Last updated Oct 15th, 2026
0

১৯৯৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে একটি সেমিনার হয়েছিল। উপলক্ষ — জাতিসংঘ ওই বছরটিকে International Year of the World’s Indigenous People ঘোষণা করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশে বর্ষটি উদযাপনের কোনো সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, আর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল — এদেশে কোনো indigenous জনগোষ্ঠী নেই।
ওই সেমিনারে পড়া মূল প্রবন্ধটি জুমজার্নালের আর্কাইভে আছে। তার একটি বাক্য এই গোটা তর্কের কেন্দ্র: “একজন গারো, সাঁওতাল বা ম্রোর কাছে এই সরকারি ব্যাখ্যা তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করারই নামান্তর।”
তেত্রিশ বছর পরেও প্রশ্নটি মেটেনি। এই লেখাটি সেই প্রশ্নের নথিপত্র — জাতিসংঘ কোন সালকে আদিবাসী বর্ষ ঘোষণা করেছিল, UNDRIP আসলে কী বলে, ILO-র দুটি কনভেনশনের পার্থক্য কোথায়, বাংলাদেশ কোনটিতে সই করেছে আর কোনটিতে করেনি, আর রাষ্ট্রের আপত্তিটি ঠিক কোন জায়গায়।
দুটি অবস্থানই এখানে উৎস ধরে ধরে দেওয়া আছে। পক্ষ নেওয়া হয়নি।
১৯৯৩ সাল। জাতিসংঘ ওই বছরটিকে ঘোষণা করেছিল International Year of the World’s Indigenous People — বিশ্ব আদিবাসী জনগণের আন্তর্জাতিক বর্ষ। জুমজার্নালের আর্কাইভে থাকা ১৯৯৩ সালের সেমিনার-প্রবন্ধটি এই ঘোষণার প্রেক্ষিতেই লেখা, আর সেখানে ঘোষণাটিকে বলা হয়েছে “মূলত একটি প্রতীকী পদক্ষেপ”।
প্রতীকী কেন? কারণ ঘোষণার সঙ্গে কোনো বাধ্যবাধকতা আসেনি। প্রবন্ধটির ভাষায়, ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জনগোষ্ঠীদের “বহু শতাব্দীর বঞ্চনা ও নিপীড়নের ইতিহাস এবং বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় তাদের উপেক্ষিত অবস্থানের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ” করা।
পরীক্ষার খাতায় প্রশ্নটি প্রায়ই এভাবে আসে — “জাতিসংঘ আদিবাসী বর্ষ হিসেবে কোন সালকে ঘোষণা করেছে?” উত্তর ১৯৯৩। তবে সালটি মুখস্থ করার চেয়ে বেশি কাজের হলো জানা, ওই বছর বাংলাদেশে কী হয়েছিল — আর সেটিই এই লেখার শেষ অংশের বিষয়।
আদিবাসী অধিকারের আন্তর্জাতিক কাজটি শুরু হয়েছিল ১৯৮২ সালে, জাতিসংঘের Working Group on Indigenous Populations গঠনের মধ্য দিয়ে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের (UN DESA) নথি অনুযায়ী এটি ছিল মানবাধিকার কমিশনের অধীন সাব-কমিশনের ছয়টি ওয়ার্কিং গ্রুপের একটি।
গ্রুপটি কেন তৈরি হলো, তার পিছনে একটি গবেষণা আছে। হোসে আর. মার্তিনেস কোবো-র একটি সমীক্ষা পৃথিবীজুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মুখোমুখি হওয়া বৈষম্যের সমস্যাটি তুলে ধরেছিল — নিপীড়ন, প্রান্তিকীকরণ ও শোষণের চিত্র। সেই সমীক্ষার ফলেই ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয়।
এই গ্রুপই প্রথম খসড়া ঘোষণাপত্রটি তৈরি করে, যা ১৯৯৪ সালে সাব-কমিশনে অনুমোদিত হয়। অর্থাৎ UNDRIP-এর যাত্রা ১৯৮২ থেকে ২০০৭ — পঁচিশ বছর।

প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়, আর তারিখটি বেছে নেওয়া হয়েছে ১৯৮২ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠকের স্মরণে। এটি জাতিসংঘের নিজের দেওয়া ব্যাখ্যা।
অর্থাৎ দিনটি কোনো যুদ্ধজয় বা স্বাধীনতার বার্ষিকী নয় — এটি একটি বৈঠকের বার্ষিকী। যে বৈঠকে প্রথমবার আদিবাসী প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের পরিসরে নিজেদের কথা বলার জায়গা পেয়েছিলেন।
জুমজার্নালের আর্কাইভে ২০২৬ সালের দিবসটি নিয়ে লেখা আছে; সে বছরের জাতিসংঘ-ঘোষিত প্রতিপাদ্য ছিল আদিবাসী ধাত্রীদের অবদানকে সম্মান জানানো — মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সংরক্ষণ।
জাতিসংঘ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য পরপর দুটি আন্তর্জাতিক দশক ঘোষণা করেছে — প্রথমটি ১৯৯৫–২০০৪, দ্বিতীয়টি ২০০৫–২০১৫। এর কারণ সরল এবং অস্বস্তিকর: প্রথম দশকে যে কাজটি শেষ করার আশা ছিল, সেটি শেষ হয়নি।
UN DESA-র নথিতে কথাটি স্পষ্ট। ১৯৯৫ সালে একটি open-ended inter-sessional working group তৈরি হয়েছিল ১৯৯৪-র খসড়াটি নিয়ে কাজ করতে, আর আশা ছিল প্রথম দশকের ভেতরেই সাধারণ পরিষদ ঘোষণাপত্রটি গ্রহণ করবে। সেটি না হওয়ায় ওয়ার্কিং গ্রুপের দায়িত্বকাল দ্বিতীয় দশকে বাড়ানো হয়।
কাজ এত ধীরে এগোল কেন? নথিতে কারণটিও লেখা আছে: খসড়ার দুটি মূল বিধান নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর আপত্তি — আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, এবং তাদের ঐতিহ্যগত ভূমিতে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ। এই দুটি আপত্তিই পরে বাংলাদেশের আলোচনাতেও ফিরে আসে।
এর পাশাপাশি চলছে আরেকটি দশক — Decade of Indigenous Languages, ২০২২–২০৩২। জাতিসংঘের হিসাবে পৃথিবীর প্রায় ৭,০০০ ভাষার অন্তত ৪০ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রায় বিপন্ন, আর আদিবাসী ভাষাগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিতে — কারণ এগুলোর অনেকগুলোই স্কুলে পড়ানো হয় না, সরকারি পরিসরেও ব্যবহার হয় না।
জাতিসংঘের হিসাবে পৃথিবীতে আদিবাসী মানুষের সংখ্যা প্রাক্কলিত ৪৭.৬ কোটি, যাঁরা ৯০টি দেশে বসবাস করেন। তাঁরা বিশ্ব জনসংখ্যার ৬ শতাংশেরও কম, কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের অন্তত ১৫ শতাংশ।
সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি অসঙ্গতি চোখে পড়ে:
অর্থাৎ যাঁরা জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রেখেছেন, তাঁরাই সবচেয়ে দরিদ্র। এই দুটি তথ্য একসঙ্গে পড়লে আদিবাসী অধিকারের আলোচনাটি নিছক সংস্কৃতির প্রশ্ন থেকে অর্থনীতি ও পরিবেশের প্রশ্নে চলে যায়।
UNDRIP হলো United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples — জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এটি গ্রহণ করে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার, প্রস্তাব নম্বর A/RES/61/295। দলিলটিতে আছে ৪৬টি অনুচ্ছেদ।
জাতিসংঘের নিজের মূল্যায়ন অনুযায়ী এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে সবচেয়ে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক দলিল। এটি নতুন কোনো অধিকার তৈরি করে না — বিদ্যমান মানবাধিকারের মানগুলো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রযোজ্য, সেটিই ব্যাখ্যা করে, আর বেঁচে থাকা, মর্যাদা ও কল্যাণের জন্য সর্বনিম্ন মানের একটি সর্বজনীন কাঠামো দাঁড় করায়।
পথটি সোজা ছিল না। ২০০৬ সালের ২৯ জুন নবগঠিত মানবাধিকার কাউন্সিল ঘোষণাপত্রটি গ্রহণ করে। কিন্তু ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটি একটি প্রস্তাব নিয়ে বিষয়টি স্থগিত করে দেয়। পেরুর নেতৃত্বে একটি প্রস্তাবে দলিলটি দ্রুত গৃহীত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু নামিবিয়ার নেতৃত্বে কয়েকটি আফ্রিকান দেশের সহপ্রস্তাবে সংশোধনী এসে “আরও পরামর্শের সময়” দেওয়ার কথা বলা হয়। তারপর আরও নয় মাস।
২০০৭ সালের ভোটে ঘোষণাপত্রের পক্ষে ছিল ১৪৩ (জাতিসংঘের একই পাতায় অন্যত্র ১৪৪) রাষ্ট্র, বিপক্ষে ৪টি, আর ভোটদানে বিরত ছিল ১১টি। বাংলাদেশ ছিল সেই ১১টি দেশের একটি।
বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল চারটি দেশ — অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। লক্ষণীয়, চারটিই সেই দেশ যেখানে ইউরোপীয় বসতি স্থাপনের ইতিহাস সবচেয়ে সরাসরি।
আর ভোটদানে বিরত এগারোটি দেশ: আজারবাইজান, বাংলাদেশ, ভুটান, বুরুন্ডি, কলম্বিয়া, জর্জিয়া, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, রাশিয়ান ফেডারেশন, সামোয়া ও ইউক্রেন।
একটি কারিগরি কথা, যা পাঠকের জানা দরকার। জাতিসংঘ DESA-র একই পাতায় সংখ্যাটি দুইবার দেওয়া আছে — একবার ১৪৩, আরেকবার ১৪৪। কোনটি চূড়ান্ত, সেটি ওই পাতা থেকে নির্ধারণ করা যায় না। তাই এখানে দুটিই লেখা থাকল। [মূল ভোটের নথিতে যাচাই প্রয়োজন]
বাংলাদেশের বিরত থাকাটি এই লেখার কেন্দ্রীয় তথ্য। রাষ্ট্র বিপক্ষে ভোট দেয়নি — অর্থাৎ ঘোষণাপত্রটিকে নাকচ করেনি; কিন্তু পক্ষেও দেয়নি। ভুটানও বিরত ছিল, আর ভারত ও পাকিস্তান বিরত থাকা বা বিপক্ষে ভোট দেওয়া — কোনো তালিকাতেই নেই, অর্থাৎ তারা পক্ষে ছিল।
২০০৭-এ বিপক্ষে ভোট দেওয়া চারটি দেশই — অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র — পরবর্তীতে অবস্থান উল্টে ঘোষণাপত্রের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। জাতিসংঘের নথিতে কথাটি সোজাসুজি লেখা: “Years later the four countries that voted against have reversed their position and now support the UN Declaration.”
শুধু তারাই নয়। বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে কলম্বিয়া ও সামোয়াও পরে ঘোষণাপত্রটি সমর্থন করেছে।
আর ২০০৯ সালের এপ্রিলে ডারবান রিভিউ সম্মেলনে ১৮২টি রাষ্ট্র একটি ফলাফল-দলিলে সর্বসম্মত হয়, যেখানে UNDRIP গ্রহণকে স্বাগত জানানো হয় এবং রাষ্ট্রগুলোকে বৈষম্য ছাড়া আদিবাসী অধিকার বাস্তবায়নের সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানানো হয়।
এই ধারাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় আপত্তিগুলো স্থায়ী ছিল না। যে দেশগুলো শুরুতে সবচেয়ে কঠোর বিরোধিতা করেছিল, তারাও সরে এসেছে।
না — এটি একটি ঘোষণাপত্র (declaration), চুক্তি বা কনভেনশন নয়। ঘোষণাপত্রে সই বা অনুসমর্থনের ব্যবস্থা নেই, আর ভঙ্গ করলে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের সুযোগও নেই।
তাহলে এর জোর কোথায়? তিন জায়গায়। এক, এটি সর্বনিম্ন মানের একটি কাঠামো দাঁড় করায়, যার সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ মেলানো যায়। দুই, এটি বিদ্যমান বাধ্যতামূলক মানবাধিকার দলিলগুলোর ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হয়। তিন, ১৮২টি রাষ্ট্রের সর্বসম্মতির মতো পরবর্তী ঘটনাগুলো এটিকে ক্রমশ প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের দিকে ঠেলে দেয়।
বাধ্যতামূলক দলিল আছে আলাদা — ILO-র কনভেনশন দুটি। সেগুলোর কথা নিচে।
UNDRIP-এর সবচেয়ে বিতর্কিত অনুচ্ছেদটি তৃতীয়। মূল পাঠে এটি সংক্ষিপ্ত: “Indigenous peoples have the right to self-determination. By virtue of that right they freely determine their political status and freely pursue their economic, social and cultural development.”
অর্থাৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে; সেই অধিকারবলে তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করবে এবং স্বাধীনভাবে নিজেদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পথ বেছে নেবে।
এই একটি বাক্যেই পঁচিশ বছরের দেরির ব্যাখ্যা আছে। রাষ্ট্রগুলোর আপত্তি ছিল, “আত্মনিয়ন্ত্রণ” শব্দটি আন্তর্জাতিক আইনে বিচ্ছিন্নতার অধিকার বোঝাতে পারে। পরের দুটি অনুচ্ছেদ এই আপত্তিরই উত্তর।
চতুর্থ অনুচ্ছেদ আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিধি নির্দিষ্ট করে দেয় — এটি অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসনের অধিকার। মূল পাঠে: আদিবাসী জনগোষ্ঠী আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে “the right to autonomy or self-government in matters relating to their internal and local affairs” পাবে, সঙ্গে সেই স্বায়ত্তশাসিত কাজ চালানোর অর্থায়নের উপায়ও।
শেষ অংশটি প্রায়ই নজর এড়িয়ে যায় — অর্থায়নের উপায়। স্বায়ত্তশাসন কাগজে দিয়ে টাকা না দিলে সেটি কাজ করে না। পাহাড়ের পাঠকের কাছে এই কথাটি পরিচিত: পরিষদ আছে, কিন্তু বিষয় ও বাজেট হস্তান্তর হয়নি।
UNDRIP-এর শেষ অনুচ্ছেদটি স্পষ্ট করে বলে, এই ঘোষণাপত্রের কিছুই রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক ঐক্য ভাঙার অধিকার হিসেবে পড়া যাবে না। এটিই রাষ্ট্রের প্রধান আশঙ্কার সরাসরি উত্তর, আর এটি ঘোষণাপত্রেরই অংশ।
মূল পাঠে অনুচ্ছেদ ৪৬(১) বলছে, এই ঘোষণাপত্রের কিছুই এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না যাতে কোনো রাষ্ট্র, জনগোষ্ঠী, দল বা ব্যক্তি জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী কোনো কাজ করার অধিকার পায়, বা যা “authorizing or encouraging any action which would dismember or impair, totally or in part, the territorial integrity or political unity of sovereign and independent States” হিসেবে গণ্য হয়।
তিনটি অনুচ্ছেদ একসঙ্গে পড়লে কাঠামোটি দাঁড়ায় এরকম:
| অনুচ্ছেদ | কী দেয় |
|---|---|
| ৩ | আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার |
| ৪ | সেই অধিকারের রূপ — অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে স্বায়ত্তশাসন, সঙ্গে অর্থায়ন |
| ৪৬ | সেই অধিকারের সীমা — রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ভাঙার অধিকার নয় |
অর্থাৎ ঘোষণাপত্রটি নিজের ভেতরেই একটি নিরাপত্তা-কপাট রেখেছে। এটি জানা থাকলে “UNDRIP মানলে দেশ ভেঙে যাবে” — এই আলোচনাটি অন্তত দলিলের পাঠ ধরে করা যায়।
দশম অনুচ্ছেদ বলছে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি বা ভূখণ্ড থেকে জোর করে সরানো যাবে না। আর স্থানান্তর হতে পারে কেবল তিনটি শর্তে।
মূল পাঠ অনুযায়ী শর্তগুলো হলো — সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অবাধ, পূর্ব ও অবহিত সম্মতি (free, prior and informed consent), ন্যায্য ও যথাযথ ক্ষতিপূরণ বিষয়ে সমঝোতা, এবং সম্ভব হলে ফিরে আসার সুযোগ।
তৃতীয় শর্তটি সবচেয়ে কম আলোচিত, অথচ পাহাড়ের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কাপ্তাই বাঁধের উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে এর কোনোটিই ছিল না — সম্মতি নয়, পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ নয়, ফেরার সুযোগও নয়।
UNDRIP-এর সবচেয়ে কার্যকর ধারণাটি একটি সংক্ষিপ্ত রূপ — FPIC, অর্থাৎ free, prior and informed consent। দুটি অনুচ্ছেদে এটি দুই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করা হয়েছে: আইন বানানোর সময়, আর প্রকল্প অনুমোদনের সময়।
অনুচ্ছেদ ১৯ — রাষ্ট্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজেদের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সদিচ্ছা নিয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা করবে, যাতে তাদের প্রভাবিত করতে পারে এমন আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আগে তাদের অবাধ, পূর্ব ও অবহিত সম্মতি পাওয়া যায়।
অনুচ্ছেদ ৩২ — আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আছে নিজেদের ভূমি, ভূখণ্ড ও অন্যান্য সম্পদের উন্নয়ন বা ব্যবহারের অগ্রাধিকার ও কৌশল নির্ধারণের। আর রাষ্ট্র তাদের ভূমি বা ভূখণ্ড প্রভাবিত করে এমন যেকোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে একইভাবে সম্মতি নেবে — বিশেষত খনিজ, জল বা অন্য সম্পদের উন্নয়ন, ব্যবহার বা উত্তোলনের ক্ষেত্রে।
দুটি শব্দের দিকে নজর দেওয়া দরকার। “প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে” — অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজের বেছে নেওয়া কারও সঙ্গে কথা বলে দায় সারতে পারবে না। আর “আগে” — সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর জানানো পরামর্শ নয়।
FPIC-এর ধারণাটি এখন উন্নয়ন-অর্থায়নেও ঢুকে গেছে; বিশ্বব্যাংক ও অন্য সংস্থার সুরক্ষা-নীতিতে এর ছায়া আছে। এই কারণেই একটি অবাধ্যতামূলক ঘোষণাপত্রও বাস্তবে কাজ করে।
ছাব্বিশ অনুচ্ছেদ ভূমির অধিকার দেয় তিন স্তরে, আর আটাশ অনুচ্ছেদ হারানো ভূমির জন্য প্রতিকারের কথা বলে। এই দুটি অনুচ্ছেদই প্রথাগত ভূমি-ব্যবস্থার প্রশ্নে সবচেয়ে কাজের।
অনুচ্ছেদ ২৬-এর কাঠামো:
তৃতীয় উপধারাটিই আসল জায়গা। প্রথাগত দখল থাকা মানে কাগজে মালিকানা থাকা নয় — আর এখানে দায়টি রাষ্ট্রের উপর বর্তায়: স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দিতে হবে।
অনুচ্ছেদ ২৮ এর পরের ধাপ। যে ভূমি তারা ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানায় বা ব্যবহারে রেখেছিল কিন্তু যা বাজেয়াপ্ত, কেড়ে নেওয়া, দখল করা, ব্যবহার করা বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার জন্য প্রতিকারের অধিকার আছে — পুনরুদ্ধার (restitution), আর সেটি সম্ভব না হলে ন্যায্য, সঙ্গত ও সমতাভিত্তিক ক্ষতিপূরণ।
লক্ষণীয় ক্রম: প্রথমে জমি ফেরত, টাকা পরে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের আলোচনায় এই ক্রমটি গুরুত্বপূর্ণ।
অষ্টম অনুচ্ছেদ জোরপূর্বক আত্মীকরণ ও সংস্কৃতি ধ্বংস নিষিদ্ধ করে; একাদশ অনুচ্ছেদ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যচর্চার অধিকার দেয়; আর চতুর্দশ অনুচ্ছেদ দেয় নিজের ভাষায় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার অধিকার।
অনুচ্ছেদ ৮-এ রাষ্ট্রের উপর নির্দিষ্ট দায় আছে — প্রতিরোধ ও প্রতিকারের কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে এমন কাজের বিরুদ্ধে, যার উদ্দেশ্য বা ফল হলো: স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদের অখণ্ডতা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বা জাতিগত পরিচয় কেড়ে নেওয়া; ভূমি, ভূখণ্ড বা সম্পদ থেকে উচ্ছেদ; আর যেকোনো ধরনের জোরপূর্বক জনসংখ্যা-স্থানান্তর।
অনুচ্ছেদ ১১-এ আছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রীতি চর্চা ও পুনরুজ্জীবনের অধিকার — অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রকাশ রক্ষা ও বিকাশের অধিকারসহ: প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থান, নিদর্শন, নকশা, আচার-অনুষ্ঠান, প্রযুক্তি।
আর অনুচ্ছেদ ১৪-এ আছে নিজেদের ভাষায় শিক্ষা দেওয়ার শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার, নিজেদের সাংস্কৃতিক শিক্ষাপদ্ধতির উপযোগী করে। বাংলাদেশে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার কর্মসূচিটি যে আলোচনার ভেতরে পড়ে, সেটি এই অনুচ্ছেদ।
আদিবাসী অধিকার নিয়ে বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক দলিল দুটি, দুটিই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার — আর তাদের নামের একটি শব্দেই মূল পার্থক্যটি আছে।
পার্থক্যটি Populations আর Peoples-এ। আন্তর্জাতিক আইনে “peoples” শব্দটি আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে সঙ্গে নিয়ে আসে; “populations” কেবল একটি জনসংখ্যা-গোষ্ঠী বোঝায়। ১৯৫৭-র দলিলটির মূল সুর ছিল আত্মীকরণমুখী — উন্নয়নের ধারায় এই জনগোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে আসা। ১৯৮৯-এর দলিলটি সেই সুর ছেড়ে স্বতন্ত্রতা ও পরামর্শের ভিত্তিতে দাঁড়ায়।
ILO-র সরকারি হিসাব (NORMLEX) অনুযায়ী বর্তমান অবস্থা:
| C107 (১৯৫৭) | C169 (১৯৮৯) | |
|---|---|---|
| কার্যকর | ২ জুন ১৯৫৯ | ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ |
| মোট অনুসমর্থন | ২৭ | ২৪ |
| পরিত্যক্ত (denounced) | ১০ | ০ |
| বাংলাদেশ | ২২ জুন ১৯৭২ — বলবৎ | নেই |
| ভারত | ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ — বলবৎ | নেই |
| পাকিস্তান | ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬০ — বলবৎ | নেই |
| নেপাল | নেই | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৭ |
বাংলাদেশ ILO কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করেছে ১৯৭২ সালের ২২ জুন, আর সেটি আজও বলবৎ। কনভেনশন ১৬৯-এ বাংলাদেশ নেই। তারিখটি ILO-র নিজের অনুসমর্থন-তালিকার।
স্বাধীনতার মাত্র সাত মাসের মাথায় নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি তাৎপর্যপূর্ণ। জুমজার্নালের আর্কাইভে প্রকাশিত একটি লেখায় এর অর্থ এভাবে বলা হয়েছে — এই অনুসমর্থনের মাধ্যমে বাংলাদেশ “‘উপজাতীয়’ ও ‘আদিবাসী’ (বা ইনডিজেনাস) জনগোষ্ঠীদের অধিকার সুরক্ষার ব্যপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছিল।”
একই লেখায় একটি তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ আছে, যা পরিভাষার তর্কের সঙ্গে সরাসরি জড়িত: কনভেনশন ১০৭-এ এমন কিছু বলা নেই যে ‘উপজাতীয়’দের জন্য এক ধরনের ব্যবস্থা থাকবে আর ‘আদিবাসী’দের জন্য আরেক ধরনের। দলিলটি দুটি শব্দকে একসঙ্গেই ধরে।
ILO-র নিয়মে C169 অনুসমর্থন করলে C107 স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়, আর ঠিক এভাবেই নয়টি দেশ পুরনো কনভেনশন ছেড়ে নতুনটিতে গেছে।
ILO-র তালিকা অনুযায়ী এই দেশগুলো হলো আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, কোস্টা রিকা, ইকুয়েডর, মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে ও পেরু — প্রত্যেকের নামের পাশে লেখা “Automatic Denunciation … by convention C169”। পর্তুগাল আলাদাভাবে ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর C107 পরিত্যাগ করেছে।
লক্ষণীয়, এই দেশগুলোর প্রায় সবই লাতিন আমেরিকার। অন্যদিকে C107-এ এখনো বলবৎ অবস্থায় আছে যারা — বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আর এর পাশে অ্যাঙ্গোলা, বেলজিয়াম, কিউবা, ডোমিনিকান রিপাবলিক, মিশর, এল সালভাদর, ঘানা, গিনি-বিসাউ, হাইতি, ইরাক, মালাউই, পানামা, সিরিয়া ও তিউনিসিয়া।
আর C169-এ দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ নেপাল — অনুসমর্থন ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৭, অর্থাৎ UNDRIP গৃহীত হওয়ার ঠিক একদিন পর। সাম্প্রতিক সংযোজন ইউরোপ থেকে: লুক্সেমবার্গ (২০১৮) ও জার্মানি (২০২১)।
জাতিসংঘ-ঘোষিত বর্ষটি বাংলাদেশে সরকারিভাবে উদযাপিত হয়নি, আর যুক্তি ছিল — এদেশে কোনো indigenous জনগোষ্ঠী নেই। আর্কাইভে থাকা ১৯৯৩ সালের প্রবন্ধটি এই অবস্থানটি নথিবদ্ধ করে রেখেছে, এবং তার জবাবও দিয়েছে।
প্রবন্ধটির যুক্তি-কাঠামো কয়েকটি ধাপে এগোয়:
এক. অভিধানে “indigenous” মানে স্থানীয়ভাবে উদ্ভূত। সেই অর্থে জন্মসূত্রে একটি দেশের নাগরিক যে কেউ নিজেকে সেদেশের indigenous বাসিন্দা বলতে পারে। তাহলে শব্দটির নির্দিষ্ট অর্থ কী?
দুই. একটি জনগোষ্ঠীকে indigenous বলার অর্থ, তারাই একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের প্রাচীনতম অধিবাসীদের বংশধর। কিন্তু প্রবন্ধটি নিজেই স্বীকার করছে, “স্পষ্টতই এটি একটি আপেক্ষিক ব্যাপার” — স্থান ও কালের সীমানা কোথায় টানা হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে। অনেক পিছিয়ে গেলে শব্দটি অর্থহীন হয়ে পড়ে, কারণ সব মানুষই শেষ বিচারে এক উৎস থেকে এসেছে।
তিন. তাই শব্দটি অর্থবহ হয় একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে — গত পাঁচশ বছরের ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ। savage, primitive, tribal, Red Indian, Aboriginal — এসব অবজ্ঞাসূচক নাম এড়ানোর জন্যই “indigenous” শব্দের ব্যবহার শুরু হয়।
চার. কিন্তু প্রবন্ধটির মূল যুক্তি এখানে: ধারণাটি কেবল আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার জন্য নয়। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতেও ঔপনিবেশিক শাসন শেষ হওয়ার পর নতুন শাসকশ্রেণী ও সংখ্যাগুরু জাতিগোষ্ঠী নিজেরাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপর একই ধরনের শাসন ও শোষণ চালিয়েছে। এই “আভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতার” শিকার জনগোষ্ঠীগুলোও indigenous অভিধার বৈধ দাবিদার — আর জাতিসংঘের পরিসরে শব্দটির এই সম্প্রসারিত অর্থই দাঁড় করানো হয়েছে।
প্রবন্ধটি একটি সূক্ষ্ম কথাও বলে রাখে, যা প্রায়ই আলোচনায় হারিয়ে যায়: আদিবাসী/উপজাতীয়দের indigenous বলার অর্থ এই নয় যে বাঙালিদের শেকড় এদেশের মাটিতে প্রোথিত নয়। বহু প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে আত্মস্থ করেই বাঙালির ইতিহাস ও আত্মপরিচয় গড়ে উঠেছে। পার্থক্যটি অন্য জায়গায় — বাঙালিরা এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, তাই কোনো বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠীর বিপরীতে তাঁদের indigenous বলার প্রেক্ষাপট নেই।
আর্কাইভের আরেকটি লেখা ১৯৯৩ থেকে ২০১৩ — এই দুই দশকে শব্দটির ভাগ্য অনুসরণ করেছে, আর তার সারকথা হলো শব্দটি ক্রমশ সরকারি পরিসরে অপাংক্তেয় হয়ে পড়েছে।
লেখাটির বর্ণনা অনুযায়ী কোনো প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা জারি হয়নি। কিন্তু ঘটেছে এগুলো:
লেখকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এর পিছনে একটি আইনি হিসাব আছে: দেশে ‘ইনডিজেনাস’ লোকজন নেই — এটি প্রতিষ্ঠিত করা গেলে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এ নামে অভিহিত মানুষদের অধিকার রক্ষার দায় থেকে রাষ্ট্র বেঁচে যায়।
এটি লেখকের বিশ্লেষণ, রাষ্ট্রের ঘোষিত অবস্থান নয় — পার্থক্যটি মনে রাখা দরকার।
২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে একটি নতুন ধারা (২৩ক) যোগ হয়, যেখানে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ ও ‘নৃগোষ্ঠী’ — তিনটি শব্দ আছে, কিন্তু ‘আদিবাসী’ শব্দটি নেই। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী এটিই ছিল শব্দটি সরকারি পরিসরে অপাংক্তেয় হয়ে পড়ার সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ।
লেখাটি জানাচ্ছে, ওই বছরেরই জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে পত্রপত্রিকায় খবর বেরোয় যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকাস্থ কূটনীতিকদের উদ্দেশে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
২০২৬ সালের আদিবাসী দিবস নিয়ে আর্কাইভের লেখাটি সাংবিধানিক ছবিটি এভাবে সাজায়: অনুচ্ছেদ ২৭ সব নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও সমান সুরক্ষার অধিকার দেয়; অনুচ্ছেদ ২৮ ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে; আর ১৫তম সংশোধনী দেশের জাতিগত বৈচিত্র্য স্বীকার করে — কিন্তু আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আদিবাসী জনগণ (Indigenous Peoples)’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।
একই লেখা অনুযায়ী ILO-র বিশেষজ্ঞ কমিটি CEACR বারবার গুরুত্বারোপ করেছে, এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে আদিবাসী জনগণ তাঁদের মৌলিক অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে ভোগ করতে পারেন। অর্থাৎ ১৯৭২-এর অনুসমর্থনের ফলে তদারকির একটি ব্যবস্থা এখনো সক্রিয়।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। আদিবাসী সংগঠনগুলোর হিসাবে প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি। অর্থাৎ দুই হিসাবের ফারাক আড়াই গুণেরও বেশি।
আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী দেশে ৫৪টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস, যাঁরা অন্তত ৩৫টি ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন — চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, সাঁওতাল, ওরাঁও, গারো, মাহাতো, পাংখোয়া, রাখাইন, মুন্ডা, মণিপুরীসহ।
ফারাকটি কেন তৈরি হয়, সেটি এই লেখার উৎসে ব্যাখ্যা করা নেই। তবে প্রশ্নটি নিছক পরিসংখ্যানের নয় — শুমারিতে কে কীভাবে গোনা হবে, তার উপরই নির্ভর করে বাজেট, আসন ও কর্মসূচির হিসাব। ভারতের শুমারিতে জাতিগত পরিচয় গোনা হয়, তানজানিয়ায় হয় না — আর ইনুইট ও মাসাইদের নিয়ে লেখাগুলোতে দেখা গেছে, গোনা আর না-গোনার ফল কত আলাদা।
এই তর্কে দুটি অবস্থান আছে, আর দুটিরই নিজস্ব যুক্তি ও নথি আছে। নিচে কে কী বলে তা–ই দেওয়া হলো, কোনো পক্ষ না নিয়ে।
| প্রশ্ন | রাষ্ট্রের অবস্থান | আদিবাসী সংগঠন ও লেখকদের অবস্থান |
|---|---|---|
| পরিভাষা | সংবিধানের ২৩ক ধারায় ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘নৃগোষ্ঠী’ — ‘আদিবাসী’ নয় | জনগোষ্ঠীগুলো নিজেদের ‘আদিবাসী’ বলে; আন্তর্জাতিক অর্থে শব্দটি প্রযোজ্য |
| UNDRIP | ২০০৭-এ ভোটদানে বিরত | গ্রহণ ও বাস্তবায়নের দাবি |
| ILO | C107 অনুসমর্থিত (১৯৭২), C169 নয় | C169 অনুসমর্থনের দাবি; C107-ও যে দায় তৈরি করে সেই যুক্তি |
| সংখ্যা | ২০২২ শুমারিতে প্রায় ১৬.৫ লাখ, মোটের ~১% | প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ |
| আত্মনিয়ন্ত্রণ | সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রশ্নে সতর্কতা | UNDRIP-এর ৪ ও ৪৬ অনুচ্ছেদ অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসনেই সীমিত রাখে |
UNDRIP-এর তিনটি ধারণা পার্বত্য চট্টগ্রামের চলতি আলোচনার সঙ্গে সরাসরি মেলে — FPIC, ভূমি-প্রতিকারের ক্রম, আর অর্থায়নসহ স্বায়ত্তশাসন।
এক — FPIC। অনুচ্ছেদ ১৯ বলছে, প্রভাবিত করতে পারে এমন আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে সম্মতি নিতে হবে, আর সেটি নিতে হবে জনগোষ্ঠীর নিজেদের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ১৯৯৭ সালের চুক্তিতে আঞ্চলিক পরিষদকে যে পরামর্শের ভূমিকা দেওয়া হয়েছে, তার কাঠামোগত মিল এখানেই।
দুই — প্রতিকারের ক্রম। অনুচ্ছেদ ২৮ আগে বলে পুনরুদ্ধার, তারপর ক্ষতিপূরণ। ভূমি কমিশনের কাজের ক্রমে এই প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে — জমি ফেরানো হবে, না টাকা দেওয়া হবে।
তিন — অর্থায়ন। অনুচ্ছেদ ৪ স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে অর্থায়নের উপায়কেও অধিকারের অংশ করেছে। জেলা পরিষদে বিষয় ও বাজেট হস্তান্তরের আলোচনাটি ঠিক এই প্রশ্নে।
আর একটি কথা শেষে। UNDRIP বাধ্যতামূলক নয়, বাংলাদেশ সেটি গ্রহণও করেনি। কিন্তু ILO কনভেনশন ১০৭ বাধ্যতামূলক, আর বাংলাদেশ সেটিতে ১৯৭২ সাল থেকে আছে — তদারকিসহ। অর্থাৎ পরিভাষার তর্ক যেদিকেই যাক, একটি আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পঞ্চাশ বছরেরও পুরনো।

আদিবাসী অধিকারের জন্য জাতিসংঘে একটিমাত্র দরজা নেই — কয়েকটি আলাদা ব্যবস্থা আছে, আর সেগুলোর ইতিহাসেও বদল এসেছে। পাহাড়ের সংগঠনগুলো কোথায় কী নিয়ে যেতে পারে, সেটি বুঝতে এই কাঠামোটি জানা দরকার।
Working Group on Indigenous Populations (১৯৮২)। প্রথম ব্যবস্থা, মানবাধিকার কমিশনের অধীন সাব-কমিশনের ছয়টি ওয়ার্কিং গ্রুপের একটি। এটিই খসড়া ঘোষণাপত্র তৈরি করে। তবে ২০০৬ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার-কাঠামোয় সংস্কার হয় — মানবাধিকার কমিশন বিলুপ্ত হয়ে মানবাধিকার কাউন্সিল গঠিত হয়, আর তার সঙ্গে পুরনো সাব-কমিশনের ব্যবস্থাটিও শেষ হয়।
Permanent Forum on Indigenous Issues (UNPFII)। জাতিসংঘের নথিতে এই স্থায়ী ফোরামটির উল্লেখ আছে — এর সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন ভিক্তোরিয়া তাউলি-করপুজ, আর সচিবালয়টি UN DESA-র সামাজিক নীতি ও উন্নয়ন বিভাগের অধীনে। ২০১২ সালের পঞ্চম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি ফোরামের একাদশ অধিবেশনের সময় হয়।
২০০৬ সালের ২৯ জুন নতুন মানবাধিকার কাউন্সিলই ঘোষণাপত্রটি গ্রহণ করে — সাধারণ পরিষদে যাওয়ার আগের ধাপ। অর্থাৎ UNDRIP গ্রহণের সময় তিনটি স্তর পেরিয়েছে: ওয়ার্কিং গ্রুপ, কাউন্সিল, তারপর সাধারণ পরিষদ।
ঘোষণাপত্র গ্রহণের পর জাতিসংঘ নিজেই পর্যায়ক্রমে হিসাব নিয়েছে — পাঁচ বছরে একবার, দশ বছরে আরেকবার। এই প্রস্তাবগুলো দেখায় দলিলটি কাগজে পড়ে থাকেনি।
পঞ্চম বার্ষিকী। ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর গৃহীত প্রস্তাব A/RES/66/142-এ সাধারণ পরিষদ মহাসচিবকে অনুরোধ করে স্থায়ী ফোরামের একাদশ অধিবেশনের সময় একটি উচ্চ-পর্যায়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে, যাতে ঘোষণাপত্রের উদ্দেশ্যগুলো অনুসরণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ে। অনুষ্ঠানটি হয় ২০১২ সালের ১৭ মে।
দশম বার্ষিকী। ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বরের প্রস্তাব A/RES/69/159 এবং ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বরের প্রস্তাব A/RES/70/232 — দুটিতেই সিদ্ধান্ত হয় ২০১৭ সালে সাধারণ পরিষদের একাত্তরতম অধিবেশনে একটি উচ্চ-পর্যায়ের অনুষ্ঠান হবে। সেখানে তিনটি কাজ ছিল: আগের দশ বছরের অর্জনের হিসাব নেওয়া, অবশিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো মূল্যায়ন করা, আর একটি তৃতীয় আন্তর্জাতিক দশকের কথা বিবেচনা করা।
তৃতীয় দশকটি শেষে ঘোষিত হয়েছিল কি না, তা এই লেখার উৎসে নেই। তবে ২০২২ সালে শুরু হওয়া আদিবাসী ভাষার দশক (২০২২–২০৩২) চলছে।
আর্কাইভের ১৯৯৩ সালের প্রবন্ধটি একটি কড়া পর্যবেক্ষণ রেখে গেছে, যা আদিবাসী-প্রশ্নের শিকড়ে পৌঁছায়। লেখকের যুক্তি অনুযায়ী মানবজাতির ইতিহাস কেবল বিভাজনের ইতিহাস নয়, মিলনেরও — কিন্তু সেই মিলন অনেক ক্ষেত্রে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ হয়নি, হয়েছে “এক গোষ্ঠী কর্তৃক আরেক গোষ্ঠীর উপর কর্তৃত্ব স্থাপনের মাধ্যমে।”
এই অসম সম্পর্কের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র নামক ব্যবস্থাটির উদ্ভব — আর সেটি বোঝাতেই ‘সভ্যতা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়, যেমন সিন্ধু সভ্যতা, মিশরীয় সভ্যতা, ইনকা সভ্যতা। প্রবন্ধটির সিদ্ধান্ত স্পষ্ট: “আসলে সভ্যতার ইতিহাস এই অর্থে বর্বরতারই ইতিহাস।”
কারণ রাষ্ট্রের উৎপত্তির পর থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগঠিত জনগোষ্ঠীরা দুটি কাজ করেছে — হয় অন্যদের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে, নয়তো তাদের নিশ্চিহ্ন বা বিতাড়িত করে শুধু ভূমিটুকু দখল করেছে।
এই প্রেক্ষাপটেই, প্রবন্ধটির মতে, “indigenous জনগোষ্ঠী” ধারণাটি অর্থবহ হয়। শব্দটি কোনো প্রাগৈতিহাসিক আদিত্বের দাবি নয় — এটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সম্পর্কের নাম, যেখানে একটি জনগোষ্ঠী অন্যের ভূমি ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে নিয়েছে। এটি জানা থাকলে “কে আগে এসেছিল” — এই অমীমাংসেয় তর্কটি থেকে আলোচনাটি সরে আসে।
ঘোষণাপত্রটি জাতিসংঘের ছয়টি সরকারি ভাষায় আছে, আর তার বাইরে বহু আদিবাসী ভাষায় অনানুষ্ঠানিক অনুবাদ হয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের তালিকায় বাংলা নেই।
সরকারি ভাষা ছয়টি — ইংরেজি, স্পেনীয়, ফরাসি, রুশ, আরবি ও চীনা। এর পাশাপাশি জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামের সচিবালয়ে জমা পড়া অনানুষ্ঠানিক অনুবাদের একটি লম্বা তালিকা আছে, যেগুলো বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থা তৈরি করে পাঠিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দুটি নাম সেখানে আছে। হিন্দি — পাঠিয়েছে UNIC India। আর বোড়ো (Boro), ভারতে কথিত একটি আদিবাসী ভাষা — পাঠিয়েছে Indian Confederation of Indigenous and Tribal Peoples North East Zone। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশে একটি আদিবাসী সংগঠন নিজেদের ভাষায় দলিলটি অনুবাদ করে জাতিসংঘে জমা দিয়েছে।
বাংলা ওই তালিকায় নেই। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা বা কোনো পাহাড়ি ভাষাও নেই। জাতিসংঘ নিজেই সতর্ক করে রেখেছে, এই অনুবাদগুলোর পরিভাষা জাতিসংঘের নিজের পরিভাষার সঙ্গে অভিন্ন নয় — তবু একটি জনগোষ্ঠীর নিজের ভাষায় দলিলটি থাকা মানে সেটি আর বিশেষজ্ঞের হাতে আটকে থাকে না।
আর একটি সংস্করণ আছে, যেটি আলাদা করে বলার মতো — কিশোর-উপযোগী সংস্করণ (Know your Rights: Adolescent friendly version), আপাতত ইংরেজি, স্পেনীয় ও রুশে। স্কুলপর্যায়ে অধিকারের ধারণা পৌঁছে দেওয়ার জন্য এটিই সবচেয়ে কাজের দরজা।
১৯৯৩ সালকে। জাতিসংঘ ওই বছরটিকে ঘোষণা করেছিল International Year of the World’s Indigenous People, অর্থাৎ বিশ্ব আদিবাসী জনগণের আন্তর্জাতিক বর্ষ। জুমজার্নালের আর্কাইভে থাকা ওই বছরের সেমিনার-প্রবন্ধে ঘোষণাটিকে বলা হয়েছে “মূলত একটি প্রতীকী পদক্ষেপ”, কারণ এর সঙ্গে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা আসেনি। বাংলাদেশে বর্ষটি সরকারিভাবে উদযাপিত হয়নি।
জাতিসংঘের ব্যাখ্যা অনুযায়ী তারিখটি বেছে নেওয়া হয়েছে ১৯৮২ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের Working Group on Indigenous Populations-এর প্রথম বৈঠকের স্মরণে। অর্থাৎ দিনটি কোনো যুদ্ধজয় বা স্বাধীনতার বার্ষিকী নয়, একটি বৈঠকের বার্ষিকী — যেখানে প্রথমবার আদিবাসী প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের পরিসরে নিজেদের কথা বলার জায়গা পেয়েছিলেন।
UNDRIP হলো United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এটি গ্রহণ করে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, প্রস্তাব নম্বর A/RES/61/295। দলিলটিতে ৪৬টি অনুচ্ছেদ আছে। জাতিসংঘের মূল্যায়নে এটি আদিবাসী অধিকার নিয়ে সবচেয়ে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক দলিল, যা বেঁচে থাকা ও মর্যাদার জন্য সর্বনিম্ন মানের একটি সর্বজনীন কাঠামো দাঁড় করায়।
বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত ছিল। ২০০৭-এর ভোটে পক্ষে ১৪৩ (জাতিসংঘের একই পাতায় অন্যত্র ১৪৪) রাষ্ট্র, বিপক্ষে ৪টি — অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র, আর বিরত ১১টি: আজারবাইজান, বাংলাদেশ, ভুটান, বুরুন্ডি, কলম্বিয়া, জর্জিয়া, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, রাশিয়া, সামোয়া ও ইউক্রেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ নাকচও করেনি, সমর্থনও করেনি।
না। এটি একটি ঘোষণাপত্র, চুক্তি বা কনভেনশন নয় — তাই সই বা অনুসমর্থনের ব্যবস্থা নেই এবং ভঙ্গ করলে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের সুযোগ নেই। তবে এটি সর্বনিম্ন মানের একটি কাঠামো দেয়, বাধ্যতামূলক মানবাধিকার দলিলগুলোর ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হয়, আর ২০০৯ সালের ডারবান রিভিউ সম্মেলনে ১৮২টি রাষ্ট্র সর্বসম্মতভাবে এটিকে স্বাগত জানিয়েছে।
না, এবং ঘোষণাপত্র নিজেই তা স্পষ্ট করেছে। অনুচ্ছেদ ৪৬(১) বলছে, এই দলিলের কিছুই এমনভাবে পড়া যাবে না যা কোনো সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক ঐক্য সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ভাঙা বা ক্ষতিগ্রস্ত করার কাজকে অনুমোদন বা উৎসাহ দেয়। অনুচ্ছেদ ৪ আত্মনিয়ন্ত্রণকে অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে স্বায়ত্তশাসনে সীমিত রাখে।
FPIC মানে free, prior and informed consent — অবাধ, পূর্ব ও অবহিত সম্মতি। UNDRIP-এর অনুচ্ছেদ ১৯ অনুযায়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করতে পারে এমন আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তাদের নিজেদের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই সম্মতি নিতে হবে। অনুচ্ছেদ ৩২ একই শর্ত দেয় তাদের ভূমি প্রভাবিত করে এমন প্রকল্প অনুমোদনের আগে।
নামেই পার্থক্যটি ধরা আছে। C107 হলো Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957, কার্যকর ২ জুন ১৯৫৯; C169 হলো Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989, কার্যকর ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯১। আন্তর্জাতিক আইনে “peoples” শব্দটি আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সঙ্গে আনে, “populations” আনে না। ১৯৫৭-র দলিলের সুর ছিল আত্মীকরণমুখী, ১৯৮৯-এর দলিল স্বতন্ত্রতা ও পরামর্শভিত্তিক।
বাংলাদেশ ILO কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করেছে ১৯৭২ সালের ২২ জুন, আর ILO-র নিজের তালিকা অনুযায়ী সেটি আজও বলবৎ। কনভেনশন ১৬৯-এ বাংলাদেশ নেই। ভারত (২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮) ও পাকিস্তানও (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬০) একইভাবে কেবল ১০৭-এ আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় C169 অনুসমর্থন করেছে কেবল নেপাল, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৭-এ।
২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে যোগ হওয়া এই ধারায় তিনটি সামষ্টিক পরিচয়বাচক শব্দ আছে — ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ ও ‘নৃগোষ্ঠী’ — কিন্তু ‘আদিবাসী’ শব্দটি নেই। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী সংশোধনীটি দেশের জাতিগত বৈচিত্র্য স্বীকার করে, তবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আদিবাসী জনগণ (Indigenous Peoples)’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।
দুটি হিসাব আছে, আর ফারাক আড়াই গুণেরও বেশি। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। আদিবাসী সংগঠনগুলোর হিসাবে প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী দেশে ৫৪টিরও বেশি জনগোষ্ঠীর বসবাস, যাঁরা অন্তত ৩৫টি ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন।
জাতিসংঘের প্রাক্কলন ৪৭ কোটি ৬০ লাখ, ছড়িয়ে আছেন ৯০টি দেশে। তাঁরা বিশ্ব জনসংখ্যার ৬ শতাংশেরও কম, কিন্তু চরম দরিদ্রদের অন্তত ১৫ শতাংশ। তাঁদের ভূখণ্ড পৃথিবীর স্থলভাগের ২৮ শতাংশ জুড়ে, যার মধ্যে বিশ্বের বনের ১১ শতাংশ। তাঁরা ৫,০০০টি ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতিনিধি এবং পৃথিবীর প্রাক্কলিত ৭,০০০ ভাষার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের বক্তা।
এই লেখার ফাঁকগুলো নিচে খোলাখুলি লেখা আছে।
প্রাথমিক উৎস — জুমজার্নালের নিজস্ব আর্কাইভ
আন্তর্জাতিক সরকারি নথি
সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রসঙ্গ:আদিবাসী, আদিবাসী অধিকার, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস, জাতিসংঘ, বাংলাদেশ, ভূমি অধিকার, মানবাধিকার
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।