Jumjournal Logo

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে আবেদন করবেন কীভাবে

Last updated Oct 6th, 2026

0

পাহাড়ের চূড়া থেকে তোলা প্রশস্ত দৃশ্য — সামনে ঘাস ও ঝোপে ঢাকা ঢাল, নিচের উপত্যকায় ছড়ানো কয়েকটি ঘরের একটি ছোট পাড়া, দূরে সারি সারি নীলচে পাহাড় আর আকাশজুড়ে মেঘ

পার্বত্য চট্টগ্রামে জমি হারানোর অভিযোগ নিয়ে যাওয়ার জন্য আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান আছে — পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন। আইনটি ২০০১ সালের, কিন্তু কীভাবে আবেদন করতে হয় সেই প্রশ্নের সোজা উত্তর ইন্টারনেটে প্রায় নেই — আছে কেবল আইনের কাঁচা পাঠ আর সংবাদ।

এই লেখাটি আইনের মূল পাঠ ধরে ধাপগুলো সাজিয়েছে। প্রতিটি ধাপের পাশে ধারার নম্বর দেওয়া, যাতে মিলিয়ে নেওয়া যায়।

সংক্ষেপে। দরখাস্ত সাদা কাগজে, বাংলায়, দস্তখত বা টিপসই দিয়ে — নির্ধারিত ফরম, স্ট্যাম্প বা আইনজীবীর বাধ্যবাধকতা আইনে নেই। প্রতিপক্ষ হিসেবে তিনজনের নাম দিতে হয়, যাঁদের একজন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক। কমিশন সাক্ষ্য আইন মানতে বাধ্য নয়, আর বাংলা না জানলে অনুবাদকের ব্যবস্থা আছে। সিদ্ধান্ত হয় লিখিতভাবে, দেওয়ানি আদালতের ডিক্রির মর্যাদায় — এবং তার বিরুদ্ধে আপিল নেই।

যে দাবিগুলো কমিশনে চলবে না

আবেদন লেখার আগে জেনে নেওয়া দরকার কোন বিষয়গুলো কমিশনের এখতিয়ারের বাইরে, কারণ ভুল জায়গায় আবেদন করলে সময় ও পরিশ্রম দুটোই নষ্ট হয়।

এলাকার সীমা। ৬(২) ধারা স্পষ্ট — কমিশনের কার্যাবলী পার্বত্য চট্টগ্রামে সীমিত থাকবে। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের বাইরের কোনো জমি এর আওতায় নয়। ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’ ও ‘পার্বত্য জেলা’ — দুটিরই সংজ্ঞা ২ ধারায় এই তিন জেলা ধরে দেওয়া।

বিষয়ের সীমা। ৬(১) ধারায় তিন ধরনের কাজ — পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি-বিরোধ, অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল সংক্রান্ত বিরোধ, এবং স্বত্ব নির্ধারণ ও দখল পুনর্বহাল। ভূমি-বিরোধের বাইরের কোনো বিষয় এতে নেই।

শরণার্থী-পরিচয়ের সীমা। প্রথম ধরনটির জন্য ‘পুনর্বাসিত শরণার্থী’ হতে হয়, আর তার সংজ্ঞা ৯ মার্চ ১৯৯৭-এর আগরতলা চুক্তির তালিকা ধরে। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধরনে এই শর্ত নেই — অবৈধ বন্দোবস্ত বা বেদখলের অভিযোগ যে কেউ আনতে পারেন।

এলাকাভিত্তিক ব্যতিক্রম। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকায় ৬(১)(গ) ধারার বাতিল-ক্ষমতা সীমিত, যদিও বসতবাড়িসহ জলেভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় সেই সীমার বাইরে।

সময়ের সীমা। ‘প্রচলিত আইন’-এর সংজ্ঞা ২০০১ সালের আগে প্রচলিত আইন, ঐতিহ্য, বিধি ও প্রজ্ঞাপনে বাঁধা। এর পরে তৈরি কোনো নিয়ম এই মাপকাঠিতে নেই।

একটি বিষয় আইনে সরাসরি নেই বলে এখানে অনুমান করা হচ্ছে না — ক্ষতিপূরণ। ৬(১) ধারার ভাষায় কমিশনের কাজ স্বত্ব নির্ধারণ, বন্দোবস্ত বাতিল ও দখল পুনর্বহাল; আর্থিক ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের কথা ধারাটিতে নেই। ক্ষতিপূরণের দাবি কমিশনে চলে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর এই পাঠ থেকে দেওয়া যায় না। [যাচাই প্রয়োজন]

পুরো পথটা এক নজরে

বিস্তারিতে যাওয়ার আগে ধাপগুলো পাশাপাশি সাজিয়ে দেওয়া হলো। প্রতিটি ধাপের পাশে ধারার নম্বর, যাতে মিলিয়ে নেওয়া যায়।

ধাপকী করতে হয় / কী ঘটেধারা
১দেখে নিন আপনার বিরোধ কমিশনের আওতায় পড়ে কি না — পুনর্বাসিত শরণার্থীর ভূমি, অবৈধ বন্দোবস্ত, বা বেদখল৬(১)
২সাদা কাগজে, বাংলা ভাষায় দরখাস্ত লিখুন; দস্তখত বা টিপসই দিন৯(১)
৩প্রতিপক্ষ হিসেবে তিন পক্ষের নাম-ঠিকানা লিখুন — জেলা প্রশাসক, অবৈধ বন্দোবস্ত গ্রহীতা, বর্তমান দখলকার১০(১)
৪কমিশনের কাছে দাখিল করুন৯(১)
৫কমিশন প্রতিপক্ষদের উপর নোটিশ জারি করে, সঙ্গে আবেদনের কপি১০(২)
৬তালিকার বাইরের কেউ কারণ দেখিয়ে প্রতিপক্ষ হওয়ার আবেদন করতে পারেন১০(৩)
৭ভুল থাকলে একবার আবেদন সংশোধনের সুযোগ৯(২)
৮সাক্ষ্যগ্রহণ — সাক্ষ্য আইন মানতে বাধ্য নয়; অন্য ভাষায় সাক্ষ্য দিলে অনুবাদক১১
৯প্রয়োজনে সরেজমিন পরিদর্শন; সরকারি সংস্থাকে কাগজ বা জরিপ-প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ৬(৩), ৬(৪)
১০সিদ্ধান্ত — সর্বসম্মতিতে, না হলে চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে; লিখিতভাবে৭(৫), ৭(৬)
১১সিদ্ধান্ত দেওয়ানি আদালতের ডিক্রি হিসেবে বাস্তবায়িত হয়১৭
১২আপিল বা রিভিশনের সুযোগ নেই১৬

ছকটি দেখলে দুটি জিনিস চোখে পড়ে। শুরুর ধাপগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে সহজ — কাগজ, ভাষা, টিপসই, আইনজীবীর বাধ্যবাধকতা না থাকা। আর শেষ ধাপটি ইচ্ছাকৃতভাবে চূড়ান্ত।

কমিশনে কারা বসেন

আবেদন কার কাছে যাচ্ছে, সেটা জানা থাকলে বাকি সবকিছু বোঝা সহজ হয়। ৩(২) ধারায় কমিশনের গঠন পাঁচ সদস্যের:

সদস্যকীভাবে আসেন
চেয়ারম্যান — বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিসরকার কর্তৃক নিযুক্ত
আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বা তাঁর মনোনীত ওই পরিষদের একজন সদস্যপরিষদ থেকে
সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানপদাধিকারবলে
সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ বা তাঁর মনোনীত একজন প্রতিনিধিসার্কেল থেকে
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার বা তাঁর মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারপ্রশাসন থেকে

‘সংশ্লিষ্ট’ শব্দটির অর্থ আইনেই ব্যাখ্যা করা আছে: বিরোধীয় ভূমি যে পার্বত্য জেলা ও যে সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত, সেই জেলা ও সেই সার্কেল। অর্থাৎ কমিশনের গঠন প্রতিটি মামলার সঙ্গে বদলায় — বান্দরবানের জমি নিয়ে বিরোধ হলে বোমাং চীফ ও বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বসেন, রাঙ্গামাটির ক্ষেত্রে চাকমা চীফ ও রাঙ্গামাটির চেয়ারম্যান।

২(ঠ) ধারায় ‘সার্কেল চীফ’-এর সংজ্ঞাও দেওয়া — চাকমা চীফ, বোমাং চীফ বা মং চীফ।

হিসাবটা কেন গুরুত্বপূর্ণ

পাঁচজনের মধ্যে তিনজন — আঞ্চলিক পরিষদের প্রতিনিধি, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ও সার্কেল চীফ — পার্বত্য চট্টগ্রামের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আসেন। বাকি দুজন সরকারের দিক থেকে: চেয়ারম্যান, যিনি সরকার কর্তৃক নিযুক্ত, এবং বিভাগীয় কমিশনার।

এই হিসাবটিই সিদ্ধান্ত-গ্রহণের নিয়মকে এত বিতর্কিত করে তুলেছিল। সর্বসম্মতি লাগলে যেকোনো একজন সদস্য কার্যত ভেটো দিতে পারতেন; সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সিদ্ধান্ত হলে তিন-দুই ভাগ হয়ে যায়।

চেয়ারম্যানকে সরানো যায়

৩(৫) ধারা অনুযায়ী সরকার সন্তুষ্ট হলে যে চেয়ারম্যান গুরুতর অসদাচরণ কিংবা শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতার কারণে পদে বহাল থাকার অযোগ্য হয়ে পড়েছেন, তবে যেকোনো সময় তাঁকে অপসারণ করতে পারে।

একটিই সুরক্ষা: শুনানির যুক্তিসংগত সুযোগ না দিয়ে অপসারণ করা যাবে না। চেয়ারম্যান নিজেও সরকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে পদত্যাগ করতে পারেন (৩(৪))।

চাকরির শর্তাবলীও নির্ধারণ করে সরকার (৩(৩))। অন্য চার সদস্য পদাধিকারবলে বা মনোনয়নে আসেন, তাই তাঁদের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয়।

মেয়াদ, কার্যালয় ও লোকবল

মেয়াদ তিন বছর, গণনা শুরু চেয়ারম্যান নিয়োগের তারিখ থেকে (৫ ধারা)। তবে সরকার আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে মেয়াদ বাড়াতে পারে — এবং কতবার বাড়ানো যাবে, তার কোনো সীমা ধারাটিতে নেই।

প্রধান কার্যালয় খাগড়াছড়ি জেলা সদরে (৪(১))। সরকার প্রয়োজনবোধে যেকোনো পার্বত্য জেলাসহ অন্য কোনো স্থানে শাখা কার্যালয় স্থাপন করতে পারে (৪(২))।

কমিশনের একজন সচিব থাকবেন, নিযুক্ত হবেন আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ সরকারের উপ-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে, সরকার কর্তৃক (১৩(১))।

১৩(৩) ধারায় একটি নির্দিষ্ট নিয়োগনীতি আছে: সচিবসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী পদে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দিয়ে স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগ করা হবে।

টাকার দিকটি সরল — সরকার থোক বরাদ্দ হিসেবে প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করবে, আর কমিশন সেই বছরের আর্থিক বিবরণ সরকারের কাছে পাঠাবে (১৪(১))। কমিশনের নিজস্ব কোনো তহবিল বা আয়ের উৎস আইনে দেওয়া হয়নি।

হিসাব নিরীক্ষা করেন বাংলাদেশের মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, প্রতি বছর, আর রিপোর্টের অনুলিপি যায় সরকার ও কমিশন দুই জায়গায় (১৫(১))। নিরীক্ষার জন্য তিনি কমিশনের সব রেকর্ড, দলিল, নগদ বা ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, জামানত ও সম্পত্তি পরীক্ষা করতে এবং যেকোনো সদস্য, কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন (১৫(২))।

কমিশন কোন ধরনের বিরোধ দেখে

আইনের ৬(১) ধারা অনুযায়ী কমিশনের কাজ তিন ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি — পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ, অবৈধ বন্দোবস্ত, এবং বেদখল হওয়া ভূমি। নিষ্পত্তি হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী।

এই শেষ শর্তটি গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন কেবল দলিল দেখে না — প্রথা ও রীতিও বিবেচনায় নেয়। যেখানে জুমভূমির কাগুজে স্বত্ব নেই, সেখানে এই ধারাটিই ভরসা।

একই ধারায় বলা আছে, আবেদনে উল্লিখিত ভূমিতে আবেদনকারী বা প্রতিপক্ষের স্বত্ব বা অন্য অধিকার আছে কি না, সেটিও কমিশন নির্ধারণ করবে — একই প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতির ভিত্তিতে।

‘প্রচলিত আইন’ বলতে আইন কী বোঝে

নিষ্পত্তির মাপকাঠি যেহেতু ‘প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি’, সেই শব্দটির সংজ্ঞা জানা জরুরি। ২(ছ) ধারায় তা দেওয়া আছে, এবং সংজ্ঞাটি অস্বাভাবিক রকমের বিস্তৃত:

“প্রচলিত আইন” বলিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে এই আইন বলবৎ হইবার পূর্বে যে সমস্ত আইন, ঐতিহ্য, বিধি, প্রজ্ঞাপন প্রচলিত ছিল কেবলমাত্র সেইগুলিকে বুঝাইবে।

ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১, ধারা ২(ছ)

চারটি শব্দের তালিকায় ‘ঐতিহ্য’ আছে — অর্থাৎ অলিখিত প্রথাও কমিশনের বিচারের ভিত্তি হতে পারে। ২০০১ সালের একটি আইনে এটি বড় স্বীকৃতি, কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমির বহু অধিকার কখনো কাগজে ওঠেনি।

তবে সীমাটিও ভাষাতেই: “এই আইন বলবৎ হইবার পূর্বে যে সমস্ত… প্রচলিত ছিল কেবলমাত্র সেইগুলিকে”। অর্থাৎ ২০০১ সালের পরে তৈরি হওয়া কোনো নিয়ম এই সংজ্ঞার বাইরে।

‘পুনর্বাসিত শরণার্থী’ কারা

কমিশনের প্রথম কাজটি পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি। এই শব্দটিও সংজ্ঞায়িত, এবং সংজ্ঞাটি একটি নির্দিষ্ট তালিকার দিকে নির্দেশ করে।

২(চ) ধারা অনুযায়ী পুনর্বাসিত শরণার্থী অর্থ ৯ই মার্চ ১৯৯৭ তারিখে ভারতের আগরতলায় সরকারের সঙ্গে উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সম্পাদিত চুক্তির আওতায় তালিকাভুক্ত শরণার্থী।

এই আগরতলা চুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির নয় মাস আগের, এবং চুক্তির (ঘ) খণ্ডেও এর উল্লেখ আছে — সেখানে বলা হয়েছে ওই চুক্তি অনুযায়ী ২৮ মার্চ ১৯৯৭ থেকে শরণার্থীরা দেশে ফিরতে শুরু করেন।

ফলে একটি ব্যবহারিক প্রশ্ন দাঁড়ায়: যিনি ওই তালিকায় নেই কিন্তু জমি হারিয়েছেন, তিনি ৬(১)(ক) ধারার প্রথম অংশের আওতায় পড়েন না। তবে একই ধারার বাকি অংশ — অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ — শরণার্থী-পরিচয়ের শর্ত ছাড়াই প্রযোজ্য।

‘ভূমি’ শব্দটিরও সংজ্ঞা আছে (২(ঝ)): পার্বত্য জেলাধীন পাহাড় এবং জলে ভাসাসহ সমুদয় জমি।

কাপ্তাই ও বেতবুনিয়া: যে দুটি এলাকা বাদ

৬(১)(গ) ধারা কমিশনকে একটি শক্ত ক্ষমতা দিয়েছে — প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে জলেভাসা ভূমিসহ কোনো ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া বা বেদখল করা হয়ে থাকলে তা বাতিল করা, এবং বৈধ মালিক বেদখল হয়ে থাকলে তাঁর দখল পুনর্বহাল করা।

কিন্তু ধারাটির শেষে একটি শর্ত যোগ করা আছে, আর সেই শর্তটি দুটি নির্দিষ্ট এলাকাকে আওতার বাইরে রাখে:

“তবে শর্ত থাকে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং বসতবাড়ীসহ জলেভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় ব্যতীত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা ও বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকার ক্ষেত্রে এই উপ-ধারা প্রযোজ্য হইবে না।”

ধারা ৬(১)(গ)-এর শর্তাংশ

শর্তাংশটি জটিল ভাষায় লেখা, তাই ভেঙে পড়া দরকার। কাপ্তাই ও বেতবুনিয়া এলাকায় ৬(১)(গ) ধারার বাতিল-ক্ষমতা সাধারণভাবে প্রযোজ্য নয়। তবে ব্যতিক্রমের ভেতরেও ব্যতিক্রম আছে — প্রচলিত আইন অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত ভূমি, এবং বসতবাড়িসহ জলেভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় — এগুলো শর্তাংশের বাইরে, অর্থাৎ সেখানে ধারাটি চলে।

এই দুটি এলাকা কেন আলাদা, তা বোঝা কঠিন নয়। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র — দুটিই রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, এবং কাপ্তাই বাঁধের কারণে বিপুল ভূমি স্থায়ীভাবে ডুবে গেছে।

শর্তাংশটির ব্যবহারিক পরিণতি কী — অর্থাৎ কাপ্তাই এলাকার কোন ধরনের দাবি এখনো কমিশনে চলে আর কোনটি চলে না — তার কোনো ব্যাখ্যামূলক নজির বা রায় এই কাজে পাওয়া যায়নি। [যাচাই প্রয়োজন]

খেয়াল রাখা দরকার, শর্তাংশটি কেবল ৬(১)(গ) ধারার জন্য — ৬(১)(ক) ও ৬(১)(খ) ধারায় এমন কোনো এলাকাভিত্তিক ব্যতিক্রম লেখা নেই।

ভূমি-খতিয়ান (পার্বত্য চট্টগ্রাম) অধ্যাদেশ। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ

আবেদন কীভাবে লিখতে হয়

৯(১) ধারা এখানে অস্বাভাবিক রকম সহজ। দরখাস্ত লিখতে হবে সাদা কাগজে, বাংলা ভাষায়, আবেদনকারীর দস্তখত বা টিপসই সহ, আর তা কমিশনের কাছে দাখিল করতে হবে। নির্ধারিত কোনো ফরম, স্ট্যাম্প বা আইনজীবীর বাধ্যবাধকতার কথা ধারাটিতে নেই।

তিনটি শর্তের প্রতিটিই লক্ষ করার মতো। সাদা কাগজ মানে নির্ধারিত কোনো ফরম কিনতে হয় না, তাই ফরম না পাওয়ার অজুহাতে কেউ আটকে যান না। বাংলা ভাষা মানে ইংরেজিতে আইনি খসড়া তৈরির দরকার নেই। আর দস্তখত বা টিপসই মানে সইয়ের অক্ষমতা কোনো বাধা নয়।

ধারাটিতে যা নেই, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ — কোর্ট ফি, স্ট্যাম্প, হলফনামা বা আইনজীবীর মাধ্যমে দাখিলের কোনো শর্ত এখানে লেখা নেই। ১৮ ধারার অধীনে প্রণীত বিধিতে এমন কোনো শর্ত যোগ হয়েছে কি না, তা আলাদা বিষয়। [যাচাই প্রয়োজন]

টিপসইয়ের উল্লেখ আকস্মিক নয় — যাঁরা লিখতে জানেন না, আইনটি তাঁদের কথাও ধরে রেখেছে।

একবার সংশোধনের সুযোগ আছে। ৯(২) ধারা অনুযায়ী কমিশন আবেদন নিষ্পত্তির আগে যেকোনো সময়, ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং কমিশনের অনুমতি সাপেক্ষে, আবেদনকারী তাঁর আবেদন একবার সংশোধন করতে পারবেন।

প্রতিপক্ষ হিসেবে কাদের নাম দিতে হবে

১০(১) ধারা অনুযায়ী প্রতিটি আবেদনে প্রতিপক্ষ হিসেবে তিন পক্ষের নাম ও ঠিকানা থাকতেই হবে:

  1. সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক
  2. অবৈধ বন্দোবস্ত গ্রহীতা
  3. দাবিকৃত ভূমির বর্তমান দখলকার — আবেদনকারীর জানামতে

এই তালিকাটি না মানলে আবেদন অসম্পূর্ণ থাকে। বিশেষ করে জেলা প্রশাসকের নাম বাদ দেওয়া যায় না — রাষ্ট্র নিজেই এখানে একটি পক্ষ।

কমিশন এরপর প্রতিপক্ষ সবার উপর নোটিশ জারি করে, আর নোটিশের সঙ্গে আবেদনপত্রের একটি কপিও যুক্ত করে দেয় (১০(২))। অর্থাৎ প্রতিপক্ষ জানতে পারেন তাঁর বিরুদ্ধে ঠিক কী বলা হয়েছে।

তালিকায় নাম নেই এমন কেউও কারণ দেখিয়ে প্রতিপক্ষ হওয়ার আবেদন করতে পারেন, আর কমিশন সেই আবেদন বিবেচনা করে (১০(৩))।

কমিশন কী কী করতে পারে

কমিশনের ক্ষমতা কেবল কাগজপত্র দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ৭(৪) ধারা অনুযায়ী কমিশন, চেয়ারম্যান, বা কমিশনের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো সদস্য বিরোধীয় ভূমি সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারেন।

সিদ্ধান্ত হয় আলোচনার ভিত্তিতে। ৭(৫) ধারা বলছে চেয়ারম্যান উপস্থিত সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন; সর্বসম্মত হওয়া সম্ভব না হলে চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে।

আর ৭(৬) ধারা অনুযায়ী কমিশনের সব সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে দিতে হবে — মৌখিক নিষ্পত্তি চলে না।

সিদ্ধান্তের নিয়মটি লক্ষ করার মতো, কারণ এটি আইনের মূল পাঠে ছিল না। bdlaws-এ প্রকাশিত পাঠে ‘চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গৃহীত সিদ্ধান্ত’ অংশটি বর্গাকার বন্ধনীতে চিহ্নিত — অর্থাৎ পরবর্তী সংশোধনীতে যুক্ত। মূল ব্যবস্থায় সর্বসম্মতি ছাড়া নিষ্পত্তি হতো না।

কেন এই একটি বাক্য এত বিতর্কিত ছিল

পাঁচ সদস্যের হিসাবটি আগে দেখা হয়েছে — তিনজন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠান থেকে, দুজন সরকারের দিক থেকে। এই হিসাবের সঙ্গে সিদ্ধান্তের নিয়ম মিলিয়ে পড়লে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়।

সর্বসম্মতির নিয়মে যেকোনো একজন সদস্য দ্বিমত করলে সিদ্ধান্ত হয় না। অর্থাৎ পাঁচজনের প্রত্যেকের হাতে কার্যত একটি ভেটো — চেয়ারম্যানের, বিভাগীয় কমিশনারের, সার্কেল চীফের, সবার।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়মে হিসাবটি বদলে যায়। কোরামে চেয়ারম্যানসহ অন্তত চারজন থাকতে হয়, আর সিদ্ধান্ত হয় চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে।

একই আইনে দুটি ব্যবস্থা পরপর থাকায় বোঝা যায় এটি কোনো কারিগরি খুঁটিনাটি নয় — কার হাতে শেষ কথা থাকবে, সেই প্রশ্নেরই দুই উত্তর। bdlaws-এর পাঠে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অংশটি ও কোরামের ‘অপর তিনজন সদস্যের’ অংশটি দুটোই বন্ধনীতে চিহ্নিত, অর্থাৎ দুটোই পরে যুক্ত হয়েছে।

সংশোধনী কোন সালে এবং কোন প্রজ্ঞাপনে হয়েছে, তা এই কাজে আলাদা করে যাচাই করা হয়নি। [যাচাই প্রয়োজন]

কোরাম ও বৈঠকের নিয়ম

বৈঠকের স্থান, তারিখ ও সময় নির্ধারণ করেন সচিব, চেয়ারম্যানের নির্দেশে, এবং সদস্যদের লিখিতভাবে জানাতে হয় (৭(২))।

কোরামের জন্য চেয়ারম্যান এবং আরও তিনজন সদস্যের উপস্থিতি লাগে (৭(৩)) — অর্থাৎ পাঁচজনের মধ্যে অন্তত চারজন। চেয়ারম্যান সব বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। এখানেও ‘অপর তিনজন সদস্যের’ অংশটি বন্ধনীতে চিহ্নিত, অর্থাৎ সংশোধিত।

৭(৪) ধারায় একটি ধারাবাহিকতার বিধান: কোনো বৈঠকে বিবেচিত বিষয় অনিষ্পন্ন থাকলে তা পরবর্তী যেকোনো বৈঠকে নিষ্পত্তি করা যাবে, আর আগের বৈঠকে উপস্থিত কোনো সদস্যের অনুপস্থিতির কারণে নিষ্পত্তি বন্ধ থাকবে না বা কার্যক্রম অবৈধ হবে না। শর্ত একটাই — এমন ক্ষেত্রে সব সদস্যকে বৈঠকের আগে নোটিশ দিতে হবে (এই শর্তটিও সংশোধনীতে যুক্ত)।

সাক্ষ্যগ্রহণে কমিশন কোন নিয়ম মানে

১১ ধারাটি এই আইনের সবচেয়ে ব্যবহারিক অংশ, বিশেষত যাঁরা প্রচলিত আদালতে যেতে ভরসা পান না তাঁদের জন্য।

সাক্ষ্য আইন মানতে বাধ্য নয়

১১(১) অনুযায়ী কমিশন Evidence Act, 1872-এর বিধানাবলী অনুসরণে বাধ্য নয়। বরং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি অনুসারে কমিশন যেভাবে যথাযথ মনে করে, সেভাবেই সাক্ষ্য গ্রহণ ও লিপিবদ্ধ করতে পারে।

এর তাৎপর্য বড়। দেওয়ানি আদালতে দলিলের প্রমাণমূল্য, শোনা কথার অগ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি কঠোর নিয়ম মানতে হয়। যেখানে জমির কাগজ নেই কিন্তু গ্রামের প্রবীণরা জানেন কার জমি কোনটি, সেখানে এই শিথিলতাই ভরসা।

নিজের ভাষায় সাক্ষ্য দেওয়া যায়

১১(২) ধারায় একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা আছে: কেউ বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় সাক্ষ্য দিলে কমিশন একজন অনুবাদকের সহায়তা নিতে পারে, এবং অনুবাদ অনুসারে সেই সাক্ষ্য বাংলায় লিপিবদ্ধ করতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে এটি ছোট কথা নয়। জমির বিরোধে যাঁরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁদের অনেকের প্রথম ভাষা বাংলা নয়। আবেদন বাংলায় লিখতে হলেও সাক্ষ্য নিজের ভাষায় দেওয়া যায়।

বাকি নিয়মগুলো

  • কমিশন লিখিত নোটিশ দিয়ে যেকোনো ব্যক্তিকে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দিতে এবং সব তথ্য ও দলিলপত্র দাখিল করতে নির্দেশ দিতে পারে (১১(৩))।
  • মৌখিক সাক্ষ্য হুবহু লিপিবদ্ধ করা বাধ্যতামূলক নয় — সারাংশ লিপিবদ্ধ করলেই চলে (১১(৪))।
  • তবে Oaths Act, 1883 প্রযোজ্য (১১(৫)) — অর্থাৎ শপথের বিধান শিথিল করা হয়নি।

কমিশনের আরও যে ক্ষমতা আছে

কাগজ দেখা ও সরেজমিন পরিদর্শনের বাইরেও কমিশনের হাতে দুটি শক্ত ক্ষমতা আছে, যেগুলো সাধারণত আলোচনায় আসে না।

সরকারি সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা

৬(৩) ধারা অনুযায়ী কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য কমিশন যেকোনো সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় তথ্য, উপাত্ত বা কাগজপত্র সরবরাহের নির্দেশ দিতে পারে। এবং প্রয়োজনে সেই কর্তৃপক্ষের যেকোনো কর্মকর্তাকে স্থানীয় তদন্ত, পরিদর্শন বা জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিতে পারে।

ধারার শেষ বাক্যটি বাধ্যতামূলক ভাষায়: “উক্ত কর্তৃপক্ষ বা কর্মকর্তা উহা পালনে বাধ্য থাকিবেন।”

বাস্তবে এর অর্থ, ভূমি অফিসের রেকর্ড, জরিপ বিভাগের মানচিত্র বা জেলা প্রশাসনের নথি চাইলে সেগুলো দিতে হবে — কমিশনকে নিজে খুঁজে বেড়াতে হয় না।

অবমাননার ক্ষমতা

১৯ ধারা অনুযায়ী Penal Code, 1860-এর ২২০ ধারা এবং Code of Criminal Procedure, 1898-এর ৪৮০ ধারার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কমিশন দেওয়ানি আদালত বলে গণ্য হবে, এবং সেই অনুযায়ী অবমাননাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

অর্থাৎ কমিশনের নোটিশ উপেক্ষা করা বা কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার আইনি পরিণতি আছে।

ক্ষমতা অর্পণ — এবং যেটুকু অর্পণ করা যায় না

১২ ধারা অনুযায়ী কমিশন প্রয়োজনবোধে লিখিত আদেশ দিয়ে চেয়ারম্যান, কোনো সদস্য বা কোনো কর্মকর্তাকে তার ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে। কিন্তু একটি ব্যতিক্রম স্পষ্ট করে বলা — ৬(১) ধারায় বর্ণিত কার্যাবলী, অর্থাৎ বিরোধ নিষ্পত্তির মূল কাজটি, অর্পণ করা যাবে না।

বিরোধ নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত পুরো কমিশনকেই নিতে হয়। এটি ৭(৩) ধারার কোরাম ও ৭(৫) ধারার সিদ্ধান্ত-পদ্ধতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

দায়মুক্তি

২০ ধারায় একটি রক্ষাকবচ: এই আইন বা প্রবিধানের অধীনে সরল বিশ্বাসে করা কোনো কাজের ফলে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে, তার জন্য কমিশনের চেয়ারম্যান, সদস্য, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না।

১৬ ধারার আপিল-নিষেধের সঙ্গে এই ধারাটি একসঙ্গে পড়া দরকার — সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও পথ নেই, সিদ্ধান্তদাতার বিরুদ্ধেও নেই।

সিদ্ধান্তের পর কী হয় — এবং আপিল কেন নেই

কমিশনের সিদ্ধান্ত দেওয়ানি আদালতের ডিক্রি বলে গণ্য হয়, এবং সেভাবেই বাস্তবায়ন করা যায় (১৭ ধারা)। কিন্তু আইনটিতে এর সঙ্গে একটি কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া আছে।

ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল বা রিভিশন দায়ের করা যাবে না, এমনকি সিদ্ধান্তের বৈধতা বা যথার্থতা নিয়ে প্রশ্নও তোলা যাবে না।

এর অর্থ, কমিশনের সিদ্ধান্ত কার্যত চূড়ান্ত। যিনি জিতলেন তাঁর জন্য এটি নিশ্চয়তা; যিনি হারলেন তাঁর জন্য এটি শেষ দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া। আইনটির এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে পাঠটি এখানে স্পষ্ট।

চুক্তিতে যা ছিল, আইনে যা দাঁড়াল

এই কমিশনের নকশা ২০০১ সালের আইনে নয়, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির (ঘ) খণ্ডে আঁকা হয়েছিল। দুটি দলিল পাশাপাশি রাখলে প্রায় সব মিলে যায় — এবং একটি জায়গায় মেলে না।

যেখানে হুবহু মিল

গঠন। চুক্তির (ঘ)৫ দফায় পাঁচ সদস্য: অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বা প্রতিনিধি, বিভাগীয় কমিশনার বা অতিরিক্ত কমিশনার, এবং সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। আইনের ৩(২) ধারায় একই পাঁচজন, কেবল ক্রম আলাদা।

মেয়াদ। চুক্তির (ঘ)৬(ক): “কমিশনের মেয়াদ তিন বৎসর হইবে। তবে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে পরামর্শক্রমে ইহার মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাইবে।” আইনের ৫ ধারা কার্যত অভিন্ন।

নিষ্পত্তির মাপকাঠি। চুক্তির (ঘ)৬(খ): “কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন।” আইনের ৬(১)-এ একই ভাষা।

আপিল না থাকা। এটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার, কারণ অনেকে ধরে নেন আপিলের নিষেধাজ্ঞা আইনে যোগ হয়েছে। চুক্তির (ঘ)৪ দফায় স্পষ্ট লেখা: “এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কোন আপিল চলিবে না এবং এই কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে।” অর্থাৎ ১৬ ধারার বিধানটি চুক্তিরই সিদ্ধান্ত, আইনপ্রণেতাদের সংযোজন নয়।

যেখানে মেলে না: কাপ্তাই ও বেতবুনিয়া

চুক্তির (ঘ)৪ দফায় কমিশনের ক্ষমতা এভাবে বর্ণিত:

“পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমি জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এই যাবৎ যেইসব জায়গা-জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হইয়াছে সেই সমস্ত জমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণের পূর্ণ ক্ষমতা এই কমিশনের থাকিবে… ফ্রীঞ্জ ল্যান্ড (জলেভাসা জমি) এর ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।”

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭, খণ্ড (ঘ), দফা ৪

দুটি জিনিস খেয়াল করুন। প্রথমত, ক্ষমতাটি ‘পূর্ণ’ বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, জলেভাসা জমির ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে — ইতিবাচক ভাষায়।

চুক্তির এই দফায় কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বা বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকার কোনো ব্যতিক্রম নেই। ব্যতিক্রমটি এসেছে ২০০১ সালের আইনের ৬(১)(গ) ধারার শর্তাংশে।

একটি বিভ্রান্তি এড়ানো দরকার। চুক্তির অন্য একটি জায়গায় — জেলা পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া জমি বন্দোবস্ত-ক্রয়-বিক্রয়-হস্তান্তর নিষেধের বিধানে — কাপ্তাই ও বেতবুনিয়ার নাম আছে। কিন্তু সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ, ভূমি কমিশনের ক্ষমতা নিয়ে নয়।

ফলে ভূমি কমিশনের ক্ষমতার প্রশ্নে দুটি দলিলের মধ্যে একটি বাস্তব পার্থক্য দাঁড়ায়, এবং সেটি ঠিক সেই এলাকায় যেখানে বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস সবচেয়ে দীর্ঘ।

যে দুটি প্রতিশ্রুতি কমিশনের পাশে থাকার কথা ছিল

চুক্তির (ঘ) খণ্ডে কমিশনের আগে-পরে আরও দুটি দফা আছে, যেগুলো ছাড়া কমিশনের কাজ অসম্পূর্ণ।

(ঘ)২ — ভূমি জরিপ। চুক্তি অনুযায়ী গঠিতব্য আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে সরকার যথাশীঘ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ কাজ শুরু করবে এবং যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করে উপজাতীয় জনগণের ভূমি মালিকানা চূড়ান্ত করে তাঁদের ভূমি রেকর্ডভুক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করবে।

(ঘ)৩ — দুই একর। সরকার ভূমিহীন বা দুই একরের কম জমির মালিক উপজাতীয় পরিবারের ভূমি-মালিকানা নিশ্চিত করতে পরিবার প্রতি দুই একর জমি স্থানীয় এলাকায় জমির লভ্যতা সাপেক্ষে বন্দোবস্ত দেওয়া নিশ্চিত করবে। প্রয়োজনমতো জমি না পাওয়া গেলে টিলা জমির (গ্রোভ ল্যান্ড) ব্যবস্থা করা হবে।

এই দুটি দফার কোনোটিই ২০০১ সালের কমিশন আইনের বিষয়বস্তু নয় — সেগুলো সরকারের প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে চুক্তিতে রাখা। তবে দুটি একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায় ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করার কথা ছিল: জরিপ হবে, রেকর্ড হবে, ভূমিহীনরা জমি পাবেন, আর যেখানে বিরোধ থেকে যাবে সেখানে কমিশন বসবে।

জরিপ ও দুই-একর বন্দোবস্তের বাস্তবায়ন কতদূর হয়েছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য নথি এই কাজে ব্যবহার করা হয়নি। [যাচাই প্রয়োজন]

(ঘ)৮ দফায় আরেকটি নির্দিষ্ট নির্দেশ ছিল: যেসব অ-উপজাতীয় ও অ-স্থানীয় ব্যক্তিকে রাবার বা অন্যান্য প্লান্টেশনের জন্য জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে যাঁরা গত দশ বছরে প্রকল্প গ্রহণ করেননি বা জমি সঠিকভাবে ব্যবহার করেননি, সেসব জমির বন্দোবস্ত বাতিল করা হবে।

প্রশ্নোত্তর

আবেদন করতে কি আইনজীবী লাগে?

৯(১) ধারায় আইনজীবীর কোনো বাধ্যবাধকতার কথা নেই। দরখাস্ত সাদা কাগজে বাংলায় লিখে দস্তখত বা টিপসই দিয়ে দাখিল করলেই হয়।

আবেদনে কাদের প্রতিপক্ষ করতে হবে?

সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, অবৈধ বন্দোবস্ত গ্রহীতা, এবং আবেদনকারীর জানামতে দাবিকৃত ভূমির বর্তমান দখলকার — তিনজনেরই নাম ও ঠিকানা (১০(১) ধারা)।

ভুল হলে আবেদন সংশোধন করা যায়?

হ্যাঁ, তবে একবার। কমিশনের অনুমতি নিয়ে, নিষ্পত্তির আগে যেকোনো সময় (৯(২) ধারা)।

কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা যায়?

না। আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেওয়ানি আদালতের ডিক্রি হিসেবে গণ্য হয়, আর তার বিরুদ্ধে কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল বা রিভিশন দায়ের করা যায় না।

ভূমি কমিশনে কারা সদস্য থাকেন?

পাঁচজন — চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বা তাঁর মনোনীত সদস্য, সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদাধিকারবলে, সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ বা তাঁর প্রতিনিধি, এবং চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার বা তাঁর মনোনীত অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (৩(২) ধারা)।

‘সংশ্লিষ্ট’ জেলা পরিষদ ও সার্কেল চীফ মানে কী?

আইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী বিরোধীয় ভূমি যে পার্বত্য জেলা ও যে সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত, সেই জেলা ও সেই সার্কেল। ফলে কমিশনের গঠন প্রতিটি মামলার সঙ্গে বদলায় — বান্দরবানের জমি হলে বোমাং চীফ, রাঙ্গামাটির হলে চাকমা চীফ বসেন।

কমিশন কোন আইন অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করে?

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী (৬(১) ধারা)। ২(ছ) ধারায় ‘প্রচলিত আইন’-এর সংজ্ঞায় আইন, ঐতিহ্য, বিধি ও প্রজ্ঞাপন — চারটিই আছে। অর্থাৎ অলিখিত প্রথাও কমিশনের বিচারের ভিত্তি হতে পারে, যা কাগুজে দলিলহীন জুমভূমির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা না জানলে কমিশনে সাক্ষ্য দেওয়া যায়?

যায়। ১১(২) ধারা অনুযায়ী কেউ বাংলা ছাড়া অন্য ভাষায় সাক্ষ্য দিলে কমিশন একজন অনুবাদকের সহায়তা নিতে পারে এবং অনুবাদ অনুসারে সেই সাক্ষ্য বাংলায় লিপিবদ্ধ করতে পারে। আবেদন বাংলায় লিখতে হলেও সাক্ষ্য নিজের ভাষায় দেওয়া যায়।

কমিশন কি সাক্ষ্য আইন মানতে বাধ্য?

না। ১১(১) ধারা অনুযায়ী কমিশন Evidence Act, 1872-এর বিধানাবলী অনুসরণে বাধ্য নয়; পরিস্থিতি অনুযায়ী যেভাবে যথাযথ মনে করে সেভাবেই সাক্ষ্য নিতে ও লিপিবদ্ধ করতে পারে। তবে Oaths Act, 1883 প্রযোজ্য, এবং মৌখিক সাক্ষ্যের সারাংশ লিপিবদ্ধ করলেই চলে।

কাপ্তাই এলাকার জমি কি কমিশনের আওতায়?

আংশিকভাবে। ৬(১)(গ) ধারার শর্তাংশ অনুযায়ী কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকায় বন্দোবস্ত বাতিলের ক্ষমতা সাধারণভাবে প্রযোজ্য নয়। তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং বসতবাড়িসহ জলেভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় এই ব্যতিক্রমের বাইরে। ১৯৯৭ সালের চুক্তির (ঘ)৪ দফায় এমন কোনো ব্যতিক্রম ছিল না।

কমিশনের মেয়াদ কত?

চেয়ারম্যান নিয়োগের তারিখ থেকে তিন বছর (৫ ধারা)। তবে সরকার আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে মেয়াদ বাড়াতে পারে, এবং কতবার বাড়ানো যাবে তার কোনো সীমা ধারাটিতে নেই। কমিশনের প্রধান কার্যালয় খাগড়াছড়ি জেলা সদরে।

কমিশন কি সরকারি অফিস থেকে কাগজ চাইতে পারে?

পারে। ৬(৩) ধারা অনুযায়ী কমিশন যেকোনো সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য, উপাত্ত বা কাগজপত্র সরবরাহের এবং প্রয়োজনে কোনো কর্মকর্তাকে স্থানীয় তদন্ত, পরিদর্শন বা জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিতে পারে — এবং তাঁরা তা পালনে বাধ্য থাকবেন।

যা এখনো জানা যায়নি

  • আবেদন কোথায় জমা দিতে হয়। আইনে বলা আছে “কমিশনের নিকট”, কিন্তু কার্যালয়ের ঠিকানা বা জেলাভিত্তিক গ্রহণকেন্দ্র আছে কি না, মূল পাঠে নেই। [যাচাই প্রয়োজন]
  • সময়সীমা। আবেদন দাখিলের কোনো তামাদি বা কমিশনের নিষ্পত্তির সময়সীমা এই পাঠে পাওয়া যায়নি।
  • কত আবেদন জমা পড়েছে, কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে। কোনো সরকারি সংখ্যা এই কাজে পাওয়া যায়নি।
  • কাপ্তাই শর্তাংশের প্রয়োগ। ৬(১)(গ) ধারার ব্যতিক্রম কাপ্তাই ও বেতবুনিয়া এলাকার কোন দাবিগুলো আটকায় আর কোনগুলো আটকায় না — তার কোনো ব্যাখ্যামূলক নজির বা রায় পাওয়া যায়নি।
  • চুক্তির (ঘ)২ ও (ঘ)৩ দফার বাস্তবায়ন। ভূমি জরিপ শুরু হয়েছে কি না, এবং ভূমিহীন পরিবারপ্রতি দুই একর বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি কতদূর কার্যকর হয়েছে — এই লেখায় ব্যবহার করার মতো নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি।
  • বিধি প্রণয়ন। ১৮ ধারায় সরকারকে ‘যথাশীঘ্র’ বিধি প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া আছে। বিধিমালা প্রণীত হয়েছে কি না এবং তাতে আবেদনের ফরম, ফি বা সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়নি। [যাচাই প্রয়োজন]
  • মেয়াদ কতবার বেড়েছে। ৫ ধারায় মেয়াদ বৃদ্ধির সংখ্যাসীমা নেই। এ পর্যন্ত কতবার বাড়ানো হয়েছে, জানা যায়নি।
  • ২০১৬ সালের সংশোধনী। আইনটি পরে সংশোধিত হয়েছে; আর্কাইভে থাকা পাঠে সংশোধনীগুলো বর্গাকার বন্ধনীতে চিহ্নিত, তবে প্রতিটি সংশোধনীর তারিখ ও প্রভাব আলাদা করে যাচাই করা হয়নি।

কমিশনই একমাত্র জায়গা নয়

ভূমি নিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর কমিশনে নেই। চুক্তির (খ) খণ্ডে জেলা পরিষদের হাতেও ভূমি-সংক্রান্ত কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, এবং সেগুলো জানা থাকলে কোন সমস্যা কোথায় নিতে হবে তা বোঝা সহজ হয়।

জেলা পরিষদের পূর্বানুমোদন

চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোনো জায়গা-জমি জেলা পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া ইজারা, বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাবে না।

তবে এই বিধানেও একটি ব্যতিক্রম-তালিকা আছে, এবং তালিকাটি কমিশনের ক্ষেত্রের চেয়ে লম্বা: রক্ষিত (reserved) বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় শিল্প কারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত ভূমি।

আলাদা করে বলা আছে, জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোনো প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সঙ্গে আলোচনা ও তার সম্মতি ছাড়া সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যাবে না। এখানে শব্দটি ‘সম্মতি’ — কেবল আলোচনা নয়।

ভূমি প্রশাসনের কর্মীরা কার অধীনে

চুক্তির একই অংশে একটি তালিকা আছে, যা ভূমি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করা যে কারও চেনা: জেলা পরিষদ হেডম্যান, চেইনম্যান, আমিন, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-দের কার্যাদি তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

এই ছয়টি পদ মিলেই মাঠপর্যায়ের ভূমি প্রশাসন — জমি মাপা থেকে রেকর্ড পর্যন্ত। ১৯০০ সালের শাসনবিধিতে হেডম্যান জেলা প্রশাসকের নিয়োগ ও তাঁরই অধীন; চুক্তিতে তাঁর কার্যাদির তত্ত্বাবধান জেলা পরিষদের হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কাপ্তাই হ্রদের জলেভাসা জমি

একটি দফা আলাদা করে উল্লেখযোগ্য, কারণ কমিশন আইনের কাপ্তাই-ব্যতিক্রমের পাশে এটি পড়া দরকার। চুক্তিতে বলা আছে — কাপ্তাই হ্রদের জলেভাসা (Fringe Land) জমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জমির মূল মালিকদেরকে বন্দোবস্ত দেওয়া হবে।

অর্থাৎ কাপ্তাই হ্রদের জলেভাসা জমি নিয়ে চুক্তির অবস্থান ছিল ইতিবাচক ও নির্দিষ্ট — মূল মালিকরাই অগ্রাধিকার পাবেন।

ভূমি উন্নয়ন কর

চুক্তির (খ) খণ্ডে আরও বলা হয়েছিল, জেলার ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের দায়িত্ব পরিষদের হাতে ন্যস্ত থাকবে এবং আদায়কৃত সেই কর পরিষদের তহবিলে থাকবে।

এই দফাগুলো কমিশন আইনের বিষয় নয় — এগুলো ছিল জেলা পরিষদ আইন সংশোধনের প্রস্তাব। এখানে উল্লেখ করার কারণ, ভূমির প্রশ্নে কোন সিদ্ধান্ত কোথায় হয় তা না জানলে কমিশনে অপ্রাসঙ্গিক আবেদন করে সময় নষ্ট হতে পারে।

এবং প্রস্তাবগুলো আইনে রূপ পেয়েছে। রাংগামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯-এর ৬৪ ধারায় চারটিই আছে — পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া জমি হস্তান্তর নিষেধ (একই ব্যতিক্রম-তালিকাসহ), পরিষদের সম্মতি ছাড়া সরকারের অধিগ্রহণ নিষেধ, হেডম্যান-চেইনম্যান-আমিন-সার্ভেয়ার-কানুনগো-সহকারী কমিশনার (ভূমি)-দের কার্যাদি পরিষদের তত্ত্বাবধানে, এবং কাপ্তাই হ্রদের জলেভাসা জমি মূল মালিকদের অগ্রাধিকারে বন্দোবস্ত। ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের বিধানটি ৬৫ ধারায়।

বিস্তারিত জেলা পরিষদ নিয়ে আলাদা লেখাটিতে। তবে আইনে থাকা আর বাস্তবে প্রয়োগ হওয়া এক নয় — প্রয়োগের কোনো নথি এই কাজে ব্যবহার করা হয়নি।

সরেজমিন পরিদর্শন ও ভাতা

দুটি ছোট বিধান এখানে যোগ করা যায়। ৬(৪) ধারা অনুযায়ী কমিশন, চেয়ারম্যান, বা কমিশন কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো সদস্য বিরোধীয় ভূমি সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবেন — অর্থাৎ সিদ্ধান্ত কেবল কাগজের ভিত্তিতে নিতে হয় না।

আর ৮ ধারা অনুযায়ী সরকার কমিশনের বৈঠকে যোগদানের জন্য কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির সদস্যদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করতে পারে, এবং সেই অনুযায়ী তাঁরা ভাতা পাবেন।

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় কীভাবে

সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পর সেটি কার্যকর করার দায়িত্ব কার — ১৭ ধারা এ বিষয়ে স্পষ্ট, এবং ভাষাটি জোরালো।

ধারাটি শুরু হয় একটি অগ্রাধিকার-বাক্য দিয়ে: “অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন”। এরপর বলা হয়েছে, কমিশন তার সিদ্ধান্ত দেওয়ানি আদালতের ডিক্রি বা আদেশের মতো নিজের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে, অথবা প্রয়োজনবোধে সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে বা করাতে পারবে।

আর ১৭(২) ধারায় সেই কর্তৃপক্ষদের বাধ্যবাধকতা: “সকল কর্তৃপক্ষ কমিশনের নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকিবে।”

এই দুটি উপ-ধারা মিলিয়ে পড়লে কাগজে-কলমে ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ — সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে, সেটি ডিক্রির মর্যাদা পায়, বাস্তবায়নের যন্ত্রও দেওয়া আছে, এবং প্রশাসন তা মানতে বাধ্য।

বাস্তবে কতগুলো সিদ্ধান্ত এভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, তার কোনো তথ্য এই কাজে পাওয়া যায়নি। [যাচাই প্রয়োজন]

এই লেখার সীমা

এটি আইন কী বলে তার বিবরণ — কমিশন কীভাবে কাজ করছে তার নয়। কত আবেদন জমা পড়েছে, কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে, কতবার মেয়াদ বেড়েছে, বৈঠক কতগুলো হয়েছে — এসবের কোনো সরকারি সংখ্যা এখানে ব্যবহার করা হয়নি, কারণ যাচাইযোগ্য উৎস পাওয়া যায়নি।

দ্বিতীয় সীমাটি সংশোধনী নিয়ে। bdlaws-এ প্রকাশিত পাঠে সংশোধিত অংশগুলো বর্গাকার বন্ধনীতে চিহ্নিত, এবং এই লেখায় যেখানে তা প্রাসঙ্গিক সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিটি সংশোধনীর তারিখ, প্রজ্ঞাপন-নম্বর ও ঠিক কোন শব্দ বদলেছে — তা আলাদা করে মিলিয়ে দেখা হয়নি।

তৃতীয়ত, কমিশন একা দাঁড়িয়ে নেই। এর পাশে আছে ১৯০০ সালের শাসনবিধির মৌজা-ব্যবস্থা, যেখানে জুম চাষে মালিকানা স্বত্ব লাগে না, আর আছে আঞ্চলিক পরিষদ, যার চেয়ারম্যান বা প্রতিনিধি কমিশনেরই একজন সদস্য। এই তিন ব্যবস্থার সংযোগস্থলে কী ঘটে, সেটি আলাদা লেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র

  1. পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১ (২০০১ সনের ৫৩ নং আইন), ১৭ জুলাই ২০০১ — ধারা ৬, ৭, ৯, ১০, ১৭ — bdlaws.minlaw.gov.bd
  2. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, ১৯৯৭ — খণ্ড (ঘ) “পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও অন্যান্য বিষয়াবলী”, দফা ২–৮ — রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রকাশিত বাংলা পাঠ, rhdc.gov.bd
  3. Evidence Act, 1872 (Act I of 1872) ও Oaths Act, 1883 (Act X of 1883) — কমিশন আইনের ১১ ধারায় উল্লিখিত
  4. Penal Code, 1860 এর ধারা ২২০ এবং Code of Criminal Procedure, 1898 এর ধারা ৪৮০ — কমিশন আইনের ১৯ ধারায় উল্লিখিত
  5. জুমজার্নাল, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনা, ভূমি বিরোধ ও ভূমি অধিকার

পদ্ধতি সম্পর্কে। আইনের উদ্ধৃতিগুলো bdlaws.minlaw.gov.bd-এ প্রকাশিত সরকারি বাংলা পাঠ থেকে ধারা ধরে ধরে নেওয়া, এবং প্রতিটি দাবির পাশে ধারার নম্বর দেওয়া আছে। চুক্তির উদ্ধৃতিগুলো রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রকাশিত বাংলা পাঠ থেকে; ওই দলিলটি পুরনো ফন্ট-এনকোডিংয়ে প্রকাশিত, ইউনিকোডে রূপান্তরের পর প্রতিটি উদ্ধৃত অংশ মূল পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। এই লেখা আইনি পরামর্শ নয় — নির্দিষ্ট কোনো বিরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলুন।

সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৫ আগস্ট ২০২৬

প্রসঙ্গ:

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা