Jumjournal Logo

প্রথাগত আইনে আদিবাসী তঞ্চঙ্গ্যা নারীর অবস্থান

Last updated Oct 6th, 2026

1

তঞ্চঙ্গ্যা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

নোটারি পাবলিকের ঘরে হলফনামার কাগজে একজন তঞ্চঙ্গ্যা নারী সই করছেন। কাগজে লেখা আছে তাঁর বিবাহ-বিচ্ছেদের কথা। কাজটি আইনসিদ্ধ, সমাজও মেনে নেবে — কিন্তু যে বিধিমালা আজও পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ভিত্তি, সেই ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি তাঁর সমাজের বিবাহ বা বিচ্ছেদ নিয়ে একটি শব্দও বলে না।

এই ফাঁকটাই এই লেখার বিষয়। তঞ্চঙ্গ্যা নারীর বিবাহ, বিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকার — তিনটিই চলে প্রথাগত আইনে, যা লিখিত নয়, সংসদে পাস হয়নি, তবু কাজ করে। আর যেখানে প্রথাগত আইন থামে, সেখানে রাষ্ট্রীয় আইন শুরু হয় না — একটা শূন্যস্থান থেকে যায়।

পরিবারের ভেতরে নারী কোথায় দাঁড়ান

তঞ্চঙ্গ্যা পরিবারের গঠন বোঝা দরকার আগে, কারণ প্রথাগত আইনে অধিকার ব্যক্তির নয় — পরিবারের ভেতরে ব্যক্তির অবস্থানের।

জুমজার্নালের আর্কাইভে তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায় পরিবারের কয়েকটি ধরন আলাদা করে দেখানো হয়েছে — কর্তা, স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের নিয়ে ছোট পরিবার; তার সঙ্গে নির্ভরশীল পিতামাতা যুক্ত হলে বড় পরিবার। কর্তার পদটি পুরুষের। নারী পরিবারের সদস্য, কিন্তু কর্তা নন।

এটি নিছক পারিবারিক বিন্যাস নয়। কর্তা কে, তার উপরই নির্ভর করে সামাজিক আদালতে কে কথা বলবেন, জুমের কর কার নামে জমা হবে, আর সম্পত্তির হিসাব কার হাতে থাকবে। নারীর অবস্থান তাই শুরুতেই একধাপ পিছিয়ে থাকে — নিয়মে নিষেধ থাকার কারণে নয়, কাঠামোর কারণে।

পরিবারের পাঁচটি ধরন, আর তাতে নারীর অবস্থান

উৎসে তঞ্চঙ্গ্যা পরিবারের গঠন পাঁচ ভাগে বর্ণনা করা হয়েছে। তালিকাটি শুকনো মনে হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ধাপে নারী কোথায় বসছেন, সেটিই আসলে বলা হচ্ছে:

  1. কর্তা, স্ত্রী এবং অবিবাহিত পুত্র-কন্যাগণ।
  2. কর্তা, অবিবাহিত পুত্র-কন্যা, নির্ভরশীল পিতামাতা এবং অবিবাহিত আত্মীয়গণ (যদি থাকে)।
  3. কর্তা, স্ত্রী, একজন বিবাহিত পুত্র ও তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যাগণ।
  4. বিবাহিত আত্মীয়গণ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নন।
  5. তঞ্চঙ্গ্যা পরিবার পিতৃতান্ত্রিক।

প্রথম তিনটি ধরনেই তালিকা শুরু হয় ‘কর্তা’ দিয়ে, আর স্ত্রী আসেন তাঁর পরে। চতুর্থ শর্তটি বলে দেয়, বিয়ের পর ব্যক্তি আর মূল পরিবারের অংশ থাকেন না। আর পঞ্চম বাক্যটি — তঞ্চঙ্গ্যা পরিবার পিতৃতান্ত্রিক — উৎসেরই ভাষা, আমার ব্যাখ্যা নয়।

কোন পুত্র ঘরে থাকেন, আর তার ফল

উৎসে একটি নির্দিষ্ট রীতির উল্লেখ আছে যা উত্তরাধিকারের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ: গৃহকর্তার একাধিক পুত্রসন্তান থাকলে কেবল একজন বিবাহিত পুত্র পরিবারে থাকেন; বাকিরা বিয়ের পর অন্যত্র ঘর তুলে আলাদা সংসার গড়েন। উৎসে এর কারণ হিসেবে বসতঘরের গঠন ও জায়গার সংকুলানের কথা বলা হয়েছে।

নাবালক পুরুষ আত্মীয়দের ক্ষেত্রেও একই — বিয়ে হয়ে গেলে তাঁরা অন্যত্র ঘর বাঁধেন।

এই ব্যবস্থার তিনটি ফল নারীর দিক থেকে দেখা যায়।

প্রথমত, যে পুত্র ঘরে থাকেন, তাঁর স্ত্রী শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সদস্য হন এবং নির্ভরশীল পিতামাতার দেখাশোনার দায়িত্ব কার্যত তাঁর উপরেই বর্তায়। যাঁরা আলাদা হন, তাঁদের স্ত্রীদের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব নেই।

দ্বিতীয়ত, কন্যার জন্য কোনো সমান্তরাল ব্যবস্থা এই তালিকায় নেই। অবিবাহিত কন্যা পরিবারের সদস্য, বিবাহিত কন্যা নন — কিন্তু ‘বিবাহিত কন্যা ঘরে থাকতে পারেন’ এমন কোনো ধরন উৎসে বর্ণিত হয়নি।

তৃতীয়ত, ভাই না থাকলে কন্যা উত্তরাধিকারী হন — এই যে নিয়মটি আগে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি এই আবাস-কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে অর্থ বদলে যায়। ভাই না থাকা মানে কেবল উত্তরাধিকারী না থাকা নয়, বাড়িতে থেকে যাওয়ার মতো কোনো পুত্রও না থাকা। অর্থাৎ কন্যার অধিকারটি সম্ভবত শূন্যস্থান পূরণের ব্যবস্থা, স্বতন্ত্র প্রাপ্যতার স্বীকৃতি নয়।

এই শেষ ব্যাখ্যাটি আমার পাঠ — উৎস এভাবে বলেনি। ভাইহীন কন্যা বিয়ের পর স্বামীসহ পিতৃগৃহে থাকেন কি না, তার কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি। [যাচাই প্রয়োজন]

যৌথ পরিবার কমে আসার প্রভাব

উৎস জানাচ্ছে, তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে একক ও যৌথ দুই ধরনের পরিবারই ছিল, তবে যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে যৌথ পরিবার এখন নেই বললেই চলে।

এর প্রভাব দুই দিকেই যেতে পারে, আর উৎস কোনো দিকেই রায় দেয়নি। একক পরিবারে গৃহকর্তার সরাসরি কর্তৃত্বের বাইরে দাঁড়ানোর সুযোগ বাড়ে; আবার যৌথ পরিবারের ভেতরে যে পারস্পরিক নির্ভরতা ও সুরক্ষা ছিল, বিধবা বা পরিত্যক্ত নারীর জন্য সেটি হারানোও ক্ষতি। কোনটি বেশি ঘটেছে, তা নির্ধারণের মতো তথ্য এই গবেষণায় পাওয়া যায়নি।

তঞ্চঙ্গ্যা নারীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ

বিবাহের তিনটি ধরন, আর বিধবা বিবাহের স্বীকৃতি

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে বিবাহ এক রকম নয়। আর্কাইভের বিবরণে তিনটি ধরন আলাদা করা হয়েছে:

  • কন্যার গৃহে বরকে নিয়ে সামাজিক বা নিয়মিত বিবাহ — পূর্ণ সামাজিক স্বীকৃতিসহ, আয়োজন কন্যার বাড়িতে
  • অনিয়মিত বিবাহ — সামাজিক আচার সম্পূর্ণ না হলেও পরে স্বীকৃতি পাওয়ার পথ থাকে
  • রানী মেলার সাঙা — বিধবা বিবাহ

শেষেরটি আলাদা করে খেয়াল করার মতো। বিধবা বিবাহের একটি নিজস্ব নাম থাকা মানে সেটি ব্যতিক্রম হিসেবে সহ্য করা হয় না, বরং সমাজের চেনা একটি পথ। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক সমাজে বিধবার পুনর্বিবাহ নিয়ে যে দীর্ঘ নিষেধের ইতিহাস, তার তুলনায় এটি একটি নির্দিষ্ট, বলার মতো তথ্য।

তবে একটি প্রশ্নের উত্তর আর্কাইভে নেই: এই তিন ধরনের বিবাহে কন্যার সম্মতি কীভাবে নেওয়া হয়, আর অসম্মতি জানানোর পথ কী। বিবাহ কন্যার গৃহে হওয়া আর কন্যার সম্মতিতে হওয়া এক জিনিস নয়। [যাচাই প্রয়োজন]

গসা ও গুত্তি: বিবাহের সীমা কে ঠিক করে

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে কে কাকে বিয়ে করতে পারবেন, তা কেবল দুই পরিবারের সম্মতির প্রশ্ন নয় — গোষ্ঠী-কাঠামোই সীমা টেনে দেয়। এই কাঠামোর দুটি স্তর: গসা এবং তার ভেতরে গুত্তি।

উৎসের ভাষায়, তঞ্চঙ্গ্যাদের মোট বারোটি গোত্র আছে এবং কথ্য ভাষায় গোত্রকে ‘গসা’ বলা হয়। প্রতিটি গসা আবার একাধিক গুত্তিতে বিভক্ত।

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি: তঞ্চঙ্গ্যাদের বংশ পরিচয় পিতসূত্রীয় — অর্থাৎ সন্তান গসা ও গুত্তির পরিচয় পান পিতার কাছ থেকে, মাতার কাছ থেকে নয়। একই উৎস আরও সরাসরি বলছে, তঞ্চঙ্গ্যা পরিবার পিতৃতান্ত্রিক।

এই একটি বাক্য গোটা লেখার কাঠামো ব্যাখ্যা করে দেয়। বিবাহের পর নারী স্বামীর পরিবারে যান, কিন্তু তাঁর সন্তানেরা পান স্বামীর গসা — নারীর নিজের গসা পরের প্রজন্মে যায় না। ফলে ভূমি ও পদের উত্তরাধিকার যে পুরুষের ধারায় চলে, সেটি বিচ্ছিন্ন কোনো রীতি নয়; পুরো বংশপরিচয়ের ব্যবস্থাটিই ওই ধারায় গাঁথা।

বারোটি গসা ও তাদের গুত্তি

উৎসে সংকলিত তালিকাটি নিচে দেওয়া হলো। এটি তঞ্চঙ্গ্যা সমাজকাঠামোর একটি প্রাথমিক নথি, আর বিবাহের সীমা বুঝতে এটিই ভিত্তি।

ক্রমগসাগুত্তি
১মোয় গসাতাসি, দাল্লোয়া, আগারা, কুরুগা, গন্যা, আগা, খুসসা, কবাল্যে
২কারওয়া গসাআরওয়া, গসাল্যা, বলা, বাংগাল্যে, ফ্রাংসা, লাম্বায়া, বকচারা, বুং, লাপস্যা, যৌ
৩ধন্যা গসাপিসো, পোসোই, বাংগাল্যা, বলাহ, বান্দব্যা, রাংগা, কালামেলা, কালাথংসা, রাংগাকাংগারা, বউ, কালাংসা, পন্ডিত, কাট্টল্যা, দাল্লোয়া, তান্ন্যাবো, আমিলা, বগা, বন্দুগ
৪লাংবাসা গসাসক্যা, বলাহ, লাম্বাইয়া, কারু, বেদাব, আবাংগ্যা, পায়া
৫মেলং গসাআমিলা, টেমেলে, আলু, পাকতা, রানদাঙ্গর
৬মংলা গসাপালংসা, ভাবুন্যা, কালাইয়া, দেবা, নালাবা, নাবানা
৭অঙ্গয়া গসাউৎসে পৃথকভাবে তালিকাভুক্ত নয়
৮তাসিস গসাউৎসে পৃথকভাবে তালিকাভুক্ত নয়
৯রাংগ্যা গসাউৎসে পৃথকভাবে তালিকাভুক্ত নয়
১০লাপোস্যা গসাউৎসে পৃথকভাবে তালিকাভুক্ত নয়
১১মুলিমা গসাউৎসে পৃথকভাবে তালিকাভুক্ত নয়
১২ওয়াহ্ গসাউৎসে পৃথকভাবে তালিকাভুক্ত নয়

তালিকাটি হুবহু উৎস অনুসরণ করে দেওয়া হয়েছে, সম্পাদনা করে মসৃণ করা হয়নি। দুটি অসঙ্গতি পাঠকের জানা থাকা দরকার। প্রথমত, উৎসের প্রথম তালিকায় ক্রমসংখ্যা ৫ ও ১০ বাদ পড়েছে, কিন্তু মোট সংখ্যা বারো বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কয়েকটি গসার নাম দুই জায়গায় সামান্য ভিন্ন বানানে এসেছে — যেমন ‘লাং গসা’ ও ‘লাংবাসা গসা’। এই অসঙ্গতিগুলো উৎসের, আর সেগুলো এখানে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

লক্ষণীয়, কয়েকটি গুত্তির নাম একাধিক গসায় ফিরে আসে — যেমন দাল্লোয়া গুত্তি আছে মোয় ও ধন্যা দুই গসাতেই, বলাহ আছে লাংবাসা ও ধন্যায়, আমিলা আছে ধন্যা ও মেলংয়ে। একই নামের গুত্তি ভিন্ন গসায় থাকলে বিবাহের নিষেধ প্রযোজ্য হয় কি না, উৎস তা স্পষ্ট করে না। [যাচাই প্রয়োজন]

এই কাঠামো কি দৈংনাকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য

একটি সীমা এখানেই বলে রাখা দরকার। আরাকানে বসবাসকারী দৈংনাক জনগোষ্ঠীকে উৎসে তঞ্চঙ্গ্যাদেরই একটি বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে, আর বলা হয়েছে এই অঞ্চলের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে কম করে হলেও প্রায় ৩০০ বছর।

এই লেখায় বর্ণিত গসা-গুত্তি কাঠামো, তিন পুরুষের নিষেধ, সা-চি ও বাপদিন্যা — সবই এপারের তঞ্চঙ্গ্যা সমাজের বিবরণ থেকে নেওয়া। তিনশ বছরের বিচ্ছিন্নতার পর দৈংনাক সমাজে এই একই নিয়ম একইভাবে চলে কি না, উৎস তা বলে না, আর অনুমান করাও ঠিক হবে না।

প্রসঙ্গত, দৈংনাকদের প্রথম লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় আর্থার ফেইরির ১৮৪১ সালের নিবন্ধ An Account of Arakan-এ, যেখানে তিনি লেখেন তাঁরা নিজেদের ‘খেইমবা-নাগো’ বলে পরিচয় দেন। ফেইরি অনুমান করেছিলেন তাঁরা দাস হিসেবে আনীত বাঙালিদের বংশধর এবং জলবায়ুর প্রভাবে তাঁদের দৈহিক গঠন বদলে গেছে।

উৎসেই এই অনুমান খণ্ডন করা হয়েছে — জলবায়ু পরিবর্তনে কোনো জনগোষ্ঠীর দৈহিক গঠন ও আকৃতি বদলে যায় না, এবং শত শত বছর পাশাপাশি বাস করেও এমন রূপান্তরের কোনো দৃষ্টান্ত নেই। ‘খেইমবা-নাগো’ শব্দটির ব্যাখ্যা হিসেবে অশোক কুমার দেওয়ানের প্রস্তাব, দোভাষীর উচ্চারণে ‘চম্পকনগর’ শব্দটি বিকৃত হয়ে ফেইরির নোটে ওই রূপ নিয়েছিল — যা তিনি নিজেই স্পষ্ট করে নিছক অনুমান বলে চিহ্নিত করেছেন।

প্রথাগত আইন নিয়ে লিখতে গেলে এই সতর্কতা জরুরি: ঔপনিবেশিক আমলের প্রথম বিবরণগুলোই পরবর্তী বহু লেখার ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, অথচ সেগুলো লেখা হয়েছিল দোভাষীর মাধ্যমে, ভাষা না জেনে, এবং বহু ক্ষেত্রে ভুল অনুমানসহ।

তিন পুরুষের নিয়ম

বিবাহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধটি এই কাঠামো থেকেই আসে: একই গুত্তির আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ, যতক্ষণ না গোত্রভেদে তিন পুরুষ অতিক্রান্ত হয়।

এটি নারীর অবস্থানের প্রশ্নে সরাসরি প্রাসঙ্গিক, দুই কারণে। প্রথমত, বিবাহযোগ্য পাত্র-পাত্রীর তালিকা আগেই সংকুচিত হয়ে যায় — পছন্দের পরিসর ব্যক্তির নয়, কাঠামোর। দ্বিতীয়ত, এই হিসাব রাখেন ও প্রয়োগ করেন সমাজের প্রবীণ ও সমাজপতিরা, যাঁরা কার্যত সবাই পুরুষ।

নিষেধটি কার্যত এক-প্রজন্মের নয়, বরং কয়েক প্রজন্ম পিছিয়ে গিয়ে আত্মীয়তার হিসাব কষার দাবি রাখে। আর যেহেতু গুত্তি-পরিচয় পিতার ধারায় চলে, সেই হিসাবটিও পিতৃবংশ ধরেই রাখা হয়। মাতৃবংশের দিক থেকে তিন পুরুষের নিয়ম একইভাবে প্রযোজ্য কি না, উৎস তা বলে না। [যাচাই প্রয়োজন]

‘রানী মেলা’ শব্দটি কোথা থেকে

বিধবা বিবাহের নামটির উৎস আর্কাইভেই ব্যাখ্যা করা আছে — তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিধবা নারীকে বলা হয় ‘রানী’ বা ‘রানী মেলা’, আর সেখান থেকেই ‘রানী মেলার সাঙা’। অর্থাৎ নামটি নেতিবাচক নয়; বিধবাকে চিহ্নিত করার জন্য সমাজে একটি স্বাভাবিক শব্দ আছে, আর তাঁর পুনর্বিবাহের জন্যও।

তঞ্চঙ্গ্যা গসা ও গুত্তির পরিচিতি — বিবাহের সীমা এই কাঠামোই ঠিক করে। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ

সা-চি: বিচ্ছেদের তিনটি পথ

স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করাকে তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে বলা হয় ‘সা-চি’। আর্কাইভের বিবরণ অনুযায়ী জীবদ্দশায় সা-চি হতে পারে তিনটি উপায়ে:

  1. সামাজিক আদালত — স্বামী বা স্ত্রী, যে কেউ আদালতের দ্বারস্থ হয়ে সিদ্ধান্তের মাধ্যমে
  2. বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম — রাষ্ট্রীয় আদালতের আওতায়
  3. হলফনামা — ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিকের কাছে; বিবরণে বলা হয়েছে এটি ‘ইদানীং শিক্ষিত সমাজে’ প্রচলিত

এখানে নারীর অবস্থানের দিক থেকে দুটি কথা বলা যায়, আর একটি বলা যায় না।

যা বলা যায়: বিবরণে বিচ্ছেদের সূচনার অধিকার স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই — ‘স্বামী কিংবা স্ত্রী যে কোনো একজন’। অর্থাৎ নিয়মে নারীর জন্য দরজা বন্ধ নয়। আর তৃতীয় পথটি — হলফনামা — সামাজিক আদালতকে পাশ কাটিয়ে যায়, যেখানে বিচারকেরা সবাই পুরুষ।

যা বলা যায় না: বাস্তবে তিনটির মধ্যে কোনটি নারীরা কত বার ব্যবহার করেন। কোনো সংখ্যা নেই — না আর্কাইভে, না কোনো প্রকাশিত সমীক্ষায় যা এই লেখার জন্য পাওয়া গেছে। [যাচাই প্রয়োজন]

স্ত্রী কোন কোন কারণে নিজে আদালতে যেতে পারেন

এতক্ষণ কেবল পদ্ধতির কথা হলো। কিন্তু আর্কাইভের বিবরণে নির্দিষ্ট কারণও লেখা আছে, যেগুলোর ভিত্তিতে স্ত্রী নিজে সমাজপতি বা কার্বারি-হেডম্যান আদালতে যেতে পারেন। এগুলো নারীর অবস্থানের প্রশ্নে সবচেয়ে বাস্তব অংশ, কারণ এখানে অধিকারটি কেবল কাগুজে নয় — কারণসহ নির্দিষ্ট।

এক — দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের দাবি। বিবাহের পর স্বামী যদি বৈবাহিক সম্পর্ক অগ্রাহ্য করেন বা অব্যাহত না রাখেন, অথবা ভরণপোষণ দিতে বিরত থাকেন, তবে স্ত্রী তাঁর দাম্পত্য সম্পর্ক ও দাবি পুনরুদ্ধারের জন্য মামলা করার অধিকার রাখেন।

খেয়াল করার মতো, এটি বিচ্ছেদের মামলা নয় — বরং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দাবি। ভরণপোষণ বন্ধ করে দেওয়াকে এখানে অন্যায় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, আর তার প্রতিকার চাওয়ার পথ নারীর হাতেই রাখা হয়েছে।

দুই — বিচ্ছেদের অধিকার। স্বামী যদি নপুংসক হন, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন, কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীন হন — এই তিন অবস্থায় স্ত্রী সমাজপতি বা কার্বারি-হেডম্যান আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকারী।

অর্থাৎ প্রথাগত আইনে নারীর জন্য দুটি আলাদা পথ রাখা আছে: সম্পর্ক ফিরে পাওয়ার, আর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার। দুটিই তাঁর নিজের উদ্যোগে শুরু হতে পারে।

তবে সীমাটিও স্পষ্ট। দুটি পথই গিয়ে থামে সেই আদালতে, যেখানে বিচারকের আসনে নারী নেই — পরের অংশে সেই প্রসঙ্গ।

বাপদিন্যা: কন্যা কখন উত্তরাধিকারী হন

পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারকে তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে বলা হয় বাপদিন্যা। আর্কাইভের লেখাটি একটি জরুরি পটভূমি দেয়: জুমচাষভিত্তিক সমাজে স্থাবর সম্পত্তির ধারণাই দেরিতে তৈরি হয়েছে। জুমের জমি বছর বছর বদলায়, তাই স্থায়ী মালিকানার প্রয়োজন আগে তেমন ছিল না। জুমভূমির অপ্রতুলতা আর উদ্যান-কৃষির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এখন সেই প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

এই পটভূমিতেই কন্যার প্রশ্নটি আসে। International Journal of Research and Innovation in Social Science-এ প্রকাশিত বিলাশী শাহা ও ড. আনিসুর রহমানের লেখায় তঞ্চঙ্গ্যা নিয়ম সম্পর্কে বলা হয়েছে — কন্যা সম্পত্তির অংশ দাবি করতে পারেন কেবল তখনই, যখন তাঁর কোনো ভাই নেই।

একই লেখায় তুলনার জন্য দুটি প্রতিবেশী সমাজের কথা আছে: চাকমা সমাজেও পুত্র বা পুত্রের পুত্র না থাকলে কন্যা উত্তরাধিকারী হন; আর মারমা সমাজে কন্যারা সাধারণত ভূমি পান না, বিবাহে ব্যক্তিগত জিনিস ও উপহার পান।

একটি সতর্কতা এখানেই বলে রাখা ভালো: ওই প্রবন্ধটি ১৭টি সূত্রের গ্রন্থপঞ্জি দিলেও এই প্রথাগত-আইনের দাবিগুলোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট নৃতাত্ত্বিক সমীক্ষা উল্লেখ করেনি — দ্বিতীয় স্তরের সূত্রের উপর নির্ভর করেছে। তাই “ভাই না থাকলে কন্যা” নিয়মটি এখানে প্রকাশিত দাবি হিসেবে রাখা হলো, মাঠপর্যায়ে যাচাই হওয়া নিয়ম হিসেবে নয়।

দশটি জনগোষ্ঠীর তুলনা: কন্যা কখন উত্তরাধিকারী

তঞ্চঙ্গ্যা নিয়মটি একা দাঁড়িয়ে বোঝা যায় না। পাশের সমাজগুলোর সঙ্গে রেখে দেখলে বোঝা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে কন্যার উত্তরাধিকার একরকম নয় — এক প্রান্তে নির্দিষ্ট ভাগ, অন্য প্রান্তে সম্পূর্ণ নিষেধ।

নিচের ছকটি জুমজার্নালের নিজস্ব নয়টি প্রথাগত-আইন পোস্ট থেকে সংকলিত, তঞ্চঙ্গ্যার তথ্য প্রকাশিত গবেষণা থেকে। এমন তুলনামূলক ছক কোথাও প্রকাশিত হয়নি।

জনগোষ্ঠী কন্যা স্থাবর সম্পত্তি পান? যেভাবে
খিয়াং (লাইতু শাখা)হ্যাঁ, নির্দিষ্ট ভাগেপুত্র ৩ ভাগের ২, কন্যা ২ ভাগের ১; পুত্র না থাকলে কন্যারাই সম্পূর্ণ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী
ত্রিপুরাকিছু গোত্রে হ্যাঁযাদুঙ, দেনদাউ, গাবিং গোত্রে মেয়েরা মায়ের বংশ পরিচয়ে পরিচিত এবং মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী
মারমাপুত্র না থাকলেস্ত্রী ও কন্যারা স্থাবর সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ; পুত্র থাকলে পান না
তঞ্চঙ্গ্যাভাই না থাকলেভাই থাকলে দাবি করতে পারেন না (প্রকাশিত দাবি, মাঠ-যাচাই নয়)
চাকপুত্র না থাকলেপুত্রের বর্তমানে কন্যারা ভূ-সম্পত্তি পান না
লুসাইসাধারণত নাকদাচিৎ পিতা-মাতা ভাগ দেন, তবে এমন ঘটনা অত্যন্ত নগণ্য
বমনা (স্থাবরে)পুত্রই আইনগত উত্তরাধিকারী; অস্থাবর সম্পত্তিতে কন্যা ও স্ত্রীর অধিকার স্বীকৃত; বিধবা অস্থাবরের ২৫%
চাকমানাকেবল দান, উইল, বা নিজের উপার্জনে অর্জিত সম্পত্তিতে অধিকার
ম্রোনাপুত্রহীন অবস্থাতেও নয় — সম্পত্তি যায় মৃতের পিতার কাছে, তারপর ভাইয়ের; দান বা উইল ব্যতিক্রম
খুমীনাদত্তক ও অবৈধ পুত্র পর্যন্ত পিতৃসম্পত্তি পান, ঔরসজাত কন্যা পান না

ছকটি যা দেখায়: দশটির মধ্যে তিনটিতে কন্যার স্থাবর সম্পত্তিতে কোনো অধিকারই নেই (চাকমা, ম্রো, খুমী); চারটিতে পুত্র বা ভাই না থাকলে অধিকার আসে (তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, মারমা, আংশিকভাবে খিয়াং); আর একটিমাত্র সমাজে — খিয়াংদের লাইতু শাখায় — পুত্র থাকা সত্ত্বেও কন্যার নির্দিষ্ট ভাগ আছে। ত্রিপুরাদের কয়েকটি গোত্রে মাতৃসূত্র চলে, যা এই অঞ্চলে ব্যতিক্রম।

তঞ্চঙ্গ্যা নিয়ম তাই বিচ্ছিন্ন কিছু নয় — এটি অঞ্চলের সবচেয়ে প্রচলিত ছাঁদের ভেতরেই পড়ে: পুত্র থাকলে কন্যা নয়, পুত্র না থাকলে কন্যা।

সূত্র: ছকের নয়টি সারি জুমজার্নালের প্রথাগত-আইন পোস্টগুলো থেকে সংকলিত (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, ম্রো প্রভৃতি); তঞ্চঙ্গ্যার সারি Shaha ও Rahman (2025) থেকে।

সামাজিক আদালতে নারীর জায়গা

প্রথাগত আইন কাগজে থাকে না, আদালতে থাকে — কার্বারি ও হেডম্যানের বিচারসভায়। তাই প্রশ্নটা কেবল নিয়ম কী বলে তা নয়, নিয়ম কে ব্যাখ্যা করেন তাও।

BRAC-এর গবেষণা বিভাগ থেকে ২০১১ সালে প্রকাশিত State of Justice in Chittagong Hill Tracts প্রতিবেদনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত ও রাষ্ট্রীয় — দুই ধরনের বিচারব্যবস্থাই সরেজমিনে দেখেছে। তার তিনটি পর্যবেক্ষণ এখানে সরাসরি প্রযোজ্য।

প্রথম: গবেষকেরা আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কোনো নারী কার্বারি বা হেডম্যান খুঁজে পাননি। প্রতিবেদনের ভাষায় প্রথাগত আদালতগুলো “dominated by all male jurors” — বিচারকের আসনে কেবল পুরুষ। ফলে নারীর অভিযোগ শুনছেন এমন কেউ, যিনি সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাননি।

দ্বিতীয়: শালিসে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আদিবাসী নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীন — প্রতিবেদন বলছে বাঙালি নারীদের চেয়ে বেশি, এবং ভয় বা সংকোচ ছাড়াই তাঁরা উপস্থিত হতে পারেন। কিন্তু উপস্থিত হওয়া আর কথা বলতে পারা এক নয়; প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ, তাঁরা যথেষ্টভাবে কথা বলে উঠতে পারেন না।

তৃতীয়, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: প্রতিবেদনটি বলছে পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর অধিকার রক্ষার জন্য নির্দিষ্ট কোনো প্রথাগত আইন নেই। অর্থাৎ প্রথাগত আইনে নারীর অবস্থান দুর্বল হওয়ার কারণ কেবল প্রয়োগের ঘাটতি নয় — রক্ষাকবচটিই অনুপস্থিত।

একটি সীমা বলে রাখা দরকার: প্রতিবেদনটি চাকমা, মারমা, ম্রো ও ত্রিপুরা সমাজের কথা নাম ধরে বলেছে, তঞ্চঙ্গ্যা সমাজকে আলাদা করে নয়। তঞ্চঙ্গ্যাদের বিচারসভাও কার্বারি-হেডম্যান কাঠামোর ভেতরেই চলে, তাই পর্যবেক্ষণগুলো সম্ভবত প্রযোজ্য — কিন্তু তঞ্চঙ্গ্যা-নির্দিষ্ট সমীক্ষা এটি নয়। [যাচাই প্রয়োজন]

যে বিধানটি সরাসরি ‘পুত্র’ লেখে

এতক্ষণের আলোচনায় ধরে নেওয়া হচ্ছিল, নারীর অনুপস্থিতি প্রথার ব্যাপার আর রাষ্ট্রীয় আইন এ বিষয়ে নীরব। ৪৮ বিধির মূল পাঠ পড়লে এই ধারণাটি সংশোধন করতে হয়।

৪৮ বিধি হেডম্যান নিয়োগ ও বরখাস্তের বিধান। এর শেষ বাক্যটি এইরকম:

“This appointment is not hereditary, but a son, when competent, may be appointed to succeed his father.”

শাসনবিধি ১৯০০, বিধি ৪৮

বাংলায় — এই পদ বংশানুক্রমিক নয়, তবে যোগ্য হলে পুত্র পিতার স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন।

বাক্যটি দুটি কাজ একসঙ্গে করে। প্রথমে বলে পদটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার নয় — অর্থাৎ নীতিগতভাবে যে কেউ যোগ্য হতে পারেন। তারপরই একটিমাত্র ব্যতিক্রম রাখে, আর সেই ব্যতিক্রমে কেবল son ও his father — কন্যার কোনো উল্লেখ নেই।

কেন এটি কেবল ভাষার প্রশ্ন নয়

১৯০০ সালের ইংরেজি নথিতে পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহার সেই সময়ের রীতি — এটুকু বললে বিষয়টি লঘু করা হয়। কিন্তু এখানে শব্দটি সাধারণ বর্ণনায় নয়, একটি নির্দিষ্ট অধিকার-সৃষ্টিকারী ব্যতিক্রমে বসানো। মূল নিয়ম হলো ‘বংশানুক্রমিক নয়’; ব্যতিক্রমটি একজনের জন্যই তৈরি, আর সেই একজন পুত্র।

তুলনা করে দেখুন — একই বিধিতে জেলা প্রশাসকের ক্ষমতার কথা বলার সময় ভাষা সাধারণ: নিয়োগ হবে চিফের সঙ্গে পরামর্শক্রমে, অযোগ্যতা বা অসদাচরণের জন্য বরখাস্ত করা যাবে চিফকে জানিয়ে, এবং জেলা প্রশাসক কোনো ক্ষেত্রেই চিফের ইচ্ছার দ্বারা আবদ্ধ থাকবেন না, যদিও তা পূর্ণ বিবেচনায় নেবেন। সেখানে যোগ্যতার কোনো লিঙ্গ-শর্ত নেই।

ফলে পাঠটি এইভাবে দাঁড়ায়: হেডম্যান হওয়ার সাধারণ পথে বিধিমালা কোনো লিঙ্গ-বাধা লেখেনি, কিন্তু উত্তরাধিকারের একমাত্র স্বীকৃত পথটি কেবল পুত্রের জন্য খোলা রেখেছে।

BRAC-এর পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে

আগের অংশে দেখা গেছে, BRAC-এর ২০১১ সালের গবেষণায় কোনো নারী কার্বারি বা হেডম্যান পাওয়া যায়নি। সাধারণত এই অনুপস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে প্রথার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

৪৮ বিধি দেখায়, ব্যাখ্যাটি অসম্পূর্ণ। প্রথা ও বিধি — দুটিই একই দিকে কাজ করেছে। প্রথা নারীকে বিচারের আসনে বসায়নি, আর যে রাষ্ট্রীয় বিধান পদটিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তার একমাত্র উত্তরাধিকার-ধারাটিও পুত্রের নামে লেখা।

এটি সংশোধনযোগ্য কি না, সে প্রশ্নের উত্তর এই লেখার বাইরে। তবে বিধিটি এখনো বলবৎ, আর এর ভাষা পরিবর্তন করতে হলে সেটি প্রথার সংস্কার নয় — আইনের সংশোধন।

বাস্তবে কোনো নারীকে হেডম্যান পদে নিয়োগের আবেদন এই বিধির কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে কি না, তার কোনো নজির আর্কাইভে নেই। [যাচাই প্রয়োজন]

শাসনবিধি ১৯০০ যা বলে, আর যা বলে না

প্রথাগত আইন শূন্যে চলে না — ১৯০০ সালের শাসনবিধির কাঠামোর ভেতরে চলে। কিন্তু ওই বিধিমালা ঠিক কী বলে, সেটা নিয়ে ভুল ধারণা ছড়ানো আছে, এমনকি এই আর্কাইভেও।

মূল পাঠ মিলিয়ে দেখা গেছে:

বিধিবিষয়
৩৪সরকারি খাস জমির বন্দোবস্ত — লাঙল-চাষের সমতল জমি একটি পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ ৫ একর, বাগানের জন্য আরও ৫ একর পর্যন্ত
৩৪Bনদীর তীরে বা তীরের কাছে জুম চাষ নিষিদ্ধ
৪১জেলা প্রশাসক জুম চাষ নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত করতে পারেন; কোনো এলাকা জুমের জন্য বন্ধ ঘোষণা করতে পারেন
৪১Aহেডম্যান মৌজার সম্পদ সংরক্ষণের জন্য দায়ী — বাঁশ-কাঠ সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা, জুম এলাকা থেকে অংশ বাদ রাখা
৪২জুম কর — প্রতিটি জুমচাষি পরিবার মৌজা হেডম্যানকে সরকার-নির্ধারিত হারে কর দেবে

একটি সংশোধনী, নিজের ঘর থেকেই। আর্কাইভের উত্তরাধিকার-বিষয়ক লেখাটিতে বলা হয়েছে, ‘৪২ বিধিমতে পাহাড়ে জুম চাষের জন্য জমির মালিকানা স্বত্বের প্রয়োজন হয় না’। মূল পাঠ অনুযায়ী ৪২ বিধি জুম করের বিধান — মালিকানা স্বত্বের কথা ওখানে নেই।

তবে যে বক্তব্যটি ওই লেখা দিতে চেয়েছে, তা কাঠামো থেকেই দাঁড়ায়: শাসনবিধিতে জুম একটি নিয়ন্ত্রিত ও করযোগ্য চর্চা (৪১, ৪১A, ৪২), আর জমি সম্পত্তি হিসেবে বন্দোবস্ত সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রক্রিয়া, নির্দিষ্ট সীমাসহ (৩৪)। জুম করলে জমির স্বত্ব জন্মায় — এমন কোনো বিধান পাওয়া যায়নি।

নারীর দিক থেকে এর ফল সোজা। যে সম্পত্তির স্বত্বই দুর্বল, তার উত্তরাধিকারে ভাগ পাওয়া বা না-পাওয়ার প্রশ্নটাও অস্পষ্ট থাকে। কন্যা যখন ‘অংশ’ দাবি করেন, তখন প্রশ্ন ওঠে — কিসের অংশ? জুমের জমির স্বত্ব যদি না-ই থাকে, তবে ভাগ হবে কেবল বাড়ি, গাছ, গবাদি পশু ও অস্থাবর সম্পত্তির। বন্দোবস্ত করা জমি থাকলে ছবিটা আলাদা।

আর শাসনবিধি যা বলে না, সেটাই সবচেয়ে বড় কথা: বিবাহ, বিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকার নিয়ে ১৯০০ সালের বিধিমালায় তঞ্চঙ্গ্যা সমাজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই। এই জায়গাটা প্রথাগত আইনের হাতে ছাড়া — যা লিখিত নয়, তাই বদলানোও কঠিন, আবার প্রমাণ করাও কঠিন।

শাসনবিধিতে ‘উত্তরাধিকার’ শব্দটি ঠিক কোথায় আছে

শাসনবিধি পরিবারের ভেতরের উত্তরাধিকার নিয়ে নীরব — কিন্তু ‘inheritance’ শব্দটি একেবারে অনুপস্থিত নয়। ৩৪ বিধির ১৩ উপবিধিতে এটি স্পষ্টভাবে আছে, এবং সেখানে যা বলা হয়েছে তা নারীর জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক:

“Nothing in these rules, or any grant, lease or contract under which land is held in the Hill-tracts shall operate to permit the inheritance of any Hill-tracts land by non-residents of the district except with the express consent of the Deputy Commissioner…”

শাসনবিধি ১৯০০, বিধি ৩৪(১৩)

সহজ বাংলায় — জেলার বাইরের বাসিন্দা কেউ পার্বত্য চট্টগ্রামের জমি উত্তরাধিকারসূত্রে পেতে পারেন না, যদি না জেলা প্রশাসক স্পষ্ট সম্মতি দেন। এই সম্মতি দেওয়ার সময় জেলা প্রশাসক ন্যায়পরতার নীতি বিবেচনা করবেন।

ভূমি হস্তান্তরে বাইরের দখল ঠেকানোর জন্যই বিধানটি লেখা। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে এর একটি নির্দিষ্ট ফল আছে, যা সম্ভবত উদ্দেশ্য ছিল না।

তঞ্চঙ্গ্যা বিবাহে স্ত্রী সাধারণত স্বামীর বাড়িতে যান। বিয়ে যদি জেলার ভেতরেই হয়, প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু কোনো নারী যদি জেলার বাইরে বিয়ে করে সেখানে বসবাস শুরু করেন — অর্থাৎ non-resident হয়ে যান — তবে পিতার জমিতে তাঁর উত্তরাধিকারের দাবি ৩৪(১৩)-এর আওতায় পড়ে যায়। ভাই জেলাতেই থাকলে তাঁর ক্ষেত্রে এই বাধা নেই।

অর্থাৎ প্রথাগত রীতি ও রাষ্ট্রীয় বিধান এখানে একই দিকে ঠেলে দেয়: প্রথা বলে কন্যা সাধারণত অংশ পান না, আর বিধান বলে জেলাছাড়া হলে জেলা প্রশাসকের সম্মতি ছাড়া উত্তরাধিকার কার্যকর হবে না।

বাস্তবে জেলা প্রশাসকের কাছে এমন আবেদন কতবার এসেছে, বা কতগুলোতে সম্মতি মিলেছে — তার কোনো পরিসংখ্যান আর্কাইভে নেই। [যাচাই প্রয়োজন]

বসতভিটা: সবচেয়ে ব্যবহারিক প্রশ্নটি

উত্তরাধিকারের আলোচনায় সাধারণত জুমভূমি ও ধানি জমির কথা আসে। কিন্তু বিচ্ছেদপ্রাপ্ত বা বিধবা নারীর সামনে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রশ্নটি ভিন্ন — থাকবেন কোথায়। এ বিষয়ে শাসনবিধিতে একটি নির্দিষ্ট বিধান আছে।

৫০(১) বিধি অনুযায়ী, একজন পাহাড়ি ব্যক্তি বসতভিটার জন্য সর্বোচ্চ ০.৩০ একর পর্যন্ত অ-শহুরে খাস জমি দখলে নিতে পারেন, এবং তার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বন্দোবস্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই — সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যানের অনুমতিই যথেষ্ট। হেডম্যান এমন বরাদ্দকৃত জমির একটি রেজিস্টার রাখেন।

বিধানটির ভাষায় লিঙ্গের কোনো শর্ত নেই, তবে ইংরেজি পাঠে ব্যবহৃত শব্দ hillman এবং his homestead — সেই আমলের রীতি অনুযায়ী পুরুষবাচক।

তবে যা এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা ভাষা নয় — ক্ষমতার অবস্থান। বসতভিটা পাওয়ার সিদ্ধান্তটি জেলা প্রশাসকের কাছে যায় না, থামে হেডম্যানের কাছে। আর আগের অংশে দেখা গেছে, BRAC-এর গবেষণায় কোনো নারী হেডম্যান পাওয়া যায়নি এবং ৪৮ বিধির উত্তরাধিকার-ধারাটি কেবল পুত্রের নামে লেখা।

ফলে স্বামীর ঘর ছেড়ে আসা একজন নারীর নিজের নামে বসতভিটা পাওয়ার পথটি ব্যবহারিকভাবে যায় সেই একই কর্তৃপক্ষের ভেতর দিয়ে, যেখানে তাঁর সমাজের নারীরা কখনো বসেননি। কার্যত কতজন নারী এভাবে নিজ নামে বসতভিটা পেয়েছেন, তার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। [যাচাই প্রয়োজন]

বিধিগুলো কী নিয়ে, আর কী নিয়ে নয়

শাসনবিধির যে অংশটি ভূমি ও জুম নিয়ে, তার শিরোনামগুলো পাশাপাশি রাখলে নীরবতার ধরনটি স্পষ্ট হয়।

বিধিবিষয়নারীর প্রশ্নে প্রাসঙ্গিকতা
৩৪সরকারি খাস জমির বন্দোবস্ত, হস্তান্তর, বিভাজন ও সাব-লেট‘holding’-এর সর্বোচ্চ পরিমাণ ও কাকে ইজারা দেওয়া যাবে — পরিবারভিত্তিক, ব্যক্তিভিত্তিক নয়
৩৪(৭)holding-এর বিভাজন (partition)বিভাজনের পদ্ধতি আছে, কিন্তু কার কত অংশ তা প্রথার হাতে
৩৪(১১)সরাসরি সরকারের অধীন প্রজার স্থায়ী ও উত্তরাধিকারযোগ্য স্বত্বস্বত্ব উত্তরাধিকারযোগ্য — কিন্তু উত্তরাধিকারী কে, তা বলা নেই
৩৪(১৩)জেলার বাইরের বাসিন্দার উত্তরাধিকারজেলা প্রশাসকের সম্মতি ছাড়া কার্যকর নয়
৩৪খনদীর তীরে বা তীরসংলগ্ন জুম চাষ নিষিদ্ধ—
৪১জুম চাষের নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মনজুমভূমি বরাদ্দের সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক
৪১কমৌজার সম্পদ সংরক্ষণে হেডম্যানের দায়িত্ব—
৪২জুম কর — প্রতিটি জুমচাষি পরিবার হেডম্যানকে দেয়করদাতা একক পরিবার, ব্যক্তি নয়
৪৩খাজনা আদায় — হেডম্যান আদায় করে প্রশাসনে জমা দেন—
৪৮চিফের অভিষেক এবং হেডম্যান নিয়োগ ও বরখাস্তনিয়োগ প্রশ্নে নারীর যোগ্যতা নিয়ে বিধিতে কিছু বলা নেই

ছকটি পড়লে একটি ধরন চোখে পড়ে। শাসনবিধি ধারাবাহিকভাবে পরিবারকে একক ধরে — জুম কর দেয় পরিবার, holding-এর সীমা পরিবারের হিসাবে, বন্দোবস্ত পরিবারের নামে। পরিবারের ভেতরে কে কী পাবেন, সে প্রশ্নটি বিধি কখনো তোলেনি।

ফলে নারীর অংশের প্রশ্নটি আইনত অমীমাংসিত নয় — আইনের এখতিয়ারের বাইরে। এটি ছোট পার্থক্য নয়। অমীমাংসিত হলে আদালতে ব্যাখ্যা চাওয়া যেত; এখতিয়ারের বাইরে হলে ফিরে যেতে হয় সেই প্রথার কাছেই, যা প্রশ্নটির জন্ম দিয়েছে।

প্রথাগত আইন: রক্ষাকবচ, না বাধা

এই বিষয়ে দুটি পরস্পরবিরোধী অবস্থান আছে, আর দুটিরই ভিত্তি আছে। কোনটি ঠিক তা এই লেখা ঠিক করে দেবে না — কিন্তু দুটোই স্পষ্ট করে বলা দরকার, কারণ পাঠক সাধারণত একটিই শোনেন।

যাঁরা বলেন এটি রক্ষাকবচ

প্রথাগত আইন টিকে আছে বলেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি ও পারিবারিক সম্পর্ক দেশের সাধারণ আইনের বাইরে থেকেছে। ৩৪(১৩)-এর মতো বিধান বাইরের দখল ঠেকিয়েছে। সমাজপতি ও কার্বারির আদালত সস্তা, কাছের, নিজের ভাষায় — যেখানে একজন নারীর পক্ষে যাওয়া জেলা আদালতে যাওয়ার চেয়ে অনেক সহজ। বিধবা বিবাহের স্বীকৃতি, স্ত্রীর নিজের উদ্যোগে বিচ্ছেদের অধিকার — এগুলো প্রথারই দান, রাষ্ট্রের নয়।

যাঁরা বলেন এটি বাধা

একই কাঠামোয় সিদ্ধান্তের সব আসনে পুরুষ — সমাজপতি, কার্বারি, হেডম্যান, চিফ। ভূমিতে কন্যার অংশ প্রথা দেয় না, আর রাষ্ট্রীয় আইন সেখানে ঢোকে না বলেই প্রতিকার চাওয়ার জায়গাও নেই। যেখানে ‘প্রথা’ ও ‘সংস্কৃতি রক্ষা’ একসঙ্গে উচ্চারিত হয়, সেখানে ভেতরের অসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন হয়ে পড়ে — কারণ প্রশ্নটিকে বাইরের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হতে পারে।

দুটি অবস্থানই একই তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে, ব্যাখ্যা আলাদা। আর্কাইভের উৎসগুলো এই বিতর্কের নিষ্পত্তি করে না — সেগুলো প্রথার বিবরণ দেয়, মূল্যায়ন নয়।

যা এখনো জানা যায়নি

এই লেখার সীমা স্পষ্ট করে বলা দরকার, কারণ প্রথাগত আইন নিয়ে অনুমান করে লেখা ক্ষতিকর।

  • কন্যার অংশের পরিমাণ। ভাই না থাকলে কন্যা উত্তরাধিকারী হন — এটুকু প্রকাশিত। কিন্তু ভাই থাকলে কন্যা কি কিছুই পান না, নাকি অস্থাবর সম্পত্তিতে অংশ পান, কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
  • বিধবার অবস্থান। রানী মেলার সাঙা স্বীকৃত, কিন্তু বিধবা স্বামীর সম্পত্তিতে কী পান, আর পুনর্বিবাহ করলে সেটি বদলায় কি না — অজানা।
  • তঞ্চঙ্গ্যা-নির্দিষ্ট বিচারসভা। BRAC-এর প্রতিবেদন কার্বারি-হেডম্যান আদালতে নারীর অনুপস্থিতি নথিবদ্ধ করেছে, কিন্তু চাকমা, মারমা, ম্রো ও ত্রিপুরা সমাজ ধরে। তঞ্চঙ্গ্যা বিচারসভার আলাদা সমীক্ষা পাওয়া যায়নি।
  • বাস্তব প্রয়োগ। নিয়ম আর চর্চা এক নয়। তিনটি বিচ্ছেদ-পথের কোনটি কত ব্যবহৃত হয়, তার কোনো সংখ্যা নেই।
  • প্রথাগত আইনের লিখিত সংকলন। তঞ্চঙ্গ্যা প্রথাগত আইনের কোনো স্বীকৃত, প্রকাশিত সংকলন এই গবেষণায় পাওয়া যায়নি।

গসা-গুত্তির অসঙ্গতি। উৎসের তালিকায় বারোটি গসার কথা বলা হলেও ক্রমসংখ্যায় দুটি বাদ পড়েছে, ছয়টি গসার গুত্তি-তালিকা আলাদা করে দেওয়া নেই, আর কয়েকটি নামের বানান দুই জায়গায় ভিন্ন। এগুলো মুদ্রণজনিত না প্রকৃত ভিন্নতা, তা যাচাই করা যায়নি। একই নামের গুত্তি ভিন্ন গসায়। দাল্লোয়া, বলাহ ও আমিলা — এই গুত্তিগুলো একাধিক গসায় আছে। ভিন্ন গসার একই নামের গুত্তির মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ কি না, কোনো উৎসে বলা নেই। বিবাহের সীমা নির্ধারণে এটি ব্যবহারিক প্রশ্ন। ৩৪(১৩) বিধির প্রয়োগ। জেলার বাইরে বিবাহিত নারীর উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের সম্মতি কতবার চাওয়া হয়েছে বা মঞ্জুর হয়েছে, তার কোনো নথি বা পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ৪৮ বিধির প্রয়োগ। কোনো নারীকে হেডম্যান পদে নিয়োগের আবেদন এই বিধির ‘পুত্র’ শব্দের কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে কি না, তার কোনো নজির খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিধিটি সংশোধনের কোনো প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে কি না, তাও অজানা। দৈংনাক সমাজে প্রথা। প্রায় তিনশ বছরের বিচ্ছিন্নতার পর আরাকানের দৈংনাক সমাজে এখানে বর্ণিত গসা-গুত্তি, সা-চি ও বাপদিন্যার নিয়ম কতটা অভিন্ন রয়ে গেছে, তার কোনো তুলনামূলক গবেষণা এই সংকলনে নেই। এই ছকের বাকি ঘরগুলোও একই সীমার মুখোমুখি। তুলনার জন্য দেখতে পারেন চাকমা, ত্রিপুরা ও ম্রো নারীর অবস্থান।

প্রশ্নোত্তর

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদকে কী বলে?

‘সা-চি’। জীবদ্দশায় তিনটি স্বীকৃত উপায়ে সা-চি হতে পারে — সামাজিক আদালতের সিদ্ধান্তে, বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমে, অথবা ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিকের কাছে হলফনামা সম্পাদন করে। স্বামী বা স্ত্রী, যে কেউ সূচনা করতে পারেন।

তঞ্চঙ্গ্যা কন্যা কি পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন?

প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী কন্যা সম্পত্তির অংশ দাবি করতে পারেন কেবল তখনই, যখন তাঁর কোনো ভাই নেই। ভাই থাকলে কন্যা কিছু পান কি না, তার নির্দিষ্ট উত্তর কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে বিধবা বিবাহ কি স্বীকৃত?

হ্যাঁ। বিধবা বিবাহের নিজস্ব নাম আছে — ‘রানী মেলার সাঙা’। নিজস্ব নাম থাকা মানে এটি ব্যতিক্রম হিসেবে সহ্য করা হয় না, বরং সমাজের চেনা একটি পথ।

১৯০০ সালের শাসনবিধিতে তঞ্চঙ্গ্যা বিবাহ ও উত্তরাধিকার নিয়ে কী আছে?

কিছুই নেই। বিধিমালায় জুম কর (৪২ বিধি), জুম নিয়ন্ত্রণ (৪১ ও ৪১A) এবং খাস জমির বন্দোবস্ত (৩৪ বিধি) আছে। বিবাহ ও বিচ্ছেদ নিয়ে একটি বিধানও নেই। উত্তরাধিকার শব্দটি আছে কেবল ৩৪(১৩) বিধিতে, যা জেলার বাইরের বাসিন্দাদের উত্তরাধিকার জেলা প্রশাসকের সম্মতিসাপেক্ষ করে — পরিবারের ভেতরে কে কী পাবেন, সে প্রশ্ন বিধিমালা কখনো তোলেনি।

প্রথাগত আদালতে কি নারী বিচারক থাকেন?

BRAC-এর ২০১১ সালের গবেষণায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কোনো নারী কার্বারি বা হেডম্যান পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনের ভাষায় প্রথাগত আদালতগুলো “dominated by all male jurors”।

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে গসা ও গুত্তি কী?

তঞ্চঙ্গ্যা কথ্য ভাষায় গোত্রকে ‘গসা’ বলা হয়, এবং মোট বারোটি গসা আছে। প্রতিটি গসা আবার একাধিক গুত্তিতে বিভক্ত — যেমন মোয় গসার অধীনে তাসি, দাল্লোয়া, আগারা, কুরুগাসহ আটটি গুত্তি। বংশ পরিচয় পিতসূত্রীয়, অর্থাৎ সন্তান পিতার গসা ও গুত্তি পান।

একই গোত্রে বিবাহ কি নিষিদ্ধ?

হ্যাঁ, শর্তসাপেক্ষে। একই গুত্তির আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ যতক্ষণ না গোত্রভেদে তিন পুরুষ অতিক্রান্ত হয়। তিন পুরুষ পেরিয়ে গেলে নিষেধ আর কার্যকর থাকে না। এই হিসাব রাখেন ও প্রয়োগ করেন সমাজের প্রবীণ ও সমাজপতিরা।

স্বামী ভরণপোষণ না দিলে তঞ্চঙ্গ্যা নারী কী করতে পারেন?

তিনি সমাজপতি বা কার্বারি-হেডম্যান আদালতে মামলা করতে পারেন। স্বামী যদি বৈবাহিক সম্পর্ক অগ্রাহ্য করেন বা ভরণপোষণ দিতে বিরত থাকেন, তবে স্ত্রী তাঁর দাম্পত্য সম্পর্ক ও দাবি পুনরুদ্ধারের জন্য মামলা করার অধিকার রাখেন। এটি বিচ্ছেদের মামলা নয়, বরং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দাবি।

তঞ্চঙ্গ্যা নারী কোন কোন কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকারী?

স্বামী নপুংসক হলে, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে, কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীন হলে — এই তিন অবস্থায় স্ত্রী সমাজপতি বা কার্বারি-হেডম্যান আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকারী। অর্থাৎ প্রথাগত আইনে বিচ্ছেদের উদ্যোগ নারীর নিজের হাতেও থাকতে পারে।

‘রানী মেলা’ শব্দের অর্থ কী?

তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিধবা নারীকে ‘রানী’ বা ‘রানী মেলা’ বলা হয়। সেখান থেকেই বিধবা বিবাহের নাম ‘রানী মেলার সাঙা’। শব্দটি নেতিবাচক নয় — বিধবাকে চিহ্নিত করার জন্য সমাজে একটি স্বাভাবিক শব্দ আছে, এবং তাঁর পুনর্বিবাহের জন্য একটি স্বীকৃত নামও আছে।

নারী কি হেডম্যান হতে পারেন?

শাসনবিধি ১৯০০-এর ৪৮ বিধিতে হেডম্যান নিয়োগের সাধারণ পথে কোনো লিঙ্গ-শর্ত লেখা নেই — জেলা প্রশাসক চিফের সঙ্গে পরামর্শ করে নিয়োগ দেন। তবে পদটি বংশানুক্রমিক না হলেও বিধিতে একটিমাত্র ব্যতিক্রম আছে, আর সেখানে লেখা আছে যোগ্য হলে পুত্র পিতার স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন। কন্যার উল্লেখ নেই।

জেলার বাইরে বিয়ে হলে কি জমির উত্তরাধিকারে সমস্যা হয়?

শাসনবিধি ১৯০০-এর ৩৪(১৩) বিধি অনুযায়ী জেলার বাইরের বাসিন্দা কেউ পার্বত্য চট্টগ্রামের জমি উত্তরাধিকারসূত্রে পেতে পারেন না, যদি না জেলা প্রশাসক স্পষ্ট সম্মতি দেন। কোনো নারী জেলার বাইরে বিয়ে করে সেখানে বসবাস শুরু করলে তাঁর দাবি এই বিধানের আওতায় পড়ে, যেখানে জেলায় থেকে যাওয়া ভাইয়ের ক্ষেত্রে এই বাধা নেই।

তথ্যসূত্র

  1. পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, ১৯০০ (Regulation I of 1900), বিধি ৩৪ (বিশেষত উপবিধি ৭, ১১ ও ১৩), ৩৪B, ৪১, ৪১A, ৪২, ৪৩, ৪৮ ও ৫০ — সংকলিত পাঠ, PCJSS; সরকারি পাঠ bdlaws.minlaw.gov.bd
  2. বিলাশী শাহা ও আনিসুর রহমান, “Inheritance for Aboriginal People: Bangladesh Perspective”, International Journal of Research and Innovation in Social Science, Vol. 8, Issue 8, সেপ্টেম্বর 2025 — rsisinternational.org
  3. Debasish Kumar Kundu, Mrinmoy Samadder, Ashrafuzzaman Khan ও Sharin Shajahan Naomi, State of Justice in Chittagong Hill Tracts: Exploring the Formal and Informal Justice Institutions of Indigenous Communities, Research Monograph Series No. 44, Research and Evaluation Division, BRAC, জানুয়ারি 2011 — bigd.bracu.ac.bd
  4. Arthur P. Phayre, An Account of Arakan, ১৮৪১ — দৈংনাকদের প্রথম লিখিত বিবরণ ও ‘খেইমবা-নাগো’ পরিচয়। মূল নিবন্ধটি এই গবেষণায় সরাসরি দেখা হয়নি; উদ্ধৃতি ও ইংরেজি পাঠ নেওয়া হয়েছে ৭ নম্বর উৎস থেকে।
  5. অশোক কুমার দেওয়ান, চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার — ফেইরির অনুমানের খণ্ডন এবং ‘খেইমবা-নাগো’ শব্দের ব্যাখ্যা। একইভাবে ৭ নম্বর উৎসে উদ্ধৃত।
  6. জুমজার্নাল, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর উত্তরাধিকার (বাপদিন্যা)
  7. জুমজার্নাল, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর বিবাহ বিচ্ছেদ (সা-চি)
  8. জুমজার্নাল, তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত

পদ্ধতি সম্পর্কে। শাসনবিধি ১৯০০-এর যে উদ্ধৃতিগুলো এখানে ইংরেজিতে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো সংশোধনীসহ সংকলিত পাঠ থেকে নেওয়া — মূল ১৯০০ সালের পাঠ নয়। ৪৮ ও ৫০ বিধি পরবর্তীকালে একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে। বাংলা অনুবাদগুলো এই লেখার, এবং প্রতিটির পাশে ইংরেজি মূল পাঠ রাখা হয়েছে যাতে পাঠক নিজে মিলিয়ে নিতে পারেন।

সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৫ আগস্ট ২০২৬

প্রসঙ্গ:তঞ্চঙ্গ্যা, তঞ্চঙ্গ্যা উত্তরাধিকার, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা