Jumjournal Logo

খাগড়াছড়ির বাঁশ শিল্প কেন বিলুপ্তির পথে: প্লাস্টিক, বাঁশের অভাব আর কারিগরের হিসাব

Last updated Nov 3rd, 2026

2

টেবিলে সাজানো বাঁশ ও বেতের তৈরি কলসি-আকৃতির ঝুড়ি, খোলা বুননের চৌকো ঝাঁপি, মাছ ও কাঁকড়া ধরার ফাঁদ, প্রতিটির গায়ে নামের লেবেল

খাগড়াছড়ির বাঁশ শিল্প কেন বিলুপ্তির পথে, তার উত্তর জেলার সংবাদ-প্রতিবেদনগুলো প্রায় একই সুরে দেয়: সস্তা প্লাস্টিকের জিনিস বাঁশ-বেতের ঝুড়ি, কুলা, চালুনির জায়গা নিয়েছে, অথচ কাঁচা বাঁশের দাম বেড়েছে, বাঁশঝাড় কমেছে, আর কারিগরের হাতে পুঁজি নেই, পণ্যের ন্যায্য দামও নেই। এর সঙ্গে আলাদা দুটি ঘটনা যোগ করে অন্য উৎস: 2007–2008 সালে বাঁশে ফুল এসে বাঁশঝাড় মরে যাওয়া, আর বর্ষায় বাঁশ কোড়ল কেটে বিক্রি।

কারণগুলো কে বলছেন, সেটাও জানা দরকার। দৈনিক ইনকিলাব (জানুয়ারি ও জুন 2022) কথা বলেছে মাটিরাঙ্গা ও পলাশপুরের কারিগর আর এক পাইকারি ক্রেতার সঙ্গে; এশিয়ান টিভি ও ভয়েস সেভেন নিউজে একই দিনে (22 জুন 2024) ছাপা একটি প্রতিবেদন কথা বলেছে জেলার বিভিন্ন এলাকার লোকজনের সঙ্গে; দ্য ডেইলি স্টার (2008, 2012) কথা বলেছে বন কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আর বাঁশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। নিচে প্রতিটি কারণের পাশে তার উৎস রাখা আছে, যাতে কোন দাবি কোথা থেকে এসেছে তা পাঠক নিজেই মেলাতে পারেন।

এই লেখা বাঁশের খাবার, বাঁশের বাদ্যযন্ত্র বা পাহাড়ি পণ্যের জিআই নিবন্ধনের গল্প আবার বলে না; সেগুলোর জন্য আলাদা লেখা আছে, যথাস্থানে লিংক দেওয়া। এখানে প্রশ্ন একটাই: খাগড়াছড়িতে বাঁশ-বেতের হাতের কাজ কমছে কেন, আর কোন উৎস তা বলছে।

এই লেখায় যা আছে

  1. খাগড়াছড়ির বাঁশ শিল্প বিলুপ্তির পথে কেন: উৎসগুলো কোন কারণ বলে
  2. খাগড়াছড়িতে বাঁশ-বেতের কারিগর কারা, তাঁরা কী বানান
  3. জনগোষ্ঠী ধরে বাঁশ-বেতের জিনিসের নাম: আর্কাইভ কী রেখে গেছে
  4. প্লাস্টিক কি সত্যিই বাঁশের জিনিসের জায়গা নিয়েছে
  5. বাঁশ কমে গেল কেন: বাগান, পাহাড় আর বাঁশ কোড়ল
  6. বাঁশে ফুল আসার বছরগুলোতে খাগড়াছড়িতে কী হয়েছিল
  7. কাঁচা বাঁশের ব্যবসা: বাবুছড়ার বাজার আর বন বিভাগের অনুমতি
  8. বেত কোথায় গেল: বেতের মজুদ কমার হিসাব
  9. বাঁশ-বেতের জিনিস এখন কারা কেনেন, দাম কত পাওয়া যায়
  10. সরকারি সহায়তা কী আছে, কারিগরেরা কী চান
  11. নতুন নকশার বাঁশের কাজ: একজন কারিগরের উদাহরণ
  12. প্রশ্নোত্তর
  13. যা এখনো জানা যায়নি
  14. তথ্যসূত্র

খাগড়াছড়ির বাঁশ শিল্প বিলুপ্তির পথে কেন: উৎসগুলো কোন কারণ বলে

প্রকাশিত উৎসগুলো খাগড়াছড়ির বাঁশ শিল্পের পতনের পাঁচ ধরনের কারণ বলে: প্লাস্টিকের সহজলভ্যতা, বাঁশের অভাব ও দাম বৃদ্ধি, পুঁজি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়া, আর বাঁশঝাড় ধ্বংস (পাহাড় কাটা, বাঁশ কোড়ল তোলা, বাঁশে ফুল আসা)। কোন উৎস কোনটি বলে, নিচের ছকে আলাদা করা আছে।

ছকটি পড়ার আগে একটি কথা মনে রাখা দরকার। কারণগুলো এসেছে সংবাদ-প্রতিবেদন থেকে, যেখানে কারিগর, ব্যবসায়ী বা কর্মকর্তা নিজের অভিজ্ঞতা বলেছেন। খাগড়াছড়িতে কতজন বাঁশ-বেতের কারিগর ছিলেন আর এখন কতজন আছেন, তার কোনো জরিপ কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। তাই “কতটা কমেছে” প্রশ্নের সংখ্যাভিত্তিক উত্তর নেই; আছে কেবল কারিগরদের মুখের বর্ণনা।

কারণ উৎস যা বলে উৎস
প্লাস্টিকের সহজলভ্যতাঘরে ঘরে বাঁশের জিনিসের জায়গা নিয়েছে প্লাস্টিক পণ্য; জুমচাষিদের মধ্যেও বাঁশ-বেতের জিনিসের ব্যবহার কমে আসছেদৈনিক ইনকিলাব, জানুয়ারি ও জুন 2022
বাজারে প্লাস্টিক সামগ্রীর দাপটচাহিদা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে প্লাস্টিকের দাপট, রক্ষণাবেক্ষণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবএশিয়ান টিভি / ভয়েস সেভেন নিউজ, 22 জুন 2024
বাঁশের অভাব ও দাম বৃদ্ধিপ্রয়োজনীয় বাঁশের অভাব, উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি; মূল উপকরণ বাঁশের দাম বাড়ায় কারিগরেরা পেশা ধরে রাখতে পারছেন নাদৈনিক ইনকিলাব, জানুয়ারি ও জুন 2022
বাঁশ-বেত প্রায় নেইএকসময় এ অঞ্চলের অনেকে বাঁশ-বেত দিয়ে জীবিকা চালাতেন, এখন বাঁশ-বেত “নেই বললেই চলে”এশিয়ান টিভি / ভয়েস সেভেন নিউজ, 2024
পুঁজির অভাবপলাশপুরের কারিগরেরা বলেছেন, পুঁজি আর উপকরণের অভাবে পেশা ধরে রাখার চেষ্টা থেমে গেছে; ঋণ সহায়তা চেয়েছেনদৈনিক ইনকিলাব, জানুয়ারি 2022
ন্যায্য দাম/মজুরি না পাওয়াউৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য মেলে না; তৈরি পণ্যের ন্যায্য মজুরি পাওয়া যায় নাদৈনিক ইনকিলাব, জানুয়ারি 2022; এশিয়ান টিভি / ভয়েস সেভেন নিউজ, 2024
পাহাড় কাটাদীঘিনালা, পানছড়ি ও মাটিরাঙ্গার টিলায় একসময় নানা জাতের বাঁশ জন্মাত; নির্বিচারে পাহাড় কাটায় বাঁশের বংশবিস্তার কমেছেদৈনিক ইনকিলাব, জুন 2022
বাঁশ কোড়ল ধ্বংসনির্বিচারে বাঁশ কোড়ল ধ্বংসের কারণে বাঁশের বংশবিস্তার কমছে; নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কোড়ল কাটায় উৎপাদন হুমকিতেদৈনিক ইনকিলাব, জানুয়ারি 2022; দ্য ডেইলি স্টার, জুলাই 2012
বাঁশে ফুল আসাআট উপজেলার প্রায় 45টি গ্রামে বাঁশঝাড় ফুল-ফল দিয়ে মরে যাচ্ছিলদ্য ডেইলি স্টার, মার্চ 2008

দুটি ইনকিলাব প্রতিবেদনের বড় অংশ একই রকম, কিন্তু বাঁশ কমার কারণ বলতে গিয়ে আলাদা কথা বলে: জানুয়ারির লেখা দায়ী করে “নির্বিচারে বাঁশ কড়ুল ধ্বংস”-কে, জুনের লেখা দায়ী করে “নির্বিচারে পাহাড় কাটা”-কে। দুটোই নিচে আলাদা অংশে আছে।

খাগড়াছড়িতে বাঁশ-বেতের কারিগর কারা, তাঁরা কী বানান

সংবাদ-প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির যে কারিগরদের নাম এসেছে, তাঁরা মাটিরাঙ্গার আদর্শ গ্রাম ও পলাশপুর এলাকার, আর একজন খাগড়াছড়ি সদরের যৌথ খামার সাতভাইয়াপাড়ার। তাঁদের হাতে তৈরি জিনিসের তালিকায় আছে চাটাই, কুলা, ডালা, চাঙারি, টুকরি, ওড়া, চালুনি, খালই, ঝুড়ি, খাঁচা, মোড়া, মাছ ধরার চাঁই আর মাথাল।

দৈনিক ইনকিলাবের জুন 2022-এর প্রতিবেদনে মাটিরাঙ্গার আদর্শ গ্রামের বাঁশ শিল্প কারিগর মো. রহমত আলী নিজেই বাঁশ-বেতের পণ্য বানিয়ে হাটবাজারে বিক্রি করতে আসেন বলে উল্লেখ আছে। একই প্রতিবেদনে কারিগর মো. দুলাল মিয়া, আয়েশা আক্তার ও রহিমা বেগম কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার কথা বলেছেন; জানুয়ারির প্রতিবেদন তাঁদের এলাকা হিসেবে পলাশপুরের নাম দেয়। দুই প্রতিবেদনই বলে, একসময় ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামে বাঁশের চটা দিয়ে নানা জিনিস তৈরি হতো, আর পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এ কাজ করতেন। বিক্রি হতো সাপ্তাহিক হাটবারে, এমনকি বাড়ি বাড়ি ফেরি করে।

এশিয়ান টিভি ও ভয়েস সেভেন নিউজে প্রকাশিত বিপ্লব তালুকদারের প্রতিবেদন (22 জুন 2024) খাগড়াছড়ির হাটে কারিগরদের সাজিয়ে রাখা পণ্যের লম্বা তালিকা দেয়: কুলা, চালুন, খাঁচা, মাচা, মই, চাটাই, ঢোল, গোলা, ওড়া, বাউনি, ঝুড়ি, ডুলা, মোড়া, মাছ ধরার চাঁই, মাথাল, সোফাসেট আর বইপত্র রাখার র‍্যাক। প্রতিবেদনটি একই সঙ্গে বলে, জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার “গুটি কয়েক মানুষ” জীবিকার তাগিদে এখনো এই শিল্প আঁকড়ে আছেন।

এই প্রতিবেদনগুলোতে যে কারিগরদের নাম এসেছে, তাঁদের কারও জনগোষ্ঠী-পরিচয় প্রতিবেদন আলাদা করে লেখেনি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব বাঁশ-বেতের কাজের বিবরণ পাওয়া যায় জুমজার্নাল আর্কাইভের জনগোষ্ঠী-পরিচিতিগুলোতে, যা পরের অংশে আছে। খাগড়াছড়ি জেলার মোটামুটি পরিচয়, উপজেলা আর জনসংখ্যার হিসাব আছে খাগড়াছড়ি জেলার পরিচিতি লেখায়।

মেঝেতে রাখা অসমাপ্ত ঝুড়ির তলা, কেন্দ্র থেকে চারদিকে ছড়িয়ে আছে বাঁশের সরু ফালি
পাক্কোন: কেন্দ্র থেকে তারার মতো ছড়ানো বাঁশের ফালি, এখান থেকে ঝুড়ির তলা গড়ে ওঠে। ছবি: বাপ্পি চাকমা · আলোকচিত্রীর অনুমতিতে জুমজার্নালে প্রকাশিত

জনগোষ্ঠী ধরে বাঁশ-বেতের জিনিসের নাম: আর্কাইভ কী রেখে গেছে

জুমজার্নাল আর্কাইভের জনগোষ্ঠী-পরিচিতিগুলোতে চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, খিয়াং, খুমী ও পাংখোয়াদের বাঁশ-বেতের জিনিসের নিজস্ব নাম লেখা আছে, কোথাও চল্লিশটির বেশি। খাগড়াছড়ি জেলায় চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা, এই তিন জনগোষ্ঠীর বড় বসতি; তবে আর্কাইভের লেখাগুলো জনগোষ্ঠীর বিবরণ, কোনো একটি জেলার নয়।

ছকটিতে কেবল সেই নামগুলো আছে যেগুলোর পাশে উৎস নিজে বলেছে যে জিনিসটি বাঁশ বা বেতের। যেখানে উৎস কেবল নামের তালিকা দিয়েছে, উপাদান বলেনি, সেখানে তা আলাদা করে লেখা আছে। এক জনগোষ্ঠীর জিনিসের নাম বা ব্যবহার অন্য জনগোষ্ঠীর বেলায় খাটানো যায় না।

জনগোষ্ঠী উৎসে যে নাম ও কাজ আছে উৎস (জুমজার্নাল আর্কাইভ)
ত্রিপুরাধান ও শস্য রাখার পাত্র: মং, কচা, কৗবাং, জাংগা, ফালা, চেমাই, লাই, য়াম, দালকি, লংগাই; ধান-চাল মাপার: টন বা তুঙ, সেরি; কাপড় বোনার: থুরি, পাইরেং, রিখুক্র, রিখ্রোক, বেংকে, বুমুল ওয়াফ্রি; হাঁস-মুরগি রাখার: তাখোক, বেংগলা, মাওচাঁ, ওয়াউগ্রো; মাছ শিকারের: লুসি, বাংবু, চপ্রা, চৈ, দুলা, বারাইত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত
চাকমাফুলবারেং (বাঁশের এক প্রকার ঝুড়ি, বিয়েতে কনের কাপড় ও অলংকার নিতে); থুরুং, সামো (বীজঝুড়ি); দুলো, লুদুং (বাঁশের খোলা পাত্র); তাগলক (পশুপাখি তাড়ানোর লম্বা বাঁশের শব্দযন্ত্র); বাদোল (বাঁশ বা বেতের গুলতি-ধনুক)চাকমা জাতি; সুযশ চাকমা, “চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জুমচাষ”
চাকমা (নামের তালিকা, উপাদান আলাদা করে বলা নেই)গৃহস্থালির জিনিস, যা “গাছ ও বাঁশ বা বিভিন্ন ধরণের ফল থেকে” তৈরি: দাবা, দুলো, লুদুঙ, মেজাঙ, ফুরবারেঙ, পিদে কাল্লোঙ, চুমো, সাম্মো, কুলো, জুমোর, ধুলোন প্রভৃতি 28টি নামচাংমাটারা: চাকমা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
মারমাঝুড়ি তৈরির কাজ পুরুষেরা করেন; বাড়ির ধান রাখা হয় বাঁশের তৈরি আধারে; বাজারে বিক্রির দ্রব্যের মধ্যে ঝুড়ি আছে, যার অধিকাংশ বিক্রি হয় দালাল ও মহাজনের মাধ্যমেমারমা জাতির আদ্যোপান্ত
তঞ্চঙ্গ্যা (নামের তালিকা, উপাদান আলাদা করে বলা নেই)তৈজসপত্র: কুরুম, কাল্লোং, ডিঙারা, বারেং, কুলা, চালোইন, মেচাং, পাত্ত্যং; বুননের কাজে: ব্যং থুরচুমা, বগলা, সাম্মেয়া, ফুলবারেং, তলইতঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত
খিয়াংবনের বাঁশ ও বেত দিয়ে বাঁশের ঝুড়ি তৈরিতে দক্ষ; থুরুং (ঝুড়ি)খিয়াং জাতির আদ্যোপান্ত
খুমীবাঁশের থ্রুং ও গ্রুং (ঝুড়ি); দামি পোশাক ও অলংকার রাখার টেকসই ঝুড়ি; শুকানোর কাজে ব্যবহৃত তলয়; মাছ ধরার চেউংখুমী জাতির আদ্যোপান্ত
পাংখোয়াথুড়ং (বাঁশের ঝুড়ি), যার ভেতরে ধানের আঁটি আছড়ে ধান ঝরানো হয়; বিয়েতে কনে সঙ্গে নেন ঝুড়ি, থুরুং (লান) ও ফুলবারেং (ডেমফর)পাংখোয়া জাতির আদ্যাপান্ত

ত্রিপুরা পরিচিতিটি সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলে: ত্রিপুরা জাতির বাঁশ ও বেত শিল্প “বেশ সমৃদ্ধ”, জীবন-জীবিকার বেশিরভাগ প্রয়োজনীয় সামগ্রী বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি হয়। একই লেখা জানায়, কেরপূজার জন্য বাঁশ কেটে ও বেত দিয়ে নানা ধরনের নকশা তৈরি করা হয়। অর্থাৎ বাঁশ-বেতের কাজ কেবল ঘরের জিনিস নয়, আচারেরও অংশ।

জুমচাষে কোন ধাপে কোন ঝুড়ি লাগে, তার হিসাব আছে আর্কাইভের পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে আদিবাসী লোকজ্ঞান লেখায়: ধান কেটে থুরুং ভরে জুমঘরে নেওয়া, তলই (চাটাই) আর থুরুং দিয়ে মাড়াই, আর ঝুড়ির ভেতরে শুকনো কলাপাতা বা কুরক পাতা বিছিয়ে বীজধান রাখা। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইনকিলাবের প্রতিবেদনও বলে, বাঁশ-বেতের জিনিসের প্রধান ক্রেতা এখন জুমচাষি ও কৃষিজমিতে কাজ করা মানুষ।

বাঁশের ঝুড়ি থেকে বাঁশের বাদ্যযন্ত্র পর্যন্ত একই উপাদানের আরেকটি ধারা আছে, যা এখানে আবার বলা হলো না; কোন যন্ত্র কোন জনগোষ্ঠীর, কী দিয়ে তৈরি, তার পূর্ণ ছক আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাদ্যযন্ত্রের তালিকা লেখায়।

প্লাস্টিক কি সত্যিই বাঁশের জিনিসের জায়গা নিয়েছে

খাগড়াছড়ি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিটি প্রতিবেদন প্লাস্টিককে প্রধান কারণ বলে। দৈনিক ইনকিলাব (জুন 2022) লিখেছে, একসময় গ্রামের ঘরে ঘরে বাঁশের তৈরি জিনিস দেখা গেলেও “এখন সে জায়গা নিয়েছে প্লাস্টিক পণ্য”। জুমজার্নাল আর্কাইভেও একটি নির্দিষ্ট জিনিসের বদলে যাওয়ার কথা আছে: চাকমা বিয়ের ফুলবারেং-এর জায়গায় এখন স্যুটকেস ব্যবহার হয়।

ইনকিলাবের জানুয়ারি 2022-এর প্রতিবেদনে মাটিরাঙ্গার কারিগর মো. রহমত আলী কারণটি সরাসরি বলেছেন: লোকজন এখন প্লাস্টিক পণ্যের দিকে ঝুঁকছে, ফলে বাঁশের জিনিস আগের মতো ব্যবহার হচ্ছে না। একই প্রতিবেদনে স্থানীয় পাইকারি ক্রেতা মো. আলী আশরাফ বলেছেন, একসময় প্রত্যেক বাড়িতে বাঁশের জিনিস ছিল, চাহিদা ছিল ব্যাপক, কিন্তু প্লাস্টিক পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শিল্পটি টিকতে পারছে না। জুনের প্রতিবেদনে রহমত আলীর আরেকটি কথা আছে: প্লাস্টিকের সহজলভ্যতার কারণে বাঁশ-বেত শিল্প হয়তো একেবারে হারিয়ে যাবে।

জুমের কাজে প্লাস্টিক ঢুকছে কি না, সে প্রশ্নে ইনকিলাব (জুন 2022) বলে, জুমচাষিদের প্রধান উপকরণ হিসেবে বাঁশ-বেতের জিনিস এখনো টিকে আছে, তবে প্লাস্টিকের সহজলভ্যতায় সেখানেও কমে আসছে। কোন জিনিসটি কোন প্লাস্টিক পণ্যে বদলেছে, যেমন থুরুং-এর বদলে প্লাস্টিকের বস্তা না বালতি, তার কোনো তালিকা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

নিচের ছবিটি একটি ছোট কিন্তু স্পষ্ট দৃশ্য দেখায়। বাঁশে বোনা কাল্লোং ঝুড়ির মুখের কিনারা বাঁধা হয়েছে চেরা বেতের পাশাপাশি হলুদ প্লাস্টিকের দড়ি দিয়ে; বহনের ফিতাটি গাছের বাকলের।

ব্যবহারে পুরোনো একটি কল্লোং ঝুড়ি, মুখের কিনারা বেত আর হলুদ প্লাস্টিকের দড়িতে বাঁধা, সঙ্গে গাছের বাকলের বহন-ফিতা
কল্লোং (আর্কাইভের বানানে কাল্লোং): ব্যবহারে পুরোনো বহনের ঝুড়ি; মুখের কিনারা চেরা বেত আর হলুদ প্লাস্টিকের দড়িতে বাঁধা। ছবি: বাপ্পি চাকমা · আলোকচিত্রীর অনুমতিতে জুমজার্নালে প্রকাশিত

বাঁশ কমে গেল কেন: বাগান, পাহাড় আর বাঁশ কোড়ল

খাগড়াছড়িতে কাঁচা বাঁশ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে উৎসগুলো তিনটি কথা বলে: বড় বাঁশবাগান আর চোখে পড়ে না (ইনকিলাব), পাহাড় কাটায় বাঁশের বংশবিস্তার কমেছে (ইনকিলাব, জুন 2022), আর বর্ষায় বাঁশ কোড়ল কেটে খাওয়া ও বিক্রি করায় নতুন বাঁশ বাড়তে পারছে না (ইনকিলাব, জানুয়ারি 2022; দ্য ডেইলি স্টার)।

ইনকিলাবের দুই প্রতিবেদনই লেখে, একসময় খাগড়াছড়ির বিভিন্ন জনপদে বড় বড় বাঁশবাগান দেখা যেত, এখন আর চোখে পড়ে না। জানুয়ারির প্রতিবেদন এই তথ্য নিয়েছে দীঘিনালা, পানছড়ি ও মাটিরাঙ্গার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে: পাহাড়ি টিলায় একসময় নানা জাতের বাঁশ জন্মাত, আর সেই বাঁশ দিয়ে জিনিস বানিয়েই স্থানীয়রা জীবিকা চালাতেন।

বাঁশ কোড়ল তোলা নিয়ে বন বিভাগ ও কৃষি বিভাগ কী বলে

দ্য ডেইলি স্টারের জুলাই 2012-এর প্রতিবেদন (কাফিল মাহমুদ, খাগড়াছড়ি) জানায়, বর্ষায় কোড়ল গজানোর সময় খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের বন কর্মকর্তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের 25টি উপজেলায় জুন থেকে তিন মাসের জন্য সব ধরনের বাঁশ কাটা নিষিদ্ধ করেছিলেন। তবু নজরদারি ও প্রচারের অভাবে কোড়ল কেটে বাজারে বিক্রি বেড়েছে বলে প্রতিবেদনের দাবি। খাগড়াছড়ি বাজারের 15 বছরের এক বাঁশ ব্যবসায়ী বলেছেন, কোড়ল তোলার কারণে প্রতি বছর বাঁশের উৎপাদন কমছে।

একই প্রতিবেদনে জেলার এক ঠিকাদার বাঁশের দাম জানিয়েছেন: ভালো মানের একটি বাঁশ 150 থেকে 170 টাকা, আর 100টি মুলি বাঁশের এক আঁটি 1,000 থেকে 1,200 টাকা; আগের বছরের তুলনায় দাম প্রায় 30 শতাংশ বেড়েছে। খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বলেছেন, কর্ণফুলী পেপার মিল এই এলাকার বাঁশের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল, আর বাঁশের অভাবে মিলটি বন্ধ হওয়ার মুখে।

দ্য ডেইলি স্টারের আরেকটি প্রতিবেদন (জসিম মজুমদার, খাগড়াছড়ি; অনলাইন সংস্করণে প্রকাশের তারিখ দেওয়া নেই) জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোড়ল তোলার নিষেধাজ্ঞার কথা বলে। বন ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনটি জানায়, বর্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বন থেকে অন্তত 1.5 কোটি টাকার কোড়ল তোলা হয়, যা পূর্ণ বাঁশ হলে 15 কোটি টাকার বাঁশ হতো; শুধু খাগড়াছড়িতে 100টির বেশি বাজারে দিনে অন্তত 10,000 কেজি কোড়ল বিক্রি হয়। প্রতিবেদক বাবুছড়া, দীঘিনালা, মেরুং, লক্ষ্মীছড়ি, মহালছড়ি, রামগড় ও পানখাইয়াপাড়াসহ জেলার বিভিন্ন বাজারে কোড়ল বিক্রি হতে দেখেছেন।

কোড়লের অন্য দিকটাও একই প্রতিবেদনে আছে। গোলাবাড়ির এক মারমা নারী বলেছেন, বাঁশ কোড়ল ঐতিহ্যগতভাবেই তাঁদের প্রিয় খাবার, আইন করে বন্ধ করলে মানা কঠিন হবে। জেলা বন কর্মকর্তা বলেছেন, কেবল আইন দিয়ে খাবার হিসেবে কোড়লের ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না, দরকার ব্যাপক সচেতনতা আর বাঁশের আরও লাভজনক বহুমুখী ব্যবহার। কোড়ল যে পাহাড়ের খাদ্যতালিকায় কতটা গভীরে, কোন জনগোষ্ঠী কীভাবে রাঁধে, সে আলোচনা আছে পাহাড়ের বুনো খাবার লেখায়।

বাঁশে ফুল আসার বছরগুলোতে খাগড়াছড়িতে কী হয়েছিল

দ্য ডেইলি স্টার মার্চ 2008-এ খাগড়াছড়ি থেকে জানায়, জেলার আট উপজেলার প্রায় 45টি গ্রামে বাঁশঝাড় ফুল ও ফল দিয়ে শুকিয়ে মরে যাচ্ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী খাগড়াছড়ির বাঁশের দুই-তৃতীয়াংশ জন্মায় দীঘিনালা, মহালছড়ি, পানছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি ও মাটিরাঙ্গায়। কর্ণফুলী পেপার মিলের সূত্র তখন বলেছিল, বাঁশবন মরতে থাকলে মিলের সরবরাহে টান পড়তে পারে।

কমলছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রতিবেদককে বলেছিলেন, দুর্গম পাহাড়ের বেশিরভাগ আদিবাসী মানুষের প্রধান জীবিকা বাঁশ, আর তাঁর ইউনিয়নের প্রায় 7,000 পরিবার খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান পরিষদের তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি কর্মসূচির কথা ভাবছেন বলে জানিয়েছিলেন।

চক্রের দৈর্ঘ্য নিয়ে একই প্রতিবেদনেই দুই হিসাব আছে: এলাকার প্রবীণেরা বলেছেন 40 থেকে 50 বছর পরপর, আর মাটিরাঙ্গা ডিগ্রি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমান বলেছেন 25 থেকে 40 বছর পরপর; তাঁর হিসাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগে এমন ঘটেছিল 1943 ও 1980 সালে। দ্য ডেইলি স্টারের আগস্ট 2009-এর আরেকটি প্রতিবেদন বলছে, এই অঞ্চলে আগের সংকটটি হয়েছিল 1958 সালে, আর 2007-এর সংকটে রাঙামাটি ও বান্দরবান বেশি এবং খাগড়াছড়ির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। IRRI-র Rice Today (2010) এই ঘটনাকে mautam নামে উল্লেখ করেছে। বাংলাপিডিয়ার “Bamboo” নিবন্ধ জানায়, মুলি বাঁশ (Melocanna baccifera) চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের বনে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়, এ দিয়ে নানা হস্তশিল্প ও কম দামের আসবাব হয়, কাগজ ও মণ্ড শিল্পেও এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত; আর বেশিরভাগ বাঁশ প্রজাতি একযোগে ফুল দেওয়ার পর মরে যায়। চক্রটি নিয়ে আরও উৎসের হিসাব আছে পাহাড়ের বুনো খাবার লেখার বাঁশে ফুল অংশে।

বাঁশ-নির্ভর জীবিকায় এর আঘাতের একটি সংখ্যা পাওয়া যায় রাঙামাটির সাজেক থেকে, খাগড়াছড়ি থেকে নয়। BSS-এর বরাতে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, খাগড়াছড়িতে কার্যালয় থাকা এনজিও Alo-র নির্বাহী পরিচালক বলেছেন, সাজেকে 26 শতাংশ মানুষ বাঁশের ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন, ফুল আসার পর বাঁশ মরে যাওয়ায় তা নেমে আসে 6 শতাংশে। খাগড়াছড়ি জেলার জন্য এমন কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।

কাঁচা বাঁশের ব্যবসা: বাবুছড়ার বাজার আর বন বিভাগের অনুমতি

খাগড়াছড়িতে হাতের কাজ কমলেও কাঁচা বাঁশের ব্যবসা বড়। বাংলা ট্রিবিউন (মে 2020) দীঘিনালার বাবুছড়াকে দেশের অন্যতম বৃহৎ বাঁশের বাজার বলেছে: সেখানকার চারটি ঘাট থেকে প্রতিদিন অন্তত 24টি ট্রাক বাঁশ নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেত, আর এক অর্থবছরের 9 মাসে পাঠানো হয়েছিল 28 লাখ 44 হাজার বাঁশ।

বাবুছড়া বাঁশ কল্যাণ সমিতির বরাতে প্রতিবেদনটি জানায়, এই বাঁশ কাটা, পরিবহন ও লোডিংয়ে অন্তত 50 হাজার মানুষ যুক্ত। বাঁশ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি অরুন বিকাশ চাকমাও একই সংখ্যা বলেছেন। করোনার সময় রাঙামাটির বিভাগীয় বন অফিস বন্ধ থাকায় পরিবহনের অনুমতি মেলেনি, আর মাইনী নদীতে অন্তত 5 লাখ বাঁশ পড়ে ছিল; ব্যবসায়ীদের হিসাবে সাধারণত 50 টাকার একটি বাঁশ তখন 10 টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছিল।

পরিবহনের জন্য বন বিভাগের অনুমতি যে বাধ্যতামূলক, সেটি The Business Standard (মে 2020) স্পষ্ট লিখেছে: পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের সবচেয়ে বড় বাঁশ সরবরাহকারী, আর এখান থেকে অন্য জেলায় বাঁশ নিতে বন বিভাগের অনুমোদন লাগে। প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে প্রায় 6 কোটি টাকার বাঁশ পচে যাওয়ার কথা আছে। দ্য ডেইলি স্টারের 2012-এর প্রতিবেদন জানায়, 2010–11 অর্থবছরে শুধু খাগড়াছড়ির বন বিভাগ প্রায় 33 লাখ বাঁশ কাটার পারমিট দিয়েছিল, যা থেকে সরকারের রাজস্ব এসেছিল 28.48 লাখ টাকা।

আইনি কাঠামোটি দ্য ডেইলি স্টারের আইন পাতার একটি লেখায় (সেপ্টেম্বর 2020) সংক্ষেপে আছে: বন আইন 1927-এর অধীনে জারি করা Chittagong Hill Tracts Transit Rules, 1973 পার্বত্য তিন জেলার ভেতরে, ভেতরে আনা বা বাইরে নেওয়া কাঠ ও অন্যান্য বনজ সম্পদের পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করে। এর সঙ্গে আছে Forest Transit Rules, 2011। বিধিমালায় বাঁশের জন্য আলাদা হার বা প্রক্রিয়া কী, তা এই লেখায় নেই।

কাঁচা বাঁশ জেলার বাইরে চলে যাওয়ার সঙ্গে স্থানীয় কারিগরের বাঁশ না পাওয়ার সরাসরি কোনো সম্পর্ক কোনো উৎস টানেনি। দুটি তথ্যই আছে: একদিকে কারিগরেরা বাঁশের অভাব ও দাম বৃদ্ধির কথা বলছেন, অন্যদিকে বাবুছড়া থেকে লাখ লাখ বাঁশ বাইরে যাচ্ছে। দুটির মধ্যে যোগসূত্র নিয়ে কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের বন থেকে কাঠ, বাঁশ ও বেত কীভাবে কারখানায় যায়, তার বড় ছবিটি আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও জীবিকা লেখায়।

বেত কোথায় গেল: বেতের মজুদ কমার হিসাব

বাঁশ-বেতের কাজে বেত লাগে বাঁধন ও বুননে, আর সেই বেতের মজুদ দেশজুড়েই কমেছে। বাংলাপিডিয়ার “Cane” নিবন্ধ অনুযায়ী দেশে বেত উৎপাদন ছিল 1985–86 সালে 39 লাখ 38 হাজার ফুট, 1993–94 সালে নেমে আসে 29 লাখ 38 হাজার ফুটে। দেশে নথিভুক্ত 11 প্রজাতির বেতের মধ্যে চারটি এখন সহজে পাওয়া যায় না।

বাংলাপিডিয়া বলে, বেত সাধারণত জন্মায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের উত্তর-পূর্ব পাহাড়ি বনে। কাঠ ও বাঁশের পরেই বনজ সম্পদ হিসেবে বেতের গুরুত্ব, কিন্তু সম্পদটি কমছে, আর বন বিভাগ সম্প্রতি অনেক বনে বেত লাগানো শুরু করেছে বলে নিবন্ধটি জানায়। খাগড়াছড়ি জেলায় বেত কতটা কমেছে, তার আলাদা কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি; জেলার প্রতিবেদনগুলো কেবল বলে বাঁশ-বেত “নেই বললেই চলে” (এশিয়ান টিভি / ভয়েস সেভেন নিউজ, 2024)।

বেতের ব্যবহার কেবল ঝুড়িতে নয়। দ্য ঢাকা ট্রিবিউনের জানুয়ারি 2019-এর প্রতিবেদন পাহাড়ের মাচাং ঘর নিয়ে লিখেছে, আড়াআড়ি খুঁটিগুলো মূল খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হয় “বেত” দিয়ে, যা কচি বাঁশ থেকে তোলা ফালি। প্রতিবেদনটি বান্দরবান শহর থেকে 8 কিলোমিটার দূরের একটি পাড়ার, খাগড়াছড়ির নয়; তবে সেখানকার এক মারমা বাসিন্দা বলেছেন, বন থেকে বাঁশ ও গাছ সহজে মেলে না আর বাজারে বাঁশের দাম অনেক বেশি, তাই মাচাং ঘর কমছে।

বাঁশ-বেতের জিনিস এখন কারা কেনেন, দাম কত পাওয়া যায়

দৈনিক ইনকিলাব (জুন 2022) অনুযায়ী খাগড়াছড়ির হাটে বাঁশ-বেতের জিনিসের অধিকাংশ ক্রেতা জুমচাষি আর কৃষিজমিতে কাজ করা মানুষ, তবু বিক্রি আশানুরূপ নয়। রাঙামাটির কারিগরেরাও বাজারে জিনিস নিয়ে যান, কিন্তু দাম ও ক্রেতা না পেয়ে অনেকে পেশা ছেড়েছেন বলে একই প্রতিবেদন জানায়।

এশিয়ান টিভি ও ভয়েস সেভেন নিউজের 2024-এর প্রতিবেদন একটু ভিন্ন ছবি দেয়: সরেজমিনে দেখা গেছে, পাহাড়ি এলাকা ও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাটে বাঁশ-বেতের পণ্যের “কদর রয়েছে ব্যাপক”। একই প্রতিবেদন আবার বলে, তৈরি পণ্যের ন্যায্য মজুরি পাওয়া যাচ্ছে না, আর ভাগ্যের উন্নতির জন্য খাগড়াছড়ির “প্রসিদ্ধ বাঁশ শিল্পীরা” বাপদাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন। হাটে চাহিদা আছে, কিন্তু কারিগরের ঘরে আয় পৌঁছায় না; দুই কথা একই প্রতিবেদনে পাশাপাশি আছে।

হাটে কারিগর কোন জিনিস কত টাকায় বেচেন, যেমন একটি কুলা বা একটি থুরুং-এর দাম, তা খাগড়াছড়ির কোনো প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। দামের একমাত্র সংখ্যা এসেছে নতুন নকশার শৌখিন বাঁশের কাজ থেকে, যা নিচে আলাদা অংশে আছে। মারমা পরিচিতি (জুমজার্নাল আর্কাইভ) আরেকটি কথা যোগ করে: মারমা গ্রামের ঝুড়ি, বোনা কাপড় ও অন্যান্য দ্রব্যের অধিকাংশ বিক্রি হয় দালাল ও মহাজনের মাধ্যমে।

পাহাড়ের হাতের কাজে কার হাতে কত দাম থাকে, সে হিসাব তাঁতের ক্ষেত্রে কিছুটা আছে। তিন পার্বত্য জেলার নারীদের বয়নশিল্প নিয়ে আর্কাইভের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও পাহাড়ি নারী লেখাটি বলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাহাড়ি নারীরা ন্যায্য দাম পান না, লাভের বেশিরভাগ যায় মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে। বাঁশ-বেতের পণ্যের বেলায় এমন কোনো আলাদা হিসাব পাওয়া যায়নি।

সরকারি সহায়তা কী আছে, কারিগরেরা কী চান

খাগড়াছড়ির বাঁশ-বেতের কারিগরদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সরকারি প্রকল্পের নথি পাওয়া যায়নি। যা আছে: ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তরিত প্রতিষ্ঠান, আর পরিষদগুলো এর মাধ্যমে নারীদের বয়ন ও বাঁশ-বেতের শিল্পে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বলে জুমজার্নাল আর্কাইভের একটি লেখা জানায়; খাগড়াছড়ির মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর বাঁশ ও বেতের ব্যাগ তৈরির প্রশিক্ষণ দেয় বলে 2026 সালের একটি প্রতিবেদনে আছে।

আর্কাইভের লেখাটি একই সঙ্গে সীমাবদ্ধতার কথাও বলে: পর্যাপ্ত অর্থ আর বাজারজাতকরণের সুযোগের অভাবে এ পেশার পাহাড়ি নারীরা আশানুরূপ সফল হচ্ছেন না, এমন অভিমত অনেকের। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে (মে 2026) UNB-র প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক জানিয়েছেন, নারীদের সেলাই, হস্তশিল্প আর বাঁশ ও বেতভিত্তিক ব্যাগ তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, এবং যোগ্য নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা বা ঋণ দেওয়া হবে।

কারিগরদের নিজেদের চাওয়া প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্ট। পলাশপুরের কারিগরেরা সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ঋণ সহায়তা চেয়েছেন (ইনকিলাব, জানুয়ারি 2022)। মাটিরাঙ্গার মো. রহমত আলী বলেছেন, বাঁশ-বেত শিল্পের সুদিন ফেরাতে সরকারি উদ্যোগ “চোখে পড়ছে না”। এশিয়ান টিভি / ভয়েস সেভেন নিউজের প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের মত, সরকারি সহায়তা পেলে শিল্পটি হয়তো ফিরে আসতে পারে।

জাতীয় পর্যায়ে বাঁশ-বেতের কারুশিল্পের হিসাব

বাংলাপিডিয়ার “Cane” নিবন্ধ বিসিকের সূত্রে জানায়, 29টি নির্বাচিত পণ্য তৈরি করা 4,226টি হস্তশিল্প গ্রামের মধ্যে 1,154টি গ্রাম বাঁশ ও বেতের পণ্য তৈরি করে। বাঁশ ও বেতের পণ্যই হস্তশিল্পের সবচেয়ে বড় উপখাত, যেখানে 2000 সালে প্রায় 1 লাখ 35 হাজার মানুষ কাজ করতেন। 1999–2000 সালে বাঁশ ও বেতের পণ্য রপ্তানি করে দেশ আয় করেছিল 258.6 মিলিয়ন টাকা। বিসিকের একটি নকশা কেন্দ্র নতুন নকশা তৈরি করে কারিগরদের বিনা খরচে দেয় বলে নিবন্ধটি জানায়। এই 1,154টি গ্রামের কয়টি খাগড়াছড়িতে, তা নিবন্ধে নেই।

পাহাড়ের হাতের কাজকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার আরেকটি পথ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) নিবন্ধন। আইনের সংজ্ঞায় হস্তশিল্পজাত দ্রব্য এর আওতায় পড়ে, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো পণ্য এখনো জিআই পায়নি; বিস্তারিত আছে পিনন হাদি জিআই পণ্য হয়নি কেন লেখায়। খাগড়াছড়ির বাঁশ-বেতের কোনো পণ্যের জন্য জিআই আবেদন হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

নতুন নকশার বাঁশের কাজ: একজন কারিগরের উদাহরণ

খাগড়াছড়িতে বাঁশের কাজের সব খবর পতনের নয়। প্রথম আলো (ডিসেম্বর 2019) খাগড়াছড়ি সদরের যৌথ খামার সাতভাইয়াপাড়ার বাবু মগের কথা লিখেছে, যিনি বাঁশ দিয়ে চুড়ি, চায়ের কাপ, ট্রে, গ্লাস, মুখোশ, ফটোফ্রেম, ল্যাম্পশেড, কলমদানি, ফুলের টব ও হুঁকা বানিয়ে 100 থেকে 5,000 টাকায় বিক্রি করেন; বাঁশের শিকড় দিয়েও জিরাফ, হাঁস, কুমির, হরিণের মূর্তি বানান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী বাবু মগ 17 বছর আসবাবের দোকানে কাজ করেছেন। প্রায় তিন বছর আগে হাতে কাজ না থাকায় খেলাচ্ছলে বাঁশের একটি মুখোশ বানিয়ে বিক্রি করতে পেরে তিনি বাঁশের কাজকে ব্যবসা হিসেবে নেন। ইউটিউবে নতুন নকশা দেখে শিখেছেন, কাজে সাহায্য করেন স্ত্রী নাজেইউ মগ। তিনি মিতিংগা, ঢোল ও মুলি, এই তিন ধরনের বাঁশ ব্যবহার করেন; লাগে সিরিশ কাগজ আর নকশার জন্য গ্যাসের লাইট। পানখাইয়াপাড়ায় 1,000 টাকায় একটি দোকান ভাড়া নিয়েছেন। তাঁর চাওয়াও কারিগরদের সাধারণ চাওয়ার মতো: সহজ শর্তে সরকারি ঋণ পেলে ব্যবসা বাড়াতে পারতেন।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বাবু মগের একটি কথা উল্টো দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ: তিনি বাঁশের কাজ বেছে নিয়েছিলেন কারণ “পাহাড়ে বাঁশের অভাব নেই”। ইনকিলাব ও এশিয়ান টিভির প্রতিবেদনে কারিগরেরা বলছেন উল্টো কথা, বাঁশের অভাব আর দাম বৃদ্ধির কথা। একটি 2019-এর, অন্যগুলো 2022 ও 2024-এর; জায়গাও আলাদা (সদর বনাম মাটিরাঙ্গা-পলাশপুর)। দুই বর্ণনাই উৎসে যেমন আছে, তেমনই রাখা হলো।

জাতীয় পর্যায়ে বাংলাপিডিয়ার “Bamboo Craft” নিবন্ধও একই প্রবণতার কথা বলে: ইদানীং বাঁশের আসবাব জনপ্রিয় হয়েছে, আর ছাইদানি, ফুলদানি, প্রসাধনী বাক্স, ছবির ফ্রেম, আয়নার ফ্রেম ও কলমের মতো শৌখিন জিনিসও বাঁশে তৈরি হচ্ছে। তবে খাগড়াছড়িতে এমন কারিগর কতজন, তার কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য বিষয়গুলোর সূচি আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম মূল পাতায়।

প্রশ্নোত্তর

খাগড়াছড়ির বাঁশ শিল্প বিলুপ্তির পথে কেন?

দৈনিক ইনকিলাব (2022) ও এশিয়ান টিভি / ভয়েস সেভেন নিউজ (2024) কারণ হিসেবে বলেছে প্লাস্টিক পণ্যের সহজলভ্যতা, বাঁশের অভাব ও দাম বৃদ্ধি, পুঁজি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, আর পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়া। দ্য ডেইলি স্টার এর সঙ্গে যোগ করেছে 2008 সালে বাঁশে ফুল এসে বাঁশঝাড় মরে যাওয়া এবং বর্ষায় নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বাঁশ কোড়ল কাটা।

খাগড়াছড়ির বাঁশ-বেতের কারিগরেরা কী কী জিনিস বানান?

সংবাদ-প্রতিবেদনে যে জিনিসের নাম আছে: চাটাই, কুলা, ডালা, চাঙারি, টুকরি, ওড়া, চালুনি, খালই, ঝুড়ি, হাঁস-মুরগির খাঁচা, মাচা, মই, ঢোল, গোলা, ডুলা, মোড়া, মাছ ধরার চাঁই, মাথাল, সোফাসেট ও বইয়ের র‍্যাক (দৈনিক ইনকিলাব 2022; এশিয়ান টিভি 2024)। সদরের বাবু মগ বাঁশের চুড়ি, কাপ, ট্রে, মুখোশ ও ল্যাম্পশেড বানান (প্রথম আলো 2019)।

প্লাস্টিক কি বাঁশের জিনিসের জায়গা নিয়েছে?

খাগড়াছড়ির সব প্রতিবেদন তা-ই বলে। দৈনিক ইনকিলাব (জুন 2022) লিখেছে, একসময় গ্রামের ঘরে ঘরে বাঁশের জিনিস থাকলেও এখন সে জায়গা নিয়েছে প্লাস্টিক পণ্য, আর জুমচাষিদের মধ্যেও ব্যবহার কমছে। জুমজার্নাল আর্কাইভের চাকমা পরিচিতি জানায়, বিয়েতে বাঁশের ফুলবারেং-এর বদলে এখন স্যুটকেস ব্যবহার হয়। কোন জিনিস কোন প্লাস্টিক পণ্যে বদলেছে, তার তালিকা নেই।

খাগড়াছড়িতে বাঁশ কোথায় বেশি জন্মায়?

দ্য ডেইলি স্টার (মার্চ 2008) বন কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের বরাতে লিখেছে, খাগড়াছড়ির বাঁশের দুই-তৃতীয়াংশ জন্মায় দীঘিনালা, মহালছড়ি, পানছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি ও মাটিরাঙ্গা উপজেলায়। দৈনিক ইনকিলাব (2022) লিখেছে, দীঘিনালা, পানছড়ি ও মাটিরাঙ্গার পাহাড়ি টিলায় একসময় নানা জাতের বাঁশ জন্মাত, কিন্তু বড় বাঁশবাগান এখন আর চোখে পড়ে না।

বাঁশে ফুল আসায় খাগড়াছড়িতে কত গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল?

দ্য ডেইলি স্টারের 16 মার্চ 2008-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বন কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের হিসাবে খাগড়াছড়ির আট উপজেলার প্রায় 45টি গ্রামের বাঁশঝাড় ফুল-ফল দিয়ে মরে যাচ্ছিল। কমলছড়ির ইউপি চেয়ারম্যান তখন বলেছিলেন, তাঁর ইউনিয়নের প্রায় 7,000 পরিবার খাদ্যসংকটে পড়তে পারে।

বাঁশে ফুল কত বছর পরপর আসে?

উৎসে দুই রকম হিসাব আছে। দ্য ডেইলি স্টারের (2008) প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির প্রবীণেরা বলেছেন 40 থেকে 50 বছর পরপর, আর মাটিরাঙ্গা ডিগ্রি কলেজের উদ্ভিদবিদ ড. হাবিবুর রহমান বলেছেন 25 থেকে 40 বছর পরপর; তাঁর হিসাবে আগের দুই ঘটনা 1943 ও 1980 সালে। দ্য ডেইলি স্টারের 2009-এর প্রতিবেদন আগের সংকটের সাল বলে 1958।

বাঁশ কোড়ল খাওয়া কি বাঁশ কমার কারণ?

দ্য ডেইলি স্টার (জুলাই 2012) ও দৈনিক ইনকিলাব (জানুয়ারি 2022) তা-ই বলে। ডেইলি স্টার জানায়, বর্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামের 25 উপজেলায় তিন মাস বাঁশ কাটা নিষিদ্ধ, তবু কোড়ল কেটে বিক্রি হচ্ছে; এক বাঁশ ব্যবসায়ীর মতে এতে প্রতি বছর উৎপাদন কমছে। জেলা বন কর্মকর্তা আরেক প্রতিবেদনে বলেছেন, কেবল আইন দিয়ে কোড়ল খাওয়া বন্ধ করা যাবে না।

খাগড়াছড়ি থেকে বাঁশ বাইরে নিতে কি অনুমতি লাগে?

হ্যাঁ। The Business Standard (মে 2020) লিখেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অন্য জেলায় বাঁশ নিতে বন বিভাগের অনুমোদন লাগে। আইনি ভিত্তি Chittagong Hill Tracts Transit Rules, 1973, যা পার্বত্য জেলায় কাঠ ও অন্যান্য বনজ সম্পদের পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করে (দ্য ডেইলি স্টার, 2020)। 2010–11 অর্থবছরে খাগড়াছড়ি বন বিভাগ প্রায় 33 লাখ বাঁশ কাটার পারমিট দিয়েছিল।

বাবুছড়ার বাঁশের বাজার কত বড়?

বাংলা ট্রিবিউন (মে 2020) দীঘিনালার বাবুছড়াকে দেশের অন্যতম বৃহৎ বাঁশের বাজার বলেছে। বাবুছড়া বাঁশ কল্যাণ সমিতির বরাতে প্রতিবেদনটি জানায়, এক অর্থবছরের 9 মাসে সেখান থেকে 28 লাখ 44 হাজার বাঁশ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গেছে, প্রতিদিন অন্তত 24টি ট্রাক যেত, আর বাঁশ কাটা, পরিবহন ও লোডিংয়ে অন্তত 50 হাজার মানুষ যুক্ত।

ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বাঁশ-বেতের জিনিসের নাম কী?

জুমজার্নাল আর্কাইভের “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত” অনুযায়ী ধান ও শস্য রাখার পাত্র মং, কচা, কৗবাং, দালকি, লংগাই; ধান-চাল মাপার টন বা তুঙ ও সেরি; কাপড় বোনার থুরি, পাইরেং, রিখুক্র; হাঁস-মুরগি রাখার তাখোক, বেংগলা; আর মাছ শিকারের লুসি, বাংবু, চপ্রা, চৈ, দুলা, বারাই। লেখাটি ত্রিপুরাদের বাঁশ ও বেত শিল্পকে “বেশ সমৃদ্ধ” বলে।

খাগড়াছড়ির বাঁশ-বেতের কারিগরেরা সরকারের কাছে কী চান?

দৈনিক ইনকিলাবে (জানুয়ারি 2022) পলাশপুরের কারিগরেরা সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ঋণ সহায়তা চেয়েছেন, আর মাটিরাঙ্গার কারিগর মো. রহমত আলী বলেছেন সরকারি উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। প্রথম আলোতে (2019) সদরের বাবু মগ বলেছেন, সহজ শর্তে সরকারি ঋণ পেলে ব্যবসা বাড়াতে পারতেন। খাগড়াছড়ির মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর বাঁশ ও বেতের ব্যাগ তৈরির প্রশিক্ষণ দেয় (UNB, 2026)।

বাংলাদেশে কতগুলো গ্রাম বাঁশ ও বেতের পণ্য তৈরি করে?

বাংলাপিডিয়ার “Cane” নিবন্ধ বিসিকের সূত্রে জানায়, 29টি নির্বাচিত পণ্য তৈরি করা 4,226টি হস্তশিল্প গ্রামের মধ্যে 1,154টি গ্রাম বাঁশ ও বেতের পণ্য বানায়। বাঁশ-বেতের পণ্য হস্তশিল্পের সবচেয়ে বড় উপখাত; 2000 সালে এতে প্রায় 1 লাখ 35 হাজার মানুষ কাজ করতেন। খাগড়াছড়ির গ্রামের সংখ্যা আলাদা করে দেওয়া নেই।

যা এখনো জানা যায়নি

  • খাগড়াছড়িতে বাঁশ-বেতের কারিগর কতজন ছিলেন, এখন কতজন আছেন: কোনো জরিপ বা সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনগুলোতে আছে কেবল “গুটি কয়েক মানুষ”, “অনেকেই পেশা ছেড়েছেন” জাতীয় বর্ণনা।
  • বিসিকের 1,154টি বাঁশ-বেতের হস্তশিল্প গ্রামের কয়টি খাগড়াছড়িতে, তা জানা যায়নি।
  • কোন বাঁশ বা বেতের জিনিস কোন প্লাস্টিক পণ্যে বদলেছে (যেমন থুরুং, কাল্লোং বা কুলার জায়গায় কী এসেছে), তার কোনো নথিভুক্ত তালিকা নেই। একমাত্র নির্দিষ্ট উদাহরণ চাকমা বিয়ের ফুলবারেং-এর বদলে স্যুটকেস।
  • হাটে একটি ঝুড়ি, কুলা বা থুরুং কত টাকায় বিক্রি হয়, আর বানাতে কত খরচ পড়ে, খাগড়াছড়ির কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
  • বাবুছড়া থেকে বছরে লাখ লাখ কাঁচা বাঁশ বাইরে যাওয়ার সঙ্গে স্থানীয় কারিগরের বাঁশ না পাওয়ার সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি।
  • 2007–2008 সালে বাঁশে ফুল আসার পর খাগড়াছড়ির বাঁশঝাড় কত বছরে আবার আগের অবস্থায় ফিরেছে, তার হিসাব জানা যায়নি। বাঁশ-ব্যবসায় যুক্ত মানুষের হার কমার একমাত্র সংখ্যা (26 থেকে 6 শতাংশ) রাঙামাটির সাজেকের।
  • সংবাদ-প্রতিবেদনগুলো কারিগরদের জনগোষ্ঠী-পরিচয় উল্লেখ করেনি; চাকমা, ত্রিপুরা বা মারমা গ্রামে ঘরের প্রয়োজনে বাঁশ-বেতের কাজ কতটা টিকে আছে, তার কোনো সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। আর্কাইভের জনগোষ্ঠী-পরিচিতিগুলো জিনিসের নাম ও ব্যবহার বলে, পতনের হিসাব নয়।
  • খাগড়াছড়ি জেলায় বেতের মজুদ কতটা কমেছে, তার আলাদা কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি; বাংলাপিডিয়ার সংখ্যাগুলো সারা দেশের।
  • খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ বিসিকের মাধ্যমে বাঁশ-বেতের কাজে কোন বছরে কী প্রকল্প নিয়েছে, কতজন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, তার নথি পাওয়া যায়নি।

তথ্যসূত্র

জুমজার্নাল আর্কাইভ

  1. “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত”, জুমজার্নাল, 2021: আসবাবপত্র ও তৈজসপত্র অংশ, কেরপূজা অংশ।
  2. “চাকমা জাতি”, জুমজার্নাল, 2021: বিবাহ অংশ (ফুলবারেং ও স্যুটকেস)।
  3. তনয় দেওয়ান, “চাংমাটারা: চাকমা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস”, জুমজার্নাল: গৃহস্থালির জিনিসের তালিকা।
  4. সুযশ চাকমা, “চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জুমচাষ”, জুমজার্নাল, 2018: থুরুং, সামো, দুলো, লুদুং, তাগলক, বাদোল।
  5. “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত”, জুমজার্নাল, 2021: শ্রমবিভাগ ও বাজার অংশ।
  6. “তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত”, জুমজার্নাল: তৈজসপত্র অংশ।
  7. “খিয়াং জাতির আদ্যোপান্ত”, “খুমী জাতির আদ্যোপান্ত” ও “পাংখোয়া জাতির আদ্যাপান্ত”, জুমজার্নাল, 2021।
  8. “পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে আদিবাসী লোকজ্ঞান”, জুমজার্নাল, 2021।
  9. “আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও পাহাড়ি নারী”, জুমজার্নাল: বিসিক ও জেলা পরিষদ অংশ।

সংবাদপত্র ও অন্যান্য

  1. মো. ইব্রাহিম শেখ, “বিলুপ্তির পথে খাগড়াছড়ির বাঁশ শিল্প”, দৈনিক ইনকিলাব, 3 জুন 2022।
  2. “বিলুপ্তির পথে বাঁশ শিল্প” (সরকারি-বেসরকারিভাবে ঋণ সহায়তার দাবি), দৈনিক ইনকিলাব, 4 জানুয়ারি 2022।
  3. বিপ্লব তালুকদার, “হারিয়ে যাচ্ছে খাগড়াছড়ির ঐতিহ্য বাঁশ ও বেত শিল্প”, এশিয়ান টিভি অনলাইন, 22 জুন 2024; একই প্রতিবেদনের ইংরেজি রূপ “Bamboo & Cane Craft Disappearing in Khagrachari”, ভয়েস সেভেন নিউজ, 22 জুন 2024।
  4. “Hill people fear food crisis as bamboo clusters flowering”, দ্য ডেইলি স্টার, 16 মার্চ 2008।
  5. “Rodent horror looms large in the hills”, দ্য ডেইলি স্টার, 9 আগস্ট 2009।
  6. “CHT rat victims want long-term solution to food crisis” (BSS), দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (অনলাইন সংস্করণে তারিখ দেওয়া নেই)।
  7. “When rats attack”, Rice Today, International Rice Research Institute, 2010।
  8. কাফিল মাহমুদ, “Consumption of shoots threatens bamboo production in CHT”, দ্য ডেইলি স্টার, 31 জুলাই 2012।
  9. জসিম মজুমদার, “Bamboo shoots becoming too costly to dish up”, দ্য ডেইলি স্টার (অনলাইন সংস্করণে তারিখ দেওয়া নেই)।
  10. জসিম উদ্দিন মজুমদার, “বন্ধ বনবিভাগ, পানিতে নষ্ট হচ্ছে ২ কোটি টাকার বাঁশ”, বাংলা ট্রিবিউন, 2 মে 2020।
  11. “Bamboos worth Tk6cr rotting amid lockdown”, The Business Standard, 5 মে 2020।
  12. “Law & Our Rights” (পার্বত্য চট্টগ্রামের বন আইন বিষয়ক লেখা), দ্য ডেইলি স্টার, 28 সেপ্টেম্বর 2020।
  13. “পাহাড়ে বাঁশের নান্দনিক শিল্পকর্ম”, প্রথম আলো, 17 ডিসেম্বর 2019।
  14. “Traditional Machang homes disappearing from the hills”, ঢাকা ট্রিবিউন, 3 জানুয়ারি 2019।
  15. UNB, “More women in Khagrachhari turn to entrepreneurship, driving local economy”, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, 5 মে 2026।
  16. MK Alam ও Sadat Ullah Khan, “Cane”, বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ।
  17. Zinat Mahrukh Banu, “Bamboo Craft”, বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ।
  18. M Khairul Alam ও Abul Khair, “Bamboo”, বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ।

সর্বশেষ হালনাগাদ: 3 নভেম্বর 2026

প্রসঙ্গ:খাগড়াছড়ি, চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা, শিল্প

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা