Last updated Oct 17th, 2026
0

আমাদের ই-বুক আর্কাইভে ২৯ পাতার একটি পুস্তিকা আছে। প্রকাশক আইএলও-র ঢাকা অফিস, প্রকাশকাল অক্টোবর 2010। ভেতরে দুটি আন্তর্জাতিক চুক্তির পূর্ণ বাংলা পাঠ — আইএলও কনভেনশন 107 ও 169। “আদিবাসী কারা” — এই প্রশ্নে বাংলাদেশে যত তর্ক হয়, তার প্রায় প্রতিটিতে এই দুটি কনভেনশনের নাম আসে। কিন্তু কনভেনশনের প্রথম অনুচ্ছেদটি আসলে কী বলে, সেটি পাঠকের সামনে খুব কমই রাখা হয়।
সংক্ষিপ্ত উত্তর এই: আদিবাসীর সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইনে একটিমাত্র বাক্যে বাঁধা নেই। আইএলও কনভেনশন 107 (1957) ও 169 (1989)-এর অনুচ্ছেদ 1 বলে দেয় কোন জনগোষ্ঠীর ওপর চুক্তিটি প্রযোজ্য হবে, আর 169-এ আত্মপরিচয়কে “মৌলিক মানদণ্ড” করা হয়েছে। জাতিসংঘের কোনো সংস্থা কখনো আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা গ্রহণ করেনি; কাজ চলে মার্টিনেজ কোবোর “কার্যকরী সংজ্ঞা” আর কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের তালিকা দিয়ে।
এই লেখায় দলিলগুলোর মূল পাঠ ধারার নম্বরসহ পাশাপাশি রাখা হলো — ইংরেজি মূল, আর যেখানে আছে, আইএলও ঢাকা ও ইউএনডিপি-র প্রকাশিত বাংলা পাঠ। শব্দটির সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে আমাদের আগের লেখা আদিবাসী শব্দটির সংজ্ঞা কিভাবে নির্ধারিত হয়? আর জাতিসংঘ ঘোষণাপত্রের ধারা ধরে ব্যাখ্যা জাতিসংঘ আদিবাসী ঘোষণাপত্র (UNDRIP): কী বলে, বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে — সেগুলোর কথা এখানে আর বলা হয়নি। এখানে প্রশ্ন একটাই: সংজ্ঞার জায়গায় দলিলগুলোতে হুবহু কী লেখা আছে।
এই লেখায় যা আছে
নেই — অন্তত সর্বজনীন, আনুষ্ঠানিক অর্থে। জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের সচিবালয় 2004 সালের একটি পটভূমি-পত্রে লিখেছে, জাতিসংঘে তিরিশ বছর আর আইএলও-তে আরও দীর্ঘ সময় ধরে বিতর্ক হলেও “indigenous peoples”-এর কোনো সংজ্ঞা “জাতিসংঘ ব্যবস্থার কোনো সংস্থা কখনো গ্রহণ করেনি”।
একই পত্রের উপসংহারে একটি তুলনা আছে, যা তর্কটিকে অন্য আলোয় দেখায়। জাতিসংঘ “peoples” বা “minorities” শব্দেরও কোনো আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা দেয়নি, তবু জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করেছে, সংখ্যালঘু অধিকারের ঘোষণাপত্রও গ্রহণ করেছে। সংজ্ঞার অভাব সেসব ক্ষেত্রে সাফল্য বা ব্যর্থতার কারণ হয়নি। পত্রটির সিদ্ধান্ত: আজ প্রচলিত মত হলো আনুষ্ঠানিক সর্বজনীন সংজ্ঞার “প্রয়োজন নেই”, আর ব্যবহারিক কাজে সাধারণভাবে গৃহীত বোঝাপড়াটি মার্টিনেজ কোবো সমীক্ষার।
তাহলে তর্কে যে “আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা” বলা হয়, সেটি আসলে তিন ধরনের পাঠ:
স্থায়ী ফোরামের পটভূমি-পত্র নিজেই আইএলও 169-এর অনুচ্ছেদ 1 সম্পর্কে বলেছে, এতে আছে “a statement of coverage rather than a definition” — সংজ্ঞা নয়, পরিধির বিবরণ। আমাদের আর্কাইভে প্রকাশিত জুম্ম জনগণের আদিবাসী পরিচয়ের দাবি কেন যৌক্তিক লেখাটিও একই কথা বলে: কনভেনশন 107 “আদিবাসী” পদটিকে “পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত করে না”, আর 169-ও পরিষ্কার সংজ্ঞা না দিয়ে “কিছু মুখ্য ও গৌণ নির্ণায়ক” দিয়েছে।
1957 সালের কনভেনশন 107-এর অনুচ্ছেদ 1 দুই ধরনের জনগোষ্ঠীর ওপর চুক্তিটি প্রযোজ্য করে: যাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা “কম অগ্রসর” আর মর্যাদা নিজস্ব প্রথা বা বিশেষ আইনে নিয়ন্ত্রিত; আর যারা রাজ্য বিজয় বা উপনিবেশ স্থাপনের কালের বাসিন্দাদের বংশধর হিসেবে “আদিবাসী” বলে গণ্য। সঙ্গে আছে “সেমি-ট্রাইবাল”-এর সংজ্ঞা।
কনভেনশনটি গৃহীত হয় 26 জুন 1957, জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনের চল্লিশতম অধিবেশনে। জাতিসংঘের চুক্তি-সংকলনে (United Nations Treaty Series, খণ্ড 328, নং 4738) এর সরকারি পাঠ ইংরেজি ও ফরাসি, আর আইএলও এটি নিবন্ধন করে 5 জুন 1959। পুরো নাম নিজেই লক্ষ্যটা বলে দেয়: “Convention concerning the Protection and Integration of Indigenous and Other Tribal and Semi-Tribal Populations in Independent Countries” — সুরক্ষা ও একীভূতকরণ।
ইংরেজি মূল পাঠে অনুচ্ছেদ 1:
1. This Convention applies to—
(a) members of tribal or semi-tribal populations in independent countries whose social and economic conditions are at a less advanced stage than the stage reached by the other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations;
(b) members of tribal or semi-tribal populations in independent countries which are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonisation and which, irrespective of their legal status, live more in conformity with the social, economic and cultural institutions of that time than with the institutions of the nation to which they belong.
2. For the purposes of this Convention, the term semi-tribal includes groups and persons who, although they are in the process of losing their tribal characteristics, are not yet integrated into the national community.
3. The indigenous and other tribal or semi-tribal populations mentioned in paragraphs 1 and 2 of this Article are referred to hereinafter as “the populations concerned”.
আইএলও ঢাকার 2010 সালের বাংলা পাঠে একই অনুচ্ছেদ:
১। এই কনভেনশন প্রযোজ্য হবে—
(ক) স্বাধীন দেশসমূহের আদিবাসী এবং ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর সদস্যদের বেলায়, যাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জাতীয় জনসমষ্টির অন্যান্য অংশের চেয়ে কম অগ্রসর এবং যাদের মর্যাদা সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে তাদের নিজস্ব প্রথা কিংবা রীতি-নীতি অথবা বিশেষ আইন বা প্রবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়;
(খ) স্বাধীন দেশসমূহের আদিবাসী এবং ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর সদস্যদের ক্ষেত্রে রাজ্য বিজয় কিংবা উপনিবেশ স্থাপনের কালে এই দেশে কিংবা যে ভৌগলিক ভূখণ্ডে দেশটি অবস্থিত সেখানে বসবাসকারী অধিবাসীদের উত্তরাধিকারী হওয়ার প্রেক্ষিতে আদিবাসী বলে পরিগণিত এবং যারা, তাদের আইনসংগত মর্যাদা নির্বিশেষে নিজেদের জাতীয় আচার ও কৃষ্টির পরিবর্তে ঐ সময়কার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আচার ব্যবহারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপন করে।
২। এই কনভেনশনে ট্রাইবাল বলতে ঐ গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের বুঝাবে যারা তাদের ট্রাইবাল বৈশিষ্ট্য হারানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং এখনও জাতীয় জনসমষ্টির সাথে একীভূত হয়নি।
৩। এই অনুচ্ছেদের প্যারাগ্রাফ ১ ও ২ -তে বর্ণিত আদিবাসী এবং অন্যান্য ট্রাইবাল ও সেমি-ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীসমূহকে এরপর থেকে ‘সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
পাঠটি ধরে চারটি বিষয় চোখে পড়ে।
এক — মাপকাঠি “অগ্রসরতা”। উপধারা (ক)-এর শর্ত হলো জাতীয় জনসমষ্টির অন্য অংশের তুলনায় “a less advanced stage”। অর্থাৎ 1957-এর দলিল জনগোষ্ঠীকে চিনছে উন্নয়নের সিঁড়িতে তার অবস্থান দিয়ে। কনভেনশনের পরের অনুচ্ছেদগুলোতেও একই ভাষা ফিরে আসে — অনুচ্ছেদ 10(2)-এ শাস্তি নির্ধারণে “degree of cultural development” বিবেচনার কথা আছে।
দুই — সময়ের রেখা “বিজয় বা উপনিবেশ”। উপধারা (খ)-এ বংশধারার মাপকাঠি হলো “at the time of conquest or colonisation”। এখানে রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণের কোনো উল্লেখ নেই — সেটি আসে 1989-এ।
তিন — “সেমি-ট্রাইবাল” একটি মধ্যবর্তী অবস্থা। অনুচ্ছেদ 1(2) এমন গোষ্ঠীর কথা বলে যারা “ট্রাইবাল বৈশিষ্ট্য হারানোর প্রক্রিয়ায়” আছে কিন্তু এখনো একীভূত হয়নি। অর্থাৎ দলিলটি ধরে নিয়েছে, পরিচয় হারানোটাই স্বাভাবিক গতিপথ।
চার — আত্মপরিচয়ের কোনো উল্লেখ নেই। কে আদিবাসী, তা ঠিক করার মানদণ্ড এখানে পুরোপুরি বাইরের — অর্থনৈতিক অবস্থা, আইনি মর্যাদা, বংশধারা। জনগোষ্ঠী নিজেকে কী মনে করে, সেই প্রশ্ন 1957-এর পাঠে আসেনি।
কারণ দলিলটির প্রস্তাবনা আর অনুচ্ছেদ 2 সরাসরি সেটাই বলে: সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং তাদের “progressive integration” — দেশের জীবনধারায় ক্রমান্বয়ে একীভূত করা। 1989-এর কনভেনশনের প্রস্তাবনা পরে এই “assimilationist orientation” সরিয়ে দেওয়ার কথা স্পষ্ট করে লিখেছে।
কনভেনশন 107-এর প্রস্তাবনায় একটি বাক্য আছে: স্বাধীন দেশগুলোতে এমন আদিবাসী, ট্রাইবাল ও সেমি-ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী আছে যারা “not yet integrated into the national community” — এখনো জাতীয় জনসমষ্টিতে একীভূত হয়নি। অনুচ্ছেদ 2(1)-এর বাংলা পাঠ:
সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিধান ও নিজ নিজ দেশের জীবন ধারায় তাদেরকে ক্রমান্বয়ে একীভূত করার জন্য সমন্বিত ও সুব্যবস্থিত কার্যক্রম গ্রহণের প্রাথমিক দায়িত্ব দেশের সরকারের উপর বর্তাবে।
তবে একই অনুচ্ছেদে দুটি সীমারেখাও টানা আছে, যা প্রায়ই উপেক্ষিত। অনুচ্ছেদ 2(2)(গ) জাতীয় একীভূতকরণের কথা বলে “to the exclusion of measures tending towards the artificial assimilation” — কৃত্রিম আত্মীকরণের পদক্ষেপ বাদ দিয়ে। আর অনুচ্ছেদ 2(4): একীভূতকরণের উপায় হিসেবে “Recourse to force or coercion … shall be excluded” — বলপ্রয়োগ চলবে না। অনুচ্ছেদ 3(2)(ক) আরও বলে, বিশেষ সুরক্ষার ব্যবস্থা যেন “a state of segregation” তৈরি বা দীর্ঘায়িত করার উপায় না হয়।
অর্থাৎ 1957-এর দলিলটি দুই দিকে টানে: পৃথক থাকাটা স্থায়ী হোক তা চায় না, আবার জোর করে মিশিয়ে দেওয়াও নিষেধ করে। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই অধিকারগুলো বসানো। অনুচ্ছেদ 7(2) জনগোষ্ঠীকে নিজেদের প্রথা ও প্রতিষ্ঠান রাখতে দেয় — কিন্তু শর্ত হলো সেগুলো “not incompatible with the national legal system or the objectives of integration programmes”।
1989-এর কনভেনশন 169-এর প্রস্তাবনা এই অবস্থান থেকে সরে আসার কারণ নিজেই লিখে রেখেছে: 1957 সালের পর আন্তর্জাতিক আইনের অগ্রগতি আর আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর অবস্থার পরিবর্তন এমন নতুন মান গ্রহণ যথার্থ করেছে “with a view to removing the assimilationist orientation of the earlier standards”। আইএলও ঢাকার বাংলা পাঠে কথাটি: “পূর্ববর্তী মানদণ্ডের একীভূতকরণ ধারণা অপসারণ করার দৃষ্টিভঙ্গি সম্বলিত নতুন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড গ্রহণ করার যথার্থতা বিবেচনা করে”।
আর্কাইভের লেখাটি এই পরিবর্তনকে আরও কড়া ভাষায় বলেছে — কনভেনশন 107-এ “অন্তর্নিহিতভাবে আত্তীকরণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা প্রকৃতিগতভাবে বিধ্বংসী এবং সেকেলে”, আর সেই কারণেই 169 একে প্রতিস্থাপন করেছে।
1989 সালের কনভেনশন 169-এর অনুচ্ছেদ 1 তিনটি কাজ করে: “ট্রাইবাল” ও “আদিবাসী” জনগোষ্ঠী চেনার দুটি মাপকাঠি দেয়, আত্মপরিচয়কে “মৌলিক মানদণ্ড” ঘোষণা করে, আর বলে দেয় “peoples” শব্দটি আন্তর্জাতিক আইনে ওই শব্দের সঙ্গে জড়িত অধিকারের ইঙ্গিত বহন করে না।
কনভেনশনটি গৃহীত হয় 27 জুন 1989, আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনের 76তম অধিবেশনে। ইংরেজি মূল পাঠে অনুচ্ছেদ 1:
1. This Convention applies to:
(a) tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations;
(b) peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonisation or the establishment of present state boundaries and who, irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions.
2. Self-identification as indigenous or tribal shall be regarded as a fundamental criterion for determining the groups to which the provisions of this Convention apply.
3. The use of the term peoples in this Convention shall not be construed as having any implications as regards the rights which may attach to the term under international law.
আইএলও ঢাকার বাংলা পাঠ:
১. এই কনভেনশন প্রযোজ্য হবে-
(ক) স্বাধীন দেশসমূহের ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে, যাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জাতীয় জনসমষ্টির অন্য অংশ থেকে স্বতন্ত্র এবং যাদের মর্যাদা সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে তাদের নিজস্ব প্রথা কিংবা ঐতিহ্য অথবা বিশেষ আইন বা বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়;
(খ) স্বাধীন দেশসমূহের জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে, যাদের আদিবাসী হিসেবে গণ্য করা হয় এই বিবেচনায় যে তারা রাজ্য বিজয় কিংবা উপনিবেশ স্থাপনের কালে অথবা বর্তমান রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণের কালে এই দেশে কিংবা যে ভৌগোলিক ভূখণ্ডে দেশটি অবস্থিত সেখানে বসবাসকারী জাতিগোষ্ঠীর বংশধর এবং তারা তাদের আইনগত মর্যাদা নির্বিশেষে তাদের নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অক্ষুন্ন রাখে।
২. এই কনভেনশনের বিধানাবলী যেসব জনসমষ্টির বেলায় প্রযোজ্য সেই জনসমষ্টির চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে আদিবাসী কিংবা ট্রাইবাল হিসেবে আত্মপরিচয়কেই মৌলিক উপাদান হিসেবে গণ্য করা হবে।
৩. এই কনভেনশনের জাতিগোষ্ঠী শব্দটির ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইনে সন্নিবেশিত শব্দটির যে অধিকারের নিহিতার্থ রয়েছে সেভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
আইএলও-র 2013 সালের হ্যান্ডবুক Understanding the Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169) এই অনুচ্ছেদকে দুই ভাগে পড়তে বলে — একটি “subjective” মানদণ্ড, আর কয়েকটি “objective” মানদণ্ড, যেগুলো “jointly applied”, অর্থাৎ একসঙ্গে প্রয়োগ হয়। হ্যান্ডবুকের ছকটি বাংলায় সাজালে দাঁড়ায়:
| ব্যক্তিনিষ্ঠ মানদণ্ড | বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড | |
|---|---|---|
| আদিবাসী জনগোষ্ঠী | আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে আত্মপরিচয় | বিজয়, উপনিবেশ বা বর্তমান রাষ্ট্রসীমা নির্ধারণের কালে দেশটিতে বা ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারীদের বংশধর; আইনি মর্যাদা যা-ই হোক, নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কিছু বা সবটা ধরে রেখেছে |
| ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী | ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে আত্মপরিচয় | সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জাতীয় জনসমষ্টির অন্য অংশ থেকে আলাদা; মর্যাদা পুরোপুরি বা আংশিকভাবে নিজস্ব প্রথা, ঐতিহ্য বা বিশেষ আইনে নিয়ন্ত্রিত |
অনুচ্ছেদ 1(3)-এর পেছনের প্রশ্নটি আমাদের UNDRIP লেখায় বিস্তারিত আছে — “peoples” শব্দ আন্তর্জাতিক আইনে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন বয়ে আনে। 1989-এর দলিল শব্দটি গ্রহণ করেছে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একটি বাক্য জুড়ে দিয়েছে যে এই ব্যবহার থেকে কোনো অধিকারের ইঙ্গিত টানা যাবে না।
অনুচ্ছেদ 1-এ পাঁচটি বদল হয়েছে: “populations” থেকে “peoples”; “কম অগ্রসর” থেকে “স্বতন্ত্র”; সময়রেখায় “রাষ্ট্রসীমা নির্ধারণ” যোগ; “সে সময়ের প্রতিষ্ঠান মেনে চলা” থেকে “নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ধরে রাখা”; আর আত্মপরিচয়কে মৌলিক মানদণ্ড করা। “সেমি-ট্রাইবাল” শ্রেণিটি পুরো বাদ পড়েছে।
| বিষয় | C107 (1957), অনুচ্ছেদ 1 | C169 (1989), অনুচ্ছেদ 1 |
|---|---|---|
| মূল শব্দ | members of … populations | peoples |
| ট্রাইবাল চেনার মাপকাঠি | “at a less advanced stage” — কম অগ্রসর | “distinguish them from other sections” — স্বতন্ত্র |
| সময়রেখা | বিজয় বা উপনিবেশ স্থাপনের কাল | বিজয়, উপনিবেশ বা বর্তমান রাষ্ট্রসীমা নির্ধারণের কাল |
| প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন | জাতির প্রতিষ্ঠানের চেয়ে “সে সময়ের” প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্য রেখে বাস | নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কিছু বা সবটা ধরে রাখা |
| সেমি-ট্রাইবাল | আছে — অনুচ্ছেদ 1(2) | নেই |
| আত্মপরিচয় | উল্লেখ নেই | “fundamental criterion” — অনুচ্ছেদ 1(2) |
| শব্দের অধিকারগত অর্থ | প্রশ্ন ওঠেনি | “peoples”-এর আন্তর্জাতিক আইনগত অর্থ টানা যাবে না — অনুচ্ছেদ 1(3) |
এর মধ্যে এশিয়ার জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বদল সম্ভবত তৃতীয়টি — “the establishment of present state boundaries”। ইউরোপীয় উপনিবেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন পরিস্থিতিও এই বাক্যাংশে ঢুকে পড়ে: যে জনগোষ্ঠী একটি ভূখণ্ডে ছিল, আর তারপর সেখানে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সীমা টানা হয়েছে।
দুটি কনভেনশনের আইনি সম্পর্কও অনুচ্ছেদেই লেখা। কনভেনশন 169-এর অনুচ্ছেদ 36: “This Convention revises the Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957.” আর কনভেনশন 107-এর অনুচ্ছেদ 36-এর বাংলা পাঠ বলছে, নতুন সংশোধনী কনভেনশন অনুসমর্থন করলে পুরনোটির “তাৎক্ষণিক বাতিলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে”, কিন্তু যে রাষ্ট্র নতুনটি অনুসমর্থন করেনি “তাদের বেলায় যে কোনো ক্ষেত্রেই এই কনভেনশন প্রকৃত আকারে এবং শর্তাবলীসহ বলবৎ থাকবে”। বাংলাদেশ এই দ্বিতীয় শ্রেণিতে।
আইএলও-র দলিলে নেই। আইএলও-র 2013 সালের হ্যান্ডবুক লিখেছে, কনভেনশন 169 “indigenous” ও “tribal” — দুই শব্দই ব্যবহার করে এবং দুই গোষ্ঠীকে “the same set of rights” দেয়। 1957-এর কনভেনশনও দুই শব্দকে একসঙ্গে “সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী” নামে ধরে, আলাদা ব্যবস্থা রাখে না।
তাহলে দুটি শব্দ কেন? জাতিসংঘ স্থায়ী ফোরামের 2004-এর পটভূমি-পত্রে ব্যাখ্যা আছে: এমন ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী আছে যারা আক্ষরিক অর্থে সংশ্লিষ্ট দেশে “indigenous” নয়, কিন্তু একই রকম পরিস্থিতিতে বাস করে। উদাহরণ হিসেবে পত্রটি মধ্য আমেরিকার আফ্রিকান-বংশোদ্ভূত ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী, আর আফ্রিকার সান ও মাসাইদের কথা বলেছে, যারা নিজেদের অঞ্চলে অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে বেশি দিন ধরে না-ও থাকতে পারে। পত্রটির সিদ্ধান্ত: জাতিসংঘ ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী নিজেদের আদিবাসী আলোচ্যসূচির অধীনে চিহ্নিত করলে “indigenous” ও “tribal” শব্দ দুটি “synonyms” হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
1996 সালের কার্যপত্রে (পরের অংশে বিস্তারিত) জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপের সভাপতি-র্যাপোর্টিয়ার অনুচ্ছেদ 72-এ লিখেছেন, “indigenous” ও “tribal” জনগোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য করার কোনো “satisfactory reasoning” জাতিসংঘের চর্চায় বা নজিরে তিনি পাননি।
এই প্রশ্নটি বাংলাদেশে সরাসরি প্রাসঙ্গিক, কারণ এখানে তর্ক প্রায়ই “উপজাতি না আদিবাসী” রূপে হয়। আমাদের আর্কাইভে প্রকাশিত প্রশান্ত ত্রিপুরার আরণ্য জনপদের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সনদের ছায়াতলে (প্রথম প্রকাশ: সংহতি 2013, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম) এই জায়গাটিতে আঙুল রেখেছে: “আইএলও’র ১০৭ নং কনভেনশনে এটা বলা হয় নি যে, ‘উপজাতীয়’দের জন্য এক ধরনের ব্যবস্থা থাকবে, আবার ‘আদিবাসী’দের জন্য থাকবে আরেক ধরনের ব্যবস্থা।”
দলিলের পাঠ এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মেলে। কনভেনশন 107-এর অনুচ্ছেদ 1(3) আদিবাসী, ট্রাইবাল ও সেমি-ট্রাইবাল — তিনটিকেই “the populations concerned” নামে এক করে দেয়, আর তার পরের প্রতিটি অনুচ্ছেদ — ভূমি, শ্রম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য — এই এক শ্রেণির জন্যই লেখা।
জাতিসংঘের পরিসরে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত সংজ্ঞাটি এসেছে বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার হোসে আর. মার্টিনেজ কোবোর Study on the Problem of Discrimination against Indigenous Populations থেকে। এর চারটি স্তম্ভ: আক্রমণ ও উপনিবেশ-পূর্ব সমাজের সঙ্গে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, নিজেদের স্বতন্ত্র মনে করা, বর্তমানে সমাজের অ-প্রভাবশালী অংশ হওয়া, আর পূর্বপুরুষের ভূখণ্ড ও পরিচয় পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়ার সংকল্প।
স্থায়ী ফোরামের পটভূমি-পত্র অনুযায়ী সমীক্ষাটি শুরু হয় 1972 সালে, শেষ হয় 1986-এ, আর 37টি মনোগ্রাফের ভিত্তিতে এটি এ ধরনের সবচেয়ে বিশাল সমীক্ষা। সংজ্ঞাটি আছে জাতিসংঘ নথি E/CN.4/Sub.2/1986/7/Add.4-এর অনুচ্ছেদ 379–382-এ। মূল পাঠ:
“Indigenous communities, peoples and nations are those which, having a historical continuity with pre-invasion and pre-colonial societies that developed on their territories, consider themselves distinct from other sectors of the societies now prevailing on those territories, or parts of them. They form at present non-dominant sectors of society and are determined to preserve, develop and transmit to future generations their ancestral territories, and their ethnic identity, as the basis of their continued existence as peoples, in accordance with their own cultural patterns, social institutions and legal system.”
“ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা” বলতে কী বোঝায়, পরের অনুচ্ছেদে কোবো তার তালিকা দিয়েছেন — বর্তমান পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে নিচের এক বা একাধিক উপাদানের ধারাবাহিকতা:
ব্যক্তির ক্ষেত্রে কোবোর মানদণ্ড দুই দিকের: আদিবাসী ব্যক্তি সে, যে আত্মপরিচয়ের মাধ্যমে নিজেকে আদিবাসী মনে করে (“group consciousness”), এবং যাকে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী নিজেদের সদস্য বলে স্বীকার করে (“acceptance by the group”)। কোবো লিখেছেন, এতে কে সদস্য তা ঠিক করার “sovereign right and power” বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্প্রদায়ের হাতেই থাকে।
আমাদের আর্কাইভে কোবোর সংজ্ঞা অন্তত দুটি লেখায় এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অনুরাগ চাকমা জাতিসংঘ ও আদিবাসী ইস্যু-তে সংজ্ঞাটি ইংরেজিতে উদ্ধৃত করে একটি সময়রেখা দিয়েছেন — 1957 সালে কনভেনশন 107, 1972 সালে কোবোর গবেষণা, 1989 সালে কনভেনশন 169। আর আরেকটি লেখা কোবোর “ক্ষমতাহীন” (non-dominant) শর্তটিকে আন্তর্জাতিক আইনি সংজ্ঞার “অপরিহার্য মানদণ্ড” হিসেবে আলাদা করে দেখিয়েছে।
এই সমীক্ষায় একটি তথ্য আছে যা বাংলাদেশের তর্কে কম আলোচিত। ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স (IWGIA) 2000 সালে চন্দ্রা কে. রায়ের (Rajkumari Chandra Kalindi Roy) [যাচাই প্রয়োজন: বাংলা বানান] যে বইটি প্রকাশ করে — Land Rights of the Indigenous Peoples of the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, যা আমাদের ই-বুক আর্কাইভে আছে — সেখানে কোবো সমীক্ষার এই অংশ উদ্ধৃত:
“In Bangladesh, the Government states that the members of Tribal or Semi-tribal populations are regarded as indigenous ‘on account of their descent from the populations which are settled in specified geographical areas of the country’.”
বইটির পাদটীকা অনুযায়ী উৎস জাতিসংঘ নথি E/CN.4/Sub.2/1986/7/Add.1, খণ্ড II, পৃষ্ঠা 15। একই বইয়ের বক্তব্য, পরে জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপে ও ঘোষণাপত্রের খসড়া প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা পাহাড়ের মানুষদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকার করেছেন, যা বইটির ভাষায় আগের ওই নিশ্চিতকরণের “contradiction”। লক্ষণীয়, সরকারের উদ্ধৃত বাক্যটির কাঠামো কনভেনশন 107-এর অনুচ্ছেদ 1(1)(খ)-এর ভাষারই প্রতিধ্বনি — “regarded as indigenous on account of their descent”।
1996 সালের 10 জুন জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠী বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের সভাপতি-র্যাপোর্টিয়ার এরিকা-আইরিন দায়েস (Erica-Irene A. Daes) [যাচাই প্রয়োজন: বাংলা বানান] “indigenous” ধারণা নিয়ে একটি কার্যপত্র (E/CN.4/Sub.2/AC.4/1996/2) দেন। এতে চারটি উপাদানের তালিকা আছে, আর সরকারগুলোর মতামত অংশে বাংলাদেশের বক্তব্য নাম ধরে লেখা।
কার্যপত্রের অনুচ্ছেদ 69 অনুযায়ী আধুনিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞরা — আদিবাসী আইন বিশেষজ্ঞসহ — “indigenous” ধারণা বোঝার জন্য যেসব উপাদান প্রাসঙ্গিক মনে করেছেন:
(a) Priority in time, with respect to the occupation and use of a specific territory;
(b) The voluntary perpetuation of cultural distinctiveness, which may include the aspects of language, social organization, religion and spiritual values, modes of production, laws and institutions;
(c) Self-identification, as well as recognition by other groups, or by State authorities, as a distinct collectivity; and
(d) An experience of subjugation, marginalization, dispossession, exclusion or discrimination, whether or not these conditions persist.
পরের অনুচ্ছেদ 70 সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক করে: এই উপাদানগুলো কোনো “inclusive or comprehensive definition” নয়, হতেও পারে না; বিভিন্ন অঞ্চলে ও প্রেক্ষাপটে এগুলো কম-বেশি মাত্রায় থাকতে পারে।
কার্যপত্রের অনুচ্ছেদ 39-এ “Views expressed by Governments” শিরোনামে লেখা:
“The representatives of the observer Governments of Bangladesh and India emphasized the need for a clear definition of ‘indigenous people’ in the interest of an effective focus on the true indigenous people of the world. The representative of the observer Government of Bangladesh stated in particular that a procedure based on self-identification could be self-defeating and that it would be a great disservice to the true indigenous people if the agenda for indigenous people were allowed to be confused with the agenda of other subnational and tribal groups that constituted minorities within their respective countries.”
অর্থাৎ বাংলাদেশের অবস্থান ছিল তিনটি: স্পষ্ট সংজ্ঞা দরকার; আত্মপরিচয়-ভিত্তিক প্রক্রিয়া “self-defeating” হতে পারে; আর দেশের ভেতরের সংখ্যালঘু “subnational and tribal groups”-এর আলোচ্যসূচিকে “true indigenous people”-এর সঙ্গে মেলানো উচিত নয়। ঠিক আগের অনুচ্ছেদ 38-এ আবার উল্টো দিকের কথা: এশিয়ার কয়েকজন আদিবাসী প্রতিনিধি বলেছিলেন, সরকারগুলো যাতে নিজেদের দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করতে না পারে, সে জন্য আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা “urgently needed”। একই দাবি — সংজ্ঞা চাই — দুই পক্ষ দুই কারণে তুলেছিল।
কার্যপত্রের অনুচ্ছেদ 61 কয়েকটি রাষ্ট্রের যুক্তি তুলে ধরেছে: “indigenous” ধারণা কেবল সেখানে প্রযোজ্য যেখানে আদি বাসিন্দাদের পরাজিত ও উচ্ছেদ করেছিল সমুদ্রের ওপার থেকে আসা ভিনদেশি বসতি স্থাপনকারীরা, আর সেই পরিস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে মূলত আমেরিকা ও ওশেনিয়াতে সীমিত। অনুচ্ছেদ 63-এ সভাপতি-র্যাপোর্টিয়ারের মত: এই প্রস্তাবিত সংজ্ঞা কোবো সমীক্ষা ও আইএলও-র দুই কনভেনশন থেকে কেবল একটি জায়গায় আলাদা — বিজয় বা অধীনতা আসতে হবে “from other regions of the world rather than neighbours”। তাঁর মতে এটি দূরের আর কাছের আগ্রাসনের মধ্যে “unjustified distinction”, আর দূরত্বের কোনো সীমা টানা “logically impossible”।
অনুচ্ছেদ 64 রাষ্ট্রগুলোর উদ্বেগকে খারিজ না করে স্বীকার করে: আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক সরকারের “unease” বোধগম্য, কারণ রাষ্ট্র যাঁদের নিয়ন্ত্রণে, তাঁরাও দেশের মাটিতে “আদিবাসী” বা “ট্রাইবাল” হিসেবে চিহ্নিত গোষ্ঠীর চেয়ে কম “native” নন। কিন্তু সমাধানটিও সেখানে লেখা:
“… this conceptual difficulty disappears if we think of ‘indigenous’ peoples as groups which are native to their own specific ancestral territories within the borders of the existing State, rather than persons that are native generally to the region in which the State is located.”
প্রশান্ত ত্রিপুরার 1993 সালের সেমিনার-প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ ও বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ-এও একই সূক্ষ্মতা আছে, ভিন্ন ভাষায় — আদিবাসীদের indigenous বলার মানে এই নয় যে বাঙালিদের শেকড় এদেশের মাটিতে নেই। প্রবন্ধটির সেই যুক্তির বিস্তার আমাদের UNDRIP লেখায় আছে।
2007 সালের জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্রে (UNDRIP) “indigenous peoples”-এর কোনো সংজ্ঞা নেই। খসড়া প্রক্রিয়ায় আদিবাসী সংগঠনগুলো রাষ্ট্র-নির্ধারিত সংজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করেছিল, আর ওয়ার্কিং গ্রুপ 1997 সালে সিদ্ধান্তে আসে যে বৈশ্বিক সংজ্ঞা তখন সম্ভব নয়, ঘোষণাপত্র গ্রহণের জন্য প্রয়োজনও নয়। তার বদলে ঘোষণাপত্র অনুচ্ছেদ 33-এ পরিচয় নির্ধারণের অধিকার দিয়েছে।
স্থায়ী ফোরামের পটভূমি-পত্রে প্রক্রিয়াটির বিবরণ আছে। ওয়ার্কিং গ্রুপের বহু বছরের আলোচনায় আদিবাসী সংগঠনের পর্যবেক্ষকরা একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছান: রাষ্ট্রগুলো গ্রহণ করবে এমন আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞার ধারণাই তাঁরা প্রত্যাখ্যান করেন। পত্রটির পাদটীকায় 1996 সালের 27 জুলাই জেনেভায় আদিবাসী প্রস্তুতি-সভার বিবৃতি উদ্ধৃত: “We categorically reject any attempts that Governments define Indigenous Peoples.” সরকারি প্রতিনিধিদলগুলোও, পত্রটির ভাষায়, মত দিয়েছিল যে সর্বজনীন সংজ্ঞা বানানো “neither desirable nor necessary”। শেষে 1997 সালে পঞ্চদশ অধিবেশনে ওয়ার্কিং গ্রুপের সিদ্ধান্ত।
এর বদলে ঘোষণাপত্রে কী আছে, তা তিনটি জায়গায়:
প্রস্তাবনা। ঘোষণাপত্র স্বীকার করে যে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি অঞ্চলভেদে ও দেশভেদে আলাদা, এবং “the significance of national and regional particularities and various historical and cultural backgrounds should be taken into consideration”। কাপেং ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা মঙ্গল কুমার চাকমার অনুবাদে (ইউএনডিপি বাংলাদেশ, ডিসেম্বর 2017; আমাদের ই-বুক আর্কাইভে): “জাতীয় ও আঞ্চলিক বিশিষ্টতা ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমির তাৎপর্যকে স্বীকার করে”।
অনুচ্ছেদ 9। “আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও ব্যক্তির তাদের ঐতিহ্য ও প্রথা অনুসারে আদিবাসী সম্প্রদায় বা জাতির সদস্য হওয়ার অধিকার রয়েছে। এই অধিকার উপভোগ করার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বৈষম্য করা যাবে না।”
অনুচ্ছেদ 33(1)। “আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তাদের নিজস্ব প্রথা এবং ঐতিহ্য মোতাবেক তাদের আত্মপরিচয় অথবা সদস্যপদ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। এই অধিকার যে রাষ্ট্রে বাস করে সে রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ থেকে আদিবাসী ব্যক্তিদেরকে নিবৃত্ত করবে না।” ইংরেজি মূলে: “Indigenous peoples have the right to determine their own identity or membership in accordance with their customs and traditions.”
সংজ্ঞা না থাকার সমালোচনাও নথিতে আছে। 1996-এর কার্যপত্রের অনুচ্ছেদ 40-এ ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্য আর. হাতানোর বক্তব্য উদ্ধৃত: ঘোষণাপত্রের খসড়া রাষ্ট্রের দায় নির্ধারণ করে, অথচ মূল শব্দটিই কোথাও সংজ্ঞায়িত নয়; আদিবাসী সংগঠনগুলো পৃথিবীতে প্রায় 30 কোটি আদিবাসী মানুষ আছে বলে দাবি করে, তবে কোনো মাপকাঠি ছাড়া এই সংখ্যায় পৌঁছানো গেল কীভাবে — এই প্রশ্ন তিনি তুলেছিলেন।
ঘোষণাপত্রটির ভোট, বাংলাদেশের বিরত থাকা আর অধিকারের ধারাগুলো নিয়ে আলোচনা এই লেখায়।
জাতিসংঘ আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের একটি তথ্যপত্র (Who are indigenous peoples?, পঞ্চম অধিবেশন) স্পষ্ট লেখে, কোনো জাতিসংঘ সংস্থা আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা গ্রহণ করেনি; তার বদলে সাতটি বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে একটি “modern understanding” তৈরি হয়েছে, আর জাতিসংঘের মতে সবচেয়ে ফলপ্রসূ পথ হলো সংজ্ঞায়িত করার বদলে “identify” করা।
তথ্যপত্রের সাতটি বৈশিষ্ট্য:
তথ্যপত্রে নামের প্রশ্নেও একটি বাক্য আছে, যা বাংলাদেশের পাঠকের কাছে চেনা শোনাবে। কিছু দেশে অন্য শব্দ পছন্দ করা হতে পারে — tribes, first peoples/nations, aboriginals, ethnic groups, adivasi, janajati; আবার “hill people”-এর মতো পেশা বা ভূগোলভিত্তিক নামও আছে, যেগুলো “for all practical purposes can be used interchangeably with ‘indigenous peoples’”। আইএলও-র 2013 হ্যান্ডবুকেও একই রকম তালিকা: “adivasis, mountain dwellers, hill tribes”। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক চর্চায় নামটি নয়, বৈশিষ্ট্যগুলোই মাপকাঠি।
তথ্যপত্রটি আরেকটি সতর্কতাও দিয়েছে: অনেক ক্ষেত্রে “indigenous” নামে অভিহিত হওয়ার নেতিবাচক অর্থ থাকে, আর কেউ কেউ নিজের উৎস প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন; অন্যদের সেই সিদ্ধান্ত সম্মান করতে হবে।
দুটি প্রতিষ্ঠানই সংজ্ঞা নয়, বৈশিষ্ট্যের তালিকা ব্যবহার করে। বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ ও সামাজিক মান 7 (ESS7) চারটি বৈশিষ্ট্য “in varying degrees” থাকলেই প্রযোজ্য, নাম যা-ই হোক। আফ্রিকান কমিশনের বিশেষজ্ঞ দল 2005 সালে লিখেছে, শব্দটির আধুনিক অর্থ “who came first”-এর প্রশ্নের চেয়ে অনেক বিস্তৃত।
বিশ্বব্যাংকের Environmental and Social Framework-এর ESS7-এর অনুচ্ছেদ 8 অনুযায়ী শব্দটি “generic sense”-এ এমন স্বতন্ত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীকে বোঝায় যার নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো বিভিন্ন মাত্রায় আছে:
অনুচ্ছেদ 6 বলে, কোনো কোনো দেশে এই গোষ্ঠীগুলোকে অন্য নামে ডাকা হয় — “indigenous ethnic minorities,” “aboriginals,” “hill tribes,” “minority nationalities,” “scheduled tribes,” “tribal groups” ইত্যাদি — আর ঋণগ্রহীতা দেশ চাইলে জাতীয় প্রেক্ষাপটে উপযুক্ত বিকল্প নাম ব্যবহারের অনুরোধ করতে পারে। কিন্তু “Regardless of which terminology is used, the requirements of this ESS will apply to all such groups.” অনুচ্ছেদ 9 আরও যোগ করে, সদস্যদের জীবদ্দশায় জোরপূর্বক বিচ্ছিন্নতা, সংঘাত, সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচি, ভূমি থেকে উচ্ছেদ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে যারা পূর্বপুরুষের ভূখণ্ডের সঙ্গে সমষ্টিগত সম্পর্ক হারিয়েছে, তাদের ওপরও মানটি প্রযোজ্য।
আইএলও-র 2009 সালের নির্দেশিকা Indigenous & Tribal Peoples’ Rights in Practice লিখেছে, বিশ্বব্যাংকের আগের নীতিমালার (Operational Policy 4.10, 2005) কার্যকরী সংজ্ঞাও কনভেনশন 169-এর প্রয়োগ-পরিধির ওপর দাঁড়ানো এবং তাতে আইএলও সংজ্ঞার সব মূল উপাদান আছে।
আফ্রিকান কমিশন অন হিউম্যান অ্যান্ড পিপলস রাইটস-এর আদিবাসী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দলের 2005 সালের প্রতিবেদন (কমিশন ও IWGIA-র যৌথ প্রকাশনা) একটি যুক্তির সরাসরি জবাব দিয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার তর্কেও শোনা যায়। প্রতিবেদনের ভাষায় একটি “misconception” হলো, আফ্রিকায় শব্দটি প্রযোজ্য নয় কারণ “all Africans are indigenous”। প্রতিবেদন স্বীকার করে, ইউরোপীয় উপনিবেশকারীদের আগমনের আগে থেকে থাকার অর্থে সব আফ্রিকানই আফ্রিকার আদিবাসী। কিন্তু প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলো যখন শব্দটি ব্যবহার করে, তারা ব্যবহার করে এর আধুনিক বিশ্লেষণী রূপ — “which does not merely focus on aboriginality” — নিজেদের ওপর নির্দিষ্ট ধরনের বৈষম্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে; অন্য আফ্রিকানদের আফ্রিকার মানুষ হওয়ার দাবি অস্বীকার করতে নয়।
প্রতিবেদনটি সংজ্ঞার প্রশ্নেও অবস্থান নিয়েছে: “A strict definition of indigenous peoples is neither necessary nor desirable.” কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, কঠোর সংজ্ঞা অনেক সরকারকে নিজেদের ভূখণ্ডে আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্বীকার না করার অজুহাত দিতে পারে; আর তুলনা হিসেবে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, জাতিসংঘের সংখ্যালঘু অধিকার ঘোষণাপত্রেও “minority” সংজ্ঞায়িত নয়।
একক বা চূড়ান্ত শর্ত হিসেবে নয়। আইএলও 169-এর মাপকাঠি বিজয়, উপনিবেশ বা রাষ্ট্রসীমা নির্ধারণের কালের বংশধারা, আগমনের ক্রম নয়। 1996-এর কার্যপত্রে “priority in time” চারটি উপাদানের একটি মাত্র, আর আফ্রিকান কমিশন বলেছে শব্দটির অর্থ “who came first”-এর চেয়ে বিস্তৃত। কয়েকটি রাষ্ট্র অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে।
বাংলাদেশে “আদিবাসী” শব্দ নিয়ে তর্কের বড় অংশ ঘোরে একটি প্রশ্নে: কে আগে এসেছে। দলিলগুলো এই প্রশ্নকে কোথায় রাখে, তা পাশাপাশি দেখলে পরিষ্কার হয়:
| দলিল | সময় বা আগমন নিয়ে যা বলে |
|---|---|
| আইএলও 107, অনুচ্ছেদ 1(1)(খ) | “at the time of conquest or colonisation” যারা ছিল তাদের বংশধর |
| আইএলও 169, অনুচ্ছেদ 1(1)(খ) | বিজয়, উপনিবেশ “or the establishment of present state boundaries”-এর কালের বংশধর; ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর (ক) উপধারায় সময়ের কোনো শর্ত নেই |
| কোবো, 1986 | “pre-invasion and pre-colonial societies”-এর সঙ্গে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা; ধারাবাহিকতা প্রমাণে ছয়টি উপাদানের যেকোনো একটি বা একাধিক |
| দায়েস কার্যপত্র, 1996, অনু. 69 | “Priority in time” — চার উপাদানের একটি; অনু. 70: উপাদানগুলো সংজ্ঞা নয় |
| স্থায়ী ফোরাম তথ্যপত্র | প্রাক-ঔপনিবেশিক বা বসতি-পূর্ব সমাজের সঙ্গে ধারাবাহিকতা — সাত বৈশিষ্ট্যের একটি |
| বিশ্বব্যাংক ESS7 | আগমনের ক্রমের উল্লেখ নেই; পূর্বপুরুষের ভূখণ্ডের সঙ্গে “collective attachment” |
| আফ্রিকান কমিশন, 2005 | অর্থ “much wider than the question of ‘who came first’” |
বিপরীত অবস্থানটিও নথিতে আছে, আর সেটি এখানে সমান গুরুত্বে রাখা দরকার। 1996-এর কার্যপত্রের অনুচ্ছেদ 61 অনুযায়ী কয়েকটি রাষ্ট্র মনে করেছিল ধারণাটি কেবল সেখানে খাটে যেখানে সমুদ্রপারের বসতি স্থাপনকারীরা আদি বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করেছে। আমাদের আর্কাইভে প্রকাশিত হানা শামস আহমেদের লেখার অনুবাদ আদিবাসীত্বের রাজনীতি এবং ভূমি ও পরিচয়ের স্বীকৃতির জন্য জুম্মদের সংগ্রাম জানায়, জাতিসংঘের বিশেষ দূত মিগেল আলফোনসো মার্টিনেজও [যাচাই প্রয়োজন: বাংলা বানান] এশীয় ও আফ্রিকান পরিস্থিতিতে “আদিবাসী জনগোষ্ঠী” পদটি ব্যবহারযোগ্য নয় বলে প্রশ্ন তুলেছিলেন; লেখাটি এই অবস্থানের সমালোচনাও উদ্ধৃত করেছে।
ভারত সরকারের অবস্থানও একই ধারার। আইএলও-র 2009 সালের নির্দেশিকা লিখেছে, ভারত সরকার একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য “Indigenous Peoples” শব্দের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি করেছে, এই বলে যে “all citizens are indigenous to India”, এবং “Scheduled Tribes” শব্দটি পছন্দ করে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক দলিলগুলোর পাঠে আগমনের ক্রম প্রধান শর্ত নয়, আর কয়েকটি রাষ্ট্রের ব্যাখ্যায় ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপনই শর্ত। দুটি অবস্থানই নথিভুক্ত।
সাতটি দলিলের মধ্যে আত্মপরিচয় কেবল আইএলও 107-এ অনুপস্থিত; ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক আর স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান প্রায় সবগুলোতে আছে; “অ-প্রভাবশালী” হওয়ার শর্ত কোবো ও স্থায়ী ফোরামে স্পষ্ট; আর আইনত বাধ্যতামূলক কেবল দুটি আইএলও কনভেনশন — তাও শুধু অনুসমর্থনকারী রাষ্ট্রের জন্য।
| মানদণ্ড | C107 1957 |
C169 1989 |
কোবো 1986 |
দায়েস 1996 |
UNDRIP 2007 |
স্থায়ী ফোরাম | বিশ্বব্যাংক ESS7 |
|---|---|---|---|---|---|---|---|
| আইনত বাধ্যতামূলক | হ্যাঁ* | হ্যাঁ* | না | না | না | না | ব্যাংকের প্রকল্পে |
| আত্মপরিচয় | নেই | মৌলিক মানদণ্ড | আছে | আছে | অধিকার (অনু. 33) | আছে | আছে |
| ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা / বংশধারা | বিজয়-উপনিবেশের কাল | + রাষ্ট্রসীমার কাল | আছে | priority in time | — | আছে | — |
| ভূমি / ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক | ভূমি অংশে (অনু. 11) | ভূমি অংশে (অনু. 13–14) | আছে | আছে | — | আছে | আছে |
| স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান / সংস্কৃতি | আছে | আছে | আছে | আছে | — | আছে | আছে |
| স্বতন্ত্র ভাষা | — | — | আছে | আছে | — | আছে | আছে |
| অ-প্রভাবশালী / প্রান্তিকতার অভিজ্ঞতা | “কম অগ্রসর” | — | non-dominant | subjugation… | — | non-dominant | — |
* কেবল যে রাষ্ট্র অনুসমর্থন করেছে তার জন্য। “—” মানে দলিলের সংজ্ঞা-অংশে মানদণ্ডটির উল্লেখ নেই। ভূমির ঘরে আইএলও-র দুই কনভেনশনের ক্ষেত্রে মানদণ্ডটি অনুচ্ছেদ 1-এ নয়, ভূমি-বিষয়ক অংশে অধিকার হিসেবে এসেছে।
ছকটি থেকে একটি প্রবণতা দেখা যায়: 1957 থেকে পরের দলিলগুলোতে মাপকাঠি সরে গেছে বাইরের মূল্যায়ন (“কম অগ্রসর”) থেকে নিজের পরিচয় আর সম্পর্কের দিকে — ভূমির সঙ্গে, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, ভাষার সঙ্গে। ছয়টি দেশের আদিবাসী ভূমি-ব্যবস্থার তুলনা আমাদের আদিবাসী ভূমি অধিকার: ছয় দেশের ব্যবস্থা এক ছকে লেখায় আছে।
আইনত বাধ্যতামূলক কেবল আইএলও কনভেনশন 107 — বাংলাদেশ এটি 22 জুন 1972 অনুসমর্থন করেছে, আর কনভেনশন 169 অনুসমর্থন করেনি। ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য পাঠ 1957-এর অনুচ্ছেদ 1: আত্মপরিচয়ের মানদণ্ড ছাড়া, “আদিবাসী, ট্রাইবাল ও সেমি-ট্রাইবাল” — তিনটিকেই এক শ্রেণিতে ধরে।
অনুসমর্থনের তারিখটি আইএলও ঢাকার পুস্তিকার ভূমিকায় লেখা: “দেশের আদিবাসী ও ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালের ২২শে জুন আইএলও কনভেনশন ১০৭ অনুস্বাক্ষর করে।” একই ভূমিকা জানায়, 2010 পর্যন্ত পৃথিবীর 17টি দেশ কনভেনশন 107 এবং 22টি দেশ কনভেনশন 169 অনুস্বাক্ষর করেছে। আইএলও-র 2009 সালের নির্দেশিকা লিখেছে, কনভেনশন 107 আর অনুসমর্থনের জন্য উন্মুক্ত নয়, কিন্তু কয়েকটি দেশে বলবৎ আছে — উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের নাম।
বাধ্যতামূলক দলিলটির ভূমি-অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত। অনুচ্ছেদ 11-এর বাংলা পাঠ: “সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সদস্যদের ঐতিহ্যগতভাবে অধিকৃত ভূমির উপর যৌথ কিংবা ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার স্বীকার করতে হবে।” অনুচ্ছেদ 13(2): “সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সদস্য নয় এমন ব্যক্তিদেরকে এসব প্রথার সুযোগ গ্রহণ অথবা এসব জনগোষ্ঠীর সদস্যদের আইন সম্পর্কিত অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জমির মালিকানা লাভ কিংবা ব্যবহার করা থেকে নিবৃত্ত করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
IWGIA-র 2000 সালের বইটি এই দুটি অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে আইএলও বিশেষজ্ঞ কমিটির (CEACR) 1993 সালের প্রতিবেদন থেকে একটি অংশ তুলে দিয়েছে: কমিটি “recalls that many thousands of non-tribals have been settled in the Hill Tracts area, often on the lands traditionally occupied by tribal families”, এবং আশা প্রকাশ করেছে যে ঐতিহ্যগত ভূমি পুনরুদ্ধারের দাবি নিষ্পত্তির উপযুক্ত পদ্ধতি স্থাপিত হবে। বইটি আরও জানায়, 1986 ও 1987 সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনের মান-প্রয়োগ কমিটিতে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং দুটি মিশন এলাকাটি পরিদর্শন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি আইনের ইতিহাস ১৯০০ সালের রেগুলেশন থেকে ভূমি কমিশন লেখায়।
আইএলও-র তদারকি এখনো চলছে বলে জানায় আমাদের আর্কাইভের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬ লেখাটি: CEACR “বার বার গুরুত্বারোপ করেছে যে, এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; যেখানে আদিবাসী জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে ভোগ করতে পারেন।”
দেশের ভেতরের আইনে শব্দের ব্যবহার এক রকম নয়। IWGIA-র বইয়ের তথ্য অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি (Regulation 1 of 1900) “indigenous hillman” ও “indigenous tribesman” শব্দ দুটি পরস্পর-বিনিময়যোগ্যভাবে ব্যবহার করে; এর বিধি 4-এ “a Chakma, Mogh or member of any tribe [is] indigenous to the Hill Tracts” কথাটি আছে; আর বিধিমালার তফসিল অনুযায়ী আয়কর আইন 1922 পার্বত্য চট্টগ্রামের সবার ওপর প্রযোজ্য “except the indigenous hillmen”। বইটি আরও জানায়, 1995 সালের আইন নং 12-তে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির “indigenous hillman”-এর আয়ের কথা আছে।
আইএলও-র 2009 সালের নির্দেশিকায় বাংলাদেশের ওপর একটি আলাদা অংশ আছে। সেখানে লেখা, এদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন নামে চেনা হয় — pahari (পাহাড়ি), jumma (জুম চাষের ঐতিহ্য থেকে), adivasi, upajati বা tribal; আগে সরকার “tribe” বা “tribal” শব্দ পছন্দ করত; 2005 সালের দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রে (PRSP-I) “Adivasi/Ethnic Minority” ব্যবহৃত হয়, আর পরের PRSP-II-তে “indigenous people” ও “indigenous communities” দুটোই। নির্দেশিকাটির হিসাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নিয়ে অনুমান 12 থেকে 46 পর্যন্ত।
রাষ্ট্রের বর্তমান সাংবিধানিক অবস্থান — 2011 সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর অনুচ্ছেদ 23ক, যেখানে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ ও ‘নৃগোষ্ঠী’ শব্দ আছে কিন্তু ‘আদিবাসী’ নেই — এবং একই বছর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কূটনীতিকদের উদ্দেশে বক্তব্যের বিবরণ UNDRIP লেখায় দেওয়া আছে। আর্কাইভের অনুবাদ-লেখাটি জানায়, 2011 সালের মে মাসে নিউ ইয়র্কে স্থায়ী ফোরামের দশম অধিবেশনে বাংলাদেশ মিশনের ইকবাল আহমেদ বলেছিলেন, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই; একই লেখায় সরকার পক্ষের যুক্তিটিও আছে — আইএলও অনুযায়ী “আদিবাসী” পদমর্যাদার সঙ্গে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার যুক্ত, যা বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিপ্রায় লালন করতে পারে।
এই অবস্থানের পাশাপাশি দলিলের পাঠ দুটি কথা বলে। এক, বাংলাদেশের জন্য বাধ্যতামূলক কনভেনশন 107-এ “peoples” শব্দটিই নেই — আছে “populations”, আর আত্মনিয়ন্ত্রণের কোনো উল্লেখ নেই। দুই, যে কনভেনশন 169-এ “peoples” আছে, তার অনুচ্ছেদ 1(3) নিজেই বলে শব্দটি থেকে আন্তর্জাতিক আইনের অধিকারগত অর্থ টানা যাবে না। জাতিসংঘের ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউতে বাংলাদেশকে কনভেনশন 169 অনুসমর্থনের সুপারিশ আর সরকারের জবাব — সংবিধানের বিধান বিবেচনা করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে — আমাদের আর্কাইভের ইউপিআর লেখায় নথিভুক্ত।
পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমাদের অন্য লেখাগুলো একসঙ্গে পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়; 1997 সালের চুক্তির ধারা ধরে ব্যাখ্যা এখানে।
আইএলও ঢাকার 2010 সালের বাংলা পাঠে “populations”-এর বাংলা “জনগোষ্ঠী” আর “peoples”-এর “জাতিগোষ্ঠী”; কনভেনশন 169-এর “shifting cultivators” হয়েছে “জুম চাষী”। আর কনভেনশন 107-এর অনুচ্ছেদ 1(1)-এর বাংলা পাঠ ও ইংরেজি মূলের শব্দে একটি পার্থক্য আছে, যা মূল পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে পড়া দরকার।
দুই কনভেনশনের দুই শিরোনাম। বাংলা পুস্তিকায় কনভেনশন 107 “আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী কনভেনশন, ১৯৫৭” আর 169 “আদিবাসী ও ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠী কনভেনশন, ১৯৮৯”। Populations আর Peoples-এর পার্থক্যটি এভাবে “জনগোষ্ঠী” আর “জাতিগোষ্ঠী” শব্দে ধরা হয়েছে। “Tribal” শব্দটি অনুবাদ না করে “ট্রাইবাল” রাখা হয়েছে — “উপজাতি” নয়।
জুম চাষী। কনভেনশন 169-এর অনুচ্ছেদ 14(1)-এর শেষ বাক্যের ইংরেজি মূল: “Particular attention shall be paid to the situation of nomadic peoples and shifting cultivators in this respect.” বাংলা পাঠে: “এক্ষেত্রে যাযাবর জনগোষ্ঠী ও জুম চাষীদের অবস্থার প্রতি বিশেষ নজর প্রদান করতে হবে।” বৈশ্বিক দলিলের একটি সাধারণ শব্দ বাংলায় এসে পাহাড়ের নির্দিষ্ট চাষপদ্ধতির নাম পেয়েছে।
কনভেনশন 107, অনুচ্ছেদ 1(1)। ইংরেজি মূলে (ক) ও (খ) — দুই উপধারাই শুরু হয় “members of tribal or semi-tribal populations” দিয়ে। বাংলা পাঠে দুই জায়গাতেই আছে “আদিবাসী এবং ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর সদস্যদের”। আইএলও-র ঢাকা অফিসের প্রকাশিত পাঠ হলেও কনভেনশনের সরকারি পাঠ কেবল ইংরেজি ও ফরাসি — জাতিসংঘ চুক্তি-সংকলনে এবং বাংলা পুস্তিকার অনুচ্ছেদ 37-এই লেখা: “এই কনভেনশনের ইংরেজী ও ফরাসী ভাষান্তর সমভাবে প্রামাণিত।” তাই আইনি ব্যাখ্যার প্রশ্নে মূল পাঠই নির্ণায়ক।
“আদিবাসী” শব্দের নিজস্ব ভার। প্রশান্ত ত্রিপুরার 2013 সালের লেখা একটি ভাষাগত সমস্যার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর হাতের কাছের বাংলা অভিধানগুলোতে — বাংলা একাডেমীর সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান (1996), সংসদ বাংলা অভিধান (2000), সরল বাঙ্গালা অভিধান (2009) — “আদিবাসী” শব্দের অর্থ অভিন্ন: “আদিম জাতি বা অধিবাসী”; আর চলন্তিকায় “অধিবাসী আদিম জাতি”। 1993 সালের প্রবন্ধে তিনি তাই লিখেছিলেন, ‘ইনডিজেনাস’ বাংলা বানানেই রাখা, বা “স্বদেশজাত”-এর মতো নতুন শব্দ উদ্ভাবন “অধিকতর যুক্তিযুক্ত” হতে পারে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক দলিলের “indigenous” আর বাংলা অভিধানের “আদিবাসী” — দুটি শব্দের অর্থের সীমানা পুরোপুরি এক নয়, আর আন্তর্জাতিক সংজ্ঞার কোথাও “আদিম” বা “সবার আগে আসা” শর্ত হিসেবে নেই।
আন্তর্জাতিক আইনে আদিবাসীর একক সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। জাতিসংঘ স্থায়ী ফোরামের সচিবালয় 2004 সালে লিখেছে, জাতিসংঘের কোনো সংস্থা কখনো সংজ্ঞা গ্রহণ করেনি। বাধ্যতামূলক দলিল আইএলও কনভেনশন 107 (1957) ও 169 (1989)-এর অনুচ্ছেদ 1 প্রয়োগের পরিধি নির্ধারণ করে, আর সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কার্যকরী সংজ্ঞাটি মার্টিনেজ কোবোর 1986 সালের সমীক্ষার।
অনুচ্ছেদ 1(1) দুই ধরনের জনগোষ্ঠীর ওপর কনভেনশনটি প্রযোজ্য করে: ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী, যাদের অবস্থা জাতীয় জনসমষ্টি থেকে স্বতন্ত্র; আর আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যারা বিজয়, উপনিবেশ বা বর্তমান রাষ্ট্রসীমা নির্ধারণের কালের বাসিন্দাদের বংশধর এবং নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের কিছু বা সবটা ধরে রেখেছে। অনুচ্ছেদ 1(2) আত্মপরিচয়কে মৌলিক মানদণ্ড করে।
1957-এর কনভেনশন 107 “populations” শব্দ ব্যবহার করে, “কম অগ্রসর” অবস্থাকে মাপকাঠি ধরে এবং লক্ষ্য রাখে “progressive integration”। 1989-এর কনভেনশন 169 “peoples” শব্দ নেয়, প্রস্তাবনায় আগের দলিলের “assimilationist orientation” সরানোর কথা বলে, রাষ্ট্রসীমা নির্ধারণের কাল যোগ করে এবং অনুচ্ছেদ 1(2)-এ আত্মপরিচয়কে মৌলিক মানদণ্ড করে।
বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন 107 অনুসমর্থন করেছে 22 জুন 1972 — তারিখটি আইএলও ঢাকার 2010 সালের বাংলা পুস্তিকার ভূমিকায় লেখা। কনভেনশন 169 বাংলাদেশ অনুসমর্থন করেনি। কনভেনশন 107-এর অনুচ্ছেদ 36 অনুযায়ী নতুন কনভেনশন অনুসমর্থন না করা রাষ্ট্রের জন্য পুরনোটি শর্তাবলীসহ বলবৎ থাকে; আইএলও-র 2009 সালের নির্দেশিকাও বাংলাদেশকে সেই তালিকায় রেখেছে।
জাতিসংঘ নথি E/CN.4/Sub.2/1986/7/Add.4-এর অনুচ্ছেদ 379 অনুযায়ী আদিবাসী সম্প্রদায় তারা, যাদের আক্রমণ ও উপনিবেশ-পূর্ব সমাজের সঙ্গে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আছে, যারা নিজেদের স্বতন্ত্র মনে করে, বর্তমানে সমাজের অ-প্রভাবশালী অংশ, আর পূর্বপুরুষের ভূখণ্ড ও জাতিগত পরিচয় পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দিতে সংকল্পবদ্ধ। ব্যক্তির ক্ষেত্রে মানদণ্ড আত্মপরিচয় ও গোষ্ঠীর স্বীকৃতি।
খসড়া প্রক্রিয়ায় আদিবাসী সংগঠনগুলো রাষ্ট্র-নির্ধারিত সংজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করেছিল, আর সরকারি প্রতিনিধিরাও সর্বজনীন সংজ্ঞাকে “neither desirable nor necessary” বলেছিলেন। 1997 সালে ওয়ার্কিং গ্রুপ সিদ্ধান্ত নেয়, সংজ্ঞা তখন সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নয়। তার বদলে ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ 33(1) জনগোষ্ঠীকে নিজেদের প্রথা অনুযায়ী পরিচয় ও সদস্যপদ নির্ধারণের অধিকার দেয়।
আন্তর্জাতিক দলিলে এটি একক শর্ত নয়। আইএলও 169-এর মাপকাঠি বিজয়, উপনিবেশ বা রাষ্ট্রসীমা নির্ধারণের কালের বংশধারা; 1996 সালের জাতিসংঘ কার্যপত্রে “priority in time” চার উপাদানের একটি মাত্র; আফ্রিকান কমিশন 2005 সালে বলেছে অর্থটি “who came first”-এর চেয়ে বিস্তৃত। তবে কয়েকটি রাষ্ট্র যুক্তি দিয়েছে, ধারণাটি কেবল সমুদ্রপারের উপনিবেশের ক্ষেত্রে খাটে।
আইএলও-র দলিলে নেই। আইএলও-র 2013 সালের হ্যান্ডবুক অনুযায়ী কনভেনশন 169 দুই গোষ্ঠীকে “the same set of rights” দেয়। কনভেনশন 107-ও অনুচ্ছেদ 1(3)-এ আদিবাসী, ট্রাইবাল ও সেমি-ট্রাইবাল — তিনটিকে “সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী” নামে এক করে, পরের সব অনুচ্ছেদ এই এক শ্রেণির জন্য। জাতিসংঘ ব্যবস্থায় শব্দ দুটি সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
1996 সালের কার্যপত্র E/CN.4/Sub.2/AC.4/1996/2-এর অনুচ্ছেদ 39 অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারতের পর্যবেক্ষক প্রতিনিধিরা “indigenous people”-এর স্পষ্ট সংজ্ঞার প্রয়োজনের ওপর জোর দেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধি বলেন, আত্মপরিচয়-ভিত্তিক প্রক্রিয়া “self-defeating” হতে পারে, আর দেশের ভেতরের সংখ্যালঘু “subnational and tribal groups”-এর আলোচ্যসূচিকে প্রকৃত আদিবাসীদের সঙ্গে মেলানো উচিত নয়।
বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ ও সামাজিক মান ESS7-এর অনুচ্ছেদ 8 অনুযায়ী চারটি বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন মাত্রায় থাকলেই মানটি প্রযোজ্য: স্বতন্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপরিচয় ও অন্যদের স্বীকৃতি, পূর্বপুরুষের ভূখণ্ড ও সম্পদের সঙ্গে সমষ্টিগত সম্পর্ক, স্বতন্ত্র প্রথাগত প্রতিষ্ঠান, আর স্বতন্ত্র ভাষা বা উপভাষা। অনুচ্ছেদ 6 অনুযায়ী দেশে “hill tribes” বা অন্য যেকোনো নাম ব্যবহৃত হোক, মানটি প্রযোজ্য।
আইএলও-র ঢাকা অফিস অক্টোবর 2010 সালে কনভেনশন 107 ও 169-এর পূর্ণ বাংলা পাঠ একটি 29 পাতার পুস্তিকায় প্রকাশ করেছে, যা জুমজার্নালের ই-বুক আর্কাইভে আছে। পুস্তিকায় 107-এর বাংলা নাম “আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী কনভেনশন” আর 169-এর “আদিবাসী ও ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠী কনভেনশন”। সরকারি পাঠ অবশ্য কেবল ইংরেজি ও ফরাসি।
জাতিসংঘ আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের তথ্যপত্রে সাতটি: ব্যক্তি পর্যায়ে আত্মপরিচয় ও সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি; প্রাক-ঔপনিবেশিক বা বসতি-পূর্ব সমাজের সঙ্গে ধারাবাহিকতা; ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক; স্বতন্ত্র সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা; স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও বিশ্বাস; অ-প্রভাবশালী অবস্থান; আর পূর্বপুরুষের পরিবেশ ও ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সংকল্প।
জুমজার্নালের আর্কাইভ
আন্তর্জাতিক দলিল ও প্রতিবেদন
সর্বশেষ হালনাগাদ: 16 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:আইএলও কনভেনশন, আদিবাসী, আদিবাসী অধিকার, জাতিসংঘ, বাংলাদেশ
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।