Last updated Oct 6th, 2026
2

আমাদের ম্রো জাতিতে একটি নির্দিষ্ট ডাক নাম রয়েছে। আমাদের একটি নির্দিষ্ট জাতির ডাক নাম হচ্ছে “ম্রো”। কিন্তু ভিন্ন জাতিরা আমাদেরকে বিভিন্ন রকমের নামে ডাক দিয়ে থাকেন যা ম্রো, মুরং, মুরুং, ম্র নামে। এর বিশেষ কারণ কি?
ক. পার্বত্য চট্টগ্রাম সাধারণ জ্ঞান বইয়ের একটি ডায়েরিতে দেখলাম “মুরং” জাতি উল্লেখ্য রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ডায়েরিতে ম্রো জাতির সম্পর্কে যেগুলো উল্লেখ্য রয়েছে সব তথ্য সূত্রে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রাংলাই ম্রো ও আওয়ামী লীগের সদস্য সিংইয়ং ম্রো।

#বাঙ্গালীঃ “মুরং” ডাকটা হচ্ছে বাঙ্গালীদের চাপিয়ে দেওয়া নাম। সাধারণত বাঙ্গালীরা ম্রো জাতিকে মুরং/মুরংগিয়া বলে ডাকেন। এটি খুব একটা নিচু মনে আমাদের জাতিকে ডাকা হয়েছে যা জাতির মানহানি বলা যায়।
★মারমাঃ সাধারণত মারমা জাতিরা আমাদের জাতিকে “ম্র” নামে ডাকেন। কিন্তু “ম্র” প্রতি শব্দ কি তা জানিনা।
★ত্রিপুরাঃ ত্রিপুরা জাতিরা আমাদের জাতিকে মুরুং নামে ডাকেন। কারণ ম্রো ব্যক্তিরা অন্যেকে নিজের নামের শেষে “মুরুং” টাইটেল দিয়ে থাকেন। এর ফলে ত্রিপুরা জাতিরা ম্রো আদিবাসীকে “মুরুং” হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে।
★চাকমাঃ অন্যেকে চাকমা জাতিরা ম্রো জাতিকে চিনেন না। চেনা অচেনা আমার অনেক জনের চাকমা আদিবাসীদের সাথে প্রায় ফেসবুকে কথা হয়। তারা জিজ্ঞেস করতেন আমি কোন জাতি। পরিচয় দিলাম আমি “ম্রো” জাতি। তারা বলে ম্রো জাতি মানে? এটা কি বাঙ্গালী জাতি? আমি বললাম “না”। ম্রো একটি জাতির নাম অর্থাৎ পাহাড়ি আদিবাসী “ম্রো আদিবাসী”। চাকমা ছাড়াও আরো অনেক জাতি রয়েছে যা ম্রো জাতির নাম কোনদিন শোনেননি। দুঃখের বিষয় বটে।
★খুমিও বম জাতিঃ খুমি জাতিরাও আমাদের জাতিকে “ম্র” হিসেবে সম্বোধন করে থাকেন। কিন্তু খুমি জাতিদের সাথে ম্রো জাতিদের রীতিনীতি প্রায় মিল দেখা যায়। যেমন, বিয়ের রীতিনীতিতে রয়েছে একটি বিশেষ নিয়ম। ম্রো আদিবাসী পুরুষেরা বিয়ে করলে কন্যার পিতামাতাকে রুপা পয়সা বা টাকা দিতে হয়, ঠিক তেমনি খুমি জাতি পুরুষেরা বিয়ে করলে কন্যার পিতামাতাকে রুপা পয়সা বা টাকা দিতে হয়।
এদিকে বম জাতিরাও আমাদেরকে “ম্র” নামে ডাকে। তবে বম জাতিদের সাথে ম্রো জাতির কিছু কিছু ক্ষেত্রে রীতিনীতি খুব মিল রয়েছে।
খ. মুরং, মুরুং, ম্র নাকি ম্রোঃ
উত্তরঃ ম্রো ।
ম্রো অর্থ মানুষ। ম্রো অর্থ একটি জাতির বিশেষ ডাক নাম। ম্রো মানে পাহাড়ি, পাহাড়ে বসবাসরত আদিবাসী।
গুগল সাইটে যেটা পাবেন—–
*Mru- ম্রো
Mru ছাড়া কোন ওয়ার্ড ভাসবে না।
MRU-ম্রো√√
“”””””””””””
ভুল ডাক নাম👇
©Murong-মুরং[×]
©Murung-মুরুং [×]
©Mro-ম্র [×]
যেগুলো × ক্রস চিহ্ন দিলাম সেগুলো অন্য জাতিগোষ্ঠীরা ভুলে আমাদেরকে চাপিয়ে দেওয়া ডাক নাম।

গ. আরো সেই পার্বত্য চট্টগ্রাম ডায়েরিতে ম্রো জাতিদের সম্পর্কে অনেক কিছু উপস্থাপন করেছে তা দেখে আমার মাথা ঘুরে গেলো। মাথা ঘুরে যাওয়ার কারণ পার্বত্য চট্টগ্রাম ডায়েরিতে লেখা রয়েছে যে, ম্রো জাতিদের প্রিয় খাদ্য নাকি নাপ্পি 😂। লেখাটি দেখে মাথা গরম😠 হয়ে গেলো আমার।
সমাধানঃ হ্যা নাপ্পি সব আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের প্রিয় খাদ্য। কিন্তু নাপ্পি কোন বিশেষ প্রিয় খাদ্য নয়। নাপ্পি হচ্ছে তৈল মসলা হিসেবে আদিবাসীরা ব্যবহার করে থাকে অর্থাৎ শুধুমাত্র তরকারি রান্নার কালে তরকারির সাথে মিশে রান্না করা হয় যাতে তরকারির স্বাদটা বাড়ে।
উত্তরঃ ম্রো আদিবাসীদের সবচেয়ে বেশি প্রিয় খাদ্য হলো ভাত, মুরগী, শূকর মাংস ও শুটকি মাছ।
ঘ. ম্রো জাতিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম বসবাস। তথা ১৪১৪ সালে মায়ানমার হইতে প্রথম চট্টগ্রামে প্রবেশ করেন। তারপর থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে গ্রামাঞ্চল গড়ে উঠে। ম্রো জাতিরা সাধারণত প্রথম বসবাস পার্বত্য চট্টগ্রামে। তখন পার্বত্য এলাকায় কোন শাসকগোষ্ঠী বাস করতো না। জিয়া-এরশাদ আমল হইতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালী জাতিসত্তা অনুপ্রবেশ হলে ম্রো জনগোষ্ঠীরা পার্বত্য চট্টগ্রাম সদর হইতে গহীন অরণ্যে চলে যায় যা বর্তমানে বান্দরবান জেলা হিসেবে পরিচিত। ম্রো আদিবাসীদের বর্তমান বসবাস পার্বত্য চট্টগ্রাম বান্দরবান জেলায় বিভিন্ন উপজেলায় যথা বান্দরবান জেলা সদর, চিম্বুক, তংকাবতী, থানচি উপজেলা, আলীকদম উপজেলা, লামা উপজেলা, রুমা উপজেলা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় বসবাসরত রয়েছে। ম্রো জনগোষ্ঠীদেরকে সদরে খুব কমই দেখা যায়। তারা গভীর জঙ্গলে বসবাস করতে ভালোবাসে। কারণ সদরে বেঁচে থাকার তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সদরে বসবাস করলে জুম চাষ করার সুযোগ পাই না। ম্রো জনগোষ্ঠীরা বেঁচে থাকার জন্য জুম চাষের উপর নির্ভরশীল।
ঙ. ম্রো জাতিরা জুম চাষের উপর নির্ভরশীল। ম্রো জাতিরা খুব পরিশ্রমী জাতি। বিশেষ করে পুরুষের চেয়েও ম্রো নারীরা খুব বেশি পরিশ্রম করে থাকেন। ম্রো আদিবাসী নারীরা শুধু জুম চাষ নয়, জুম থেকে ফিরেও বাড়িতে নানা ধরনের কাজ করে থাকেন, রান্নাবান্না থেকে শুরু করে বাড়িঘর পরিস্কার করা, পানি সংগ্রহ করা ও অবসর সময়ে নিজস্ব জাতির শিল্প কাপড়, কম্বল, আশাক-পোশাক বুনে থাকেন। তার পাশাপাশি পুরুষেরাও কম পরিশ্রম করেনি। পাহাড় অঞ্চলে বসবাসরত ম্রো জনগোষ্ঠী পুরুষেরা নিজেদের ব্যবহারের জন্য “থ্রং” ঝুড়ি বা বাঁশের বেত দ্বারা নানা ধরনের ব্যাগ ও ঝুড়ি বানিয়ে থাকেন।
ম্রো আদিবাসীদের বেঁচে থাকার জন্য জুম চাষের উপর নির্ভর করেন। জুম চাষের পাশাপাশি জুমে বিভিন্ন ফলের চাষও করে থাকেন। যেমন, ভুট্টা, গম, সাদা কুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, মারফা, শশা, মরিচ, আদা, হলুদ চাষ ইত্যাদি।

চ. ম্রো আদিবাসীদের প্রধান উৎসব গো হত্যা অনুষ্ঠান। ম্রো সমাজের সবচেয়ে বড় সংস্কৃতি অনুষ্ঠান হলো গো হত্যা। অর্থাৎ গরুকে সেল দ্বারাই হত্যা করা হয়। এবং এই অনুষ্ঠানে সকল জাতিরা অংশগ্রহণ করতে পারেন। এই অনুষ্ঠানে সকল জাতিস্বত্তাকে নিমন্ত্রণ দিয়ে থাকে। এই অনুষ্ঠানে গরু ছাড়াও শূকর, মুরগীও কাটে এবং শুটকি মাছসহ তাজা মাছও রান্না করে সবাইকে খাওয়ায়।
এই অনুষ্ঠানে নারী পুরুষেরা তাদের নিজস্ব বাশি (প্লুং) বাজিয়ে নাচ গান করে থাকেন। নাচে গানে নারী পুরুষের কোন ভেদাভেদ নেই। এছাড়াও বিবাহিত ও অবিবাহিত নারী পুরুষরা এই অনুষ্ঠানে নাচ গান করতে পারবেন। এই উৎসব সাধারণত বেশিরভাগ শীতকালীন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
প্রসঙ্গ:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।