Last updated Oct 6th, 2026
0

পার্বত্য চট্টগ্রামে কেউ জুম চাষ করলে তার কর যায় মৌজা হেডম্যানের কাছে। জমি নিয়ে বিরোধ হলে প্রথম বিচার বসে কার্বারির উঠানে। অথচ এই দুটি পদ ঠিক কী, কে নিয়োগ করেন, আর ক্ষমতার সীমা কোথায় — সে প্রশ্নের সোজা উত্তর কোথাও লেখা নেই।
এই লেখাটি ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির মূল পাঠ ধরে সেই উত্তরগুলো সাজিয়েছে। প্রতিটি দাবির পাশে বিধির নম্বর দেওয়া আছে, যাতে যাচাই করা যায়।
সংক্ষেপে উত্তরগুলো। হেডম্যানকে নিয়োগ ও বরখাস্ত করেন জেলা প্রশাসক, চিফের সঙ্গে পরামর্শ করে — কিন্তু চিফের ইচ্ছা মানতে তিনি বাধ্য নন। পদটি বংশানুক্রমিক নয়, তবে যোগ্য পুত্র পিতার স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন। জুম কর যায় হেডম্যানের কাছে, সেখান থেকে চিফের কাছে, হিসাব যায় জেলা প্রশাসক পর্যন্ত। কার্বারি সম্পর্কে শাসনবিধিতে কিছুই নেই — অথচ অধিকাংশ বিচার সেই স্তরেই হয়।
নিচে এই প্রতিটি বিষয় ধারাসহ বিস্তারিত, সঙ্গে রাজস্ব-বর্ষপঞ্জি, ভাগ-বাঁটোয়ারার ছক এবং কোন সিদ্ধান্ত মৌজায় থামে ও কোনটি জেলায় যায় তার তালিকা।
হেডম্যান নিয়োগ করেন জেলা প্রশাসক (Deputy Commissioner), সার্কেল চিফের সঙ্গে পরামর্শ করে। বরখাস্তও করেন জেলা প্রশাসকই — অযোগ্যতা বা অসদাচরণের কারণে, চিফের কাছে বিষয়টি পাঠানোর পর। ৪৮ বিধিতে স্পষ্ট লেখা, জেলা প্রশাসক চিফের ইচ্ছা মানতে বাধ্য নন, যদিও সেই ইচ্ছাকে পূর্ণ গুরুত্ব দিতে হবে।
এটি অনেকের ধারণার উল্টো। হেডম্যানকে প্রায়ই নিছক প্রথাগত পদ ভাবা হয়, কিন্তু বিধির কাঠামোয় পদটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের অংশ — নিয়োগ ও অপসারণ দুটোই রাষ্ট্রের হাতে।
একই বিধিতে চিফের অভিষেকের কথাও আছে, তবে সেটি নিয়ন্ত্রণ করে প্রাদেশিক সরকার। অর্থাৎ তিন স্তরের প্রতিটিতেই রাষ্ট্রের অনুমোদন লাগে।
প্রতিটি জুমচাষি পরিবার সরকার-নির্ধারিত হারে জুম কর দেয় মৌজা হেডম্যানকে (৪২ বিধি)। হেডম্যান সেই কর নিজের কাছে রাখেন না — বিধির ভাষায় তিনি নিজের অংশ কেটে রেখে বাকিটা চিফকে পরিশোধ করেন, আর হিসাব যায় জেলা প্রশাসক পর্যন্ত।
কর দেওয়ার একক কে, সেটি ৪২(১) বিধিতে সংজ্ঞায়িত করা আছে, এবং সংজ্ঞাটি বেশ নির্দিষ্ট। জুমচাষি পরিবার মানে — এক গৃহকর্তার অধীনে থাকা সদস্যরা, যাঁরা এক হেঁশেলে থাকেন, একটি জুম চাষ করেন এবং সেই জুমের ফসল ভাগ করে নেন।
তিনটি শর্ত একসঙ্গে: এক গৃহকর্তা, এক হেঁশেল, এক জুম। ফলে ‘পরিবার’ এখানে রক্তসম্পর্কের হিসাব নয়, একটি অর্থনৈতিক একক। একই বাড়িতে দুই ভাই আলাদা হেঁশেলে আলাদা জুম করলে বিধির চোখে তাঁরা দুটি পরিবার, এবং কর দুবার।
৪২ বিধি এই লেখার সবচেয়ে বিস্তারিত অংশ — বারোটি উপবিধি জুড়ে কে কাকে কত দেবে, কবে দেবে, না দিলে কী হবে, সব লেখা। মৌজা প্রশাসন আসলে কীভাবে চলে, তা এই একটি বিধিতেই সবচেয়ে স্পষ্ট।
জুম কর থেকে কোন শ্রেণির মানুষ প্রথা অনুযায়ী অব্যাহতি পান, তা ঘোষণা করেন সার্কেল চিফ — তাঁর নিজের সার্কেলের জন্য। কিন্তু ঘোষণাই শেষ কথা নয়। প্রতি বছর ১৫ অক্টোবরের আগে অস্থায়ী ও স্থায়ীভাবে অব্যাহতিপ্রাপ্ত জুমচাষি পরিবারের একটি তালিকা জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হয় (৪২(২))।
অর্থাৎ ছাড়ের ভিত্তি প্রথা, কিন্তু অনুমোদনের কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের।
বিধিতে একটি আলাদা শ্রেণির নাম আছে যা সাধারণ আলোচনায় প্রায় আসে না — পরকুলিয়া (Parkulia)। যে জুমচাষি পরিবার এক মৌজায় বাস করে কিন্তু জুম কাটে অন্য মৌজায়, তাদের এই নামে ডাকা হয় (৪২(৩))।
পরকুলিয়াদের অতিরিক্ত কর দিতে হয় সেই মৌজার হেডম্যানকে, যেখানে তাঁরা জুম করেন। হার দুই রকম:
ব্যবস্থাটির যুক্তি স্পষ্ট: যে মৌজার সম্পদ ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই মৌজার হেডম্যানও ভাগ পাবেন। আর সার্কেলের সীমা পেরোলে ভাগ দ্বিগুণ, কারণ তখন রাজস্ব অন্য চিফের এলাকা থেকে যাচ্ছে।
প্রতি বছর হেডম্যানকে জুম তৌজি তৈরি করতে হয়, এবং ৪২(৪) বিধিতে তার বিষয়বস্তু নির্দিষ্ট করে দেওয়া:
শেষ ঘরটি লক্ষ করার মতো। মৌজায় কে নতুন এসেছেন, সেটি প্রতি বছর নথিভুক্ত হয়। ৪১ক বিধিতে হেডম্যানকে নতুন আগন্তুকদের জুম কাটা ঠেকানোর ক্ষমতা দেওয়া আছে — আর এই তৌজিই সেই ক্ষমতার তথ্যভিত্তি।
বিধিতে তারিখগুলো এলোমেলোভাবে ছড়ানো, কিন্তু পাশাপাশি সাজালে একটি পূর্ণ রাজস্ব-বর্ষপঞ্জি দাঁড়ায়।
| তারিখ | কী ঘটে | বিধি |
|---|---|---|
| পুণ্যাহ দিবস | হেডম্যান জুম করের অন্তত অর্ধেক চিফকে দেন | ৪২(৬) |
| ১ জানুয়ারি | আগের বছরের অনাদায়ি কর বকেয়া হয়ে যায়; সুদ শুরু | ৪২(৬) |
| ১৫ জানুয়ারির আগে | হেডম্যান বাকি টাকা, বকেয়া তালিকা ও রসিদের মুড়ি চিফকে দেন | ৪২(৬) |
| ৩১ জানুয়ারির মধ্যে | চিফ খেলাপি হেডম্যানের নাম জেলা প্রশাসককে জানান | ৪২(৬) |
| ৩১ মার্চের মধ্যে | চিফ সরকারের পাওনা পরিশোধ করেন | ৪২(৯) |
| ১ এপ্রিল | চারণ করের নতুন বছর শুরু, পুনর্মূল্যায়ন | ৪৫খ(৮) |
| ১ জুনের আগে | হেডম্যান জুম তৌজি চিফের কাছে পাঠান | ৪২(৫) |
| ১ আগস্টের আগে | চিফ সব তৌজি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠান | ৪২(৫) |
| ১৫ অক্টোবরের আগে | চিফ অব্যাহতিপ্রাপ্তদের তালিকা জেলা প্রশাসকের অনুমোদনে পাঠান | ৪২(২) |
এর সঙ্গে একটি পাঁচ বছরের চক্রও আছে: জেলা প্রশাসক প্রতি পাঁচ বছরে অন্তত একবার প্রতিটি তৌজির নির্ভুলতা যাচাই করবেন (৪২(৫))। আর চিফের দায়িত্ব, প্রতিটি হেডম্যান যেন সঠিক হিসাব রাখেন এবং মুড়িসহ ছাপা রসিদ দেন।
ছাপা রসিদ ও মুড়ির শর্তটি ছোট মনে হলেও এটিই করদাতার একমাত্র প্রমাণ — এবং হেডম্যানের হিসাব মেলানোর একমাত্র উপায়।
জুম কর ক্যালেন্ডার বছরের মধ্যে হেডম্যানকে দিতে হয়। না দিলে পরের বছরের ১ জানুয়ারি থেকে তা বকেয়া, আর তার উপর বার্ষিক ৬¼ শতাংশ হারে সুদ চড়ে (৪২(৬))।
খেলাপি হেডম্যানের নাম চিফ ৩১ জানুয়ারির মধ্যে জেলা প্রশাসককে জানান। তদন্তের পর জেলা প্রশাসক বকেয়া সরকারি দাবি (public demand) হিসেবে আদায় করতে পারেন — অর্থাৎ প্রথাগত আদায়ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রীয় আদায়যন্ত্র সরাসরি নামে।
এভাবে আদায় হওয়া টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারাও নির্দিষ্ট: আদায় খরচ এবং হেডম্যানের অংশের এক-চতুর্থাংশ আগে প্রাদেশিক রাজস্বে জমা হয়, বাকিটা যায় চিফের কাছে (৪২(৭))। অর্থাৎ নিজে আদায় করতে ব্যর্থ হলে হেডম্যান তাঁর প্রাপ্য অংশের এক-চতুর্থাংশ হারান।
একটি উপবিধি আছে যা তিন স্তরের কাঠামোটিকে ভেঙে দিতে পারে। ৪২(৮) অনুযায়ী জেলা প্রশাসক লিখিতভাবে কারণ লিপিবদ্ধ করে এবং সংশ্লিষ্ট চিফকে জানিয়ে নির্দেশ দিতে পারেন যে, হেডম্যান বা সরাসরি জুমিয়ারা কর তাঁকেই দেবেন, চিফকে নয়।
এমন নির্দেশ দিলে হিসাবও বদলে যায়। হেডম্যানকে বাইপাস করা হলে তাঁর অংশের এক-চতুর্থাংশ আদায়-খরচ হিসেবে প্রাদেশিক রাজস্বে যায়, বাকিটা চিফকে। আর হেডম্যানের প্রাপ্য অংশ থেকে জেলা প্রশাসক আগে সরকারের পাওনা, তারপর চিফের পাওনা মিটিয়ে অবশিষ্টটুকু তাঁকে দেন।
বিধানটি দেখায়, সার্কেল চিফের রাজস্ব-ভূমিকা প্রথাগত অধিকার নয় — এটি একটি ব্যবস্থা, যা জেলা প্রশাসক কারণ দেখিয়ে স্থগিত করতে পারেন।
বিধিতে একটি স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞাও আছে, যা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থাকে। ৪২(১১) অনুযায়ী হেডম্যান ও চিফ জুমিয়া বা অন্য প্রজাদের কাছ থেকে কোনো আবওয়াব, নজর বা অন্য কোনো আদায় নিতে পারবেন না — ব্যতিক্রম কেবল তিনটি ক্ষেত্রে: যা প্রথাসিদ্ধ, যা অসন্তোষের কারণ হয় না, অথবা যা প্রাদেশিক সরকার বিশেষভাবে অনুমোদন করেছে।
‘আবওয়াব’ ও ‘নজর’ বাংলার পুরনো রাজস্ব-ভাষার শব্দ — নির্ধারিত খাজনার বাইরে আদায় করা অতিরিক্ত। এই ধারাটি কার্যত একটি অতিরিক্ত আদায়-বিরোধী বিধান, এবং এটি মনে করিয়ে দেয় যে বিধিপ্রণেতারা এই ঝুঁকিটি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন।
তবে ব্যতিক্রমের ভাষা শিথিল — ‘যা প্রথাসিদ্ধ এবং অসন্তোষের কারণ হয় না’ কে নির্ধারণ করবেন, বিধি তা বলে না। [যাচাই প্রয়োজন]
জুম চাষ ঝুঁকির কাজ, আর বিধিতে তার স্বীকৃতি আছে। লিখিত কারণ লিপিবদ্ধ করে, সংশ্লিষ্ট চিফ ও হেডম্যানদের সঙ্গে পরামর্শ করে জেলা প্রশাসক ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে জুম কর মওকুফ বা হ্রাস করতে পারেন, এবং ফসলহানির কারণে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার জন্য সামগ্রিক মওকুফও দিতে পারেন (৪২(১২))। মওকুফের অঙ্কসহ বিষয়টি কমিশনারের মাধ্যমে প্রাদেশিক সরকারকে জানাতে হয়।

হেডম্যানের একটি নির্দিষ্ট কাগুজে দায়িত্বও আছে: জুম তৌজি — প্রতি বছর তৈরি করা জুমচাষি পরিবারের তালিকা, যাতে পরিবারপ্রধানের নাম, সদস্যসংখ্যা, কে কর দিয়েছেন আর কে অব্যাহতি পেয়েছেন — সব থাকে।
বিধিতে এমন ধারাও আছে যে কর না দিয়ে কোনো জুমিয়া মৌজা ছেড়ে চলে যেতে চাইলে হেডম্যান তার সম্পত্তি আটকে রাখতে পারেন। অর্থাৎ পদটি কেবল সমাজপতির নয়, রাজস্ব আদায়েরও।
জুম করের বাইরে সাধারণ খাজনাও আদায় করেন হেডম্যান — প্রজাদের কাছ থেকে তুলে তা জমা দেন সাব-ডিভিশনাল অফিসার বা জেলা প্রশাসকের কাছে (৪৩(১) বিধি)। কেবল পুরনো প্রজারাই নন, ৩৪(১) বিধির অধীনে সরকার ভবিষ্যতে যাঁদের জমি ইজারা দেবে, সেই সব শ্রেণির ইজারাদারের কাছ থেকেও আদায়ের দায়িত্ব হেডম্যানের।
এর জন্য তিনি আদায়ের উপর কমিশন পান, সরকার সময়ে সময়ে যে হার অনুমোদন করে সেই হারে। তবে একটি ব্যতিক্রম বিধিতেই লেখা — বাগানজমির (grove land) ক্ষেত্রে এই কমিশন প্রযোজ্য নয়।
বাগানজমির ভাগের হিসাব আলাদা নিয়মে চলে। ৪৩(২) অনুযায়ী, বাগানজমি খাজনার আওতায় এলে চিফ ও হেডম্যান তার যে অনুপাতে অংশ পাবেন, সেই একই অনুপাত যা তাঁরা ওই জমির জুম থেকে পেতেন। অর্থাৎ ভূমির ব্যবহার বদলালেও দুই পদের প্রাপ্য অনুপাত অপরিবর্তিত থাকে — নতুন করে দরকষাকষির সুযোগ রাখা হয়নি।
খাজনা মওকুফের ক্ষমতা অবশ্য হেডম্যান বা চিফের নয়। ৪৩(৩) অনুযায়ী হাল ও বাগানজমির খাজনা মওকুফ করতে পারেন কেবল জেলা প্রশাসক, প্রতিটি ক্ষেত্রে যথেষ্ট কারণ লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করে।
জুম কর ও খাজনার পাশে একটি তৃতীয় আদায়ও হেডম্যানের হাত দিয়ে যায়, যা আলোচনায় প্রায় আসে না — চারণ কর (৪৫খ বিধি)। পার্বত্য চট্টগ্রামে রাখা বা চরানো গরু, মহিষ, ছাগল ও গয়াল করের আওতাভুক্ত।
আদায় করেন দুই ধরনের কর্মকর্তা — বাজার এলাকায় বাজার চৌধুরীরা, বাকি সব জায়গায় হেডম্যানরা। এখানেও নিয়মটি একই রকম কড়া: আদায়ের সময় ছাপা রসিদ দিতে হবে এবং অঙ্ক ক্যাশবইয়ে তুলতে হবে। বিনিময়ে তাঁরা কমিশন পান, যার হার জেলা প্রশাসক কমিশনারের অনুমোদনক্রমে নির্ধারণ করেন। ব্যতিক্রম কেবল সরকারি কর্মচারীরা — তাঁরা কমিশন পান না।
করের হারও নির্ধারণ করেন জেলা প্রশাসক, কমিশনারের অনুমোদন নিয়ে। কর প্রতি বছর ১ এপ্রিল থেকে পুনর্মূল্যায়িত হয়।
অব্যাহতির হিসাবটি বেশ বিস্তারিত, এবং তাতে জীবিকার ধরনের স্বীকৃতি আছে। যে পাহাড়ি কোনো জমি চাষ করেন না, তাঁর পরিবারও করমুক্তভাবে রাখতে পারে চারটি গরু, দুটি দুধছাড়ানো বাছুর ও দুটি ছাগল — অথবা বিকল্প হিসেবে দুটি গয়াল বা মহিষ, একটি বাছুর ও দুটি ছাগল। হিসাব মেলানোর জন্য একটি গয়াল বা মহিষকে দুটি গরুর সমান ধরা হয়।
যিনি অন্তত ০.৪ একর জমি চাষ করেন, তিনি এর অতিরিক্ত ছাড় পান — চাষের পরিমাণ অনুযায়ী প্রতি পূর্ণ একরে আরও গবাদি পশু করমুক্ত।
একটি সীমাও আছে: কর দিলে পশু চরানো যায় কেবল একটি মৌজার খাসজমিতে। একাধিক মৌজায় চরালে প্রতিটিতে নতুন করে কর ধার্য হয়।
এর বিনিময়ে হেডম্যান পারিশ্রমিক পান। ৪৬ বিধির শিরোনামেই তা আছে — খাজনা আদায়ের জন্য পারিশ্রমিক, এবং পদে থাকা অবস্থায় তাঁকে দেওয়া খাজনামুক্ত জমি। আর্কাইভের বিবরণ অনুযায়ী বর্তমানে হেডম্যান ও কার্বারি দুজনেই মাসিক ভাতা পান, কার্বারির ভাতা হেডম্যানের চেয়ে কম।
৪১ক বিধিতে হেডম্যানকে মৌজার সম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষমতাবলে তিনি চারটি কাজ করতে পারেন, আর সেগুলো বেশ নির্দিষ্ট:
জুম চাষের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ অবশ্য হেডম্যানের হাতে নয় — ৪১ বিধিতে সেটি জেলা প্রশাসকের। তিনি কোনো এলাকা জুমের জন্য বন্ধ ঘোষণা করতে পারেন, জুমিয়াদের চলাচলেও বিধিনিষেধ দিতে পারেন।
কার্বারি বসেন হেডম্যানের নিচের স্তরে — গ্রাম বা পাড়াভিত্তিক। আর্কাইভের বিবরণ অনুযায়ী প্রতিটি মৌজায় পাড়া ধরে ধরে কার্বারি নিযুক্ত হন, আর তাঁরা সামাজিক বিচার, খাজনা আদায় ও প্রশাসনিক কাজে হেডম্যানের সহকারী হিসেবে কাজ করেন।
বাস্তবে অধিকাংশ বিরোধ কার্বারির স্তরেই মেটে। হেডম্যান সামাজিক বিচার বসান সংশ্লিষ্ট পাড়ার কার্বারি ও স্থানীয় মুরুব্বিদের সহায়তায় — অর্থাৎ বিচারটি একক ব্যক্তির নয়, একটি সভার।
হেডম্যান পদ বাবার কাছ থেকে ছেলের কাছে যায় — এই ধারণা ব্যাপক। ৪৮ বিধির মূল বাক্যটি এ বিষয়ে দ্ব্যর্থহীন, তবে উত্তরটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনোটাই নয়:
“This appointment is not hereditary, but a son, when competent, may be appointed to succeed his father.”
শাসনবিধি ১৯০০, বিধি ৪৮
বাংলায় — এই নিয়োগ বংশানুক্রমিক নয়, তবে যোগ্য হলে পুত্র পিতার স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন।
বাক্যটি দুই ভাগে দুটি আলাদা কথা বলে। মূল নিয়ম: পদটি উত্তরাধিকারসূত্রে দাবি করা যায় না। ব্যতিক্রম: পুত্র যোগ্য হলে নিযুক্ত হতে পারেন।
ফলে বাস্তবে যা ঘটে — বহু মৌজায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পরিবার হেডম্যান — তা বিধি লঙ্ঘন নয়, ব্যতিক্রমটির নিয়মিত প্রয়োগ। কিন্তু আইনগতভাবে প্রতিটি নিয়োগ নতুন সিদ্ধান্ত, এবং সেই সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসকের।
‘যোগ্য’ বলতে কী বোঝায়, বিধি তা সংজ্ঞায়িত করেনি — শিক্ষা, বয়স বা অভিজ্ঞতার কোনো মাপকাঠি নেই। [যাচাই প্রয়োজন]
আরেকটি বিষয় ভাষাতেই স্পষ্ট: ব্যতিক্রমে লেখা আছে a son ও his father। কন্যার কোনো উল্লেখ নেই। নিয়োগের সাধারণ পথে বিধিতে লিঙ্গের কোনো শর্ত নেই, কিন্তু উত্তরাধিকারের একমাত্র স্বীকৃত পথটি কেবল পুত্রের জন্য লেখা।
একটি কম-আলোচিত বিধান কাঠামোটিকে জটিল করে তোলে। ৪৭ বিধি অনুযায়ী কমিশনারের অনুমোদন নিয়ে সার্কেল চিফ তাঁর সার্কেলের এক বা একাধিক মৌজা নিজের ‘খাস মৌজা’ হিসেবে রাখতে পারেন।
সেক্ষেত্রে চিফ হিসেবে প্রাপ্য পারিশ্রমিকের অতিরিক্ত তিনি হেডম্যানের জন্য নির্ধারিত সব পারিশ্রমিকও পান। শর্ত একটাই — হেডম্যান ও মৌজা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের যথাযথ ব্যবস্থা তাঁকে করতে হবে।
অর্থাৎ তিন স্তরের ছকটি সব মৌজায় তিন স্তর নয়। খাস মৌজায় উপরের দুটি স্তর একই ব্যক্তিতে মেলে, এবং সেখানে হেডম্যানের বিরুদ্ধে চিফের কাছে নালিশের পথটি কার্যত থাকে না।
প্রথাগত প্রশাসনের সবচেয়ে কঠিন ক্ষমতাগুলো এই অংশে, এবং এগুলো সাধারণত আলোচনায় আসে না।
৪৯ বিধি বলছে, এক সার্কেল থেকে অন্য সার্কেলে চাষি প্রজাদের স্থানান্তর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু নিরুৎসাহিত করতে হবে। কোনো চাষি প্রজা ততক্ষণ যেতে পারবেন না, যতক্ষণ না তিনি যে সার্কেল ও মৌজা ছাড়ছেন সেখানকার সমস্ত পাওনা মিটিয়ে দেন।
আর পাওনা না মিটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে — চিফ ও হেডম্যান জেলা প্রশাসকের আদেশ না আসা পর্যন্ত সেই ব্যক্তির দেহ ও সম্পত্তি উভয়ই আটকে রাখার ক্ষমতা রাখেন।
ইংরেজি পাঠে শব্দটি detain the persons and property — কেবল সম্পত্তি নয়, ব্যক্তিও। এটি প্রথাগত পদাধিকারীর হাতে দেওয়া একটি অসাধারণ ক্ষমতা, যা কার্যত আটকের সমতুল্য।
এই বিধানের সঙ্গে মেলে ৪২(১০): কোনো জুমিয়া কর না দিয়ে চলে যাওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে হেডম্যানের মনে হলে তিনি তাঁর সম্পত্তি আটকে রাখবেন এবং বিষয়টি চিফ বা জেলা প্রশাসককে জানাবেন। এখানে ক্ষমতাটি বিকল্প নয়, দায়িত্ব — কারণ পরের বাক্যেই লেখা, হেডম্যান এই ব্যবস্থা নিতে অবহেলা করলে খেলাপি জুমিয়ার করের জন্য তাঁকে দায়ী করা যেতে পারে।
আর যিনি পালিয়ে যান, তিনি পাওনা না মেটানো পর্যন্ত ওই সার্কেলে আর বসতি করতে পারবেন না।
তিনটি বিধান একসঙ্গে পড়লে ছবিটি স্পষ্ট: হেডম্যানের রাজস্ব-দায়িত্ব ব্যক্তিগত ঝুঁকিসহ আসে, আর সেই ঝুঁকি সামলানোর জন্য তাঁকে দেওয়া হয়েছে আটকের ক্ষমতা। পদটির কর্তৃত্ব কেবল সামাজিক সম্মানের নয়।
ক্ষমতার তালিকা যত লম্বাই হোক, সীমাগুলো না জানলে ছবিটি ভুল হয়। শাসনবিধি ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি বিষয় হেডম্যানের বাইরে রেখেছে।
| বিষয় | সিদ্ধান্ত কার | বিধি |
|---|---|---|
| জুম চাষের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ, এলাকা বন্ধ ঘোষণা | জেলা প্রশাসক | ৪১ |
| সরকারি খাস জমির বন্দোবস্ত ও উচ্ছেদ | জেলা প্রশাসক | ৩৪ |
| অকৃষি জমির খাজনা নির্ধারণ; বাজার মৌজা থেকে আলাদা করা | জেলা প্রশাসক | ৪৪ |
| ঘাসের খোলা বন্দোবস্ত | জেলা প্রশাসক | ৪৫ |
| খাজনা মওকুফ | জেলা প্রশাসক | ৪৩(৩), ৪২(১২) |
| ০.৩০ একরের বেশি বসতভিটা | জেলা প্রশাসকের বন্দোবস্ত লাগে | ৫০(২) |
| হেডম্যানের নিজের নিয়োগ ও বরখাস্ত | জেলা প্রশাসক | ৪৮ |
একটি জায়গায় অবশ্য হেডম্যানের হাতেই চূড়ান্ত ক্ষমতা, আর সেটি দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে ঘন ঘন কাজে লাগে। ৫০(১) অনুযায়ী একজন পাহাড়ি ০.৩০ একর পর্যন্ত অ-শহুরে খাস জমি বসতভিটার জন্য নিতে পারেন কেবল মৌজার হেডম্যানের অনুমতিতেই — জেলা প্রশাসকের আনুষ্ঠানিক বন্দোবস্ত লাগে না। হেডম্যান এমন বরাদ্দকৃত জমির একটি রেজিস্টার রাখেন।
অর্থাৎ বড় ভূমি-সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের, কিন্তু কে কোথায় ঘর তুলবেন — সেই সিদ্ধান্তটি মৌজাতেই থেমে যায়।
মৌজার বাসিন্দারা হেডম্যানের কাছে সবচেয়ে বেশি যান জমি নিয়ে। কিন্তু ৩৪ বিধি পড়লে দেখা যায়, জমি সংক্রান্ত প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তেই চূড়ান্ত অনুমোদন জেলা প্রশাসকের।
৩৪(৫) অনুযায়ী কোনো ইজারাদার বা উপ-ইজারাদার তাঁর holding-এর পুরোটা বা অংশবিশেষ বিক্রি, দান বা বন্ধক করতে পারবেন না জেলা প্রশাসকের পূর্বানুমোদন ছাড়া।
বন্ধকের ক্ষেত্রে শর্ত আরও কড়া। সাধারণ নিয়মে জেলা প্রশাসক কেবল দখলি বন্ধক (usufructuary mortgage) অনুমোদন করতে পারেন, এবং তার মেয়াদ সাত বছরের বেশি নয়। ওই সাত বছরের মধ্যেই আসল ও সুদসহ পুরো ঋণ শোধ হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে, আর মেয়াদ কোনো অবস্থাতেই বাড়ানো যাবে না।
ব্যতিক্রম কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ঋণদাতাদের ক্ষেত্রে — সরকার, নির্দিষ্ট কয়েকটি উন্নয়ন ব্যাংক, নিবন্ধিত সমবায় সমিতি বা অন্য ঋণদাতা সংস্থার অনুকূলে জেলা প্রশাসক সাধারণ বন্ধকও অনুমোদন করতে পারেন।
বিধির শেষ বাক্যটি নির্মম: অননুমোদিত হস্তান্তর কোনো অবস্থাতেই স্বীকৃতি পাবে না। আর ৩৪(৬) অনুযায়ী অননুমোদিত উপ-ইজারা বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক জমিটি বাজেয়াপ্ত করবেন এবং পরিস্থিতি বুঝে তা খাস রাখতে বা যে কাউকে ইজারা দিতে পারেন।
মেয়াদ সাত বছরে বাঁধা আর দখলি বন্ধকে সীমাবদ্ধ রাখা — দুটিই ঋণের ফাঁদে জমি হারানো ঠেকানোর ব্যবস্থা। বিধিটি লেখা হয়েছিল এমন এক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ঋণের মাধ্যমে ভূমি হাতবদল একটি চেনা ঝুঁকি ছিল।
৩৪(৪) অনুযায়ী কোনো ইজারাদার তাঁর জমির পুরোটা বা অংশবিশেষ উপ-ইজারা দিতে পারবেন না। আর ৩৪(৩খ) বলছে, স্বীকৃত কোনো উপ-ইজারা যে কারণেই শেষ হোক, সেই জমি আবার উপ-ইজারা দেওয়া যাবে না।
holding ভাগ করার ক্ষেত্রেও একই কথা — জেলা প্রশাসকের সম্মতি ছাড়া কোনো holding-এর বিভাজন করা যাবে না (৩৪(৭))।
উত্তরাধিকারের প্রশ্নে এটি গুরুত্বপূর্ণ। পিতার মৃত্যুর পর সন্তানদের মধ্যে জমি ভাগ হলে সেটি কাগজে-কলমে partition, আর তার জন্য প্রশাসনিক সম্মতি লাগে। প্রথা কীভাবে ভাগ করবে তা প্রথার ব্যাপার, কিন্তু সেই ভাগ নথিভুক্ত হওয়ার শর্ত রাষ্ট্রীয়।
বিধি প্রজাদের একেবারে অরক্ষিত রাখেনি। ৩৪(১০) ও ৩৪(১১) দুই শ্রেণির প্রজাকে স্থায়ী ও উত্তরাধিকারযোগ্য স্বত্ব দিয়েছে:
এই স্বত্ব নিঃশর্ত নয়। খাজনা বকেয়া রাখলে, জমি এমনভাবে ব্যবহার করলে যাতে তা প্রজাস্বত্বের উপযোগী থাকে না, অথবা ইজারার শর্ত ভাঙলে উচ্ছেদ হতে পারে। তবে উচ্ছেদের ক্ষমতা কেবল জেলা প্রশাসকের (৩৪(১২)) — হেডম্যান বা চিফের নয়।
একটি নির্দিষ্ট তারিখ বিধিতে স্থায়ীভাবে গেঁথে আছে। ১৯২০ সালের ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে সব উপ-প্রজা বিদ্যমান ছিলেন এবং জেলা প্রশাসক কর্তৃক স্বীকৃত, তাঁদের ৩৪(৮)-এর নিয়ম ছাড়া উচ্ছেদ করা যাবে না, এবং জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া তাঁদের খাজনা বাড়ানোও যাবে না (৩৪(৩ক))।
খাজনা বৃদ্ধির উপর আরও একটি সীমা আছে। ৩৪(৯) অনুযায়ী স্বীকৃত উপ-প্রজার খাজনা বাড়াতে পারেন কেবল জেলা প্রশাসক, এবং আবেদনের আগের দশ বছরে সেই খাজনা না বাড়ানো থাকলে তবেই। জমিদারের নিজের খাজনার চেয়ে উপ-প্রজার খাজনা ৫০ শতাংশের বেশি হয়ে গেলে লিখিত বিশেষ কারণ ছাড়া তা বাড়ানো যাবে না।
এগুলো হেডম্যানের ক্ষমতার তালিকায় পড়ে না, কিন্তু মৌজার বাসিন্দাদের জানা দরকার — কারণ খাজনা বৃদ্ধির নোটিশ এলে প্রশ্ন করার ভিত্তি এই ধারাগুলোই।
হেডম্যান-কার্বারি-চিফ — এই তিন স্তরের বাইরে বিধিতে আরও একটি পদ আছে, যা আলোচনায় প্রায় আসে না: বাজার চৌধুরী।
৪৫খ(৯) অনুযায়ী বাজার এলাকার বাসিন্দাদের কাছ থেকে চারণ কর আদায় করেন বাজার চৌধুরীরা — বাকি সবার কাছ থেকে হেডম্যানরা। দুই পক্ষের দায়িত্ব ও সুবিধা একই: ছাপা রসিদ দেওয়া, ক্যাশবইয়ে অঙ্ক তোলা, এবং আদায়ের উপর কমিশন পাওয়া।
এই পদের অস্তিত্বের কারণ ৪৪ বিধিতে। সেখানে বলা আছে, অকৃষি জমির খাজনা নির্ধারণ করেন জেলা প্রশাসক, তবে বাজারের ক্ষেত্রে নিয়মটি আলাদা — জেলা প্রশাসক চাইলে বাজারকে মৌজা থেকে আলাদা করে নিজে বন্দোবস্ত দিতে পারেন, এবং তা হেডম্যানের মাধ্যমে বা সরাসরি নিজে — যেভাবে উপযুক্ত মনে করেন — পরিচালনা করতে পারেন।
ফলে বাজার এলাকা মৌজা প্রশাসনের একটি ব্যতিক্রম। মৌজার মানচিত্রে বাজার থাকলেও তা হেডম্যানের এখতিয়ারের বাইরে চলে যেতে পারে।
বাজার চৌধুরী কীভাবে নিযুক্ত হন, তাঁর মেয়াদ কত, বা কার্বারির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী — শাসনবিধির যে অংশ এই কাজে পড়া হয়েছে, তাতে এসব পাওয়া যায়নি। [যাচাই প্রয়োজন]
সব মিলিয়ে প্রথাগত প্রশাসন তিন স্তরের, আর প্রতিটি স্তরের ক্ষমতা আলাদা:
| স্তর | এলাকা | মূল দায়িত্ব |
|---|---|---|
| সার্কেল চিফ | সার্কেল | হেডম্যানদের কাছ থেকে জুম কর গ্রহণ; হেডম্যান নিয়োগে পরামর্শ; অভিষেক প্রাদেশিক সরকার-নিয়ন্ত্রিত (৪৮) |
| মৌজা হেডম্যান | মৌজা | জুম কর ও খাজনা আদায় (৪২, ৪৩); জুম তৌজি; মৌজার সম্পদ সংরক্ষণ (৪১ক); সামাজিক বিচার |
| কার্বারি | গ্রাম / পাড়া | প্রথম স্তরের বিচার; হেডম্যানের সহকারী; মাসিক ভাতাপ্রাপ্ত |
জুম চাষ কে নিয়ন্ত্রণ করেন — এই প্রশ্নে বিভ্রান্তি সবচেয়ে বেশি, কারণ পাশাপাশি দুটি বিধি দুই কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতা দিয়েছে। দুটোই ১৯৩৯ সালে একই প্রজ্ঞাপনে যুক্ত হয়েছিল, আর ভাগটি ইচ্ছাকৃত।
৪১ বিধি — জেলা প্রশাসকের। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম চাষ নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মন করতে এবং সে জন্য প্রয়োজনীয় আদেশ জারি ও কার্যকর করতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। যথেষ্ট কারণ থাকলে তিনি যেকোনো এলাকা জুমের জন্য বন্ধ ঘোষণা করতে পারেন, এবং জুমিয়াদের স্থানান্তরেও বিধিনিষেধ দিতে পারেন।
৪১ক বিধি — হেডম্যানের। তিনি নিজের মৌজার সম্পদ সংরক্ষণের জন্য দায়ী, এবং সে জন্য চারটি নির্দিষ্ট কাজ করতে পারেন — যেগুলো আগে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
পার্থক্যটি ভাষাতেই ধরা আছে। ৪১ বিধির ক্ষমতা আঞ্চলিক ও নীতিগত — গোটা জেলা, এলাকা বন্ধ করা, মানুষের চলাচল। ৪১ক বিধির ক্ষমতা মৌজাবদ্ধ ও সম্পদ-কেন্দ্রিক — বাঁশ-কাঠ, রিজার্ভ, নতুন আগন্তুক, গবাদি পশু।
ব্যবহারিক ফল: হেডম্যান তাঁর মৌজার একটি অংশ রিজার্ভ ঘোষণা করে জুমের বাইরে রাখতে পারেন, কিন্তু গোটা এলাকা জুমের জন্য বন্ধ ঘোষণা করতে পারেন না। আবার জেলা প্রশাসকের আদেশ এলে হেডম্যানের সিদ্ধান্ত তার নিচে পড়ে।
দুই বিধির মধ্যে সংঘর্ষ হলে নিষ্পত্তির কোনো পদ্ধতি বিধিতে লেখা নেই। [যাচাই প্রয়োজন]
মৌজা থেকে সরকারের ঘরে টাকা যায় একাধিক পথে, আর প্রতিটি পথে হেডম্যান ও চিফের প্রাপ্য আলাদা নিয়মে ঠিক হয়। বিধিগুলো ছড়ানো থাকায় ছবিটি সহজে চোখে পড়ে না। পাশাপাশি সাজালে দাঁড়ায়:
| আদায়ের ধরন | কে আদায় করেন | হেডম্যানের প্রাপ্য | বিধি |
|---|---|---|---|
| জুম কর | হেডম্যান | নিজের অংশ কেটে রেখে বাকিটা চিফকে | ৪২(১) |
| সাধারণ খাজনা | হেডম্যান | আদায়ের উপর কমিশন | ৪৩(১) |
| বাগানজমির খাজনা | হেডম্যান | কমিশন নয়; জুম থেকে যে অনুপাতে পেতেন সেই অনুপাত | ৪৩(১), ৪৩(২) |
| চারণ কর | হেডম্যান (বাজারে চৌধুরী) | কমিশন; সরকারি কর্মচারী হলে নয় | ৪৫খ(৯) |
| ঘাসের খোলার খাজনা | জেলা প্রশাসকের বন্দোবস্তে | কিছু নয় — আলাদা আদায়, rent-roll-এ যোগ হয় না | ৪৫ |
| বাজারের বন্দোবস্ত | জেলা প্রশাসক | নির্ভর করে তিনি হেডম্যানের মাধ্যমে চালান কি না | ৪৪ |
ছকটি দুটি জিনিস স্পষ্ট করে।
প্রথমত, হেডম্যানের আয় একরকম নয়। জুম করে তিনি ‘অংশ’ পান, খাজনায় ‘কমিশন’ পান, আর ঘাসের খোলায় কিছুই পান না। ৪৫ বিধিতে স্পষ্ট লেখা, ঘাসের খোলার খাজনা আলাদাভাবে আদায় হবে এবং rent-roll-এ যোগ হবে না বা হাল চাষ ও অকৃষি জমির খাজনার মতো বণ্টিত হবে না। বণ্টন না হওয়া মানেই মৌজা স্তরে ভাগ না যাওয়া।
দ্বিতীয়ত, ব্যতিক্রমগুলো এলোমেলো নয়। যেখানে জমি জেলা প্রশাসক নিজে বন্দোবস্ত দেন — ঘাসের খোলা, বাজার — সেখানে মৌজার ভাগ কমে বা মিলিয়ে যায়। যেখানে আদায়ের শ্রম হেডম্যানের, সেখানে তাঁর প্রাপ্য থাকে। ভাগের হিসাব অনুসরণ করলে দেখা যায় কোন জমি কার্যত মৌজার এখতিয়ারে, আর কোনটি নয়।
এতক্ষণ প্রতিটি দাবির পাশে বিধির নম্বর দেওয়া গেছে। কার্বারির ক্ষেত্রে তা যায় না, আর সেটাই এই অংশের বিষয়।
শাসনবিধিতে সার্কেল চিফ আছেন, হেডম্যান আছেন, এমনকি বাজার চৌধুরীও আছেন। কার্বারি নেই। নিয়োগ কে করেন, মেয়াদ কত, কীভাবে সরানো যায়, এখতিয়ার কতদূর, পারিশ্রমিক কী — এই কাজে যে অংশগুলো পড়া হয়েছে, তার কোথাও কার্বারি সংক্রান্ত বিধান পাওয়া যায়নি।
অথচ বাস্তবে অধিকাংশ বিরোধ কার্বারির স্তরেই মেটে। অর্থাৎ যে স্তরে সবচেয়ে বেশি বিচার হয়, সেটিই সবচেয়ে কম নথিভুক্ত।
এক — অপসারণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নেই। হেডম্যানকে বরখাস্ত করতে হলে নির্দিষ্ট কারণ লাগে (অযোগ্যতা বা অসদাচরণ), চিফের কাছে বিষয়টি পাঠাতে হয়, এবং সিদ্ধান্ত নেন জেলা প্রশাসক — অর্থাৎ একটি প্রক্রিয়া আছে। কার্বারির ক্ষেত্রে এমন কোনো লিখিত প্রক্রিয়া বিধিতে নেই।
দুই — এখতিয়ারের সীমা লিখিত নয়। কার্বারি কোন ধরনের বিরোধ শুনতে পারেন, কোনটি হেডম্যানের কাছে পাঠাতে বাধ্য, তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল কোথায় — কোনোটিরই লিখিত উত্তর নেই। প্রথা অনুযায়ী চললেও, বিরোধ বাধলে দেখানোর মতো পাঠ থাকে না।
তিন — পারিশ্রমিকের ভিত্তি প্রথাগত। আর্কাইভের বিবরণ অনুযায়ী কার্বারিরা মাসিক ভাতা পান, হেডম্যানের চেয়ে কম। কিন্তু হেডম্যানের পারিশ্রমিকের মতো এর কোনো বিধিগত ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এটি নিছক প্রশাসনিক খুঁত নয়। প্রথাগত প্রতিষ্ঠান নিয়ে যে কোনো সংস্কার আলোচনায় এই ফাঁকটি গুরুত্বপূর্ণ — কারণ যাকে আইনে সংজ্ঞায়িতই করা হয়নি, তাকে আইন দিয়ে রক্ষা করাও কঠিন।
কার্বারি নিয়োগ ও অপসারণ জেলা পরিষদ আইন বা পরবর্তী কোনো সার্কুলারে নিয়ন্ত্রিত হয় কি না, তা আলাদা যাচাইয়ের বিষয়। [যাচাই প্রয়োজন]
শাসনবিধির শেষ দিকের কয়েকটি বিধি মৌজা প্রশাসনের অংশ নয়, কিন্তু মৌজায় কে থাকতে পারবেন তা এগুলোই ঠিক করে। হেডম্যান বা কার্বারির এখানে কোনো ভূমিকা বিধিতে দেওয়া নেই — ক্ষমতা পুরোটাই জেলা প্রশাসকের।
৫১ বিধি — অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের বহিষ্কার।
৫১ক বিধি — জরুরি পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসকের ক্ষমতা, যা দিয়ে তিনি ব্যবসা ও ব্যক্তির চলাচল নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করতে পারেন।
৫২ বিধি — পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ। এটি সবচেয়ে বিস্তারিত। বিধির উপ-অনুচ্ছেদগুলোর শিরোনাম থেকেই ব্যবস্থাটির চেহারা বোঝা যায়:
এই তালিকাটি এখানে রাখার কারণ একটাই — মৌজা প্রশাসনের ছবি সম্পূর্ণ হয় না, যদি না দেখা যায় যে মৌজায় কে ঢুকতে পারবেন সেই সিদ্ধান্তটি মৌজার বাইরে নেওয়া হয়।
এই বিধিগুলোর মূল পাঠ এই কাজে বিস্তারিতভাবে পড়া হয়নি; উপরের বিবরণ বিধির উপ-অনুচ্ছেদ-শিরোনাম থেকে নেওয়া। বর্তমানে এগুলোর কোনটি কার্যকর ও কোনটি রহিত, তা যাচাই করা হয়নি। [যাচাই প্রয়োজন]
কড়াকড়ির তালিকার মধ্যে একটি ছাড়ও আছে। ৪৫ক বিধি অনুযায়ী জেলা প্রশাসক যখনই উপযুক্ত মনে করেন, পাহাড়িদের ঘরের প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য রয়্যালটি ছাড়াই সুনগ্রাস (ছন) সংগ্রহের অনুমতি দিতে পারেন।
ছন ঘরের ছাউনির প্রধান উপকরণ। বিধিটি দেখায়, রাজস্ব-ব্যবস্থা তৈরির সময় ঘরে ব্যবহারের প্রয়োজন আর বাণিজ্যিক আহরণের মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছিল — যেমনটি ৪১ক বিধিতেও, যেখানে মৌজার বাসিন্দাদের গৃহস্থালির প্রয়োজন বাদে বাঁশ-কাঠ সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতা হেডম্যানকে দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক, সার্কেল চিফের সঙ্গে পরামর্শ করে। বরখাস্তও করেন জেলা প্রশাসক — অযোগ্যতা বা অসদাচরণের কারণে। ৪৮ বিধি অনুযায়ী তিনি চিফের ইচ্ছা মানতে বাধ্য নন।
মৌজা হেডম্যানকে, সরকার-নির্ধারিত হারে (৪২ বিধি)। হেডম্যান সেই করের অন্তত অর্ধেক সার্কেল চিফকে পরিশোধ করেন।
প্রতি বছর হেডম্যানের তৈরি জুমচাষি পরিবারের তালিকা — পরিবারপ্রধানের নাম, সদস্যসংখ্যা, কে কর দিয়েছেন, কে অব্যাহতি পেয়েছেন।
কার্বারি গ্রাম বা পাড়ার স্তরে, হেডম্যান মৌজার স্তরে। কার্বারি সামাজিক বিচার ও খাজনা আদায়ে হেডম্যানের সহকারী হিসেবে কাজ করেন এবং তুলনামূলক কম ভাতা পান।
না। ৪৮ বিধিতে স্পষ্ট লেখা, এই নিয়োগ বংশানুক্রমিক নয়। তবে একই বাক্যে একটি ব্যতিক্রম আছে — যোগ্য হলে পুত্র পিতার স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন। ফলে একই পরিবারে পদটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম থাকা বিধিবিরুদ্ধ নয়, কিন্তু আইনগতভাবে প্রতিটি নিয়োগ জেলা প্রশাসকের নতুন সিদ্ধান্ত।
যে জুমচাষি পরিবার এক মৌজায় বাস করে কিন্তু জুম কাটে অন্য মৌজায়, বিধিতে তাদের বলা হয় পরকুলিয়া। তারা যে মৌজায় জুম করে সেখানকার হেডম্যানকে অতিরিক্ত কর দেয় — একই সার্কেলের মধ্যে হলে অর্ধেক হারে, অন্য সার্কেলে হলে পূর্ণ হারে (৪২(৩) বিধি)।
৪২(১) বিধির সংজ্ঞা অনুযায়ী জুমচাষি পরিবার হলো এক গৃহকর্তার অধীনে থাকা সদস্যরা, যাঁরা এক হেঁশেলে থাকেন, একটি জুম চাষ করেন এবং সেই জুমের ফসল ভাগ করে নেন। অর্থাৎ এটি রক্তসম্পর্কের হিসাব নয়, একটি অর্থনৈতিক একক।
ক্যালেন্ডার বছরের মধ্যে কর না দিলে পরের বছরের ১ জানুয়ারি থেকে তা বকেয়া হয়ে যায় এবং বার্ষিক ৬¼ শতাংশ হারে সুদ চড়ে। খেলাপি হেডম্যানের নাম চিফ ৩১ জানুয়ারির মধ্যে জেলা প্রশাসককে জানান, এবং তদন্তের পর জেলা প্রশাসক বকেয়া সরকারি দাবি হিসেবে আদায় করতে পারেন (৪২(৬) বিধি)।
না। ৪২(১১) বিধিতে স্পষ্ট নিষেধ — হেডম্যান ও চিফ জুমিয়া বা অন্য প্রজাদের কাছ থেকে কোনো আবওয়াব, নজর বা অতিরিক্ত আদায় নিতে পারবেন না। ব্যতিক্রম কেবল যা প্রথাসিদ্ধ ও অসন্তোষের কারণ হয় না, অথবা প্রাদেশিক সরকার বিশেষভাবে অনুমোদন করেছে।
পাওনা বকেয়া থাকলে পারেন। ৪৯ বিধি অনুযায়ী কোনো চাষি প্রজা সমস্ত পাওনা না মিটিয়ে অন্য সার্কেলে যেতে পারবেন না, আর পাওনা না মিটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে চিফ ও হেডম্যান জেলা প্রশাসকের আদেশ না আসা পর্যন্ত সেই ব্যক্তির দেহ ও সম্পত্তি আটকে রাখতে পারেন।
শাসনবিধি ১৯০০-এ এর উত্তর নেই। বিধিতে সার্কেল চিফ, হেডম্যান এমনকি বাজার চৌধুরীর কথা থাকলেও কার্বারি সংক্রান্ত কোনো বিধান নেই — নিয়োগ, মেয়াদ, অপসারণ, এখতিয়ার বা পারিশ্রমিক কিছুই নয়। ফলে বাস্তবে যে স্তরে সবচেয়ে বেশি বিচার হয়, সেটিই সবচেয়ে কম নথিভুক্ত।
০.৩০ একর পর্যন্ত অ-শহুরে খাস জমি বসতভিটার জন্য নিতে কেবল মৌজার হেডম্যানের অনুমতিই যথেষ্ট, জেলা প্রশাসকের আনুষ্ঠানিক বন্দোবস্ত লাগে না (৫০(১) বিধি)। এর বেশি জমি লাগলে জেলা প্রশাসকের বন্দোবস্ত নিতে হয়। হেডম্যান বরাদ্দকৃত এসব জমির একটি রেজিস্টার রাখেন।
একটি কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার। এই লেখা শাসনবিধি ১৯০০ কী বলে তার বিবরণ — বাস্তবে কী ঘটে তার নয়। বিধিতে লেখা ছাপা রসিদ, ক্যাশবই, পাঁচ বছরে একবার তৌজি যাচাই বা আবওয়াব-নজরের নিষেধ — এগুলো কতটা অনুসরণ করা হয়, তার কোনো সমীক্ষা এই কাজে ব্যবহার করা হয়নি।
একইভাবে, ১৯০০ সালের এই কাঠামোর উপর পরে বসেছে ১৯৮৯ সালের তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৭ সালের চুক্তি এবং আঞ্চলিক পরিষদ আইন। কোথায় সেগুলো এই বিধিকে প্রতিস্থাপিত করেছে, কোথায় পাশাপাশি চলছে — সেটি আলাদা লেখার বিষয়, আর জুমজার্নালে সার্কেল চিফ, জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ নিয়ে আলাদা লেখা রয়েছে।
পদ্ধতি সম্পর্কে। এই লেখার প্রতিটি দাবির পাশে বিধির নম্বর দেওয়া আছে যাতে পাঠক নিজে মিলিয়ে নিতে পারেন। ইংরেজি উদ্ধৃতিগুলো সংশোধনীসহ সংকলিত পাঠ থেকে নেওয়া — মূল ১৯০০ সালের পাঠ নয়; ৪১, ৪১ক ও ৪২ বিধি ১৯৩৮–১৯৪৪ সালের একাধিক প্রজ্ঞাপনে সংশোধিত হয়েছে। বাংলা অনুবাদগুলো এই লেখার। ৫১, ৫১ক ও ৫২ বিধির ক্ষেত্রে মূল পাঠ নয়, উপ-অনুচ্ছেদের শিরোনাম অনুসরণ করা হয়েছে, এবং তা লেখাতেই বলা আছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৫ আগস্ট ২০২৬
প্রসঙ্গ:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।