Jumjournal Logo

অহমিয়া জাতির আদ্যোপান্ত

Last updated Oct 6th, 2026

10

ঐতিহ্যবাহী পোশাকে অহমিয়া দম্পতি

অহমিয়া জাতির বসতি, অঞ্চল ও জনসংখ্যা

অহমিয়া জনগােষ্ঠীর লােকজন পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা যথাক্রমে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় অন্যান্য পাহাড়ি জনগােষ্ঠীর পাশাপাশি সুদীর্ঘকাল ধরে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে।

এই অহমিয়া জনগােষ্ঠীকে স্থানীয়ভাবে ‘আসাম’ হিসেবে বলা হয়ে থাকে। ভারতে ‘অসম’ নামেও অভিহিত করা হয়। বিশেষ করে রাঙ্গামাটি জেলার আসামবস্তি, মাঝেরবস্তি, গর্জনতলী ইত্যাদি এলাকায় অহমিয়া জনগােষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।

এছাড়া বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায়ও গুটিকয়েক অহমিয়া পরিবার বসবাস করে। সরকারি পরিসংখ্যানে বা আদমশুমারিতে তিন পার্বত্য জেলায় অহমিয়া জনগােষ্ঠীর জনসংখ্যা সম্পর্কে কোনােকিছুই উল্লেখ নেই। তবে অহমিয়ারা মনে করে যে, তিন পার্বত্য জেলায় তাদের জনসংখ্যা ২,০০০ থেকে ২,২০০-এর মতাে হবে।

 অহমিয়া বা অসমদের মূল জনগােষ্ঠী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আসাম রাজ্যে বাস করছে। মূলত অহমিয়া বা অসম জনগােষ্ঠীর নামে ভারতের উক্ত প্রদেশের নাম ‘আসাম’ নামকরণ হয়েছে। বর্তমানে অবশ্য আসাম রাজ্যেও মূল অসম জনগােষ্ঠী কোণঠাসা ও প্রান্তিক অবস্থানে।

বহিরাগতদের সংখ্যাধিক্যে মূল ভূ-খণ্ডে (আসাম রাজ্যে) আদি অহমিয়া অধিবাসীরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে এবং বহিরাগতদের নিকট উপনীত অবস্থানে পরিণত হয়েছে। আসাম রাজ্যে মূল আদি অহমিয়া মঙ্গোলিয়েড মহাজাতিভুক্ত জনগােষ্ঠী। আর বর্তমানে আসাম রাজ্যের শাসনক্ষমতায় যারা রয়েছে তারা অমঙ্গোলীয় জনগােষ্ঠীর বংশােদ্ভূত।

 পার্বত্য চট্টগ্রামসহ আসাম রাজ্যের আদি অহমিয়ারাও মূলত পাহাড়ি আদিবাসী এবং মঙ্গোলীয় নৃগােষ্ঠীভুক্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অহমিয়া জনগােষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা অত্যন্ত শােচনীয়। শিক্ষা-দীক্ষায় তারা অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া। সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনায় তারা বরাবরই অবহেলিত ও উপেক্ষিত।

অধিকাংশ অহমিয়া জনগােষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করে। স্বল্প জনসংখ্যা হওয়ার কারণে এবং শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণে  তাদের ভাষা-কৃষ্টি-সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে। তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপােষকতা নেই বললেই চলে। ব্রিটিশ আমল থেকে এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও পার্বত্য  চট্টগ্রামের কোনাে আইনে অহমিয়া জনগােষ্ঠীর স্বীকৃতি নেই। 

ঐতিহাসিক পটভূমি

প্রাক-উপনিবেশিক যুগে কাছারি রাজ্য নামে আসামে একটি শক্তিশালী রাজ্য ছিল। এ সময় কাছারি রাজ্যের পাশাপাশি অহােম, কামাতা, চুটিয়া প্রভৃতি রাজ্যে উপস্থিতিও ইতিহাসে পাওয়া যায়।

দিমাসা বংশীয় রাজাই ছিল কাছারি রাজ্যের শাসনকর্তা। দিমাসা বৃহত্তর বােড়াে-কাছারি জনজাতিভুক্ত একটি নৃগােষ্ঠী । এই রাজ্যের শাসনামল ব্রিটিশ উপনিবেশ কর্তৃক দখল না করা পর্যন্ত বর্তমান ছিল। এই রাজ্যের নামেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বর্তমান আসাম প্রদেশের কাছার ও উত্তর কাছার জেলা নামকরণ হয়েছিল।

 বার্মা কর্তৃক আসাম দখলের পর ব্রিটিশরা বার্মার বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে ১৮২৪ সালে নিম্ন আসাম নামে খ্যাত সমতল অঞ্চল ব্রিটিশরা দখল করে।

এর পরই ব্রিটিশরা অপর আসামে বার্মাকে পরাজিত করে ইয়ানদাবাে সন্ধি নামে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য করে। এসময় অহােম রাজা ব্রিটিশ সাহাযার্থে এগিয়ে আসেনি। রাজা গােবিন্দ চন্দ্রের মৃত্যুর পর ১৮২৮ সালে ব্রিটিশরা কাছার রাজ্য দখল করে। ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের সময় এ রাজ্যের পরিধি ছিল নাগাঁও ও কাব্রি আলং, উত্তর কাছার, কাছার এবং মণিপুর সীমান্তবর্তী ঝিরি অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত।

 ১৮৮১ সনের আদমশুমারি অনুযায়ী কাছারি জনজাতিভুক্ত ১৮টি জনগােষ্ঠীকে উল্লেখ করা হয়। এগুলাে হলাে – বােড়ো, চুটিয়া, ধীমাল, দিমাসা, গারাে, হাজং, হােজাই, লালুং, মাদানি, মাহালিয়া, মেছ, মটক, মােরান, ফুলগরিয়া, রাভা, রাজবংশী (কোচ), সারানিয়া, সােলাইমিয়া ও তিপ্রা জনগােষ্ঠী।

হিমালয়ের পাদদেশ আসাম, ত্রিপুরা, উত্তরবঙ্গ এবং বাংলাদেশের কিয়দংশ এলাকা নিয়ে এসব জনজাতির বসতি ছিল। উক্ত কাছারি জনজাতির বংশধরেরা বর্তমানে পশ্চিম আসামের মেছ জনগােষ্ঠী, মধ্য আসামের বােড়ো জনগােষ্ঠী, উত্তর কাছার হিলের দিমাসা ও হােজাই জনগােষ্ঠী এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর পূর্বাংশে সােনােওয়াল ও থেঙ্গাল জনগােষ্ঠী হিসেবে বসবাস করছে। 

ব্রিটিশ কর্তৃক আসাম দখলের পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তার শাসনকার্য পরিচালনা এবং আরাে অধিকতর পার্বত্যাঞ্চলে দুর্ধর্ষ পাহাড়ি জনগােষ্ঠীগুলােকে আয়ত্তে আনার লক্ষ্যে বিটিশ সেনাবাহিনীর অংশ হিসেবে অধীনস্থ বিভিন্ন জনগােষ্ঠী লােক নিয়ে বিভিন্ন রেজিমেন্ট গঠন করে। তার মধ্যে আসাম রেজিমেন্ট ছিল অন্যতম।এই আসাম রেজিমেন্টের সৈনিক হিসেবে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বসবাসকারী অহমিয়া জনগােষ্ঠীর পূর্বসূরিরা এ অঞ্চলে আগমন করে।

অনেকের ধারণা যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ব্রিটিশ সরকারের সৈনিক হিসেবে আসাম ও গুর্খাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে আনয়ন করা হয়েছিল । কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। তারও অনেক আগে ব্রিটিশরা বর্তমান অহমিয়া জনগােষ্ঠীর পূর্বসূরিদের এই পার্বত্যাঞ্চলে নিয়ে আসে মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ববর্তী দুর্ধর্ষ কুকি জনগােষ্ঠীকে সশস্ত্র উপায়ে দমনের উদ্দেশ্যে।

 ভারতবর্ষের অধিকাংশ অঞ্চল দখলের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৎকালীন চাকমা রাজ্য (পার্বত্য চট্টগ্রাম)সহ এর পূর্ববর্তী উপজাতি অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলগুলাের দিকে দৃষ্টি দেয়। তৎকালীন  চাকমা শাসকগােষ্ঠীর সাথে দীর্ঘ এক দশক ব্যাপী (১৭৭৭-১৭৮৭) যুদ্ধের পর চাকমা রাজা ধরম বক্স খাঁ দুর্বল হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি ব্রিটিশের করতলগত হয়।

এরপর পূর্ব সীমানা তৎকালীন লুসাই-কুকি অধ্যুষিত পার্বত্যাঞ্চল আয়ত্তে আনার চেষ্টা করে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দুর্ধর্ষ এসব পার্বত্য জনগােষ্ঠীর শৌর্যবীর্যের কাছে ব্রিটিশ সৈন্যরা বরাবরই পরাজিত হতে বাধ্য হয়।

 ১৮৯৮ সনে রাঙ্গামাটিতে জন্ম নেয়া স্বর্গীয় গােপাল চন্দ্র আসাম-এর কাছ জানা যায় যে, তার পিতা দুলাভ সিং রাভা ব্রিটিশ অভিযানের অংশ হিসেবে আসাম রেজিমেন্ট সৈনিক হিসেবে ১৮৬০ সালে রাঙ্গামাটিতে আগমন করেন।

আগমনের উদ্দেশ্য মূলত কুকীদের দমন। এসময় প্রায় ২০০ আসাম ও গুর্খা সৈন্যের সমন্বয়ে একটি দল বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার উপর দিয়ে প্রথমে চট্টগ্রাম এবং পরে রাঙ্গামাটিতে আগমন করে।

তৎকালীন সময়ে অর্থাৎ ১৮৬০ সালে চট্টগ্রাম হতে রাঙ্গামাটি আসা-যাওয়ার পথ ছিল না। উক্ত সৈনিকগণ ঝােপ-ঝাড় পরিষ্কার করে রাস্তা কেটে দুর্গম পাহাড় অতিক্রম করে রাঙ্গামাটিতে এসে পৌঁছায়।

জনশ্রুতি আছে, তৎকালীন সময়ে কুকীদের বীরত্ব প্রদর্শনের প্রথাস্বরূপ মানুষ হত্যা করা এবং শিরােচ্ছেদ করে নরমন্ডু সজ্ঞে নিয়ে গিয়ে নিজ বাড়ির আঙিনার উপর ঝুলিয়ে রাখা হতাে।কুকীদের এ ধরনের বীরত্ব প্রদর্শন প্রথা বন্ধ করার নিমিত্তে অভিযানে অংশ নিতে উক্ত সৈনিকদের রাঙ্গামাটিতে আনা হয়।

সৈনিকদের মালামাল ও অস্ত্র পরিবহন কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল খচ্চর। বর্তমান রাঙ্গামাটি  শহরের তবলছড়ি নামক বাজারের ঠিক পূর্ব প্রান্তে সমতল উপত্যকার (যা বর্তমানে পানির নিচে) সেনারা তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নেয় এবং খচ্চরগুলিকে স্ব স্ব  তাবুর পাশে বাঁধা হয়। ঐ উপত্যকায় খচ্চরগুলি চরে বেড়াতাে বলেই ঐ এলাকাটাকে নাম দেয়া হয়েছিল খচ্চরঘাটা।

আনীত সৈনিকদের ক্যাম্পাসসমূহে আলাে বিতরণ এবং শত্রুর মােকাবিলা প্রতিরােধ করার নিমিত্তে উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বস্থ পাহাড়ের খাদ কেটে বৃহদাকার একটি জেনারেটর স্থাপন করা হয়েছিল। সন্ধ্যা নামলেই উক্ত জেনারেটরের বিকট শব্দে সারা রাঙ্গামাটি প্রকম্পিত হয়ে উঠত । রাঙ্গামাটিতে বসবাসকারী, যাদের বর্তমান বয়স ষাটের কোঠায় তারা এ বিষয়ে বিদিত আছেন।

পরবর্তী সময়ে আরাে একটি সৈনিক দল যাদের ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য হতে বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলাস্থ দীঘিনালা পাড়ি দিয়ে রাঙ্গামাটিতে আনা হয় মূলত দুর্ধর্ষ কুকীদের দমন করে ব্রিটিশ শাসনাধীনে নিয়ে আসার জন্য। 

 জনশ্রুতি আছে, ক্যাপ্টেন লুইনের নেতৃত্বে পরিচালিত আসাম, গুর্খা ও ত্রিপুরা এই তিন বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত সৈনিকগণ দক্ষতার সাথে কুকীদের পরাস্ত করে তাদের অভিযানকে সাফল্যমণ্ডিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

সাফল্যের কারণ হিসেবে কথিত আছে যে, কুকীরা বড় একটি পাহাড়ে বসবাস করত। ঐ পাহাড়ে উঠার পথ ছিল শুধু একটি। শত্রু মােকাবেলা করার জন্য বড় বড় গাছের গুড়ি লতা দিয়ে এমনভাবে বেঁধে রাখতাে যে শত্রু আসার আভাষ পাওয়া মাত্র বেঁধে রাখা লতা কেটে দিত এবং বৃহদাকার গাছের গুড়ি গড়িয়ে নিচে পড়ে যেত।

গড়িয়ে পড়া গাছের গুড়িতে চাপা পড়ে শত্রুরা মারা যেত অথবা ঘায়েল হতাে। বিষয়টি সৈনিকগণ আঁচ করতে পেরে চালাকির আশ্রয় নিয়ে প্রথমে গরুর গলায় কাঠের তৈরি ঘণ্টি বেঁধে রাত্রে পাহাড়ের রাস্তায় তুলে দেয়।

কুকীগণ মনে করেছিল যে, ঠং ঠং শব্দ করে শত্রু আসছে। তারা যা করার তাই করল অর্থাৎ বেঁধে রাখা লতা কেটে দিল বড় গাছের গুড়ি গড়িয়ে নিচে পড়ে গেল এবং গরুগুলি গাছের গুড়িতে চাপা পড়ে সবই মারা যায় এবং সেদিনকার মতাে পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।

পরের দিন সকালে কুকীগণ উৎসুক দৃষ্টিতে দেখতে পায় যে, বেশ কয়টি গরু মরে পড়ে আছে। উৎফুল্ল কুকীগণ যে যেমন পারে গরুর মাংস কেটে কুটে খাওয়ার জন্য নিজ নিজ বাসগৃহে নিয়ে যায় । পরের দিন সমন্বিত সৈনিকগণ একই কায়দায় গলায় ঘণ্টি বেঁধে পাহাড়ে উঠতে লাগলাে।

কুকীরা মনে করল আবার গরু আসছে। মরা গরুর চেয়ে জীবিত গরুর মাংস খেতে পারবে এ আশায় তারা গাছের গুড়ি বেঁধে রাখা লতা কাটল না। সৈনিকগণ নিষ্কণ্টকে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে সমর্থ হলাে।

যেহেতু সৈনিকদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র (গাদা-বন্ধুক) ও অন্যান্য হাতিয়ার ছিল এবং সংখ্যার দিক দিয়েও তাদের চেয়ে বেশি ছিল সেহেতু পরাভব মেনে নেওয়া ছাড়া কুকীদের কোনাে উপায় ছিল না। কুকীগণ আত্মসমর্পণ করলে একটি চুক্তিনামা হয়  “যতদিন পর্যন্ত না ঢেঁকির চাটোয় এ লবণের গাছ উঠবে না, ততদিন পর্যন্ত তারা আর নরহত্যা ও বিদ্রোহ করবে না।” এভাবেই কুকী বিদ্রোহের অবসান ঘটে।

সফলভাবে কুকী বিদ্রোহ দমনের পর কিছু সংখ্যক সৈনিক, বিশেষ করে যারা অবিবাহিত তরুণ বয়সীদের রাঙ্গামাটিতে রেখে বাদ-বাকি সৈনিকদের স্ব স্ব রাজ্যে বা নিজ বাসভূমে চলে যাবার অনুমতি প্রদান করা হয়। যাদের রাঙ্গামাটিতে থাকার নির্দেশ ছিল গােত্র ভেদে আবাসভূমির বরাদ্দ করা হয়েছিল।

আসাম রাজ্য থেকে আসা সৈনিকদের জন্য বর্তমান রাঙ্গামাটিস্থ তবলছড়ি বাজারের পশ্চিমাংশ প্রায় দুই কিলােমিটার দীর্ঘ একটি টিলা বরাদ্দ করা হয়। দৃষ্টিনন্দন সুদৃশ্য এ জায়গার নামকরণ করা হয় আসামবস্তি।

গুর্খা সৈনিকদের জন্য উপরােল্লিখিত তবলছড়ি বাজারের উত্তরাংশ যা বর্তমানে মাঝেরবস্তি নামে খ্যাত জায়গাটুকু বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে জনৈক গুর্খার ভাষ্য মতে মাঝেরবস্তির প্রাথমিক এবং মূল নাম ছিল মানজিবস্তি। গুর্খাদের একটি গােষ্ঠী নাম ছিল মানজি।

মানজি গােষ্ঠীর লােকেরা বসবাস করছিল বলে ঐ এলাকার নামকরণ করা হয়েছিল মানজিবস্তি। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরাে বলেন, গুর্খাদের উচ্ছেদ করার জন্য মানজিবস্তির নাম পরিবর্তন করে মাঝেরবস্তি করা হয়েছে। যা হােক, আসামবস্তির নাম ঠিক থাকলেও মানজিবস্তি পরিবর্তিত হয়ে মাঝেরবস্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

অহমিয়ারা এ দেশের নাগরিক হিসেবে দেশের আন্দোলন সংগ্রামে নানাভাবে ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় কিছু সংখ্যক অহমিয়া ব্যক্তি যারা তখনকার সময়ে পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত ছিল তারা প্রত্যক্ষভাবে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

সামাজিক সংগঠন 

অহমিয়া জাতির গােত্র

 অহমিয়া সমাজ মূলত পিতৃসূত্ৰীয় সমাজ। পিতার বংশে সন্তান-সন্ততিদের বংশ পরিচয় হয়ে থাকে।  তৎকালীন সময়ে আসাম রাজ্য হতে নিয়ে আসা অহমিয়াদের মধ্যে মূলত তিনটি গােত্র যেমন : রাভা (Rabha), কাছারি (Kachari) এবং মেচ কাছারী গােষ্ঠীর লােক ছিল ।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একই উপাধি হারের সুবিধার্থে, রাভা, কাছারি ও মেচ কাছারিদের আসাম নামে প্রতিনিয়ত   ব্যবহার করতে থাকায় এককালে ‘আসাম’ উপাধি পাকাপােক্ত হয়ে যায়। সেই হতে বংশ পরম্পরায় নামের পার্শ্বে আসাম লিপিবদ্ধ করা হয় যা এখনাে বিদ্যমান রয়ে গেছে।

পরিবারের ধরন

বর্তমানে অহমিয়ারা একক পরিবার গঠন করে থাকে।

অহমিয়া জাতির অর্থনৈতিক সংগঠন

১৯৬১ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম হ্রদের পানির নীচে যখন পুরো রাঙ্গামাটি অঞ্চলের জনপদ ও ফসলি ধান্য জমি নিমজ্জিত হলাে তখনই অন্যান্য পাহাড়ি আদিবাসীদের ন্যায় অহমিয়াদের ভাগ্যাকাশে দুর্যোগ দেখা দেয়।

কেউ কেউ উঁচু টিলা ও পাহাড়ে আশ্রয় নিলেও ধান্য জমি অভাবের কারণে জুম চাষ করা ছাড়া অন্য কোনাে উপায় ছিল না। অভাব অনটন বাড়তে থাকে এসব উদ্বাস্তু জনগােষ্ঠীর মধ্যে। তারা হন্যে হয়ে কর্মসংস্থান ও ধান্য জমি সন্ধানে রাঙ্গামাটি ছেড়ে অন্যান্য অঞ্চলে পাড়ি জমাতে থাকে। অহমিয়াদের ক্ষেত্রেও ঘটে একই ঘটনা। কেউ কেউ ছােটখাটো চাকরি নিয়ে শহর-নগরের দিকে চলে যায়।

এভাবে রাঙ্গামাটিতে একত্র হয়ে বসবাসকারী অহমিয়ারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কালস্রোতে সংখ্যার দিক দিয়ে কমতে কমতে একেবারে নগণ্য পর্যায়ে চলে আসে। দুর্বল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান আরাে বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে।

পাহাড়িদের আবাস ও ফসলি জমি কাপ্তাই বাঁধের ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম হ্রদের জলে তলিয়ে যাওয়ার কারণে অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড একেবারে ভেঙে পড়েছিল। এর সুযােগে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল কিছু ফড়িয়া ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্ৰেণী।

এক আড়ি ধানের পরিবর্তে তিন আড়ি ধান দিতে হতাে ধান কাটার মৌসুমে। উপায়হারা আদিবাসীগণ মহাজনদের দ্বারস্থ হতে হতাে। ফলে গরিব থেকে আরাে গরিব হতে থাকল। একসময় দেখা গেল যে, অতিকষ্টে বন-বাদাড়, নর্দমা পরিষ্কার করা জমি মহাজনের নিকট বিক্রয় অথবা বন্ধক দিতে বাধ্য হয়।

কালান্তরে দরিদ্র উদ্বাস্তু আদিবাসী পরিবার শহরতলী নিকটবর্তী উর্বর জমি হতে আরাে একবার উদ্বাস্তু হয়ে জঙ্গলের আরাে ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে। এমনও দিন গুজরান হয়েছে বনের আলু (কুইয়া, মােম, পান আলু), কলাগাছ, লতা-পাতা সিদ্ধ খেয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে হয়েছিল। এভাবে গভীরে যেতে যেতে একসময় দেখা গেল যে, যাবার আর জায়গা নেই অর্থাৎ সীমানার শেষ প্রান্তে এসে গেছে।

বসতবাড়ি ও ফসলি জমি কর্ণফুলি হদে নিমজ্জিত হবার পর শুধুমাত্র অহমিয়ারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা নয়। এতদঞ্চলে বসবাসরত সমগ্র পাহাড়ি আদিবাসী এবং বাঙালিরাও সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চাকমারা । কেননা রাঙ্গামাটিতে সংখ্যার দিক দিয়ে চাকমারাই ছিল অধিক ।

অধিকাংশ চাকমা পরিবার মাথা গোজার ঠাঁই ও ফসলি জমির খোঁজে মাইনী, চেঙ্গী ও কাচালং নদীর উজানের দিকে এগােতে থাকলো। বন-বাদাড়, নর্দমা-খাল পরিষ্কার করে নতুন বাসস্থল তৈরি করা হলেও আর্থিক টানা-পােড়েন পিছু ছাড়েনি। অনাহারে অর্ধহারে দিন অতিবাহিত করতে হয়েছিলাে। অথচ রাঙ্গামাটিতে থাকাকালীন সকলে মিলে-মিশে সচ্ছল আনন্দময় অনাবিল এক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে জীবনযাপন করছিল এতদঞ্চলের আদিবাসীরা।

দুর্দশাগ্রস্ত পাহাড়ি আদিবাসীগণ আয়-রােজগারের পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। জুম চাষ করে যে ফসল পাওয়া যেত, তাও বছরের খােরাকি হতাে না। ঐ বেহাল দশা কম বেশি সকল আদিবাসীর বেলায় ঘটেছিল। নিজ বাসভূম জায়গা-জমি হারিয়ে আদিবাসীগণ দুর্বিষহ জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছিল।

অহমিয়াদের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত শােচনীয়। অহমিয়াদের এমন কোনাে পরিবার নেই, যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল । কিছু কিছু অহমিয়া আছে হয়ত নিজস্ব বসতভিটায় ঘরবাড়ি তৈরি করে কোনােরকমে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু অনেকেই আছে অন্যের বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে।

এককালে হয়ত নিজস্ব বসতভিটা ছিল। কিন্তু দরিদ্রতার কষাঘাতে তা বিক্রি করে উদ্বাস্তু হয়ে বর্তমানে ভাড়া করা বাসায় বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। যাদের ঘরবাড়ি আছে তাদের ৯৫% ঘরবাড়ি জরাজীর্ণ ও ঝুপড়ির মতাে।

 অধিকাংশ অহমিয়া জনগােষ্ঠী শহরতলী এলাকায় বসবাস করার ফলে তাদের কোনো ধানী জমি এবং পাহাড় ভূমি (গ্রোভল্যান্ড) নেই। কৃষি উৎপাদনের সাথে তাদের সম্পৃক্ততা নেই বললেই চলে। বর্তমানে অহমিয়াদের অধিকাংশ পেশায় দিনমজুর ও বেকার। কিছু কিছু পরিবার দেশীয় মদ তৈরি ও বিক্রি করেও কষ্টকর জীবন অতিবাহিত করে।

অহমিয়া সমাজে পৈতৃক সম্পত্তি পুত্রসন্তানরাই পেয়ে থাকে। তবে পিতা জীবিতকালে কোনাে সম্পত্তি কন্যাসন্তানের নামে উইল করে গেলে কন্যাসন্তানরাও পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ পেয়ে থাকে।

ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অহমিয়াদের সামাজিকভাবে একত্রিতকরণের প্রচেষ্টা চালানো হয় ১৯৯৩ সালে।অর্ধ শিক্ষিত, দারিদ্র্য-পীড়িত অহমিয়া জনগােষ্ঠী কীভাবে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে, তার কোনাে হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। এক নৈরাশ্যময় গণ্ডি থেকে বেরোনোর কোনো রাস্তা পাওয়া যাচ্ছিল না। 

আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চশিক্ষা গ্রহন সম্ভব নয়। চাকরি পাওয়াও ছিল দুষ্কর। অহমিয়াদের জন্য চাকরির কোটাও সংরক্ষিত নেই। এমতাবস্থায় সংঘবদ্ধ হওয়ার তাগিদে ঐ বছরে “অহমিয়া উন্নয়ন ও কল্যাণ সংসদ” নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠে  এবং সাংগঠনিক প্রক্রিয়া চালানাে হয়।

১৯৯৪ সনের পহেলা মার্চ স্থানীয় জেলা সমাজসেবা বিভাগ কর্তৃক নিবন্ধিত হয়। সঠিক পরিচালনা ও নেতৃত্বদানকারীর কর্মতৎপরতার অভাব হেতু সংসদের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে। সংগঠনের কার্যক্রম তেমন অগ্রসর হচ্ছিল না। সংগঠনের নেতৃত্ব সংকটের কারণে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা কর সম্ভব হচ্ছিল না। নিষ্প্রভ কর্মতৎপরতার কারণে সরকারের উন্নয়ন সহায়ক প্রতিষ্ঠান থেকেও কোনাে অনুদান বা পৃষ্ঠপােষকতা মেলেনি।

সংগঠনের নবগঠিত কমিটির সদস্যবৃন্দ ২৩ অক্টোবর ২০০৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান মহােদয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য অনুরােধ জানানাে হলে তিনি নির্বাচিত সরকার গঠনের পর বিষয়টি উপস্থাপন করবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেছেন। তিনি অহমিয়াদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি উন্নয়নের উপর জোর দেয়ার জন্য পরামর্শ দেন।

তারই ধারাবাহিকতায় আঞ্চলিক পরিষদ হতে কয়েকজন গরিব অহমিয়া শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলআপের অর্থ বরাদ্দ করা হয়। পরবর্তীতে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মহােদয়ের সাথেও সাক্ষাৎ করা হয়।

তিনিও অহমিয়াদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি উন্নয়নের জন্য নগদ অর্থসহ কিছু বাদ্যযন্ত্র যেমন হারমােনিয়াম, গজিনা, জুড়ি প্রভৃতি প্রদান করেন। সংসদের আর্থিক ফান্ড বৃদ্ধির তাগিদে ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সুযােগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সহায়তা প্রদানেরও আশ্বাস প্রদান করেন।

অহমিয়ারা তাদের নিকট সামাজিক উন্নয়নে নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়ের উপর সুদৃষ্টি দেয়ার আবেদন জানায়-

ক. অহমিয়া (আসাম) উন্নয়ন ও কল্যাণ সংসদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিন কক্ষ বিশিষ্ট একটি ভৌত অবকাঠামাে নির্মাণ করার জন্য আর্থিক অনুদান মঞ্জুরী।

খ. অহমিয়াদের পাহাড়ি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানসহ তাদের ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি উন্নয়নে সহায়তা প্রদান এবং গ. বেকার অহমিয়া যুব-কিশাের ও মহিলাদের আয় বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্য উন্নয়নমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক সহযােগিতা প্রদান।

অহমিয়া জাতির ধর্মীয় অবস্থা

অহমিয়ারা সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী হলেও যারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মেয়েকে বিবাহ করেছেন কালে-ভদ্রে তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হয়ে গেছে। কেউ বা তাদের সনাতনী ধর্মকে ধরে রাখতে পেরেছে এবং কেউবা খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী হয়েছে। এসবের কারনে অহমিয়ারা নৈনিতালে পরিণত হয়ে ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামােয় অবক্ষয় ঘটে এবং এ গােষ্ঠীর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠে।

অহমিয়া লােক-সংস্কৃতি-ভাষা

কাছারি ভাষা তিব্বতি-বর্মণ ভাষা পরিবারভুক্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের অহমিয়ারা মূল কাছারি ভাষায় কথা বলে না। কালের আবর্তে ও অন্য জনগােষ্ঠীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে তারা তাদের মূল মাতৃভাষা হারিয়ে ফেলেছে।

আসামেও কাছারি জনগােষ্ঠীর মাত্র ৩০% লােক মূল কাছারি ভাষায় কথা বলে। অবশিষ্টরা বর্তমান অহমিয়া ভাষায় কথা বলে। বর্তমান অহমিয়া ভাষা হচ্ছে ইন্দো-এ্যারিয়ান ভাষার পরিবারভুক্ত।

 কালের আর্বতে আসামবস্তিতে অহমিয়াদের থাকার জায়গা বরাদ্দ হলেও পারিবারিক ও সামাজিক রীতিনীতি পালনে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। এর প্রধান কারণ চাকরিরত সৈনিকগণ বেশির ভাগই ছিল অবিবাহিত।

সাংসারিক ও জৈবিক চাহিদা পূরণে এ অঞ্চলে বসবাসকারী অন্য সম্প্রদায়ের নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ছাড়া কোনাে গত্যন্তর ছিল না। কারণ হিসেবে বলা যায় যে, নিজ বাসস্থান আসাম রাঙ্গামাটি হতে দূরবর্তী হওয়ায় এবং যাতায়াতের সুবিধা না থাকায় তাদের এ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা থাকলেও যাবার পথ ছিল ভঙ্গুর ও কণ্টকময়। অন্য সম্প্রদায়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পরিবার গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করা হলেও সামাজিক জীবনে নেমে আসে এক বিরাট পরিবর্তন।

এর প্রধান কারণ বর অহমিয়া ভাষায় কথা বললে কনে তার বা সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারে না, আবার কনে যে ভাষায় কথা বলে বর তার ভাষা বুঝতে পারে না। এক পর্যায়ে বর ও কনের কথাবার্তায় ও ভাবের আদানপ্রদান ক্ষেত্রে সংমশ্রিত হয় নতুন ভাষা ও সংস্কৃতি। ফলে পরিবারের মধ্যে প্রচলিত হয় নতুন এক আবিষ্কৃত ভাষা যা বাংলাও নয় শুদ্ধ অহমিয়াও নয়।

তবে কিছুটা প্রাধান্য পায় চট্টগ্রাম আঞ্চলিক ভাষায় স্বরূপ। একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে-

এখানকার অহমিয়া চট্টগ্রাম আঞ্চলিকমূল অহমিয়া
কোন্দি যায়ইন্দি দুধ পোয়া যায়মুই বাজারত যাবকন্দে যরএদেঁ দুধ পন যায় আইং বাজারত যায়ুমকোয়াত যায় ইয়থ দুধ পোয়া যায় মই বাজারত যাব

১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বিভক্তিকালে অধিকাংশ অহমিয়া সম্প্রদায় স্ব স্ব জায়গায় চলে গেলেও কিছু সংখ্যক রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় থেকে যায়। বিশেষ করে যারা জায়গা-জমি বন্দোবস্ত পেয়ে, গবাদি পশু-পক্ষী লালনপালন করে সচ্ছল অবস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল তারা আর ফিরে যায়নি।

তাছাড়াও বংশ পরম্পরায় অহমিয়ারা তৎকালীন সময়ে পুলিশ ও সামরিক বিভাগে এবং অন্যান্য দপ্তর পাহারাদার পদে চাকরিরত থাকার কারণে মােটামুটি সচ্ছলভাবে দিনযাপন করছিল।কিন্তু কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ভাষা ও সামাজিক রীতিনীতি রক্ষায় এবং শিক্ষা গ্রহণে ছিল চরম উদাসীন।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় একমাত্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও পুলিশ  লাইন প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোনাে বিদ্যালয় ছিল না। উক্ত বিদ্যালইয়ে সীমিতাকারে ছাত্রছাত্রী ভর্তির সুযােগ ছিল এবং বনেদী পরিবারের ছেলেমেয়েদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে লেখাপড়া করার সুযােগ দেয়া হতাে।

আসামবস্তি হতে উক্ত দুটি স্কুল ছিল দূরত্ব প্রায় ৫ কিলােমিটার। এমনিতেই অহমিয়ারা শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চায় ছিল উদাসীন, তার মধ্যে স্কুল দুটির দূরত্বের বিষয়টি শিক্ষা গ্রহণ ক্ষেত্রে তাদেরকে আরাে বেশি অনীহার দিকে ঠেলে দেয়।

যেহেতু অহমিয়া পরিবারগুলাে ছিল মিশ্রিত সেহেতু বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রভাব এসে ভর করল। এ কারণে এক বিবর্ণ রূপ ধারণ করল অহমিয়া সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গন।

অহমিয়া জনগােষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি দুর্বল থেকে আরাে দুর্বল হয়ে পড়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলাে অন্য সম্প্রদায়ের সাথে অহমিয়া ছেলে-মেয়ের বিবাহ বন্ধন; বিভিন্ন জনগােষ্ঠীর সংস্কৃতির প্রভাব ও রীতিনীতির পরিবর্তন এবং সময় ও সুযােগ এবং পরিবেশ অনুযায়ী ধর্মান্তরিত হওয়া।

অহমিয়া জাতির শিক্ষা

 ১৯৬১ সন হতে ১৯৬৪ সন পর্যন্ত অহমিয়ারা দৈন্যদশার মধ্য দিয়ে এক অনিশ্চিত অমানিশার পথ বেয়ে চললাে। ১৯৬৫ সালে সামান্য আলাের ছটা বিকিয়ে আত্মপ্রকাশ করল পাহাড়ি ছাত্র সমিতি | উদ্দেশ্য উচ্চ শিক্ষায় “দাও মন করাে ছাত্র উন্নয়ন”।

শিক্ষা গ্রহণ ছাড়া আদিবাসীদের বাঁচার আর কোনাে পথ নেই। এ মূল মন্ত্রকে সামনে রেখে উন্নীত হলাে বেসরকারি পর্যায়ে স্থান বিশেষে কয়েকটি উচ্চ বিদ্যালয় যেমন : খাগড়াছড়ি, পানছড়ি, দীঘিনালা, কাচালং, ফেনী, তবলছড়ি প্রভৃতি । এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৮ সালে রাঙ্গামাটি জেলা সদরে একটিমাত্র বেসরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, অন্যান্য পাহাড়ি আদিবাসীর শিক্ষা গ্রহণের দিকে আগ্রহ বাড়লেও অহমিয়াদের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। এর কারণ পূর্বেই উল্লেখহয়েছে যে, শতভাগ অহমিয়া ছিল অনুকূল পেশায় নিয়ােজিত।

তাদের উত্তরসূরি (সন্তানসন্ততি) কোনাে রকম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয়/তৃতীয় শ্রেণী অতিক্রম করতে পারলেই হয়তাে একটি চাকরি পেয়ে যাবে। এ আশায় দারিদ্র্য-পীড়িত অহমিয়াদের সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ বহন একটা বিরাট বােঝা মনে করত। তাই স্বাভাবিকভাবে অহমিয়ারা শিক্ষার দিক দিয়ে পেছনে পড়ে যায় ।

পাকিস্তান আমলে অহমিয়াদের মধ্যে শুধু একজন ছিলেন মেট্রিক পাশ এবং একজন ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তারা হলেন যথাক্রমে শুবােধ রাম আসাম ও প্রমােদ বিকাশ আসাম। বাকিদের লেখাপড়া ছিল দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত।

আর্থিক অসচ্ছলতা ও অসচেতনতা অহমিয়াদের শিক্ষা বিস্তারে অন্যতম বাধা হিসেবে কাজ করে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অহমিয়াদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানে অহমিয়াদের অনেক ছেলেমেয়ে মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজে লেখাপড়া করছে। এছাড়া মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন উচ্চ শিক্ষা লাভ করেছে।

অহমিয়া নারীর অবস্থা 

সাধারণভাবে অহমিয়া সমাজে নারীদেরকে খুবই সম্মানের সাথে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে পরিবারে ও সমাজে যে কোনাে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নির্ধারণে পুরুষদের ভূমিকাই প্রধান। এক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য বা একেবারে উপেক্ষিত বলা যায়।

পরিবারে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের রয়েছে সরব উপস্থিতি। পরিবারে ঘরকন্নার কাজে তারা পুরুষের তুলনায় অধিকতর পরিমাণে পরিশ্রম করে। কর্মক্ষেত্রেও পুরুষদের পাশাপাশি তারা সমান ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু পরিবারে ও সমাজে তাদেরকে সেভাবে গুরুত্ব প্রদান করা হয় না।

অন্যান্য জনগােষ্ঠীর মতাে অহমিয়া সমাজেও এখনাে কন্যাসন্তানের তুলনায় সুত্রসন্তানকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। সকল ক্ষেত্রে কন্যা সন্তানরা বৈষম্যের শিকার হয় বলা যায়। শিক্ষা ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় না।

পরিবারে ও সমাজে নারীরা কেবল বৈষম্যের শিকার হয় না, তারা শারীরিক নির্যাতনের ও শিকার হয়। বিশেষ করে অভাব অনটন ও পুরুষদের অনৈতিক  মধ্যপানের কারণে সংসারে অশান্তি দেখা দেয় এবং স্ত্রীর উপর শারীরিক নির্যাতন করা হয়ে থাকে।সাধারণভাবে অহমিয়া সমাজ পুত্রসন্তানই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে থাকে।

তবে মা-বাবারা ইচ্ছে করলে কন্যাসন্তানদেরও সম্পত্তির ভাগ দিতে পারে । ইদানীং প্রথাগতভাবে না হলেও সামাজিকভাবে পরিবর্তিত অবস্থা কন্যাসন্তানদেরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পত্তির অংশ দেয়া হয়ে থাকে ।প্রথাগতভাবে না হলেও সামাজিকভাবে পরিবর্তিত অবস্থার কারণে কন্যাসন্তান্দেরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পত্তির অংশ দেয়া হয়ে থাকে।

অহমিয়াদের রাজনৈতিক সংগঠন

অহমিয়ারা শিক্ষার দিকে থেকে পিছিয়ে থাকার কারণে জনগােষ্ঠী হিসেবে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত অসচেতন। স্বল্প জনগােষ্ঠী হিসেবে সেরকম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সংগঠিত হওয়ার মতাে কোনাে ভিত্তিও নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চলমান  রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযােগ্য নয়। তবে আশার কথা যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও জাতীয় রাজনৈতিক দলসমূহে অহমিয়া জনগােষ্ঠীর সম্পৃক্ততা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক যে সকল আইন রয়েছে বিশেষ করে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মােতাবেক প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে অহমিয়া জনগােষ্ঠীর স্বীকৃতি না থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থার অধীনে প্রতিষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে অহমিয়া জনগােষ্ঠী থেকে নির্বাচিত হওয়ার কোনাে সুযােগ নেই। ফলত রাজনৈতিক দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অহমিয়া জনগােষ্ঠী নানাভাবে অবহেলিত ও উপেক্ষিত বলা যায়।

টীকা

১. http://en.wikipedia.org/wiki/Kachari_Kingdom

২.http://en.wikipedia.org/wiki/Bodo-Kachari 

৩. ১৯৭২ সালে এই লেখকের সাথে স্বর্গীয় গােপাল চন্দ্র আসাম-এর সাক্ষাৎকার।

 ৪. লেখক নিজেও পানছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৭২ সালে এসএসসি পরীক্ষা পাশ

করেন।

লেখক: সুখময় রাভা

প্রসঙ্গ:

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা