Last updated Oct 17th, 2026
0

2017 সালের 9 সেপ্টেম্বর, রোহিঙ্গাদের ঢল যখন কক্সবাজারের সীমান্ত পেরোচ্ছে, স্থানীয় একটি অনলাইন পত্রিকা একটি কলাম ছাপে। শিরোনামে একটি শব্দ, তারপর তিনটি অভিযোগ: “মগ : নৃশংসতা, বর্বরতা ও শয়তানের প্রতিভূ”। লেখার ভেতরে একটি বই থেকে উদ্ধৃত বাক্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠীকে বলা হয়েছে “মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী”। ফলে একটি জীবিত বাংলাদেশি জাতি আরাকানের পুরনো জলদস্যুতা আর মিয়ানমারের সাম্প্রতিক নির্যাতনের সঙ্গে একই লেখায় বাঁধা পড়ে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: রাখাইন ও মারমা দুটি আলাদা জাতি। দুই জাতিই নিজেদের আলাদা নামে পরিচয় দেয়, 2022 সালের জনশুমারি তাদের আলাদা সারিতে গোনে (মারমা 224,299 জন, রাখাইন 11,197 জন), আর 2019 সালের সরকারি গেজেটে তারা 17 ও 21 নম্বরে আলাদা দুটি নাম। দুই জাতির শিকড় আরাকানের ইতিহাসে জড়ানো, ভাষা ঘনিষ্ঠ, ধর্ম থেরবাদী বৌদ্ধ। ‘মগ’ তাদের কারও নিজের দেওয়া নাম নয়; 1585 সাল থেকে ইউরোপীয়, ফারসি ও বাংলা লেখায় আরাকানের মানুষকে বাইরে থেকে এই নামে ডাকা হয়েছে, এর উৎপত্তি নিয়ে অন্তত ছয়টি ব্যাখ্যা চালু আছে, আর মারমা ও রাখাইনরা নামটির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে এসেছেন।
সার্চ বক্সে অনেকে লেখেন “রাখাইন মারমা মগ পার্থক্য”, যেন তিনটি আলাদা জাতির তুলনা চলছে। প্রশ্নটির গড়নেই ভুল আছে: এখানে দুটি জাতি, আর একটি বাইরে থেকে চাপানো নাম। এই লেখায় দুই জাতির পরিচয় পাশাপাশি রাখা হয়েছে উৎস ধরে: শুমারি, গেজেট, আইন, ভাষার আন্তর্জাতিক কোড, আর আমাদের আর্কাইভের পুরনো লেখা। তারপর ‘মগ’ শব্দটির ইতিহাস: কবে প্রথম লেখা হলো, কোথা থেকে এল বলে দাবি করা হয়, কীভাবে গালি হয়ে উঠল, আজ কারা ব্যবহার করেন আর কারা আপত্তি করেন। শব্দটি এখানে কেবল পরীক্ষার বস্তু হিসেবে আসবে, উদ্ধৃতির ভেতরে বা নাম হিসেবে।
মারমা জাতির সমাজ, উৎসব ও ইতিহাসের পূর্ণ বিবরণ আছে আমাদের আর্কাইভের মারমা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায়, সেটি এখানে আবার বলা হয়নি। রাখাইনরা কবে, কীভাবে কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর উপকূলে বসতি গড়লেন, সে প্রশ্ন নিয়ে আলাদা লেখা প্রস্তুত হচ্ছে: “১৭৮৪: আরাকান থেকে কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর উপকূলে রাখাইন বসতি”। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমাদের সব লেখার সূচি পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
এই লেখায় যা আছে
মারমা ও রাখাইন দুটি আলাদা আত্মপরিচয়ের জাতি; ‘মগ’ তৃতীয় কোনো জাতি নয়, বরং বাঙালি, মোগল, ইউরোপীয় ও ব্রিটিশ লেখকেরা দুই জাতিসহ আরাকানের বৌদ্ধ মানুষদের যে নামে ডাকতেন, সেই বহিরাগত নাম। মারমারা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামে, রাখাইনরা মূলত কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনার উপকূলে থাকেন। নিচের ছকে দুই জাতির পরিচয় উৎস ধরে পাশাপাশি রাখা হলো।
| বিষয় | মারমা | রাখাইন | উৎস |
|---|---|---|---|
| নিজেদের নাম | মারমা (প্রাচীন রূপ ‘মারামা’, ‘ম্রাইমা’) | রাখাইন | Kyaw Minn Htin 2015; নৃবিজ্ঞান গুরুকুল 2015 |
| প্রধান বসতি | বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি | কক্সবাজার, পটুয়াখালী, বরগুনা | বাংলাপিডিয়া; জনশুমারি 2022 |
| জনশুমারি 2022, সারা দেশে | 224,299 | 11,197 (শুমারির বানান Rakhain) | BBS জাতীয় প্রতিবেদন, Table P29 |
| তিন পার্বত্য জেলায় | 209,783 | 1,398 | BBS জেলা প্রতিবেদন, Table P17 |
| 2019 সালের গেজেটে ক্রমিক | 17 | 21 | এস.আর.ও. নং 78-আইন/2019 |
| পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনে | 11টি স্বীকৃত জনগোষ্ঠীর একটি, আঞ্চলিক পরিষদে 3টি আসন | তালিকায় নাম নেই | আঞ্চলিক পরিষদ আইন 1998, ধারা 2(গ), 5(3) |
| ভাষার আন্তর্জাতিক কোড (ISO 639-3) | rmz | rki | SIL International |
| প্রথাগত প্রশাসন | বোমাং ও মং সার্কেলের প্রধান মারমা | উপকূলীয় জেলাগুলো সার্কেল ব্যবস্থার বাইরে | পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি 1900; আমাদের আর্কাইভ |
| নিজেদের উৎপত্তির বয়ান | মারমা লেখকদের বড় অংশ: পেগু (বর্তমান মিয়ানমারের বাগো) থেকে আগমন | 1784 সালে বর্মি রাজার আরাকান দখলের পর আরাকান থেকে আগমন | মারমা জাতির আদ্যোপান্ত; বাংলাপিডিয়া |
| ‘মগ’ নাম সম্পর্কে অবস্থান | 1950-এর দশক থেকে আনুষ্ঠানিক আপত্তি; নিজেদের ‘মারমা’ নামে তালিকাভুক্তির দাবি | আপত্তিকর ও অপমানসূচক বলে গণ্য | আজাদ বুলবুল; প্রশান্ত ত্রিপুরা; Crisis Group 2025 |
ছকের শেষ সারিটি এই লেখার কেন্দ্রীয় কথা। দুই জাতির মধ্যে মিল অনেক, তবু রাষ্ট্রের প্রতিটি আধুনিক নথি তাদের আলাদা নামে চেনে। ‘মগ’ নামটি টিকে আছে কেবল তিনটি জায়গায়: পুরনো আইনের একটি ধারায়, বাংলা প্রবাদে, আর গালিতে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এর ব্যতিক্রম, সেটি নিচে আলাদা করে বলা হয়েছে।
মারমারা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আদিবাসী জাতি। 2022 সালের জনশুমারিতে সারা দেশে মারমা 224,299 জন, যার 209,783 জন তিন পার্বত্য জেলায়: বান্দরবানে 84,170, খাগড়াছড়িতে 74,210, রাঙামাটিতে 51,403। অর্থাৎ দেশের প্রায় 94 শতাংশ মারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা।
উপজেলা ধরে সবচেয়ে বেশি মারমা থাকেন বান্দরবান সদরে (26,628), তারপর গুইমারা (20,293), কাউখালী (18,477), কাপ্তাই (15,844) ও লামায় (15,819), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জেলা প্রতিবেদন অনুযায়ী। আমাদের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতি সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরার 1994 সালের বই ধরে খাগড়াছড়ির সদর, মানিকছড়ি, মাটিরাঙ্গা, মহালছড়ি ও পানছড়িতে মারমা বসতির কথা বলে, আর বান্দরবানে “সর্বত্র”।
বাংলাদেশের বাইরে মারমা আছেন ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামে এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে, আমাদের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতি অনুযায়ী (লেখক মংসিংঞা মারমা)। সেখানে 1991 সালের শুমারির হিসাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে মারমা 142,334 জন, আর ভারতে 28,136 জন।
জনসংখ্যা নিয়ে উৎসে বড় অমিল আছে: ইংরেজি বাংলাপিডিয়া বলছে বাংলাদেশে মারমা “প্রায় 350,000”, আর 2022 সালের জনশুমারি বলছে 224,299। বাংলা বাংলাপিডিয়া আবার 1991 সালের শুমারি ধরে সংখ্যা দেয় 157,301।
প্রথাগত প্রশাসনে মারমাদের বিশেষ জায়গা আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সার্কেলের দুটির প্রধান মারমা: বান্দরবানের বোমাং সার্কেল আর খাগড়াছড়ির মং সার্কেল। তবে সার্কেল ভৌগোলিক এলাকা, জাতিভিত্তিক নয়; বোমাং সার্কেলে কেবল মারমারা থাকেন না। বিস্তারিত আছে সার্কেল চিফ: তিনটি সার্কেল, আর রাজার ক্ষমতা আসলে কতটুকু লেখায়, আর বোমাং রাজপদের উত্তরাধিকার নিয়ে আছে বোমাং রাজপদের উত্তরাধিকার প্রথা সমীক্ষায়।
রাখাইনরা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ উপকূলের একটি আদিবাসী জাতি, যাঁদের পূর্বপুরুষ আরাকান (বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য) থেকে এসেছিলেন। প্রধান বসতি কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনায়। 2022 সালের জনশুমারিতে সারা দেশে রাখাইন 11,197 জন, যাঁদের মাত্র 1,398 জন তিন পার্বত্য জেলায়।
বাংলাপিডিয়ার রাখাইন-ভুক্তি (লেখক কামরুল হাসান) বসতির জায়গাগুলোর নাম দেয়: কক্সবাজার পৌরসভা, খুরুশকুল, চৌফলদণ্ডী, রামু, টেকনাফ, হ্নীলা, চকরিয়ার হারবাং, মহেশখালীর গোরকঘাটা, আর পটুয়াখালীর খেপুপাড়া ও কুয়াকাটা। একই ভুক্তি অনুযায়ী 1784 সালে বর্মি রাজা আরাকান দখল করার পর বিপুলসংখ্যক রাখাইন কক্সবাজারে আশ্রয় নেন, আর 1799 সালে ব্রিটিশ সরকার ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে শরণার্থী পুনর্বাসনের দায়িত্ব দেয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামেও রাখাইন আছেন, যদিও সংখ্যায় কম: শুমারিতে রাঙামাটিতে 568, খাগড়াছড়িতে 475, বান্দরবানে 355 জন। এই সংখ্যাগুলো দেখায় যে শুমারির গণনাকারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামেও মারমা ও রাখাইনকে আলাদা করে লিখেছেন; একই জেলায় পাশাপাশি দুটি আলাদা সারি।
উপকূলের রাখাইন জনসংখ্যা দ্রুত কমছে বলে আমাদের আর্কাইভের বরিশাল অঞ্চলের রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর ভূমি এবং সম্পদে অধিকার লেখাটি জানায় (লেখক মেইনথিন প্রমীলা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য)। সেখানে উদ্ধৃত কারিতাসের 2014 সালের জরিপে পটুয়াখালী ও বরগুনায় রাখাইন প্রায় 2,561 জন, অথচ 1784 থেকে 1900 সালের দিকে বরিশাল উপকূলে এই সংখ্যা ছিল 50,000-এর বেশি। একই লেখা অনুযায়ী পটুয়াখালীর 144টি রাখাইন পাড়ার মধ্যে 2015 সালে টিকে ছিল 32টি, বরগুনার 93টির মধ্যে 13টি। রাখাইনদের লোককথার নমুনা আছে আমাদের আর্কাইভে, যেমন রাখাইন রূপকথা: ভূতের কাহিনী।
‘মারমা’ নামটি ‘ম্রাম্মা’ বা ‘মারামা’ থেকে এসেছে বলে প্রায় সব উৎস একমত; অমিল এর অর্থ নিয়ে। একদল বলেন এর মানে ‘বর্মি’ বা ‘মিয়ানমারের মানুষ’, আরেকদল বলেন ‘মারামা’ ছিল আরাকানের মানুষের নিজেদের পুরনো নাম। ‘রাখাইন’ নামটি আরাকান শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত; একে পালি ‘আরক্খা’ (রক্ষক) থেকে ব্যাখ্যা করেন কেউ কেউ, অন্যরা সেই ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক ভিত্তি দেখেন না।
ইংরেজি বাংলাপিডিয়ার মারমা-ভুক্তি (লেখক সাদাত উল্লাহ খান) বলছে, ‘মারমা’ এসেছে বর্মি ‘ম্যানমা’ শব্দ থেকে, যার মানে বর্মি জাতি; পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ শব্দটিকে ‘মারমা’ উচ্চারণ করেন। 1869 সালে টি. এইচ. লুইন একই কথা লিখেছিলেন ব্রিটিশ কর্মকর্তা Arthur Phayre-এর সূত্রে: বর্মিদের মতো এদের জাতীয় নামও ‘ম্যাম্মা’, পাহাড়ে যার উচ্চারণ ‘মুর্মা’।
আমাদের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতি দুটি মারমা সূত্র ধরে নামটিকে ‘ম্রাম্মা’ বা ‘ম্রাইমা’ থেকে আনে (ক্যশৈপ্রু 1994; মংক্যশোয়েনু 1998)। সেখানে আরেকটি মতও আছে: লেখক আবদুল হক চৌধুরীর মতে শব্দটি ব্রহ্মদেশের তেলেইং ভাষার ‘মেয়ামা’র বিবর্তিত রূপ। একই লেখা জানায়, বর্ণমালার নাম ‘ম্রাইমা চা’ বা ‘মারমা জা’ থেকেও জাতির নিজস্ব নামের ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
তৃতীয় ব্যাখ্যাটি গবেষক Kyaw Minn Htin-এর, যিনি 2015 সালে দক্ষিণ কোরিয়ার Suvannabhumi জার্নালে এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন (তখন তিনি ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের পিএইচডি গবেষক)। তিনি 1787 সালে লেখা আরাকানি গ্রন্থ দেখিয়ে বলেন, আরাকানের মানুষ নিজেদের বলতেন তিন অক্ষরের ‘মা-রা-মা’, আর মধ্য মিয়ানমারের আভার মানুষ নিজেদের বলতেন দুই অক্ষরের ‘ম্রান-মা’। তাঁর সিদ্ধান্ত: ‘মারমা’ মানে ‘বর্মি’ নয়, বরং আরাকানের মানুষের একটি পুরনো নাম। তাঁর উদ্ধৃত 1798 সালের নথিতে বোমাং প্রধান কংহ্লাপ্রু ব্রিটিশ পর্যবেক্ষক ফ্রান্সিস বুখাননকে বলেছিলেন, তাঁর মানুষের প্রকৃত নাম ‘মা-রা-মা’। একই সাক্ষাতের কথা আমাদের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতিতেও আছে, Willem van Schendel সম্পাদিত বুখাননের ভ্রমণ-বিবরণ থেকে।
বাংলাপিডিয়ার রাখাইন-ভুক্তি অনুযায়ী ‘রাখাইন’ এসেছে পালি ‘আরক্খা’ শব্দ থেকে, যার অর্থ রক্ষক; বাংলা ভুক্তিতে এর সঙ্গে একটি আরাকানি শিলালিপির উদ্ধৃতিও আছে, যার মর্মার্থ: জাতি ও শীল যিনি রক্ষা করেন, তিনিই রাখাইন। আমাদের আর্কাইভের বরিশাল-বিষয়ক লেখাটিও ‘রক্ষা’ শব্দ থেকে একই ব্যাখ্যা দেয়।
নৃবিজ্ঞান গুরুকুল নামের একটি বাংলা শিক্ষামূলক সাইটের 2015 সালের পাঠ ভিন্ন কথা বলে: ‘রাখাইন’ ব্যুৎপত্তিগতভাবে আরাকানের সঙ্গে, ‘মারমা’ বার্মা বা মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কিত, আর রাখাইন নামকে সংস্কৃত বা পালি শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যার চেষ্টার “কোন যথাযথ ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই”। বাংলাপিডিয়া পালি ব্যুৎপত্তি দেয়, গুরুকুলের পাঠ সেই ব্যুৎপত্তিকে ভিত্তিহীন বলে।
নাম দুটি তাই দুটি আলাদা ভূগোলের দিকে ইঙ্গিত করে, অন্তত এক পক্ষের পাঠে: একটি আরাকানের দিকে, অন্যটি বৃহত্তর মিয়ানমারের দিকে। গুরুকুলের পাঠ এখান থেকেই অনুমান করে যে দুই জাতি নিজেদের ইতিহাস যেভাবে মনে রেখেছে, তার ওপর ভর করেই সম্ভবত দুটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের তিন ধরনের নথি মারমা ও রাখাইনকে আলাদা জাতি হিসেবে লেখে: জনশুমারি দুটি আলাদা সারিতে গোনে, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের 2019 সালের গেজেট দুটি আলাদা ক্রমিকে রাখে, আর পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন কেবল মারমাকে চেনে। কোনো আধুনিক তালিকায় ‘মগ’ নামে কোনো জাতি নেই; নামটি আছে কেবল 1950 সালের একটি আইনে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় প্রতিবেদনের (খণ্ড 1, নভেম্বর 2023) Table P29-এ মারমা ও রাখাইন আলাদা সারি: মারমা 224,299, রাখাইন (শুমারির বানান Rakhain) 11,197। জেলা প্রতিবেদনের Table P17-এ তিন পার্বত্য জেলার প্রতিটিতেও দুই নাম আলাদা।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, 2010-এর তফসিল 23 মার্চ 2019 তারিখের প্রজ্ঞাপনে (এস.আর.ও. নং 78-আইন/2019) বদলানো হয়। নতুন তফসিলের 50টি নামের মধ্যে মারমা 17 নম্বরে, রাখাইন 21 নম্বরে। তালিকায় ‘মগ’ নামে কিছু নেই। তালিকাটি কীভাবে 27 থেকে 50-এ পৌঁছাল, তার বিবরণ থাকবে “স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা 27 থেকে 50 হলো কীভাবে” লেখায়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, 1998-এর ধারা 2(গ) “উপজাতীয়” বলতে একটি বদ্ধ তালিকা দেয়: চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখো, খিয়াং, ম্রো, বম, খুমী ও চাক। ধারা 5(3) অনুযায়ী পরিষদের 12টি উপজাতীয় আসনের 3টি মারমাদের। রাখাইনের নাম এই তালিকায় নেই, ফলে শুমারি পার্বত্য চট্টগ্রামে যে 1,398 জন রাখাইন গুনেছে, তাঁদের জন্য আইনে আলাদা কোনো আসন বা শ্রেণি নেই। বিস্তারিত আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ: গঠন, ক্ষমতা ও আসন-বণ্টন লেখায়।
Kyaw Minn Htin-এর প্রবন্ধও এই আইনটিকে একটি মোড় হিসেবে দেখে: তাঁর ভাষায়, 1998 সালের আইনে ‘মারমা’ শব্দটি ঢোকার পর নামটি পুরোপুরি আইনি স্বীকৃতি পায়।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950-এর ধারা 97 আদিবাসী রায়তের জমি হস্তান্তরে বাধা দেয়, আর যাঁদের ওপর ধারাটি প্রযোজ্য হতে পারে তাঁদের একটি তালিকা দেয়। সেই তালিকায় আছে “Maghs (Bakerganj District)”, আইনের বাংলা পাঠে “মগ (বাকেরগঞ্জ জেলা)”। আমাদের আর্কাইভের বরিশাল-বিষয়ক লেখা জানায়, এই ধারার মাধ্যমেই পটুয়াখালীর রাখাইনরা আইনে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পান, এবং লেখক নিজে সেখানে আইনের শব্দটি উদ্ধৃতি-চিহ্নে রাখেন। ধারাটির পূর্ণ বিশ্লেষণ থাকবে “প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা: সমতলে আদিবাসীর জমি হস্তান্তরে যে বিধান” লেখায়।
এখানে একটি বৈপরীত্য চোখে পড়ে: 1950 সালের আইন যে মানুষদের ‘মগ’ নামে সুরক্ষা দেয়, 2019 সালের গেজেট তাঁদের ‘রাখাইন’ নামে চেনে। একই রাষ্ট্রের দুই নথিতে একই মানুষের দুই নাম, আর আইনের পাঠটি এখনো বদলানো হয়নি।
মারমা ও রাখাইন ভাষা খুব ঘনিষ্ঠ; কিছু উৎস দুটিকে একই ভাষার রূপভেদ বলে, কিছু উৎস আলাদা ভাষা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। ভাষার আন্তর্জাতিক কোড-তালিকা ISO 639-3-এ মারমা (rmz) ও রাখাইন (rki) আলাদা দুটি ভাষা, দুটি কোডই 2008 সালের 14 জানুয়ারি তৈরি। দুই ভাষাই বর্মি লিপির পরিবারের হরফে লেখা হয়।
উৎসগুলোর অবস্থান এক নয়:
লিপি নিয়েও একটি উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ আছে ইংরেজি উইকিপিডিয়ার রাখাইন ভাষার পাতায়: রাখাইনভাষীরা বর্মি লিপিতে লেখা পড়তে শেখেন, কিন্তু অধিকাংশ মারমাভাষী কেবল বাংলা হরফে সাক্ষর। আমাদের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতি অবশ্য জানায়, বান্দরবানের উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রতি বছর দুই মাসের কোর্সে মারমা লিপিতে লেখাপড়া শেখায়। পাহাড়ের ভাষা ও লিপির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আছে পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা: লিপি, কর্মসূচি ও বাস্তবতা লেখা।
ভাষা ঘনিষ্ঠ হলেই জাতি এক হয় না, এ কথা এখানে মনে রাখা দরকার। ভাষাবিজ্ঞানের কোড-তালিকা ভাষার শ্রেণি ঠিক করে, জাতির পরিচয় নয়; আর দুই জাতির নিজস্ব নাম, শুমারির সারি ও গেজেটের ক্রমিক আলাদা।
মারমা ও রাখাইনের পূর্বপুরুষ কোথা থেকে এসেছিলেন, তা নিয়ে অন্তত তিনটি আলাদা বয়ান চালু আছে, আর সেগুলো পরস্পরবিরোধী। মারমা লেখকদের বড় অংশ পেগুর রাজবংশ ও মোন জাতি থেকে উৎপত্তির কথা বলেন; এক গবেষক বলেন মারমারা আরাকানিদেরই উত্তরসূরি; আর একজন রাখাইন লেখক বলেন দুই জাতির শিকড় একই।
আমাদের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতি অনুযায়ী 1599 সালে আরাকানের রাজা পেগু আক্রমণ করলে পেগুর রাজকুমার মংচপ্যাইং আরাকানে নীত হন; 1614 সালে আরাকানরাজ তাঁকে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা করেন ও ‘বোমাং’ উপাধি দেন। তাঁর সঙ্গে আসা মোন বা তলইং প্রজারা ধীরে ধীরে চট্টগ্রামে বসতি গড়েন। লেখাটি একই সঙ্গে মেনে নেয় যে বর্মি রাজকুমার ও তলইং প্রজার সঙ্গে আরাকানিদের “রক্ত ও সংস্কৃতি সংমিশ্রণ” ঘটেছে বলে ধারণা করা যায়। ইংরেজি বাংলাপিডিয়াও মারমাদের পূর্বপুরুষকে 1599-এর আগের পেগুর বাসিন্দা বলে।
Kyaw Minn Htin-এর 2015 সালের প্রবন্ধের শিরোনামই তাঁর যুক্তি: মারমারা একটি “বি-আরাকানীকৃত” জনগোষ্ঠী। তাঁর মতে লুইন (1869), Hutchinson (1909), Bernot (1967) সহ বহু পশ্চিমা, বাংলাদেশি ও আরাকানি উৎস মারমাদের আরাকানি বলে। পেগু-মোন উৎপত্তির কাহিনি ছাপা আকারে প্রথম পাওয়া যায় 1906 সালে Hutchinson-এর বইয়ে; 1869 সালে বোমাং প্রধান নিজেই লুইনকে বলেছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষ আরাকানের কালাদান নদীর তীরে থাকতেন। প্রবন্ধটি আরও দেখায়, 1825 সালে ফ্রান্সিস হ্যামিলটন (বুখানন) লিখেছিলেন, পাহাড়ের এই পুরনো বাসিন্দারা 1794 সালের বর্মি অভিযানের পর ভয়ে আরাকানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক স্বীকার করতে চাইতেন না। Kyaw Minn Htin-এর সিদ্ধান্ত: মারমারা 1784 সালে আরাকান পতনের অনেক আগে, সম্ভবত 1740-50-এর দশকে বা তারও আগে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি গড়েছিলেন, আর পরে আসা শরণার্থীরাই উপকূলের রাখাইন।
এই প্রবন্ধে আরেকটি তথ্য আছে, যা পার্থক্যটিকে আরও জটিল করে: আবদুল মাবুদ খানের 1984 সালের গবেষণা উদ্ধৃত করে Kyaw Minn Htin লেখেন, পটুয়াখালীর আরাকানি বংশোদ্ভূতরা আগে নিজেদের ‘মারমা’ বলতেন, পরে তরুণদের মধ্যে ‘রাখাইন’ নাম চালু হয়; অথচ কক্সবাজারের রাখাইনরা বরাবর নিজেদের ‘রাখাইন’ বলেছেন। নৃবিজ্ঞান গুরুকুলের পাঠও বলে, রাখাইনদের অনেকে একসময় ‘মারমা’ পরিচয় দিতেন, কিন্তু মারমারা কখনো ‘রাখাইন’ পরিচয় ব্যবহার করেছেন এমন তথ্য পাওয়া যায় না।
আমাদের আর্কাইভে 2021 সালে প্রকাশিত রাখাইন বা মারমা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতি কথা লেখাটির লেখক জওয়াং রাখাইন। তাঁর যুক্তি: কালের বিবর্তন, ভৌগোলিক দূরত্ব আর ভিন্ন সময়ে আগমনের কারণে একই সম্প্রদায় কক্সবাজার-বরিশাল-পটুয়াখালীতে রাখাইন, পার্বত্য চট্টগ্রামে মারমা নামে পরিচিত। তিনি পেগু-উৎপত্তির দাবিকে “সন্দেহমুক্ত নয়” বলেন, কারণ তাঁর মতে ভাষা, খাদ্য, পোশাক ও সংস্কৃতিতে মারমাদের মিল রাখাইনদের সঙ্গেই বেশি, আর আরাকানি বর্ণমালাই মারমা বর্ণমালা হিসেবে পরিচিত।
তিনটি বয়ানের তুলনা এক জায়গায়:
| প্রশ্ন | মারমা-পরিচিতি (মংসিংঞা মারমা) | Kyaw Minn Htin (2015) | জওয়াং রাখাইন (2021) |
|---|---|---|---|
| মারমাদের পূর্বপুরুষ | পেগুর রাজকুমার ও তলইং প্রজা, আরাকানিদের সঙ্গে মিশ্রণ | আরাকানি | রাখাইনদের সঙ্গে অভিন্ন |
| পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন | 1614 থেকে, বোমাং বংশের সূত্রে | 1784-এর আগে, একাধিক ঢেউয়ে | বিভিন্ন সময়ে; 1500 ও 1784 গুরুত্বপূর্ণ |
| দুই জাতি এক কি না | আলাদা; মারমারা নিজেদের মারমা নামেই পরিচয় দেন | উৎপত্তি এক, পরিচয় আলাদা হয়ে গেছে | এক জাতি, ভিন্ন নাম |
এখানে দুটি আলাদা প্রশ্ন গুলিয়ে ফেলা সহজ। প্রথম প্রশ্ন ইতিহাসের: দুই জাতির পূর্বপুরুষ কি একই অঞ্চল থেকে এসেছিলেন? এ নিয়ে উৎসগুলো একমত নয়। দ্বিতীয় প্রশ্ন বর্তমানের: আজ কি তারা একই জাতি? এর উত্তর উৎসগুলো থেকে স্পষ্ট: দুই জাতি আলাদা নামে নিজেদের চেনে, আর রাষ্ট্রও তাদের আলাদা নামে চেনে। একই পূর্বপুরুষ থাকলেও দুটি জাতি আলাদা হতে পারে, যেমন Kyaw Minn Htin নিজেই বলেন।
আমাদের আর্কাইভের অন্তত দুটি পুরনো লেখা মারমা ও রাখাইনকে একই জাতির দুটি নাম হিসেবে উপস্থাপন করে, আর ‘মগ’ শব্দটিকে তাদের পাশে সমান একটি নাম হিসেবে বসায়। আজকের শুমারি, গেজেট ও দুই জাতির নিজস্ব পরিচয়ের সঙ্গে এই উপস্থাপন মেলে না। একই ঘটনা দেখা যায় বাংলাপিডিয়া ও উইকিপিডিয়াতেও।
লেখাটির শিরোনামেই “বা” শব্দটি দুই জাতিকে বিকল্প নাম বানিয়ে দেয়। প্রথম অনুচ্ছেদে লেখক লেখেন, রাখাইন, মারমা, আরাকানি আর ‘মগ’ নামের ভিন্নতা থাকলেও “আসলে এদের শিকড় একই জায়গায় গাঁথা”, আর শেষে সিদ্ধান্ত টানেন যে ভিন্ন নামে পরিচিত এই “জাতি সমূহের” শিকড় একই। তিনি ভারতে বসবাসকারীদের নাম হিসেবে ‘মগ’ লেখেন, অর্থাৎ শব্দটিকে রাখাইন ও মারমার সমান আরেকটি পরিচয় হিসেবে রাখেন।
লেখাটির ভেতরেই তিনটি তথ্য আছে যা এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে যায়: লেখক নিজেই জানান যে বোমাং রাজা 1951 সালের শুমারিতে সম্প্রদায়টিকে ‘মারমা’ নামে লেখার আবেদন করেছিলেন, যে তাঁরা ‘মগ’ নামে পরিচিত হতে পছন্দ করতেন না, আর যে কক্সবাজার-বরিশালের মানুষ নিজেদের রাখাইন বলেন। অর্থাৎ দুই সম্প্রদায় নিজেরাই আলাদা নাম বেছে নিয়েছে। শিকড় এক কি না, সে প্রশ্নে লেখকের মত একটি বৈধ মত (উপরে বয়ান ৩), কিন্তু শিকড়ের মিল থেকে আজকের দুটি জাতিকে এক বলা যায় না। লেখক নিজেও শেষে পাঠকের কাছে ভুল থাকলে শুধরে দেওয়ার অনুরোধ রেখেছেন।
লেখক আজাদ বুলবুলের এই লেখাটি সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরার 1994 সালের বই থেকে একটি বাক্য উদ্ধৃত করে, যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের “বর্মী সংস্কৃতির অনুসারীগণ” একটি দল হিসেবে বর্ণিত এবং তাঁরা নাকি বান্দরবানে মারমা, কক্সবাজারে রাখাইন আর খাগড়াছড়ির মং সার্কেলে ‘পে-ইংসা’ নামে পরিচিত। এখানেও রাখাইন ও মারমা একটি গোষ্ঠীর আঞ্চলিক নাম। লেখাটি আরও একটি বাক্যে লেখে, মারমা জনগোষ্ঠী “সাধারণত” ‘মগ’ নামে পরিচিত।
তবে একই লেখায় আপত্তির ইতিহাসও আছে, এবং সেটি এই লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস: বোমাং রাজার 1950 সালের আপত্তি, 1964 সালের চিঠি, আর লেখক আতিকুর রহমানের মন্তব্য যে শব্দটির দস্যু-অর্থের ধারণা “কৃত্রিম” (বিস্তারিত নিচে)।
একই গোলমাল আমাদের আর্কাইভের বাইরেও আছে। ইংরেজি বাংলাপিডিয়ার মারমা-ভুক্তি লেখে, কিছু মারমা কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর উপকূলে থাকেন এবং “নিজেদের রাখাইন বলেন”; পরের বাক্যেই লেখে, অনেকে তাঁদের আলাদা জনগোষ্ঠী মনে করেন। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার মারমা পাতা (সংশোধন 5 আগস্ট 2026) প্রথম অনুচ্ছেদেই লেখে, মারমারা রাখাইনদের সঙ্গে “একই সম্প্রদায়ের”, আর একই পাতায় ‘মগ’ নামটিকে একটি “সম্প্রদায়” হিসেবে ব্যবহার করে তিনটি অন্তর্বিবাহী দলের কথা বলে। বাংলা উইকিপিডিয়ার “মগ জাতি” পাতা (সংশোধন 22 মার্চ 2026) শব্দটিকে একটি জাতির নাম হিসেবে উপস্থাপন করে, উপবিভাগে “মারমা মগ” ও “বড়ুয়া মগ” লেখে, আর পাতার বড় অংশ খরচ করে সতেরো শতকের জলদস্যুতার বিবরণে।
আমাদের আর্কাইভের সব লেখা অবশ্য এক নয়। মারমা-পরিচিতি স্পষ্ট করে বলে যে মোগল ও ব্রিটিশ শাসকেরা আরাকানি বা রাখাইনদের “পাশাপাশি” এই জনগোষ্ঠীকেও ‘মগ’ নামে ডাকত, অর্থাৎ নামটি ছিল দুই জাতির ওপর চাপানো একটি সাধারণ বহিরাগত নাম, দুই জাতির অভিন্নতার প্রমাণ নয়। বরিশাল-বিষয়ক লেখাটিও রাখাইনদের আলাদা জাতিসত্তা হিসেবেই লেখে।
নামটির সবচেয়ে পুরনো যে লিখিত ব্যবহার উৎসে পাওয়া যায়, তা 1585 সালের: ইংরেজ ভ্রমণকারী র্যালফ ফিচ আরাকানের মানুষকে লেখেন “Mogen”। এরপর মোগল দরবারের ফারসি ইতিহাস, ফরাসি পর্যটক ও ব্রিটিশ কর্মকর্তারা নামটি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু আরাকানের মানুষ নিজেরা নামটি ব্যবহার করতেন না, এ কথা 1798 থেকেই লেখা আছে।
1903 সালের ব্রিটিশ-ভারতীয় শব্দকোষ Hobson-Jobson-এর “Mugg” ভুক্তি ধরে একটি কালানুক্রম দাঁড়ায়:
| সাল | কে লিখেছেন | রূপ ও প্রসঙ্গ |
|---|---|---|
| 1585 | র্যালফ ফিচ, ইংরেজ ভ্রমণকারী | “Mogen”, রেকন (আরাকান) রাজ্যের মানুষ, যারা ত্রিপুরার রাজার চেয়ে শক্তিশালী |
| আনু. 1590 | আইন-ই-আকবরী | “Magh” একটি গোত্র হিসেবে, খনি নিয়ে যুদ্ধের প্রসঙ্গে |
| আনু. 1604, 1638 | মোগল ইতিহাসকার (এলিয়টের সংকলনে) | আরাকানের রাজা ও চট্টগ্রামের শাসককে “Magh Rájá” |
| আনু. 1665 | François Bernier, ফরাসি পর্যটক | “Kingdom of Rakan or Mog” |
| 1676 | Jean-Baptiste Tavernier, ফরাসি পর্যটক | গোটা বাংলায় আরাকানের রাজা “King of Mogue” নামে পরিচিত |
| আনু. 1810 | ফ্রান্সিস বুখানন | যাঁদের এই নামে ডাকা হয়, তাঁরা তাঁকে জানান নামটি তাঁরা নিজেরা কখনো ব্যবহার করেন না |
| 1869 | টি. এইচ. লুইন | সমতলের বাঙালিরা পাহাড়ের খ্যংথা-দের “Hill Mugh” বলে, যা লুইনের ভাষায় “entirely a misnomer” |
| 1906 | R. H. Sneyd Hutchinson | প্রশাসনিক বিবরণে গোটা জনগোষ্ঠীর নাম “Magh”; বোমাংকে “Rigrayta Maghs”-এর প্রধান বলা হয়েছে |
লুইনের 1869 সালের বইটি এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষদের নিয়ে লেখা প্রথম দিকের একটি ব্রিটিশ সরকারি বিবরণ (বইটি বাংলা সরকারের নথি-সংকলনের অংশ হিসেবেও ছাপা হয়েছিল)। লুইন পাহাড়ের মারমাদের ‘খ্যংথা’ (নদীর সন্তান) নামে লেখেন এবং Arthur Phayre-এর সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, বাঙালিদের দেওয়া নামটি ভুল প্রয়োগ। Phayre-এর মতে নামটি কেবল চট্টগ্রাম জেলার ‘রাজবংশী’ নামের একটি মিশ্র গোষ্ঠীর প্রাপ্য। Hobson-Jobson Phayre-এর একই মত লিখে রাখে, তবে নিজে সেটি মানে না; শব্দকোষটির যুক্তি, বাইরের মানুষ কোনো জাতিকে কী নামে ডাকবে তাতে সেই জাতির সম্মতির প্রয়োজন নেই, যেমন “German” জার্মানদের নিজেদের নাম নয়। এই যুক্তিটিও উল্লেখযোগ্য, কারণ এটি দেখায় বহিরাগত নাম কীভাবে টিকে থাকে: যাঁর নাম, তাঁর আপত্তিকে অপ্রাসঙ্গিক ধরে নিয়ে।
এই লুইন ও Hutchinson-এর বই দুটির ডিজিটাল কপি জুমজার্নালের ই-বুক সংগ্রহেও আছে (“The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein” ও “An Account of the Chittagong Hill Tracts”)।
‘মগ’ শব্দটি কোথা থেকে এল, তা নিয়ে উৎসে অন্তত ছয়টি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়: প্রাচীন মগধ রাজ্যের নাম, ফারসি ‘মগ’ (অগ্নি-উপাসক পুরোহিত), ‘মঙ্গোল’, সংস্কৃত ‘মদ্গু’, বার্মার মানুষের উপাধি ‘মং’, আর ইন্দোচীনের কোনো ভাষা। সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত মগধ-ব্যাখ্যা, কিন্তু কোনোটিই সর্বজনস্বীকৃত নয়।
| # | ব্যাখ্যা | কে বলেছেন | কোথায় পাওয়া যায় |
|---|---|---|---|
| 1 | প্রাচীন মগধ রাজ্যের নাম থেকে; আরাকানের রাজবংশ মগধ থেকে আগত বলে দাবি করত | Arthur Phayre; ড. মুহম্মদ এনামুল হক | Hobson-Jobson; আজাদ বুলবুলের লেখা; বাংলাপিডিয়া (রাখাইন); ইংরেজি উইকিপিডিয়া |
| 2 | ফারসি ‘মগ’ (অগ্নি-উপাসক পুরোহিত); মুসলিম লেখকেরা বৌদ্ধদের অগ্নি-উপাসকের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতেন | যদুনাথ সরকার; Hobson-Jobson (সম্ভাবনা হিসেবে) | Hobson-Jobson; আজাদ বুলবুলের লেখা |
| 3 | ‘মঙ্গোল’ শব্দের বিকৃত রূপ | অধ্যাপক ডি. জি. ই. হল (আবদুল হক চৌধুরীর সূত্রে) | আজাদ বুলবুলের লেখা |
| 4 | সংস্কৃত ‘মদ্গু’ (জলচর পাখি, রূপক অর্থে জলদস্যু) | পূর্ণচন্দ্র দেববর্মা (1920) | আজাদ বুলবুলের লেখা |
| 5 | ‘মং’ (maung) শব্দের বিকৃত উচ্চারণ | জওয়াং রাখাইন (লেখকের নিজের অনুমান) | রাখাইন বা মারমা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতি কথা |
| 6 | ইন্দোচীনের কোনো জনগোষ্ঠীর শব্দ থেকে গৃহীত | জর্জ গ্রীয়ার্সন (1909) | আজাদ বুলবুলের লেখা |
মগধ-ব্যাখ্যাটির পক্ষে Phayre যে যুক্তি দেন, তা Hobson-Jobson-এ উদ্ধৃত: আরাকানের ইতিহাসে বেনারস থেকে আসা রাজাদের কিংবদন্তি আছে। বাংলাপিডিয়ার রাখাইন-ভুক্তি একই ধারায় বলে, রাখাইনরা প্রাচীন মগধের বাসিন্দা ছিলেন এবং আরাকানে আসার পর স্থানীয়দের কাছে ‘মগধী’ নামে পরিচিত হন। তবে Hobson-Jobson জানায়, বুখানন এই তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে মনে হয়। আর নৃবিজ্ঞানী প্রশান্ত ত্রিপুরা লিখেছেন, শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিয়ে যত ব্যাখ্যা তিনি পড়েছেন, কোনোটিই তাঁর কাছে খুব নির্ভরযোগ্য মনে হয়নি।
লক্ষ করার মতো একটি বিষয়: চতুর্থ ব্যাখ্যাটি (সংস্কৃত ‘মদ্গু’ থেকে জলদস্যু) শব্দের উৎপত্তিতেই দস্যুতার অর্থ বসিয়ে দেয়। আতিকুর রহমানের (2000) যে মন্তব্য আজাদ বুলবুলের লেখায় উদ্ধৃত, তা ঠিক এর বিপরীত: শব্দটির অর্থ দস্যু হওয়ার ধারণাটিই “কৃত্রিম”।
‘মগ’ শব্দটি একসময় কেবল আরাকান বা মিয়ানমার থেকে আসা মানুষ বোঝাত; ষোলো-সতেরো শতকে বাংলার উপকূলে আরাকানি ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণের স্মৃতি, ‘মগের মুল্লুক’ প্রবাদ আর পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস মিলে শব্দটি বিশৃঙ্খলা ও নিষ্ঠুরতার প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে। নৃবিজ্ঞানী প্রশান্ত ত্রিপুরার অনুমান, গালি হিসেবে শব্দটি প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ শাসনামলে।
বাংলার উপকূলে আরাকান-ঘাঁটি থেকে আসা জলদস্যুদের লুটপাট ও মানুষ ধরে নিয়ে দাস বানানোর বিবরণ সমকালীন মোগল ইতিহাসকারদের লেখায় আছে, আর বাংলা উইকিপিডিয়া ড. আহমদ শরীফ উদ্ধৃত করে ভুলুয়া, সন্দ্বীপ, বিক্রমপুর, সোনারগাঁ, যশোর ও হুগলিসহ যে জায়গাগুলোর নাম দেয়, সেগুলো এই আক্রমণের ভূগোল দেখায়। বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী 1666 সালে মোগল সুবাদার শায়েস্তা খানের সেনাপতিরা চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপ দখল করলে এই পর্বের অবসান হয়; আমাদের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতিও 1666 সালের 27 জানুয়ারি মোগল সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খাঁর চট্টগ্রাম জয়ের কথা লেখে। বাংলাপিডিয়ার রাখাইন-ভুক্তি একটি পরের তথ্যও দেয়: চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বসবাসকারী আরাকানিদের ওপর শায়েস্তা খান 1666 সালে ‘মগজমা’ নামে একটি কর বসান।
ইতিহাসের এই পর্বের সঙ্গে আজকের রাখাইন বা মারমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, এ কথা উৎসেও লেখা আছে। আজাদ বুলবুলের লেখায় উদ্ধৃত মুস্তফা মজিদ (2004) বলেন, সেই জলদস্যুদের উত্তরসূরি যে বর্তমান রাখাইন ও মারমারা নন, “সেই সত্য ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে”। বাংলাপিডিয়ার মারমা-ভুক্তি লেখে, পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমারা নিজেদের এই নামের সঙ্গে মেলাতে পছন্দ করেন না, কারণ তাঁদের মতে ‘মগ’রা ছিল মূলত জলদস্যু, আর মারমারা সেই পেশাকে ঘৃণা করতেন।
‘মগের মুল্লুক’ প্রবাদটি আজও সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের বাংলা সংস্করণে 2019 সালের 9 আগস্ট প্রকাশিত একটি ব্যাখ্যামূলক লেখা প্রবাদটির মানে দেয় “বিশৃঙ্খল অবস্থা, অরাজক দেশ”, আর বলে আক্ষরিক অর্থে আরাকান বা মিয়ানমারই সেই ‘মুলুক’। আজকের পত্রিকার 2 আগস্ট 2026 সালের সম্পাদকীয় একজন ট্রেনচালকের দায়িত্বহীনতা বোঝাতে প্রবাদটি ব্যবহার করে এবং ব্যাখ্যায় লেখে, বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের মানুষই এই নামে পরিচিত ছিলেন। দুটি লেখাই প্রবাদটির পেছনের জাতিটিকে রাখাইন অঞ্চলের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে।
প্রশান্ত ত্রিপুরা এই প্রক্রিয়াটি তিন ধাপে দেখান, তাঁর 2012 সালের একটি প্রথম আলো নিবন্ধে, যার অংশবিশেষ আমাদের আর্কাইভের মারমা-বিষয়ক একটি ‘লাকসু-ধর্মী’ লেখা নিবন্ধে পুনর্মুদ্রিত। প্রথমত, স্কুলে আরাকান রাজসভার বাংলা সাহিত্যের কথা পড়ানো হয়, কিন্তু চট্টগ্রাম যে আরাকানের অংশ ছিল তা পড়ানো হয় না। দ্বিতীয়ত, ইতিহাসের ক্লাসে শেখানো হয় যে এই নামের মানুষেরা জলদস্যু ছিল। তৃতীয়ত, বাংলার ক্লাসে প্রবাদ শেখানো হয় যে ‘মগের মুল্লুক’ মানে অরাজকতা। তাঁর প্রশ্ন: বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক থেকে এই মানুষেরা কেবল দস্যুতে পরিণত হলো কীভাবে?
প্রশান্ত ত্রিপুরার অনুমান (তিনি নিজেই একে অনুমান বলেন): ব্রিটিশরা 1757 সালে চট্টগ্রামের দখল পায় যখন আরাকান স্বাধীন (Kyaw Minn Htin-এর প্রবন্ধে চট্টগ্রাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে আসার সাল 1760), 1784 সালে আরাকান বার্মার অধীনে যায়, 1824 থেকে 1885 পর্যন্ত তিনটি ইঙ্গ-বর্মি যুদ্ধে গোটা বার্মা ব্রিটিশ দখলে আসে। এই সাম্রাজ্য-বিস্তারের সময়ে আরাকানি ও বর্মিদের হিংস্র হিসেবে দেখানোর ব্রিটিশ মতাদর্শের অংশ হিসেবে বাংলা ভাষাতেও এই নামের মানুষেরা অরাজকতার প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠে, আর আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রসার ঘটেছিল ঠিক এই সময়েই। তিনি একটি পাল্টা-কল্পনাও দেন: ইংরেজদের বদলে ফরাসি বা পর্তুগিজরা বাংলা দখল করলে হয়তো ইতিহাসে ইংরেজ ও থাই জলদস্যুদের কথাই পড়ানো হতো।
এই অনুমানের পক্ষে বা বিপক্ষে স্বাধীন কোনো গবেষণা উৎসে পাওয়া যায়নি।
শব্দটি কেবল মারমা ও রাখাইনদের দিকে ছোড়া গালি নয়। প্রশান্ত ত্রিপুরা লেখেন, চট্টগ্রামের বাঙালিদের অপমান করার একটি “মোক্ষম উপায়” তাদের এই নামে গালি দেওয়া। নৃবিজ্ঞান গুরুকুলের পাঠও বলে, নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ এখনো চট্টগ্রামের মানুষকে গালি হিসেবে এই নামে ডাকেন। আর দুই উৎসই জানায়, চট্টগ্রামের বাঙালি বৌদ্ধ বড়ুয়ারাও একসময় ‘বড়ুয়া মগ’ নামে অভিহিত হতেন; প্রশান্ত ত্রিপুরা এর সমর্থনে বুখাননের 1798 সালের ভ্রমণ-বিবরণের উল্লেখ করেন।
মারমারা ‘মগ’ নাম প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের ‘মারমা’ নামে তালিকাভুক্ত করার আনুষ্ঠানিক দাবি তোলেন পাকিস্তান আমলে, বোমাং রাজা মং শৈ প্রু চৌধুরীর নেতৃত্বে। কোন বছর দাবি উঠেছিল আর কোন বছর সরকার নামটি মেনে নেয়, তা নিয়ে উৎসগুলোর মধ্যে অমিল আছে: 1950, 1951, 1961 ও 1964 সাল চারটিই উৎসে আছে।
| সাল | কী ঘটেছিল | উৎস |
|---|---|---|
| 1950 | বোমাং রাজা মং শৈ প্রু চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কাছে মারমাদের ‘মগ’ আখ্যা দেওয়ায় আপত্তি জানান, এবং 1951-এর শুমারিতে ‘মারমা’ নামে তালিকাভুক্তির অনুরোধ করেন | আজাদ বুলবুল, অংসুই মারমার (1984) সূত্রে |
| 1951 | বোমাং রাজা মং শৈ প্রু শুমারির সময় সম্প্রদায়টিকে ‘মারমা’ নামে উল্লেখের আবেদন করেন | জওয়াং রাখাইন |
| 1951 | পূর্ব পাকিস্তান সরকার শুমারিতে ‘মারমা’ শব্দ ব্যবহার শুরু করে | Kyaw Minn Htin, আবদুস সাত্তারের (1971) সূত্রে |
| 1961 | পূর্ব পাকিস্তান সরকার ‘মারমা’ অভিধাটি সরকারিভাবে স্বীকার করে, বোমাং রাজা মংশৈপ্রু চৌধুরীর দাবিতে | মারমা জাতির আদ্যোপান্ত (মংসিংঞা মারমা) |
| 1964 | বোমাং চিফ বান্দরবান মহকুমা প্রশাসককে চিঠিতে জানান, ‘মগ’ নয়, ‘মারমা’ নামই তাঁদের কাছে অভিপ্রেত | আজাদ বুলবুল, আতিকুর রহমানের (2000) সূত্রে |
| 1940-এর দশক | মারমারা নামটিকে অবমাননাকর মনে করে ‘মারমা’ নাম গ্রহণ করেন | ইংরেজি উইকিপিডিয়া (মারমা পাতা) |
সব উৎস মিলিয়ে কয়েকটি বিষয় স্থির থাকে: দাবিটি এসেছিল বোমাং রাজার কাছ থেকে, দাবিটি ছিল শুমারি ও সরকারি নথিতে নিজেদের নাম, আর অন্তত 1964 পর্যন্ত দাবিটি নতুন করে জানাতে হয়েছে, অর্থাৎ সরকারি স্বীকৃতির পরও নথিতে পুরনো নাম চলছিল। মারমা-পরিচিতি এর পেছনের মানসিকতাটি এক বাক্যে লেখে: বোমাং সার্কেলের মানুষ নিজেদের ‘মারমা’ মনে করেন এবং সেই অভিধাই ব্যবহার করেন।
এর বহু আগের একটি নথিও আছে, যা দেখায় নিজেদের নামটি নতুন নয়: 1798 সালে বোমাং প্রধান কংহ্লাপ্রু বুখাননকে নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন ‘মা-রা-মা’ বলে, মারমা-পরিচিতি ও Kyaw Minn Htin দুজনেই এই তথ্য দেন।
নামবদলের এই আন্দোলন কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়। প্রশান্ত ত্রিপুরা খাগড়াছড়ির স্মৃতি থেকে লেখেন, সেখানে মারমারা একসময় চাকমা ও বাঙালিদের কাছে প্রধানত ‘মগ’ নামেই পরিচিত ছিলেন, তাঁরা নিজেরাও এই পরিচয়ে অভ্যস্ত ছিলেন, এমনকি অনেকে নামের উপাধি হিসেবেও এটি ব্যবহার করতেন। নৃবিজ্ঞান গুরুকুলের পাঠ একই কথা অন্যভাবে বলে: একসময় সরকারি নথিপত্রে অনেক রাখাইন ও মারমার নামের পেছনে অন্যরা এই পদবি জুড়ে দিয়েছিল, কিন্তু সাম্প্রতিককালে এই “আরোপিত পরিচিতি” সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়েছে।
একই ধরনের নাম-প্রশ্ন পার্বত্য চট্টগ্রামের আরেকটি জাতির ক্ষেত্রেও উঠেছে; তুলনার জন্য দেখতে পারেন মুরুং, মুরং, ম্র নাকি ম্রো: কোনটা সঠিক? লেখাটি।
শব্দটি আজ চারটি ভিন্ন জায়গায় টিকে আছে: বাংলা প্রবাদ ও সংবাদমাধ্যমে, একটি পুরনো আইনের পাঠে, রোহিঙ্গা ও চট্টগ্রামী ভাষাভাষীদের মুখে রাখাইনদের প্রতি গালি হিসেবে, আর ভারতের ত্রিপুরায় একটি জাতির সরকারি ও আত্মপরিচয়ের নাম হিসেবে। আপত্তি জানিয়েছেন মারমারা, আর গবেষক ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন শব্দটিকে রাখাইনদের প্রতি অবমাননাকর বলে চিহ্নিত করে।
| কে বা কোথায় | কীভাবে ব্যবহার | উৎস |
|---|---|---|
| বাংলা সংবাদমাধ্যম | ‘মগের মুল্লুক’ প্রবাদ, অরাজকতা অর্থে | দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, 2019; আজকের পত্রিকা, 2026 |
| রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950 | ধারা 97-এর তালিকায় “Maghs (Bakerganj District)” | বাংলাদেশ আইন ওয়েবসাইট (bdlaws) |
| রোহিঙ্গা ও চট্টগ্রামী ভাষাভাষী | রাখাইনদের প্রতি অবমাননাকর শব্দ; 2024 থেকে আরাকান আর্মিকে ‘Mogh Baghi’ বলা | International Crisis Group, 18 জুন 2025 |
| কক্সবাজারের একটি অনলাইন পত্রিকা, 2017 | একটি জাতিকে সামগ্রিকভাবে অশুভের প্রতীক বানানো কলাম | coxsbazarnews.com, 9 সেপ্টেম্বর 2017 |
| বাংলা উইকিপিডিয়া | “মগ জাতি” নামে একটি জাতির পাতা | bn.wikipedia.org, সংশোধন 22 মার্চ 2026 |
| নোয়াখালী অঞ্চল | চট্টগ্রামের মানুষকে গালি | নৃবিজ্ঞান গুরুকুল; প্রশান্ত ত্রিপুরা |
| চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায় | মারমা-রাখাইনদের প্রচলিত নাম হিসেবে | জওয়াং রাখাইন; প্রশান্ত ত্রিপুরা (খাগড়াছড়িতে চাকমাদের কাছে, অতীতে) |
| ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য | তফসিলি জনজাতি তালিকার 12 নম্বর “Mag”; সম্প্রদায়ের একাংশের আত্মপরিচয় | ভারতের জনজাতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়; Kyaw Minn Htin |
আন্তর্জাতিক সংকট-গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের 18 জুন 2025 তারিখের প্রতিবেদন (Asia Report 348, “Bangladesh/Myanmar: The Dangers of a Rohingya Insurgency”) একটি পাদটীকায় শব্দটিকে বাংলা, চট্টগ্রামী ও রোহিঙ্গা ভাষায় রাখাইনদের প্রতি “অবমাননাকর শব্দ” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী 2024 সালে উত্তেজনা বাড়ার পর রোহিঙ্গাদের মধ্যে আরাকান আর্মিকে ‘Mogh Baghi’ (বিদ্রোহী) বলা সাধারণ হয়ে উঠেছে, বিশেষত অনলাইনে।
কক্সবাজারের অনলাইন পত্রিকাটির 2017 সালের কলামটি (লেখক মাহ্ফুজুল হক) একই প্রেক্ষাপটে লেখা, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের খবরের মধ্যে। কলামটি শব্দটির সঙ্গে একের পর এক নিষ্ঠুরতার অর্থ জুড়ে দেয় এবং শব্দটিকে “একটি মূর্তিমান আতংকের নাম” বলে। লেখাটি একটি বই উদ্ধৃত করে মারমাদের “মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী” বলে, অর্থাৎ মিয়ানমারের ঘটনার দায় পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি বাংলাদেশি জাতির নামের সঙ্গে জুড়ে দেয়। এই লেখার শুরুতে যে শিরোনামের কথা বলা হয়েছে, সেটি এই কলামেরই।
আপত্তির সবচেয়ে স্পষ্ট নথি মারমাদের নিজেদের: 1950 থেকে 1964 পর্যন্ত বোমাং রাজার আবেদন ও চিঠি (উপরের ছক)। প্রশান্ত ত্রিপুরা লেখেন, মারমা ও রাখাইন নামে পরিচিত দুটি জনগোষ্ঠীকে “তাদের আপত্তি সত্ত্বেও” এখনো অনেক জায়গায় ‘মগ’ বলা হয়। নৃবিজ্ঞান গুরুকুলের পাঠ লেখে, ‘মগের মুল্লুক’ প্রবাদের অর্থই বলে দেয় কেন অভিধাটি রাখাইন বা মারমাদের কাছে আপত্তিকর, এবং সমকালীন কোনো রাখাইন বা মারমাকে এই নামে সম্বোধন করা “নিঃসন্দেহে অপমানসূচক”। আতিকুর রহমান (2000, আজাদ বুলবুলের লেখায় উদ্ধৃত) লেখেন, দস্যু-অর্থের বহুল প্রচারের প্রতিক্রিয়ায় বর্মি ও আরাকানি বংশোদ্ভূতরা আজকাল এ নামে পরিচিত হতে কুণ্ঠিত।
রাখাইন সংগঠনের নিজস্ব আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা দাবিপত্র, মারমাদের মতো তারিখসহ, উৎসে পাওয়া যায়নি।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে একই শব্দ একটি জাতির সরকারি নাম: ভারতের জনজাতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তফসিলি জনজাতির তালিকায় ত্রিপুরার 12 নম্বর জাতির নাম “Mag”। Kyaw Minn Htin-এর প্রবন্ধ অনুযায়ী ত্রিপুরার এই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের ‘মগ’ বলে পরিচয় দেন, কখনো ‘ম্রাইমা’ বলেও, আর নিজেদের আরাকানি বংশোদ্ভূত মনে করেন।
Kyaw Minn Htin-এর উদ্ধৃত সূত্রগুলোর একটি ত্রিপুরার উপজাতি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে 2011 সালে প্রকাশিত একটি বই, যার লেখকের নামেই শব্দটি পদবি হিসেবে আছে (Krairi Mog Chaudhury)। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার মারমা পাতাও লেখে, ত্রিপুরার কিছু মারমা নিজেদের ‘মারিমা’ বা ‘মগ’ বলে পরিচয় দেন। আমাদের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতি ত্রিপুরা রাজ্যের বঙ্গু, খোয়ে, শিলো, থৌলে ও সাব্রুম এলাকায় মারমা বসতির কথা বলে, 1991 সালের ভারতীয় শুমারি ধরে ত্রিপুরায় 27,966 জন।
অর্থাৎ একই শব্দ সীমান্তের এক পাশে একটি জাতির সরকারি ও নিজস্ব নাম, অন্য পাশে সেই জাতিরই আত্মীয়দের কাছে গালি। আমাদের আর্কাইভের “রাখাইন বা মারমা” লেখাটি যখন বলে ভারতে এই সম্প্রদায় নিজেদের ‘মগ’ নামে পরিচয় দেয়, তখন সেটি ত্রিপুরার এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। বাংলাদেশের প্রসঙ্গে এ থেকে শব্দটির গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ হয় না, কারণ বাংলাদেশের মারমারা আনুষ্ঠানিকভাবে নামটি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ত্রিপুরার এই সম্প্রদায় বাংলাদেশের মারমাদের সঙ্গে কতটা এক, বা বাংলাদেশের রাখাইনদের সঙ্গে কতটা, সে প্রশ্নে উৎস একটিই (Kyaw Minn Htin), যিনি তাঁদের আরাকানি বংশোদ্ভূত বলেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিবেশী জাতিদের ভাষায় মারমা ও রাখাইনদের জন্য আলাদা আলাদা নাম আছে, এবং তার সবগুলো নেতিবাচক নয়। জওয়াং রাখাইনের তালিকা অনুযায়ী চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা বলেন ‘মগ’, ম্রোরা ‘ম্রান’, পাংখোয়ারা ‘ম্রং’, চাকরা ‘ম্রাইঙ’, ত্রিপুরারা ‘মুখু’, খুমিরা ‘ত্রামো’, আর খিয়াংরা ‘ওঅঃ’।
| জাতি | মারমা-রাখাইনদের যে নামে ডাকে | উৎস |
|---|---|---|
| চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা | ‘মগ’ | জওয়াং রাখাইন |
| ম্রো | ম্রান | জওয়াং রাখাইন |
| পাংখোয়া | ম্রং | জওয়াং রাখাইন |
| চাক | ম্রাইঙ | জওয়াং রাখাইন |
| ত্রিপুরা | মুখু (জওয়াং রাখাইন); Mwkwk বা Mwkhwk, উচ্চারণ ‘মুকুক’ বা ‘মুখুক’-এর কাছাকাছি (প্রশান্ত ত্রিপুরা) | দুই লেখা |
| খুমি | ত্রামো | জওয়াং রাখাইন |
| খিয়াং | ওঅঃ | জওয়াং রাখাইন |
প্রশান্ত ত্রিপুরা ককবরক নামটি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টানেন: ককবরকে ‘মুকুক’ বা ‘মুখুক’ শব্দের বাংলা ‘মগ’-এর মতো কোনো নেতিবাচক ব্যঞ্জনা নেই। তিনি আরও লেখেন, মারমারা ত্রিপুরাদের ডাকেন ‘ম্রুং’ নামে। অর্থাৎ পাহাড়ের জাতিগুলো পরস্পরকে নিজেদের ভাষার নামে ডাকে; সমস্যাটি নাম থাকায় নয়, একটি নির্দিষ্ট নামের সঙ্গে জুড়ে থাকা অপমানের অর্থে।
উপরের তালিকার বেশিরভাগ নাম কেবল একটি উৎসে আছে (জওয়াং রাখাইন), এবং কোনো ম্রো, পাংখোয়া, চাক, খুমি বা খিয়াং উৎসে নামগুলো যাচাই করা যায়নি। মারমাদের নিজেদের লোককথার সংগ্রহ নিয়ে আছে মারমা রূপকথার ভাণ্ডার: আর্কাইভের ১৯টি গল্প ও তাদের লেখকেরা।
না। দুই জাতি নিজেদের আলাদা নামে পরিচয় দেয়, আর বাংলাদেশ রাষ্ট্রও তাদের আলাদা চেনে: 2022 সালের জনশুমারিতে মারমা 224,299 জন ও রাখাইন 11,197 জন আলাদা সারিতে, 2019 সালের গেজেটে মারমা 17 ও রাখাইন 21 নম্বরে। দুই জাতির ইতিহাস আরাকানের সঙ্গে জড়ানো এবং ভাষা ঘনিষ্ঠ, তবে পূর্বপুরুষ এক কি না, তা নিয়ে উৎসগুলো একমত নয়।
প্রধান পার্থক্য বসতি, নাম ও সরকারি পরিচয়ে। মারমাদের প্রায় 94 শতাংশ (209,783 জন) তিন পার্বত্য জেলায় থাকেন; রাখাইনরা মূলত কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন 1998 মারমাদের 3টি আসন দেয়, রাখাইনদের নাম সেই আইনে নেই। ভাষার আন্তর্জাতিক কোডও আলাদা: মারমা rmz, রাখাইন rki।
‘মগ’ কোনো আলাদা জাতি নয়। এটি একটি বহিরাগত নাম, যা 1585 সাল থেকে ইউরোপীয়, মোগল ও বাঙালি লেখকেরা আরাকানের মানুষ এবং পরে মারমা, রাখাইন ও চট্টগ্রামের বড়ুয়া বৌদ্ধদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেছেন। 1810-এর দিকে ফ্রান্সিস বুখানন লিখেছিলেন, যাঁদের এই নামে ডাকা হয় তাঁরা নিজেরা নামটি কখনো ব্যবহার করেন না। আজ মারমা ও রাখাইনরা নামটিকে আপত্তিকর মনে করেন।
উৎপত্তি নিশ্চিত নয়; অন্তত ছয়টি ব্যাখ্যা চালু। সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত ব্যাখ্যা প্রাচীন মগধ রাজ্যের নাম থেকে (Arthur Phayre, মুহম্মদ এনামুল হক)। অন্যগুলো: ফারসি ‘মগ’ বা অগ্নি-উপাসক (যদুনাথ সরকার), ‘মঙ্গোল’ (ডি. জি. ই. হল), সংস্কৃত ‘মদ্গু’ (পূর্ণচন্দ্র দেববর্মা, 1920), ‘মং’ শব্দের বিকৃতি (জওয়াং রাখাইন), আর ইন্দোচীনের কোনো ভাষা (গ্রীয়ার্সন, 1909)।
হ্যাঁ, উৎসগুলো তাই বলে। নৃবিজ্ঞান গুরুকুলের পাঠ অনুযায়ী সমকালীন কোনো রাখাইন বা মারমাকে এই নামে সম্বোধন করা “নিঃসন্দেহে অপমানসূচক”। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের 2025 সালের প্রতিবেদন শব্দটিকে বাংলা, চট্টগ্রামী ও রোহিঙ্গা ভাষায় রাখাইনদের প্রতি অবমাননাকর বলে। বোমাং রাজা 1950 থেকে 1964 পর্যন্ত একাধিকবার নামটির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছেন।
উৎসগুলো ভিন্ন সাল দেয়। আজাদ বুলবুল অংসুই মারমা উদ্ধৃত করে বলেন, বোমাং রাজা মং শৈ প্রু চৌধুরী 1950 সালে আপত্তি জানান এবং 1951-এর শুমারিতে ‘মারমা’ নাম চান। Kyaw Minn Htin বলেন, 1951 সালের শুমারি থেকে নামটি ব্যবহার শুরু হয়। আমাদের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতি বলে, স্বীকৃতি আসে 1961 সালে। 1964 সালেও বোমাং চিফ চিঠিতে একই দাবি জানান।
উৎসে দুটি প্রধান মত আছে। বাংলাপিডিয়া বলে শব্দটি বর্মি ‘ম্যানমা’ থেকে, যার মানে বর্মি জাতি। গবেষক Kyaw Minn Htin 1787 সালের আরাকানি গ্রন্থ দেখিয়ে বলেন, তিন অক্ষরের ‘মা-রা-মা’ ছিল আরাকানের মানুষের নিজেদের পুরনো নাম, আর দুই অক্ষরের ‘ম্রান-মা’ ছিল বর্মিদের। 1798 সালে বোমাং প্রধান বুখাননকে নিজেদের নাম বলেছিলেন ‘মা-রা-মা’।
ভাষার নাম মারমা। আন্তর্জাতিক কোড-তালিকা ISO 639-3-এ মারমা (rmz) ও রাখাইন (rki) আলাদা দুটি ভাষা, দুটি কোডই 2008 সালে তৈরি। গ্লটোলগ মারমাকে “Arakanese-Marma” উপদলে রাখে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া মারমাকে আরাকানি ভাষার রূপ হিসেবে দেখায়। ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সবাই একমত, পৃথক ভাষা কি না তা নিয়ে নয়।
2022 সালের জনশুমারিতে সারা দেশে রাখাইন 11,197 জন (শুমারির বানান Rakhain)। প্রধান বসতি কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনায়; তিন পার্বত্য জেলায় 1,398 জন (রাঙামাটি 568, খাগড়াছড়ি 475, বান্দরবান 355)। পটুয়াখালী-বরগুনায় সংখ্যা দ্রুত কমেছে: কারিতাসের 2014 সালের জরিপে মাত্র প্রায় 2,561 জন।
হ্যাঁ। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950-এর ধারা 97 আদিবাসী রায়তের জমি হস্তান্তরে বাধা দেয়, আর তার তালিকায় আছে “Maghs (Bakerganj District)”, বাংলা পাঠে “মগ (বাকেরগঞ্জ জেলা)”। এই ধারাতেই পটুয়াখালীর রাখাইনদের জমি সুরক্ষার বিধান। অথচ 2019 সালের সরকারি গেজেটে একই মানুষদের নাম ‘রাখাইন’, ‘মগ’ নামে কোনো জাতি নেই।
প্রবাদটির মানে অরাজক বা যথেচ্ছাচারের দেশ। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলার 2019 সালের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আক্ষরিক অর্থে ‘মুলুক’টি আরাকান বা মিয়ানমার, আর অরাজকতার অর্থ এসেছে ষোলো-সতেরো শতকে বাংলার উপকূলে আরাকান-ঘাঁটির জলদস্যুদের আক্রমণের স্মৃতি থেকে। নৃবিজ্ঞানী প্রশান্ত ত্রিপুরা দেখান, এই প্রবাদ ও পাঠ্যবই মিলে আজকের মারমা-রাখাইনদের প্রতি নামটিকে গালি বানিয়েছে।
হ্যাঁ। ভারতের জনজাতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তফসিলি জনজাতি তালিকায় ত্রিপুরা রাজ্যের 12 নম্বর নাম “Mag”। Kyaw Minn Htin-এর 2015 সালের প্রবন্ধ অনুযায়ী ত্রিপুরার এই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের ‘মগ’ বা কখনো ‘ম্রাইমা’ বলে পরিচয় দেন এবং নিজেদের আরাকানি বংশোদ্ভূত মনে করেন। বাংলাদেশে পরিস্থিতি উল্টো: এখানকার মারমারা নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আমাদের আর্কাইভ (জুমজার্নাল)
সরকারি নথি ও আইন
গবেষণা, বিশ্বকোষ ও ভাষা-ডেটাবেস
প্রতিবেদন ও সংবাদমাধ্যম
সর্বশেষ হালনাগাদ: 17 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী, বোমাং সার্কেল, মারমা, রাখাইন
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।