Jumjournal Logo

পাহাড়ে সামাজিক বিচার আপিল: কার্বারি থেকে বিভাগীয় কমিশনার পর্যন্ত যে ধাপগুলো আইনে লেখা

Last updated Oct 19th, 2026

0

চট্টগ্রামে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের লাল ইটরঙা দোতলা ঔপনিবেশিক ভবন, সামনে খিলানযুক্ত বারান্দা ও একটি গাড়ি

পাহাড়ে সামাজিক বিচার আপিল আইনে সাধারণত তিন ধাপে চলে: প্রথমে কার্বারি বা হেডম্যান, তারপর সার্কেল চিফ, শেষে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার। শেষ ধাপে কমিশনারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে তিন পার্বত্য জেলার আইনের পাঠ এক নয়। বান্দরবানে কার্বারি আর হেডম্যান আলাদা দুটি ধাপ। খাগড়াছড়িতে চিফের নাম আইনেই লেখা, মং চিফ, আর তাঁর পাশে সরকার-মনোনীত দুজন পরামর্শদাতা বসেন। এর ওপর আছে 1900 সালের শাসনবিধির 40 নম্বর বিধি। সেখানে চিফের রায়ের ওপর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসককে, আপিল হিসেবে নয়, রিভিশন হিসেবে।

এই লেখায় প্রতিটি ধাপ নিয়ে আলাদা করে আলোচনা আছে: কোন আইনের কোন ধারা বা বিধি কী বলে, কোন মামলা প্রথাগত আদালতে যেতেই পারে না, ফি কে ঠিক করে, দুই আইনের যেখানে বিরোধ, আর বাস্তবে এই আদালতগুলো কীভাবে চলে, সে বিষয়ে কোন গবেষণা কী পেয়েছে। হেডম্যান ও কার্বারির দৈনন্দিন দায়িত্ব নিয়ে আলাদা লেখা আছে, মৌজা হেডম্যান ও কার্বারি আসলে কী কী করেন। সার্কেল চিফের ক্ষমতা নিয়ে আছে সার্কেল চিফ: তিনটি সার্কেল, আর রাজার ক্ষমতা। সেসব কথা এখানে আবার বলা হয়নি। এখানে শুধু একটি প্রশ্ন: একজনের রায় আরেকজনের কাছে কোন পথে যায়।

এই লেখায় যা আছে

  1. পাহাড়ে সামাজিক বিচার আপিল: এক নজরে সিঁড়িটি
  2. ধারা 66 তিন জেলায় তিন রকম
  3. প্রথম ধাপ: কার্বারি বা হেডম্যান কী দিয়ে বিচার করেন
  4. 1900 সালের শাসনবিধির 40 নম্বর বিধি কী বলে
  5. কোন মামলা প্রথাগত আদালতে যায় না
  6. সার্কেল চিফের ধাপ: কোন জেলায় কোন চিফ
  7. শেষ ধাপে বিভাগীয় কমিশনার, আর তিন বিজ্ঞ ব্যক্তির শর্ত
  8. আপিল না রিভিশন: 40 বিধি আর 66 ধারার দ্বন্দ্ব
  9. 2003 সালের সংশোধনী: জজ আদালত কেন পারিবারিক মামলা শোনেন না
  10. বিচারের ফি কে ঠিক করেন, টাকা কোথায় যায়
  11. আঞ্চলিক পরিষদ ও চুক্তি: সামাজিক বিচার কার তত্ত্বাবধানে
  12. পুরনো নথিতে আপিল আর রিভিশনের দৃষ্টান্ত
  13. বাস্তবে প্রথাগত আদালত কীভাবে চলে: BRAC-এর গবেষণা
  14. জনগোষ্ঠীভেদে আর্কাইভের বিবরণ
  15. সব আইন এক ছকে
  16. প্রশ্নোত্তর
  17. যা এখনো জানা যায়নি
  18. তথ্যসূত্র

পাহাড়ে সামাজিক বিচার আপিল: এক নজরে সিঁড়িটি

পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989-এর ধারা 66 অনুযায়ী জেলার উপজাতীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা উপজাতীয় বিষয়ে বিরোধ হলে প্রথমে তা তুলতে হয় স্থানীয় কার্বারি বা হেডম্যানের কাছে। সেখান থেকে আপিল যায় সার্কেল চিফের কাছে, তারপর চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের কাছে। কমিশনারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

এই কথাটুকু তিন জেলার আইনেই এক। বাকি খুঁটিনাটি আলাদা। তিনটি আইনই 6 মার্চ 1989 তারিখের: রাংগামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন (1989 সনের 19 নং আইন), খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন (20 নং) এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন (21 নং)। তিনটির ধারা 66-এর শিরোনামও প্রায় এক, “উপজাতীয় বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত বিধান”। সরকারি আইন-ওয়েবসাইট bdlaws-এ তিনটির বর্তমান পাঠই পাওয়া যায়। আমাদের আর্কাইভেও তিনটি আইনের পূর্ণ পাঠ রাখা আছে।

পুরো ছবির জন্য আরও তিনটি দলিল পাশাপাশি পড়তে হয়:

  1. 1900 সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি (Regulation I of 1900) ও তার ধারা 18-এর অধীনে তৈরি বিধিমালা। এর 40 নম্বর বিধি হেডম্যান ও চিফকে “উপজাতীয় মামলা” (tribal cases) বিচারের ক্ষমতা দেয়, আর জেলা প্রশাসককে দেয় রিভিশনের ক্ষমতা।
  2. পার্বত্য চট্টগ্রাম (সংশোধন) আইন, 2003 (2003 সনের 38 নং আইন)। এটি শাসনবিধির ধারা 8-এ নতুন উপধারা যোগ করে। সেই উপধারা অনুযায়ী পারিবারিক ও প্রথাগত আইনের মামলা যুগ্ম জেলা জজের এখতিয়ারের বাইরে, এগুলো “মৌজা হেডম্যান ও সার্কেল চিফ” বিচার করবেন।
  3. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, 1998। এর ধারা 22(ঙ) “উপ-জাতীয় রীতিনীতি, প্রথা ইত্যাদি এবং সামাজিক বিচার”-এর সমন্বয় ও তত্ত্বাবধান আঞ্চলিক পরিষদকে দেয়।

এই চারটি দলিল চার সময়ের, তাই সবকটি একই কথা বলে না। কোথায় মেলে আর কোথায় মেলে না, সেটাই পরের অংশগুলোর বিষয়।

ধারা 66 তিন জেলায় তিন রকম: রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের পাঠ পাশাপাশি

রাঙামাটিতে আপিলের ধাপ তিনটি। প্রথমে কার্বারি বা হেডম্যান, তারপর “ক্ষেত্রবিশেষে” চাকমা বা বোমাং চিফ, শেষে কমিশনার। খাগড়াছড়িতেও ধাপ তিনটি, কিন্তু চিফের ধাপে আইনে নাম আছে একজনেরই, মং চিফ। তাঁকে সাহায্য করেন সরকার-মনোনীত একজন ত্রিপুরা ও একজন চাকমা পরামর্শদাতা। বান্দরবানে ধাপ চারটি: কার্বারি, হেডম্যান, বোমাং চিফ, কমিশনার।

বিষয় রাঙামাটি (1989 সনের 19 নং আইন) খাগড়াছড়ি (20 নং আইন) বান্দরবান (21 নং আইন)
প্রথম শুনানিস্থানীয় কারবারী বা হেডম্যান — 66(1)স্থানীয় কারবারী বা হেডম্যান — 66(1)স্থানীয় কারবারী বা হেডম্যান — 66(1)
কার্বারির রায়ের বিরুদ্ধেসরাসরি চিফের কাছে — 66(2)সরাসরি মং চিফের কাছে — 66(2)হেডম্যানের কাছে — 66(2)
চিফের ধাপ“ক্ষেত্রবিশেষে” চাকমা সার্কেলের চীফ বা বোমাং সার্কেলের চীফ — 66(2)“খাগড়াছড়ি মং চীফ” — 66(2)“বান্দরবান বোমং চীফ” — 66(2)
চিফের পাশে কেকোনো বিধান নেইএকজন ত্রিপুরা ও একজন চাকমা পরামর্শদাতা, সরকার তিন বছরের জন্য মনোনীত করে — 66(3)চিফকেও অন্তত তিনজন বিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করতে হয় — 66(3)
শেষ ধাপচট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত — 66(3)চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত — 66(4)চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত — 66(2)
কমিশনারের শর্তসংশ্লিষ্ট উপজাতি থেকে তাঁর মনোনীত অন্তত তিনজন “উপজাতীয় বিজ্ঞ ব্যক্তি”র সঙ্গে পরামর্শএকই শর্তঅন্তত তিনজন “বিজ্ঞ ব্যক্তি” — “উপজাতীয়” শব্দটি নেই
পদ্ধতি ও ফিপরিষদ প্রবিধান দিয়ে ঠিক করবে — 66(4)পরিষদ প্রবিধান দিয়ে ঠিক করবে — 66(5)পরিষদ প্রবিধান দিয়ে ঠিক করবে — 66(4)
মোট ধাপ334

সূত্র: bdlaws-এ রাংগামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান আইনের ধারা 66। উদ্ধৃতির বানান মূল পাঠের।

রাঙামাটির পাঠ 1998 সালে বদলেছিল

রাংগামাটি আইনের ধারা 66(2)-এ আগে লেখা ছিল “রাংগামাটি চাকমা চীফের”। রাংগামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, 1998 (1998 সনের 9 নং আইন)-এর ধারা 4 বলে তার জায়গায় বসে “ক্ষেত্রবিশেষে, চাকমা সার্কেলের চীফ এবং বোমাং সার্কেলের চীফ”। 66(3)-এর “চাকমা চীফের” শব্দও একই সংশোধনে বদলে হয় “চাকমা সার্কেলের চীফ এবং বোমাং সার্কেলের চীফের”। bdlaws-এর পাদটীকায় দুটি পরিবর্তনই নথিভুক্ত। অর্থাৎ 1989 থেকে 1998 পর্যন্ত রাঙামাটি জেলার সব বিরোধে আপিলের চিফ-ধাপ ছিলেন চাকমা চিফ একা। 1998-এর পর জেলার যে অংশ বোমাং সার্কেলে পড়ে, সেখানকার আপিল যায় বোমাং চিফের কাছে।

খাগড়াছড়ির পাঠে কোনো সংশোধনের চিহ্ন নেই

খাগড়াছড়ি আইনের ধারা 66-এর bdlaws পাঠে কোনো পাদটীকা নেই। চিফ-ধাপে এখনো শুধু “খাগড়াছড়ি মং চীফ” লেখা। রাঙামাটির মতো “ক্ষেত্রবিশেষে” ধরনের শব্দ সেখানে নেই। অথচ আমাদের আর্কাইভের পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার সৃষ্টি, শাসন ও বিচার ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ লেখায় বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা ও লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা চাকমা সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত। সেই অংশের কোনো বাসিন্দার আপিল আইনের অক্ষর মেনে কার কাছে যাবে, ধারা 66-এর পাঠে তার উত্তর নেই।

এই খুঁটিনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সব জায়গায় একই ছক লেখা হয়। উদাহরণ হিসেবে আর্কাইভের ওই লেখাটি ধারা 66-কে তিন জেলার জন্য একটিই পাঠ হিসেবে উদ্ধৃত করে: কার্বারি থেকে হেডম্যান, হেডম্যান থেকে “সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ”, তারপর কমিশনার। ধাপের দিক থেকে সেটি বান্দরবানের পাঠ। bdlaws-এর বর্তমান পাঠে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে কার্বারি আর হেডম্যান একই ধাপে, আর খাগড়াছড়িতে চিফের নাম নির্দিষ্ট।

প্রথম ধাপ: কার্বারি বা হেডম্যান কী দিয়ে বিচার করেন

ধারা 66(1) বলে, কার্বারি বা হেডম্যান বিরোধ নিষ্পত্তি করবেন “সংশ্লিষ্ট উপজাতীয়গণের মধ্যে প্রচলিত রীতি-নীতি অনুযায়ী”। অর্থাৎ কোনো লিখিত সাধারণ আইন নয়, যে জনগোষ্ঠীর বিরোধ তাদের নিজস্ব প্রথা। এখতিয়ারের তিনটি শর্ত আছে: দুই পক্ষই “উপজাতীয়”, দুজনই ওই জেলার বাসিন্দা, আর বিষয়টি “সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা উপজাতীয়”।

এর একটি সরাসরি ফল আছে। একজন বাঙালি আর একজন পাহাড়ির মধ্যে বিরোধ হলে ধারা 66 প্রযোজ্য নয়, কারণ প্রথম শর্তই পূরণ হয় না। নিচে BRAC-এর গবেষণা প্রসঙ্গে দেখা যাবে, বাস্তবেও এ ধরনের বিরোধ অন্য পথে যায়।

কার্বারি পদটি নিয়ে একটি অদ্ভুত অবস্থা আছে। 1900 সালের শাসনবিধিতে কার্বারির নিয়োগ, অপসারণ বা এখতিয়ার নিয়ে কোনো বিধান নেই। অথচ 1989 সালের আইনের ধারা 66(1) তাঁকে প্রথম বিচারকের আসনে বসায়। আমাদের আর্কাইভের ক্রমবিকাশ-লেখাটি এই অবস্থার কথা বলে। BRAC-এর 2011 সালের গবেষণাও লেখে, শাসনবিধিতে কার্বারির কোনো বিধান না থাকলেও জেলা পরিষদ আইনের 66(1) ধারায় পদটির স্বীকৃতি আছে। আর্কাইভের লেখাটি আরও বলে, কার্বারির ক্ষমতা ও কার্যাবলি নিয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদ “অদ্যাবধি কোনো বিধি-বিধান প্রণয়ন করেনি”।

জেলা পরিষদের কাজের তালিকাতেও বিষয়টি আছে। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি আইনের প্রথম তফসিলে (পরিষদের কার্যাবলি, ধারা 22) 1998 সালের সংশোধনীতে একটি দফা যোগ হয়েছে: “উপজাতীয় রীতিনীতি অনুসারে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও উপজাতীয় বিষয়ক বিরোধের বিচার”। একই সংশোধনী তিন জেলার তফসিলেই আরেকটি দফা যোগ করে: “উপজাতীয় রীতিনীতি, প্রথা ইত্যাদি এবং সামাজিক বিচার”। বান্দরবান আইনের তফসিলে প্রথম দফাটি পাওয়া যায় না, দ্বিতীয়টি আছে। bdlaws-এর তফসিল-পিডিএফ পুরনো বিজয় ফন্টে লেখা। এখানকার বাংলা পাঠ সেই ফন্ট থেকে রূপান্তর করে নেওয়া।

1900 সালের শাসনবিধির 40 নম্বর বিধি কী বলে

40 নম্বর বিধি অনুযায়ী মৌজা হেডম্যান নিজের মৌজার বাসিন্দাদের আনা “সকল বিরোধের” বিচার করবেন। তিনি উপজাতীয় মামলা পক্ষদের সামাজিক প্রথা অনুযায়ী নিষ্পত্তি করবেন। তিনি 25 টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন। চিফ পারেন 50 টাকা পর্যন্ত। দুজনের সব রায়ের ওপর জেলা প্রশাসকের রিভিশনের ক্ষমতা আছে, আর একই মামলা নিজে শোনার ক্ষমতাও আছে।

বিধিটি শাসনবিধির ধারা 18-এর অধীনে তৈরি “Rules for the Administration of the Chittagong Hill Tracts”-এর অংশ। এর শিরোনাম “Administrative powers of the Chiefs and Headmen”। PCJSS-এর সংকলিত পাঠের পাদটীকা অনুযায়ী বিধিটির বর্তমান রূপ এসেছে তিনটি প্রজ্ঞাপনে: 16 এপ্রিল 1937, 29 ফেব্রুয়ারি 1940 আর 20 জানুয়ারি 1942। বিধির মূল কথাগুলো অংশ ধরে ধরে:

  1. হেডম্যানের এখতিয়ার। মৌজার বাসিন্দাদের আনা সব বিরোধ। “উপজাতীয় মামলা” তিনি বিচার করবেন “পক্ষদের সামাজিক প্রথা অনুযায়ী” (in accordance with the social custom of the parties)। ক্ষমতা তিনটি: 25 টাকা পর্যন্ত জরিমানা, ক্ষতিপূরণ বা ফেরত আদায় (restitution), আর জেলা প্রশাসকের আদেশ না আসা পর্যন্ত আটক রাখা।
  2. চিফের এখতিয়ার। নিজের খাস মৌজায় চিফ হেডম্যান হিসেবেই সব বিরোধ শোনেন। এ ছাড়া তিনি সেই উপজাতীয় মামলাগুলো শোনেন যেগুলো “হেডম্যানের সিদ্ধান্ত থেকে” তাঁর কাছে আসে, অথবা হেডম্যান নিজেই পাঠান। চিফের জরিমানার সীমা 50 টাকা।
  3. চিফের রায়ের মর্যাদা। বিধির ভাষায় চিফের সিদ্ধান্ত “subject to the general revisional jurisdiction of the Deputy Commissioner, be final”। অর্থাৎ জেলা প্রশাসকের সাধারণ রিভিশন-এখতিয়ার সাপেক্ষে চূড়ান্ত।
  4. রায় কার্যকর করা। চিফ বা হেডম্যান দণ্ড কার্যকর করতে না পারলে জেলা প্রশাসকের সহায়তা চাইতে পারেন।
  5. কোর্ট-ফি নেই। চিফ বা হেডম্যানের কাছে উপজাতীয় মামলায় কোনো কোর্ট-ফি লাগে না।
  6. জরিমানার টাকা কোথায় যায়। জরিমানা যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে (যদি কেউ থাকেন) এবং প্রথা অনুযায়ী গোটা সম্প্রদায়ের কাছে। সম্প্রদায়ের অংশ থেকে প্রথা যতটুকু অনুমোদন করে, চিফ ও হেডম্যান ততটুকু পান। বিচারের সূত্রে কোনো নজরানা বা অন্য কিছু নেওয়া যায় না।
  7. বিচারের খরচ। জেলা প্রশাসকের অনুমোদিত হারে চিফ ও হেডম্যান মামলা চালানোর খরচ মেটাতে ফি নিতে পারেন।
  8. সীমা। এই বিধির অধীনে তাঁরা উপজাতীয় মামলা ছাড়া অন্য কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা শুনতে পারেন না, যদি না গভর্নর (এখন সরকার) আলাদা ক্ষমতা দেন।
  9. জেলা প্রশাসকের ক্ষমতা। এই বিধির অধীনে চিফ ও হেডম্যানের সব ক্ষমতা প্রয়োগের ওপর জেলা প্রশাসকের “general revisional and concurrent jurisdiction”। মানে তিনি রায় পুনর্বিবেচনা করতে পারেন, আবার একই মামলা নিজেও শুনতে পারেন।

আর্কাইভের ক্রমবিকাশ-লেখাটির তথ্যসূত্র অ্যাডভোকেট জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, অ্যাডভোকেট প্রতিম রায় ও সুগত চাকমা সম্পাদিত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন। লেখাটি বিধি 40-এর একই অংশগুলো বাংলায় তুলে দিয়েছে। একটি তথ্য সেখানে বাড়তি আছে: চিফ ও হেডম্যানের এই বিচারক্ষমতা তৎকালীন জেলা প্রশাসক এস.জেড. খানের স্মারক নং 1243(400)/সি, রাঙ্গামাটি, তারিখ 5 মে 1964 মূলে জারি করা প্রজ্ঞাপনেও স্বীকার করা হয়েছিল।

25 আর 50 টাকার সীমা 1937–1942 সালের অঙ্ক। এগুলো পরে বাড়ানো হয়েছে কি না, শাসনবিধির কোনো সংকলিত পাঠে পাওয়া যায় না। রাজা দেবাশীষ রায় 2005 সালে Minority Rights Group-এর প্রতিবেদনে লিখেছেন, জরিমানার ক্ষমতা হালনাগাদ করা ও নমনীয় করা দরকার। “পশু-জরিমানা”র বদলে যেন টাকায় জরিমানা করা যায়, সেটাও তিনি বলেছেন।

কোন মামলা প্রথাগত আদালতে যায় না: 40 বিধির বাদ-তালিকা

40 নম্বর বিধি সাত শ্রেণির অপরাধ চিফ ও হেডম্যানের বিচারের বাইরে রেখেছে। এগুলোর মধ্যে আছে রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, গুরুতর আঘাত, জালিয়াতি, আর 50 টাকার বেশি মূল্যের সম্পত্তি জড়িত ডাকাতি বা গৃহে অনধিকার প্রবেশ। এসব মামলা সাধারণ ফৌজদারি আদালতে যায়। কোনো পর্যায়েই এগুলো কার্বারি-হেডম্যান-চিফের সিঁড়িতে ওঠার কথা নয়।

বিধির তালিকাটি পুরোটা:

  1. রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ, সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে অপরাধ, অথবা জনবিচারের (public justice) বিরুদ্ধে অপরাধ;
  2. যে দাঙ্গায় গুরুতর আঘাত হয়েছে বা মারণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে;
  3. ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ: খুন, অপরাধমূলক নরহত্যা, ইচ্ছাকৃত গুরুতর আঘাত, অবৈধ আটক, ধর্ষণ, অপহরণ, মনুষ্যহরণ ও “অস্বাভাবিক অপরাধ”;
  4. বলপূর্বক আদায়, দস্যুতা, ডাকাতি, ওত পেতে গৃহে অনধিকার প্রবেশ বা ঘর ভাঙা, যখন নেওয়া সম্পত্তির মূল্য 50 টাকার বেশি;
  5. জালিয়াতি;
  6. শাসনবিধির চতুর্থ অধ্যায়ের অপরাধ, অর্থাৎ অস্ত্র, গোলাবারুদ, মাদক ও মদ-সংক্রান্ত;
  7. কমিশনার আলাদাভাবে যে অপরাধ বা অপরাধ-শ্রেণি নির্দিষ্ট করেন।

আর্কাইভের ক্রমবিকাশ-লেখাটি ষষ্ঠ দফার পাশে একটি পরের আইনের কথা বলে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, 1990-এর ধারা 10(2)(খ)-এর শর্তাংশে বলা আছে, তিন পার্বত্য জেলার আদিবাসীরা ঐতিহ্যগতভাবে যে মদ তৈরি করেন, তাঁরা নিজেরা তা পান করলে ওই উপধারা প্রযোজ্য নয়।

একই লেখায় 50টি “উল্লেখযোগ্য সামাজিক বিরোধ ও অপরাধ”-এর একটি তালিকা আছে। এগুলো সাধারণত কার্বারি-হেডম্যান-চিফের আদালতে আসে। কয়েকটি উদাহরণ: অন্যের চিহ্নিত জুমে চাষ করা, জুম থেকে জোর করে ফসল তোলা, সবার ব্যবহারের পানির উৎস নষ্ট করা, দাম্পত্য কলহ, ভরণপোষণ না দেওয়া, সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করা, উত্তরাধিকারের সম্পত্তি ভাগ নিয়ে বিরোধ, বসতভিটার সীমানা, ঋণ শোধ না করা, আর অন্যের জাঁক থেকে বিনা অনুমতিতে মাছ ধরা। BRAC-এর গবেষণাও প্রায় একই ধরনের “সামাজিক অপরাধ”-এর তালিকা দেয়: অন্যের জমিতে জুম, ফসল নিয়ে যাওয়া, গৃহপালিত পশু চুরি, সবার পানির উৎস নষ্ট করা।

বাস্তবে এই সীমা সবসময় মানা হয় না। BRAC-এর গবেষণা পুরোপুরি আদিবাসী গ্রামে দেখেছে, কিছু ক্ষেত্রে ধর্ষণের মামলাও সালিশে মীমাংসা হয়েছে। গবেষকরা লিখেছেন, সরকারি আইন অনুযায়ী কার্বারি বা হেডম্যানের সেই এখতিয়ার নেই। খুনের মামলায় অবশ্য কার্বারি-হেডম্যানরা থানাকে যুক্ত করেছেন।

সার্কেল চিফের ধাপ: কোন জেলায় কোন চিফ, আর সার্কেলের সীমা কেন সমস্যা

আপিলের চিফ-ধাপ জেলা ধরে লেখা, কিন্তু সার্কেলের সীমা জেলার সীমা মানে না। রাঙামাটির আইন 1998 সালে “ক্ষেত্রবিশেষে” চাকমা বা বোমাং চিফ লিখে এই সমস্যা মিটিয়েছে। খাগড়াছড়ির আইনে এখনো শুধু মং চিফ। বান্দরবানের আইনে শুধু বোমাং চিফ।

আর্কাইভের ক্রমবিকাশ-লেখাটি সীমানার দুটি অমিল নির্দিষ্ট করে বলে। রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী ও কাপ্তাই উপজেলা বোমাং সার্কেলে পড়ে। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা ও লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা পড়ে চাকমা সার্কেলে। লেখাটির মতে, এ কারণে বিধি 40-এর অধীনে এসব এলাকার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধে জেলা প্রশাসকরা “অনেক সময় আদালতের অধিক্ষেত্রের প্রশ্নে আইনী জটিলতার সম্মুখীন” হন। এর কারণ, বিধি 40-এর রিভিশন-ক্ষমতা জেলা প্রশাসকের, অথচ সংশ্লিষ্ট চিফের সার্কেল জেলার বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত।

শাসনবিধির নিজের পাঠেও সার্কেল আর মহকুমার সম্পর্ক লেখা আছে। 38A বিধির পুরনো পাঠে বলা হয়েছে, রামগড় মহকুমার এলাকা মং সার্কেলের সঙ্গে মিলে যায়, আর জেলার বাকিটা সদর ও বান্দরবান মহকুমায়। সেই বিন্যাস তিন জেলা গঠনের আগের। কোন চিফ কোন জেলার, আর তিন সার্কেলের আকার কত, তা সার্কেল চিফের লেখায় আছে।

খাগড়াছড়ির পরামর্শদাতা-বিধানটি আর কোথাও নেই। মং চিফের আপিল নিষ্পত্তিতে “একজন ত্রিপুরা এবং একজন চাকমা পরামর্শদাতা” থাকবেন, সরকার তাঁদের তিন বছরের জন্য মনোনীত করবে [66(3)]। আইনটি এর কারণ বলে না। কোনো সময়ে এই পদে কেউ মনোনীত হয়েছেন কি না, তার কোনো সরকারি তালিকাও পাওয়া যায়নি।

শেষ ধাপে বিভাগীয় কমিশনার, আর তিন বিজ্ঞ ব্যক্তির শর্ত

তিন জেলাতেই আপিলের শেষ ঠিকানা চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার, এবং তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। শর্ত একটি। আপিল নিষ্পত্তির আগে তাঁকে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী থেকে তাঁর নিজের মনোনীত অন্তত তিনজন বিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। বান্দরবানে এই শর্ত বোমাং চিফের বেলাতেও খাটে।

শাসনবিধির ধারা 2(b) অনুযায়ী “Commissioner” মানে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার, আর “Additional Commissioner” মানে ওই বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার। শর্তটির ভাষা লক্ষ করার মতো, দুটি কারণে।

প্রথমত, পরামর্শ বাধ্যতামূলক, কিন্তু পরামর্শ মানা বাধ্যতামূলক নয়। আইনে লেখা “পরামর্শ করিবেন”, “পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিবেন” নয়। দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞ ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেন কমিশনার নিজেই (“তত্কর্তৃক মনোনীত”)। চিফ, আঞ্চলিক পরিষদ বা জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিষ্ঠানের এতে ভূমিকা নেই। পাংখোয়া নারীর প্রথাগত অধিকার নিয়ে আমাদের লেখায় এই দিকটি দেখানো হয়েছে: ছোট জনগোষ্ঠীর রীতির ব্যাখ্যা একজন সরকারি কর্মকর্তা একা দিতে পারেন না, কিন্তু কার সঙ্গে পরামর্শ হবে তা তিনিই ঠিক করেন।

রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাঠে লেখা “উপজাতীয় বিজ্ঞ ব্যক্তি”। বান্দরবানের পাঠে শুধু “বিজ্ঞ ব্যক্তি”, “উপজাতীয়” শব্দটি নেই। তবে “সংশ্লিষ্ট উপজাতি হইতে” কথাটি তিনটিতেই আছে।

শাসনবিধির বিধি 11-এ একটি পুরনো সীমাও আছে। CHT-তে আইনজীবীর উপস্থিতি সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। ব্যতিক্রম: কমিশনারের সম্মতিতে সেশন মামলায়, আর কমিশনারের কাছে আপিল ও রিভিশন মামলায় যেখানে বিষয়মূল্য 2,000 টাকা বা তার বেশি। বিধি 5 অনুযায়ী আপিলকারী চাকমা, “মগ” বা পার্বত্য অঞ্চলের কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য হলে আপিলের স্মারকলিপিতে কোর্ট-ফি লাগে না। এই দুই বিধি শাসনবিধির দেওয়ানি বিচার-অংশের। ধারা 66-এর আপিলে এগুলো সরাসরি প্রযোজ্য কি না, কোনো আইনে স্পষ্ট লেখা নেই।

আপিল না রিভিশন: 40 বিধি আর 66 ধারার দ্বন্দ্ব

দুটি আইন চিফের রায়ের ওপরের ধাপ দুজনকে দিয়েছে। 1900 সালের বিধি 40 অনুযায়ী চিফের রায় চূড়ান্ত, তবে জেলা প্রশাসকের রিভিশন সাপেক্ষে। 1989 সালের ধারা 66 অনুযায়ী চিফের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল যায় বিভাগীয় কমিশনারের কাছে। আমাদের আর্কাইভ আর BRAC-এর গবেষণা, দুই জায়গাতেই এটিকে অমীমাংসিত আইনি দ্বন্দ্ব বলা হয়েছে।

আর্কাইভের ক্রমবিকাশ-লেখাটির ভাষায়, বিধি 40 অনুযায়ী সার্কেল চিফের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশনের এখতিয়ার জেলা প্রশাসকের। “পক্ষান্তরে” ধারা 66(2) ও 66(3) কমিশনারকে আপিল শোনার ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। লেখাটি বলে, এর ফলে “সামাজিক বিরোধ চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এ অধিক্ষেত্রের প্রশ্নে আইনী দ্বন্দ্বের উদ্ভব হয়েছে, যা ন্যায় বিচারের পথে অন্তরায়”। BRAC-এর 2011 সালের মনোগ্রাফ একই কথা লেখে, শব্দটুকু আলাদা: “This contradiction between two laws is still remained unresolved.”

দুই উৎস বিধি 40-এর ভাষা পড়েছে দুইভাবে। আর্কাইভের লেখাটি বলে জেলা প্রশাসকের “রিভিশন” ক্ষমতা, বিধির ইংরেজি পাঠও তাই বলে। BRAC-এর গবেষণা লেখে, বিধি 40 অনুযায়ী চিফের সিদ্ধান্ত “subject to appeal before Deputy Commissioner”।

আপিল আর রিভিশনের পার্থক্য নিছক শব্দের নয়। রাজা দেবাশীষ রায় MRG-র প্রতিবেদনে (2005) এটি ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বিবরণে CHT-র প্রথাগত আদালত দুই স্তরের, হেডম্যান ও চিফ। সরকার-নিযুক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও হাইকোর্ট এদের রায় পর্যালোচনা করতে পারেন, কিন্তু চিফের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে “fully fledged appeals” চলে না। তাঁর ভাষায়, রিভিশনে হস্তক্ষেপের পরিসর অনেক ছোট, সাধারণত পদ্ধতি ও আইনের প্রশ্নে সীমিত, মামলার তথ্য পর্যন্ত যায় না। লক্ষ করার বিষয়, এই বিবরণে ধারা 66-এর কমিশনার-আপিলের উল্লেখ নেই। তিনি পাদটীকায় বিধি 39 ও 40 এবং 2003 সালের সংশোধনীকে ভিত্তি হিসেবে দেখিয়েছেন।

উৎসগুলোর বর্ণনাও তাই এক রকম নয়। IWGIA-র 2000 সালের প্রকাশনায় (লেখক Chandra K. Roy) বলা হয়েছে, প্রথাগত ব্যবস্থায় রাজা “highest court of appeal”। ব্যক্তিগত আইনের বিষয়ে জেলা প্রশাসক রিভিশন-এখতিয়ার প্রয়োগ করেন। বম সমাজের বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে আর্কাইভের লেখায় সার্কেল চিফের সিদ্ধান্তকেই “চূড়ান্ত বলে গণ্য” বলা হয়েছে। আর তিন জেলা পরিষদ আইনের ধারা 66 বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কমিশনারের। তিনটি বিবরণ পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায় প্রশ্নটি কেন অমীমাংসিত।

শাসনবিধির ধারা 17 এই ছবিতে আরেকটি স্তর যোগ করে। 17(1) অনুযায়ী CHT-র সব কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের অধীন, এবং তিনি তাঁদের আদেশ রিভিশন করতে পারেন। 17(2) অনুযায়ী এই শাসনবিধির অধীনে জেলা প্রশাসক বা অন্য কোনো কর্মকর্তার দেওয়া যেকোনো আদেশ কমিশনার রিভিশন করতে পারেন। 17(3) অনুযায়ী সরকারও পারে। ধারা 19 বলে, শাসনবিধি বা বিধিমালার অধীনে দেওয়া সিদ্ধান্ত বা আদেশ কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি আদালতে প্রশ্ন তোলা যায় না, যদি না শাসনবিধি বা অন্য কোনো আইন আলাদা কিছু বলে।

2003 সালের সংশোধনী: জজ আদালত কেন পারিবারিক মামলা শোনেন না

পার্বত্য চট্টগ্রাম (সংশোধন) আইন, 2003 (2003 সনের 38 নং আইন) শাসনবিধির ধারা 8-এ তিনটি উপধারা যোগ করে। এর ফলে তিন জেলা তিনটি আলাদা দেওয়ানি এখতিয়ার হয়, আর প্রতিটিতে জেলা জজ ও যুগ্ম জেলা জজ বসেন। কিন্তু ধারা 8(4) স্পষ্ট বলে, জনগোষ্ঠীগুলোর পারিবারিক আইন ও অন্যান্য প্রথাগত আইন থেকে উদ্ভূত মামলা যুগ্ম জেলা জজ শুনবেন না। এগুলো “triable by the Mauza Headmen and Circle Chiefs”।

ধারা 8(4)-এর পুরো কথা: যুগ্ম জেলা জজ মূল এখতিয়ারের আদালত হিসেবে সংশ্লিষ্ট জেলার “existing laws, customs and usages” অনুযায়ী সব দেওয়ানি মামলা শুনবেন। ব্যতিক্রম রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের জনগোষ্ঠীগুলোর পারিবারিক আইন ও অন্যান্য প্রথাগত আইন থেকে উদ্ভূত মামলা, যা মৌজা হেডম্যান ও সার্কেল চিফ শুনবেন। ধারা 8(5) অনুযায়ী যুগ্ম জেলা জজের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল যায় জেলা জজের কাছে। একই আইন শাসনবিধির ধারা 7 থেকে “civil” শব্দ বাদ দেয় এবং ধারা 10 (মামলা প্রত্যাহারের ক্ষমতা) রহিত করে। আগে বিভাগীয় কমিশনার সেশন জজের ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। সেই ক্ষমতা নতুন সেশন জজের হাতে যায়।

আইনটি কাগজে 2003 সালের, কার্যকর হয় অনেক পরে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়ানি বিবিধ মামলা নং 11/2022 (রেফারেন্স)-এর রায়ে বলা হয়েছে, সংশোধনী আইনটি গেজেটের মাধ্যমে 4 জুন 2008 তারিখে বলবৎ হয়। BRAC-এর গবেষণা বলে, 1 জুলাই 2008-এর আগে CHT-তে কোনো ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যুগান্তরের 18 সেপ্টেম্বর 2026-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বান্দরবানে জেলা ও দায়রা জজ আদালত চালু হয় 2008 সালে।

2022 সালের রেফারেন্স: কমিশনারের পুরনো দেওয়ানি আপিল

এই রায় ধারা 66-এর সামাজিক বিচার নিয়ে নয়। এর বিষয় 2008-এর আগে জেলা প্রশাসকের রায়ের বিরুদ্ধে কমিশনারের কাছে ঝুলে থাকা সাধারণ দেওয়ানি আপিল। তবু এটি কমিশনারের বিচারিক ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে সাম্প্রতিক উচ্চ আদালতের ব্যাখ্যা। বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত প্রশ্ন পাঠিয়েছিল, এসব আপিল কি জেলা জজের কাছে স্থানান্তর হবে? 21 নভেম্বর 2022 তারিখে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামানের বিশেষ বেঞ্চ উত্তর দেন “না”। কারণ 2003 সালের আইনের ধারা 6 শুধু ফৌজদারি মামলার স্থানান্তরের কথা বলে, দেওয়ানি আপিল নিয়ে নীরব। বেঞ্চ নির্দেশ দেন, তিন জেলার জেলা জজরা এসব আপিল কমিশনারের কাছে ফেরত পাঠাবেন, আর কমিশনার “as before” সেগুলো নিষ্পত্তি করবেন।

রায়ে একজন অ্যামিকাস কিউরি, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ. এফ. হাসান আরিফ, যুক্তি দিয়েছিলেন যে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর নির্বাহী কর্মকর্তার চালানো সমান্তরাল আপিল-ফোরাম অসাংবিধানিক। বেঞ্চ এই যুক্তি গ্রহণ করেননি। তাঁরা বলেছেন, CHT-র এই আলাদা বিচারব্যবস্থাকে সংবিধান-বিরোধী বলা যায় না। এ প্রসঙ্গে বেঞ্চ Bangladesh vs. Rangamati Food Products (69 DLR (AD) 432) ও Wagachara Tea Estate vs. Md. Abu Taher (69 DLR (AD) 381)-সহ কয়েকটি রায়ের উল্লেখ করেন। এই মামলা নিয়ে আমাদের আলাদা লেখা: রাঙ্গামাটি ফুড প্রোডাক্টস মামলা: ১৯০০ সালের শাসনবিধি যেভাবে ‘মৃত আইন’ হলো, আর যেভাবে ফিরে এল। রায়ে বেঞ্চ আরও বলেন, 2003 সালের সংশোধনী পারিবারিক ও প্রথাগত আইনের মামলা যুগ্ম জেলা জজের এখতিয়ার থেকে বাইরে রেখে “Mouza Headmen and Chief Circles”-এর এখতিয়ার স্বীকার করেছে।

এই রেফারেন্সে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল এ. এম. আমিন উদ্দিন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী ও রাজা দেবাশীষ রায়ও শুনানি করেন। রাজা দেবাশীষ রায়ের যুক্তি রায়ে এভাবে লেখা আছে: শাসনবিধির আগেও CHT-র প্রশাসন ও বিচারের আলাদা মর্যাদা ছিল, শাসনবিধি তা বজায় রেখেছে, আর দেওয়ানি বিরোধে দেওয়ানি কার্যবিধির প্রয়োগ এখানে বাদ।

পারিবারিক আদালত আইন পাহাড়ে প্রযোজ্য নয়

পারিবারিক আদালত আইন, 2023-এর ধারা 1(2) বলে, আইনটি “রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা, বান্দরবান পার্বত্য জেলা ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা ব্যতীত” সমগ্র বাংলাদেশে প্রযোজ্য। অর্থাৎ পাহাড়ে খোরপোষ, বিবাহবিচ্ছেদ বা অভিভাবকত্বের জন্য আলাদা পারিবারিক আদালত নেই। যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিন জেলায় পৃথক পারিবারিক আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা বলেছেন, এতে বিশেষ করে বাঙালি বাসিন্দা, এবং আধুনিক আইনি সুরক্ষা চান এমন পাহাড়িরা, প্রতিকার পাচ্ছেন না। তাঁরা প্রথাগত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয় এমনভাবে আইনটি পাহাড়ে চালুর দাবি জানিয়েছেন। পাহাড়ি পক্ষের কোনো প্রতিক্রিয়া ওই প্রতিবেদনে নেই।

বিচারের ফি কে ঠিক করেন, আর টাকা কোথায় যায়

চারটি দলিল ফি নিয়ে চার রকম কথা বলে। বিধি 40: কোর্ট-ফি নেই, তবে জেলা প্রশাসকের অনুমোদিত হারে বিচারের খরচ নেওয়া যায়। ধারা 66-এর শেষ উপধারা: বিচারপ্রার্থী ও আপিলকারীর ফি জেলা পরিষদ প্রবিধান দিয়ে ঠিক করবে। জেলা পরিষদ আইনের দ্বিতীয় তফসিল: “সামাজিক বিচারের ফিস” পরিষদের আয়ের উৎস। শান্তিচুক্তি: একই ফি পরিষদের আরোপযোগ্য উৎসের তালিকায়।

  • বিধি 40 (1937–1942-এর রূপ): কোর্ট-ফি নেই। চিফ ও হেডম্যান জেলা প্রশাসকের অনুমোদিত হারে মামলা চালানোর খরচ নিতে পারেন। জরিমানা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগ হয়, আর প্রথা অনুযায়ী তার একটি অংশ চিফ-হেডম্যান পান।
  • ধারা 66(4) (খাগড়াছড়িতে 66(5)): জেলা পরিষদ প্রবিধান দিয়ে “(ক) বিচার পদ্ধতি; (খ) বিচার প্রার্থী ও আপীলকারী কর্তৃক প্রদেয় ফিস” নির্ধারণ “করিতে পারিবে”। শব্দটি “পারিবে”, বাধ্যবাধকতা নয়।
  • দ্বিতীয় তফসিল, দফা 12: তিন জেলা পরিষদ আইনেই পরিষদের আরোপযোগ্য কর, রেট, টোল ও ফিসের তালিকায় “সামাজিক বিচারের ফিস” আছে।
  • পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, 1997, খণ্ড খ, দফা 35: পরিষদের আরোপযোগ্য উৎসের তালিকায় যোগ হয় “Fees from cases of social justice” (চুক্তির ইংরেজি অনুবাদ অনুযায়ী)।

BRAC-এর গবেষণা কার্বারির সালিশে টাকার একটি প্রথা বর্ণনা করেছে। আবেদনকারী একটি থালায় নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা রেখে লিখিত আবেদন জমা দেন। মামলার গুরুত্ব অনুযায়ী অঙ্কটি 5 টাকা থেকে 500 টাকা পর্যন্ত। রায় আবেদনকারীর পক্ষে গেলে টাকা ফেরত পান। গবেষকরা আরও লিখেছেন, অভিযুক্তকে আবেদনকারীর জমা দেওয়া অঙ্কের দ্বিগুণ দিতে হয়, এমন একটি চল আছে। তাঁদের হিসাবে একটি সাধারণ বিরোধে সালিশের মোট খরচ 50 থেকে 500 টাকা।

কোনো জেলা পরিষদ ধারা 66-এর অধীনে বিচার-পদ্ধতি বা ফি নিয়ে প্রবিধান জারি করেছে কি না, জানা যায়নি। bdlaws-এ তিন আইনের পাঠের সঙ্গে এমন কোনো প্রবিধান যুক্ত নেই।

আঞ্চলিক পরিষদ ও চুক্তি: সামাজিক বিচার কার তত্ত্বাবধানে

1997 সালের চুক্তি সামাজিক বিচারকে দুই জায়গায় রেখেছে। খণ্ড খ-এর দফা 34 “উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার” জেলা পরিষদের কাজের তালিকায় যোগ করে। খণ্ড গ-এর দফা 9(ঙ) বলে, এটি “আঞ্চলিক পরিষদের আওতাভুক্ত থাকিবে”। আঞ্চলিক পরিষদ আইন, 1998-এর ধারা 22(ঙ)-এ শব্দটি নরম হয়ে দাঁড়ায় “সমন্বয় ও তত্ত্বাবধান”।

এই পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আছে আঞ্চলিক পরিষদের গঠন ও ক্ষমতা নিয়ে আমাদের লেখায়। চুক্তির দফাগুলো ধরে ধরে আলোচনা আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭: ধারা ধরে ধরে লেখায়। আপিলের প্রশ্নে যা গুরুত্বপূর্ণ: চুক্তি বা আঞ্চলিক পরিষদ আইন, কোনোটিই আপিলের সিঁড়িতে নতুন ধাপ যোগ করেনি। আঞ্চলিক পরিষদ সামাজিক বিচারের “তত্ত্বাবধান” করে, কিন্তু কোনো রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শোনার ক্ষমতা আইনে তার নেই। শেষ ধাপে এখনো কমিশনার, একজন সরকারি কর্মকর্তা।

আঞ্চলিক পরিষদ আইনের আপিলের ধারাটি (ধারা 43) পরিষদ বা তার চেয়ারম্যানের আদেশে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জন্য। সামাজিক বিরোধের রায়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। আঞ্চলিক পরিষদের লেখায় এই দুইয়ের পার্থক্য আলাদা করে আলোচনা করা আছে।

পুরনো নথিতে আপিল আর রিভিশনের দৃষ্টান্ত: 1946 থেকে 2022

প্রকাশিত উৎসে কয়েকটি নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় যেখানে চিফের প্রথাগত রায় ওপরের কর্তৃপক্ষের কাছে গেছে। প্রায় সবগুলোতে ওপরের কর্তৃপক্ষ চিফের রায় বহাল রেখেছে। রাজা দেবাশীষ রায় এগুলো উদ্ধৃত করেছেন B.K. Dewan-এর Chakma Jatiyo Bichar O Uttaradhikar Pratha (Rangamati, Jum Aesthetics Council, দ্বিতীয় সংস্করণ, 2003) থেকে।

তারিখ নথি কী হয়েছিল উৎস
1 মে 1900শাসনবিধির ধারা 18-এর অধীনে বিধিমালা, প্রজ্ঞাপন নং 123 PCHT প্রশাসনের বিধিমালা কলকাতা গেজেটে প্রকাশ (2 মে 1900)PCJSS সংকলন, পাদটীকা 80
1937–1942তিনটি প্রজ্ঞাপনবিধি 40-এর বর্তমান রূপ: জরিমানার সীমা, বাদ-তালিকা, জেলা প্রশাসকের রিভিশনPCJSS সংকলন, পাদটীকা 107
24 সেপ্টেম্বর 1946চাকমা চিফের আদেশএকটি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘোষণাRoy 2005, পাদটীকা 19
31 মার্চ 1947Misc. Revision Case No. 13 of 1947, চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের আদালতরায় বর্ণিত হয়েছে চিফদের প্রথাগত রায় বহাল রাখা ও হস্তক্ষেপ না করার পরামর্শ হিসেবেRoy 2005, পাদটীকা 19
2 মার্চ 1948বোর্ড অব রেভিনিউর আদেশ1946 সালের চিফের আদেশের বিরুদ্ধেRoy 2005, পাদটীকা 19
2 অক্টোবর 1951রেজোলিউশন নং 4374-j, গভর্নরের সচিব“উপজাতীয় জনগণের সামাজিক কাঠামো রক্ষার” কারণে বোর্ডের 1948 সালের আদেশ বাতিল, চিফের 1946 সালের আদেশ বহালRoy 2005, পাদটীকা 19
5 মে 1964জেলা প্রশাসক এস.জেড. খানের স্মারক নং 1243(400)/সিচিফ ও হেডম্যানের সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতার স্বীকৃতিজুমজার্নাল আর্কাইভ, ক্রমবিকাশ-লেখা
6 মার্চ 1989তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ধারা 66কার্বারি থেকে কমিশনার পর্যন্ত আপিলের সিঁড়ি লিখিত রূপ পায়bdlaws
1998Aung Shwe Prue Chowdhury vs. Kyaw Sain Prue Chowdhury, Civil Appeal No. 8 of 1997, আপিল বিভাগ, 18 BLD (AD) 33–43রাজা দেবাশীষ রায় এটিকে প্রথা-সংক্রান্ত একই ধরনের বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গির সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেনRoy 2005, পাদটীকা 19
1998রাংগামাটি জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ধারা 4রাঙামাটিতে চিফ-ধাপে চাকমা চিফের পাশে বোমাং চিফ যোগbdlaws পাদটীকা
4 জুন 20082003 সনের 38 নং আইন বলবৎজজ আদালত চালু, প্রথাগত মামলা হেডম্যান ও চিফের হাতে রাখাহাইকোর্ট বিভাগ, 2022
21 নভেম্বর 2022দেওয়ানি বিবিধ নং 11/2022 (রেফারেন্স)2008-এর আগের দেওয়ানি আপিল কমিশনারের কাছেই নিষ্পত্তি হবেসুপ্রিম কোর্ট ওয়েবসাইট

রাজা দেবাশীষ রায় আরও লিখেছেন, বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সরকারি নীতি ছিল প্রথাগত বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ, এমনকি সরকারি রিভিশন-কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপও, “strongly” নিরুৎসাহিত করা। চাকমা চিফের আদালতের কয়েকটি মামলার নম্বরও তিনি দিয়েছেন: Misc. Cases No. 1/1998, 7/1999, 1/2000, 6/2000 ও 12/2000। এগুলো উদ্ধৃত হয়েছে এই কথার সমর্থনে যে বহু বিরোধ “আদালতের বাইরে” মেটে। তখন সম্প্রদায়কে জরিমানা দেওয়ার শর্তে অভিযোগ প্রত্যাহার হয়।

বাস্তবে প্রথাগত আদালত কীভাবে চলে: BRAC-এর 2011 সালের গবেষণা যা পেয়েছে

BRAC-এর গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগ 2011 সালের জানুয়ারিতে State of Justice in Chittagong Hill Tracts প্রকাশ করে (Research Monograph Series No. 44)। গবেষকরা 24টি পাড়ায় 601 জনের তথ্য নিয়েছেন। একটি সাধারণ বিরোধ মেটাতে লেগেছে এক থেকে পাঁচটি বৈঠক, খরচ 50 থেকে 500 টাকা। প্রায় 30 শতাংশ রায় কার্যকর হয়নি। গবেষণার পাড়াগুলোতে কোনো নারী কার্বারি বা হেডম্যান পাওয়া যায়নি।

গবেষণায় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো ও বাঙালি উত্তরদাতা ছিলেন। পরিমাণগত তথ্যের পাশাপাশি নেওয়া হয়েছে 25টি গভীর সাক্ষাৎকার ও 25টি কেস স্টাডি, আর চারটি সালিশ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সময়টি গুরুত্বপূর্ণ: মাঠের কাজ হয়েছিল 2008 সালে নতুন জজ আদালত চালুর ঠিক আগে। গবেষকরা নিজেরাই লিখেছেন, তখনো ওই আদালত কাজ শুরু করেনি।

একটি মামলা কীভাবে এগোয়

গবেষণা অনুযায়ী ধাপগুলো এ রকম। প্রথমে কেউ কার্বারির কাছে সালিশ চান। কার্বারি শুরুতেই পরামর্শ দেন বিষয়টি পরিবারের ভেতরে মিটিয়ে নিতে। আবেদনকারী রাজি না হলে লিখিত আবেদন ও টাকা জমা দেন। কার্বারি তারিখ, সময় ও জায়গা ঘোষণা করেন, দুই পক্ষকে আর পাড়ার গণ্যমান্যদের জানান। আগে প্রতিটি কার্বারির এক-দুজন “রোয়াঞ্চি” বা বার্তাবাহক থাকতেন, যাঁরা নোটিশ পৌঁছে দিতেন। গবেষকদের মতে এই প্রথা এখন কম দেখা যায়। সালিশে দুই পক্ষ ও সাক্ষীরা বক্তব্য দেন, কার্বারি প্রশ্ন করেন, প্রমাণ চাইতে পারেন, তারপর সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে রায় দেন।

রায় না মানা হলে বা কোনো পক্ষ সন্তুষ্ট না হলে বিষয়টি যায় হেডম্যানের কাছে। হেডম্যানের সালিশও একই ক্রমে চলে। হেডম্যান সাধারণত একটি মধ্যস্থতা-কমিটি নিয়ে বসেন, যার সদস্য তিনি নিজেই কার্বারি ও স্থানীয় গণ্যমান্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করেন। হেডম্যানের রায়ও চ্যালেঞ্জ হলে বিরোধ “usually” যায় রাজার কাছে। একটি সালিশ শেষ হতে সাত দিন থেকে সাড়ে তিন মাস লাগে। ছোট মামলায় সাধারণত একটি বৈঠকই যথেষ্ট।

গবেষণার চিত্র-3-এ একটি বাস্তব বিষয় আছে যা আইনের পাঠে নেই। কার্বারি ও হেডম্যানের পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও একটি প্রবেশপথ, যেখান থেকে বিরোধ সার্কেল চিফ ও কমিশনারের দিকে যায়। মিশ্র পাড়ায় কার্বারি-হেডম্যানের সঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য, এমনকি রাজাও সালিশে যুক্ত হয়েছেন।

পাড়ার ধরন অনুযায়ী তিন রকম পথ

পাড়ার ধরন কারা নিষ্পত্তি করেন সময় খরচ
শুধু আদিবাসীকার্বারি ও হেডম্যানের সালিশ; খুনের মামলায় থানাএক থেকে পাঁচ বৈঠক50–500 টাকা
একাধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠী মিশ্রকার্বারি, হেডম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য, এমনকি রাজা; খুনে পুলিশএক থেকে সাত বৈঠক50–500 টাকা
আদিবাসী-বাঙালিইউপি চেয়ারম্যান, থানা, জেলা প্রশাসক, আনুষ্ঠানিক আদালতদুই থেকে পঁচিশ বছর2,000–15,000 টাকা

সূত্র: BRAC, State of Justice in Chittagong Hill Tracts (2011), সারণি 4।

কোন আইন মানুষ বেশি পছন্দ করেন

গবেষণার সারণি 7-এ উত্তরদাতাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তাঁরা কোন আইনকে নিজের মনে করেন। উত্তর জনগোষ্ঠী ধরে আলাদা:

জনগোষ্ঠী (উত্তরদাতা) বাংলাদেশের আইন প্রথাগত আইন দুটোই জানেন না
চাকমা (124)3.2%46.8%40.3%9.7%
মারমা (173)0%64.7%17.3%17.9%
ম্রো (127)2.4%71.7%8.7%17.3%
ত্রিপুরা (125)0%52%10.4%37.6%
বাঙালি (48)58.3%0%12%16.7%

সূত্র: BRAC (2011), সারণি 7। মূল সারণির শতাংশ হুবহু; বাঙালি সারির যোগফল মূল সারণিতেই 100 হয় না।

সারণি 8 অনুযায়ী 90.3 শতাংশ উত্তরদাতা ন্যায়বিচারে সালিশের গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। 76.5 শতাংশ সালিশের ভূমিকাকে ইতিবাচক বলেছেন। 70.9 শতাংশ বলেছেন রায় সবসময় কার্যকর হয়, আর 50.9 শতাংশ মনে করেন প্রথাগত আইনের চর্চায় উন্নতি দরকার। গবেষণায় উদ্ধৃত দুটি মন্তব্য দুই দিকের ছবি দেয়। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার একজন হেডম্যান বলেছেন, কার্বারি-হেডম্যানের আদালত ন্যায়বিচার আনতে পারে না, কারণ এটি দুই পক্ষকে খুশি রাখে আর ভুক্তভোগীর অবস্থান ঠিকভাবে তুলে ধরে না। বান্দরবানের জিপতলির একজন উত্তরদাতা বলেছেন, সালিশে সবাই সবাইকে চেনেন আর সবার কথা বলার সুযোগ থাকে, তাই প্রথাগত আইন ন্যায়বিচার দিতে পারে।

নারী, দণ্ড ও প্রভাব

গবেষণার তিনটি পর্যবেক্ষণ আপিলের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রথমত, পাড়াগুলোতে কোনো নারী কার্বারি বা হেডম্যান পাওয়া যায়নি। প্রথাগত আদালতের বিচারকরা সবাই পুরুষ। দ্বিতীয়ত, কিছু ক্ষেত্রে প্রথাগত আদালত ধনী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের দিকে ঝুঁকেছে। তৃতীয়ত, কিছু রায়ে এমন দণ্ড দেওয়া হয়েছে যাকে গবেষকরা মানবমর্যাদার পরিপন্থী বলেছেন, যেমন মাথা ন্যাড়া করা বা জুতার মালা পরানো।

এর বিপরীত তথ্যও আছে। IWGIA-র 2000 সালের প্রকাশনা লিখেছে, চিফদের মনোনয়নে নিযুক্ত মৌজা হেডম্যানদের মধ্যে “a few women” আছেন। রাজা দেবাশীষ রায় 2005 সালে লিখেছেন, পদধারীদের স্ত্রী বা কন্যা কখনো কখনো এই পদে উত্তরসূরি হন। আবার একই গবেষণার সারণি 8-এ 83.7 শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন সালিশে নারীরা কথা বলার সুযোগ পান। BRAC-এর গবেষকরা নিজেরাই যোগ করেছেন, সুযোগ থাকলেও নারীরা যথেষ্ট জোরে কথা তুলতে পারেন না।

আপিলের সিঁড়ি থাকলেও কতজন তা ব্যবহার করেন, সেই সংখ্যা এই গবেষণায় নেই। হেডম্যানের পর রাজার কাছে বা রাজার পর কমিশনারের কাছে কতগুলো বিরোধ গেছে, তার হিসাব এতে দেওয়া হয়নি।

জনগোষ্ঠীভেদে আর্কাইভের বিবরণ: একই সিঁড়ি, আলাদা প্রতিষ্ঠান

আইনের সিঁড়ি সবার জন্য এক। কিন্তু আমাদের আর্কাইভের জনগোষ্ঠী-ভিত্তিক লেখাগুলোতে প্রথম ধাপের চেহারা আলাদা। নিচের বিবরণগুলো প্রতিটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য লেখা। একটির কথা অন্যটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যায় না।

  • চাকমা। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখায় বলা হয়েছে, গ্রামের কার্বারি ঝগড়া-বিবাদ মেটান। তাঁর রায় মনঃপূত না হলে হেডম্যান আদালতে, আর হেডম্যানের রায়ের বিরুদ্ধে রাজা বা সার্কেল চিফের আদালতে আপিল করা যায়। লেখাটিতে কমিশনারের ধাপের উল্লেখ নেই।
  • বম। বম বিবাহবিচ্ছেদ (“মাকসেহ”) নিয়ে আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রী সামাজিক আদালতে বা বম সোশ্যাল কাউন্সিলে যেতে পারেন। কাউন্সিলের ইউনিট, এরিয়া ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের পরামর্শে মামলা যায় কার্বারি আদালতে, সেখান থেকে হেডম্যান আদালতে, তারপর সার্কেল চিফের কাছে। লেখাটি বলে, চিফের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত গণ্য হয়। তবে এ পর্যন্ত মাকসেহ-সংক্রান্ত কোনো মামলা হেডম্যান আদালতের পর সার্কেল চিফের আদালত পর্যন্ত যায়নি। লেখাটির সূত্রও জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, প্রতিম রায় ও সুগত চাকমা সম্পাদিত বইটি।
  • তঞ্চঙ্গ্যা। আর্কাইভের তঞ্চঙ্গ্যা-বিষয়ক লেখা একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির কথা বলে। পালিয়ে বিয়ের পর ছেলের পক্ষ উপঢৌকন (“পৈ”) পাঠায়। মেয়ের পক্ষ তা না মানলে আর দুই পক্ষ একমত না হলে বিষয়টি পাড়া কার্বারি, মৌজার হেডম্যান, “এমনকি রাজার আদালতের” সালিশে নিষ্পত্তি হয়।
  • পাংখোয়া। ভরণপোষণ (“ইনসেন”) নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে রাঙামাটির ধারা 66-এর সিঁড়ি কীভাবে প্রযোজ্য হয়, তা প্রথাগত আইনে পাংখোয়া নারীর অবস্থান লেখায় আলোচনা করা আছে।

তিনটি জিনিস লক্ষ করার মতো। আর্কাইভের জনগোষ্ঠী-ভিত্তিক বিবরণে সিঁড়ি সাধারণত চিফ বা রাজাতে শেষ হয়, কমিশনারের কথা আসে আইনের আলোচনায়। বম সমাজে আইনের সিঁড়ির পাশে একটি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, বম সোশ্যাল কাউন্সিল, কাজ করে। আর রাজা দেবাশীষ রায় 2005 সালে লিখেছেন, কয়েকটি জনগোষ্ঠী তাদের ব্যক্তিগত আইনের বড় অংশ লিখিত রূপ দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি 24 অক্টোবর 2003 তারিখে বম সোশ্যাল কাউন্সিলের সভাপতির সঙ্গে সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করেছেন।

সব আইন এক ছকে: কোন দলিল আপিলের কোন অংশ ঠিক করে

আপিলের প্রশ্নে অন্তত আটটি দলিল প্রাসঙ্গিক। এগুলো চারটি সময়ের, আর একটি অন্যটিকে পুরোপুরি বাতিল করেনি। নিচের ছকে প্রতিটি দলিলের প্রাসঙ্গিক অংশ, আর আপিলের প্রশ্নে সেটি কী বলে।

দলিল ধারা বা বিধি আপিলের প্রশ্নে যা বলে
শাসনবিধি, 1900ধারা 17জেলা প্রশাসক অধস্তনদের, কমিশনার জেলা প্রশাসক ও অন্যদের, সরকার যেকোনো আদেশ রিভিশন করতে পারে
শাসনবিধি, 1900ধারা 19শাসনবিধি বা বিধিমালার অধীনে দেওয়া সিদ্ধান্ত সাধারণ দেওয়ানি বা ফৌজদারি আদালতে প্রশ্ন তোলা যায় না, যদি না অন্য আইন বলে
CHT প্রশাসন বিধিমালাবিধি 40হেডম্যান থেকে চিফ; চিফের রায় জেলা প্রশাসকের রিভিশন সাপেক্ষে চূড়ান্ত; সাত শ্রেণির অপরাধ বাদ
CHT প্রশাসন বিধিমালাবিধি 5, 10, 11আদিবাসী আপিলকারীর কোর্ট-ফি নেই; দেওয়ানি মামলার সব আদেশ কমিশনারের কাছে আপিলযোগ্য; আইনজীবীর উপস্থিতি সীমিত
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989ধারা 66কার্বারি/হেডম্যান থেকে চিফ, তারপর কমিশনার (চূড়ান্ত); জেলাভেদে পাঠ আলাদা
ওই আইনগুলোর তফসিল (1998 সংশোধন)প্রথম তফসিল দফা 23 (রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে দফা 1খ-ও); দ্বিতীয় তফসিল দফা 12সামাজিক বিচার পরিষদের কাজ; “সামাজিক বিচারের ফিস” পরিষদের আয়
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, 1997খ-34, খ-35, গ-9(ঙ)উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার জেলা পরিষদের কাজ ও আঞ্চলিক পরিষদের আওতায়; বিচারের ফি পরিষদের উৎস
আঞ্চলিক পরিষদ আইন, 1998ধারা 22(ঙ)সামাজিক বিচারের সমন্বয় ও তত্ত্বাবধান; আপিল শোনার ক্ষমতা নেই
পার্বত্য চট্টগ্রাম (সংশোধন) আইন, 2003শাসনবিধির ধারা 8(3)–(5) যোগপারিবারিক ও প্রথাগত মামলা যুগ্ম জেলা জজ শোনেন না, হেডম্যান ও চিফ শোনেন
পারিবারিক আদালত আইন, 2023ধারা 1(2)তিন পার্বত্য জেলায় প্রযোজ্য নয়

2003 সালের সংশোধনীর ধারা নম্বর নিয়ে উৎসে অমিল আছে। আমাদের আর্কাইভ বিধানটিকে লেখে “২০০৩ সনের ৩৮নং আইনের ৪(৪) ধারা”। রাজা দেবাশীষ রায়ের 2005 সালের প্রতিবেদন লেখে “Section 4(C)(4), Chittagong Hill Tracts (Amendment) Act, 2004″। PCJSS-এর সংকলন ও হাইকোর্ট বিভাগের 2022 সালের রায় একে “Act XXXVIII of 2003” বলে, যার মাধ্যমে শাসনবিধির ধারা 8-এ উপধারা যুক্ত হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য বিষয়ে আমাদের সব লেখা একসঙ্গে পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।

প্রশ্নোত্তর

পাহাড়ে সামাজিক বিরোধের প্রথম বিচার কে করেন?

পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989-এর ধারা 66(1) অনুযায়ী স্থানীয় কার্বারি বা হেডম্যান। দুই পক্ষ জেলার উপজাতীয় বাসিন্দা হলে এবং বিষয়টি সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা উপজাতীয় হলে বিরোধ প্রথমে তাঁদের কাছেই তুলতে হয়। তাঁরা সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রচলিত রীতিনীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করেন। তিন জেলার আইনেই এই উপধারা একই রকম।

কার্বারির রায়ে সন্তুষ্ট না হলে আপিল কোথায় করতে হয়?

জেলাভেদে আলাদা। বান্দরবানে ধারা 66(2) অনুযায়ী আপিল যায় হেডম্যানের কাছে, তারপর বোমাং চিফের কাছে। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে কার্বারি ও হেডম্যান একই ধাপে। সেখানে আপিল সরাসরি চিফের কাছে যায়: রাঙামাটিতে ক্ষেত্রবিশেষে চাকমা বা বোমাং চিফ, খাগড়াছড়িতে মং চিফ।

সামাজিক বিচারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কে দেন?

তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ধারা 66 অনুযায়ী চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার, এবং তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে 1900 সালের শাসনবিধির বিধি 40 বলে, চিফের রায় জেলা প্রশাসকের রিভিশন সাপেক্ষে চূড়ান্ত। আমাদের আর্কাইভ ও BRAC-এর 2011 সালের গবেষণা দুটিই এই দুই বিধানকে অমীমাংসিত আইনি দ্বন্দ্ব বলেছে।

বিভাগীয় কমিশনারকে কাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হয়?

আপিল নিষ্পত্তির আগে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী থেকে তাঁর নিজের মনোনীত অন্তত তিনজন বিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে। আইনে লেখা “পরামর্শ করিবেন”। তাঁদের মত মানতে তিনি আইনত বাধ্য নন, আর কাকে মনোনীত করবেন তাও তিনিই ঠিক করেন। বান্দরবানে বোমাং চিফকেও একই পরামর্শ করতে হয়।

খাগড়াছড়িতে মং চিফের পাশে কারা বসেন?

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ধারা 66(3) অনুযায়ী মং চিফকে আপিল নিষ্পত্তিতে সাহায্য করেন একজন ত্রিপুরা ও একজন চাকমা পরামর্শদাতা। সরকার তাঁদের তিন বছরের জন্য মনোনীত করে। রাঙামাটি ও বান্দরবানের আইনে এমন বিধান নেই। এই পদে কে কবে মনোনীত হয়েছেন, তার সরকারি তালিকা পাওয়া যায়নি।

হেডম্যান ও সার্কেল চিফ কত টাকা জরিমানা করতে পারেন?

1900 সালের শাসনবিধির বিধি 40 অনুযায়ী উপজাতীয় মামলায় হেডম্যান 25 টাকা পর্যন্ত, সার্কেল চিফ 50 টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন। দুজনেই ক্ষতিপূরণ বা ফেরত আদায় করাতে পারেন, আর জেলা প্রশাসকের আদেশ না আসা পর্যন্ত আটক রাখতে পারেন। অঙ্কগুলো 1937–1942 সালের প্রজ্ঞাপনের।

কোন মামলা কার্বারি, হেডম্যান বা চিফ শুনতে পারেন না?

বিধি 40 সাত শ্রেণির অপরাধ বাদ দিয়েছে: রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ; গুরুতর আঘাত বা মারণাস্ত্রসহ দাঙ্গা; খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, গুরুতর আঘাত; 50 টাকার বেশি মূল্যের ডাকাতি, দস্যুতা বা গৃহে অনধিকার প্রবেশ; জালিয়াতি; শাসনবিধির অস্ত্র-মাদক অধ্যায়ের অপরাধ; আর কমিশনার যেগুলো নির্দিষ্ট করেন।

পাহাড়ে প্রথাগত বিচারে কোর্ট-ফি লাগে কি?

না। শাসনবিধির বিধি 40 অনুযায়ী চিফ বা হেডম্যানের কাছে উপজাতীয় মামলায় কোর্ট-ফি লাগে না। তবে জেলা প্রশাসকের অনুমোদিত হারে বিচারের খরচ নেওয়া যায়। ধারা 66 জেলা পরিষদকে ফি নির্ধারণের ক্ষমতা দেয়। BRAC-এর 2011 সালের গবেষণায় সালিশের খরচ পাওয়া গেছে 50 থেকে 500 টাকা।

পাহাড়ের যুগ্ম জেলা জজ কি বিবাহবিচ্ছেদ বা উত্তরাধিকারের মামলা শোনেন?

জনগোষ্ঠীগুলোর পারিবারিক বা প্রথাগত আইনের মামলা শোনেন না। পার্বত্য চট্টগ্রাম (সংশোধন) আইন, 2003 শাসনবিধির ধারা 8(4) যোগ করে এগুলো মৌজা হেডম্যান ও সার্কেল চিফের বিচার্য করেছে। আইনটি 4 জুন 2008 বলবৎ হয়। পারিবারিক আদালত আইন, 2023-ও ধারা 1(2) অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলায় প্রযোজ্য নয়।

আঞ্চলিক পরিষদ কি সামাজিক বিচারের আপিল শোনে?

না। আঞ্চলিক পরিষদ আইন, 1998-এর ধারা 22(ঙ) পরিষদকে “উপ-জাতীয় রীতিনীতি, প্রথা ইত্যাদি এবং সামাজিক বিচার”-এর সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেয়। কিন্তু কোনো রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শোনার ক্ষমতা দেয় না। চুক্তির খণ্ড গ-এর দফা 9(ঙ)-এ লেখা ছিল বিষয়টি পরিষদের “আওতাভুক্ত” থাকবে।

পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যে বিরোধ হলে কি ধারা 66 প্রযোজ্য?

না। ধারা 66(1) শুধু জেলার উপজাতীয় বাসিন্দাদের “মধ্যে” বিরোধের কথা বলে। BRAC-এর 2011 সালের গবেষণা দেখেছে, আদিবাসী-বাঙালি বিরোধ যায় ইউপি চেয়ারম্যান, থানা, জেলা প্রশাসক ও আনুষ্ঠানিক আদালতে। এসব মামলায় দুই থেকে পঁচিশ বছর আর 2,000 থেকে 15,000 টাকা লেগেছে।

নারীরা কি কার্বারি বা হেডম্যান হন?

BRAC-এর 2011 সালের গবেষণা অনুযায়ী তাদের 24টি পাড়ায় কোনো নারী কার্বারি বা হেডম্যান ছিলেন না। IWGIA-র 2000 সালের প্রকাশনা লিখেছে, মৌজা হেডম্যানদের মধ্যে “a few women” আছেন। রাজা দেবাশীষ রায় 2005 সালে লিখেছেন, পদধারীদের স্ত্রী বা কন্যা কখনো কখনো উত্তরসূরি হন।

যা এখনো জানা যায়নি

  • কমিশনারের কাছে কতগুলো আপিল যায়। 1989 সালের পর ধারা 66-এর অধীনে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের কাছে কতগুলো সামাজিক বিরোধের আপিল জমা পড়েছে বা নিষ্পত্তি হয়েছে, তার কোনো প্রকাশিত হিসাব পাওয়া যায়নি। চিফদের আদালতে বছরে কত মামলা আসে, সেই হিসাবও প্রকাশিত নয়।
  • 40 বিধি আর 66 ধারার দ্বন্দ্ব আদালতে মীমাংসা হয়েছে কি না। জেলা প্রশাসকের রিভিশন আর কমিশনারের আপিল, এই দুইয়ের সম্পর্ক নিয়ে উচ্চ আদালতের কোনো রায় পাওয়া যায়নি। 2022 সালের রেফারেন্সটি সাধারণ দেওয়ানি আপিল নিয়ে, ধারা 66 নিয়ে নয়।
  • জেলা পরিষদের প্রবিধান। ধারা 66-এর অধীনে বিচার-পদ্ধতি ও ফি নিয়ে তিন জেলা পরিষদের কোনোটি প্রবিধান জারি করেছে কি না, জানা যায়নি। bdlaws-এ এমন কোনো প্রবিধান যুক্ত নেই।
  • খাগড়াছড়ির পরামর্শদাতা। ধারা 66(3)-এর ত্রিপুরা ও চাকমা পরামর্শদাতা পদে কখনো কেউ মনোনীত হয়েছেন কি না, তার কোনো সরকারি নথি পাওয়া যায়নি। খাগড়াছড়ির চাকমা সার্কেলভুক্ত এলাকার আপিল বাস্তবে মং চিফের কাছে যায় না চাকমা চিফের কাছে, তাও কোনো উৎসে লেখা নেই।
  • জরিমানার সীমা। বিধি 40-এর 25 ও 50 টাকার সীমা 1942-এর পর বদলানো হয়েছে কি না, কোনো সংকলিত পাঠে পাওয়া যায়নি।
  • তিন বিজ্ঞ ব্যক্তি। কমিশনার বাস্তবে কাদের মনোনীত করেন এবং পরামর্শের কোনো লিখিত রেকর্ড রাখা হয় কি না, তার বিবরণ পাওয়া যায়নি।
  • 2008-এর পরের মাঠ-চিত্র। BRAC-এর গবেষণার মাঠের কাজ জজ আদালত চালুর আগের। তার পরে প্রথাগত আদালত, ইউপি ও জজ আদালতের মধ্যে মামলার ভাগ কীভাবে বদলেছে, সে বিষয়ে তুলনীয় কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি।
  • জনগোষ্ঠী-ভিত্তিক ছবি। চাকমা, বম, তঞ্চঙ্গ্যা ও পাংখোয়া ছাড়া অন্য জনগোষ্ঠীর আপিলের অভ্যাস নিয়ে আর্কাইভে নির্দিষ্ট বিবরণ নেই। মারমা, ত্রিপুরা ও ম্রো সম্পর্কে যা আছে, তা BRAC-এর সমষ্টিগত পরিসংখ্যান।

তথ্যসূত্র

প্রাথমিক উৎস: আইন ও সরকারি পাঠ

  1. রাংগামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989 (1989 সনের 19 নং আইন), ধারা 66 ও পাদটীকা। আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়, bdlaws। http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-724/section-34774.html; তফসিল: http://bdlaws.minlaw.gov.bd/upload/act/724___Schedule.pdf
  2. খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989 (1989 সনের 20 নং আইন), ধারা 66। bdlaws। http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-725/section-34854.html; তফসিল: http://bdlaws.minlaw.gov.bd/upload/act/725___Schedule.pdf
  3. বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, 1989 (1989 সনের 21 নং আইন), ধারা 66। bdlaws। http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-726/section-34955.html; তফসিল: http://bdlaws.minlaw.gov.bd/upload/act/726___Schedule.pdf
  4. The Chittagong Hill Tracts Regulation, 1900 (Regulation I of 1900), ধারা 2, 7, 8, 17, 18, 19, এবং Rules for the Administration of the Chittagong Hill Tracts, বিধি 1–11, 38A, 39, 40, 48; সংশোধনী-পাদটীকাসহ। PCJSS সংকলন, 2020। https://www.pcjss.org/wp-content/uploads/sites/16/2020/10/CHT-Regulation-1900.pdf
  5. পারিবারিক আদালত আইন, 2023, ধারা 1(2)। bdlaws। https://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-print-1444.html
  6. Chittagong Hill Tracts Peace Accord, 1997 (ইংরেজি অনুবাদ), খণ্ড খ দফা 34–35, খণ্ড গ দফা 9। Peace Accords Matrix, University of Notre Dame। http://peaceaccords.nd.edu/wp-content/accords/Chittagong_Hill_Tracts_Peace_Accord.pdf
  7. সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ, হাইকোর্ট বিভাগ, Civil Miscellaneous No. 11 of 2022 (Reference), রায় 21.11.2022। https://www.supremecourt.gov.bd/resources/documents/2302441_CivilMisc11of2022.pdf

প্রাথমিক উৎস: জুমজার্নাল আর্কাইভ

  1. “পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার সৃষ্টি, শাসন ও বিচার ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ” (সূত্র: অ্যাডভোকেট জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, অ্যাডভোকেট প্রতিম রায় ও সুগত চাকমা সম্পাদিত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন)। জুমজার্নাল। লিংক
  2. “বম জনগোষ্ঠী বিবাহ বিচ্ছেদ (মাকসেহ)”। জুমজার্নাল। লিংক
  3. “চাকমা জাতি”। জুমজার্নাল। লিংক
  4. “তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত”। জুমজার্নাল। লিংক

গবেষণা ও সংবাদ

  1. Kundu, Debasish Kumar; Samadder, Mrinmoy; Khan, Ashrafuzzaman; Naomi, Sharin Shajahan। State of Justice in Chittagong Hill Tracts: Exploring the Formal and Informal Justice Institutions of Indigenous Communities। BRAC Research and Evaluation Division, Research Monograph Series No. 44, জানুয়ারি 2011। লিংক
  2. Roy, Raja Devasish। Traditional Customary Laws and Indigenous Peoples in Asia। Minority Rights Group International, মার্চ 2005। https://minorityrights.org/resources/traditional-customary-laws-and-indigenous-peoples-in-asia/
  3. Roy, Chandra K.। Land Rights of the Indigenous Peoples of the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh। IWGIA, 2000। https://www.iwgia.org/images/publications/0128_Chittagong_hill_tracts.pdf
  4. বান্দরবান প্রতিনিধি। “পার্বত্য চট্টগ্রামে দুই দশকেও প্রতিষ্ঠা হয়নি পারিবারিক আদালত, বিচারবঞ্চিত নারী ও শিশুরা”। যুগান্তর, 18 সেপ্টেম্বর 2026। https://www.jugantor.com/country-news/1156575

সম্পর্কিত জুমজার্নাল লেখা

সর্বশেষ হালনাগাদ: 19 অক্টোবর 2026

প্রসঙ্গ:CHT Regulation 1900, পার্বত্য জেলা পরিষদ, প্রথাগত আইন, সার্কেল চীফ, হেডম্যান

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা