Last updated Nov 3rd, 2026
0

বান্দরবান শহরের উজানী পাড়ার একটি ছাপাখানায় শীতের মৌসুমে ভিড় বাড়ে — সাত উপজেলা থেকে মানুষ আসেন বিয়ের কার্ড আর প্রব্রজ্যার নিমন্ত্রণপত্র মারমা হরফে ছাপাতে। সেই হরফের নাম ম্রাইমাজা: মারমা বর্ণমালা, যার 12টি স্বর আর 33টি ব্যঞ্জন মিলে 45টি অক্ষর। বাংলাপিডিয়া একে ব্রাহ্মী লিপি থেকে উদ্ভূত, বাম থেকে ডানে লেখা বর্ণমালা বলে; মারমা ভাষাবিদের গবেষণা বলে, মারমা, রাখাইন ও বর্মি একই বানানরীতিতে লেখা হয়, কিন্তু মারমা পড়া হয় নিজের উচ্চারণে আর তিনটি সুরে।
এই লেখায় দুটি প্রশ্নের উত্তর এক জায়গায় রাখা হলো: মারমা বর্ণমালা কোথা থেকে এল, আর সেটি কীভাবে পড়তে হয়। পড়ার নিয়মগুলো নেওয়া হয়েছে মারমা উৎস থেকে — বিশেষ করে 2024 সালে MIT-তে জমা দেওয়া এক মারমা ভাষাবিদের গবেষণাপত্র থেকে — বর্মি ভাষার নিয়ম ধরে নিয়ে নয়। কারণ সেই গবেষণাপত্র নিজেই দেখিয়েছে, বর্মির সব নিয়ম মারমায় খাটে না।
এই লেখায় যা আছে
ম্রাইমাজা হলো মারমা ভাষার নিজস্ব বর্ণমালার নাম। বাংলাপিডিয়ার মারমা ভুক্তি নামটি এভাবেই লেখে এবং জানায়, বর্ণমালাটি বাম থেকে ডানে লেখা হয় ও উপমহাদেশের প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপি থেকে উদ্ভূত। একই ভুক্তি অনুযায়ী মারমা ভাষা ভোট-বর্মী শাখার বর্মী দলের ভাষা।
নামটির বানান সব উৎসে এক নয়। আমাদের আর্কাইভের মারমা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায় (লেখক মংসিংঞা মারমা) বর্ণমালাটির নাম দুইভাবে আছে — ‘ম্রাইমা চা’ ও ‘মারমা জা’। 2024 সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন বর্ণমালার বর্তমান রূপটিকে বলেছে ‘ম্রাইম্মা (মারমা)’। নামের শেষাংশ ‘চা’ না ‘জা’ — কোনটি মারমা উচ্চারণের সবচেয়ে কাছের, তা কোনো পঠিত উৎস আলাদা করে ব্যাখ্যা করেনি।
জাতির নাম আর বর্ণমালার নামের সম্পর্ক নিয়ে আর্কাইভের লেখাটি একটি দাবি করে: মারমাদের পূর্বপুরুষেরা এই প্রাচীন হস্তলিপিতে নিজেদের কথা লিখে বংশপরিচয় রক্ষা করেছেন বলে তাঁরা নিজেদের মারমা নামে পরিচয় দেন (সেখানে মংক্যশোয়েনু, 1998-এর বরাত দেওয়া)। ‘মারমা’ নামের উৎপত্তি নিয়ে আরও কয়েকটি মত আছে; সেগুলো আছে আমাদের রাখাইন, মারমা ও ‘মগ’ নামের পার্থক্য নিয়ে লেখায়।
অক্ষরের সংখ্যা নিয়ে তিনটি উৎস একমত: আমাদের আর্কাইভের লেখা, বিডিনিউজের 2024 সালের প্রতিবেদন আর Rani Ukhengching Marma-র 2024 সালের MIT গবেষণাপত্র — তিনটিতেই মারমা বর্ণমালায় 12টি স্বরবর্ণ ও 33টি ব্যঞ্জনবর্ণ, মোট 45টি।

মারমা বর্ণমালার উৎপত্তি নিয়ে উৎসগুলো দুটি পথের কথা বলে: সরাসরি ব্রাহ্মী লিপি থেকে বিবর্তন, অথবা মোন-খমের লিপির মধ্য দিয়ে। বাংলাপিডিয়া কেবল ব্রাহ্মীর কথা বলে; আমাদের আর্কাইভের লেখা ও বিডিনিউজের প্রতিবেদন দুটি মতই পাশাপাশি রাখে। কোনো উৎস নির্দিষ্ট সালে বর্ণমালাটির ‘জন্ম’ দাবি করে না।
নিচের ছকে প্রতিটি উৎস তার নিজের কথায়:
| উৎস | উৎপত্তি নিয়ে বক্তব্য |
|---|---|
| বাংলাপিডিয়া, বাংলা ভুক্তি “মারমা” (সাদাত উল্লাহ খান) | বর্ণমালার নাম ম্রাইমাজা; উপমহাদেশের প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপি থেকে উদ্ভূত; বাম থেকে ডানে লেখা। |
| বাংলাপিডিয়া, ইংরেজি ভুক্তি “Marma, The” | মারমা ভাষা “Burmese characters”-এ লেখা হয়; ভাষাটি তিব্বতি-বর্মী শ্রেণির ‘Burma-Arakan’ দলের। |
| মংসিংঞা মারমা, “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” (আমাদের আর্কাইভ; রাফি 2001-এর বরাতে) | কোনো কোনো ভাষাতাত্ত্বিকের মতে মোন-খমের লিপি থেকে; কারও মতে বর্মী বর্ণমালার মতোই ব্রাহ্মী লিপি থেকে। |
| একই লেখা, মিয়ানমারের ভাষা-গবেষক উঅংসাউ (U Aung Tha U, 1995)-এর বরাতে | সম্রাট অশোকের শিলালিপির উত্তরাঞ্চলীয় ব্রাহ্মী হরফ কালক্রমে 6 বার রূপ বদলে বর্তমান রূপে পৌঁছেছে। |
| বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, 21 ফেব্রুয়ারি 2024 (মিয়ানমার ল্যাংগুয়েজ কমিশনের বরাতে) | উৎপত্তি অশোকের রাজত্বকালের ব্রাহ্মী লিপি থেকে; কোনো কোনো গবেষকের মতে মোন-খমের লিপি থেকেও; রূপ বদলেছে ছয়বার। |
| জওয়াং রাখাইন (2021), আমাদের রাখাইন-মারমা লেখায় উদ্ধৃত | আরাকানি বর্ণমালাই মারমা বর্ণমালা হিসেবে পরিচিত। |
| ইংরেজি উইকিপিডিয়া, “Rakhine language” | আরাকানি (রাখাইন) ভাষা বর্মি লিপিতে লেখা হয়, যা দক্ষিণ ব্রাহ্মী থেকে এসেছে। পাতাটি মারমাকে আরাকানির একটি উপভাষা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। |
ছকটি থেকে একটি অমিল চোখে পড়ে। আমাদের আর্কাইভের লেখা অশোকের উত্তরাঞ্চলীয় ব্রাহ্মীর কথা বলে; উইকিপিডিয়ার রাখাইন ভাষার পাতা বর্মি লিপিকে দক্ষিণ ব্রাহ্মীর উত্তরসূরি বলে। দুটি দাবির পেছনের প্রমাণ এই উৎসগুলোর কোনোটিতে বিস্তারিত দেওয়া নেই।
আর্কাইভের লেখায় আরও একটি ঐতিহাসিক বয়ান আছে, যা অন্য কোনো পঠিত উৎসে মেলেনি। সেখানে বলা হয়েছে, ষষ্ঠ শতকে দক্ষিণ ভারতের কৃষ্ণা-গোদাবরী অঞ্চলের ‘তলই’ নামে পরিচিত লোকেদের দুই রাজপুত্র সাহ্মালা ও ওয়িমালা প্রায় 573 খ্রিস্টাব্দে পেগু নগর গড়ে তোলেন, আর তাঁরাই নৌপথে ‘ম্রাইমা চা’ বা ‘মারমা জা’ বর্ণমালা বার্মার দক্ষিণ-পূর্বাংশে ছড়িয়ে দেন। মারমাদের পেগু-উৎপত্তির বয়ান আর তার বিপরীত মতগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রাখাইন ও মারমা আলাদা জাতি কি না লেখায় আছে; এখানে কেবল বর্ণমালার অংশটুকু রাখা হলো।
বিডিনিউজের 2024 সালের প্রতিবেদন মারমা বর্ণমালার ইতিহাসকে ছয়টি রূপে ভাগ করে: ব্রাহ্মী, ‘কুশানাহ’, ‘গুট্টাহ’, ‘পুগাইঙ’, ‘আংওয়াহ’ আর শেষে ‘ম্রাইম্মা’। শেষ রূপটি পাওয়া যায় 1700-এর শতকে, এবং প্রতিবেদন অনুযায়ী সেটিই এখন প্রতিষ্ঠিত মারমা রূপ। আমাদের আর্কাইভের লেখাও একই কথা বলে — রূপ বদলেছে 6 বার — তবে ধাপগুলোর নাম দেয় না।
| ধাপ | রূপের নাম (প্রতিবেদনের বানানে) | কোথায় পাওয়া যায় | সময় (প্রতিবেদন অনুযায়ী) |
|---|---|---|---|
| 1 | ব্রাহ্মী লিপি | সম্রাট অশোকের রাজত্বকাল, প্রাচীন ভারতবর্ষ | খ্রিষ্টপূর্ব 300 অব্দ |
| 2 | কুশানাহ | পাথরের শিলালিপি | খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী |
| 3 | গুট্টাহ | পিউ-মোন যুগের ম্রাজাদি পাথরের শিলালিপি | “1112–1300 শতকে” |
| 4 | পুগাইঙ | হাইসাউইদি যুগের শিলালিপি | 1500-এর শতক |
| 5 | আংওয়াহ | পিতলের ঘণ্টা ও বৌদ্ধশাস্ত্রীয় গ্রন্থ | 1600-এর শতক |
| 6 | ম্রাইম্মা (মারমা) | — | 1700-এর শতক |
ছকের সময়গুলো প্রতিবেদনের ভাষাতেই রাখা হয়েছে। দুটি জায়গায় পাঠকের সতর্ক থাকা দরকার। প্রথমত, ‘1112–1300 শতকে’ কথাটি সাল না শতক, প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত, একই প্রতিবেদনের আগের অনুচ্ছেদে মোন-খমের লিপি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “এটি খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩ থেকে ৩২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল”; আমাদের আর্কাইভের লেখা ঠিক এই সময়সীমা দেয় অশোকের ব্রাহ্মী হরফের জন্য, আর সেখানে শেষ সীমা খ্রিস্টপূর্ব 32 অব্দ। দুই উৎসের সময়সীমা ও কোন লিপির জন্য সেটি — দুটিই আলাদা।
ধাপগুলোর নাম (কুশানাহ, গুট্টাহ ইত্যাদি) কোন শিলালিপি বা কোন রাজবংশের সঙ্গে মেলে, তা প্রতিবেদন বা অন্য কোনো পঠিত উৎস ব্যাখ্যা করেনি। রাখাইন ভাষার ক্ষেত্রে ইংরেজি উইকিপিডিয়া কিছু তারিখ দেয়: আরাকানি ভাষার প্রথম টিকে থাকা শিলালিপিগুলো 1300-এর দশকের (মহাথি কুমির-পাথরের শিলালিপি, 1356), আর 1400-এর দশকের শুরুতে পাথরে খোদাই করা চৌকো অক্ষর থেকে গোলাকার অক্ষরে সরে আসা শুরু হয়। একই পাতা জানায়, কিছু আরাকানি লেখক বর্মি হরফের আগের একটি লিপিকে ‘Rakkhawunna’ নামে চিহ্নিত করেন, কিন্তু সমসাময়িক কোনো শিলালিপিতে তার প্রমাণ নেই। এগুলো রাখাইন লিপির ইতিহাস; মারমা বর্ণমালার সঙ্গে এগুলোর সরাসরি যোগ কোনো মারমা উৎস দেখায়নি।
অক্ষরের দিক থেকে হ্যাঁ, উচ্চারণের দিক থেকে না। Rani Ukhengching Marma-র MIT গবেষণাপত্র (2024) লিখেছে, আরাকানি, বর্মি ও মারমা একই বানানরীতি অনুসরণ করে। বিডিনিউজের 2024 সালের প্রতিবেদনও বলে, তিন ভাষার বর্ণমালা একই রকম; পার্থক্য সুর ও উচ্চারণে, আর মারমা ও রাখাইনের উচ্চারণ প্রায় কাছাকাছি।
অন্য উৎসগুলোর ভাষা একটু আলাদা, কিন্তু অর্থ কাছাকাছি:
অর্থাৎ, ‘মারমা লিপি আলাদা লিপি কি না’ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে প্রশ্নটি কী নিয়ে তার ওপর। অক্ষরের আকার আর বানানের নিয়ম বর্মির সঙ্গে ভাগ করা; নাম, উচ্চারণ ও ব্যবহারের পরম্পরা মারমাদের নিজের। এই ভাগাভাগি কম্পিউটারেও দেখা যায়। MIT গবেষণাপত্রটি মারমা শব্দগুলো লিখেছে ইউনিকোডের মিয়ানমার অক্ষরে; আর সরকারের আইসিটি বিভাগ ও বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল ‘BCC Marma’ নামে যে ইউনিকোড ফন্ট বানিয়েছে, ফন্ট-বিতরণকারী সাইট 1001 Fonts সেটির ভাষা-তালিকায় দেখায় কেবল “Burmese”। ফোন ও কম্পিউটারে মারমা হরফ টাইপ করা আলাদা লেখার বিষয়।
উচ্চারণের পার্থক্য কতটা বড়, তার একটি ইঙ্গিত দেয় মার্কিন ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ডাকোটায় 2014 সালে জমা দেওয়া Heidi A. Davis-এর থিসিস। বাংলাদেশে সংগ্রহ করা মারমা শব্দতালিকা বিশ্লেষণ করে তিনি লিখেছেন, বর্মি ও রাখাইনের তুলনায় মারমা লিখিত বর্মি বানানের নির্দেশিত উচ্চারণ বেশি ধরে রেখেছে, আর মোটের ওপর মারমা সেই উচ্চারণ রেখেছে যা 1780-এর দশকের শুরুতে, মারমারা মিয়ানমার ছেড়ে আসার সময়, বর্মিতে চালু ছিল। সহজ কথায়: একই বানান মারমা পাঠক পড়েন বানানের কাছাকাছি করে, আধুনিক বর্মি পাঠক পড়েন বানান থেকে বেশি সরে গিয়ে।
মারমা বর্ণমালায় 45টি অক্ষর: 33টি ব্যঞ্জনবর্ণ ও 12টি স্বরবর্ণ। মারমা ভাষাবিদ Rani Ukhengching Marma তাঁর গবেষণাপত্রে পুরো তালিকা দিয়েছেন — প্রতিটি অক্ষরের রোমান প্রতিবর্ণ ও আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালায় (IPA) উচ্চারণসহ। গবেষণাপত্রের মুখবন্ধ অনুযায়ী এই অধ্যায়ের তথ্যদাতা একজন মারমা লেখক ও গবেষক, যিনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বই তৈরিতে কাজ করেছেন।
নিচের ছকে অক্ষরগুলো গবেষণাপত্রের ক্রম ও রোমান প্রতিবর্ণ অনুযায়ী সাজানো। বাংলা কলামটি পাঠকের সুবিধার জন্য সেই রোমান প্রতিবর্ণ থেকে করা কাছাকাছি রূপ — এটি কোনো প্রমিত মারমা-বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ নয়।
| সারি | অক্ষর | রোমান প্রতিবর্ণ (গবেষণাপত্র) | কাছাকাছি বাংলা ধ্বনি |
|---|---|---|---|
| 1 | က ခ | k, kh | ক, খ |
| 2 | ဂ ဃ | g, gh | গ, ঘ |
| 3 | င | ng / nga | ঙ |
| 4 | စ ဆ | ch, chh | চ, ছ |
| 5 | ဇ ဈ | j, jh | জ, ঝ |
| 6 | ည | ny / nya | ঞ |
| 7 | ဋ ဌ | t, th (মূর্ধন্য) | ট, ঠ |
| 8 | ဍ ဎ | d, dh (মূর্ধন্য) | ড, ঢ |
| 9 | ဏ | na | ণ |
| 10 | တ ထ | t, th (দন্ত্য) | ত, থ |
| 11 | ဒ ဓ | d, dh (দন্ত্য) | দ, ধ |
| 12 | န | n | ন |
| 13 | ပ ဖ | p, ph | প, ফ |
| 14 | ဗ ဘ | b, bh | ব, ভ |
| 15 | မ | m | ম |
| 16 | ယ | ya | য় (ইয়) |
| 17 | ရ | ra | র |
| 18 | လ | la | ল |
| 19 | ဝ သ ဟ | wa, sa, ha | ওয়, স (IPA কলামে θ), হ |
| 20 | ဠ အ | la, a | ল, অ |
দুটি অক্ষর আলাদা করে মনে রাখার মতো। ရ (রা): গবেষণাপত্র বলে, রাখাইনের মতো মারমাও /r/ ধ্বনিটি ধরে রেখেছে, যা বর্মিতে /j/ (য়) হয়ে গেছে। আর သ: গবেষণাপত্রের রোমান কলামে এর প্রতিবর্ণ ‘sa’, কিন্তু উচ্চারণের কলামে θ — ইংরেজি ‘think’ শব্দের th-এর কাছাকাছি ধ্বনি। কোন মারমা এলাকায় কোনটি বেশি শোনা যায়, গবেষণাপত্র তা আলাদা করেনি।
স্বরবর্ণগুলো শব্দের শুরুতে স্বাধীন অক্ষর হিসেবে বসে; ব্যঞ্জনের সঙ্গে বসলে প্রতিটির একটি চিহ্ন-রূপ আছে (পরের অংশে)। মারমা বর্ণমালার একটি বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি স্বরবর্ণ একটি নির্দিষ্ট সুরও বহন করে। গবেষণাপত্রের ভাষায়: “Vowels carry the tones.”
| ক্রম | স্বরবর্ণ | স্বরের ধরন (গবেষণাপত্র) | সুর |
|---|---|---|---|
| 1 | အ | সামনের, নিচু — ‘আ’-জাতীয় | উঁচু, খসখসে (creaky) |
| 2 | အာ | সামনের, নিচু — ‘আ’-জাতীয় | নিচু |
| 3 | ဣ | সামনের, উঁচু — ‘ই’ | উঁচু, খসখসে |
| 4 | ဤ | সামনের, উঁচু — ‘ই’ | নিচু |
| 5 | ဥ | পেছনের, উঁচু — ‘উ’ | উঁচু, খসখসে |
| 6 | ဦ | পেছনের, উঁচু — ‘উ’ | নিচু |
| 7 | ဧ | সামনের, মাঝারি-বন্ধ — ‘এ’ | নিচু |
| 8 | চিহ্ন-রূপ ◌ဲ | সামনের, মাঝারি-বন্ধ — ‘এ’-জাতীয় | উঁচু ও পড়ন্ত |
| 9 | ဩ | পেছনের, মাঝারি-বন্ধ — ‘ও’ | পড়ন্ত |
| 10 | ဪ | পেছনের, মাঝারি-খোলা — ‘অ’-জাতীয় | নিচু |
| 11 | အံ | সামনের, মাঝারি-খোলা | নিচু |
| 12 | အား | সামনের, নিচু — ‘আ’ | পড়ন্ত, শ্বাসমিশ্র (breathy) |
খেয়াল করলে দেখা যায়, ‘আ’, ‘ই’, ‘উ’ — প্রতিটির জন্য দুটি করে স্বরবর্ণ আছে, যাদের পার্থক্য দৈর্ঘ্যে নয়, সুরে। বাংলাভাষী পাঠকের কাছে ই আর ঈ-র তফাত যেমন মূলত লেখায় থেকে গেছে, মারমায় ဣ আর ဤ-র তফাত উচ্চারণে শোনা যায় — একটি উঁচু সুরে, অন্যটি নিচু সুরে।
মারমা বর্ণমালা বাংলা বর্ণমালার মতোই একটি আবুগিদা (abugida): প্রতিটি ব্যঞ্জনের ভেতরে একটি অন্তর্নিহিত স্বর থাকে, আর অন্য স্বর বোঝাতে ব্যঞ্জনের সামনে, পেছনে, ওপরে বা নিচে চিহ্ন বসে। က একা পড়লে ‘কা’ (গবেষণাপত্রের প্রতিবর্ণে ka); তার সঙ্গে চিহ্ন বসিয়ে বাকি স্বরগুলো তৈরি হয়।
বাংলা পাঠকের জন্য সবচেয়ে চেনা জিনিসটি হলো ေ চিহ্ন: এটি লেখায় বসে ব্যঞ্জনের আগে, যদিও উচ্চারণে আসে পরে — ঠিক বাংলা ‘কে’-র এ-কারের মতো। নিচের ছকটি গবেষণাপত্রের ‘আবুগিদা’ ছক থেকে নেওয়া; প্রতিটি সারিতে က-র সঙ্গে একটি করে স্বরচিহ্ন। গবেষণাপত্র নিজেই সতর্ক করেছে, এর কয়েকটি আসল শব্দ নয়, কেবল উচ্চারণের নমুনা।
| লেখা | চিহ্ন | প্রতিবর্ণ (গবেষণাপত্র) | কোন স্বরবর্ণের চিহ্ন |
|---|---|---|---|
| က | চিহ্ন নেই | ka | အ (1) |
| ကာ | ◌ာ | kaa | အာ (2) |
| ကိ | ◌ိ | ki | ဣ (3) |
| ကီ | ◌ီ | kii | ဤ (4) |
| ကု | ◌ု | ku | ဥ (5) |
| ကူ | ◌ူ | kuu | ဦ (6) |
| ကေ | ေ◌ | ke | ဧ (7) |
| ကဲ | ◌ဲ | kyii (গবেষণাপত্রের বানানে) | স্বর 8 |
| ကော | ေ◌ာ | koh | ဩ (9) |
| ကော် | ေ◌ာ် | koh | ဪ (10) |
| ကံ | ◌ံ | keing | အံ (11) |
| ကား | ◌ား | kaa | အား (12) |
একটি আসল শব্দের উদাহরণ গবেষণাপত্রেই আছে: လ ‘লা’, তাতে ◌ီ বসালে လီ ‘লি’ — মারমায় যার অর্থ বাতাস। প্রতিবর্ণ কলামে ka আর kaa (সারি 1, 2 ও 12) দেখে মনে হতে পারে এগুলো কেবল ছোট-বড় ‘আ’; আসলে তিনটির তফাত সুরে, যা পরের ধাপে।
ব্যঞ্জনের সঙ্গে আরও দুটি যুক্তচিহ্ন বসে, যা বাংলার য-ফলা আর র-ফলার কথা মনে করিয়ে দেয়। গবেষণাপত্র অনুযায়ী মারমাভাষীরা ◌ျ চিহ্নকে বলেন “Yapang” — উচ্চারণ /j/, অর্থাৎ ‘য়’; আর ြ◌ চিহ্নকে বলেন “Raro” — উচ্চারণ /r/, অর্থাৎ ‘র’। দ্বিতীয়টিতেই মারমা আর আধুনিক বর্মির বড় পার্থক্য: বর্মিতে এই চিহ্নও ‘য়’ উচ্চারিত হয়, মারমায় ‘র’ থেকে যায়। গবেষণাপত্রের উদাহরণ ကျောက် (পাথর) — প্রতিবর্ণ kjok, অর্থাৎ ‘ক্যোক’-এর কাছাকাছি।
মারমা একটি সুরভিত্তিক ভাষা: একই ধ্বনি ভিন্ন সুরে বললে ভিন্ন শব্দ হয়, আর লেখাতেই সুর চিহ্নিত থাকে। Rani Ukhengching Marma যন্ত্রে মাপা উচ্চারণ বিশ্লেষণ করে মারমায় তিনটি সুর পেয়েছেন — উঁচু ও খসখসে (high, creaky), নিচু (low), আর পড়ন্ত (falling)। তাঁর মতে, বর্মির জন্য আগের গবেষণায় যে চারটি সুরের কথা বলা হয়, মারমায় তা খাটে না।
গবেষণাপত্রে তিনটি মূল ‘ধ্বনি-বদল চিহ্ন’ আছে, মারমা নামসহ:
| চিহ্ন | গবেষণাপত্রে দেওয়া মারমা নাম | কী করে |
|---|---|---|
| ◌ံ | Sisitang | ব্যঞ্জন বা স্বরের ডান দিকে ওপরে বসে; হ্রস্ব স্বরকে দীর্ঘ স্বরে বদলায়। স্বর 11 (အံ)-এ এটিই। |
| ◌့ | Oukamroh | ডান দিকে নিচে বসে; দীর্ঘ স্বরকে হ্রস্ব করে; খসখসে ধ্বনি বোঝায়। |
| ◌း | Wecha nholungpowk / Hrigapouk | দীর্ঘ স্বরকে ‘ভারী’ করে; শ্বাসমিশ্র ধ্বনি বোঝায়। স্বর 12 (အား)-এ এটিই। |
চিহ্নগুলোর মারমা নাম এখানে গবেষণাপত্রের রোমান বানানেই রাখা হলো; বাংলা হরফে এগুলোর প্রচলিত বানান কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি।
এই চিহ্ন আর স্বরচিহ্ন মিলে প্রতিটি স্বরের তিনটি সুর লেখা যায়। গবেষণাপত্রের নিয়মটি এক ছকে:
| স্বর | উঁচু, খসখসে | নিচু | পড়ন্ত |
|---|---|---|---|
| ‘আ’ | အ | အာ | အား |
| ‘ই’ | ◌ိ | ◌ီ | ◌ီး |
| ‘উ’ | ◌ု | ◌ူ | ◌ူး |
| ‘এ’ | အေ့ | အေ | အေး |
অর্থাৎ নিয়মটি মনে রাখা সহজ: ‘ই’ ও ‘উ’-র ছোট চিহ্ন উঁচু সুর, বড় চিহ্ন নিচু সুর, বড় চিহ্নের পরে း (দুটি বিন্দু) পড়ন্ত সুর। ‘এ’-তে নিচের বিন্দু ◌့ খসখসে সুর আনে। গবেষণাপত্র ‘ই’ সুরের তিন ধরন মাপতে যে শব্দগুলো ব্যবহার করেছে, সেগুলোও এই নিয়ম মানে — উঁচু সুরে သိ ထိ ပိ, নিচু সুরে လီ ဆီ ရီ, পড়ন্ত সুরে မီး တီး ဆီး।
মাপা তথ্যেও পার্থক্য স্পষ্ট। একজন নারী বক্তার উচ্চারণে ‘ই’ স্বরের গড় কম্পাঙ্ক উঁচু সুরে প্রায় 275 হার্জ, নিচু সুরে প্রায় 198, পড়ন্ত সুরে প্রায় 183; একজন পুরুষ বক্তার ক্ষেত্রে যথাক্রমে প্রায় 189, 147 ও 137 হার্জ। গবেষণাপত্র নিজেই জানায়, এই মাপ নেওয়া হয়েছে খাগড়াছড়ির প্লেংসা গোত্রের দুজন বক্তার কাছ থেকে, অন্য গোত্রের উচ্চারণ আলাদা করে মাপা হয়নি। 7000 Languages-এর পাতাও লেখে, মারমার সুর সম্প্রদায়ের 13টি গোত্রের মধ্যে ভিন্ন হতে পারে।
শব্দের শেষে ব্যঞ্জন থাকলে তার ওপর ◌် চিহ্ন বসে, যা ব্যঞ্জনের ভেতরের ‘অ’ মুছে দেয় — বাংলার হসন্তের কাছাকাছি কাজ। গবেষণাপত্র অনুযায়ী মারমা বানানে এই চিহ্ন বসে 10টি ব্যঞ্জনের সঙ্গে: က င စ ဉ ည တ န ပ မ ယ। က একা ‘কা’; က် হলে ‘ক্’।
শেষ ব্যঞ্জন সুরও ঠিক করে দেয়। গবেষণাপত্রের দুটি প্রস্তাব:
| শব্দ | অর্থ | প্রতিবর্ণ (গবেষণাপত্র) | শেষ | সুর |
|---|---|---|---|---|
| ကျောက် | পাথর | kjok | ক্ + রোধ | উঁচু, খসখসে |
| ကန် | পুকুর | kaeing | নাসিক্য | নিচু |
| ကန်း | পার হওয়া | kaeing | নাসিক্য + း | পড়ন্ত |
শেষ দুটি শব্দ পাশাপাশি রাখলে মারমা পড়ার মূল কৌশলটি দেখা যায়: অক্ষর একই, প্রতিবর্ণও একই (kaeing), কেবল း চিহ্নটি সুর বদলে অর্থ বদলে দেয়। গবেষণাপত্র অবশ্য জানায়, শেষ ব্যঞ্জন ও সুরের এই সম্পর্ক এখনো প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ; বিস্তারিত গবেষণা দরকার।
গবেষণাপত্রে আরও একটি ব্যবহারিক নিয়ম আছে, যা লেখা পড়ার সময় কাজে লাগে। মারমায় বাক্যের কিছু চিহ্নক অংশ (যেমন কর্ম বোঝাতে ‘গো/কো’, আর ‘গা/কা’) লেখা হয় একই অক্ষরে, কিন্তু উচ্চারণ বদলায় আগের শব্দের শেষ ধ্বনি অনুযায়ী। আগের শব্দ স্বর বা ‘ঙ’ দিয়ে শেষ হলে পড়া হয় ‘গা/গো’; প, ত, ক বা চ-জাতীয় রুদ্ধ ধ্বনি দিয়ে শেষ হলে ‘কা/কো’। যেমন গবেষণাপত্রের তালিকায় বাঘ, বিড়াল ও পুকুর-এর পরে ‘গা/গো’, আর মুরগি, ইঁদুর, পাথর ও কাউন-এর পরে ‘কা/কো’।
যিনি বর্মি পড়তে জানেন, তিনি মারমা লেখা পড়তে পারবেন, কিন্তু বর্মি উচ্চারণে পড়লে মারমা কানে ভুল শোনাবে। মারমা উৎস ও ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা মিলিয়ে অন্তত চারটি পার্থক্য নথিভুক্ত: ြ-ফলার ‘র’, এ-কারের ‘ই’ উচ্চারণ, কিছু অন্ত্যধ্বনি, আর সুরের সংখ্যা।
| বিষয় | বর্মি | মারমা | উৎস |
|---|---|---|---|
| ြ-ফলা | /j/ ‘য়’ | /r/ ‘র’ (“Raro”) | Ukhengching Marma 2024 |
| এ-কার ေ | /e/ ‘এ’; কুকুর ခွေး (খোয়ে) | রাখাইনের মতো /i/ ‘ই’; মারমা ও রাখাইনে কুকুর লেখা হয় ခွီး (খোয়ী) | Ukhengching Marma 2024 |
| ডালের তরকারি ပဲဟင်း | ‘পে-হিন’ | ‘পে-হাং’ | Ukhengching Marma 2024 |
| ‘ক্য/ক্র’ ধ্বনি | ‘চ’ হয়ে গেছে; তারা ʧɛ | ‘ক্য/ক্র’ রয়ে গেছে; তারা kɹɛ | Davis 2014 (শব্দতালিকা) |
| সুরের সংখ্যা | আগের গবেষণায় 4টি | 3টি | Ukhengching Marma 2024 |
দ্বিতীয় সারির কুকুরের উদাহরণটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে পার্থক্য কেবল উচ্চারণে নয়, বানানেও: মারমা লেখায় শব্দটি নিজের উচ্চারণ অনুযায়ী ီ দিয়ে লেখা হয়। গবেষণাপত্র সতর্কভাবে লেখে, এ-কারের ক্ষেত্রে মারমা “রাখাইনের মতো বলে মনে হয়” — পুরো ভাষায় নিয়মটি কতটা সাধারণ, তা আলাদা করে যাচাই করা হয়নি।
Davis-এর থিসিস দেখায়, পার্থক্যগুলো এলোমেলো নয়। বর্মি ও রাখাইন দুটি ধ্বনি-পরিবর্তন ভাগ করে, যা মারমায় ঘটেনি: ‘ক্য’ থেকে ‘চ’ হওয়া, আর পুরোনো ‘চ/ৎস’ ধ্বনি থেকে ‘স’ হওয়া। তাঁর শব্দতালিকায় ‘তারা’ শব্দটি বর্মিতে ʧɛ, কিন্তু মারমার দুজন বক্তার উচ্চারণে kɹɛ। থিসিসের সাধারণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে এটি মেলে: মারমা উচ্চারণ লিখিত বানানের কাছাকাছি থেকেছে।
রাখাইন আর বর্মির পার্থক্য নিয়ে উইকিপিডিয়ার পাতায় আরও অনেক উদাহরণ আছে (যেমন কিছু অন্ত্যধ্বনি আর শব্দভাণ্ডার)। কিন্তু সেগুলো রাখাইন ভাষার; মারমায় একই নিয়ম খাটে কি না, তা কোনো পঠিত মারমা উৎস নিশ্চিত করেনি, তাই এখানে রাখা হলো না। Ukhengching Marma-র গবেষণাপত্রের উপসংহারও একই সতর্কবাণী দেয়: বর্মির গবেষণা মারমায় সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না; মারমার নিজস্ব ধ্বনিগত পর্যবেক্ষণ দরকার।
মারমা হরফ বহু আগে থেকে রাজকার্য আর ধর্মীয় গ্রন্থ লেখায় ব্যবহৃত হয়েছে, আর কয়েক দশক আগেও পার্বত্য অঞ্চলের অফিস-আদালত, বোমাং রাজদরবার ও কাচারিতে মারমা ভাষা চলত — এ তথ্য আমাদের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতির। বাংলাপিডিয়ার মারমা ভুক্তিতে পাণ্ডুলিপি বা লিখিত সাহিত্যের কোনো তালিকা নেই; এই অংশটি তাই প্রায় পুরোপুরি আমাদের আর্কাইভের ওপর দাঁড়ানো।
আর্কাইভের লেখা যে পাণ্ডুলিপি ও বইগুলোর নাম দেয়:
পাংখুং ও জাইতের পুঁথি, বিহারে রাখা গানের পুঁথি আর মারমা মৌখিক সাহিত্যে লেখার জায়গা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে ত্রিপুরা ও মারমা মৌখিক সাহিত্য লেখায়; এখানে কেবল এটুকু যোগ করা দরকার যে ওই পুঁথিগুলোই মারমা বর্ণমালার সবচেয়ে বড় পরিচিত লিখিত সংগ্রহ। আর্কাইভের লেখা ক্যশৈপ্রু খোকার বরাতে জানায়, প্রায় শত বছর আগে বেতবুনিয়ার শিয়ালবুক্কা পাড়ার এক মারমা বৌদ্ধ বিহারাধ্যক্ষ প্রথম মারমা ভাষা ও বর্ণমালায় পাংখুং রচনা করেন।
রাজদরবারের প্রসঙ্গে বোমাং সার্কেলের ইতিহাস প্রাসঙ্গিক; রাজাদের ক্রম ও সময় আছে আমাদের বোমাং রাজাদের তালিকায়। দরবারের কোন নথি মারমা হরফে লেখা হয়েছিল, তার কোনো নমুনা বা তালিকা কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি।
ঔপনিবেশিক শিক্ষাতেও বর্মি-পরিবারের হরফের জায়গা ছিল। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী 1860 সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গঠনের পর 1862 সালে চন্দ্রঘোনায় জেলার প্রথম স্কুল, চন্দ্রঘোনা বোর্ডিং স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে ‘চাকমা’ ও ‘বার্মিজ’ নামের দুটি ক্লাসে ইংরেজি, বাংলা ও বার্মিজ পড়ানো হতো। তার আগে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মাধ্যম ছিল বার্মিজ ও পালি। ‘বার্মিজ ক্লাসে’ পড়া শিক্ষার্থীরা কারা ছিল, সে তথ্য লেখায় নেই।

সংখ্যা কোনো উৎসে নেই, তবে সব উৎসের ইঙ্গিত একই দিকে: নিজের হরফে স্বচ্ছন্দে পড়তে পারেন এমন মারমা কম। Davis-এর 2014 সালের থিসিস লেখে, বাংলাদেশে বেশিরভাগ মারমাভাষী কেবল বাংলায় সাক্ষর, যদিও মারমা কিন্ডারগার্টেন প্রাইমারের মাধ্যমে বর্মি-পরিবারের হরফে সাক্ষরতা বাড়ছে।
অন্য উৎসগুলো একই চিত্রের নানা দিক দেখায়:
শেষ দুটি কথা একসঙ্গে পড়লে একটি জিনিস স্পষ্ট হয়: উচ্চশিক্ষিত মারমাও নিজের হরফে দুর্বল হতে পারেন, আর মারমা শিশুর মাতৃভাষায় পড়ার পথে প্রথম বাধা অনেক সময় বর্ণমালা না-চেনা শিক্ষক। পরের অংশ সেই বিষয়ে।
2017 সাল থেকে পার্বত্য তিন জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মারমা শিশুরা প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মারমা বর্ণমালায় লেখা পাঠ্যবই পায়। কিন্তু 2026 সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষক না থাকায় নয় বছরেও পাঠদান শুরু হয়নি; বইগুলো অনেক ঘরেই পড়ে আছে।
সিদ্ধান্তের তারিখ নিয়ে দুই উৎস দুই কথা বলে। আমাদের আর্কাইভে উদ্ধৃত সরকারি কমিটির সিদ্ধান্ত 31 অক্টোবর 2012 সালের, যেখানে ঠিক হয় চাকমা ও মারমার বই হবে নিজস্ব বর্ণমালায়, গারো ও ত্রিপুরার রোমান বর্ণমালায়, আর ওঁরাওদের বাংলা বর্ণমালায় (বিস্তারিত: পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা)। প্রথম আলোয় তারিক মনজুরের 2024 সালের লেখা অনুযায়ী জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কমিটি গঠন করে 2012 সালে, আর পাঁচ ভাষায় পাঠদানের সিদ্ধান্ত নেয় 2013 সালে।
| সাল | যা ঘটে | উৎস |
|---|---|---|
| 2010 | জাতীয় শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষা শেখার জন্য শিক্ষক ও পাঠ্যবইয়ের অঙ্গীকার | প্রথম আলো, 6 মার্চ 2024 |
| 2012–2013 | জাতীয় কমিটি; চাকমা ও মারমার বই নিজস্ব বর্ণমালায় | আর্কাইভ; প্রথম আলো 2024 |
| 2017 | প্রাক-প্রাথমিকের বই | প্রথম আলো 2024 |
| 2018 | প্রথম শ্রেণির বই | প্রথম আলো 2024 |
| 2019 | দ্বিতীয় শ্রেণির বই; বান্দরবানের প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে মারমা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শুরু, পরে কোভিড-19-এ বন্ধ | প্রথম আলো 2024; ডেইলি স্টার বাংলা, 1 জানুয়ারি 2023 |
| 2020 | তৃতীয় শ্রেণির বই; এর পরে আর কোনো শ্রেণির বই হয়নি | প্রথম আলো 2024 |
| 2022–23 অর্থবছর | খাগড়াছড়িতে 90 জন শিক্ষকের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, তার 30 জন মারমা; এরপর আর প্রশিক্ষণ হয়নি | বিডিনিউজ, 22 ফেব্রুয়ারি 2025 |
| 2026 | শিক্ষক না থাকায় পাঠদান শুরু হয়নি | প্রথম আলো, 20 ফেব্রুয়ারি 2026 |
বাংলা ট্রিবিউনের 2021 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিকের বইয়ের আদলে লেখা এই বইগুলোতে ছবির মাধ্যমে বর্ণমালা শেখানো, গণনা, চিহ্ন দেখে হাসপাতালসহ নানা প্রতিষ্ঠান চেনা আর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ আছে; বেশিরভাগ উপকরণ মাতৃভাষায়, কেবল শিক্ষক সহায়িকার নির্দেশনা বাংলায়। মারমা ভাষার লেখক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মংক্যশোয়েনু নেভী 2024 সালে বিডিনিউজকে বলেছেন, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির মারমা পাঠ্যক্রমে ঘাটতি আছে: শিশুরা কিছু নাম ও অক্ষরের সঙ্গে পরিচিত হবে, কিন্তু ভাষা শিখতে পারবে না।
পাঠদান আদৌ হচ্ছে কি না, তা নিয়ে উৎসগুলোর ছবি এক নয়। প্রথম আলোর 2026 সালের প্রতিবেদন বলে, তিন পার্বত্য জেলার চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা কোনো শিশুই এখনো মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ পায়নি; রোয়াংছড়ির কাইন্তারমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মংচিং অং মারমা জানিয়েছেন, তাঁর বিদ্যালয়ে কেবল মারমা শিক্ষার্থী আর মারমা শিক্ষক, কিন্তু শিক্ষকেরা মাতৃভাষায় লিখতে-পড়তে পারেন না। অন্যদিকে বাংলা ট্রিবিউনের 2021 সালের প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির মহালছড়ির এ কে পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে 132 জন মারমাভাষী শিক্ষার্থীর জন্য সপ্তাহে একদিন মারমা বই পড়ানোর কথা আছে।
শিক্ষকদের নিজেদের অভিজ্ঞতাও এখানে প্রাসঙ্গিক। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে শিক্ষকেরা জানান, তাঁদের প্রশিক্ষণ ছিল দুই থেকে ছয় দিনের; “আমরা বর্ণগুলো চিনি আগে থেকে, কিন্তু শুধু বর্ণ চিনলে তো হয় না”। ঢাকা ট্রিবিউনের 2022 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী 2019 সালে খাগড়াছড়িতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা শিক্ষার্থী ছিল 30,129 জন, আর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ তিন ভাষায় 90 জন শিক্ষকের জন্য মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ আয়োজন করেছিল।
বান্দরবানের অবস্থা কিছুটা আলাদা, কারণ ঢাকা ট্রিবিউনের হিসাবে সেখানে এগারোটির বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস। ডেইলি স্টার বাংলার 21 ফেব্রুয়ারি 2024 সালের প্রতিবেদনে আলীকদমের দয়াল চন্দ্র পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে 30-এর বেশি মারমা শিক্ষার্থী থাকলেও পাঁচ শিক্ষকের একজনও মারমা নন, আর মারমা ভাষায় পড়ানোর কোনো প্রশিক্ষণও কাউকে দেওয়া হয়নি। একই প্রতিবেদন জানায়, সেই বছর কয়েকটি বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার বই তখনো পৌঁছায়নি।
বিদ্যালয়ের বাইরে মারমা বর্ণমালা শেখার পথ মূলত চারটি: বৌদ্ধ বিহার, বান্দরবানের সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের কোর্স, শিক্ষার্থীদের নিজেদের চালানো ক্লাস, আর হাতে গোনা কয়েকটি অনলাইন উপকরণ। বিডিনিউজের 2024 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিক মারমা ভাষাশিক্ষা কার্যক্রম কোথাও চালু হয়নি; যা আছে তা বিহার বা পাড়াভিত্তিক, সীমিত পরিসরে।
বিহার সবচেয়ে পুরোনো পথ। মংক্যশোয়েনু নেভী বিডিনিউজকে বলেছেন, অনেক মারমা একসময় বৌদ্ধ বিহারে ও পালি টোলে গিয়ে মাতৃভাষা পড়তেন; আর আজ যাঁরা মারমা ভাষায় পারদর্শী ও লেখালেখিতে দক্ষ, তাঁরা প্রত্যেকে নিজ উদ্যোগে চর্চা করেছেন। একই প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক মারমা শিক্ষার্থী জানান, ভালোভাবে শিখতে তিনি এক বছর শ্রমণ হয়ে বিহারে ছিলেন, কারণ ভান্তেরা ধর্মদেশনা ও জাতক কাহিনি মারমা ভাষায় বলেন। কোভিডের লকডাউনে বুয়েটের এক মারমা শিক্ষার্থী রোয়াংছড়ির একটি বিহারে ভান্তের কাছে মারমা ভাষা শিখেছেন; এখন বই দেখে পড়তে পারেন, তবে লিখতে গেলে বানানে সমস্যা হয়।
আমাদের আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী বান্দরবানে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রতি বছর 2 মাস মেয়াদি কোর্সে মারমা ভাষায় লিখতে-পড়তে শেখানো হয়, আর স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মারমা শিক্ষার্থীদের জন্য মারমা ভাষায় সাহিত্য প্রতিযোগিতা হয় (সেখানে উচনু, 2008-এর বরাত)। বিডিনিউজের 2024 সালের প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির নাম বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইনস্টিটিউট (কেএসআই); এর পরিচালক মংনুচিং মারমা বলেছেন, বছরব্যাপী বিভিন্ন এলাকায় একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা পর্যন্ত শিশুদের জন্য মারমা ভাষাশিক্ষা চালু আছে। দুই লেখাতেই পরিচালক হিসেবে মংনুচিং মারমার নাম আছে।
বিডিনিউজের প্রতিবেদন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক উদ্যোগের কথা বলে:
ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরের 2016 সালের প্রতিবেদন Maung Nyeu-র প্রতিষ্ঠিত Our Golden Hour উদ্যোগের কথা বলে। 2009 সালে 12 জন শিক্ষার্থী নিয়ে প্রথম স্কুল চালু হয়। শিশুরা ছুটিতে বাড়ি গিয়ে বড়দের কাছ থেকে গল্প শোনে, স্কুলে ফিরে তা পরিবেশন করে; তিনি প্রায় 70টি গল্প ভিডিও করে মারমায় লিপিবদ্ধ করেছেন, শিল্পী ও লেখকদের সাহায্যে ছবি ও সম্পাদনা করে বই বানাচ্ছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী ছয় বছর পরে তিনটি আবাসিক স্কুলে 650-এর বেশি জুম্ম শিশু পড়ত, যেখানে বাংলা আর মারমার মতো মাতৃভাষা পাশাপাশি পড়ানো হয়।
অনলাইনে 7000 Languages নামের অলাভজনক সংস্থা মারমাভাষী ও শিক্ষার্থীদের পড়া-লেখার দক্ষতা বাড়াতে একটি মারমা কোর্স বানিয়েছে। অমনিগ্লট মারমা অক্ষরের একটি তালিকা ও উচ্চারণের অডিও রাখে। ফোনে ও কম্পিউটারে লেখার জন্য সরকারের ‘BCC Marma’ ইউনিকোড ফন্ট আছে, আর বিডিনিউজের 2026 সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ভাষা-প্রযুক্তিবিদ Samar N Soren যে ছয়টি ভাষার কি-বোর্ড বিন্যাস তৈরিতে কাজ করেছেন, মারমা তার একটি। কি-বোর্ড ও টাইপিং নিয়ে বিস্তারিত আলাদা লেখার বিষয়।
পাঠ্যবইয়ের চেয়ে জীবনে মারমা হরফ বেশি দেখা যায়: বিয়ের কার্ড, প্রব্রজ্যা ও ভিক্ষুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নিমন্ত্রণপত্র, নির্বাচনী পোস্টার, পাড়া ও বিহারের নাম, দোকানের সাইনবোর্ড, আর ফেসবুক পোস্ট। বিডিনিউজের 2024 সালের প্রতিবেদন এই ব্যবহারগুলো নথিভুক্ত করেছে বান্দরবান থেকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী বেশিরভাগ মারমা বিয়ের কার্ডে বাংলার পাশাপাশি মারমা ভাষা আবশ্যিকভাবে লেখেন। বান্দরবান শহরের উজানী পাড়ার ‘বনতুলি আর্ট’ ছাপাখানায় সাত উপজেলা থেকে মানুষ আসেন, বিশেষ করে শীতকালে, যখন অনুষ্ঠান বেশি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক জানিয়েছেন, পাড়ার সামাজিক অনুষ্ঠান আর কার্বারি-হেডম্যানদের খাজনা আদায়ের অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণপত্রও মারমা ভাষায় ছাপা হয়, আর নির্বাচনী পোস্টার মারমায় ছাপা হয় কারণ অনেক পাড়ার বয়স্করা এখনো মারমা হরফ ভালো পড়তে পারেন।
লিখিত সাহিত্যেও নতুন কাজ আসছে। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগ থেকে পাস করা নুথোয়াই মারমা 2022 সালে মারমাদের ইতিহাস নিয়ে মারমা ভাষায় 256 পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশ করেছেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ মারমা ভাষায় অনুবাদ করেছেন। 1996 সালে প্রতিষ্ঠিত ‘মারমা শিল্পী গোষ্ঠী’ দুই যুগের বেশি সময় ধরে মারমা গান লিখছে; তবে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতার কথায়, এখন অনেক গান পাঠকের সুবিধার জন্য বাংলা হরফে লেখা হয়।
সামাজিক মাধ্যমেও মারমা হরফ ফিরছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থী বিডিনিউজকে বলেছেন, তিনি ফেসবুকে বাংলার পাশাপাশি মারমা ভাষায় পোস্ট দেন, যাতে অন্যরাও আগ্রহী হন; আর কোর্স শেষ করা শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের হরফে যোগাযোগ করতে পারেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি নিজস্ব লিপির ইতিহাস তিন রকম। মারমা বর্ণমালা বর্মি-রাখাইনের সঙ্গে ভাগ করা পুরোনো একটি লিপি-পরিবারের অংশ; চাকমা লিপিও ব্রাহ্মী-পরিবারের, কিন্তু আলাদা অক্ষর ও আলাদা ইউনিকোড ব্লক নিয়ে; আর ম্রো লিপি একজন মানুষের হাতে 1982 সালে তৈরি। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য বিষয়ের সূচি আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম হাবে।
| প্রশ্ন | মারমা (ম্রাইমাজা) | চাকমা (অঝাপাত) | ম্রো |
|---|---|---|---|
| উৎপত্তি | ব্রাহ্মী থেকে বিবর্তিত; বর্মি-রাখাইনের সঙ্গে একই বানানরীতি | ব্রাহ্মী-পরিবারের; মাঝের ধাপ নিয়ে মতভেদ | 1982 সালে মেনলে ম্রোর তৈরি |
| কম্পিউটারে | ইউনিকোডের মিয়ানমার অক্ষর (MIT গবেষণাপত্রে যেমন) | নিজস্ব ইউনিকোড ব্লক | নিজস্ব ইউনিকোড ব্লক |
| সরকারি পাঠ্যবই | 2017 থেকে, প্রাক-প্রাথমিক–তৃতীয় শ্রেণি | 2017 থেকে, প্রাক-প্রাথমিক–তৃতীয় শ্রেণি | সরকারি পাঁচ ভাষার তালিকায় নেই |
| বিস্তারিত | এই লেখা | চাকমা লিপি (অঝাপাত) | ম্রো লিপি: মেনলে ম্রোর বর্ণমালা |
তিন লিপির মধ্যে একটি ঐতিহাসিক যোগও আছে। আমাদের ম্রো লিপির লেখায় উদ্ধৃত টিম ব্রুকস লিখেছেন, ম্রো লিপি আসার আগে বেশিরভাগ ম্রো গ্রামের স্কুলে মারমা বর্ণমালা পড়ানো হতো, আর মেনলে ম্রো নিজেও মারমা ভাষায় পড়তে-লিখতে শিখেছিলেন। অর্থাৎ ম্রাইমাজা একসময় নিজের সম্প্রদায়ের বাইরেও পাঠের হরফ ছিল।
বাংলাপিডিয়া মারমা বর্ণমালার নাম দিয়েছে ম্রাইমাজা। জুমজার্নালের আর্কাইভে মংসিংঞা মারমার লেখায় নামটি ‘ম্রাইমা চা’ বা ‘মারমা জা’, আর বিডিনিউজের 2024 সালের প্রতিবেদনে বর্তমান রূপটির নাম ‘ম্রাইম্মা (মারমা)’। বানান উৎসভেদে আলাদা হলেও তিনটিই একই বর্ণমালাকে বোঝায়, যা বাম থেকে ডানে লেখা হয়।
মারমা বর্ণমালায় মোট 45টি অক্ষর: 33টি ব্যঞ্জনবর্ণ ও 12টি স্বরবর্ণ। জুমজার্নালের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতি, বিডিনিউজের 21 ফেব্রুয়ারি 2024 সালের প্রতিবেদন আর Rani Ukhengching Marma-র 2024 সালের MIT গবেষণাপত্র — তিনটি উৎসই একই সংখ্যা দেয়। স্বরবর্ণগুলো সুরও বহন করে।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী মারমা বর্ণমালা উপমহাদেশের প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপি থেকে উদ্ভূত। জুমজার্নালের আর্কাইভ ও বিডিনিউজ দুটি মত রাখে: ব্রাহ্মী থেকে সরাসরি, অথবা মোন-খমের লিপি থেকে। মিয়ানমারের গবেষক উঅংসাউ (1995)-এর বরাতে বলা হয়, অশোকের ব্রাহ্মী হরফ ছয়বার রূপ বদলে আজকের মারমা রূপে পৌঁছেছে।
অক্ষর ও বানানরীতি একই, উচ্চারণ আলাদা। মারমা ভাষাবিদ Rani Ukhengching Marma-র গবেষণাপত্র (MIT, 2024) বলে, আরাকানি, বর্মি ও মারমা একই বানানরীতি মানে। কিন্তু মারমায় র-ফলা ‘র’ পড়া হয়, বর্মিতে ‘য়’; বর্মির এ-কার মারমায় ‘ই’-এর মতো; আর মারমায় সুর তিনটি। তাই বর্মি উচ্চারণে মারমা পড়া ঠিক নয়।
Rani Ukhengching Marma-র 2024 সালের যন্ত্রনির্ভর বিশ্লেষণ অনুযায়ী মারমায় তিনটি সুর: উঁচু-খসখসে, নিচু ও পড়ন্ত। লেখায় সুর বোঝা যায় স্বরচিহ্ন দেখে — ‘ই’-এর ছোট চিহ্ন ◌ိ উঁচু, বড় চিহ্ন ◌ီ নিচু, আর ◌ီး পড়ন্ত। ‘উ’-তেও একই নিয়ম। শব্দ ক, ত, প বা চ দিয়ে শেষ হলে সুর উঁচু হয়।
◌် চিহ্নটি ব্যঞ্জনের ভেতরের ‘অ’ ধ্বনি মুছে দেয়, বাংলা হসন্তের মতো। Rani Ukhengching Marma-র গবেষণাপত্র অনুযায়ী মারমা বানানে এটি বসে 10টি ব্যঞ্জনের সঙ্গে: က င စ ဉ ည တ န ပ မ ယ। যেমন က ‘কা’, কিন্তু က် ‘ক্’। শেষ ব্যঞ্জনটি কী, তার ওপর শব্দের সুরও নির্ভর করে।
2017 সাল থেকে পার্বত্য তিন জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মারমা বর্ণমালায় লেখা পাঠ্যবই দেওয়া হয়। কিন্তু প্রথম আলোর 20 ফেব্রুয়ারি 2026 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় নয় বছরেও পাঠদান শুরু হয়নি। বাংলা ট্রিবিউন 2021 সালে মহালছড়ির একটি বিদ্যালয়ে সপ্তাহে একদিন মারমা বই পড়ানোর কথা জানিয়েছিল।
সবচেয়ে পুরোনো পথ বৌদ্ধ বিহার, যেখানে ভান্তেরা মারমা ভাষায় দেশনা দেন। বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইনস্টিটিউট (কেএসআই) শিশুদের জন্য ভাষাশিক্ষা চালায়; আর্কাইভ অনুযায়ী প্রতি বছর 2 মাসের কোর্স হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে 2017–18 থেকে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 2024 থেকে মারমা শিক্ষার্থীরা নিজেরা সাপ্তাহিক ক্লাস চালান।
নির্দিষ্ট সংখ্যা কোনো উৎসে নেই। Heidi A. Davis-এর 2014 সালের থিসিস লেখে, বাংলাদেশে বেশিরভাগ মারমাভাষী কেবল বাংলায় সাক্ষর, যদিও কিন্ডারগার্টেন প্রাইমারের মাধ্যমে নিজের হরফে সাক্ষরতা বাড়ছে। বিডিনিউজের 2024 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী একসময় কেবল বয়স্করাই ভালো পড়তে পারতেন; গত এক দশকে তরুণদের চর্চা বেড়েছে।
জুমজার্নালের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতি ‘সমুহাদা উইচ্ছেদানি’ ও ‘মনুগ্যি ধম্মাসাত্’ নামের দুটি পাণ্ডুলিপির নাম দেয়। একই লেখায় ভূর্জপত্র ও কাগজে মারমা হরফে লেখা 34টি পাংখুং গীতিনাট্যের পুঁথি আর সাতটি জাইত্ পাণ্ডুলিপির নাম আছে। পূজার শ্লোক, মন্ত্র ও তাবিজও এই হরফে লেখা হয়। বাংলাপিডিয়ায় এমন কোনো তালিকা নেই।
জুমজার্নালের আর্কাইভের মারমা-পরিচিতি বলে, বাংলাদেশে মারমা ভাষা ও মারমা বর্ণমালা বিপন্ন অবস্থায় আছে। Rani Ukhengching Marma-র MIT গবেষণাপত্র ও 7000 Languages-ও মারমাকে বিপন্ন ভাষা বলে। তবে বিডিনিউজের 2024 সালের প্রতিবেদন জানায়, বিয়ের কার্ড, পোস্টার, সাইনবোর্ড ও ফেসবুকে মারমা হরফের ব্যবহার আগের চেয়ে বেড়েছে।
হ্যাঁ। অমনিগ্লট লেখে, মারমা বর্মি লিপিতে লেখা হয়, আর বাংলা হরফেও লেখা যায়। মারমা শিল্পী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা চথুইপ্রু মারমা 2024 সালে বিডিনিউজকে বলেছেন, আগে তাঁদের সব গানের কথা মারমা হরফে লেখা হতো, কিন্তু এখন অনেকে পড়তে না জানায় মারমা গান বাংলা হরফে লেখা হয়।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 3 নভেম্বর 2026
প্রসঙ্গ:মারমা, মারমা বর্ণমালা
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।