Last updated Oct 17th, 2026
0

2022 সালের 19 জুলাই তথ্য মন্ত্রণালয়ের টিভি-2 শাখা থেকে দেশের সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রধানদের কাছে একটি চিঠি যায়। চিঠির শেষ বাক্যে টক শোর অতিথিদের জানিয়ে দিতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার না করার একটি “সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা” আছে (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, 29 জুলাই 2022)। সরকার কেন আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করে না — এই প্রশ্নের সরকারি উত্তর মোটামুটি এটাই: সংবিধানের অনুচ্ছেদ 23ক-তে আছে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’, ‘আদিবাসী’ নেই। কিন্তু নথিগুলো পাশাপাশি রাখলে ছবিটা এত সরল থাকে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনগুলো বলে ‘উপজাতীয়’, শুমারি বলে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’, আর যে আইনের তফসিল ধরে শুমারি গোনে, সেই 2010 সালের আইনের সংজ্ঞা-ধারাতেই ‘আদিবাসী’ শব্দটি আছে।
এই লেখা কোনো পক্ষের যুক্তি নয়। এটি একটি নথি-সংকলন: কোন আইন, কোন অনুচ্ছেদ, কোন শুমারি আর কোন সরকারি চিঠি ঠিক কোন শব্দ ব্যবহার করে, ধারা ও অনুচ্ছেদের নম্বরসহ। তার পরে শব্দ নিয়ে বিতর্কের দুই অবস্থান, যার যার নাম ধরে। জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র আর ILO কনভেনশনের বিস্তারিত আলাদা লেখায় আছে — জাতিসংঘ আদিবাসী ঘোষণাপত্র (UNDRIP): কী বলে, বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে। এখানে সেগুলো কেবল যেটুকু শব্দের প্রশ্নে লাগে, ততটুকু।
এই লেখায় যা আছে
সরকারি নথি ও মন্ত্রীদের প্রকাশ্য বক্তব্যে তিনটি কারণ বারবার এসেছে: সংবিধানে শব্দটি নেই, বরং অনুচ্ছেদ 23ক-তে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী’ আছে; 1997 সালের চুক্তি ও পার্বত্য আইনগুলো ‘উপজাতি’ বলে; আর রাষ্ট্রের ব্যাখ্যায় এই জনগোষ্ঠীরা আন্তর্জাতিক অর্থে ‘indigenous’ নন। তিনটিই নিচে মূল উৎস ধরে দেওয়া হলো।
2011, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি। পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের কয়েক সপ্তাহ পরে, 2011 সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে, তিনি ঢাকায় বিদেশি কূটনীতিক ও জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের এবং আলাদাভাবে সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। দ্য ডেইলি স্টার (26 জুলাই 2011) তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে: “Neither Bangladesh constitution nor any international laws recognise these people as indigenous.” একই প্রতিবেদনে তাঁর আরও দুটি যুক্তি আছে — 1997 সালের চুক্তিতেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীদের “Tribal” বলা হয়েছে, “indigenous peoples” নয়; আর 1900 সালের শাসনবিধি ও 1989 সালের জেলা পরিষদ আইনেও তাঁরা “Tribal” হিসেবে চিহ্নিত। তিনি Oxford অভিধানের সংজ্ঞাও টেনেছিলেন — indigenous মানে যাঁরা কোনো জায়গার, অন্য কোথাও থেকে আসেননি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের একই দিনের প্রতিবেদনে তাঁর ভাষ্য: বর্তমান সরকার তাঁদের আর কেবল ‘tribal’ নয়, ‘ethnic minorities’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেছে, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে।
2022, তথ্য মন্ত্রণালয়। 19 জুলাইয়ের চিঠির যুক্তি এক বাক্যে: “বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ছোট ছোট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীকে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।” চিঠিটি নিয়ে নিচে আলাদা অংশ আছে।
2026, দুই মন্ত্রী। 11 আগস্ট 2026 ঢাকায় চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচটিআরএফ) “বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক” শিরোনামের গোলটেবিলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী, কেউ আদিবাসী নয়।” প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁর যুক্তিগুলো ছিল: সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত; ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ সব দল একমত হয়েছে যে ভূখণ্ডের সব মানুষের পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’; প্রতিবেশী বহুভাষী দেশগুলোতেও আলাদা ‘আদিবাসী’ সত্তার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই; আর 2007 সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘ ঘোষণাপত্রের ভোটে বিরত ছিল বলে ওই ঘোষণাপত্র ও ILO কনভেনশন 169 বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। একই অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শব্দটি “অপ্রাসঙ্গিক” (ডেইলি স্টার বাংলা, 13 আগস্ট 2026)। সালাহউদ্দিন আহমদের পদ নিয়ে দুই পত্রিকায় অমিল আছে: প্রথম আলো লিখেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী।
এই তিন সময়ের যুক্তির মধ্যে একটি পার্থক্য লক্ষ করার মতো। 2011 ও 2022 সালের যুক্তির কেন্দ্রে সংবিধানের শব্দ। 2026 সালের যুক্তির কেন্দ্রে নাগরিক পরিচয় — সবাই ‘বাংলাদেশি’ — এবং আন্তর্জাতিক দলিলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না থাকা।
রাষ্ট্রীয় নথিতে তিনটি শব্দ তিন জায়গায় বসে। ‘উপজাতি’ বা ‘উপজাতীয়’ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক আইন ও 1997 সালের চুক্তির শব্দ। ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ 2010 সালের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, জনশুমারি ও কোটার শব্দ। ‘আদিবাসী’ সংবিধানে নেই, কিন্তু 2010 সালের আইনের সংজ্ঞা-ধারায় আছে। নিচের ছকটি মূল আইনের পাঠ থেকে বানানো।
| নথি ও সাল | ধারা / অনুচ্ছেদ | যে শব্দ ব্যবহৃত | ‘আদিবাসী’ আছে? |
|---|---|---|---|
| পূর্ববঙ্গ রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950 | ধারা 97 | aboriginal castes or tribes; aboriginal raiyat | ইংরেজি পাঠে ‘aboriginal’ |
| পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, 1900 (বর্তমান পাঠ) | ধারা 8(4) | customary laws of the tribes | না |
| তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989 | ধারা 2(খ); প্রস্তাবনা | উপজাতীয়, অ-উপজাতীয়; “অনগ্রসর উপজাতি অধ্যুষিত” | না |
| পার্বত্য জেলাসমূহ (আইন রহিত ও প্রয়োগ এবং বিশেষ বিধান) আইন, 1989 | ধারা 16 | উপজাতি বা উপজাতির সদস্য | না |
| পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, 1997 | ক-খণ্ড, ধারা 1 | “উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল” | না |
| পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, 1998 | ধারা 2(ক)–(গ); প্রস্তাবনা | উপ-জাতীয়, অ-উপজাতীয় | না |
| পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, 2001 | প্রস্তাবনা | “অনগ্রসর উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল”; উপজাতীয় অধিবাসীগণ | না |
| ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, 2010 | ধারা 2(2) | ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী | হ্যাঁ — সংজ্ঞার ভেতরে |
| সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, 2011 | অনুচ্ছেদ 23ক | উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় | না |
| পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন, 2014 | — | কোনো জাতিগত পরিচয়বাচক শব্দ নেই; কেবল “সার্কেল চীফ” | না |
| সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন, 2019 | এস.আর.ও. নং 78-আইন/2019 | “বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নাম” — 50টি | না |
| জনশুমারি ও গৃহগণনা, 2022 | সংজ্ঞা 2.31; সারণি P29 | ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী / Ethnic Population | না |
| তথ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠি, 19 জুলাই 2022 | টিভি-2 শাখা | উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃগোষ্ঠী | শব্দটি ব্যবহার না করার অনুরোধ |
| সরকারি চাকরির কোটা, জুলাই 2024 | প্রজ্ঞাপন | “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য 1%” | না |
তাহলে ‘পার্থক্য’ প্রশ্নের নথিভিত্তিক উত্তর হলো: রাষ্ট্রের দলিলে তিনটি শব্দ একই মানুষদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, আলাদা আলাদা আইনে। কোনো আইন তিনটির মধ্যে সংজ্ঞাগত পার্থক্য টানেনি। পার্থক্যটা অন্য জায়গায় — কোন শব্দটি নিজের পরিচয় হিসেবে জনগোষ্ঠীরা দাবি করেন আর কোনটি রাষ্ট্র লেখে। আর একটি ব্যতিক্রম আছে: 2010 সালের আইন দুটি শব্দকে এক বাক্যে জুড়ে দিয়েছে, “আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী”।
অভিধানের দিক থেকেও একটি তথ্য প্রাসঙ্গিক। নৃবিজ্ঞানী প্রশান্ত ত্রিপুরা 2013 সালে লিখেছিলেন, তাঁর হাতের কাছের প্রতিটি বাংলা অভিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দের অর্থ একই: “আদিম জাতি বা অধিবাসী” — বাংলা একাডেমীর সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান (দ্বিতীয় সংস্করণ, 1996) ও কলকাতার সংসদ বাংলা অভিধানসহ; আর ‘চলন্তিকা’য় “অধিবাসী আদিম জাতি” (আমাদের আর্কাইভে তাঁর লেখা)। অর্থাৎ অভিধানে প্রাধান্য পেয়েছে ‘আদিম অধিবাসী’ অর্থটি, ‘আদি নিবাসী’ নয়। শব্দটি নিয়ে তর্কের একটি অংশ এই দুই অর্থের টানাপোড়েনও।
অনুচ্ছেদ 23ক সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির মধ্যে। এর শিরোনাম “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি”। অনুচ্ছেদটি কেবল সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব দেয়; কারা এই চার শ্রেণিতে পড়েন, তার কোনো সংজ্ঞা বা তালিকা দেয় না। ‘আদিবাসী’ শব্দটি এতে নেই।
পূর্ণ পাঠ, আইন মন্ত্রণালয়ের বাংলা সংকলন থেকে:
“২৩ক। রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।”
একই সংকলনের পাদটীকা জানায়, অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশিত হয়েছে সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, 2011 (2011 সনের 14 নং আইন)-এর 14 ধারাবলে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের হিসাবে সংশোধনীটি আনা হয় 2011 সালের 30 জুন।
ইংরেজি পাঠে চারটি শব্দ হয়েছে “tribes, minor races, ethnic sects and communities” (ইংরেজি সংকলন)। বাংলা ও ইংরেজি পাঠের শব্দ যে হুবহু মেলে না — ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ ইংরেজিতে ‘minor races’, ‘নৃ-গোষ্ঠী’ ইংরেজিতে ‘ethnic sects’ — সেটি লক্ষ করার মতো। দুই পাঠে বিরোধ হলে কোনটি চলবে, সংবিধান নিজেই বলে দিয়েছে: অনুচ্ছেদ 153(3)-এর শর্তাংশ অনুযায়ী “বাংলা ও ইংরাজী পাঠের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাইবে।”
তিনটি জিনিস অনুচ্ছেদটিতে নেই, আর এগুলো নিয়েই বিতর্ক:
সংশোধনী তৈরির সময়ের একটি বক্তব্য আমাদের আর্কাইভে আছে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরার 20 এপ্রিল 2011 তারিখের প্রবন্ধ অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধন বিষয়ক কমিটির কো-চেয়ার সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত 15 মার্চ 2011-এর সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকায় যে অর্থে আদিবাসীরা ‘আদিবাসী’, এদেশের জনগোষ্ঠীরা সে অর্থে নন; তাই সংবিধানে স্বীকৃতি হবে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ হিসেবে (আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও এর প্রাসঙ্গিকতা)। সংবাদ সম্মেলনের মূল প্রতিবেদন দিয়ে উক্তিটি যাচাই করা যায়নি [যাচাই প্রয়োজন]।
পরিভাষা-বিতর্কের দ্বিতীয় সাংবিধানিক কেন্দ্র অনুচ্ছেদ 6(2): “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালী এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন।” এই পাঠটিও পঞ্চদশ সংশোধনীর — 2011 সালের 14 নং আইনের 6 ধারাবলে আগের 6 অনুচ্ছেদের পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত। অর্থাৎ একই সংশোধনী জাতি-পরিচয় লিখেছে ‘বাঙালী’, আর বাকিদের জন্য 23ক-তে চারটি শব্দ।
প্রশ্নটি 2011-তে শুরু হয়নি। 1972 সালের 31 অক্টোবর গণপরিষদে সংবিধান বিলের 6 অনুচ্ছেদে আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়া সংশোধনী আনেন: “বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।” পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আপত্তি করেন। গণপরিষদের বিতর্কের সরকারি রেকর্ড (খণ্ড 2, সংখ্যা 13) থেকে আমাদের আর্কাইভে রাখা পাঠে তাঁর কথা:
“আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদেরকে বাংলাদেশী বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়।”
সংশোধনী পাস হয়, আর লারমা প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য বৈঠক বর্জন করেন। তাঁর বেরিয়ে যাওয়ার পর শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম যে জবাব দেন, তাতে রাষ্ট্রের তখনকার শব্দটি পাওয়া যায়: “পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ৫ লক্ষ উপজাতি রয়েছে, তাঁরা বাঙালি।” (গণপরিষদে এম এন লারমা: নাগরিকত্ব সংশোধনী ও পরিষদ বর্জন।) লারমার পুরো রাজনৈতিক জীবন আলাদা লেখায় আছে — মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা: জীবন, সংগ্রাম ও অসমাপ্ত প্রশ্ন।
ফলে 1972 থেকে 2026 পর্যন্ত একটি লক্ষণীয় বৃত্ত আছে। 1972 সালে লারমা চেয়েছিলেন ‘বাংলাদেশী’ পরিচয়, ‘বাঙালি’ নয়। 2026 সালে মন্ত্রী বলছেন সবার পরিচয় ‘বাংলাদেশি’, তাই ‘আদিবাসী’ অপ্রাসঙ্গিক। একই শব্দ দুই সময়ে দুই বিপরীত যুক্তির কাজ করেছে।
সংবিধান কোটা বা বিশেষ সুবিধার প্রশ্নে কোনো জাতিগত শব্দই ব্যবহার করে না। তিনটি অনুচ্ছেদে শব্দটি “অনগ্রসর অংশ” — অনুচ্ছেদ 14, 28(4) ও 29(3)(ক)। সরকারি চাকরির কোটা এই ভিত্তিতেই দাঁড়িয়ে, আর কোটার প্রজ্ঞাপনে শব্দটি ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’।
2024 সালের 23 জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্নির্ধারণের যে প্রজ্ঞাপন জারি হয়, তাতে 93 শতাংশ মেধাভিত্তিক এবং বাকি 7 শতাংশের মধ্যে “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ১%” রাখা হয় (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, 23 জুলাই 2024; ডেইলি স্টার বাংলা)। 2026 সালের গোলটেবিলে সালাহউদ্দিন আহমদও এই যুক্তি দেন যে মূলধারার সঙ্গে সমতা আনতে বিশেষ সুবিধা ও কোটাব্যবস্থা চালু আছে, “যার স্বীকৃতি সংবিধানেও রয়েছে” — প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী। কোটার সুফল কারা পাচ্ছেন, সে প্রশ্নটি এই লেখার বিষয় নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক আইনগুলোর মূল শব্দ ‘উপজাতীয়’, আর তার বিপরীত ‘অ-উপজাতীয়’। শব্দ দুটি আসন-বণ্টন, প্রার্থিতা আর ভোটারের শর্ত ঠিক করে, তাই এখানে এটি কেবল নাম নয়, আইনি শ্রেণি। প্রতিটি আইন নিজের সংজ্ঞায় নাম ধরে জনগোষ্ঠীর তালিকা দিয়েছে, আর তালিকাগুলো এক নয়।
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989-এর প্রস্তাবনা শুরু হয় এভাবে: “যেহেতু রাংগামাটি পার্বত্য জেলা বিভিন্ন অনগ্রসর উপজাতি অধ্যুষিত একটি বিশেষ এলাকা”। আঞ্চলিক পরিষদ আইন, 1998 ও ভূমি কমিশন আইন, 2001-এর প্রস্তাবনায় একই শব্দবন্ধ: “পার্বত্য চট্টগ্রাম অনগ্রসর উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল”। দুটি আইনেই এর পরের বাক্যে আছে “উপ-জাতীয় অধিবাসীগণসহ” সকল নাগরিকের অধিকারের কথা।
সংজ্ঞা-ধারায় কোন আইন কোন জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতীয়’ বলেছে, নিচের ছকে তা দেওয়া হলো। বানানগুলো আইনের পাঠে যেমন আছে, তেমনই রাখা হয়েছে।
| আইন | সংজ্ঞা-ধারা | ‘উপজাতীয়’ অর্থ যাঁরা | সংখ্যা |
|---|---|---|---|
| রাংগামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989 (19 নং আইন) | 2(খ) | চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যাঁ, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখোয়া ও খেয়াং | 7 |
| খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989 | 2(খ) | চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা | 3 |
| বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989 | 2(খ) | মারমা, ম্রো (মুরং), ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যাঁ, বম, চাকমা, খুমী, উচাই, চাক, খিয়াং, পাংখোয়া ও লুসাই | 12 |
| পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, 1998 (12 নং আইন) | 2(গ) | চাকমা, মারমা, তনৈচংগা, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখো, খিয়াং, ম্রো, বোম, খুমী ও চাক | 11 |
কয়েকটি জিনিস ছক থেকেই চোখে পড়ে। এক, একই জনগোষ্ঠীর নাম চার আইনে চার বানানে — তঞ্চঙ্গ্যাঁ ও তনৈচংগা, বম ও বোম, পাংখোয়া ও পাংখো, খেয়াং ও খিয়াং। জেলা পরিষদ আইনগুলোর কিছু নাম বন্ধনীতে পরে সংশোধিত, সেটি আইন মন্ত্রণালয়ের সংকলনের পাদটীকায় চিহ্নিত। দুই, বান্দরবানের তালিকায় ‘উচাই’ আছে, যে নাম আঞ্চলিক পরিষদ আইনের এগারোটির মধ্যে নেই। তিন, খাগড়াছড়ির সংজ্ঞায় কেবল তিনটি নাম।
‘অ-উপজাতীয়’-এর সংজ্ঞা সব আইনে এক: “যিনি উপজাতীয় নহেন”। এর সঙ্গে ‘অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা’র আলাদা সংজ্ঞা আছে — যাঁর পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা-জমি আছে এবং যিনি সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণত বসবাস করেন। আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ধারা 5(9) অনুযায়ী কেউ উপ-জাতীয় কিনা এবং কোন উপজাতির সদস্য, তা স্থির করবেন সার্কেল চীফ, আর তাঁর সার্টিফিকেট ছাড়া কেউ উপ-জাতীয় সদস্যপদে প্রার্থী হতে পারবেন না। আসন-বণ্টনও এই শব্দে লেখা: ধারা 5(3) অনুযায়ী উপ-জাতীয় সদস্যদের পাঁচজন “চাকমা উপজাতি হইতে”, তিনজন মারমা, দুইজন ত্রিপুরা, একজন “ম্রো ও তনৈচংগা উপজাতি হইতে”, আর একজন “লুসাই, বোম, পাংখো, খুমী, চাক ও খিয়াং উপজাতি হইতে”। আসনের পূর্ণ হিসাব আলাদা লেখায় — পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ: গঠন, ক্ষমতা ও আসন-বণ্টন এবং পার্বত্য জেলা পরিষদে আসন ভাগ হয় কীভাবে; সার্কেল চীফের ভূমিকা সার্কেল চিফ: তিনটি সার্কেল লেখায়।
উল্টো দিকের একটি উদাহরণও আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন, 2014-তে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’, ‘আদিবাসী’ — কোনোটিই নেই। সংজ্ঞা-ধারায় জনগোষ্ঠী বোঝানোর মতো একমাত্র শব্দ “সার্কেল চীফ” — “পার্বত্য জেলার চাকমা, বোমাং ও মং সার্কেল চীফ”। পার্বত্য অঞ্চলের পুরো আইনি কাঠামোর প্রবেশপথ হিসেবে দেখতে পারেন পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব-পাতা।
1997 সালের 2 ডিসেম্বরের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ক-খণ্ডের প্রথম ধারায় দুই পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রামকে “উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল” হিসেবে বিবেচনা করে এর বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। এটি চুক্তির নিজস্ব পরিভাষা। চুক্তিতে সরকারের পক্ষে সই করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, আর “পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে” জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা।
এই তথ্যটিই 2011 সালে দীপু মনির একটি প্রধান যুক্তি ছিল: চুক্তিতেই তাঁদের “Tribal” বলা হয়েছে। অন্যদিকে, চুক্তির পরে প্রণীত আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও জেলা পরিষদ আইনের সংশোধনীগুলো এই শব্দটি বহন করেছে — উপরের ছকের ‘উপজাতীয়’ সেই উত্তরাধিকার। চুক্তির ধারা ধরে বিশ্লেষণ আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি 1997: ধারা ধরে ধরে লেখায়।
চুক্তির শব্দকে আদিবাসী সংগঠনগুলো কীভাবে দেখে, তার একটি নমুনা আমাদের আর্কাইভে আছে। শক্তিপদ ত্রিপুরার 2011 সালের প্রবন্ধে সংবিধান সংশোধনের যে নয় দফা প্রস্তাব, তার সপ্তমটি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামকে “আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল” হিসেবে বিশেষ শাসিত অঞ্চলের সাংবিধানিক স্বীকৃতি। অর্থাৎ চুক্তির শব্দবন্ধে কেবল একটি শব্দ বদলের প্রস্তাব।
2010 সালের 12 এপ্রিল প্রণীত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন (2010 সনের 23 নং আইন) ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটিকে আইনি সংজ্ঞা দিয়েছে। সেই সংজ্ঞার ভেতরেই ‘আদিবাসী’ শব্দ আছে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে শব্দটির এটিই সবচেয়ে সরাসরি উপস্থিতি, আর বিতর্কে প্রায়ই এটি অনুল্লিখিত থাকে।
ধারা 2(2), আইন মন্ত্রণালয়ের সংকলন থেকে:
“(২) “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী” অর্থ তফসিলে উল্লিখিত বিভিন্ন আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও শ্রেণীর জনগণ;”
‘তথা’ শব্দটি এখানে সমার্থক বোঝায় — ‘আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’। 2011 সালে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় ঠিক এই ধারাটিই তুলে ধরেছিলেন। দীপু মনির ব্রিফিংয়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, “The constitution does not say that there are no indigenous people in the country”, এবং 2010 সালের আইন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করেছে।
আইনের প্রস্তাবনার শব্দ আবার সংবিধানের 23ক-র সঙ্গে প্রায় হুবহু মেলে: “বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে”। আইনটি পঞ্চদশ সংশোধনীর এক বছরের বেশি আগের, তবু শব্দবন্ধটি একই।
তফসিল: 50টি নাম। আইনের ধারা 19 সরকারকে প্রজ্ঞাপন দিয়ে তফসিল বদলানোর ক্ষমতা দেয়। এই ক্ষমতায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় 19 মার্চ 2019 তারিখে এস.আর.ও. নং 78-আইন/2019 জারি করে, যা 23 মার্চ 2019-এর অতিরিক্ত গেজেটে প্রকাশিত হয় (বাংলাদেশ গেজেট)। নতুন তফসিলের শিরোনাম “বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নাম”, আর তাতে 50টি নাম — ওরাওঁ, কোচ, কোল থেকে শুরু করে খাড়িয়া ও খারওয়ার পর্যন্ত। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, খিয়াং, খুমি, চাক, লুসাই, পাংখোয়া ও তঞ্চঙ্গ্যা এই তালিকায় আছেন। তফসিলে ‘আদিবাসী’ শব্দ নেই; শব্দটি কেবল সংজ্ঞা-ধারায়।
2025 সালের খসড়া। দ্য ডেইলি স্টারে মং সিং হাই মারমার 6 জুলাই 2025-এর লেখা অনুযায়ী, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় 23 জুন 2025 একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা ডাকে, যেখানে আইনটির নতুন খসড়ার নাম ছিল “Cultural Institution for Ethnic Diversity Act 2025” — ‘small ethnic group’-এর বদলে ‘ethnic diversity’। খসড়াটি আইনে পরিণত হয়েছে কিনা, জানা যায়নি। আইন মন্ত্রণালয়ের সংকলনে এখনো 2010 সালের নাম ও ধারা 2(2)-এর পাঠটিই আছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জনশুমারিতে ‘আদিবাসী’ বা ‘উপজাতি’ নয়, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দে গোনে, ইংরেজিতে ‘Ethnic Population’। আর কাকে গোনা হবে, তা শুমারি নিজে ঠিক করে না; 2022 সালের জাতীয় প্রতিবেদন সংজ্ঞাটি সরাসরি 2010 সালের আইন থেকে নিয়েছে।
Population and Housing Census 2022, National Report (Volume I)-এর সংজ্ঞা 2.31 (পৃ. 33): “The population defined as Ethnic Population by ‘Khudra Nri-goshthi Sangskritik Pratisthan Ain, 2010’ under the Ministry of Cultural Affairs.” অধ্যায় 3.2.11-তে (পৃ. 96) আবার বলা হয়েছে, জাতিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ওই আইনের বিধান অনুসরণ করে।
এর একটি সরল পরিণতি আছে। শুমারি গোনে আইনের তফসিল ধরে, আর তফসিল ঠিক হয় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে। 2022 সালের সারণি P29-এ (পৃ. 364–365) ঠিক 50টি নাম, আর তার নিচে “Others” — 68,588 জন। অর্থাৎ যাঁরা 2019 সালের তফসিলের বাইরে, তাঁরা নাম ছাড়া একটি সারিতে।
একই প্রতিবেদনের Key Findings সারণিতে (পৃ. xx) পাঁচটি শুমারির সংখ্যা পাশাপাশি দেওয়া আছে, একই শিরোনামে — “Ethnic Population”:
| শুমারি | মোট | পুরুষ | নারী |
|---|---|---|---|
| 2022 | 1,650,478 | 824,933 | 825,545 |
| 2011 | 1,586,141 | 797,477 | 788,664 |
| 2001 | 1,410,169 | 724,398 | 685,771 |
| 1991 | 1,205,978 | 616,878 | 589,100 |
| 1981 | 897,828 | 456,974 | 440,854 |
| 1974 | সারণিতে তথ্য নেই | ||
2022 সালের শিরোনামটি পুরোনো শুমারির ওপরও বসানো হয়েছে। 1991 বা 1981 সালের নিজস্ব প্রতিবেদনে একই জনসংখ্যাকে কোন শব্দে লেখা হয়েছিল, সেটি পাওয়া যায়নি।
সংখ্যার প্রশ্নে বিরোধও আছে, আর সেটিও শব্দের সঙ্গে জড়ানো। বিবিএস-এর হিসাবে 2022 সালে 1,650,478; আদিবাসী সংগঠনগুলোর হিসাবে প্রকৃত সংখ্যা প্রায় 40 লাখ — দুটি হিসাব পাশাপাশি আছে UNDRIP বিষয়ক লেখায়। 2022 সালের 9 আগস্ট আদিবাসী ফোরামের অনুষ্ঠানে আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ফজলে হোসেন বাদশা আদিবাসীদের জন্য আলাদা জনশুমারির আহ্বান জানান (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর)।
তিন পার্বত্য জেলায় 2022 সালের জেলা প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘Ethnic Population’ রাঙ্গামাটিতে 372,875, খাগড়াছড়িতে 349,390 এবং বান্দরবানে 197,983। জাতীয় সারণি P29-এ চাকমা 483,365, মারমা 224,299, ত্রিপুরা 156,620, ম্রো 52,463, তঞ্চঙ্গ্যা 45,974 (সারণিতে বানান “Tonchonga”) এবং বম 13,193।
‘আদিবাসী’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ নিয়ে তর্কের আগেই বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘aboriginal’ শব্দ ছিল, এবং এখনো আছে। পূর্ববঙ্গ রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950-এর ধারা 97-এর শিরোনামই “Restriction on alienation of land by aboriginals”।
ধারাটি সরকারকে প্রজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা করার ক্ষমতা দেয় যে নির্দিষ্ট জেলায় “aboriginal castes or tribes”-এর ক্ষেত্রে ধারাটি প্রযোজ্য হবে। তালিকায় নাম ধরে আছে: Sonthals, Banais, Bhuiyas, Bhumijes, Dalus, Garos, Gonds, Hadis, Hajangs, Hos, Kharias, Kharwars, Kochs (Dhaka Division), Koras, Maghs (Bakerganj District), Mal and Sauria Paharias, Maches, Mundas, Mundais, Oraons ও Turis। ধারা 97(2) অনুযায়ী একজন “aboriginal raiyat” তাঁর জমি অন্য একজন aboriginal ছাড়া কারও কাছে হস্তান্তর করতে পারেন না, রাজস্ব কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া (আইন মন্ত্রণালয়ের সংকলন)। তালিকাটি সমতলের জনগোষ্ঠীর; পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো জনগোষ্ঠীর নাম এতে নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, 1900-এর বর্তমান পাঠে ধারা 8(4)-এ শব্দটি “tribes”: পারিবারিক ও অন্যান্য প্রথাগত আইনের মামলা “customary laws of the tribes of the districts of Rangamati, Khagrachory and Bandarban” অনুযায়ী মৌজা হেডম্যান ও সার্কেল চীফরা বিচার করবেন। 2011 সালে দীপু মনি দাবি করেছিলেন, 1900 সালের এই শাসনবিধিতে তাঁরা “Tribal” হিসেবে চিহ্নিত।
এর বিপরীত দাবিও আছে। শক্তিপদ ত্রিপুরার 2011 সালের প্রবন্ধ অনুযায়ী 1900 সালের শাসনবিধি, 1995 সালের অর্থ আইন, আদালতের রায় এবং রাজস্ব বোর্ডের একাধিক স্মারকে “ইন্ডিজিনাস হিলম্যান” শব্দ ব্যবহার হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত শাসনবিধির মূল ধারাগুলোতে এবং অর্থ আইন, 1995-এর পাঠে শব্দবন্ধটি পাওয়া যায়নি [যাচাই প্রয়োজন]। শাসনবিধির অধীনের বিধিমালা (Rules) ওই সংকলনে নেই, তাই দাবিটি বিধিমালার পাঠ দিয়ে মেলানো বাকি।
আন্তর্জাতিক দলিলে বাংলাদেশের দুটি সিদ্ধান্ত শব্দের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয়: ILO-র Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (C107) অনুসমর্থন, আর 2007 সালে জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্রের ভোটে বিরত থাকা। ILO-র 1989 সালের C169-এ বাংলাদেশ নেই। দুটির বিস্তারিত আলাদা লেখায় আছে।
ILO-র নিজস্ব তালিকা (NORMLEX) অনুযায়ী বাংলাদেশ C107 অনুসমর্থন করেছে 22 জুন 1972, আর সেটি বলবৎ আছে। 2026 সালের 44 নাগরিকের বিবৃতিতে সালটি লেখা হয়েছে 1957 — প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী; 1957 আসলে কনভেনশনটি গৃহীত হওয়ার বছর। কনভেনশনের নামেই ‘Indigenous’ ও ‘Tribal’ দুটি শব্দ আছে।
2007 সালের 13 সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ঘোষণাপত্রের ভোটে বাংলাদেশ বিরত থাকা 11টি দেশের একটি ছিল। 2026 সালে সালাহউদ্দিন আহমদ এই তথ্য থেকেই যুক্তি দেন যে ঘোষণাপত্রটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে “কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়”। অন্যদিকে 25টি ছাত্র-যুব সংগঠনের বিবৃতি বলেছে, বিরত থাকলেও সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এটি বাস্তবায়নের নৈতিক দায় আছে। ভোটের পূর্ণ হিসাব, ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ 46 আর ILO-র দুই কনভেনশনের পার্থক্য: UNDRIP: কী বলে, বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে।
2011 সালে দীপু মনির আপত্তির লক্ষ্যও ছিল আন্তর্জাতিক একটি দলিল: জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের (UNPFII) 2011 সালের প্রতিবেদন, যার দুটি অনুচ্ছেদে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীদের “indigenous peoples” বলা হয়েছিল — ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী। কোন দুটি অনুচ্ছেদ, প্রতিবেদনে তা উল্লেখ নেই।
রাষ্ট্রীয় নথিতে শব্দগুলো যে ক্রমে এসেছে, তা নিচে সাল ধরে। প্রতিটি সারির উৎস ওপরের অংশগুলোতে লিংকসহ দেওয়া আছে।
19 জুলাই 2022-এর চিঠিটি স্বাক্ষর করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের টিভি-2 শাখার উপসচিব শেখ শামছুর রহমান, আর পাঠানো হয় সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশনের প্রধানদের কাছে। চিঠিটি আইন বা প্রজ্ঞাপন নয়; এর ক্রিয়াপদ “নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল”। বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক সোহরাব হোসেন চিঠি পাওয়ার কথা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের কাছে স্বীকার করেছিলেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে প্রকাশিত চিঠির পাঠ:
“বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ছোট ছোট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীকে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ অবস্থায় আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত টক শোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্য ব্যক্তিদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার না করার বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে প্রচারের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল।”
দুটি জিনিস চিঠির পাঠ থেকেই পরিষ্কার। চিঠিতে কোনো অনুচ্ছেদের নম্বর নেই, কেবল “পঞ্চদশ সংশোধনী”। আর চিঠিটি সংবিধানের চার শব্দের তিনটি নিয়েছে — ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃগোষ্ঠী’ — ‘সম্প্রদায়’ বাদ দিয়ে, ‘ও’-র জায়গায় ‘বা’ বসিয়ে।
প্রতিক্রিয়া এসেছিল দ্রুত। 30 জুলাই 2022 প্রথম আলো 49 জন বিশিষ্ট নাগরিকের একটি বিবৃতি প্রকাশ করে — স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে হামিদা হোসেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সুলতানা কামাল, বদিউল আলম মজুমদার, শিরীন হক ও অধ্যাপক পারভীন হাসান। বিবৃতিতে চিঠিটিকে বলা হয় “আমলাতান্ত্রিক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ”, “সংবিধান পরিপন্থী”, আর দাবি করা হয়, “আদিবাসী শব্দটি ব্যবহারে কোনো আইনগত প্রতিবন্ধকতা নেই।” তাঁরা চিঠি প্রত্যাহারের দাবি জানান।
চিঠির প্রতিক্রিয়ায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের 29 জুলাইয়ের প্রতিবেদনে কয়েকজনের বক্তব্য আছে। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন: “একটা গণতান্ত্রিক দেশে কোন গোষ্ঠী নিজেদেরকে কী নামে ডাকবে, এটা কি সরকার নির্ধারণ করতে পারে?” বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, কোনো জাতিগোষ্ঠীকে বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে সম্বোধন করবেন, তা ঠিক করার দায়িত্ব তথ্য মন্ত্রণালয়ের নয়। ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, মন্ত্রণালয় সংবিধানের ধারাটি “অনেকটাই ভুলভাবে ব্যাখ্যা” করেছে। সরকারি জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ও আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ফজলে হোসেন বাদশাও বলেন, “আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করলে সংবিধানের কোনো অবমাননা হয়, এমনটা মনে করি না।”
5 আগস্ট 2022 বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সমাবেশ থেকে “বিধিনিষেধ” বাতিলের দাবি তোলে (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর)। 9 আগস্টের অনুষ্ঠানে ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন সেইসব গণমাধ্যমের প্রশংসা করেন, যারা “কোট-আনকোট আদিবাসী” লিখে নির্দেশনা এড়িয়ে গিয়েছিল। চিঠিটি প্রত্যাহার হয়েছিল কিনা, পরবর্তী কোনো সরকারি নথিতে জানা যায়নি।
চিঠির পক্ষে মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা ওই সময়ের প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি। চিঠির নিজের যুক্তি — সংবিধানে চার শব্দ আছে, ‘আদিবাসী’ নেই — সেটিই মন্ত্রণালয়ের অবস্থান হিসেবে নথিতে থাকা একমাত্র বক্তব্য।
2026 সালের আগস্টে বিতর্ক আবার প্রকাশ্যে আসে, এবার কোনো চিঠি নয়, মন্ত্রীদের বক্তব্য দিয়ে। 11 আগস্টের গোলটেবিলের পর 13 আগস্ট 25টি ছাত্র, যুব, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং 18 আগস্ট 44 জন বিশিষ্ট নাগরিক আলাদা বিবৃতি দেন। দুই পক্ষের বক্তব্য নিচে, যার যার উৎস ধরে।
গোলটেবিল। আয়োজক সিএইচটিআরএফ; সভাপতি সংগঠনটির চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান পলাশ; প্রধান অতিথি সালাহউদ্দিন আহমদ; বিশেষ অতিথি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম (প্রথম আলো)। মন্ত্রীর বক্তব্যের সারকথা প্রথম অংশে দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে তাঁর আরেকটি বাক্যও আছে: রাষ্ট্র “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও উপজাতিদের” ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অর্থাৎ 2026 সালের সরকারি বক্তব্যেও শব্দ দুটি — ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ ও ‘উপজাতি’ — আগের নথির ধারাতেই।
25 সংগঠনের বিবৃতি। ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম, বাংলাদেশ গারো স্টুডেন্ট ফেডারেশনসহ 25টি সংগঠন মন্ত্রীদের বক্তব্যকে বলেছে “আপত্তিকর, বিভ্রান্তিকর, ইতিহাস ও বাস্তবতাবিবর্জিত”। তাদের চার দাবি: সংবিধানে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি; আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ ভূমি, ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার; সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জ্ঞানের ওপর অধিকার; এবং 2007 সালের ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন। বিবৃতিটি বিএনপির 31 দফার “রেইনবো নেশন” প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মন্ত্রীদের বক্তব্যের অসংগতির প্রশ্নও তোলে।
44 নাগরিকের বিবৃতি। প্রথম আলোর 18 আগস্ট 2026-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী সুলতানা কামাল, খুশী কবির, শাহীন আনাম, শহিদুল আলম, হিরণ মিত্র চাকমাসহ 44 জন বিবৃতিতে বলেন, মন্ত্রীদের বক্তব্য সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিবৃতির একটি বাক্য: “আদিবাসী পরিচয় এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়।” বিবৃতি আদিবাসী অধিকারের সুরক্ষা আছে এমন কয়েকটি আইনেরও উল্লেখ করেছে — রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন 1950, আয়কর আইন 2023, অর্থ আইন 1995 ও জাতীয় শিক্ষানীতি 2010। এর মধ্যে 1950 সালের আইনের ধারা 97 ওপরে মূল পাঠ ধরে দেওয়া আছে; বাকি তিনটি নথিতে ঠিক কোন শব্দ আছে, তা মূল পাঠ দিয়ে মেলানো যায়নি [যাচাই প্রয়োজন]।
বিতর্কে দুটি অবস্থান। রাষ্ট্রের ঘোষিত অবস্থান: সংবিধানে শব্দটি নেই, চুক্তি ও আইন ‘উপজাতি’ বলে, আর এই জনগোষ্ঠীরা আন্তর্জাতিক অর্থে indigenous নন। আদিবাসী সংগঠন ও তাঁদের সমর্থকদের অবস্থান: শব্দটি আত্মপরিচয়ের, সংবিধান এটি নিষেধ করে না, আর রাষ্ট্রের নিজের আইনেই শব্দটি আছে। নিচের ছকে প্রতিটি যুক্তির পাশে বক্তার নাম।
| প্রশ্ন | রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য | আদিবাসী সংগঠন ও সমর্থকদের বক্তব্য |
|---|---|---|
| সংবিধান | 23ক-তে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃগোষ্ঠী’; ‘আদিবাসী’ ব্যবহার না করার “সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা” (তথ্য মন্ত্রণালয়, 2022) | “সংবিধানের কোথাও বলা হয়নি যে, আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না” (মেসবাহ কামাল, 2022); “The constitution does not say that there are no indigenous people” (দেবাশীষ রায়, 2011) |
| চুক্তি ও আইন | চুক্তি ও 1900 সালের শাসনবিধিতে তাঁরা “Tribal” (দীপু মনি, 2011) | 2010 সালের আইন তাঁদের আদিবাসী হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করেছে (দেবাশীষ রায়, 2011); বিভিন্ন আইন ও নথিতে “ইন্ডিজিনাস হিলম্যান” (শক্তিপদ ত্রিপুরা, 2011) |
| কে আগে এসেছেন | পার্বত্য জনগোষ্ঠীরা 16শ থেকে 19শ শতকে আশ্রয়প্রার্থী ও অর্থনৈতিক অভিবাসী হিসেবে এসেছেন (দীপু মনি, 2011, ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী) | আদিবাসী নির্ধারণে কে আদি বাসিন্দা তা “একমাত্র নির্ণায়ক বিষয় নয়”; মাপকাঠি রাষ্ট্রে প্রান্তিকতা, প্রথাগত আইন ও প্রতিষ্ঠান, ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক (শক্তিপদ ত্রিপুরা, 2011); সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, ভীল, কোলসহ অনেক জাতি এ অঞ্চলে প্রথম বসতি করেছিলেন (ফারহা তানজীম তিতিল, 2022) |
| নাগরিক পরিচয় | সব নাগরিকের মূল পরিচয় ‘বাংলাদেশি’; এই ঐক্য সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার ভিত্তি (সালাহউদ্দিন আহমদ, 2026) | “আদিবাসী পরিচয় এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়” (44 নাগরিক, 2026) |
| আন্তর্জাতিক দলিল | UNDRIP-এ বিরত, ILO 169-এ নেই, তাই প্রযোজ্য নয় (সালাহউদ্দিন আহমদ, 2026); “international laws” তাঁদের indigenous বলে না (দীপু মনি, 2011) | ILO 107 অনুসমর্থিত ও আইনত বাধ্যতামূলক (44 নাগরিক, 2026); বিরত থাকলেও বাস্তবায়নের নৈতিক দায় (25 সংগঠন, 2026) |
| কে নাম ঠিক করবে | রাষ্ট্র সংবিধানের শব্দ অনুসরণ করে (তথ্য মন্ত্রণালয়, 2022) | “আমার পরিচয় প্রকাশ করতে আমি কোন শব্দ ব্যবহার করব, সেটি রাষ্ট্র কোনোভাবেই ঠিক করতে পারে না” (গৌতম দেওয়ান, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটি, 2022) |
একটি সূক্ষ্ম কথা আদিবাসীপক্ষের লেখাতেই আছে, যা প্রায়ই হারিয়ে যায়। আমাদের আর্কাইভের 1993 সালের সেমিনার-প্রবন্ধ বলেছিল, পাহাড়ি ও সমতলের জনগোষ্ঠীদের indigenous বলার অর্থ এই নয় যে বাঙালির শেকড় এদেশের মাটিতে নেই; শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় রাষ্ট্রক্ষমতার সম্পর্কে, প্রাচীনত্বের প্রতিযোগিতায় নয় (প্রবন্ধটির বিশদ পাঠ UNDRIP বিষয়ক লেখায়)। অন্যদিকে শক্তিপদ ত্রিপুরা 2011 সালে লিখেছিলেন, সরকারের বড় পদে থাকা ব্যক্তিরাও নাকি প্রশ্ন তোলেন — “আপনারা উপজাতিরা এদেশের আদিবাসী হলে আমরা কারা? আমরাও তো এদেশের আদিবাসী।” দুই পক্ষের মধ্যে আসল ফাঁকটি এখানেই: এক পক্ষ শব্দটিকে পড়ে ‘আদি নিবাসী’ অর্থে, অন্য পক্ষ আন্তর্জাতিক আইনের একটি রাজনৈতিক শ্রেণি হিসেবে। ‘জুম্ম’ পরিচয়ের দাবি নিয়ে আর্কাইভের আরেকটি লেখা আছে — জুম্ম জনগণের আদিবাসী পরিচয়ের দাবি কেন যৌক্তিক।
প্রশান্ত ত্রিপুরা তাঁর 2013 সালের লেখায় শব্দটির সরকারি পরিসর থেকে সরে যাওয়ার একটি বর্ণনাও দিয়েছেন: কোনো প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা নয়, কিন্তু একটি গোপনীয় সরকারি প্রতিবেদনের খবর ফাঁস হওয়ার পর সরকারি মহলে শব্দটির উচ্চারণ কমে আসে, আর এনজিও মহলে জানাজানি হয় যে প্রকল্পের কাগজে ‘আদিবাসী’ থাকলে এনজিও অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোর অনুমোদন মিলবে না। এটি লেখকের বর্ণনা; সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন বা ব্যুরোর কোনো লিখিত নির্দেশনা প্রকাশিত আকারে পাওয়া যায়নি [যাচাই প্রয়োজন]।
প্রকাশিত কোনো আইনে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নেই। সংবিধানের অনুচ্ছেদ 23ক একটি দায়িত্ব দেয়, কোনো শব্দ নিষেধ করে না। 2022 সালের চিঠিটি আইন বা গেজেট প্রজ্ঞাপন নয়, একটি মন্ত্রণালয়ের “অনুরোধ”। উল্টো দিকে, প্রচলিত একটি আইনের সংজ্ঞাতেই শব্দটি আছে।
তবে প্রশ্নটির দুটি স্তর আছে, আর দুটি আলাদা। প্রথম স্তর: শব্দটি বলা বা লেখা অপরাধ কিনা — এমন কোনো আইনি বিধান কোনো পক্ষই উদ্ধৃত করেনি; 2022 সালের চিঠিও কোনো শাস্তির কথা বলেনি। দ্বিতীয় স্তর: রাষ্ট্র নিজে তার দলিলে শব্দটি লিখবে কিনা — এখানে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট, আর সেটি হলো ‘না’। ওপরের ছকে 2011-পরবর্তী প্রতিটি সরকারি নথি ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ বা ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ লিখেছে, আর মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে শব্দটির প্রযোজ্যতা অস্বীকার করছেন।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠি যে “সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা”র কথা বলেছিল, তার পক্ষে মন্ত্রণালয় কোনো অনুচ্ছেদের নম্বর দেয়নি। চিঠির সমালোচকেরা — ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, 49 জন নাগরিক — এই ফাঁকটিকেই তাঁদের যুক্তির কেন্দ্রে রেখেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে কোনো আদালতের রায় পাওয়া যায়নি।
সরকারি নথি ও মন্ত্রীদের বক্তব্যে তিনটি কারণ এসেছে। এক, সংবিধানের অনুচ্ছেদ 23ক-তে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ আছে, ‘আদিবাসী’ নেই (তথ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠি, 19 জুলাই 2022)। দুই, 1997 সালের চুক্তি ও পার্বত্য আইনগুলো ‘উপজাতি’ বলে (দীপু মনি, 2011)। তিন, সব নাগরিকের পরিচয় ‘বাংলাদেশি’ এবং UNDRIP ও ILO 169 বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় (সালাহউদ্দিন আহমদ, 11 আগস্ট 2026)।
রাষ্ট্রীয় নথিতে তিনটি শব্দ একই জনগোষ্ঠীদের বোঝায়, আলাদা আইনে। ‘উপজাতি/উপজাতীয়’ পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন 1989, আঞ্চলিক পরিষদ আইন 1998 ও 1997 সালের চুক্তির শব্দ। ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ 2010 সালের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, 2022 শুমারি ও 2024 সালের কোটার শব্দ। ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীদের আত্মপরিচয়ের শব্দ; সংবিধানে নেই, তবে 2010 সালের আইনের ধারা 2(2)-এ আছে।
বাংলাদেশের আইনে একই মানুষদের জন্য দুটি শব্দই ব্যবহৃত হয়েছে, কোনো আইন দুটির সংজ্ঞাগত পার্থক্য টানেনি। পার্থক্যটি অবস্থানের: রাষ্ট্র ‘উপজাতি’ ও ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ লেখে, আর জনগোষ্ঠীগুলোর সংগঠন নিজেদের ‘আদিবাসী’ বলে। বাংলা অভিধানে ‘আদিবাসী’ অর্থ “আদিম জাতি বা অধিবাসী” — নৃবিজ্ঞানী প্রশান্ত ত্রিপুরার 2013 সালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী।
“রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।” এটি সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, 2011 (14 নং আইন)-এর 14 ধারাবলে যুক্ত। ইংরেজি পাঠে “tribes, minor races, ethnic sects and communities”; বিরোধে অনুচ্ছেদ 153(3) অনুযায়ী বাংলা পাঠ প্রাধান্য পায়।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, 2010 (23 নং আইন)-এর ধারা 2(2): “”ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী” অর্থ তফসিলে উল্লিখিত বিভিন্ন আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও শ্রেণীর জনগণ”। এর ইংরেজি সমতুল্য ‘aboriginal’ আছে পূর্ববঙ্গ রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950-এর ধারা 97-এ, যা সমতলের জনগোষ্ঠীদের জমি হস্তান্তরে বিধিনিষেধ দেয়।
50টি। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এস.আর.ও. নং 78-আইন/2019, তারিখ 19 মার্চ 2019, 2010 সালের আইনের তফসিল বদলে 50টি নাম বসিয়েছে; 23 মার্চ 2019-এর অতিরিক্ত গেজেটে প্রকাশিত। 2022 শুমারির সারণি P29-এ এই 50টি নামের পর “Others” সারিতে আরও 68,588 জন গোনা হয়েছে।
‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’, ইংরেজিতে ‘Ethnic Population’। 2022 সালের জাতীয় প্রতিবেদনের সংজ্ঞা 2.31 অনুযায়ী এটি 2010 সালের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে সংজ্ঞায়িত জনগোষ্ঠী। 2022 সালে মোট 1,650,478 জন; একই প্রতিবেদনে 2011 সালে 1,586,141, 2001 সালে 1,410,169 এবং 1991 সালে 1,205,978।
19 জুলাই 2022 টিভি-2 শাখার উপসচিব শেখ শামছুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে টিভি চ্যানেলগুলোকে অনুরোধ করা হয়, 9 আগস্টের টক শোর অতিথিদের জানাতে যে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার না করার “সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা” আছে। যুক্তি ছিল পঞ্চদশ সংশোধনীর শব্দ। 30 জুলাই 49 জন নাগরিক চিঠি প্রত্যাহারের দাবি জানান।
শব্দটি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয় এমন কোনো আইন প্রকাশিত নেই, আর কোনো পক্ষই এমন আইন উদ্ধৃত করেনি। 2022 সালের চিঠিটি গেজেট প্রজ্ঞাপন নয়, মন্ত্রণালয়ের “অনুরোধ”, আর তাতে কোনো অনুচ্ছেদের নম্বর নেই। রাষ্ট্র নিজের নথিতে শব্দটি লেখে না — এটুকুই নথিতে প্রতিষ্ঠিত।
আঞ্চলিক পরিষদ আইন, 1998-এর ধারা 2(গ) অনুযায়ী চাকমা, মারমা, তনৈচংগা, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখো, খিয়াং, ম্রো, বোম, খুমী ও চাক — 11টি জনগোষ্ঠী। জেলা পরিষদ আইনগুলোর তালিকা আলাদা: রাঙ্গামাটিতে 7টি, খাগড়াছড়িতে 3টি (চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা), বান্দরবানে 12টি, যার মধ্যে ‘উচাই’ও আছে।
“উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল”। 1997 সালের 2 ডিসেম্বরের চুক্তির ক-খণ্ডের ধারা 1-এ সরকার ও জনসংহতি সমিতি দুই পক্ষই এই শব্দবন্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। 2011 সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি এই ধারাটিকেই ‘indigenous’ শব্দের বিপক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন।
1972 সালের 31 অক্টোবর গণপরিষদে সংবিধান বিলের অনুচ্ছেদ 6-এ নাগরিকদের ‘বাঙালি’ বলে পরিচিত করার সংশোধনী পাস হয়। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বলেন, “আমরা আমাদেরকে বাংলাদেশী বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়।” তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য বৈঠক বর্জন করেন। বর্তমান 6(2) অনুচ্ছেদ পঞ্চদশ সংশোধনীর পাঠ।
11 আগস্ট 2026 সিএইচটিআরএফের গোলটেবিলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী, কেউ আদিবাসী নয়।” তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন শব্দটিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে “অপ্রাসঙ্গিক” বলেন। 13 আগস্ট 25টি সংগঠন এবং 18 আগস্ট 44 জন নাগরিক বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে বিবৃতি দেন।
প্রাথমিক উৎস — জুমজার্নালের আর্কাইভ
আইন ও সরকারি নথি
সংবাদ ও বিশ্লেষণ
সর্বশেষ হালনাগাদ: 16 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী, আদিবাসী অধিকার, উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, সংবিধানে আদিবাসী
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।