Jumjournal Logo

ভূমি কমিশন সংশোধন আইন ২০১৬: ২০০১ সালের আইনের কোন ধারা কীভাবে বদলেছিল

Last updated Oct 19th, 2026

1

ধূসর আকাশের নিচে ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের দিক, ত্রিভুজ ও বৃত্তাকার খোলা অংশসহ কংক্রিটের দেয়াল, সামনে লাল ফুলের কেয়ারি ও সবুজ মাঠ

ভূমি কমিশন সংশোধন আইন ২০১৬ (2016 সনের 45 নং আইন) ২০০১ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের নয়টি ধারায় মোট 14টি পরিবর্তন এনেছিল। সবচেয়ে বড় তিনটি: সর্বসম্মতি না হলে আর চেয়ারম্যান একা সিদ্ধান্ত দেন না, চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠের মত চলে; কোরামে চেয়ারম্যানের সঙ্গে দুজনের বদলে তিনজন সদস্য লাগে; আর কমিশনের এখতিয়ার কেবল পুনর্বাসিত শরণার্থীদের বিরোধ থেকে বেড়ে অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া জমি পর্যন্ত পৌঁছায়।

বিলটি জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয় 6 অক্টোবর 2016। তার আগে আগস্টে একই বিষয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল, আর তারও আগে, 2013 সালে, প্রায় একই রকম একটি বিল সংসদীয় কমিটিতে আটকে থেকে নবম সংসদের মেয়াদের সঙ্গে হারিয়ে যায়। এই লেখা প্রতিটি পরিবর্তন সরকারি পাঠ ধরে পাশাপাশি রাখে, ২০১৩ সালের বিলের সঙ্গে মেলায়, আর কে কী বলেছিলেন তা নাম ও তারিখসহ জানায়।

কমিশন কীভাবে গঠিত হলো আর কেন এখনো একটিও বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি, সে ইতিহাস আছে আমাদের আগের লেখা পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি: ১৯০০ সালের রেগুলেশন থেকে ভূমি কমিশন-এ। কমিশনে আবেদন করার ধাপগুলো ধারা ধরে আছে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে আবেদন করবেন কীভাবে-এ। এখানে কেবল একটি প্রশ্ন: ২০১৬ সালে আইনের ভাষা ঠিক কোথায়, কোন শব্দে বদলেছিল।

এই লেখায়

  1. এক নজরে: ভূমি কমিশন সংশোধন আইন ২০১৬ কী কী বদলেছে
  2. ২০০১ থেকে ২০১৬: সংশোধনী কোন পথে এল
  3. ২০১৩ সালের বিলে কী ছিল, কী বাদ পড়েছিল
  4. প্রস্তাবনা: চুক্তির দুই পক্ষের নাম কেন শুধরাতে হলো
  5. ধারা 3(2)(ঘ): সার্কেল চীফ এখন প্রতিনিধি পাঠাতে পারেন
  6. ধারা 4(2): শাখা কার্যালয় পার্বত্য জেলার বাইরেও
  7. ধারা 6(1)(ক): শরণার্থীর বাইরে অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল
  8. ধারা 6(1)(খ): ‘পদ্ধতি’ শব্দটি নিয়ে এত টানাটানি কেন
  9. ধারা 6(1)(গ): বাতিলের ক্ষমতা, আর শর্তাংশের পাঁচ ব্যতিক্রম থেকে দুই
  10. ধারা 7: কোরাম, নোটিশ আর সিদ্ধান্তের নিয়ম
  11. ধারা 9 ও 13: আবেদন সংশোধন আর স্থানীয় নিয়োগ
  12. ধারা 18: বিধিমালার ‘ছয় মাস’ কেন ‘যথাশীঘ্র’ হলো
  13. যা বদলায়নি
  14. সংসদে কী বলা হয়েছিল
  15. কে কী বলেছিলেন: প্রতিক্রিয়া, নাম ধরে
  16. সংবাদে যে ভুলগুলো ছাপা হয়েছিল
  17. সংশোধনের পর কমিশন কতদূর এগোল
  18. প্রশ্নোত্তর
  19. যা এখনো জানা যায়নি
  20. তথ্যসূত্র

এক নজরে: ভূমি কমিশন সংশোধন আইন ২০১৬ কী কী বদলেছে

সংশোধনী আইনের 2 থেকে 9 ধারা মূল আইনের প্রস্তাবনা এবং 3, 4, 6, 7, 9, 13 ও 18 ধারায় হাত দিয়েছে। bdlaws-এ প্রকাশিত মূল আইনের পাঠে 14টি পাদটীকা আছে, প্রতিটি একটি করে পরিবর্তন চিহ্নিত করে। নিচের ছকে বাঁয়ে ২০০১ সালের শব্দ, ডানে ২০১৬ সালের শব্দ।

উৎস দুটি। ২০১৬-পরবর্তী পাঠ ও পুরোনো শব্দ নেওয়া হয়েছে আইন ও বিচার বিভাগের bdlaws ওয়েবসাইটের পাদটীকা থেকে; একই পাঠ আমাদের আর্কাইভেও আছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের পূর্ণ পাঠ শিরোনামে। যেখানে পুরো দফা প্রতিস্থাপিত হয়েছে (6(1)(ক) ও (গ)), সেখানে পাদটীকায় পুরোনো পাঠ নেই; সেগুলোর ২০০১ সালের রূপ নেওয়া হয়েছে FAOLEX-এ রাখা গেজেটের ইংরেজি সরল অনুবাদ থেকে, তাই সেখানে ইংরেজিই রাখা হলো।

# মূল আইনের ধারা ২০০১ সালে যা ছিল ২০১৬ সালে যা হলো সংশোধনী আইনের ধারা
1প্রস্তাবনা“পার্বত্য জেলা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য জনসংহতি সমিতি”“পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি”2
23(2)(ঘ)“সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ, পদাধিকারবলে”“সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ বা তৎকর্তৃক মনোনীত একজন প্রতিনিধি”3
34(2)শাখা কার্যালয় “যে কোন পার্বত্য জেলায়”“যে কোন পার্বত্য জেলাসহ অন্য কোন স্থানে”4
46(1)(ক)কেবল পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি-বিরোধ, “existing laws and customs” অনুযায়ীশরণার্থীদের বিরোধ “এবং অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ”, “প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি” অনুযায়ী5(ক)
56(1)(খ)“আইন ও রীতি”“আইন, রীতি ও পদ্ধতি”5(খ)
66(1)(গ)আইন-বহির্ভূত বন্দোবস্ত বাতিল; শর্তাংশে পাঁচ ধরনের জমি বাদজলেভাসা ভূমিসহ বন্দোবস্ত “বা বেদখল” বাতিল; শর্তাংশে কেবল কাপ্তাই ও বেতবুনিয়া এলাকা, তার ভেতরেও কিছু জমি ব্যতিক্রম5(গ)
77(3)কোরাম: চেয়ারম্যান ও “অপর দুইজন সদস্যের” উপস্থিতি“অপর তিনজন সদস্যের” উপস্থিতি6(ক)
87(4)মুলতবি বিষয় পরের বৈঠকে নিষ্পত্তি, কোনো শর্ত নেইশর্তাংশ যোগ: সব সদস্যকে বৈঠকের আগে নোটিশ দিতে হবে6(খ)
97(5)সর্বসম্মতি না হলে “চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত”“চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গৃহীত সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত”6(গ)
109-এর শিরোনাম“কমিশনের আবেদন দাখিল”“কমিশনের নিকট আবেদন দাখিল”7(ক)
119একটিমাত্র অনুচ্ছেদবিদ্যমান বিধান উপ-ধারা (1) হিসেবে পুনঃসংখ্যায়িত7(খ)
129(2)ছিল নাআবেদনকারী কমিশনের অনুমতি নিয়ে আবেদন “একবার” সংশোধন করতে পারবেন7(খ)
1313(3)ছিল নাসচিব ও কর্মচারী পদে “উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার প্রদানক্রমে স্থায়ী অধিবাসীদেরকে” নিয়োগ8
1418বিধি “এই আইন বলবৎ হইবার ছয় মাসের মধ্যে,”বিধি “যথাশীঘ্র”9

ছকের বাইরে আইনটির আরেকটি কাজ ছিল: আগস্টে জারি হওয়া অধ্যাদেশটি রহিত করা। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রতিবেদন, যা সিএইচটি টাইমস ছেপেছিল, বলছে “বিলে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০১৬ রহিত করা হয়েছে।” রহিতকরণের ধারাটির নম্বর বা ভাষা bdlaws-এর পাদটীকায় আসে না, কারণ ওই পাদটীকাগুলো কেবল মূল আইনে কী বদলাল তা দেখায়।

২০০১ থেকে ২০১৬: সংশোধনী কোন পথে এল

সংশোধনের দাবি আইন পাসের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ওঠে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ 7 মে 2009-এ সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠায়, 20 জুন 2011-এ মন্ত্রণালয় 13 দফা চূড়ান্ত করে, 2013 সালে বিল সংসদে ওঠে কিন্তু পাস হয় না, আর 2016 সালের আগস্টে অধ্যাদেশ ও অক্টোবরে আইন হয়। প্রায় পনেরো বছরের পথ, তারিখ ধরে:

তারিখ ঘটনা উৎস
12 জুলাই 2001তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগের দিন সংসদে আইন পাস; আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগমঙ্গল কুমার চাকমা, ডেইলি স্টার, 25 জুন 2013
17 জুলাই 2001রাষ্ট্রপতির সম্মতি ও গেজেটে প্রকাশ, 2001 সনের 53 নং আইনFAOLEX-এ রাখা গেজেটের অনুবাদ
7 মে 2009আঞ্চলিক পরিষদ নতুন করে সংশোধনী সুপারিশ পাঠায়জনসংহতি সমিতি, UNPO-তে প্রকাশিত; আমাদের আর্কাইভে মঙ্গল কুমার চাকমার লেখা
27 জানুয়ারি 2010-এর খবরখাগড়াছড়িতে কমিশনের বৈঠক শেষে সন্তু লারমা আইনের কয়েকটি ধারাকে “discriminatory and controversial” বলে পর্যালোচনা চানডেইলি স্টার
22 সেপ্টেম্বর 2010পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সভা: সার্কেল চীফের প্রতিনিধি, 6(1)(ক)-তে সব বিরোধ, শর্তাংশ বাদ, কোরাম তিনজন — এসব সিদ্ধান্তজনসংহতি সমিতি, UNPO-তে প্রকাশিত
10 অক্টোবর 2010রাঙ্গামাটিতে ভূমিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আন্তমন্ত্রণালয় সভা; বিরোধ নিষ্পত্তি শুরুর আগে আইন সংশোধনে মতৈক্যআমাদের আর্কাইভে মঙ্গল কুমার চাকমা (প্রথম আলো, 22 অক্টোবর 2010-এর বরাতে)
20 জুন 2011মন্ত্রণালয় আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করে 13 দফা চূড়ান্ত করে ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠায়ডেইলি স্টার 2013; FAOLEX নথির পাদটীকা
22 জানুয়ারি ও 28 মে 2012চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির চতুর্থ ও পঞ্চম সভায় 13 দফা অনুমোদনএকই
29 জুলাই 2012 (খবর 30 জুলাই)আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদের সভাপতিত্বে আন্তমন্ত্রণালয় সভা; সংশোধনী পরের অধিবেশনে তোলার ঘোষণাডেইলি স্টার, 30 জুলাই 2012
9 এপ্রিল 2013আইন মন্ত্রণালয়ে আরেকটি সভা; জনসংহতি সমিতির অভিযোগ, ভূমি সচিবের মত অনুযায়ী কার্যবিবরণী করা হয়জনসংহতি সমিতির স্মারকলিপি, 29 এপ্রিল 2013
মে–জুন 2013মন্ত্রিসভায় খসড়া অনুমোদন; সংসদে বিল উত্থাপন; স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণতারিখ নিয়ে উৎসভেদ নিচে
3 অক্টোবর 2013ভূমি মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির শেষ সভা; আলোচনা ছাড়াই বিষয়টি পাশে রাখা হয় বলে জনসংহতি সমিতির অভিযোগজনসংহতি সমিতি, UNPO-তে প্রকাশিত
1 আগস্ট 2016মন্ত্রিসভায় সংশোধনী খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন; অধ্যাদেশ আকারে কার্যকর করার সিদ্ধান্তডেইলি স্টার, 10 আগস্ট 2016; বাংলা ট্রিবিউন
8 আগস্ট 2016গেজেটে প্রকাশঢাকা ট্রিবিউন, 4 সেপ্টেম্বর 2016
3 অক্টোবর 2016মন্ত্রিপরিষদ আইন আকারে পাসের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়; মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ভাষায় অধ্যাদেশের পাঠে “কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি”বাংলা ট্রিবিউন, 3 অক্টোবর 2016
4–5 অক্টোবর 2016বিল উত্থাপন; সেই রাতেই স্থায়ী কমিটির বৈঠক, পরদিন কমিটির প্রতিবেদনবাংলাদেশ প্রতিদিন, 6 অক্টোবর 2016
6 অক্টোবর 2016দ্বাদশ অধিবেশনের সমাপনী দিনে কণ্ঠভোটে পাসএকই

কয়েকটি তারিখে উৎসগুলো মেলে না। ২০১৩ সালের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের তারিখ ডেইলি স্টারের 2 জুন ও 30 জুন 2013-এর প্রতিবেদন এবং ঢাকা ট্রিবিউনের যে প্রতিবেদন UNPO পুনর্মুদ্রণ করেছে, তাতে 27 মে; মঙ্গল কুমার চাকমার নিবন্ধ ও জনসংহতি সমিতির বিবৃতি বলছে খসড়া 27 মে মন্ত্রিসভায় তোলা হয়, অনুমোদন 3 জুন। বিল উত্থাপনের তারিখ মঙ্গল কুমার চাকমা ও ঢাকা ট্রিবিউন বলছে 16 জুন, ডেইলি স্টারের 30 জুন 2013-এর প্রতিবেদন বলছে 17 জুন।

আঞ্চলিক পরিষদের প্রথম সুপারিশ কয় দফার ছিল, সে প্রশ্নেও তিনটি সংখ্যা আছে। জনসংহতি সমিতির 29 এপ্রিল 2013-এর স্মারকলিপির বিবরণ বলছে 2009 সালে “19 point recommendations” পাঠানো হয়েছিল; আমাদের আর্কাইভে থাকা মঙ্গল কুমার চাকমার লেখা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বলছে 10 অক্টোবর 2010-এর সভায় “২৩টি বিরোধাত্মক ধারা” সংশোধনে মতৈক্য হয়েছিল; আর 2013 সালের সংবাদ সম্মেলনে ঐক্য ন্যাপের পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, জনসংহতি সমিতি আগে 23 দফা দাবি করেছিল।

২০১৩ সালের বিলে কী ছিল, কী বাদ পড়েছিল

২০১৩ সালের বিলে 13 দফার 10টি ঢুকেছিল, তার দুটি অসম্পূর্ণভাবে; তিনটি একেবারে বাদ ছিল: কোরাম তিনজন করা, 6(1)(খ)-তে “পদ্ধতি” যোগ, আর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কমিশনকে নিতে নতুন ধারা 21। ২০১৬ সালের আইন প্রথম দুটি যোগ করেছে, তৃতীয়টি করেনি।

এই হিসাব আছে FAOLEX-এ রাখা একটি নথিতে, যার শিরোনাম “Proposal of the CHT Regional Council for amendment of Chittagong Hill Tracts Land Dispute Settlement Commission Act, 2001”। তাতে তিনটি কলামে পাশাপাশি আছে মূল আইনের ধারা, 13 দফা প্রস্তাব, আর 16 জুন 2013 সংসদে উত্থাপিত বিলের ভাষা। ওই ছক এবং ২০১৬ সালের পাঠ মিলিয়ে নিচের তুলনা:

13 দফার প্রস্তাব ২০১৩ সালের বিল ২০১৬ সালের আইন
1. প্রস্তাবনায় চুক্তির দুই পক্ষের সঠিক নামছিলআছে
2. সার্কেল চীফ বা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধিছিলআছে
3. 6(1)(ক): শরণার্থীর পাশাপাশি অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল, “laws, customs and practices” অনুযায়ীছিল, কিন্তু “practices” ছাড়াআছে, “রীতি ও পদ্ধতি” সহ
4. 6(1)(খ)-তে “practices”ছিল নাআছে
5. 6(1)(গ): জলেভাসা জমিসহ বন্দোবস্ত “or occupied” বাতিল, “practices” যোগ, শর্তাংশ বাদজলেভাসা জমি ছিল; “occupied” ও “practices” ছিল না; শর্তাংশ অক্ষত“বেদখল” ও “পদ্ধতি” আছে; শর্তাংশ ছোট হয়েছে, পুরো বাদ যায়নি
6. 7(3): কোরাম চেয়ারম্যান + তিনজনছিল নাআছে
7. 7(4): সব সদস্যকে নোটিশছিলআছে
8. 7(5): চেয়ারম্যানসহ সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তছিলআছে
9. ধারা 9-এর শিরোনাম শুদ্ধ করাছিলআছে
10. আবেদন সংশোধনের সুযোগ (প্রস্তাবে নতুন 10(4))9(2) হিসেবে ছিল9(2) হিসেবে আছে, “একবার” শর্তসহ
11. 13(3): কর্মচারী নিয়োগে পাহাড়ি অগ্রাধিকারছিলআছে, “স্থায়ী অধিবাসী” কাঠামোয়
12. 18: “ছয় মাসের মধ্যে” বাদছিলআছে
13. নতুন ধারা 21: কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনেছিল নানেই; আইনে এখনো 20টি ধারা

ছক মিলিয়ে দেখলে 13 দফার 11টি ২০১৬ সালের আইনে পুরোপুরি এসেছে, একটি (শর্তাংশ বাদ দেওয়া) আংশিক, একটি (ধারা 21) আসেনি। আবার উল্টো দিকে, ধারা 4(2)-এর শাখা কার্যালয় সংক্রান্ত পরিবর্তনটি 13 দফার ছকে নেই; সেটি কোন পর্যায়ে কার প্রস্তাবে যুক্ত হলো, তা কোনো প্রকাশিত নথিতে পাওয়া যায়নি।

২০১৩ সালের বিলটি পাস হয়নি। জনসংহতি সমিতির বিবৃতি অনুযায়ী স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় সভায় পার্বত্য যুব ফ্রন্ট, পার্বত্য নাগরিক পরিষদ ও বাঙালি ছাত্র পরিষদকেও ডাকা হয়, আর 3 অক্টোবর 2013-এর শেষ সভায় বিলটি আলোচনায় ওঠেনি। নবম সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ায় বিলটির পথ সেখানেই থামে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত 4 নভেম্বর 2013-এ ডেইলি স্টারে লিখেছিলেন, 7 নভেম্বর শেষ হতে যাওয়া অধিবেশনেই বিলটি পাস হোক; সেটি হয়নি।

প্রস্তাবনা: চুক্তির দুই পক্ষের নাম কেন শুধরাতে হলো

২০০১ সালের আইনের প্রস্তাবনায় ১৯৯৭ সালের চুক্তির দুই পক্ষকে লেখা হয়েছিল “পার্বত্য জেলা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য জনসংহতি সমিতি”। ২০১৬ সালে তা হয় “পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি”। সংশোধনী আইনের 2 ধারা এই কাজটি করেছে।

পরিবর্তনটি শব্দের, কিন্তু অর্থহীন নয়। যে আইন একটি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য লেখা, তার প্রস্তাবনায় চুক্তির পক্ষের নামই ভুল থাকলে আইনটির উৎস নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। FAOLEX নথির ইংরেজি অনুবাদে অবশ্য ২০০১ সালের প্রস্তাবনা অনুবাদ করা হয়েছে “National Committee on Chittagong Hill Tracts and Chittagong Hill Tracts Jana Sanghati Samity” হিসেবে, যা বাংলা মূল পাঠের ভুলটি ধরে না; একই নথির 13 দফার ছকে মূল পাঠটি লেখা আছে “Hill District Committee and Parbatya Jana Samhati Samiti”। চুক্তির পূর্ণ বিবরণ আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭: ধারা ধরে ধরে লেখায়।

ধারা 3(2)(ঘ): সার্কেল চীফ এখন প্রতিনিধি পাঠাতে পারেন

২০০১ সালে কমিশনের পাঁচ সদস্যের একজন ছিলেন “সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ, পদাধিকারবলে” — অর্থাৎ নিজে না এলে তাঁর আসন শূন্য থাকত। ২০১৬ সালে হয় “সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ বা তৎকর্তৃক মনোনীত একজন প্রতিনিধি”। চাকমা, বোমাং ও মং — তিন চীফের যে কেউ এখন প্রতিনিধি পাঠাতে পারেন।

অন্য তিন সদস্যের ক্ষেত্রে এই সুযোগ ২০০১ সালেই ছিল: আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পরিষদের একজন সদস্যকে, বিভাগীয় কমিশনার একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে পাঠাতে পারতেন। কেবল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আর সার্কেল চীফ ছিলেন “পদাধিকারবলে”। ২০১৬ সালের পরেও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি পাঠানোর বিধান যোগ হয়নি।

প্রস্তাবটি পুরোনো। জনসংহতি সমিতির বিবরণ অনুযায়ী 22 সেপ্টেম্বর 2010-এর মন্ত্রণালয় সভায় আঞ্চলিক পরিষদের এই সুপারিশ গৃহীত হয়েছিল। সেই সভায় পরিষদের পক্ষে ছিলেন গৌতম কুমার চাকমা ও স্নেহ কুমার চাকমা, আর তিন সার্কেলের পক্ষে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়, বোমাং চীফের প্রতিনিধি ও মং চীফ সাচিং প্রু চৌধুরী। পরের অংশে দেখা যাবে, কোরামের হিসাব বদলানোর সঙ্গে এই পরিবর্তনটি সরাসরি জড়িত। সার্কেল প্রশাসনের কাঠামো নিয়ে আছে চাকমা সার্কেল, হেডম্যান ও কার্বারি।

ধারা 4(2): শাখা কার্যালয় পার্বত্য জেলার বাইরেও

কমিশনের প্রধান কার্যালয় খাগড়াছড়ি জেলা সদরে, সেটি বদলায়নি। বদলেছে শাখা কার্যালয়ের জায়গা: ২০০১ সালে সরকার শাখা খুলতে পারত “যে কোন পার্বত্য জেলায়”, ২০১৬ সালের পর “যে কোন পার্বত্য জেলাসহ অন্য কোন স্থানে”। অর্থাৎ তিন জেলার বাইরেও শাখা হতে পারে।

কমিশনের কার্যাবলী অবশ্য 6(2) ধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সীমিত, সেটি অপরিবর্তিত। তাই শাখা বাইরে হলেও বিরোধের জমি তিন জেলার ভেতরের হতে হবে। প্রথম আলোর 8 সেপ্টেম্বর 2022-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী রাঙামাটিতে শাখা কার্যালয় খোলে 2019 সালের ডিসেম্বরে, বান্দরবানে 2020 সালের ফেব্রুয়ারিতে; একই প্রতিবেদন বলছে কমিশনের চেয়ারম্যান, রেজিস্ট্রার ও সচিব “ঢাকায় বসে দাপ্তরিক কাজ সারেন”। ঢাকায় কোনো আনুষ্ঠানিক শাখা এই ধারার অধীনে খোলা হয়েছে কি না, কোনো প্রকাশিত নথিতে পাওয়া যায়নি।

ধারা 6(1)(ক): শরণার্থীর বাইরে অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল

২০০১ সালের 6(1)(ক) কমিশনকে কেবল পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তির কাজ দিয়েছিল। ২০১৬ সালের প্রতিস্থাপিত দফায় যোগ হয়েছে “অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ”, আর মাপকাঠি “আইন ও রীতি” থেকে হয়েছে “প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি”। এখতিয়ারের দিক থেকে এটিই সংশোধনীর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।

FAOLEX নথির অনুবাদে ২০০১ সালের দফাটি এমন:

“To settle the land related dispute of the rehabilitated refugees in accordance with the existing laws and customs in the Chittagong Hill Tracts”
— ধারা 6(1)(ক), ২০০১ (FAOLEX-এর ইংরেজি সরল অনুবাদ)

আর ২০১৬ সালের পাঠ, bdlaws থেকে হুবহু:

“পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ এবং অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা;”
— ধারা 6(1)(ক), ২০১৬ সালের সংশোধনী আইনের 5(ক) ধারাবলে প্রতিস্থাপিত

কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার একটি হিসাব দিয়েছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, 29 জুন 2013-এর সংবাদ সম্মেলনে। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁর দাবি ছিল, “বেদখল” শব্দ বাদ থাকলে কমিশন মাত্র 35 শতাংশ বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারবে, বাকি 65 শতাংশ যেমন আছে তেমন থাকবে। মঙ্গল কুমার চাকমা একই বছর লিখেছিলেন, “or occupied” শব্দ না থাকলে প্রায় 70 শতাংশ বিরোধ কমিশনের এখতিয়ারের বাইরে থেকে যাবে। দুটি সংখ্যাই রাজনৈতিক বক্তব্যে দেওয়া হিসাব; কোন জরিপ বা তালিকা থেকে এগুলো নেওয়া, তা প্রতিবেদনে নেই।

লক্ষ করার মতো একটি বিষয় বদলায়নি: “পুনর্বাসিত শরণার্থী”-র সংজ্ঞা। ধারা 2(চ) এখনো কেবল 9 মার্চ 1997-এর আগরতলা চুক্তির তালিকাভুক্ত শরণার্থীদের ধরে। জনসংহতি সমিতির বিবরণ অনুযায়ী 2010 সালে আঞ্চলিক পরিষদ চেয়েছিল 1992–1994 সালে 16 দফা প্যাকেজ চুক্তির আওতায় ফেরা শরণার্থীদেরও এতে আনা হোক; সরকার পক্ষ রাজি হয়নি, আর পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন তাঁরা “non-refugees” হিসেবে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। ২০১৬ সালে যেহেতু অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখলের বিরোধ শরণার্থী-পরিচয় ছাড়াই আনা যায়, সেই কথাটি আইনে এখন একটি পথ পায়। শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের তালিকার প্রশ্ন আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু টাস্কফোর্স লেখায়।

“প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি” বলতে আইন ঠিক কী বোঝায় আর ধারা 6 পুরো আইনে কোন ভার বহন করে, সেই বিশ্লেষণ এই সিরিজের আলাদা লেখা ‘ভূমি কমিশনকে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি মেনে চলতে হয়: ৬ ধারার তাৎপর্য’-এর বিষয়; এখানে কেবল পরিবর্তনটুকু।

ধারা 6(1)(খ): ‘পদ্ধতি’ শব্দটি নিয়ে এত টানাটানি কেন

6(1)(খ) দফায় ২০১৬ সালে একটিমাত্র শব্দ যোগ হয়েছে: “আইন ও রীতি” হয়েছে “আইন, রীতি ও পদ্ধতি”। এই দফায় কমিশন আবেদনকারী বা প্রতিপক্ষের স্বত্ব নির্ধারণ করে এবং প্রয়োজনে দখল পুনর্বহাল করে। ২০১৩ সালের বিলে এই দফায় কোনো পরিবর্তনই ছিল না, আর 6(1)(ক) ও (গ)-তেও “পদ্ধতি” বাদ ছিল।

শব্দটি কেন কেন্দ্রে ছিল, তার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা, ডেইলি স্টারে 25 জুন 2013-এ। তাঁর ভাষায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি ব্যবস্থাপনায় “practices” সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; উদাহরণ হিসেবে তিনি দেখান, পার্বত্য জেলার যেকোনো জমি হস্তান্তর, বন্দোবস্ত বা অধিগ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যানের প্রতিবেদন বা সুপারিশ নেওয়া বাধ্যতামূলক প্রথা।

15 জুলাই 2013 সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আদিবাসী প্রতিনিধিরা একই আপত্তি তোলেন; ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন বলছে “practices” শব্দটি হেডম্যানের ভূমিকাকেই বোঝায়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং 29 জুন 2013-এর সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শব্দটি “cleverly” বাদ দেওয়া হয়েছে, যার অর্থ কার্বারি ও হেডম্যানের ঐতিহ্যগত ভূমি ব্যবস্থাপনা। 24 আগস্ট 2013-এর এক আলোচনা সভার পর তিনি ডেইলি স্টারকে (প্রকাশ 25 আগস্ট) বলেন, 13 দফার আটটি পুরোপুরি, দুটি আংশিক ঢুকেছে, তিনটি বাদ পড়েছে।

পার্বত্য চুক্তির (ঘ) খণ্ডেই “প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি” কথাটি আছে, তাই ২০১৬ সালের পরিবর্তন আইনের ভাষাকে চুক্তির ভাষার সঙ্গে মিলিয়েছে। হেডম্যান ও কার্বারির দায়িত্বের বিবরণ আছে মৌজা হেডম্যান ও কার্বারি আসলে কী কী করেন-এ।

ধারা 6(1)(গ): বাতিলের ক্ষমতা, আর শর্তাংশের পাঁচ ব্যতিক্রম থেকে দুই

6(1)(গ) পুরোটাই প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ২০০১ সালে কমিশন কেবল আইন-বহির্ভূত “বন্দোবস্ত” বাতিল করতে পারত, আর শর্তাংশে পাঁচ ধরনের জমি পুরো দফার বাইরে ছিল। ২০১৬ সালে দফায় যোগ হলো জলেভাসা ভূমি, “বেদখল”, আর “রীতি ও পদ্ধতি”; শর্তাংশে থাকল কেবল কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, তার ভেতরেও কিছু জমি বাদে।

২০০১ সালের দফা, FAOLEX-এর অনুবাদে:

“If any land settlement is made against the existing laws of Chittagong Hill Tracts it shall stand rejected and on account of this settlement if any lawful owner is evicted from land, his possession shall be restored: Provided that, this sub-section shall not be applicable in case of Reserved Forests, Kaptai Hydroelectricity Project area, Betbunia Earth Satellite Station, state-owned industries and land recorded with the Government or local authorities.”
— ধারা 6(1)(গ), ২০০১ (FAOLEX-এর ইংরেজি সরল অনুবাদ)

২০১৬ সালের দফা, bdlaws থেকে হুবহু:

“পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে জলেভাসা ভূমিসহ (Fringe Land) কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং বন্দোবস্তজনিত বা বেদখলজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:
তবে শর্ত থাকে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং বসতবাড়ীসহ জলেভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় ব্যতীত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা ও বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকার ক্ষেত্রে এই উপ-ধারা প্রযোজ্য হইবে না।”
— ধারা 6(1)(গ), ২০১৬ সালের সংশোধনী আইনের 5(গ) ধারাবলে প্রতিস্থাপিত

শর্তাংশের তালিকা পাশাপাশি রাখলে পার্থক্যটা গোনা যায়:

যে জমি কমিশনের বাতিল-ক্ষমতার বাইরে ২০০১ ২০১৬
সংরক্ষিত বন (Reserved Forests)বাইরেতালিকায় নেই
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকাবাইরেবাইরে, তবে শর্তাংশে উল্লিখিত জমি বাদে
বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকাবাইরেবাইরে, তবে শর্তাংশে উল্লিখিত জমি বাদে
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প (state-owned industries)বাইরেতালিকায় নেই
সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডভুক্ত জমিবাইরেতালিকায় নেই
কাপ্তাই হ্রদের জলের ওপারে কাপ্তাই বাঁধের সারি সারি স্লুইস গেট, পেছনে গাছে ঢাকা টিলা ও পরিষ্কার নীল আকাশ
কাপ্তাই বাঁধ, রাঙ্গামাটি। ২০১৬ সালের পরেও কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা 6(1)(গ)-এর শর্তাংশে রয়ে গেছে। ছবি: Moheen Reeyad · CC BY-SA 4.0 · Wikimedia Commons

নতুন শর্তাংশের “ব্যতীত” অংশটি কোন জমিকে কাপ্তাই ও বেতবুনিয়ার ব্যতিক্রম থেকে বের করে আনে, তার কোনো সরকারি ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়নি, আর এর ওপর কোনো আদালতের রায়ও পাওয়া যায়নি। বাক্যটির পাঠে তিনটি জিনিসের নাম আছে: প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত ভূমি; বসতবাড়ীসহ জলেভাসা ভূমি; এবং টিলা ও পাহাড়। এর বাইরে ব্যাখ্যা দেওয়া এই লেখার কাজ নয়।

শর্তাংশ পুরো বাদ দেওয়ার দাবি ছিল 13 দফার একটি। জনসংহতি সমিতির বিবরণ অনুযায়ী 22 সেপ্টেম্বর 2010-এর সভায় শর্তাংশ বাদ দেওয়ার সুপারিশের সিদ্ধান্ত হলেও, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ কয়েকজন কর্মকর্তা কমিশনের এলাকাগত এখতিয়ার নিয়ে সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিলেন। ২০১৩ সালের বিলে শর্তাংশ অক্ষত ছিল। ২০১৬ সালে তা ছোট হয়, কিন্তু কাপ্তাই ও বেতবুনিয়া থেকে যায়। পার্বত্য চুক্তির (ঘ)৪ দফায় কমিশনের ক্ষমতা বর্ণনায় এই দুই এলাকার কোনো ব্যতিক্রম নেই — চুক্তি ও আইনের এই অমিল নিয়ে বিস্তারিত আছে আবেদন পদ্ধতির লেখার “যেখানে মেলে না: কাপ্তাই ও বেতবুনিয়া” অংশে।

ধারা 7: কোরাম, নোটিশ আর সিদ্ধান্তের নিয়ম

ধারা 7-এ তিনটি উপ-ধারা বদলেছে। 7(3)-এ কোরাম চেয়ারম্যান ও দুজন থেকে চেয়ারম্যান ও তিনজন; 7(4)-এ মুলতবি বিষয় পরের বৈঠকে নিষ্পত্তির আগে সব সদস্যকে নোটিশের শর্ত; আর 7(5)-এ সর্বসম্মতি না হলে চেয়ারম্যানের একক সিদ্ধান্তের বদলে চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত।

7(3): কোরাম কেন তিনজন

পাঁচ সদস্যের কমিশনে চেয়ারম্যান ও আরও দুজন হলেই কোরাম হলে, চেয়ারম্যান, বিভাগীয় কমিশনার ও আঞ্চলিক পরিষদের প্রতিনিধি মিলেই বৈঠক বৈধ হয় — জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সার্কেল চীফ কেউ না থাকলেও। জনসংহতি সমিতির বিবরণ অনুযায়ী 2010 সালের সভায় চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় ঠিক এই যুক্তি দেন: সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দুজনই অনুপস্থিত থাকলেও কমিশন বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারে, যা যথাযথ নয়, তাই এ দুই প্রতিষ্ঠানের অন্তত একজনের উপস্থিতি নিশ্চিত করা দরকার। মঙ্গল কুমার চাকমা 2013 সালে লিখেছিলেন, এই সংশোধনী বাদ পড়ায় “decisions will be taken against the wishes of the indigenous members” এমন আশঙ্কা থাকে। ২০১৩ সালের বিলে প্রস্তাবটি ছিল না; ২০১৬ সালের আইনে আছে।

7(4): মুলতবি বিষয়ে সবাইকে নোটিশ

২০০১ সালের 7(4) বলত, কোনো বৈঠকে অনিষ্পন্ন বিষয় পরের যেকোনো বৈঠকে নিষ্পত্তি করা যাবে, আর আগের বৈঠকে উপস্থিত কোনো সদস্য অনুপস্থিত থাকলেও তাতে কার্যক্রম অবৈধ হবে না। ২০১৬ সালে দাঁড়ির জায়গায় কোলন বসিয়ে শর্তাংশ যোগ হয়েছে: “তবে শর্ত থাকে যে, উক্তরূপ বিবেচনা ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কমিশনের সকল সদস্যকে বৈঠকের পূর্বে নোটিশ প্রদান করিতে হইবে।” এই প্রস্তাব ২০১৩ সালের বিলেও ছিল।

7(5): চেয়ারম্যানের একক সিদ্ধান্ত থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা

২০০১ সালের শেষ অংশটি ছিল: সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব না হলে “চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হইবে”। ২০১৬ সালে তা হয়: “চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গৃহীত সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হইবে”। সংবাদমাধ্যম এই পরিবর্তনকেই শিরোনাম করেছিল — বাংলাদেশ প্রতিদিন ও বাংলা ট্রিবিউন দুটোই লিখেছিল চেয়ারম্যানের “ক্ষমতা কমানো হয়েছে”।

পুরোনো নিয়মের বিরুদ্ধে আপত্তির একটি নমুনা আছে আমাদের আর্কাইভের লেখা পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যার চিত্র-এ, যেখানে 7(5)-কে “অগণতান্ত্রিক” বলা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এই বিধান থাকায় তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী এককভাবে 15 অক্টোবর 2009 থেকে ভূমি জরিপ শুরুর ঘোষণা দেন। পাঁচজনের মধ্যে কার হাতে কার্যত কতটা ক্ষমতা থাকে, সেই ভোটের হিসাব আবেদন পদ্ধতির লেখার “কেন এই একটি বাক্য এত বিতর্কিত ছিল” অংশে কষা আছে; এখানে আর পুনরাবৃত্তি করা হলো না।

ধারা 9 ও 13: আবেদন সংশোধন আর স্থানীয় নিয়োগ

ধারা 9-এ শিরোনাম শুদ্ধ হয়েছে (“কমিশনের আবেদন দাখিল” থেকে “কমিশনের নিকট আবেদন দাখিল”) এবং নতুন উপ-ধারা 9(2) যোগ হয়েছে, যাতে আবেদনকারী নিষ্পত্তির আগে কমিশনের অনুমতি নিয়ে আবেদন একবার সংশোধন করতে পারেন। ধারা 13-তে নতুন উপ-ধারা 13(3) কমিশনের সচিব ও কর্মচারী নিয়োগে পাহাড়িদের অগ্রাধিকার দিয়েছে।

9(2): একবারের সুযোগ

“(২) কমিশন কর্তৃক উক্ত আবেদন নিষ্পত্তির পূর্বে যে কোন সময়ে ন্যায় বিচারের স্বার্থে, কমিশনের অনুমতি সাপেক্ষে, আবেদনকারী তাঁহার আবেদন একবার সংশোধন করিতে পারিবেন।”
— ধারা 9(2), ২০১৬ সালের সংশোধনী আইনের 7(খ) ধারাবলে সংযোজিত

13 দফার প্রস্তাবে এটি ছিল ধারা 10-এর নতুন উপ-ধারা হিসেবে, আর FAOLEX ছকে ২০১৩ সালের বিলের যে ইংরেজি ভাষা দেওয়া আছে, তাতে “at any time to amend” আছে কিন্তু “একবার”-এর সীমা নেই। ২০১৬ সালের পাঠে “একবার” শব্দটি এই সুযোগকে একটি সংশোধনে বেঁধে দিয়েছে। এই পরিবর্তনের পর্যায় বা কারণ কোনো প্রকাশিত নথিতে পাওয়া যায়নি।

পুরোনো আবেদনকারীদের জন্য ধারাটির ব্যবহারিক অর্থ আছে। প্রথম আলোর 2022 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীর সময়ে আবেদন আহ্বান করা হলে প্রায় সাড়ে চার হাজার আবেদন পড়ে, আর কমিশনের একজন কর্মী জানান শেষ আবেদন জমা পড়ে 2017 সালে। অর্থাৎ অনেক আবেদন সংশোধনী আসার আগেই, পুরোনো এখতিয়ারের ভাষা মাথায় রেখে লেখা।

13(3): “উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার প্রদানক্রমে স্থায়ী অধিবাসী”

“(৩) কমিশনের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার প্রদানক্রমে স্থায়ী অধিবাসীদেরকে নিয়োগ করা হইবে।”
— ধারা 13(3), ২০১৬ সালের সংশোধনী আইনের 8 ধারাবলে সংযোজিত

FAOLEX ছকে 13 দফার প্রস্তাব ও ২০১৩ সালের বিল দুটোতেই এর ইংরেজি ভাষা “giving priority to the tribal persons of the Hill districts”; সেখানে “স্থায়ী অধিবাসী” কথাটি নেই। ২০১৬ সালের পাঠ নিয়োগের পরিধি পার্বত্য অঞ্চলের স্থায়ী অধিবাসীদের মধ্যে রাখে এবং তাঁদের ভেতরে পাহাড়িদের অগ্রাধিকার দেয়। সচিব পদ নিয়ে 13(1) অপরিবর্তিত — সচিব সরকারের উপ-সচিব পদমর্যাদার, আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। 13(3) প্রয়োগে কতজন নিয়োগ হয়েছে, তার কোনো হিসাব প্রকাশিত হয়নি; প্রথম আলো 2022 সালে খাগড়াছড়ির কার্যালয়ে দুজন কর্মীকে কাজ করতে দেখেছিল।

ধারা 18: বিধিমালার ‘ছয় মাস’ কেন ‘যথাশীঘ্র’ হলো

২০০১ সালে সরকারকে বিধি করতে হতো “এই আইন বলবৎ হইবার ছয় মাসের মধ্যে”। সেই সময় পেরিয়ে গেছে বহু আগে, বিধি হয়নি। ২০১৬ সালে শব্দগুলো বদলে করা হয় “যথাশীঘ্র”। পরিবর্তনটি আইনের লঙ্ঘিত সময়সীমা মুছে দেয়, কিন্তু নতুন কোনো সময়সীমা বসায় না।

ফলাফল সংবাদে নথিভুক্ত। প্রথম আলোর 8 সেপ্টেম্বর 2022-এর প্রতিবেদনে কমিশনের সচিব মোহাম্মদ নেজাম উদ্দীন বলেন, “কমিশন কী প্রক্রিয়ায় কাজ করবে, তার একটি বিধিমালা দরকার। কিন্তু এখনো বিধিমালা হয়নি।” একই প্রতিবেদনে ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বলেন, “আইন সংশোধনের ছয় বছরেও বিধিমালা হয়নি।” প্রতিবেদনটি জানায়, আঞ্চলিক পরিষদ একটি খসড়া বিধিমালা সরকারকে দিয়েছে; চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় এ বিষয়ে ভূমিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রথম আলোর 2 ডিসেম্বর 2023-এর প্রতিবেদন আবারও লেখে, বিধিমালা “আজও তা চূড়ান্ত হয়নি”।

একটি অমিল আছে, যা পাঠকের নিজে মিলিয়ে দেখার মতো। FAOLEX-এর ইংরেজি সরল অনুবাদে ২০০১ সালের ধারা 18-তে বিধি প্রণয়ন “through consultation with the Council” লেখা আছে, আর 13 দফার ছকেও মূল ধারা উদ্ধৃত হয়েছে “in consultation with the Council” কথাসহ। কিন্তু bdlaws-এর বাংলা পাঠে ধারা 18-তে আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে পরামর্শের কোনো উল্লেখ নেই, আর পাদটীকাও কেবল “ছয় মাসের মধ্যে” শব্দগুলোর বদলের কথা বলে।

যা বদলায়নি: ধারা 16, শরণার্থীর সংজ্ঞা আর মন্ত্রণালয়

২০১৬ সালের সংশোধনী 20টি ধারার 13টিতে হাত দেয়নি। এর মধ্যে তিনটি বিষয় বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল বা আছে: ধারা 16-এ কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত, আপিল-রিভিশন নিষিদ্ধ; ধারা 2(চ)-এ শরণার্থীর সংজ্ঞা আগরতলা চুক্তির তালিকায় বাঁধা; আর কমিশন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থেকে গেছে।

ধারা 16। কমিশনের সিদ্ধান্ত দেওয়ানি আদালতের ডিক্রি বলে গণ্য, আর তার বিরুদ্ধে কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল বা রিভিশন চলে না, বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায় না। ২০১৩ বা ২০১৬, কোনো পর্যায়েই 13 দফায় বা বিলে এই ধারা বদলের প্রস্তাব ছিল না — FAOLEX ছকে ধারা 16-এর কোনো সারি নেই। ধারাটির তাৎপর্য এই সিরিজের আলাদা লেখা ‘ভূমি কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলও চলে না, রিভিশনও নয়’-এর বিষয়।

ধারা 10। প্রতিপক্ষ হিসেবে “জেলা প্রশাসক”-এর নাম দেওয়ার বিধান অপরিবর্তিত। 2010 সালের সভায় আঞ্চলিক পরিষদ চেয়েছিল শাসনবিধি ১৯০০-তে ব্যবহৃত “Deputy Commissioner” পরিভাষা; জনসংহতি সমিতির বিবরণ অনুযায়ী সরকার পক্ষ দেশের সাধারণ পরিভাষা “জেলা প্রশাসক” রাখতে চেয়েছিল। 13 দফায় প্রস্তাবটি আর ছিল না।

প্রস্তাবিত ধারা 21। 13 দফার শেষটি ছিল কমিশনের কার্যাবলী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা। মঙ্গল কুমার চাকমা 2013 সালে যুক্তি দিয়েছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সব বিষয় দেখার ক্ষমতা ওই মন্ত্রণালয়ের, অথচ কমিশন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ২০১৩ সালের বিলে বা ২০১৬ সালের আইনে এমন কোনো ধারা নেই। সংসদে বিল উত্থাপন ও পাসের প্রস্তাব দুটোই করেছিলেন ভূমিমন্ত্রী।

সংসদে কী বলা হয়েছিল: ভূমিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা ও নাকচ হওয়া প্রস্তাব

ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ সংসদে সংশোধনীর কারণ হিসেবে বলেন, আইন প্রণয়নের পর কমিশন নিয়মিত বৈঠক ডাকলেও উপজাতীয় সদস্যরা আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে বৈঠকে অব্যাহতভাবে অনুপস্থিত থাকেন, আর সেই অচলাবস্থা দূর করতেই সংশোধন। জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র কয়েকজন সদস্যের জনমত যাচাই, বাছাই কমিটি ও সংশোধনী প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের 6 অক্টোবর 2016-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের দ্বাদশ অধিবেশনের সমাপনী দিনে বিলটি পাস হয়। বিলটি 4 অক্টোবর উত্থাপিত হয়, সেদিন রাতেই সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটি বৈঠকে বসে, এবং 5 অক্টোবর কমিটি প্রতিবেদন দেয় — অর্থাৎ উত্থাপন থেকে পাস পর্যন্ত তিন দিন। ২০১৩ সালের বিল একই ধরনের কমিটিতে মাসের পর মাস পড়ে ছিল।

বাসসের প্রতিবেদন, যা সিএইচটি টাইমস ছেপেছিল, প্রস্তাবগুলো যাঁরা এনেছিলেন তাঁদের নাম দেয়: জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম, নুরুল ইসলাম মিলন ও বেগম মাহজাবীন মোরশেদ, এবং স্বতন্ত্র সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী ও আবদুল মতিন। তাঁদের প্রস্তাবের বিষয়বস্তু — কোন ধারায় কী সংশোধন চেয়েছিলেন — প্রতিবেদনে নেই।

মন্ত্রীর ব্যাখ্যার সঙ্গে আগের নথি মেলে। ডেইলি স্টারের 16 জুলাই 2013-এর প্রতিবেদন লিখেছিল, আইন পাস না হওয়ায় কমিশন তখন কার্যকর নয়; জনসংহতি সমিতির নেতা মঙ্গল কুমার চাকমার আর্কাইভ-লেখা জানায়, ফেব্রুয়ারি 2012-এর শুনানিতে চেয়ারম্যান ও বিভাগীয় কমিশনার ছাড়া অন্য কোনো সদস্য উপস্থিত হননি। কিন্তু অনুপস্থিতির কারণ নিয়ে দুই পক্ষের বর্ণনা আলাদা: মন্ত্রী একে অচলাবস্থা বলেছেন, আর মঙ্গল কুমার চাকমা লিখেছেন, ২৬ ডিসেম্বর ২০১০ চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির তৃতীয় সভায় আইন সংশোধনের আগে কমিশনের বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, আর চেয়ারম্যান তা উপেক্ষা করে শুনানি ডেকেছিলেন।

কে কী বলেছিলেন: প্রতিক্রিয়া, নাম ধরে

প্রতিক্রিয়া দুই দিক থেকে এসেছিল। পাহাড়ি নেতৃত্ব ও আদিবাসী অধিকারকর্মীরা ২০১৩ সালের বিলকে অসম্পূর্ণ বলেছিলেন এবং ২০১৬ সালে কমিশনের প্রথম বৈঠকে যোগ দেন। পাঁচটি বাঙালি সংগঠন ২০১৩ ও ২০১৬ দুবারই হরতাল ডেকে সংশোধনী বাতিল চায়। সরকারের পক্ষে উপদেষ্টা গওহর রিজভী বলেন, বৈধ দাবিদার কোনো বাঙালি বঞ্চিত হবেন না।

২০১৩: বিল নিয়ে আপত্তি

কে কবে, কোথায় কী বলেছিলেন
জনসংহতি সমিতি (সহ-সভাপতি ঊষাতন তালুকদারের সভাপতিত্বে)29 এপ্রিল 2013, রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনেপ্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি: ভূমি সচিবের মতে “একতরফা” সংশোধন উদ্যোগ বন্ধ করে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি ও আন্তমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্তমতো সংশোধন
মঙ্গল কুমার চাকমা, জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদকডেইলি স্টার, 25 জুন 2013বিলে 13 দফার 10টি, তার দুটি ঠিকভাবে নয়; “practices” ও “or occupied” বাদ, শর্তাংশ বহাল, কোরাম ও ধারা 21 নেই
রাশেদ খান মেনন, ওয়ার্কার্স পার্টি29 জুন 2013, হোটেল সুন্দরবনবেদখল জমি বাদ থাকলে মাত্র 35% বিরোধ কমিশনে নিষ্পত্তিযোগ্য
সঞ্জীব দ্রং, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম29 জুন ও 24 আগস্ট 2013“practices” শব্দ বাদ দেওয়া হয়েছে; 13 দফার 8টি পুরো, 2টি আংশিক, 3টি বাদ
পঙ্কজ ভট্টাচার্য, ঐক্য ন্যাপ29 জুন 2013, দশ দলের পক্ষে লিখিত বক্তব্যত্রুটিপূর্ণ সংশোধনী পাহাড়ে আরও উত্তেজনা তৈরি করবে
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতডেইলি স্টার, 4 নভেম্বর 2013চুক্তি অনুযায়ী সংশোধন করে চলতি অধিবেশনেই বিল পাসের আহ্বান
পার্বত্য সম অধিকার আন্দোলন, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ঐক্য পরিষদ, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ2 জুন 2013, তিন জেলায় হরতালসংশোধনী প্রস্তাব বাতিলের দাবি

২০১৬: অধ্যাদেশ ও আইনের পর

কমিশনের প্রথম বৈঠক বসে 4 সেপ্টেম্বর 2016, রাঙ্গামাটি সার্কিট হাউসে, হরতালের মধ্যেই। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে তিনজনের কথা উদ্ধৃত:

  • জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা), আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান: “The Commission will work for everyone in the Chittagong Hill Tracts.”
  • বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার-উল হক, কমিশনের চেয়ারম্যান: স্থানীয় বা সেটেলার, কোনো বাসিন্দা কমিশন সক্রিয় হওয়ার ফলে জমি হারাবেন না।
  • রাজা দেবাশীষ রায়, চাকমা সার্কেল চীফ: আইনে কিছু অসংগতি ছিল, এখন তা দূর হয়েছে; কমিশনের এখন জনবল ও কার্যালয় দরকার।

বৈঠকে আরও ছিলেন মং সার্কেল চীফ সাচিং প্রু চৌধুরী, বোমাং সার্কেলের প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার।

বিপরীত দিকে, পাঁচটি সংগঠন — পার্বত্য নাগরিক পরিষদ, পার্বত্য সম অধিকার আন্দোলন, পার্বত্য গণপরিষদ, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ ও পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ঐক্য পরিষদ — ২০১৬ সালে অন্তত তিন দফা হরতাল ডাকে:

  • 10–11 আগস্ট 2016: তিন জেলায় হরতাল, পরে এক দিন বাড়ানো। ডেইলি স্টারের 10 আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী নেতারা বলেন, এভাবে কমিশন গঠিত হলে পাহাড়ের বাঙালিরা ভূমির অধিকার হারাবেন এবং “আবার শরণার্থী” হবেন। পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের রাঙ্গামাটি শাখার সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ি শাখার মুখপাত্র মো. আবদুল মজিদ উদ্যোগটি দ্রুত বাতিলের দাবি জানান, আর নেতারা সংশোধনীকে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যমূলক বলেন।
  • 4 সেপ্টেম্বর 2016: কমিশনের প্রথম বৈঠক ঠেকাতে হরতাল। ঢাকা ট্রিবিউন অনুযায়ী আগের দিনের সংবাদ সম্মেলনে নেতারা অভিযোগ করেন, সংশোধিত আইন দিয়ে পাহাড়ের বাঙালিদের উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র হয়েছে।
  • অক্টোবর 2016: আইন পাসের পর একই পাঁচ সংগঠন খাগড়াছড়িতে 48 ঘণ্টার হরতাল ঘোষণা করে, আইন বাতিলের দাবিতে (ঢাকা ট্রিবিউন, 12 অক্টোবর 2016)।

প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী 16 এপ্রিল 2017-এ বিআইআইএসএস-এর সেমিনারে বলেন, “Bangalee community who have legitimate claim on land in CHT will not be deprived. This is a commitment of the government.” ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি সংশোধনী আইনের প্রশংসা করেন এবং কমিশনকে যথেষ্ট সময় দিতে বলেন।

ইউপিডিএফ সভাপতি প্রসিত খীসা 2016 সালের আগস্টে সংশোধনীর সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম আছে, কিন্তু প্রতিবেদনটির পূর্ণ পাঠ যাচাই করা যায়নি, তাই তাঁর বক্তব্য এখানে উদ্ধৃত হলো না।

পরের বছরগুলো

বিরোধ থামেনি। প্রথম আলোর 17 অক্টোবর 2025-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী 19 অক্টোবর 2025 রাঙ্গামাটিতে কমিশনের বৈঠক ডাকা হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) “রাঙামাটির সচেতন ছাত্র-জনতা”-র ব্যানারে হরতাল ডাকে, আর কমিশনের সচিব মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিনের চিঠিতে বৈঠক স্থগিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন এতে উদ্বেগ জানায়। 20 অক্টোবর 2025 সুলতানা কামাল, খুশী কবির, ইফতেখারুজ্জামানসহ 33 জন নাগরিক বিবৃতিতে বলেন, ২০১৬ সালে আইন সংশোধনের পর কমিশনের কয়েকটি সভা হয় ও “বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।”

সংবাদে যে ভুলগুলো ছাপা হয়েছিল

২০১৩ ও ২০১৬ সালের কয়েকটি প্রতিবেদন কমিশনের গঠন নিয়ে এমন তথ্য দিয়েছিল যা আইনের পাঠের সঙ্গে মেলে না। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো: সদস্যসংখ্যা “সাত থেকে আট” বা “তিন থেকে পাঁচ” হওয়া, আর খাগড়াছড়িতে “ত্রিপুরা” সার্কেল। ২০০১ ও ২০১৬ দুই পাঠেই কমিশন পাঁচ সদস্যের, আর সার্কেল তিনটি: চাকমা, বোমাং ও মং।

  • বাংলা ট্রিবিউন, 3 অক্টোবর 2016: “আগে কমিশনে সদস্য ছিলেন সাতজন। এখন সদস্য সংখ্যা বেড়ে আটজন হয়েছে।” একই প্রতিবেদনে তিন সার্কেল লেখা “বান্দরবানের মং, রাঙামাটির চাকমা, খাগরাছড়ির ত্রিপুরা”। ধারা 3(2) পাঁচজন সদস্যের কথা বলে, যার মধ্যে কেবল “সংশ্লিষ্ট” — অর্থাৎ বিরোধীয় জমি যে সার্কেলে — সেই একজন সার্কেল চীফ বসেন; ধারা 2(ঠ) সার্কেল চীফ বলতে “চাকমা চীফ বা বোমাং চীফ বা মং চীফ” বোঝায়। ২০১৬ সালের সংশোধনী সদস্যসংখ্যায় হাত দেয়নি।
  • ডেইলি স্টার, 2 জুন 2013: ২০১৩ সালের প্রস্তাবিত বিল সদস্যসংখ্যা “three” থেকে “five” করবে, বিভাগীয় কমিশনার হবেন “member secretary”, আর থাকবেন “two indigenous people or circle chiefs”। FAOLEX-এ রাখা ২০০১ সালের গেজেট-অনুবাদেই পাঁচ সদস্য, আর বিভাগীয় কমিশনার সাধারণ সদস্য; সচিব আলাদা পদ, ধারা 13(1) অনুযায়ী উপ-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা।
  • প্রথম আলো, 8 সেপ্টেম্বর 2022: সদস্যতালিকায় লেখা “তিন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, তিন সার্কেল প্রধান বা রাজা” — যা কমিশনের সম্ভাব্য সদস্যদের পুরো তালিকা; আইনের ভাষায় প্রতিটি বিরোধে কেবল সংশ্লিষ্ট জেলার একজন চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট সার্কেলের একজন চীফ বসেন।

আইনের ব্যাখ্যামূলক অংশে “সংশ্লিষ্ট” শব্দের অর্থ স্পষ্ট: বিরোধীয় ভূমি যে পার্বত্য জেলা এবং যে সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত। এই অংশ ২০১৬ সালে বদলায়নি।

সংশোধনের পর কমিশন কতদূর এগোল

সংশোধনের পরও কমিশন একটি বিরোধও নিষ্পত্তি করেনি, আর বিধিমালা হয়নি। আবেদনের সংখ্যা নিয়ে উৎসভেদ আছে: গওহর রিজভী 2017 সালে বলেছিলেন 24,000; প্রথম আলো 2022 সালে কমিশনের হিসাবে 22,468 (রাঙামাটি 9,941, খাগড়াছড়ি 7,975, বান্দরবান 4,552); 33 নাগরিকের 2025 সালের বিবৃতি বলছে 26 হাজারের বেশি।

প্রথম আলোর 2022 সালের প্রতিবেদন আরও জানায়, 2017 সালে বিচারপতি আনোয়ার উল হককে দিয়ে কমিশন পুনর্গঠিত হয়, আর প্রতিবেদনের ভাষায় 3 ফেব্রুয়ারি 2020-এর সর্বশেষ সভায় “এই পাঁচ সদস্যের কেউই ছিলেন না”। প্রথম আলোর 2 ডিসেম্বর 2023-এর প্রতিবেদনে কমিশনের সচিব মো. নেজাম উদ্দিন বলেন, 22 হাজারের বেশি আবেদনের একটিরও সুরাহা হয়নি। নতুন কোরাম ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ম কাগজে যা-ই বলুক, বৈঠকই যখন বসে না বা স্থগিত হয়, তখন সেগুলো পরীক্ষার সুযোগ পায়নি। কমিশনের বৃহত্তর ইতিহাস ও চেয়ারম্যানদের তালিকা আছে ১৯০০ সালের রেগুলেশন থেকে ভূমি কমিশন লেখায়; পুরো অঞ্চলের প্রেক্ষাপটের জন্য দেখুন পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব।

প্রশ্নোত্তর

ভূমি কমিশন সংশোধন আইন ২০১৬ কবে পাস হয়?

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) বিল 4 অক্টোবর 2016 সংসদে উত্থাপিত হয় এবং 6 অক্টোবর 2016 দ্বাদশ অধিবেশনের সমাপনী দিনে কণ্ঠভোটে পাস হয়। এটি 2016 সনের 45 নং আইন। এর আগে 1 আগস্ট 2016 মন্ত্রিসভা খসড়া অনুমোদন করে এবং বিষয়টি অধ্যাদেশ আকারে কার্যকর হয়; আইনটি সেই অধ্যাদেশ রহিত করে।

২০১৬ সালের সংশোধনীতে ভূমি কমিশন আইনের কয়টি ধারা বদলেছে?

সংশোধনী আইনের 2 থেকে 9 ধারা মূল ২০০১ সালের আইনের প্রস্তাবনা এবং 3, 4, 6, 7, 9, 13 ও 18 নম্বর ধারা বদলেছে। bdlaws-এ মূল আইনের পাঠে মোট 14টি পাদটীকা এই পরিবর্তনগুলো চিহ্নিত করে। এর মধ্যে দুটি নতুন উপ-ধারা — 9(2) ও 13(3) — এবং 7(4)-এ একটি নতুন শর্তাংশ যোগ হয়েছে। ধারা 16-সহ বাকি ধারাগুলো অপরিবর্তিত।

সংশোধনের আগে ভূমি কমিশনে সিদ্ধান্ত কে নিতেন?

২০০১ সালের ধারা 7(5) অনুযায়ী চেয়ারম্যান উপস্থিত সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করতেন, কিন্তু সর্বসম্মতি না হলে “চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত” বলে গণ্য হতো। ২০১৬ সালের সংশোধনীর 6(গ) ধারা এটি বদলে করে “চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গৃহীত সিদ্ধান্ত”। সর্বসম্মতির চেষ্টা প্রথম ধাপ হিসেবে এখনো আছে।

ভূমি কমিশনের কোরাম কত জনে হয়?

২০১৬ সালের পর কোরামের জন্য চেয়ারম্যান এবং আরও তিনজন সদস্যের উপস্থিতি লাগে, অর্থাৎ পাঁচজনের মধ্যে চারজন। ২০০১ সালে লাগত চেয়ারম্যান ও দুজন। ২০১০ সালের মন্ত্রণালয় সভায় চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় যুক্তি দিয়েছিলেন, পুরোনো নিয়মে সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দুজনের অনুপস্থিতিতেও নিষ্পত্তি সম্ভব ছিল। ২০১৩ সালের বিলে এই পরিবর্তন ছিল না।

২০১৬ সালের পর কমিশন কোন কোন বিরোধ শুনতে পারে?

সংশোধিত ধারা 6(1)(ক) অনুযায়ী কমিশন পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি-বিরোধ এবং অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ, দুটোই নিষ্পত্তি করে, “প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি” অনুযায়ী। ২০০১ সালে এখতিয়ার কেবল শরণার্থীদের বিরোধে সীমিত ছিল। কার্যাবলী এখনো ধারা 6(2) অনুযায়ী খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে সীমিত।

‘রীতি ও পদ্ধতি’ শব্দে ‘পদ্ধতি’ যোগ করা কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

জনসংহতি সমিতির মঙ্গল কুমার চাকমা 2013 সালে ব্যাখ্যা করেন, “পদ্ধতি” বা practices পার্বত্য ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রথাগুলোকে বোঝায়, যেমন জমি হস্তান্তর, বন্দোবস্ত বা অধিগ্রহণের আগে মৌজা হেডম্যানের প্রতিবেদন নেওয়া। ২০১৩ সালের বিলে শব্দটি বাদ ছিল। ২০১৬ সালে 6(1)-এর তিনটি দফাতেই “রীতি ও পদ্ধতি” বসে, যা পার্বত্য চুক্তির (ঘ) খণ্ডের ভাষার সঙ্গে মেলে।

কাপ্তাই ও বেতবুনিয়ার জমি কি ভূমি কমিশনের আওতায়?

পুরোপুরি নয়। সংশোধিত 6(1)(গ)-এর শর্তাংশ অনুযায়ী কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা ও বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকায় বন্দোবস্ত বা বেদখল বাতিলের এই উপ-ধারা প্রযোজ্য নয়, তবে শর্তাংশে নাম থাকা জমি — প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত ভূমি, বসতবাড়ীসহ জলেভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় — এই ব্যতিক্রমের বাইরে। ২০০১ সালে এই দুই এলাকাসহ পাঁচ ধরনের জমি পুরো বাইরে ছিল।

সংরক্ষিত বনের জমি নিয়ে কি এখন কমিশনে বিরোধ তোলা যায়?

২০০১ সালের 6(1)(গ)-এর শর্তাংশে সংরক্ষিত বন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প এবং সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডভুক্ত জমি কমিশনের বাতিল-ক্ষমতার বাইরে ছিল। ২০১৬ সালের প্রতিস্থাপিত শর্তাংশে এই তিনটি নাম নেই, কেবল কাপ্তাই ও বেতবুনিয়া আছে। এর ভিত্তিতে কোনো সংরক্ষিত বনের বিরোধ কমিশনে নিষ্পত্তি হয়েছে, এমন কোনো নথি পাওয়া যায়নি, কারণ কমিশন এখনো কোনো বিরোধই নিষ্পত্তি করেনি।

আবেদন জমা দেওয়ার পর কি তা সংশোধন করা যায়?

হ্যাঁ, ২০১৬ সালে যোগ হওয়া ধারা 9(2) অনুযায়ী কমিশন আবেদন নিষ্পত্তির আগে যেকোনো সময়ে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং কমিশনের অনুমতি সাপেক্ষে, আবেদনকারী তাঁর আবেদন একবার সংশোধন করতে পারেন। ২০০১ সালের আইনে এমন কোনো বিধান ছিল না। FAOLEX-এ রাখা ২০১৩ সালের বিলের ইংরেজি ভাষায় “একবার”-এর সীমা ছিল না।

২০১৩ সালের সংশোধনী বিল কেন পাস হয়নি?

বিলটি জুন 2013-এ সংসদে উত্থাপিত হয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিতে যায়। জনসংহতি সমিতির বিবৃতি অনুযায়ী কমিটি তিনটি সভা করে, শেষটি 3 অক্টোবর 2013, কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়েই বিষয়টি ফেলে রাখে; নবম সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ায় বিলটি আর ওঠেনি। পাহাড়ি নেতারা বিলটিকে অসম্পূর্ণ বলছিলেন, আর বাঙালি সংগঠনগুলো বাতিল চাইছিল।

সংশোধনীর প্রতিবাদে কারা হরতাল ডেকেছিল?

পার্বত্য নাগরিক পরিষদ, পার্বত্য সম অধিকার আন্দোলন, পার্বত্য গণপরিষদ, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ ও পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ঐক্য পরিষদ 2016 সালের 10–11 আগস্ট, 4 সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে তিন পার্বত্য জেলায় হরতাল ডাকে। তাঁদের দাবি ছিল সংশোধিত আইন পাহাড়ের বাঙালিদের ভূমির অধিকার কেড়ে নেবে। 2 জুন 2013-এও এর তিনটি সংগঠন হরতাল করেছিল।

সংশোধনের পর ভূমি কমিশনের বিধিমালা হয়েছে কি?

না। ২০১৬ সালে ধারা 18-এর “ছয় মাসের মধ্যে” বদলে “যথাশীঘ্র” করা হয়, কিন্তু কোনো সময়সীমা বসানো হয়নি। প্রথম আলোর 2022 ও 2023 সালের প্রতিবেদনে কমিশনের সচিব জানান বিধিমালা চূড়ান্ত হয়নি। আঞ্চলিক পরিষদ একটি খসড়া বিধিমালা সরকারকে দিয়েছে বলে 2022 সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

যা এখনো জানা যায়নি

  • অধ্যাদেশের নম্বর ও তারিখ। আগস্ট 2016-এর পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশের নম্বর জানা যায়নি। ঢাকা ট্রিবিউন গেজেটে প্রকাশের তারিখ দিয়েছে 8 আগস্ট; গেজেটের মূল কপি দেখা যায়নি।
  • ২০০১ সালের বাংলা মূল পাঠের দুটি দফা। 6(1)(ক) ও (গ) পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হওয়ায় bdlaws-এর পাদটীকায় তাদের পুরোনো বাংলা ভাষা নেই। এখানে ব্যবহৃত পাঠ FAOLEX-এর ইংরেজি সরল অনুবাদ; ২০০১ সালের বাংলা গেজেটের মূল কপির সঙ্গে মেলানো যায়নি।
  • ধারা 18-এ আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ। ইংরেজি অনুবাদে আছে, বাংলা পাঠে নেই — ২০০১ সালের বাংলা গেজেটে কোনটি ছিল, তা নিশ্চিত হয়নি।
  • শর্তাংশের “ব্যতীত” অংশের সরকারি ব্যাখ্যা। কাপ্তাই ও বেতবুনিয়া এলাকার কোন জমি কমিশনের আওতায় ফেরে, তা নিয়ে কোনো বিধি, প্রজ্ঞাপন বা আদালতের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
  • 9(2)-এ “একবার” ও 13(3)-এ “স্থায়ী অধিবাসী” কোন পর্যায়ে এল। ২০১৩ সালের বিল থেকে ২০১৬ সালের পাঠে এই পরিবর্তন কার প্রস্তাবে, কোন সভায় হলো, তার নথি প্রকাশিত হয়নি। ধারা 4(2)-এর পরিবর্তনের উৎসও একইভাবে অজানা।
  • সংসদে নাকচ হওয়া সংশোধনী প্রস্তাবের বিষয়বস্তু। জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র সদস্যরা কোন ধারায় কী চেয়েছিলেন, সংসদের কার্যবিবরণী ছাড়া জানা সম্ভব নয়; কার্যবিবরণী পাওয়া যায়নি।
  • ইউপিডিএফের অবস্থান। 2016 সালের আগস্টে প্রসিত খীসার সমালোচনার পূর্ণ পাঠ যাচাই করা যায়নি।
  • 13(3) অনুযায়ী নিয়োগ। সংশোধনের পর কমিশনে কতজন নিয়োগ পেয়েছেন এবং তাঁদের কতজন পাহাড়ি, তার কোনো হিসাব প্রকাশিত হয়নি।

তথ্যসূত্র

  1. আইন ও বিচার বিভাগ, “পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১ (২০০১ সনের ৫৩ নং আইন)”, সংশোধনীর পাদটীকাসহ, bdlaws। http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-details-877.html
  2. জুমজার্নাল আর্কাইভ, “পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন” (পূর্ণ পাঠ ও 14টি পাদটীকা), 2 মে 2021। জুমজার্নাল
  3. FAOLEX, “Simple English Version of Chittagong Hill Tracts Land Dispute Settlement Commission Act 2001 (Act 53 of 2001)” এবং “Proposal of the CHT Regional Council for amendment … 13-Point Amendment Proposals and Amendment Bill introduced in the Parliament on 16 June 2013”। https://faolex.fao.org/docs/pdf/bgd165300.pdf
  4. বাংলাদেশ প্রতিদিন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন বিল পাস”, 6 অক্টোবর 2016 (Internet Archive কপি)। লিংক
  5. সিএইচটি টাইমস (বাসস), “জাতীয় সংসদে পাস হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) বিল-২০১৬”, অক্টোবর 2016 (Internet Archive কপি)। লিংক
  6. বাংলা ট্রিবিউন, “‘জেলা পরিষদ অধ্যাদেশ’ ও ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’ আইন আকারে প্রকাশের অনুমোদন”, 3 অক্টোবর 2016। লিংক
  7. The Daily Star, “Settlers observe hartal in CHT”, 10 আগস্ট 2016। লিংক
  8. The Daily Star, “Hartal ends in CHT”, 11 আগস্ট 2016। লিংক
  9. The Daily Star, “Land commission to work for all” (সন্তু লারমা, আনোয়ার-উল হক, দেবাশীষ রায়ের বক্তব্য), 4 সেপ্টেম্বর 2016। লিংক
  10. Dhaka Tribune, “Strike at CHT ends”, 11 আগস্ট 2016। লিংক
  11. Dhaka Tribune, “Settlers announce hartal today in CHT”, 4 সেপ্টেম্বর 2016। লিংক
  12. Dhaka Tribune, “Settlers announce two-day strike in CHT”, 12 অক্টোবর 2016। লিংক
  13. The Daily Star, “Bangalees in CHT won’t be deprived: Gowher”, 17 এপ্রিল 2017। লিংক
  14. মঙ্গল কুমার চাকমা, “Amendment of CHT Land Commission Act 2001 needed”, The Daily Star, 25 জুন 2013। লিংক
  15. The Daily Star, “Amendment bill will fail to ensure adivasis’ land rights”, 30 জুন 2013। লিংক
  16. The Daily Star, “Indigenous leaders place objections to JS body”, 16 জুলাই 2013। লিংক
  17. The Daily Star, “Incorporate all proposed amendments”, 25 আগস্ট 2013। লিংক
  18. The Daily Star, “Settlers observe peaceful hartal”, 2 জুন 2013। লিংক
  19. ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত, “The Amendment of the CHT Land Dispute Resolution Commission Act 2001”, The Daily Star, 4 নভেম্বর 2013। লিংক
  20. The Daily Star, “Changes to be placed in next JS session”, 30 জুলাই 2012। লিংক
  21. The Daily Star, “Review controversial land commission act: Larma”, 27 জানুয়ারি 2010। লিংক
  22. পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, “Meeting on amendment of CHT Land Commission Act held at CHT Ministry” (22 সেপ্টেম্বর 2010-এর সভা), UNPO (Internet Archive কপি)। লিংক
  23. পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, “Memorandum For Amendment Of CHT Land Commission Act” (29 এপ্রিল 2013), UNPO (Internet Archive কপি)। লিংক
  24. Dhaka Tribune-এর প্রতিবেদন, UNPO-তে পুনর্মুদ্রিত, “Improved Version of Land Dispute Resolution Commission Act Possible” (29 জুন 2013) (Internet Archive কপি)। লিংক
  25. পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, প্রেস বিজ্ঞপ্তি (অক্টোবর 2013, স্থায়ী কমিটিতে বিল আটকে থাকা নিয়ে), UNPO (Internet Archive কপি)। লিংক
  26. মঙ্গল কুমার চাকমা, “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার : অর্জন ও সম্ভাবনা” (4 মার্চ 2012), জুমজার্নাল আর্কাইভ। জুমজার্নাল
  27. জুমজার্নাল আর্কাইভ, “পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যার চিত্র”। জুমজার্নাল
  28. প্রণব বল, “২৩ বছরে কিছুই করতে পারেনি পার্বত্য ভূমি কমিশন”, প্রথম আলো, 8 সেপ্টেম্বর 2022। লিংক
  29. প্রথম আলো, “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৬ বছর: ভূমিসহ ৩ বিষয়ে অগ্রগতি নেই”, 2 ডিসেম্বর 2023। লিংক
  30. প্রথম আলো, “ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সভা স্থগিত: পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের উদ্বেগ”, 17 অক্টোবর 2025। লিংক
  31. প্রথম আলো, “পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সভা স্থগিতে উদ্বেগ ৩৩ বিশিষ্টজনের”, 20 অক্টোবর 2025। লিংক

সর্বশেষ হালনাগাদ: 19 অক্টোবর 2026

প্রসঙ্গ:পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি সমস্যা, ভূমি অধিকার, ভূমি কমিশন আইন, ভূমি বিরোধ

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা