Last updated Oct 17th, 2026
0

কার্তিকের পূর্ণিমার রাতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে একই উৎসব হয় দুই মাঠে। মাধবপুরের জোড়ামণ্ডপে রাসলীলা সাজান বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা, আর আদমপুরের মণিপুরী কালচারাল কমপ্লেক্সে মৈতৈ মণিপুরীরা। 2022 সালে দ্য ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী মাধবপুরে সেটি ছিল 180তম আয়োজন, আদমপুরে 40তম। বাইরের দর্শকের কাছে দুটিই “মণিপুরী রাস”। কিন্তু যাঁরা নাচছেন, তাঁরা দুই আলাদা ভাষায় কথা বলেন।
বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ মণিপুরী পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষায়। মৈতৈ ভাষা (মৈতৈলোন) তিব্বত-বর্মী পরিবারের, আর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা ইন্দো-আর্য পরিবারের। ভাষাতত্ত্বের সূত্রগুলো এ ব্যাপারে মোটামুটি একমত। বিরোধ বাধে “মণিপুরী” নামটা নিয়ে। মৈতৈ লেখক ও গবেষকদের একাংশ বলেন, মণিপুরী আর মৈতৈ একই কথা। বিষ্ণুপ্রিয়া লেখকেরা বলেন, মণিপুরী জাতির দুটি ধারা, মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া। ধর্ম, নাচ, কীর্তন আর পোশাকে দুই সমাজের মিল অনেক। বাংলাদেশের সরকারি তালিকা আর জনশুমারিতে দুই সমাজ মিলে একটিই নাম, “মণিপুরী”।
এই লেখায় দুই পক্ষের নিজের কথা পাশাপাশি রাখা হয়েছে, প্রতিটি দাবির সঙ্গে কে বলছেন তা উল্লেখ করে। কোন পক্ষ ঠিক, সে বিচার এখানে করা হয়নি। আমাদের আর্কাইভে মণিপুরী সমাজ নিয়ে যে লেখাগুলো আছে, সেগুলোর বিষয় সাহিত্য, ভাষা আন্দোলন বা ইতিহাস। এখানে সেসবের পুনরাবৃত্তি নেই, কেবল প্রাসঙ্গিক জায়গায় লিংক দেওয়া আছে।
এই লেখায় যা আছে
সংক্ষেপে বললে, দুই সমাজের ভাষা দুই আলাদা ভাষা-পরিবারের, লিপির ইতিহাস আলাদা, আর ভারতে দুই ভাষার আইনি মর্যাদাও আলাদা। ধর্ম, রাসলীলা, কীর্তন আর পোশাকে মিল বেশি। বাংলাদেশে দুই সমাজই প্রধানত সিলেট বিভাগে থাকেন, সবচেয়ে বেশি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে। নিচের ছকে প্রতিটি ঘরের সঙ্গে উৎস দেওয়া আছে।
| বিষয় | মৈতৈ মণিপুরী | বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী |
|---|---|---|
| ভাষার নাম | মৈতৈলোন, মৈতৈ ভাষা বা মণিপুরী ভাষা (এ কে শেরাম; বাংলাপিডিয়া) | বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী; ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তালিকায় বিষ্ণুপ্রিয়া মৈতৈ, মায়াং, ইমার ঠার নামও আছে |
| ভাষা-পরিবার | তিব্বত-বর্মী; গ্লটোলগে Sino-Tibetan › Kuki-Chin-Naga | ইন্দো-আর্য, পূর্বাঞ্চলীয় শাখা; গ্লটোলগে Indo-Aryan › Gauda-Kamrupa › Gauda-Banga |
| লিপি | নিজস্ব মৈতৈ ময়েক; অষ্টাদশ শতক থেকে বাংলা লিপিও (শেরাম; বাংলাপিডিয়া) | বাংলা-অসমিয়া লিপি (উইকিপিডিয়া; Endangered Language Alliance) |
| ভারতে মর্যাদা | 20 আগস্ট 1992 থেকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে (শেরাম) | ত্রিপুরায় 1995 ও আসামে 2001 থেকে প্রাথমিক স্কুলে পাঠ্যভাষা (আর্কাইভের ভাষা আন্দোলন বিষয়ক লেখা) |
| ভারতে ভাষাভাষী | প্রায় 17.6 লাখ, 2011-এর শুমারি (উইকিপিডিয়ার বরাতে) | 79,646, 2011-এর শুমারি (উইকিপিডিয়ার বরাতে) |
| বাংলাদেশে আনুমানিক সংখ্যা | প্রায় 15,000 (উইকিপিডিয়া, এথনোলগের বরাতে) | 40,000, 2003 সালের হিসাব (উইকিপিডিয়া, এথনোলগের বরাতে) |
| বাংলাদেশের শুমারি 2022 | আলাদা করে গোনা হয়নি; “Monipuri” নামে একটি সারি, মোট 22,979 জন (BBS) | |
| ধর্ম | দুই সমাজেই চৈতন্য-প্রবর্তিত বৈষ্ণব ধারা প্রধান; মৈতৈদের মধ্যে প্রাচীন সানামহী বা আপোকপা ধর্মের অনুসারীও আছেন (হামোম তনুবাবু; শুভাশিস সিনহা) | |
| রাস উৎসব, কমলগঞ্জ | আদমপুর, মণিপুরী কালচারাল কমপ্লেক্স | মাধবপুর (শিববাজার), জোড়ামণ্ডপ |
| প্রধান সাহিত্য সংগঠন (বাংলাদেশ) | বাংলাদেশ মণিপুরী সাহিত্য সংসদ, 1975; মুখপত্র “দীপান্বিতা” | “খংচেল”, “পৌরি”, “ইথাক” প্রভৃতি পত্রিকা (শুভাশিস সিনহা) |
ছকের “আনুমানিক সংখ্যা” সারির দুই হিসাব আর শুমারির সংখ্যা মেলে না। এথনোলগের দুই সংখ্যা যোগ করলে দাঁড়ায় 55,000, আর শুমারিতে দুই সমাজ মিলিয়ে 22,979। কোন সংখ্যা কোন সময়ের ও কোন পদ্ধতির, তা শুমারির অংশে আলাদা করে দেখানো হয়েছে।
এই প্রশ্নেই বিরোধ সবচেয়ে বেশি। মৈতৈ সমাজের লেখকদের একটি অবস্থান হলো, “মণিপুরী” শব্দটি মৈতৈ জাতির পরে পাওয়া নাম, তাই এটি কেবল মৈতৈদেরই বোঝায়। বিষ্ণুপ্রিয়া লেখকদের অবস্থান হলো, মণিপুর থেকে আসা দুই জনগোষ্ঠীই মণিপুরী, তাঁদের একটি ধারা মৈতৈ, অন্যটি বিষ্ণুপ্রিয়া। ভারতের আদালতে এই বিরোধ মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছিল।
মণিপুরী ভাষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার উপদেষ্টা হামোম তনুবাবু আমাদের আর্কাইভের বাংলাদেশের মণিপুরী : এক সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র লেখায় শব্দ দুটির সম্পর্ককে লুসাই থেকে মিজো, বা উৎকলী থেকে উড়িয়া নাম বদলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, “মণিপুরী এবং মীতৈ শব্দ দু’টি একে অন্যের পরিচয় বহনকারী শব্দ এবং একই অর্থবোধক।” তাঁর হিসাবে মণিপুররাজ ভাগ্যচন্দ্রের আমলে, অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে, “মীতৈলৈপাক”-এর বদলে “মণিপুর” আর “মীতৈ”-এর বদলে “মণিপুরী” নাম চালু হয়।
একই সংস্থার সভাপতি কবি ও গবেষক এ কে শেরাম একই অবস্থান আরও বিস্তারে লিখেছেন। আর্কাইভের মণিপুরী ভাষা দিবসঃ প্রাসঙ্গিক কিছু কথা লেখায় তিনি বাংলাদেশে প্রচলিত “মৈতৈ-মণিপুরী” শব্দবন্ধটিকে “একটি ভ্রান্ত উপস্থাপনা” বলেছেন, কারণ তাঁর মতে “মৈতৈ” ও “মণিপুরী” সমার্থক। বিষ্ণুপ্রিয়াদের সম্পর্কে একই লেখায় তিনি লিখেছেন, তাঁরা “সাধারণভাবে মণিপুরী জাতির অংশ বলে বিবেচিত হয়ে থাকেন”, কিন্তু তাঁর মতে ধর্মীয় সংস্কৃতিতে নৈকট্য সত্ত্বেও তাঁরা “সম্পূর্ণ পৃথক এক নৃতাত্ত্বিক উৎস থেকে উদ্ভূত” ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশে দুই ভাষাকে “একই ভাষা বা একই ভাষার দু’টি ভিন্ন রূপ” বলে গুলিয়ে ফেলাকে তিনি বিভ্রান্তি বলেছেন।
শেরামের একটি আগের প্রবন্ধে ছবিটা কিছুটা অন্যরকম। মুস্তাফা মজিদ সম্পাদিত “আদিবাসী সংস্কৃতি” (মাওলা ব্রাদার্স, 2009) সংকলনে তাঁর “মণিপুরীদের ঐতিহ্যময় নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত” প্রবন্ধে লেখা আছে, “বাংলাদেশের মণিপুরী মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত: ১. মৈতৈ, ২. বিষ্ণুপ্রিয়া এবং ৩. পাঙখান, যাদের ধর্ম ইসলাম” (পৃ. 49)। বইটি জুমজার্নালের ই-বুক সংগ্রহে আছে। দুটি লেখাই এখানে পাশাপাশি রাখা হলো; কোন লেখা কোন সময়ের অবস্থান, তা লেখকের নিজের কথায় যাচাই করা যায়নি।
বিষ্ণুপ্রিয়া লেখক শুভাশিস সিনহা আর্কাইভের মণিপুরী ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস: একটি অন্তর্গত পর্যালোচনা প্রবন্ধে (বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের “ভাষা ও সাহিত্য সম্মেলন ২০১২”-তে পড়া) লিখেছেন, মণিপুরে নানা ভাষার মানুষ ভৌগোলিকভাবে “মণিপুরী” পরিচয় পেলেও “সাংস্কৃতিক ও জাতিগতভাবে ‘মণিপুরী’ হিসেবে বিকশিত হয়েছে কেবল মেইতেই ও বিষ্ণুপ্রিয়ারা।” তাঁর মতে “বাংলাদেশের মণিপুরী জাতিসত্তা ভাষার দিক দিয়ে দুভাগে অন্তর্বিভক্ত। বিষ্ণুপ্রিয়া ও মেইতেই।”
তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন গবেষক Nayan Jyoti Kalita, Navanath Saharia ও Smriti Kumar Sinha-র একটি গবেষণাপত্র (arXiv, 2013) ভাষাবিদ কালীপ্রসাদ সিংহের বরাতে একই কথা বলে: “The Manipuris are divided into two groups, namely, the Meiteis and the Bishnupriyas.” সেখানে আরও আছে, বিষ্ণুপ্রিয়ারা আগে নিজেদের ভাষাকে শুধু “মণিপুরী” বলতেন, মৈতৈ থেকে আলাদা করতে এখন বলেন “বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী”।
“আদিবাসী সংস্কৃতি” সংকলনের ভূমিকায় সম্পাদক মুস্তাফা মজিদ লিখেছেন, “মণিপুরীদের মধ্যে প্রধানত দু’টি ধারা বিদ্যমান যথা মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া। এদের মধ্যে ভাষাগত এবং কিছুটা চেহারাগত প্রভেদ থাকলেও সাংস্কৃতিক প্রভেদ নেই” (পৃ. 8)। 2012 সালে দ্য ডেইলি স্টারের “স্টার ইনসাইট” ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনও শুরু হয়েছিল এভাবে যে মণিপুরী ভাষা দুই ভাগে বিভক্ত, বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ। তবে ওই প্রতিবেদনের পাঠ শুভাশিস সিনহার প্রবন্ধের সঙ্গে প্রায় হুবহু মেলে, তাই এটিকে আলাদা স্বাধীন সূত্র ধরা যায় না।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষাকে “বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী” নামে পরিচয়ের অধিকার দিয়েছিল বলে দুই সূত্র জানায়। রায়ের তারিখ নিয়ে সূত্রে অমিল আছে: আর্কাইভের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা আন্দোলনের কথা লেখা বলছে 8 মার্চ 2006, শুভাশিস সিনহার প্রবন্ধ ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন বলছে 8 মার্চ 2007। রায়ের মূল পাঠ পাওয়া যায়নি।
একই জনগোষ্ঠীর নাম বাংলায় অন্তত চারভাবে লেখা হয়: মৈতৈ, মীতৈ, মেইতেই আর মী-তৈ। এ কে শেরাম ও হামোম তনুবাবু “মৈতৈ” ও “মীতৈ” লেখেন, বাংলাপিডিয়ার বাংলা ভুক্তি ও শুভাশিস সিনহা লেখেন “মেইতেই”, ডেইলি স্টার বাংলার একটি প্রতিবেদনে আছে “মী-তৈ”। এগুলো আলাদা জাতি নয়, একই নামের বানানভেদ।
এই লেখায় “মৈতৈ” বানানটি রাখা হয়েছে, কারণ বাংলাদেশের মৈতৈ লেখকেরা নিজেরা আর্কাইভের লেখায় এটিই বেশি ব্যবহার করেছেন। উদ্ধৃতির ভেতরে মূল বানান বদলানো হয়নি।
রাজ্যের পুরোনো নাম নিয়েও সূত্রে নানা রূপ আছে। হামোম তনুবাবু লিখেছেন “কংলৈপাক”, “মীতৈলৈপাক”, “পোইরৈ সানা লৈপাক”। বাংলাপিডিয়া (এ কে শেরামের লেখা ভুক্তি) দিয়েছে Kangleipak, Kangkleipung, Kanglei, Meitrabak ও Mekhali।
“মণিপুর” নামটি কবে, কীভাবে এল, তা নিয়েও সূত্রগুলো এক কথা বলে না:
“মায়াং” শব্দটি নিয়েও সাবধান থাকা দরকার। ইংরেজি উইকিপিডিয়া বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার অন্য নামগুলোর মধ্যে “মায়াং” রেখেছে, আর গ্রিয়ারসনের Linguistic Survey of India-তে “Bishnupriya alias Mayang” আছে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে আর্কাইভের বাংলাদেশের মণিপুরী মুসলিম লেখায় সাজ্জাদুল হক স্বপন Iboonghal Singh-এর একটি বাক্য (“In 1603 A.D, The Mayang invaded Manipur”) উদ্ধৃত করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে সেখানে “Mayang” মানে বাংলাভাষী। এক শব্দ দুই সূত্রে দুই অর্থে এসেছে।
মৈতৈ ভাষা তিব্বত-বর্মী ভাষা-পরিবারের। এ নিয়ে এই লেখায় ব্যবহৃত কোনো সূত্রে দ্বিমত নেই। তর্কটা ভেতরের শাখা নিয়ে: ভাষাটি কুকি-চীন গোষ্ঠীর অংশ, না নিজেই একটি আলাদা শাখা। বাংলাপিডিয়া, শুভাশিস সিনহা ও এ কে শেরাম পুরোনো ধারা মেনে কুকি-চীনের কথা বলেন। আধুনিক শ্রেণিবিন্যাসে অন্য মতও আছে।
উৎসভেদে শ্রেণিবিন্যাস এরকম:
ভারতে এই ভাষাই সরকারি নথিতে “মণিপুরী”। শেরাম জানান, মণিপুরের রাজ্যভাষা আইন The Manipur Official Language Bill-1979 এবং 20 আগস্ট 1992 তারিখে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্তি, দুই জায়গাতেই ভাষাটির নাম “মণিপুরী”। ভারতের মৈতৈভাষীরা ওই দিনটিকে “মণিপুরী ভাষা দিবস” হিসেবে পালন করেন।
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ইন্দো-আর্য পরিবারের, পূর্বাঞ্চলীয় শাখার ভাষা। বাংলা আর অসমিয়ার সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রায় সব সূত্র একমত। বিরোধ হলো এর মর্যাদা নিয়ে। একে কেউ আলাদা ভাষা বলেন, কেউ বাংলার উপভাষা, কেউ অসমিয়ার উপভাষা, আবার কেউ বাংলা ও মৈতৈর মিশ্রণে তৈরি ভাষা।
সূত্রগুলো যা বলে, ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় সংকলিত বরাতসহ:
ইংরেজি উইকিপিডিয়ার নিবন্ধটির মাথায় “আরও উৎস প্রয়োজন” সতর্কবার্তা আছে, আর কয়েকটি বাক্যে “citation needed” চিহ্ন। ওপরের তালিকায় কেবল সেই দাবিগুলো নেওয়া হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে নির্দিষ্ট বই বা লেখকের বরাত দেওয়া আছে।
মৈতৈ ভাষার নিজস্ব লিপি আছে, নাম মৈতৈ ময়েক। অষ্টাদশ শতক থেকে ভাষাটি বাংলা লিপিতেও লেখা হয়ে আসছে। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী লেখা হয় বাংলা-অসমিয়া লিপিতে। শব্দভান্ডারে বিষ্ণুপ্রিয়ায় মৈতৈ শব্দ প্রচুর, কিন্তু ব্যাকরণের গড়ন ইন্দো-আর্য ধাঁচের।
শেরাম ও শুভাশিস সিনহা দুজনেই লিখেছেন, মৈতৈ ময়েকে প্রথমে 18টি বর্ণ ছিল, পরে রাজা খাগেম্বার আমলে আরও 9টি যোগ হয়। বাংলাপিডিয়া (এ কে শেরামের ভুক্তি) জানায়, পুরোনো লিপির প্রতিটি বর্ণের নাম দেহের একটি অঙ্গের নামে, আর রাজা গরীব নেওয়াজের আমলে বাংলা থেকে আসা চৈতন্য ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে এই লিপির জায়গায় বাংলা লিপি চালু হয়। শুভাশিস সিনহা উদাহরণ দিয়েছেন: বাংলা “ক”-এর সমার্থক বর্ণের নাম “কোক”, অর্থ মাথা।
শেরাম আরও জানান, মণিপুরে ময়েক ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয় 1982 সালে, আর 2006 সালে এই লিপিতে সরকারি স্কুল-পাঠ শুরু হয়। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী মণিপুর সরকার 2021 সালে মণিপুরী লেখার জন্য মৈতৈ ময়েককে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে, তবে 2031 পর্যন্ত বাংলা লিপিও সহ-সরকারি থাকবে।
বাংলাদেশেও ময়েক শেখানোর উদ্যোগ আছে। হামোম তনুবাবুর লেখা অনুযায়ী 2010 সালে কমলগঞ্জের তেতইগাঁওয়ে “মীতৈ ময়েক” স্কুল চালু হয়েছিল, তবে কিছুদিন পরে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর 29 এপ্রিল 2011 তারিখে গঠিত হয় মণিপুরী ভাষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা। সংস্থাটি লিপি শেখার বই প্রকাশ করে এবং কয়েকটি “মণিপুরী স্কুল” খোলে।
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীর ক্ষেত্রে ইংরেজি উইকিপিডিয়া ও Endangered Language Alliance দুটিই জানায়, ভাষাটি বাংলা-অসমিয়া লিপিতে লেখা হয়।
Kalita, Saharia ও Sinha-র গবেষণাপত্র কালীপ্রসাদ সিংহের বরাতে জানায়, ইন্দো-আর্য উৎসের হয়েও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী মৈতৈ থেকে প্রায় 4,000 শব্দ নিয়েছে। উল্টো দিকে মৈতৈ তিব্বত-বর্মী হলেও প্রতিবেশী ইন্দো-আর্য ভাষা থেকে অনেক শব্দ নিয়েছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া আরও জানায়, বিষ্ণুপ্রিয়ায় মৈতৈর পুরোনো 18টি ধ্বনি রয়ে গেছে, কারণ ধ্বনিগুলো পরে বদলানোর আগেই বিষ্ণুপ্রিয়ারা মণিপুর ছেড়েছিলেন।
শুভাশিস সিনহা তাঁর প্রবন্ধে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীর কয়েকটি বাক্য দিয়েছেন। এগুলো দেখায়, এ ভাষায় লিঙ্গ ও বচনভেদে ক্রিয়াপদ বদলায়, যা বাংলায় হয় না:
| বাংলা | বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী | যা দেখায় |
|---|---|---|
| থৈবা যাচ্ছে | থৈবা যারগা | কর্তা পুরুষ না নারী, তাতে ক্রিয়া বদলায় |
| থৈবী যাচ্ছে | থৈবী যেইরিগা | |
| আমি যাচ্ছি | মি যাউরিগা | এক না বহু, তাতে ক্রিয়া বদলায় |
| আমরা যাচ্ছি | আমি যারাংগা | |
| আমি যাব না | মি না যিমগা | নঞর্থক “না” বসে ক্রিয়ার আগে |
মৈতৈ ভাষার এমন তুলনীয় বাক্য এই লেখায় ব্যবহৃত কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি, তাই পাশাপাশি তুলনা দেওয়া হয়নি।
বিষ্ণুপ্রিয়াদের উৎপত্তি নিয়ে সূত্রে অন্তত তিনটি আলাদা অবস্থান পাওয়া যায়। বিষ্ণুপ্রিয়া গবেষকেরা বলেন, তাঁদের আদিভূমি মণিপুর, বিশেষত Loktak হ্রদের আশপাশ। মৈতৈ লেখক এ কে শেরাম তাঁদের “সম্পূর্ণ পৃথক” এক ইন্দো-আর্য উৎসের মানুষ বলেন। আর একজন মণিপুরি পণ্ডিতের মতে তাঁরা আসাম-বাংলা সীমান্ত থেকে মণিপুরে যাওয়া বাঙালি হিন্দু সমাজের একটি অংশ।
Kalita, Saharia ও Sinha-র গবেষণাপত্র কালীপ্রসাদ সিংহের বরাতে জানায়, ভাষাটি আদিতে মণিপুরের Loktak হ্রদের চারপাশে সীমিত ছিল। সেখানে Khangabok, Heirok, Mayang-Yumphan, Bishnupur, Khunau, Ningthaukhong, Thamnapokpi প্রভৃতি জায়গার নাম আছে। এসব জায়গার মানুষ এখনো “বিষ্ণুপ্রিয়া” নামে পরিচিত, কিন্তু তাঁরা এখন মৈতৈ ভাষায় কথা বলেন।
আর্কাইভের “বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা আন্দোলনের কথা” লেখাও বলছে, ইম্ফল, বিষ্ণুপুর ও নিংথৌখঙের বিষ্ণুপ্রিয়ারা মৈতৈ ভাষা গ্রহণ করায় মণিপুরে বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা “প্রায় বিলুপ্তির পথে”, তবে জিরিবাম অঞ্চলে কয়েক হাজার বিষ্ণুপ্রিয়ার হিসাব পাওয়া যায়।
এ কে শেরাম লিখেছেন, বিষ্ণুপ্রিয়ারা মৈতৈদের থেকে “সম্পূর্ণ পৃথক এক নৃতাত্ত্বিক উৎস থেকে উদ্ভুত” ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠী। তাঁর হিসাবে, মণিপুর রাজ্যে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী “নেই বললেই চলে”। ভারতের 2001 সালের শুমারির বরাতে তিনি জানান, মণিপুরে বিষ্ণুপ্রিয়াভাষী ছিলেন 1,457 জন, আর সারা ভারতে 77,545 জন।
ইংরেজি উইকিপিডিয়া পদ্মশ্রী পাওয়া মণিপুরি পণ্ডিত Ningthoukhongjam Khelchandra-র মত উদ্ধৃত করেছে (Naorem Sanajaoba সম্পাদিত Manipur, Past and Present, 1988-এর বরাতে)। এই মতে বিষ্ণুপ্রিয়ারা আসাম-বাংলা সীমান্ত এলাকার একটি বাঙালি হিন্দু সমাজের অংশ। তাঁরা মণিপুরের বিষ্ণুপুরে (আগের নাম Lamangdong) গিয়ে বসতি করায় “বিষ্ণুপুরিয়া” নামে পরিচিত হন, পরে নামটি “বিষ্ণুপ্রিয়া” হয়ে যায়।
এই তিন অবস্থানের কোনোটিই এখানে চূড়ান্ত বলে ধরা হয়নি। এ বিতর্ক নিয়ে দুই পক্ষ থেকে বই লেখা হয়েছে। আর্কাইভের সাহিত্য-বিষয়ক লেখায় এ কে শেরামের “মণিদীপ্ত মণিপুরী ও বিষ্ণুপ্রিয়া বিতর্ক: ইতিহাসের দর্পণে দেখা” (1993) বইয়ের উল্লেখ আছে। বিষ্ণুপ্রিয়া পক্ষের লেখাগুলোর তথ্যসূত্রে আছে অসীমকুমার সিংহের “মণিপুরী জাতিসত্তা বিতর্ক: একটি নিরপেক্ষ পাঠ” (সিলেট)। এর প্রকাশসাল আর্কাইভের লেখায় 2002, উইকিপিডিয়ায় 2001। এই বইগুলোর পাঠ পাওয়া যায়নি।
মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া দুই পক্ষের সূত্রই অভিবাসনের প্রধান ঢেউ হিসেবে 1819–1825 সালের মণিপুর-বর্মা যুদ্ধের কথা বলে। মণিপুরের ইতিহাসে এই সময়টি “চহী তারেৎ খুনতাকপা” বা সাত বছরের ধ্বংসযজ্ঞ নামে পরিচিত। তবে অভিবাসন শুরুর সময় নিয়ে সূত্রগুলোর হিসাব আলাদা।
বসতির ভূগোল নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত তালিকা দিয়েছেন হামোম তনুবাবু, গ্রামের নামসহ। তাঁর তালিকা আর্কাইভের “বাংলাদেশের মণিপুরী : এক সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র” লেখায় আছে, এখানে আর দেওয়া হলো না। একটি বিষয় অবশ্য চোখে পড়ার মতো। তালিকাটির শিরোনাম “মণিপুরী ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত গ্রাম”। লেখক নিজে মণিপুরী আর মৈতৈকে সমার্থক ধরেন, ফলে তালিকার গ্রামগুলো বিষ্ণুপ্রিয়া গ্রামও কি না, সে প্রশ্নের উত্তর লেখাটি থেকে পাওয়া যায় না। শুভাশিস সিনহা লিখেছেন, ভানুবিল মৌজার পাঁচটি গ্রামে (উত্তরগাঁও, মাঝেরগাঁও, ছনগাঁও, কোনাগাঁও, তেতইগাঁও) মণিপুরীদের “সর্ববৃহৎ অভিবাসন” ঘটেছিল, 752টি পরিবার নিয়ে।
বাংলাপিডিয়া ও তনুবাবু দুজনেই জানান, একসময় ঢাকার তেজগাঁও, ময়মনসিংহ অঞ্চলের দুর্গাপুর আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়ও মণিপুরী বসতি ছিল, যা এখন আর নেই।
দুই সমাজের প্রধান ধর্ম চৈতন্য-প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধারা। রাসলীলা, কীর্তন, নৃত্য আর পোশাকে মিল এত বেশি যে বাইরের মানুষের পক্ষে আলাদা করা কঠিন। তবে সংস্কৃতিতে আদৌ কোনো প্রভেদ আছে কি না, তা নিয়ে সূত্রগুলো এক কথা বলে না। আর দুই সমাজের প্রধান উৎসব কমলগঞ্জে আলাদা মাঠে আলাদা কমিটি আয়োজন করে।
Kalita, Saharia ও Sinha-র গবেষণাপত্র লিখেছে, দুই অংশের “a common stock of culture” আছে: কীর্তন, নাচ, গান, পোশাক সবই একই ধরনের। দুই সমাজের মধ্যে বিয়েতে কোনো বাধা নেই, তবে বাস্তবে তা কম হয়। মুস্তাফা মজিদ তাঁর সংকলনের ভূমিকায় লিখেছেন, দুই ধারার মধ্যে “সাংস্কৃতিক প্রভেদ নেই”।
একই সংকলনে এ কে শেরাম লিখেছেন, বিষ্ণুপ্রিয়াদের সঙ্গে মৈতৈ ও পাঙখানদের ভাষাগত ভেদ যেমন আছে, “তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় অমিল লক্ষণীয়” (পৃ. 49)। কোন কোন ক্ষেত্রে, তার বিবরণ সেখানে নেই।
মৈতৈদের পুরোনো ধর্মের কথা অবশ্য মৈতৈ সূত্রগুলোতে স্পষ্ট। বাংলাপিডিয়া ও শেরামের প্রবন্ধ জানায়, বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণের আগে মৈতৈরা “আপোকপা” বা “সানামহী লাইনিং” ধর্ম পালন করতেন, এবং এখনো ঘরে ঘরে সানামহী ও লৈমরেন গৃহদেবতা হিসেবে পূজিত হন। লাইহারাওবা উৎসবও এই পুরোনো ধারার অংশ।
হামোম তনুবাবুর একটি দাবি নিয়ে সাবধান থাকা দরকার। তিনি লিখেছেন, 1727 সালে রাজা পামহৈবা হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হয়ে প্রজাদের জোর করে হিন্দু ধর্ম পালনে বাধ্য করেন এবং প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ পুড়িয়ে দেন। শুভাশিস সিনহাও “শতাধিক মেইতেই ভাষার গ্রন্থ পুড়িয়ে দেয়া”-র কথা লিখেছেন। বিষ্ণুপ্রিয়া সমাজের প্রাক-বৈষ্ণব ধর্মবিশ্বাস নিয়ে এমন বিবরণ পাওয়া যায়নি। তবে শুভাশিস সিনহা বিষ্ণুপ্রিয়া সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে কৃষিভিত্তিক দুটি গানের কথা বলেছেন: “বরণ ডাহানির এলা” (বৃষ্টি ডাকার গান) ও “মাদই সরালেলর এলা”। এগুলো বৈষ্ণব ধর্মের আগের বলে তাঁর মত।
দ্য ডেইলি স্টার বাংলার তিনটি প্রতিবেদন (2022, 2023, 2025) কমলগঞ্জের রাস উৎসবের যে ছবি দেয়, তাতে বিভাজনটা দেখা যায়। মাধবপুরের জোড়ামণ্ডপে আয়োজক মণিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘ, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সম্প্রদায়ের। আদমপুরে মণিপুরী কালচারাল কমপ্লেক্সে আয়োজক আদমপুর মণিপুরী মহারাস উৎসব উদযাপন পরিষদ, মৈতৈ সম্প্রদায়ের।
2022 সালে কবি সনাতন হামোম পত্রিকাটিকে বলেন, “মাধবপুরের জোড়া মণ্ডপে বিষ্ণুপ্রিয়া (মণিপুরী) সম্প্রদায়ের ১৮০তম ও আদমপুর মণিপুরি কালচারাল কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে মৈতৈ (মণিপুরী) সম্প্রদায়ের ৪০তম মহারাস উৎসব হচ্ছে।” 2023-এর প্রতিবেদনে মাধবপুরের আয়োজন 181তম, 2025-এর প্রতিবেদনে 183তম। 2025-এর প্রতিবেদনে আদমপুরের আয়োজনকেও “৪০তম” বলা হয়েছে, যা 2022-এর হিসাবের সঙ্গে মেলে না।
রাসলীলার গান নিয়ে সনাতন হামোম 2025 সালে জানান, পদগুলো নেওয়া হয় জয়দেব, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাসের পদাবলি থেকে, বাংলা, ব্রজবুলি, মৈথিলী ও সংস্কৃতে; সাম্প্রতিক কালে মণিপুরী ভাষাতেও।
মণিপুরী নাচ নিয়ে আর্কাইভে আলাদা কোনো লেখা পাওয়া যায়নি। তবে মণিপুরী সম্প্রদায় : উষালোকে দীপ্ত সূর্য লেখায় ভাষাবিদ সফিউদ্দিন আহমদ রবীন্দ্রনাথের সিলেট সফর আর শান্তিনিকেতনে মণিপুরী নাচ শেখানো শুরুর কথা লিখেছেন। লেখাটি 1988 সালে বাংলাদেশ মণিপুরী সাহিত্য সংসদের সংকলন “মৈরা”-তে প্রথম ছাপা হয়েছিল। সেখানে বিষ্ণুপ্রিয়াদের আলাদা কোনো উল্লেখ নেই।
ভারতে দুই ভাষার আইনি মর্যাদার ফারাক অনেক। মৈতৈ বা মণিপুরী ভাষা 1992 সাল থেকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলের ভাষা এবং মণিপুরের রাজ্যভাষা। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী প্রায় অর্ধশতাব্দীর আন্দোলনের পর ত্রিপুরা ও আসামের প্রাথমিক স্কুলে ঢুকেছে, কিন্তু উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী মণিপুরে এর কোনো আইনি মর্যাদা নেই।
এ কে শেরামের লেখা অনুযায়ী, মণিপুরী ভাষা 1972 সালে নয়াদিল্লির সাহিত্য অকাদেমির স্বীকৃতি পায় এবং 1973 থেকে প্রতি বছর মণিপুরী ভাষার কোনো বই সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পায়। 1979 সালে রাজ্যভাষা আইন হয়, আর 20 আগস্ট 1992 তারিখে ভাষাটি অষ্টম তফসিলে যুক্ত হয়।
এই আন্দোলনের পূর্ণ ঘটনাপঞ্জি আর্কাইভের “বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা আন্দোলনের কথা” লেখায় আছে, যার উৎস পাভেল পার্থের সংকলিত ঘটনাপঞ্জি। এখানে কেবল সেই কয়েকটি তারিখ রাখা হলো, যা দুই ভাষার মর্যাদার ফারাক বুঝতে দরকার:
ইংরেজি উইকিপিডিয়া (সেন্টিনেল আসাম, 2020-এর বরাতে) জানায়, ত্রিপুরা সরকার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীকে রাজ্য শিক্ষা গবেষণা পরিষদের “Tribal Language Cell”-এ রেখেছে, আসাম সরকার বিষ্ণুপ্রিয়াদের “Other Backward Classes” মর্যাদা দিয়েছে, আর মণিপুরে তাঁদের কোনো আইনি মর্যাদা নেই।
শেরামের লেখায় আসাম ও ত্রিপুরায় সরকারিভাবে গঠিত “বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল”-এর উল্লেখ আছে। এই নামের কাউন্সিল নিয়ে অন্য কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি [যাচাই প্রয়োজন]।
ভাষা আন্দোলন বিষয়ক ওই লেখার একটি বড় অভিযোগ ভারতের শুমারি নিয়ে। লেখাটি বলছে, 1951 সালের শুমারিতে সারা ভারতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী দেখানো হয়েছিল 114 জন, অথচ তার 60 বছর আগে গ্রিয়ারসন মণিপুর ও সিলেটে প্রায় 23,000 বিষ্ণুপ্রিয়ার কথা লিখেছিলেন। 1961 সালে করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে দেখানো হয় মাত্র 1 জন। এই সংখ্যাগুলো লেখাটির নিজের, মূল শুমারি প্রতিবেদন মিলিয়ে দেখা যায়নি।
বাংলাদেশের সরকারি তালিকায় নাম একটিই, “মণিপুরী”। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, 2010-এর মূল তফসিলে 27টি নামের মধ্যে মণিপুরী 17 নম্বরে। 2019 সালের নতুন তফসিলে 50টি নামের মধ্যে মণিপুরী 16 নম্বরে। দুই তালিকার কোনোটিতে বিষ্ণুপ্রিয়া, মৈতৈ বা পাঙাল নামে আলাদা কোনো ভুক্তি নেই।
দুটি তালিকাই মূল গেজেট থেকে মিলিয়ে দেখা হয়েছে:
একই আইনের ধারা 4-এ যে সাতটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নাম আছে, তার একটি “মণিপুরী ললিতকলা একাডেমী, মৌলভীবাজার”। আইনের পাঠ আমাদের আর্কাইভেও আছে। ডেইলি স্টার বাংলার 2023 সালের প্রতিবেদনে রাস উপলক্ষে এই একাডেমির প্রাঙ্গণে মণিপুরী তাঁতবস্ত্রের প্রদর্শনীর উল্লেখ আছে।
তালিকা কীভাবে 27 থেকে 50 হলো, সে আলোচনা আমাদের আরেকটি লেখায় আছে: “স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা 27 থেকে 50 হলো কীভাবে”। সমতলের অন্য জাতিগুলোর পাশে মণিপুরীদের অবস্থান নিয়ে আছে আরেকটি লেখা: “সমতলের আদিবাসী জাতিগুলো: কে কোথায় থাকেন, কী নিয়ে বেঁচে আছেন”।
বাংলাপিডিয়ায় “মণিপুরী” নামে একটি ভুক্তি আছে, যার লেখক এ কে শেরাম। বিষ্ণুপ্রিয়া নামে বাংলাপিডিয়ার বাংলা বা ইংরেজি সংস্করণে কোনো আলাদা ভুক্তি পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022-এর জাতীয় প্রতিবেদনে “Monipuri” নামে একটিই সারি আছে, মোট 22,979 জন: পুরুষ 10,718, নারী 12,261। এর মধ্যে 22,150 জন সিলেট বিভাগে। বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ আলাদা করে গোনা হয়নি, তাই শুমারি থেকে দুই সমাজের আলাদা সংখ্যা জানা যায় না।
নিচের সব সংখ্যা BBS-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে নেওয়া:
| এলাকা | মণিপুরী (জন) | BBS-এর উৎস |
|---|---|---|
| সারা দেশ (চূড়ান্ত) | 22,979 | জাতীয় প্রতিবেদন, খণ্ড 1, Table P29 |
| সারা দেশ (প্রাথমিক) | 22,978 | প্রাথমিক প্রতিবেদন, আগস্ট 2022 |
| সিলেট বিভাগ | 22,150 | জাতীয় প্রতিবেদন, Table P29 |
| মৌলভীবাজার জেলা | 18,031 | মৌলভীবাজার জেলা প্রতিবেদন, Table P17 |
| কমলগঞ্জ উপজেলা | 15,708 | ঐ |
| জুড়ী উপজেলা | 1,078 | ঐ |
| শ্রীমঙ্গল উপজেলা | 564 | ঐ |
| বড়লেখা উপজেলা | 304 | ঐ |
| মৌলভীবাজার সদর উপজেলা | 225 | ঐ |
| কুলাউড়া উপজেলা | 121 | ঐ |
| রাজনগর উপজেলা | 31 | ঐ |
| হবিগঞ্জ জেলা | 803 | হবিগঞ্জ জেলা প্রতিবেদন, Table P17, পৃ. 257 |
| চুনারুঘাট উপজেলা | 707 | ঐ |
| ঢাকা বিভাগ | 487 | জাতীয় প্রতিবেদন, Table P29 |
| চট্টগ্রাম বিভাগ | 126 | ঐ |
| বাকি পাঁচ বিভাগ মিলিয়ে | 216 | ঐ (রংপুর 75, খুলনা 47, ময়মনসিংহ 35, রাজশাহী 31, বরিশাল 28) |
মৌলভীবাজারের সাত উপজেলার যোগফল জেলার মোট 18,031-এর সঙ্গে হুবহু মেলে। সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার আলাদা প্রতিবেদন এই লেখায় ব্যবহার করা যায়নি। বিভাগের 22,150 থেকে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ বাদ দিলে দুই জেলায় মিলিয়ে থাকে 3,316 জন; এটি হিসাব করে বের করা, BBS-এর ছাপা সংখ্যা নয়।
শুমারির বাইরে অন্য যে হিসাবগুলো ঘোরে, সেগুলোর সময় আর পদ্ধতি আলাদা, তাই শুমারির সংখ্যার সঙ্গে সরাসরি তুলনা চলে না:
শুমারিতে নিজেকে “মণিপুরী” বলে জানাননি এমন বিষ্ণুপ্রিয়া বা পাঙাল কতজন, আর কতজন “Others” (সারা দেশে 68,588) সারিতে গেছেন, তা প্রকাশিত ছকে নেই।
পুরো ৫০টি জনগোষ্ঠীর জেলাওয়ারি সংখ্যা আছে আমাদের “জনশুমারি ২০২২: ৫০ জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা, জেলা ধরে ধরে” লেখায়। শুমারিতে জাতিগোষ্ঠী কীভাবে গোনা হয় আর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক কেন, তা নিয়ে আছে “১৬ লাখ না ৩০ লাখ — জনশুমারিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গোনা হয় কীভাবে”।
পাঙালরা মণিপুরী সমাজের মুসলমান অংশ। সূত্রগুলো তাঁদের ভাষা হিসেবে মৈতৈর কথাই বলে, বিষ্ণুপ্রিয়ার নয়। এ কারণে বিষ্ণুপ্রিয়া-মৈতৈ প্রশ্নে তাঁরা ভাষার দিক থেকে মৈতৈদের পাশে পড়েন, কিন্তু ধর্মের দিক থেকে দুই সমাজ থেকেই আলাদা। বাংলাদেশের সরকারি তালিকা ও শুমারিতে তাঁদেরও আলাদা কোনো ভুক্তি নেই।
সূত্রভেদে নামের বানান নানারকম। হামোম তনুবাবু লিখেছেন “মৈতৈ পাঙল” ও “মৈতৈ পাঙন”, শুভাশিস সিনহা ও আর্কাইভের ভাষা আন্দোলন বিষয়ক লেখা “পাঙন”, এ কে শেরাম “পাঙখান”, মুস্তাফা মজিদ “পংখান” ও “পাখান”, সাজ্জাদুল হক স্বপন “পাঙল”। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার মতে “pangal” শব্দের অর্থই মুসলমান।
উৎপত্তি নিয়ে সাজ্জাদুল হক স্বপন আর্কাইভের “বাংলাদেশের মণিপুরী মুসলিম” লেখায় যে কাহিনি দিয়েছেন, তার মূল কথা হলো: রাজা খাগেম্বার ভাই সানোংবার পক্ষে কাছাড় ও সিলেট থেকে যাওয়া মুসলমান সৈন্যরা 1606 সালের যুদ্ধের পর মণিপুরে মণিপুরী নারী বিয়ে করে বসতি করেন। এর ফলে “মাতা মণিপুরী ও পিতা মুসলমান”-এর সমন্বয়ে নতুন সম্প্রদায় তৈরি হয়। তিনি এ-ও লিখেছেন যে যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়াও 1606 সালকে “definitive” তারিখ বলেছে। স্বপনের হিসাবে অধিকাংশ পাঙাল বাংলাদেশে আসেন 1819–1825 সালের যুদ্ধের সময়।
স্বপন তাঁর লেখা শুরু করেছেন পাঙালদের একটি স্বতন্ত্র “নৃ-গোষ্ঠী” বলে, যাঁরা “ধর্মীয়, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য” রক্ষা করে চলছেন। অন্যদিকে শেরাম, তনুবাবু ও মজিদ তাঁদের মণিপুরী জাতির একটি ধারা হিসেবে গুনেছেন। উইকিপিডিয়ায় তাঁদের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে “দ্বৈত পরিচয়”-এর মানুষ হিসেবে: ধর্মে মুসলমান, ভাষায় ও অনেক সাংস্কৃতিক চর্চায় মৈতৈ।
বাংলাদেশে পাঙালদের বসতির তালিকা দিয়েছেন হামোম তনুবাবু: মৌলভীবাজার সদরের বরশীজোড়া, সিলেট সদরের খাদিমপাড়া, আর কমলগঞ্জের 25টি গ্রাম, মোট 27টি গ্রাম। উৎসব, খাবার, পঞ্চায়েত আর খেলাধুলার বিবরণ সাজ্জাদুল হক স্বপনের লেখায় আছে, এখানে তার পুনরাবৃত্তি করা হলো না।
বাংলাদেশে দুই ভাষার সাহিত্যচর্চা আলাদা সংগঠন ও আলাদা পত্রিকাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। মৈতৈ সাহিত্যের কেন্দ্রে আছে 1975 সালে গড়া বাংলাদেশ মণিপুরী সাহিত্য সংসদ। বিষ্ণুপ্রিয়া সাহিত্যের কেন্দ্রে আছে “খংচেল”, “পৌরি”, “ইথাক”-এর মতো পত্রিকা। দুই সমাজের লেখকদের বড় অংশ বাংলাতেও লেখেন।
এ কে শেরাম ও খোইরোম ইন্দ্রজিতের লেখা অনুযায়ী 1975 সালে প্রথমে “পূজারী সাহিত্য সংসদ” গঠিত হয়। বছর দেড়েক পরে, শেরামের হিসাবে 1977 সালে, এর নাম হয় “বাংলাদেশ মণিপুরী সাহিত্য সংসদ”। মুখপত্র “দীপান্বিতা”-র প্রথম সংখ্যা বের হয় 16 ডিসেম্বর 1975, মণিপুরী ও বাংলা দুই ভাষায়। পরে আসে “মৈরা”।
শুভাশিস সিনহার হিসাবে বাংলাদেশে মৈতৈ মণিপুরী ভাষায় কুড়িটির বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশক মণিপুরী সাহিত্য সংসদ, ঈনাৎ পাবলিকেশন্স, হামোম পাবলিকেশন্স প্রভৃতি। শেরাম জানান, সিলেট বেতারে 1976 সাল থেকে সাপ্তাহিক “মুদঙ্গ” অনুষ্ঠানে মণিপুরী ভাষায় অনুষ্ঠান হয়।
লেখকদের পরিচয় ও বইয়ের তালিকা আছে আর্কাইভের সাহিত্য চর্চায় সিলেটের মণিপুরী সমাজ ও মণিপুরী সাহিত্য: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ লেখায়। দুটি লেখাতেই “মণিপুরী সাহিত্য” বলতে মৈতৈ ভাষার সাহিত্য বোঝানো হয়েছে।
শুভাশিস সিনহার মতে বাংলাদেশে বিষ্ণুপ্রিয়া সাহিত্যচর্চা “সুস্পষ্টত” শুরু হয় স্বাধীনতার পরে। ডেইলি স্টারের 2012 সালের প্রতিবেদনে “খংচেল”-এর শুরু 1973, “Mingal” 1981, “ইমার ঠার” 1979। শুভাশিস সিনহা লিখেছেন, গল্পকার সুরেন্দ্র কুমার সিংহের প্রথম গল্প 1975 সালে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সাহিত্য পরিষদের “খংচেল”-এ ছাপা হয়।
নব্বইয়ের দশকে আসে “পৌরি” (1989), “জাগরণ” (1991), “যেবাকা যেদিন” (1991) ও “ইথাক” (1994)। Endangered Language Alliance জানায়, তারা Pouri International-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য Uttam Singha-র সঙ্গে কাজ করেছে। একই প্রতিষ্ঠান বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষার গবেষকদের মধ্যে “Justice SK Sinha of Bangladesh” এবং বাংলাদেশের গবেষক Ranjit Singha-র নাম উল্লেখ করেছে।
বিষ্ণুপ্রিয়া সাহিত্যের ধারাবাহিক ইতিহাস আর লেখকদের নাম আছে শুভাশিস সিনহার প্রবন্ধে, যা আর্কাইভে আছে। সে প্রবন্ধের শেষ অংশে মৈতৈ ও পাঙাল সাহিত্যের কথাও আছে।
জুমজার্নালের আর্কাইভে মূলত মণিপুরী সমাজকে নিয়ে লেখা নয়টি। এর মধ্যে চারটি মৈতৈ লেখকের, একটি বিষ্ণুপ্রিয়া লেখকের, একটির লেখকের নাম নেই কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি বিষ্ণুপ্রিয়া পক্ষের, আর একটি পাঙাল লেখকের। “মণিপুরী” শব্দ দিয়ে কোন লেখক কাকে বোঝান, তা না জেনে পড়লে লেখাগুলো পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে। নিচের ছক সেই পাঠ-নির্দেশিকা।
| লেখা | লেখক | “মণিপুরী” বলতে | মূল বিষয় |
|---|---|---|---|
| বাংলাদেশের মণিপুরী : এক সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র | হামোম তনুবাবু | মৈতৈ (পাঙালসহ) | নামের ইতিহাস, গ্রামের তালিকা, লিপি-স্কুল |
| মণিপুরী ভাষা দিবসঃ প্রাসঙ্গিক কিছু কথা | এ কে শেরাম | মৈতৈ; বিষ্ণুপ্রিয়াকে পৃথক বলেছেন | ভাষার বয়স, শ্রেণিবিন্যাস, ময়েক লিপি, 1992-এর স্বীকৃতি |
| সাহিত্য চর্চায় সিলেটের মণিপুরী সমাজ | এ কে শেরাম | মৈতৈ | লেখক-পরিচিতি, প্রকাশনা |
| মণিপুরী সাহিত্য: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ | খোইরোম ইন্দ্রজিত | মৈতৈ | সাহিত্য সংসদ, বইয়ের তালিকা |
| মণিপুরী সম্প্রদায় : উষালোকে দীপ্ত সূর্য | সফিউদ্দিন আহমদ | মৈতৈ (লেখাটি মৈতৈ সংগঠনের সংকলনে প্রথম ছাপা) | সাহিত্য, নাচ, “উপজাতি” শব্দের সমালোচনা |
| মণিপুরী ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস: একটি অন্তর্গত পর্যালোচনা | শুভাশিস সিনহা | বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ দুই-ই | দুই ভাষার সাহিত্যের ইতিহাস, পাঙাল সাহিত্য |
| বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা আন্দোলনের কথা | নাম নেই (সূত্র: সচলায়তন) | বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ দুই-ই | আসাম-ত্রিপুরার ভাষা আন্দোলন, 1955–1996 |
| বাংলাদেশের মণিপুরী মুসলিম | সাজ্জাদুল হক স্বপন | পাঙাল | উৎপত্তি, উৎসব, পঞ্চায়েত, গ্রাম |
| মনিপুরী রূপকথা: মিথ্যা বলার পরিণাম | বর্ণনা: রণজিৎ সিংহ | কোন সমাজের গল্প, লেখায় বলা নেই | একটি লোককথা |
সফিউদ্দিন আহমদ নিজে মণিপুরী নন। তাঁর লেখাটি বাংলাদেশ মণিপুরী সাহিত্য সংসদের সংকলনে প্রথম ছাপা হয়েছিল, তাই ছকে “মৈতৈ” লেখা হয়েছে লেখাটির প্রেক্ষাপট বোঝাতে। লোককথাটির বর্ণনাকারী রণজিৎ সিংহ, শুভাশিস সিনহার উল্লেখ করা বিষ্ণুপ্রিয়া কবি রণজিত সিংহ আর Endangered Language Alliance-এর উল্লেখ করা গবেষক Ranjit Singha একই ব্যক্তি কি না, তা জানা যায়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের অন্য লেখার সূচি আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম হাবে।
মূল পার্থক্য ভাষায়। মৈতৈ ভাষা তিব্বত-বর্মী পরিবারের, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ইন্দো-আর্য পরিবারের, বাংলা ও অসমিয়ার কাছাকাছি। মৈতৈ ভাষার নিজস্ব লিপি মৈতৈ ময়েক, বিষ্ণুপ্রিয়া লেখা হয় বাংলা-অসমিয়া লিপিতে। ধর্মে দুই সমাজই প্রধানত গৌড়ীয় বৈষ্ণব, রাসলীলা আর নাচে মিল অনেক। বাংলাদেশের সরকারি তালিকা ও শুমারি 2022-এ দুই সমাজকে একসঙ্গে “মণিপুরী” হিসেবে ধরা হয়েছে।
মৈতৈ লেখক হামোম তনুবাবু ও এ কে শেরামের মতে হ্যাঁ: “মণিপুরী” মৈতৈ জাতির পরে পাওয়া নাম, দুটি সমার্থক। বাংলাপিডিয়ার ভুক্তিও (লেখক এ কে শেরাম) আধুনিক মৈতৈদেরই মণিপুরী বলেছে। বিষ্ণুপ্রিয়া লেখক শুভাশিস সিনহা ও ভাষাবিদ কালীপ্রসাদ সিংহের বরাতে একটি গবেষণাপত্রের মতে মণিপুরী জাতির দুই ধারা, মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া।
সূত্রভেদে উত্তর আলাদা। উইকিপিডিয়ার বরাতে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় একে বাংলার উপভাষা বলেছিলেন, গ্রিয়ারসনের Linguistic Survey of India অসমিয়ার উপভাষা বলেছে। কালীপ্রসাদ সিংহ একে মাগধী প্রাকৃত থেকে আসা আলাদা ভাষা বলেন। কয়েকজন ভাষাবিদ একে বাংলা ও মৈতৈর মিশ্র ভাষা মনে করেন। এ কে শেরাম জানান, ভারতের শুমারি একে স্বতন্ত্র ইন্দো-আর্য ভাষা ধরে।
মৈতৈ ভাষা তিব্বত-বর্মী পরিবারের। বাংলাপিডিয়া, এ কে শেরাম ও শুভাশিস সিনহা গ্রিয়ারসনের অনুসরণে একে কুকি-চীন গোষ্ঠীতে রাখেন। গ্লটোলগ রেখেছে Sino-Tibetan › Kuki-Chin-Naga শাখায়। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী বর্তমান একাডেমিক মত James Matisoff-এর অনুসরণে মণিপুরীকে নিজস্ব একটি উপবিভাগে রাখে। ভারতে ভাষাটি 20 আগস্ট 1992 থেকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে আছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি 2022-এর চূড়ান্ত জাতীয় প্রতিবেদনে মণিপুরী 22,979 জন: পুরুষ 10,718, নারী 12,261। প্রাথমিক প্রতিবেদনে সংখ্যাটি ছিল 22,978। এর মধ্যে 22,150 জন সিলেট বিভাগে, 18,031 জন মৌলভীবাজার জেলায়। শুমারি বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈকে আলাদা করে গোনেনি। উইকিপিডিয়া এথনোলগের বরাতে বিষ্ণুপ্রিয়া 40,000 ও মৈতৈ প্রায় 15,000 বলে।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায়। জনশুমারি 2022-এর মৌলভীবাজার জেলা প্রতিবেদন অনুযায়ী কমলগঞ্জে মণিপুরী 15,708 জন, যা সারা দেশের মোট 22,979-এর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি। এরপর জুড়ী (1,078), চুনারুঘাট (707, হবিগঞ্জ) ও শ্রীমঙ্গল (564)। বাংলাপিডিয়া সিলেট শহর ও শহরতলি, সুনামগঞ্জের ছাতক এবং মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও বড়লেখার কথাও বলে।
না। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, 2010-এর তফসিলে 27টি নামের মধ্যে “মণিপুরী” 17 নম্বরে, আর 19 মার্চ 2019-এর প্রজ্ঞাপনে (এস.আর.ও. নং 78) 50টি নামের মধ্যে 16 নম্বরে। দুই তালিকায় বিষ্ণুপ্রিয়া, মৈতৈ বা পাঙাল নামে আলাদা ভুক্তি নেই। জনশুমারি 2022-এও “Monipuri” নামে একটিই সারি।
সূত্রগুলো মৈতৈ ভাষার কথা বলে। এ কে শেরাম 2009 সালে লিখেছেন, পাঙখান মণিপুরীরা “প্রাচীন মৈতৈ ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত”। শুভাশিস সিনহা লিখেছেন, পাঙনদের ভাষা মেইতেই, তবে ইসলাম ধর্মের অনুসারী হওয়ায় তাঁদের মধ্যে মণিপুরী সংস্কৃতির চর্চা কম। মুস্তাফা মজিদের মতে ভাষাগতভাবে তাঁরা অনেকাংশে মৈতৈদের মতো।
দুই রকম বর্ণনাই আছে। সাজ্জাদুল হক স্বপন পাঙালদের নিজস্ব ধর্মীয়, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের একটি নৃ-গোষ্ঠী বলেছেন। এ কে শেরাম, হামোম তনুবাবু ও মুস্তাফা মজিদ তাঁদের মণিপুরী জাতির তৃতীয় ধারা হিসেবে গুনেছেন। বাংলাদেশের 2010 ও 2019 সালের সরকারি তালিকায় পাঙাল নামে আলাদা ভুক্তি নেই।
দুই সমাজ আলাদা আয়োজন করে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী মাধবপুরের জোড়ামণ্ডপে রাস আয়োজন করে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সম্প্রদায়ের মণিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘ, আর আদমপুরের মণিপুরী কালচারাল কমপ্লেক্সে মৈতৈ সম্প্রদায়ের উদযাপন পরিষদ। 2022 সালে মাধবপুরের আয়োজন ছিল 180তম, আদমপুরের 40তম। দুই জায়গাতেই কার্তিক পূর্ণিমায় রাত জুড়ে রাসনৃত্য হয়।
সূত্র অনুযায়ী দীর্ঘ মামলার পর সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা “বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী” নামে পরিচয়ের অধিকার পায়। তারিখ নিয়ে অমিল আছে: জুমজার্নাল আর্কাইভের ভাষা আন্দোলন বিষয়ক লেখা বলছে 8 মার্চ 2006, শুভাশিস সিনহার প্রবন্ধ ও দ্য ডেইলি স্টারের 2012 সালের প্রতিবেদন বলছে 8 মার্চ 2007। রায়ের মূল পাঠ পাওয়া যায়নি।
সুদেষ্ণা সিংহ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা আন্দোলনের একজন তরুণী কর্মী। জুমজার্নাল আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী 16 মার্চ 1996 তারিখে আসামের পাথারকান্দিতে মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবিতে রেল অবরোধ কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন। এর পর 7 ফেব্রুয়ারি 2001 থেকে বরাক উপত্যকার 152টি স্কুলে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী পাঠ্যবই চালু হয়। ত্রিপুরায় ভাষাটি প্রাথমিক স্কুলে আসে 26 মে 1995।
মৈতৈ ময়েক মৈতৈ ভাষার নিজস্ব লিপি। এ কে শেরাম ও শুভাশিস সিনহা লিখেছেন, এতে প্রথমে 18টি বর্ণ ছিল, রাজা খাগেম্বার আমলে আরও 9টি যোগ হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, প্রতিটি বর্ণের নাম দেহের একটি অঙ্গের নামে, আর অষ্টাদশ শতকে লিপিটির জায়গায় বাংলা লিপি চালু হয়। বাংলাদেশে 2011 সালে গঠিত মণিপুরী ভাষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ময়েক শেখানোর স্কুল চালু করেছে।
জুমজার্নালের আর্কাইভ
সরকারি নথি
বিশ্বকোষ ও ভাষাতাত্ত্বিক তথ্যভান্ডার
গবেষণা
সংবাদমাধ্যম
সর্বশেষ হালনাগাদ: 17 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, মণিপুরী, মণিপুরী ভাষা, মণিপুরী মুসলিম
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।