Last updated Oct 17th, 2026
0

হাজংরা বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তের, গারো পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী একটি আদিবাসী চাষি জনগোষ্ঠী — নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও সুনামগঞ্জের সীমান্ত-ঘেঁষা এক সরু ফালিতে তাঁদের গ্রাম। তাঁদের ভূমি-ইতিহাসের কেন্দ্রে আছে টংক: জমিদারকে টাকায় নয়, নির্দিষ্ট পরিমাণ ধানে খাজনা দেওয়ার এক প্রথা, যার বিরুদ্ধে হাজং জনগোষ্ঠী টংক আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিল। 1950 সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনে টংক উঠে যায়, কিন্তু তার পরের দুই দশকে দমন-পীড়ন, দাঙ্গা আর দেশত্যাগে হাজংদের বড় অংশ নিজেদের জমি থেকেই সরে যান।
সংখ্যা দুটি পাশাপাশি রাখলে ছবিটা পরিষ্কার হয়। 1951 সালের শুমারিতে শুধু ময়মনসিংহ জেলাতেই হাজং ছিলেন প্রায় 35 হাজার — এ কথা লিখেছেন আবদুস্ সাত্তার, 1960-এর দশকের একটি সংকলনে, আর পরে সুগত চাকমাও (দুটি বই-ই জুমজার্নালের ই-বুক সংগ্রহে আছে)। 2022 সালের জনশুমারিতে সারা বাংলাদেশে হাজং গোনা হয়েছেন 7,996 জন। এই লেখা সেই মাঝখানের ইতিহাস নিয়ে — টংক কী ছিল, আইন কী বদলাল, আর আইন বদলানোর পরও জমি কেন হাতছাড়া হলো। শুরুতে থাকছে সেই সাধারণ প্রশ্নগুলোর উত্তর, যা হাজংদের নিয়ে প্রথমেই মানুষ খোঁজেন: তাঁরা কারা, কোথায় থাকেন, কতজন।
এই লেখায় যা আছে
হাজংরা বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি আলাদা জাতি, নিজস্ব ভাষা আর সমাজ-কাঠামো নিয়ে। বাংলাদেশে তাঁরা মূলত গারো পাহাড়-সংলগ্ন সীমান্তের সমতলে থাকেন, জীবিকা চাষাবাদ। ধর্মবিশ্বাসে তাঁরা হিন্দু, তবে নিজস্ব দেবদেবী ও আচার আলাদা করে পালন করেন। জমির আইন, সংস্কৃতির আইন আর জনশুমারি — রাষ্ট্রের তিনটি তালিকাতেই তাঁদের নাম আছে।
রাষ্ট্রের খাতায় হাজংদের নাম তিনটি আলাদা জায়গায় পাওয়া যায়, তিনটি আলাদা কাজে। প্রথমটি জমির: 1950 সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ধারা 97-এ যে 21টি “aboriginal castes or tribes”-এর জমি হস্তান্তরে বিধিনিষেধ আছে, তার একটি নাম “Hajangs” (আইনের পাঠ, bdlaws)। দ্বিতীয়টি সংস্কৃতির: 2010 সালের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনের মূল তফসিলের 27টি নামের মধ্যে হাজং আছে, আর 2019 সালের 50-নামের তফসিলেও আছে (পাভেল পার্থ, আদিবাসী জনগণের কার্বন-নিরপেক্ষ অর্থনীতি)। তৃতীয়টি শুমারির: 2022 সালের জনশুমারি সেই 50-নামের তালিকা ধরেই হাজংদের আলাদা করে গুনেছে।
ধর্ম নিয়ে উৎসগুলো একমত, খুঁটিনাটিতে আলাদা। বাংলাপিডিয়ার হাজং ভুক্তি (লেখক সুভাষ জেংচাম) বলছে, হাজংরা উপাসনাভেদে দুই দলে ভাগ — শাক্ত “হাজং” আর বৈষ্ণবপন্থী “খাটাল”; শাক্তরা ব্রাহ্মণ পুরোহিত ডাকেন, খাটালরা নিজেদের সমাজের অধিকারী দিয়ে পূজা করান। এর বাইরে আছে খাংখাঙী দেও, ময়লাদেও, হাওয়াদেও, পিঠাদেও, গাঙদেও — নিজস্ব দেবদেবী (বাংলাপিডিয়া, হাজং)। 1960-এর দশকে আবদুস্ সাত্তার লিখেছিলেন, শিব হাজংদের প্রধান দেবতা, আর আগে পূজা-বিয়েতে ব্রাহ্মণ ডাকা হতো না, গ্রামের “অধিকারী”-ই সব করতেন (পাকিস্তানের উপজাতি, পৃ. 37)। রবীন্দ্র চন্দ্র রায় 2009 সালের একটি সংকলনে লিখেছেন, হাজংরা বিশেষ করে শক্তির উপাসক, কামাখ্যা দেবীর পূজা বড় করে করেন (আদিবাসী সংস্কৃতি, পৃ. 269)। একই সময়ের লেখায় খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হাজংদের কথাও আছে।
বাংলাদেশে হাজংদের বসতি পশ্চিমে শেরপুর থেকে পূর্বে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত, ভারতের মেঘালয় সীমান্ত বরাবর। সবচেয়ে ঘন বসতি নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া, আর শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদীতে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও ধর্মপাশায়ও হাজং গ্রাম আছে।
উপজেলার নামের তালিকা উৎসভেদে একটু আলাদা, কিন্তু মূল এলাকা একই। নিচের ছকে চারটি উৎস পাশাপাশি:
| উৎস | যে এলাকাগুলোর নাম আছে |
|---|---|
| আবদুস্ সাত্তার, পাকিস্তানের উপজাতি (1963/1966) | ময়মনসিংহ জেলার উত্তরাংশের বিরিশিরি, শ্রীবর্দী, হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ী, সুসং-দুর্গাপুর, কলমাকান্দা |
| শ্রী হাজং নিখিল রায়, আদিবাসী সংস্কৃতি (2009) | হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, নালিতাবাড়ী, শ্রীবর্দী; সুনামগঞ্জের মধ্যনগর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, বংশীকুণ্ডা; ভারতের মেঘালয়, আসাম, অরুণাচল, জলপাইগুড়ি, কুচবিহার |
| বাংলাপিডিয়া, বাংলা ভুক্তি | শ্রীবর্দি, ঝিনাইগাতি, হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নালিতাবাড়ি, সুসং দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, বিরিশিরি; কিছু শেরপুর, সিলেট ও নেত্রকোনায় |
| বাংলাপিডিয়া, ইংরেজি ভুক্তি | হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া; শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী; সুনামগঞ্জ সদর, ধর্মপাশা, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার; সবচেয়ে বেশি কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও ধোবাউড়ায় |
SIL-এর একটি ভাষা-সমীক্ষা (মাঠকাজ মার্চ 2005, প্রকাশ 2011) এই এলাকাকে বলেছে বৃহত্তর হাজং জনগোষ্ঠীর “দক্ষিণের প্রান্ত-ঘাঁটি” — সীমান্তের এক সরু ফালি, যার বেশির ভাগ হাজং থাকেন সীমান্তের ওপারে, মেঘালয়ের গারো পাহাড়ে, আসামে, এমনকি অরুণাচল পর্যন্ত। সমীক্ষকেরা ঘুরেছিলেন ধোবাউড়ার ভালুকাপাড়াসহ চারটি হাজং গ্রামে; প্রতিটিতে 25 থেকে 50টি পরিবার, 175 থেকে 235 জন মানুষ (Kim ও অন্যান্য, SIL 2011)। একই সমীক্ষা লিখেছে, চট্টগ্রাম বিভাগে কিছু হাজংয়ের থাকার খবর পাওয়া যায়, তবে তা নিশ্চিত নয় — সেই প্রসঙ্গে নিচে আলাদা অংশ আছে।
ভারতে হাজংরা তফসিলি উপজাতি (Scheduled Tribe)। ইংরেজি উইকিপিডিয়া ভারতের 2011 সালের শুমারির টেবিল উদ্ধৃত করে মেঘালয়ে 41,414 ও আসামে 27,521 জন হাজংয়ের হিসাব দেয় (Wikipedia, Hajong people)। এই সংখ্যা ভারতের শুমারির মূল টেবিল থেকে যাচাই করা যায়নি [যাচাই প্রয়োজন]।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022-এর জাতীয় প্রতিবেদনে হাজং 7,996 জন — পুরুষ 3,814, নারী 4,182। এর 6,068 জন (প্রায় 76%) ময়মনসিংহ বিভাগে, 1,528 জন (প্রায় 19%) সিলেট বিভাগে। দুই বিভাগ মিলিয়ে 95%। 50টি তালিকাভুক্ত জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যায় হাজংদের অবস্থান 21তম।
সংখ্যাগুলো এসেছে প্রতিবেদনের Table P29 (“Ethnic Population by Category, Sex and Division, 2022”) থেকে (BBS, National Report Vol. I)। বিভাগ ধরে পুরো ভাগটি:
| বিভাগ | মোট | পুরুষ | নারী |
|---|---|---|---|
| ময়মনসিংহ | 6,068 | 2,808 | 3,260 |
| সিলেট | 1,528 | 756 | 772 |
| ঢাকা | 302 | 195 | 107 |
| চট্টগ্রাম | 45 | 28 | 17 |
| রাজশাহী | 29 | 11 | 18 |
| খুলনা | 10 | 6 | 4 |
| রংপুর | 9 | 6 | 3 |
| বরিশাল | 5 | 4 | 1 |
| সারা দেশ | 7,996 | 3,814 | 4,182 |
তিনটি জিনিস ছকটি থেকে চোখে পড়ে। এক, ময়মনসিংহ বিভাগের 61,561 জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে গারোরা 45,164, তারপরই হাজং 6,068 — বিভাগের দ্বিতীয় বড় জাতিগোষ্ঠী। দুই, হাজংদের মধ্যে নারীর অংশ 52.30%, যা সারা দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গড় (50.02%) থেকে বেশ উপরে; ময়মনসিংহ বিভাগে এই অংশ আরও বেশি, 53.72%। কেন, প্রতিবেদন তার ব্যাখ্যা দেয় না। তিন, ঢাকা বিভাগের 302 জনের মধ্যে পুরুষ 195 — শহরে কাজ বা পড়াশোনার জন্য আসা মানুষের ছাপ হতে পারে, তবে প্রতিবেদন এ নিয়েও কিছু বলে না।
জেলা বা উপজেলা ধরে হাজংদের সংখ্যা জাতীয় প্রতিবেদনে নেই। শুমারির সংজ্ঞা-অংশ জানায়, “Khudra Nri-goshthi Sangskritik Pratisthan Ain, 2010”-এর তালিকা অনুসরণ করেই জাতিগোষ্ঠীর তথ্য নেওয়া হয়েছে — অর্থাৎ তালিকায় নাম আছে বলেই হাজংদের আলাদা সারি আছে।
হাজংদের সংখ্যা নিয়ে উৎসভেদে হিসাব 6 হাজার থেকে 50 হাজার পর্যন্ত। কারণ তিনটি: সরকারি শুমারি বহু দশক হাজংদের আলাদা করে গোনেনি; বেশির ভাগ হিসাব অনুমান, গণনা নয়; আর 1950 থেকে 1970-এর দশক পর্যন্ত দেশত্যাগে সংখ্যা সত্যিই নাটকীয়ভাবে কমেছে। নিচের ছকে সময়ের ক্রমে সব হিসাব এক জায়গায়।
| সময় | সংখ্যা | উৎস ও ধরন |
|---|---|---|
| 1951 | প্রায় 35,000 (শুধু ময়মনসিংহ জেলা) | শুমারির সংখ্যা, উদ্ধৃত করেছেন আবদুস্ সাত্তার (পাকিস্তানের উপজাতি, পৃ. 42) ও সুগত চাকমা (বাংলাদেশের উপজাতি, পৃ. 86) |
| 1961 | আলাদা করে গোনা হয়নি | পাকিস্তানের 1961 সালের শুমারিতে ময়মনসিংহের সব “উপজাতি” মিলিয়ে 15,329 জন; আবদুস্ সাত্তারের ধারণা, হাজংদের হিন্দু ও কিছু খ্রিষ্টান হিসেবে গোনা হয়েছিল (পৃ. 42–43, Census of Pakistan 1961, Bulletin No. 2, পৃ. 135 উদ্ধৃত) |
| 1982 পর্যন্ত | 6,168 | স্বর্ণকান্ত হাজং ও নিখিল রায়, “হাজং ইতিবৃত্ত” (মাটির মানুষ, 1982), উদ্ধৃত সুগত চাকমা, পৃ. 86 |
| 2005 (সমীক্ষা) | বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে 70,000–1,35,000 | SIL সমীক্ষা, পূর্ববর্তী লেখা থেকে উদ্ধৃত পরিসর |
| 2009 | “হয়তো 15 থেকে 20 হাজার” | রবীন্দ্র চন্দ্র রায়, আদিবাসী সংস্কৃতি, পৃ. 269 (অনুমান) |
| তারিখহীন | প্রায় 15,000 / “পনেরো হাজারের বেশি নয়” | বাংলাপিডিয়া, বাংলা ও ইংরেজি ভুক্তি (অনুমান) |
| তারিখহীন | 50,000-এর বেশি | বাংলা উইকিপিডিয়া, উৎস উল্লেখ নেই |
| 2022 | 7,996 | BBS জনশুমারি, Table P29 (গণনা) |
| 2025 | প্রায় 20,000 | The Business Standard, একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী নিয়ে প্রতিবেদন |
ছকের একমাত্র দুটি গণনা — 1951 আর 2022 — ঠিক তুলনীয় নয়: প্রথমটি কেবল তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার (যার মধ্যে আজকের নেত্রকোনা ও শেরপুরও পড়ত), দ্বিতীয়টি সারা দেশের। তবু 35 হাজার থেকে 8 হাজারের এই পতন অন্য প্রতিটি উৎসের বর্ণনার সঙ্গে মেলে। 2022-এর সংখ্যাটি প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম কি না — সেই পুরোনো প্রশ্ন সব আদিবাসী জাতির বেলায়ই ওঠে, আর তার আলাদা কোনো হিসাব হাজংদের জন্য প্রকাশিত হয়নি।
“হাজং” নামের উৎস নিয়ে অন্তত পাঁচটি ব্যাখ্যা চালু, আর কোনোটিই প্রমাণিত নয়। সবচেয়ে প্রচলিত মত হলো, পূর্বপুরুষেরা আসামের হাজো এলাকা থেকে এসেছিলেন বলে নাম হাজং। হাজংদের নিজেদের মধ্যে আরেকটি কথা চালু — নামটি গারোদের দেওয়া। নিখিল রায় সোজাসুজিই লিখেছেন, হাজংদের আদি নিবাস নিয়ে সঠিক তথ্য এখনো কেউ উদ্ধার করতে পারেননি।
| ব্যাখ্যা | কে বলেছেন |
|---|---|
| গুয়াহাটির প্রায় 12 মাইল দক্ষিণের হাজো নগর থেকে আসা মানুষদের বলা হতো “হাজোন”, পরে “হাইজং”, শেষে “হাজং” | রবীন্দ্র চন্দ্র রায় (2009); একই রকম কথা স্বর্ণকান্ত হাজং ও নিখিল রায়ের “হাজং ইতিবৃত্ত”-এ, হিউয়েন সাং-এর কামরূপ বিবরণে হাজো নগরের উল্লেখের সূত্রে (সুগত চাকমার উদ্ধৃতি) |
| গারো ভাষায় “হা” মাটি, “জং” পোকা — “মাটির পোকা”; হাজংরা জমিচাষি বলে গারোরা এই নাম দেয় | বাংলাপিডিয়া; হাজংদের প্রবাদ “গারো গিলা আমগা নাম থুছে হাজং” |
| কাছাড়ি ভাষায় “হা” পাহাড়, “জো” পর্বত — পাহাড়-পর্বতের অধিবাসী | আবদুস্ সাত্তার (1960-এর দশক); সুগত চাকমা উদ্ধৃত এন্ডলের মত |
| হাজো নামের এক কোচ সর্দারের অনুসারীরা নিজেদের “হাজবংশী” বলতেন, তা থেকে “হাজং” | SIL সমীক্ষায় উদ্ধৃত এক হাজং লেখক |
| উৎপত্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে, পরে উত্তরে সরে যাওয়া | SIL সমীক্ষায় উদ্ধৃত একটি তারিখহীন লেখা; সমীক্ষকেরা নিজেরাই বলেছেন, পণ্ডিত ও হাজংরা কেউ এ নিয়ে একমত নন |
কবে ও কেন হাজংরা গারো পাহাড়ের পাদদেশে এলেন, সেখানেও উৎস আলাদা। বাংলাপিডিয়ার বাংলা ভুক্তি বলছে, সপ্তদশ শতকে মুগলদের হাতে বিতাড়িত হয়ে তাঁরা গারো পাহাড়ে আশ্রয় নেন, পরে সমতলে নামেন; একই বিশ্বকোষের ইংরেজি ভুক্তিতে লেখা “seventh century”, আর তাড়ানোর কাজটি মগদের। কোন শতক ঠিক, দুই ভুক্তি মিলিয়ে বলা যায় না। নৃবিজ্ঞানীদের নামে বাংলাপিডিয়া আদিনিবাস বলছে উত্তর বার্মা; আবদুস্ সাত্তার কর্নেল ডাল্টনকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন হাজংরা আসামের কাছাড়ি জাতির শাখা, আর রেভারেন্ড সিডনি এন্ডলের মতে কোচদের শাখা।
হাজংদের নিজস্ব ভাষা আছে, নাম হাজং। এখন একে ইন্দো-আর্য পরিবারের ভাষা ধরা হয়, যদিও আগে টিবেটো-বর্মন পরিবারে রাখা হতো। হাজং ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা নেই; লেখা হয় অসমীয়া বা বাংলা-অসমীয়া হরফে। বাইরের মানুষের সঙ্গে আর বিদ্যালয়ে হাজংরা বাংলা বলেন, ঘরে ও গ্রামে হাজং।
ভাষা-পরিবারের প্রশ্নটি আমাদের আর্কাইভের একটি লেখায় স্পষ্ট: মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা হাজংকে ইন্দো-আর্য ভাষার তালিকায় রেখে বন্ধনীতে লিখেছেন, “পূর্বে টিবেটো বর্মন ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিল” (বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষা: এ যেন আলো আঁধারি পথ রেখায় অন্তহীন পদযাত্রা)। একই লেখা জানায়, 14 জুলাই 2013 তারিখে সরকারের মাতৃভাষায় শিক্ষা বিষয়ক জাতীয় কমিটি যে ধাপ ঠিক করেছিল, তার তৃতীয় ধাপে কোচ, কুড়ুখ, রাখাইন, খুমি ও খ্যাংয়ের সঙ্গে হাজং ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালুর কথা ছিল। আমাদের আর্কাইভের পুরোনো কিছু লেখায় হাজংকে বোডো ভাষাগোষ্ঠীতেও রাখা হয়েছে — ভাষা-শ্রেণিবিন্যাসের সেই পুরোনো ধারণারই ছাপ।
1960-এর দশকে আবদুস্ সাত্তার লিখেছিলেন, হাজং ভাষা বাংলা আর আসামী ভাষার মিশ্রণ, অনেক কাছাড়ি শব্দ তাতে মিশে আছে, লিখিত বর্ণমালা নেই (পাকিস্তানের উপজাতি, পৃ. 42)। SIL সমীক্ষা মাঠে গিয়ে মেপে দেখেছে, মিলটা কতখানি: ভারতের ছয়টি আর বাংলাদেশের চারটি গ্রাম থেকে নেওয়া শব্দতালিকায় দুই দেশের হাজংয়ের শব্দ-মিল 74 থেকে 85 শতাংশ, আর বাংলাদেশের ভেতরে 92 থেকে 96 শতাংশ। ভারতে রেকর্ড করা একটি হাজং গল্প শুনে বাংলাদেশের 18 জন শ্রোতার সবাই চিনেছেন ভাষাটি হাজং, বেশির ভাগ বলেছেন পুরোটাই বুঝেছেন। সমীক্ষকদের সিদ্ধান্ত, দুই দেশে একটিই হাজং ভাষা। তবে তাঁদের সতর্কবার্তাও আছে: বাংলা-মাধ্যম স্কুলে পড়া নতুন প্রজন্মের মুখে “খাঁটি” হাজংয়ের জায়গা নিচ্ছে বাংলা-মেশানো হাজং (SIL Electronic Survey Report 2011-042)।
লিপি নিয়ে উৎসে দুটি বর্ণনা: বাংলাপিডিয়া বলছে হাজংরা লেখেন অসমীয়া বর্ণমালায়, আর ইংরেজি উইকিপিডিয়া বলছে Eastern Nagari বা বাংলা-অসমীয়া হরফে। দুই হরফের অক্ষর প্রায় এক, তফাত কয়েকটি বর্ণে।
হাজং সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। সব উৎস একমত, পারিবারিক জমির উত্তরাধিকারী ছেলেরা; মেয়েরা বিয়ের সময় যৌতুক-অলংকার পান, জমির ভাগ নয়। বিধবা পুনর্বিবাহ না করলে স্বামীর সম্পত্তি ভোগ করতে পারেন। গ্রামের জমি ও বসতি নিয়ন্ত্রণে গ্রামপ্রধান “গাঁওবুড়া”-র ভূমিকা বড় — অনুমতি ছাড়া কেউ অন্য গ্রামে গিয়ে স্থায়ী হতে পারেন না।
এই পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোই হাজংদের পাশের গারো সমাজ থেকে তাঁদের আলাদা করে। 1960-এর দশকে আবদুস্ সাত্তার লিখেছিলেন, হাজংরা মাতৃপ্রধান সমাজের অন্তর্ভুক্ত নয় বলে স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি ছেলেরা সমান হারে পায় (পাকিস্তানের উপজাতি, পৃ. 40)। SIL সমীক্ষা একই কথা উদ্ধৃত করেছে আহমদ রফিকের লেখা থেকে। বাংলাপিডিয়া যোগ করে, মেয়ের ভাই না থাকলে এবং সে পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হলে নবদম্পতি কখনো কখনো কনের বাবার বাড়িতে থাকেন। কুমুদিনী হাজংয়ের বিয়েতেও স্বামী ঘরজামাই হয়েছিলেন, বাবার রেখে যাওয়া জমির সূত্রে; সে কথা নিচে আসছে।
গ্রামের প্রশাসনিক কাঠামো চার স্তরের: কয়েকটি পরিবারে পাড়া, কয়েকটি পাড়ায় গাঁও, কয়েকটি গাঁওয়ে চাক্লা, আর কয়েকটি চাক্লা মিলে পুরাগাঁও বা পরগনা (বাংলাপিডিয়া)। নিখিল রায় চাক্লাকে “জোয়ার”-ও বলেছেন, আর লিখেছেন পরগনার প্রধানকে বলা হতো রাজা। বাংলাপিডিয়া জানায়, পরগনা-প্রধানের পদ এখন আর নেই। জমির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দুটি প্রথার কথা বাংলাপিডিয়া লিখেছে: গ্রাম ছেড়ে যেতে চাইলে নিজ গ্রামের গাঁওবুড়াকে জরিমানা দিতে হয় — “মাটি নিদাবি”; আর নতুন গ্রামে স্থায়ী হতে হলে সেখানকার গাঁওবুড়াকে দিতে হয় “গাঁও হামাকর”। নিখিল রায় এই সদস্যপদকে বলেছেন “গাঁওহামা” — তা না হলে নতুন গ্রামে স্থায়ী বাসের অধিকার থাকে না।
জীবিকা কী ছিল, সেখানে একটি স্পষ্ট বিরোধ আছে। বাংলাপিডিয়া (দুই ভাষাতেই) আর আবদুস্ সাত্তার বলছেন, হাজংরা জুমচাষে অভ্যস্ত ছিলেন না, প্রাচীনকাল থেকেই হাল-চাষ করতেন; ইংরেজি উইকিপিডিয়া SIL সমীক্ষার সূত্রে লিখেছে, গারো পাহাড়ে হাজংরাই ভেজা জমিতে ধানচাষ এনেছিলেন। উল্টো দিকে ঢাকা ট্রিবিউনের 2024 সালের একটি প্রতিবেদন লিখেছে, বৃহত্তর ময়মনসিংহের হাজংরা ঐতিহাসিকভাবে জুমচাষি ছিলেন।
টংক আন্দোলনের অনেক আগে হাজংরা আরেকটি বিদ্রোহ করেছিলেন — হাতিখেদা। জমিদারেরা হাজংদের দিয়ে জোর করে পাহাড়ের বুনো হাতি ধরাতেন; সেই বেগারের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ। বাংলাপিডিয়া একে হাজংদের প্রথম আন্দোলন বলেছে। কবে হয়েছিল, উৎসভেদে তা আলাদা: এক উৎসে উনিশ শতকের শেষ দশক, আরেক উৎসে আঠারো শতকের শেষ ভাগ।
সুগত চাকমা লিখেছেন, 1893 সালে হাতিখেদাকে কেন্দ্র করে হাজংরা বিদ্রোহ করতে বাধ্য হন, বিদ্রোহ চলে 1899 পর্যন্ত, আর স্থানীয় রাজা হাজং সর্দারদের কিছু তালুক ছেড়ে দিয়ে তবেই বিদ্রোহ থামাতে পারেন (বাংলাদেশের উপজাতি, পৃ. 86–87)। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন বলছে, আঠারো শতকের শেষ দিকে বহু হাজংকে জমিদারদের জন্য বুনো হাতি পোষ মানাতে বাধ্য করা হতো, আর হাতিখেদা ছিল ওই অঞ্চলের প্রথম কৃষক বিদ্রোহ (Reaz Ahmad, Dhaka Tribune, 2024)। একই প্রতিবেদনে আছে, কুমুদিনী হাজংয়ের বাবা অতিথ চন্দ্র ছিলেন হাতি-পোষ মানানোর এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একজন কর্মী।
হাতিখেদা যে কেবল হাজংদের লড়াই ছিল না, তা আমাদের আর্কাইভের একটি লেখায় আছে। গবেষক পাভেল পার্থ লিখেছেন, নেত্রকোনার কলমাকান্দা-দুর্গাপুর সীমান্তে হাতিবাণিজ্যের বিরুদ্ধে হাজং, মান্দি ও বানাই আদিবাসীরা মিলে হাতিখেদাবিরোধী বিদ্রোহ সংগঠিত করেছিলেন (আদিবাসী জনগণের কার্বন-নিরপেক্ষ অর্থনীতি)। জমির প্রশ্নে হাতিখেদার গুরুত্ব হলো সুগত চাকমার লেখা সেই শেষ বাক্যটি — বিদ্রোহের দাম হিসেবে হাজং সর্দারেরা তালুক পেয়েছিলেন। জমির ওপর হাজংদের দাবি যে শতাব্দীপ্রাচীন, এটি তার একটি লিখিত চিহ্ন।
টংক ছিল উত্তর ময়মনসিংহের একটি খাজনা-ব্যবস্থা: জমির খাজনা টাকায় নয়, নির্দিষ্ট পরিমাণ ধানে দিতে হতো। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে টংক-রায়তরা প্রতি সোয়া একর জমির জন্য বছরে 10 থেকে 15 মণ ধান দিতেন, যা টাকার হিসাবে নগদ খাজনার দ্বিগুণেরও বেশি। ফসল হোক বা না হোক, এই ধান দিতেই হতো। “টংক” শব্দটি কেন, তা স্পষ্ট নয়।
বাংলাপিডিয়ার টঙ্ক আন্দোলন ভুক্তি (লেখক সিরাজুল ইসলাম) একে দক্ষিণ বাংলার “ধান করারি”-র মতো একটি মুদ্রা-পূর্ব যুগের প্রথা বলেছে। সমস্যা শুধু হারের ছিল না, অধিকারেরও ছিল। জমিদারেরা টংক-রায়তদের সাধারণ রায়ত বলে মানতে রাজি ছিলেন না; তাঁদের যুক্তি ছিল, টংক-রায়তরা কার্যত চাষ-করা দাস, তাই রায়তি স্বত্ব আর ধানের বদলে টাকায় খাজনা দেওয়ার অধিকার তাঁদের প্রাপ্য নয় (Banglapedia, Tonk Movement; বাংলাপিডিয়া, টঙ্ক আন্দোলন)। অর্থাৎ টংক মানে কেবল বেশি খাজনা নয় — জমির ওপর কোনো স্থায়ী স্বত্ব না থাকা।
খাজনার হার নিয়ে উৎসগুলোর সংখ্যা পাশাপাশি:
| উৎস | টংকের হার যা বলা হয়েছে |
|---|---|
| বাংলাপিডিয়া (সিরাজুল ইসলাম) | প্রতি 1.25 একরে 10–15 মণ ধান (1 মণ = 37.5 কেজি); টাকার হিসাবে নগদ খাজনার দ্বিগুণের বেশি |
| ঢাকা ট্রিবিউন, 2024 | একই হার; সঙ্গে যোগ — খারাপ আবহাওয়ার বছরেও জমিদারেরা ধানের পরিমাণ কমাতেন না |
| দ্য ডেইলি স্টার (স্টার উইকেন্ড ম্যাগাজিন), 2010 | জমিদার ও তাঁদের মধ্যস্বত্বভোগীদের 7 থেকে 15 মণ চাল (জমির পরিমাপ উল্লেখ নেই) |
| ইংরেজি উইকিপিডিয়া (Tanka movement) | জমিদার প্রতি বছর জমি নিলামে তুলতেন, সবচেয়ে বেশি ধান যে দিতে রাজি তাকে জমি দেওয়া হতো; 1937 সালে নিলামের ন্যূনতম হার পৌনে এক একরে প্রায় 555 কেজি [যাচাই প্রয়োজন] |
| চিররঞ্জন সরকার, bdnews24 মতামত, 2024 | জমিতে ফসল হোক বা না হোক টংকের ধান দিতেই হতো; না দিলে নির্যাতন |
নিলামের বর্ণনাটি কেবল উইকিপিডিয়ায় পাওয়া গেছে, আর সেখানে এর কোনো উৎস দেওয়া নেই; তাই সেটিতে যাচাইয়ের চিহ্ন। কিন্তু অন্য সব উৎস একটি বিষয়ে মেলে: টংকের খাজনা ছিল ফসলের পরিমাণের সঙ্গে বাঁধা নয়, নির্দিষ্ট ধানের অঙ্কে বাঁধা — খরা বা বন্যার বছরে ঝুঁকি পুরোটাই চাষির।
টংক কতটা বিস্তৃত ছিল? বাংলাপিডিয়া বলছে, উত্তর ময়মনসিংহে টংক-ভোগদখল প্রায় সর্বজনীন ছিল, বিশেষ করে কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদী থানায় — এবং এই থানাগুলোর জমি প্রধানত চাষ করতেন গারো ও হাজং রায়তরা। উপরের প্রথম ছকটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, টংক-এলাকা আর হাজং-এলাকা প্রায় হুবহু এক।
কারণটি ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক: টংক-ব্যবস্থা যে পাঁচ থানায় সবচেয়ে বেশি চালু ছিল, সেখানকার চাষিরা ছিলেন মূলত গারো ও হাজং। তাই আন্দোলনটি যদিও কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহের সংগঠিত এক কৃষক আন্দোলন, এর মাঠের সৈনিক ও প্রথম শহীদদের বড় অংশ হাজং। ইংরেজি উইকিপিডিয়া একে সরাসরি হাজংদের পক্ষে পরিচালিত সশস্ত্র কৃষক সংগ্রাম বলেছে।
কবে শুরু, সে নিয়েও উৎসভেদে তফাত। বাংলাপিডিয়া মণি সিংহের জীবনী ভুক্তিতে লিখেছে, 1937 সালের নভেম্বরে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি সুসং-দুর্গাপুরে ফিরে কৃষকদের সংগঠিত করেন টংক-বিরোধী আন্দোলনে (Banglapedia, Singh, Moni); অথচ একই বিশ্বকোষের টংক ভুক্তিতে আন্দোলনের সময়কাল 1946–50। মণি সিংহের নিজের পরিচয় নিয়েও দুই বর্ণনা: বাংলাপিডিয়া তাঁকে বলেছে সুসং-দুর্গাপুরের একজন জমিদার, আর চিররঞ্জন সরকার লিখেছেন তিনি সুসং-দুর্গাপুরের জমিদারদের ভাগ্নে। আন্দোলনের ছয় দফা দাবি ছিল: টংক প্রথার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি; টংক-কৃষকের ভূমি-অধিকারের স্বীকৃতি; পরগনার নগদ খাজনার হারে খাজনা নির্ধারণ; বকেয়া টংক মওকুফ; জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি; এবং সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদ।
দেশভাগের পর আন্দোলন কিছুদিন থেমে থাকে, 1948 সালে আবার শুরু হয়ে চলে জমিদারি বিলোপ পর্যন্ত (বাংলাপিডিয়া)। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার পর হাজং বিদ্রোহীরা সীমান্তের ওপারে গারো পাহাড়ের বাঘমারায় ঘাঁটি গাড়েন, সেখান থেকে পাকিস্তানি পুলিশের ওপর আক্রমণ চালাতেন। পাকিস্তান আমলের, 1960-এর দশকের একটি সংকলনেও কথাটির ছাপ আছে, তবে উল্টো দৃষ্টিকোণ থেকে: আবদুস্ সাত্তার লিখেছিলেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকে “এক শ্রেণীর শিক্ষিত হাজং” শ্রেণি-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন, এখন তাঁরা ভারতে আশ্রিত, আর সেখান থেকে সীমান্তের পুলিশের ওপর মাঝে মাঝে হামলা করেন (পাকিস্তানের উপজাতি, পৃ. 41)। একই ঘটনা — দুই পক্ষের দুই বর্ণনা।
আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত ঘটনাটি ঘটে দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেরাতলী গ্রামে, সোমেশ্বরী নদীর তীরে। পুলিশ আন্দোলনের নেতা লংকেশ্বর হাজংকে না পেয়ে তাঁর সদ্যবিবাহিত স্ত্রী কুমুদিনী হাজংকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল; গ্রামের রাশিমণি হাজংয়ের নেতৃত্বে শতাধিক নারী-পুরুষ দা, বল্লম, লাঠি নিয়ে পথ আটকান। সংঘর্ষে রাশিমণি ও সুরেন্দ্র হাজং পুলিশের গুলিতে নিহত হন, কুমুদিনীকে পুলিশ নিয়ে যেতে পারেনি (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 2024; bdnews24, 2024)। তারিখ নিয়ে উৎস দুই ভাগ: bdnews24-এর প্রতিবেদন ও বাংলা উইকিপিডিয়ার রাসিমণি হাজং নিবন্ধ বলছে 31 জানুয়ারি 1946, আর দ্য ডেইলি স্টারের 2010 সালের একটি লেখা ও বাংলা উইকিপিডিয়ার টঙ্ক আন্দোলন নিবন্ধ বলছে 31 ডিসেম্বর (1946)। হাজং সমাজ প্রতি বছর 31 জানুয়ারি বহেরাতলীর রাশিমণি স্মৃতিসৌধে দিনটি পালন করে — 2025 সালে পালিত হয়েছে 79তম প্রয়াণ দিবস (bdnews24, 2025)। এই দিনের পূর্ণ বিবরণ, আর কুমুদিনী হাজংয়ের জীবন, আলাদা দুটি লেখার বিষয়; এখানে কেবল এটুকুই দরকার যে টংক আন্দোলনের প্রথম শহীদেরা হাজং।
হাজংদের সঙ্গে গারোরাও ছিলেন। আমাদের আর্কাইভের মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক একটি সংকলনে আছে, কলমাকান্দার লতিকা এন মারাক বিরিশিরি মিশনারি স্কুলে পড়ার সময়ই টংক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন, আর তাঁর আদর্শ গড়ে ওঠে হাজং নেত্রী কলাবতী হাজংয়ের সংস্পর্শে; 1971 সালেও কলাবতী হাজং বেঁচে ছিলেন, তাঁর বাড়িতে কমিউনিস্ট নেতারা মিলিত হতেন। রেণুকা ম্রি মাত্র 13 বছর বয়সে টংক আন্দোলনে যোগ দেন (মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের অবদান)। দ্য ডেইলি স্টারের 2010 সালের লেখায় পিটার কাস্টার্সের বই উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, 1937–38 সালের মধ্যে আন্দোলন সুসং-দুর্গাপুরের প্রায় 300 গ্রামে ছড়িয়েছিল (Audity Falguni, The Daily Star, 2010)।
টংক উঠে যায় পূর্ববঙ্গ রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950 দিয়ে। বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, এই আইনে সব টংক-কৃষক তাঁদের দখলের জমির স্বাভাবিক মালিক হিসেবে স্বীকৃতি পান। আইনের ধারা 24(4) সরাসরি ধানে-দেওয়া খাজনার কথা বলে: এমন খাজনাকে টাকায় রূপান্তর করতে হবে, আর সেই টাকা জমির বার্ষিক মোট ফসলের মূল্যের এক-দশমাংশের বেশি হতে পারবে না।
ধারাটি একটু খুলে বলা দরকার, কারণ টংকের মূল অভিযোগের সঙ্গে এটি প্রায় দফা ধরে মেলে। আইনের বর্তমান পাঠে ধারা 24-এর শিরোনাম “Determination of fair and equitable rents of raiyats and under-raiyats”। উপধারা (4) বলছে, কোনো রায়ত বা উপ-রায়ত যদি খাজনা দেন “either in kind or on the estimated value of a portion of the crop” — অর্থাৎ ফসলে বা ফসলের একাংশের আনুমানিক মূল্যে — তাহলে রাজস্ব কর্মকর্তা সেই খাজনাকে “fair and equitable money-rent”-এ রূপান্তর করবেন। ঊর্ধ্বসীমা: জমির স্বাভাবিক বার্ষিক ফলনকে আগের 20 বছরের গড় দামে গুণ করে যে মোট মূল্য দাঁড়ায়, তার এক-দশমাংশ (State Acquisition and Tenancy Act, 1950, ধারা 24(4))। টংকের ছয় দফার তৃতীয়টি ছিল নগদ টাকায় খাজনা; আইন সেটিই দিয়েছে, সঙ্গে একটি ছাদ বেঁধে দিয়েছে।
জমির মালিকানার প্রশ্নটি আইনের আরও গোড়ায়। বাংলাপিডিয়ার আইন-বিষয়ক ভুক্তি (লেখক আবদুল কাইয়ুম) ব্যাখ্যা করেছে, আইনের ধারা 3-এর ফলে সব জমিধারী সরাসরি সরকারের প্রজা হন, তাঁদের বলা হয় “মালিক”, আর জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের খাজনা-আদায়ের অধিকার ধাপে ধাপে সরকার অধিগ্রহণ করে নেয় (Banglapedia, East Bengal State Acquisition and Tenancy Act 1950)। টংক-রায়তকে “সাধারণ রায়ত” মানতে জমিদারদের যে আপত্তি ছিল, মধ্যস্বত্বের স্তরটাই তুলে দিয়ে আইন সেই প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক করে দিল।
টংক বিলোপের সাল নিয়ে দুটি সংখ্যা ঘোরে, আর দুটিরই উৎস একই বিশ্বকোষ। বাংলাপিডিয়ার টংক ভুক্তি বলছে 1950 সালে জমিদারি বিলোপের সঙ্গে টংক উঠে যায়; একই বিশ্বকোষের মণি সিংহ ভুক্তি বলছে, আন্দোলন সশস্ত্র রূপ নিলে পাকিস্তান সরকার 1951 সালে টংক প্রথা বিলোপ করে। আইনের ইতিহাস থেকে বোঝা যায় দুই সংখ্যা কোথা থেকে এল: বিলটি প্রকাশিত হয়েছিল 31 মার্চ 1948, আইনের নামে সাল 1950, কিন্তু তাতে সম্মতি মেলে 16 মে 1951 (বাংলাপিডিয়া, আইন ভুক্তি)। আইনের বিভিন্ন অংশ আবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় চালু হয়েছে আলাদা আলাদা প্রজ্ঞাপনে — বর্তমান পাঠের ধারা 79 অনুযায়ী আইনের পঞ্চম খণ্ড কোন এলাকায় কবে চালু হবে, তা সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে ঠিক করবে। দুর্গাপুর-কলমাকান্দায় ঠিক কোন তারিখে আইনটি কার্যকর হয়েছিল, তা জানা যায়নি।
অর্থাৎ কেউ “1950” লিখলে আইনের নামের সাল বলছেন, “1951” লিখলে সম্মতির সাল। দুটোই উৎসে আছে।
একই 1950 সালের আইনের ধারা 97 হাজংদের জমির জন্য দ্বিতীয় একটি সুরক্ষা দেয়। ধারাটির শিরোনাম “Restriction on alienation of land by aboriginals”। এতে 21টি আদিবাসী জাতির নাম আছে, তার একটি “Hajangs”। এই জাতিগুলোর কোনো রায়ত অ-আদিবাসী কারও কাছে বিক্রি, দান বা উইলে জমি দিতে চাইলে আগে রাজস্ব কর্মকর্তার লিখিত অনুমতি লাগবে; না নিলে হস্তান্তর বাতিল।
ধারাটির তালিকা: সাঁওতাল, বানাই, ভূঁইয়া, ভূমিজ, ডালু, গারো, গোন্দ, হদি, হাজং, হো, খাড়িয়া, খারওয়ার, কোচ (ঢাকা বিভাগ), কোড়া, মগ (বাকেরগঞ্জ জেলা), মাল ও সাউরিয়া পাহাড়িয়া, মেচ, মুন্ডা, মুন্ডাই, ওরাওঁ ও তুরি। “Banais” নামটি যোগ হয় 1974 সালের সংশোধনী আইনে (Act No. LXI of 1974)। শর্তগুলো এরকম: অ-আদিবাসীর কাছে হস্তান্তর হতে হবে নিবন্ধিত দলিলে, এবং নিবন্ধনের আগেই রাজস্ব কর্মকর্তার লিখিত সম্মতি নিতে হবে; অন্য হস্তান্তর বৈধ কেবল তখন, যখন জমি যাচ্ছে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী আরেকজন আদিবাসীর কাছে; নিয়ম ভেঙে হস্তান্তর হলে তা বাতিল, আর কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে রাজস্ব কর্মকর্তা ক্রেতাকে উচ্ছেদ করতে পারেন (আইনের পাঠ, ধারা 97)।
বাংলাপিডিয়ার আইন ভুক্তি এর সঙ্গে আরেকটি তারিখ যোগ করে: 30 নভেম্বর 1955 তারিখের যে গেজেট প্রজ্ঞাপনে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়, সেই প্রজ্ঞাপনেই দেশের বিভিন্ন এলাকার আদিবাসীদের জমি অ-আদিবাসীর কাছে হস্তান্তরে রাজস্ব কর্তৃপক্ষের অনুমতির শর্ত রাখা হয়।
কাগজে সুরক্ষাটি শক্ত। কিন্তু ধারাটি কেবল হস্তান্তর আটকায় — বিক্রি, দান, উইল। মালিক দেশ ছেড়ে চলে গেলে, বা জমি জবরদখল হলে, ধারা 97 কোনো কাজে আসে না। পরের অংশটি ঠিক সেই ফাঁকের গল্প।
টংক উঠে যাওয়ার পরের দুই দশকে হাজংরা তিন ধাক্কায় জমি থেকে সরে যান: 1950-এর আশপাশে আন্দোলন দমনের সময়, 1964 সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়, আর 1971 সালের যুদ্ধে। যাঁরা ভারতে চলে যান, তাঁদের বেশির ভাগ আর ফেরেননি; ফেরত আসা অনেকে দেখেছেন জমি অন্যের দখলে। সঞ্জীব দ্রংয়ের হিসাবে দেশভাগের পর 90 শতাংশের বেশি হাজং দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
সুগত চাকমা লিখেছেন, 1950 সালেও হাজংদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়, পাকিস্তান সরকার কঠোর হাতে তা দমন করে, আর তাতে বহু হাজং ভারতে চলে যান (বাংলাদেশের উপজাতি, পৃ. 87)। চিররঞ্জন সরকারের লেখায় আছে, 1950 সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের আশ্বাসে সাধারণ হাজংরা ঘরে ফিরতে শুরু করেন, আর তাতে আন্দোলনে ভাটা পড়ে (bdnews24 মতামত, 2024)। ইংরেজি উইকিপিডিয়া আরও একধাপ বলে: পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল দেশত্যাগী হাজংদের “প্রায় সবাই” কমিউনিস্ট-সমর্থক, আর সেই দাবি দেখিয়ে তাঁদের ঘরবাড়ি ও জমি অধিগ্রহণ করে কম দামে ভারত থেকে আসা বাঙালি মুসলমান শরণার্থীদের কাছে বিক্রি করা হয় [যাচাই প্রয়োজন]। এই শেষ দাবিটির কোনো দ্বিতীয় উৎস পাওয়া যায়নি, আর উইকিপিডিয়া নিবন্ধেও এর তথ্যসূত্র স্পষ্ট নয়।
1964 সালের দাঙ্গার কথা তিনটি আলাদা ধরনের উৎসে আছে। চিররঞ্জন সরকার লিখেছেন, সে বছর হাজং গ্রামে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে হাজংরা দলে দলে ভারতে আশ্রয় নেন, আর সেই সুযোগে “সেটেলাররা” তাঁদের জমি-বাড়ি দখল করে নেয় — লেখকের দাবি, সরকারের ইন্ধনে। The Business Standard লিখেছে, 1964 সালে প্রায় 30,000 হাজং শরণার্থী ভারতে যান (Aunim Shams, TBS, 2025)। আর ভারতের দিকের হিসাব আমাদের ভারতের চাকমা লেখায় আছে: 1964 থেকে 1969 সালের মধ্যে 2,748টি পরিবারের 14,888 জন চাকমা ও হাজংকে তৎকালীন নেফায় (আজকের অরুণাচল প্রদেশ) পুনর্বাসন করা হয়। সেই লেখা স্পষ্ট করেছে, এই হাজংরা চাকমা নন, পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ অঞ্চলের আলাদা জনগোষ্ঠী, যাঁরা একই সময়ে ভারতে গিয়ে একই পুনর্বাসন-কর্মসূচিতে পড়েন — আর এ কারণেই ভারতের আইনি নথিতে “চাকমা ও হাজং” নাম দুটি প্রায় সবসময় একসঙ্গে আসে।
একটি পরিবারের হিসাবে ব্যাপারটি কেমন দাঁড়িয়েছিল, তার উদাহরণ কুমুদিনী হাজং। চিররঞ্জন সরকার লিখেছেন, 11–12 বছর বয়সে বিয়ের পর বাবার রেখে যাওয়া চার আড়া জমি (লেখকের হিসাবে 128 শতকে এক আড়া) আর বাড়ি বুঝিয়ে দিয়ে লংকেশ্বর হাজংকে ঘরজামাই করে নেওয়া হয়; 1964 সালে সেই জমিসহ বাড়িঘর দখলদারদের হাতে চলে যায়; 1971 সালে তাঁরা ভারতের বাঘমারা শিবিরে আশ্রয় নেন, আর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফিরে ভিটে ছাড়া কোনো জমি ফেরত পাননি। ঢাকা ট্রিবিউনকে কুমুদিনীর মেয়ে অঞ্জলি রায় বলেছেন, তাঁর বাবা হারানো জমি নিয়ে সালিশ বা মামলায় না যেতে পরিবারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন।
ঢাকা ট্রিবিউনকে কুমুদিনীর মেয়ে বলেছেন, 1947 ও 1971 সালের ঘটনা আর পরের রাজনৈতিক পালাবদলে তাঁদের সম্প্রদায়ের বহু মানুষকে নিজেদের জায়গা ছেড়ে অন্যত্র থিতু হতে হয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় দাবিটি আমাদের আর্কাইভে, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রংয়ের 2019 সালের একটি প্রবন্ধে: দেশভাগের পর বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে প্রায় 75 শতাংশ গারো ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন, আর হাজং, কোচ, বানাই, হদি, ডালুদের মতো ছোট জাতিগুলোর 90 শতাংশের বেশি মানুষ দেশ ছাড়েন — ঘরবাড়ি, জমি, ভিটেমাটি চিরতরে হারিয়ে। একই প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, একসময়ের প্রভাবশালী হাজং জাতি এখন “অদৃশ্যপ্রায়” (ভূমিই জীবন, ভূমিই পরিচয়, ভূমিই অস্তিত্বের প্রতীক)। SIL সমীক্ষা একটি পুরোনো সংবাদপত্র-প্রবন্ধ উদ্ধৃত করে একই কথা বলেছে — দেশভাগের পর জাতিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ভারতে চলে যায় — আর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে হাজংদের হিন্দুধর্মের কাছাকাছি বিশ্বাস।
এই তিন ধাক্কার পর টংক-বিলোপের লাভ কার ঘরে গেল, সেই প্রশ্নের সরাসরি কোনো জরিপ পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া যায় তা হলো ফলাফলের ছবি: 1951 সালে ময়মনসিংহে প্রায় 35 হাজার হাজং, 2022 সালে সারা দেশে 7,996 — আর 2025 সালের একটি প্রতিবেদনে লেখা, বেশির ভাগ হাজংয়ের নিজের জমি নেই।
উৎসে এর আভাস আছে, নিশ্চিত প্রমাণ নেই। কাপ্তাই বাঁধে ডুবে যাওয়া এলাকার দুজন চাকমা প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতিকথায় হাজংদের কথা এসেছে, SIL সমীক্ষা চট্টগ্রাম বিভাগে হাজং থাকার “অনিশ্চিত” খবরের কথা লিখেছে, আর 2022 সালের শুমারিতে চট্টগ্রাম বিভাগে হাজং গোনা হয়েছেন 45 জন। পার্বত্য চট্টগ্রামে হাজং বসতি কত বড় ছিল, কোনো উৎসে তার সংখ্যা পাওয়া যায়নি।
সমারী চাকমার সংকলন “কাপ্তাই বাঁধ: বর-পরং — ডুবুরীদের আত্মকথন” থেকে আমাদের আর্কাইভে আসা দুটি সাক্ষ্যে কথাটি আছে। লংগদুর সুষমা বালা চাকমার বয়ানে, বাঁধের পানিতে লক্ষ লক্ষ চাকমার সঙ্গে “কিছু হাজং, মার্মা আর কিছু পুরাতন বাঙালি অধিবাসীরাও” সব হারিয়েছেন, আর অর্ধলক্ষাধিক চাকমা, হাজং ও কিছু ত্রিপুরাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল (ডুবুরী থেকে শহীদ জননী — সুষমা বালা চাকমা)। পঞ্চ চাকমার বয়ানের টীকাতেও লেখা, অর্ধলক্ষেরও বেশি চাকমা আর হাজংকে দেশ ছেড়ে ভারতে যেতে হয়েছিল (চোখের পানি বাঁধের পানি যখন একাকার — পঞ্চ চাকমা)।
এখানে দুটি আলাদা ঘটনা জড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। কাপ্তাই বাঁধে ঘর হারানো মানুষের দেশত্যাগ আর ময়মনসিংহের হাজংদের দেশত্যাগ — দুটোই 1964 সালে, আর দুই দলই ভারতের একই পুনর্বাসন-কর্মসূচিতে পড়েছিল। ফলে “চাকমা ও হাজং” জোড়াটি সাক্ষ্যে এলে সব হাজংই পার্বত্য চট্টগ্রামের ছিলেন, এমন ধরে নেওয়া যায় না। ভারতের চাকমা লেখাটিতে নেফার হাজংদের ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষ বলেই চিহ্নিত করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগুলোর সামগ্রিক পরিচয়ের জন্য দেখতে পারেন আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব।
আজকের হাজংদের অবস্থা নিয়ে সব উৎস একই দিকে ইঙ্গিত করে: জমি কম, শিক্ষা পিছিয়ে, জীবিকা মূলত দিনমজুরি ও কৃষিকাজ। The Business Standard 2025 সালে লিখেছে, বেশির ভাগ হাজংয়ের নিজের জমি নেই, উচ্চশিক্ষা প্রায় নাগালের বাইরে, নারী-পুরুষ দুজনেই মূলত দিনমজুর বা খেতমজুর।
পুরোনো উৎসের সঙ্গে মেলালে পরিবর্তনের রেখাটা দেখা যায়। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, দেশভাগের আগে ময়মনসিংহে হাজংরা চাষাবাদ করে স্বনির্ভর ছিলেন; এখন আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। সুগত চাকমা 1985 সালের বইয়ে লিখেছিলেন, দেশে থেকে যাওয়া হাজংদের জমিজমা খুব একটা নেই, আর 1982 সাল পর্যন্ত মাত্র 2 জন হাজং বি.এ. পাস করেছিলেন, সে বছর কলেজে পড়ছিলেন আরও 8 জন। SIL-এর 2005 সালের মাঠকাজের বর্ণনায় আছে, অনেকে গ্রামের কাছের খেতে দিনমজুরি করেন, কেউ কেউ নিজের জমি চাষ করেন, আর কেউ সীমান্তের পাহাড় থেকে কাঠ কুড়িয়ে বাজারে বেচেন — ভারী কাঠের গাড়ি টেনে দূরের হাট পর্যন্ত। সাক্ষরতা নিয়ে বাংলাপিডিয়ার দুই ভাষার ভুক্তিতে দুই সংখ্যা: বাংলায় প্রায় 30%, ইংরেজিতে মাত্র 3%।
পুরোনো জীবিকার কিছু চিহ্ন এখনো আছে। পাভেল পার্থ লিখেছেন, হাজংদের “বানা” তাঁতে বোনা কাপড় দেশের আদিবাসী বস্ত্রশিল্পের একটি ধারা, আর নেত্রকোনা-শেরপুরের সীমান্তে মান্দি, কোচ ও হাজংরা এখনো সুগন্ধী জুমধান আবাদ করেন। বাংলাপিডিয়া হাজং নারীদের ডোরাকাটা পোশাক “পাথিন”, শীতের চাদর “আর্গন”, আর আমন রোপণের সময়ের কোমরবন্ধ “বানং”-এর কথা লিখেছে।
আর স্মৃতির জায়গায় আছে টংক। বহেরাতলীর রাশিমণি স্মৃতিসৌধে প্রতি বছরের অনুষ্ঠানে বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির পরিচালক সুজন হাজং 2025 সালে বলেছেন, হাজংরা রাশিমণিকে নিজেদের জনগোষ্ঠীর মাতা আর শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক মনে করেন। টংক আন্দোলনের শেষ জীবিত সংগ্রামী হিসেবে পরিচিত কুমুদিনী হাজং মারা যান 23 মার্চ 2024, বহেরাতলীতে নিজের বাড়িতে; তাঁর বয়স নিয়ে প্রতিবেদনগুলো একমত নয় — দ্য ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে 92, ঢাকা ট্রিবিউন 94। 1971 সালের মুক্তিযুদ্ধেও হাজংরা ছিলেন: আমাদের আর্কাইভের চারু হকের লেখা অনুযায়ী ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর ও নেত্রকোনার গারো, হাজং, কোচ, ডালু প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর প্রায় 1,500 মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন (মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী: মহাকাব্যের অগ্রন্থিত কবিতা)। পাশের জনগোষ্ঠী গারোদের ইতিহাস জানতে দেখতে পারেন আমাদের গারো ইতিহাস ও সংস্কৃতি লেখাটি।
হাজংরা বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি আদিবাসী চাষি জাতি, নিজস্ব হাজং ভাষা ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নিয়ে। বাংলাদেশে তাঁরা মূলত গারো পাহাড়-সংলগ্ন সীমান্তের সমতলে থাকেন। ধর্মে হিন্দু, তবে নিজস্ব দেবদেবী আছে। 1950 সালের প্রজাস্বত্ব আইনের ধারা 97-এ এবং 2010 ও 2019 সালের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তালিকায় হাজংদের নাম আছে।
বাংলাদেশে হাজংরা থাকেন মেঘালয় সীমান্ত বরাবর — নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া, শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী, আর সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও ধর্মপাশায়। 2022 সালের শুমারিতে 76% হাজং ময়মনসিংহ বিভাগে, 19% সিলেট বিভাগে। বেশির ভাগ হাজং অবশ্য ভারতে, মেঘালয় ও আসামে থাকেন।
BBS-এর জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022-এর জাতীয় প্রতিবেদনের Table P29 অনুযায়ী বাংলাদেশে হাজং 7,996 জন — পুরুষ 3,814, নারী 4,182। ময়মনসিংহ বিভাগে 6,068, সিলেটে 1,528, ঢাকায় 302, চট্টগ্রামে 45। 50টি তালিকাভুক্ত জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যায় হাজংরা 21তম। 1951 সালে শুধু ময়মনসিংহ জেলাতেই হাজং ছিলেন প্রায় 35 হাজার।
ভাষার নাম হাজং। এখন একে ইন্দো-আর্য পরিবারের ভাষা ধরা হয়, আগে টিবেটো-বর্মন পরিবারে রাখা হতো। নিজস্ব বর্ণমালা নেই; বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী লেখা হয় অসমীয়া হরফে। SIL-এর 2005 সালের সমীক্ষায় বাংলাদেশ ও ভারতের হাজংয়ের শব্দ-মিল 74–85%, আর বাংলাদেশের ভেতরে 92–96% পাওয়া গেছে — অর্থাৎ দুই দেশে একটিই ভাষা।
টংক ছিল উত্তর ময়মনসিংহের একটি খাজনা-ব্যবস্থা, যেখানে জমির খাজনা টাকায় নয়, নির্দিষ্ট পরিমাণ ধানে দিতে হতো। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে প্রতি সোয়া একরে বছরে 10 থেকে 15 মণ ধান, যা নগদ খাজনার দ্বিগুণেরও বেশি। ফসল না হলেও ধান দিতে হতো। জমিদারেরা টংক-চাষিকে সাধারণ রায়ত বলে মানতেন না, ফলে জমিতে তাঁদের স্থায়ী স্বত্বও ছিল না।
টংক আন্দোলন সংগঠিত করেন কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহ, যিনি নিজে সুসং-দুর্গাপুরের জমিদারদের সঙ্গে যুক্ত পরিবারের মানুষ। বাংলাপিডিয়ার মণি সিংহ ভুক্তি অনুযায়ী তিনি 1937 সালের নভেম্বরে জেল থেকে ফিরে কৃষকদের সংগঠিত করেন; একই বিশ্বকোষের টংক ভুক্তিতে আন্দোলনের সময় 1946–50। আন্দোলনের প্রধান শক্তি ছিলেন হাজং ও গারো চাষিরা, কারণ টংক-এলাকার জমি তাঁরাই চাষ করতেন।
দুটি সালই উৎসে আছে। বাংলাপিডিয়ার টংক ভুক্তি বলছে, পূর্ববঙ্গ রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950-এ টংক-চাষিরা জমির মালিকানা পান; মণি সিংহ ভুক্তি বলছে, সরকার 1951 সালে টংক বিলোপ করে। আইনের নামে সাল 1950, কিন্তু এতে সম্মতি মেলে 16 মে 1951। আইনের ধারা 24(4) ধানে-দেওয়া খাজনাকে টাকায় রূপান্তরের নির্দেশ দেয়।
রাশিমণি হাজং টংক আন্দোলনের প্রথম শহীদ হিসেবে পরিচিত, নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বহেরাতলী গ্রামের মানুষ। পুলিশ কুমুদিনী হাজংকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি গ্রামবাসীকে নিয়ে বাধা দেন এবং গুলিতে নিহত হন। bdnews24 তারিখটি 31 জানুয়ারি 1946 বলেছে, দ্য ডেইলি স্টারের 2010 সালের লেখা 31 ডিসেম্বর 1946। হাজংরা প্রতি বছর 31 জানুয়ারি বহেরাতলীর স্মৃতিসৌধে দিনটি পালন করেন।
হাতিখেদা ছিল জমিদারদের জন্য জোর করে বুনো হাতি ধরানোর বিরুদ্ধে হাজংদের বিদ্রোহ, বাংলাপিডিয়ার মতে হাজংদের প্রথম আন্দোলন। সুগত চাকমা লিখেছেন, এটি চলে 1893 থেকে 1899 পর্যন্ত, আর স্থানীয় রাজা হাজং সর্দারদের কিছু তালুক ছেড়ে দিয়ে বিদ্রোহ থামান। ঢাকা ট্রিবিউন একে আঠারো শতকের শেষ ভাগের ঘটনা বলেছে।
প্রধান কারণ দেশত্যাগ। সুগত চাকমা লিখেছেন, 1950 সালে পাকিস্তান সরকার হাজংদের অসন্তোষ কঠোরভাবে দমন করলে বহু হাজং ভারতে চলে যান। 1964 সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আরেক দফা দেশত্যাগ হয়; The Business Standard-এর হিসাবে সে বছর প্রায় 30,000 হাজং ভারতে যান। সঞ্জীব দ্রং লিখেছেন, দেশভাগের পর 90 শতাংশের বেশি হাজং দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
কাগজে সুরক্ষিত। 1950 সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ধারা 97-এ “Hajangs”-সহ 21টি আদিবাসী জাতির নাম আছে। এঁদের কেউ অ-আদিবাসীর কাছে জমি বিক্রি, দান বা উইল করতে চাইলে রাজস্ব কর্মকর্তার লিখিত অনুমতি লাগে; না নিলে হস্তান্তর বাতিল। তবে ধারাটি কেবল হস্তান্তর আটকায় — দেশত্যাগ বা জবরদখলে জমি হারালে এটি কাজে আসে না।
নিশ্চিত প্রমাণ নেই, আভাস আছে। কাপ্তাই বাঁধে ঘর হারানো দুজন চাকমা প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতিকথায় চাকমাদের সঙ্গে হাজংদেরও দেশ ছাড়ার কথা আছে, আর SIL সমীক্ষা চট্টগ্রাম বিভাগে হাজং থাকার অনিশ্চিত খবরের কথা লিখেছে। 2022 সালের শুমারিতে চট্টগ্রাম বিভাগে 45 জন হাজং গোনা হয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে হাজং বসতির আকার কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
প্রাথমিক উৎস — জুমজার্নালের নিজস্ব সংগ্রহ
সরকারি নথি ও আইন
বিশ্বকোষ ও গবেষণা
সংবাদমাধ্যম
সর্বশেষ হালনাগাদ: 16 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী, ভূমি অধিকার, হাজং বিদ্রোহ
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।