Last updated Oct 19th, 2026
0

পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম কর হেডম্যান খাজনা হিসেবে তোলেন প্রতিটি জুমচাষি পরিবারের কাছ থেকে, নিজের ভাগ রেখে বাকিটা দেন সার্কেল চিফ বা রাজাকে, আর চিফ সরকারের পাওনা অংশ জমা দেন। হার পরিবারপ্রতি বছরে মাত্র কয়েক টাকা: 1870 সালে সরকার ঠিক করেছিল 4 টাকা, পরের উৎসগুলোতে 6 টাকা, 6.65 টাকা ও 6.75 টাকা পাওয়া যায়। সরকারের অংশ আগে যেত জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে; প্রথম আলোর 2014 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী এখন যায় পার্বত্য জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলে।
শুনতে সহজ, কিন্তু প্রতিটি অংশে একটি করে প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। হার কে ঠিক করে, যখন 1900 সালের বিধিতে কোনো অঙ্ক লেখাই নেই? তিন ভাগে কে কত পান, আর উৎসভেদে সেই ভাগ কেন আলাদা? এটি জমির খাজনা, না পরিবারের ওপর বসানো কর — ব্রিটিশ, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশ সরকার এই প্রশ্নের তিন রকম উত্তর দিয়েছে। এই লেখা শাসনবিধির মূল পাঠ, ব্রিটিশ আমলের গেজেটিয়ার, গবেষণা ও সংবাদপত্রের হিসাব পাশাপাশি রেখে সেই উত্তরগুলো খুঁজেছে।
হেডম্যান ও সার্কেল চিফের পুরো দায়িত্ব, জুম তৌজি তৈরির নিয়ম আর রাজস্ব-বর্ষপঞ্জি আমাদের আগের দুটি লেখায় বিস্তারিত আছে — মৌজা হেডম্যান ও কার্বারি আসলে কী কী করেন এবং সার্কেল চিফ: তিনটি সার্কেল, আর রাজার ক্ষমতা আসলে কতটুকু। এখানে সেগুলো আবার বলা হয়নি; এই লেখার কাজ টাকার অঙ্ক আর টাকার পথ।
এই লেখায়
জুম কর দেয় জুমচাষি পরিবার, তোলেন মৌজার হেডম্যান, গ্রহণ করেন সার্কেল চিফ, আর সরকারের অংশ চিফ পরিশোধ করেন প্রতি বছর 31 মার্চের মধ্যে। হার সরকার সময়ে সময়ে ঠিক করে; উৎসগুলোতে 4 থেকে 6.75 টাকার মধ্যে অঙ্ক পাওয়া যায়, আর সরকারের ভাগ সবচেয়ে কম।
| প্রশ্ন | উত্তর | উৎস |
|---|---|---|
| কে দেয় | প্রতিটি জুমচাষি পরিবার — এক গৃহকর্তার অধীনে এক হেঁশেলে থাকা, একটি জুম চাষ করা ও তার ফসল ভাগ করে নেওয়া মানুষেরা | বিধি 42(1) |
| কে তোলেন | মৌজা হেডম্যান; সংবাদ-প্রতিবেদন অনুযায়ী পাড়ার কার্বারিরাও আদায়ে যুক্ত | বিধি 42(1); প্রথম আলো 2014 |
| কার কাছে যায় | হেডম্যান নিজের অংশ কেটে বাকিটা সার্কেল চিফকে দেন | বিধি 42(1) |
| সরকার কবে পায় | চিফ সরকারের পাওনা দেন প্রতি বছর 31 মার্চের মধ্যে | বিধি 42(9) |
| হার কত | 1870: 4 টাকা; পরে 6 টাকা (রায় 2000; বিডিনিউজ২৪ 2009), 6.75 টাকা (আহসান 1993), 6.65 টাকা (প্রথম আলো 2014) | নিচের ছক দেখুন |
| সরকারের অংশ কোথায় জমা হয় | আগে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে; 2014 সালের সংশোধনের পর জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলে | প্রথম আলো, 25 ডিসেম্বর 2014 |
জুম কর তোলেন মৌজার হেডম্যান। 1900 সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির সঙ্গে জারি করা প্রশাসনিক বিধিমালার 42(1) বিধি বলছে, প্রতিটি জুমচাষি পরিবার সরকার-নির্ধারিত হারে কর দেবে মৌজা হেডম্যানকে, আর হেডম্যান “নিজের অংশ কেটে রেখে” করটি দেবেন চিফকে। চিফ সরকারের পাওনা দেবেন 31 মার্চের মধ্যে (42(9))।
অর্থাৎ টাকার পথ তিন ধাপের: পরিবার → হেডম্যান → চিফ → সরকার। প্রতিটি ধাপে একটি করে ভাগ থেকে যায়। বিধির ইংরেজি পাঠে বাক্যটি হলো: “the headmen after deducting his share shall pay the tax to the Chief” — হেডম্যান তাঁর অংশ কেটে নিয়ে বাকিটা চিফকে দেবেন। সরকারের অংশ নিয়ে আলাদা বাক্য আছে 42(9)-এ: “The Chief shall pay the Government demand by the 31st March of each year.”
পাড়ার কার্বারির নাম বিধিতে নেই। কিন্তু প্রথম আলোর বান্দরবান প্রতিনিধির 2014 সালের প্রতিবেদন লিখেছে, শাসনবিধি অনুযায়ী পাড়ার কার্বারি ও মৌজার হেডম্যানরা প্রত্যেক জুমচাষি পরিবার থেকে জুম খাজনা আদায় করেন। বিডিনিউজ২৪-এর 31 ডিসেম্বর 2009-এর প্রতিবেদনে বোমাং সার্কেল প্রসঙ্গে আরও একটি কথা আছে: আদায় করা খাজনা থেকে রাজা, সরকার, হেডম্যান ও কারবারি “নির্ধারিত হারে অংশ পেয়ে থাকেন”। কার্বারির কোনো ভাগ বিধিতে নেই, আর অন্য কোনো উৎস কার্বারির ভাগের অঙ্ক দেয়নি। জুমজার্নালের আর্কাইভে সংরক্ষিত বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যার লেখাতেও কার্বারিকে খাজনা আদায়ে হেডম্যানের সহকারী বলা হয়েছে, ভাগের কথা নয়।
রাজপুণ্যাহের দিনটিও এই পথের একটি তারিখ। 42(6) বিধি অনুযায়ী জুম কর ক্যালেন্ডার বছরের মধ্যে হেডম্যানকে দিতে হয়; হেডম্যান দাবির অন্তত অর্ধেক চিফকে দেন “Punyah day”-তে, বাকিটা পরে। বাকিটা কবে — এখানে দুই উৎস দুই রকম বলে: PCJSS-এর সংকলিত পাঠে “before 15th January”, আর জুমজার্নালের আর্কাইভের পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার শাসন ও বিচার ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ লেখায় “পরবর্তী বছরের ১লা জানুয়ারীর মধ্যে”।
বাস্তবে টাকাটা কীভাবে হাতবদল হয়, তার একটি বিবরণ আছে জুমজার্নালের আর্কাইভে সংরক্ষিত চাকমা রাজবংশের ইতিহাস লেখায়: হেডম্যানরা আদায় করা খাজনার অর্থ “পৃথকভাবে সরকার, রাজা এবং হেডম্যানের অংশে” জমা করেন; রাজপুণ্যাহ নিয়মিত না হলে সুবিধামতো সময়ে পরিশোধ করতে পারেন। ডেইলি স্টারের 27 ডিসেম্বর 2009-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী সেই বছর রাঙামাটিতে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় তাঁর সার্কেলের 175টি মৌজার 175 জন হেডম্যানের কাছ থেকে বার্ষিক জুম কর গ্রহণ করেন। রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠানটি নিয়ে আলাদা লেখা তৈরি হচ্ছে; এখানে কেবল তার রাজস্ব-দিকটুকু।
বিধির ভাষায় জুম কর পরিবারপ্রতি ধার্য, জমির মাপে নয়। কিন্তু এটি “কর” না “খাজনা”, সে প্রশ্নে তিন যুগের তিন সরকারি অবস্থান পাওয়া যায়: ব্রিটিশ গেজেটিয়ার বলেছে রাষ্ট্রকে দেওয়া নজরানা, জমির খাজনা নয়; পাকিস্তানের রাজস্ব বোর্ড বলেছে জুমক্ষেতের ওপর ধার্য; আর 1973 সালে বাংলাদেশের মন্ত্রী সংসদে বলেছেন পরিবারপিছু কর।
প্রশ্নটি শুধু শব্দের নয়। কর যদি জমির খাজনা হয়, তাহলে খাজনা দেওয়া পরিবারের সঙ্গে জমির একটি সম্পর্ক স্বীকৃত হয়। আর যদি তা মাথাপিছু বা পরিবারপিছু কর হয়, তাহলে জমির ওপর কোনো দাবি জন্মায় না। রাজকুমারী চন্দ্রা কালিন্দী রায় তাঁর IWGIA-প্রকাশিত গবেষণায় (2000) ঠিক এই কারণেই বিষয়টি তুলেছেন: ব্রিটিশ প্রশাসনের যুক্তি ছিল, চিফ ও হেডম্যানের কর্তৃত্ব মানুষের ওপর, জমির ওপর নয়।
| সময় | কে বলেছেন | কী বলেছেন |
|---|---|---|
| 1906 ও 1909 | আর. এইচ. স্নেইড হাচিনসন (R. H. Sneyd Hutchinson), জেলার গেজেটিয়ার | “This tax is tribute payable to the State; it in no way partakes of the nature of rent” — এটি রাষ্ট্রকে দেয় নজরানা, জমির খাজনার সঙ্গে সম্পর্কহীন |
| 1958 | পাকিস্তানের রাজস্ব বোর্ড, Bessaignet (1958)-এর সূত্রে রায় (2000) | “Revenue i.e. the jhum tax is assessed on the jhum field, not on the household” — কর ধার্য হয় জুমক্ষেতের ওপর, পরিবারের ওপর নয় |
| 23 জুন 1973 | ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, জাতীয় সংসদে | “ইহা পরিবার পিছু কর হিসাবে আদায় করা হয়, জমির উপর খাজনা হিসাবে নয়” |
| 2000 | চন্দ্রা কালিন্দী রায়, IWGIA | কর জুমের প্রথাগত অধিকারের সঙ্গে বাঁধা, আর আদায় চলে প্রত্যেক রাজার ভৌগোলিক এলাকার ভেতরে — অর্থাৎ এর উৎস জমির অধিকার |
1973 সালের উত্তরটি এসেছিল এম এন লারমার একটি প্রশ্নের জবাবে: জুমচাষিদের জুম খাজনা মাফ করার কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না। মন্ত্রীর উত্তর ছিল “না”। পুরো প্রশ্নোত্তর ও সেদিনের বাজেট-বক্তৃতা আমাদের আর্কাইভে আছে — জাতীয় সংসদে এম এন লারমা: জুম খাজনা ও বাজেটের উপর সাধারণ আলোচনা।
বিধির পাঠ নিজেও দুই দিকেই টানে। 42(1) করের একক বানিয়েছে “জুমচাষি পরিবার”-কে, জমিকে নয়। কিন্তু 42(3) বিধি পরকুলিয়া পরিবারকে — যারা এক মৌজায় থাকে, অন্য মৌজায় জুম করে — অতিরিক্ত কর দিতে বলে “যে মৌজায় জুম করে” সেখানকার হেডম্যানকে। অর্থাৎ কর কোথায় যাবে, তা ঠিক হয় জুমের জমি কোন মৌজায়, তা দিয়ে। আর 43(2) বিধি বাগানজমির খাজনার ভাগ ঠিক করেছে সেই জমির “জুম থেকে” চিফ ও হেডম্যান যে অনুপাত পেতেন, তার সমান করে — জুম কর আর জমির খাজনাকে একই হিসাবের খাতায় এনে।
টাকা চালু হওয়ার আগে পাহাড়ের খাজনা দেওয়া হতো কাঁচা তুলায়। হাচিনসন লিখেছেন, চট্টগ্রাম কালেক্টরেটের পুরোনো রাজস্ব-খাতায় এই আদায় লেখা থাকত “কাপাস মহাল” নামে। 1906 সালের বইয়ে তিনি যোগ করেছেন, “capitation tax” বা মাথাপিছু কর নামটি ভুল: এটি আসলে ছিল গৃহকর, যা পরিবারভেদে আলাদা, আর নেওয়া হতো কেবল জুম-করা পরিবারপ্রধানের কাছ থেকে।
চাকমা রাজাদের তালিকার পাশে টমাস হারবার্ট লুইন তাঁর 1869 সালের বইয়ে কয়েকটি তারিখ দিয়েছেন: তালিকার প্রথম নামের পাশে লেখা, আনুমানিক 1715 সালে মোগল উজিরকে প্রথম তুলার খাজনা দেওয়া হয়; 1782 সালে তুলার খাজনা কমিয়ে 500 মণ করা হয়; আর 1789 সালে সরকার ঠিক করে খাজনা তুলার বদলে টাকায় দিতে হবে। জুমজার্নালের আর্কাইভে নিঝুম তালুকদারের বৃটিশ শাসনে চাকমা জনগোষ্ঠী লেখায় 1787 সালের চুক্তিতে চাকমা রাজার বছরে 500 মণ তুলা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা আছে।
রাজার ঘরে খাজনা যেত কয়েক স্তর পেরিয়ে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক আনন্দ বিকাশ চাকমার ঊনিশ শতকে বাংলার গ্রামীণ সমাজ: প্রেক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রবন্ধ অনুযায়ী চাকমা সমাজ ছিল রাজা–দেওয়ান–খীসা–সাধারণ চাকমা, এই চার স্তরে ভাগ; মারমা সমাজে প্রধানের অধীনে খাজনা তুলতেন তাঁর নিযুক্ত রোয়াজা, আর রোয়াজার অধস্তন পাইংসি। লুইনও লিখেছেন, প্রতিটি চাকমা গোজার প্রধান দেওয়ান মাথাপিছু কর তোলেন এবং তার একটি নির্দিষ্ট অংশ রেখে দেন। এই দুটি বিবরণ দুটি আলাদা জনগোষ্ঠীর; একটির নিয়ম অন্যটির বেলায় খাটে কি না, উৎসগুলো বলে না।
হার নিয়েও এই সময়ের কয়েকটি তথ্য আছে, তবে প্রতিটি নির্দিষ্ট এলাকার:
একটি জিনিস লক্ষ করার মতো: লুইন 1869 সালে বছরে তিন দিনের বেগার শ্রমের কথা লিখেছেন, আর 1900 সালের বিধিমালার 42A(3) বিধিতে চিফ বা হেডম্যান প্রথা অনুযায়ী জুমিয়া বা লাঙলচাষিকে দিয়ে বছরে সর্বোচ্চ 4 দিন, দিনে 8 ঘণ্টা ব্যক্তিগত কাজ করাতে পারেন — জেলা প্রশাসকের অনুমতি সাপেক্ষে। পরে “ছয় টাকা” অংশে দেখা যাবে, এই বেগারের দাম টাকায় হিসাব হয়ে হেডম্যানের ভাগে ঢুকেছিল।
জুম করের প্রথম সরকারি হার 4 টাকা। হাচিনসনের গেজেটিয়ার অনুযায়ী 1870 সালে বাংলার সরকার আদেশ দেয় জুম কর কেবল জুম-করা পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হবে, পরিবারপ্রতি 4 টাকা। 1874 সালে ঠিক হয় তার ভাগ: হেডম্যান 1 টাকা, সার্কেল চিফ 2 টাকা, সরকার 1 টাকা।
পথটা তৈরি হয়েছিল কয়েক ধাপে। হাচিনসনের 1909 সালের গেজেটিয়ারের “Land Revenue and Administration” অধ্যায় অনুযায়ী:
একই অনুচ্ছেদের দুটি বাক্য পরের ইতিহাস বুঝতে কাজে লাগে। প্রথমটি: তিন সার্কেলে জুম করের অঙ্কে অসমতা আছে, তা প্রথানির্ভর, আর সরকার সারা জেলায় এক হার চাপানোর চেষ্টা করেনি — তবে আদালত 4 টাকাকেই এক পরিবারের এক বছরের পূর্ণ জুম কর হিসেবে “legal tender” মানে। দ্বিতীয়টি: চিফ ও তাঁর প্রজাদের মধ্যে যে ব্যবস্থায় “কেউ বেশি, কেউ কম দেয়”, তাতে হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। অর্থাৎ 4 টাকা ছিল সরকারের হিসাবের ভিত্তি; প্রজারা আসলে কত দিতেন, তা সার্কেলভেদে আলাদা থাকতে পারত।
আনন্দ বিকাশ চাকমার প্রবন্ধের একটি টীকা এই পর্বকে একটু অন্যভাবে বলে: 1873 সাল পর্যন্ত এর নাম ছিল “ক্যাপিটেশন বা মাথাপিছু কর”, 1874 থেকে জুম ট্যাক্স হিসেবে পরিবারপিছু 4 টাকা ধার্য হয়, যা দেওয়ানদের মাধ্যমে রাজারা আদায় করতেন। ওই টীকায় ভাগের বাক্যটি — “২ টাকা রেখে ১ টাকা সরকারকে জমা দিতেন” — হাচিনসনের রাজার ভাগের সঙ্গে মেলে।
লুইন নিজে অবশ্য এই করকে রাজস্বের উৎস হিসেবে দেখতে চাননি। হাচিনসন তাঁর 1872 সালের একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: জুম কর সংশোধন বা বাড়ানোর অধিকার সরকারের আছে, কিন্তু তিনি জোর দিয়ে বারণ করছেন; বরং জুম করকে “illegitimate and injurious” রাজস্ব হিসেবে দেখে রাজস্ব-খাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা উচিত, আর জুম বন্ধ করে লাঙলচাষ চালু করে জমির খাজনাকে রাজস্বের ভিত্তি করা উচিত। হাচিনসন এই মতের সঙ্গে একমত হননি।
1900 সালের বিধিমালায় জুম করের কোনো অঙ্ক লেখা নেই। 42(1) বিধি বলে কর দেওয়া হবে “at such rates as the Provincial Government may from time to time fix” — প্রাদেশিক সরকার সময়ে সময়ে যে হার ঠিক করে। 1972 সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নং 48 বিধিমালা জুড়ে “Provincial Government”-এর জায়গায় “Government” বসিয়েছে বলে PCJSS-এর সংকলনের পাদটীকাগুলো জানায়।
বর্তমানে যে পাঠটি পড়া হয়, তা মূল 1900 সালের নয়। PCJSS-এর সংকলিত পাঠের পাদটীকা অনুযায়ী 42 বিধিটি 12 ডিসেম্বর 1938, 26 জুলাই 1939 ও 30 জুলাই 1941-এর প্রজ্ঞাপনে সংশোধিত রূপ; 42(6) সংশোধিত হয় 10 ফেব্রুয়ারি 1942-এ; 42(7) যোগ হয় 22 জানুয়ারি 1944-এ; আর 42(8)(iii) যোগ হয় 30 আগস্ট 1943-এ। ভাগের প্রশ্নে এই শেষ দুটি উপবিধিই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো বলে হেডম্যান নিজে আদায় না করলে তাঁর ভাগের কী হয়।
| বিধি | টাকার ভাগ নিয়ে কী বলে |
|---|---|
| 42(1) | হার সরকার ঠিক করবে; হেডম্যান নিজের অংশ কেটে বাকিটা চিফকে দেবেন |
| 42(7) | বকেয়া জুম কর জেলা প্রশাসক আদায় করলে খরচ ও হেডম্যানের অংশের এক-চতুর্থাংশ আগে সরকারি রাজস্বে, বাকিটা চিফের কাছে |
| 42(8)(ii) | হেডম্যানকে সরাসরি জেলা প্রশাসকের কাছে কর দিতে বলা হলে, প্রশাসক হেডম্যানের অংশ কেটে পুরো টাকা চিফকে দেবেন; হেডম্যানের অংশ থেকে আগে সরকারের কাছে তাঁর দেনা, তারপর চিফের কাছে দেনা মিটিয়ে বাকিটা হেডম্যানকে |
| 42(8)(iii) | জুমিয়াদের সরাসরি কর দিতে বলা হলে, হেডম্যানের যে অংশ হতো তার এক-চতুর্থাংশ আদায়-খরচ হিসেবে সরকারি রাজস্বে, বাকিটা চিফকে |
| 42(9) | চিফ সরকারের পাওনা দেবেন প্রতি বছর 31 মার্চের মধ্যে |
| 42(12) | ব্যক্তিগত মওকুফে চিফের সরকারি পাওনা কমে না; ফসলহানিতে এলাকাভিত্তিক মওকুফ হলে সরকারের অংশের সমপরিমাণ সরকারি পাওনাও মওকুফ |
| 43(2) | বাগানজমিতে খাজনা বসলে চিফ ও হেডম্যান সেই অনুপাতই পাবেন, যা ওই জমির জুম থেকে পেতেন |
42(12)-এর শেষ বাক্যটি সাধারণত আলোচনায় আসে না, অথচ এটিই বলে মওকুফের দাম কে দেয়। জেলা প্রশাসক কোনো একটি পরিবারের কর মাফ করলে চিফের সরকারি পাওনা একই থাকে — অর্থাৎ সেই ক্ষতি চিফ ও হেডম্যানের ভাগ থেকে যায়। কিন্তু ফসলহানির কারণে কোনো এলাকার কর মাফ হলে সরকারও তার নিজের অংশ ছেড়ে দেয়। বিধির ইংরেজি পাঠ: “Remission under clause (b) shall be accompanied by a remission of the Government demand payable by the Chiefs, to the extent of the Government share of the tax remitted.”
একটি নম্বরের গোলমালও এখানে বলে রাখা দরকার। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে রাখা ইংরেজি সংকলনের সূচিপত্রে “Jhum tax” আছে 41 নম্বরে, আর জুম নিয়ন্ত্রণ 40 নম্বরে; PCJSS-এর সংকলনে একই বিষয় 42 ও 41 নম্বরে। এই লেখায় PCJSS-এর নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে, কারণ পূর্ণ পাঠটি সেখানে পড়া যায়। আর্কাইভের পুরোনো কিছু লেখায় “৪১ নং বিধিমতে” জুম কর লেখার একটি কারণ সম্ভবত এই ভিন্ন নম্বর।
বাংলাদেশ আমলের প্রায় সব উৎস জুম কর পরিবারপ্রতি 6 টাকা বলে। রাজকুমারী চন্দ্রা কালিন্দী রায়ের 2000 সালের গবেষণা এর ভাগও দিয়েছে: রাজা 2.50 টাকা, হেডম্যান 2.25 টাকা, সরকার 1.25 টাকা। হেডম্যানের 2.25 টাকার মধ্যে 1.25 টাকা তাঁর আসল ভাগ, আর 1 টাকা বেগার বা সেবার “commuted value” — অর্থাৎ বিনা মজুরির শ্রমের বদলে টাকা।
রায়ের বইয়ের পাদটীকার বাক্যটি: “Generally the jum tax was Rs. 6.00 per jumiya and apportioned using the following formula: Raja – Rs. 2.50; Headman/woman: Rs. 2.25 (Rs. 1.25 actual share and Rs. 1.00 as commuted value of begar or services; and Rs. 1.25 to the government.” বইয়ের মূল পাঠে তিনি লিখেছেন, ইংরেজরা ধাপে ধাপে এই করের একটি ভাগ নিতে শুরু করে, কিন্তু আজও সরকারের ভাগ সবচেয়ে কম, রাজা ও হেডম্যানের ভাগ বড়; আর তত্ত্বে এই ব্যবস্থা চালু থাকলেও বাস্তবে জুম কর হিসেবে “only nominal sums” আসে।
1874 সালের ভাগের সঙ্গে তুলনা করলে পরিবর্তনটা স্পষ্ট। 4 টাকার যুগে হেডম্যান পেতেন এক-চতুর্থাংশ, চিফ অর্ধেক, সরকার এক-চতুর্থাংশ। 6 টাকার এই হিসাবে হেডম্যানের ভাগ বেড়ে প্রায় 37.5%, চিফের কমে প্রায় 41.7%, আর সরকারের কমে প্রায় 20.8%। হার কবে 4 থেকে 6 টাকা হলো, আর এই নতুন ভাগ কোন আদেশে, তা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
6 টাকার কথা আরও তিনটি উৎসে আছে, প্রতিটি নিজের মতো করে:
শেষ তথ্যটি জুম কর বনাম খাজনার প্রশ্নে ফিরে যায়। যে পরিবার বছর বছর জুমের জন্য কর দিয়েছে, জমি ডুবে গেলে সেই করের রসিদ ক্ষতিপূরণের দাবিতে কাজে আসেনি। কর দেওয়া আর জমির স্বত্ব পাওয়া যে এক জিনিস নয়, এখানে তা সবচেয়ে স্পষ্ট।
বোমাং সার্কেলের জন্য দুটি আলাদা অঙ্ক আছে। সেলিনা আহসানের 1993 সালের বই “The Marmas of Bangladesh”-এর সূত্রে জুমজার্নালের মারমা-পরিচিতি লিখেছে প্রতি জুমে 6.75 টাকা: রাজা 2.50, হেডম্যান 2.25, সরকার 2.00 টাকা। প্রথম আলোর 2014 সালের প্রতিবেদন বলছে প্রত্যেক পরিবার থেকে 6 টাকা 65 পয়সা, আর ভাগ হেডম্যান 37%, রাজা 42%, সরকার 21%।
প্রথম বিবরণটি আছে মংসিংঞা মারমার মারমা জাতির আদ্যোপান্ত লেখার রাজপুণ্যাহ অংশে: রাজার উপবেশনের পর ঘোষকের ডাকে হেডম্যানরা একে একে “প্রতি জুমের জন্য ৬.৭৫ টাকা করে খাজনার টাকা জমা দিয়ে থাকে। এই খাজনার টাকা থেকে বোমাঙ রাজা ২.৫০ টাকা, হেডম্যান ২.২৫ টাকা ও সরকার ২.০০ টাকা পেয়ে থাকে।”
দ্বিতীয় বিবরণটি বান্দরবান হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক উনিহ্লা মার্মার বক্তব্য, প্রথম আলোর প্রতিবেদনে: আদায় করা খাজনার 37 শতাংশ হেডম্যান, 42 শতাংশ রাজা ও 21 শতাংশ সরকার পায়।
দুটি হিসাব পাশাপাশি রাখলে একটি মিল চোখে পড়ে। আহসানের হিসাবে রাজা ও হেডম্যান যথাক্রমে 2.50 ও 2.25 টাকা পান — রায়ের 6 টাকার হিসাবের হুবহু একই অঙ্ক। পার্থক্য কেবল সরকারের ঘরে: রায়ের হিসাবে 1.25, আহসানের হিসাবে 2.00 টাকা। আর প্রথম আলোর শতাংশগুলো (42–37–21) রায়ের 6 টাকার ভাগের শতাংশের (41.7–37.5–20.8) প্রায় সমান, যদিও প্রথম আলো মোট অঙ্ক বলেছে 6.65 টাকা।
এই অমিলের ব্যাখ্যা কোনো উৎস দেয়নি। তিনটি সম্ভাবনা থাকতে পারে — সময়ের সঙ্গে সরকারের ভাগ বদলেছে, সার্কেলভেদে আলাদা, অথবা কোনো একটি উৎসে অঙ্ক ভুল ছাপা হয়েছে — কিন্তু কোনোটিই নথি দিয়ে যাচাই করা যায়নি, তাই এখানে কোনোটিকে সঠিক বলা হয়নি।
উৎসগুলো পাশাপাশি রাখলে হার 4 থেকে 6.75 টাকার মধ্যে, চিফের ভাগ সবসময় সবচেয়ে বড় বা প্রায় সবচেয়ে বড়, আর সরকারের ভাগ 1874-এর এক-চতুর্থাংশ থেকে পরে নেমে এসেছে এক-পঞ্চমাংশের কাছাকাছি — এক উৎসে (আহসান) প্রায় 30%। শতাংশগুলো উৎসের টাকার অঙ্ক থেকে এই লেখায় হিসাব করা।
| উৎস ও সময় | এলাকা | মোট (পরিবারপ্রতি) | হেডম্যান | চিফ/রাজা | সরকার |
|---|---|---|---|---|---|
| লুইন 1869 | বোমাং ও মং চিফের প্রজা | 4–8 টাকা | ভাগ দেওয়া নেই; রোয়াজা কোথাও কোথাও চিফের কাছ থেকে আদায়ের একটি শতাংশ পান | ||
| সরকারি আদেশ 1870/1874 (হাচিনসন) | সারা জেলা | 4 টাকা | 1 (25%) | 2 (50%) | 1 (25%) |
| আহসান 1993 | বোমাং সার্কেল | 6.75 টাকা (প্রতি জুম) | 2.25 (33.3%) | 2.50 (37.0%) | 2.00 (29.6%) |
| রায় 2000 | সাধারণভাবে | 6.00 টাকা | 2.25 (37.5%), যার 1.00 বেগারের বদলে | 2.50 (41.7%) | 1.25 (20.8%) |
| রাজা দেবাশীষ রায়, 2003 (আর্কাইভের লেখায়) | চাকমা সার্কেল | 6 টাকা | উল্লেখ নেই | 2.50 | “বাকি অংশ” |
| বিডিনিউজ২৪ 2009 | বোমাং সার্কেল | 6 টাকা | রাজা, সরকার, হেডম্যান ও কারবারি “নির্ধারিত হারে” পান; অঙ্ক নেই | ||
| প্রথম আলো 2014 | বান্দরবান | 6.65 টাকা | 37% | 42% | 21% |
ছকটি থেকে আরেকটি জিনিস বোঝা যায়: “জুম করের হার” বলতে একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের অঙ্ক নয়, বরং প্রতিটি সার্কেলে প্রচলিত একটি অঙ্ক বোঝানো হচ্ছে। 1874 সালেই সরকার মেনে নিয়েছিল যে সার্কেলভেদে অসমতা আছে। বাংলাদেশ আমলে হার নির্ধারণের কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
জুম করের তিন ভাগের দুটি থেকে যায় পাহাড়ের ভেতরেই — হেডম্যানের হাতে আর চিফের দপ্তরে। সরকারের অংশটি চিফ প্রতি বছর 31 মার্চের মধ্যে পরিশোধ করেন (42(9))। প্রথম আলোর 2014 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী সেই অংশ আগে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা হতো; সংশোধনের পর থেকে যায় পার্বত্য জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলে।
হেডম্যানের ভাগ তাঁর আয়। বিধিমালার 46 বিধিতে হেডম্যানের পারিশ্রমিকের আলাদা একটি হিসাব আছে, কিন্তু সেটি মৌজার লাঙলচাষের খাজনার দাবির শতাংশ হিসেবে ঠিক হয় — যেমন দাবি 500 টাকার বেশি হলে 3%, ন্যূনতম 16 টাকা — জুম করের ওপর নয়। জুম কর থেকে হেডম্যান পান কেবল তাঁর ভাগটুকু। আর্কাইভে বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যার পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কর্মকান্ডে মৌজা হেডম্যান ও কার্বারীর অংশগ্রহণ লেখা অনুযায়ী আদায় করা খাজনার “যৎসামান্য কমিশন” ছাড়া হেডম্যানদের আর কোনো পুরস্কার ছিল না; বাংলাদেশ আমলে তাঁরা মাসিক ভাতা পান, আর কার্বারিরাও পান তার চেয়ে কম ভাতা।
চিফের ভাগ তাঁর দপ্তরের আয়। দ্য ইনডিপেনডেন্টের 22 ডিসেম্বর 2017-এর প্রতিবেদনে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় বলেছেন, তাঁরা দুই ধরনের রাজস্ব তোলেন — জুমের জন্য পরিবারপ্রতি, আর জমি বন্দোবস্তির জন্য একরপ্রতি। সার্কেল থেকে রাজস্ব বাবদ তাঁর বার্ষিক আয় প্রায় 3,50,000 টাকা, যা থেকে সরকারকে দিতে হয় 15,000 টাকা; অথচ দপ্তর চালাতে বছরে লাগে 18 থেকে 20 লাখ টাকা, যা তাঁকে ব্যক্তিগত আয় থেকে বহন করতে হয়। সরকার থেকে মাসে 10,000 টাকার সম্মানী ছাড়া কর্মী, যানবাহন বা অন্য খরচের কোনো বরাদ্দ নেই বলেও তিনি জানান। এই অঙ্কগুলো জুম ও জমি দুই ধরনের রাজস্ব মিলিয়ে; শুধু জুম করের অংশ আলাদা করে প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
হেডম্যান আদায়ে ব্যর্থ হলে টাকার পথ বদলায়, আর তখন তাঁর ভাগের একটি অংশ সরকারে যায় (42(7), 42(8)(iii))। এই নিয়মগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা হেডম্যানের দায়িত্ব নিয়ে আমাদের লেখায় আছে।
প্রথম আলোর 25 ডিসেম্বর 2014-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় 25 এপ্রিল 2014 তারিখে শাসনবিধির 41 ও 42 বিধি সংশোধনের প্রজ্ঞাপন জারি করে, যাতে “জেলা প্রশাসক”-এর জায়গায় “জেলা পরিষদ” বসানো হয়। 4 ডিসেম্বর 2014 মন্ত্রণালয় জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসকদের কাছে কার্যকর করার পরিপত্র পাঠায়।
প্রতিবেদনটির মূল বাক্য: “এখন থেকে জুমের খাজনা বা রাজস্বের সরকারি অংশ সরাসরি জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলে জমা হবে। আগে এই রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা হতো।” মন্ত্রণালয়ের জেলা পরিষদ শাখার সূত্রে প্রতিবেদনটি জানায়, এর আগে 41 ও 42 বিধি অনুযায়ী জুমভূমি ও খাজনা ব্যবস্থাপনা তদারক করতেন জেলা প্রশাসকেরা; সংশোধনের ফলে রাজস্ব আদায়সহ পুরো জুম ব্যবস্থাপনা এখন জেলা পরিষদের দায়িত্ব।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা মারমা প্রতিবেদনে বলেন, 19 ডিসেম্বর 2014-এর রাজপুণ্যাহে আদায় হওয়া জুম খাজনার সরকারি অংশ জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলে নেওয়া হবে, আর জুম-সংক্রান্ত নথিপত্র ও তথ্য সংরক্ষণ এবং জুমচাষ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও পরিষদের কাছে ন্যস্ত হলো।
এই সংশোধনের অর্থ হলো, 42 বিধির যেসব জায়গায় “Deputy Commissioner” ছিল — অব্যাহতির তালিকা অনুমোদন (42(2)), তৌজি যাচাই (42(5)), বকেয়া আদায় (42(6), 42(7)), সরাসরি আদায়ের নির্দেশ (42(8)), মওকুফ (42(12)) — সেখানে এখন জেলা পরিষদ। তবে প্রজ্ঞাপনের পূর্ণ পাঠ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি; PCJSS-এর 2020 সালের সংকলন ও মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের ইংরেজি পাঠ — দুটোতেই 42 বিধিতে এখনো “Deputy Commissioner” লেখা। তাই ঠিক কোন কোন উপবিধিতে শব্দ বদলেছে, তা জানা যায়নি।
শাসনবিধি থেকে পরের ভূমি-আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এল, তা দেখতে পড়তে পারেন আমাদের লেখা পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি: ১৯০০ সালের রেগুলেশন থেকে ভূমি কমিশন।
জুম কর থেকে সরকারের মোট আয়ের অঙ্ক পাওয়া যায় কেবল ব্রিটিশ আমলের গেজেটিয়ারে। হাচিনসনের হিসাবে 1895 সালে তিন চিফের কাছ থেকে এই খাতে সরকার পেয়েছিল মোট 8,387 টাকা; 1905 সালের সংশোধনের পর 1 এপ্রিল 1905 থেকে দশ বছরের জন্য বছরে 13,803 টাকা নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশ আমলের কোনো সরকারি মোট অঙ্ক প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
| চিফ | 1895 সালে আদায় (টাকা) | 1905 থেকে দশ বছরের বার্ষিক দাবি (টাকা) |
|---|---|---|
| চাকমা চিফ | 3,155 | 4,553 |
| বোমাং চিফ | 2,918 | 5,772 |
| মং চিফ | 2,314 | 3,478 |
| মোট | 8,387 | 13,803 |
হাচিনসন লিখেছেন, 1895 সালের অঙ্ক যা হওয়ার কথা তার চেয়ে অনেক কম ছিল দুটি কারণে: লুসাই অভিযানে সহায়তার জন্য সরকার আগে উদার ছাড় দিয়েছিল, আর প্রথা অনুযায়ী পুরোহিত, ওঝা, অবিবাহিত, বিপত্নীক, বিধবা, রোগী ও অক্ষমরা জুম কর দিতেন না। তাই চিফদের অধিকার বিবেচনায় রেখে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব “materially enhanced” করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।
একই গেজেটিয়ারের আরেকটি পর্যবেক্ষণ জুম করের সঙ্গে জনগণনার সম্পর্ক দেখায়। 1872 সালের শুমারির সংখ্যা নির্ভরযোগ্য নয়, কারণ চিফদের রাজস্ব আসত মাথাপিছু কর থেকে, যার একটি অংশ সরকারকে দিতে হতো — তাই সরকারের দাবি কমাতে জনসংখ্যা কম দেখানো চিফদের স্বার্থে ছিল। আর্কাইভে নিঝুম তালুকদারের লেখায় 1864 সালে ধার্য নতুন খাজনার পরিমাণ বছরে 11,803 টাকা বলা আছে; লেখাটি এর উৎস দেয়নি, আর হাচিনসনের অঙ্কের সঙ্গে এটি মেলানো যায়নি।
বর্তমানের একটি আনুমানিক হিসাব কেবল বান্দরবানের জন্য করা যায়। প্রথম আলোর 2014 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বান্দরবানে প্রায় সাড়ে 11 হাজার পরিবার জুমচাষ করে। সবাই 6.65 টাকা দিলে মোট দাঁড়ায় প্রায় 76,475 টাকা, আর তার 21% সরকারি অংশ প্রায় 16,060 টাকা। অব্যাহতিপ্রাপ্ত পরিবার এই হিসাবে বাদ দেওয়া হয়নি, তাই আসল অঙ্ক এর চেয়ে কম হওয়ার কথা। এটি এই লেখার হিসাব, কোনো সরকারি নথির অঙ্ক নয়।
কারা জুম কর থেকে অব্যাহতি পান, তা 42(2) বিধি অনুযায়ী প্রতিটি চিফ নিজের সার্কেলের প্রথা মেনে ঘোষণা করেন, আর প্রতি বছর 15 অক্টোবরের আগে তালিকা অনুমোদনে পাঠান। তাই তালিকা সার্কেলভেদে আলাদা হতে পারে। উৎসগুলোতে যে নামগুলো আসে, তা নিচে — প্রতিটি তার নিজের এলাকার।
| উৎস | কাদের কথা | অব্যাহতিপ্রাপ্ত |
|---|---|---|
| লুইন 1869 | বোমাং ও মং চিফের প্রজা | অবিবাহিত পুরুষ, পুরোহিত, বিধবা, বিপত্নীক, যাঁরা চাষ না করে শিকারে জীবিকা চালান |
| হাচিনসন 1909 | জেলা জুড়ে, “tribal custom” | পুরোহিত, ওঝা, অবিবাহিত, বিপত্নীক, বিধবা, রোগী ও অক্ষম |
| আহসান 1993 (আর্কাইভের মারমা-পরিচিতিতে) | বোমাং সার্কেল | অবিবাহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু, বিধবা, বিপত্নীক, শিকারি ও বৈদ্য |
| রায় 2000 | সাধারণভাবে | পুরোহিত, শামান, বিধবা, বিপত্নীক, অবিবাহিত, অসুস্থ; আরেক জায়গায় কার্বারিও |
রায়ের ব্যাখ্যায় অব্যাহতির যুক্তি হলো, এই মানুষদের পক্ষে পুরো একটি জুম চালানোর মতো জমি ব্যবহার ও পরিচালনা কঠিন — যদিও বাস্তবে তাঁরা জুম করেও থাকতে পারেন। তাঁর মতে এই অব্যাহতি প্রমাণ করে কর সবার ওপর সমানভাবে বসানো ব্যক্তিগত কর ছিল না, বরং জুমের প্রথাগত অধিকারের সঙ্গে বাঁধা। 1909 সালে হাচিনসনের কাছে একই অব্যাহতি ছিল সরকারের রাজস্ব কম আসার একটি কারণ।
অব্যাহতির তালিকা কীভাবে তৈরি ও অনুমোদিত হয়, আর পরকুলিয়াদের কর কীভাবে ধরা হয়, তা মৌজা হেডম্যানের দায়িত্ব নিয়ে লেখায় বিস্তারিত আছে। জুম চাষ নিজে কী, কোন মাসে কী কাজ হয় — সে জন্য দেখুন জুম চাষ: পাহাড়ের কৃষিবিদ্যা, মাসে মাসে।
দেড়শো বছরে জুম কর 4 টাকা থেকে বেড়ে মোটামুটি 6 থেকে 7 টাকায় দাঁড়িয়েছে, অথচ একই সময়ে টাকার মূল্য বহুগুণ কমেছে। রায় (2000) লিখেছেন, বাস্তবে জুম কর হিসেবে কেবল “nominal sums” আসে। এর মধ্যে দুই দিক থেকে দুটি দাবি উঠেছে: 1973 সালে কর মাফের প্রশ্ন, আর 2011 সালে কর বাড়ানোর আহ্বান।
1973 সালে এম এন লারমা সংসদে জানতে চেয়েছিলেন জুম খাজনা মাফের সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না; সরকার “না” বলেছিল (ওপরে “কর না খাজনা” অংশ দেখুন)। এর প্রায় চার দশক পরে উল্টো দিক থেকে প্রস্তাব আসে। ডেইলি স্টারের 31 জানুয়ারি 2011-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বোমাং রাজা অংশৈপ্রু চৌধুরী রাজপুণ্যাহে সরকারের কাছে প্রতি বছর উৎসবে সহায়তা, তিন সার্কেল চিফের ভাতা বাড়ানো এবং জুম কর বাড়ানোর আহ্বান জানান।
দুটি দাবি আসলে একই সমস্যার দুই দিক। জুমচাষি পরিবারের কাছে কয়েক টাকা হলেও তা একটি বার্ষিক দায় — আর লারমার প্রশ্ন ছিল সেই দায় থেকে মুক্তি নিয়ে। অন্যদিকে চিফ ও হেডম্যানের দপ্তর এই কয়েক টাকার ভাগের ওপর চলে বলে কাগজে লেখা থাকলেও, তা দিয়ে দপ্তর চলে না — চাকমা রাজার 2017 সালের হিসাব সেটাই দেখায়। আর্কাইভের “চাকমা রাজবংশের ইতিহাস” লেখাও বলছে, প্রথাগত নেতৃত্বের ভূমিকার তুলনায় তাঁদের সম্মানী “একদম নগণ্য”।
হার বাড়ানোর জন্য বিধিতে আলাদা কোনো আইন লাগে না — 42(1) অনুযায়ী সরকার সময়ে সময়ে হার ঠিক করতে পারে। 2011 সালের আহ্বানের পর হার বদলানো হয়েছে, এমন কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন বা সংবাদ পাওয়া যায়নি। 2014 সালের প্রথম আলোর প্রতিবেদনে হার তখনও 6.65 টাকা।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসন, ভূমি ও জনগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের সব লেখা এক জায়গায় পাবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংকলন পাতায়।
মৌজার হেডম্যান। 1900 সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির প্রশাসনিক বিধিমালার 42(1) বিধি অনুযায়ী প্রতিটি জুমচাষি পরিবার সরকার-নির্ধারিত হারে কর দেয় মৌজা হেডম্যানকে। হেডম্যান নিজের অংশ কেটে রেখে বাকিটা সার্কেল চিফকে দেন। প্রথম আলোর 2014 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী পাড়ার কার্বারিরাও আদায়ের কাজে যুক্ত থাকেন।
পরিবারপ্রতি বছরে কয়েক টাকা, উৎসভেদে আলাদা। 1870 সালে বাংলার সরকার 4 টাকা ঠিক করে (হাচিনসন 1909)। চন্দ্রা কালিন্দী রায়ের 2000 সালের গবেষণা ও বিডিনিউজ২৪-এর 2009 সালের প্রতিবেদনে 6 টাকা; সেলিনা আহসানের 1993 সালের বইয়ে বোমাং সার্কেলে 6.75 টাকা; প্রথম আলোর 2014 সালের প্রতিবেদনে বান্দরবানে 6.65 টাকা।
1874 সালের সরকারি সিদ্ধান্তে 4 টাকার মধ্যে হেডম্যান 1, চিফ 2 আর সরকার 1 টাকা পেতেন। রায় (2000) অনুযায়ী 6 টাকার মধ্যে রাজা 2.50, হেডম্যান 2.25 (যার 1 টাকা বেগার শ্রমের বদলে) আর সরকার 1.25 টাকা। প্রথম আলো (2014) বান্দরবানের হিসাব দিয়েছে রাজা 42%, হেডম্যান 37%, সরকার 21%।
চিফ সরকারের পাওনা দেন প্রতি বছর 31 মার্চের মধ্যে (বিধি 42(9))। প্রথম আলোর 25 ডিসেম্বর 2014-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী আগে এই অংশ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে যেত। 25 এপ্রিল 2014-এর প্রজ্ঞাপনে 41 ও 42 বিধিতে “জেলা প্রশাসক”-এর জায়গায় “জেলা পরিষদ” বসানোর পর তা যায় পার্বত্য জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলে।
সরকারি অবস্থান যুগভেদে আলাদা। হাচিনসন (1909) লিখেছেন এটি রাষ্ট্রকে দেয় নজরানা, জমির খাজনা নয়। পাকিস্তানের রাজস্ব বোর্ড, Bessaignet (1958)-এর সূত্রে, বলেছে কর ধার্য হয় জুমক্ষেতের ওপর। 23 জুন 1973 সংসদে মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বলেন, এটি পরিবারপিছু কর, জমির ওপর খাজনা নয়।
না। 42(1) বিধি কেবল বলে কর দেওয়া হবে “at such rates as the Provincial Government may from time to time fix” — সরকার সময়ে সময়ে যে হার ঠিক করবে। 1972 সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নং 48 “Provincial Government”-কে “Government” করেছে। বাংলাদেশ আমলে হার নির্ধারণের কোনো প্রজ্ঞাপন প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
42(2) বিধি অনুযায়ী প্রতিটি চিফ নিজের সার্কেলের প্রথা মেনে অব্যাহতির শ্রেণি ঘোষণা করেন। হাচিনসন (1909) জেলা জুড়ে পুরোহিত, ওঝা, অবিবাহিত, বিপত্নীক, বিধবা, রোগী ও অক্ষমদের কথা লিখেছেন। বোমাং সার্কেলে, আহসান (1993) অনুযায়ী, অবিবাহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু, বিধবা, বিপত্নীক, শিকারি ও বৈদ্য অব্যাহতি পান।
1874 সালের ভাগে 4 টাকার মধ্যে 1 টাকা, “আদায়ের পরিশ্রমের জন্য”। রায় (2000) অনুযায়ী 6 টাকার মধ্যে 2.25 টাকা — যার 1.25 টাকা আসল ভাগ আর 1 টাকা বেগার বা সেবার বদলে। আহসান (1993) বোমাং সার্কেলে 6.75 টাকার মধ্যে 2.25 টাকা বলেছেন। প্রথম আলো (2014) বান্দরবানে হেডম্যানের ভাগ 37% বলেছে।
হাচিনসনের 1906 ও 1909 সালের বই অনুযায়ী 1870 সালে (1906-এর বইয়ে জানুয়ারি 1870)। বাংলার সরকার আদেশ দেয়, জুম কর কেবল জুম-করা পরিবার দেবে এবং পরিবারপ্রতি 4 টাকা হবে আইনসিদ্ধ অঙ্ক। এর আগে অক্টোবর 1867-এ ক্যাপ্টেন লুইন বাড়িপ্রতি 4 টাকা সুপারিশ করেছিলেন।
বাংলাদেশ আমলের সরকারি মোট অঙ্ক প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। হাচিনসনের গেজেটিয়ার অনুযায়ী 1895 সালে তিন চিফের কাছ থেকে সরকার পেয়েছিল 8,387 টাকা, আর 1 এপ্রিল 1905 থেকে দশ বছরের জন্য বার্ষিক দাবি ঠিক হয় 13,803 টাকা — বোমাং 5,772, চাকমা 4,553, মং 3,478 টাকা।
42(6) বিধি অনুযায়ী হেডম্যান তাঁর মৌজার জুম করের দাবির অন্তত অর্ধেক চিফকে দেন “Punyah day”-তে, বাকিটা পরে। ডেইলি স্টারের 2009 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী সেই বছরের অনুষ্ঠানে চাকমা রাজা 175 জন হেডম্যানের কাছ থেকে বার্ষিক জুম কর গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠান নিয়মিত না হলে হেডম্যানরা সুবিধামতো সময়ে পরিশোধ করেন।
42(12) বিধি অনুযায়ী জেলা প্রশাসক (2014-এর সংশোধনের পর জেলা পরিষদ) কোনো একটি পরিবারের কর মাফ করলে চিফের সরকারি পাওনা কমে না, অর্থাৎ ক্ষতি চিফ ও হেডম্যানের ভাগে যায়। কিন্তু ফসলহানির কারণে কোনো এলাকার কর মাফ হলে সরকারও তার নিজের অংশের সমপরিমাণ পাওনা ছেড়ে দেয়।
জুমজার্নাল আর্কাইভ (প্রাথমিক উৎস)
আইন ও সরকারি নথি
গবেষণা
সংবাদপত্র
পদ্ধতি সম্পর্কে: বিধির ইংরেজি উদ্ধৃতিগুলো PCJSS-এর সংশোধনীসহ সংকলিত পাঠ থেকে, বাংলা অনুবাদ এই লেখার। শতাংশগুলো উৎসের টাকার অঙ্ক থেকে হিসাব করা, দশমিকের পর এক ঘর পর্যন্ত। ছবি: শিরোনামের ছবি — Jubersahel001, “Jhum Ghar”, CC BY-SA 4.0, উইকিমিডিয়া কমন্স।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 17 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:CHT Regulation 1900, জুমচাষ, পার্বত্য জেলা পরিষদ, সার্কেল চীফ, হেডম্যান
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।