Jumjournal Logo

উপজাতীয় সনদপত্র সার্কেল চিফ দেন: জেলা পরিষদ নির্বাচনে জাতিগত পরিচয়ের সনদ, জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বিরোধ ও 2010-এর রায়

Last updated Oct 19th, 2026

2

বাংলাদেশের মানচিত্র, দক্ষিণ-পূর্ব কোণে লাল রঙে চিহ্নিত পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের একটি মারমা আসনে কেউ দাঁড়াতে চাইলে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে একটি কাগজ লাগবেই — চাকমা চিফের দেওয়া সার্টিফিকেট, যাতে লেখা থাকে তিনি উপজাতীয় এবং কোন উপজাতির। আইনের পাঠ অনুযায়ী জেলা পরিষদ নির্বাচনে উপজাতীয় সনদপত্র সার্কেল চিফ দেন, আর 1998 সাল থেকে অ-উপজাতীয় প্রার্থীর সনদও দেন তিনিই, তবে হেডম্যান বা ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে। 1989 সালের মূল আইনে এই ক্ষমতা ছিল ডেপুটি কমিশনারের হাতে।

এই লেখা তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের সেই দুটি উপধারা — 4(5) ও 4(6) — আর আঞ্চলিক পরিষদ আইনের 5(8) ও 5(9) ধারা হুবহু পাশাপাশি রাখে, দেখায় 1998 সালে কোন শব্দ বদলেছিল, তারপর অনুসরণ করে পরের পঁচিশ বছরের বিরোধ: 2000 সালের মন্ত্রণালয়ের আদেশ, আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত, 2010 সালের হাইকোর্টের রায় আর তার ওপর স্থগিতাদেশ। জেলা পরিষদে কোন জনগোষ্ঠীর কয়টি আসন, তা আলাদা লেখায় আছে — পার্বত্য জেলা পরিষদে আসন ভাগ হয় কীভাবে; আঞ্চলিক পরিষদের গঠন ও ক্ষমতা আছে আঞ্চলিক পরিষদের গঠন, ক্ষমতা ও আসন-বণ্টন লেখায়। এখানে সেগুলো আর বলা হচ্ছে না।

সূচিপত্র

  1. জেলা পরিষদ নির্বাচনে উপজাতীয় সনদপত্র সার্কেল চিফ দেন — আইনের হুবহু ভাষা
  2. 1989 সালে এই ক্ষমতা ছিল ডেপুটি কমিশনারের, বদল এল 1998-এ
  3. অ-উপজাতীয় প্রার্থীর সনদ: দুই ধাপের একটি শৃঙ্খল
  4. তিন জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদ: সনদের বিধান এক ছকে
  5. আঞ্চলিক পরিষদ আইনে একই বিধান, কিন্তু কোন চিফ তা লেখা নেই
  6. সার্কেলের সীমা আর জেলার সীমা মেলে না
  7. সনদ কি শুধু নির্বাচনের জন্য? স্থায়ী বাসিন্দার সনদ নিয়ে বিরোধের শুরু
  8. “এবং” না “বা”: অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দার সংজ্ঞায় একটি শব্দ
  9. 2000 সালের মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ: জেলা প্রশাসকও সনদ দেবেন
  10. সরকারের নিজের হিসাব: আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত ও “আংশিক বাস্তবায়িত”
  11. আজ কে কোন সনদ দেন: জেলা প্রশাসকের পোর্টাল, চিফের সনদ, দুই সনদের শর্ত
  12. 2010 সালের হাইকোর্টের রায়ে সনদের বিধান কী হয়েছিল
  13. বান্দরবানে “রাজার সনদ” বাতিলের দাবি
  14. 1989-এর পর নির্বাচন হয়নি — বিধানটি কি কখনো প্রয়োগ হয়েছে?
  15. প্রশ্নোত্তর
  16. যা এখনো জানা যায়নি
  17. তথ্যসূত্র

জেলা পরিষদ নির্বাচনে উপজাতীয় সনদপত্র সার্কেল চিফ দেন — আইনের হুবহু ভাষা

তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনেরই ধারা 4(5) বলে: কেউ উপজাতীয় কি না এবং কোন উপজাতির, তা স্থির করবেন জেলার সার্কেল চিফ, আর তাঁর সার্টিফিকেট ছাড়া কেউ উপজাতীয় হিসেবে চেয়ারম্যান বা উপজাতীয় সদস্যপদে প্রার্থী হতে পারবেন না। সনদটি তাই প্রার্থিতার পূর্বশর্ত, ভোটার হওয়ার নয়।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989 (1989 সনের 19 নং আইন)-এর ধারা 4(5), bdlaws-এ বর্তমান পাঠ:

“কোন ব্যক্তি উপজাতীয় কি না এবং হইলে তিনি কোন উপজাতির সদস্য তাহা জেলার [সার্কেল চিফ] স্থির করিবেন এবং এতদসম্পর্কে [সার্কেল চিফের] নিকট হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট ব্যতীত কোন ব্যক্তি উপজাতীয় হিসাবে চেয়ারম্যান বা কোন উপজাতীয় সদস্য পদের জন্য প্রার্থী হইতে পারিবেন না৷”

খাগড়াছড়ি (1989 সনের 20 নং আইন) ও বান্দরবান (1989 সনের 21 নং আইন) আইনের 4(5) শব্দে শব্দে একই, কেবল বানান “সার্কেল চীফ”। বন্ধনীর শব্দগুলো লক্ষ করার মতো — bdlaws-এ বন্ধনী মানে শব্দটি পরে বসানো হয়েছে। কে সেই “জেলার সার্কেল চিফ”, তা প্রতিটি আইনের ধারা 2(ঞ)-তে লেখা: রাঙ্গামাটিতে “চাকমা চীফ”, খাগড়াছড়িতে “মং চীফ”, বান্দরবানে “বোমাং চীফ”।

এখানে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার। প্রথমত, সনদের দরকার কেবল প্রার্থীর জন্য; ভোটার তালিকায় ওঠার শর্ত ধারা 17-তে আলাদা, সেখানে সনদের কথা নেই। দ্বিতীয়ত, আইনে সনদের কোনো ফরম, ফি, সময়সীমা বা প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের ব্যবস্থা লেখা নেই। তৃতীয়ত, সনদ দেওয়ার মাপকাঠি “উপজাতীয়” শব্দের সংজ্ঞা, যা ধারা 2(খ)-তে প্রতিটি জেলার জন্য আলাদা তালিকা দেয় — নিচের ছকে তিনটি তালিকা পাশাপাশি আছে। সার্কেল চিফের অন্যান্য ক্ষমতা ও পদটির ইতিহাস পাওয়া যাবে সার্কেল চিফ: তিনটি সার্কেল, আর রাজার ক্ষমতা আসলে কতটুকু লেখায়।

1989 সালে এই ক্ষমতা ছিল ডেপুটি কমিশনারের, বদল এল 1998-এ

মূল 1989 সালের আইনে কে উপজাতীয় তা স্থির করতেন জেলার ডেপুটি কমিশনার, সার্টিফিকেটও দিতেন তিনি। 1997 সালের পার্বত্য চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের 4(গ) দফা এই দুটি শব্দ বদলে “সার্কেল চীফ” বসানোর কথা বলে, আর 1998 সালের তিনটি সংশোধনী আইনের ধারা 6 তা কার্যকর করে।

bdlaws-এর পাদটীকায় বদলের হিসাব পরিষ্কার। রাঙ্গামাটি আইনের 4(5)-এর নিচে লেখা: “সার্কেল চিফ” শব্দগুলি “ডেপুটি কমিশনার” শব্দগুলির পরিবর্তে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ (সংশোধন) আইন, 1998 (1998 সনের 9 নং আইন)-এর 6 ধারাবলে প্রতিস্থাপিত। খাগড়াছড়ির ক্ষেত্রে একই বদল 1998 সনের 10 নং আইনে, বান্দরবানের ক্ষেত্রে 1998 সনের 11 নং আইনে — দুই ক্ষেত্রেই 6 ধারাবলে (খাগড়াছড়ি, বান্দরবান)।

চুক্তির পাঠ এই বদলকে আরও নির্দিষ্টভাবে বলে। আমাদের আর্কাইভে রাখা পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাংলা পাঠ অনুযায়ী ‘খ’ খণ্ডের 4(গ):

“৪ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৫)-এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত “ডেপুটি কমিশনার” এবং “ডেপুটি কমিশনারের” শব্দগুলির পরিবর্তে যথাক্রমে “সার্কেল চীফ” এবং “সার্কেল চীফের” শব্দগুলি প্রতিস্থাপিত হইবে।”

অর্থাৎ 1989 থেকে 1998 পর্যন্ত, প্রথম ও একমাত্র জেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় (25 জুন 1989), কে উপজাতীয় তা নির্ধারণের ক্ষমতা ছিল সরকারি প্রশাসকের হাতে। চুক্তি তা সরিয়ে প্রথাগত প্রধানের হাতে দেয়। এর পেছনের যুক্তি কী ছিল, চুক্তির পাঠে তা লেখা নেই; তবে নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের Peace Accords Matrix-এর বিশ্লেষণ বলছে, ‘খ’ খণ্ডের এই সংশোধনের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতাটি জাতিতে বাঙালি ডেপুটি কমিশনারদের হাত থেকে আদিবাসী কর্তৃপক্ষের হাতে সরানো (Peace Accords Matrix)।

চুক্তির পুরো ‘খ’ খণ্ড কীভাবে আইনে ঢুকেছে, তার ধারাভিত্তিক হিসাব আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি 1997: ধারা ধরে ধরে লেখায়।

অ-উপজাতীয় প্রার্থীর সনদ: দুই ধাপের একটি শৃঙ্খল

ধারা 4(6) পুরোপুরি নতুন, 1998 সালে যোগ হয়েছে। কেউ অ-উপজাতীয় কি না এবং কোন সম্প্রদায়ের, তা সার্কেল চিফ স্থির করবেন — তবে নিজে থেকে নয়, সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা পৌরসভার চেয়ারম্যানের দেওয়া সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে।

রাঙ্গামাটি আইনের ধারা 4(6), bdlaws:

“কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় কিনা এবং হইলে তিনি কোন সম্প্রদায়ের সদস্য তাহা সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা, ক্ষেত্রমত, পৌরসভার চেয়ারম্যান কর্তৃক এতদুদ্দেশ্যে প্রদত্ত সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে সার্কেল চীফ স্থির করিবেন এবং এতদ্‌সম্পর্কে সার্কেল চীফের নিকট হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট ব্যতীত কোন ব্যক্তি কোন অ-উপজাতীয় সদস্য পদের জন্য প্রার্থী হইতে পারিবেন না৷”

পাদটীকা বলছে উপধারাটি 1998 সনের 9 নং আইনের ধারা 6 দিয়ে “সংযোজিত”। খাগড়াছড়ি (10 নং) ও বান্দরবান (11 নং) আইনেও একই পাঠ।

এখানে দুই স্তরের সনদ কাজ করে। প্রথম স্তরে স্থানীয় সনদ — মৌজার হেডম্যান, নয়তো ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার চেয়ারম্যান। “বা” শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ: তিনজনের যেকোনো একজনের সনদই যথেষ্ট, আর পৌর এলাকায় “ক্ষেত্রমত” পৌরসভার চেয়ারম্যান। দ্বিতীয় স্তরে সার্কেল চিফের সনদ, যেটি ছাড়া প্রার্থিতা চলে না। হেডম্যানের দৈনন্দিন দায়িত্ব কী, তা আছে মৌজা হেডম্যান ও কার্বারি আসলে কী কী করেন লেখায়।

চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের 4(ঘ) আর আইনের পাঠের মধ্যে দুটি ছোট পার্থক্য আছে। চুক্তিতে লেখা ছিল সার্টিফিকেট “দাখিল সাপেক্ষে” সংশ্লিষ্ট সার্কেলের চীফ স্থির করবেন, আর সনদ ছাড়া কেউ “অ-উপজাতীয় হিসাবে” প্রার্থী হতে পারবেন না। আইনে হয়েছে “সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে” এবং শুধু “সার্কেল চীফ”। চুক্তির “সংশ্লিষ্ট সার্কেলের চীফ” কথাটি সার্কেল ধরে চিফ বোঝায়; আইনের “সার্কেল চীফ” ধারা 2(ঞ) অনুযায়ী জেলা ধরে একজন নির্দিষ্ট চিফ। এই পার্থক্যের ফল নিচে সার্কেল ও জেলার সীমা অংশে।

তিন জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদ: সনদের বিধান এক ছকে

চারটি আইনেই একই দুই ধাপের নিয়ম, কিন্তু কাকে “উপজাতীয়” ধরা হবে আর কোন চিফ সনদ দেবেন, তা আলাদা। নিচের ছক bdlaws-এর বর্তমান পাঠ থেকে তৈরি; জনগোষ্ঠীর নাম আইনের বানানে।

বিষয় রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ আইন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ আইন বান্দরবান জেলা পরিষদ আইন আঞ্চলিক পরিষদ আইন
আইন নম্বর1989 সনের 19 নং1989 সনের 20 নং1989 সনের 21 নং1998 সনের 12 নং
সনদের বিধান যে সংশোধনীতে1998 সনের 9 নং আইন, ধারা 61998 সনের 10 নং আইন, ধারা 61998 সনের 11 নং আইন, ধারা 6মূল আইনেই
উপজাতীয় সনদধারা 4(5)ধারা 4(5)ধারা 4(5)ধারা 5(9)
অ-উপজাতীয় সনদধারা 4(6)ধারা 4(6)ধারা 4(6)ধারা 5(8)
“সার্কেল চীফ” কে (সংজ্ঞা)চাকমা চীফ — ধারা 2(ঞ)মং চীফ — ধারা 2(ঞ)বোমাং চীফ — ধারা 2(ঞ)সংজ্ঞা নেই
“উপজাতীয়” কারা — ধারা 22(খ): চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যাঁ, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখোয়া ও খেয়াং (7টি)2(খ): চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা (3টি)2(খ): মারমা, ম্রো (মুরং), ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যাঁ, বম, চাকমা, খুমী, উচাই, চাক, খিয়াং, পাংখোয়া ও লুসাই (12টি)2(গ): চাকমা, মারমা, তনৈচংগা, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখো, খিয়াং, ম্রো, বোম, খুমী ও চাক (11টি)
প্রথম ধাপের স্থানীয় সনদ (অ-উপজাতীয়)মৌজার হেডম্যান বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা, ক্ষেত্রমত, পৌরসভার চেয়ারম্যান — চারটি আইনেই একই
ভোটারের শর্তধারা 17(1)(ঘ): জেলার স্থায়ী বাসিন্দাধারা 17(1)(ঘ): জেলার স্থায়ী বাসিন্দাধারা 17(1)(ঘ): জেলার স্থায়ী বাসিন্দাপরোক্ষ নির্বাচন — ধারা 6

ছক থেকে একটি বিষয় চোখে পড়ে, যা কেবল তালিকাগুলো পাশাপাশি রাখলেই ধরা যায়। খাগড়াছড়ি আইনের সংজ্ঞায় উপজাতীয় কেবল তিনটি জনগোষ্ঠী। সংজ্ঞার পাঠ অনুযায়ী মং চিফ খাগড়াছড়ির কোনো বাসিন্দাকে “উপজাতীয়” সনদ দেবেন কেবল তিনি চাকমা, ত্রিপুরা বা মারমা হলে। ওই তালিকার বাইরের কোনো জনগোষ্ঠীর সদস্য সংজ্ঞাগতভাবে “অ-উপজাতীয়” শ্রেণিতে পড়েন। রাঙ্গামাটির সাতটির তালিকা নিয়ে একই পর্যবেক্ষণ আছে আসন-বণ্টনের লেখায়। বাস্তবে খাগড়াছড়িতে এমন কোনো সনদ-আবেদন হয়েছে কি না, কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

আরেকটি বিষয়: তালিকাগুলোর কয়েকটি নাম পরে বদলেছে। রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান আইনে “তনচৈংগা” বদলে “তঞ্চঙ্গ্যাঁ”, “পাংখু” বদলে “পাংখোয়া” হয়েছে 2014 সালের সংশোধনীতে (রাঙ্গামাটি 2014 সনের 16 নং, বান্দরবান 2014 সনের 18 নং আইন); বান্দরবানে “বোম” হয়েছে “বম”, “খুশী” হয়েছে “খুমী”। আঞ্চলিক পরিষদ আইনে পুরোনো বানান — “তনৈচংগা”, “পাংখো”, “বোম” — এখনো রয়ে গেছে।

আঞ্চলিক পরিষদ আইনে একই বিধান, কিন্তু কোন চিফ তা লেখা নেই

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, 1998 (1998 সনের 12 নং আইন)-এর ধারা 5(8) ও 5(9) জেলা পরিষদ আইনের 4(6) ও 4(5)-এর প্রায় হুবহু অনুলিপি। কিন্তু এই আইনের সংজ্ঞা-ধারায় “সার্কেল চীফ” শব্দের কোনো সংজ্ঞা নেই, আর ধারা 5(9)-এ “জেলার” শব্দটিও নেই।

ধারা 5(9), bdlaws:

“কোন ব্যক্তি উপ-জাতীয় কিনা এবং হইলে তিনি কোন উপজাতির সদস্য তাহা সার্কেল চীফ স্থির করিবেন এবং এতদ্‌সম্পর্কে সার্কেল চীফের নিকট হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট ব্যতীত কোন ব্যক্তি উপ-জাতীয় হিসাবে চেয়ারম্যান বা কোন উপ-জাতীয় সদস্য পদের জন্য প্রার্থী হইতে পারিবেন না৷”

ধারা 5(8)-এর পাঠ জেলা আইনের 4(6)-এর সঙ্গে শব্দে শব্দে মেলে: হেডম্যান বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা ক্ষেত্রমত পৌরসভার চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে সার্কেল চীফ অ-উপজাতীয় পরিচয় স্থির করবেন।

আইনের ধারা 2-এ সংজ্ঞা আছে এগারোটি — “অ-উপজাতীয়”, “অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা”, “উপ-জাতীয়”, “চেয়ারম্যান”, “পরিষদ”, “পার্বত্য জেলা” ইত্যাদি — কিন্তু “সার্কেল চীফ” নেই। তিন জেলার প্রার্থী একই পরিষদের জন্য দাঁড়ান, তাই কোন প্রার্থীর সনদ কোন চিফ দেবেন, তা আইনের পাঠ থেকে সরাসরি জানা যায় না। আঞ্চলিক পরিষদের সদস্যরা জেলা পরিষদের সদস্যদের ভোটে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন (ধারা 6), আর এ পর্যন্ত সেই নির্বাচনও হয়নি, তাই প্রশ্নটি বাস্তবে ওঠার সুযোগ পায়নি।

সার্কেলের সীমা আর জেলার সীমা মেলে না

জেলা পরিষদ আইন প্রতিটি জেলার জন্য একজন চিফ নির্দিষ্ট করে, কিন্তু তিনটি সার্কেল তিনটি জেলার সীমা মেনে চলে না। খাগড়াছড়ির একাংশ চাকমা সার্কেলে, রাঙ্গামাটির একাংশ বোমাং সার্কেলে। 1997 সালের চুক্তি নিজেই এই অমিল স্বীকার করেছিল, তবে কেবল সভায় যোগদানের ধারার ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশের মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন সার্কেল রং দিয়ে চিহ্নিত: চাকমা সার্কেল হলুদ, মং সার্কেল কমলা, দক্ষিণে বোমাং সার্কেল নীল
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন সার্কেল। হলুদ চাকমা সার্কেলের একাংশ খাগড়াছড়ি জেলার ভেতরে পড়েছে। মানচিত্র: Ajijul Islam emon104 · CC BY 4.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের 12 নম্বর দফা, আমাদের আর্কাইভের পাঠ অনুযায়ী:

“যেহেতু খাগড়াছড়ি জেলার সমস্ত অঞ্চল মং সার্কেলের অন্তর্ভূক্ত নহে, সেহেতু খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার আইনে ২৬ নম্বর ধারায় বর্ণিত “খাগড়াছড়ি মং চীফ” এর পরিবর্তে “মং সার্কেলের চীফ এবং চাকমা সার্কেলের চীফ” শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে।”

একই দফায় রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের সভায় বোমাং সার্কেলের চিফেরও উপস্থিত থাকার সুযোগ রাখার কথা আছে। bdlaws-এ রাঙ্গামাটি আইনের ধারা 26-এর শিরোনামও এখন “পরিষদের সভায় চাকমা চীফ ও বোমাং চীফের যোগদানের অধিকার”। অর্থাৎ ধারা 26-এ সীমার অমিল সংশোধন হয়েছে। কিন্তু সনদের ধারা 4(5) ও 4(6) “জেলার সার্কেল চিফ” বা “সার্কেল চীফ” বলে, আর ধারা 2(ঞ) প্রতিটি জেলায় একজন চিফকেই চিহ্নিত করে — সেখানে এমন কোনো সংশোধন নেই।

কোন উপজেলার কয়টি মৌজা কোন সার্কেলে, তার নির্ভরযোগ্য সূত্রসহ হিসাব পাওয়া যায়নি। তবু আইনের পাঠ ধরলে, খাগড়াছড়ির চাকমা সার্কেলভুক্ত কোনো মৌজার একজন বাসিন্দা খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদে প্রার্থী হতে চাইলে সনদ দেবেন মং চিফ, যদিও তাঁর মৌজার হেডম্যান চাকমা সার্কেলের। রাঙ্গামাটির বোমাং সার্কেলভুক্ত কোনো মৌজার বাসিন্দার বেলায় রাঙ্গামাটি আইন অনুযায়ী সনদ দেবেন চাকমা চিফ। বাস্তবে এমন ক্ষেত্রে কী করা হয়, কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

সনদ কি শুধু নির্বাচনের জন্য? স্থায়ী বাসিন্দার সনদ নিয়ে বিরোধের শুরু

ধারা 4(5) ও 4(6) সরাসরি কেবল জেলা পরিষদের প্রার্থিতার কথা বলে। কিন্তু পাহাড়ে চাকরি, ভর্তি ও জমির কাজে যে “স্থায়ী বাসিন্দার সনদ” লাগে, সেটি কে দেবেন — এই প্রশ্নে জনসংহতি সমিতি এই দুই ধারাকেই ভিত্তি হিসেবে ধরে, আর সরকারি কর্তৃপক্ষ বলে ধারাগুলো শুধু নির্বাচনের জন্য। বিরোধের মূল এখানেই।

এই বিরোধের সমকালীন একটি বিবরণ আমাদের আর্কাইভেই আছে — শ্রী তাতিন্দ্র লাল চাকমার লেখা স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রসঙ্গে। লেখাটির ভেতরে 11 অক্টোবর 2002-এর একটি স্মারকলিপির উল্লেখ আছে, তাই এটি তার পরে লেখা। লেখক জানান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিভাগের শূন্যপদে নিয়োগের সার্কুলারে বলা হয়েছিল, “স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র জেলা প্রশাসক ও তার পাশাপাশি সার্কেল চীফও দিতে পারবেন।”

লেখকের বিবরণ অনুযায়ী জনসংহতি সমিতি এর প্রতিবাদে স্মারকলিপি দেয়। সেখানে দাবি ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, জেলা পরিষদ (সংশোধিত) আইন 1998 বা আঞ্চলিক পরিষদ আইন 1998 — কোনোটিতেই জেলা প্রশাসককে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, আর “২(কক) ও ৪(৬) ধারা অনুযায়ী” হেডম্যান বা ইউপি বা পৌরসভা চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে এই সনদ দেবেন সংশ্লিষ্ট সার্কেল চিফ। লেখক আরও জানান, এর আগে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে শুধু সার্কেল চিফের সনদের বিধান রেখেছিল।

উল্টো অবস্থানটিও একই লেখায় আছে। লেখকের বিবরণে, স্মারকলিপি গ্রহণের সময় রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ডঃ মানিকলাল দেওয়ান বলেন চুক্তির ওই বিষয়টি “শুধুমাত্র নির্বাচনের জন্য প্রযোজ্য” এবং তিনি সরকারের নির্দেশ অমান্য করতে পারবেন না। প্রায় এক দশক পরে জনসংহতি সমিতির 2013 সালের বাস্তবায়ন-প্রতিবেদনও একই সরকারি ব্যাখ্যার কথা লেখে: কর্তৃপক্ষ বলছে বিধানটি “applicable only to the election to the posts of the members of the HDCs” (PCJSS, 2013)। আর 2025 সালে বান্দরবানের Hill News BD-র একটি সম্পাদকীয়, যা সার্কেল চিফের সনদ-ব্যবস্থার বিরোধিতা করে, সেটিও যুক্তি দেয় যে চুক্তি ও জেলা পরিষদ আইন এই সনদ চায় কেবল নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীর ক্ষেত্রে (Hill News BD, 13 অক্টোবর 2025)।

আইনের পাঠে যা নিশ্চিত: ধারা 4(5) ও 4(6)-এর শেষাংশ শুধু প্রার্থিতার কথা বলে। আর “স্থায়ী বাসিন্দা” কে, তা নির্ধারণের কোনো কর্তৃপক্ষ জেলা পরিষদ আইনে আলাদা করে নির্দিষ্ট নেই — ধারা 17 ভোটারের শর্ত হিসেবে “স্থায়ী বাসিন্দা” হওয়ার কথা বলে, কিন্তু কে তা সনদ দিয়ে প্রমাণ করবেন, বলে না। জনসংহতি সমিতির যুক্তি এই ফাঁকটুকু 4(6) দিয়ে পূরণ করে; সরকারি অবস্থান পূরণ করে জেলা প্রশাসক দিয়ে।

“এবং” না “বা”: অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দার সংজ্ঞায় একটি শব্দ

চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের 3 নম্বর দফায় অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা মানে যাঁর বৈধ জায়গা-জমি আছে এবং যিনি সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণত বসবাস করেন। জেলা পরিষদ আইনের ধারা 2(কক)-র বর্তমান পাঠে শব্দটি “বা”। এই শব্দ নিয়ে জনসংহতি সমিতির বক্তব্য আর bdlaws-এর পাঠ মেলে না।

চুক্তির দফা 3, আর্কাইভের পাঠ: “অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা” বলিতে যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা জমি আছে এবং যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণত বসবাস করেন তাহাকে বুঝাইবে।

রাঙ্গামাটি আইনের ধারা 2(কক), bdlaws: “অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা” অর্থ যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাঁহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা-জমি আছে বা যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণতঃ বসবাস করেন। পাদটীকা অনুযায়ী দফাটি 1998 সনের 9 নং আইনের ধারা 4 দিয়ে সন্নিবেশিত; পরে কোনো সংশোধনের উল্লেখ নেই। আঞ্চলিক পরিষদ আইনের 2(খ)-তে শব্দটি “এবং” — এই পার্থক্যটি আসন-বণ্টনের লেখায় আলোচিত হয়েছে।

জনসংহতি সমিতির 2013 সালের প্রতিবেদন বলছে, 1998 সনের 9 নং আইনে “and”-এর জায়গায় “or” বসানো হয়েছিল, আর জুম্ম জনগণের প্রতিবাদের পর 1998 সনের XXIII নং আইনে বিধানটি চুক্তি অনুযায়ী সংশোধন করা হয়। bdlaws-এ রাঙ্গামাটি আইনের বর্তমান পাঠে শব্দটি এখনো “বা”, আর পাদটীকায় 1998 সনের 23 নং আইনের কোনো উল্লেখ নেই। দুই উৎসের এই অমিল মেলানো যায়নি; 1998 সনের 23 নং আইনের পাঠ এই লেখার উৎসগুলোতে পাওয়া যায়নি।

শব্দটির গুরুত্ব সনদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। “এবং” হলে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ দিতে জমির বৈধতা যাচাই লাগে; “বা” হলে নির্দিষ্ট ঠিকানায় বসবাসই যথেষ্ট। তাতিন্দ্র লাল চাকমার যুক্তি ছিল ঠিক এই জায়গায়: বৈধ জমি আছে কি নেই তা “বাছবিচার করার সুবিধার্থে” হেডম্যান ও সার্কেল চিফকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ ঐতিহ্যগতভাবে তাঁরাই জমির খাজনা আদায় করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে জমির বৈধতা প্রশ্নটি নিজেই ভূমি কমিশনের অমীমাংসিত বিষয় — বিস্তারিত পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি: 1900 সালের রেগুলেশন থেকে ভূমি কমিশন লেখায়।

2000 সালের মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ: জেলা প্রশাসকও সনদ দেবেন

জনসংহতি সমিতির নথি অনুযায়ী 21 ডিসেম্বর 2000 পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি নির্দেশ জারি করে, যাতে তিন পার্বত্য জেলার ডেপুটি কমিশনারদের সার্কেল চিফের পাশাপাশি স্থায়ী বাসিন্দার সনদ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়। নির্দেশের নম্বর দেওয়া আছে CHTAM(P-1)-HDC/Certificate/62/99-587।

এই নির্দেশের তারিখ নিয়ে দুই উৎস ভিন্ন কথা বলে। জনসংহতি সমিতির 2013 সালের প্রতিবেদন বলছে তারিখ 21 ডিসেম্বর 2000 (PCJSS, 2013); Peace Accords Matrix একই নম্বরের (HDC/Certificate/62/99-587) আদেশকে 1999 সালের ঘটনা হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে (Peace Accords Matrix)। নম্বরের ভেতরের “99” অংশটি নথি-ফাইল খোলার বছর হতে পারে, তবে কোনো উৎস তা বলে না।

জনসংহতি সমিতির প্রতিবেদন এ বিষয়ে আরও তিনটি দাবি করে, প্রতিটিই সংগঠনটির নিজস্ব বক্তব্য:

  1. আঞ্চলিক পরিষদের আপত্তির পর 1 জুলাই 2001 পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সভায় নির্দেশটি বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়, কিন্তু বাতিলের কোনো আদেশ জারি হয়নি।
  2. বাংলাদেশের কোনো আইনে কোনো জেলার ডেপুটি কমিশনারকে এ ধরনের সনদ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া নেই; সামরিক শাসনামলের “Charter of Duties of Deputy Commissioners”-এর অধীনে তাঁরা কেবল নাগরিকত্ব সনদ দিতে পারেন।
  3. ডেপুটি কমিশনারের সনদ নিয়ে অস্থায়ী বাঙালি বসতিস্থাপনকারীরা চাকরি, জমি কেনা বা বন্দোবস্ত এবং উচ্চশিক্ষায় জুম্ম ছাত্রদের জন্য সংরক্ষিত কোটা পাচ্ছেন।

Peace Accords Matrix দ্বিতীয় দাবিটির একটি ভিন্ন দিক দেখায়: 2000 সালে ডেপুটি কমিশনারের “Charter of Duties”-এর 11 ধারার 5 উপধারায় “domicile certificates” দেওয়ার ক্ষমতা তালিকাভুক্ত ছিল। অর্থাৎ নথিটির অস্তিত্ব নিয়ে দুই উৎস একমত, এর আইনি ওজন নিয়ে নয়।

আমাদের আর্কাইভের লেখাটিতে তাতিন্দ্র লাল চাকমা এই নির্দেশের দায় তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী কল্পরঞ্জন চাকমার ওপর দেন — তাঁর ভাষায় মন্ত্রী “লিখিত নির্দেশ” দিয়েছিলেন যে সার্কেল চিফের পাশাপাশি জেলা প্রশাসকও স্থায়ী বাসিন্দার সনদ দিতে পারবেন। মন্ত্রীর পক্ষের কোনো বক্তব্য বা ব্যাখ্যা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

সরকারের নিজের হিসাব: আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত ও “আংশিক বাস্তবায়িত”

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত চুক্তি বাস্তবায়ন-অগ্রগতির নথি অ-উপজাতীয় সনদের দফা ‘খ’ 4(ঘ)-কে “আংশিক বাস্তবায়িত” বলে। কারণ হিসেবে নথিটি আইন মন্ত্রণালয়ের একটি মতামত উদ্ধৃত করে: জেলা প্রশাসকগণ অধিবাসীদের চাকুরিসহ সকল প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র দিতে পারবেন।

নথিটি (মন্ত্রণালয়ের “শান্তি চুক্তি ও বাস্তবায়ন অগ্রগতি” পাতা, পিডিএফ সংযুক্তি) পুরোনো বিজয় এনকোডিংয়ে লেখা; নিচের পাঠ ইউনিকোডে রূপান্তরিত। ‘খ’ 4(ঘ)-এর বাস্তবায়ন-অবস্থার ঘরে লেখা:

“এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত গ্রহণ করা হয়। আইন মন্ত্রণালয় পার্বত্য জেলা পরিষদের আইন পর্যালোচনাক্রমে “পার্বত্য জেলাসমূহের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকগন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের চাকুরীসহ সকল প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন” মর্মে আইনগত মতামত ব্যক্ত করেছে।”

মতামতটি কবে দেওয়া হয়েছিল, নথিতে তারিখ নেই। একই নথির সারাংশ অনুযায়ী চুক্তির 72টি ধারার মধ্যে 48টি সম্পূর্ণ, 15টি আংশিক বাস্তবায়িত এবং 9টির বাস্তবায়ন চলমান; ‘খ’ খণ্ডের 3 নম্বর দফা (অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দার সংজ্ঞা) সম্পূর্ণ বাস্তবায়িতের তালিকায়, 4(ঘ) আংশিকের তালিকায়।

ভোটার তালিকার দফা ‘খ’ 9 সম্পর্কে একই নথি একটি স্বীকারোক্তি দেয়, যা সনদের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত: পার্বত্য জেলায় ভূমি মালিকানার বিষয়টি ভূমি কমিশন কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন থাকায় “পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা নির্ধারণ হয়নি”। পৃথক ভোটার তালিকা করা যাবে কি না, সে বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত চাওয়া হয়েছিল; নথির ভাষায় বেশ কয়েকবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও মতামত পাওয়া যায়নি, সর্বশেষ 21/12/2011 তারিখে আইন ও বিচার বিভাগের সচিবকে “তাগিদপত্র-১২” দেওয়া হয়। দফাটির অবস্থা: আংশিক বাস্তবায়িত।

জনসংহতি সমিতির হিসাব ভিন্ন। তাদের 2013 সালের প্রতিবেদনের ছকে দফা 3-এর ঘরে লেখা, সংজ্ঞা আইনে আছে, কিন্তু সরকার অ-উপজাতীয় বহিরাগতদের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে সুবিধা দিয়ে চলেছে; সনদের ঘরে লেখা, 21 ডিসেম্বর 2000-এর নির্দেশ বাতিলের বারবার দাবি সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আজ কে কোন সনদ দেন: জেলা প্রশাসকের পোর্টাল, চিফের সনদ, দুই সনদের শর্ত

আজ রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসকের কার্যালয় অনলাইনে স্থায়ী বাসিন্দা সনদের আবেদন নেয়, আর আবেদনের সঙ্গে স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেয়র বা হেডম্যানের সনদ চায়। অর্থাৎ ধারা 4(6)-এর প্রথম ধাপের স্থানীয় সনদ এখানেও আছে, কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে সার্কেল চিফের জায়গায় জেলা প্রশাসক।

রাঙ্গামাটির পোর্টাল সনদটিকে বলে “জেলা প্রশাসক প্রদত্ত স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র”, যা জেলার বাসিন্দাদের “বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রয়োজনীয়”; আবেদনের সঙ্গে জন্ম নিবন্ধন, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং চেয়ারম্যান/মেয়রের সনদের স্ক্যান কপি লাগে (residence.rangamati.gov.bd)। খাগড়াছড়ির পোর্টালের প্রশ্নোত্তরে প্রয়োজনীয় কাগজের তালিকায় আছে ছবি, জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট, “হেডম্যানের সার্টিফিকেট ইউপি চেয়ারম্যান বা মেয়রের সার্টিফিকেট”, আর আবেদনের 7 দিনের মধ্যে ফি জমা দেওয়ার কথা (residence.dc-khagrachhari.gov.bd)। দুটি পোর্টালের কোনোটিই কোনো আইন বা পরিপত্রের নাম উল্লেখ করে না। বান্দরবানের এমন কোনো পোর্টাল এই লেখার উৎসগুলোতে পাওয়া যায়নি।

একাধিক ক্ষেত্রে সনদ লাগে দুটোই। Peace Accords Matrix-এর তথ্যমতে 2007–08 সালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি নথি (নম্বর 31/2008/713) উপজাতীয় বাসিন্দাদের সার্কেল চিফ ও ডেপুটি কমিশনার দুজনেরই স্থায়ী বাসিন্দার সনদ দেখাতে বলেছিল, অথচ বাঙালিদের জন্য কেবল ডেপুটি কমিশনারের সনদই যথেষ্ট ছিল; শুধু চিফের সনদধারী উপজাতীয় ব্যক্তিকে স্থায়ী বাসিন্দা গণ্য করা হয়নি (Peace Accords Matrix)। মূল নথিটি এই লেখার উৎসগুলোতে পাওয়া যায়নি।

চাকরি ও ভর্তির কোটায় “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সনদ” আলাদা একটি কাগজ, আর সেটি কে দেন — পাহাড়ে সার্কেল চিফ, সমতলে জেলা প্রশাসক, মেডিকেল ভর্তিতে চিফ ও জেলা প্রশাসক দুজনের সনদ — তার হিসাব আছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কোটা কারা পাচ্ছেন লেখায়। জেলা পরিষদ আইনের সনদ, স্থায়ী বাসিন্দার সনদ আর কোটার সনদ — তিনটি আলাদা কাগজ, যদিও তিনটির সঙ্গেই সার্কেল চিফের নাম জড়িত।

2010 সালের হাইকোর্টের রায়ে সনদের বিধান কী হয়েছিল

13 এপ্রিল 2010 হাইকোর্ট বিভাগ আঞ্চলিক পরিষদ আইন 1998-কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে, আর একই রায়ে 1998 সালের সংশোধিত জেলা পরিষদ আইনের কয়েকটি ধারাও বাতিল করে — তার একটি সেই বিধান, যাতে অ-উপজাতীয়দের সার্কেল চিফের কাছ থেকে সনদ নিতে হয়। আপিল বিভাগ রায়টি স্থগিত করে, আর সেই স্থগিতাদেশ আপিল নিষ্পত্তি পর্যন্ত বহাল।

মামলাটির উৎস 2000 সালে একজন বাঙালি বসতিস্থাপনকারী মোহাম্মদ বদিউজ্জামানের দায়ের করা রিট; 2007 সালে আইনজীবী তাজুল ইসলাম চুক্তিটিকেই অবৈধ ঘোষণার আরেকটি রিট করেন। রায় দেন বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর বেঞ্চ, 12 ও 13 এপ্রিল 2010 (The Daily Star, 14 এপ্রিল 2010; বাংলা ট্রিবিউন, 30 জানুয়ারি 2018)। বাংলা ট্রিবিউনের ভাষায়, ওই রায়ে “পার্বত্য শান্তি চুক্তিকে বৈধ ঘোষণা করা হয়।”

জেলা পরিষদ আইনের কোন বিধানগুলো বাতিল হয়েছিল, তার দুটি স্বাধীন বিবরণ পাওয়া যায়:

  • দ্য ডেইলি স্টার (14 এপ্রিল 2010): বাতিল হওয়া বিধানের মধ্যে আছে সেটি, যাতে বাঙালি বসতিস্থাপনকারীদের সার্কেল চিফের কাছ থেকে অ-আদিবাসী হওয়ার সনদ নিতে হয়; সেটি, যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে জমি না থাকলে কেউ ভোটার হতে পারেন না; এবং জেলা পরিষদ ও পুলিশে চাকরিতে পাহাড়িদের অগ্রাধিকারের বিধান।
  • জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের সমীক্ষা (E/C.19/2011/6, 18 ফেব্রুয়ারি 2011), অনুচ্ছেদ 32: বাতিল হওয়া ধারার মধ্যে আছে বাঙালি বসতিস্থাপনকারীদের সংশ্লিষ্ট প্রথাগত প্রধানের কাছ থেকে স্থায়ী বসবাসের সনদ নেওয়ার বিধান, বৈধ জমি ছাড়া ভোটার না হওয়ার বিধান, এবং পরিষদে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদ আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষণের বিধান (E/C.19/2011/6)।

দুই উৎসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় বাতিলের তালিকায় ছিল ধারা 4(6) — অ-উপজাতীয়দের জন্য সার্কেল চিফের সনদ। উপজাতীয় প্রার্থীর সনদের ধারা 4(5) বাতিল হয়েছিল কি না, দুই উৎসের কোনোটি তা বলে না; রায়ের পূর্ণ পাঠ এই লেখার উৎসগুলোতে পাওয়া যায়নি।

এরপর স্থগিতাদেশ। দ্য ডেইলি স্টারের 9 জানুয়ারি 2018-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার বিচারপতি হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন, 3 মার্চ 2011 আপিল বিভাগ সেই স্থগিতাদেশ বহাল রাখে, আর আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকবে; সরকার ও আঞ্চলিক পরিষদ আলাদা দুটি আপিল করে (The Daily Star, 9 জানুয়ারি 2018)। বাংলা ট্রিবিউন একই তারিখকে লিখেছে লিভ টু আপিল মঞ্জুরের দিন হিসেবে। 2018 সালের জানুয়ারিতে প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ রিটকারীর আইনজীবীর আবেদনে শুনানি পিছিয়ে দেয় — প্রথমে 23 জানুয়ারি, পরে 6 মার্চ। এরপর আপিলের রায় হয়েছে কি না, কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

ফলে আজ bdlaws-এ ধারা 4(6) অপরিবর্তিত অবস্থায় আছে, আর স্থগিতাদেশের কারণে আইনগতভাবে বলবৎ। তবে এটি এমন একটি বিধান, যার বৈধতা নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে একটি আপিল দেড় দশক ধরে অমীমাংসিত।

বান্দরবানে “রাজার সনদ” বাতিলের দাবি

2024–25 সালে বান্দরবানে বাঙালি নাগরিক সংগঠনগুলো বোমাং চিফের দেওয়া সনদ — স্থানীয়ভাবে “রাজার সনদ” — বাতিলের দাবি তোলে। এই দাবি জেলা পরিষদ নির্বাচনের সনদ নিয়ে নয়, জমি, চাকরি ও অন্যান্য কাজে চিফের স্থায়ী বাসিন্দার সনদ চাওয়ার প্রথা নিয়ে।

দেশ রূপান্তর জানায়, 26 আগস্ট 2025 পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের বান্দরবান জেলা শাখা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করে চারটি দাবি তোলে, যার একটি “রাজার সনদ বাতিল করতে হবে” (দেশ রূপান্তর, 26 আগস্ট 2025)। প্রতিবেদনে সনদটি কোন কাজে লাগে, তা বলা নেই।

Hill News BD-র 13 অক্টোবর 2025-এর সম্পাদকীয় (লেখকের নাম নেই) এই অবস্থানের যুক্তিগুলো সাজায়। সেখানে দাবি করা হয়, জমি বিক্রি ও নিবন্ধন, নামজারি এবং চাকরিতে সার্কেল চিফের স্থায়ী বাসিন্দা সনদ ও হেডম্যান প্রতিবেদন চাওয়া হয়; সম্পাদকীয়র ভাষায় “সরকারিভাবে এই সনদের প্রয়োজনীয়তার কোনো ব্যাখ্যা নেই”; আর দুজন আইনজীবী 15 আগস্ট 2024 বান্দরবানের জেলা প্রশাসকের কাছে এই সনদ ও হেডম্যান প্রতিবেদনের শর্ত বাতিলের আবেদন করেন। সম্পাদকীয়টি অর্থ আদায় ও জালিয়াতির অভিযোগও তোলে, তবে কোনো মামলা বা সরকারি তদন্তের সূত্র দেয় না। বোমাং চিফের কার্যালয়ের কোনো জবাব কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

লক্ষণীয়, এই দুই অবস্থানের দুই প্রান্ত — জনসংহতি সমিতি, যারা চায় স্থায়ী বাসিন্দার সনদ কেবল চিফ দিন, আর বান্দরবানের নাগরিক পরিষদ, যারা চায় চিফের সনদ বাতিল হোক — দুটিই একই দুই উপধারা, 4(5) ও 4(6), পড়ে উল্টো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। প্রথম পক্ষ বলে ধারাগুলো সনদের কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দিয়েছে; দ্বিতীয় পক্ষ বলে ধারাগুলো কেবল প্রার্থীর জন্য, অন্য কাজে প্রযোজ্য নয়।

1989-এর পর নির্বাচন হয়নি — বিধানটি কি কখনো প্রয়োগ হয়েছে?

যে বিধানের সরাসরি কাজ নির্বাচনের প্রার্থী বাছাই, সেই নির্বাচনই 1989 সালের পর আর হয়নি। জাতিসংঘের সমীক্ষা (2011) ও দৈনিক সোনার বাংলা (2024) দুটিই বলে, 1989 সালের প্রথম নির্বাচনের পর জেলা পরিষদগুলো সরকার-মনোনীতদের দিয়ে চলছে। ফলে 1998-এ যুক্ত সার্কেল চিফের সনদের বিধান এখনো কোনো জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রয়োগ হওয়ার সুযোগ পায়নি।

জাতিসংঘের সমীক্ষার অনুচ্ছেদ 29 বলে, 1989 সালের “প্রথম এবং বেশ বিতর্কিত” নির্বাচনের পর পরিষদগুলো সরকার-মনোনীতদের দিয়ে পরিচালিত, চুক্তির পর কোনো নির্বাচন হয়নি, আর বাধাগুলোর একটি ভোটার তালিকা — চুক্তি কেবল স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে তালিকা চায় (E/C.19/2011/6)। দৈনিক সোনার বাংলা 23 এপ্রিল 2024 লিখেছে, নির্বাচন “প্রথম ও শেষবার অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালের ২৫ জুন” (দৈনিক সোনার বাংলা)।

তাই সনদ-বিধানের ইতিহাসটা এক অর্থে উল্টো পথে চলেছে। নির্বাচনের সনদ হিসেবে বিধানটির কাজ শুরুই হয়নি; অথচ নির্বাচনের বাইরের ক্ষেত্রে — চাকরি, ভর্তি, জমি — স্থায়ী বাসিন্দার সনদ নিয়ে বিরোধ পঁচিশ বছর ধরে চলছে, আর সেই বিরোধের দুই পক্ষই নিজেদের যুক্তি টানে এই দুই উপধারা থেকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক কাঠামোর অন্যান্য বিষয়ের জন্য দেখতে পারেন আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতা।

প্রশ্নোত্তর

জেলা পরিষদ নির্বাচনে উপজাতীয় সনদ কে দেন?

জেলার সার্কেল চিফ। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ধারা 4(5) অনুযায়ী কেউ উপজাতীয় কি না এবং কোন উপজাতির, তা সার্কেল চিফ স্থির করেন, আর তাঁর সার্টিফিকেট ছাড়া কেউ উপজাতীয় হিসেবে চেয়ারম্যান বা উপজাতীয় সদস্যপদে প্রার্থী হতে পারেন না। রাঙ্গামাটিতে চাকমা চিফ, খাগড়াছড়িতে মং চিফ, বান্দরবানে বোমাং চিফ।

অ-উপজাতীয় প্রার্থীর সনদ কে দেন?

সার্কেল চিফ, তবে দুই ধাপে। ধারা 4(6) অনুযায়ী আগে সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান, নয়তো ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট দেন; তার ভিত্তিতে সার্কেল চিফ স্থির করেন ব্যক্তিটি অ-উপজাতীয় কি না এবং কোন সম্প্রদায়ের। চিফের সনদ ছাড়া অ-উপজাতীয় সদস্যপদে প্রার্থী হওয়া যায় না। উপধারাটি 1998 সালে যোগ হয়।

1989 সালের মূল আইনে কে সনদ দিতেন?

জেলার ডেপুটি কমিশনার। মূল আইনের 4(5)-এ “ডেপুটি কমিশনার” ও “ডেপুটি কমিশনারের” শব্দ ছিল। 1997 সালের চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের 4(গ) দফা অনুযায়ী 1998 সালের তিনটি সংশোধনী আইনের (1998 সনের 9, 10 ও 11 নং) ধারা 6 এই শব্দগুলো বদলে “সার্কেল চিফ/চীফ” বসায়। অ-উপজাতীয়দের সনদের বিধান মূল আইনে ছিলই না।

উপজাতীয় সনদপত্র সার্কেল চিফের কাছ থেকে নিতে হয় কোন ধারায়?

জেলা পরিষদের জন্য তিন আইনের ধারা 4(5), আর আঞ্চলিক পরিষদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন 1998-এর ধারা 5(9)। অ-উপজাতীয় সনদের জন্য যথাক্রমে ধারা 4(6) ও 5(8)। আঞ্চলিক পরিষদ আইনে “সার্কেল চীফ” শব্দের কোনো সংজ্ঞা নেই, তাই কোন প্রার্থীর সনদ কোন চিফ দেবেন, আইনের পাঠে তা নির্দিষ্ট নয়।

স্থায়ী বাসিন্দার সনদ কি জেলা প্রশাসক দিতে পারেন?

সরকার বলে পারেন, জনসংহতি সমিতি বলে পারেন না। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন-নথি আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত উদ্ধৃত করে: জেলা প্রশাসকগণ চাকুরিসহ সকল প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ দিতে পারবেন। জনসংহতি সমিতির 2013 সালের প্রতিবেদন বলে কোনো আইনে জেলা প্রশাসককে এই ক্ষমতা দেওয়া নেই, এবং জেলা পরিষদ আইনের 4(6) অনুযায়ী এটি সার্কেল চিফের কাজ।

21 ডিসেম্বর 2000-এর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কী ছিল?

জনসংহতি সমিতির 2013 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ নং CHTAM(P-1)-HDC/Certificate/62/99-587 তিন পার্বত্য জেলার ডেপুটি কমিশনারদের সার্কেল চিফের পাশাপাশি স্থায়ী বাসিন্দার সনদ দেওয়ার ক্ষমতা দেয়। Peace Accords Matrix একই নম্বরের আদেশকে 1999 সালের বলে তালিকাভুক্ত করেছে। 1 জুলাই 2001 বাতিলের সিদ্ধান্ত হলেও আদেশ জারি হয়নি বলে সমিতির দাবি।

হাইকোর্ট কি সার্কেল চিফের সনদের বিধান বাতিল করেছিল?

হ্যাঁ, অ-উপজাতীয়দের ক্ষেত্রে। দ্য ডেইলি স্টার (14 এপ্রিল 2010) ও জাতিসংঘের সমীক্ষা E/C.19/2011/6 অনুযায়ী 13 এপ্রিল 2010-এর রায়ে বাঙালিদের সার্কেল চিফের কাছ থেকে সনদ নেওয়ার বিধান এবং জমি ছাড়া ভোটার না হওয়ার বিধান বাতিল হয়। আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশের কারণে রায়টি কার্যকর নয়; 3 মার্চ 2011 স্থগিতাদেশ বহাল রাখা হয়।

হাইকোর্টের রায়ের পর এখন বিধানটির অবস্থা কী?

bdlaws-এ ধারা 4(6) অপরিবর্তিত, আর আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত — দ্য ডেইলি স্টার 9 জানুয়ারি 2018-এ এটি জানিয়েছে। 2018 সালের জানুয়ারি ও মার্চে আপিল শুনানির তারিখ পড়েছিল। এরপর আপিল বিভাগের কোনো রায় হয়েছে কি না, প্রকাশিত কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

রাঙ্গামাটির মারমা বা ত্রিপুরা প্রার্থী কোন চিফের সনদ নেবেন?

চাকমা চিফের। রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ আইনের ধারা 2(ঞ) অনুযায়ী ওই আইনে “সার্কেল চীফ” অর্থ চাকমা চীফ, আর ধারা 4(5) “জেলার সার্কেল চিফ”-এর সনদ চায়। সনদ জনগোষ্ঠী ধরে নয়, জেলা ধরে। একইভাবে খাগড়াছড়ির সব প্রার্থী মং চিফের এবং বান্দরবানের সব প্রার্থী বোমাং চিফের সনদ নেবেন।

খাগড়াছড়ি আইনে কোন জনগোষ্ঠী “উপজাতীয়”?

কেবল তিনটি — চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন 1989-এর ধারা 2(খ) “উপজাতীয়” বলতে জেলায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত এই তিন জনগোষ্ঠীর সদস্যকে বোঝায়। তুলনায় রাঙ্গামাটি আইনের তালিকায় 7টি এবং বান্দরবান আইনের তালিকায় 12টি জনগোষ্ঠী। সার্কেল চিফের উপজাতীয় সনদের মাপকাঠি এই সংজ্ঞাই।

জেলা পরিষদের ভোটার হতে কি সার্কেল চিফের সনদ লাগে?

আইনে লাগে না। তিন আইনের ধারা 17(1) অনুযায়ী ভোটার হতে হলে বাংলাদেশের নাগরিক, অন্তত 18 বছর বয়সী, আদালত-ঘোষিত মানসিক অসুস্থ নন এবং জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হয়। স্থায়ী বাসিন্দা কে তা কে প্রমাণ করবেন, ধারা 17 বলে না; মন্ত্রণালয়ের নিজের নথি জানায় স্থায়ী বাসিন্দা “নির্ধারণ হয়নি”।

শেষ জেলা পরিষদ নির্বাচন কবে হয়েছিল?

25 জুন 1989, দৈনিক সোনার বাংলার (23 এপ্রিল 2024) হিসাবে সেটিই প্রথম ও শেষ নির্বাচন। জাতিসংঘের 2011 সালের সমীক্ষাও বলে চুক্তির পর কোনো নির্বাচন হয়নি, পরিষদ চলছে সরকার-মনোনীতদের দিয়ে। তাই 1998 সালে যুক্ত সার্কেল চিফের সনদের বিধান এখনো কোনো জেলা পরিষদ নির্বাচনে ব্যবহারের সুযোগ পায়নি।

যা এখনো জানা যায়নি

  • হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণ পাঠ। 13 এপ্রিল 2010-এর রায়ে ঠিক কোন কোন উপধারা বাতিল হয়েছিল — বিশেষ করে উপজাতীয় প্রার্থীর সনদের ধারা 4(5)-ও তার মধ্যে ছিল কি না — পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যম ও জাতিসংঘের সমীক্ষা কেবল অ-উপজাতীয়দের সনদের কথা বলে।
  • আপিলের বর্তমান অবস্থা। 2018 সালের মার্চের পর আপিল শুনানি বা রায়ের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
  • 2000 সালের নির্দেশের মূল পাঠ ও তারিখ। জনসংহতি সমিতি বলে 21 ডিসেম্বর 2000, Peace Accords Matrix রাখে 1999 সালে। নির্দেশটির মূল কপি বা এটি বাতিল হয়েছে কি না, জানা যায়নি।
  • আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের তারিখ ও পূর্ণ পাঠ। মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন-নথি মতামতটির সারকথা দেয়, তারিখ বা স্মারক নম্বর দেয় না।
  • “এবং” না “বা”। জনসংহতি সমিতি বলছে 1998 সনের XXIII নং আইনে 2(কক)-র “বা” বদলে চুক্তির “এবং” করা হয়েছে; bdlaws-এর বর্তমান পাঠে এখনো “বা”। 1998 সনের 23 নং আইনের পাঠ পাওয়া যায়নি।
  • সার্কেল ও জেলার সীমার অমিলে সনদ। খাগড়াছড়ির চাকমা সার্কেলভুক্ত মৌজা, কিংবা রাঙ্গামাটির বোমাং সার্কেলভুক্ত মৌজার বাসিন্দাদের সনদ বাস্তবে কোন চিফ দেন, জানা যায়নি; কোন উপজেলার কয়টি মৌজা কোন সার্কেলে, তার সূত্রসহ হিসাবও পাওয়া যায়নি।
  • সনদের সংখ্যা ও প্রক্রিয়া। তিন চিফের কার্যালয় বছরে কতগুলো উপজাতীয় বা অ-উপজাতীয় সনদ দেয়, কোনো ফরম বা ফি নির্ধারিত আছে কি না, কতগুলো আবেদন ফেরত যায় — কোনো প্রকাশিত হিসাব পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় কতগুলো স্থায়ী বাসিন্দা সনদ দিয়েছে, তারও হিসাব নেই।
  • 2008 সালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি। দুই সনদের শর্ত দেওয়া নথি (31/2008/713)-র মূল পাঠ পাওয়া যায়নি; তথ্যটি কেবল Peace Accords Matrix-এর বিবরণ থেকে।
  • বোমাং চিফের কার্যালয়ের বক্তব্য। বান্দরবানে “রাজার সনদ” নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে চিফের কার্যালয়ের কোনো জবাব প্রকাশিত উৎসে পাওয়া যায়নি।

তথ্যসূত্র

  1. লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ, আইন মন্ত্রণালয়। রাংগামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989 (1989 সনের 19 নং আইন), ধারা 4; ধারা 2; ধারা 17। bdlaws.minlaw.gov.bd।
  2. লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989 (1989 সনের 20 নং আইন), ধারা 4; ধারা 2; ধারা 17।
  3. লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989 (1989 সনের 21 নং আইন), ধারা 4; ধারা 2; ধারা 17।
  4. লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, 1998 (1998 সনের 12 নং আইন), ধারা 2 ও 5।
  5. জুমজার্নাল আর্কাইভ। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (1997), পূর্ণ বাংলা পাঠ — ‘খ’ খণ্ড, দফা 3, 4 ও 12।
  6. তাতিন্দ্র লাল চাকমা। স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রসঙ্গে। জুমজার্নাল আর্কাইভ (লেখাটি 2002-এর পরে রচিত)।
  7. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। শান্তি চুক্তি ও বাস্তবায়ন অগ্রগতি (পিডিএফ সংযুক্তি, বিজয় এনকোডিং; ‘খ’ খণ্ডের দফা 4(ঘ) ও 9-এর বাস্তবায়ন-অবস্থা)। পাতা হালনাগাদ 1 মে 2025।
  8. Parbatya Chattagram Jana Samhati Samiti। Report on the Status of Implementation of the CHT Accord। জানুয়ারি 2013।
  9. Kroc Institute, University of Notre Dame। Citizenship Reform: Chittagong Hill Tracts Peace Accord। Peace Accords Matrix।
  10. Lars-Anders Baer, Special Rapporteur। Study on the status of implementation of the Chittagong Hill Tracts Accord of 1997 (E/C.19/2011/6)। জাতিসংঘ আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরাম, 18 ফেব্রুয়ারি 2011।
  11. The Daily Star। Decade-old hills admin at stake। 14 এপ্রিল 2010।
  12. The Daily Star। HC verdict on CHT regional council: SC adjourns appeal hearing till Jan 23। 9 জানুয়ারি 2018।
  13. বাংলা ট্রিবিউন। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন বাতিলের আপিল শুনানি ৬ মার্চ। 30 জানুয়ারি 2018।
  14. দৈনিক সোনার বাংলা। আঞ্চলিক পরিষদসহ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ৩৫ বছর পরিচালিত হচ্ছে অনির্বাচিতদের দ্বারা। 23 এপ্রিল 2024।
  15. দেশ রূপান্তর। রাজার সনদ বাতিলসহ চার দাবিতে বান্দরবানে মানববন্ধন। 26 আগস্ট 2025।
  16. Hill News BD (সম্পাদকীয়)। ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার: রাজার সনদ প্রসঙ্গ। 13 অক্টোবর 2025।
  17. জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, রাঙ্গামাটি। স্থায়ী বাসিন্দা সনদ — অনলাইন সেবা।
  18. জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, খাগড়াছড়ি। স্থায়ী বাসিন্দা সনদ — জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন।

সর্বশেষ হালনাগাদ: 19 অক্টোবর 2026

প্রসঙ্গ:আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ আইন, পার্বত্য চুক্তি, পার্বত্য জেলা পরিষদ, সার্কেল চীফ

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা