Jumjournal Logo

খাসিয়া পুঞ্জি কী, আর পান-জুমের একটি গ্রাম আসলে কীভাবে চলে

Last updated Oct 23rd, 2026

0

ভেজা কালো মেঝেতে বসে একজন নারী হাতভর্তি পানপাতা গোছাচ্ছেন, চারপাশে স্তূপ করা সবুজ পানপাতা

শ্রীমঙ্গল শহর ছেড়ে চা-বাগানের ভেতর দিয়ে কাঁচা রাস্তা, তারপর কয়েক মিনিট পায়ে হাঁটা পথ — এভাবেই পৌঁছাতে হয় নাহার পুঞ্জিতে। পুঞ্জির মান্ত্রি ডিবারমিনের বর্ণনায়, তাঁদের পানজুমের সীমানা যেখানে শেষ, সেখানে বাংলাদেশ-ভারতের সীমানা-পিলার (সেং ভালাং – এক সাহসী আদিবাসীর আত্মকথন, জুমজার্নাল, 2017)।

খাসিয়া পুঞ্জি হলো খাসি জনগোষ্ঠীর গ্রাম — সিলেট বিভাগের টিলার ওপর কয়েক ডজন পরিবারের গুচ্ছবসতি, যাকে ঘিরে থাকে বনের বড় গাছ। একটি খাসিয়া পুঞ্জি পান জুম ঘিরেই চলে: সেই গাছে লতিয়ে ওঠা পান পুরুষেরা তোলেন, নারীরা বাছাই করে গুনে বাঁধেন, পাইকার পুঞ্জিতে এসে কিনে নেন। জমি বণ্টন, বিরোধ মেটানো আর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ সামলান পুঞ্জিপ্রধান মান্ত্রি ও তাঁর পরিষদ।

এই লেখা পুঞ্জির দৈনন্দিন অর্থনীতি নিয়ে: পান জুম ঠিক কীভাবে করা হয়, বছরে কবে কোন পান তোলা হয়, পাতা গোনা হয় কোন এককে, দাম কে ঠিক করে, পুঞ্জির জমি কার নামে, আর কেন খবরে বারবার “পানগাছ কেটে ফেলা”র কথা আসে। খাসি সমাজের উত্তরাধিকার, বংশ ও পরিবারের নিয়ম নিয়ে আমাদের আলাদা লেখা আছে — খাসি সমাজে কনিষ্ঠ কন্যার উত্তরাধিকার ও বংশপরিচয়ের নিয়ম; সেখানে যা বলা হয়েছে, এখানে তার পুনরাবৃত্তি নেই।

সূচিপত্র

  1. খাসিয়া পুঞ্জি কী, আর একটি পুঞ্জি কত বড়
  2. পান জুম কী — জুম চাষ থেকে কোথায় আলাদা
  3. খাসিয়া পুঞ্জি পান জুম কীভাবে গড়ে তোলে: ধাপে ধাপে
  4. বছরে পাঁচবার পান তোলা: কোন মাসে কোন পান
  5. উত্রাম, শিলা আর খরা: পান জুমের বিপদ
  6. কে কোন কাজ করেন, আর পান গোনা হয় কোন এককে
  7. পান কোথায় যায়, দাম কে ঠিক করে
  8. একটি পুঞ্জির আয়ের কত অংশ পান থেকে আসে
  9. মান্ত্রি ও পুঞ্জি পরিষদ: গ্রামটি পরিচালনা করেন কে
  10. গির্জা, স্কুল, ভাষা আর বিদ্যুৎ
  11. পুঞ্জির জমি কার নামে: ইজারা, খতিয়ান আর দাবি
  12. চা-বাগান, বন বিভাগ আর পানগাছ কাটা: ঘটনাপঞ্জি
  13. পান জুম কি বন বাঁচায়, না বন দখল করে — দুই পক্ষের কথা
  14. পানের বাইরে: গরু, কফি, পর্যটন
  15. প্রশ্নোত্তর
  16. যা এখনো জানা যায়নি
  17. তথ্যসূত্র

খাসিয়া পুঞ্জি কী, আর একটি পুঞ্জি কত বড়

বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায়, “খাসিয়ারা গ্রামকে পুঞ্জি বলে”; গ্রামগুলো অন্য সম্প্রদায় থেকে আলাদা, নিজস্ব সীমানা ও সাংস্কৃতিক বলয়ে গুচ্ছবদ্ধ। সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে একেকটি পুঞ্জিতে 22 থেকে 72টির মতো পরিবারের কথা পাওয়া যায়; বসতি সাধারণত টিলার মাথায়, চারপাশে পানের জুম।

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা (Haider ও সহকর্মী, 2013) পুঞ্জিকে বর্ণনা করেছেন পাহাড় বা টিলার ওপরে গড়ে ওঠা গুচ্ছগ্রাম হিসেবে। জাফলংয়ের পুঞ্জিগুলো নিয়ে প্রথম আলোর 2026 সালের একটি ভ্রমণ-প্রতিবেদন আরেকটি বৈশিষ্ট্য লিখেছে: সেখানে বাড়িগুলো মাটি থেকে কিছুটা উঁচুতে মাচার ওপর, কোনোটি বাঁশের, কোনোটি পাকা। বাংলাপিডিয়াও কাঠ বা বাঁশের মঞ্চের ওপর বারান্দাসহ ঘরের কথা লিখেছে, পাশাপাশি জানিয়েছে যে এখন বাঙালিদের মতো ঘরও তৈরি হয়।

টিলার ওপর টিনের চালার মাটির ও পাকা ঘরের সারি, উঠানে দড়িতে কাপড় শুকাচ্ছে, পেছনে সুপারি ও বনের গাছ
শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের আশপাশের একটি খাসি পুঞ্জি, ফেব্রুয়ারি 2016। ছবি: David Stanley · CC BY 2.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

কয়টি পুঞ্জি আছে

মোট পুঞ্জির সংখ্যা উৎসভেদে আলাদা। বাংলাপিডিয়া হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার সীমান্তে 5টি, মৌলভীবাজারে 61টি আর সিলেট জেলায় 7টি পুঞ্জির কথা বলে। Md. Faisal Ahmmed (2005) Rahman (2004)-এর বরাতে 71টি পুঞ্জির নাম সংগৃহীত হওয়ার কথা লিখেছেন, আর আনুমানিক 90টি খাসি গ্রামের কথাও। Rajmoni Singha (2014) Potam (2010)-এর বরাতে বলেছেন 85টি। খাসি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রচার সম্পাদক সাজু মার্চিয়াং 2023 সালে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন, সিলেট বিভাগে মোট 90টি পুঞ্জি। জেলা-উপজেলাভিত্তিক বিস্তারিত ছক ও জনসংখ্যার হিসাব আছে আমাদের খাসি উত্তরাধিকার-বিষয়ক লেখায় এবং জনশুমারি 2022-এর জাতিভিত্তিক জনসংখ্যার লেখায়।

কয়েকটি পুঞ্জির আকার, উৎস ধরে ধরে

নিচের ছকটি বিভিন্ন প্রতিবেদন ও গবেষণা থেকে সংকলিত। সংখ্যাগুলো যে বছরের, সে বছরের — পরে বদলে থাকতে পারে।

পুঞ্জিউপজেলাপরিবার / মানুষউৎস ও সাল
মাগুরছড়াকমলগঞ্জ205 জন (2003)Singha, 2014
Doublecheraকমলগঞ্জ277 জন (2003)Singha, 2014
লাউয়াছড়াশ্রীমঙ্গল30টি পরিবারপ্রথম আলো, 2024
হোসনাবাদশ্রীমঙ্গল27টি পরিবার, প্রায় 200 জনপ্রথম আলো, 2023
ডলুছড়াকুলাউড়া50টি পরিবারপ্রথম আলো, 2021
ভেলুয়াকুলাউড়া70টি পরিবারপ্রথম আলো, 2021
ইছাছড়াকুলাউড়া52টি পরিবারদ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 2020
আগারবড়লেখা48টি পরিবারদ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 2021
Jhimaiকুলাউড়া72টি পরিবার (2015); প্রায় 500 জন (2019)The Daily Star, 2015; NE Now, 2019
Sahebtilaকুলাউড়াঅন্তত 22টি পরিবারThe Daily Star, 2019
Pallathalবড়লেখাপ্রায় 50টি পরিবার, প্রায় 250 জনThe Daily Star, 2016
লামাগোয়াইনঘাট47টি পরিবারদ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 2025
প্রতাপপুরগোয়াইনঘাট25টি পরিবার (লামাসহ দুই পুঞ্জিতে প্রায় 410 জন)দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ও Radio Veritas Asia, 2025

যেসব পুঞ্জির নামের কোনো বাংলা বানান উৎসে পাওয়া যায়নি, ছকে সেগুলো ইংরেজি উৎসের বানানেই রাখা হয়েছে। Jhimai-এর আকার নিয়ে উৎসে অমিল আছে: দ্য ডেইলি স্টার (আগস্ট 2015) 72টি পরিবারের কথা লিখেছে, একই পত্রিকা এপ্রিল 2015-এ কুলাউড়ার ইউএনও-র জরিপের বরাতে 59টি পরিবার বলেছে, আর আরেকটি প্রতিবেদনে (এপ্রিল 2015) 72টি পরিবারের প্রায় 1,400 মানুষ পাঁচটি গ্রামে আটকে পড়ার কথা আছে।

পান জুম কী — জুম চাষ থেকে কোথায় আলাদা

পান জুম হলো বনের বড় গাছকে খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে পানের লতা চাষ — খাসিদের নিজস্ব ধরন, যাকে গবেষকেরা “গাছপান” বা “খাসিয়া পান” বলেছেন। সমতলের বাঁশ-খড়ের ঘেরা “বরজ পান” থেকে এটি আলাদা। নামে “জুম” থাকলেও এটি আগুনে পুড়িয়ে প্রতি বছর জায়গা বদলানো জুম চাষ নয়; লতা একই গাছে বহু বছর ফলন দেয়।

Haider ও সহকর্মীরা (2013) চাষের ধরন অনুযায়ী পানকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: সমতলের বরজ পান আর গাছপান। বৃহত্তর সিলেটে খাসিরা যে গাছপান করেন, স্থানীয়ভাবে তাকে “খাসিয়া পান” বলা হয়; তাঁদের হিসাবে পাশের এলাকার বাঙালিরাও বাড়ির আশপাশে খাসিয়া পান চাষ করেন। মোঙ্গাবে-র 2025 সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী খাসি ভাষায় পান জুমকে বলা হয় Bri।

প্রথম আলো 2024 সালের এক প্রতিবেদনে “পানজুম” শব্দটির ব্যাখ্যা দিয়েছে বন্ধনীতে — “পানের খেত/বরজ” — আর “পানপুঞ্জি”র ব্যাখ্যা দিয়েছে “আদিবাসী গ্রাম”। শব্দ দুটি সিলেট অঞ্চলের সংবাদে নিয়মিত ব্যবহৃত হয়।

জুম চাষের সঙ্গে সম্পর্ক কতটুকু

Singha (2014) লিখেছেন, পুড়িয়ে চাষ করার (slash and burn) পদ্ধতি খাসি সমাজে সাধারণ নয়; যেখানে তা করা হয়, পোড়া জমিতে প্রথমে আদা, লেবু আর মিষ্টি আলু লাগানো হয়, তারপর পানের জন্য গাছ লাগানো শুরু হয়। Rahman ও সহকর্মীদের (2009) জৈন্তাপুরের গবেষণা পান জুমের এলাকাকে বর্ণনা করেছে “একসময় খাসিদের জুম চাষে ব্যবহৃত বনভূমি” হিসেবে। Haider ও সহকর্মীদের (2013) হিসাবে খাসিদের প্রধান পেশা একসময় ছিল সমতলে ধান আর লেবু, পান, সুপারি ও ফলের চাষ; এখন পানই জীবিকার মূল উৎস।

পান জুমেরও একটা আয়ু আছে। নাহার পুঞ্জির মান্ত্রি ডিবারমিন বলেছেন, একটানা 10–12 বছর একটি পাহাড়ে পান চাষ করলে পানজুমের উর্বরতা কমে যায়, তাই তাঁদের পূর্বপুরুষেরা নির্দিষ্ট সময় অন্তর জুমের জায়গা বদলাতেন। Singha (2014) আরও দীর্ঘ সময়ের কথা লিখেছেন: ইজারার জমি 30–40 বছর পর মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ায় আর পানের উপযুক্ত থাকে না।

সরু ও লম্বা গাছের ঘন বন, নিচে কলা ও আদা জাতীয় গাছের ঝোপ
নাহার পুঞ্জির বন, শ্রীমঙ্গল। এ ধরনের বনের গাছেই পানের লতা তোলা হয়। ছবি: বাবলু চাকমা, জুমজার্নাল আর্কাইভ (2017)

খাসিয়া পুঞ্জি পান জুম কীভাবে গড়ে তোলে: ধাপে ধাপে

পান জুম শুরু হয় উপযুক্ত গাছ বেছে নিয়ে। তারপর পুরোনো লতা কেটে কলম বানানো, জুন-আগস্টে গাছের গোড়ায় লাগানো, গাছের ডাল ছেঁটে আলো ঢোকানো, ছাঁটা ডাল-পাতা গোড়ায় জমিয়ে মালচ করা — এই ধারাবাহিকতায় লতা গাছ বেয়ে ওঠে। মৌলভীবাজারের তিনটি পুঞ্জিতে 2010–2011 সালের মাঠ-গবেষণা থেকে Haider ও সহকর্মীরা (2013) ধাপগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন।

গবেষণাটি হয়েছিল লাউয়াছড়া, কালেঞ্জি ও Patrakhola পুঞ্জিতে, খাসি সম্প্রদায়ের অনুমতি নিয়ে। নিচের ধাপগুলো সেই গবেষণাপত্র থেকে; খাসি শব্দগুলো গবেষণাপত্রে যেভাবে রোমান হরফে লেখা, সেভাবেই রাখা হলো।

  1. জমি ও গাছ বাছাই। হালকা ছাউনির প্রাকৃতিক বা লাগানো বন বেছে নেওয়া হয়। প্রাকৃতিকভাবে গজানো চারাকে 4–5 বছর বাড়তে দেওয়া হয়; সেগুলো 3–4 মিটার উঁচু হলে পাশে লতা লাগানো হয়।
  2. কলম তৈরি। লাগানোর উপকরণ লতার কাটা অংশ, খাসি ভাষায় boot-tang। অন্তত 3 বছর বয়সী রোগমুক্ত লতা থেকে কলম নেওয়া হয়। খুঁটি-গাছ সরু হলে (বেড় 20–50 সেমি) দুই শাখার কলম, মাঝারি হলে (50–90 সেমি) চার শাখার, মোটা হলে (90 সেমির বেশি) ছয় শাখার। শক্ত, ফ্যাকাশে হলুদ কলম বাদ দেওয়া হয় — খাসিরা একে বলেন thla, অর্থাৎ অনুর্বর।
  3. লাগানো। সবচেয়ে ভালো সময় জুন থেকে আগস্ট। গাছের গোড়ায় 20×20×30 সেমি গর্ত করে কলমের দুটি গিঁট মাটির নিচে আর একটি ওপরে রেখে লাগানো হয়।
  4. নতুন লতার যত্ন। 15–20 দিনে নতুন ডগা বের হয়। লতা মাটিতে গড়িয়ে গেলে গাছের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়।
  5. গাছ ছাঁটা। খুঁটি-গাছের 50–60 শতাংশ ডাল ছেঁটে ফেলা হয়, যাতে লতায় আলো-বাতাস পৌঁছায়। নতুন জুমে লাগানোর 3–4 সপ্তাহের মধ্যে, পুরোনো জুমে জুন-আগস্টে।
  6. মালচ। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ছাঁটা ডাল-পাতা টুকরো করে গাছের গোড়ায় জমানো হয়; পচে গিয়ে তা লতার খাদ্য জোগায়। ঢালে মালচ আটকে রাখতে খুঁটি পোঁতা হয়।
  7. সার। এপ্রিল-মে মাসে প্রতি গাছের গোড়ায় 2–3 কেজি শুকনো গোবর। কেউ কেউ খৈল মেশান। অল্প কিছু চাষি রাসায়নিক সার দেন, তবে বেশির ভাগই মাটি নষ্ট হওয়ার ভয়ে তা এড়িয়ে চলেন।
  8. সেচ। সাধারণ রীতি নয়। শুষ্ক মৌসুমে (ডিসেম্বর-মার্চ) কাছের ছড়া থেকে পানি দেওয়া হয়; সচ্ছল চাষিরা নলকূপ বসিয়ে পাইপে পানি দেন।

কোন গাছে পান ভালো ওঠে

একই গবেষণায় পান জুমে খুঁটি-গাছ হিসেবে 86টি প্রজাতির গাছ নথিভুক্ত হয়েছে; হেক্টরপ্রতি চারা বাদে গাছের ঘনত্ব 1,452টি। খাসি চাষিদের মতে সবচেয়ে উপযুক্ত দুটি গাছ চাপালিশ (Artocarpus chama) আর সুপারি (Areca catechu)। গুরুত্বপূর্ণ কাঠগাছের তালিকায় আছে আওয়াল, কালোজাম, তুন, কানাক, বনশিমুল, কদম, ডুমুর, পুতিজাম ও কাঁঠাল।

বড়লেখার আগার পুঞ্জির প্রধান সুখমন আমসে 2021 সালে দ্য ডেইলি স্টারকে কথাটা সরাসরি বলেছেন: জুমে বড় গাছ না থাকলে “পান গাছের লত উঠবে না”। সেখানে জুমে চাপালিশ, জাম, কাঁঠাল, আওয়াল, হরীতকী, বহেড়াসহ নানা গাছ ছিল বলে প্রতিবেদনটি জানিয়েছে।

মোঙ্গাবে (2025) আরও দুটি তথ্য দিয়েছে: অন্তত প্রতি তিন হাত অন্তর একটি খুঁটি-গাছ রাখা হয়, আর পাহাড়ের ঢালে লাঙল দেওয়া খাসিরা এড়িয়ে চলেন — মাগুরছড়া পুঞ্জির মান্ত্রি জিডিশন প্রধান সুছিয়াংয়ের ভাষায়, তাঁদের বিশ্বাস লাঙল বনের মেঝে ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে। হলুদ, আদা ও আনারস চাষের চেষ্টা তাঁরা ছেড়ে দিয়েছিলেন এই কারণেই।

বছরে পাঁচবার পান তোলা: কোন মাসে কোন পান

একটি লতা থেকে বছরে পাঁচবার পান তোলা হয়, প্রতিবারের নাম আলাদা। এপ্রিল-মে মাসে নতুন কচি পাতা, জুন থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সবচেয়ে বড় ফলন, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বেছে বেছে নিচের পাতা, নভেম্বর-ডিসেম্বরে ডগার পাতা, আর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বাকি সব পাতা — এই হিসাব Haider ও সহকর্মীদের (2013)।

খাসি নাম (গবেষণাপত্রের বানানে)সময়কী তোলা হয়
Hat lobor (প্রথম আলোর বানানে “লবর”)মধ্য-এপ্রিল থেকে মেনতুন ছোট নরম পাতার মৌসুম; প্রতিটি শাখা থেকে তুলনামূলক শক্ত পাতা, সঙ্গে শুকনো বা নষ্ট পাতা সরানো
Hat sumarজুন থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝিসবচেয়ে বেশি ফলন; মূল লতার পাতার দুই-তৃতীয়াংশ তোলা, কম ফলনের লতা ছাঁটা
Hat basiaসেপ্টেম্বর-অক্টোবরবেছে বেছে, শাখার নিচের দিক থেকে 2–3টি পাতা
Hat canditমধ্য-নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরডগার দিকের পাতা, আর যে পাতা শুকনো মৌসুমে ঝরে যেতে পারে
Hat khia বা Long khongজানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিআকার নির্বিশেষে বাকি সব পাতা

প্রথম আলোর 2024 সালের প্রতিবেদনেও চাষিদের বরাতে বলা হয়েছে, সাধারণত এপ্রিল থেকে “লবর” বা নতুন পাতা তোলার মৌসুম শুরু হয়। মূল লতার পাতাকে খাসি চাষিরা “বেটি পান” আর পাশের শাখার পাতাকে “বেটা পান” বলেন; গবেষণাপত্রের হিসাবে বেটি পান তুলনামূলক কম ঝাঁঝালো।

উঁচু গাছ থেকে পাতা তুলতে একটিমাত্র বাঁশ দিয়ে তৈরি বিশেষ মই ব্যবহার করা হয়, যার নাম গবেষণাপত্রে Lo-u। যাঁরা পাতা তোলেন, তাঁরা বুড়ো আঙুলের নখ একটু লম্বা রাখেন — নখ দিয়েই পাতা ছেঁড়া হয়। তোলা পাতা ঘরে আনা হয় একধরনের বিশেষ ঝুড়িতে।

লাগানো থেকে প্রথম ফলন পর্যন্ত কত সময় লাগে

এ নিয়ে উৎসে দুই রকম হিসাব আছে। Haider ও সহকর্মীরা (2013) লিখেছেন, পান তোলা সাধারণত শুরু হয় 3 বছর বয়সে, আর একটি লতার উৎপাদনশীল আয়ু 12–15 বছর। গোয়াইনঘাটের লামা পুঞ্জির হেডম্যান রিসন কংওয়াং 2025 সালে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন, একটি পান বাগান পরিপক্ব হতে প্রায় দুই বছর লাগে; Radio Veritas Asia-র প্রতিবেদনেও গ্রামবাসীর বরাতে প্রায় দুই বছরের কথা আছে।

এই সময়ের হিসাবটাই বোঝায়, কেন পানগাছ কেটে ফেলা এত বড় ক্ষতি: যে লতা কাটা পড়ল, তার জায়গায় নতুন লতা থেকে আবার ফলন পেতে কয়েক বছর লাগে।

উত্রাম, শিলা আর খরা: পান জুমের বিপদ

পান জুমের সবচেয়ে ভয়ের রোগ দুটি — পাতা পচা, যাকে খাসিরা “উত্রাম” বলেন, আর শিকড় পচা। এর সঙ্গে আছে এপ্রিল-মে মাসের শিলাবৃষ্টি, যা নতুন পাতা ফুটো করে উত্রামের পথ খুলে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনিয়মিত বৃষ্টি আর খরায় ফলন কমার কথাও চাষিরা বলছেন।

উত্রাম আর শিকড় পচা

Haider ও সহকর্মীদের (2013) বিবরণে পাতা পচার খাসি নাম uthram। প্রথমে পাতায় দাগ পড়ে, পাতার মাঝখান বা ডগা গাঢ় বাদামি-হলুদ হয়ে যায়; সময়মতো আক্রান্ত পাতা না কাটলে এক সপ্তাহে অর্ধেক পান আক্রান্ত হয়ে মূল লতায় ছড়ায়। বৃষ্টি ও আর্দ্রতা বেশি থাকলে (জুন-আগস্ট) রোগটি বেশি হয়। আক্রান্ত লতা উপড়ে মাটির নিচে পুড়িয়ে ফেলা হয়, আর জমিটি 1–3 বছর ফেলে রাখা হয়। খাসিদের বিশ্বাস, রোগটি পিঁপড়া, পোকা, কাঠবিড়ালি ও পাখির মাধ্যমে ছড়ায়; আক্রান্ত লতা পরিষ্কারের পর কাপড় ধুয়ে গরম পানিতে স্নান করা হয়।

শিকড় পচার খাসি নাম গবেষণাপত্রে ukhlam। লতার সব পাতা হলুদ হয়ে দুই-তিন দিনে লতা মারা যায়, আর এক সপ্তাহে পুরো জুমে ছড়াতে পারে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে এর কোনো প্রতিরোধ বা প্রতিকার খাসিদের জানা নেই; অনেকে একে “অভিশাপ” মনে করেন।

শিলাবৃষ্টি: 2024 সালের উদাহরণ

প্রথম আলো (8 মে 2024) জানিয়েছে, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে কয়েক দফা কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টিতে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া, বালিশিরা, মাগুরছড়া, দেবলছড়া, গবিনছড়া, কাটাবিল, কুরমা, কালেঞ্জিসহ বিভিন্ন পুঞ্জির পানজুমে ব্যাপক ক্ষতি হয়। খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ও লাউয়াছড়া পুঞ্জির মান্ত্রী ফিলা পতমীর হিসাবে শুধু লাউয়াছড়াতেই 15 থেকে 20 লাখ টাকার পানের ক্ষতি হয়েছিল।

একই প্রতিবেদনে মাগুরছড়ার মান্ত্রী জিডিশন প্রধান সুছিয়াং বলেছেন, পাতা ছিঁড়ে বা ঝরে গেলে অতটা ক্ষতি নয়; বড় আশঙ্কা হলো ফুটো বা দাগ থেকে উত্রাম সৃষ্টি হওয়া। খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রচার সম্পাদক সাজু মারছিয়াং জানিয়েছেন, শীতের খরা থেকে বাঁচাতে অনেক চাষি ঋণ করে গভীর নলকূপ বসিয়েছিলেন।

বৃষ্টির ধরন বদলানো

মোঙ্গাবে (সেপ্টেম্বর 2025) হবিগঞ্জের বাহুবলের Aliachhara পুঞ্জির অভিজ্ঞতা লিখেছে। পুঞ্জির মান্ত্রির ভাষ্যে, 2024 সালে এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে তিনবার পান তোলা গিয়েছিল, কিন্তু 2025 সালে একবারই। আরেক চাষি বলেছেন, জুলাই-আগস্ট সাধারণত নতুন লতা লাগানোর সময়, কিন্তু বৃষ্টির অভাবে অনেক চারা মরে গেছে। একই মান্ত্রি 2017 সালে সিলেট অঞ্চলজুড়ে পান জুমে এক ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কথাও স্মরণ করেছেন।

কে কোন কাজ করেন, আর পান গোনা হয় কোন এককে

উৎসগুলো একমত: পুরুষেরা লতা লাগান, যত্ন নেন ও গাছ থেকে পান তোলেন; নারীরা পাতা বাছাই করে গুনে আঁটি বাঁধেন আর বিক্রির জন্য তৈরি করেন। পান গোনা হয় বারোর গুণিতকে — 12 পাতায় এক ছোট আঁটি, 144 পাতায় এক বড় আঁটি, আর 2,880 পাতায় এক কুড়ি; কুড়ি ধরেই বাজারে বিক্রি।

Singha (2014) মাগুরছড়া ও Doublechera পুঞ্জির মাঠ-গবেষণায় লিখেছেন, পানপাতা বাজারের জন্য গোছানো নারীদের দায়িত্ব, আর পান লাগানো, যত্ন ও তোলা পুরুষদের। Haider ও সহকর্মীরা (2013) একই বিভাজন পেয়েছেন, সঙ্গে যোগ করেছেন যে কখনো কখনো পান তোলায় মজুরিভিত্তিক শ্রমিকও নেওয়া হয়। দ্য ডেইলি স্টার (2019) লিখেছে, নারীরা পান বাছাই, বিক্রি ও হিসাবের খাতা রাখেন। নাহার পুঞ্জির মান্ত্রি ডিবারমিনের ভাষায়ও পুঞ্জির অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অংশ — পান বাছাই, বাঁধাই ও বিক্রি — নারীরাই দেখেন।

ভেজা কালো মেঝেতে বসে একজন নারী হাতভর্তি পানপাতা গোছাচ্ছেন, চারপাশে স্তূপ করা সবুজ পানপাতা
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের কাছের একটি খাসিয়া গ্রামে পানপাতা গোছানো, শ্রীমঙ্গল। ছবি: Adam Jones · CC BY-SA 2.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

তোলা পাতা পলিথিন বা কলাপাতার ওপর রেখে পানি ছিটানো হয়, যাতে তাজা থাকে; তারপর বাছাই করে ছোট ছোট আঁটি। আঁটি বাঁধা হয় একধরনের গুল্মের ডাঁটার ফালি দিয়ে (Haider ও সহকর্মীরা গাছটিকে Alpinia nigra হিসেবে শনাক্ত করেছেন, যা জুমেই কলাগাছের সঙ্গে জন্মায়); Singha লিখেছেন বেত দিয়ে বাঁধার কথা।

গোনার একক: চার উৎস, তিন রকম নাম

উৎস12 পাতা144 পাতা2,880 পাতা
Singha, 2014 (মাগুরছড়া, Doublechera)gushigutakuri
Haider ও সহকর্মী, 2013 (লাউয়াছড়া, কালেঞ্জি, Patrakhola)gucikanta (12 guci)kuri (20 kanta)
The Daily Star, 2014 (ইছাছড়া পুঞ্জির এক চাষির বরাতে)—motakuri (20 mota)
জুমজার্নালের খাসি উত্তরাধিকার-বিষয়ক লেখা (Singha-র বরাতে)গুশিগুটাকুড়ি

অঙ্ক তিনটি (12, 144, 2,880) সব উৎসে এক; শুধু মাঝের এককের নাম আলাদা। সীমান্তের ওপারে আসামের কাছাড় জেলার একটি খাসি গ্রামে (Nath ও সহকর্মী, 2016) হিসাব আলাদা — সেখানে এক আঁটিতে 360 পাতা, নাম mora। এটি ভারতের একটি গ্রামের তথ্য; বাংলাদেশের পুঞ্জির জন্য প্রযোজ্য কি না, উৎসে বলা নেই।

পান গোছানো খাসি উৎসবেও জায়গা পেয়েছে। মাগুরছড়া পুঞ্জির মাঠে খাসি বর্ষবিদায় “সেং কুটস্নেম”-এ পুরুষেরা যখন তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওঠা বা তির ছোড়ার প্রতিযোগিতায়, নারীরা তখন পান গোছানোর প্রতিযোগিতায় — কে কত কম সময়ে গোছাতে পারেন (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 2023; প্রথম আলো, 2024)।

পান জুমে মজুরি-শ্রম

পুঞ্জির সবার নিজের পান জুম নেই। Ahmmed (2005) লিখেছেন, যাঁদের পান চাষের জমি নেই, তাঁদের দরিদ্র গণ্য করা হয় এবং তাঁরা মূলত প্রতিবেশীর পান জুমে মজুরি-শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন; সম্প্রদায়ের বাইরে কেউ মজুরি খাটতে যান না। গোয়াইনঘাটের লামা ও প্রতাপপুর পুঞ্জির বাসিন্দারা 2025 সালে জানিয়েছেন, প্রতিটি পান বাগানে 15–20 জন শ্রমিক কাজ করেন (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা); Radio Veritas Asia-র প্রতিবেদনে গ্রামবাসীর বরাতে আরও বলা হয়েছে, আয়ের প্রায় 75 শতাংশ যায় শ্রমিকের মজুরি ও চাষের খরচে।

পান কোথায় যায়, দাম কে ঠিক করে

খাসিয়া পান সাধারণত পুঞ্জি থেকেই বিক্রি হয় — বাঙালি পাইকার পুঞ্জিতে এসে কুড়ি ধরে কিনে নেন। এতে বাজারে যাওয়ার ঝুঁকি কমে, কিন্তু উৎসগুলো বলছে দামও কম মেলে; আগাম ঋণ নেওয়া চাষিকে ঋণদাতার কাছেই বিক্রি করতে হয়। দাম ওঠানামা করে মৌসুম ও ফলনের সঙ্গে।

বাংলাপিডিয়া লিখেছে, খাসিদের উৎপাদিত পণ্য ব্যবসায়ীরা পুঞ্জি থেকেই কিনে নেন; নারীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পাহাড় থেকে হাটে নামেন। মোঙ্গাবে (2025) Aliachhara পুঞ্জিতে একই চক্র দেখেছে: সন্ধ্যায় বা পরদিন সকালে ব্যবসায়ীরা এসে আঁটি কিনে নেন, আর চক্র আবার শুরু হয়। কুলাউড়ার ডলুছড়ায় 2021 সালের বিরোধের সময় “বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকাররা পান কিনতে” পুঞ্জিতে যেতে চাইলে রাস্তায় বাধা পান বলে প্রথম আলো জানিয়েছে — অর্থাৎ পুঞ্জিতে ঢোকার রাস্তাই বিক্রির পথ।

সরাসরি বাজারে কেন নয়

Singha (2014) লিখেছেন, খাসিরা বাজারে বাঙালি ব্যবসায়ীদের কাছে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ করেন — ব্যবসায়ীরা টাকা ধার নিয়ে ফেরত দেননি। তাই তাঁরা পুঞ্জি থেকে সরাসরি বিক্রির কৌশল নেন, যা তাঁদের কাছে নিরাপদ; কিন্তু তাতে বাঙালি ব্যবসায়ীরা সাধারণত বাজারদরের চেয়ে কম দামে কেনেন। কখনো পুঞ্জির ভেতরের একজন খাসি ব্যবসায়ী পরিবারগুলো থেকে পান জোগাড় করে বাঙালি ব্যবসায়ীর কাছে বেচেন, তবে Singha-র পর্যবেক্ষণে পুঞ্জিবাসী এমন “ব্যবসায়ী-মনস্ক” মানুষকে ভালো চোখে দেখেন না।

Ahmmed (2005) আরও কড়া ভাষায় লিখেছেন: বিপণন পুরোপুরি মূলধারার মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে; দরিদ্র খাসিরা পান চাষের জন্য মধ্যস্বত্বভোগীর কাছ থেকে ঋণ নেন, আর ঋণ শোধ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর কাছেই, তাঁর ঠিক করা দামে বিক্রি করতে বাধ্য থাকেন। জমির বৈধ কাগজ না থাকায় সরকারি ঋণও মেলে না — বন্ধক রাখার মতো দলিল নেই।

দামের ওঠানামা

দ্য ডেইলি স্টার (10 সেপ্টেম্বর 2014) মৌলভীবাজারে পানের দাম ধসের খবর দিয়েছিল। কুলাউড়ার ইছাছড়া পুঞ্জির এক চাষির হিসাবে তখন এক কুড়ি বিক্রি হচ্ছিল 200 টাকায়, যেখানে আগের বছর ছিল 2,000–3,000 টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী জেলার প্রায় পাঁচ হাজার খাসি চাষি এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর মৌলভীবাজারের সাতটি উপজেলায় 80টির বেশি পান বাগান ছিল। ইছাছড়ার হেডম্যান পাইকারদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করেছিলেন; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জানিয়েছিলেন, পান চাষের জন্য তাঁদের কোনো বিশেষ বাজেট নেই।

একই প্রতিবেদনে আরেক চাষি বলেছেন, তিনি দুই বছর আগে গ্রামের সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে পান লাগিয়েছিলেন। অর্থাৎ অন্তত কিছু পুঞ্জিতে নিজস্ব ঋণ-সমিতিও কাজ করে।

সীমান্ত-বাণিজ্য

বাংলাপিডিয়া লিখেছে, চা-বাগানের কাজ ছাড়াও সীমান্তের এপার-ওপার খাসিরা পান, কমলা, মাছ, চাল ইত্যাদির ব্যবসা করেন, এর জন্য নির্দিষ্ট বাজার আছে, আর খাসি নারীরা সেসব বাজারে মালামাল আনা-নেওয়া ও বেচাকেনা করেন। এই বাণিজ্য এখন কতটা চালু, সাম্প্রতিক কোনো উৎসে তার হিসাব পাওয়া যায়নি।

একটি পুঞ্জির আয়ের কত অংশ পান থেকে আসে

যে গবেষণাগুলো মেপেছে, সবগুলোতেই পান খাসি পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস: লাউয়াছড়ার দুই পুঞ্জিতে গড় বার্ষিক আয়ের প্রায় 71 শতাংশ, জৈন্তাপুরে 95 শতাংশের বেশি পরিবার পান চাষে যুক্ত, আর সামগ্রিক হিসাবে প্রায় 75.5 শতাংশ খাসি পান চাষে জড়িত। সংখ্যাগুলো আলাদা জায়গার, আলাদা সালের।

গবেষণাএলাকাযা পাওয়া গেছে
Islam ও Nath, 2014লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরের দুটি পুঞ্জি, 48টি খানাগড় বার্ষিক আয়ের প্রায় 71% পান চাষ থেকে, কৃষকের শ্রেণি নির্বিশেষে; দরিদ্র কৃষকের আয়ের গড়ে 14% বনজ সম্পদ থেকে (মাঝারি 10%, ধনী 6%)
Rahman, Rahman ও Islam, 2009জৈন্তাপুর, সিলেট95.45% খানা পান চাষে যুক্ত; হেক্টরপ্রতি পান থেকে গড় বার্ষিক আয় 80,979 টাকা; লাভ-খরচ অনুপাত 4.47
Singha, 2014 (Costa ও Dutta, 2007-এর বরাতে)বাংলাদেশের খাসি সামগ্রিকভাবেপ্রায় 75.5% খাসি পান চাষে যুক্ত
Haider ও সহকর্মী, 2013মৌলভীবাজার80%-এর বেশি খাসি গাছপানের ওপর নির্ভরশীল (অন্য গবেষণার বরাতে); পরিবারপ্রতি গড় খামার প্রায় 1.21 হেক্টর

জৈন্তাপুরের গবেষণাটি আরও জানিয়েছে, সেখানকার খাসি খানার গড় আকার 7.68 জন, আর গবেষণা এলাকার খাসিরা শতভাগ সাক্ষর — গবেষকদের ভাষায় “একটি বিস্ময়কর তথ্য”। সেখানে বাড়ির বাগানে 15টি কাঠগাছ, 22টি উদ্যানফসল, 6টি ঔষধি, 13টি বর্ষজীবী ফসল, 7টি মসলা আর 5টি বাঁশের প্রজাতি নথিভুক্ত হয়েছে।

সব পুঞ্জি এক নয়। Singha (2014) লিখেছেন, সিলেট জেলার খাসিরা কমলা, ধান আর সুপারিও উৎপাদন করেন, কিন্তু মৌলভীবাজারের বেশির ভাগ খাসি এলাকায় সুপারি হয় না; সেখানে পানের পাশাপাশি ধান, ভুট্টা, মিষ্টি আলু ও লেবু। Ahmmed (2005) লেবু, গোলমরিচ, কাঁঠাল ও সুপারির ছোট আকারের চাষ, শূকর পালন, আর অল্প কিছু কামার ও হস্তশিল্পীর কথা লিখেছেন।

মান্ত্রি ও পুঞ্জি পরিষদ: গ্রামটি পরিচালনা করেন কে

প্রতিটি পুঞ্জির প্রধান মান্ত্রি (সংবাদে মন্ত্রী, মান্ত্রী বা হেডম্যানও লেখা হয়)। তিনি পুঞ্জির ভেতরের বিরোধ মেটান, বিয়ে-তালাকের সভায় থাকেন, পরিবারগুলোর মধ্যে জমি বণ্টনের তদারকি করেন, আর বন বিভাগ, প্রশাসন ও রাজনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তাঁর সঙ্গে থাকে নির্বাচিত পরামর্শক পরিষদ।

বাংলাপিডিয়া লিখেছে পুঞ্জিপ্রধানকে “সিয়েম” বলা হয় এবং তাঁদের “মন্ত্রী” বলা হয়; বাংলাদেশে পুঞ্জিপ্রধানেরা নিজেদের বিচার-আচার নিজেরাই করেন, আর ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান তাঁদের তত্ত্বাবধানে হয়। দ্য ডেইলি স্টার (2019) ইংরেজিতে পদটিকে লিখেছে myntri।

মান্ত্রির কাজের তালিকা

Singha (2014) মাঠ-গবেষণা থেকে মান্ত্রির প্রধান কাজগুলো এভাবে তালিকা করেছেন:

  1. পুঞ্জির ভেতরের বিরোধ মেটানো;
  2. স্থানীয় রাজনীতিক ও সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ;
  3. ঢাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ;
  4. পর্যটক ও বাইরের মানুষকে স্বাগত জানানো;
  5. অন্য পুঞ্জির মান্ত্রিদের সঙ্গে যোগাযোগ;
  6. বাংলাদেশ খাসি ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সঙ্গে যোগাযোগ।

এর বাইরে, Singha-র বিবরণে পুঞ্জির প্রায় সব কর্মসূচিতে মান্ত্রির অনুমতি লাগে। বিয়ের আগে দুই পরিবারকেই মান্ত্রিকে জানিয়ে অনুমতি নিতে হয়, তালাকের সময় তাঁর নেতৃত্বে সভা বসে, আর পুঞ্জির নিয়ম ভাঙলে তিনি শাস্তি দিতে পারেন — যেমন একঘরে করা। খুনের মতো গুরুতর ঘটনা মান্ত্রির কাছে মীমাংসা না হলে, সাধারণত তাঁর অনুমতি নিয়ে, স্থানীয় প্রশাসনের কাছে যাওয়া হয়।

পান জুমের জমি পাওয়া মান্ত্রির ওপর নির্ভর করে

পুঞ্জির অর্থনীতির সঙ্গে মান্ত্রির সবচেয়ে সরাসরি সম্পর্ক জমিতে। Singha লিখেছেন, খাসিরা সরকারের কাছ থেকে ইজারায় বনভূমি পান, তারপর পানের উপযুক্ত টিলা খোঁজেন; সেই বনভূমি পাওয়া “পুরোপুরি” মান্ত্রির ভূমিকার ওপর নির্ভর করে, কারণ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন তিনিই। তাঁর উপসংহার: মান্ত্রি স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে দক্ষ না হলে খাসিদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। দ্য ডেইলি স্টার (2019) লিখেছে, পুঞ্জির জমি একটি সমষ্টিগত সম্পত্তি, যা পরিবারগুলোর মধ্যে বণ্টনের তদারকি করেন মান্ত্রি।

পরিষদ, নির্বাচন ও উত্তরাধিকার

Singha-র বিবরণে প্রতিটি পুঞ্জিতে একজন বড় মান্ত্রি ও একজন ছোট মান্ত্রি থাকেন, আর পুঞ্জিবাসীর নির্বাচিত 14 জন পরামর্শক সদস্য; একই লেখার আরেক জায়গায় গ্রাম-পরিষদের আকার “প্রায় এগারোজন”। নির্বাচন হওয়ার কথা প্রতি চার-পাঁচ বছরে, কিন্তু মাগুরছড়া ও Doublechera-য় পদটি কার্যত বংশানুক্রমিক ছিল। নাহার পুঞ্জিতে 2012 সালের দিকে আগের মান্ত্রি পুঞ্জি ছেড়ে চলে গেলে ডিবারমিন দায়িত্ব নিয়ে পুঞ্জিবাসীর সঙ্গে পরামর্শ করে 7 সদস্যের একটি কমিটি গড়েন। মান্ত্রি সাধারণত পুরুষ; দ্য ডেইলি স্টার 2019 সালে পাঁচজন নারী মান্ত্রির কথা লিখেছিল। পরিষদে নারীর ভূমিকা ও পরিবারে নারীর কর্তৃত্বের পার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত আছে খাসি উত্তরাধিকার-বিষয়ক লেখায়; “মাতৃতান্ত্রিক” শব্দটি কেন বিভ্রান্তিকর, তা নিয়ে আছে বাংলাদেশের মাতৃসূত্রীয় জাতিগুলো নিয়ে লেখা।

পুঞ্জির ওপরের সংগঠন

একক পুঞ্জির বাইরে কয়েকটি আন্তপুঞ্জি সংগঠন উৎসে বারবার আসে। খাসি সোশ্যাল কাউন্সিল: ICCCAD-এর 2021 সালের এক প্রতিবেদনে এটি বিভিন্ন পুঞ্জির 30 জন হেডম্যান নিয়ে গঠিত; মোঙ্গাবে (2025) একে সিলেট অঞ্চলের 65টি পুঞ্জির মান্ত্রিদের প্রতিনিধি সংগঠন বলেছে। কুবরাজ আন্তপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন — দ্য ডেইলি স্টার 2015 সালে বন্ধনীতে নামটির ব্যাখ্যা দিয়েছে কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও রাজনগর উপজেলা হিসেবে। এ ছাড়া খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ও খাসি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে আছে।

পুঞ্জির নিজস্ব শাসন কতটা কার্যকর, তার একটি নথিভুক্ত উদাহরণ কোভিড-19-এর সময়। ICCCAD-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী মাগুরছড়াসহ পুঞ্জিগুলো প্রবেশপথে প্রথাগত বেড়া দিয়ে বন্ধ করে, বাইরে থেকে ফেরা বাসিন্দাদের 14 দিন বাইরে থাকতে বলে, তিন মাসের খাবার মজুত করে, আর বাইরে থেকে আনা চাল-ডাল এক সপ্তাহ আলাদা ঘরে রেখে তারপর বিতরণ করে। লকডাউনে এক মাস পান চাষ বন্ধ ছিল; পরে পুঞ্জির বাইরে আলাদা জায়গায় পান বেচাকেনা হতো।

গির্জা, স্কুল, ভাষা আর বিদ্যুৎ

প্রায় প্রতিটি পুঞ্জিতে একটি গির্জা আছে, আর রোববারের প্রার্থনার পর সেখানে পুঞ্জির বিষয়ও আলোচনা হয় — বাংলাপিডিয়ার বিবরণ এটি। স্কুল সাধারণত পুঞ্জি থেকে দূরে; কোথাও কোথাও বেসরকারি সংস্থার স্কুল পুঞ্জির ভেতরে। অনেক পুঞ্জিতে বিদ্যুৎ নেই, রাস্তা কাঁচা।

গির্জা

বাংলাপিডিয়া লিখেছে, বর্তমানে 80–90 শতাংশ খাসি খ্রিষ্টান, প্রায় প্রতি পুঞ্জিতে গির্জা আছে, প্রতি রোববার প্রার্থনার পর পুঞ্জির বিষয়াদি নিয়ে আলাপ হয়, আর খ্রিষ্টান যাজকেরা অনেক সময় পুঞ্জির বিচার-আচারেও দায়িত্ব পালন করেন। Singha (2014) Costa ও Dutta (2007)-এর বরাতে হিসাব দিয়েছেন: 81.63 শতাংশ খ্রিষ্টান, 11.8 শতাংশ প্রথাগত বিশ্বাসের অনুসারী, প্রায় 3.6 শতাংশ হিন্দু। সব পুঞ্জি এক রকম নয় — Radio Veritas Asia (2025) গোয়াইনঘাটের লামা ও প্রতাপপুর পুঞ্জির খাসিদের প্রায় 70 শতাংশ খ্রিষ্টান ও 30 শতাংশ হিন্দু বলে লিখেছে। Jhimai পুঞ্জিতে 2015 সালে তিনটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল বলে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে।

গোলাপি দেয়াল ও সবুজ কিনারার ছোট একটি গির্জা, সামনে ক্রুশচিহ্ন, পাশে ঝাউ, নারকেল ও কলাগাছ
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরের খাসিয়া পল্লির গির্জা, শ্রীমঙ্গল, মার্চ 2023। ছবি: Anik Sarker · CC BY 4.0 · উইকিমিডিয়া কমন্স

স্কুল ও খাসি ভাষা

Singha (2014) Potam (2010)-এর বরাতে লিখেছেন, প্রতি চারটি খাসি গ্রামের জন্য একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। Ahmmed (2005) লিখেছেন, প্রায় সব খাসি শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলেও বেশির ভাগ তা শেষ করতে পারে না; মাধ্যমিকে পড়তে চাইলে দূরে থাকার ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হয়।

প্রথম আলো (11 ফেব্রুয়ারি 2023) শ্রীমঙ্গলের হোসনাবাদ পুঞ্জির একটি উদাহরণ দিয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গ্রাম থেকে দেড়-দুই কিলোমিটার দূরে, উচ্চবিদ্যালয় আড়াই-তিন কিলোমিটার। প্রায় 10 বছর আগে কারিতাস পুঞ্জিতে একটি বাংলা মাধ্যম প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু করে। শিশুরা খাসি ভাষা ভুলে যাচ্ছে টের পেয়ে পুঞ্জি কর্তৃপক্ষ 2022 সালের নভেম্বরে বাংলা ক্লাসের পর একই স্কুলে খাসি ভাষা চর্চার ব্যবস্থা করে। হরফের প্রশ্নও আছে: বাংলাপিডিয়া লিখেছে, শিক্ষিত খাসিরা নিজেদের মধ্যে বাংলা হরফে খাসি ভাষায় চিঠি লেখেন, আর সীমান্তের ওপারে খাসি ভাষা রোমান হরফে লেখা হয়।

রাস্তা ও বিদ্যুৎ

নাহার পুঞ্জির মান্ত্রি ডিবারমিন 2017 সালে তাঁদের “বিদ্যুতহীন পুঞ্জি”র কথা বলেছেন, যেখান থেকে রাতে সীমান্তের ওপারের বিএসএফ ছাউনি বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করতে দেখা যায়। মাগুরছড়ার মান্ত্রি ICCCAD-কে বলেছেন, পাহাড়ি রাস্তার খারাপ অবস্থা আর বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁদের ভুগতে হয়, আর অনেক দূরবর্তী পুঞ্জিতে কোনো আধুনিক সুবিধা নেই। Jhimai পুঞ্জি থেকে বের হতে দুই কিলোমিটারের একটিমাত্র রাস্তা, যা 2015 সালে চা-বাগান কর্তৃপক্ষ গেট দিয়ে বন্ধ করে দেয় বলে 2019 সালে দশটি অধিকার সংগঠন অভিযোগ করেছে (NE Now)।

পুঞ্জির জমি কার নামে: ইজারা, খতিয়ান আর দাবি

বেশির ভাগ পুঞ্জির জমি আইনত খাসিদের নামে নেই। গবেষণা অনুযায়ী তাঁরা বন বিভাগ বা রাজস্ব বিভাগের কাছ থেকে ইজারায় জমি পান; কোথাও জমি চা-বাগানের ইজারাভুক্ত, কোথাও সরকারি খাস বা সংরক্ষিত বন হিসেবে নথিভুক্ত। খাসিদের দাবি, তাঁরা বহু প্রজন্ম ধরে এই জমিতে আছেন; সরকারি নথি পরে এসেছে।

গবেষণায় ইজারার শর্ত

Haider ও সহকর্মীরা (2013) লিখেছেন, খাসিরা বন বিভাগ অথবা রাজস্ব বিভাগ থেকে ইজারায় জমি নেন; সাধারণত পরিবারপ্রতি 1.27 হেক্টর বরাদ্দ হয় ঘর ও পান জুমের জন্য, যার প্রায় 1.24 হেক্টর পানে ব্যবহৃত হয়। Singha (2014) লিখেছেন, ইজারার শর্ত অনুযায়ী সাধারণত 99 বছর জমি ব্যবহার করা যায়। Nath ও Inoue (2009)-এর গবেষণার সারসংক্ষেপ বলছে, খাসিরা 1950-এর দশকের শুরু থেকে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব পাহাড়ি বনে “বনগ্রামবাসী” হিসেবে বন বিভাগের দেওয়া জমিতে পান-ভিত্তিক কৃষিবনায়ন করছেন।

দলিল কেন নেই — দুই রকম ব্যাখ্যা

Ahmmed (2005) Rahman (2004)-এর বরাতে লিখেছেন, 1950 সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের পর প্রজাদের নিয়মিত খাজনার দলিল দিয়ে দখল প্রমাণ করতে হতো; খাসিরা তখন মালিকানা নথিভুক্ত করতে পারেননি, ফলে তাঁদের পূর্বপুরুষের জমি সরকারি কর্তৃপক্ষের অধীনে খাস জমি ও অধিগৃহীত বনভূমি হিসেবে চিহ্নিত হয়, আর তাঁরা নিজেদের জমিতেই “অবৈধ দখলদার” হয়ে যান।

খাসি নেতারা 2007 সালে দ্য ডেইলি স্টারকে ভিন্ন একটি ইতিহাস বলেছেন: ব্রিটিশ আমল থেকে খাজনা দিয়ে তাঁরা জমি ব্যবহার করছেন, আর 1956 সালের জরিপে জমি সংশ্লিষ্ট পুঞ্জিপ্রধানদের নামে রেকর্ড হয়। একই প্রতিবেদনে সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, খাসিরা বনভূমিতে পান বাগান গড়ে তুলেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী তখন বন বিভাগ ও আদিবাসীদের মধ্যে শতাধিক ভূমি-মামলা আদালতে বিচারাধীন ছিল, আর জেলা প্রশাসন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

দ্য ডেইলি স্টার (7 মার্চ 2019) মাগুরছড়ার মান্ত্রি জিডিশন প্রধান সুছিয়াংয়ের বরাতে হিসাব দিয়েছে: উত্তর-পূর্বের জেলাগুলোর 85টি পুঞ্জির মাত্র 11টির জমির দলিল খাসিদের নামে, 15টি পুঞ্জি চা-বাগান এলাকায়, আর বাকি প্রায় সবগুলো নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে টানাপোড়েন আছে।

একেক পুঞ্জির জমির একেক ইতিহাস

  • Jhimai (কুলাউড়া): 2019 সালে অধিকার সংগঠনগুলোর লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী 1935 সালে এক জমিদারের কাছ থেকে পান চাষের জন্য খাসিরা 350 একর জমি পান; জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর 1956 সালের জরিপে তা নিজেদের নামে রেকর্ড করাতে পারেননি (NE Now, 2019)। কুলাউড়ার ইউএনও-র বক্তব্যে 1937 সালে চা-বাগানকে 672 একর দেওয়া হয়েছিল, যার প্রায় 300 একরে চা লাগানো হয় (দ্য ডেইলি স্টার, এপ্রিল 2015)। বাগানের ইজারা নবায়ন নিয়েও উৎসে অমিল: দ্য ডেইলি স্টার (আগস্ট 2015) লিখেছে 661.55 একরের ইজারা সর্বশেষ নবায়ন হয় 2012 সালে; 2019 সালের লিখিত বক্তব্যে আছে আগস্ট 2015-এ 37 বছরের জন্য।
  • ইছাছড়া (কুলাউড়া): এক পান জুমের মালিক জসপার আমলরংয়ের দাবি, জমিদারের প্রজা হিসেবে তাঁর পূর্বপুরুষেরা জমিটি ভোগ করতেন, 1956–57 সালের জরিপে মাঠ পর্চা হয়, কিন্তু রেকর্ড হয় জেলা প্রশাসকের নামে; পরে দেওয়ানি মামলার ডিক্রির মাধ্যমে তাঁরা স্বত্ব পান (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, অক্টোবর 2020)। কুলাউড়ার ইউএনও তখন বলেছিলেন, তফসিল অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জুমটি ডিসি খতিয়ানের আওতায়।
  • আগার (বড়লেখা): পাশের ছোটলেখা চা-বাগানের ব্যবস্থাপক 2021 সালে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন, পুঞ্জির জমি “বহু আগে পুঞ্জির কাছে বর্গা দেওয়া হয়েছে”।
  • নাহার (শ্রীমঙ্গল): মান্ত্রি ডিবারমিনের বিবরণে 1984 সালে পাশের চা-বাগানের মালিকেরা কাগজপত্র দেখিয়ে জমির মালিকানা দাবি করেন; পুঞ্জিবাসী সাব-লিজ চুক্তিতে সই করেন, প্রথমবার 10 বছর, পরে 5 ও 7 বছর; সর্বশেষ চুক্তিতে বছরে 20 লাখ টাকা দিতে হতো। তাঁর অভিযোগ, চুক্তিতে পুঞ্জিবাসীকে চা-বাগানের শ্রমিক হিসেবে লেখা হয়েছিল।

সমতলের আদিবাসীদের জমি হস্তান্তরে সুরক্ষা দেয় প্রজাস্বত্ব আইনের 97 ধারা; কিন্তু ওই ধারার তালিকা নিয়ে আমাদের লেখায় দেখানো হয়েছে, খাসিদের নাম সেই তালিকায় নেই।

চা-বাগান, বন বিভাগ আর পানগাছ কাটা: ঘটনাপঞ্জি

গত তিন দশকে পুঞ্জিগুলোর খবর হয়েছে মূলত তিন ধরনের ঘটনায়: চা-বাগানের সম্প্রসারণ বা গাছ কাটা, বন বিভাগের উচ্ছেদ বা প্রকল্প, আর রাতের অন্ধকারে পানগাছ কেটে ফেলা। নিচের ছকটি সংবাদ ও গবেষণা থেকে সংকলিত; প্রতিটি সারি সেই উৎসের বিবরণ, অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যসহ।

সালপুঞ্জি / এলাকাযা ঘটেছে (উৎসের বিবরণ)উৎস
1968–69, 1987, 2004, 2005হবিগঞ্জরাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস কোম্পানির কারণে 1968–69 সালে তিনটি পুঞ্জি বাস্তুচ্যুত; একই কোম্পানি 1987, 2004 ও 2005 সালে একটি খাসি গ্রাম অধিগ্রহণ করে; যথাযথ ক্ষতিপূরণ মেলেনিSingha, 2014 (Potam, 2010-এর বরাতে)
14 জুন 1997মাগুরছড়াগ্যাসকূপ বিস্ফোরণে লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনের প্রায় 96 একরের গাছ পুড়ে যায়; খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রকাশনা সম্পাদকের ভাষ্যে খাসিরা ক্ষতিপূরণের মাত্র 10 শতাংশ পেয়েছেনThe Daily Star, 2019
2001–2002উৎসে স্থানের নাম নেইখাসিদের পূর্বপুরুষের জমিতে 1,500 একরের ইকো-পার্কের উদ্যোগ; Asian Indigenous Peoples Pact-এর হিসাবে প্রায় 1,000 পরিবার উচ্ছেদের মুখে; 2002 সালে বন বিভাগ 15টি খাসি ও 2টি গারো পরিবারকে উচ্ছেদ করে; প্রতিবাদে প্রকল্প থামেSingha, 2014
2008–2016নাহার (শ্রীমঙ্গল)চা-বাগানের মালিকপক্ষ প্রায় 4,000 গাছ কাটার টেন্ডার দেয়, প্রায় 1,200 গাছ কাটা হয়; হাইকোর্টে মামলা; 30 মে 2014 পুঞ্জিতে হামলা, সংঘর্ষের পর এক চা-শ্রমিকের মৃত্যুতে পুঞ্জিবাসীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা; 9 জুন 2016 জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ নোটিশ, বিভাগীয় কমিশনারের স্থগিতাদেশজুমজার্নাল আর্কাইভ, 2017
এপ্রিল–আগস্ট 2015Jhimai (কুলাউড়া)চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ও ইউএনও সীমানা-খুঁটি বসাতে যান; বাগান 2,096টি গাছ কাটার অনুমতি পায়; প্রশাসন পরিবারপ্রতি 2 একর দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, খাসিরা আইনি মালিকানা চান; বাগানের ব্যবস্থাপক অভিযোগ অস্বীকার করেনThe Daily Star, এপ্রিল ও আগস্ট 2015
2016Pallathal (বড়লেখা)স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে প্রায় 300 একর জমি, যেখানে খাসিরা পান চাষ করেন, ভারতের ভাগে যাওয়ার আশঙ্কা; হেডম্যানের অভিযোগ, ভারত পান বাগান ঘেঁষে কাঁটাতার বসাচ্ছেThe Daily Star, মার্চ 2016
ডিসেম্বর 2016লাউয়াছড়া ও মাগুরছড়াবন্যপ্রাণী ও গাছ রক্ষার কথা বলে দুই পুঞ্জি জাতীয় উদ্যান থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত; প্রায় 70টি পরিবার উচ্ছেদের আশঙ্কায়; বন কর্মকর্তারা বলেন গ্রামবাসীকে জানানো হয়েছে, গ্রামবাসী বলেন জানানো হয়নিThe Daily Star, ডিসেম্বর 2016
এপ্রিল 2019Sahebtila (কুলাউড়া)36 একর পান জমির দখল নিয়ে হামলায় তিন খাসি গুরুতর আহতThe Daily Star, 2019
2020ইছাছড়া (কুলাউড়া)প্রায় পাঁচ একরের পান জুম জবরদখল; প্রশাসন দলিল যাচাই করে দখলদারের দুটি দলিলের সত্যতা পায়নি, জমি উদ্ধার করে ফেরত দেয়; সেদিন সন্ধ্যায় পুঞ্জির গির্জায় হামলাদ্য ডেইলি স্টার বাংলা, অক্টোবর ও নভেম্বর 2020
মার্চ 2021আগার (বড়লেখা)ছোটলেখা চা-বাগান কর্তৃপক্ষ পান জুমের গাছ কাটে, আরও 25টি চিহ্নিত; ব্যবস্থাপকের ভাষ্যে কাঠের প্রয়োজন ছিলদ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 2021
আগস্ট 2021ডলুছড়া ও ভেলুয়া (কুলাউড়া)ডলুছড়ার প্রায় 10 হেক্টর টিলা নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে বিরোধ; সামাজিক বনায়নের চারা উপড়ানোর মামলা; পরে ভেলুয়ার পাঁচটি জুমের প্রায় তিন হাজার পানগাছ কাটা, এজাহারে সাড়ে 18 লাখ টাকার ক্ষতি; অভিযুক্তদের একজন ঘটনাটিকে “সাজানো” বলেনপ্রথম আলো, 2021
8 মে 2023বেরেঙ্গা (বড়লেখা)বিভিন্ন জুম থেকে প্রায় 3 হাজার পান ও 60টি সুপারি গাছ কাটাদ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 2023
জুলাই 2025লামা ও প্রতাপপুর (গোয়াইনঘাট)পানগাছ কাটা; ক্ষতিগ্রস্তের হিসাবে ক্ষতি প্রায় 15 লাখ টাকা; মামলা দায়েরদ্য ডেইলি স্টার বাংলা ও Radio Veritas Asia, 2025
28 মার্চ 2026ইছাছড়া (কুলাউড়া)এক দম্পতির পান জুমে 12 শতাধিক পানগাছ কাটা; স্থানীয় ইউপি সদস্যের হিসাবে প্রায় 12 লাখ টাকার ক্ষতি; মানববন্ধন ও পাঁচ দফা দাবিবিডিনিউজ২৪, 2 এপ্রিল 2026
7 জুলাই 2026কুরমা (কমলগঞ্জ)বন বিভাগ কুরমা খাসিয়া পুঞ্জি সংলগ্ন ছোট পিকল এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমিতে “অবৈধভাবে গড়ে তোলা” প্রায় 3.29 হেক্টর পান বাগান উচ্ছেদ করে, আনুমানিক 1 হাজার পান চারা উপড়ানো হয়; বন আইনে পিওআর মামলা প্রক্রিয়াধীনদৈনিক ইনকিলাব, 8 জুলাই 2026

লামা-প্রতাপপুরের ঘটনায় কাটা গাছের সংখ্যা নিয়ে দুই উৎসে অমিল: দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (31 জুলাই 2025) লিখেছে প্রায় এক হাজার 700টি, Radio Veritas Asia (4 আগস্ট 2025) লিখেছে প্রায় 3,000টি, ঘটনার তারিখ 28 জুলাই।

এর বাইরে Ahmmed (2005) জাফলংয়ের কথা লিখেছেন: নদী ইজারা নিয়ে পাথর তোলার ফলে খাসিদের জমির ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীতে ভাঙন, শত শত একর জমি হারানো, আর পাশে পাথর ভাঙার কারখানার দূষণ। তিনি আরও লিখেছেন, কেউ কেউ রাতে পানগাছ উপড়ে বা কেটে দেন, আবার কেউ হাতি ও মহিষ পান জুমে ছেড়ে দেন।

কুরমার ঘটনাটি অন্য ঘটনাগুলো থেকে ধরনে আলাদা: এখানে পান বাগান সরিয়েছে রাষ্ট্রের বন বিভাগ, সংরক্ষিত বনের জমি উদ্ধারের কথা বলে। ইনকিলাবের প্রতিবেদনে পুঞ্জির কারও বক্তব্য নেই; বাগানটি কার, পুঞ্জিবাসী কী বলছেন — সেই তথ্য পাওয়া যায়নি।

পান জুম কি বন বাঁচায়, না বন দখল করে — দুই পক্ষের কথা

গবেষণাগুলো পান জুমকে টেকসই কৃষিবনায়ন বলে বর্ণনা করেছে, কারণ পানের জন্য বড় গাছ দরকার এবং খাসিরা সেগুলো রক্ষা করেন। বন বিভাগের অবস্থান ভিন্ন: তাদের ভাষায় খাসিরা সংরক্ষিত বনে অবৈধভাবে পান বাগান করেছেন। দুই অবস্থানই উৎসে নথিভুক্ত।

যে উৎসগুলো পান জুমকে সংরক্ষণ বলে

Rahman ও সহকর্মীদের (2009) সিদ্ধান্ত, পান চাষের এলাকার প্রজাতি-গঠন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে “উল্লেখযোগ্য ভূমিকা” রাখতে পারে, যা পদ্ধতিটিকে টেকসই কৃষিবনায়ন করে তোলে। Nath ও Inoue (2009)-এর সারসংক্ষেপে প্রজাতি-গঠন, রোগ নিয়ন্ত্রণ, মাটির উর্বরতা, লাভজনকতা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা আর প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাকে টেকসইতার লক্ষণ বলা হয়েছে, আর বলা হয়েছে গ্রামবাসীর পারস্পরিক অবদান বন সম্পদ রক্ষায় সাহায্য করে। Islam ও Nath (2014) লাউয়াছড়ায় লিখেছেন, এই চাষ সংরক্ষিত এলাকায় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় “গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা” রাখে এবং অন্যত্রও অনুসরণ করা যেতে পারে।

মোঙ্গাবে (2025) খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের সভাপতির দাবি তুলে ধরেছে: খাসিরা মিলে সিলেটের 5,000 একরের বেশি প্রাকৃতিক বন রক্ষা করেন, তাই কার্বন-নিঃসরণকারীদের কাছ থেকে তাঁদের অর্থ পাওয়া উচিত। একই প্রতিবেদনে সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁদের অধীন 50,000 হেক্টরের মধ্যে কতটুকু খাসিরা রক্ষা করেন তার কোনো রেকর্ড নেই, তবে বন সংরক্ষণে খাসিরা সাহায্য করেন বলে তাঁরা স্বীকার করেছেন।

যে উৎসগুলো দখলের কথা বলে

সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা 2007 সালে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, খাসিরা বনভূমিতে পান বাগান গড়ে তুলেছেন। 2026 সালের কুরমা অভিযানে রাজকান্দি রেঞ্জ কর্মকর্তা এটিকে “সংরক্ষিত বনভূমি দখল ও অবৈধ পান চাষের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ” বলেছেন, আর বন বিভাগ জানিয়েছে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের অভিযান চলবে (ইনকিলাব)। 2016 সালে লাউয়াছড়া ও মাগুরছড়া পুঞ্জি সরানোর সিদ্ধান্তের পেছনেও বন বিভাগের যুক্তি ছিল বন্যপ্রাণী ও গাছ রক্ষা।

দুই অবস্থানের মাঝখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায় — জমিটি বন না পুঞ্জি — আর তার উত্তর নির্ভর করে কোন নথিকে ভিত্তি ধরা হচ্ছে, তার ওপর। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত ভূমি-অধিকারের প্রেক্ষাপট জানতে দেখতে পারেন আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব; সমতলের অন্য আদিবাসী জাতিগুলোর জমি হারানোর ধরন নিয়ে আছে সমতলের আদিবাসী জাতিগুলো নিয়ে লেখা।

পানের বাইরে: গরু, কফি, পর্যটন

পানের দাম পড়ে যাওয়া, রোগ, গাছ কাটা আর ঋণের চাপে কিছু পুঞ্জি বিকল্প আয়ের দিকে যাচ্ছে: সরকারি প্রকল্পের গরু-ভেড়া পালন, পানের লতার ফাঁকে কফি, আর জাফলংয়ে হোমস্টে-ভিত্তিক পর্যটন। তবে উৎসগুলোতে পান এখনো প্রধান জীবিকা।

দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (28 আগস্ট 2023) কুলাউড়ার বালুকনা পুঞ্জির এক চাষির কথা লিখেছে, যিনি পানের দাম কমা ও রোগে লোকসানের পর প্রাণিসম্পদ বিভাগের দেওয়া গাভি পালন শুরু করেন। কুলাউড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার হিসাবে 2020–21 সালে 74টি বকনা গাভি, 2021–22 সালে 618টি ভেড়া আর 2022–23 সালে 77টি ষাঁড় দেওয়া হয়। খাসি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রচার সম্পাদক সেখানে বলেছেন, পান গাছের ঝুম চাষই তাঁদের আয়ের একমাত্র উৎস ছিল, তবে এখন অনেকে বিকল্প পেশায় আগ্রহী।

মোঙ্গাবে (2025) লিখেছে, কিছু খাসি অবক্ষয়িত জুমে লেবু, মাল্টা, আতা, কলা, নারকেল ও আগর লাগাচ্ছেন, আর Mariang নামের একটি সম্প্রদায়ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম পানের লতার ফাঁকে কফি লাগানোর প্রচার চালাচ্ছে — তাদের দাবি, একটি গাছও না কেটে। একই প্রতিবেদনে খাসিদের বাইরের হস্তক্ষেপ ও পর্যটন এড়িয়ে চলার কথা আছে।

জাফলংয়ের চিত্র ভিন্ন। প্রথম আলো (21 ফেব্রুয়ারি 2026) জানিয়েছে, 2025 সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও আইএলও-র যৌথ উদ্যোগে সেখানকার খাসিয়াপুঞ্জিতে “কমিউনিটি ট্যুরিজম” চালু হয়েছে; তিনটি পুঞ্জিতে চারটি হোমস্টে, গাইড খাসি তরুণ-তরুণীরা। নকশিয়াপুঞ্জির হেডম্যান ওয়েলকাম লাম্বা বলেছেন, শুরুতে দ্বিধা থাকলেও এখন তাতে বাড়তি আয় হচ্ছে। অর্থাৎ পর্যটন নিয়ে পুঞ্জিগুলোর অবস্থান এক নয়।

প্রশ্নোত্তর

খাসিয়া পুঞ্জি কী?

পুঞ্জি হলো খাসি জনগোষ্ঠীর গ্রাম। বাংলাপিডিয়ার ভাষায় খাসিরা গ্রামকে পুঞ্জি বলেন। বাংলাদেশে পুঞ্জিগুলো সিলেট বিভাগে, বেশির ভাগ মৌলভীবাজারে, টিলার ওপর গুচ্ছবসতি হিসেবে। সংবাদ প্রতিবেদনে একেকটি পুঞ্জিতে 22 থেকে 72টির মতো পরিবারের কথা পাওয়া যায়। পুঞ্জির প্রধান মান্ত্রি, আর চারপাশের বনে থাকে পরিবারগুলোর পানের জুম।

পান জুম কী, এটি কি জুম চাষ?

পান জুম হলো বনের বড় গাছকে খুঁটি করে পানের লতা চাষ, যাকে গবেষকেরা “গাছপান” বা “খাসিয়া পান” বলেছেন। এটি সমতলের বরজ পান থেকে আলাদা। নামে জুম থাকলেও প্রতি বছর পুড়িয়ে জায়গা বদলানোর জুম চাষ নয়; Haider ও সহকর্মীদের (2013) হিসাবে একটি লতা 12–15 বছর ফলন দেয়। খাসি ভাষায় একে Bri বলা হয় বলে মোঙ্গাবে জানিয়েছে।

খাসিয়া পান কোন গাছে চাষ হয়?

মৌলভীবাজারের তিন পুঞ্জিতে Haider ও সহকর্মীরা (2013) পান জুমে 86 প্রজাতির খুঁটি-গাছ পেয়েছেন। খাসি চাষিদের মতে সবচেয়ে উপযুক্ত চাপালিশ ও সুপারি। অন্য গুরুত্বপূর্ণ গাছের মধ্যে আছে আওয়াল, কালোজাম, তুন, কানাক, বনশিমুল, কদম, ডুমুর ও কাঁঠাল। হেক্টরপ্রতি গাছের ঘনত্ব 1,452টি, চারা বাদে।

খাসিয়া পান কখন লাগানো হয়, কখন তোলা হয়?

লতার কলম লাগানোর সবচেয়ে ভালো সময় জুন থেকে আগস্ট। পান তোলা হয় বছরে পাঁচবার: এপ্রিল-মে মাসে নতুন পাতা (“লবর”), জুন থেকে মধ্য-জুলাই সবচেয়ে বড় ফলন, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বেছে বেছে, নভেম্বর-ডিসেম্বরে ডগার পাতা, আর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বাকি সব পাতা। হিসাবটি Haider ও সহকর্মীদের 2013 সালের গবেষণার।

নতুন পান জুমে ফলন আসতে কত বছর লাগে?

উৎসে দুই রকম হিসাব আছে। Haider ও সহকর্মীরা (2013) লিখেছেন, পান তোলা সাধারণত লতার 3 বছর বয়সে শুরু হয়। গোয়াইনঘাটের লামা পুঞ্জির হেডম্যান 2025 সালে দ্য ডেইলি স্টার বাংলাকে বলেছেন, একটি পান বাগান পরিপক্ব হতে প্রায় দুই বছর লাগে। তাই কাটা পড়া জুম থেকে আবার আয় পেতে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়।

এক কুড়ি পানে কয়টি পাতা থাকে?

এক কুড়িতে 2,880টি পাতা। গোনা হয় বারোর হিসাবে: 12 পাতায় এক ছোট আঁটি (গবেষণায় gushi বা guci), 144 পাতায় এক বড় আঁটি (guta, kanta বা mota — উৎসভেদে নাম আলাদা), আর 20টি বড় আঁটিতে এক কুড়ি। Singha (2014), Haider ও সহকর্মী (2013) এবং দ্য ডেইলি স্টার (2014) — তিন উৎসেই অঙ্ক এক।

পুঞ্জিতে পান তোলেন কে, বিক্রি করেন কে?

উৎসগুলো একমত যে পুরুষেরা লতা লাগান, যত্ন নেন ও গাছ থেকে পান তোলেন, আর নারীরা পাতা বাছাই করে গুনে আঁটি বাঁধেন ও বিক্রির জন্য তৈরি করেন। দ্য ডেইলি স্টার (2019) লিখেছে নারীরা বিক্রি ও হিসাবের খাতাও রাখেন। বড় জুমে 15–20 জন মজুরি-শ্রমিকও কাজ করেন বলে গোয়াইনঘাটের পুঞ্জিবাসী 2025 সালে জানিয়েছেন।

খাসিয়া পানের দাম কে ঠিক করে?

পান সাধারণত পুঞ্জি থেকেই পাইকারের কাছে বিক্রি হয়। Singha (2014) লিখেছেন, তাতে বাজারদরের চেয়ে কম দাম মেলে; Ahmmed (2005) লিখেছেন, মধ্যস্বত্বভোগীর কাছ থেকে ঋণ নেওয়া চাষি তাঁর ঠিক করা দামে তাঁর কাছেই বেচতে বাধ্য থাকেন। 2014 সালে মৌলভীবাজারে এক কুড়ির দাম 2,000–3,000 টাকা থেকে নেমে 200 টাকায় দাঁড়িয়েছিল (দ্য ডেইলি স্টার)।

খাসি পরিবারের আয়ের কত অংশ পান থেকে আসে?

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের দুই পুঞ্জির 48টি খানায় গড় বার্ষিক আয়ের প্রায় 71 শতাংশ পান থেকে (Islam ও Nath, 2014)। সিলেটের জৈন্তাপুরে 95.45 শতাংশ খানা পান চাষে যুক্ত, আর হেক্টরপ্রতি বার্ষিক আয় গড়ে 80,979 টাকা (Rahman ও সহকর্মী, 2009)। সামগ্রিকভাবে প্রায় 75.5 শতাংশ খাসি পান চাষে যুক্ত বলে Singha (2014) লিখেছেন।

পুঞ্জির মান্ত্রি কী কাজ করেন?

Singha (2014)-এর বিবরণে মান্ত্রি পুঞ্জির বিরোধ মেটান, বিয়েতে অনুমতি দেন, তালাকের সভায় নেতৃত্ব দেন, নিয়ম ভাঙলে শাস্তি দেন, আর সরকার, রাজনীতিক ও অন্য মান্ত্রিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। ইজারায় বনভূমি পাওয়া “পুরোপুরি” তাঁর ভূমিকার ওপর নির্ভর করে। দ্য ডেইলি স্টার (2019) লিখেছে, পরিবারগুলোর মধ্যে পুঞ্জির জমি বণ্টনও তিনি তদারক করেন।

খাসিয়া পুঞ্জির জমি কি খাসিদের নামে?

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নয়। দ্য ডেইলি স্টার (2019) এক মান্ত্রির বরাতে লিখেছে, 85টি পুঞ্জির মাত্র 11টির জমির দলিল খাসিদের নামে। গবেষকেরা লিখেছেন, খাসিরা বন বা রাজস্ব বিভাগ থেকে ইজারায় জমি পান, সাধারণত 99 বছরের জন্য (Singha, 2014)। খাসি নেতাদের দাবি, 1956 সালের জরিপে জমি পুঞ্জিপ্রধানদের নামে রেকর্ড হয়েছিল; বন বিভাগ এই দাবি মানে না।

খাসিয়া পুঞ্জিতে পানগাছ কাটা হয় কেন?

সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে পুঞ্জিবাসীর অভিযোগ, তাঁদের উচ্ছেদ করে জমির নিয়ন্ত্রণ নিতেই পানগাছ কাটা হয়, কারণ পানই বেশির ভাগ পরিবারের একমাত্র আয়। ভেলুয়া (2021), বেরেঙ্গা (2023), লামা-প্রতাপপুর (2025) ও ইছাছড়া (2026)-তে হাজার হাজার পানগাছ কাটা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মামলা হয়েছে; অভিযুক্তদের কেউ কেউ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

যা এখনো জানা যায়নি

  • পুঞ্জির সর্বশেষ সংখ্যা। 73, 71, 85, প্রায় 90 — হিসাবগুলো আলাদা সময়ের, আলাদা পদ্ধতিতে করা। সরকারি কোনো পুঞ্জিভিত্তিক তালিকা পাওয়া যায়নি।
  • খাসিয়া পানের মোট উৎপাদন ও বাজারমূল্য। জেলা বা জাতীয় পর্যায়ে গাছপানের আলাদা উৎপাদন-পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি; 2014 সালের দামের খবরের পর সাম্প্রতিক কুড়িপ্রতি দামের ধারাবাহিক তথ্যও নেই।
  • ইজারার আসল দলিল। গবেষণাপত্রে 99 বছরের ইজারার কথা আছে, কিন্তু কোনো ইজারা-দলিলের পাঠ, কোন আইনের অধীনে তা দেওয়া হয়, বা কয়টি পুঞ্জি এমন ইজারায় আছে — তা জানা যায়নি।
  • 1956 সালের জরিপের রেকর্ড। খাসি নেতারা বলছেন জমি পুঞ্জিপ্রধানদের নামে রেকর্ড হয়েছিল; সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের কোনো প্রকাশিত কপি পাওয়া যায়নি।
  • মামলাগুলোর পরিণতি। ভেলুয়া, বেরেঙ্গা, লামা-প্রতাপপুর ও ইছাছড়ার পানগাছ কাটার মামলায় কেউ দণ্ডিত হয়েছেন কি না, তার তথ্য পাওয়া যায়নি। Jhimai-এর বিরোধ ও নাহার পুঞ্জির হত্যা মামলার সর্বশেষ অবস্থাও জানা যায়নি।
  • 2016 সালের সরানোর সিদ্ধান্ত। লাউয়াছড়া ও মাগুরছড়া পুঞ্জি সরানোর সিদ্ধান্ত পরে বাতিল হয়েছিল কি না, প্রকাশিত কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি; 2024 সালের প্রতিবেদনে দুই পুঞ্জিই চালু আছে।
  • কুরমার উচ্ছেদ। 2026 সালের জুলাইয়ে উচ্ছেদ হওয়া পান বাগানটি কাদের ছিল এবং পুঞ্জিবাসীর বক্তব্য কী — প্রকাশিত প্রতিবেদনে তা নেই।
  • খাসি পরিভাষার বাংলা বানান। পান তোলার পাঁচ মৌসুম, কলম, মই ও রোগের খাসি নামগুলো কেবল ইংরেজি গবেষণাপত্রে রোমান হরফে পাওয়া যায়; “লবর” ও “উত্রাম” ছাড়া বাকিগুলোর বাংলা বানান কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
  • নারীর জমির উত্তরাধিকার বনাম রাষ্ট্রের নথি। প্রথা অনুযায়ী জমি নারীর, কিন্তু ইজারা বা খতিয়ান কার নামে থাকে — এ বিষয়ে পুঞ্জিভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

তথ্যসূত্র

জুমজার্নালের নিজস্ব সংগ্রহ

গবেষণা ও বিশ্বকোষ

  • M Rafiqul Haider, Abul Khair, M Mahfuzur Rahman ও M Khairul Alam, “Indigenous management practices of betel-leaf (Piper betle L.) cultivation by the Khasia community in Bangladesh”, Indian Journal of Traditional Knowledge, খণ্ড 12(2), এপ্রিল 2013, পৃ. 231–239। NOPR
  • Rajmoni Singha, “Kinship and Marriage System among the Khasis of Bangladesh: A Study of Khasi Culture and Identity”, Bangladesh Development Research Working Paper Series 24, নভেম্বর 2014। PDF (Internet Archive)
  • Md. Faisal Ahmmed, “The Khasis in Bangladesh”, Journal of Ethnic Affairs, খণ্ড 1, Ethnic Community Development Organization, আগস্ট 2005, পৃ. 18–26। PDF (Internet Archive)
  • Mizanur Rahman, Mohammad Mahfuzur Rahman ও Mahmuda Islam, “Financial viability and conservation role of betel leaf based agroforestry: an indigenous hill farming system of Khasia community in Bangladesh”, Journal of Forestry Research, 20(2), 2009, পৃ. 131–136। সারসংক্ষেপ
  • Md. Jahirul Islam ও Tapan Kumar Nath, “Forest-based betel leaf and betel nut farming of the Khasia indigenous People in Bangladesh: approach to biodiversity conservation in Lawachara National Park (LNP)”, Journal of Forestry Research, 25(2), 2014, পৃ. 419–427। সারসংক্ষেপ
  • Tapan Kumar Nath ও Makoto Inoue, “Sustainability attributes of a small-scale betel leaf agroforestry system: a case study in north-eastern hill forests of Bangladesh”, Small-scale Forestry, 8, 2009, পৃ. 289–304। Springer (শুধু সারসংক্ষেপ ব্যবহৃত)
  • Arun Jyoti Nath ও সহকর্মী, “Traditional practice of Paan Jhum cultivation among Khasia community in Barak valley, Assam”, Journal of Traditional and Folk Practices, 2016, পৃ. 96–99। JTFP
  • আলি নওয়াজ, “খাসিয়া“, বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি।

সংবাদ ও প্রতিবেদন

সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026

প্রসঙ্গ:আদিবাসীদের ভূমি, খাসি, বনভূমি, ভূমি অধিকার

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা