Jumjournal Logo

নাপ্পি ও সিদোল কীভাবে তৈরি হয়: চিংড়ি, লবণ, রোদ আর উপকূল থেকে পাহাড়ের বাজার

Last updated Nov 2nd, 2026

1

শুঁটকি থেকে তৈরি নাপ্পি

নাপ্পি তৈরি হয় সাগরের খুব ছোট চিংড়ি দিয়ে: অল্প লবণ মাখিয়ে রোদে শুকানো, কাঠের ঢেঁকি বা হামানদিস্তায় পেষা, আবার শুকানো, আবার পেষা, তারপর পাতায় মুড়ে বাঁশের ঝুড়িতে কয়েক দিন রেখে দেওয়া। কাজটি হয় পাহাড়ে নয়, কক্সবাজার আর পটুয়াখালীর উপকূলে, প্রধানত রাখাইন পরিবারগুলোর হাতে। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা রান্নাঘরে যে জিনিসকে সিদোল বলা হয়, উৎসগুলো তাকেও সমুদ্রের মাছ-চিংড়ির এই মণ্ড হিসেবেই বর্ণনা করে।

পাহাড়ের খাবার নিয়ে আমাদের আগের লেখা পাহাড়ি খাবার: সিদোল, নাপ্পি আর রান্নার সাত পদ্ধতি-তে কয়েকটি প্রশ্ন খোলা রাখা হয়েছিল: কত দিন লাগে, কী পাত্রে, লবণ কতটা, সিদোল আর নাপ্পি এক কি না। এই লেখা সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজে তিনটি গবেষণাপত্র, উপকূলের সংবাদ প্রতিবেদন আর জুমজার্নালের আর্কাইভ মিলিয়ে। নাপ্পি দিয়ে কোন পদ রাঁধা হয়, তা আছে চাকমা খাবার ও রান্না আর মারমা খাবার ও রান্না লেখায়; এখানে সে আলোচনা আবার করা হয়নি।

এই লেখায়

  1. নাপ্পি কী দিয়ে তৈরি হয়
  2. নাপ্পি তৈরির ধাপ: তিন দিন রোদ, তিন রাত পেষা
  3. লবণ কতটা, আর গাঁজন হয় কখন
  4. পাতা, খাচি আর 20 কেজির ঝুড়ি
  5. কোন মৌসুমে তৈরি হয়
  6. কোথায় তৈরি হয়
  7. কারা তৈরি করেন
  8. পাহাড়ে কে কোন নামে খায়
  9. সিদোল আর নাপ্পি কি একই জিনিস
  10. একই নামের অন্য খাবার: সিঁদল, চ্যাপা, শিদল
  11. নাপ্পিতে কী আছে
  12. নাপ্পি কতটা নিরাপদ
  13. অস্বাস্থ্যকর উৎপাদনের অভিযোগ ও কর্তৃপক্ষ
  14. বাজার, দাম আর রপ্তানি
  15. পাহাড়ের রান্নাঘরে নাপ্পি
  16. সীমানার ওপারের আত্মীয়: ঙাপ্পি, কাপি, তেরাসি
  17. প্রশ্নোত্তর
  18. যা এখনো জানা যায়নি
  19. তথ্যসূত্র

নাপ্পি কী দিয়ে তৈরি হয়: মিম চিংড়ি, অ্যাসিটিস আর মিসিড

নাপ্পির মূল কাঁচামাল সাগরের খুব ছোট চিংড়ি, যাকে কক্সবাজারে স্থানীয়ভাবে মিম চিংড়ি বলা হয়। গবেষকেরা এগুলো শনাক্ত করেছেন Acetes আর Mysid গণের চিংড়ি হিসেবে। মহেশখালীতে এর সঙ্গে কিছু মাছের পোনা ও ছোট মাছও মেশানো হয়, যাকে সেখানে “মেং” বলা হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের Md. Mostafa Monwar ও সহকর্মীরা কক্সবাজারের মহেশখালী আর চৌফলদণ্ডী থেকে নাপ্পির নমুনা নিয়ে গবেষণা করেছেন (প্রি-প্রিন্ট জানুয়ারি 2024, পরে Journal of Ethnic Foods-এ প্রকাশিত)। তাঁদের ভাষায়, দুই এলাকাতেই নাপ্পির কাঁচামাল মূলত Acetes ও Mysid জাতের ছোট চিংড়ি; বাংলাদেশের নাপ্পিতে Acetes indicus আর A. vulgaris প্রজাতির কথা তাঁরা একটি তুলনামূলক ছকে দিয়েছেন। একই গবেষণায় কাঁচামাল সম্পর্কে আরও বলা হয়েছে, জেলেদের কাছ থেকে নেওয়া হয় “ট্র্যাশ ফিশ”, বাইক্যাচ আর বাজারে দাম নেই এমন প্রজাতি।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের Turia Chakma ও সহকর্মীদের 2015 সালের গবেষণাও একই কথা বলে: কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলে নাপ্পি সাধারণত Acetes ও Mysid জাতের ছোট চিংড়ি দিয়ে তৈরি হয়।

সংবাদ প্রতিবেদনগুলো একই জিনিসকে স্থানীয় নামে ডেকেছে। প্রথম আলোর কক্সবাজার প্রতিনিধি আব্দুল কুদ্দুস 2013 সালে চৌফলদণ্ডীর মগপাড়ায় গিয়ে দেখেছিলেন, সাগর ও নদীর তীরের বেড়িবাঁধের ওপর “কয়েক শ মণ ছোট চিংড়ি” শুকাতে দেওয়া হয়েছে, স্থানীয়দের কাছে যা “মিম চিংড়ি”। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার একটি 2024 সালের প্রতিবেদনে কাঁচামালের নাম “ছোট ভুলা চিংড়ি মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক ছোট মাছ”। আলোকিত বাংলাদেশের অক্টোবর 2026-এর প্রতিবেদনে কক্সবাজারের উদ্যোক্তা সাইয়্যিদ মঞ্জু বলেছেন, নাপ্পি “ছোট মাছ ও চিংড়ি গাঁজন করে তৈরি”।

অর্থাৎ নাপ্পি মূলত চিংড়ির পেস্ট, তবে তাতে ছোট মাছও মেশে। এই কারণেই এক উৎস একে “মাছের পেস্ট” বলে, আরেক উৎস “চিংড়ির পেস্ট”। দুটো কথাই আংশিক সত্য, কাঁচামালের মিশ্রণ এলাকা ও মৌসুম ভেদে বদলায়।

নাপ্পি তৈরির ধাপ: তিন দিন রোদ, তিন রাত পেষা

সবচেয়ে বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী নাপ্পি তৈরিতে লাগে তিন দিন, তারপর আরও 7 থেকে 10 দিন ঝুড়িতে রেখে দেওয়া। দিনে রোদে শুকানো, রাতে কাঠের হামানদিস্তায় পেষা, এই চক্র তিনবার। লবণ দেওয়া হয় কেবল প্রথম দিন। তৃতীয় রাতের পেষার পর মণ্ডটি ধূসর-কালচে রং নেয়।

এই বিবরণ Turia Chakma ও সহকর্মীদের 2015 সালের গবেষণাপত্রের প্রথম চিত্রের ব্যাখ্যা থেকে নেওয়া (World Journal of Dairy & Food Sciences, খণ্ড 10)। সেখানে ধাপগুলো এভাবে আছে:

  1. কাঁচামাল সংগ্রহ করে আকার অনুযায়ী বাছাই, অবাঞ্ছিত প্রজাতি সরিয়ে ফেলা।
  2. মাদুরের ওপর অল্প লবণ ছিটিয়ে তার ওপর চিংড়ি পাতলা স্তরে বিছানো, তারপর সারা দিন রোদে শুকানো।
  3. আধা-শুকনো চিংড়ি সেই রাতেই লবণসহ কাঠের হামানদিস্তায় পেষা।
  4. পরদিন লবণ-মেশানো মণ্ড আবার সারা দিন মাদুরে রোদে শুকানো, রাতে আবার পেষা। এবার লবণ দেওয়া হয় না।
  5. তৃতীয় দিন আবার শুকানো, রাতে শেষবার পেষা। এবারও লবণ নয়।
  6. তৈরি মণ্ড ব্লক বা গোলকের আকার দিয়ে “মোস-পাতা” নামের এক বুনো পাহাড়ি গাছের বড় পাতায় মোড়া।
  7. মোড়ানো নাপ্পি চেরা বাঁশের হালকা ঝুড়িতে, যার স্থানীয় নাম “খাচি”, 20 কেজি করে ভরে 7 থেকে 10 দিন রেখে দেওয়া।

Monwar ও সহকর্মীদের 2024 সালের গবেষণায় ধাপের সংখ্যা একটু কম: অল্প লবণ মিশিয়ে 1 থেকে 2 দিন রোদে শুকানো, লবণসহ কাঠের হামানদিস্তায় পেষা, আবার রোদে শুকিয়ে আবার লবণসহ পেষা, তারপর মোড়কে ভরা। প্রথম আলোর 2013 সালের প্রতিবেদনে উৎপাদকদের বর্ণনা আরেকটু আলাদা: কাঁচা চিংড়ি খোলা মাঠে 12 ঘণ্টা রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করা, ঘরে নিয়ে ঢেঁকিতে চূর্ণ করা, গুঁড়া আরও 24 ঘণ্টা রোদে শুকানো, তারপর পানি, লবণ ও “নানা দ্রব্য” মিশিয়ে নাপ্পি তৈরি।

কক্সবাজার লাইফ নামের স্থানীয় সংবাদসাইট অক্টোবর 2024-এ লিখেছে, ছোট চিংড়ি ও মাছ কাঠের মুগুর দিয়ে পিটিয়ে রোদে শুকানো হয়, আর এই কাজ তিনবার করা হয় বিক্রির জন্য বাঁধার আগে। “তিনবার” কথাটি 2015 সালের গবেষণার তিন দিনের চক্রের সঙ্গে মেলে।

উৎসশুকানোপেষালবণ কখনশেষ ধাপ
Turia Chakma প্রমুখ, 2015তিন দিন, প্রতিদিন সারা দিনতিন রাত, কাঠের হামানদিস্তাকেবল প্রথম দিন, মাদুরে ও প্রথম পেষায়মোস-পাতায় মোড়া, খাচিতে 7–10 দিন
Monwar প্রমুখ, 2024প্রথমে 1–2 দিন, পরে আবারদুবার, কাঠের হামানদিস্তাশুরুতে অল্প, দুই পেষাতেই লবণসহমোড়ক ও বিক্রি
প্রথম আলো, 201312 ঘণ্টা, পরে গুঁড়া 24 ঘণ্টাঢেঁকিতে চূর্ণশেষে, পানির সঙ্গেপাতায় মুড়ে 20 কেজির ঝুড়ি
কলাপাড়া প্রতিবেদন, 2024স্তূপ করে পচানো, তারপর হালকা রোদপা দিয়ে মাড়ানোশেষেমোট 5–6 দিন

পটুয়াখালীর পদ্ধতিটি বাকিগুলো থেকে আলাদা, আর তার বিবরণ এসেছে উৎপাদনের বিরোধিতাকারী স্থানীয় শুঁটকি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ঘিরে লেখা প্রতিবেদন থেকে। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী মাছ প্রথমে নির্দিষ্ট জায়গায় স্তূপ করে পচতে দেওয়া হয়, হালকা শুকিয়ে পা দিয়ে মাড়ানো হয়, আবার শুকিয়ে লবণ মেশানো হয়, সব মিলিয়ে 5 থেকে 6 দিন। কক্সবাজার থেকে আসা এক নাপ্পি ব্যবসায়ী সেখানে লবণ মেশানো ও পা দিয়ে মাড়ানোর কথা স্বীকার করেছেন। এই অভিযোগ নিয়ে নিচে আলাদা অংশ আছে।

পাহাড়ি খাবারের আগের লেখায় আজকের পত্রিকার (15 জানুয়ারি 2023) একটি সংজ্ঞা উদ্ধৃত হয়েছিল, যেখানে সিদোল বা নাপ্পিকে বলা হয়েছে “চিংড়ি বা ছোট মাছ শুকিয়ে গুঁড়া করে বা মাটি চাপা দিয়ে বানানো বিশেষ খাবার”। উৎপাদনের ধাপ বর্ণনা করা যে দুটি গবেষণা ও চারটি প্রতিবেদন এই লেখায় ব্যবহার হয়েছে, তার কোনোটিতেই মাটিচাপার কোনো ধাপ নেই। মাটিচাপা কোথাও প্রচলিত কি না, জানা যায়নি।

নাপ্পিতে লবণ কতটা, আর গাঁজন হয় কখন

নাপ্পিতে লবণের সঠিক অনুপাত কোনো উৎসে দেওয়া নেই। গবেষণা দুটি বলেছে “অল্প লবণ” (small amount of salt), আর লবণ দেওয়া হয় শুরুর দিকে, শুকানো ও প্রথম পেষার সময়। গাঁজন বা ফারমেন্টেশন ঘটে মূলত শুকানো-পেষার ফাঁকে ফাঁকে আর শেষে পাতায় মোড়া অবস্থায় ঝুড়িতে রেখে দেওয়ার 7 থেকে 10 দিনে।

লবণ নিয়ে উৎসগুলোর কথা পাশাপাশি রাখলে এমন দাঁড়ায়। 2015 সালের গবেষণা: মাদুরে অল্প লবণ, প্রথম রাতের পেষায় লবণ, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পেষায় লবণ নয়। 2024 সালের গবেষণা: শুরুতে অল্প লবণ, দুই দফা পেষাতেই “লবণসহ”। প্রথম আলো 2013: শুকনো চিংড়ির গুঁড়ার সঙ্গে পানি ও লবণ মেশানো। আলোকিত বাংলাদেশ 2026: ছোট চিংড়ি ও মাছের সঙ্গে “পরিমিত লবণ মিশিয়ে নির্দিষ্ট সময় গাঁজন করা হয়”, তারপর রোদে শুকানো ও বারবার পেষা। শেষ বিবরণটিতে গাঁজন আগে, শুকানো পরে; বাকিগুলোতে উল্টো।

সীমানার ওপারের তুলনাটিও এখানে প্রাসঙ্গিক। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Ngapi নিবন্ধ লিখেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ঙাপ্পিতে লবণ “খুব কম বা একেবারেই থাকে না”, অথচ মিয়ানমারের অন্য অঞ্চলের ঙাপ্পিতে লবণ বেশি। বাংলাদেশের রাখাইন উৎপাদকদের নাপ্পি নিয়ে দুটি গবেষণাই লবণ দেওয়ার কথা বলেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের উপকূলের নাপ্পি আর আরাকানের ঙাপ্পি লবণের প্রশ্নে এক রকম নয়, অন্তত এই উৎসগুলো অনুযায়ী।

Monwar ও সহকর্মীদের পরিমাপে নাপ্পির ছাই বা খনিজ অংশ ছিল 17.49 থেকে 18.47 শতাংশ, আর আর্দ্রতা 35 থেকে 38 শতাংশ। লবণের আলাদা পরিমাপ গবেষণায় নেই, তাই ছাইয়ের কত অংশ লবণ, তা এই তথ্য থেকে বলা যায় না।

গাঁজন কত দিন চলে, সেটিও সূত্রভেদে আলাদা। 2015 সালের বিবরণে পুরো প্রক্রিয়া তিন দিন আর ঝুড়িতে 7–10 দিন, অর্থাৎ মোটামুটি দুই সপ্তাহ। সমতলের চ্যাপা শুঁটকি বা উত্তর-পূর্ব ভারতের শিদল যেখানে মাসের পর মাস মাটির পাত্রে বন্ধ থাকে, নাপ্পির গাঁজন সেখানে অনেক ছোট। এই পার্থক্যই সিদোল নামের বিভ্রান্তির একটি চাবি।

পাতা, খাচি আর 20 কেজির ঝুড়ি: নাপ্পি কী পাত্রে রাখা হয়

নাপ্পি মাটির হাঁড়িতে নয়, পাতায় মুড়ে চেরা বাঁশের ঝুড়িতে রাখা হয়। প্রতিটি ঝুড়িতে থাকে 20 কেজি। পাতার নাম উৎসভেদে আলাদা: 2015 সালের গবেষণায় “মোস-পাতা”, কক্সবাজার লাইফের 2024 সালের প্রতিবেদনে বাঁশ ও গামারি পাতা। ঝুড়ির স্থানীয় নাম “খাচি”।

পাতা বিছানো পাঁচটি চেরা বাঁশের ঝুড়িতে স্তূপ করা ধূসর-কালচে নাপ্পি, দুটি ঝুড়িতে কাঠের হাতল গোঁজা
পাতা বিছানো বাঁশের ঝুড়িতে নাপ্পি। ছবির স্থান ও তারিখ Commons-এ দেওয়া নেই। ছবি: Rushafi · Public domain · Wikimedia Commons

প্রথম আলোর 2013 সালের প্রতিবেদন লিখেছে, তৈরি নাপ্পি “পাতা দিয়ে মুড়িয়ে বাঁশের ঝুড়িতে ভরে ট্রাকে বোঝাই করা হচ্ছে। প্রতিটি ঝুড়িতে থাকে 20 কেজি নাপ্পি।” 2015 সালের গবেষণাও 20 কেজির খাচির কথা বলেছে। কক্সবাজার লাইফের প্রতিবেদনেও একই মাপ: প্রায় 20 কেজির বাঁশের ঝুড়ি। তিনটি স্বাধীন উৎসে একই সংখ্যা আসায় 20 কেজির ঝুড়িকে নাপ্পির প্রচলিত বিক্রির একক বলা যায়।

ঘরে আনার পর নাপ্পি কীভাবে রাখা হয়, তার নির্দিষ্ট বিবরণ কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। 2015 সালের গবেষণা থেকে একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত মেলে: খোলা বাতাসে এক মাস রাখা নমুনায় জীবাণু বেড়েছিল (বিস্তারিত নিরাপত্তা অংশে)। Monwar ও সহকর্মীরা উৎপাদকদের জন্য কম খরচের সংরক্ষণ প্রযুক্তির সুপারিশ করেছেন, যা থেকে বোঝা যায় এখনকার সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত নয়।

নাপ্পি কোন মৌসুমে তৈরি হয়: শীত, না বর্ষার আগে

নাপ্পি তৈরির মৌসুম নিয়ে উৎসগুলো একমত নয়। Monwar ও সহকর্মীরা লিখেছেন, স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায় শীতকালে নাপ্পি তৈরি করেন, আর তাঁদের নমুনা নেওয়া হয়েছিল ডিসেম্বর 2022-এ। পটুয়াখালীর প্রতিবেদনও বলছে শীত মৌসুমে। কিন্তু প্রথম আলোর প্রতিবেদক 26 সেপ্টেম্বর 2013-এ চৌফলদণ্ডীতে গিয়ে নাপ্পি তৈরির “ধুম” দেখেছিলেন।

বাকি সূত্রগুলো এই ছবিকে আরও জটিল করে। 2015 সালের গবেষণার নমুনা কক্সবাজারের দুই বাজার থেকে নেওয়া হয়েছিল নভেম্বর 2013 থেকে ফেব্রুয়ারি 2014-এর মধ্যে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা পত্রিকায় (Bangladesh Journal of Fisheries) 2020 সালে প্রকাশিত Md. Ismail Hossain ও সহকর্মীদের জরিপের সারাংশ বলছে, নাপ্পির বাজারজাতকরণের পথ “স্থান ও বছরের মৌসুম” অনুযায়ী বদলায়। দ্য ডেইলি স্টারের ফেব্রুয়ারি 2023-এর একটি ফিচারে সাধারণভাবে শুঁটকির মৌসুম বলা হয়েছে অক্টোবর থেকে এপ্রিল।

উৎপাদকদের কথায় মৌসুম ঠিক করে কাঁচামালের জোগান। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে চৌফলদণ্ডীর মংলাচি রাখাইন বলেছেন, সাগরে মিম বেশি ধরা পড়লে প্রতি ঝুড়ির দাম 100–120 টাকায় নেমে আসে, “তখন নাপ্পিতে বেশি লাভ করা যায়”। পটুয়াখালীর প্রতিবেদনে কক্সবাজারের এক ব্যবসায়ীর কথা আরও স্পষ্ট: শীত মৌসুমে কক্সবাজারে এসব মাছ কম পাওয়া যায় বলে তাঁরা পটুয়াখালী গিয়ে নাপ্পি তৈরি করেন।

নাপ্পি কোথায় তৈরি হয়: চৌফলদণ্ডী থেকে মহিপুর

নাপ্পি তৈরির প্রধান কেন্দ্র কক্সবাজার সদরের চৌফলদণ্ডী ইউনিয়ন। এর বাইরে খুরুশকুল, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, টেকনাফ, নাজিরারটেক, আর মৌসুমে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর এলাকায় নাপ্পি তৈরির কথা বিভিন্ন উৎসে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতরে নাপ্পি তৈরি হয় বলে কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

এলাকাকী বলা হয়েছেউৎস
চৌফলদণ্ডী, কক্সবাজার সদরমগপাড়ায় 20টির বেশি জায়গায় দলবদ্ধ উৎপাদন; প্রায় 26টি রাখাইন গ্রাম; গবেষণার নমুনাস্থলপ্রথম আলো 2013; কক্সবাজার লাইফ 2024; গবেষণা 2015, 2024
মহেশখালীউৎপাদন এলাকা; গবেষণার নমুনাস্থলপ্রথম আলো 2013; ডেইলি স্টার 2023; গবেষণা 2024
খুরুশকুল, কুতুবদিয়া, টেকনাফউপকূলের রাখাইনপল্লিতে উৎপাদনপ্রথম আলো 2013; ডেইলি স্টার 2023
নাজিরারটেকনাপ্পি উৎপাদনকে ঘিরে ব্যবসাআলোকিত বাংলাদেশ 2026
হারবাং, চকরিয়াপাইকারি ও খুচরা বাজার, উৎপাদন নয়গবেষণা 2015
মহিপুর, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)শীত মৌসুমে শুঁটকিপল্লিতে উৎপাদন, কক্সবাজারের ব্যবসায়ীসহ 200-এর বেশি মানুষকলাপাড়া প্রতিবেদন, ডিসেম্বর 2024
কক্সবাজার ও পটুয়াখালী (সাধারণভাবে)রাখাইনরা সামুদ্রিক শুঁটকি ও নাপ্পি উৎপাদন করেনজুমজার্নাল আর্কাইভ, পাভেল পার্থ

2015 সালের গবেষণাপত্রের ভূমিকায় নাপ্পি তৈরির এলাকা হিসেবে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের “পাহাড়ি জেলা”র কথাও আছে, আর 2020 সালের জরিপটি কক্সবাজারের পাশাপাশি বান্দরবানেও হয়েছিল। তবে বান্দরবানে উৎপাদন হয় নাকি কেবল বিক্রি, তা 2020 সালের জরিপের সারাংশে আলাদা করে বলা নেই, আর পূর্ণপাঠ পাওয়া যায়নি।

এই ভূগোল জুমজার্নালের আর্কাইভেও আছে। “চাকমা জাতি” লেখাটি জানায়, সিদোল তৈরি হয় “উপকূল অঞ্চলে বিশেষত কক্সবাজার জেলার উপকূলবর্তী এলাকায় রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকেরা”। অর্থাৎ পাহাড়ি রান্নার একটি কেন্দ্রীয় উপকরণ তৈরি হয় পাহাড়ে নয়, সমুদ্রতীরে। রাখাইনরা কীভাবে আরাকান থেকে এই উপকূলে এসে বসতি করেছিলেন, সে ইতিহাস আছে 1784: আরাকান থেকে কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর উপকূলে রাখাইন বসতি লেখায়।

নাপ্পি কারা তৈরি করেন: রাখাইন পরিবার, শ্রমিক আর ব্যবসায়ী

নাপ্পির প্রধান উৎপাদক কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর রাখাইন সম্প্রদায়, এ কথা প্রতিটি উৎসে আছে। তবে উৎপাদন ও ব্যবসায় এখন বাঙালি ব্যবসায়ী ও শ্রমিকও যুক্ত। প্রথম আলোর 2013 সালের হিসাবে কক্সবাজার জেলার 8 হাজার রাখাইনসহ অন্তত 30 হাজার মানুষ নাপ্পি উৎপাদন ও বিপণনে জড়িত।

প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনে চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের সাবেক সদস্য থোয়াইংগা রাখাইন বলেছেন, রাখাইনদের অনেকে নাপ্পি তৈরি করে দিয়ে দৈনিক 200 থেকে 250 টাকা পারিশ্রমিক পান, আর “নাপ্পি না হলে এই জনপদের আট হাজার রাখাইন বেকার হয়ে পড়ত”। স্থানীয়দের হিসাবে শুধু চৌফলদণ্ডী গ্রামেই নাপ্পি ব্যবসায়ী পাঁচ শতাধিক, আর সাগরে মিম চিংড়ি ধরার নৌকা প্রায় 400টি।

কক্সবাজার লাইফ (অক্টোবর 2024) লিখেছে, চৌফলদণ্ডী এলাকায় রাখাইনরা প্রায় 26টি গ্রামে থাকেন, তাঁদের আয়ের প্রধান উৎস নাপ্পি তৈরি ও বিক্রি, আর এই উৎপাদন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় 10 হাজার পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছে।

2020 সালের জরিপের সারাংশ বলছে, নাপ্পি উৎপাদন ও ব্যবসায় জড়িতদের বেশির ভাগ রাখাইন, ধর্মে বৌদ্ধ, আর তাঁরা “প্রজন্মের পর প্রজন্ম” এই কাজ করছেন। একই সারাংশ অনুযায়ী পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা উৎপাদকের চেয়ে বেশি লাভ করেন, আর পাইকাররা অর্থনৈতিকভাবে উৎপাদকদের চেয়ে সচ্ছল।

পটুয়াখালীর মহিপুরে উৎপাদনের যে চিত্র 2024 সালের প্রতিবেদনে এসেছে, সেখানে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে আসা ব্যবসায়ীদের কথা আছে। অর্থাৎ নাপ্পি এখন আর কেবল রাখাইন ঘরের কুটিরশিল্প নয়; কক্সবাজারের উদ্যোক্তা সাইয়্যিদ মঞ্জুর মতো বাণিজ্যিক উৎপাদকও আছেন (আলোকিত বাংলাদেশ, 2026)।

জুমজার্নালের আর্কাইভে পাভেল পার্থের “আদিবাসী জনগণের কার্বন-নিরপেক্ষ অর্থনীতি” লেখায় আরেকটি তথ্য আছে: লবণ উৎপাদনে জড়িত আছেন “রাখাইন ও কিছু তঞ্চঙ্গ্যা পরিবার”। নাপ্পির লবণ এই উপকূলের লবণমাঠ থেকেই আসে কি না, তা কোনো উৎসে বলা নেই।

পাহাড়ে কে কোন নামে খায়: নাপ্পি, সিদোল, ঙাপ্পি, চিদল

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় সব জনগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায় এই মাছ-চিংড়ির মণ্ড আছে, কিন্তু নাম আলাদা। জুমজার্নালের আর্কাইভে চাকমা লেখায় নাম সিদোল, মারমা লেখায় ঙাপ্পি, তঞ্চঙ্গ্যা লেখায় নাপ্পি বা চিদল, খিয়াং ও খুমী লেখায় নাপ্পি। এক জনগোষ্ঠীর ভেতরেও একাধিক নাম চলে।

জনগোষ্ঠীউৎসে ব্যবহৃত নামউৎসের বর্ণনাউৎস
চাকমাসিদোল“সামুদ্রিক মাছ হতে তৈরী সিদোল চাকমাদের তরকারী রান্নার প্রধান উপকরণ”চাংমাটারা (তনয় দেওয়ান)
চাকমাসিদোলসমুদ্রের ছোট মাছ ও চিংড়ি গুঁড়ো করে প্রক্রিয়াজাত মণ্ড; রাখাইনরা তৈরি করেনচাকমা জাতি
চাকমাঙাপ্পি“ছেলেবেলা থেকে এখানকার নিম্নমানের ঙাপ্পি” খাওয়ার অভ্যাসের কথামায়ানমারে চম্পকনগরের পথে (সুপ্রিয় তালুকদার)
মারমাঙাপ্পি“মাছের পেস্ট”, তরকারি ও মরিচের চাটনিতেমারমা জাতির আদ্যোপান্ত
তঞ্চঙ্গ্যানাপ্পি বা চিদলসিদ্ধ তরকারি আর মরিচ বাটায়তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত
তঞ্চঙ্গ্যানাপ্পি“এক ধরণের শুটকি গুড়া দিয়ে তৈরি নাপ্পি”তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয় (মিলন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা)
খিয়াংনাপ্পি“শুকনো মাছ দিয়ে তৈরি এক প্রকার খাবার”খিয়াং জাতির আদ্যোপান্ত
খুমীনাপ্পিলবণ, হলুদ, আদা, পেঁয়াজ, রসুনের সঙ্গে রান্নার উপাদানখুমী জাতির আদ্যোপান্ত (লেলুং খুমী)
মারমা, ত্রিপুরা, চাকমা, রাখাইনNappiএই জনগোষ্ঠীগুলো নাপ্পি তৈরি করে; রাখাইনরা প্রধান উৎপাদক ও বিক্রেতাTuria Chakma প্রমুখ, 2015

শেষ সারিটি নিয়ে একটি সতর্কতা দরকার। 2015 সালের গবেষণাপত্রের ভূমিকায় মারমা, ত্রিপুরা ও চাকমাদেরও নাপ্পি “তৈরি” করার কথা আছে, কিন্তু তার কোনো সূত্র বা মাঠপর্যায়ের বিবরণ সেখানে নেই; গবেষণার নমুনা নেওয়া হয়েছে কেবল কক্সবাজারের দুই বাজার থেকে। বাকি সব উৎসে পার্বত্য জনগোষ্ঠীগুলো নাপ্পি বা সিদোলের ভোক্তা, উৎপাদক নয়।

বম, ম্রো, লুসাই, পাংখোয়া ও চাক রান্নায় নাপ্পি বা সিদোলের ব্যবহার নিয়ে আর্কাইভে বা অন্য উৎসে আলাদা বিবরণ পাওয়া যায়নি। ত্রিপুরা রান্নায় এর নাম কী, সেটিও জানা যায়নি।

সিদোল আর নাপ্পি কি একই জিনিস?

পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সিদোল খাওয়া হয়, উৎসগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী সেটি আর উপকূলের নাপ্পি একই ধরনের জিনিস: সমুদ্রের ছোট মাছ ও চিংড়ি থেকে তৈরি, কক্সবাজারের রাখাইনদের হাতে। কোনো উৎস পাহাড়ে আলাদাভাবে তৈরি “সিদোল” নামের অন্য কোনো পণ্যের বিবরণ দেয়নি। তবে কোনো উৎস দুটিকে হুবহু এক বলে স্পষ্ট ঘোষণাও করেনি।

এই উপসংহারের পেছনে যুক্তিগুলো এক এক করে:

  1. উপাদান এক। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখায় সিদোল হলো “সমুদ্রের ছোট মাছ ও চিংড়ি দিয়ে গুড়ো করে বিশেষ প্রক্রিয়াজাত মণ্ড”। চাকমা রাঁধুনি Chiangmi Talukder Lena দ্য ডেইলি স্টারে (ফেব্রুয়ারি 2021) লিখেছেন, সিদোল “গাঁজানো চিংড়ি ও নানা মাছের পেস্ট”। গবেষণায় নাপ্পির বর্ণনাও তাই: মূলত ছোট চিংড়ি, সঙ্গে ছোট মাছ।
  2. উৎপাদক ও জায়গা এক। আর্কাইভ বলছে সিদোল তৈরি করেন কক্সবাজারের উপকূলের রাখাইনরা; নাপ্পি নিয়ে প্রতিটি গবেষণা ও প্রতিবেদন একই কথা বলে।
  3. পাহাড়ি লেখকেরা দুটি নাম একসঙ্গে লেখেন। তঞ্চঙ্গ্যা লেখায় “নাপ্পি বা চিদল”, আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে “সিদোল বা নাপ্পি”। চাকমা গবেষক সুপ্রিয় তালুকদার নিজের ছেলেবেলার জিনিসটিকে বলেছেন “ঙাপ্পি”।
  4. বাজারের প্রবাহ এক। প্রথম আলো জানাচ্ছে চৌফলদণ্ডীর নাপ্পি যায় বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে। পাহাড়ে আলাদা কোনো সিদোল-উৎপাদন কেন্দ্রের উল্লেখ কোথাও নেই।

নামের উৎস নিয়ে উৎসে যতটুকু আছে: ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে বর্মী শব্দ ngapi-র আক্ষরিক অর্থ “চাপা মাছ”, আর বাংলাদেশে চিংড়ির পেস্টকে বলা হয় nappi। চাকমা “সিদোল” বা তঞ্চঙ্গ্যা “চিদল” শব্দের উৎস নিয়ে কোনো প্রকাশিত ব্যুৎপত্তি পাওয়া যায়নি। শব্দটি শুনতে বাংলার “সিদল” বা “শিদল”-এর কাছাকাছি, কিন্তু সেই নামে সমতলে যে খাবারগুলো চলে, সেগুলো আলাদা জিনিস (পরের অংশ দেখুন)।

একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য তবু থেকে যায়। Lena যেখানে সিদোলের কথা বলেছেন, সেখানে তিনি “suguni” বা শুঁটকিকে আলাদা উপকরণ হিসেবে দেখিয়েছেন, চাকমা ভাষায় যার আরেক নাম “eje guri”। অর্থাৎ চাকমা রান্নাঘরে সিদোল (পেস্ট) আর শুঁটকি (আস্ত শুকনো মাছ) দুটি আলাদা জিনিস, যদিও দুটিই উপকূল থেকে আসে। এর বিস্তারিত আছে চাকমা খাবারের লেখায়।

একই নামের অন্য খাবার: রংপুরের সিঁদল, চ্যাপা আর উত্তর-পূর্ব ভারতের শিদল

“সিদল” নামে বাংলাদেশ ও ভারতে অন্তত আরও তিনটি আলাদা খাবার আছে, আর তিনটিই পাহাড়ের সিদোল বা নাপ্পি থেকে ভিন্ন। রংপুরের সিঁদল ছোট মাছের শুঁটকি আর কচুর ডাঁটা বেটে বানানো শুকনো বড়া। ময়মনসিংহের চ্যাপা শুঁটকিকেও সিধল বা হিদল বলা হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের শিদল লবণ ছাড়া পুঁটি মাছ মাটির পাত্রে মাসের পর মাস গাঁজিয়ে তৈরি।

রংপুরের সিঁদল। আলোকিত বাংলাদেশের রংপুর ব্যুরোর জুলাই 2023-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী এটি তৈরি হয় মলা, ডারকা বা পুঁটি জাতীয় ছোট মাছ দিয়ে। মাছ সপ্তাহখানেক কড়া রোদে শুকিয়ে ঢেঁকিতে বা কাঠের বড় হামানদিস্তায় (স্থানীয় নাম উরুনগান) আধা গুঁড়ো করা হয়, তারপর সমপরিমাণ সাদা মানকচু ও কালো কচুর কাঁচা ডাঁটা বেটে মেশানো হয়, সঙ্গে আদা, রসুন, খাওয়ার সোডা, হলুদ ও সরিষার তেল। হাতে গোল বা চ্যাপটা করে আরও এক সপ্তাহ রোদে শুকালে সিঁদল তৈরি। এখানে সাগরের চিংড়ি নেই, আছে মিঠাপানির মাছ আর কচু।

চ্যাপা শুঁটকি। দ্য ডেইলি স্টারের ফেব্রুয়ারি 2023-এর ফিচারে Shahana Huda Ranjana লিখেছেন, চ্যাপা শুঁটকি নানা নামে পরিচিত, যেমন সিধল বা সিদোইল, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লায় হিদল, আর পার্বত্য চট্টগ্রামে “ব্যারমা”। একই লেখায় নাপ্পিকে বলা হয়েছে চ্যাপার “আরেক রূপ”। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও নেদারল্যান্ডসের ভাগেনিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক Farhana Jasmin Ara ও সহকর্মীদের 2025 সালের গবেষণা (Heliyon) চ্যাপার উৎপাদন বর্ণনা করেছে: লবণ ছাড়া, পুঁটি, ফাইশা বা পোমা মাছ 12–15 দিন রোদে শুকিয়ে, নদীর পানিতে ভিজিয়ে, “মটকা” নামের মাটির পাত্রে ঠেসে ভরা হয়। মটকার ছিদ্র বন্ধ করা হয় মাছের নাড়িভুঁড়ি থেকে বের করা তেলে, মুখ বন্ধ হয় শুঁটকি-বাটা আর ভেজা কাদার স্তরে, তারপর 3 থেকে 12 মাস গাঁজন।

উত্তর-পূর্ব ভারতের শিদল। Foods পত্রিকায় 2023 সালের একটি পর্যালোচনা (Chan ও সহকর্মীরা) লিখেছে, শিদল তৈরি হয় পুঁটি (Puntius) ও ফাইশা (Setipinna phasa) মাছ দিয়ে, লবণ ছাড়া, বায়ুরোধী মাটির পাত্রে প্রায় 3 থেকে 5 মাস। তবে Comprehensive Reviews in Food Science and Food Safety-এর 2026 সালের একটি পর্যালোচনার ছকে (Khongthaw ও সহকর্মীরা) শিদলের প্রক্রিয়ায় 1:10 অনুপাতে পরে লবণ দেওয়ার কথা আছে। ভারতের International Journal of Food and Fermentation Technology-এর 2018 সালের একটি পর্যালোচনা অনুযায়ী আসাম, ত্রিপুরা, অরুণাচল ও নাগাল্যান্ডে এর স্থানীয় নাম seedal, seepa, hidal ও shidol।

খাবারকাঁচামাললবণপাত্রসময়
নাপ্পি / পাহাড়ের সিদোলসাগরের ছোট চিংড়ি (Acetes, Mysid), কিছু ছোট মাছঅল্প, শুরুতেপাতায় মোড়া, বাঁশের খাচি3 দিন + 7–10 দিন
চ্যাপা শুঁটকি (সিধল, হিদল)পুঁটি, ফাইশা, পোমানেইমাছের তেলে মাখানো মাটির মটকা3–12 মাস
শিদল (উত্তর-পূর্ব ভারত)পুঁটি, ফাইশানেইবায়ুরোধী মাটির পাত্র3–5 মাস
রংপুরের সিঁদলমলা, ডারকা, পুঁটি + কচুর ডাঁটাউৎসে উল্লেখ নেইডালা বা কুলায় রোদেপ্রায় 2 সপ্তাহ রোদ

তিনটি পার্থক্য স্পষ্ট। নাপ্পি সাগরের চিংড়ির, বাকিগুলো মিঠাপানি বা মোহনার মাছের। নাপ্পিতে লবণ আছে, চ্যাপা ও শিদলে নেই। নাপ্পির গাঁজন দুই সপ্তাহের, চ্যাপা ও শিদলের কয়েক মাসের, বন্ধ মাটির পাত্রে। কাজেই অনলাইনে “সিদল তৈরির পদ্ধতি” খুঁজলে রংপুর বা ময়মনসিংহের রেসিপি এলে সেটি পাহাড়ের সিদোলের রেসিপি নয়।

উত্তর-পূর্ব ভারতের চাকমারা কোন সিদোল খান, উপকূলের নাপ্পি না স্থানীয় শিদল, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি। কলকাতার নিউ টাউনে বসবাসরত চাকমাদের নিয়ে Soumen Das-এর 2025 সালের একটি সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় (International Journal of Social Science Research) সিদোলকে কেবল “fermented fish paste” বলা হয়েছে; উৎস বা উৎপাদনের কথা সেখানে নেই।

নাপ্পিতে কী আছে: প্রোটিন, চর্বি, আর্দ্রতা

নাপ্পির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রোটিন। Monwar ও সহকর্মীদের পরিমাপে মহেশখালীর নমুনায় প্রোটিন 34.93 শতাংশ, চৌফলদণ্ডীর নমুনায় 37.43 শতাংশ। আর্দ্রতা ছিল 37.66 ও 35.44 শতাংশ, চর্বি 8.53 ও 6.0 শতাংশ, ছাই 17.49 ও 18.47 শতাংশ, শর্করা 1.39 ও 2.66 শতাংশ।

উপাদান (%)মহেশখালীচৌফলদণ্ডী
প্রোটিন34.9337.43
আর্দ্রতা37.6635.44
ছাই (খনিজ)17.4918.47
চর্বি8.536.0
শর্করা1.392.66

গবেষকেরা নিজেদের ফলকে আগের হিসাবের সঙ্গে মিলিয়েছেন। তাঁদের উদ্ধৃত Clucas ও Ward-এর নির্দেশিকায় নাপ্পির প্রোটিন 30–40 শতাংশ, আর্দ্রতা 27–40 শতাংশ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের 2012 সালের একটি অপ্রকাশিত টার্ম পেপারে প্রোটিন 22.62 থেকে 33.46 শতাংশ, চর্বি 5.58 থেকে 12.53 শতাংশ। চৌফলদণ্ডীর নমুনায় প্রোটিন বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে গবেষকেরা ভালো কাঁচামাল আর কম আর্দ্রতার কথা বলেছেন, আর মহেশখালীর নাপ্পির মান বাড়াতে আর্দ্রতা কমানোর সুপারিশ করেছেন।

একই গবেষণাপত্রে নাপ্পিকে বলা হয়েছে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য “সাশ্রয়ী প্রোটিনের উৎস”। তবে তরকারিতে নাপ্পি দেওয়া হয় অল্প পরিমাণে, স্বাদের জন্য; দৈনিক খাদ্যে নাপ্পি থেকে কতটা প্রোটিন আসে, সে হিসাব কোনো উৎসে নেই।

নাপ্পি কতটা নিরাপদ: দুই বাজারের নমুনায় যা পাওয়া গেছে

বাজারের নাপ্পিতে জীবাণুর মাত্রা খুব বেশি পাওয়া গেছে। 2015 সালের গবেষণায় কক্সবাজারের চৌফলদণ্ডী ও হারবাং বাজারের নমুনায় প্রতি গ্রামে মোট ব্যাকটেরিয়া ছিল 1010-এর ঘরে, সালমোনেলা 107-এর ঘরে, ভিব্রিও 106-এর ঘরে। এক মাস খোলা রাখার পর প্রায় সব মাত্রা আরও বেড়েছে। গবেষকদের মতে রান্নার তাপে বেশির ভাগ জীবাণু মরে যায়, তাই কাঁচা নাপ্পিই ঝুঁকির।

গবেষণাটি করেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের Turia Chakma, Bhakta Supratim Sarker, Priyanka Rani Majumdar, A.B.M. Ashraful Hoque ও M. Belal Hossain, সঙ্গে জাপানের মিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের Debasish Saha। নভেম্বর 2013 থেকে ফেব্রুয়ারি 2014-এর মধ্যে দুই বাজার থেকে 10টি করে টাটকা নমুনা নেওয়া হয়; একই নমুনার একাংশ গবেষণাগারে ফ্রিজ ছাড়া খোলা বাতাসে এক মাস রেখে আবার পরীক্ষা করা হয়।

জীবাণু (CFU/g)চৌফলদণ্ডী, টাটকাচৌফলদণ্ডী, এক মাস পরহারবাং, টাটকাহারবাং, এক মাস পর
মোট ব্যাকটেরিয়া1.32 × 10101.63 × 10101.43 × 10101.52 × 1010
মোট কলিফর্ম7.70 × 1098.55 × 1097.75 × 1098.25 × 109
মলবাহিত কলিফর্ম5.06 × 1096.99 × 1095.87 × 1096.07 × 109
সালমোনেলা2.30 × 1079.5 × 1072.6 × 1073.01 × 107
ভিব্রিও3.35 × 1065.55 × 1063.25 × 1064.0 × 106

গবেষকেরা লিখেছেন, রাখাইন গ্রামগুলোতে পুরো প্রক্রিয়া “খুবই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে” হয়। দূষণের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তাঁরা নষ্ট কাঁচা চিংড়ি, অপরিচ্ছন্ন প্রস্তুতি, পরিবহন আর অনুপযুক্ত সংরক্ষণের কথা বলেছেন। প্রজাতি পর্যায়ে শনাক্ত করা গবেষণার আওতায় ছিল না; তবে এত বেশি ভিব্রিও ও সালমোনেলা থাকায় কলেরা, টাইফয়েড বা প্যারাটাইফয়েডের জীবাণু থাকার সম্ভাবনা বাড়ে বলে তাঁরা সতর্ক করেছেন।

একই গবেষণাপত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যও আছে। গবেষকেরা লিখেছেন, এত জীবাণু সত্ত্বেও অসুখের ঘটনা “সাধারণ নয়”, কারণ আদিবাসীরা প্রথাগতভাবে নাপ্পি অন্য উপকরণের সঙ্গে 100 ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপে রান্না করে খান, আর এই তাপে প্রায় সব সক্রিয় জীবাণু মরে যায়। ঝুঁকি থাকে তখনই, যখন নাপ্পি ঠিকমতো রান্না না করে খাওয়া হয়।

Monwar ও সহকর্মীদের 2024 সালের গবেষণাও একই দিকে ইঙ্গিত করে: নষ্ট কাঁচা চিংড়ি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর দুর্বল প্রস্তুতিতে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, ভাইরাস ও পরজীবী দূষণের সুযোগ থাকে। তাঁরা উৎপাদনে স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি মানা, উন্নত প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা এবং কম খরচের সংরক্ষণ প্রযুক্তির সুপারিশ করেছেন।

এখানে বলে রাখা দরকার, এই দুটি গবেষণা যথাক্রমে 2013–14 ও 2022 সালের নমুনার ওপর, আর নমুনা কেবল কক্সবাজারের। পটুয়াখালীর নাপ্পি বা পাহাড়ের বাজারে বিক্রি হওয়া নাপ্পি নিয়ে কোনো জীবাণু পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়নি। Food Research পত্রিকায় ডিসেম্বর 2023-এ Chakma ও সহকর্মীদের একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে দীর্ঘ শীতল সংরক্ষণে গাঁজানো চিংড়ি-পেস্টের মান নিয়ে, তবে তার পূর্ণপাঠ পাওয়া যায়নি।

অস্বাস্থ্যকর উৎপাদনের অভিযোগ, আর কর্তৃপক্ষ কী বলেছে

ডিসেম্বর 2024-এ পটুয়াখালীর মহিপুরের শুঁটকিপল্লিতে নাপ্পি উৎপাদন নিয়ে স্থানীয় শুঁটকি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ তোলেন: পচা মাছ পা দিয়ে মাড়ানো হয় আর “বিষাক্ত কেমিক্যাল” মেশানো হয়। উৎপাদক ব্যবসায়ী লবণ মেশানো ও পা দিয়ে মাড়ানোর কথা স্বীকার করেছেন, রাসায়নিকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা নমুনা পরীক্ষার কথা বলেছিলেন; সেই পরীক্ষার ফল জানা যায়নি।

প্রতিবেদনটি 11 ডিসেম্বর 2024-এ অনলাইন পত্রিকা স্বাধীন সূর্যোদয়ে “নিজস্ব প্রতিবেদক” নামে, আর পরদিন আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোরে “কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি” নামে প্রায় একই ভাষায় প্রকাশিত হয়। এতে যা আছে, তা কয়েক ভাগে আলাদা করে দেখা দরকার:

  • প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ হিসেবে উপস্থাপিত: নিজামপুর, নজিবপুর ও আন্দারমানিক নদীর মোহনার শুঁটকিপল্লিতে কক্সবাজার থেকে আসা ব্যবসায়ীসহ 200-এর বেশি মানুষ নাপ্পি তৈরি করছেন; ছোট চিংড়ি থেকে তিনটি পণ্য হয়: ভুলা শুঁটকি, নাপ্পি আর “রাবিশ”।
  • অভিযোগ: কমরপুরের কয়েকজন শুঁটকি ব্যবসায়ী বলেছেন, উৎপাদনে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো হয় আর তীব্র দুর্গন্ধে এলাকায় থাকা কঠিন। কোন রাসায়নিক, তার নাম প্রতিবেদনে নেই।
  • উৎপাদকের বক্তব্য: কক্সবাজারের এক উৎপাদক ব্যবসায়ী বলেছেন নাপ্পিতে “কোন স্বাস্থ্য ঝুঁকি নেই”; লবণ মেশানো ও পা দিয়ে মাড়ানো স্বীকার করেছেন, রাসায়নিক অস্বীকার করেছেন। চট্টগ্রামের আরেক ব্যবসায়ী পরিবেশ স্বাস্থ্যকর কি না, সে প্রশ্নের “সদুত্তর” দেননি বলে প্রতিবেদনে লেখা।
  • কর্মকর্তাদের বক্তব্য: কলাপাড়া উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেছেন, নাপ্পি “অবশ্যই স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে” করতে হবে, খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন। পটুয়াখালী জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা আবু রায়হান বলেছেন, মহিপুরে নাপ্পি তৈরির কথা তাঁর জানা ছিল না; নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পরীক্ষা করবেন, ক্ষতিকর রাসায়নিক বা জীবাণু পেলে ব্যবস্থা নেবেন।

রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগ কোনো পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি; আবার অভিযোগ খণ্ডন করা কোনো পরীক্ষার ফলও পাওয়া যায়নি। কক্সবাজারের উৎপাদন নিয়ে গবেষণা দুটিতে রাসায়নিক মেশানোর কোনো উল্লেখ নেই; সেখানে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে জীবাণু ও অপরিচ্ছন্নতা।

নাপ্পির জন্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আলাদা কোনো মান, নির্দেশিকা বা নাপ্পি-উৎপাদকের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কোনো প্রকাশিত রায় পাওয়া যায়নি। আলোকিত বাংলাদেশের অক্টোবর 2026-এর প্রতিবেদনে উদ্যোক্তা সাইয়্যিদ মঞ্জু বলেছেন, বিদেশের বাজার ধরে রাখতে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, নিরাপদ কাঁচামাল, “নিয়ন্ত্রিত গাঁজন প্রক্রিয়া”, মান পরীক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তা মানা জরুরি। অর্থাৎ মানদণ্ডের প্রশ্নটি উৎপাদকদের ভেতর থেকেও উঠছে।

নাপ্পির বাজার, দাম আর রপ্তানি

উপকূলের নাপ্পি দেশের ভেতরে যায় বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, বরিশাল, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে; দেশের বাইরে টেকনাফ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার ও ভারতে। দাম নিয়ে দুই সময়ের দুটি হিসাব আছে: প্রথম আলো 2013-এ প্রতি কেজি 800–900 টাকা, কক্সবাজার লাইফ 2024-এ প্রতি কেজি 400 টাকা, প্রতি মণ 13,000 টাকা।

উৎপাদনের পরিমাণ

প্রথম আলোর 2013 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী শুধু চৌফলদণ্ডী এলাকা থেকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত 500 মণ নাপ্পি বিভিন্ন জায়গায় যায়। কাঁচামাল ও ফলনের একটি হিসাবও সেখানে আছে: মাঝরপাড়ার মংলাচি রাখাইন জানিয়েছেন, 30–35 কেজির দুই ঝুড়ি চিংড়ি তিনি কেনেন 350–500 টাকায়, আর এমন চার ঝুড়ি কাঁচা মিম চিংড়ি থেকে এক মণ নাপ্পি হয়। ব্যবসায়ী সামো রাখাইনের হিসাবে 20 কেজির এক ভার মিম চিংড়ির দাম তখন 500–700 টাকা।

দেশজুড়ে মোট উৎপাদন বা বিক্রির কোনো সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। 2020 সালের জরিপের সারাংশে বলা আছে, বাংলাদেশে গাঁজানো মৎস্যপণ্য বাণিজ্যিক মাত্রায় উৎপাদিত হয় না।

দাম

দামের দুটি হিসাব পাশাপাশি: প্রথম আলো (অক্টোবর 2013) লিখেছে কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতি কেজি নাপ্পি 800 থেকে 900 টাকা; কক্সবাজার লাইফ (অক্টোবর 2024) এক বিক্রেতার কথায় লিখেছে পাইকারি প্রতি মণ 13,000 টাকা, খুচরা প্রতি কেজি 400 টাকা। এগারো বছরে দাম অর্ধেক হওয়ার কোনো ব্যাখ্যা কোনো উৎসে নেই; হিসাব দুটি ভিন্ন মানের নাপ্পির হতে পারে, কিন্তু উৎস তা বলেনি।

বাজারের পথ

Monwar ও সহকর্মীদের গবেষণায় উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগীদের তালিকা আছে: স্থানীয় ব্যবসায়ী, ব্যবসায়ী, কমিশন এজেন্ট, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা। তাঁরা নাপ্পির বাজারজাতকরণের চারটি পথ চিহ্নিত করেছেন। 2015 সালের গবেষণা জানাচ্ছে, চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়ন নাপ্পির পাইকারি ও খুচরা বেচাকেনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, আর চৌফলদণ্ডী উৎপাদনের কেন্দ্র। 2020 সালের জরিপ চালানো হয়েছিল 8 জন কাঁচা চিংড়ি সংগ্রাহক, 16 জন উৎপাদক, 12 জন পাইকার ও 10 জন খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে।

রপ্তানি

সীমান্ত পেরিয়ে নাপ্পি যাওয়ার কথা চারটি স্বাধীন উৎসে আছে, কিন্তু কোনো সরকারি রপ্তানি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি:

  • প্রথম আলো (2013): টেকনাফ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত দিয়ে “প্রতি মাসে অন্তত কয়েক কোটি টাকার নাপ্পি” ভারত ও মিয়ানমারে যায়।
  • দ্য ডেইলি স্টার (2023): প্রতি মাসে টেকনাফ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে নাপ্পি ভারত ও মিয়ানমারে রপ্তানি হচ্ছে।
  • Monwar প্রমুখ (2024): পণ্যটি “অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যপথে” মিয়ানমারে রপ্তানি হয়; মান নিশ্চিত হলে ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকংয়ে বাজার সম্ভব।
  • জুমজার্নাল আর্কাইভ, পাভেল পার্থ: নাপ্পি ও সামুদ্রিক শুঁটকির “এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ” মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যে রপ্তানি হয়।

আলোকিত বাংলাদেশের অক্টোবর 2026-এর প্রতিবেদন গন্তব্য হিসেবে ভারত, চীন ও থাইল্যান্ডের নাম দিয়েছে, তবে তথ্যটি “সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের” বরাতে। অন্যদিকে কক্সবাজার লাইফ (2024) লিখেছে, সরকারি সহায়তা পেলে রপ্তানি থেকে বিদেশি মুদ্রা আসতে পারে, অর্থাৎ বর্তমান রপ্তানির কথা সেখানে নেই। “রপ্তানি” বলতে উৎসগুলো আনুষ্ঠানিক রপ্তানি বোঝাচ্ছে, নাকি সীমান্ত-বাণিজ্য, তা কোথাও আলাদা করা হয়নি।

মানের প্রশ্নে সীমানার দুই পারের একটি তুলনা আর্কাইভে আছে। চাকমা গবেষক সুপ্রিয় তালুকদার 2013 সালে মিয়ানমার ভ্রমণের সময় ইয়াঙ্গুনে ঙাপ্পি দিয়ে বেগুনের তরকারি খেয়ে লিখেছেন, ছেলেবেলা থেকে “এখানকার নিম্নমানের ঙাপ্পি” খেয়ে অভ্যস্ত বলে “ইয়াংগুনে কারখানায় তৈরি উন্নতমানের ঙাপ্পির স্বাদ পাওয়া গেলনা”।

পাহাড়ের রান্নাঘরে নাপ্পি আর সিদোল কীভাবে ব্যবহৃত হয়

নাপ্পি বা সিদোল সাধারণত সরাসরি তরকারিতে দেওয়া হয় না, আগে পোড়ানো হয়। দ্য ডেইলি স্টারের 2023 সালের ফিচার অনুযায়ী নাপ্পি কলাপাতায় মুড়ে আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা হয়, তারপর রান্নায় দেওয়া হয়; আবার পানিতে গুলে সরাসরিও ব্যবহার করা যায়। এই পোড়ানোর গন্ধই চাকমা লেখকদের স্মৃতিতে বারবার এসেছে।

তনয় দেওয়ানের চাংমাটারা বইয়ে আছে: “সিদোল এর পোড়া গন্ধ পেলে প্রত্যেক চাকমার পেটে ক্ষুধা চলে আসে।” Chiangmi Talukder Lena কয়লার আগুনে মরিচসহ পোড়ানো সিদোলের সসের কথা লিখেছেন, যা সেদ্ধ শাকের সঙ্গে খাওয়া হয়, আর “মালাহ” নামের পুর-ভরা পদে সিদোল ভেজে দেওয়ার কথা। রাঙামাটির গীতিকার রণজিৎ দেওয়ান 2013 সালের একটি বক্তৃতায় “নাপ্পি পোড়া মরিচ দিয়ে কোরবু” খাওয়ার কথা বলেছেন (আর্কাইভে সংরক্ষিত)।

তঞ্চঙ্গ্যা রান্নায় নাপ্পি বা চিদলের জায়গা সিদ্ধ তরকারি ও মরিচ বাটায়, যাকে “উসুনা চন” বলা হয়। মারমা রান্নায় ঙাপ্পি দিয়ে মরিচের চাটনি আর সেদ্ধ সবজির তোহ্জা। বিজুর পাজনে সিদোল বা নাপ্পির ভূমিকা নিয়ে আছে পাজন কী? বিজুর খাবারে কত পদের সবজি লেখায়।

সিদোল দৈনন্দিন জীবনের এতটা গভীরে যে আর্কাইভে তার অর্থনৈতিক ছাপও আছে। চাংমাটারার একটি গল্পে গ্রামের শিক্ষক অন্য গোজার লোকের কাছে “চাল-সিদোল ধার” নিচ্ছেন বলে কার্বারী সভা ডাকা হয়, আর গ্রামবাসীরা পরের বাজারে তাঁকে কে কত দেবেন তার প্রতিশ্রুতি দেন। চাল আর সিদোল এখানে একসঙ্গে, সংসারের ন্যূনতম রসদ হিসেবে। চাকমা প্রবাদের সংকলনেও সিদোল এসেছে: “ঘিরে নিন্দেই সিদোলে” (চাকমা ভাষার বর্ণমালা ও ব্যকরণ)।

ঘরের বাইরেও এর জায়গা আছে। কলকাতায় বসবাসরত চাকমাদের নিয়ে Soumen Das-এর 2025 সালের গবেষণায় এক উত্তরদাতা জানিয়েছেন, বুদ্ধপূর্ণিমায় তিনি সিদোলের তরকারি রাঁধেন পূর্বপুরুষ ও অতিথি দুজনকেই খুশি করতে; আরেকজন বলেছেন, সিদোলের গন্ধ পেলে তিনি নিজের পরিচয় টের পান। গবেষণাটি সিদোলকে বুদ্ধপূর্ণিমা ও বিজুর মতো উৎসবের রান্নার অংশ হিসেবে দেখিয়েছে।

ঙাপ্পি, কাপি, তেরাসি: নাপ্পির সীমানার ওপারের আত্মীয়

নাপ্পি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিংড়ি-পেস্টের পরিবারের সদস্য। Monwar ও সহকর্মীদের ছক অনুযায়ী একই ধরনের পণ্য মিয়ানমারে ঙাপ্পি বা সেইনসা, থাইল্যান্ডে কাপি, ইন্দোনেশিয়ায় তেরাসি, মালয়েশিয়ায় বেলাচান, ফিলিপাইনে বাগুং বা আলামাং নামে পরিচিত, আর প্রায় সবখানে Acetes গণের চিংড়ি দিয়ে তৈরি।

দেশনামচিংড়ির প্রজাতি
বাংলাদেশনাপ্পিA. indicus, A. vulgaris
মিয়ানমারঙাপ্পি, সেইনসাA. indicus, A. vulgaris, A. intermedius
থাইল্যান্ডকাপিA. japonicus
ইন্দোনেশিয়াতেরাসিA. japonicus প্রভৃতি
মালয়েশিয়াবেলাচানA. japonicus, A. erythraeus প্রভৃতি
ফিলিপাইনবাগুং, আলামাংA. erythraeus, A. intermedius, A. vulgaris

ছকটি গবেষকেরা নিয়েছেন Hajeb ও Jinap-এর 2012 সালের একটি পর্যালোচনা থেকে। একই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, চিংড়ির পেস্ট সম্ভবত প্রথম তৈরি করেছিলেন ইন্দোচীন অঞ্চলের চাম ও মোন জাতি। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Ngapi নিবন্ধও মোনদের ঙাপ্পি-বাণিজ্যের কথা বলে, আর জানায় বর্মী শব্দটি থাই, লাও ও খমের ভাষায় “কাপি” হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে এই পরিবারের সদস্যটি তৈরি করেন উপকূলের রাখাইনরা, আর খান পাহাড়ের প্রায় সব জনগোষ্ঠী। রাখাইন ও মারমা জাতির সম্পর্ক নিয়ে আছে রাখাইন ও মারমা আলাদা জাতি লেখায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমাদের অন্য লেখাগুলো একসঙ্গে আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।

প্রশ্নোত্তর

নাপ্পি কী দিয়ে তৈরি হয়?

নাপ্পি তৈরি হয় সাগরের খুব ছোট চিংড়ি দিয়ে, যাকে কক্সবাজারে মিম চিংড়ি বলা হয়; গবেষকেরা এগুলোকে Acetes ও Mysid গণের চিংড়ি হিসেবে শনাক্ত করেছেন। সঙ্গে কিছু ছোট মাছ ও মাছের পোনাও মেশে, মহেশখালীতে যাকে “মেং” বলা হয়। লবণ দেওয়া হয় অল্প পরিমাণে।

নাপ্পি তৈরি করতে কত দিন লাগে?

2015 সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী তিন দিন: প্রতিদিন রোদে শুকানো আর প্রতি রাতে কাঠের হামানদিস্তায় পেষা। তারপর পাতায় মুড়ে বাঁশের ঝুড়িতে আরও 7 থেকে 10 দিন রাখা হয়। প্রথম আলোর 2013 সালের প্রতিবেদনে শুকানোর সময় 12 ঘণ্টা আর গুঁড়া শুকানো 24 ঘণ্টা।

নাপ্পিতে কি লবণ দেওয়া হয়?

হ্যাঁ, অল্প। 2015 সালের গবেষণায় লবণ দেওয়া হয় কেবল প্রথম দিন, শুকানোর মাদুরে আর প্রথম পেষায়। 2024 সালের গবেষণায় দুই দফা পেষাতেই লবণ। লবণের সঠিক অনুপাত কোনো উৎসে নেই। উইকিপিডিয়া অনুযায়ী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ঙাপ্পিতে লবণ খুব কম বা নেই।

নাপ্পি কোথায় তৈরি হয়?

প্রধানত কক্সবাজার সদরের চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নে, এ ছাড়া খুরুশকুল, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, টেকনাফ ও নাজিরারটেকে। শীত মৌসুমে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মহিপুরেও তৈরি হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতরে নাপ্পি উৎপাদনের কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি; পাহাড়ে যা খাওয়া হয় তা উপকূল থেকে আসে।

নাপ্পি কারা তৈরি করেন?

প্রধানত কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর রাখাইন পরিবারগুলো, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। প্রথম আলোর 2013 সালের হিসাবে কক্সবাজারের 8 হাজার রাখাইনসহ অন্তত 30 হাজার মানুষ নাপ্পি উৎপাদন ও বিপণনে জড়িত। এখন বাঙালি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারাও উৎপাদন ও ব্যবসায় যুক্ত।

সিদোল আর নাপ্পি কি একই জিনিস?

পার্বত্য চট্টগ্রামে উৎসগুলো দুটিকে একই ধরনের জিনিস হিসেবে বর্ণনা করে: সমুদ্রের ছোট মাছ ও চিংড়ির মণ্ড, কক্সবাজারের রাখাইনদের তৈরি। চাকমারা বলেন সিদোল, মারমারা ঙাপ্পি, তঞ্চঙ্গ্যারা নাপ্পি বা চিদল। তবে কোনো উৎস দুটিকে হুবহু এক বলে স্পষ্ট ঘোষণা করেনি।

রংপুরের সিঁদল আর পাহাড়ের সিদোল কি এক?

না। রংপুরের সিঁদল মলা, ডারকা বা পুঁটি মাছের শুঁটকি আর কচুর ডাঁটা বেটে গোল করে রোদে শুকানো বড়া। পাহাড়ের সিদোল বা নাপ্পি সাগরের ছোট চিংড়ির পেস্ট। ময়মনসিংহের চ্যাপা শুঁটকিও সিধল বা হিদল নামে পরিচিত, যা লবণ ছাড়া মাটির মটকায় 3 থেকে 12 মাস গাঁজানো পুঁটি মাছ।

নাপ্পি খাওয়া কি নিরাপদ?

2015 সালের একটি গবেষণায় কক্সবাজারের দুই বাজারের নাপ্পিতে প্রতি গ্রামে 1010-এর ঘরে ব্যাকটেরিয়া এবং উচ্চ মাত্রায় সালমোনেলা ও ভিব্রিও পাওয়া গেছে, এক মাস খোলা রাখার পর আরও বেশি। গবেষকদের মতে 100 ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপে রান্না করলে প্রায় সব সক্রিয় জীবাণু মরে যায়; ঝুঁকি কাঁচা বা কম রান্না করা নাপ্পিতে।

নাপ্পিতে কতটা প্রোটিন আছে?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিমাপে মহেশখালীর নাপ্পিতে প্রোটিন 34.93 শতাংশ আর চৌফলদণ্ডীর নাপ্পিতে 37.43 শতাংশ। একই নমুনায় আর্দ্রতা 35 থেকে 38 শতাংশ, ছাই 17.5 থেকে 18.5 শতাংশ, চর্বি 6 থেকে 8.5 শতাংশ। নমুনা নেওয়া হয়েছিল ডিসেম্বর 2022-এ।

নাপ্পির দাম কত?

দুটি হিসাব পাওয়া যায়। প্রথম আলো অক্টোবর 2013-এ লিখেছে কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতি কেজি 800 থেকে 900 টাকা। কক্সবাজার লাইফ অক্টোবর 2024-এ এক বিক্রেতার বরাতে লিখেছে পাইকারি প্রতি মণ 13,000 টাকা, খুচরা প্রতি কেজি 400 টাকা। কোনো সরকারি দরতালিকা পাওয়া যায়নি।

নাপ্পি কি বিদেশে রপ্তানি হয়?

প্রথম আলো (2013), দ্য ডেইলি স্টার (2023), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের 2024 সালের গবেষণা আর জুমজার্নালের আর্কাইভ বলছে, টেকনাফ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত দিয়ে নাপ্পি মিয়ানমার ও ভারতে যায়। আলোকিত বাংলাদেশ (2026) ব্যবসায়ীদের বরাতে চীন ও থাইল্যান্ডের নামও দিয়েছে। সরকারি রপ্তানি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

নাপ্পি রান্নায় কীভাবে ব্যবহার করা হয়?

দ্য ডেইলি স্টারের 2023 সালের একটি ফিচার অনুযায়ী নাপ্পি কলাপাতায় মুড়ে আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করে তরকারিতে দেওয়া হয়, অথবা পানিতে গুলে সরাসরি। চাকমা রান্নায় কয়লায় মরিচসহ পোড়ানো সিদোলের সস সেদ্ধ শাকের সঙ্গে খাওয়া হয়; মারমা রান্নায় ঙাপ্পি দিয়ে মরিচের চাটনি হয়।

নাপ্পি নিয়ে কি সরকারি কোনো মান বা নিষেধাজ্ঞা আছে?

বিএসটিআই বা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নাপ্পির জন্য আলাদা কোনো মান বা প্রকাশিত ব্যবস্থার তথ্য পাওয়া যায়নি। ডিসেম্বর 2024-এ পটুয়াখালীর মহিপুরে রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগ উঠলে জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা নমুনা পরীক্ষার কথা বলেছিলেন; সেই ফল জানা যায়নি।

যা এখনো জানা যায়নি

  • লবণের অনুপাত। নাপ্পিতে কতটা লবণ দেওয়া হয়, প্রতি কেজি চিংড়িতে কত গ্রাম, তা কোনো গবেষণা বা প্রতিবেদনে নেই। আলাদা লবণ-পরিমাপও পাওয়া যায়নি।
  • মাটিচাপা। আজকের পত্রিকার একটি সংজ্ঞায় সিদোল বা নাপ্পি “মাটি চাপা দিয়ে” তৈরির কথা আছে, কিন্তু উৎপাদনের কোনো বিবরণে এমন ধাপ নেই। কোথাও এই পদ্ধতি প্রচলিত কি না, জানা যায়নি।
  • মৌসুম। শীতকাল (দুটি উৎস) আর সেপ্টেম্বর (প্রথম আলো 2013) দুটি তথ্যই আছে; বছরের কোন মাসগুলোতে উৎপাদন হয়, তার পূর্ণ হিসাব নেই।
  • পাতার পরিচয়। “মোস-পাতা” আর “গামারি পাতা” একই গাছ কি না, আর মোস-পাতার উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম কী, জানা যায়নি।
  • সিদোল শব্দের উৎস। চাকমা “সিদোল” আর বাংলার “সিদল/শিদল” শব্দের সম্পর্ক নিয়ে কোনো প্রকাশিত ব্যুৎপত্তি পাওয়া যায়নি।
  • বম, ম্রো, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখোয়া ও চাক রান্নায় নাম ও ব্যবহার। আর্কাইভে বা অন্য উৎসে এদের রান্নায় নাপ্পির আলাদা বিবরণ পাওয়া যায়নি।
  • পাহাড়ের বাজারের নাপ্পির মান। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি বা বান্দরবানের বাজারে বিক্রি হওয়া নাপ্পি নিয়ে কোনো জীবাণু বা রাসায়নিক পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়নি।
  • মহিপুরের নমুনা পরীক্ষা। পটুয়াখালী জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা ডিসেম্বর 2024-এ যে পরীক্ষার কথা বলেছিলেন, তার ফল প্রকাশিত হয়েছে কি না, জানা যায়নি।
  • উৎপাদন ও রপ্তানির পরিসংখ্যান। দেশে বছরে কত নাপ্পি তৈরি হয়, কত সীমান্ত পেরোয়, তার কোনো সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। দামের দুই হিসাবের (2013 ও 2024) ফারাকের ব্যাখ্যাও নেই।
  • 2020 সালের জরিপ ও 2023 সালের সংরক্ষণ-গবেষণার পূর্ণপাঠ। দুটির কেবল সারাংশ বা শিরোনাম পাওয়া গেছে; উৎপাদন-ধাপ ও সংরক্ষণের ফল নিয়ে তাদের বিস্তারিত এই লেখায় নেই।
  • উত্তর-পূর্ব ভারতের চাকমাদের সিদোল। ত্রিপুরা, মিজোরাম বা অরুণাচলের চাকমারা উপকূলের নাপ্পি খান নাকি স্থানীয় শিদল, জানা যায়নি।

তথ্যসূত্র

জুমজার্নাল আর্কাইভ (প্রাথমিক উৎস)

  1. “চাকমা জাতি”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। সিদোলের সংজ্ঞা, রাখাইনদের উৎপাদন, কক্সবাজার উপকূল।
  2. তনয় দেওয়ান, “চাংমাটারা: চাকমা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। সিদোল প্রধান উপকরণ, পোড়া গন্ধ, চাল-সিদোল ধারের গল্প।
  3. পাভেল পার্থ, “আদিবাসী জনগণের কার্বন-নিরপেক্ষ অর্থনীতি”, জুমজার্নাল আর্কাইভ (মূল IPNEWSBD)। রাখাইনদের নাপ্পি উৎপাদন, লবণ উৎপাদনে রাখাইন ও তঞ্চঙ্গ্যা, রপ্তানি।
  4. “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত”, জুমজার্নাল আর্কাইভ (উচনু 2007-এর বরাতে)। ঙাপ্পি = মাছের পেস্ট।
  5. “তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। নাপ্পি বা চিদল, উসুনা চন।
  6. মিলন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, “তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। শুঁটকি গুঁড়ার নাপ্পি।
  7. “খিয়াং জাতির আদ্যোপান্ত”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। খিয়াংদের নাপ্পি।
  8. লেলুং খুমী, “খুমী জাতির আদ্যোপান্ত”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। রান্নার উপাদান হিসেবে নাপ্পি।
  9. সুপ্রিয় তালুকদার, “মায়ানমারে চম্পকনগরের পথে”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। ইয়াঙ্গুনের ঙাপ্পি।
  10. রণজিৎ দেওয়ান, “প্রসঙ্গ: পাহাড়ী ছাত্র সমিতি ও গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী”, জুমজার্নাল আর্কাইভ (2013 সালের বক্তৃতা)। নাপ্পি পোড়া মরিচ দিয়ে কোরবু।
  11. “চাকমা ভাষার বর্ণমালা ও ব্যকরণ”, জুমজার্নাল আর্কাইভ। সিদোল-সংবলিত প্রবাদ।

গবেষণাপত্র

  1. Turia Chakma, Bhakta Supratim Sarker, Priyanka Rani Majumdar, Debasish Saha, A.B.M. Ashraful Hoque, M. Belal Hossain, “Comparisons of Human Pathogenic Microorganisms in Fresh and Stored ‘Nappi’ (Fish-Paste) – An Ethnic Foodstuff of Bangladesh”, World Journal of Dairy & Food Sciences 10(1): 60–67, 2015. পূর্ণপাঠ (PDF)। উৎপাদনের ধাপ, মোস-পাতা, খাচি, জীবাণুর মাত্রা।
  2. Md. Mostafa Monwar, Md. Royhanur Islam, Sawmor Dey Nirjar ও অন্যরা, “Proximate Composition of Nappi and its way of marketing in Bangladesh”, Research Square প্রি-প্রিন্ট, 23 জানুয়ারি 2024, CC BY 4.0. প্রি-প্রিন্ট; প্রকাশিত রূপ: “The proximate composition of Nappi and its marketing methods in Bangladesh”, Journal of Ethnic Foods, 2024, doi:10.1186/s42779-024-00231-9। কাঁচামাল, প্রস্তুতি, পুষ্টি উপাদান, বাজারের পথ, রপ্তানি।
  3. Md. Ismail Hossain, Fatema Hoque Shikha, Qamruzzaman Howlader, Bijoy Kumar Das, “Production procedure and marketing of ethnic fermented product Nga-pi in South-Eastern region of Bangladesh”, Bangladesh Journal of Fisheries 32(1): 115–124, 2020. সারাংশ। রাখাইন উৎপাদক, মৌসুমভেদে বাজারপথ, লাভের বণ্টন।
  4. Farhana Jasmin Ara, Sijmen E. Schoustra, Ferdous Ahamed, Bas Zwaan, Oscar van Mastrigt, “The production process of chepa shutki: A traditional Bangladeshi fermented fish product”, Heliyon 11(2): e41972, 2025. পূর্ণপাঠ। চ্যাপা শুঁটকির উৎপাদন, মটকা, 3–12 মাস।
  5. Sharon Xi Ying Chan ও অন্যরা, “A Comprehensive Review with Future Insights on the Processing and Safety of Fermented Fish and the Associated Changes”, Foods 12(3): 558, 2023. পূর্ণপাঠ। শিদল: পুঁটি ও ফাইশা, লবণহীন, মাটির পাত্রে 3–5 মাস।
  6. Banlambhabok Khongthaw ও অন্যরা, “Fermented Fish Products: A Comprehensive Overview of Traditional Processing Techniques, Varieties, and Their Health Benefits”, Comprehensive Reviews in Food Science and Food Safety 25: e70457, 2026. doi:10.1111/1541-4337.70457। শিদলে পরে লবণ দেওয়ার উল্লেখ।
  7. Ringshangphi Khapudang, Somesh Sharma, V.K. Joshi, “Indigenous Fermented Food Products of Eastern and Western Himalayan Region: A review”, International Journal of Food and Fermentation Technology 8(2): 119–139, 2018. পূর্ণপাঠ (PDF)। শিদলের স্থানীয় নাম।
  8. Soumen Das, “Food Meaning and Migrant Identity: A Sociological Analysis of Chakma Ritual Cuisine through the FMD Framework”, International Journal of Social Science Research 2(6), 2025. পূর্ণপাঠ (PDF)। কলকাতার চাকমাদের সিদোল।

সংবাদ ও অন্যান্য

  1. আব্দুল কুদ্দুস, “নাপ্পি বেচে সচ্ছল”, প্রথম আলো, 2 অক্টোবর 2013। চৌফলদণ্ডীর উৎপাদন, মিম চিংড়ি, ধাপ, দাম, পরিমাণ, শ্রমিক, রপ্তানি।
  2. গাজী মুনছুর আজিজ, “কক্সবাজারের নাপ্পি, রপ্তানিতে খুলবে সম্ভাবনার দুয়ার”, আলোকিত বাংলাদেশ, 16 অক্টোবর 2026। নাজিরারটেক, গাঁজন, রপ্তানির গন্তব্য, মানের প্রশ্ন।
  3. নিজস্ব প্রতিবেদক, “কলাপাড়া উপজেলার মহিপুরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করা হয় উপজাতিদের প্রিয় খাবার ‘নাপ্পি’”, স্বাধীন সূর্যোদয়, 11 ডিসেম্বর 2024; একই প্রতিবেদন আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর, 12 ডিসেম্বর 2024। মহিপুরের উৎপাদন, অভিযোগ, কর্মকর্তাদের বক্তব্য।
  4. Rajin Saleh, “Nappi: A Trusted Rakhine Dish”, Cox’s Bazar Life, 23 অক্টোবর 2024। 26টি গ্রাম, 10 হাজার পরিবার, তিনবার পেষা, গামারি পাতা, দাম।
  5. Shahana Huda Ranjana, “Fresh fish or shutki?”, The Daily Star, 15 ফেব্রুয়ারি 2023। নাপ্পির উৎপাদক, ব্যবহার, রপ্তানি; চ্যাপার অন্য নাম।
  6. Chiangmi Talukder Lena, “Flavours from the hills”, The Daily Star, 15 ফেব্রুয়ারি 2021। সিদোলের সংজ্ঞা ও রান্নায় ব্যবহার।
  7. মান্দি ডি কস্তা, “রাজধানীতে পাহাড়ি খাবারের ঘ্রাণ”, আজকের পত্রিকা, 15 জানুয়ারি 2023। “সিদোল বা নাপ্পি”, মাটিচাপার উল্লেখ।
  8. রংপুর ব্যুরো, “রংপুরে ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘সিঁদল’”, আলোকিত বাংলাদেশ, 11 জুলাই 2023। রংপুরের সিঁদলের প্রস্তুতি।
  9. Ngapi, ইংরেজি উইকিপিডিয়া। শব্দের অর্থ, বাংলাদেশে “nappi”, রাখাইন রাজ্যের লবণহীন ঙাপ্পি।
  10. File:Napi.jpg, Rushafi, Public domain, Wikimedia Commons। ছবি।

সর্বশেষ হালনাগাদ: 2 নভেম্বর 2026

প্রসঙ্গ:কক্সবাজার, চাকমা, রাখাইন

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা