খুমি নিয়ে লেলুং খুমী, চাক নিয়ে মংমং চাক ও চিংহ্লামং, তঞ্চঙ্গ্যা নিয়ে বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা। এগুলোর পাশে রাখা হয়েছে বাংলাপিডিয়ার ভুক্তি আর কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদন। একই জাতি নিয়ে দুই উৎসের বিবরণ না মিললে দুটোই লেখা হয়েছে।
আরেকটি সতর্কতা: আচারের অনেকগুলোই আজ আর সবাই পালন করেন না। বমরা 1918 সাল থেকে ধীরে ধীরে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছেন বলে জির কুং সাহু লিখেছেন; বাংলাপিডিয়া লুসাইদের শতভাগ খ্রিস্টান বলে; খুমিদের মধ্যে প্রকৃতিপূজারি, ক্রামা ও খ্রিস্টান — তিন ধারাই আছে। তাই নিচের বিবরণের অনেকটাই “প্রথাগত রীতি” — কোন গ্রামে আজও কতটুকু চলে, তার হিসাব কোনো উৎসে নেই।
জায়গা বাছাইয়ের পর প্রায় প্রতিটি নথিভুক্ত জাতি সেখানে একটি চিহ্ন পোঁতে, যাতে অন্য কেউ সেই জায়গা না নেয়; আর অন্তত চারটি উৎসে চিহ্ন দেওয়ার পর রাতের স্বপ্ন দেখে ঠিক হয় জায়গাটি চাষ হবে কি না। চিহ্নের গড়ন, স্বপ্নের শুভ-অশুভ লক্ষণ ও নাম জাতিভেদে আলাদা।
সুযশ চাকমার “চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জুমচাষ” লেখায় জুমভূমি চিহ্নিত করার পর মালিকানার চিহ্ন বসানোর নাম “ধোজ্যে লাগারা”। একটি বাঁশের মাথায় আড়াআড়ি একটি কাঠি ঢুকিয়ে তার ওপর একটি মাটির ঢেলা রাখা হয়। এটি অন্য জুমিয়াদের জানিয়ে দেয় জায়গাটি আগেই কেউ বেছে নিয়েছেন। এই লেখায় চাকমাদের ক্ষেত্রে স্বপ্ন-বিচারের কথা নেই।
মংসিংঞা মারমার “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” অনুযায়ী পরিবারের প্রধান ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে জায়গা বাছেন, তারপর দুই টুকরো বাঁশ বেঁধে বানানো একটি ক্রস চিহ্ন পুঁতে দেন। প্রাথমিক জঙ্গল কাটার পর একটু জায়গা পরিষ্কার করে বাঁশের একটি মঞ্চ বানানো হয়, তার ওপর রাখা হয় দুটি বড় মাটির ঢেলা, আর দেবতার উদ্দেশে প্রার্থনা করা হয় — এ বছর এখানে জুমের জন্য জঙ্গল কাটা হবে, ভূত-প্রেত যেন পরিবারের ক্ষতি না করে, অনুমতি থাকলে যেন জানানো হয়।
এরপর জুমক্ষেত থেকে এক টুকরো মাটি এনে রাতে বালিশের নিচে রাখা হয়। গৃহকর্তা যদি স্বপ্নে মাছ, দুধ বা মাংস দিয়ে ভাত খান, তবে তা শুভ; চুল কাটা, ঠাট্টা-তামাশা বা সাদা পোশাক দেখলে অশুভ, আর তখন নতুন জায়গা খুঁজতে হয়। বাংলাপিডিয়ার মারমা ভুক্তিও বলে, দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে মারমাদের কাছে স্বপ্নের প্রভাব খুব বেশি।
জুমজার্নাল আর্কাইভের “ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর প্রচলিত রীতিনীতি ও প্রথা” লেখায় জুমের জন্য বাছা জায়গায় চিহ্ন দিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার নাম “লওয়া”। আগের রাতে জুমচাষি স্ত্রী-পুত্রের কাছ থেকে আলাদা বিছানায়, হাত-মুখ ধুয়ে শুদ্ধ হয়ে ঘুমান। স্বপ্নে মাছ পাওয়া, হাতির পিঠে চড়া বা কোনো যুবতীকে ঘরে আসতে দেখা শুভ লক্ষণ।
শুভ স্বপ্ন দেখলে পাহাড়ে গিয়ে উর্বর মাটি দেখে কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করা হয়, দুই-আড়াই হাত লম্বা গাছ বা বাঁশের তিনটি টুকরো সমান্তরালভাবে পোঁতা হয় (মাঝেরটি একটু উঁচু)। সামনের মাটি সমান করে বাঁশের ফালির ওপর তিন টুকরো পাতা, পাতার ওপর কেঁচোর ঢিবির মাটি রাখা হয়; বাঁশের চোঙায় ছড়ার পানি এনে চন্দ্র, সূর্য, বসুমতি ও গঙ্গাকে স্মরণ ও সাক্ষী রেখে লওয়া দেওয়া হয়। একবার কেউ লওয়া দিলে সেখানে আর কারও লওয়া দেওয়ার অধিকার থাকে না।
লাল চুয়াক লিয়ামা পাংখোর “পাংখোয়া জাতির আদ্যোপান্ত” অনুযায়ী জুম কাটার আগে বাঁশ চিরে ক্রসের মতো চিহ্ন দিয়ে জায়গা আগেভাগে চিহ্নিত করা হয় — এর নাম “ফালদার জে” (Phaldar zeh)। যেদিন ফালদার জে করা হয়, সেই রাতের স্বপ্ন ভালো হলে জুম হবে, ভালো না হলে হবে না।
সিংইয়ং ম্রোর “পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে আদিবাসী লোকজ্ঞান” লেখা চিহ্ন স্থাপনের সময় “জুম দেবতার নামে সত্যক্রিয়া”-র কথা বলে, যাতে স্বপ্ন দেখা যায়; স্বপ্ন অশুভ হলে প্লটটি বাতিল। অশুভ স্বপ্নের উদাহরণ: মাংস কাটা, আগুন, মরা মুরগি, মৃত জীবজন্তু। লেখাটি এখানে কোনো নির্দিষ্ট জাতির নাম দেয়নি, তাই এটিকে কোনো এক জাতির রীতি বলে ধরা যায় না।
| জনগোষ্ঠী ও উৎস | স্বপ্নের আগে | শুভ | অশুভ |
|---|---|---|---|
| মারমা (মংসিংঞা মারমা) | জুমের মাটি বালিশের নিচে | মাছ, দুধ বা মাংস দিয়ে ভাত খাওয়া | চুল কাটা, ঠাট্টা-তামাশা, সাদা পোশাক |
| ত্রিপুরা (আর্কাইভ, প্রথা-বিষয়ক লেখা) | আলাদা বিছানা, শুদ্ধ হয়ে ঘুম | মাছ পাওয়া, হাতির পিঠে চড়া, যুবতী ঘরে আসা | উৎসে উল্লেখ নেই |
| পাংখোয়া (লাল চুয়াক লিয়ামা পাংখো) | ফালদার জে-র দিন | “ভালো” স্বপ্ন — বিবরণ নেই | বিবরণ নেই |
| জাতির নাম নেই (সিংইয়ং ম্রো) | জুম দেবতার নামে সত্যক্রিয়া | উৎসে উল্লেখ নেই | মাংস কাটা, আগুন, মরা মুরগি, মৃত জীবজন্তু |
চিহ্নের এই প্রথা যে আজ দুর্বল হয়ে আসছে, সে কথা উঠে এসেছিল 2021 সালের নভেম্বরে বান্দরবানে মারমা নবান্ন অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশ পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী সেখানে প্রধান অতিথি বলেছিলেন, 40 বছর আগে পাহাড়ে লাঠির মাথায় ক্রস চিহ্ন দেখলে সবাই বুঝত জায়গাটি কেউ জুমের জন্য ঠিক করেছেন, কেউ আর সেখানে হাত দিত না; সেই সম্মান এখন হারিয়ে যাচ্ছে। জুমের জমির মালিকানা ও খাজনার নিয়ম নিয়ে বিস্তারিত আছে জুম কর কে তোলেন, কত, আর টাকাটা শেষে কোথায় যায় লেখায়।
জঙ্গল কাটা জুমের সবচেয়ে ঝুঁকির কাজ, আর এর আগে-পরে আচারও সবচেয়ে কঠোর। পাংখোয়ারা প্রথম দিনে বলি দেন, ত্রিপুরারা কাথারক পূজা ও নাচ করেন, খুমিরা শুষ্ক মৌসুমে পাড়া বন্ধ রাখেন, আর ম্রো সমাজে জুম শুরুর আগে আমিষ খাওয়া নিষেধ। চাকমা সমাজে এর সামাজিক দিকটি — দল বেঁধে কাটা — “মালেইয়া” নামে নথিভুক্ত।
লাল চুয়াক লিয়ামা পাংখো লিখেছেন, জুম কাটার (“লৌ ভাত”) প্রথম দিন কমপক্ষে একটি মুরগি বা মোরগ সঙ্গে নিতেই হয়; শূকর, গরু বা গয়াল নিতে পারলে আরও ভালো। যেখানে জুম হবে সেখানে অন্তত রক্ত ঝরাতে হয়, নইলে জুমক্ষেতের মালিক বা অধিষ্ঠাত্রী দেবতা অসন্তুষ্ট হন — এই রেওয়াজ পাংখোয়ারা এখনও মানেন বলে তিনি লিখেছেন। জুম কাটা শুরু হয় ফেব্রুয়ারিতে, শেষ করতে হয় মার্চের মধ্যে। কাজটিকে পবিত্র ও একপ্রকার যুদ্ধ হিসেবে দেখা হয়, কারণ গাছ-বাঁশ কাটতে গিয়ে যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কাটার প্রায় দেড় মাস পরে জুম পোড়ানো হয় (“লৌ ওর”)।
বাংলাপিডিয়ার পাংখোয়া ভুক্তি (আহমেদ রফিক) আরও বলে, সৃষ্টিকর্তা “পত্যেন”-এর পর পাংখোয়াদের প্রধান দেবতা “খোজিং” — অরণ্যের কর্তা, যিনি জুমচাষের ভালোমন্দও নিয়ন্ত্রণ করেন, তাই অধিকাংশ পূজাপার্বণ তাঁরই উদ্দেশে। খোজিংয়ের সন্তুষ্টির জন্য বৈশাখের শুরুতে নাচ হয়, আর মূল খোজিং পূজা হয় শ্রাবণে, যা সমাজের সবচেয়ে বড় উৎসব। বাংলাপিডিয়া পাংখোয়াদের “নিজেদের বৌদ্ধ বলে দাবি” করার কথা লেখে, আর জির কুং সাহু লেখেন বম, পাংখোয়া ও লুসাইরা “একশত ভাগই খ্রিস্টিয়ান”। এই অমিল ও পাংখোয়াদের বাকি পরিচয় আছে পাংখোয়া জনগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের লেখায়।
শক্তিপদ ত্রিপুরা ও সন্তোষ বিকাশ ত্রিপুরার “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত” অনুযায়ী কোনো শুভ কাজের আগে, “অথবা জুম কাটা শুরু করার আগে”, ত্রিপুরারা কাথারক পূজার আয়োজন করেন এবং কাথারক নৃত্য পরিবেশন করেন — এ কারণে নাচটির আরেক নাম মাঙ্গলিক নৃত্য। নর্তক মাথায় দীপশিখাসহ বোতল, হাতে থালা নিয়ে পানিভর্তি কলসির ওপর উঠে নাচেন; লেখকদের ব্যাখ্যায় দীপশিখা জ্ঞানের, কলসি কর্মের, মদের বোতল শক্তির আর ফুলের মালা ভক্তির প্রতীক। আর্কাইভের ত্রিপুরা প্রথা-বিষয়ক লেখাও বলে, ত্রিপুরা সমাজের নিয়মে “বছরের প্রথমে” কাথারক পূজা হয়।
লেলুং খুমীর “খুমী জাতির আদ্যোপান্ত” লেখায় প্রকৃতিপূজারি খুমিদের জুম ঘিরে চারটি আচারের প্রথমটি “নিশা জা” — শুষ্ক মৌসুমের পাড়া-বন্ধক পূজা। এটি পাড়াকেন্দ্রিক, চলে 2–3 দিন; ছাগল, শূকর ও মুরগি জবাই হয়, পাড়ার লোক বাইরে যেতে পারেন না, বাইরের লোকও ঢুকতে পারেন না। উদ্দেশ্য পাড়ার দেবতাকে সন্তুষ্ট করা, যাতে তিনি রোগ-বালাই আর বিপদ থেকে রক্ষা করেন। খুমিদের সব উৎসবের দুই উৎসের নাম পাশাপাশি রাখা আছে খুমি জনগোষ্ঠী লেখার ছকে।
আর্কাইভের “ম্রো জনগোষ্ঠী: প্রচলিত রীতিনীতি ও প্রথা” লেখায় আছে, ম্রো সমাজে জুম চাষের আগে মাছ, মাংস, মশলা ইত্যাদি আমিষ খাওয়া সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, এবং রীতিটি এখনও প্রচলিত। বাংলাপিডিয়ার ম্রো ভুক্তি (আব্দুল মাবুদ খান) বলে, ম্রোদের তিন দেবতার একজন পাহাড়ের দেবতা “সাংতুং”, জুমে ভালো ফসলের আশায় তাঁর কাছেই প্রার্থনা করা হয়।
সিংইয়ং ম্রো লিখেছেন, জুম কাটার আগে “অনেক আদিবাসী” 2–3 দিনের “পাড়া বন্ধ” পূজা করেন, আর জুম কাটা সাধারণত শুরু হয় বুধ, বৃহস্পতি বা মঙ্গলবারে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে। বিধবা ও অসুস্থ মানুষের জুম কাটা হয় স্বেচ্ছাশ্রমে — যেমন 10 জনের এক দিনের শ্রম। কোন জাতির রীতি, লেখায় তা বলা নেই।
বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান “চাকমা পূজা পার্বণ” (1989) লেখায় স্পষ্ট বলেছেন, মালেইয়া কোনো পূজা নয়, এতে কোনো দেবতার পূজা হয় না। কারও জুম কাটা দেরি হয়ে গেলে — ঠিক সময়ে না কাটলে জঙ্গল শুকাবে না, ভালো পোড়া যাবে না, ফসলও ভালো হবে না — তিনি পাড়ার ঘরে ঘরে গিয়ে সাহায্য চান; পরদিন প্রতি বাড়ি থেকে একজন দা-কুড়াল নিয়ে এসে এক দিনে কাজ শেষ করে দেন। মজুরি নেই, শুধু ভালো খাবার। নিড়ানি ও ধান কাটাতেও মালেইয়া ডাকা হয়। সঞ্জীব চাকমার “চাকমা জাতি” লেখা আহ্বানটির নাম দেয় “মালেইয়া-দাগানা”, অর্থাৎ দশের সাহায্য চাওয়া।
বাংলাপিডিয়ার “জুমচাষ” ভুক্তি অনুযায়ী চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষের অনুষ্ঠানের পর সাধারণত জমিতে ফসল বোনার উৎসব শুরু হয়, পরিবারের সবাই মিলে বীজ বোনেন। অর্থাৎ পাহাড়ের বড় বর্ষবরণ উৎসবগুলো — চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই, ত্রিপুরাদের বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু — জুম পোড়ানো আর বীজ বোনার মাঝখানে পড়ে।
বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি “Jhum” ভুক্তি সময়টা লেখে এপ্রিলের প্রথম বৃষ্টির পর; মংসিংঞা মারমাও লেখেন, মারমারা এপ্রিলের কোনো এক সময় প্রথম ভারী বৃষ্টির পর ধানের বীজ বোনেন, সঙ্গে কার্পাস, ভুট্টা, মারফা, শিম, আলু। মারমারা পাহাড়ের নিচ থেকে ওপরে উঠতে উঠতে “দাউজু” নামের বিশেষ দা দিয়ে গর্ত খুঁড়ে বীজ ফেলেন; জুমের সীমানায় হলুদ, আদা ও বুনো ফুল লাগান। উৎসব আর বোনার এই ক্রম কাকতালীয় না কোনো নিয়মে বাঁধা — কোনো উৎস সরাসরি সে প্রশ্নের উত্তর দেয় না; বাংলাপিডিয়া শুধু ক্রমটা জানায়।
উৎসবগুলোর নিজের আচার — ফুল ভাসানো, বয়স্কদের স্নান, পাজন, জলকেলি — এখানে আর বলা হলো না। চার জাতির আলাদা আচার-ক্রম আছে বৈসাবি: বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসুর আলাদা আচার-ক্রম লেখায়, আর বিজুর খাবারের রীতি পাজন নিয়ে লেখায়।
সিংইয়ং ম্রোর লেখায় বীজ বোনার সঙ্গে একটি আচারিক জায়গার কথা আছে: পোড়া জুমের এক পাশে একটি পবিত্র স্থান ঠিক করা হয়, প্রথম দিনে যে বীজগুলো রোপণ করা হবে সেগুলো সেখানে জড়ো করা হয়। কোন কোন ফসলের বীজ বোনা হবে, সে সিদ্ধান্ত নেন নারীরা। এই একই পবিত্র স্থানে পরে, ধান কাটার আগে, প্রথম ফসলের পূজা হয় (নিচে “ধান কাটার আগে” অংশ দেখুন)। এখানেও লেখক জাতির নাম দেননি।
ধানের চারা ওঠার পর থেকে পাকা পর্যন্ত জুমের সবচেয়ে বড় শত্রু আগাছা, পোকা, বানর, হরিণ, শূকর আর পাখি। এই পর্বের পূজাগুলোর উদ্দেশ্য তাই ফসল রক্ষা: খিয়াংদের “বুগেলে”, খুমিদের “ল ব”, ত্রিপুরাদের “মাইনযুগমা”, আর চাকমাদের “জুম মারা আঙ”-এর মতো সুরক্ষা-লিপি।
আর্কাইভের “খিয়াং” লেখা অনুযায়ী জুমে ধান রোপণের পর, ধানের চারা উঠলে, খিয়াংরা জুমে শূকর বলি দিয়ে “বুগেলে” অনুষ্ঠান করেন। উদ্দেশ্য — জুমের ধান, তুলা ও অন্যান্য ফসল যেন “বনাঙ্গ” থেকে রক্ষা পেয়ে বেশি ফলন দেয়। শূকরের মাংস আর মদ দিয়ে গ্রামের আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে ভোজ হয়। খিয়াংদের বাকি পরিচয় আছে খিয়াং জনগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের লেখায়।
লেলুং খুমী লেখেন, জুমে প্রথমবার আগাছা পরিষ্কারের সময় “ল ব” পূজা হয় — জুমে যেন বেশি আগাছা না ওঠে, আর জুমে কোনো খারাপ দেবতা থাকলে যেন রোগ-বালাই না ছড়ায়। জুম দেবতাকে খুশি করতে পূজা হয় মুরগি ও ডিম দিয়ে; এটি পরিবারভিত্তিক।
ত্রিপুরা প্রথা-বিষয়ক আর্কাইভ লেখা বছরের পূজাগুলোকে একটি ক্রমে সাজায়: বছরের প্রথমে কাথারক পূজা, “ফসল উৎপাদনের সময়” মাইনযুগমা পূজা, ফসল সংগ্রহের পর নুখুংনি পূজা বা বাৎসরিক পূজা, আর বছরের শেষে কারায়া-গরয়া দেবতার পূজা। মাইনযুগমা পূজার আচারের বিবরণ লেখায় নেই। একই লেখা বলে, জুমের কাজে গহীন বন পার হওয়ার সময় যেন অপদেবতার দৃষ্টি না পড়ে আর হিংস্র জন্তু আক্রমণ না করে, সে জন্য আশীর্বাদ বিতরণ করা হয়।
সুযশ চাকমা জুম-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি “তন্ত্রমন্ত্র” লিপিবদ্ধ করেছেন। “আঙ” হলো জাদুক্ষমতাসম্পন্ন লেখা, যা দুষ্ট আত্মা বা কারও “টোনা” থেকে রক্ষা করে বলে বিশ্বাস। “জুম মারা আঙ” স্লেট পাথরে লিখে কয়েকটি উপকরণসহ দূষিত স্থানের মাটির নিচে পোঁতা হয়, যাতে অশুভ চিহ্নবাহী আত্মারা জুম থেকে দূরে থাকে। “জুম মারা চোল পরা”-তে মন্ত্রপূত চাল পাঁচটি কাটা মিডিঙ্গা বাঁশের ডগায় রেখে একটি জুমের মাঝখানে আর চারটি চার কোণে পোঁতা হয়। লেখাটি এর উল্টো ব্যবহারও নথিভুক্ত করেছে — “জুম মারা বান”, যা বেদখল হয়ে যাওয়া জুমভূমির উর্বরতা নষ্ট করতে ব্যবহৃত হয় বলে বিশ্বাস।
সিংইয়ং ম্রো লিখেছেন, চারা বড় হওয়ার সময় বানর ও হরিণের উপদ্রব বাড়ে, ফাঁদ পাতা হয়, আর ফসলহানি, পোকা ও জন্তুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে “স্বীয় সংস্কারের পদ্ধতিতে” নানা পূজা-অর্চনা হয়। তাঁর লেখায় আরও আছে, জুমে ধান রোপণ থেকে পাক ধরা পর্যন্ত পাশের ঝিরি থেকে মাছ বা কাঁকড়া ধরা যায় না, নিরামিষ খেতে হয়; আর ফসলের চারা অঙ্কুরিত না হওয়া পর্যন্ত জুমে কোনো পাখির বাচ্চা ধরা নিষেধ। এই নিয়মগুলোও কোনো নির্দিষ্ট জাতির নামে লেখা নয়।
বর্ষার মাঝামাঝি আষাঢ়ে অন্তত চারটি জাতির একটি আচারিক বিরতি নথিভুক্ত: চাকমাদের আহল পালনী, তঞ্চঙ্গ্যাদের আলপালনী, খুমিদের নিচো জা, আর ম্রোদের কেরাই বা কাংনাত পূজা। তবে উদ্দেশ্য এক নয় — চাকমাদের দিনটি মাটির বিশ্রামের, খুমি ও ম্রোদেরটি পাড়ার সুরক্ষার।
চাকমাদের এই দিনটির তিনটি বিবরণ আর্কাইভে আছে, আর সেগুলো পুরোপুরি মেলে না:
অর্থাৎ বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান ও সঞ্জীব চাকমা হালচাষের কথা বলেন, সুযশ চাকমা জুমের; একজন তিন দিনের কথা বলেন, অন্য দুজন একটি দিনের। তারিখ — 7 আষাঢ় — তিনটিতেই এক।
বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যার “তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত” তঞ্চঙ্গ্যাদের সামাজিক উৎসবের তালিকায় বিষু, রাজপুণ্যাহ ও নবান্নের পাশে “আলপালনী উৎসব”-এর নাম দেয়। কবে, কীভাবে পালিত হয়, লেখায় তার বিবরণ নেই; চাকমা আহল পালনীর সঙ্গে এর মিল কতটা, সে বিষয়েও কোনো উৎস কিছু বলে না।
লেলুং খুমীর তালিকার দ্বিতীয় পাড়াকেন্দ্রিক আচার “নিচো জা” বা আষাঢ় পূজা। শুষ্ক মৌসুমের নিশা জা-র মতোই এটি 2–3 দিন চলে, পাড়ায় আসা-যাওয়া বন্ধ থাকে, ছাগল-শূকর-মুরগি জবাই হয়, উদ্দেশ্য পাড়ার দেবতাকে সন্তুষ্ট রেখে রোগ-বিপদ ঠেকানো। অর্থাৎ খুমিরা বছরে দুবার পাড়া বন্ধ রাখেন — একবার জুম কাটার মৌসুমে, একবার বর্ষায়।
বাংলাপিডিয়ার ম্রো ভুক্তি অনুযায়ী বছরে দুবার — ফাল্গুন ও আষাঢ়ে — সারা পাড়ায় তিন দিনব্যাপী “কেরাই/কাংনাত” পূজা হয়। একই ভুক্তি বছরে দুবারের “খাং” পূজার কথাও বলে। আর্কাইভের ম্রো প্রথা-বিষয়ক লেখা বলে, ম্রোরা বছরে দুবার “খ্যাং” নামের বিশেষ পূজা করেন; তখন তিন দিন পাড়া বন্ধ থাকে, বাড়ি বাড়ি পিঠা তৈরি হয় — এর বাইরে অন্য কোনো সময় পিঠা তৈরি করা যায় না — আর মোরগ, শূকর, ছাগল, গরু বলি দিয়ে পূজা হয়। বাংলাপিডিয়ার খাং আর আর্কাইভের খ্যাং একই পূজা কি না, এবং কেরাই/কাংনাতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী, কোনো উৎসে স্পষ্ট নয়।
জুম পুরোপুরি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল; সেচ নেই। তাই বৃষ্টি না এলে, বা ধানের শীষ ঠিকমতো না ভরলে, তার প্রতিকারে আলাদা আচার আছে। বম সমাজে বৃষ্টি ডাকার “রুয়া-খা-জার” আর পাড়া শুদ্ধির “খুয়া-টেম”, চাকমা সমাজে পাড়াভিত্তিক “থান্ মানা” — তিনটিই নথিভুক্ত।
জির কুং সাহুর “বম জাতির আদ্যোপান্ত” অনুযায়ী রুয়া-খা-জার হলো জুমের ফসল ভালো হওয়ার জন্য বৃষ্টির কামনা — অনাবৃষ্টি-অতিবৃষ্টি আর অপদেবতার কোপ থেকে রক্ষা পেতে। বমদের প্রায় প্রতিটি আচারে বলি অপরিহার্য হলেও এই অনুষ্ঠানে কোনো জীববলি লাগে না, নির্দিষ্ট দিনক্ষণও নেই: জুমের আগাছা-জঙ্গল পরিষ্কার শেষ হলে একটি দিন ঠিক করা হয়। সেদিন মেয়েরা ভোরে লাউয়ের খোলে ঝরনার পানি আনেন, পুরুষেরা বাড়ির চারপাশের জঙ্গল সাফ করেন, ঘরের নিচ দিয়ে বৃষ্টির পানি যাতে না যায় সে জন্য নালা কাটেন, সিঁড়ি মেরামত করেন। বলি না থাকায় এতে আনুষ্ঠানিকতা নেই, লেখক লিখেছেন।
একই লেখায় পাড়া শুদ্ধির নাম “খুয়া-টেম”। জুমের ধানের শীষ সাদাটে হয়ে যাওয়া, ভুট্টার গাছ বা কুমড়ার লতা লিকলিকে থাকা, পাড়ায় অসুখ — এসবের কারণ ধরা হয় “জল খুরী” নামের অপশক্তিকে। তাকে তাড়াতে গ্রামবাসী নানা গাছের শিকড়-বাকল, লতাগুল্ম, আধপোড়া খড়ি, কয়লা, হাড়ের টুকরা, ভাঙা হাঁড়ির টুকরা জড়ো করে কুচি কুচি কাটেন, হলুদ-চুনের পানি মিশিয়ে রঙিন করে পুরো পাড়ায় — ঘরে, মুরগির ঘরে, গোলাঘরে, ঢেঁকিশালে, পোকার গর্তে — ছিটিয়ে দেন। শিশু-নারী-পুরুষ সবার অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক; নির্দিষ্ট দিন-মাস নেই।
বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের বিবরণে থান্ মানা প্রতি চাকমা পাড়ায় বছরে একবারের সমষ্টিগত পূজা, যার উদ্দেশ্যের মধ্যে আছে পাড়ার সমৃদ্ধি, রোগ-মহামারী থেকে রক্ষা, আর “অজন্মার সময় সুবৃষ্টি কামনা”। পূজাটি হয় চাষের ধান গোলায় ওঠার পর, শুভদিনে। একসঙ্গে চৌদ্দজন দেবদেবীর পূজা হয় — প্রধান গঙ্গাদেবী; তারপর বিয়াত্রা, ভূত, আহ্ত্যা, মোত্যা, বড়শিল্, মগনী আর সাত বোন কুঙারী। ঘাটে বাঁশের মাচানে মাটির বেদী বানানো হয়; অঝা মন্ত্রপাঠ করে বলি দেন — কোন দেবতার জন্য কোন প্রাণী, তার নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। গ্রামের প্রান্তে বড় গাছের নিচে মাংস রান্না হয়, ভাত সবাই বাড়ি থেকে আনেন। লেখকের মতে পূজাটি ত্রিপুরা সম্প্রদায়েও প্রচলিত, তবে পদ্ধতিতে কিছু ভিন্নতা আছে; ত্রিপুরা উৎসে এর আলাদা বিবরণ পাওয়া যায়নি।
ধান কাটার আগে প্রথম ফসল দেবতাকে নিবেদনের আচার অন্তত তিনটি উৎসে আছে: মারমাদের “অবংমা” বা লক্ষ্মী পূজা, খুমিদের “চো প্ল”, আর সিংইয়ং ম্রোর বর্ণিত “নবান্ন দেবতা”-র পূজা। চাকমাদের ক্ষেত্রে ধান “ফাঙ” করার সময় মালক্ষ্মী মার পূজা অবশ্যকরণীয়। এই পূজার আগে জুমের ফসল খাওয়া নিষেধ — অন্তত একটি উৎসে এটি স্পষ্ট লেখা।
মংসিংঞা মারমা ধান তোলার আগের এই পূজার সবচেয়ে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কার্বারী; সমাজের কয়েকজন গণ্যমান্যকে নিমন্ত্রণ করা হয়, বিশেষ ভোজ হয়। একটি সুসজ্জিত বাঁশের মাচায় কলাপাতা বিছিয়ে কিছু চাল রাখা হয়, মাচা থেকে সুতায় একটি কাঁকড়া ঝোলানো থাকে, পাশে একটি শূকর বাঁধা থাকে। আরেকটি মাচায় থাকে পাত্রে মুরগির বাচ্চার রক্ত, দুটি ডিম, এক বোতল মদ, নানা জাতের ধান, একটি সেদ্ধ মুরগির বাচ্চা, এক বান্ডিল সুতা, সেদ্ধ শাকসবজি, এক জগ পানি, এক প্লেট ভাত, একটি সেদ্ধ চিংড়ি, তিনটি মরিচ আর দুটি রৌপ্যমুদ্রা।
সবাই মাচার সামনে প্রার্থনা করার পর দুজন মাচাটি তুলে ধানক্ষেতের আগে থেকে ঠিক করা জায়গায় নিয়ে যান; শূকরটিকেও নেওয়া হয়, বাকিরা শোভাযাত্রা করে পেছনে চলেন। পুরোহিত দেবীর উদ্দেশে মন্ত্র পড়েন, খাবার উপস্থিত সবাইকে বিতরণ হয়, তারপর শূকর জবাই করে রান্না হয়, ভাত-মাংস-মদে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
সময় নিয়ে একই লেখার ভেতরে দুটি তথ্য আছে: এক জায়গায় ধান তোলা শুরু “সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের দিকে”, আরেক জায়গায় মারমা মাস “তসলাং” (আগস্ট-সেপ্টেম্বর)। একই লেখার হিসাবে জুন-জুলাইয়ে প্রথম মারফা আর জুলাই-আগস্টে ভুট্টা তোলা হয়। মারমাদের খাবার ও রান্নার রীতি আছে মারমা খাবার ও রান্না লেখায়।
লেলুং খুমী লেখেন, “চো প্ল” পূজা হয় ধান কাটার সময়, যাতে জুমের দেবতা বেশি ফসলের আশীর্বাদ দেন। ল ব-র মতো এটিও পরিবারভিত্তিক।
সিংইয়ং ম্রোর লেখা অনুযায়ী ফসল তোলার আগে, বীজ বোনার দিন ঠিক করা সেই পবিত্র স্থানে, “নবান্ন দেবতা”-র নামে মুরগি উৎসর্গ করে বাঁশের চোঙায় মুরগির রক্ত দিয়ে পূজা হয়। জুমের প্রথম ফলমূল ও সবজি দিয়ে নৈবেদ্য সাজানো হয়, আর এই পূজার আগে কেউ জুমের ফসল খেতে পারেন না। জুমের ধান কেটে জুমঘরের অস্থায়ী গোলায় রাখার সময়ের অনুষ্ঠানকে তিনি নবান্ন বলেছেন, আর সব ফসল তোলা শেষ হলে “নবান্ন পূজা”। লেখাটি এখানেও কোনো জাতির নাম দেয়নি।
বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের বিবরণে মালক্ষ্মী মা হলেন হিন্দুদের লক্ষ্মীদেবী, তবে চাকমাদের ঘরে তিনি মদ-মাংসের ভোগও নেন; তাঁর প্রিয় ভোগ “ভাডুই” পাখি, না পেলে শূকর, মোরগ, এমনকি কাঁকড়া। ধান “ফাঙ” করার সময় এবং নবান্ন উৎসবে তাঁর পূজা অবশ্যকরণীয়। এর জন্য অঝা লাগে না — বাড়ির গৃহিণী স্নান করে, মাথায় “খবং” জড়িয়ে, চারপাশে চাল ও জল ছিটিয়ে দেবীকে আবাহন করেন; সকালে সবার খাওয়ার আগে ভোগ দিতে হয়।
নতুন জুমের ধান ঘরে তোলার পর ভোজ — বাংলায় যাকে নবান্ন বলা হয় — নথিভুক্ত প্রায় প্রতিটি জাতির আছে, কিন্তু নাম, সময় ও ধরন আলাদা। ত্রিপুরা ও চাকদের নবান্ন ভাদ্রে, খিয়াংদের হেনেই বছরে অন্তত তিনবার, ম্রোদের প্রতিটি পরিবারকে আলাদা পূজা দিতে হয়, আর বমদের নবান্ন এখন শুরু হয় গির্জায়।
2021 সালের 9 নভেম্বর বাংলাদেশ পোস্ট বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট আয়োজিত মারমা নবান্ন অনুষ্ঠান নিয়ে প্রতিবেদনে আটটি জাতির ভাষায় নতুন ভাত খাওয়ার উৎসবের নাম দিয়েছিল। নিচের ছকে নামগুলো প্রতিবেদনের রোমান বানানেই রাখা হলো, কারণ এর বাংলা বানান সব ক্ষেত্রে কোনো বাংলা উৎসে পাওয়া যায়নি; যেখানে আর্কাইভ বা বাংলাপিডিয়ায় বাংলা নাম আছে, পাশে দেওয়া হলো।
| জনগোষ্ঠী | বাংলাদেশ পোস্ট (2021) | আর্কাইভ / বাংলাপিডিয়ার নাম | সময় |
|---|---|---|---|
| মারমা | Koksai Cha: -poye: | ধান কাটার আগে অবংমা পূজা (মংসিংঞা মারমা) | প্রতিবেদনের অনুষ্ঠান নভেম্বরে |
| চাকমা | Nuyo Bhat Hana | নবান্নে মালক্ষ্মী মার পূজা (বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান) | উৎসে নির্দিষ্ট নেই |
| ত্রিপুরা | Maikta Chamo Pan Da | চুমলাই (শক্তিপদ ও সন্তোষ বিকাশ ত্রিপুরা); নুখুংনি পূজা (আর্কাইভের প্রথা-বিষয়ক লেখা) | ভাদ্রে, জুমের ফসল ঘরে তোলা শেষে |
| চাক | Angna in Book | আংনাইবুক পো (মংমং চাক ও চিংহ্লামং); আংনাইবুক পোয়ে (বাংলাপিডিয়া) | জুমচাষিরা সাধারণত ভাদ্রে |
| খুমি | Changtha Cha Pai | চো প্ল — ধান কাটার সময়ের পূজা (লেলুং খুমী) | ধান কাটার সময় |
| খিয়াং | Loo Bu Ta: Poi : | হেনেই — “নবান্ন উৎসবও বলা হয়” (আর্কাইভ) | রোপণের সময় বা ধান কাটার পরে, বছরে অন্তত 3 বার |
| বম | Thlai Thar | লৌ থিং কুং বল — জুম মঙ্গল পূজা (জির কুং সাহু) | বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বর 2017 |
| ম্রো | Ningsar Hum | ফসল ঘরে তোলার পর পরিবারপিছু পূজা (আর্কাইভ); ছিয়াছত-প্লাই (বাংলাপিডিয়া) | ছিয়াছত-প্লাই ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি |
| লুসাই | তালিকায় নেই | পলকূত — শস্য কাটার উৎসব (বাংলাপিডিয়া) | উৎসে নির্দিষ্ট নেই |
| তঞ্চঙ্গ্যা | তালিকায় নেই | “নবান্ন উৎসব” (বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা) | উৎসে নির্দিষ্ট নেই |
| পাংখোয়া | তালিকায় নেই | মূল খোজিং পূজা, সবচেয়ে বড় উৎসব (বাংলাপিডিয়া) | শ্রাবণ |
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী অনুষ্ঠানটি হয়েছিল এক মারমা জুমচাষির জুমক্ষেতে, আর সেখানে একজন বক্তা জানান, জুমে 30–35 জাতের সহফসল পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটি এ-ও লিখেছে, 6–7 মাসের পরিশ্রমের ফসল ঘরে উঠলে চাষি একা উৎসব করেন না, প্রতিবেশী-আত্মীয়দের নিয়ে করেন।
সময়ের আরেকটি সাক্ষ্য দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলার একটি আলোকচিত্র-প্রতিবেদন (আগস্ট 2025): বান্দরবানের জুমচাষিরা সেখানে জানান, ধান পাকবে ভাদ্র-আশ্বিনে, আর তখন নবান্ন উৎসবের মধ্য দিয়ে জুমের নতুন ধান খাওয়া হবে। প্রতিবেদনে চাষিদের জাতি আলাদা করে বলা হয়নি।
শক্তিপদ ত্রিপুরা ও সন্তোষ বিকাশ ত্রিপুরা লেখেন, ভাদ্র মাসে জুমক্ষেতের ফসল ঘরে তোলা শেষ হলে যে নবান্ন উৎসব হয়, তা “চুমলাই” নামে পরিচিত; চুমলাই পূজার উপাস্য মুকুন্দ্রায় বা নকসু মাতাই, পূজা হয় শরৎকালে, আর বিবাহে চুমলাই পূজা অবশ্যই দিতে হয়। আর্কাইভের ত্রিপুরা প্রথা-বিষয়ক লেখা ফসল সংগ্রহের পরের পূজার নাম দেয় “নুখুংনি পূজা” বা বাৎসরিক পূজা। দুটি একই অনুষ্ঠানের দুই নাম, না আলাদা পূজা — কোনো উৎস তা বলে না। ত্রিপুরাদের অন্য বড় পূজা গরিয়া নিয়ে আছে গরিয়া নৃত্য ও বৈসু লেখা।
মংমং চাক ও চিংহ্লামং লেখেন, প্রায় প্রতিটি চাক ঘরে বছরে একবার নতুন ফসল ওঠার পর আংনাইবুক পো পালিত হয়; চাকদের কেউ জুমচাষি, কেউ হালচাষি, তাই জুমচাষিরা সাধারণত ভাদ্রে করেন। যে কোনো চাষের আগে বা প্রথম দিন, আর ধান কাটার প্রথম দিন, জ্যোতিষ দেখে শুভ দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। নতুন চাল, শূকর ও মুরগির মাংস পাড়ার তরুণ-তরুণীরা রান্না করেন, রান্না শেষে প্রথমে বৌদ্ধ বিহারে “ছোয়েং” দেওয়া হয়, তারপর অতিথিদের পরিবেশন। নবান্নের ভাত খাওয়ার আগে নিমন্ত্রিত গণ্যমান্যরা ঘরটির আগামী দিনের জুমে আরও ভালো ফলন কামনা করেন। মদও পরিবেশিত হয়। চাকদের বাকি পরিচয় চাক জনগোষ্ঠী লেখায়।
আর্কাইভের খিয়াং লেখা অনুযায়ী হেনেই পাশাপাশি কয়েকটি পরিবার একজোট হয়ে পালন করে — জুমের ধান রোপণের সময় বা ধান কাটার পরে, বছরে অন্তত তিনবার; একে নবান্ন উৎসবও বলা হয়। কোনো ছড়া বা ঝরনার কাছে গরু বা মহিষ বধ করে মাংস রান্না হয়, পূজা-অর্চনার পর পাড়ার সবাই ভোজে বসেন।
আর্কাইভের ম্রো প্রথা-বিষয়ক লেখা বলে, জুমের ফসল ঘরে তোলার পর দেবতার সন্তুষ্টির জন্য প্রত্যেক পরিবারকে এক বোতল মদ, একটি শূকর ও একটি মোরগ বলি দিয়ে পূজা দিতে হয়; বিশ্বাস, দেবতা সন্তুষ্ট না হলে পরের বছর ফসল ভালো হয় না। বাংলাপিডিয়া বলে, জুম শেষে ফসল তোলার পর অবস্থাপন্ন ম্রো পরিবার “ছিয়াছত-প্লাই” উৎসবের আয়োজন করে, সাধারণত ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারিতে; তরুণ-তরুণীরা প্লুং বাঁশির তালে গরুকে ঘিরে নাচেন, কোনো পুরোহিত থাকেন না। একই ভুক্তিতে আছে, জুমের নতুন ফসলে পাড়ায় পাড়ায় পিঠা তৈরি হয় আর তিন দিন উৎসব চলে। প্লুং বাঁশি কীভাবে বানানো হয়, তা আছে প্লুং বাঁশি লেখায়, আর ম্রো সমাজের ধর্ম ও ক্রামা নিয়ে ম্রো জাতি লেখায়।
জির কুং সাহু লেখেন, যে জুম সারা বছরের আহার জুগিয়েছে, তার আত্মা তিন বছর মালিকের পিছু ছাড়ে না; তাকে অবহেলা করলে অমঙ্গল। তাই “লৌ থিং কুং বল” বা জুম মঙ্গল পূজা। আগের দিন মেয়েরা ঢেঁকিতে ধান ভেনে বিন্নি ধানের পিঠা বানান। পুরুষেরা ভোরে জুমে যান, সারা পথে চালের গুঁড়া ছিটাতে ছিটাতে। জঙ্গল কাটার প্রথম দিনে একটি গাছের নিচে যে পাথর মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল, সেটি খোঁজা হয় — কখনো সারা দুপুর লেগে যায়। পাথর পাওয়া মাত্র সবাই আনন্দে চিৎকার করে জুমের মাটি কপালে মাখেন।
পাথরটি জুম আলুর গর্তের পাশে খাড়া করে পোঁতা হয়, পাশে একটি মারফা ও একটি বাঁশের চোঙা। পাথরে চালের গুঁড়া ছিটিয়ে মোরগ বা শূকর বলি দেওয়া হয়, মন্ত্রে জুমের নানা কোণে থাকা শক্তিদের ডেকে “সন্ধি” ও “আত্মীয়তা” করার কথা বলা হয়, হৃষ্টপুষ্ট ধানের শীষ আর সুস্বাস্থ্য চাওয়া হয়। পাথরের চারপাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে ছোট পূজাঘর বানিয়ে ফুল, কলাপাতা ও মোরগের পালকে সাজানো হয়; ফেরার পথে কলাপাতায় বাঁধা কাঁচা মাংস প্রতিটি গাছের গোড়ায় রেখে আসা হয়। পরদিন জুমের মালিকের জুমে যাওয়া নিষেধ। পূজাটি বছরের কোন সময়ে হয়, লেখায় তা বলা নেই।
জুমের আচার মুছে যায়নি, অনেক জায়গায় নতুন ধর্মের ভেতরে ঢুকে গেছে। বমদের নবান্ন এখন শুরু হয় গির্জার প্রার্থনায়, চাকদের নবান্নের রান্না প্রথমে যায় বৌদ্ধ বিহারে, আর চাকমাদের “ধর্মকাম” পূজায় বৌদ্ধ পুরোহিত রুরিরা পৌরোহিত্য করেন জুমের ধান তোলার পরে।
বাংলা ট্রিবিউনের 10 সেপ্টেম্বর 2017-এর প্রতিবেদনে বান্দরবানের লাইমি পাড়ায় বম সম্প্রদায় ধান, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, ভুট্টা, মারফা ও কলাসহ জুমের নতুন ফসল দিয়ে বছরের প্রথম নবান্ন পালন করে। এক কিশোরী বলেন, সবাই প্রথমে গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা সেরে তারপর একত্র হয়েছেন। পাড়ার ইভানজেলিক্যাল চার্চের পালক রোয়ালচুংনুং বম জানান, প্রতি বছর জুমের প্রথম ফসল তোলার পর নবান্ন হয়, আর সে বছর জুমের ফসল আগে ওঠায় তাঁরা অন্যদের আগেই করেছেন। একই প্রতিবেদন লেখে, মারমা, বম ও ম্রোসহ বিভিন্ন জাতি নিজ নিজ ধর্ম ও রীতি অনুসারে, কেউ আগে কেউ পরে, এই উৎসব করেন। বমদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ইতিহাস আছে বম জাতি লেখায়।
আগেই বলা হয়েছে, চাক নবান্নের রান্না প্রথমে বৌদ্ধ বিহারে “ছোয়েং” দেওয়া হয়। বাংলাপিডিয়ার চাক ভুক্তি বলে, চাকরা দুই ধারায় — বৌদ্ধ রীতি আর বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা (লক্ষ্মীপূজা বা “ওয়াইগ্যা”, ফুলপূজা, প্রদীপপূজা) — ধর্ম পালন করেন, আর তাঁদের পার্বণের তালিকায় আছে “আংনাইবুক পোয়ে” বা নবান্ন।
বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের বিবরণে ধর্মকাম একটি ব্যয়বহুল মানতের পূজা, যা কেবল বৌদ্ধ পুরোহিত রুরিদের পৌরোহিত্যে হতে পারে; প্রাচীন গ্রন্থ “আঘরতারা” আবৃত্তি অপরিহার্য, পূজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মদ-জগড়া নিষিদ্ধ, আর পশ্চিম দরজার মুখে বুদ্ধমূর্তি স্থাপন করা হয়। সাধারণত জুমের ধান তোলা হলে, কাজের চাপ কমে এলে, শুভদিন দেখে অনুষ্ঠানটি হয়; পাড়ার সবাই নিমন্ত্রিত থাকেন। লাগে 7টি মোরগ-মুরগি, একটি শূকর, প্রচুর শুঁটকি আর তরকারি; অনেকে মানতের দিনই নিজের পালের একটি শূকরছানাকে পূজার জন্য আলাদা করে রাখেন। লেখক 1970 সালের শেষ ভাগে বাকছড়ি মৌজার বড় কাটাছড়ি গ্রামে এমন এক পূজায় উপস্থিত ছিলেন বলে লিখেছেন।
বাংলাপিডিয়া লেখে, অতীতে লুসাইরা গ্রামে গ্রামে একেক নিয়মে দেবদেবীর পূজা করতেন; এখন তাঁরা শতভাগ খ্রিস্টান, তবু ধর্মীয় উৎসবের বাইরে বছরে তিনটি প্রধান উৎসব পালন করেন — চাপচারকূত (বসন্ত উৎসব), মীমতূত (মৃত আত্মাদের স্মরণে) ও পলকূত (শস্য কাটার উৎসব)। বাংলাদেশে পলকূত কোথায়, কীভাবে পালিত হয়, তার কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি; লুসাইদের বাকি তথ্য আছে লুসাই জনগোষ্ঠী লেখায়। খুমিদের ক্ষেত্রে খুমি লেখাটি দুই উৎসের বরাতে জানায়, খ্রিস্টান ও ক্রামা অনুসারী খুমিরা কিছু প্রথাগত উৎসব আর করেন না।
জুমের বছর শেষ হয় খাজনা দিয়ে। মংসিংঞা মারমা লেখেন, মারমা জুমচাষিরা প্রতি বছর বোমাং রাজার মাধ্যমে সরকারকে জুমের খাজনা দেন, আর সেই উপলক্ষের অনুষ্ঠানের নাম রাজপুণ্যাহ, মারমা ভাষায় “পইজ্রা”; এটি হয় জুমের ফসল তোলার পর, ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে। খিয়াং লেখা অনুযায়ী বোমাং সার্কেলের খিয়াংরাও এতে অংশ নেন, আর খুমি কার্বারীরা এক বোতল মদ ও একটি মোরগ দিয়ে খাজনা দেন।
অর্থাৎ বোমাং সার্কেলে জুমের পঞ্জিকার শেষ উৎসবটি গ্রামে নয়, রাজদরবারে — হেডম্যান-কার্বারীদের হাত দিয়ে। খাজনার অঙ্ক কীভাবে ভাগ হয়, উৎসবটি কেন বছরের পর বছর বন্ধ থেকেছে — সে বিবরণ আছে রাজপুণ্যাহ: বোমাং সার্কেলে 1875 থেকে চলা খাজনার উৎসব আর জুম কর লেখায়; এখানে আর পুনরাবৃত্তি নয়।
জুমের ক্যালেন্ডার শুধু পূজায় নয়, নাচ আর লোককথাতেও ধরা আছে। ত্রিপুরাদের গরিয়া নাচের দৃশ্যগুলো সাজানো জুমের কাজ ধরে, চাকমা সংস্কৃতির পরিচিত নাচটির নামই জুম নাচ, আর চাকমা লোককথায় মালক্ষ্মী মা নিজে মাস ধরে ধরে মানুষকে জুম চাষ শেখান।
শক্তিপদ ত্রিপুরা ও সন্তোষ বিকাশ ত্রিপুরা লেখেন, গরিয়া নৃত্য জুমচাষ ও জীবিকা নিয়ে রচিত: জুম কাটা, বীজ বোনা, আগাছা পরিষ্কার, পশুপাখি তাড়ানো, ধান কাটা, ধান পরিষ্কার, সুতা কাটা আর কাপড় বোনা — এই ক্রমেই নাচের দৃশ্যগুলো সাজানো, সঙ্গে ঢোল ও বাঁশি।
সুযশ চাকমা লেখেন, নৃত্যে চাকমা সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে বললে এখন পর্যন্ত যে নাচটি প্রাধান্য পায় তা জুম নাচ। প্রথম দিকে সুগত চাকমা ননাধনের “হিল্লো মিলাবো জুমত যায়দে” আর রণজিৎ দেওয়ানের “হোই হোই জুমত যেবং” গানের সুরে নাচটি সাজানো হয়, আর আধুনিক কোরিওগ্রাফির পথিকৃৎ হিসেবে তিনি শাহানা দেওয়ানের নাম দেন। পরে জুম পাহাড়ে নারীদের পানি আনার বিষয় নিয়ে সুস্মিতা চাকমার কোরিওগ্রাফি টেলিভিশনে প্রচারের পর আলোচিত হয়। সঞ্জীব চাকমাও সুগত চাকমার বরাতে লেখেন, অতীতে বিজুকে কেন্দ্র করে বিজু নাচ আর জুমকে কেন্দ্র করে জুম নাচ ছিল।
আর্কাইভের “চাকমা লোককথা: সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনী” (উৎস হিসেবে “ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা” বইয়ের নাম দেওয়া) গল্পটি একটি পুরো জুম-পঞ্জিকা। বিয়াত্রা দেবতার আমন্ত্রণে মাহ লখী মা ভাদ্র মাসের এক মঙ্গলবার এক বিধবার বেশে পৃথিবীতে আসেন, এক গরিব গৃহস্থের ঘরে ওঠেন। মাঘ-ফাল্গুনে তিনি গৃহস্থকে জুমের জায়গা চিহ্নিত করতে পাঠান, তারপর জঙ্গল কাটতে; চৈত্রের শেষ দিকে কাটা জুম পোড়ানো হয়; তিনি নিজে বীজ বোনেন, আগাছাগুলো ধরে জুমের উত্তর প্রান্তের এক গর্তে পাথরচাপা দেন। নিষেধ না মেনে গৃহস্থ পাথর সরিয়ে দিলে আগাছা ছড়িয়ে পড়ে — গল্পের ভাষায়, সেই থেকে জুমচাষির নিড়ানির কাজ বেড়ে গেল। আষাঢ়-শ্রাবণে চারা বাড়ে, শ্রাবণের শেষ আর ভাদ্রের শুরুতে ধান পাকে।
শেষে মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাহ লখী মা জানান, তিনি এখন থেকে অদৃশ্যভাবে থাকবেন ধানের শিষে আর ধান-চালের ঝুড়িতে। গল্পের এই শেষ কথাটি বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে পড়া যায়, যেখানে ধান “ফাঙ” করার সময় আর নবান্নে মালক্ষ্মী মার পূজা অবশ্যকরণীয়। গল্পটি চাকমাদের; অন্য জাতির জুম-উৎপত্তির গল্প এতে পড়ে নেওয়া চলে না। চাকমাদের জুমের ভাত ও রান্না নিয়ে আছে চাকমা খাবার ও রান্না লেখা।
নিচের ছকে জুম চাষের আচার ধাপ ধরে সাজানো হলো। ফাঁকা ঘর মানে সেই ধাপে ওই জাতির আচারের কথা ব্যবহৃত উৎসগুলোতে পাওয়া যায়নি — আচার নেই, এমন নয়।
| জনগোষ্ঠী | জায়গা বাছাই | জঙ্গল কাটা | চারা ও বর্ষা | ধান কাটা ও পরে |
|---|---|---|---|---|
| চাকমা | ধোজ্যে লাগারা | মালেইয়া (শ্রম, পূজা নয়) | জুম মারা আঙ; 7 আষাঢ় আহল পালনী | মালক্ষ্মী পূজা; থান্ মানা; ধর্মকাম |
| মারমা | বাঁশের ক্রস, মাটির ঢেলা, স্বপ্ন | দেবতার অনুমতির প্রার্থনা | — | অবংমা পূজা; রাজপুণ্যাহ (পইজ্রা) |
| ত্রিপুরা | লওয়া, স্বপ্ন | কাথারক পূজা ও নাচ | মাইনযুগমা পূজা | ভাদ্রে চুমলাই / নুখুংনি |
| তঞ্চঙ্গ্যা | — | — | আলপালনী (বিবরণ নেই) | নবান্ন; রাজপুণ্যাহ |
| ম্রো | — | আগে আমিষ নিষেধ | ফাল্গুন ও আষাঢ়ে কেরাই/কাংনাত; খ্যাং | পরিবারপিছু বলি; ছিয়াছত-প্লাই |
| বম | — | গাছের নিচে পাথর পোঁতা | রুয়া-খা-জার; খুয়া-টেম | লৌ থিং কুং বল; গির্জায় নবান্ন |
| পাংখোয়া | ফালদার জে, স্বপ্ন | প্রথম দিনে বলি | শ্রাবণে খোজিং পূজা | — |
| খুমি | — | নিশা জা (পাড়া বন্ধ) | ল ব; নিচো জা | চো প্ল; রাজপুণ্যাহে খাজনা |
| খিয়াং | — | — | বুগেলে; রোপণে হেনেই | হেনেই; রাজপুণ্যাহ |
| চাক | — | শুভ দিন দেখে শুরু | — | ধান কাটার প্রথম দিন শুভক্ষণে; ভাদ্রে আংনাইবুক পো |
| লুসাই | — | — | — | পলকূত |
ছকটি থেকে দুটি জিনিস চোখে পড়ে। এক, নথিপত্র সবচেয়ে ঘন চাকমা, বম ও খুমিদের ক্ষেত্রে, সবচেয়ে পাতলা লুসাই ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ক্ষেত্রে। দুই, ধান কাটার পরের ঘরটি প্রায় কোনো জাতির ক্ষেত্রেই ফাঁকা নয় — জুমের বছরের যে মুহূর্তটি সবাই আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেন, তা নতুন ধান ঘরে তোলা।
না। একই ধাপে জাতিভেদে আচার, নাম ও দেবতা আলাদা। যেমন জায়গা বাছাইয়ের চিহ্নকে ত্রিপুরারা বলেন “লওয়া”, পাংখোয়ারা “ফালদার জে”, চাকমারা “ধোজ্যে লাগারা”; নতুন ধানের উৎসব ত্রিপুরাদের “চুমলাই”, চাকদের “আংনাইবুক পো”, খিয়াংদের “হেনেই”। জুমজার্নাল আর্কাইভে প্রতিটি জাতির নিজের লেখকের লেখা আলাদা বিবরণ দেয়।
জায়গাটি চাষ হবে কি না, তা ঠিক হয় চিহ্ন দেওয়ার রাতের স্বপ্নে। মারমা গৃহকর্তা জুমের মাটি বালিশের নিচে রাখেন; মাছ, দুধ বা মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার স্বপ্ন শুভ, চুল কাটা বা সাদা পোশাক অশুভ। ত্রিপুরা জুমচাষির কাছে মাছ পাওয়া, হাতির পিঠে চড়া শুভ। পাংখোয়ারা ফালদার জে-র রাতের স্বপ্ন দেখেন।
লওয়া ত্রিপুরা সমাজে জুমের জন্য বাছা জায়গায় দেওয়া চিহ্ন, যা ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। শুভ স্বপ্নের পর গাছ বা বাঁশের তিনটি টুকরো পোঁতা হয়, বাঁশের ফালিতে তিন টুকরো পাতা আর কেঁচোর ঢিবির মাটি রাখা হয়, ছড়ার পানি এনে চন্দ্র, সূর্য, বসুমতি ও গঙ্গাকে সাক্ষী রাখা হয়। লওয়া দেওয়া জায়গায় অন্য কেউ লওয়া দিতে পারেন না।
লাল চুয়াক লিয়ামা পাংখো লিখেছেন, যেখানে জুম হবে সেখানে অন্তত রক্ত ঝরাতে হয়, নইলে জুমক্ষেতের মালিক বা অধিষ্ঠাত্রী দেবতা অসন্তুষ্ট হন। তাই প্রথম দিন অন্তত একটি মুরগি বা মোরগ নিতে হয়; শূকর, গরু বা গয়াল হলে আরও ভালো। জুম কাটা হয় ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে।
আষাঢ়ের 7 তারিখ — তিনটি আর্কাইভ উৎসই এ বিষয়ে একমত। বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান (1989) লেখেন অম্বুবাচী থেকে তিন দিন হালচাষ বন্ধ থাকে, কারণ বসুমতি তখন ঋতুমতী; সুযশ চাকমা লেখেন দিনটিতে জুমের সব কাজ বন্ধ, মাতা বসমপুদি ও জুমের যন্ত্রপাতির উদ্দেশে নিবেদন হয়; সঞ্জীব চাকমা একে হাল-পালনি বলেন, মা-লক্ষ্মীকে ভোগ দেওয়ার দিন।
অবংমা বা লক্ষ্মী পূজা মারমাদের ধান তোলার আগের পূজা, পরিচালনা করেন কার্বারী। মাচায় কলাপাতায় চাল, ঝোলানো কাঁকড়া, মুরগির বাচ্চার রক্ত, ডিম, মদ, নানা জাতের ধান, সুতা, চিংড়ি, তিনটি মরিচ ও দুটি রৌপ্যমুদ্রা সাজিয়ে শোভাযাত্রা করে ধানক্ষেতে নেওয়া হয়; পুরোহিত মন্ত্র পড়েন, শূকর জবাই করে ভোজ হয়।
শক্তিপদ ত্রিপুরা ও সন্তোষ বিকাশ ত্রিপুরা লেখেন, ভাদ্রে জুমের ফসল ঘরে তোলা শেষে যে নবান্ন হয় তার নাম চুমলাই; উপাস্য মুকুন্দ্রায় বা নকসু মাতাই। আর্কাইভের ত্রিপুরা প্রথা-বিষয়ক লেখা ফসল সংগ্রহের পরের পূজাকে বলে নুখুংনি পূজা। বাংলাদেশ পোস্ট (2021) ত্রিপুরা নামটি লিখেছে “Maikta Chamo Pan Da”।
আর্কাইভের ম্রো প্রথা-বিষয়ক লেখা অনুযায়ী ফসল ঘরে তোলার পর প্রতিটি পরিবারকে এক বোতল মদ, একটি শূকর ও একটি মোরগ বলি দিয়ে পূজা দিতে হয়, নইলে পরের বছর ফসল ভালো হয় না বলে বিশ্বাস। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী অবস্থাপন্ন পরিবার ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারিতে ছিয়াছত-প্লাই উৎসব করে, প্লুং বাঁশির তালে গরু ঘিরে নাচ হয়।
এটি বমদের জুম মঙ্গল পূজা। জির কুং সাহুর বিবরণে জঙ্গল কাটার প্রথম দিনে গাছের নিচে পোঁতা পাথরটি খুঁজে বের করে জুম আলুর গর্তের পাশে খাড়া করে পোঁতা হয়, মোরগ বা শূকর বলি দিয়ে ভালো ধানের শীষ আর সুস্বাস্থ্য চাওয়া হয়। বিশ্বাস, জুমের আত্মা তিন বছর মালিকের পিছু ছাড়ে না। পরদিন জুমে যাওয়া নিষেধ।
দুটিই বম আচার। রুয়া-খা-জার জুমের ফসলের জন্য বৃষ্টি কামনা; এতে জীববলি লাগে না, জুমের আগাছা পরিষ্কার শেষে একটি দিন ঠিক করা হয়। খুয়া-টেম পাড়া শুদ্ধি: ধানের শীষ সাদাটে হওয়া বা রোগের জন্য “জল খুরী” নামের অপশক্তিকে দায়ী ধরে শিকড়-বাকলের মিশ্রণ পুরো পাড়ায় ছিটানো হয়।
দুটিই আর্কাইভের খিয়াং লেখায় নথিভুক্ত। বুগেলে হয় জুমে ধানের চারা ওঠার পর — জুমে শূকর বলি দিয়ে, যাতে ধান, তুলা ও অন্য ফসল রক্ষা পায়। হেনেই কয়েকটি পরিবার মিলে করে, ধান রোপণের সময় বা কাটার পরে, বছরে অন্তত তিনবার; ছড়া বা ঝরনার কাছে গরু বা মহিষ বধ করে ভোজ হয়। একে নবান্ন উৎসবও বলা হয়।
বাংলা ট্রিবিউনের 2017 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী করেন, তবে নতুন রূপে। বান্দরবানের লাইমি পাড়ায় বম সম্প্রদায় জুমের নতুন ধান, কুমড়া, ভুট্টা, মারফা ও কলা দিয়ে নবান্ন পালন করে, শুরু হয় গির্জায় প্রার্থনা দিয়ে। স্থানীয় পালক জানান, প্রতি বছর জুমের প্রথম ফসল তোলার পর এই নবান্ন হয়।
বাংলাপিডিয়ার “জুমচাষ” ভুক্তি অনুযায়ী চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষের অনুষ্ঠানের পর সাধারণত বীজ বোনা শুরু হয়। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি ভুক্তি সময়টা লেখে এপ্রিলের প্রথম বৃষ্টির পর; মারমা লেখক মংসিংঞা মারমাও এপ্রিলের প্রথম ভারী বৃষ্টির পর বীজ বোনার কথা লেখেন। এই ক্রম কোনো ধর্মীয় নিয়মে বাঁধা কি না, উৎসে বলা নেই।
রাজপুণ্যাহ বা মারমা ভাষায় পইজ্রা বোমাং সার্কেলে জুমের খাজনা দেওয়ার অনুষ্ঠান, যা জুমের ফসল তোলার পর ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে হয় বলে মংসিংঞা মারমা লিখেছেন। হেডম্যান ও কার্বারীরা জুমপিছু খাজনা জমা দেন; খিয়াংরা এতে অংশ নেন, আর খুমি কার্বারীরা মদ ও মোরগ দিয়ে খাজনা দেন বলে আর্কাইভে আছে।
জুমজার্নাল আর্কাইভ (প্রাথমিক উৎস)
বাংলাপিডিয়া
সংবাদ
সর্বশেষ হালনাগাদ: 2 নভেম্বর 2026
প্রসঙ্গ:জুম, জুম ও জুমিয়া, জুম চাষ, জুমচাষ
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।