Last updated Nov 2nd, 2026
2

ত্রিপুরা ও মারমা মৌখিক সাহিত্য দুটি আলাদা পরম্পরা — ভাষা আলাদা, গানের নাম আলাদা, পরিবেশনের উপলক্ষও আলাদা। ত্রিপুরাদের ককবরক ভাষায় সবচেয়ে বড় মৌখিক রূপ দীর্ঘ গীতিকাব্য, যেমন লালমতির কাহিনি পুন্দা তান্নায়; মারমাদের মধ্যে কাপ্যা, রদু, সাখ্রাং জাতীয় গান আর পাংখুং ও জাইত নামের রাতভর গীতিনাট্য। এই লেখায় দুটিকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে, কিন্তু মেশানো হয়নি।
জুমজার্নালের আর্কাইভে দুই জনগোষ্ঠীর রূপকথার আলাদা সংকলন আগেই আছে — ত্রিপুরা লোককাহিনীর ৩৯টি গল্পের সূচি আর মারমা রূপকথার ১৯টি গল্পের ভাণ্ডার। এখানে গল্পগুলো আবার বলা হয়নি। এই লেখার বিষয় গল্পের বাইরের মুখের সাহিত্য: গান, গীতিকাব্য, পালা, হেঁয়ালি, প্রবাদ, জায়গার কিংবদন্তি — আর কারা এগুলো গাইতেন, কবে কোনটি ছাপা হলো, কোনটি এখনো কেবল মুখে মুখে।
লেখাটি চাকমা মৌখিক সাহিত্য নিয়ে আমাদের মূল লেখা গেংখুলি ও রাধামন-ধনপুদি: চাকমা মৌখিক সাহিত্যের পাঠ-এর একটি শাখা। চাকমা উপাদান এখানে টানা হয়নি; গেংখুলির সঙ্গে কোনো মিল বা অমিল নিয়ে কোনো উৎস কিছু বলেনি, তাই তুলনাও করা হয়নি।
সূচিপত্র
না। ত্রিপুরাদের ভাষা ককবরক ভোট-বর্মী পরিবারের বোডো শাখার, আর মারমা ভাষা একই পরিবারের বর্মী দলের। দুই জনগোষ্ঠীর মৌখিক সাহিত্যের ধারার নাম, উপলক্ষ ও পরিবেশকও আলাদা; কোনো উৎস দুটিকে এক ধারা বলেনি।
আর্কাইভের ককবরক ভাষার প্রোফাইল-এ মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা লিখেছেন, ককবরক চীনা-তিব্বতীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। ভারতের ত্রিপুরার কবি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং আরও নির্দিষ্ট করে বলেছেন, ভাষাটি তিব্বতি-বর্মী পরিবারের “বোডো” শাখার, আর ত্রিপুরা রাজ্যের ১৯টি আদি জনগোষ্ঠীর আটটি এই ভাষায় কথা বলে (Indian Folklife, জানুয়ারি 2010)। অন্যদিকে মারমা জাতির আদ্যোপান্ত-এ মংসিংঞা মারমা লিখেছেন, মারমা ভাষা “টিবের্টো বর্মান (ভোট-বর্মী) শাখার বর্মী দলভুক্ত”, এর নিজস্ব বর্ণমালা আছে, আর বর্ণ মোট 45টি।
এই পার্থক্য মৌখিক সাহিত্যেও চোখে পড়ে। ত্রিপুরা উৎসগুলো বারবার ফিরে যায় হিন্দু-বৈষ্ণব প্রভাব, রাজসভা আর জুমের জীবনে — পুন্দা তান্নায়-এর নায়ক মা দুর্গার বন্দনা করে, গানের বিভাগে আছে “কীর্তন পদবাচ্য সংগীত”। মারমা উৎসগুলো ঘোরে বৌদ্ধ জাতক, বিহার আর আরাকানি-বর্মী রাজসভার চারপাশে — সাখ্রাং গান গৌতম বুদ্ধের জীবন নিয়ে, ন্বইলা গানের পুঁথি থাকে বিহারে। দুই পরম্পরার মধ্যে যোগাযোগের কথা কোনো উৎসে নেই, তাই এই লেখাও সেটা অনুমান করে না।
মারমা ও রাখাইন যে আলাদা জনগোষ্ঠী, সেই আলোচনা আলাদা লেখায় আছে: রাখাইন ও মারমা আলাদা জাতি — আর ‘মগ’ নামটি কোথা থেকে এল। এখানে কেবল মারমা উৎসের কথাই নেওয়া হয়েছে।
ত্রিপুরা সমাজে মৌখিক সাহিত্যের সবচেয়ে ছোট রূপটি গান নয়, সংলাপ। আর্কাইভের পুন্দা তান্নায় উপাখ্যান লেখাটি শুরুই হয়েছে এই কথায় যে, কথায় কথায় ছন্দ ব্যবহার আর “কাব্যময় ফোড়ন কাটা” ত্রিপুরা লোকসমাজের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
কোন সম্পর্কের মধ্যে এই ছন্দের বিনিময় হয়, লেখাটি তা নাম ধরে বলেছে: ভগ্নিপতির সঙ্গে শ্যালক-শ্যালিকার কথোপকথন, বৌদির সঙ্গে দেবর-ননদের আলাপ, ঠাকুরদা-ঠাকুমার আসরে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে। যুবক-যুবতীর প্রথম পরিচয় আর প্রেম নিবেদনেও ছন্দময় বাক্যবিনিময় হয়। আর শোকের মুহূর্তে, লেখকের ভাষায়, ত্রিপুরা নারীরা “অতি সাবলিলতার সাথে নির্মাণ করতে পারে ছন্দের অট্টালিকা” — অর্থাৎ বিলাপও ছন্দে বাঁধা।
এই ছন্দের সংলাপের নাম লেখাটিতে একাধিকবার “হেঁয়ালি”। গীতিকাব্যের নায়িকা লালমতির নাম ফিরে আসে প্রেমিক-প্রেমিকার গানে “কিংবা গভীর রাতে উনুনের পাশে বিনিময় হওয়া হেঁয়ালিতে”। প্রেম নিবেদনের দৃশ্যে লালমতি আর হেমন্তের মধ্যে “ছন্দে ছন্দে বিনিময় হয় হেঁয়ালি” — আর লেখাটি সেখানে মূল ককবরক পদগুলো তুলে দিয়েছে, যেমন প্রথম চরণ “ববই লালমতি খানাদি”।
এর অর্থ দাঁড়ায়, ত্রিপুরা গীতিকাব্যের ভাষা দৈনন্দিন ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। একই ছন্দ-কৌশল সম্পর্কের ঠাট্টায়, প্রেমে, শোকে আর দীর্ঘ কাহিনিতে ব্যবহৃত হয়। তবে এই হেঁয়ালির কোনো ককবরক নাম, কাঠামো বা ছন্দের নিয়ম আর্কাইভের কোনো লেখায় দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের ত্রিপুরা লেখকদের হিসাবে ককবরকে ছয়-সাতটি বড় গীতিকাব্য আছে, যার প্রতিটি ছাপলে শত পৃষ্ঠা ছাড়াবে। ছাপা হয়েছে দুটি বা তিনটি — কোনগুলো, তা নিয়ে আর্কাইভের দুই লেখায় তালিকা আলাদা। বাকিগুলো এখনো মুখে মুখে, অথবা হারিয়ে যাচ্ছে।
আর্কাইভের ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত (লেখক শক্তিপদ ত্রিপুরা ও সন্তোষ বিকাশ ত্রিপুরা) বলেছে, “৬/৭টি গীতিকাব্যের মধ্যে অদ্যাবধি মাত্র ২টি গীতিকাব্য গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছে” — লাংগৈ রাজানো বুমানি আর পুন্দা তানমানি। প্রথমটি ত্রিপুরা রাজার যুদ্ধ ও রাজ্যজয় নিয়ে, দ্বিতীয়টি “প্রেমের করুণ কাহিনী”। একই লেখা অন্য জায়গায় নামগুলোর বানান লিখেছে “পুন্দা তান্নায়” ও “লাংগই রাজানো বুমানি”, আর প্রতিটি গীতিকাব্য “এক একটি শত পৃষ্ঠার ওপরে হবে” বলে দাবি করেছে।
মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার কালের দর্পনে ককবরকের লিখিত চর্চা অবশ্য প্রকাশিত গীতিকাব্যের মধ্যে আরেকটি নাম রাখে: প্রশান্ত কুমার ত্রিপুরা সম্পাদিত গাঁ/গঙ্গা তলিয়ে থাঁমানি (2005)। ফলে একটি উৎস বলছে দুটি ছাপা হয়েছে (লাংগৈ রাজানো বুমানি ও পুন্দা তান্নায়), অন্যটির তালিকায় পুন্দা তান্নায় ও গাঁ তলিয়ে থাঁমানি — লাংগৈ রাজানো বুমানির কোনো প্রকাশতথ্য সেখানে নেই।
| গীতিকাব্যের নাম (উৎসের বানানে) | বিষয় (উৎস যা বলে) | ছাপা হয়েছে? | উৎস |
|---|---|---|---|
| পুন্দা তান্নায় / পুন্দা তান্নাই / পুন্দা তানমানি / জিজোক পুন্দা | লালমতির প্রেম ও বিরহ | হ্যাঁ — ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ, 1979; সম্পাদনা বরেন ত্রিপুরা | 22657, 4390, 21635 |
| লাংগৈ রাজানো বুমানি / লাংগই রাজানো বুমানি | ত্রিপুরা রাজার যুদ্ধ ও রাজ্যজয় | একটি উৎসে হ্যাঁ; প্রকাশক ও সাল দেওয়া নেই | 22657 |
| গাঁ তলিঅ থাঁমানি / গঙ্গা তলীয় থাঁমানি | উৎসে বলা নেই | একটি উৎসে হ্যাঁ — সম্পাদনা প্রশান্ত কুমার ত্রিপুরা, 2005 | 21635, 22657, 6739 |
| খুম কামানি | ফুল তোলা; একটি প্রেম-কিংবদন্তি | গীতিকাব্য হিসেবে প্রকাশের তথ্য নেই | 22657, 6739 |
| কুচুক হা সিকাম কামানি / হায়া হা সিকাম কামানি | উৎসে বলা নেই | প্রকাশের তথ্য নেই | 22657, 6739 |
| গোঁসাই রাজ্যা থাঁমানি | উৎসে বলা নেই | প্রকাশের তথ্য নেই | 22657 |
| হায় বিদেশি থাঁমানি | উৎসে বলা নেই | প্রকাশের তথ্য নেই | 22657 |
ছকের “উৎস” ঘরে জুমজার্নাল আর্কাইভের লেখার নম্বর: 22657 = ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত; 4390 = অপুল ত্রিপুরা, বাংলাদেশে ককবরক ভাষার লিখিত চর্চা; 21635 = মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, কালের দর্পনে ককবরকের লিখিত চর্চা; 6739 = ককবরক কাব্যচর্চার বর্তমান হালচাল (লেখকের নাম আর্কাইভ-কপিতে নেই)। “কামানি” ও “থাঁমানি” শব্দ দুটির অর্থ কোনো উৎসে আলাদা করে দেওয়া হয়নি।
নামের এতগুলো বানান থেকে একটি কথা পরিষ্কার: ককবরকের বাংলা হরফে লেখার কোনো স্থির রীতি এখনো দাঁড়ায়নি। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার লেখাতেই আছে, ২০ ডিসেম্বর 2000-এ খাগড়াছড়িতে বাংলাদেশের ত্রিপুরা সংগঠনগুলোর এক কর্মশালা ককবরক লেখার জন্য রোমান হরফ বেছে নিয়েছিল, আর সেখানে বলা হয়েছিল বাংলাদেশে ককবরকের “কমপক্ষে ১২টি উপভাষা” আছে। একই গীতিকাব্য ভিন্ন উপভাষার গায়েনের মুখে ভিন্ন উচ্চারণে আসা স্বাভাবিক — যদিও কোনো উৎস বানানভেদের কারণ নিজে ব্যাখ্যা করেনি।

পুন্দা তান্নায় (জিজোক পুন্দা নামেও পরিচিত) ককবরকের সবচেয়ে বেশি আলোচিত গীতিকাব্য। এর নায়িকা লালমতি। আর্কাইভে কাহিনিটির দুটি গদ্য-রূপ আছে, আর দুটিতে লালমতির প্রেমিক আলাদা মানুষ — একটিতে হেমন্ত, অন্যটিতে সুমন্ত। মৌখিক সাহিত্যে একই কাহিনির একাধিক পাঠ থাকার এটি একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
প্রথম পাঠটি আর্কাইভের ককবরক গীতিকাব্য ‘পুন্দা তান্নাই’ উপাখ্যান লেখায়, যেখানে ককবরক মূল পদ আর বাংলা গদ্যে কাহিনি পাশাপাশি। এখানে লালমতি শ্যামলা মেয়ে; দাদু আশীর্বাদ করেছিলেন, তার স্বামী “শিং ছাড়াই গুঁতো মারতে” আর “ডানা ছাড়াই উড়তে” পারবে। প্রেমিক হেমন্ত সেই গুণ শিখতে ফকিরের আখড়ায় মন্ত্রের বই পড়ে, আর রাতে পশুর রূপ পেয়ে বসে — ছাগল। প্রতিদ্বন্দ্বী সুমন্ত, রাজার সেনা-কর্মকর্তা মানিক দর্প নারানের ছেলে, দরবেশের আশ্রমে মন্ত্র শিখে ফিরে আসে। শেষে সুমন্ত লালমতির পোশাক ও আংটি পরে, মন্ত্রপূত পান খাইয়ে ছাগলরূপী হেমন্তকে মারে, আর গীতিকাব্য শেষ হয় লালমতির দীর্ঘ বিলাপে।
দ্বিতীয় পাঠটি আর্কাইভের ত্রিপুরা লোককাহিনী সংগ্রহে, মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরার নামে, উৎস ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি (2012)। আমাদের ত্রিপুরা লোককাহিনীর সূচি অনুযায়ী সেখানে কাহিনিটি “সমাজপতির নাতনি লালমতি আর সুমন্তের প্রেম”, ছাগলরূপী এক যোগী, যুদ্ধ, আর শেষে গোঁসাইন রাজার রায়ে সম্পত্তি ফেরত; শেষ বাক্য “লালমতির প্রেম ও সুমন্তের বীরত্ব চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।” অর্থাৎ প্রথম পাঠে যে সুমন্ত খলনায়ক, দ্বিতীয় পাঠে সে-ই নায়ক।
কাহিনির কাল নিয়েও দুই রকম কথা আছে। প্রথম পাঠের লেখক বলছেন, চৌদ্দ শতকে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের (শাসনকাল 1338–1349) চট্টগ্রাম দখলের সমসাময়িক সময়ে অঞ্চলটি ফকির-দরবেশের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল, আর ঘটনাপ্রবাহ বিচারে গীতিকাব্যটি সেই সময়ের “বলে ধারণা করা হয়”। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা লিখেছেন, কাহিনিটি চট্টগ্রাম অঞ্চলের নানা স্থানে “কোন এক অনির্ণিত প্রাচীন সময়ে” ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে। দুটির কোনোটিই কোনো দলিল দেখায়নি।
গীতিকাব্যের ভূগোলও উল্লেখ করার মতো। কাহিনিতে রাজার সৈন্যরা “উজানের দিকে কাঁচাপুর থেকে ভাটির উজিপুর পর্যন্ত” ঘেরাও করে; লালমতি আংটি কিনতে যায় “বারো দোকানের মাঝখানে তেরো পাড়ার ভিতরে” শংকর স্বর্ণকারের কাছে; সুমন্ত মন্ত্র শিখতে যায় কামার, কুমার, যুগি, বারৈ, তিলি, বামনদের এলাকা পেরিয়ে। একটি ককবরক গীতিকাব্যের ভেতরে সমতলের বাঙালি পেশাজীবী সমাজ, দরবেশ আর রাজসেনা — মৌখিক সাহিত্য এখানে পাহাড় আর সমতলের মেলামেশার স্মৃতি বহন করছে। স্থাননামগুলো কোথায়, তা কোনো উৎস শনাক্ত করেনি।
পুন্দা তান্নায় যে কেবল পুরোনো পাঠ নয়, তার ইঙ্গিতও প্রথম লেখায় আছে: লালমতি “বাংলাদেশের ককবরক সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা”, আর “আধুনিক বহু ককবরক গানেও এই নামটি বারে বারে ফিরে এসেছে।” কোন গানে, তার তালিকা অবশ্য দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের ত্রিপুরা উৎসে দীর্ঘ গীতিকাব্যের পরিবেশকদের বলা হয়েছে “লোক গায়েন” বা “গায়েন কবি”। নাম ধরে পাওয়া যায় একজনকেই: শশী কুমার ত্রিপুরা, যাঁর মুখ থেকে নেওয়া পাঠে পুন্দা তান্নায় ছাপা হয়েছিল। গায়েনদের প্রশিক্ষণ, পারিশ্রমিক বা আসরের নিয়ম নিয়ে কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি।
মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা লিখেছেন, বরেন ত্রিপুরার সম্পাদনায় প্রকাশিত পুন্দা তান্নায়-এর কাহিনি বর্ণনা করেছেন “সেই সময়ের জনপ্রিয় লোক গায়েন শশী কুমার ত্রিপুরা।” অর্থাৎ ছাপা বইটি একজন নির্দিষ্ট গায়েনের পাঠ — অন্য গায়েনের মুখে কাহিনিটি অন্যরকম হতেই পারত, যেমন আগের অংশের দ্বিতীয় পাঠে দেখা গেছে।
গায়েন যে কেবল পুরোনো কাহিনি গাইতেন না, তার একটি দৃশ্য আছে আর্কাইভের ককবরক কাব্যচর্চার বর্তমান হালচাল লেখার শুরুতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিশ্রান্ত জুমিয়া লোকালয়ে বিরোধী শক্তির আনাগোনা দেখে “সহজে সতর্কবাণী ফুটে ওঠে গায়েন কবিদের মুখে”; গোলাগুলিতে ত্রস্ত গ্রাম দেখে “গায়েন কবি ব্যাকুল হয়ে গেয়ে উঠেন।” লেখাটি সেই গানের ককবরক পাঠ তুলে দিয়েছে। মৌখিক কবি এখানে সংবাদদাতাও।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উৎসে আসরের ছবিটি আরও বিস্তারিত — তবে সেটি সীমান্তের ওপারের বিবরণ, বাংলাদেশের নয়। চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং লিখেছেন, জুমের সারাদিনের খাটুনির পর সন্ধ্যায় গান, নাচ আর গল্পের আসর বসত, যেখানে প্রবীণ কথকেরা মূলত তরুণ শ্রোতাদের “বাস্তব আর স্বপ্নের মাঝখানের এক জগতে” নিয়ে যেতেন। গল্প বলা ছিল চর্চিত শিল্প, আর এ নিয়ে একটি ককবরক প্রবাদও তিনি উদ্ধৃত করেছেন, যার ইংরেজি অনুবাদের অর্থ মোটামুটি এরকম: যে চলে যায়, তাকে গভীর ঘুমে ডুবে থাকা একদল শ্রোতার সামনে একা একা বকে যেতে হবে। প্রবাদটির ককবরক পাঠ লেখায় দেওয়া নেই। একই লেখায় আছে, ককবরকে লোককথার একটিই নাম — কেরাং কথমা, অর্থাৎ “স্থলকচ্ছপের গল্প”, কচ্ছপ গল্পে থাকুক বা না থাকুক; নামটির কারণ জানা নেই বলে লেখক নিজেই জানিয়েছেন।
আর্কাইভের ককবরক সঙ্গীত অতীত ও ভবিষ্যৎ লেখাটিও ভারতের ত্রিপুরার — লেখক কবি ও গীতিকার বিকাশ রায় দেববর্মা, বাংলা অনুবাদ সুনীল দেববর্মার। সেখানে বলা হয়েছে, গানের মাধ্যমে বলা এই কাহিনিগুলো “শেষ হতে কখনো কখনো সপ্তাহ লেগে যেত বলে অনেকে বলে থাকেন”, শ্রোতারা কখনো হেসে ফেটে পড়তেন, কখনো কাঁদতেন। নাম ধরে আসে কয়েকটি কাহিনি: সিকাম (কুকি) রাজ্যের উঁচু পাহাড়ে আরোহণ, খেরেংবার ফুল চয়ন, আর মামলা মৗসা চামানি — “বাঘের মুখে নিহত ভালবাসা”। বাংলাদেশের তালিকার “কুচুক হা সিকাম কামানি” আর এই “সিকাম রাজ্যের পাহাড় আরোহণ” একই কাহিনি কি না, কোনো উৎস তা মিলিয়ে দেখায়নি।
বাংলাদেশের উৎস ত্রিপুরা গানকে চার ভাগে ভাগ করে — লোকসংগীত, বাউল, কাব্যসংগীত ও কীর্তন। ভারতের ত্রিপুরার একটি উৎস প্রাচীন ককবরক গান, অর্থাৎ জাদুনী গানকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে — কাজের গান, ঘুমপাড়ানি, হৃদয়বিদারক গান, রেসের বা এসের খাগড়া, আর মামিতার গান। দুটি ভাগ দুই দেশের দুই লেখকের, তাই এখানে আলাদা রাখা হলো।
ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত-এ চার ভাগের তালিকার পাশাপাশি গবেষক প্রভাংশু ত্রিপুরার বরাতে বলা হয়েছে, ত্রিপুরা সংগীতের সাতটি রাগ-রাগিণী আছে; নাম দেওয়া হয়েছে তিনটির — “ত্রিপুরা সারং” (গরয়া নৃত্যের রাগ), “ত্রিপুরা ভৈরব” (কাথারক বা বোতল নৃত্যের রাগ) আর “গোমতী”। একই লেখা বলছে, ত্রিপুরাদের গান “এখনো বেশিরভাগ অলিখিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত”। নাচ-গান পরিবেশিত হয় বিবাহ, পূজা-পার্বণ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে। গরিয়া নৃত্যের গান নিয়ে বিস্তারিত আছে গরিয়া নৃত্য ও বৈসু লেখায়।
বিকাশ রায় দেববর্মার লেখায় কাজের গানের আবার শাখা আছে — উত্তর রাগিণী, দক্ষিণী রাগিণী, দাসপা রাগিণী, দুনা রাগিণী, বেরি রাগিণী। তিনি লিখেছেন, মন দিয়ে না শুনলে এগুলো একই ধাঁচের মনে হবে। ঘুমপাড়ানি গানে ককবরকভাষী বিভিন্ন দফার সুর আলাদা — “কলয় ও দাসপা, দক্ষিণি ও দাসপার মধ্যে সুরের কোন মিল নেই”; মামিতাও দফাভেদে ভিন্ন। চংপ্রেং যন্ত্রে শিকারের ভাগ-বণ্টন, পাহাড়ে চড়া, চরকা কাটা, দোলনায় শিশু ঘুম পাড়ানোর সুর বাজানো হয়, তবে ঘুমপাড়ানি গানের সুর আর চংপ্রেংয়ের ঘুমপাড়ানি সুর এক নয়।
দুই উৎসের মধ্যে মিলও আছে একটিই: দুজনেই বলেছেন গানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। বিকাশ রায় দেববর্মা ভারতের কয়েকজন শিল্পীর নাম দিয়েছেন, যাঁরা তাঁর লেখার সময় জীবিত ছিলেন — জাদুনী গানের শিল্পী কৗলীয় দেববর্মা, যাঁর মতো “জাদুনীর কথাশিল্পী ককবরক ভাষীদের মধ্যে বিরল”, আর চংপ্রেং, সারিন্দা ও বাঁশির কয়েকজন বাদক। বাংলাদেশের কোনো ত্রিপুরা লোকগায়কের নাম, শশী কুমার ত্রিপুরা ছাড়া, আর্কাইভের উৎসগুলোতে পাওয়া যায়নি।
পাশাপাশি রাখার মতো আরেকটি তথ্য: প্রভাংশু ত্রিপুরা নিজে ত্রিপুরা জাতির লোক সঙ্গীত নামে বই লিখেছেন, আর ককবরক গীতি সংকলন খুম সাংদারি — প্রদীপ চৌধুরীর নেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারে বই দুটির নাম আছে। বই দুটির প্রকাশসাল বা প্রকাশক সাক্ষাৎকারে দেওয়া হয়নি, আর বই দুটি জুমজার্নালের ই-বুক লাইব্রেরিতে নেই।
বাংলাদেশে ককবরক মৌখিক সাহিত্যের প্রথম ছাপা নিদর্শন ধরা হয় 1942 সালের একটি গানের বই। গীতিকাব্য প্রথম ছাপা হয় 1979 সালে। নিচের ছকে দুই দেশের ঘটনাগুলো আলাদা চিহ্ন দিয়ে রাখা হয়েছে, কারণ উৎসগুলো নিজেরাই ভারত ও বাংলাদেশের চর্চাকে আলাদা করে দেখেছে।
| সাল | কী | দেশ | উৎস |
|---|---|---|---|
| 1906, 1919 | ঠাকুর রাধামোহন দেববর্মনের ত্রৈপুর কথামালা (1906) এবং “ত্রৈপুর লোক গাথার সংকলন ও ত্রৈপুর কথামালা” (1919) | তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্য (আজ ভারত) | 6716 |
| সাল দেওয়া নেই | বড়ঠাকুর সমরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্মন বিয়োগান্তক লোকগীতি য়েসিয়ার খাগরা স্বরলিপিসহ ত্রিপুরার স্মৃতি বইয়ে রাখেন | ভারত | 6716, 21635 |
| 1942 | সাধক খুশীকৃষ্ণ ত্রিপুরার (বলংরায় সাধু) 33টি আধ্যাত্মিক গান নিয়ে ত্রিপুরা খা-কাচাংমা খুম্বার বই | বাংলাদেশ | 6739, 21635 |
| 1954 | প্রথম ককবরক পত্রিকা কৗতাল কথমা; তাতে লোকগান, লোককথা, আর ধারাবাহিকভাবে ধাঁধার সংগ্রহ ফুনুকমুং | ভারত | উইকিপিডিয়া |
| 1977 | সুরেশ ত্রিপুরার সম্পাদনায় এগারোজন গীতিকারের বারোটি গানের সংকলন বজন, বাংলা অনুবাদসহ, রাঙামাটি | বাংলাদেশ | 21635 |
| 1978 | বলংরায় সাধুর গানের বইয়ের দ্বিতীয় প্রকাশ; প্রায় একই সময়ে তাঁর গানের দ্বিতীয় সংকলন প্রাণ কাচাংমা, সংকলক শংকর চন্দ্র ত্রিপুরা (মিরসরাই) | বাংলাদেশ | 21635 |
| 1979 | গীতিকাব্য পুন্দা তান্নায়, ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ; সম্পাদনা বরেন ত্রিপুরা, বর্ণনা লোক গায়েন শশী কুমার ত্রিপুরা | বাংলাদেশ | 4390, 21635 |
| 1992–1999 | সান্তুআ, বানৌক, পনাই, বিচক, হামকরাই, য়ামুক, হ-মাচাং প্রভৃতি সাময়িকী | বাংলাদেশ | 21635 |
| 2005 | গাঁ/গঙ্গা তলিয়ে থাঁমানি, সম্পাদনা প্রশান্ত কুমার ত্রিপুরা | বাংলাদেশ | 21635 |
| 2003 / 2012 | প্রভাংশু ত্রিপুরার ত্রিপুরা লোককাহিনী — সাক্ষাৎকারে 2003, কলকাতা ও আগরতলা থেকে একযোগে; ই-বুক লাইব্রেরির কপিটি বলাকা প্রকাশন, চট্টগ্রাম, ফেব্রুয়ারি 2012 | দুই দেশ | 12723, ই-বুক 437 |
ছকটি দেখায়, বাংলাদেশে প্রথম ছাপা হয়েছিল ভক্তিগান — লোককাহিনী বা গীতিকাব্য নয়। বিকাশ রায় দেববর্মা লিখেছেন, খুশীকৃষ্ণ ত্রিপুরা বাংলার “ভক্তিগীতি”র অনুসরণে ককবরক গানকে দিশা দিয়েছিলেন, আর “কিংবদন্তী মতে” তিনশোর বেশি গান রচনা করেছিলেন। 1942 সালের বইয়ে আছে তার 33টি। লিখিত রূপ পাওয়ার আগে এই গানগুলোও মুখে মুখেই ছড়াত — বইয়ের সংখ্যা আর “কিংবদন্তি”র সংখ্যার ফারাকটাই সে কথা বলে।
ত্রিপুরা লোককাহিনীর সবচেয়ে বড় দুটি সংকলন — প্রভাংশু ত্রিপুরার ত্রিপুরা লোককাহিনী আর আগরতলার ত্রিপুরা বাণী প্রকাশনী থেকে জানুয়ারি 2006-এ প্রকাশিত নিরঞ্জন চাকমা ও রঘুনাথ সরকারের ত্রিপুরা আদিবাসী লোককথা — জুমজার্নালের ই-বুক লাইব্রেরিতে পূর্ণ পাঠে আছে। লোককথাগুলো কারা সংগ্রহ করেছিলেন, তার হিসাব আছে পাহাড়ের লোককথা কে সংগ্রহ করেছিলেন লেখায়।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার নুনছড়ি মৌজার পাহাড়চূড়ার হ্রদ মাতাই তুয়ারি বা মাতাই পুখির (বাংলায় “দেবতার পুকুর”) ঘিরে ত্রিপুরাদের মধ্যে অন্তত চারটি আলাদা উৎপত্তি-কিংবদন্তি প্রচলিত। আর্কাইভের লেখায় 1979 ও 2012 সালের দুটি “অলৌকিক” ঘটনাও লোকমুখে প্রচলিত বলে লেখা আছে — অর্থাৎ এই পরম্পরা কেবল অতীতের নয়।
আর্কাইভের মাতাই তুয়ারি: কিংবদন্তি ও লোকবিশ্বাস লেখায় (লেখক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা) হ্রদের মাপ দেওয়া আছে — সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 700 ফুট উঁচুতে, প্রায় সাড়ে 5 একর জুড়ে, দৈর্ঘ্যে প্রায় দেড় হাজার ফুট, প্রস্থে ছয়শো ফুট। তারপর পাশাপাশি রাখা হয়েছে কিংবদন্তিগুলো:
এর পরে লেখাটি দুটি সাম্প্রতিক ঘটনার কথা বলে, যা “লোকমুখে এখনও প্রচলিত”: 1979 সালের চৈত্রসংক্রান্তির দিন পূজার পর জলকন্যার ভেসে ওঠা, আর “সম্ভবত ২০১২ সালের বৈসুর সময়” রাঙামাটি থেকে বেড়াতে আসা ত্রিপুরা পরিবারের এক ছেলের হ্রদের নিয়ম ভাঙার পর জ্বর ও এলার্জি, আর মায়ের মানতে আরোগ্য। লেখক শুরুতেই জানিয়েছেন, লেখায় তাঁর “বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কোন প্রতিফলন নেই”।
মৌখিক সাহিত্যের দিক থেকে লেখাটির মূল্য এখানেই: একই জায়গার একাধিক ব্যাখ্যা পাশাপাশি টিকে আছে, কোনোটি অন্যটিকে বাতিল করেনি, আর নতুন ঘটনাও একই কাঠামোয় — নিয়ম ভাঙা, তারপর শাস্তি বা মানত — গল্প হয়ে ঢুকে পড়ছে। চতুর্থ কিংবদন্তিটির কাঠামো, অর্থাৎ অজগর খাওয়া গ্রাম আর বেঁচে যাওয়া একমাত্র বিধবা, পাহাড়ের অন্য জনগোষ্ঠীর গল্পে আছে কি না, তা মিলিয়ে দেখা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
রাজমালা ত্রিপুরা রাজাদের বংশ-ইতিহাস, বাংলা পয়ারে লেখা। বইটির ভেতরেই একটি চরণ আছে যা বলে, রাজমালা আগে “ত্রিপুর ভাষাতে” ছিল, পরে “সু-ভাষাতে” অর্থাৎ বাংলায় করা হয়। ককবরক মূল পাঠটি পাওয়া যায়নি, তাই সেটি লিখিত ছিল নাকি মুখে মুখে চলত, কোনো উৎস নিশ্চিত করে বলতে পারেনি।
মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা রাজমালার দ্বিতীয় খণ্ডের ধর্ম মাণিক্য পর্বের ৬ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে চরণগুলো উদ্ধৃত করেছেন: “পূর্বে রাজমালা ছিল ত্রিপুর ভাষাতে / পয়ার গাঁথিল সব সকলে বুঝিতে”। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Kokborok literature নিবন্ধেও একই চরণ, একই পৃষ্ঠাসূত্রে। দুই উৎসের মধ্যে অমিল দুটি জায়গায়। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা লিখেছেন, মূল গ্রন্থ “কলমা লিপিতে” লেখা হয়েছিল বলে জানা যায় এবং তা প্রথমে সংস্কৃতে ও পরে মহারাজ ধর্ম মাণিক্যের আমলে (1458–65) সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়; উইকিপিডিয়া সংস্কৃত ধাপের কথা বলে না, আর বাংলা রূপটির সময় বলে চৌদ্দ শতক।
এখানে সতর্ক থাকার জায়গা আছে। “লিপিতে লেখা ছিল” দাবিটি কোনো পাণ্ডুলিপি দিয়ে প্রমাণিত নয় — মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা নিজেই লিখেছেন, “এই মূল গ্রন্থের কোন হদিস এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।” অপুল ত্রিপুরার লেখায় একটি লোকশ্রুতিও আছে, যা নিজেই মৌখিক সাহিত্যের নমুনা: ত্রিপুরার হরফ নাকি কলাপাতায় লেখা ছিল, রোদে শুকাতে দিলে সবার অগোচরে ছাগল এসে তা খেয়ে ফেলে। হারানো লিপির এই গল্প পাহাড়ের আরও কোনো জনগোষ্ঠীতে আছে কি না, তা এই লেখার উৎসগুলো বলেনি।
ভারতের Indian Folklife পত্রিকার ত্রিপুরা সংখ্যায় সরোজ চৌধুরীর “The Land” লেখাটি রাজমালাকে বাংলায় লেখা প্রাচীনতম ইতিহাস-রচনা বলেছে, আর লিখেছে রাজসভার ভাষা হিসেবে ষোলো শতকের শুরু থেকে ত্রিপুরায় বাংলায় লেখা বিকশিত হয়। অর্থাৎ রাজসভার লিখিত ঐতিহ্য বাংলায়, আর সাধারণ মানুষের মৌখিক ঐতিহ্য ককবরকে — মুড়াসিংয়ের ভাষায়, রাজারা প্রজাদের ভাষা বলতে লজ্জা পেতেন, আর ককবরক তার “দরিদ্র সাধারণ ভাষীদের” আত্মপ্রকাশের তৃষ্ণা মিটিয়ে বয়ে চলেছিল।
মারমা মৌখিক সাহিত্যের ধারাগুলো জীবনের প্রায় প্রতিটি উপলক্ষের সঙ্গে বাঁধা: শিশুকে ঘুম পাড়ানো, জুমের কাজ, সন্ধ্যার আসর, সাংগ্রাইয়ের পানিখেলা, প্রতিযোগিতায় জয়, বিহারে প্রার্থনা, মৃতদেহ পাহারা, আর উৎসবের রাতভর পালা। ধারাগুলোর পূর্ণ তালিকা আছে পাহাড়ি গান ও আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র লেখায়; এখানে সেগুলো উপলক্ষ ধরে সাজানো।
উৎস একটিই: মংসিংঞা মারমার মারমা জাতির আদ্যোপান্ত, যা নিজে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, বান্দরবানের দুটি প্রকাশনার বরাত দিয়েছে — সাচপ্রুর “মারমা সংস্কৃতিতে সংগীত ও গীত নাট্যের ঐতিহ্য” (পইজ্রা, 2003) আর উচনুর “মারমা” (আদিবাসী জনগোষ্ঠী, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ডিসেম্বর 2007)। দুটি মূল লেখা জুমজার্নালের সংগ্রহে নেই।
| উপলক্ষ | ধারা | কে গায়, কীভাবে |
|---|---|---|
| শিশু ঘুম পাড়ানো, কাজ, অবসর | কাপ্যা | গ্রামাঞ্চলে; প্রতিযোগিতামূলকভাবেও; যুবক-যুবতী পরস্পরের সৌন্দর্য বর্ণনা করে |
| জুমে বা জমিতে কাজ | চাগায়াঙ | জুমিয়া কৃষক, উচ্চ কণ্ঠে |
| সন্ধ্যা ও রাত | সাখ্রাং | মারমাপ্রধান গ্রামে; বুদ্ধের জীবন ও জাতক নিয়ে কাহিনিগান |
| একাকিত্ব, উপদেশ | রদু | মহাপুরুষ ও সমাজনেতার গুণগান; কিছু রদু “নিঃসঙ্গ ভারাক্রান্ত হৃদয়ের গান” |
| যেকোনো সময় | লাঙ্গা | যুবক-যুবতী, বুড়ো-বুড়ি সবাই; প্রকৃতি বা মহাপুরুষের বর্ণনা |
| সাংগ্রাইয়ের মৈত্রী পানিবর্ষণ | সাইঙগ্যাইত্ | তরুণ-তরুণীর দল; একজন ধরেন, দল তাল মেলায়; তাৎক্ষণিক রচনা, প্রশংসা বা ব্যঙ্গ |
| প্রতিযোগিতায় জয় | লুঙঃদি | বিজয়ী দল ঘরে ঘরে গিয়ে গেয়ে নজরানা আদায় করে |
| বিহারে শীল প্রার্থনা | সাইঙবক্ | কোমল সুরে বন্দনা |
| অভিজাতদের আসর | আফোওয়েহ্ | “এঃ” নামের বেহালা-জাতীয় যন্ত্রের সঙ্গে; একসময় রাজারা শিল্পী ডেকে আসর বসাতেন |
| মৃত্যু, দাহের আগ পর্যন্ত | ন্বইলা | কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়া; বুদ্ধের নির্বাণ নিয়ে; পুঁথি বিহার থেকে আনা হয় |
| ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের রাত | পাংখুং, জাইত | 20–50 জনের দল, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে; জাইত সারারাত |
ছকটি থেকে চোখে পড়ে, মারমা গানের নামকরণ হয়েছে কাজ ও উপলক্ষ ধরে, বিষয় ধরে নয়। একই কাহিনি — যেমন উদয়ন বা বিধুরের জাতক — রদু হিসেবেও আছে, পাংখুং পালা হিসেবেও আছে (পরের অংশ দেখুন)। পার্থক্য হলো কে কোথায় কীভাবে গাইছে।
সাংগ্রাইয়ের পানিখেলায় গানের জায়গা নিয়ে আলাদা লেখা আছে সাংগ্রাই জলকেলি-তে। সাইঙগ্যাইত্-এর কোনো পূর্ণ পাঠ বা লিপ্যন্তর অবশ্য কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

মারমা কাহিনি-গানের মধ্যে আর্কাইভে নাম ধরে আছে মোট ছয়টি: কাপ্যা পাইংদাইং মাঙঃসাঃ ও সাইংদোয়েঃসু; সাখ্রাং সইতাথানু ও ককানু; রদু উদিনা (উদয়ন) ও ধাইমাউইজয়া (ধর্মবিজয়)। এগুলোর কোনো পূর্ণ পাঠ বা বাংলা অনুবাদ পাওয়া যায়নি।
কাপ্যাকে উৎসটি বলেছে “এক ধরনের লোকসঙ্গীত ও কাহিনী কাব্য”, যাতে “কোনো মহাপুরুষের জীবনের প্রতিচ্ছবিও” আসতে পারে। সাখ্রাং বৌদ্ধ জাতকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত: উৎস ব্যাখ্যা করেছে, জাতক অনুসারে গৌতম বুদ্ধ আগের জন্মগুলোতে মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণী হয়ে জন্মেছিলেন, আর বোধিসত্ত্বের সেই জন্ম-মৃত্যুর কাহিনি নিয়েই এই গানগুলো রচিত। রদুর একটি অংশ কাহিনিভিত্তিক, আরেকটি অংশ কাহিনিহীন, ব্যক্তিগত দুঃখের গান — যার সুর দুঃখের হলেও “চিত্তাকর্ষক”।
একটি মিল লক্ষ করার মতো, যদিও উৎস নিজে তা টানেনি: সাখ্রাংয়ের উদাহরণ “সইতাথানু” ও “ককানু”, আর পাংখুং পালার তালিকায় 17 নম্বরে “সাইটাথানু”, 18 নম্বরে “কঃকানু”। রদুর উদাহরণ “উদিনা” আর পাংখুং তালিকার 7 নম্বর “উদিনা (উদয়ন)”। “ধাইমাউইজয়া রদুহ্” (ধর্ম বিজয়) আর পাংখুং তালিকার 4 নম্বর “দাম্মাজেয়া (ধর্মজয়)” সম্ভবত একই কাহিনির নাম। অর্থাৎ মারমা সমাজে একই কাহিনি গান হিসেবে, আবার নাট্য হিসেবেও বেঁচে আছে। নামগুলো একই কাহিনিকে বোঝায় কি না, তা নিশ্চিত করার মতো পাঠ পাওয়া যায়নি।
মারমা রূপকথা-লোককথার পাঠ — ঠকের গল্প, ফৌহ, রোসাঙ রাজা ও শিল্পীর কাহিনি — আর তাদের লেখকেরা আলাদা করে আছেন মারমা রূপকথার ভাণ্ডার লেখায়। বান্দরবানের উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের উপজাতীয় গল্প সংকলন-এর দুটি খণ্ড জুমজার্নালের ই-বুক লাইব্রেরিতে আছে — খণ্ড তিন (এপ্রিল 1997; সম্পাদক এস. এ. প্রু, সহ-সম্পাদক মং নু চিং) আর খণ্ড চার (এপ্রিল 1998; সম্পাদক মং নু চিং, সহ-সম্পাদক উ চ নু)। খণ্ড চারের সহ-সম্পাদক উ চ নু আর মারমা গানের উৎস “উচনু” একই ব্যক্তি কি না, উৎস থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
পাংখুং ও জাইত মারমাদের দুটি গীতিনাট্য — গান, নাচ আর অভিনয়ে বলা দীর্ঘ কাহিনি। আর্কাইভের উৎস বলছে, পাংখুংয়ের উদ্ভব আনুমানিক একশো বছর আগে, মারমা হরফে লেখা পুঁথি থেকে অন্তত 34টি পালার নাম পাওয়া যায়, আর জাইতের পুঁথি আছে অন্তত সাতটি। দুটিই এখনো মঞ্চস্থ হয়: 2023 সালে বান্দরবানে পাংখুং, 2024 সালে জাইত।
মারমা জাতির আদ্যোপান্ত অনুযায়ী পাংখুংয়ের জন্মকথা এরকম: লেখক ক্যশৈপ্রু খোকার মতে, শত বছর আগে বেতবুনিয়া এলাকার শিয়ালবুক্কা পাড়ায় এক সাহিত্যরসিক মারমা বৌদ্ধ বিহারাধ্যক্ষ মারমা ভাষা ও বর্ণমালায় প্রথম পাংখুং রচনা করেন ও সুর দেন। নিজে ভিক্ষু হওয়ায় তিনি পাড়ার এক মারমা শিল্পীকে দিয়ে একক পালা প্রবর্তন করেন — শিল্পী একাই গেয়ে সব ভূমিকায় অভিনয় করতেন। পরে বহু চরিত্রের সমাবেশে তা পূর্ণাঙ্গ দলীয় পালা হয়, 20 থেকে 50 জনের দল।
ভূর্জপত্র ও কাগজের পুঁথি খুঁজে যে 34টি পালার নাম পাওয়া গেছে, তার অনেকগুলোর বাংলা প্রতিরূপ উৎসেই দেওয়া: দাম্মাজেয়া (ধর্মজয়), উদিনা (উদয়ন), রামা (রাম), উইঃজেয়া (বিজয়), মনহরী (মনোহারি), জানাক্কা (জনক), সুওয়েনাসামা (সুবর্ণ শ্যাম), চাইন্দাকুমারা (চন্দ্রকুমার), নারাদা (নারদ), উইধুরা (বিধুর), ওয়েসাইন্দ্রা (বেস্সন্তর)। শেষ কয়েকটি নাম — টেমী, জনক, সুবর্ণ শ্যাম, নেমি, নারদ, বিধুর, বেস্সন্তর — বৌদ্ধ জাতকের পরিচিত কাহিনির নামের সঙ্গে মেলে; উৎসও পাংখুং-জাইতকে “মারমা সামাজিক মিথ, লোকজ প্রথাগত রীতিনীতি এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় জাতক গল্পের সম্মিলিত রূপ” বলেছে। তালিকায় “রামা (রাম)”-ও আছে।
জাইত আলাদা ধারা। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাংলায় একে “ওয়াকশান” বলা হয়; দল 20 থেকে 40 জনের; নাচের মুদ্রা, গানের ধরন আর বাদ্যযন্ত্র পাংখুং থেকে ভিন্ন; ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সারারাত পরিবেশন। জাইতের সাতটি পুঁথির নাম: বো-দোওয়, মাচক্যাই, মাঅংপ্রু, সীলাবাহুং, তাইংছিঃ, আলাঙবাহুং, সা-বেয়া। উৎসের আরেকটি বাক্য মনে রাখার মতো: পাংখুংয়ে বঙ্গীয় বাদ্যযন্ত্র, জাইতে বর্মী বাদ্যযন্ত্র; পোশাকেও একই ভাগ।
সাম্প্রতিক দুটি পরিবেশনার খবর আছে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারে। 12 নভেম্বর 2023-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বান্দরবানের রাজবিলা ইউনিয়নের রেনিং এলাকায় 15 বছর পর মারমাদের “Pangkhum” ঐতিহ্যের পালা Maha Janakha মঞ্চস্থ হয়; 45 সদস্যের দলে 15 জন নারী, তিন মাসের প্রশিক্ষণ; আয়োজক সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট (দ্য ডেইলি স্টার)। পালার নাম “মহা জনক” জাতক-তালিকার “জানাক্কা (জনক)”-এর সঙ্গে মেলে বলে মনে হয়; প্রতিবেদন নিজে সেই যোগ দেখায়নি।
26 ডিসেম্বর 2024-এর আরেক প্রতিবেদন জানায়, রুমার থানা পাড়া জাইত দল (“Thana Para Jyat Dal”) 28 ডিসেম্বর রাত 9টা থেকে সারারাত বান্দরবানে মারমা লোকনাট্য Machayng পরিবেশন করবে, আয়োজক বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংরক্ষণ সেল। শিল্পকলা একাডেমির প্রেস বিজ্ঞপ্তির বরাতে প্রতিবেদন বলছে, জাইতে প্রাচীন রাজা-শাসকদের জীবন আর সেই কালের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সংস্কৃতি ও কাজের পরিবেশ ছন্দ, সুর আর নড়াচড়ায় বোনা হয় (দ্য ডেইলি স্টার)। আর্কাইভের জাইত-তালিকার দ্বিতীয় নাম “মাচক্যাই” — নাম দুটি একই পালার কি না, কোনো উৎস তা নিশ্চিত করেনি।
মারমা মৌখিক সাহিত্য পুরোপুরি মৌখিক নয়। পাংখুং ও জাইতের পালা মারমা হরফে পুঁথিতে লেখা, ন্বইলা গানের পুঁথি বিহারে রাখা হয় আর মৃতের বাড়িতে এনে পড়া হয়, পূজার শ্লোক ও মন্ত্রও মারমা বর্ণমালায় লেখা হয়। গাওয়া মুখে, কিন্তু পাঠ রক্ষা পায় পুঁথিতে আর বিহারে।
ত্রিপুরা উৎসগুলোর সঙ্গে এখানেই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। ত্রিপুরা লেখকেরা বারবার লিখেছেন, ককবরকের নিজস্ব লিপি হারিয়ে গেছে বা মূল পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় না, আর গীতিকাব্যগুলো প্রথম ছাপা হয়েছে বিশ শতকের শেষে, গায়েনের মুখ থেকে নিয়ে। মারমা উৎস উল্টো দিক থেকে বলে: মংসিংঞা মারমার লেখায় আছে, বহুকাল আগে থেকেই মারমারা রাজকার্য ও ধর্মগ্রন্থ লিখতে নিজেদের বর্ণমালা ব্যবহার করে আসছে, “সমুহাদা উইচ্ছেদানি”, “মনুগ্যি ধম্মাসাত্” প্রভৃতি পাণ্ডুলিপি আছে, আর মাত্র কয়েক দশক আগেও বোমাং রাজদরবার ও কাচারিতে মারমা ভাষা প্রচলিত ছিল।
জ্ঞান কীভাবে হাতবদল হয়, তার একটি সরকারি বিবরণও আছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্য-তালিকার পোর্টাল হেরিটেজ হাব-এ “Marma Religion – Buddhism” নামের এন্ট্রিতে (BGD-20.22.2023.00054) লেখা হয়েছে, ঐতিহ্যের ধারকেরা বিহারে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাটিয়ে প্রবীণ ধর্মচর্চাকারীদের কাছ থেকে “পুরাণকথা, ভাষা, আচার ও রীতি” শেখেন; এন্ট্রিটির ক্ষেত্রতালিকায় “মৌখিক ঐতিহ্য ও অভিব্যক্তি”ও আছে (heritagehub.gov.bd)। এন্ট্রিটির অবস্থান হিসেবে কক্সবাজার জেলা দেওয়া, যদিও বিবরণে তিন পার্বত্য জেলার কথা আছে।
পুঁথি থাকলেও পরিবেশনা মৌখিক থেকে যায়। পাংখুংয়ের জন্মকথাতেই তা আছে: রচয়িতা ভিক্ষু নিজে গাইতে পারতেন না, তাই একজন শিল্পীকে দিয়ে পালা চালু করেন। পুঁথি থেকে মঞ্চে পৌঁছাতে একজন গায়ক লাগে, আর সেই গায়কের হাতে পাঠ বদলায় কি না — এমন কোনো তুলনা কোনো উৎস করেনি।
মারমা প্রবাদের মধ্যে আর্কাইভে আছে সাতটি, মারমা পাঠ ও বাংলা অর্থসহ। ত্রিপুরা প্রবাদের এমন কোনো তালিকা জুমজার্নালের বাংলাদেশি উৎসে পাওয়া যায়নি — উৎসগুলো কেবল বলেছে, ত্রিপুরাদের ধাঁধা ও প্রবাদ-প্রবচন “বেশ সমৃদ্ধ”।
মারমা জাতির আদ্যোপান্ত-এর “প্রবাদ প্রবচন” অংশে যে বাংলা অর্থগুলো দেওয়া:
চতুর্থ প্রবাদটির মারমা পাঠ উৎসে স্পষ্ট পড়া যায় — “ওয়াঃ নাহ্ ওয়াঃ খ্যইংরাহূরে, ছাং নাহ্ ছাং ফাইঃ রাহরে” — আর দুই চরণের সমান গঠনই বলে দেয় কোন শব্দ বাঁশ, কোনটি হাতি। বাকি প্রবাদগুলোর মারমা পাঠও উৎসে আছে, কিন্তু অনলাইন কপিতে ছকটি এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় কোন মারমা বাক্যের কোন বাংলা অর্থ, তা নিশ্চিতভাবে মেলানো যায় না। তাই এখানে কেবল অর্থগুলো দেওয়া হলো।
প্রবাদগুলোর বিষয়ও লক্ষ করার মতো: সাতটির মধ্যে চারটিতে রাজা, হাতি বা জোরের কথা। বোমাং রাজদরবার আর আফোওয়েহ্ গানের (“ক্ষমতাশালী ও অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রতি প্রজাসাধারণ… কর্তৃক তুষ্টি সাধনের জন্য রচিত গান”) মতো রাজসভা-কেন্দ্রিক ধারার পাশে এই প্রবাদগুলো সাধারণ মানুষের দিক থেকে ক্ষমতাকে দেখার একটি ভাষা।
মৌখিক গান এখন রেকর্ড, ক্যাসেট আর অনলাইনে পৌঁছাচ্ছে। মারমা দিকে একটি দৃষ্টান্ত 2025 সালের: রুমার ক্যউপ্রু মার্মার নানি ম্রাকোয়াইচিং মার্মা, যিনি কাজের মধ্যে আপন মনে মারমা গান করেন, কোক স্টুডিও বাংলার “বাজি” গানের সূচনায় মারমা ভাষায় গেয়েছেন। ককবরক দিকে ভারতের ত্রিপুরায় ক্যাসেট-যুগ নিয়ে এক কবির আক্ষেপও আর্কাইভে আছে।
প্রথম আলোয় 30 আগস্ট 2025-এ প্রকাশিত সজীব মিয়ার লেখায় ক্যউপ্রু মার্মা বলেছেন, শৈশবে কাঁদলে নানি নেচে বা গান গেয়ে কান্না থামাতেন, আর নানির গানবাজনা শুনেই তাঁর গানের প্রতি ঝোঁক (প্রথম আলো)। নানি কোন ধারার গান গাইতেন — কাপ্যা, লাঙ্গা বা অন্য কিছু — প্রতিবেদনে তার নাম নেই। কিন্তু উৎসে কাপ্যার যে উপলক্ষ লেখা আছে, শিশুকে ঘুম পাড়ানো আর কাজের সময় গাওয়া, তার সঙ্গে দৃশ্যটি মেলে।
বিকাশ রায় দেববর্মার লেখা (ভারতের ত্রিপুরা) এর উল্টো দিকটা দেখায়। তাঁর হিসাবে “লাংমানি হাদুক” ক্যাসেট বের হওয়ার পর একের পর এক ককবরক ক্যাসেট আসতে থাকে, কিন্তু নতুন গানগুলোর অনেকটাই “বাংলা বা হিন্দী ছায়াছবির গানের আদলে”; পুরোনো জাদুনী গানের “কথা ও সুরের লহরী”-র সঙ্গে আজকের জাদুনীর মিল নেই, বিশুদ্ধ ককবরক শব্দও কমে যাচ্ছে। তিনি মহেন্দ্র দেববর্মার রচিত গানের কথা বলেছেন, যেগুলো তাঁর সন্তানেরা ককবরক না জানায় “সরায় ঢাকা পাতিলে” আটকে আছে।
বাংলাদেশের ত্রিপুরা লেখক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা সমাধান হিসেবে বলেছেন প্রথমে সংগ্রহ: ভাষা লিখিত রূপ পাওয়ার আগে লোকগান, ছড়া, ধাঁধা, প্রবাদ-প্রবচন — যা মুখে মুখে চলে — সেগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা দরকার, আর তা হতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও আঞ্চলিক পরিষদের সমন্বয়ে (ককবরক ভাষার প্রোফাইল)। এমন কোনো সংগ্রহ-প্রকল্প শুরু হয়েছে কি না, কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
দুই পরম্পরা পাশাপাশি রাখলে মূল পার্থক্য তিনটি: দীর্ঘ কাহিনির রূপ (ত্রিপুরায় একক গায়েনের গীতিকাব্য, মারমায় দলীয় গীতিনাট্য), লেখার সম্পর্ক (ত্রিপুরায় হারানো লিপি, মারমায় বিহারে রক্ষিত পুঁথি), আর ধর্মীয় প্রেক্ষাপট। ছকের প্রতিটি ঘর এই লেখার উৎস থেকে নেওয়া; উৎসে নেই এমন ঘর ফাঁকা রাখা হয়েছে।
| প্রশ্ন | ত্রিপুরা (বাংলাদেশ) | মারমা |
|---|---|---|
| ভাষা | ককবরক — বোডো শাখা | মারমা — বর্মী দল |
| দীর্ঘ কাহিনির প্রধান রূপ | গীতিকাব্য (পুন্দা তান্নায়, লাংগৈ রাজানো বুমানি প্রভৃতি) | গীতিনাট্য (পাংখুং, জাইত); কাহিনি-গান (কাপ্যা, সাখ্রাং, রদু) |
| পরিবেশক | লোক গায়েন (যেমন শশী কুমার ত্রিপুরা) | 20–50 জনের দল; একক কাপ্যা গায়ক; ন্বইলা পাঠক |
| ধর্মীয় প্রেক্ষাপট (উৎসে যা আছে) | দুর্গা-বন্দনা, কীর্তন, বৈষ্ণব সাধক, গরিয়া পূজা | বৌদ্ধ জাতক, বিহার, শীল প্রার্থনা |
| লেখার সঙ্গে সম্পর্ক | নিজস্ব লিপি ও রাজমালার মূল পাঠ পাওয়া যায় না; গায়েনের মুখ থেকে ছাপা | নিজস্ব বর্ণমালায় পালার পুঁথি; ন্বইলার পুঁথি বিহারে |
| প্রথম ছাপা নিদর্শন (উৎসে) | 1942 — বলংরায় সাধুর গানের বই | উৎসে বলা নেই |
| ছাপা দীর্ঘ পাঠ | পুন্দা তান্নায় (1979); গাঁ তলিয়ে থাঁমানি (2005) | কোনো পালার ছাপা পাঠের তথ্য নেই |
| প্রবাদের নমুনা আর্কাইভে | নেই | সাতটি |
| সাম্প্রতিক মঞ্চায়ন (প্রতিবেদনে) | উৎসে বলা নেই | পাংখুং 2023, জাইত 2024 (বান্দরবান) |
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য জনগোষ্ঠী ও বিষয় নিয়ে জুমজার্নালের লেখাগুলোর সূচি আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
না। ত্রিপুরাদের ভাষা ককবরক বোডো শাখার, মারমা ভাষা বর্মী দলের। ত্রিপুরাদের প্রধান দীর্ঘ মৌখিক রূপ গায়েনের গাওয়া গীতিকাব্য, যেমন পুন্দা তান্নায়; মারমাদের মধ্যে কাপ্যা, সাখ্রাং, রদু জাতীয় গান আর পাংখুং ও জাইত নামের দলীয় গীতিনাট্য। ধর্মীয় প্রেক্ষাপটও আলাদা — ত্রিপুরা উৎসে কীর্তন ও দুর্গা-বন্দনা, মারমা উৎসে বৌদ্ধ জাতক ও বিহার।
পুন্দা তান্নায় (জিজোক পুন্দা নামেও পরিচিত) একটি ককবরক গীতিকাব্য, যার নায়িকা লালমতি। জুমজার্নাল আর্কাইভের এক পাঠে লালমতির প্রেমিক হেমন্ত মন্ত্র শিখতে গিয়ে ছাগলের রূপ পায় আর প্রতিদ্বন্দ্বী সুমন্তের হাতে মারা যায়; আরেক পাঠে সুমন্তই নায়ক। গীতিকাব্যটি 1979 সালে ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ থেকে ছাপা হয়, লোক গায়েন শশী কুমার ত্রিপুরার বর্ণনায়, বরেন ত্রিপুরার সম্পাদনায়।
বাংলাদেশের ত্রিপুরা লেখকেরা ছয়-সাতটির কথা বলেন: পুন্দা তান্নায়, লাংগৈ রাজানো বুমানি, গাঁ তলিয়ে থাঁমানি, খুম কামানি, কুচুক হা সিকাম কামানি, গোঁসাই রাজ্যা থাঁমানি ও হায় বিদেশি থাঁমানি। “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত” বলছে ছাপা হয়েছে দুটি — লাংগৈ রাজানো বুমানি ও পুন্দা তান্নায়; মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার তালিকায় ছাপা পুন্দা তান্নায় (1979) ও গাঁ তলিয়ে থাঁমানি (2005)।
ভারতের ত্রিপুরার কবি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিংয়ের লেখা অনুযায়ী ককবরকে লোককথার একটিই নাম — কেরাং কথমা। কেরাং মানে স্থলকচ্ছপ, কথমা মানে গল্প; গল্পে কচ্ছপ থাকুক বা না থাকুক, সব লোককথাই এই নামে। নামটির কারণ জানা নেই বলে তিনি নিজেই জানিয়েছেন (Indian Folklife, সংখ্যা 35, জানুয়ারি 2010)। বাংলাদেশের কোনো উৎসে শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়নি।
মংসিংঞা মারমার “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” মারমা সংগীত ও গীতিনাট্যের 13টি ধারার নাম দিয়েছে: কাপ্যা, চাগায়াঙ, সাখ্রাং, রদু, লাঙ্গা, সাইঙগ্যাইত্, লুঙঃদি, সাইঙবক্, আফোওয়েহ্, ন্বইলা, খইসই তেঃখ্রাং (আধুনিক গান), পাংখুং ও জাইত গীতিনাট্য। ধারাগুলো উপলক্ষ ধরে আলাদা — ঘুমপাড়ানি, জুমের কাজ, সাংগ্রাই, বিহারের প্রার্থনা, মৃত্যু, উৎসবের রাত।
পাংখুং মারমাদের কাহিনিভিত্তিক দলীয় গীতিনাট্য, 20 থেকে 50 জনের দল উৎসবে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পরিবেশন করে। লেখক ক্যশৈপ্রু খোকার বরাতে আর্কাইভ বলছে, আনুমানিক শত বছর আগে বেতবুনিয়ার শিয়ালবুক্কা পাড়ার এক মারমা বিহারাধ্যক্ষ প্রথম পাংখুং রচনা করেন। মারমা হরফের পুঁথি থেকে 34টি পালার নাম পাওয়া যায়, অনেকগুলো বৌদ্ধ জাতকের কাহিনি।
দুটিই মারমা গীতিনাট্য, তবে জাইতের দল 20 থেকে 40 জনের, পরিবেশনা সারারাতের, আর নাচের মুদ্রা, গানের ধরন ও বাদ্যযন্ত্র আলাদা। মারমা জাতির আদ্যোপান্ত অনুযায়ী পাংখুংয়ে বঙ্গীয় আর জাইতে বর্মী বাদ্যযন্ত্র বাজে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাংলায় জাইতকে “ওয়াকশান” বলা হয়। জাইতের সাতটি পুঁথির নাম জানা যায়, যেমন মাচক্যাই ও সীলাবাহুং।
মারমা সমাজে কারও মৃত্যু হলে দাহ না হওয়া পর্যন্ত মৃতদেহ পাহারার সময় ন্বইলা গাওয়া হয়, কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়া। বিষয় গৌতম বুদ্ধের নির্বাণ লাভ, সুর নির্দিষ্ট ও কোমল। মারমা জাতির আদ্যোপান্ত অনুযায়ী এর গ্রন্থগুলো বৌদ্ধ বিহারে সংরক্ষিত থাকে, আর প্রয়োজনের সময় মৃতের বাড়িতে এনে পাঠ করা হয়।
জুমজার্নাল আর্কাইভের “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত”-এ সাতটি মারমা প্রবাদ আছে, যেমন: “বাঁশ দিয়ে বাঁশ বাঁধতে হয়, হাতি দিয়ে হাতি ধরতে হয়” (মারমায় “ওয়াঃ নাহ্ ওয়াঃ খ্যইংরাহূরে, ছাং নাহ্ ছাং ফাইঃ রাহরে”), “হোঁচট না খেলে কেউ মাকে ডাকে না”, “জিহ্বার যেমন অস্থি নেই, রাজারও তেমন আত্মীয় নেই” এবং “মণি ভালো হলে একটাই যথেষ্ট, মানুষ ভালো হলে একজনই যথেষ্ট”।
বাংলা রাজমালার দ্বিতীয় খণ্ডের ধর্ম মাণিক্য পর্বে একটি চরণ আছে: “পূর্বে রাজমালা ছিল ত্রিপুর ভাষাতে”। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা লিখেছেন, মূল গ্রন্থ কলমা লিপিতে লেখা হয়েছিল বলে জানা যায় এবং সংস্কৃত হয়ে ধর্ম মাণিক্যের আমলে (1458–65) বাংলায় অনুবাদ হয়। তবে ককবরক মূল পাঠটির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
খাগড়াছড়ির নুনছড়ি মৌজার পাহাড়চূড়ার হ্রদ মাতাই তুয়ারি নিয়ে ত্রিপুরাদের মধ্যে অন্তত চারটি কিংবদন্তি আছে: দেবতাদের সোনার বাসন ধার দেওয়া, স্বপ্নাদেশ অমান্য করা জুমিয়ার জুম হ্রদ হয়ে যাওয়া, কারবারির কন্যার দেবীর ডাকে জলে নেমে যাওয়া, আর অজগর খাওয়া গ্রাম ডুবে যাওয়া। 1979 ও 2012 সালের দুটি ঘটনাও লোকমুখে প্রচলিত।
জুমজার্নালের ই-বুক লাইব্রেরিতে প্রভাংশু ত্রিপুরার “ত্রিপুরা লোককাহিনী” (বলাকা প্রকাশন, 2012), নিরঞ্জন চাকমা ও রঘুনাথ সরকারের “ত্রিপুরা আদিবাসী লোককথা” (আগরতলা, 2006) এবং বান্দরবানের উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের “উপজাতীয় গল্প সংকলন” খণ্ড তিন ও চার পূর্ণ পাঠে আছে। পুন্দা তান্নায়-এর 1979 সালের সংস্করণ বা কোনো পাংখুং পুঁথি লাইব্রেরিতে নেই।
জুমজার্নাল আর্কাইভ (প্রাথমিক উৎস)
জুমজার্নাল ই-বুক লাইব্রেরি
অন্যান্য উৎস
সর্বশেষ হালনাগাদ: 2 নভেম্বর 2026
প্রসঙ্গ:ককবরক, ককবরক গীতিকাব্য, ত্রিপুরা, প্রবাদ-প্রবচন, মারমা
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।