Last updated Oct 6th, 2026
7

চুক্তিটি বাংলায় লেখা। শেষ পাতায় দুটি সই — একদিকে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে (আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্), আহ্বায়ক, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি”, অন্যদিকে “পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে (জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা), সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি”। তারিখ: ১৮ই অগ্রহায়ণ ১৪০৪, মোতাবেক ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭। স্থান: ঢাকা।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা একটি সশস্ত্র সংঘাতের অবসান হলো ওই দুটি সইয়ে।
আটাশ বছর পরে সেই একই নথি নিয়ে দুটি আলাদা হিসাব চালু আছে। সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৫টি বাস্তবায়িত — অর্থাৎ ৯০ শতাংশের বেশি। জনসংহতি সমিতির বিবৃতিতে বলা হয়, দুই-তৃতীয়াংশ ধারা অবাস্তবায়িত — অর্থাৎ ৩৩ শতাংশ। একই দলিল, দুই রকম অঙ্ক।
এই লেখায় আমরা দলিলটাই পড়ব — কোন খণ্ডে কী আছে, তারপর কার হিসাবে কোন ধারাটি কোন অবস্থায় আছে। মতামত নয়, ধারা ধরে ধরে।
সূচিপত্র
চুক্তি পড়ার আগে জানা দরকার এটি কীসের সমাধান হিসেবে লেখা হয়েছিল।
বাংলাপিডিয়ায় আমেনা মহসিনের লেখা নিবন্ধে সূত্রটি এভাবে ধরা: স্বাধীনতার পরপরই মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে পাহাড়িরা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে তাঁদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের স্বীকৃতির দাবি জানান। দাবি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, যার একটি সামরিক শাখা দাঁড়ায় — শান্তিবাহিনী। ১৯৭৫ সালের পর লারমা ভারতে চলে গেলে সশস্ত্র তৎপরতা বাড়ে। লারমার রাজনৈতিক চিন্তা ও দাবিনামা নিয়ে আলাদা লেখা আছে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পোস্টে।
তারিখ নিয়ে উৎসে মিল নেই — বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধে সমিতি গঠনের সময় বলা হয়েছে ১৯৭৩ সালের মার্চ; বাংলা উইকিপিডিয়ায় শান্তিবাহিনী গঠনের তারিখ দেওয়া আছে ৭ জানুয়ারি ১৯৭৩, খাগড়াছড়ির ইতছড়ির জঙ্গলে।
সরকারের জবাব ছিল দুই ধরনের — সামরিক মোতায়েন, আর ১৯৭৯ সাল থেকে সমতল থেকে বাঙালি পরিবার পুনর্বাসনের কর্মসূচি। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে এই সময়ে জনমিতি পাল্টে যায় নাটকীয়ভাবে: ১৯৭৪ সালে বাঙালি ছিলেন মোট জনসংখ্যার ১১.৬%, ১৯৯১ সালে ৪৮.৫%। এই পুনর্বাসন কর্মসূচি ও তার ভূমি-প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আছে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি লেখায়।
আলোচনার সূত্রপাত ১৯৯১ সালে, গণতান্ত্রিক শাসন ফেরার পর। বাংলা উইকিপিডিয়ার বিবরণে সেই দফার আলোচনা এগোয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নথিতে চুক্তির পটভূমি এক বাক্যে লেখা: “পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিরাজমান পরিস্থিতি নিরসনের লক্ষ্যে ১৯৯৬ সনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতির কয়েক দফা সংলাপের পর” চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
অর্থাৎ যে সমস্যাটির সমাধান হিসেবে চুক্তিটি লেখা, তার তিনটি স্তর: স্বীকৃতির প্রশ্ন (পাহাড়িদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও শাসনব্যবস্থা), ভূমির প্রশ্ন (জনস্থানান্তর ও দখল), আর নিরাপত্তার প্রশ্ন (সশস্ত্র সংঘাত ও সামরিক উপস্থিতি)। চুক্তির চারটি খণ্ড এই তিনটিকেই ধরার চেষ্টা করেছে — এবং আটাশ বছর পরে যেগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে, সেগুলোও এই তিনটিরই ভেতরে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী চুক্তিটি চার খণ্ডে বিভক্ত:
| খণ্ড | বিষয় | ধারা |
|---|---|---|
| ক | সাধারণ | ৪ |
| খ | পার্বত্য জেলা পরিষদ | ৩৫ |
| গ | পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ | ১৪ |
| ঘ | পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা ও অন্যান্য | ১৯ |
| মোট | — | ৭২ |
চুক্তির ভাষাটি লক্ষ করার মতো। এটি কোনো “স্বাধীনতা” বা “স্বায়ত্তশাসনের” দলিল নয়; প্রথম বাক্যেই বলা হয়েছে এটি সম্পাদিত হচ্ছে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া”। দ্বিতীয়ত, চুক্তিটি নিজে কোনো আইন নয় — এটি আইন বানানোর প্রতিশ্রুতি। খ ও গ খণ্ডের প্রায় প্রতিটি ধারার গঠন একই রকম: “অমুক নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে।” অর্থাৎ ১৯৮৯ সালের তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইনের ধারাগুলো কীভাবে বদলাবে, তারই তালিকা।
এই গঠনটিই পরে বাস্তবায়ন-বিতর্কের কেন্দ্র। আইন সংশোধন হয়ে গেলে ধারাটি “বাস্তবায়িত” ধরা যায় কি না — নাকি আইনটি মাঠে কার্যকর হওয়া পর্যন্ত নয়?
একটি ছোট অমিল: বাংলা উইকিপিডিয়ার নিবন্ধে বলা হয়েছে সরকারের পক্ষে শেখ হাসিনা চুক্তিতে সই করেছিলেন। চুক্তির মুদ্রিত পাঠে সইয়ের ঘরে নাম আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর, জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে।
মাত্র চারটি ধারা, কিন্তু বাকি সবকিছুর ভিত এখানেই।
শেষ ধারাটি অনেকের নজর এড়িয়ে যায়। চুক্তির কোনো মেয়াদ নেই — এটি নিজেই বলছে, কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি চালু থাকবে।
সবচেয়ে বড় খণ্ড, ৩৫টি ধারা। এর প্রায় পুরোটাই ১৯৮৯ সালের আইন সংশোধনের নির্দেশনা। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি:
সার্কেল চীফদের ভূমিকা এই খণ্ডে বারবার ফিরে আসে — সনদ দেওয়া, পরিষদের সভায় উপস্থিত থাকা। প্রথাগত ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে আলাদা লেখা আছে চাকমা সার্কেল, হেডম্যান ও কার্বারি।

চুক্তির সবচেয়ে নতুন সৃষ্টি — তিন জেলা পরিষদের ওপরে একটি সমন্বয়কারী স্তর। ১৪টি ধারা।
গঠন (ধারা ৩): চেয়ারম্যানসহ ২২ জন। ভাগটি চুক্তিতে নাম ধরে লেখা:
| শ্রেণি | সংখ্যা |
|---|---|
| চেয়ারম্যান (অবশ্যই উপজাতীয়, প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) | ১ |
| উপজাতীয় সদস্য | ১২ |
| উপজাতীয় নারী সদস্য | ২ |
| অ-উপজাতীয় সদস্য | ৬ |
| অ-উপজাতীয় নারী সদস্য | ১ |
১২ জন উপজাতীয় সদস্যের ভাগটিও নির্দিষ্ট: ৫ জন চাকমা, ৩ জন মারমা, ২ জন ত্রিপুরা, ১ জন মুরুং ও তঞ্চঙ্গ্যা থেকে, এবং ১ জন লুসাই, বম, পাংখো, খুমী, চাক ও খিয়াং থেকে। ছোট জনগোষ্ঠীগুলোকে ছয় ভাগ করে একটি আসন — চুক্তির ভেতরেই এই অসাম্যটা লেখা আছে।
ক্ষমতা (ধারা ৯): তিন জেলা পরিষদের সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সমন্বয় ও তত্ত্বাবধান; সমন্বয়ের অভাব হলে আঞ্চলিক পরিষদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত; পৌরসভাসহ স্থানীয় পরিষদগুলোর তত্ত্বাবধান; সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের সমন্বয়; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও এনজিও কার্যক্রমের সমন্বয়; উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার; ভারী শিল্পের লাইসেন্স।
ধারা ১৩ সম্ভবত সবচেয়ে দূরপ্রসারী: “সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আইন প্রণয়ন করিতে গেলে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে ও ইহার পরামর্শক্রমে আইন প্রণয়ন করিবেন।”
ধারা ১১ ১৯০০ সালের শাসনবিধির সঙ্গে ১৯৮৯ সালের আইনের অসংগতি দূর করার কথা বলে — আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ ও সুপারিশক্রমে।
ধারা ১০-এ পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আঞ্চলিক পরিষদের “সাধারণ ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে” অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে বলা হয়েছে, আর বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে যোগ্য উপজাতীয় প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা।
ধারা ১২-তে একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা: নির্বাচনের ভিত্তিতে পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার অন্তর্বর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করতে পারবে। ১৯৯৯ সালে সেই অন্তর্বর্তী পরিষদ গঠিত হয় — এবং আজও সেটিই চলছে।
ধারা ১৪-তে পরিষদের তহবিলের সাতটি উৎস — জেলা পরিষদের তহবিল, পরিষদের ওপর ন্যস্ত সম্পত্তির আয়, সরকারি ঋণ ও অনুদান, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুদান, বিনিয়োগের মুনাফা ইত্যাদি। নিজস্ব কর আরোপের ক্ষমতা এখানে নেই; সেটি জেলা পরিষদের।
মঙ্গল কুমার চাকমার ২০১২ সালের লেখায় এই কাঠামোটির অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে কড়া ভাষায়: আইন অনুযায়ী সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের ওপর আঞ্চলিক পরিষদের তত্ত্বাবধানের বিধান কার্যকর হয়নি, কার্যবিধিমালাও বছরের পর বছর ঝুলে আছে — ফলে পরিষদটি “পরিণত হয়েছে একটি ঠুঁটো জগন্নাথের প্রতিষ্ঠানে”। এটি চুক্তির একটি পক্ষের মূল্যায়ন, তবে মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তালিকাতেও গ-খণ্ডের ২ থেকে ৬ নম্বর ধারাগুলো “আংশিক বাস্তবায়িত” ঘরে আছে।
১৯টি ধারা। ভূমি-সংক্রান্ত ধারাগুলো (২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৮) আলাদা করে আলোচনা করা হয়েছে ভূমি-বিষয়ক লেখায়। বাকিগুলোর মধ্যে:
এই শেষ ধারাটি সবচেয়ে দ্রুত কার্যকর হয়েছিল: মন্ত্রণালয়টি সৃষ্টি হয় ১৫ জুলাই ১৯৯৮-এ।
চুক্তির পরের প্রথম বছরগুলোতে যেসব কাজ সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে খুব একটা বিরোধ নেই।
অস্ত্র সমর্পণ। ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে রাঙামাটির সাংসদ ঊষাতন তালুকদারের প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “যেদিন অস্ত্র সমর্পণ হয়, সেদিন বিএনপি পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় হরতাল-অবরোধ ডেকেছিল, যাতে অস্ত্র সমর্পণ না হয়। এই ১০ ফেব্রুয়ারি কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্র জমা দেন বিদ্রোহীরা।”
শরণার্থী প্রত্যাবাসন। একই বক্তব্যে: ভারত প্রত্যাগত ১২ হাজার ২২৩টি শরণার্থী পরিবার পুনর্বাসিত হয়েছে, প্রতিটি পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা নগদ দেওয়া হয়েছে।
ক্যাম্প প্রত্যাহার। একই বক্তব্য অনুযায়ী চুক্তি স্বাক্ষরের সময় অস্থায়ী সেনাক্যাম্প ছিল ২৩২টি; ১৭ বছরে প্রত্যাহার হয়েছে ১১৯টি। রুমা গ্যারিসনের জন্য ৯৯৭ একর ভূমি অধিগ্রহণ তখনো প্রক্রিয়াধীন ছিল।
এখানে একটি সংখ্যাগত অমিল রেখে যাওয়া দরকার। জুমজার্নালের আর্কাইভে জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমার ২০১২ সালের একটি লেখায় বলা হয়েছে অস্থায়ী ক্যাম্পের সংখ্যা ছিল “পাঁচ শতাধিক”, এবং প্রত্যাহৃত ক্যাম্পের সংখ্যা নিয়ে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মতভেদ আছে। শুরুর সংখ্যাটাই যেখানে ২৩২ বনাম ৫০০+, সেখানে শতাংশের হিসাব দুই দিকে দুই রকম দাঁড়াবেই।
তবে দুই পক্ষই একমত যে সময়সীমাটি কখনো নির্ধারিত হয়নি। চুক্তির ভাষা ছিল “এই লক্ষ্যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হইবে”; আটাশ বছরে তা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তালিকাতেও ঘ-১৭(ক) ধারাটির অবস্থা লেখা আছে — “বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে”।
এখানেই আসল বিতর্ক। এবং কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো, সরকারের নিজেরই দুটি আলাদা সংখ্যা প্রচলিত।
হিসাব ১ — মন্ত্রণালয়ের ধারাভিত্তিক তালিকা (৪৮ / ১৫ / ৯)। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে রাখা “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি” নথিতে ধারা-নম্বর ধরে ধরে লেখা আছে: ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত, ১৫টি আংশিক, ৯টি বাস্তবায়নাধীন। ২০১৬ সালের সংসদে প্রধানমন্ত্রীও ঠিক এই ভাঙচুরটাই দিয়েছিলেন।
নথিটির দামটা হলো, এতে কোন ধারাগুলো বাকি তা নাম ধরে বলা আছে:
| অবস্থা | ধারা |
|---|---|
| বাস্তবায়নাধীন (৯) | খ-২৬ (জমি বন্দোবস্তে পরিষদের অনুমোদন), খ-২৯, খ-৩৫; গ-১১ (১৯০০ শাসনবিধির অসংগতি), গ-১৩ (আইন প্রণয়নে পরামর্শ); ঘ-২ (ভূমি জরিপ), ঘ-৩ (ভূমিহীন পরিবারকে দুই একর), ঘ-৭, ঘ-৯ |
| আংশিক (১৫) | খ-৪(ঘ), খ-৯ (ভোটার তালিকা), খ-১৯, খ-২৪ (স্থানীয় পুলিশ), খ-২৭, খ-৩৪ (৩৩টি বিষয়); গ-২, ৩, ৪, ৫, ৬ (আঞ্চলিক পরিষদের গঠন ও নির্বাচন); ঘ-৪ (ভূমি কমিশন), ঘ-৬, ঘ-১৭ (ক্যাম্প প্রত্যাহার), ঘ-১৮ (নিয়োগে অগ্রাধিকার) |
তালিকাটি পড়লে একটি ধরন চোখে পড়ে: “সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত” ধারাগুলো প্রায় সবই আইন প্রণয়ন, প্রতিষ্ঠান গঠন ও এককালীন কাজ — মন্ত্রণালয় বানানো, আইন জারি করা, ক্ষমা ঘোষণা, ঋণ মওকুফ। আর বাকি ও আংশিক ধারাগুলো প্রায় সবই ক্ষমতা হস্তান্তর ও নির্বাচন — ভূমি, পুলিশ, ভোটার তালিকা, পরিষদের নির্বাচন, ক্যাম্প প্রত্যাহার।
হিসাব ২ — বার্ষিক বিবৃতি (৬৫ / ৭২)। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি বছর চুক্তিবার্ষিকীতে সরকার একটি সংখ্যা দেয়; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেটি দাঁড়িয়েছে “৭২টির মধ্যে ৬৫টি বাস্তবায়িত” — অর্থাৎ ৯০ শতাংশের বেশি, বাকি ১০ শতাংশ প্রক্রিয়াধীন।
হিসাব ৩ — জনসংহতি সমিতির বিবৃতি (দুই-তৃতীয়াংশ অবাস্তবায়িত)। ২০২৫ সালের বিবৃতিতে পিসিজেএসএস বলেছে, ২৮ বছর পরও দুই-তৃতীয়াংশ ধারা অবাস্তবায়িত — অর্থাৎ প্রায় ৩৩ শতাংশ বাস্তবায়ন।
একই ৭২টি ধারা নিয়ে ৯০, ৬৭ ও ৩৩ শতাংশ — পার্থক্যটা মূলত সংজ্ঞার। আইন সংশোধিত হলে ধারাটি বাস্তবায়িত ধরা হবে, নাকি আইনটি মাঠে কার্যকর হলে? মন্ত্রণালয়ের নথিতেই এর ইঙ্গিত আছে: বহু ধারার পাশে মন্তব্য “১৯৯৮ সালে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধন করা হয়েছে — বাস্তবায়িত”।
চুক্তি বাস্তবায়নের সবচেয়ে ধরা-ছোঁয়া যায় এমন মাপকাঠি হলো: কতগুলো সরকারি বিভাগ আসলে জেলা পরিষদের হাতে গেছে? প্রথম আলোর বান্দরবান প্রতিনিধি বুদ্ধজ্যোতি চাকমার ৪ ডিসেম্বর ২০২৫-এর একটি লেখায় হিসাবটি ধরে ধরে দেওয়া আছে — এবং ফলটি অপ্রত্যাশিত।
| কে, কখন | কতটি বিভাগ |
|---|---|
| জাতীয় পার্টি (চুক্তির আগে) | ৫ |
| বিএনপি, ১৯৯৩ (চুক্তির আগে) | ১০ |
| বিএনপি, ২০০৬ | ৪ |
| আওয়ামী লীগ, ২০০৯–১২ | ০ |
মোট ২৯টি বিভাগ, দপ্তর ও দপ্তরবিহীন বিষয় হস্তান্তরিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি — ১৩টি — হস্তান্তর করেছে বিএনপি সরকার, যে দল ১৯৯৭ সালে চুক্তির বিরুদ্ধে লংমার্চ করেছিল। আর চুক্তির স্বাক্ষরকারী আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফিরে ২০১২ সালের আগে একটি বিভাগও হস্তান্তর করেনি।
ওই লেখা অনুযায়ী জেলা পরিষদের কর্মকর্তাদের অভিযোগ আরও নির্দিষ্ট: আওয়ামী লীগ আমলে যা হস্তান্তর দেখানো হয়েছে তার কিছু আসলে আগেই হস্তান্তরিত বিভাগেরই অধীন দপ্তর (যেমন বিএডিসি, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, সরকারি শিশু পরিবার)। আর ২০১৩ ও ২০২৪ সালে হস্তান্তর হয়েছে দপ্তরবিহীন কিছু বিষয় — জুম চাষ, মহাজনি কারবার, জন্ম-মৃত্যুর পরিসংখ্যান, স্থানীয় শিল্প-বাণিজ্যের লাইসেন্স। পর্যটন করপোরেশন ও মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের হস্তান্তর চুক্তি সই হয়েছে, কিন্তু কার্যকর হয়নি — নির্বাহী আদেশ জারি হয়নি বলে।
যেগুলো আজও যায়নি: আইন-শৃঙ্খলা, স্থানীয় পুলিশ, ভূমি প্রশাসন, বন ও পরিবেশ। অর্থাৎ চুক্তির ৩৪ নম্বর ধারায় তালিকার একেবারে গোড়ার বিষয়গুলো।
চুক্তির কাঠামোটি নির্বাচনের ওপর দাঁড়িয়ে। জেলা পরিষদের ভোটার হবেন জেলার স্থায়ী বাসিন্দারা; সেই নির্বাচিত সদস্যরা পরোক্ষভাবে বেছে নেবেন আঞ্চলিক পরিষদের সদস্যদের। ভিত্তিটা না থাকলে ওপরের কিছুই দাঁড়ায় না।
১৯৮৯ সালের পর তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে আর কোনো নির্বাচন হয়নি। মঙ্গল কুমার চাকমার ২০১২ সালের লেখায় অবস্থাটি এভাবে বর্ণিত: “যে দল ক্ষমতায় আসে সেই দল স্ব স্ব দলীয় নেতা-কর্মীদের পরিষদের চেয়ারম্যান/সদস্য পদে মনোনয়ন দিয়ে ৫-সদস্যক অন্তর্বর্তী পরিষদের মাধ্যমে জেলা পরিষদগুলো অগণতান্ত্রিকভাবে বছরের পর বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে।”
আটকে থাকার কারণ হিসেবে যেটি বারবার আসে তা হলো ভোটার তালিকা বিধিমালা — “স্থায়ী বাসিন্দা” কারা, সেই সংজ্ঞা ধরে আলাদা ভোটার তালিকা তৈরির নিয়ম। মন্ত্রণালয়ের তালিকাতেও খ-৯ ধারাটি (ভোটার-যোগ্যতা) আছে “আংশিক বাস্তবায়িত” ঘরে।
ফল দাঁড়িয়েছে অদ্ভুত: চুক্তির মাধ্যমে তৈরি প্রতিষ্ঠানগুলোই চুক্তির নিয়মে গঠিত হয়নি। আঞ্চলিক পরিষদ ১৯৯৯ সাল থেকে “অন্তর্বর্তীকালীন”, জেলা পরিষদগুলো মনোনীত।
২০২৪ সালের আগস্টে সরকার বদলের পর চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি নতুন করে ওঠে। ২৪ আগস্ট সংবাদ সম্মেলন করে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন’ পাঁচ দফা দাবি জানায়, যার একটি ছিল পরিবীক্ষণ কমিটি পুনর্গঠন; নভেম্বরের শেষে একই দাবিতে প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দেওয়া হয়।
যা ঘটেছে:
অন্তর্বর্তী সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা জেলা পরিষদ গঠনে গতানুগতিক পদ্ধতি অনুসরণ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম তো বাংলাদেশের বাইরে নয়। দেশের অন্যত্র যা হচ্ছে, এখানে তার ব্যতিক্রম কীভাবে হবে।” কর্মপরিকল্পনা না থাকার কথা তিনি অস্বীকার করে বলেন, “এসব বিষয় চিন্তা হিসেবে আছে, এক্সপ্রেস হয়নি।”
আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য গৌতম কুমার চাকমা একই প্রতিবেদনে বলেন, “চুক্তির বাস্তবায়ন বিষয়ে এখন সরকারের কাছ থেকে কিছু শুনতে পাইনি। তারা বাস্তবায়ন করবে কি করবে না, কিছুই বলছে না।”
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে কে কে সই করেছিলেন?
চুক্তির মুদ্রিত পাঠ অনুযায়ী সরকারের পক্ষে সই করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, আর পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। তারিখ ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭, ঢাকা।
চুক্তিতে কি স্বায়ত্তশাসনের কথা আছে?
“স্বায়ত্তশাসন” শব্দটি চুক্তির ভাষা নয়। চুক্তির প্রস্তাবনায় স্পষ্ট বলা আছে এটি সম্পাদিত হচ্ছে বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য রেখে। যা আছে তা হলো একটি বিশেষ স্থানীয় শাসনকাঠামো — তিন জেলা পরিষদ ও তাদের ওপরে একটি আঞ্চলিক পরিষদ, নির্দিষ্ট কিছু বিষয় হস্তান্তরসহ।
চুক্তির মেয়াদ কি শেষ হয়ে গেছে?
না। ক-খণ্ডের ৪ নম্বর ধারা বলছে, সইয়ের তারিখ থেকে চুক্তি বলবৎ হবে এবং “উভয়পক্ষ হইতে সম্পাদনীয় সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত” বলবৎ থাকবে। কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ চুক্তিতে নেই।
এখন কোন ধারাগুলো বাকি আছে?
মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তালিকা অনুযায়ী বাস্তবায়নাধীন ৯টি ধারার মধ্যে আছে জমি বন্দোবস্তে পরিষদের অনুমোদন (খ-২৬), ১৯০০ সালের শাসনবিধির সঙ্গে অসংগতি দূর করা (গ-১১), পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আইন প্রণয়নের আগে আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ নেওয়া (গ-১৩), ভূমি জরিপ (ঘ-২) এবং ভূমিহীন পরিবারকে দুই একর জমি (ঘ-৩)। আংশিক বাস্তবায়িত ১৫টির মধ্যে আছে ভোটার তালিকা, স্থানীয় পুলিশ, ৩৩টি বিষয়ের হস্তান্তর, ভূমি কমিশন ও ক্যাম্প প্রত্যাহার।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ আগস্ট ২০২৬
প্রসঙ্গ:আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, পার্বত্য চুক্তি, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন, পার্বত্য জেলা পরিষদ
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।