Last updated Oct 6th, 2026
2

ককবরক গীতিকার ও সংগীত পরিচালক বিকাশ রায় দেববর্মা একটি বাক্যে যন্ত্রগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: “আমাদের সারিন্দা, সুমুই (বাঁশি), চংপ্রেং গুলো হল স্বর চয়নের বাদ্যযন্ত্র, আর খাম, ওয়াখপ ইত্যাদি হল ধীর বা দ্রুত তালে তাল মিলিয়ে বাজার বাদ্যযন্ত্র।”
তারপর একটি বাক্য, যেটি এই পুরো লেখার কারণ: “আমাদের বাদ্যযন্ত্র গুলোর মধ্যে মুরি নামে একটি বাদ্যযন্ত্রও ছিল, তবে ককবরক ভাষীরা অনেক আগেই এটাকে হারিয়ে ফেলেছে।”
নামটা আছে। যন্ত্রটা নেই। কেমন দেখতে ছিল, কী শব্দ হতো — কোনো উৎসে লেখা নেই।
পাহাড়ের সংগীত নিয়ে যা কিছু লেখা হয়, তার বেশিরভাগই “সমৃদ্ধ ঐতিহ্য” জাতীয় বাক্যে শেষ হয়ে যায়। এই লেখায় সেটা করা হয়নি। এখানে যা আছে তা হলো নাম — গানের ধরনের নাম, যন্ত্রের নাম, নাচের নাম, শিল্পীর নাম — যতটা জুমজার্নালের নিজস্ব আর্কাইভে লিপিবদ্ধ আছে ততটুকু।
সূচিপত্র
জুমজার্নালের আর্কাইভে “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখাটিতে মারমা সংগীত ও গীতিনাট্যের ধারাগুলো নাম ধরে সাজানো আছে। এটি সম্ভবত বাংলায় পাওয়া সবচেয়ে বিস্তারিত তালিকা:
| নাম | কী ধরনের গান |
|---|---|
| কাপ্যা | কাহিনী-কাব্য। কাজের সময়, অবসরে, শিশুকে ঘুম পাড়াতে; প্রতিযোগিতামূলকভাবেও গাওয়া হয় |
| চাগায়াঙ | জুমে বা জমিতে কাজ করার সময় উচ্চ কণ্ঠে গাওয়া লোকগীতি |
| সাখ্রাঙঃ | গৌতম বুদ্ধের জীবনচরিত ও জাতক নিয়ে রচিত কাহিনীগান, সন্ধ্যা বা রাতে |
| রদুহ্ | মহাপুরুষ ও সমাজনেতাদের গুণকীর্তন; কিছু রদুহ্ নিঃসঙ্গ ভারাক্রান্ত হৃদয়ের গান |
| লাঙ্গা | নিসর্গ-প্রশস্তিমূলক গীতিকবিতা |
| সাইঙগ্যাইত্ | দলীয় গান, অনেকটা জারির ধরনে — একজন গাওয়ার পর দল তাল মেলায়; সাংগ্রাইয়ের জলখেলায় তাৎক্ষণিক রচিত |
| লুঙঃদি | প্রতিযোগিতায় বিজয়ী দলের গান; ঘরে ঘরে গিয়ে গেয়ে নজরানা আদায় করা হয় |
| সাইঙবক্ | ধর্মীয় বন্দনাগীতি, মন্দিরে শীল প্রার্থনার সময় |
| আফোওয়েহ্ | অভিজাতদের তুষ্টির জন্য রচিত গান; ‘এঃ’ নামের বেহালা-জাতীয় যন্ত্রের সঙ্গে গাওয়া হয় |
| ন্বাইলাঃ | মৃতের বাড়িতে দাহ না হওয়া পর্যন্ত পাহারার গান — কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই |
| খইসই তেঃখ্রাং | ‘আধুনিক গান’-এর প্রতিশব্দ; তবলা, বেহালা, বাঁশি, হারমোনিয়াম, গিটার, ম্যান্ডোলিন ব্যবহৃত হয় |
| পাংঃখুঙ | কাহিনীভিত্তিক গীতিনাট্য; ২০-৫০ জনের দল, অর্থের বিনিময়ে উৎসবে পরিবেশিত |
দুটো জিনিস এখানে আলাদা করে দেখার মতো। এক, ন্বাইলাঃ — শোকের গান, যেখানে যন্ত্র নিষিদ্ধ। এর পুঁথি বৌদ্ধ মন্দিরে সংরক্ষিত থাকে, প্রয়োজনে মৃতের বাড়িতে এনে পাঠ করা হয়। দুই, পাংঃখুঙ-এর ইতিহাস: আর্কাইভের হিসাবে আনুমানিক একশো বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা সমাজে এই গীতিনাট্যের উদ্ভব; প্রথমে একজন শিল্পীই গেয়ে সব ভূমিকায় অভিনয় করতেন, পরে তা দলীয় রূপ নেয়।
বাদ্যযন্ত্রের একটি আলাদা তালিকা আসে রাজপুণ্যাহ-র বর্ণনায়। বোমাং রাজার শোভাযাত্রায় ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রীদল যা বাজায়: খরা (এক প্রকার শিঙা), মঙঃ (পিতলের তৈরি দুন্দুভি), প্যাহ্ (এক প্রকার ঢোল), হ্নেঃ (এক প্রকার বাঁশি), চে (কাঠ ও চামড়ার তৈরি দুন্দুভি)। রাজপুণ্যাহ ও সার্কেল-ব্যবস্থা নিয়ে আলাদা লেখা আছে চাকমা সার্কেল, হেডম্যান ও কার্বারি পোস্টে।

আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখায় যন্ত্রের তালিকাটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু নির্দিষ্ট: ধুদুক, হেঙগরঙ, শিঙা, বাঁশি, ঢুল, ডগর, সারিন্দ্যা, তাক।
নাচ নিয়ে ওই লেখায় একটি অপ্রত্যাশিত কথা আছে, যা সাধারণত এড়িয়ে যাওয়া হয়। সুগত চাকমার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বিগত শতকের সত্তরের দশকের আগে চাকমাদের মধ্যে আজকের মতো নাচ দেখা যেত না — বিশেষ করে নারীদের নাচ ছিল দুর্লভ ঘটনা; কারণ হিসেবে উচ্চশ্রেণির রক্ষণশীলতার কথা বলা হয়েছে। তবে সুদূর অতীতে বিজু নাচ, জুম নাচ, কদলপুর নাচ, থানমানা নাচ, মালেইয়্যা নাচ — এসবের কথা জানা যায়।
এর মানে দাঁড়ায়: আজ যেসব নাচকে “ঐতিহ্যবাহী” বলা হয়, তার অনেকগুলোর বর্তমান রূপ সত্তরের দশকেই গড়া। কে গড়েছেন, তা নিয়ে নিচে আবার আসছি।
চাকমা মৌখিক সাহিত্যের সবচেয়ে বড় ধারা গেংখুলি — গানে-গানে দীর্ঘ কাহিনী বলার ঐতিহ্য। সেটি নিয়ে আলাদা করে লেখা আছে চাকমা মৌখিক সাহিত্য পোস্টে; এখানে কেবল এটুকু যে সত্তরের দশকে রাঙামাটিতে গঠিত ‘উন্মাদ শিল্পী গোষ্ঠী’ পরে নিজেদের নাম বদলে রাখে ‘গেংখুলী শিল্পী গোষ্ঠী’ — নামটাই বলে দেয় কোথা থেকে আধুনিক চর্চাটি তার বৈধতা নিতে চেয়েছিল।
ত্রিপুরাদের ভাষা ককবরক। আর্কাইভে “ককবরক সঙ্গীত অতীত ও ভবিষ্যৎ” লেখাটি এই লেখার সবচেয়ে সমৃদ্ধ উৎস — যদিও এটি লেখা হয়েছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের প্রেক্ষাপটে (লেখায় ত্রিপুরা সরকার ও এডিসি প্রশাসনের কথা আছে)। পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরাদের ক্ষেত্রে কতটা হুবহু প্রযোজ্য, তা ওই লেখা থেকে বলা যায় না।
প্রাচীন ককবরক গান বলতে বোঝায় জাদুনী গান। লেখক একে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন:
কাজের গান আবার নানা শাখায় বিভক্ত, আর সেগুলোর নাম রাগিনি ধরে: উত্তর রাগিনি, দক্ষিণি রাগিনি, দাসপা রাগিনি, দুনা রাগিনি, বেরি রাগিনি। লেখকের মন্তব্য — “মন দিয়ে না শুনলে উল্লিখিত রাগিনিগুলোকে একই ধাঁচের বলে মনে হবে।”
যন্ত্রগুলোর ভাগটি আগেই বলা হয়েছে: সারিন্দা, সুমুই (বাঁশি), চংপ্রেং স্বর চয়নের; খাম, ওয়াখপ তাল মেলানোর। এছাড়া দাংদু — অতীতে যুবতীরা বাজাতেন, এবং এটি দুই কাজেই ব্যবহার করা যেত। আর হারিয়ে যাওয়া মুরি।
সারিন্দা সম্পর্কে একটি চমৎকার বিবরণ আছে: রাগিনি অনুসরণ করে বাজানো ছাড়াও “এ..হু.হু. রবে হর্ষোল্লাস, বন্য পশুপাখীর ডাক, মোরগের ডাক, এই বাদ্যযন্ত্রে হুবহু বাজানো যায়।” আর চংপ্রেং-এ বাজানো হয় শিকারলব্ধ বস্তুর বণ্টন, পাহাড়ে চড়া, চরকা কাটা, দোলনায় শিশু ঘুম পাড়ানো — তবে ঘুম পাড়ানোর গান আর চংপ্রেং-এ তোলা ঘুম পাড়ানোর সুর এক নয়।
ককবরক সংগীতের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ব্যালাডধর্মী — গানের মাধ্যমে দীর্ঘ কাহিনী বলা, যা শেষ হতে কখনো সপ্তাহ লেগে যেত। কাহিনীগুলোর নাম: সিকাম (কুকি) রাজ্যের উঁচু পাহাড় আরাহন; খেরেংবার ফুল চয়ন; মামলা মৗসা চামানি অর্থাৎ বাঘের মুখে নিহত ভালোবাসা।
আধুনিক ককবরক গানের ধারায় লেখক নাম করেছেন খুশীকৃষ্ণ ত্রিপুরার (কিংবদন্তি অনুযায়ী তিনশোরও বেশি ভক্তিগীতিধর্মী ককবরক গান), মহেন্দ্র দেববর্মার (ককবরক গানে হিন্দুস্তানি ঘরানার সংযোজন), আর গৌরমোহন দেববর্মার। জীবিত যন্ত্রশিল্পীদেরও নাম আছে — চংপ্রেং-এ সম্প্রই দেববর্মা, সারিন্দায় সন্তোষ দেববর্মা ও ইন্দ্র দেববর্মা, বাঁশিতে রামপদ জমাতিয়া ও বৈদ্য দেববর্মা।
বান্দরবানের লেখক জির কুং সাহুর “বম আদিবাসীদের লোকসংগীত ও লোকনৃত্য” আর্কাইভের সবচেয়ে বিশদ সংগীত-লেখা — গানের কথা, উচ্চারণ ও বঙ্গানুবাদসহ।
গানের শ্রেণি: কাইলেক, লা ফিং, লাতুং। লেখকের ভাষায় লাফিং বা লাতুং “ভাব প্রধান গান”, যেখানে জুমচাষ ও শিকারের কঠিন শ্রম বারবার ফিরে আসে।
যন্ত্র তিনটি: রিরৎ (এক প্রকার একতারা), মিমীম (ধানের নাড়া দিয়ে তৈরি বাঁশি) এবং জলপাল (এক প্রকার বাঁশি)। এদের সুর সম্পর্কে লেখকের বাক্যটি মনে রাখার মতো: “কথা নেই আছে শুধু সুর।”
নাচ পাঁচটি — এবং এখানেই বম সংগীতের সবচেয়ে স্বতন্ত্র দিকটি ধরা পড়ে: আনন্দের চেয়ে শোকের অনুষ্ঠানের প্রাধান্য।
| নাচ | উপলক্ষ ও ধরন |
|---|---|
| রোখা (বাঁশনৃত্য) | অপঘাতে বা অস্বাভাবিক মৃত্যুতে। জোড়া বাঁশের ঠোকাঠুকির ফাঁকে বৃত্তাকারে নাচ; পাশে বসে অন্যরা গায়। উদ্দেশ্য — শোকার্ত পরিবারকে সাহচর্য দেওয়া |
| সাবাংরুয়াই | বিত্তবানের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ উৎসব; মূল গায়েন আয়োজকের বীররসাত্মক কাহিনী গায়, অন্যরা ধুয়া তোলে |
| লাদৌ / বর-লা | সফল শিকারির বিজয়গীত; শিকারলব্ধ জন্তুর মাথা উঁচিয়ে গ্রামের প্রবেশদ্বারে গাওয়া |
| সিয়া কী দেং (শিং নৃত্য) | যশমান মৃতের স্মরণোৎসব, ব্যয়বহুল ভোজ। কেবল পুরুষেরা; শিং হাতে বিশেষ ভঙ্গিতে। এই নাচে গান হয় না |
| সালু লাম | ঘরের দেয়ালে সাজানো শিকার-মাথাগুলোর শুচীকরণের নাচ, বিশ্বাস অনুযায়ী জীবদ্দশায় অন্তত একবার করতে হয় |
পাংখোয়া। আর্কাইভের “পাংখোয়া জাতির আদ্যাপান্ত” লেখায় বাদ্যযন্ত্রের তালিকা আছে নিজস্ব নামসহ — পাংখোয়া ভাষায় লা সাকনা মানরোয়া: সিয়াল রাকি (গয়ালের শিং), ডার সন (ছোট পিতলের ঘণ্টা), ডার পুই (বড় ঘণ্টা বা মং), খোয়াং (গাছের তৈরি ঢোল), থেই খাং (এক কৌটা বাঁশ), রুয়া খোয়াং (বাঁশের ঢোল), রুয়া টিংটাং (বাঁশের গিটার)।
নাচও (লাম) তালিকাভুক্ত: লামদেপ (দলীয়), সালু মালাম (একক শিকারি নৃত্য), পোয়াল মা থলা লাম (রাজহংসের পাখা দিয়ে), জামা লাম, চাং রাপাল দেং (গয়ালের শিং দিয়ে)।
চাক। “চাক জাতির আদ্যোপান্ত”-এ যন্ত্রগুলো আসে উৎসবের বর্ণনার ভেতর দিয়ে — ওয়াগ্যোই উৎসবে ফানুস (ঙাংগাছামিক) ওড়ানোর সময় বাজে বাইক-পুন, হ্নে (এক ধরনের বাঁশি) এবং লাংহোয়াক (ঝাঁঝ)।
খুমী। এখানে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্যটি যন্ত্র নয়, ভাষা। “খুমী জাতির আদ্যোপান্ত” বলছে, খুমীদের লোকগীতি সব খুমীর কাছে বোধগম্য নয়; কেবল শিল্পীরাই বুঝতে পারেন। এই গানের ভাষায় শিল্পীরা নিজেদের মধ্যে আনন্দ-বেদনা, প্রেম, সুখ-দুঃখের অনুভূতি আদান-প্রদান করতে পারেন, যা সাধারণ শ্রোতা বুঝতে পারেন না। অর্থাৎ গানটি একই সঙ্গে পরিবেশনা এবং একটি বন্ধ ভাষা।
খুমী নাচের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তাং ন’ — গো-হত্যা অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলংকার পরে হাত ধরে সারিবদ্ধভাবে, বাঁশির সুরে তাল মিলিয়ে। যন্ত্র: বাঁশি ও ঢোল।
আলাদা আলাদা তালিকাগুলো পাশাপাশি বসালে একটা ধরন দেখা যায়। প্রায় প্রতিটি সম্প্রদায়ের কাছেই আছে চার ধরনের যন্ত্র — বাঁশি, তারযন্ত্র, চামড়ার ঢোল, আর ধাতু বা শিং।
| শ্রেণি | যন্ত্র (সম্প্রদায়) |
|---|---|
| বাঁশি-জাতীয় | হ্নেঃ (মারমা) · হ্নে (চাক) · সুমুই (ককবরক) · মিমীম, জলপাল (বম) · বাঁশি (চাকমা, খুমী) |
| তারযন্ত্র | এঃ, বেহালা-জাতীয় (মারমা) · সারিন্দ্যা (চাকমা) · সারিন্দা, চংপ্রেং (ককবরক) · রিরৎ, একতারা-জাতীয় (বম) · রুয়া টিংটাং, বাঁশের গিটার (পাংখোয়া) |
| ঢোল ও চামড়া | প্যাহ্, চে (মারমা) · ঢুল, ডগর, তাক (চাকমা) · খাম, ওয়াখপ (ককবরক) · খোয়াং, রুয়া খোয়াং (পাংখোয়া) · ঢোল (খুমী) |
| ধাতু ও শিং | খরা, মঙঃ (মারমা) · শিঙা, হেঙগরঙ (চাকমা) · লাংহোয়াক, ঝাঁঝ (চাক) · ডার সন, ডার পুই, সিয়াল রাকি (পাংখোয়া) |
দুটো ব্যাপার এখানে চোখে পড়ে। এক, বাঁশ নিজেই একটি যন্ত্র — পাংখোয়াদের থেই খাং (এক কৌটা বাঁশ), রুয়া খোয়াং (বাঁশের ঢোল), রুয়া টিংটাং (বাঁশের গিটার), আর বমদের রোখা নাচে বাঁশের ঠোকাঠুকিই তাল। দুই, ধাতব যন্ত্রগুলো প্রায় সবসময়ই আনুষ্ঠানিক — রাজার শোভাযাত্রা, মন্দিরের উৎসব, ফানুস ওড়ানো।
তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়। একই যন্ত্র ভিন্ন সম্প্রদায়ে ভিন্ন নামে থাকতে পারে, আবার একই নামের যন্ত্র আলাদাও হতে পারে। কোনো উৎসেই যন্ত্রগুলোর গঠন, মাপ বা তৈরির পদ্ধতির বিবরণ নেই — কেবল নাম ও এক লাইনের পরিচয়।
আর্কাইভের বাইরে সবচেয়ে কাজের তালিকাটি আছে বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধে, লিখেছেন মোমেন চৌধুরী। এই তালিকাটি আর্কাইভের সঙ্গে দুই জায়গায় কাজে লাগে — যেখানে আমাদের সংগ্রহ নীরব সেখানে নাম যোগায়, আর যেখানে দুটোতেই নাম আছে সেখানে দেখায় একই যন্ত্র ভিন্ন ভাষায় ভিন্ন নামে চলে।
যেখানে আর্কাইভ নীরব ছিল:
আর যেখানে নামগুলো মিলে যায়: নিবন্ধটি বলছে বেহালা-জাতীয় ধুধুক চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত — চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা বলেন তুত্রুমাও, ত্রিপুরারা টুটু-আ। বাঁশের গাঁট থেকে দুটি সরু ফালি তুলে বেহালার মতো প্রভাব তৈরি করা হয়। একইভাবে খেং খরং মারমাদের কাছে ‘খ্রে খ্রং’, ত্রিপুরাদের কাছে ‘সাঙ্গুঙ্’; আর বে-আনা চাকমাদের ‘বেলা’, মারমাদের ‘বেয়াঁজ’, ম্রোদের ‘ত্র’।
মারমাদের যে বেহালা-জাতীয় যন্ত্রটিকে আর্কাইভে ‘এঃ’ বলা হয়েছে, বাংলাপিডিয়ায় তার নাম ক্রি-চয় — কাঠ ও কাঁসায় তৈরি, কাঠের গোল চাকতির ওপর পনেরো-বিশটি তার। দুটি একই যন্ত্র কি না, কোনো উৎসেই বলা নেই।
ককবরক লেখার চংপ্রেং-এর কাছাকাছি একটি নাম বাংলাপিডিয়ায় আছে চং প্রেই হিসেবে — আড়াই ফুট লম্বা কাঠের গিটার-জাতীয় যন্ত্র, তিনটি তার, সবচেয়ে নিচের তারে পাঁচটি ছোট কাঠের গুটি। তবে নিবন্ধে এটি উশৈ জনগোষ্ঠীর যন্ত্র হিসেবে লেখা, ককবরকভাষী ত্রিপুরাদের নয়। একই ধারায় সেঁদা (উশৈদের তিন-তারের যন্ত্র, দেখতে পাখির বাসার মতো) ও ফকির দাঙ্গাইস (ত্রিপুরা ও উশৈদের এক-তারের যন্ত্র)।
একটি জিনিস অবশ্য দুই উৎসে মেলে না। ককবরক লেখায় সারিন্দা ধরা হয়েছে ককবরকভাষীদের নিজস্ব যন্ত্র হিসেবে; বাংলাপিডিয়ার “সারিন্দা” নিবন্ধে (ওয়াকিল আহমদ) এটি বাংলা লোকসংগীতের যন্ত্র হিসেবে বর্ণিত — কাঠের ফ্রেম, চামড়া, তিনটি তার ও ছড়; পশুর লোম বা রেশমের সুতোয় তৈরি ছড় দিয়ে বাজানো হয়, কাহিনীগান ও নৌকাবাইচের সঙ্গে। দুটোই লিখে রাখা হলো।
পাহাড়ি আধুনিক গানের একটি নির্দিষ্ট জন্মকাল আছে, এবং সেটি বেশ সংক্ষিপ্ত।
আর্কাইভে সুগত চাকমার একটি স্মৃতিচারণে সময়রেখাটি ধরা আছে। ১৯৭২ সালে রাঙামাটি শহরে তিনটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন জন্ম নেয় — জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর (জুভাপ্রদ), মুড়োল্যা সাহিত্য ও সাংস্কৃতি গোষ্ঠী, এবং গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী। পরে যুক্ত হয় জাগরণী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, রাধামন সাহিত্য গোষ্ঠী, ফ্রেন্ডস লিটারেচার গ্রুপ, আর উন্মাদ শিল্পী গোষ্ঠী — যার নাম পরে হয় গেংখুলী শিল্পী গোষ্ঠী।
১৯৭২-এর বিঝুতে জুভাপ্রদের প্রথম সংকলন ‘বিঝু’ আর মুড়োল্যার প্রথম সংকলন ‘লুরা’ প্রকাশিত হয় — আর্কাইভের ভাষায়, এ দুটিই এ অঞ্চলে বিঝু-সংকলনের ধারা তৈরি করেছিল।
তারপর ১৯৭৪ সালে গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী প্রকাশ করে ‘শিঙগা’ — চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় লেখা আধুনিক গানের প্রথম সংকলন। একটি সংকলনে তিন ভাষা; পাহাড়ি আধুনিক গানের ধারণাটাই এখানে একসঙ্গে দাঁড়ায়।
গিরিসুরের জন্ম কীভাবে, তা লিখেছেন রণজিৎ দেওয়ান “পাহাড়ী ছাত্র সমিতি ও গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী” লেখায়। ১৯৭৩ সালে পাহাড়ি ছাত্র সমিতির সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিভাগের অধীনে গোষ্ঠীটি গঠিত হয়; নামকরণ করেন প্রয়াত প্রতিমা চাকমা, যিনি ‘হুক্কি মা’ নামে পরিচিত ছিলেন। ওই লেখায় রণজিৎ দেওয়ান নিজেই জানাচ্ছেন — বিঝু নৃত্যের ধারণাটি ছিল তাঁর, আর ঝর্ণা চাকমার সঙ্গে মিলে তিনি নৃত্যটি তৈরি করেন।
আগের অংশে সুগত চাকমার যে কথাটি উদ্ধৃত হয়েছিল — সত্তরের আগে চাকমাদের মধ্যে আজকের মতো নাচ দেখা যেত না — সেটির সঙ্গে এটি মিলিয়ে পড়লে ছবিটা পরিষ্কার হয়। বিঝু ঐতিহ্য প্রাচীন; বিঝু নৃত্য ১৯৭২-৭৩-এর সৃষ্টি, এবং তার রচয়িতাদের নাম জানা আছে।
আর্কাইভে ইন্টু মনি তালুকদারের নেওয়া রণজিৎ দেওয়ানের সাক্ষাৎকারটি এই পর্বের সবচেয়ে ঘন উৎস। কয়েকটি তারিখ:
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে জীবন্ত অংশটি অবশ্য শিরোনামেই: গ্রামোফোনের পাশের গর্তে মাথা নিচু করে তিনি দেখার চেষ্টা করতেন ভেতরে কারা গান করছে, আর এত ছোট জায়গায় এতজন থাকে কী করে। তাঁর কথায় — “তখন হারমোনিয়াম বাজানো দূরের কথা, চোখেও ভালোভাবে দেখিনি।” তবলা শিখছেন জেনে তাঁর বাবা ত্যাজ্যপুত্র করার ঘোষণা দিয়েছিলেন; দুদিন অনশনের পর তিনি মত দেন।
একই সময়ের আরেকটি নাম কুমার সমিত রায় (জন্ম ২২ আগস্ট ১৯৪৩) — চাকমা রাজপরিবারের সন্তান, পেশায় রাঙামাটি সরকারি কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক, আর গীতিকার-সুরকার। তাঁর লেখা “আজার বজর ধরি”, “কোচপানা কারে কয়”, “গাজ ফাগন্দি জুনান যেক্কে উদে”, “ও বার্গী তুই যা উরি” — গানগুলো এখনো গাওয়া হয়। তাঁর জীবনী আর্কাইভে আছে।
আর অমর শান্তি চাকমা — বাঘাইছড়ির বড়াদম গ্রামের শিক্ষক, যাঁর সম্পর্কে লেখা আছে যে তিনি চাকমা ও বাংলা ভাষায় তিন হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন। আশির দশকে সামরিক শাসনের সময়ে লেখা তাঁর “উত্তন পেগে মেঘে মেঘে” গানটির কথা ওই লেখায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ‘কাচালং মুরোল্যা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’র প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘জুম ঈসথেটিক কাউন্সিল’-এর সদস্য।
আর্কাইভের সংগীত-লেখাগুলোর একটা সাধারণ সুর আছে, আর সেটা উদ্বেগের।
ককবরক লেখাটির শঙ্কাটি সবচেয়ে নির্দিষ্ট: লোকবাদ্যযন্ত্রের শিল্পী যে দু-একজন এখনো জীবিত, তাঁদের কাছ থেকে যন্ত্র-ব্যবহারের ধারণা নিতে নবীনদের কেউ এগিয়ে আসছেন না। জাদুনী শিল্পী কৗলীয় দেববর্মার কথা উল্লেখ করে লেখক বলছেন, “বিশুদ্ধ জাদুনী গানে যে কথা ও সুরের লহরী রয়েছে বর্তমান যুগের জাদুনীতে তার কোনো মিল নেই।”
খুমী লেখাটি বলছে, তাদের লোকগীতি “আজকাল খুব কম সংখ্যক লোকজন চর্চা করছে”; পাশাপাশি ধর্মীয় সংগীতের চর্চা বাড়ছে।
আর একটি প্রশ্ন ককবরক লেখায় সরাসরি তোলা হয়েছে, যা পাহাড়ের সব ভাষার গানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য: হিন্দি বা বাংলা ছায়াছবির সুরের আদলে গাওয়া গানকে নিজের ভাষার গান বলা যায় কি না। লেখকের বাক্য — “যে গানে মাটির গন্ধ নেই, আমার সংস্কৃতির লেশমাত্র চিহ্ন নেই সেটা কী করে আমার গান হলো!”
এটি একটি মতামত, এবং সব শিল্পী এতে একমত হবেন না। কিন্তু প্রশ্নটি যে আর্কাইভের একাধিক লেখায় ফিরে ফিরে আসে, সেটাই লক্ষণীয়।
উল্টো দিকটাও আছে। যা ধরে রাখা হচ্ছে তার একটি নমুনা এই আর্কাইভ নিজেই — জুমজার্নালের সংগ্রহে তিনশোর বেশি গানের ভিডিও আছে। রেকর্ড করে রাখা গান আর লিখে রাখা যন্ত্রের নাম — দুটোই সংরক্ষণ, তবে আলাদা ধরনের। প্রথমটিতে সুরটা থাকে; দ্বিতীয়টিতে কেবল নামটুকু। মুরি-র বেলায় দ্বিতীয়টুকুই অবশিষ্ট।
পাহাড়ি বাদ্যযন্ত্র বলতে কী কী বোঝায়?
এক নামে কিছু বোঝায় না — প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব নাম ও যন্ত্র আছে। জুমজার্নালের আর্কাইভে যেগুলোর নাম পাওয়া যায়: চাকমাদের ধুদুক, হেঙগরঙ, শিঙা, ঢুল, ডগর, সারিন্দ্যা, তাক; মারমাদের খরা, মঙঃ, প্যাহ্, হ্নেঃ, চে ও এঃ; ককবরকভাষীদের সারিন্দা, সুমুই, চংপ্রেং, খাম, ওয়াখপ, দাংদু; বমদের রিরৎ, মিমীম, জলপাল; পাংখোয়াদের সিয়াল রাকি, ডার সন, ডার পুই, খোয়াং, থেই খাং, রুয়া খোয়াং, রুয়া টিংটাং; চাকদের বাইক-পুন, হ্নে, লাংহোয়াক।
বিঝু নৃত্য কি প্রাচীন?
বিঝু উৎসব প্রাচীন, কিন্তু আজ যে বিঝু নৃত্য মঞ্চে দেখা যায় সেটির রচনাকাল সত্তরের দশক। আর্কাইভে রণজিৎ দেওয়ান লিখেছেন, ধারণাটি ছিল তাঁর এবং ঝর্ণা চাকমার সঙ্গে মিলে তিনি নৃত্যটি তৈরি করেন। সুগত চাকমার বরাতেও বলা আছে, সত্তরের আগে চাকমাদের মধ্যে আজকের মতো নাচ দেখা যেত না।
পাহাড়ি ভাষায় প্রথম আধুনিক গানের সংকলন কোনটি?
আর্কাইভের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৭৪ সালে গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর প্রকাশিত ‘শিঙগা’ — চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় লেখা আধুনিক গান নিয়ে। এর দুই বছর আগে ১৯৭২-এ বিঝু উপলক্ষে বেরিয়েছিল জুভাপ্রদের ‘বিঝু’ ও মুড়োল্যার ‘লুরা’ সংকলন।
জাদুনী গান কী?
প্রাচীন ককবরক গানের সাধারণ নাম। আর্কাইভের লেখায় একে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে — কাজের গান, ঘুম পাড়ানোর গান, হৃদয়বিদারক গান, রেসের খাগড়া, ও মামিতার গান। কাজের গান আবার উত্তর, দক্ষিণি, দাসপা, দুনা ও বেরি রাগিনিতে বিভক্ত।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ৯ আগস্ট ২০২৬
প্রসঙ্গ:গান, চাকমা গান, বম লোকসংগীত, লোকসংগীত
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।