Last updated Oct 21st, 2026
0

ছবিটি ছিল একটি গাছ। পাঁচটি পাতায় পাঁচটি শব্দ — মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও আদিবাসী — আর পাশে লেখা “পাতা ছেঁড়া নিষেধ”। নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে ছাপা এই গ্রাফিতি নিয়েই জানুয়ারি 2025-এর বিতর্ক: পাঠ্যবই থেকে আদিবাসী গ্রাফিতি বাদ দেওয়া হয় 12 জানুয়ারি রাতে, আর 15 জানুয়ারি মতিঝিলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সামনে দুই পক্ষের কর্মসূচিতে সংঘর্ষে আহত হন কয়েক ডজন মানুষ — সংখ্যাটি প্রতিবেদনভেদে 9 থেকে 33।
ঘটনার সপ্তাহে যত খবর ছাপা হয়েছিল, তার বেশির ভাগ ছবিটির বর্ণনা দেয়নি — শুধু লিখেছে “‘আদিবাসী’ গ্রাফিতি”। ফলে পরে অনেক আলোচনায় মনে হয় যেন বইয়ে কেবল একটি শব্দ ছিল, বা যেন পুরো বইয়ে আদিবাসীদের নিয়ে কোনো অধ্যায় ছিল। এই লেখা সেই চার দিনের ঘটনাক্রম দিন ধরে, সূত্র ধরে সাজিয়েছে: ছবিতে কী ছিল, কে কখন কী দাবি করেছিল, এনসিটিবি কী বলেছিল, মতিঝিলে কী ঘটেছিল, আহতের সংখ্যা কেন এত রকম, আর পরে মামলা ও গ্রেপ্তারে কী হয়েছিল।
‘আদিবাসী’ শব্দ নিয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা আমাদের আলাদা লেখায় আছে — সংবিধান, শুমারি ও সরকারি নির্দেশনায় ‘আদিবাসী’ শব্দের নথি-কালানুক্রম। এখানে সেই বিতর্ক পুনরাবৃত্তি করা হয়নি; শুধু জানুয়ারি 2025-এর ঘটনাটুকু।
সূচিপত্র
ছবিটি একটি গাছের চিত্র। গাছের পাঁচটি পাতায় লেখা ছিল মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও আদিবাসী, আর পাশে লেখা ছিল “পাতা ছেঁড়া নিষেধ”। চিত্রটি ছাপা হয়েছিল নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে — বইয়ের ভেতরের কোনো পাঠ বা অধ্যায়ে নয়।
এই বর্ণনা প্রায় হুবহু একই ভাষায় পাওয়া যায় দুটি পত্রিকায়: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের 15 জানুয়ারির প্রতিবেদনে এবং সমকালের 16 জানুয়ারির প্রতিবেদনে। দুটিতেই পাতার ক্রম একই: মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, আদিবাসী। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনও একই পাঁচ শব্দ ও একই ক্যাপশনের কথা বলে।
লেখাটি গাছের কোন অংশে ছিল, সে বিষয়ে একটি সূত্র আরেকটু নির্দিষ্ট। লেখক সৌমিত জয়দ্বীপ বিডিনিউজে 26 জানুয়ারির মতামত-কলামে লিখেছেন, গাছের “শেকড়ের দিকে” লেখা ছিল ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’। তাঁর বর্ণনায় পাতার ক্রম আলাদা — হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও আদিবাসী। তিনি গ্রাফিতিটিকে বলেছেন আন্দোলনের সময় থেকেই “বেশ আলোচিত” এবং পরে “ভাইরাল”।
আরও একটি তথ্য আসে আন্তর্জাতিক দুটি সংগঠনের চিঠি থেকে। ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইনডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স (IWGIA) ও এশিয়া ইনডিজেনাস পিপলস প্যাক্টের (AIPP) 31 জানুয়ারি 2025-এর চিঠিতে বলা হয়েছে, চিত্রকর্মটিতে একটি শিরোনামও ছিল, যার ইংরেজি অনুবাদ তারা দিয়েছে “Do not hurt anybody’s feelings” বা “Do not hurt anybody”। বাংলায় শিরোনামটির হুবহু শব্দ কী ছিল, তা অন্য কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি।
| উপাদান | সূত্রে যা পাওয়া যায় | সূত্র |
|---|---|---|
| বই | নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ (কোনো কোনো খবরে ‘বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি’) | বিডিনিউজ, সমকাল, ডেইলি স্টার |
| অবস্থান | পেছনের প্রচ্ছদ | সব সূত্র |
| চিত্র | একটি গাছ, পাঁচটি পাতা | বিডিনিউজ, সমকাল, দেশ রূপান্তর, AIPP-IWGIA |
| পাতার শব্দ | মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, আদিবাসী | বিডিনিউজ, সমকাল |
| ক্যাপশন | “পাতা ছেঁড়া নিষেধ” — শেকড়ের দিকে লেখা | সমকাল; অবস্থান: সৌমিত জয়দ্বীপের কলাম |
| শিরোনাম | ইংরেজি অনুবাদে “Do not hurt anybody’s feelings”; বাংলা পাঠ জানা যায়নি | AIPP-IWGIA চিঠি |
| বদলে যা এল (অনলাইন সংস্করণে) | ‘বল বীর, চির উন্নত মম শির’ শীর্ষক নতুন গ্রাফিতি | ডেইলি স্টার বাংলা, 13 জানুয়ারি |
অর্থাৎ ছবিটি কোনো একক জনগোষ্ঠী নিয়ে নয়; চারটি ধর্মীয় পরিচয়ের পাশে একটি পঞ্চম পরিচয় হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ছিল। সৌমিত জয়দ্বীপ তাঁর কলামে এই মিশ্রণটিকেই সমালোচনা করেছেন — তাঁর মতে ছবির উদ্দেশ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক হলেও ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয় এক তালিকায় রাখা যুক্তির দিক থেকে গোলমেলে। অর্থাৎ ছবিটির সমালোচনা কেবল এক দিক থেকে আসেনি।
2025 শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে পেছনের প্রচ্ছদে আগের সরকারপ্রধানের ছবি ও উদ্ধৃতি সরিয়ে জুলাই 2024-এর অভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এনসিটিবি। এনসিটিবির চেয়ারম্যান পরে বলেছেন, শিক্ষার্থীরা দেয়ালে যেভাবে এঁকেছিল, গ্রাফিতিগুলো সেভাবেই বইয়ের পেছনে নেওয়া হয়েছিল।
প্রথম আলোর অক্টোবর 2024-এর প্রতিবেদন জানায়, বিনা মূল্যের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাঠ্যবইয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের গ্রাফিতি যুক্ত হচ্ছে — কিছু বইয়ের প্রচ্ছদে বা ভেতরের অংশে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, পেছনের পাতা থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ও উদ্ধৃতি বাদ যাচ্ছে। এনসিটিবির কয়েকজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, অভ্যুত্থান সাম্প্রতিক ঘটনা এবং সময় কম বলে লেখার বদলে গ্রাফিতি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত।
পরিমার্জনের কাজে যুক্ত ছিলেন লেখক রাখাল রাহা — প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যও আছে। এই নামটি পরে বিতর্কে ফিরে আসে: স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি তাঁকে পরিমার্জন কমিটি থেকে অপসারণের দাবি তোলে (নিচে দেখুন)।
‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’ গ্রাফিতিটি কে এঁকেছিলেন, কোন দেয়ালে প্রথম আঁকা হয়েছিল — এ তথ্য কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম রিয়াজুল হাসান 13 জানুয়ারি বিডিনিউজকে বলেছিলেন:
“গ্রাফিতিগুলো দেওয়ালে শিক্ষার্থীরা যেভাবে এঁকেছে সেভাবেই বইয়ের পেছনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।”
দুই দিন পর সমকালকে তিনি আরেকটি কথা যোগ করেন: “এই গ্রাফিতি কেউ এককভাবে বাছাই করেনি।” তাঁর ভাষায়, বৃহত্তর ঐক্যের কথা ভেবে সবাই মিলে এটি বাছাই করা হয়েছিল। চেয়ারম্যানের নামের বানান নিয়ে একটি অমিল আছে: বিডিনিউজ ও প্রথম আলো লিখেছে ‘এ কে এম রিয়াজুল হাসান’, সমকাল লিখেছে ‘একেএম রেজাউল হাসান’।
রোববার, 12 জানুয়ারি 2025, ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’ নামের একটি সংগঠন মতিঝিলে এনসিটিবি ভবন (পাঠ্যপুস্তক ভবন) ঘেরাও করে গ্রাফিতিটি বাতিলের দাবি জানায়। সেদিন রাতেই এনসিটিবি ওয়েবসাইটের পিডিএফ সংস্করণ থেকে গ্রাফিতিটি সরিয়ে নতুন একটি গ্রাফিতি বসায়।
কর্মসূচিটি দিনের কোন সময়ে হয়েছিল, তা নিয়ে সূত্রে অমিল আছে। ইত্তেফাক বলছে রোববার সকালে, ডেইলি স্টার বাংলা বলছে “গতকাল রাতে”। দুই পত্রিকাই একমত যে বদলটি এসেছিল রোববার রাতে।
ইত্তেফাকের বিবরণে সংগঠনটির দাবি ছিল পাঁচটি, যার মধ্যে এনসিটিবির চেয়ারম্যান এবং শব্দটি অনুমোদনে জড়িত বলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পদত্যাগও ছিল। সংগঠনটির মূল যুক্তি ছিল, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দ নেই; সেখানে আছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা উপজাতি।
কী বদলানো হয়েছিল, সেখানেও সূত্রগুলো পুরোপুরি এক কথা বলে না:
কতগুলো ছাপা বইয়ে পুরোনো গ্রাফিতি ছিল আর কতগুলোতে নতুনটি গেছে, সেই হিসাব কোথাও প্রকাশিত হয়নি।
স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি নিজেদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক একটি অরাজনৈতিক শিক্ষার্থী সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেয়, যা 2025-এর শুরুর দিকে গড়ে ওঠে। তাদের যুক্তি: ‘আদিবাসী’ শব্দ সংবিধানবিরোধী, আর বাংলাদেশ 2007 সালের জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেনি।
সমকালের 17 জানুয়ারির প্রতিবেদনে সংগঠনটির যুগ্ম আহ্বায়কের বরাতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এক বক্তৃতায় ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করার পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রতিবাদ হয়, আর সেখান থেকেই সংগঠনটির জন্ম; আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি, সদস্য তালিকাও তখন চূড়ান্ত হয়নি। সংগঠনটির আহ্বায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী। তারা নিজেদের অরাজনৈতিক বলে এবং আগে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়েও কর্মসূচি করেছে বলে জানায়। সৌমিত জয়দ্বীপ তাঁর কলামে একে “সদ্য গড়ে ওঠা” সংগঠন বলেছেন।
সংগঠনটির যুক্তি তাদের নেতাদের নিজের ভাষায় বিডিনিউজে ছাপা হয়েছিল। যুগ্ম আহ্বায়ক বলেছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা “বিদেশি প্ররোচনায় ২০০৭ সাল থেকে” নিজেদের আদিবাসী দাবি করছে, এবং 2007 সালের জাতিসংঘ ঘোষণাপত্রের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বায়ত্তশাসন-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। আহ্বায়ক 14 জানুয়ারি বিডিনিউজকে বলেছিলেন:
“পাঠ্যবইয়ের কভার পৃষ্ঠার রাষ্ট্রদ্রোহী পরিভাষা ‘আদিবাসী’ যুক্ত অখণ্ড ভারতের কল্পিত গ্রাফিতিটি বাদ দেওয়ায় আমাদের আংশিক দাবি পূরণ হয়েছে মাত্র।”
অর্থাৎ সংগঠনটি গাছের ছবিটিকে ‘অখণ্ড ভারতের’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত করেছিল। ছবির কোন উপাদান থেকে এই ব্যাখ্যা, তা সংগঠনটি প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করেছে এমন কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। তাদের বাকি দাবি ছিল: পরিমার্জন কমিটি থেকে রাখাল রাহাকে অপসারণ, এবং গ্রাফিতি অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিটি গঠন। আহ্বায়কের কথায়, এনসিটিবি আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি — সে কারণেই তারা 15 জানুয়ারি আবার ঘেরাও কর্মসূচি দেয়।
বিপরীত অবস্থানটিও একই প্রতিবেদনে আছে। সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার এক সংগঠক রাজু ভাস্কর্যের সমাবেশে বলেছিলেন, “একদল বিচ্ছিন্নতাবাদীর চাপে পড়ে তারা সেই গ্ৰাফিতি মুছে ফেলেছে। আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে আখ্যা দিয়েছে।” আন্তর্জাতিক আইনে ‘আদিবাসী’ কাকে বলে আর জাতিসংঘ ঘোষণাপত্রে আসলে কী আছে, তা নিয়ে আমাদের লেখা: আইএলও 107, 169 ও জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রে আদিবাসীর সংজ্ঞা এবং আদিবাসী স্বীকৃতি দিলে আইনত কী বদলায়, কী বদলায় না।
সোমবার, 13 জানুয়ারি, এনসিটিবির চেয়ারম্যান নিশ্চিত করেন যে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পিডিএফ সংস্করণ থেকে গ্রাফিতিটি বাদ দিয়ে নতুন একটি বসানো হয়েছে। একই দিনে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ সিদ্ধান্তটির প্রতিবাদ জানায়, আর ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্রজনতা’ এনসিটিবি ঘেরাওয়ের পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করে।
বিডিনিউজকে দেওয়া বক্তব্যে চেয়ারম্যান বলেন, এনসিটিবি চেষ্টা করেছিল বইয়ে কোনো বিতর্কিত বিষয় যেন না ঢোকে; শিক্ষার্থীরাই এখন বাতিলের দাবি জানানোয় সেটি বদলানো হয়েছে। দুই দিন পর সমকালকে তিনি আরও বলেন, স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি আগে স্মারকলিপি দিয়েছিল, আর এনসিটিবি তাদের বলেছে “বইয়ের কোথাও আদিবাসী শব্দ নেই। সংবিধানেও আদিবাসী শব্দ নেই।” AIPP-IWGIA-র চিঠির দাবি আরও এক ধাপ এগিয়ে — তাতে লেখা, এনসিটিবি একে “ভুল” (error) বলে স্বীকার করেছিল। এনসিটিবির নিজের কোনো লিখিত বিবৃতিতে ‘ভুল’ শব্দটি পাওয়া যায়নি।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের বৃহত্তর ঢাকা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিভূতি ভূষণ মাহাতো বিডিনিউজকে বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন, আর গ্রাফিতি সরিয়ে এনসিটিবি সেই বক্তব্যকেও অসম্মান করেছে। তিনি গ্রাফিতি পুনর্বহাল এবং পাঠ্যবইয়ে আদিবাসীদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে অধ্যায় যোগ করার দাবি জানান। (AIPP-IWGIA-র চিঠি ওই ভাষণের তারিখ দিয়েছে 25 আগস্ট 2024।)
সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্রজনতা তিনটি কর্মসূচি ঘোষণা করে: সোমবার রাত 11টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাফিতি আঁকা, অনলাইন প্রচারণা, আর রাজু ভাস্কর্য থেকে এনসিটিবি ভবন ঘেরাও। ঘেরাওয়ের দিন নিয়ে বিডিনিউজের একই প্রতিবেদনে দুই রকম কথা আছে — এক জায়গায় মঙ্গলবার, আরেক জায়গায় বুধবার; শেষ পর্যন্ত কর্মসূচিটি হয় বুধবার, 15 জানুয়ারি।
দেশ রূপান্তর জানায়, স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি 12 জানুয়ারি এবং সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা 13 জানুয়ারি একই জায়গায় কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। বিডিনিউজের ভাষ্যে উল্টোটা: আদিবাসী শিক্ষার্থীরা বুধবার বেলা 11টার ঘেরাও আগে ঘোষণা করে, পরে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টিও “একইসময়ে” ঘেরাওয়ের ঘোষণা দেয়। এনসিটিবির চেয়ারম্যান সমকালকে বলেন, মঙ্গলবার দুই পক্ষ একসঙ্গে কর্মসূচি ঘোষণা করলে নিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়। অর্থাৎ একই সময়ে একই জায়গায় দুটি বিপরীত কর্মসূচি হবে — এটি দুই দিন আগেই জানা ছিল।
বুধবার, 15 জানুয়ারি 2025, সকাল থেকে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি এনসিটিবি ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মিছিল রাজু ভাস্কর্য থেকে রওনা হয়ে বেলা পৌনে 12টার দিকে সেখানে পৌঁছায়। প্রথমে হাতাহাতি, পুলিশ দুই পক্ষকে আলাদা করে; বেলা 1টার দিকে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা হয়।

বিভিন্ন পত্রিকার বিবরণ জুড়ে দিলে ঘটনাক্রম দাঁড়ায় এরকম:
| সময় | ঘটনা | সূত্র |
|---|---|---|
| সকাল | এনসিটিবি ভবনের আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন | দেশ রূপান্তর |
| সকাল | রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার সমাবেশ; তারপর রোকেয়া হল, কলাভবন ও মধুর ক্যান্টিন ঘুরে মতিঝিলের দিকে মিছিল | বিডিনিউজ |
| বেলা 11টা–11:30 | স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি এনসিটিবি ভবনের সামনে অবস্থান নেয় | বিডিনিউজ, সমকাল, দেশ রূপান্তর |
| বেলা 11:45 (আনুমানিক) | আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মিছিল পৌঁছায়; পাল্টাপাল্টি স্লোগান, এক দফা হাতাহাতি; পুলিশ মাঝখানে দাঁড়ায় | ইত্তেফাক, বিডিনিউজ |
| দুপুর | স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির ছয়জনের মতো সদস্য আলোচনার জন্য এনসিটিবি ভবনের ভেতরে যান (সংগঠনটির ভাষ্য) | সমকাল (17 জানুয়ারি) |
| বেলা 1টার দিকে | লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা; আদিবাসী শিক্ষার্থীরা দৈনিক বাংলা মোড়ের দিকে ছত্রভঙ্গ; আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয় | বিডিনিউজ, ইত্তেফাক, সমকাল |
| পরের 20–25 মিনিট | প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় | সমকাল, দেশ রূপান্তর |
| সন্ধ্যা | বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সমাবেশ ডাকে | প্রথম আলো |
বিডিনিউজের আলোকচিত্রী মাহমুদ জামান অভি ঘটনাস্থল থেকে জানিয়েছিলেন, পুলিশ মাঝখানে অবস্থান নেওয়ার পরও এক দফা হাতাহাতি হয়, এবং এক পর্যায়ে “‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’র অবস্থান থেকে একটি দল লাঠিসোঁটা নিয়ে ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র জনতা’র ওপর চড়াও হয়।” ছত্রভঙ্গ হওয়ার পরও স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির সদস্যরা লাঠিসোঁটা হাতে এনসিটিবি ভবনের সামনে ছিলেন বলে প্রতিবেদনটি জানায়।
হামলায় কী ব্যবহার হয়েছিল, সে বিষয়ে সৌমিত জয়দ্বীপের কলাম লিখেছে “জাতীয় পতাকা বাঁধা রড, লাঠি ও ক্রিকেট স্ট্যাম্প”; AIPP-IWGIA-র চিঠি বলছে ক্রিকেট স্ট্যাম্প ও লাঠি, এবং হামলাকারীর সংখ্যা “প্রায় একশো”। এই সংখ্যার পক্ষে কোনো সংবাদপত্রের স্বাধীন হিসাব পাওয়া যায়নি।
সংঘর্ষের জায়গাটি নিয়েও বর্ণনা একটু আলাদা: বেশির ভাগ সূত্র বলছে এনসিটিবি ভবনের সামনে; সমকাল বলছে মতিঝিল সিটি সেন্টারের কাছে; ঢাকা ট্রিবিউনের 17 জানুয়ারির প্রতিবেদন বলছে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে মিছিলটির ওপর হামলা হয়।
আহতদের মধ্যে ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা — সংগঠনটির মুখপাত্র উমামা ফাতেমা ফেসবুকে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেন বলে ঢাকা ট্রিবিউন ও ইত্তেফাক জানায়। আহত হন বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি নিউজের একজন সংবাদকর্মীও। আহত অন্যদের নাম পত্রিকায় ছাপা হয়েছে; এখানে সেগুলো দেওয়া হয়নি।
15 জানুয়ারির সংঘর্ষে আহতের সংখ্যা সূত্রভেদে 9 থেকে 33। সবচেয়ে কম সংখ্যাটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির হিসাব (9 জন চিকিৎসা নিয়েছেন); সবচেয়ে বড় সংখ্যাটি (33) দুই পক্ষের নিজ নিজ দাবি যোগ করে পাওয়া। সংখ্যাগুলো আলাদা, কারণ প্রত্যেকে আলাদা জিনিস গুনেছে।
| সংখ্যা | কী গোনা হয়েছে | সূত্র ও তারিখ |
|---|---|---|
| 9 | ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া, সাংবাদিকসহ (মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. ফারুকের হিসাব) | বিডিনিউজ, 15 জানুয়ারি; ইত্তেফাক একই 9 জনের নাম দিয়েছে |
| অন্তত 9 | মোট আহত | টিবিএস, 17 জানুয়ারি |
| অন্তত 10 | ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া | ডেইলি স্টার বাংলা, 16 জানুয়ারি; সমকাল, 17 জানুয়ারি |
| 10–15 | পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের বিবৃতি | প্রথম আলো, 15 জানুয়ারি |
| 11 | আদিবাসী পক্ষের সংগঠকের দাবি; আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতির ভাষ্যে হাসপাতালে নেওয়া আদিবাসী | বিডিনিউজ; সমকাল |
| অন্তত 11 | দুই দফা হামলায় আহত | 27 নাগরিকের বিবৃতি, ডেইলি স্টার বাংলা, 16 জানুয়ারি |
| 14 / 16 | স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির নিজেদের আহতের দাবি | বিডিনিউজে 14; সমকাল ও দেশ রূপান্তরে 16 |
| 15 | মামলার এজাহারে “গুরুতর আহত” সমাবেশকারী | ঢাকা ট্রিবিউন, 17 জানুয়ারি |
| 17 / 18 | আদিবাসী ছাত্র ফোরামের সভাপতির দাবি 17 (সাতজন গুরুতর); সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার নামের তালিকায় 18 | সমকাল ও দেশ রূপান্তর, 16 জানুয়ারি |
| অন্তত 18 | মতামত-কলাম | সৌমিত জয়দ্বীপ, বিডিনিউজ, 26 জানুয়ারি |
| অন্তত 19 | “গুরুতর আহত”, নামের তালিকাসহ | AIPP-IWGIA চিঠি, 31 জানুয়ারি |
| অন্তত 20 | মোট আহত, নারীসহ | ডেইলি স্টার বাংলা, 22 ফেব্রুয়ারি |
| 33 | দুই পক্ষের দাবি একসঙ্গে | সমকাল ও দেশ রূপান্তর, 16 জানুয়ারি |
33 সংখ্যাটি নিয়ে একটি কথা মনে রাখা দরকার: এটি একটি পক্ষের আহতের হিসাব নয়। সমকাল ও দেশ রূপান্তর দুই পক্ষের দাবি একসঙ্গে শিরোনামে নিয়েছে — আদিবাসী পক্ষের নামের তালিকায় 18 জন, স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির দাবিতে 16 জন। দুটি যোগ করলে 34 হয়; পত্রিকা দুটি এই গরমিলের ব্যাখ্যা দেয়নি। পরে পুলিশ স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির আটক দুই সদস্যের আঘাতের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলে (নিচে মামলা ও গ্রেপ্তার অংশে)।
এই লেখার শুরুতে “কয়েক ডজন” বলা হয়েছে এই কারণেই: সংবাদপত্রগুলো যে সংখ্যাই দিক, প্রত্যক্ষ হাসপাতাল-হিসাব (9–10) আর সংগঠনগুলোর তালিকা (17–19) — দুটোই নথিভুক্ত।
দুই পক্ষই বলেছে অন্য পক্ষ আগে হামলা করেছে। আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ভাষ্যে, তারা শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে গিয়েছিল এবং বসে পড়ার পর দ্বিতীয় দফায় হামলা হয়। স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির ভাষ্যে, আদিবাসী শিক্ষার্থীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে তাদের ওপর হামলা করে। প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের বিবরণ প্রথম ভাষ্যের কাছাকাছি।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনাও নথিভুক্ত। জাতীয় নাগরিক কমিটি বিবৃতিতে বলেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দৃশ্যমানভাবে সক্রিয় থাকলে হামলা ঠেকানো যেত। 27 নাগরিকের বিবৃতি বলছে, প্রথম দফা হামলার সময় পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল আর দ্বিতীয় দফায় হামলাকারীদের সরিয়ে দেয়; বিবৃতিটি এ-ও দাবি করে যে পুলিশকে রাস্তা থেকে রক্ত ধুয়ে ফেলতে দেখা গেছে। পুলিশের এ বিষয়ে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
হামলার পরদিন, বৃহস্পতিবার 16 জানুয়ারি, ‘সংক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে, অর্থাৎ সচিবালয় ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে মিছিল করে। শিক্ষা ভবনের কাছে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে মিছিল আটকায় এবং জলকামান, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ করে। এতে সাতজন আহত হন।
ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, আহত সাতজনের ছয়জন শিক্ষার্থী, একজন পথচারী; ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. ফারুক বলেন, “তবে তাদের কারও অবস্থা গুরুতর নয়”। এই মিছিলের আহতের সংখ্যাও সূত্রভেদে আলাদা: প্রথম আলো শিক্ষার্থীদের বরাতে অন্তত পাঁচজন, সমকাল আদিবাসী পক্ষের বরাতে তিন-চারজন।
রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম সমকালকে বলেন, পুলিশ প্রথমে আন্দোলনকারীদের ফিরে যেতে বলেছিল; ব্যারিকেড ভাঙার পর এগোনো ঠেকাতে জলকামান ব্যবহার করা হয়; উদ্দেশ্য ছিল ছত্রভঙ্গ করা, কাউকে আঘাত করা নয়, আর শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে পুলিশের কোনো দ্বিমত নেই।
AIPP-IWGIA-র চিঠি এই দিনটিকেও বর্ণনা করে: “Aggrieved Students-Masses” ব্যানারে আদিবাসী তরুণ ও সমর্থকেরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে মিছিল করেছিলেন, পুলিশ বাধা দেয় এবং আরও সাতজন আহত হন।
অন্তর্বর্তী সরকার 15 জানুয়ারিই হামলার নিন্দা জানায় এবং 16 জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে বিবৃতিতে তদন্তের নির্দেশ, দুজন গ্রেপ্তারের তথ্য ও বাকিদের শনাক্তের কথা জানায়। বিবৃতিতে ভুক্তভোগীদের বলা হয় “ethnic minority students” — এই শব্দচয়ন নিয়েই টিআইবি আপত্তি তোলে।
ইউএনবি জানায়, প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বিবৃতিটি পড়ে শোনান। বিবৃতিতে বলা হয়, সরকার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, “there is no place for mob violence, racial hatred, and bigotry in Bangladesh”, এবং সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলা নষ্টকারী যে-কেউ বৈষম্য ছাড়াই কঠোর ব্যবস্থার মুখে পড়বে। সমকাল জানায়, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফেসবুকে লিখেছিলেন যে বিচার হবে এবং দুজন গ্রেপ্তার হয়েছে; উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছিলেন ঘটনার তদন্ত হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) 17 জানুয়ারি বিবৃতিতে বলে, সরকারের বিবৃতি “সময়োপযোগী, তবে যথেষ্ট নয়”। নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের বরাতে প্রথম আলো জানায়, টিআইবির আপত্তি ছিল বিবৃতিতে শিক্ষার্থীদের ‘আদিবাসী’ না বলে ‘ethnic minority’ বলা নিয়ে — যা টিআইবির মতে প্রধান উপদেষ্টার আগস্ট 2024-এর ভাষণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। টিআইবি এনসিটিবির গ্রাফিতি সরানোকে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হুমকির মুখে নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করে এবং এনসিটিবিকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানায়।
একই ঘটনার ভুক্তভোগীদের সংবাদমাধ্যমগুলোও ভিন্ন ভিন্ন নামে ডেকেছে — ইউএনবি “ethnic minority students”, ঢাকা ট্রিবিউনের শিরোনাম “ethnic protesters”, টিবিএস “indigenous students”, আর AIPP-IWGIA “Indigenous students”। শব্দটি নিয়েই যে বিতর্ক, সেই শব্দ নিয়ে বিভাজন ঘটনার বর্ণনাতেও থেকে গেছে। সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদে কোন শব্দ আছে, আর তা কেন আদালতে বলবৎযোগ্য নয়, তা নিয়ে আমাদের লেখা: সংবিধানের 23ক অনুচ্ছেদ আদালতে বলবৎ করা যায় না কেন।
হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় একটি মামলা হয় — সংবাদমাধ্যমের বরাতে 17 জানুয়ারি, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি জগদীশ চাকমার করা। 22 ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই মামলায় পাঁচজন গ্রেপ্তার হন, যাদের একজনকে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যার ওপর হামলাকারী হিসেবে শনাক্ত করে।
মামলার খুঁটিনাটিতে সূত্রগুলো পুরো মেলে না:
গ্রেপ্তারের কালানুক্রম (গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের নাম পত্রিকায় ছাপা হয়েছে; আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি বলে এখানে কেবল ভূমিকা দেওয়া হলো):
| তারিখ | কী ঘটেছিল | সূত্র |
|---|---|---|
| 15–16 জানুয়ারি রাত | স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির দুই সদস্য আটক। ভারপ্রাপ্ত ওসি মেজবাহ উদ্দিন জানান, তাঁদের মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি, যদিও বুধবার তাঁরা রক্তমাখা ব্যান্ডেজ নিয়ে আহত দাবি করেছিলেন। টিবিএসের বরাতে পুলিশ বলেছে, ব্যান্ডেজ ও ভায়োডিন মলম দিয়ে আঘাত সাজানো হয়েছিল; সংগঠনটির এক যুগ্ম আহ্বায়ক এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। | ডেইলি স্টার বাংলা, 16 জানুয়ারি; টিবিএস |
| 29 জানুয়ারি | তৃতীয় গ্রেপ্তার | ডেইলি স্টার বাংলা, 22 ফেব্রুয়ারি |
| 12 ফেব্রুয়ারি রাত | শ্যামপুর থেকে ডিবি পুলিশ এজাহারের 6 নম্বর আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তিনি ঘটনার সময় জাতীয় নাগরিক কমিটির ধানমন্ডি থানা প্রতিনিধি ছিলেন; বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলার পর কমিটি থেকে বহিষ্কৃত হন। এ নিয়ে গ্রেপ্তার 4 জন। | ডেইলি স্টার বাংলা, 13 ফেব্রুয়ারি |
| 22 ফেব্রুয়ারি ভোর | নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে মতিঝিল থানা পুলিশ মামলার “অন্যতম আসামিকে” গ্রেপ্তার করে। ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) তালেবুর রহমানের বরাতে, সিসিটিভি ফুটেজ ও সংগৃহীত ভিডিও দেখে পুলিশ তাঁকে রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যার ওপর হামলাকারী হিসেবে শনাক্ত করে। মোট গ্রেপ্তার 5 জন। | ডেইলি স্টার বাংলা, 22 ফেব্রুয়ারি |
মামলাটির তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে কি না, বা বিচার কোন পর্যায়ে, সে বিষয়ে কোনো প্রকাশিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
হামলার পরের দুই সপ্তাহে তিনটি বড় বিবৃতি আসে: 16 জানুয়ারি 27 নাগরিকের, 19 জানুয়ারি 183 নাগরিকের, আর 31 জানুয়ারি AIPP ও IWGIA-র নেতৃত্বে 103টি সংগঠনের সই করা চিঠি প্রধান উপদেষ্টার কাছে। তিনটিই হামলাকারীদের বিচার চেয়েছে; দুটি গ্রাফিতি পুনর্বহালের দাবিও তুলেছে।
রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়াও সমকালে তালিকাভুক্ত: জাতীয় নাগরিক কমিটি, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, ইউপিডিএফ-সমর্থিত বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, গণসংহতি আন্দোলন, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ও ছাত্রদল নিন্দা জানায়। জাতীয় নাগরিক কমিটি তার বিবৃতিতে হামলাকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কৌশলের ধারাবাহিকতা বলে উল্লেখ করে।
এর বিপরীতে গ্রাফিতি সরানোর পক্ষে লেখাও ছাপা হয়েছিল। আমাদের আর্কাইভের ‘স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী’ সংজ্ঞার উৎস নিয়ে লেখায় দেখানো হয়েছে, 27 জানুয়ারি 2025-এ যুগান্তরে প্রকাশিত একটি উপসম্পাদকীয় এই গ্রাফিতি-বিতর্কের সময়েই লেখা — এবং সেটি মর্গানের নামে একটি সংজ্ঞা উদ্ধৃত করেছিল, যার মূল উৎস পাওয়া যায় না।
জানুয়ারি 2025-এর এই ঘটনা নিয়ে আলোচনায় পাঁচটি বিষয় প্রায়ই গুলিয়ে যায়: বইয়ে কী ছিল, কোন বই, ছাপা বই না অনলাইন সংস্করণ, ঘটনার সময়, আর আহতের সংখ্যা। প্রতিটির জন্য সূত্রে যা আছে, তা নিচে।
একটি গাছের ছবি, যার পাঁচটি পাতায় লেখা ছিল মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও আদিবাসী, আর পাশে বা শেকড়ের দিকে লেখা ছিল “পাতা ছেঁড়া নিষেধ”। বিডিনিউজ ও সমকালের জানুয়ারি 2025-এর প্রতিবেদনে এই বর্ণনা আছে। চিত্রটি ছিল নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে।
নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ বই (কোনো কোনো খবরে ‘বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি’)। গ্রাফিতিটি ছিল বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড 12 জানুয়ারি 2025 রাতে বইটির অনলাইন পিডিএফ থেকে এটি সরিয়ে ‘বল বীর, চির উন্নত মম শির’ শীর্ষক নতুন একটি গ্রাফিতি বসায়।
রোববার, 12 জানুয়ারি 2025-এর রাতে। সেদিন ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’ মতিঝিলে এনসিটিবি ভবন ঘেরাও করে গ্রাফিতিটি বাতিলের দাবি জানায়। 13 জানুয়ারি এনসিটিবির চেয়ারম্যান এ কে এম রিয়াজুল হাসান বিডিনিউজকে নিশ্চিত করেন যে পিডিএফ থেকে এটি বাদ দিয়ে নতুন গ্রাফিতি যুক্ত করা হয়েছে।
‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি সদ্য গঠিত সংগঠন। তাদের যুক্তি ছিল, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দ নেই, শব্দটি “সংবিধানবিরোধী”, আর বাংলাদেশ 2007 সালের জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেনি। সংগঠনের আহ্বায়ক গ্রাফিতিটিকে “অখণ্ড ভারতের কল্পিত গ্রাফিতি” বলেছিলেন।
15 জানুয়ারি 2025 সকালে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি এনসিটিবি ভবনের সামনে অবস্থান নেয়; গ্রাফিতি পুনর্বহালের দাবিতে সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার মিছিল রাজু ভাস্কর্য থেকে সেখানে পৌঁছায় বেলা পৌনে 12টার দিকে। হাতাহাতির পর পুলিশ দুই পক্ষকে আলাদা করে, কিন্তু বেলা 1টার দিকে লাঠিসোঁটা নিয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়। দুই পক্ষই অন্য পক্ষকে দায়ী করেছে।
সূত্রভেদে 9 থেকে 33। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির হিসাবে 9 জন সেখানে চিকিৎসা নেন। আদিবাসী পক্ষের নামের তালিকায় 17–18 জন, AIPP-IWGIA-র চিঠিতে অন্তত 19 জন। সমকাল ও দেশ রূপান্তরের 33 সংখ্যাটি দুই পক্ষের দাবি মিলিয়ে দেওয়া — আদিবাসী পক্ষের তালিকায় 18 ও স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির দাবিতে 16 (যোগফল আসলে 34)।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, যিনি 15 জানুয়ারি 2025-এ এনসিটিবির সামনে হামলায় আহত হন। সংগঠনটির মুখপাত্র উমামা ফাতেমা ফেসবুকে তাঁর আহত হওয়ার কথা জানান। 22 ফেব্রুয়ারি পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তাঁর ওপর হামলাকারী হিসেবে শনাক্ত একজনকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হ্যাঁ। মতিঝিল থানায় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি জগদীশ চাকমা মামলা করেন, সংবাদমাধ্যমের বরাতে 17 জানুয়ারি 2025। ঢাকা ট্রিবিউন ও টিবিএস জানায় প্রায় 300 অজ্ঞাতনামা আসামি; ডেইলি স্টার বাংলা জানায় 16 জনের নাম ও 200–300 অজ্ঞাতনামা। 22 ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচজন গ্রেপ্তার হন।
অন্তর্বর্তী সরকার হামলার নিন্দা জানায়, এবং 16 জানুয়ারি 2025 প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে তদন্তের নির্দেশ, দুজন গ্রেপ্তার ও বাকিদের শনাক্তের কথা জানায়। বিবৃতিতে বলা হয় বাংলাদেশে মব সহিংসতা, জাতিগত ঘৃণা ও গোঁড়ামির জায়গা নেই। টিআইবি বিবৃতিটিকে সময়োপযোগী কিন্তু অপর্যাপ্ত বলে, কারণ এতে শিক্ষার্থীদের ‘আদিবাসী’ না বলে ‘ethnic minority’ বলা হয়েছে।
ফিরিয়ে আনার কোনো ঘোষণা বা প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। জানুয়ারি 2025-এর শেষ পর্যন্ত পুনর্বহালের দাবি অব্যাহত ছিল — 183 নাগরিকের বিবৃতি (19 জানুয়ারি) ও AIPP-IWGIA নেতৃত্বাধীন 103 সংগঠনের চিঠি (31 জানুয়ারি) দুটিই চিত্রকর্মটি ফেরানোর দাবি করেছিল। 2026 শিক্ষাবর্ষের বইয়ে কী আছে, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য মেলেনি।
2025 শিক্ষাবর্ষে এনসিটিবি পাঠ্যবইয়ের পেছনের পাতা থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছবি ও উদ্ধৃতি সরিয়ে জুলাই 2024-এর অভ্যুত্থানের দেয়ালচিত্র বসানোর সিদ্ধান্ত নেয় (প্রথম আলো, অক্টোবর 2024)। চেয়ারম্যানের ভাষ্যে, শিক্ষার্থীরা দেয়ালে যেভাবে এঁকেছিল সেভাবেই গ্রাফিতিগুলো বইয়ে নেওয়া হয়েছিল, এবং ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’ বৃহত্তর ঐক্যের কথা ভেবে সবাই মিলে বাছাই করা।
হামলার প্রতিবাদে 16 জানুয়ারি 2025 ‘সংক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা’ রাজু ভাস্কর্য থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা সচিবালয়ের দিকে মিছিল করে। শিক্ষা ভবনের কাছে পুলিশ ব্যারিকেড দেয় এবং জলকামান, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ করে। ডেইলি স্টার বাংলার হিসাবে সাতজন আহত হন — ছয় শিক্ষার্থী ও এক পথচারী; কারও অবস্থা গুরুতর ছিল না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমাদের অন্যান্য লেখা পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম হাবে।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 21 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী, আদিবাসী অধিকার, সংবিধানে আদিবাসী
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।