Last updated Oct 24th, 2026
0

বাংলাদেশের নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের সরকারি তালিকায় 37 নম্বরে আছে “সিলেটের মনিপুরি শাড়ি”। তালিকার বস্ত্রগুলোর মধ্যে এটিই একমাত্র, যার নামে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নাম আছে। কিন্তু সনদটি শাড়ির, ফানেকের নয়: মণিপুরী নারীর নিজস্ব পোশাক ফানেক নিবন্ধিত তালিকাতেও নেই, অপেক্ষমাণ আবেদনের তালিকাতেও নেই। মণিপুরী তাঁত, ফানেক আর জিআই নিয়ে এই লেখাটি দাঁড়িয়ে আছে সরকারি নিবন্ধনবহি, জিআই জার্নাল আর 2013 সালের আইনের পাঠের ওপর।
শাড়িটি কবে থেকে বোনা হয়, তা নিয়ে উৎসগুলো একমত নয়। জিআই জার্নাল নিজেই লিখেছে, ধারণা করা হয় মণিপুরী নারীরা “ইন্নাফ” (ওড়না) থেকে 12 হাতের শাড়ি বোনা শুরু করেছিলেন। একাধিক মণিপুরী লেখক ও গবেষকের মতে শাড়িটি 1980 বা 1990-এর দশকে বাজারের জন্য তৈরি নতুন পণ্য। ঐতিহ্যবাহী যে বস্ত্র থেকে শাড়ির জন্ম, সুরক্ষা পেয়েছে সেটি নয়, পেয়েছে নতুন পণ্যটি।
এই লেখায় যা আছে
পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) নিবন্ধিত জিআই পণ্যের তালিকায় শাড়িটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর 37, আবেদন নম্বর জিআই-46, আবেদনের তারিখ 21 জুন 2023। আবেদনকারী বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, পণ্যের শ্রেণি 24 ও 25। পাতাটি শেষ হালনাগাদ হয়েছে 16 জুন 2026, তখন তালিকায় মোট 64টি পণ্য।
তালিকায় নামের বানান “সিলেটের মনিপুরি শাড়ি” (দন্ত্য ন)। জিআই জার্নাল ও সনদ-সংক্রান্ত খবরে লেখা হয়েছে “সিলেটের মণিপুরি শাড়ি”, আর আমাদের আর্কাইভে প্রচলিত বানান “মণিপুরী”। এই লেখায় সরকারি নাম উদ্ধৃত করার সময় নথির বানান রাখা হয়েছে, বাকি জায়গায় “মণিপুরী”।
শ্রেণি 24 ও 25 বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থার (WIPO) আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিভাগের নম্বর। 2013 সালের আইনের ধারা 2(15)-এ “শ্রেণী” বলতে এই শ্রেণিবিভাগই বোঝানো হয়েছে। জার্নালে পণ্যের প্রকার লেখা আছে “সিলেটের মণিপুরি শাড়ি ও টেক্সটাইল ফেব্রিক্স (24 ও 25)”।
শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির 2 সেপ্টেম্বর 2026 সংসদে জানান, দেশে নিবন্ধিত জিআই পণ্য 64টি। The Business Standard সেদিনের প্রতিবেদনে তালিকার যে নামগুলো দিয়েছে, তার মধ্যে “Sylhet’s Manipuri saree”-ও আছে। অর্থাৎ ডিপিডিটির তালিকা আর মন্ত্রীর হিসাব একই সংখ্যায় মেলে।
হ্যাঁ, নিবন্ধিত তালিকার ক্ষেত্রে কথাটি ঠিক। 64টি পণ্যের মধ্যে বস্ত্র, তাঁতজাত পণ্য ও তুলা মিলিয়ে 15টি নাম আছে। এর মধ্যে কেবল “সিলেটের মনিপুরি শাড়ি”-র নামেই একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নাম আছে। তবে আবেদনকারী কোনো মণিপুরী সংগঠন নয়, সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। আর অপেক্ষমাণ তালিকায় আরও দুটি আদিবাসী বস্ত্র আছে।
ডিপিডিটির নিবন্ধনবহি থেকে বস্ত্র, তাঁতজাত পণ্য ও বস্ত্রের কাঁচামাল আলাদা করে নিচের ছকে রাখা হলো। পাশে আবেদনকারীর নাম। এভাবে দেখলে বোঝা যায় কোন পণ্য কে নিবন্ধন করিয়েছে।
| রেজি. নং | পণ্য (তালিকার বানান) | আবেদনকারী | শ্রেণি | আবেদনের তারিখ |
|---|---|---|---|---|
| 1 | জামদানি শাড়ী | বিসিক | 25 | 01/09/2015 |
| 7 | রংপুরের শতরঞ্জি | বিসিক | 27 | 11/07/2019 |
| 8 | রাজশাহী সিল্ক | বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড | 25 | 24/09/2017 |
| 9 | ঢাকাই মসলিন | বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড | 24, 25 | 02/01/2018 |
| 30 | জামালপুরের নকশিকাঁথা | জেলা প্রশাসন, জামালপুর | 24, 26 | 17/07/2019 |
| 31 | টাঙ্গাইল শাড়ি | জেলা প্রশাসন, টাঙ্গাইল | 24, 25 | 06/02/2024 |
| 36 | সিরাজগঞ্জের গামছা | বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড | 24 | 06/03/2024 |
| 37 | সিলেটের মনিপুরি শাড়ি | বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড | 24, 25 | 21/06/2023 |
| 38 | মিরপুরের কাতান শাড়ি | বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড | 24, 25 | 19/02/2024 |
| 39 | ঢাকাই ফুটি কার্পাস তুলা | বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড | 22 | 02/11/2021 |
| 40 | কুমিল্লার খাদি | বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড | 24, 25 | 19/02/2024 |
| 45 | সিরাজগঞ্জের লুংগি | বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড | 24 | 06/03/2024 |
| 50 | কুমারখালীর বেডশিট | বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড | 24 | 23/05/2024 |
| 55 | ঢাকাই ফুটি কার্পাস তুলার বীজ ও গাছ | বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড | 31 | 01/12/2021 |
| 62 | কালিগঞ্জের তোয়ালে | বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড | 24 | 30/12/2024 |
উৎস: ডিপিডিটি, “নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক (জি আই) পণ্যসমূহ”, পাতার হালনাগাদ 16 জুন 2026। “আবেদনের তারিখ” কলামটি তালিকার নিজের শিরোনাম। তুলা বস্ত্র নয়, বস্ত্রের কাঁচামাল বলে রাখা হয়েছে। বিসিকের “বাংলাদেশের শীতল পাটি” (রেজি. 12, শ্রেণি 27) বোনা পণ্য হলেও বস্ত্র নয় বলে ছকে নেই।
ছকের 15টি নামের 10টির আবেদনকারী বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। জামালপুরের নকশিকাঁথা বা টাঙ্গাইল শাড়ির মতো কোনোটির নামে জেলার নাম, কোনোটিতে শহর বা উপজেলার। জনগোষ্ঠীর নাম আছে একটিতেই। জামদানি নামের সঙ্গেও কোনো জায়গার নাম নেই।
শিরোনামের দাবিটি তাই একটি শর্তে সত্য: কথাটি নিবন্ধিত তালিকার, সব আবেদনের নয়। ডিপিডিটির প্রক্রিয়াধীন আবেদনের তালিকায় (হালনাগাদ 4 নভেম্বর 2025) বান্দরবান পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকের নামে “থামি” ও “বম কাঁথা”-র আবেদন আছে। দুটি এখনো নিবন্ধিত হয়নি। বিস্তারিত নিচে, অপেক্ষমাণ তালিকার অংশে।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড আবেদন করে 21 জুন 2023। ডিপিডিটি জিআই জার্নাল নং 36 প্রকাশ করে 2 জুলাই 2024। সনদ হস্তান্তর হয় 30 এপ্রিল 2025, বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবসের অনুষ্ঠানে। আইনের ধারা 15(2) অনুযায়ী নিবন্ধন কার্যকর হয় আবেদনের তারিখ থেকে। তাই 21 জুন 2023 তারিখটি আবেদনের, আবার নিবন্ধন কার্যকর হওয়ারও।
| তারিখ | কী ঘটেছে | উৎস |
|---|---|---|
| জানুয়ারি 2023 | ঢাকার বনশ্রীতে ই-কমার্স ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (ইডিসি) “সিলেটি মণিপুরী কেন জিআই পণ্য হওয়া উচিত?” শিরোনামে আলোচনা সভা করে, শাড়ির জিআই স্বীকৃতি দাবি করে | জাগো নিউজ, 21 জানুয়ারি 2023 |
| 21 জুন 2023 | আবেদন নং জিআই-46, আবেদনকারী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড | ডিপিডিটি নিবন্ধনবহি; জিআই জার্নাল নং 36 |
| 6 জুন 2024 | জার্নালের শেষ পাতায় সরকারি মুদ্রণালয়ের ছাপার নম্বরে এই তারিখ (200 কপি) | জিআই জার্নাল নং 36, পৃ. 15 |
| 2 জুলাই 2024 | জিআই জার্নাল নং 36 প্রকাশ, আইনের ধারা 12 অনুযায়ী আবেদনের বিজ্ঞপ্তি | জার্নালের প্রচ্ছদ |
| জার্নালের পর দুই মাস | ধারা 13 অনুযায়ী যে কেউ নিবন্ধনের বিরোধিতা করে নোটিশ দিতে পারতেন; কোনো বিরোধিতা হয়েছিল কি না, প্রকাশিত নথিতে নেই | ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, 2013 |
| 30 এপ্রিল 2025 | বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস-2025-এর অনুষ্ঠানে 24টি পণ্যের নিবন্ধন সনদ হস্তান্তর; সিলেটের মণিপুরি শাড়ি 37 নম্বরে | চ্যানেল আই অনলাইন, 1 মে 2025; দৈনিক জনকণ্ঠ, 5 মে 2025 |
| 2 সেপ্টেম্বর 2026 | সংসদে শিল্পমন্ত্রী জানান, নিবন্ধিত জিআই পণ্য 64টি, তালিকায় সিলেটের মণিপুরি শাড়ি | The Business Standard, 2 সেপ্টেম্বর 2026 |
সনদ-অনুষ্ঠানের জায়গা নিয়ে দুই প্রতিবেদনে দুই রকম বর্ণনা আছে। দৈনিক জনকণ্ঠ লিখেছে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির অনুষ্ঠান, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। জাগো নিউজের 18 মে 2025-এর ফিচারে আছে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধার কথা। একই ফিচার অনুযায়ী, তাঁত বোর্ডের সদস্য (যুগ্মসচিব) দেবাশীষ নাগ উপদেষ্টার হাত থেকে সনদের প্রতীকী দলিল গ্রহণ করেন।
চ্যানেল আই অনলাইনের তালিকায় সেদিনের 24টি পণ্যের মধ্যে আরও পাঁচটি বস্ত্র-সংশ্লিষ্ট নাম আছে: সিরাজগঞ্জের গামছা, মিরপুরের কাতান শাড়ি, ঢাকাই ফুটি কার্পাস তুলা, কুমিল্লার খাদি ও সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি। একই প্রতিবেদন বলছে, সনদগুলো দেওয়া হয় বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও একটি আমচাষি সমবায় সমিতির হাতে। কোনো মণিপুরী সংগঠনের হাতে সনদ যাওয়ার উল্লেখ কোনো প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
জিআই জার্নাল নং 36 মোট 17 পাতার নথি। এতে শাড়ির মাপ, সুতার কাউন্ট ও ওজনের ছক আছে, পাঁচটি মূল বৈশিষ্ট্য, পাঁচটি জনপ্রিয় নকশা, উৎপাদন এলাকার মানচিত্র ও ইতিহাসের প্রমাণ আছে, আর শেষে 15টি ছবি। জার্নাল অনুযায়ী শাড়ির মূল চিহ্ন আঁচল, জমিন ও পাড়ে মন্দিরের (“টেম্পল”) প্রতিকৃতি।
জার্নালের স্পেসিফিকেশন ছক থেকে কয়েকটি মাপ নিচে দেওয়া হলো:
| বিষয় | জার্নালে যা লেখা |
|---|---|
| শাড়ির দৈর্ঘ্য | 5.50 মিটার; ব্লাউজসহ 6.40 মিটার |
| বহর (প্রস্থ) | 1.02 থেকে 1.19 মিটার |
| আঁচলের দৈর্ঘ্য | 0.39 থেকে 1.02 মিটার |
| টানা ও পড়েন সুতা | কটন 60–80 ইংলিশ কাউন্ট; পলিয়েস্টার 88–108 ডেনিয়ার; সিল্ক 40–50 ডেনিয়ার |
| গ্রাউন্ডের সুতা | কটন 60–120 ইংলিশ কাউন্ট (2 প্লাই); সিল্ক 20–22 ডেনিয়ার |
| সানার নম্বর | 44–100 (স্টোক পোর্ট পদ্ধতি) |
| মাকু সংখ্যা | 02 |
| অতিরিক্ত সুতা | জরি বা আর্টিফিশিয়াল সিল্ক |
| শাড়ির ওজন | 300–700 গ্রাম |
সুতার ঘরে কটন ও সিল্কের পাশে পলিয়েস্টারও আছে। অর্থাৎ সুরক্ষিত পণ্যের সংজ্ঞায় কৃত্রিম সুতার শাড়িও পড়ে। জার্নালের 14 নম্বর পাতার ছবির নিচেও লেখা আছে “পলিস্টার সুতার মণিপুরি শাড়ি বুনা হচ্ছে”।
জার্নাল শাড়ির পাঁচটি বৈশিষ্ট্য গুনিয়েছে। সংক্ষেপে: বুননশৈলী মণিপুরী সম্প্রদায়ের নিজস্ব; জমিনের চেয়ে পাড়ের রং গাঢ়, আর দুই পাড়ে মন্দিরের প্রতিকৃতি; হাতে বোনা বলে দুই পিঠে নকশা সমান, তাই শাড়ি দুই দিকেই পরা যায়; প্রধান বৈশিষ্ট্য “টেম্পল” বা “মৈরাং” পাড় আর জমিনে জাল বুনন; জাল বুননের কারণে বাতাস চলাচল করে, তাই শাড়ি আরামদায়ক।
জনপ্রিয় নকশা হিসেবে জার্নাল পাঁচটির নাম দিয়েছে: ঝাউগাছ, শিউলি ফুল, মন্দিরের নকশা, পায়রা ও শাপলা ফুল। অন্য এক জায়গায় গোলাপ ফুল, জবা ফুল ও রেখাসহ বিভিন্ন জ্যামিতিক আকৃতির কথাও আছে। 2023 সালে জাগো নিউজে রফিকুল ইসলাম জসিমও প্রায় একই ভাষায় এই পাড় ও নকশার বর্ণনা দিয়েছিলেন।
জার্নালে একটি বাক্য আছে, যা এই লেখার মূল প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। “সিলেটের মণিপুরি শাড়ি ও ড্রেস” অংশে বলা হয়েছে: “মণিপুরিদের উৎপাদিত তাঁত পণ্যের মধ্যে আরও রয়েছে ফানেক, শাল, ওড়না, থ্রি পিস, গামছা, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, বিছানার চাদর ইত্যাদি।” অর্থাৎ যে নথিতে শাড়িকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, সেই নথিতেই ফানেকের নাম “আরও রয়েছে” তালিকায়।
জার্নালের মানচিত্র ও বিবরণে উৎপাদন এলাকা বৃহত্তর সিলেট, যার মধ্যে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জও আছে। সবচেয়ে বেশি উৎপাদনের জায়গা হিসেবে জার্নাল নাম দিয়েছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার। তবু লেখক ও গবেষক মো. আব্দুস সামাদ 2025 সালে লিখেছেন, জিআই নথিতে মৌলভীবাজারের নাম বাদ পড়েছে, আর এটি সংশোধন হওয়া দরকার।
জার্নালের “উৎপাদকের ভৌগোলিক এলাকা” অংশে বলা হয়েছে, বৃহত্তর সিলেটের সিলেট সদর, কোম্পানীগঞ্জ, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, বড়লেখা, কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও জুড়ী আর সুনামগঞ্জের ছাতকে মণিপুরী সম্প্রদায়ের বসবাস। জার্নাল এলাকাগুলোকে দুই ভাগে দেখিয়েছে:
দৈনিক জনকণ্ঠের 5 মে 2025-এর প্রতিবেদনে আব্দুস সামাদ বলেছেন, শাড়ি মূলত মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে বেশি তৈরি হয়। তাঁর ভাষায়, “বাংলাদেশ সরকারের পেটেন্ট, শিল্প নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদফতরের পত্রে সিলেটকে GI তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে মৌলভীবাজারকে বাদ দেওয়া হয়েছে।” 9 মে 2025-এর নিজের লেখায় তিনি দাবি করেছেন, মৌলভীবাজারকে যেন জিআই নথিতে “উৎসভূমি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে” অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ফলে দুই রকম পাঠ পাওয়া যায়। জার্নালের ভেতরের বিবরণে মৌলভীবাজার ও কমলগঞ্জ স্পষ্টভাবে আছে। অথচ পণ্যের নামে আছে শুধু “সিলেট”, আর সামাদ যে পত্রের কথা বলেছেন, সেখানে মৌলভীবাজার বাদ। ওই পত্রটি প্রকাশিত অবস্থায় পাওয়া যায়নি।
জনসংখ্যার হিসাবও কমলগঞ্জ-মৌলভীবাজারের দিকেই ইঙ্গিত করে। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি ভুক্তিতে 1991 সালের আদমশুমারির বরাতে বাংলাদেশে প্রায় 25,000 মণিপুরীর কথা আছে: মৌলভীবাজারে প্রায় 13,000, সিলেটে 7,000, হবিগঞ্জে 4,000। বিবিএসের জনশুমারি 2022-এর জাতীয় প্রতিবেদনে “Monipuri” সারিতে মোট 22,979 জন (পুরুষ 10,718, নারী 12,261)। এর মধ্যে 22,150 জন সিলেট বিভাগে। শুমারির জেলাভিত্তিক হিসাব আছে আমাদের জনশুমারি 2022-এর জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক লেখায়।
জিআই জার্নাল শাড়ির ব্যবহারকাল ধরেছে 1919 সাল থেকে। মো. আব্দুস সামাদের মতে শাড়ির জন্ম 1980-এর দশকের শেষ থেকে 1990-এর দশকের গোড়ায়। রফিকুল ইসলাম জসিম লিখেছেন, উৎপাদন শুরু নব্বইয়ের দশকে। কমলগঞ্জের এক সমাজনেতার মতে 1980-এর দশক থেকে এক মণিপুরী তাঁতি শাড়িটিকে জনপ্রিয় করেন।
জার্নালের “ঐতিহাসিক দলিল” অংশে দুটি প্রমাণ দেওয়া হয়েছে। প্রথমটি 6 আগস্ট 2019-এ প্রথম আলোয় প্রকাশিত কুঞ্জ থাঙের প্রবন্ধ “মণিপুরী শিল্প-সংস্কৃতির প্রসার এবং রবীন্দ্রনাথ”। সেখানে বলা হয়েছে, 1919 সালের 5 নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ সিলেটে আসেন। যে বাংলোয় তিনি উঠেছিলেন, তার দরজা-জানালার পর্দাগুলো ছিল মণিপুরী কোমরতাঁতের তৈরি। বহির্দ্বারে টাঙানো ছিল মণিপুরীদের তৈরি “প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরনো একখানা আচ্ছাদন বস্ত্র”। দ্বিতীয় প্রমাণ মহারাজ বীরেন্দ্রকিশোরকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠি, তারিখ 19 মাঘ 1326। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, শান্তিনিকেতনের মেয়েদের তাঁতের কাজ শেখাতে আসাম থেকে একজন শিক্ষয়িত্রী এসেছেন, “কিন্তু শিলেটে (সিলেট) আমি মণিপুরি মেয়েদের যে কাজ দেখিয়াছি তাহা ইহার চেয়ে ভালো।”
এই দুই প্রমাণের পর জার্নালের সিদ্ধান্ত: “কাজেই সিলেটের মণিপুরি শাড়ির ব্যবহার কাল ১৯১৯ সাল বিবেচনা করা যেতে পারে।” তবে উদ্ধৃত দুই প্রমাণের কোনোটিতেই “শাড়ি” শব্দ নেই। প্রথমটিতে আছে পর্দা ও আচ্ছাদন বস্ত্র, দ্বিতীয়টিতে তাঁতের কাজ। রবীন্দ্রনাথের 1919 সালে সিলেট সফর আর মণিপুরী নৃত্য দেখার কথা বাংলাপিডিয়ার মণিপুরী ভুক্তিতেও আছে।
দৈনিক জনকণ্ঠে 9 মে 2025-এর লেখায় মো. আব্দুস সামাদ লিখেছেন, “‘মণিপুরি শাড়ি’ নামে যে বস্ত্র সাম্প্রতিক কালে পরিচিতি পেয়েছে, তা মণিপুরিদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক নয়, বরং এটি একটি নতুন উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিক অভিযাত্রার ফল।” তাঁর হিসাবে 1980-এর দশকের শেষ ও 1990-এর দশকের গোড়ায় বাংলাদেশের মণিপুরী তাঁতিরা বাজারের চাহিদা মাথায় রেখে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ওড়নার নকশা, রং ও বুননশৈলী অনুসরণ করে শাড়ি বোনা শুরু করেন। তাঁর মতে মণিপুরী সমাজে “শাড়ি” নামে কোনো পোশাক প্রচলিত ছিল না, ছিল ফানেক, চাদর, ওড়না।
জাগো নিউজে 21 জানুয়ারি 2023-এ রফিকুল ইসলাম জসিম লিখেছেন, ফিতুপের উন্নত সংস্করণ মৈরাংফি, যা কারুকার্যখচিত ওড়না। তাঁর ভাষায়, “মণিপুরী শাড়ি এ মৈরাংফিরই ইম্প্রোভাইজড সংস্করণ। যার উৎপাদন শুরু হয় নব্বই দশকে মূলত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই।”
The Business Standard-এ 4 এপ্রিল 2023-এ Promila Kanya-র প্রতিবেদনে কমলগঞ্জের Bhanubil Majhergaon-এর সমাজনেতা Niranjan Singha Raju-র বক্তব্য আছে। তাঁর মতে সেখানে মণিপুরীরা 350 থেকে 400 বছর ধরে আছেন, তুলা চাষ করে সুতা কেটে নিজেদের কাপড় বুনতেন। আর তাঁতি Radhabati Devi 1980-এর দশক থেকে মণিপুরী শাড়িকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
উৎসগুলো একটি বিষয়ে মেলে: শাড়ির উৎস ওড়না-জাতীয় কাপড়। জার্নাল বলছে “ইন্নাফ”, সামাদ বলছেন “ঐতিহ্যবাহী ওড়না”, জসিম বলছেন “মৈরাংফি”। জসিম মৈরাংফিকেও ওড়না বলেছেন। অমিল কেবল সময় নিয়ে: জার্নালের 1919, নাকি মণিপুরী লেখকদের 1980–90-এর দশক।
ফানেক মণিপুরী নারীদের নিচের অংশের পোশাক, লুঙ্গির মতো প্যাঁচ দিয়ে পরা হয়। সঙ্গে থাকে ব্লাউজ-জাতীয় ফুরিত আর ওড়না-জাতীয় ফিদুপ বা ইনাফি। বাংলাপিডিয়ার “পোশাক” ভুক্তিতে মণিপুরী নারীর যে পোশাকের তালিকা আছে, তাতে শাড়ির নাম নেই। জিআই জার্নালও ফানেককে মণিপুরীদের অন্য তাঁতপণ্যের তালিকায় রেখেছে।
বাংলাপিডিয়ার (পারভীন আহমেদ ও জিনাত মাহরুখ বানু) বর্ণনায় সাধারণ ফানেকে খুব একটা নকশা থাকে না। মেয়েরা ঘরে বা হাটে-বাজারে যাওয়ার সময় এটি পরেন। আরেকটি কারুকাজময় পোশাক লাইফানেক, যার জমিন সরু দুই রঙে ডোরাকাটা, পাড়ে নকশা। আগে এই নকশা সুতা দিয়ে হাতে তোলা হতো, এখন মেশিনে। ইংরেজি ভুক্তিতে লাইফানেক সম্পর্কে আরও লেখা আছে, “This dress is generally brought from Assam”। বিয়ে ও নৃত্যে পরা হয় পলই, যার চওড়া পাড়ে জরি ও চুমকির কাজ।
ওড়নার নাম নিয়ে উৎসভেদে বানান আলাদা। বাংলাপিডিয়ায় ফিফুপ ও ফিদুপ দুটোই আছে। জসিম লিখেছেন ফিতুপ ও ইনাফি। জিআই জার্নালে আছে “ইন্নাফ” ও “ইন্নাপি”, দৈনিক জনকণ্ঠে “ইন্নাফি”। The Business Standard লিখেছে “inafi”, আর ব্যাখ্যা দিয়েছে হালকা ওড়নার মতো চাদর, যা মণিপুরী নারীর পোশাকের অংশ।
আমাদের আর্কাইভে সাজ্জাদুল হক স্বপনের লেখা “বাংলাদেশের মণিপুরী মুসলিম” আছে। সেখানে পাঙাল নারীদের ফানেকের সবচেয়ে বিস্তারিত তালিকা পাওয়া যায়। তাঁর বর্ণনায় নারীরা “নিজস্ব কোমর তাঁতে তৈরী ‘ফানেক’” পরেন, যা কোমর পর্যন্ত প্যাঁচানো। ফানেকের রকম হিসেবে তিনি লিখেছেন লাই, সালু, হাংগামপাল, সোনারং, চুমহাপ্পা, মকং। বিবাহিত নারীদের জন্য লৈফানেক আরলবা, লৈফানেক মায়াইরনবি, সালু ফানেক আরনবা, লৈচিল ফানেক, উরেং আরনবা, উরেং চুমহাপ্পা, লৈচিল উরেং। শেষেরগুলো বুক পর্যন্ত প্যাঁচানো বিভিন্ন রং ও নকশার কাপড়। সঙ্গে থাকে ইন্নাফি বা খুদাই (ওড়না)।
এই তালিকা পাঙাল সমাজের। মৈতৈ বা বিষ্ণুপ্রিয়া সমাজে একই নামগুলো চলে কি না, লেখাটিতে বলা নেই। দুই সমাজের পার্থক্য নিয়ে আমাদের আলাদা লেখা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ও মৈতৈ মণিপুরী: পার্থক্যটা আসলে কোথায়। সেখানে দেখা যায়, সরকারি তালিকা আর জনশুমারিতে দুই সমাজ মিলে একটিই নাম, “মণিপুরী”। জিআই নথির শিরোনামেও তাই।
জার্নাল দুটি বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছে, যার দুটিতেই ফানেকের কথা আছে। এ কে শেরামের “বাংলাদেশের মণিপুরী: ত্রয়ী সংস্কৃতির ত্রিবেণী সঙ্গমে” (2006) থেকে উদ্ধৃতি: “মণিপুরী মেয়েরা নিজেদের পড়নের কাপড় ‘ফানেক’, ওড়না জাতীয় কাপড় ‘ইন্নাপি’ এবং গামছা জাতীয় নিত্য ব্যবহার্য কাপড় চোপড় নিজেরাই দেশী তাঁত ‘য়োংখাম’ বা ‘পাংয়োং’ এ বানিয়ে থাকেন।” একই উদ্ধৃতিতে আছে, বিছানার চাদর, খেস, শাড়ি, টেবিল ক্লথ, সাইড ব্যাগ ইত্যাদি “বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে” তৈরি ও বাজারজাত হচ্ছে। অর্থাৎ শেরামের উদ্ধৃতিতে ফানেক নিজের পরার কাপড়, আর শাড়ি বাণিজ্যিক পণ্যের তালিকায়।
দ্বিতীয় বই শাওন আকন্দের “বাংলাদেশের তাঁত শিল্প” (2018)। জার্নালের উদ্ধৃতি অনুযায়ী মণিপুরী নারীরা উৎসবে পরেন চাকছাবি বা লেইফানেক এবং ইনাফি। চাকছাবি বা লেইফানেক থামির মতো শরীরের নিচের অংশে পরা হয়। জমিনে উজ্জ্বল রং, লাল ও গোলাপির আধিক্য, চেক নকশা। চাকছাবির পাড়ে হাতে করা ভারী নকশা থাকে। মূল নকশাটির নাম “গিল্টা”, যা ডিম্বাকার, ভেতরে লতাজাতীয় নকশা। পাড়ের প্রান্তে থাকে “কানি”, সাধারণত বরফি ধরনের। গিল্টার পাশে থাকে জ্যামিতিক অর্ধত্রিভুজাকার “তংকাপ”।
জিআই জার্নালে ফানেকের নকশার নাম আছে, শাড়ির উৎস হিসেবে ইন্নাফের কথা আছে। কিন্তু নিবন্ধিত পণ্য একটিই, শাড়ি।
ফানেকের জন্য কেউ জিআই আবেদন করেছেন, এমন কোনো নথি ডিপিডিটির প্রকাশিত তালিকায় নেই। নিবন্ধিত 64টি পণ্যে ফানেক নেই, প্রক্রিয়াধীন আবেদনের তালিকাতেও নেই। কেন আবেদন হয়নি, তার ব্যাখ্যা কোনো প্রকাশিত উৎসে পাওয়া যায়নি। আইন অনুযায়ী উৎপাদনকারীদের সমিতি বা সংগঠন নিজেরাই আবেদন করতে পারে।
ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, 2013-এর ধারা 9 অনুযায়ী আবেদন করতে পারেন উৎপাদনকারী ব্যক্তিবর্গ বা তাঁদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী সমিতি, সংগঠন, সরকারি সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ। শাড়ির ক্ষেত্রে আবেদন করেছে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। জার্নালের ঘ নম্বর অনুচ্ছেদে আবেদনকারী জানিয়েছে, “উৎপাদনকারীগণের তালিকা প্রদান করা হয়েছে। পরবর্তীতে তালিকায় আরও উৎপাদনকারীর নাম সংযোজিত হতে পারে।” তালিকাটি জার্নালে ছাপা হয়নি।
আইনের ধারা 2(9) অনুযায়ী জিআই পণ্য হলো কোনো দেশ, অঞ্চল বা এলাকায় জাত বা প্রস্তুত এমন পণ্য, যার বিশেষ গুণাগুণ, সুনাম বা অনন্য বৈশিষ্ট্য মূলত তার ভৌগোলিক উৎপত্তিস্থলের সঙ্গে যুক্ত। সংজ্ঞায় এলাকা আর পণ্যের কথা আছে, কোনো জনগোষ্ঠীর নাম নেই। “সিলেটের মনিপুরি শাড়ি” নামে জনগোষ্ঠী এসেছে পণ্যের নাম হিসেবে।
শাড়ির সনদ কি ফানেককেও ঢেকে দেয়? প্রকাশিত নথির ভাষায় তেমন কিছু নেই। পণ্যের নাম “সিলেটের মণিপুরি শাড়ি”, প্রকার “সিলেটের মণিপুরি শাড়ি ও টেক্সটাইল ফেব্রিক্স (24 ও 25)”। “টেক্সটাইল ফেব্রিক্স” শব্দবন্ধে ফানেকের কাপড় পড়ে কি না, তা জার্নাল বা আইনে ব্যাখ্যা করা নেই। এই প্রশ্ন নিচের “যা এখনো জানা যায়নি” অংশে রাখা হলো।
সীমান্তের ওপারে ছবিটা আলাদা। মণিপুর রাজ্যে যে কাপড়ের নকশা জিআই পেয়েছে, সেই মৈরাংফির পাড় ফানেকেও বোনা হয় (পরের অংশ দেখুন)। বাংলাদেশে সুরক্ষা পেয়েছে শাড়ি নামের পণ্যটি, আর ভারতে কাপড়ের একটি নকশা, যা ফানেক ও শাড়ি দুটোতেই ব্যবহৃত হয়।
ভারতের জিআই রেজিস্ট্রির আবেদন নম্বর 373 “Moirang Pheejin”। আবেদনকারী মণিপুর সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প বিভাগ, আবেদনের তারিখ 19 ডিসেম্বর 2011, শ্রেণি 25, পণ্য “Handicraft”। সনদ নম্বর 213, সনদের তারিখ 31 মার্চ 2014। অর্থাৎ বাংলাদেশে মণিপুরী শাড়ির সনদের প্রায় 11 বছর আগে মণিপুরে মৈরাংফির নকশা জিআই পেয়েছে।
রেজিস্ট্রির পাতায় আরও আছে: জার্নাল নম্বর 55, প্রকাশ 29 নভেম্বর 2013; নিবন্ধন বৈধ 18 ডিসেম্বর 2021 পর্যন্ত, আর নথির তালিকায় 15 ফেব্রুয়ারি 2021 তারিখের একটি নবায়ন-সংক্রান্ত দলিল। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে মৈরাংফি “registered” হয়েছে 19 ডিসেম্বর 2011। রেজিস্ট্রির পাতায় ওই তারিখটি আবেদনের, সনদের নয়।
উইকিপিডিয়া (ভারতের জিআই জার্নালের বরাতে) বলছে, মৈরাংফি সুতি বা রেশমের কাপড়, যার দুই লম্বা প্রান্ত বরাবর “MoirangPheejin” নকশা বোনা হয়। মূলত মৈরাং গ্রামে তৈরি হতো, এখন পুরো মণিপুরে। ব্যবহার হয় শাড়ি, স্টোল, সারং, স্কুল ইউনিফর্ম, লুঙ্গি, স্কার্ট ও হাফ-শাড়িতে। সাহাপিডিয়ায় Sainico Ningthoujam লিখেছেন, মৈরাংফি একটি “দাঁত”-আকৃতির পাড়ের নকশা (yairongphee), যা “pumngou phanek”-এর ওপর-নিচে থাকে।
পাড়ের ত্রিভুজাকার নকশাটির অর্থ নিয়ে দুই দেশের উৎসে দুই রকম ব্যাখ্যা আছে। বাংলাদেশের জিআই জার্নাল এটিকে বলেছে মন্দির বা “টেম্পল”-এর প্রতিকৃতি। জাগো নিউজে জসিম আরও নির্দিষ্ট করে লিখেছেন, মন্দির-নকশাটি মৈরাংয়ের প্রাচীন থাংজিং মন্দিরের অনুকরণ। উইকিপিডিয়া ও সাহাপিডিয়া বলছে, নকশাটি মণিপুরি পুরাণের সর্পদেবতা পাখাংবার (Pakhangba) সরু, সূচালো দাঁতের প্রতীক।
জসিমের 2023-এর লেখা অনুযায়ী দেখতে প্রায় একই হলেও দুই দেশের শাড়ির বুননে অনেক পার্থক্য আছে। তাঁর মতে ভারতের জিআই পাওয়া মৈরাংফি খাঁটি সুতি ও রেশম সুতায় তৈরি। সিলেটের শাড়ির সুতা আসে নরসিংদী থেকে, আর তা মিশ্র সুতা। বাংলাদেশে মণিপুরীদের পাশাপাশি বাঙালিরাও এই তাঁতশিল্পে যুক্ত হয়েছেন। সুতি সুতার চেয়ে টেট্রন সুতার শাড়ি বেশি তৈরি হয়, কারণ সেটি সস্তা ও টেকসই।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আরেকটি আদিবাসী বস্ত্র, রিসা, কীভাবে জিআই পেয়েছে, তা আছে আমাদের রিনাই, রিসা ও কুবাই লেখায়।
জিআই জার্নাল অনুযায়ী মণিপুরীদের প্রধান তাঁত দুটি, কোমরে বাঁধা তাঁত আর ফ্রেম তাঁত। শাড়ি বোনেন দুজন তাঁতি, দুই দিকে বসে। জার্নালের হিসাবে মণিপুরী সম্প্রদায়ের 85 শতাংশ নারী তাঁতশিল্পে জড়িত। জাগো নিউজে জসিমের হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় 90 শতাংশ। একটি সাধারণ শাড়ি বুনতে কত দিন লাগে, তা নিয়ে জার্নালের দুই পাতায় দুই রকম সংখ্যা আছে।
জার্নালের 7 নম্বর পাতায় লেখা, দুজন তাঁতি মিলে একটি শাড়ি বোনেন 4 থেকে 5 দিনে, ভারী বা ঘন কাজের শাড়িতে 7 থেকে 10 দিন। 11 নম্বর পাতায় লেখা, নরমাল রঙের শাড়িতে 5 থেকে 6 দিন, আর নকশাভেদে 15 থেকে 30 দিন পর্যন্ত। The Business Standard-এ কমলগঞ্জের এক তাঁতির (প্রতিবেদনে Manthai Devi) হিসাব, 13 হাতের (ছয় গজের কিছু বেশি) শাড়িতে এক সপ্তাহ লাগে, আর একটি ইনাফিতে নকশাভেদে তিন-চার দিন।
শাওন আকন্দের বই থেকে জার্নালের উদ্ধৃতি অনুযায়ী কোমর তাঁত মণিপুরী সম্প্রদায়ের আদি তাঁত। পাশাপাশি অনেক দিন ধরে ফ্রেম তাঁতে বোনাও চলছে, যা হুইল ছাড়া ও হুইলযুক্ত দুই রকমের। কমলগঞ্জে কাঠের এবং শ্রীমঙ্গলে কাঠ ও লোহা দুই উপকরণের ফ্রেম তাঁত চলে। দুই সমাজে তাঁতের নামও আলাদা। বিষ্ণুপ্রিয়ারা কোমর তাঁতকে বলেন “আতর তাঁত” (আত = হাত), ফ্রেম তাঁতকে “চীনা তাঁত”। মৈতৈরা কোমর তাঁতকে বলেন “জংঘম”, আর ফ্রেম তাঁতকে “ইয়ং” বা “পাইজং”।
জার্নাল আরও লিখেছে, মণিপুরী ভাষায় তাঁতকে বলে “ইয়োং”, যা দুই রকম। “মোয়াং” তাঁতে মোটা সুতার কাপড় হয়, “পাং” তাঁতে চিকন সুতার। এ কে শেরামের উদ্ধৃতিতে নাম দুটি “য়োংখাম” ও “পাংয়োং”। জার্নালে বর্তমান তাঁতের চার রকম ধরন গোনা হয়েছে: ঝুলন্ত তাঁত, ফ্রেম তাঁত, পিট তাঁত ও কোমর তাঁত।
তাঁতযন্ত্রের অংশের যে 18টি নাম জার্নালে ছাপা আছে, সেগুলো হলো: বেঙ, চিনা, যতর, নাতু, উটং, নেশি, তেরেং, নানতুম, নানচাক, সেন্নাম, খুত, কন্নাপা, সেঁতু, ডাকাশুক, খরমেত, মেম, সিনত ও পালং। নামগুলো কোন ভাষার, বিষ্ণুপ্রিয়া না মৈতৈ, জার্নালে বলা নেই।
জার্নাল অনুযায়ী শাড়ি বোনার ধাপগুলো এমন:
জার্নাল বলছে, সুতায় মাড় দিয়ে রোদে শুকানো হয়, তারপর চরকায় ঘুরিয়ে মসৃণ ও চিকন করে তাঁতে বসানো হয়। কখনো তাঁতিরা বাজার থেকে রঙিন সুতা কেনেন, কখনো নিজেরাই রং করেন। জার্নাল অনুযায়ী 1990-এর দশক পর্যন্ত সুতি সুতায় ফুল-ফলের প্রাকৃতিক রং ব্যবহার হতো। The Business Standard-এ Niranjan Singha Raju-র বক্তব্যও একই রকম: আগে প্রাকৃতিক রং ছিল, এখন কেবল রাসায়নিক রং।
Niranjan Singha Raju-র হিসাবে কমলগঞ্জের Bhanubil Majhergaon এলাকায় প্রায় 14টি মৈতৈ মণিপুরী গ্রাম আর 8 থেকে 10টি মুসলিম মণিপুরী গ্রাম আছে। এসব গ্রামে প্রায় 5,000 তাঁত, অর্থাৎ আনুমানিক 10,000 তাঁতি, কারণ একটি শাড়িতে দুজন লাগে। সেখানে কিছু বাঙালি মুসলিম তাঁতিও আছেন, আর তাঁতিরা সবাই নারী। দ্য ডেইলি স্টারের 2021 সালের প্রতিবেদনে সংখ্যাটি ভিন্ন: সিলেট বিভাগে প্রায় 3,000 মণিপুরী তাঁতি, যাঁদের 1,274 জনকে তাঁত বোর্ড তখন পর্যন্ত মোট 1.70 কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী এই কমপ্লেক্সে তখন প্রায় 16 জন তাঁতি প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন, মেয়াদ তিন থেকে চার মাস। কমপ্লেক্সটি উদ্বোধন করেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব Shashi Kumar Singha, 2014 সালে। তাঁর ভাষায় প্রশিক্ষণের লক্ষ্য মান নিয়ন্ত্রণ।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে 2017 সালে একটি মণিপুরী শাড়ির দাম ছিল 3,500 থেকে 6,500 টাকা। 2025 সালে আদমপুর বাজারের Manipuri Cultural Academy-র এক কর্মী নকশা ও মানভেদে 5,000 থেকে 20,000 টাকার কথা বলেছেন। সনদ পাওয়ার এক মাস আগে, মার্চ 2025-এ, একই পত্রিকা লিখেছে বাজার নকল মণিপুরী শাড়িতে ভরে যাচ্ছে।
| বছর | দাম বা আয় | কে বলেছেন / উৎস |
|---|---|---|
| 2017 | শাড়ি 3,500–6,500 টাকা; ওড়না 850–1,800; গামছা 850–1,700; শাল 1,100–2,000 | সিলেটের তাঁতিরা; দ্য ডেইলি স্টার, 5 জুন 2017 |
| 2018 | শাড়ি 4,000–6,500 টাকা; ব্যাগ 650–1,000 | ব্যবসায়ীরা; দ্য ডেইলি স্টার, 13 জুন 2018 |
| 2023 | মহাজনের কাছ থেকে তাঁতি পান প্রতি কাপড়ে প্রায় 2,000–3,000 টাকা; সুতা কেজিপ্রতি 400–450 টাকা | কমলগঞ্জের এক তাঁতি (Manthai Devi); The Business Standard, 4 এপ্রিল 2023 |
| 2023 | একটি শাড়িতে তাঁতির সর্বনিম্ন খরচ 1,200–1,250 টাকা; 5,000–6,000 টাকার শাড়ি ঢাকায় বিক্রি হয় 10,000–12,000 টাকায় | সমাজনেতা Niranjan Singha Raju; The Business Standard |
| 2023 | মাসে প্রায় 10,000 টাকা, অর্থাৎ প্রায় ছয়টি শাড়ি | কালচারাল কমপ্লেক্সের এক তাঁতি; The Business Standard |
| 2025 | শাড়ি 5,000–20,000 টাকা; তাঁতির মাসিক আয় সাধারণত 10,000–12,000 টাকা | দ্য ডেইলি স্টার, 28 মার্চ 2025 |
সুতা কোথা থেকে আসে, তা নিয়েও উৎসগুলো আলাদা কথা বলে। জসিমের 2023 সালের লেখায় সুতা আসে নরসিংদী থেকে। একই বছর The Business Standard-এ কমলগঞ্জের ওই তাঁতি বলেছেন, সুতা সাধারণত ভারত ও চীন থেকে আমদানি করা। 2025 সালে দ্য ডেইলি স্টারে পাইকারি প্রতিষ্ঠান Inafi Manipuri Handicraft-এর এক সহ-পরিচালক বলেছেন, চীন থেকে আমদানি করা সুতা ও রঙের ওপর নির্ভরতা উৎপাদনে বাধা তৈরি করছে।
মার্চ 2025-এর একই প্রতিবেদন অনুযায়ী কমলগঞ্জে মণিপুরীরা প্রায় 15টি গ্রামে থাকেন। কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও সিলেট শহর মিলিয়ে তাঁদের সংখ্যা প্রায় 15,000। Manipuri Cultural Academy-র সাবেক সদস্যসচিব Rabi Singha Rajesh-এর হিসাবে মূলধনের অভাবে সম্প্রদায়ের 10 থেকে 20 শতাংশ এই পেশা ছেড়েছেন। এক শিক্ষার্থীর (Shantona Singha) স্মৃতিতে, নব্বইয়ের দশকের শেষে দক্ষ কারিগরেরা আগ্রহ হারাতে শুরু করেন, আর 2000-এর দশকের শুরুতে শাড়ির চাহিদা বাড়ায় শিল্পটি আবার দাঁড়ায়।
কোভিডের সময় অবস্থা কঠিন ছিল। আগস্ট 2021-এ দ্য ডেইলি স্টার জানায়, টানা চারটি ঈদে ভালো বিক্রি হয়নি। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড কমলগঞ্জে মণিপুরী তাঁতিদের ঋণের সুদ 10 থেকে কমিয়ে 5 শতাংশ করে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী সিলেট শহরে মণিপুরী পণ্যের 100-র বেশি পাইকারি দোকান আছে, সবচেয়ে বড় বাজার বন্দরবাজারে।
দাম আর তাঁতির হাতে যাওয়া টাকার ব্যবধান পার্বত্য চট্টগ্রামের কোমরতাঁতেও আছে। আমাদের পিনন হাদির দাম কত, আর তাঁতির ঘরে কত যায় লেখায় রাঙামাটির তাঁতিদের হিসাব আছে।
জিআই সনদ সরাসরি কোনো তাঁতির নামে নয়। নিবন্ধনের স্বত্বাধিকারী আবেদনকারী সংস্থা, এখানে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। আইনের ধারা 10 অনুযায়ী কোনো তাঁতি বা উৎপাদনকারী আলাদা আবেদন করে “অনুমোদিত ব্যবহারকারী” হতে পারেন। ধারা 16(2) অনুযায়ী এই নিবন্ধন 5 বছরের জন্য বৈধ। ডিপিডিটির ওয়েবসাইটে এখন পর্যন্ত অনুমোদিত ব্যবহারকারীর যে দুটি জার্নাল প্রকাশিত, দুটিই জামদানির।
দুটি জার্নালেরই প্রকাশের সিল 18 অক্টোবর 2017। প্রথমটি ফেব্রুয়ারি 2017-এর, দ্বিতীয়টি মে 2017-এর। দ্বিতীয়টিতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের আবেদনকারীদের নাম, ঠিকানা ও আবেদনের তারিখ ছাপা আছে, যেমন 15 ফেব্রুয়ারি 2017-এ আবেদন করা দুজন। সিলেটের মণিপুরি শাড়ির জন্য এমন কোনো তালিকা ডিপিডিটির জার্নাল পাতায় নেই। পাতাটির শেষ হালনাগাদ 23 আগস্ট 2026।
আইনের আরও কয়েকটি ধারা এখানে প্রাসঙ্গিক:
সনদ পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়াগুলো আশার কথাই বলেছে। দৈনিক জনকণ্ঠে কমলগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর বলেছেন, তাঁতিরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, আর দ্রুত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হবে। জাগো নিউজে তাঁত বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জিআই ট্যাগের ফলে মান নিয়ন্ত্রণ, নকল প্রতিরোধ ও প্রামাণিক উৎপাদন নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই লেখায় গবেষকদের বরাতে সতর্কবাণীও আছে: সরকার ও স্থানীয় সংগঠনের যৌথ মাননিয়ন্ত্রণ কাঠামো না থাকলে জিআই “কেবল একটি সনদ হয়েই থাকবে”।
মণিপুরী ললিতকলা একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা প্রবাস কুমার সিনহা জাগো নিউজকে বলেছেন, শাড়িটির পেছনে “মেইতেই, পাঙাল ও বিষ্ণুপ্রিয়া সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন” আছে। এ কে শেরামের মতে জিআই ট্যাগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষা ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। অন্যদিকে আব্দুস সামাদ স্বীকৃতিকে ইতিবাচক বলেও এর ভৌগোলিক নাম নিয়ে আপত্তি তুলেছেন।
ডিপিডিটির প্রক্রিয়াধীন আবেদনের তালিকায় (হালনাগাদ 4 নভেম্বর 2025) বান্দরবান পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকের চারটি আবেদন আছে। এর দুটি বস্ত্র: “থামি” (জিআই 77, 17 এপ্রিল 2024) আর “বম কাঁথা” (জিআই 82, 9 মে 2024)। এগুলো নিবন্ধিত হলে নিবন্ধিত তালিকায় আদিবাসী বস্ত্র আর একটি থাকবে না।
| আবেদন নং | পণ্য | আবেদনকারী | উৎপাদন অঞ্চল | আবেদনের তারিখ |
|---|---|---|---|---|
| জি আই 77 | থামি | জেলা প্রশাসক, বান্দরবান পার্বত্য জেলা | বান্দরবান পার্বত্য জেলা | 17.04.2024 |
| জি আই 78 | মুরুংবাঁশি | জেলা প্রশাসক, বান্দরবান পার্বত্য জেলা | বান্দরবান পার্বত্য জেলা | 17.04.2024 |
| জি আই 81 | কালো বিন্নি চাল | জেলা প্রশাসক, বান্দরবান পার্বত্য জেলা | বান্দরবান পার্বত্য জেলা | 09.05.2024 |
| জি আই 82 | বম কাঁথা | জেলা প্রশাসক, বান্দরবান পার্বত্য জেলা | বান্দরবান পার্বত্য জেলা | 09.05.2024 |
উৎস: ডিপিডিটি, “প্রক্রিয়াধীন জি আই আবেদনসমূহ”, হালনাগাদ 4 নভেম্বর 2025। নাম ও বানান তালিকার মতো।
এই আবেদনগুলোর জার্নাল এখনো প্রকাশিত হয়নি। 23 আগস্ট 2026-এ হালনাগাদ হওয়া জিআই জার্নাল পাতায় সর্বশেষ জার্নাল নং 68, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোপালভোগ আমের। সেখানে থামি বা বম কাঁথার কোনো জার্নাল নেই। তাই মণিপুরী শাড়ির জার্নালের মতো এগুলোর স্পেসিফিকেশন বা ইতিহাসের প্রমাণ কী দেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশিত হয়নি।
দুটি আবেদনের আবেদনকারীও মণিপুরী শাড়ির মতোই সরকারি দপ্তর, এখানে জেলা প্রশাসন। “থামি” নামটি কোন জনগোষ্ঠীর পোশাক বোঝাচ্ছে, তালিকায় বলা নেই। মারমা নারীর থামি নিয়ে আমাদের লেখা থামি আর আঙ্গি: মারমা নারীরা কোন তাঁতে কী বোনেন-এ আছে, বাজারে “থামি” নামটি কীভাবে চাকমা ও ত্রিপুরা তাঁতিদের বোনা কাপড়েও ব্যবহৃত হয়। আর রাঙামাটি বা খাগড়াছড়ির পিনন-হাদির জন্য কোনো আবেদন তালিকায় নেই। পাহাড়ের কোমরতাঁত নিয়ে আমাদের মূল লেখা পিনন হাদি ও বেইন: পাহাড়ি কোমর-তাঁতের পূর্ণ পাঠ। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সব লেখা একসঙ্গে আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
প্রক্রিয়াধীন তালিকা নিয়ে একটি সতর্কতা। সেখানে জয়পুরহাটের লতিরাজ কচু (জিআই-12) আর মানিকগঞ্জের হাজারী গুড় (জিআই 62) এখনো আছে, অথচ দুটিই 16 জুন 2026-এর নিবন্ধিত তালিকায় 63 ও 64 নম্বরে উঠে গেছে। অর্থাৎ প্রক্রিয়াধীন পাতাটি নিবন্ধিত পাতার মতো হালনাগাদ নয়। থামি বা বম কাঁথার অবস্থা 4 নভেম্বর 2025-এর পর বদলেছে কি না, এই তালিকা দেখে বলা যায় না। তবে 16 জুন 2026-এর নিবন্ধিত তালিকায় দুটির কোনোটিই নেই।
সরকারি heritagehub.gov.bd সাইটে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকা “Pilot Inventory 1”-এর একটি নথি আছে, ক্রমিক P1-D3-006। নাম “Bar Silkorani- The Costume Making Traditions of Manipuri Master-weavers”। এটি মণিপুরী রাস ও উৎসবের পোশাক তৈরির ঐতিহ্য, জিআই নয়। নথিটি জমা দিয়েছে ঢাকার সংগঠন Shadhona – A Center for Advancement of South Asian Culture।
নথি অনুযায়ী মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া দুই সমাজই প্রতিটি আচার, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রাসের জন্য আলাদা পোশাক তৈরি করে। এগুলোর নকশা করেন রাস-ওস্তাদ মাস্টার তাঁতিরা। মহারাসলীলার মতো উৎসবে “Bar Silkorani” নামের এক অনুষ্ঠানে পোশাকগুলো শিল্পীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। নারীদের পোশাকের নাম হিসেবে নথিতে আছে lahing, pollei, chaksabi, aahing, udni, gunja। পুরুষদের জন্য khabal, ধুতি, ময়ূরপুচ্ছ, gunja, টুপি, kaknam ও ghungur। অঞ্চল হিসেবে লেখা মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ।
নথিটি একটি বিপদের কথাও লিখেছে। কেবল উৎসবের পোশাক বানিয়ে মাস্টার তাঁতিদের জীবিকা চালানো দিন দিন কঠিন হচ্ছে, আর নতুন প্রজন্মের অনেকে এ কাজে আসছেন না। জিআই সনদ যেখানে বাজারের পণ্য শাড়িকে চিহ্নিত করেছে, এই নথি সেখানে রাসের পোশাকের কথা বলে, যা বাজারের জন্য নয়।
দৈনিক জনকণ্ঠের 5 মে 2025-এর প্রতিবেদনে মণিপুরীদের নিজেদের জন্য বোনা কাপড়ের তালিকায় আছে “ফানেক, লাহিঙ, উড়না”। বাংলাপিডিয়ায় বিয়ে ও নৃত্যের পোশাক হিসেবে আছে পলই। এই পোশাকগুলোর কোনোটি কোনো সরকারি তালিকায় নিবন্ধিত পণ্য হিসেবে নেই।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড আবেদন করে 21 জুন 2023 (আবেদন নং জিআই-46)। জিআই জার্নাল নং 36 প্রকাশিত হয় 2 জুলাই 2024। সনদ হস্তান্তর হয় 30 এপ্রিল 2025, বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবসের অনুষ্ঠানে, রেজিস্ট্রেশন নম্বর 37। আইনের ধারা 15(2) অনুযায়ী নিবন্ধন কার্যকর হয় আবেদনের তারিখ থেকে।
ডিপিডিটির নিবন্ধিত তালিকায় (হালনাগাদ 16 জুন 2026) 64টি পণ্য। শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির 2 সেপ্টেম্বর 2026 সংসদে একই সংখ্যা জানান। এর মধ্যে বস্ত্র, তাঁতজাত পণ্য ও তুলা মিলিয়ে 15টি নাম। প্রথম নিবন্ধিত পণ্য জামদানি শাড়ী, যার আবেদনের তারিখ 1 সেপ্টেম্বর 2015।
নিবন্ধিত 64টি পণ্যের মধ্যে কেবল এটির নামে একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নাম আছে। তবে অপেক্ষমাণ আবেদনের তালিকায় (হালনাগাদ 4 নভেম্বর 2025) বান্দরবানের জেলা প্রশাসকের নামে থামি, বম কাঁথা, মুরুংবাঁশি ও কালো বিন্নি চালের আবেদন আছে। থামি ও বম কাঁথা দুটিই বস্ত্র।
ফানেক মণিপুরী নারীদের নিচের অংশের পোশাক, যা লুঙ্গির মতো প্যাঁচ দিয়ে পরা হয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী সাধারণ ফানেকে খুব একটা নকশা থাকে না, আর ঘরে বা হাটে যেতে এটি পরা হয়। কারুকাজময় লাইফানেকের জমিন দুই রঙে ডোরাকাটা। সঙ্গে থাকে ব্লাউজ-জাতীয় ফুরিত আর ওড়না-জাতীয় ফিদুপ বা ইনাফি।
ফানেকের জন্য কোনো জিআই আবেদন ডিপিডিটির নিবন্ধিত বা প্রক্রিয়াধীন তালিকায় নেই। কেন আবেদন হয়নি, তার ব্যাখ্যা কোনো প্রকাশিত উৎসে পাওয়া যায়নি। আইনের ধারা 9 অনুযায়ী উৎপাদনকারীদের সমিতি, সংগঠন বা সরকারি সংস্থা আবেদন করতে পারে। শাড়ির জিআই জার্নালে ফানেকের নাম আছে মণিপুরীদের “আরও” তাঁতপণ্যের তালিকায়।
উৎসগুলো একমত নয়। জিআই জার্নাল শাড়ির ব্যবহারকাল ধরেছে 1919 সাল থেকে, প্রমাণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের সিলেট সফরে দেখা কোমরতাঁতের পর্দার কথা। মো. আব্দুস সামাদের মতে শাড়িটি 1980-এর দশকের শেষে বা 1990-এর দশকের গোড়ায় ঐতিহ্যবাহী ওড়নার নকশা থেকে তৈরি নতুন পণ্য। রফিকুল ইসলাম জসিম লিখেছেন, উৎপাদন শুরু নব্বইয়ের দশকে, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে।
জিআই জার্নাল অনুযায়ী মূল চিহ্ন আঁচল, জমিন ও পাড়ে মন্দির বা “টেম্পল”-এর প্রতিকৃতি, যাকে “মৈরাং” পাড়ও বলা হয়। পাড় সাধারণত এক থেকে দুই ইঞ্চি চওড়া ও এক রঙের, আর পাড়ের রং জমিনের রঙের বিপরীত। হাতে বোনা বলে দুই পিঠে নকশা সমান। জমিনে জাল বুননের কারণে শাড়িটি মশারির মতো কিছুটা ফাঁকা দেখায়।
জিআই জার্নাল অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুর, তিলকপুর, মাধবপুর ও মঙ্গলপুরে, এবং জুড়ী, কুলাউড়ার কর্মধা ও শ্রীমঙ্গলের আশিদ্রোনে। কম পরিমাণে তৈরি হয় সিলেট শহরের মণিপুরী এলাকা, হবিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জে। পণ্যের নামে কেবল “সিলেট” থাকায় মো. আব্দুস সামাদ মৌলভীবাজারের নাম যুক্ত করার দাবি তুলেছেন।
দুজন তাঁতি মিলে শাড়ি বোনেন। জিআই জার্নালের এক পাতায় 4 থেকে 5 দিন (ভারী কাজে 7 থেকে 10 দিন), আরেক পাতায় 5 থেকে 6 দিন (নকশাভেদে 15 থেকে 30 দিন) লেখা আছে। The Business Standard-এ কমলগঞ্জের এক তাঁতি বলেছেন, 13 হাতের একটি শাড়িতে এক সপ্তাহ লাগে।
দ্য ডেইলি স্টারের 2017 সালের প্রতিবেদনে দাম 3,500 থেকে 6,500 টাকা, 2018 সালে 4,000 থেকে 6,500 টাকা। মার্চ 2025-এ আদমপুর বাজারের Manipuri Cultural Academy-র এক কর্মী নকশা ও মানভেদে 5,000 থেকে 20,000 টাকার কথা বলেছেন। The Business Standard-এর 2023 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁতি মহাজনের কাছ থেকে প্রতি কাপড়ে প্রায় 2,000 থেকে 3,000 টাকা পান।
না। ভারতের রেজিস্ট্রিতে “Moirang Pheejin”-এর আবেদন নম্বর 373, আবেদনকারী মণিপুর সরকার, আবেদন 19 ডিসেম্বর 2011, সনদ 31 মার্চ 2014। এটি একটি পাড়ের নকশা, যা শাড়ি, ফানেক ও অন্য কাপড়ে বোনা হয়। বাংলাদেশের জিআই “সিলেটের মণিপুরি শাড়ি” নামের পণ্যের, আবেদনকারী বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড।
আইনের ধারা 10 অনুযায়ী উৎপাদনকারী আলাদা আবেদন করে “অনুমোদিত ব্যবহারকারী” হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারেন। ধারা 16(2) অনুযায়ী এই নিবন্ধন 5 বছরের জন্য বৈধ, পরে নবায়নযোগ্য। ডিপিডিটির ওয়েবসাইটে অনুমোদিত ব্যবহারকারীর যে দুটি জার্নাল আছে, দুটিই জামদানির, 2017 সালের। মণিপুরী শাড়ির কোনো অনুমোদিত ব্যবহারকারীর তালিকা সেখানে প্রকাশিত নেই।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী নারী, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, মণিপুরী
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।