Last updated Oct 19th, 2026

পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি একটি নয়। আইনে নাম ধরে স্বীকৃত 11টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকের উৎসব, পোশাক, খাবার ও গানের নিজস্ব নাম আছে: চাকমাদের বিজু, পিনোন-খাদি আর গেংখুলি; মারমাদের সাংগ্রাই, থামি আর কাপ্যা; ত্রিপুরাদের বৈসু, রিনাই-রিসা আর গরয়া নৃত্য। এই পাতায় সেই নামগুলো জনগোষ্ঠী ধরে সাজানো আছে, আর প্রতিটি বিষয়ে জুমজার্নালের বিস্তারিত লেখার ঠিকানা দেওয়া আছে।
এটি পথনির্দেশক পাতা। বিজুর দিনে কোন আচারের পরে কোনটি, পিনোন তাঁতে কীভাবে ওঠে, সিদোল কীভাবে রান্নায় পড়ে, এসবের পূর্ণ বিবরণ এখানে নেই; সেগুলো আলাদা লেখায় আছে এবং প্রতিটি অংশের শেষে তার লিংক পাবেন। এখানে যা আছে তা হলো একটি মানচিত্র: কোন জনগোষ্ঠীর কোন জিনিসের কী নাম, কোন উৎসে সেই নাম লেখা, আর কোথায় উৎস নীরব।
পড়ার সময় একটি নিয়ম মনে রাখলে সুবিধা হবে। কোনো ছকের ঘরে “জানা যায়নি” লেখা থাকলে তার অর্থ, যে উৎসগুলো পড়া গেছে তাতে নামটি নেই; জিনিসটি নেই, এমন নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে জুমজার্নালের সব লেখার সূচি আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আর্কাইভে।
সূচিপত্র
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি বলতে বোঝায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে বসবাসকারী 11টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আলাদা আলাদা ভাষা, উৎসব, পোশাক, খাদ্য, গান ও মৌখিক সাহিত্য। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইনে নামগুলো হলো চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখোয়া, খিয়াং, ম্রো, বম, খুমী ও চাক।
আইনের পাঠে কয়েকটি বানান একটু আলাদা: তনৈচংগা, পাংখো, বোম। সমষ্টিগত শব্দ হিসেবে আইন ব্যবহার করেছে “উপ-জাতীয়”। জুমজার্নাল নিজের লেখায় “আদিবাসী” এবং সমষ্টিগতভাবে “জুম্ম” শব্দ ব্যবহার করে। আইনটির পূর্ণ পাঠ আমাদের আর্কাইভে আছে: পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন। আর্কাইভে থাকা মঙ্গল কুমার চাকমার একটি প্রবন্ধ অনুযায়ী এই এগারোটির বাইরে পার্বত্য চট্টগ্রামে গোর্খা, অহমিয়া ও সাঁওতাল জাতির কিছু মানুষও বাস করেন।
“পাহাড়িদের সংস্কৃতি” বলে এক নামে সবাইকে ধরলে কী ঘটে, তার একটি উদাহরণ বাংলাপিডিয়াতেই আছে। সেখানকার “Tribal Culture” ভুক্তিতে লেখা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর বনের কিছু জনগোষ্ঠী এখনো কেবল গাছের পাতা পরেন। কোন জনগোষ্ঠী, কোন এলাকায়, কার দেখা, সে নাম বা সূত্র ভুক্তিতে নেই। অথচ নিচের পোশাক-ছকে দেখা যাবে, যে নয়টি জনগোষ্ঠীর পোশাকের বিবরণ পাওয়া গেছে তাদের প্রত্যেকের কাপড়ের নিজস্ব নাম আছে। নামহীন সাধারণ বর্ণনা তাই এই পাতায় ব্যবহার করা হয়নি; প্রতিটি তথ্য একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নামে লেখা।
পাতাটি পাঁচটি বিষয়ে ভাগ করা, আর শেষে তিনটি ছোট অংশ।
| বিষয় | এই পাতায় কী পাবেন | বিস্তারিত লেখা |
|---|---|---|
| উৎসব | বর্ষবরণ, ফসল ও পূর্ণিমার উৎসবের নাম, জনগোষ্ঠী ধরে | বৈসাবি: বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসুর আলাদা আচার-ক্রম |
| বয়ন ও পোশাক | নয়টি জনগোষ্ঠীর পোশাকের নাম এক ছকে | পিনন হাদি ও বেইন: পাহাড়ি কোমর-তাঁতের পূর্ণ পাঠ |
| খাবার | রান্নার পদ্ধতির নাম, চাকমা-ত্রিপুরা-পাংখোয়া পাশাপাশি | পাহাড়ি খাবার: সিদোল, নাপ্পি আর রান্নার সাত পদ্ধতি |
| গান ও নাচ | গানের ধারা, বাদ্যযন্ত্র ও নাচের নাম | পাহাড়ি গান ও আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র: নাম ধরে ধরে একটি পাঠ |
| লোককথা | কোন জনগোষ্ঠীর কোন গল্প আর্কাইভে আছে | গেংখুলি ও রাধামন-ধনপুদি: চাকমা মৌখিক সাহিত্যের পাঠ |
কোনো একটি জনগোষ্ঠী নিয়ে পুরো পরিচিতি পড়তে চাইলে: চাকমা জাতি · মারমা জাতির আদ্যোপান্ত · ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত · তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত · ম্রো জাতি: ক্রামা, বর্ণমালা ও চিম্বুকের পাহাড় · বম জাতির আদ্যোপান্ত · খিয়াং · পাংখোয়া জাতির আদ্যাপান্ত · চাক জাতির আদ্যোপান্ত · খুমী জাতির আদ্যোপান্ত। সংখ্যায় সবচেয়ে ছোট পাঁচটি জনগোষ্ঠী একসঙ্গে দেখা যাবে খিয়াং, খুমি, চাক, পাংখোয়া, লুসাই লেখায়।
বৈসাবি কোনো একক উৎসব নয়। এটি ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু, এই তিন বর্ষবরণ উৎসবের প্রথম অক্ষর জুড়ে তৈরি একটি যৌথ নাম। তিনটিই হয় বাংলা বছরের শেষ দুই দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিনে, কিন্তু প্রতিটির দিনের নাম ও আচার আলাদা।
নামের এই গঠনটি লেখা আছে বাংলা উইকিপিডিয়ার বৈসাবি নিবন্ধে; তিন দিনের হিসাব মেলে আর্কাইভের চাক জাতির আদ্যোপান্ত লেখার সঙ্গে। যৌথ নামে তিনটি জনগোষ্ঠীর অক্ষর থাকলেও একই সময়ে উৎসব করেন অন্তত ছয়টি জনগোষ্ঠী। আর্কাইভের পরিচিতি-লেখাগুলো পাশাপাশি রাখলে নামের এই ছক দাঁড়ায়।
| জনগোষ্ঠী | উৎসবের নাম | তিন দিনের নাম | নামের উৎস |
|---|---|---|---|
| চাকমা | বিজু / বিঝু | ফুলবিজু · মূলবিজু · নুওবঝর বা গোজ্যাপোজ্যা দিন | আর্কাইভ: চাকমা জাতি |
| তঞ্চঙ্গ্যা | বিষু | ফুলবিষু · মূলবিষু · নয়া বছর | আর্কাইভ: তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত। বাংলাপিডিয়ায় তৃতীয় দিনের নাম gujja puja day |
| ত্রিপুরা | বৈসু | হারি বৈসু · বৈসুমা · বিসিকাতাল | আর্কাইভ: ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত |
| মারমা | সাংগ্রাই / সাংগ্রাইং | আক্যা বা পাইং ছোয়ায় · বাক্ · আপ্যাইং | দিনের নাম কেবল বাংলা উইকিপিডিয়ায়; আর্কাইভের মারমা-লেখায় নেই |
| চাক | সাংগ্রাইং | পাইংছোয়েত (ফুল দিবস) · আক্যাই · আপ্যাইং | আর্কাইভ: চাক জাতির আদ্যোপান্ত |
| খুমী (প্রকৃতিপূজারি অংশ) | সাংক্রাই | তিন দিন; দিনের নাম জানা যায়নি | আর্কাইভ: খুমী জাতির আদ্যোপান্ত |
| পাংখোয়া | নাম জানা যায়নি | বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বৈশাখের শুরুতে খোজিং-এর উদ্দেশে নাচের অনুষ্ঠানের রীতি ছিল; আর্কাইভে নতুন বছরের শুভ সূচনার পূজা ডাই মাহের-এর নাম আছে | বাংলাপিডিয়া: Pankho; আর্কাইভ: পাংখোয়া জাতির আদ্যাপান্ত |
| খিয়াং, ম্রো, বম, লুসাই | চৈত্র-সংক্রান্তির বর্ষবরণ উৎসবের নিজস্ব নাম কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি | ||
দুটি অমিল এখানে লিখে রাখা দরকার। ত্রিপুরাদের উৎসবের নাম আর্কাইভের ত্রিপুরা-লেখায় “বৈসু”, চাক-লেখায় “বৈসুক”, আর বাংলা উইকিপিডিয়ায় “বৈসু” ও “বৈসুব” দুটোই। তৃতীয় দিনের নাম আর্কাইভে “বিসিকাতাল”, উইকিপিডিয়ায় “বিসি কতাল”।
পরিচিতি-লেখাগুলো আলাদা আলাদা লেখকের, আলাদা সময়ে লেখা। সেগুলো মিলিয়ে পড়লে দেখা যায় কয়েকটি আচার একাধিক জনগোষ্ঠীর বর্ণনায় ফিরে আসে, যদিও দিন ও নাম বদলে যায়।
| আচার | কোন জনগোষ্ঠীর বিবরণে, কোন দিনে |
|---|---|
| নদীতে ফুল ভাসানো বা উৎসর্গ | চাকমা (ফুলবিজু, পাতায় করে) · ত্রিপুরা (হারি বৈসু) · তঞ্চঙ্গ্যা (মা গঙ্গার উদ্দেশে) |
| বুদ্ধের উদ্দেশে ফুল | চাকমা (কিয়াঙে) · চাক (পাইংছোয়েত; কাইনকো পাইন বা নাগেশ্বর ফুল) |
| বয়স্কদের স্নান করানো | চাকমা (মূলবিজুর দুপুরে) · ত্রিপুরা (বিসিকাতাল) · তঞ্চঙ্গ্যা · চাক (আক্যাই, ঘরে ঘরে গিয়ে) |
| বুদ্ধমূর্তি স্নান | মারমা (শোভাযাত্রা করে নদীর তীরে; চন্দন ও ডাবের পানি) · চাক (নাইংছা-ই বা চন্দন পানি ও দুধ) · চাকমা (মূলবিজুতে বৌদ্ধ মন্দিরে) |
| গৃহপালিত পশুপাখিকে খাবার দেওয়া | চাকমা (ফুলবিজু) · ত্রিপুরা (বিসিকাতাল) · খুমী (সাংক্রাইয়ের প্রথম দিন, ঝুড়িতে ধান-ভুট্টা নিয়ে) |
| পানি খেলা | মারমা (মৈত্রী পানি বর্ষণ: মণ্ডপের দুই পাশে পানিভর্তি দুটি নৌকা) · চাক (এক পাড়ার সঙ্গে আরেক পাড়ার) · খুমী (দ্বিতীয় দিন) |
| সবার জন্য ঘরের দরজা খোলা | চাকমা (মূলবিজু) · তঞ্চঙ্গ্যা (মূলবিষু) · ত্রিপুরা (বিসিকাতাল) |
| প্রাণীবধ নিষেধ | ত্রিপুরা (বৈসুমার দিন) |
ছকটি বলে না যে এসব আচার অন্য জনগোষ্ঠীতে নেই; বলে কেবল কোন লেখায় কোনটির উল্লেখ আছে। প্রতিটি উৎসবের দিন ধরে আচার-ক্রম, সাংগ্রাই জলকেলির প্রসঙ্গ এবং ত্রিপুরাদের গরিয়া পূজার দল-গঠন পড়তে পারেন বৈসাবি নিয়ে আমাদের লেখায়।
বর্ষবরণের বাইরে বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসব জুমের ফসল-চক্রের সঙ্গে বাঁধা। ম্রোদের ছিয়াছত-প্লাই, খুমীদের চো প্ল, খিয়াংদের হেনেই, চাকদের আংনাইবুক পো, ত্রিপুরাদের চুমলাই আর চাকমাদের থান্ মানা, সবই ফসল বোনা বা ঘরে তোলার সময়ের সঙ্গে যুক্ত বলে উৎসে লেখা আছে।
| জনগোষ্ঠী | উৎসব বা পূজার নাম | কখন, কী উপলক্ষে | উৎস |
|---|---|---|---|
| চাকমা | থান্ মানা (গঙাপূজা বা গাঙ্ পূজাও বলা হয়) | বছরে একবার, ধান গোলায় উঠলে; পাড়ার সমষ্টিগত পূজা, 14 জন দেবদেবীর | আর্কাইভ: চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ |
| চাকমা | হাল-পালনি / আহল্ পালানী | 7 আষাঢ়; হালচাষ বন্ধ থাকে। এক লেখায় এক দিন, অন্য লেখায় তিন দিন | আর্কাইভ: চাকমা জাতি; চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ |
| ত্রিপুরা | গরিয়া পূজা · কের পূজা · খার্চি পূজা · চুমলাই · সিমতৗং · কাথারক · সাকচরাই | গরিয়া বৈসুর সঙ্গে, মানত থাকলে; কের গ্রামভিত্তিক, বছরে দুবার; চুমলাই ভাদ্র মাসে জুমের ফসল তোলার পর; সিমতৗং বৈসুর আগে পিতৃপুরুষের উদ্দেশে প্রদীপ | আর্কাইভ: ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত |
| ম্রো | ছিয়াছত-প্লাই | জুমের ফসল তোলার পর সচ্ছল পরিবারের আয়োজন, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি; প্লুং বাঁশির সুরে গরুকে ঘিরে নাচ | বাংলাপিডিয়া: Mru |
| ম্রো | কেরাই বা কাংনাত পূজা · বসুমতি পূজা | কেরাই ফাল্গুন ও আষাঢ়ে, তিন দিন; বসুমতি পূজা মহামারি দেখা দিলে | বাংলাপিডিয়া: Mru |
| ম্রো (ক্রামা অনুসারী) | গো-হত্যা উৎসব ও গো-হত্যা নৃত্য | আর্কাইভের ভাষায় ক্রামা ধর্মাবলম্বী ম্রোদের অন্যতম প্রধান অনুষ্ঠান | আর্কাইভ: ক্রামা ধর্ম |
| খুমী | রেইংনাই পই · আরেং চেংনাই পই | দুই ধরনের গো-হত্যা অনুষ্ঠান। দ্বিতীয়টি “রাজকীয়”, 5 থেকে 7টি গরু বা মহিষ লাগে; বাংলাদেশের খুমীরা এখন প্রায় করেন না | আর্কাইভ: খুমী জাতির আদ্যোপান্ত |
| খুমী | নিশা জা · নিচো জা · ল ব · চো প্ল | জুম ঘিরে চার পূজা: প্রথম দুটি পাড়াকেন্দ্রিক, পরের দুটি পরিবারভিত্তিক (আগাছা পরিষ্কার ও ধান কাটার সময়) | আর্কাইভ: খুমী জাতির আদ্যোপান্ত |
| বম | খুয়া-টেম (পাড়াশুদ্ধি) · লৌ থিং কুং বল (জুম মঙ্গল পূজা) · রুয়া-খা-জার (বৃষ্টির আহ্বান) | খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের আগের “বলশান” পূজা-পার্বণ, জুমচাষ ঘিরে; পাড়াশুদ্ধির নির্দিষ্ট দিন-মাস নেই | আর্কাইভ: বম জাতির আদ্যোপান্ত |
| পাংখোয়া | সুনথা মা-জির · ডাই মাহের; এখন বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষ | আগের দিনের পূজা, খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পর বন্ধ | আর্কাইভ: পাংখোয়া জাতির আদ্যাপান্ত |
| খিয়াং | হেনেই · সৈত্যবীল · বুগেলে | হেনেই বছরে অন্তত তিনবার, জুমের ধান রোপণ বা কাটার সময়; বুগেলে ধানের চারা ওঠার সময় | আর্কাইভ: খিয়াং |
| চাক | আংনাইবুক পো (নবান্ন) · ঠিং কানাইত্ | নবান্ন বছরে একবার নতুন ফসল ওঠার পর, জুমচাষিরা সাধারণত ভাদ্র মাসে; ঠিং কানাইত্ নদী বা ছড়া-রক্ষীর পূজা, বছরে দুবার | আর্কাইভ: চাক জাতির আদ্যোপান্ত |
| তঞ্চঙ্গ্যা | নবান্ন উৎসব · আলপালনী উৎসব | নাম আছে, বিবরণ নেই | আর্কাইভ: তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত |
| লুসাই | নিজস্ব উৎসবের নাম জানা যায়নি। আর্কাইভের বম-লেখা অনুযায়ী বম, পাংখোয়া ও লুসাইরা এখন খ্রিষ্টান | ||
পাংখোয়াদের সবচেয়ে বড় উৎসব নিয়ে দুই উৎস দুই কথা বলে: বাংলাপিডিয়া বলছে শ্রাবণ মাসের খোজিং পূজা, আর আর্কাইভের পাংখোয়া-লেখা বলছে ধন-সম্পদের দেবতার পূজা সুনথা মা-জির, এবং জানাচ্ছে সব পাংখোয়া এখন খ্রিষ্টধর্ম পালন করেন।
চাকমাদের বেলায় তালিকাটি আরও লম্বা। বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের 1989 সালের লেখা চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ আমাদের আর্কাইভে আছে; সেখানে বারোটি পূজা ও প্রথা আলাদা শিরোনামে বর্ণিত: গঙাত ভাতজরা দেনা, মালক্ষ্মী মা পূজা, চামনী, চুমুলাং, অহ্ইয়া, সিন্দি, ফানাচ্ বাত্তি, আহ্জার বাত্তি, ধর্মকাম, থান্ মানা, মালেইয়া ও আহল্ পালানী। লেখক নিজেই আলাদা করে দিয়েছেন যে মালেইয়া কোনো পূজা নয়; এটি জুম কাটা বা ফসল তোলার কাজে পাড়ার সবাই মিলে বিনা মজুরিতে সাহায্য করার একটি সামাজিক রীতি। পূজার উপকরণ, পুরোহিত রুরি ও অঝার ভূমিকা এবং বলির আগে “আগ্ পাতা” ফেলার নিয়ম ওই লেখাতেই পড়া ভালো।
রাজপুণ্যাহ আলাদা ধরনের অনুষ্ঠান, কারণ এটি কোনো এক জনগোষ্ঠীর নয়; এটি সার্কেল প্রধানের কাছে জুমের খাজনা দেওয়ার বার্ষিক দরবার। মারমা ভাষায় এর নাম পইজ্রা, বোমাং রাজার দরবারে ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে হয়। খিয়াং ও খুমীরা বোমাং সার্কেলের রাজপুণ্যাহে অংশ নেন, আর তঞ্চঙ্গ্যারা চাকমা রাজার পুণ্যাহে যোগ দেন বলে আর্কাইভে লেখা আছে। সার্কেল-ব্যবস্থার বিবরণ আছে চাকমা সার্কেল, হেডম্যান ও কার্বারি লেখায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীগুলো একই পূর্ণিমা-পঞ্জিকা ধরে ধর্মীয় উৎসব করে, কিন্তু নাম আলাদা। বৈশাখী পূর্ণিমা মারমাদের কাছে কছুংলাব্রে, চাকদের কাছে কাছুং লাব্রে, খিয়াংদের কাছে সাংলান। আষাঢ়ী পূর্ণিমায় ভিক্ষুদের বর্ষাবাস শুরু হয়, আশ্বিনী পূর্ণিমায় শেষ, আর তার পরের এক মাসে হয় কঠিন চীবর দান।
| উপলক্ষ | মারমা | চাক | খিয়াং | চাকমা | তঞ্চঙ্গ্যা |
|---|---|---|---|---|---|
| বৈশাখী পূর্ণিমা | কছুংলাব্রে | কাছুং লাব্রে | সাংলান | বৈশাখী পূর্ণিমা | বৈশাখী পূর্ণিমা (প্রধান ধর্মীয় উৎসব) |
| আষাঢ়ী পূর্ণিমা, বর্ষাবাস শুরু | ওয়াছো | ওয়াছো | ওয়াছ | ওয়া ধরানা | আষাঢ়ী পূর্ণিমা |
| আশ্বিনী পূর্ণিমা, বর্ষাবাস শেষ (প্রবারণা) | ওয়াগ্যোওয়াই | ওয়াগ্যোই | জানা যায়নি | ওয়া ভাঙানা | আশ্বিনী পূর্ণিমা, প্রবারণা |
| কঠিন চীবর দান | কঠিং বোওয়ে | কাথিং পোয়ে | জানা যায়নি | কঠিন চীবর দান | কঠিন চীবর দান |
| অন্য পূর্ণিমা ও অনুষ্ঠান | জানা যায়নি | তেংছংমং লাব্রে (অগ্রহায়ণ পূর্ণিমা) | ওয়াগ্যত (আর্কাইভে মাঘী পূর্ণিমা বলা হয়েছে) | মাঘী পূর্ণিমা, মধু পূর্ণিমা, ব্যুহ চক্র, ফানাস বাত্তি উড়ানা, আহ্জার বাত্তি জ্বালানা, গাড়ি টানা, মহাসংঘ দান | ভাদ্র (মধু) পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা, ফাল্গুনী পূর্ণিমা |
ছকের নামগুলো আর্কাইভের পাঁচটি পরিচিতি-লেখা থেকে নেওয়া। একটি জায়গায় নাম ও তিথি মেলে না: খিয়াং-লেখায় “ওয়াগ্যত”-কে মাঘী পূর্ণিমা বলা হয়েছে, অথচ কাছাকাছি নামের মারমা “ওয়াগ্যোওয়াই” ও চাক “ওয়াগ্যোই” দুটোই আশ্বিনী পূর্ণিমার উৎসব। বাংলাপিডিয়ার খিয়াং ভুক্তি সাংলানকে খিয়াংদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব বলেছে, যা গৌতম বুদ্ধের পূজা দিয়ে শুরু হয়।
কঠিন চীবর দানের সময় নিয়ে উৎসগুলো একমত। আর্কাইভের চাক ও তঞ্চঙ্গ্যা-লেখা দুটোই বলছে, আশ্বিনী পূর্ণিমার পরদিন থেকে কার্তিকী পূর্ণিমা পর্যন্ত এক মাসের মধ্যে ভিক্ষুসংঘকে চীবর, অর্থাৎ ভিক্ষুর পরিধেয় বস্ত্র দান করতে হয়। মারমা-লেখায় আছে, অনুষ্ঠানের পরদিন ভিক্ষুরা একটি বুদ্ধমূর্তি নিয়ে গ্রামের মধ্য দিয়ে শোভাযাত্রা করেন। চাকরা এ সময় বাঁশের কঞ্চি ও রঙিন কাগজে “প্যাডেছা” নামে একটি কল্পতরু গাছ বানিয়ে তাতে দানসামগ্রী ঝোলান। বাংলা উইকিপিডিয়ার কঠিন চীবর দান নিবন্ধ আরেকটি তথ্য যোগ করে, যা এই উৎসবকে বয়নের সঙ্গে জুড়ে দেয়: তুলা থেকে সুতা কাটা, রং করা ও বোনা মিলিয়ে চীবরটি 24 ঘণ্টার মধ্যে তৈরি করা হয়, আর বোনার কাজে ব্যবহৃত হয় বেইন।
সব জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ নয়। আর্কাইভের ত্রিপুরা-লেখা অনুযায়ী ত্রিপুরারা মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং দুর্গা পূজা, কালী পূজা ও রাসমেলা পালন করেন; বান্দরবানের ত্রিপুরাদের অধিকাংশ খ্রিষ্টান। বম ও পাংখোয়াদের মধ্যে খ্রিষ্টধর্মের প্রচার শুরু হয় যথাক্রমে 1918 ও 1943 সালের দিকে। খুমীরা প্রকৃতিপূজারি, ক্রামা ও খ্রিষ্টান, এই তিন ভাগে বিভক্ত। ম্রোদের ক্রামা ধর্ম নিয়ে আলাদা লেখা আছে: ক্রামা ধর্ম: গরু যে বইটা খেয়েছিল, আর মেনলে ম্রোর নতুন লিপি।
কোমর তাঁত এমন তাঁত, যার সুতার এক প্রান্ত খুঁটিতে আর অন্য প্রান্ত বেল্ট দিয়ে তাঁতির কোমরে বাঁধা থাকে; ইংরেজিতে backstrap loom, চাকমা ভাষায় বেইন। একই যন্ত্রে চাকমাদের পিনোন-খাদি, তঞ্চঙ্গ্যাদের পিনুইন, মারমাদের থবিং বা থামি আর ত্রিপুরাদের রিনাই-রিসা ওঠে, আলাদা নাম ও নকশায়।
চাকমা-লেখায় বেইনের সরঞ্জামকে বলা হয়েছে সজপদর, আর নকশার নমুনা-কাপড়কে আলাম; আলাম পরার পোশাক নয়, বোনার সময় নকশা দেখার কাপড়। অন্য ভাষাতেও বুননের সরঞ্জামের নিজস্ব নাম আছে। তঞ্চঙ্গ্যা-লেখায় আছে ব্যং থুরচুমা, বগলা, সাম্মেয়া, ফুলবারেং ও তলই; ত্রিপুরা-লেখায় থুরি, পাইরেং, রিখুক্র, রিখ্রোক, বেংকে ও বুমুল ওয়াফ্রি। কোনটি কোন কাজে লাগে, দুই লেখার কোনোটিতে লেখা নেই।
পোশাকের নামগুলো নিচের ছকে একসঙ্গে রাখা হলো। প্রথম চারটি সারির নারী-পোশাকের নাম আমাদের কোমর-তাঁত বিষয়ক লেখার ছক থেকে নেওয়া; বাকি সারি ও পুরুষের পোশাকের ঘর প্রতিটি জনগোষ্ঠীর পরিচিতি-লেখা ও বাংলাপিডিয়া থেকে যোগ করা।
| জনগোষ্ঠী | নারীর নিচের কাপড় | উপরের অংশ | মাথা, কোমর, অলংকার | পুরুষের পোশাক |
|---|---|---|---|---|
| চাকমা | পিনোন | খাদি (বক্ষবন্ধনী) | খবং (পাগড়ি), কাগই | লুঙ্গি ও শার্ট (বাংলাপিডিয়া) |
| তঞ্চঙ্গ্যা | পিনুইন বা পেনুইন; দৈর্ঘ্য 4 হাত | খাদি; কোবোই সালুম (জামা) | খবং, ফারদ্দরী (কোমরবন্ধনী) | ধুতি ও লম্বা হাতার জামা (বাংলাপিডিয়া) |
| মারমা | থবিইং / থবিং (থামি) | বেঃদাইত আঙ্গি (ব্লাউজ); রাংগাইত্ (বক্ষবন্ধনী) | খাঃগ্রোঃ (রুপার কোমরবন্ধনী) | ধোয়াঃ, ব্যারিষ্টা আঙ্গি, গবং; এখন লুঙ্গি ও শার্ট |
| ত্রিপুরা | রিনাই | রিসা (বক্ষবন্ধনী), কুবাই | রিসা পাগড়ি হিসেবেও ব্যবহৃত | অতীতে ঘরে তৈরি গামছা ও কুবাই |
| ম্রো | ওয়ানক্লাই (বাংলাপিডিয়ায় ওয়াঙলাই) | বাজারে যাওয়ার সময় একখণ্ড কাপড় | কেংঙঅর (পুঁতির মালা), রামচেং (কানের অলংকার) | নেংটি; বাজারে লুঙ্গি ও জামা |
| খিয়াং | প্যওন | লাংগত (বক্ষবন্ধনী) | রুপার অলংকার: খেলখালু, তায়্যম, থেকেল, হ্নেথেং | নেংটি; হাটে কোমর তাঁতে বোনা সাদা জামা, ধুতি ও পাগড়ি |
| খুমী | নেনা; 15/16 ইঞ্চি লম্বা, চারদিকে গুটিকা বসানো | জানা যায়নি | সাদা পাগড়ি, পিতলের বালা, রুপার বড় দুল, কোমরে বিছা | নেংটি ও লুঙ্গি |
| পাংখোয়া | কেংজেল ভেল (স্কার্ট) | করড (টপ বা ব্লাউজ) | পোয়ান ঙৌ (বিশেষ দিনের সাদা কাপড়), চং নাক পোয়ান (নকশা করা, বড় অনুষ্ঠানের) | রেনতে রেং (নেংটি), পোয়ান পুই, করড, বিয়ার (পাগড়ি) |
| চাক | নাম জানা যায়নি | রাইকাইন পে (বক্ষবন্ধনী) | রাংকাইন পহ (কালো পাগড়ি), নাতং ফ্র (কানের দুল), ক্রীক, নাচক | পাংহ্রে কামুহ (নয় হাতি ধুতি); এখন লুঙ্গি |
| বম | কোমর তাঁতে বোনার ছবি ও বিবরণ আছে, কিন্তু বম ভাষায় পোশাকের নাম কোনো নির্ভরযোগ্য উৎসে পাওয়া যায়নি | |||
| লুসাই | জানা যায়নি | |||
ছকটি পড়ার সময় তিনটি কথা মাথায় রাখা ভালো। এক, পাংখোয়া নারীর স্কার্টের নাম একই লেখার ছকে “কেং জেল ফেল” আর গদ্যে “কেংজেল ভেল”; দুটোই ওই উৎসের। দুই, মাথার পাগড়ির নাম চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যায় খবং, মারমায় গবং (বাংলাপিডিয়ায় খবং); নামের এই মিল কোথা থেকে এল, কোনো উৎসে বলা নেই। তিন, কয়েকটি লেখা নিজেই জানিয়েছে যে পোশাকগুলো আর প্রতিদিনের নয়: পাংখোয়া-লেখায় আছে, ঐতিহ্যবাহী পোশাক সমাজে আর দেখা যায় না; চাক-লেখায় আছে, পুরুষেরা ধুতির বদলে লুঙ্গি পরছেন।
কাপড়ের শুরু তাঁতে নয়, জুমক্ষেতে। আর্কাইভের ত্রিপুরা-লেখা অনুযায়ী জুমের কার্পাস থেকে সুতা কাটা হতো এবং কালমা নামের গাছের পাতা ও অন্য গাছের পাতা-বাকল দিয়ে রং তৈরি হতো; ম্রো লেখক সিংইয়ং ম্রোর বর্ণনায় ম্রোরা জুমে স্রাম নামের উদ্ভিদ ফলান সুতা কালো করার জন্য। বম-লেখায় আছে, তুলার কারণেই পার্বত্য অঞ্চলকে একসময় “কার্পাস মহল” বলা হতো। জুমের ফসল-চক্র নিয়ে পড়তে পারেন জুম চাষ: পাহাড়ের কৃষিবিদ্যা, মাসে মাসে।
আজকের হিসাবটা অন্য রকম। রাঙামাটির রাঙাপানি গ্রামে 75টি তাঁতি পরিবারের ওপর চালানো এবং 2022 সালে প্রকাশিত একটি জরিপ অনুযায়ী একটি পূর্ণ পিনন সেট বুনতে 3 থেকে 4 সপ্তাহ লাগে, আর 18.3 শতাংশ তাঁতি কাঁচামাল নিজে তৈরি করতে পারেন না। বাণিজ্যিক বয়নের ইতিহাসে মঞ্জুলিকা চাকমার নাম আসে, যিনি 1965 সালে কোমর তাঁতের বুনন-পদ্ধতি হস্তচালিত তাঁতে প্রয়োগ করেন এবং 1976 সালে বেইন টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁতের অংশ, আলামের নকশা ও জরিপের পূর্ণ সংখ্যা আছে পিনন হাদি ও বেইন লেখায়; দাম, ঋণ ও জিআই সনদের প্রশ্ন আছে পিনন হাদির দাম কত, আর তাঁতির ঘরে কত যায় লেখায়।
চার জনগোষ্ঠীর নারীর পোশাক নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন আসে, আর চারটির উত্তর চার রকম: মারমা নারী পরেন থামি ও আঙ্গি, চাকমা নারী পিনোন ও খাদি, তঞ্চঙ্গ্যা নারী পাঁচ অংশের পোশাক যার নিচের কাপড় পিনুইন, আর ম্রো নারী ওয়ানক্লাই। প্রতিটি নাম নিয়ে উৎসে কিছু জট আছে; নিচে সেগুলো সংক্ষেপে রাখা হলো।
মারমা নারীর নিচের কাপড়ের নাম আর্কাইভের মারমা-লেখায় থবিইং, বিবাহ-বিষয়ক লেখায় থবিং ও থকিং, আর সাধারণ প্রচলনে থামি। বাংলাপিডিয়ার মারমা ভুক্তিতে লেখা, মেয়েরা নিচে পরেন “থ্বিং বা থামি”। অর্থাৎ থামি ও থবিং আলাদা দুটি পোশাক নয়, একই কাপড়ের দুই রকম লেখা। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি ভুক্তি যোগ করেছে, মারমা পুরুষের আঙ্গি ব্লাউজের চেয়ে ওয়েস্টকোটের মতো। উপরের ব্লাউজ বেঃদাইত আঙ্গি, বক্ষবন্ধনী রাংগাইত্। বিয়ের দিন বরপক্ষ কনের জন্য যে পোশাক-সেট নিয়ে যায়, তার তালিকা এবং নামের সব বিকল্প বানান আছে মারমা থামি ও আংগি: পোশাকের অংশগুলো নাম ধরে লেখায়।
আর্কাইভের চাকমা জাতি লেখা অনুযায়ী চাকমা নারীর পোশাক পিনোন (নিচে পরার), খাদি (বক্ষবন্ধনী), কাগই ও খবং, আর কাপড় বোনা হয় বেইনে। বাংলাপিডিয়ার “Tribal Culture” ভুক্তি বলছে চাকমাদের প্রধান পোশাক লুঙ্গি ও শার্ট, আর নারীরা পরেন লাল-কালো সারং, ব্লাউজ ও খাদি নামের ওড়না। দুই বর্ণনা মিলিয়ে পড়লে লুঙ্গি-শার্ট পুরুষের পোশাক; আর খাদি এক উৎসে বক্ষবন্ধনী, অন্য উৎসে ওড়না। অলংকারের মধ্যে আর্কাইভে নাম আছে হালছরা (চন্দ্রহার), তেঙাছড়া (রুপার মুদ্রার মালা), তাজ্জুর, কুজি খারু, বায়োরি, তিন ধরনের কানফুল (কজফুল, রাজ্জুর, ঝুমুলি), নাগফুল ও থেংখারু।
তঞ্চঙ্গ্যা নারীর পোশাকে পাঁচটি অংশ: পিনুইন, খাদি, কোবোই সালুম, ফারদ্দরী ও খবং। বাংলাপিডিয়া পিনুইনকে সাত রঙের হাতে বোনা কাপড় বলেছে। আর্কাইভের ছকে সাতটি গসার (গোত্র) পোশাক আলাদা করে দেওয়া আছে, তবে পিনুইন ও খাদির নকশা সব গসায় একই। পায়ের রুপার মল ঠেঙর খাড়ু 40 থেকে 60 তোলা, কখনো 80 তোলা পর্যন্ত হয় বলে লেখা আছে। গসাভেদে পোশাকের ছক, পিনুইনের উৎপত্তি-কাহিনি এবং কন্যার প্রথম পিনুইন পরার অনুষ্ঠান “পিনুইন পোই” নিয়ে পড়ুন তঞ্চঙ্গ্যা পোশাকের স্বাতন্ত্র্য: পিনুইন, ফারদ্দরী ও গসার ভাগ।
ম্রো নারীর প্রধান পরিধেয়ের নাম ম্রো লেখক সিংইয়ং ম্রো ও বাংলা উইকিপিডিয়া লিখেছেন ওয়ানক্লাই, বাংলাপিডিয়া লিখেছে ওয়াঙলাই। মাপ নিয়েও দুই হিসাব: বাংলাপিডিয়ায় উপর থেকে নিচ পর্যন্ত প্রস্থ 6 ইঞ্চি, বাংলা উইকিপিডিয়ায় 8 থেকে 10 ইঞ্চি। বম নারীদের কোমর তাঁতে বোনার ছবি ও বাজারের হিসাব আছে, কিন্তু বম ভাষায় পোশাকের একটি নামও নির্ভরযোগ্য কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। দুই জনগোষ্ঠীর বস্ত্র নিয়ে যতটুকু নথিভুক্ত, তা আছে ওয়ানক্লাই ও কোমরতাঁত: ম্রো ও বম বস্ত্রের যতটুকু নথিভুক্ত লেখায়।
পাহাড়ি খাবার বোঝার সহজ চাবি পদের নাম নয়, রান্নার পদ্ধতির নাম, আর সঙ্গে দুটি উপকরণ: সিদোল ও নাপ্পি। চাকমা ভাষায় সেদ্ধ তরকারি উচ্যা, বাঁশের চোঙে রান্না গরাঙ, পাতায় মুড়ে রান্না কেবাং। ত্রিপুরা ভাষায় বাঁশের চোঙের তরকারি প্রেংজাক, পাতায় রান্না মৌকজাক; পাংখোয়া ভাষায় বাঁশের চোঙের তরকারি আন মুং।
পদ্ধতির নামগুলো প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজের ভাষার, তাই একটির নাম অন্যটির বেলায় খাটে না। নিচের ছকে একই ধরনের রান্নার নাম পাশাপাশি রাখা হলো, যেখানে যতটুকু উৎসে আছে।
| রান্নার ধরন | চাকমা | ত্রিপুরা | পাংখোয়া | অন্য জনগোষ্ঠী |
|---|---|---|---|---|
| বাঁশের চোঙে তরকারি | গরাঙ / গোরাঙ | প্রেংজাক / প্রৈংজাক | আন মুং | খুমী: জঙ্গলে রান্নায় লম্বা বাঁশের চোঙা ব্যবহার করেন; নাম জানা যায়নি |
| বাঁশের চোঙে ভাত | জানা যায়নি | প্রৈঙনায় পদ্ধতি | বু মুং | জানা যায়নি |
| পাতায় মুড়ে আগুনে | কেবাং / কেবাঙ | মৌকজাক | জানা যায়নি | জানা যায়নি |
| আগুনে সেঁকে বা আগুনের তাপে | সিক্যা (লবণ, হলুদ, মরিচ মাখানো মাংসখণ্ড) | হাংজাক | জানা যায়নি | জানা যায়নি |
| সেদ্ধ শাকসবজি | উচ্যা / উজ্যা | জানা যায়নি | নাম জানা যায়নি; সেদ্ধ খাবারে অভ্যস্ত | তঞ্চঙ্গ্যা: উসুনা চন · মারমা: তোহ্জাঃ (মরিচের ভর্তা দিয়ে) · চাক: তোহ্জাহ্ (শুকনা মাছ ও মরিচ বাটার সঙ্গে) |
| কম ঝোলে মাছ-মাংস | হলা | জানা যায়নি | জানা যায়নি | জানা যায়নি |
| বেশি মরিচ দিয়ে মিশ্রিত বা চূর্ণ করা তরকারি | গুদেয়্যা / গুদুয়্যে | গুদাকজাক (বিবরণ নেই) | জানা যায়নি | জানা যায়নি |
| মরিচ, পেঁয়াজ, শুঁটকি বা সিদোল মিশিয়ে শাকসবজি | কোরবো / করবো | জানা যায়নি | জানা যায়নি | চাক: কাইংরাবুং (একাধিক সবজি, মাছ বা মাংস, টক-ঝাল একসঙ্গে) |
চাকমা নামগুলোর ব্যাখ্যা আর্কাইভের চাকমা জাতি লেখার খাদ্য-অংশ থেকে নেওয়া। ত্রিপুরা-লেখায় তরকারি রান্নার 12টি প্রণালির নাম আছে: সেরজাক, য়কজাক, হাংজাক, প্রেংজাক, মৌকজাক, গুদাকজাক, রুজাক, চাখৈ, কুরুয়া বা লাকসু, বানসু বা বাঙসঙ, সেক ও পাচন। এর মধ্যে তিনটির পদ্ধতি বলা আছে, বাকিগুলোর কেবল নাম। মারমা, ম্রো, বম, খিয়াং, খুমী ও লুসাই ভাষায় রান্নার পদ্ধতির নাম কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
সিদোলের সংজ্ঞা আর্কাইভের চাকমা জাতি লেখায় দেওয়া আছে: সমুদ্রের ছোট মাছ ও চিংড়ি গুঁড়ো করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি মণ্ড, যা কক্সবাজার জেলার উপকূলে রাখাইনরা তৈরি করেন। নাপ্পিকে আর্কাইভের একটি অর্থনীতি-বিষয়ক প্রবন্ধ বলেছে একধরনের প্রক্রিয়াজাত শুঁটকি, যা কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর রাখাইনরা উৎপাদন করেন। জনগোষ্ঠীভেদে নামের রূপ বদলায়: মারমা-লেখায় ঙাপ্পি (মাছের পেস্ট), তঞ্চঙ্গ্যা-লেখায় “নাপ্পি বা চিদল”, খিয়াং ও খুমী-লেখায় নাপ্পি। পাংখোয়া-লেখায় একই কাজের আরেকটি উপকরণের কথা আছে: মে থু, যা শূকরের চর্বি পুরনো হাঁড়িতে ভরে মুখ কলাপাতায় বন্ধ করে চুলার উপর 4 থেকে 5 মাস রেখে তৈরি হয়।
চাকমাদের মূলবিজুর দিনের পরিচিত পদ পাজন, যা রান্না হয় ন্যূনতম 5 পদের সবজি দিয়ে; আর্কাইভ অনুযায়ী অনেক সময় 100 পদের বেশি সবজিও দেওয়া হয়। ত্রিপুরাদের বৈসুমার দিনে অতিথিদের পাঁচন পরিবেশন করা হয়। পিঠার নামও জনগোষ্ঠীভেদে আলাদা: চাকমাদের সান্ন্যাপিঠা, বিনিপিঠা ও কলাপিঠা; তঞ্চঙ্গ্যাদের বিনি চালের গুঁড়ো গরম দুধে সেদ্ধ করা মু-পিঠা; ত্রিপুরাদের বিন্নি চালের গুঁড়ো আর কলা ও লাইরু পাতায় তৈরি পিঠা। খিয়াংদের সৈত্যবীল হলো চালের গুঁড়ো, নারকেল, গুড় ও আখ এক পাত্রে মিশিয়ে সবাই মিলে খাওয়ার উৎসব। জুমে ফলানো মসলার নামও লেখা আছে: চাকমাদের ফুজি ও সাবারাং; ত্রিপুরাদের বানা, লকবানা, খুঁইচানী ও মাইত্রাঁ।
বাঁশ কোড়ল, অর্থাৎ বাঁশের কচি অঙ্কুর, নিয়ে আর্কাইভের পড়া লেখাগুলোতে আলাদা বিবরণ নেই। বাংলা উইকিপিডিয়ার বাঁশ কোড়ল নিবন্ধে তিনটি স্থানীয় নাম দেওয়া আছে, মারমা “মহ্ই”, চাকমা “বাচ্ছুরি” ও ত্রিপুরা “মেওয়া”, তবে নিবন্ধে নামগুলোর সূত্র নেই।
সিদোল ও নাপ্পির উপকূল থেকে পাহাড়ে আসার পথ, পাজনের নামের সম্ভাব্য উৎপত্তি এবং প্রতিটি খাবারের নামের বিকল্প বানান আছে পাহাড়ি খাবার: সিদোল, নাপ্পি আর রান্নার সাত পদ্ধতি লেখায়।
পাহাড়ি গান বা পাহাড়ি বাদ্যযন্ত্র বলে একক কিছু নেই; প্রতিটি জনগোষ্ঠীর যন্ত্র ও গানের ধারার নিজস্ব নাম আছে। চাকমাদের ধুদুক ও হেঙগরঙ, মারমাদের হ্নেঃ ও প্যাহ্, ত্রিপুরাদের সুমুই ও চংপ্রেং, বমদের রিরৎ ও মিমীম, পাংখোয়াদের রুয়া টিংটাং, চাকদের বাইক ও লাংহোয়াক, ম্রোদের প্লুং, সবই আলাদা ভাষার আলাদা যন্ত্র।
| জনগোষ্ঠী | গানের ধারা | বাদ্যযন্ত্র | নাচ |
|---|---|---|---|
| চাকমা | গেংখুলী গীত, উভোগীত, অলিগীত (ঘুমপাড়ানি), বিজু গীত | ধুদুক, হেঙগরঙ, শিঙা, বাঁশি, ঢুল, ডগর, সারিন্দ্যা, তাক | অতীতের বিজু নাচ, জুম নাচ, কদলপুর নাচ, থানমানা নাচ, মালেইয়্যা নাচ; 1970-এর দশকের পর আধুনিক নাচ |
| মারমা | কাপ্যা, চাগায়াঙ, সাখ্রাঙঃ, রদুহ্, লাঙ্গা, সাইঙগ্যাইত্, লুঙঃদি, সাইঙবক্, আফোওয়েহ্, ন্বাইলাঃ, খইসই তেঃখ্রাং; গীতিনাট্য পাংঃখুঙ ও জাইত্ | খরা, মঙঃ, প্যাহ্, হ্নেঃ, চে, এঃ | ঙ্চোয়ে আকাহ্, সইঙঃ আকাহ্, কুমুইঙ আকাহ্, য়ইঃ আকাহ্, ছিমুইঃ আকাহ্ (প্রদীপ নৃত্য), লঙবাইঃ আকাহ্ (থালা নৃত্য) |
| ত্রিপুরা | জাদুনী গান; গীতিকাব্য লাংগৈ রাজানো বুমানি, পুন্দা তানমানি | সারিন্দা, সুমুই, চংপ্রেং, খাম, ওয়াখপ, দাংদু | গরয়া বা গরিয়া নৃত্য, কাথারক বা বোতল নৃত্য, হজাগিরি নৃত্য, কেরপূজা নৃত্য, মাইমিতা |
| তঞ্চঙ্গ্যা | উভাগীত (সাপ্প্যেগীত), পালাগান | খেংগ্রং, বাঁশি, বেহালা | মন্দির নৃত্য; এখন জুম নৃত্য |
| বম | কাইলেক, লা ফিং, লাতুং; বিয়ের গান Lawi la | রিরৎ, মিমীম, জলপাল | রোখা (বাঁশনৃত্য), সাবাংরুয়াই, লাদৌ বা বর-লা, সিয়া কী দেং (শিং নৃত্য), সালু লাম |
| পাংখোয়া | সাখা লা, ভার হাই লা, লেং দের লা, নাউ ওয়াই লা, ব-লা, লা লেং লং | সিয়াল রাকি, ডার সন, ডার পুই, খোয়াং, থেই খাং, রুয়া খোয়াং, রুয়া টিংটাং | লামদেপ, সালু মালাম, পোয়াল মা থলা লাম, জামা লাম, চাং রাপাল দেং, লেংদের কাই লাম |
| চাক | ছিকহ্রাং (গান): ছড়া গান, ঘুম পাড়ানো গান, পালা গান, উৎসব গান, বিরহ গান, নাচ গান | বাইক (ঢোল), হ্নে (বাঁশি), লাংহোয়াক (ঝাঁজ), চিংছা | জাইক (নাট্যানুষ্ঠান) |
| খুমী | লোকগীতি, যা কেবল শিল্পীরাই বুঝতে পারেন | বাঁশি, ঢোল | তাং ন’ (গো-হত্যা অনুষ্ঠানে) |
| ম্রো | জানা যায়নি | প্লুং (বাংলাপিডিয়া) | গো-হত্যা নৃত্য; ছিয়াছত-প্লাইয়ে গরুকে ঘিরে নাচ |
| খিয়াং | গান ও ছড়া আছে; ধারার নাম জানা যায়নি | জানা যায়নি | জানা যায়নি |
| লুসাই | জানা যায়নি | ||
ছকের তিনটি সারি নিয়ে আলাদা কথা আছে। ত্রিপুরা সারির গান ও যন্ত্রের নাম এসেছে বিকাশ রায় দেববর্মার ককবরক সঙ্গীত অতীত ও ভবিষ্যৎ লেখা থেকে, যা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের প্রেক্ষাপটে লেখা; পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরাদের বেলায় কতটা হুবহু খাটে, ওই লেখা থেকে বলা যায় না। নাচের নামগুলো অবশ্য আর্কাইভের ত্রিপুরা-লেখার, যা বাংলাদেশের ত্রিপুরাদের নিয়ে। বম সারির পুরোটাই বান্দরবানের লেখক জির কুং সাহুর বম আদিবাসীদের লোকসংগীত ও লোকনৃত্য থেকে; সেখানে গানের মূল পাঠ ও বঙ্গানুবাদ আছে, আর লেখকের পর্যবেক্ষণ হলো বম নৃত্যগীতে আনন্দোৎসবের চেয়ে শোকানুষ্ঠানের প্রাধান্য। মারমা সারির বারোটি গানের ধারা ও দুটি গীতিনাট্যের বিবরণ আছে মারমা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায়।
কিওয়ার্ড হিসেবে সবচেয়ে বেশি খোঁজা হয় গরিয়া নৃত্য। আর্কাইভের ত্রিপুরা-লেখা অনুযায়ী এটি বৈসুর প্রথম দিন হারি বৈসু থেকে শুরু হয়ে টানা 5 থেকে 7 দিন গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঢোল ও বাঁশি বাজিয়ে পরিবেশিত হয়, আর এর দৃশ্যগুলো জুম কাটা, বীজ বোনা, ধান কাটা, সুতা কাটা ও কাপড় বোনার মতো কাজ নিয়ে সাজানো। লেখাটিতে নামের দুটি বানানই আছে: গরয়া ও গরিয়া।
আজ মঞ্চে যে নাচ “ঐতিহ্যবাহী” বলে পরিচিত, তার কিছু অংশের বয়স খুব বেশি নয়। আর্কাইভের চাকমা-লেখায় সুগত চাকমার বরাতে বলা হয়েছে, 1970-এর দশকের আগে চাকমাদের মধ্যে আজকের মতো নাচ দেখা যেত না। একই লেখা অনুযায়ী প্রথম আধুনিক চাকমা গান লেখেন চিত্রশিল্পী চুনিলাল দেওয়ান, 1946 সালে। আধুনিক পাহাড়ি গানের সংগঠন, বেতার ও ক্যাসেট-পর্ব এবং বাংলাপিডিয়ার বাদ্যযন্ত্র-তালিকার সঙ্গে আর্কাইভের নামগুলোর তুলনা আছে পাহাড়ি গান ও আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র: নাম ধরে ধরে একটি পাঠ লেখায়। গান শুনতে চাইলে যেতে পারেন জুমজার্নাল মিউজিকে।
মৌখিক সাহিত্যের সবচেয়ে নথিভুক্ত ধারা চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের গেংখুলি পালাগান, যার সবচেয়ে পরিচিত পালা রাধামন-ধনপুদি। এর বাইরে জুমজার্নালের আর্কাইভে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খিয়াং ও চাক, এই সাত জনগোষ্ঠীর রূপকথা ও লোককথা আলাদা আলাদা লেখা হিসেবে আছে।
গেংখুলি হলেন চারণ কবি, যাঁরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে সুর করে পালা গান। চাকমা-লেখায় পালার নাম আছে রাধামন-ধনপুদি পালা, চাদিগাং ছাড়া পালা, লোরবো মিদুঙি পালা, লক্ষ্মী পালা ও লাঙ্যা-লাঙনী পালা। তঞ্চঙ্গ্যা-লেখা অনুযায়ী তঞ্চঙ্গ্যা গেঙ্গুলীরাও বেহালা বাজিয়ে রাধামন-ধনপুদি ও চাদিগাং ছাড়া পালা গান। রাধামন-ধনপুদির কাহিনি এক এক উৎসে এক এক রকম; তিনটি পাঠের তুলনা আছে গেংখুলি ও রাধামন-ধনপুদি: চাকমা মৌখিক সাহিত্যের পাঠ লেখায়।
নিচের তালিকায় গল্পগুলো শিরোনাম ধরে দেওয়া হলো; প্রতিটি নাম থেকে মূল লেখায় যাওয়া যাবে।
বম, খুমী, পাংখোয়া ও লুসাইদের লোককথা আলাদা লেখা হিসেবে আর্কাইভে পাওয়া যায়নি, তবে পরিচিতি-লেখার ভেতরে কিছু আছে। খুমী জাতির আদ্যোপান্ত লেখায় ছয়টি লোককাহিনির নাম দেওয়া আছে (আংলো রেইংপা, সিখি আচি, পুইখং আচি, উইকিই আচি, লাকনা নু আচি, য়াংপো চে আচি) এবং উইকিই আচি বা কচ্ছপের গল্পটি পুরো লেখা আছে। পাংখোয়া-লেখায় আছে “বাঘের সাথে বন্ধুত্ব” নামের রূপকথা; পাংখোয়ারা বাঘের মাংস খান না, কারণ আদিকালে পাংখোয়া ও বাঘের বন্ধুত্ব ছিল বলে তাঁদের বিশ্বাস। তঞ্চঙ্গ্যা-লেখায় কলাত্তুর কন্যা ও দুলুকুমারী নামের আরও দুটি কাহিনির উল্লেখ আছে। ত্রিপুরা-লেখা জানাচ্ছে, ছয়-সাতটি গীতিকাব্যের মধ্যে মাত্র দুটি বই আকারে বেরিয়েছে।
একটি পুরাণ আলাদা করে বলার মতো, কারণ এটি একই সঙ্গে গল্প ও আচারের ব্যাখ্যা। ম্রোদের কাহিনিতে ঈশ্বরের পাঠানো গ্রন্থ ও বর্ণমালা একটি গরু পথে খেয়ে ফেলে, আর সেই কারণেই ম্রোরা গরু বলি দেন; খুমী-লেখা অনুযায়ী খুমীদের বর্ণমালা হারানোর কাহিনির সঙ্গে এর যথেষ্ট মিল আছে। কাহিনিটির দুটি পাঠ পাশাপাশি পড়া যাবে ক্রামা ধর্ম নিয়ে লেখায়।
জুমজার্নালের ইবুক লাইব্রেরিতে লোককথার কয়েকটি সংকলন আছে: উপজাতীয় রূপকথা লোককাহিনী এবং কিংবদন্তি, 1ম খণ্ড ও 2য় খণ্ড · ম্রো রূপকথা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি · তঞ্চংগ্যা রূপকথা, লোককাহীনি ও কিংবদন্তী · ত্রিপুরা আদিবাসী লোককথা (নিরঞ্জন চাকমা ও রঘুনাথ সরকার)।
বিয়ের আচার জনগোষ্ঠীভেদে আলাদা, আর নামও আলাদা: আর্কাইভের শিরোনামে বম বিবাহের নাম উমহ্নাক, পাংখোয়া বিবাহ ইননেই, লুসাই বিবাহ ইননেইহ্, মারমা বিবাহ মেয়াপোই বা মাঙলা হং পোই। এই পাতা আচারের বিবরণে যায়নি; নিচে কেবল কোন লেখায় কী পাবেন, তা দেওয়া হলো।
এই পাতার অন্য অংশে যে নামগুলো এসেছে, তার কয়েকটি বিয়ের সঙ্গেও যুক্ত। চাকমাদের চুমুলাং আসলে বিয়ের পূজা; বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের লেখা অনুযায়ী চুমুলাং না করে বিয়ে সিদ্ধ হয় না। ত্রিপুরাদের বিয়েতে কাথারক পূজা ও চুমলাই পূজা দিতে হয়, আর কাথারক পূজায় পরিবেশিত হয় বোতল নৃত্য। মারমা বিয়েতে বরপক্ষ কনের জন্য পুরো পোশাক-সেট নিয়ে যায়, আর তঞ্চঙ্গ্যা বিয়েতে কনের পোশাক ও গহনা যায় “ফো কালং” নামের বেতের ঝুড়িতে। কন্যা কখন উত্তরাধিকারী হন, সে প্রশ্নে দশটি জনগোষ্ঠীর নিয়মের তুলনা আছে প্রথাগত আইনে আদিবাসী তঞ্চঙ্গ্যা নারীর অবস্থান লেখায়।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, 2010-এর ধারা 4-এ নাম ধরে 7টি প্রতিষ্ঠান আছে, যার 3টি পার্বত্য চট্টগ্রামে: রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট। বাকি চারটি নেত্রকোণার বিরিশিরি, কক্সবাজার, রাজশাহী ও মৌলভীবাজারে।
আইনটি 2010 সনের 23 নং আইন, তারিখ 12 এপ্রিল 2010। ধারা 4-এর তালিকা:
একই ধারার শেষ দফায় বলা আছে, সরকার গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে আরও প্রতিষ্ঠান ঘোষণা করতে পারে। তাই “কতটি” প্রশ্নের আইনি উত্তর হলো: নাম ধরে সাতটি, সঙ্গে পরে ঘোষিত প্রতিষ্ঠান, যদি থাকে। পরে কোনো প্রতিষ্ঠান যোগ হয়েছে কি না, জানা যায়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি ইনস্টিটিউটের বেলায় আইনে একটি আলাদা ব্যবস্থা আছে। ধারা 7 অনুযায়ী অন্য জেলায় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি জেলা প্রশাসক বা বিভাগীয় কমিশনার, কিন্তু তিন পার্বত্য জেলায় সভাপতি সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। প্রতিটি পরিষদে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন করে প্রতিনিধি থাকেন। সরকার মনোনীত ছয়জন স্থানীয় প্রতিনিধির মধ্যে অন্তত চারজনকে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীভুক্ত হতে হয়। ধারা 9-এ কাজের তালিকায় আছে ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, কারুশিল্প, আচার-অনুষ্ঠান ও প্রথা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও গবেষণা; সংগীত, নৃত্য, নাট্য ও চারুকলার প্রশিক্ষণ; ঐতিহ্যবাহী উৎসবের আয়োজন; এবং সাংস্কৃতিক উপকরণ সংগ্রহ করে জাদুঘর স্থাপন।
প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের চেয়ে পুরনো; আগে নাম ছিল উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট। বাংলা উইকিপিডিয়ার তিনটি নিবন্ধ অনুযায়ী রাঙামাটিতে প্রতিষ্ঠানটি হয় 1978 সালে, বান্দরবানে এর আঞ্চলিক কার্যালয় 1985 সালে, আর খাগড়াছড়িতে 2003 সালে। সালগুলোর পেছনে অন্য কোনো উৎস পাওয়া যায়নি, আর রাঙামাটির নিবন্ধের ভূমিকায় 1993 সালও লেখা আছে। আর্কাইভের মারমা-লেখায় একটি কাজের নমুনা মেলে: বান্দরবানের ইনস্টিটিউট প্রতি বছর দুই মাস মেয়াদি কোর্সে মারমা ভাষায় লিখতে-পড়তে শেখায় এবং মারমা ভাষায় সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
নাম নিয়ে একটি বিতর্ক আছে, যা এখানে দুই পক্ষের কথা হিসেবেই রাখা হলো। আইনের নাম “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান”, আর সংজ্ঞা-ধারায় লেখা “আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী”। আর্কাইভে মঙ্গল কুমার চাকমার আদিবাসী জাতিসমূহের সাংস্কৃতিক অধিকার ও বর্তমান অবস্থা প্রবন্ধের দাবি, প্রতিষ্ঠানগুলো হোক “আদিবাসী কালচারাল একাডেমি” নামে, এবং সংখ্যায় আরও বেশি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি নিয়ে বই আকারে পড়তে চাইলে ইবুক লাইব্রেরিতে আছে: পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি ও সংস্কৃতি (সুগত চাকমা) · পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও সংস্কৃতি (সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা) · চাকমা সংস্কৃতি (ইন্দ্রলাল চাকমা) · চাকমা সমাজ ও সংস্কৃতি (বঙ্কিম চন্দ্র চাকমা) · আদিবাসী সংস্কৃতি (সম্পাদক মুস্তাফা মজিদ) · আরণ্য সংস্কৃতি (আবদুস্ সাত্তার)।
আর্কাইভের লেখাগুলোতে হারানোর কথা আসে নাম ধরে, সাধারণ আক্ষেপ হিসেবে নয়। ককবরকভাষীদের মুরি নামের বাদ্যযন্ত্রটি হারিয়ে গেছে, চাকমাদের ভাত-দ্যা পূজা গত শতাব্দীর মাঝামাঝি বিলুপ্ত, পাংখোয়া তরুণেরা আদিকালের গান চেনেন না, আর চাকদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলংকার বিলুপ্তির পথে বলে লেখা আছে।
| জনগোষ্ঠী | কী বদলেছে বা হারিয়েছে | কোন লেখায় |
|---|---|---|
| চাকমা | গোত্র-পূজা ভাত-দ্যা গত শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে বিলুপ্ত; থানমানা ও ধর্মকাম এখন কালেভদ্রে; পুরনো পুরোহিত লুরি বা রুরি প্রায় লুপ্ত | চাকমা জাতি |
| চাকমা | নিজস্ব লিপি আছে, তবে এখন সাধারণত বাংলা অক্ষরেই লেখা হয় | বাংলাপিডিয়া: Chakmas |
| মারমা | পুরুষের ধোয়াঃ-এর জায়গায় লুঙ্গি ও শার্ট; ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে; ঙ্চোয়ে আকাহ্ নৃত্যের প্রচলন এখন তেমন নেই | মারমা জাতির আদ্যোপান্ত |
| ত্রিপুরা | কয়েকটি গীতিকাব্য সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে; মুরি যন্ত্রটি অনেক আগেই হারিয়েছে; লোকবাদ্যযন্ত্রের জীবিত শিল্পীদের কাছ থেকে শিখতে নবীনেরা আসছেন না | ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত; ককবরক সঙ্গীত অতীত ও ভবিষ্যৎ |
| তঞ্চঙ্গ্যা | স্বর্ণালংকার চালু হওয়ায় রুপার অলংকার বিলোপের পথে; বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ব্যবহার কমছে | তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত; বাংলাপিডিয়া: Tanchangya |
| পাংখোয়া | আদিকালের গান এখনকার ছেলেমেয়েরা জানেন না; ঐতিহ্যবাহী পোশাক সমাজে আর দেখা যায় না; পুরনো পূজাগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ | পাংখোয়া জাতির আদ্যাপান্ত |
| খুমী | লোকগীতির চর্চা খুব কম মানুষ করছেন; গো-হত্যা অনুষ্ঠান ও নবান্ন উৎসব দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে; রাজকীয় গো-হত্যা অনুষ্ঠান প্রায় হয় না | খুমী জাতির আদ্যোপান্ত |
| চাক | ধুতি, কানের দুল নাতং ফ্র, পাগড়ি ও বক্ষবন্ধনীর ব্যবহার কমেছে; পেশাদার নাট্যানুষ্ঠানের ধারা 1970-এর দশক পর্যন্ত চালু ছিল, এখন নিজ ভাষায় নাচ-গানের চর্চা আবার দেখা যাচ্ছে | চাক জাতির আদ্যোপান্ত |
| অহমিয়া | পার্বত্য চট্টগ্রামের অহমিয়ারা মূল কাছারি ভাষায় আর কথা বলেন না | অহমিয়া জাতির আদ্যোপান্ত |
সব বদল ক্ষয় নয়। চাক-লেখা জানাচ্ছে, আগে চাকদের নাচ, গান ও নাট্যানুষ্ঠানের বেশিরভাগ বর্মী ও রাখাইন ভাষায় হতো, এখন নিজস্ব ভাষায় হয়। চাকমা-লেখা অনুযায়ী 1970-এর দশকে রাঙামাটিতে একসঙ্গে কয়েকটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে ওঠে, আর আধুনিক চাকমা গান, কবিতা ও নাটকের চর্চা তখন থেকেই বাড়ে। ভাষা ও লিপির অবস্থা নিয়ে আলাদা লেখা আছে: পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা: লিপি, কর্মসূচি ও বাস্তবতা।
সংস্কৃতির প্রশ্নকে অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে দেখেছে আর্কাইভের দুটি প্রবন্ধ, এবং দুটিই লেখকের নিজের অবস্থান থেকে লেখা। সজীব চাকমার সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক অধিকার (2013) প্রবন্ধে 1997 সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সংস্কৃতি-সংক্রান্ত ধারার উল্লেখ আছে এবং লেখকের অভিযোগ, চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি। মঙ্গল কুমার চাকমার প্রবন্ধটি শেষ হয়েছে একটি দাবিনামা দিয়ে, যার মধ্যে আছে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও চুক্তির বাস্তবায়ন। রাষ্ট্রের অবস্থান আইনের ভাষায় ধরা আছে উপরের প্রতিষ্ঠান-অংশে; এই পাতা দুই অবস্থানের কোনোটির পক্ষ নেয়নি।
বৈসাবি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি বর্ষবরণ উৎসবের যৌথ নাম: ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু। তিন নামের প্রথম অক্ষর জুড়ে শব্দটি তৈরি। উৎসব হয় বাংলা বছরের শেষ দুই দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিনে, মোট তিন দিন। তঞ্চঙ্গ্যারা একই সময়ে বিষু, চাকরা সাংগ্রাইং ও খুমীরা সাংক্রাই পালন করেন।
না। সময় এক হলেও উৎসব আলাদা। চাকমাদের বিজুর তিন দিন ফুলবিজু, মূলবিজু ও গোজ্যাপোজ্যা দিন; ত্রিপুরাদের বৈসুর তিন দিন হারি বৈসু, বৈসুমা ও বিসিকাতাল। মারমাদের সাংগ্রাইয়ে প্রথম দিন বৌদ্ধ মন্দির পরিষ্কার, শীল গ্রহণ ও বুদ্ধমূর্তি স্নান হয়, পরের দিনগুলোতে হয় মৈত্রী পানি বর্ষণ। দিনের নাম ও আচার-ক্রম জনগোষ্ঠীভেদে আলাদা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইনে 11টি জনগোষ্ঠীর নাম আছে: চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখোয়া, খিয়াং, ম্রো, বম, খুমী ও চাক। আইনে কয়েকটি বানান আলাদা, যেমন তনৈচংগা, পাংখো ও বোম। প্রত্যেকের ভাষা, উৎসব ও পোশাকের নাম আলাদা, তাই এক জনগোষ্ঠীর আচার অন্যের বেলায় খাটে না।
মারমা নারীর নিচের কাপড় থবিং বা থবিইং, প্রচলিত নাম থামি; বাংলাপিডিয়া দুটিকে একই পোশাকের নাম হিসেবে লিখেছে। উপরের ব্লাউজ বেঃদাইত আঙ্গি, বক্ষবন্ধনী রাংগাইত্, আর কোমরে রুপার বন্ধনী খাঃগ্রোঃ। অলংকারের মধ্যে আছে ন্দঙঃ (কানের দুল), লাক্কক্ (চুড়ি) ও ক্খ্যাঙঃ (পায়ের মল)। নামগুলো জুমজার্নাল আর্কাইভের মারমা জাতির আদ্যোপান্ত লেখা থেকে নেওয়া।
জুমজার্নাল আর্কাইভের চাকমা জাতি লেখা অনুযায়ী চাকমা নারীর নিচের কাপড় পিনোন, বক্ষবন্ধনী খাদি, আর মাথায় খবং; কাপড় বোনা হয় বেইন নামের কোমর তাঁতে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় চাকমা নারীরা লাল-কালো সারং, ব্লাউজ ও খাদি নামের ওড়না পরেন। অলংকারের মধ্যে আর্কাইভে নাম আছে হালছরা, তেঙাছড়া, কুজি খারু, নাগফুল ও থেংখারু।
পিনন হাদি চাকমা নারীর দুই অংশের পোশাকের জোড়া নাম। পিনন বা পিনোন কোমর থেকে নিচের অংশের কাপড়, আর হাদি বা খাদি উপরের অংশের। দুটিই বেইন নামের কোমর তাঁতে বোনা হয়। রাঙামাটির রাঙাপানি গ্রামের তাঁতিদের নিয়ে 2022 সালে প্রকাশিত একটি জরিপ অনুযায়ী একটি পূর্ণ পিনন সেট বুনতে 3 থেকে 4 সপ্তাহ লাগে।
বেইন চাকমা ভাষায় কোমর তাঁতের নাম; ইংরেজিতে backstrap loom। এতে কাঠের ফ্রেম নেই: সুতার এক প্রান্ত খুঁটিতে, অন্য প্রান্ত বেল্ট দিয়ে তাঁতির কোমরে বাঁধা থাকে, আর টান ঠিক রাখেন তাঁতি নিজের শরীর দিয়ে। চাকমা লেখায় এর সরঞ্জামকে বলা হয়েছে সজপদর। চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, খিয়াং ও পাংখোয়াদের কোমর তাঁতে বোনার কথা উৎসে আছে।
ম্রো নারীর প্রধান পরিধেয় ওয়ানক্লাই; বাংলাপিডিয়ায় বানান ওয়াঙলাই। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর প্রস্থ 6 ইঞ্চি এবং মাঝখানে এমব্রয়ডারি থাকে; বাংলা উইকিপিডিয়ায় প্রস্থ 8 থেকে 10 ইঞ্চি। ম্রো লেখক সিংইয়ং ম্রোর বর্ণনায় জুমে ফলানো স্রাম নামের উদ্ভিদ সেদ্ধ করে সুতা কালো রং করে ওয়ানক্লাই তৈরি হয়। ম্রো পুরুষ পরেন নেংটি, বাজারে গেলে লুঙ্গি ও জামা।
সিদোল হলো সমুদ্রের ছোট মাছ ও চিংড়ি গুঁড়ো করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি মণ্ড; আর্কাইভের চাকমা জাতি লেখা অনুযায়ী কক্সবাজার উপকূলের রাখাইনরা এটি তৈরি করেন। নাপ্পিকে আর্কাইভের আরেক লেখায় বলা হয়েছে একধরনের প্রক্রিয়াজাত শুঁটকি, যা কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর রাখাইনরা উৎপাদন করেন। মারমা লেখায় নাম ঙাপ্পি। দুটি হুবহু একই জিনিস কি না, কোনো উৎস স্পষ্ট করেনি।
পাজন চাকমাদের বিজুর পরিচিত তরকারি; রান্না হয় ন্যূনতম 5 পদের সবজি দিয়ে, সঙ্গে শুঁটকি বা শুকনো মাছ। আর্কাইভের চাকমা জাতি লেখা অনুযায়ী অনেক সময় 100 পদের বেশি সবজিও দেওয়া হয়। একই লেখা নামটির সম্ভাব্য উৎস হিসেবে পাঁচ অন্ন বা পাঁচনের কথা বলেছে, তবে নিশ্চিত করে নয়। ত্রিপুরাদের বৈসুমার দিনেও অতিথিদের পাঁচন পরিবেশন করা হয়।
প্রতিটি জনগোষ্ঠীর যন্ত্রের নাম আলাদা। চাকমা: ধুদুক, হেঙগরঙ, শিঙা, ঢুল, ডগর, সারিন্দ্যা, তাক। মারমা: খরা, মঙঃ, প্যাহ্, হ্নেঃ, চে। ত্রিপুরা: সারিন্দা, সুমুই, চংপ্রেং, খাম, ওয়াখপ। বম: রিরৎ, মিমীম, জলপাল। পাংখোয়া: সিয়াল রাকি, খোয়াং, রুয়া টিংটাং। চাক: বাইক, হ্নে, লাংহোয়াক। ম্রোদের বাঁশের নলের যন্ত্র প্লুং। খিয়াং ও লুসাইদের যন্ত্রের নাম কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
গরিয়া বা গরয়া নৃত্য ত্রিপুরাদের। আর্কাইভের ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত লেখা অনুযায়ী বৈসুর প্রথম দিন হারি বৈসু থেকে এটি শুরু হয় এবং টানা 5 থেকে 7 দিন গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঢোল ও বাঁশি বাজিয়ে পরিবেশিত হয়। নাচের দৃশ্যগুলো জুম কাটা, বীজ বোনা, ধান কাটা, সুতা কাটা ও কাপড় বোনার মতো কাজ নিয়ে সাজানো।
কঠিন চীবর দান হয় আশ্বিনী বা প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে কার্তিকী পূর্ণিমা পর্যন্ত এক মাসের মধ্যে। এতে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চীবর, অর্থাৎ পরিধেয় বস্ত্র দান করা হয়। মারমারা একে বলেন কঠিং বোওয়ে, চাকরা কাথিং পোয়ে। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ধর্মীয় উৎসবের তালিকাতেও এটি আছে। চাকরা এ সময় প্যাডেছা নামে কল্পতরু গাছ বানিয়ে দান করেন।
গেংখুলি হলেন চাকমা চারণ কবি, যাঁরা পুরুষানুক্রমে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সুর করে পালা গান। সবচেয়ে পরিচিত পালা রাধামন-ধনপুদি; আর্কাইভে চাদিগাং ছাড়া, লোরবো মিদুঙি, লক্ষ্মী ও লাঙ্যা-লাঙনী পালার নামও আছে। তঞ্চঙ্গ্যা গেঙ্গুলীরাও বেহালা বাজিয়ে একই পালা গান। জুমজার্নালের গেংখুলি-বিষয়ক লেখায় উদ্ধৃত প্রথম আলোর 2023 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী রাধামন-ধনপুদি পালা সাত দিন সাত রাত ধরে গাওয়া হয়।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, 2010-এর ধারা 4-এ নাম ধরে 7টি প্রতিষ্ঠান আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে 3টি: রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট। বাকি 4টি নেত্রকোণার বিরিশিরি, কক্সবাজার, রাজশাহী ও মৌলভীবাজারে। একই ধারায় সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনে আরও প্রতিষ্ঠান ঘোষণা করতে পারে; পরে যোগ হওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা জানা যায়নি।
এই পাতার প্রায় সব নাম এসেছে জুমজার্নালের আর্কাইভে থাকা জনগোষ্ঠী-পরিচিতি লেখাগুলো থেকে, সঙ্গে বাংলাপিডিয়া ও বাংলা উইকিপিডিয়া। তাই অনেক নামের পেছনে স্বাধীন উৎস আসলে একটি বা দুটি। নিচের ফাঁকগুলো সেই সীমারই হিসাব।
জুমজার্নাল আর্কাইভ (প্রাথমিক উৎস)
আইন
বাংলাপিডিয়া ও উইকিপিডিয়া
গবেষণাপত্র
সর্বশেষ হালনাগাদ: 19 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।